- হোম
- রেডিও
- ইসলামিক পুস্তক.
- কওমি মাদ্রাসার নেসাব ভুক্ত উর্দু কিতাবাদি
- কওমি সিলিভাস ভুক্ত কিতাবাদি
- উর্দু ইসলামিক কিতাবাদি
- মাদানি নেসাবের কিতাব
- ইসলামিক Mp3 সং
- ওয়াজ নসিহত বয়ান
- কোরআন তেলোয়াত Mp3
- ভিডিও বয়ান ওয়াজ
- ভিডিও ইসলামিক সং
- ইসলামি গল্প
- ইসলামি ঘটনা
- চার ইমাম
- ইসলামি ইতিহাস
- মাসালা-মাসায়েল
- মাযহাব ও তাকলিদ
- প্রশ্ন উত্তর
- যোগাযোগ
- কোরআন এবং হাদিস
- আহলে হাদিস সমাচার
- গুণী মানুষের কিছু বানী
ব্যক্তিত্ব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ব্যক্তিত্ব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শনিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৬
শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
মহান পুরুষ আল্লামা আতহার আলী রহ.
যুবায়ের আহমাদ
একটি জাতির পরিবর্তনের জন্য দরকার একজন নেতা।
মুসা আ. বনি ইসরাঈলে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, ইবরাহিম আ. নমরূদের মসনদে আঘাত হেনে আল্লাহর
বড়ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি একজন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বিশ্ব মানবতার ভাগ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায়
মুহাম্মদ বিন কাসিম তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে এই উপমহাদেশের মানুষকে আত্মিক
মুক্তির সন্ধান দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। একজন তিতুমীরের ডাকে বাংলার নিপীড়িত মজলুম
জনতা ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো।
মানুষ শিক্ষিত হয় মানুষের জন্য।
জ্ঞানার্জনের পরই একজন মানুষ স্বজাতির কাছে ঋণী হয়। পথহারা মানুষের পাশে
দাঁড়াতে। বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশ ও জাতির সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকসহ পরলৌকিক মুক্তির পথকে
সুগম করার সামাজিক দায়বদ্ধতা চেপে বসে শিক্ষিত মানুষের ঘাড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে
যে ক’জন
মনিষী এ ঋণ নিঃস্বার্থভাবে শোধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাদেরই একজন মাওলানা আতহার
আলী রহ.।
ইতিহাসের এ কিংবদন্তি ১৮৯১ সালে সিলেট জেলার
বিয়ানীবাজার উপজেলার ঘুঙ্গাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই গ্রামের মক্তবে
শিক্ষাজীবন শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষা ঝিঙ্গাবাড়ি আলিয়া মাদরাসা ও বেশ ক’জন
বুজুর্গ আলেমের কাছে সম্পন্ন করে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ভারতে যান। মাদরাসায়ে
কাসেমিয়া শাহি মুরাদাবাদ, মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর এবং সর্বশেষ
মাদরাসায়ে আলিয়া রামপুরে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য
বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন এবং অত্যন্ত কৃতিত্যের সঙ্গে
সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন। তার শিক্ষকদের মধ্যে যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম আল্লামা আনওয়ার
শাহ কাশ্মীরী ও শাইখুল ইসলাম আল্লামা শিব্বির আহমাদ উসমানী রহ. অন্যতম।
শিক্ষা সমাপনান্তে মাওলানা আতহার আলী রহ.
আত্মশুদ্ধি লাভের জন্য হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবীর রহ. পবিত্র হাতে বাইয়াত
গ্রহণ করেন। মুরশিদের সান্নিধ্যে থেকে কঠোর পরিশ্রম ও মুজাহাদার মাধ্যমে
আত্মশুদ্ধির স্তরসমূহ অতিক্রম করে খুব অল্প সময়ে তার খেলাফত লাভে ধন্য হন।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এ মহান আলেম
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর নিজ গ্রামে ইলমে হাদিস শিক্ষাদান শুরু করেন। কিছুদিনের
মধ্যে যোগ্যতার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে তিনি সিলেট জেলার প্রাচীন ও বিখ্যাত
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঝিঙ্গাবাড়ি আলিয়া মাদরাসার প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত
হন। দেশের বিভিন্ন মাদরাসা থেকে তাঁর কাছে আমন্ত্রণ আসতে থাকে। অবশেষে কুমিল্লা
জামিয়া মিল্লিয়াতে মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন
দক্ষ ও সুযোগ্য তেমনি তার ব্যক্তিত্ব ছিলো বিশাল ও গুরুগম্ভীর। এ কারণেই
ছাত্রসমাজে তিনি যেমন ছিলেন প্রিয়পাত্র, মাদরাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছেও ছিলেন
সম্মানিত।
পরে স্বীয় মুরশিদের নির্দেশে কিশোরগঞ্জের
বৌলাই জমিদার বাড়িতে শুভাগমন করে তথায় দাওয়াত ও আত্মশুদ্ধির কাজে আত্মনিয়োগ
করেন। তৎকালীন সময়ে বৌলাই জমিদার বাড়ি ছিলো ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম
কেন্দ্র। পরবর্তিতে কিশোরগঞ্জের হয়বতনগরের জমিদার মরহুম দেওয়ান মান্নান দাদ
খানের অনুরোধে হয়বতনগর তাশরিফ আনেন এবং দাওয়াত ও দীনি কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখেন।
অল্প সময়েই সর্বজন শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু এখানে একটি অনৈসলামিক কাজ সংঘটিত
হওয়ায় তিনি মর্মাহত হয়ে নিজ বাড়ির দিকে রওয়ানা করেন। পথিমধ্যে তার কিছু
ভক্তের অনুরোধে কিশোরগঞ্জ শহরের পুরান থানা মসজিদে সাময়িক অবস্থানের সিদ্ধান্ত
নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নিজ মুরশিদ বরাবর পত্র লিখেন এবং মুরশিদের
নির্দেশে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। এখান থেকেই তার কর্মবহুল
জীবনের সূত্রপাত ঘটে।
কিশোরগঞ্জবাসীর অনুরোধে তিনি পুরান থানার যে
মসজিদটির ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তা ছিলো অত্যন্ত ছোটো। তার আগমনে
মুসল্লিদের মধ্যেও অভূতপূর্ব সাড়া পড়লো। তাঁর ইবাদত, জাগরণ এবং শেষ রাতের কান্নাকাটি এতদঞ্চলে এক
আশ্চর্যজনক প্রভাব ফেললো। ভ্রান্ত বিশ্বাসের অনুসারীরাও সঠিক পথের সন্ধান পেতে
লাগলো। সূচনা হলো এক বিপ্লবের। মাত্র দশ টাকা পুঁজি নিয়েই তিনি পুরান থানা
মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করেন। পাল্টে যায় মসজিদের চেহারা, বিশাল এক মসজিদে রূপ নেয় পুরানথানা মসজিদ। এ
মসজিদ কেন্দ্রিক এ এলাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তিতে উগ্র হিন্দুরা
ঢাক-ঢোল বাজিয়ে মূর্তিসহ মসজিদের সামনে দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তওহিদি জনতা
মসজিদের মর্যাদা রক্ষার্থে বাধা দেন। ওই সময় পুলিশের গুলিতে একাধিক মুসল্লি শহিদ
হন। তখন থেকে এ মসজিদ শহিদী মসজিদ নামে খ্যাতি লাভ করে।
মসজিদকেন্দ্রিক চতুর্দিকে আতহার আলীর রহ.
খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো। তিনি একটি আধুনিক দীনি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের সংকল্প
করলেন। নিঃসন্তান এক ব্যাক্তি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য জায়গা দান করেন এবং নিজ
খরচে রেজিষ্ট্রিকরে দেন। অল্প দিনের মধ্যেই আল্লাহ তাকে সন্তানের পিতা হওয়ার
সৌভাগ্য দান করেন।
১৯৪৫ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর প্রধান খলিফা
মাওলানা আহমদ আলী খানকে রহ. প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করে জামিয়া ইমদাদিয়া নিয়ে
আরেক সংগ্রাম শুরু করেন। তার ইঙ্গিতে হাজারো জনতা মাদরাসা-মসজিদের জন্য জান-মাল
কুরবানি দেয়াকে গৌরবের বিষয় মনে করতে লাগলো। গ্রামে-গঞ্জে ব্যাপক সাড়া পড়লো।
মাওলানা আতহার আলীর রহ. কথা বললে দূর-দূরান্তের মানুষও বস্তা ভর্তি ধান, জমির ফসল,বাঁশ সাধ্যমতো দিতে শুরু করলো। যার
ফলশ্রুতিতে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নতিও পরিলক্ষিত হলো। বিভিন্ন দালান কোঠার কাজ
এতো দ্রুতগতিতে শুরু হলো যে, মানুষ অনুমান করতে পারছিলো না এসব কী হচ্ছে!
পাল্টে গেলো কিশোরগঞ্জ শহরের চিত্র। শহরের
প্রাণকেন্দ্রে শোভা পাচ্ছিলো বিশাল বিশাল অট্টালিকা। দক্ষিণ পার্শ্বের বিল্ডিংটি
ছিলো শহরের মূল সড়ক ঘেঁষে; যা এতো দ্বীর্ঘ ও উঁচু ছিলো যে বহুদিন
পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ শহরে এর নজির ছিলো না। চারতলা বিশিষ্ট বিল্ডিং-এর ঠিক মাঝখানে
ছিলো তাফসির ক্লাসের জন্য পঞ্চম তলা। তাঁর উদ্দেশ্য যেহেতু শুধু একটি মাদরাসা
স্থাপনেই সীমাবদ্ধ ছিলো না তাই অল্প দিনের ব্যবধানেই তিনি এই ছোট্ট মাদরাসাটিকে ‘জামিয়া’ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করেন। একটি দীনি মহাকেন্দ্র হিসেবে
রূপদিতে ভবনের চেয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলীর প্রয়োজনও যেহেতু কম নয় তাই তিনি
জাহেরি নির্মণকাজের পাশাপাশি বিখ্যাত, স্বনামধন্য, যোগ্যতাসম্পন্ন, নানা বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক সংগ্রহে ব্রতী
হোন। যেখানেই কোনো অভিজ্ঞ শিক্ষকের সন্ধান পেতেন সেখানেই তাঁর প্রতিনিধি পাঠিয়ে
তাকে জামিয়ায় আনার চেষ্টা করতেন। এমনকি দারুল উলুম দেওবন্দ, জামিয়া ইসলমিয়া করাচীতে অধ্যয়নরত মেধাবী, যোগ্য ছাত্রদেরকে পড়াশুনা শেষে জামিয়াতে
পাঠিয়ে দেবার অনুরোধ করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় সায়্যিদ আবদুল আহাদ কাসেমী রহ., মাওলানা আশরাফ আলী (কুমিল্লা), মাওলানা কুতুব উদ্দিন (সিলেট), মাওলানা খলিলুর রহমান (বরিশাল), মাওলানা মুহিবক্ষুর রহমান (সিলেট), মাওলানা আবদুর রব (সিলেট), মাওলানা রহমতুল্লাহ (সিলেট), মাওলানা কাজী মু‘তাসিম
বিল্লাহ (বর্তমানে মালিবাগ), মাওলানা যুবায়ের, মাওলানা আবদুল হক-এর মতো অভিজ্ঞ
শিক্ষকমণ্ডলীর সমাবেশ ঘটেছিলো জামিয়ায়।
জাতীয় জীবনে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে
আজ আমরা যেসব বিষয় নিয়ে ভাবছি মাওলানা আতহার আলী রহ. অর্ধশতাব্দী আগেই সেসব
বিষয়ে চিন্তা করেছিলেন এবং কাজ শুরু করেছিলেন। জামিয়াকে বিভিন্ন বিভাগে
সাজিয়েছিলেন। কর্মমূখী শিক্ষার কথা চিন্তা করে লেখাপড়া শেষে ছাত্ররা যেনো
আত্মকর্মসংস্থান করতে পারে সেজন্য তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তন্মধ্যেÑ অনুবাদ ও রচনা বিভাগ। এ বিভাগের অধীনে
লেখালেখিতে আগ্রহী শিক্ষকমণ্ডলী ও যোগ্য ছাত্রদেরকে অনুবাদ ও রচনার সুযোগ করে
দেয়া হয়। পৃথক দাওয়াত ও তাবলিগ বিভাগের মাধ্যমে বাংলা এবং উর্দু ভাষায় পৃথক দ্বিমাসিক পুস্তক-পুস্তিকা
প্রকাশ করা হয়। বস্ত্রশিল্প বিভাগ। জ্ঞানার্জনের পর শিক্ষার্থীরা যেনো জীবিকার
নির্বাহে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠতে পারে সেজন্য এ বিভাগের আওতায় শিক্ষার্থীদেরকে
উইভিং, নিটিং, টেইলারিং,বাইন্ডিংসহ বিভিন্ন প্রকারের কাপড় তৈরি ও
সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। চিকিৎসা বিভাগ। ১৯৫৯ সালে ইসলামি চিকিৎসার
মানোন্নয়নে এ বিভাগ খোলা হয়। পরিসংখ্যান বিভাগ। ভূমি জরিপ (আমিনশীপ) ও বিভিন্ন
জরিপ শেখােেনা হতো এ বিভাগের মাধ্যমে। টেলিগ্রাম ও টাইপরাইটিং বিভাগ। তৎকালীন
সময়ে যেহেতু কম্পিউটারের অস্তিত্ব ছিলো না তাই এ বিভাগটি আধুনিক বিষয়সমূহের
অন্যতম ছিল। ব্যাপক চাহিদা থাকায় এ মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন সহজ ছিলো।
কিন্তু স্বাধীনতার পর কারিগরি ও হস্তশিল্পের
অধিকাংশ বিভাগ বন্ধ হয়ে যায়।
আতহার আলী রহ. শহিদী মসজিদের পাঁচতলা মিনারার
একেক তলাকে একেকটি কাজের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন। ১৩৬৪(বাংলা) সালের ৮ কার্তিক
শহিদী মসজিদের ৫তলা বিশিষ্ট বিশাল মিনারা স্থাপন করা হয়। এর ১ম তলা লাইব্রেরি, ২য় তলা পাঠাগার, ৩য় তলা রচনালয়, ৪র্থ তলা সুধীর আসরের জন্য নির্ধারণ করেন।
আজও সেই সুউচ্চ মিনার তাঁর অমর কীর্তির বিমূর্ত প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
তৎকালীন পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রণালয়ের
উপদেষ্ঠা আবদুল হক ফরিদী বলেছিলেনÑ ‘আমি
আমার চাকুরী জীবনে অনেক দীনি মাদরাসা দেখেছি, কিন্তু নিছক দীনি শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক
শিল্প কারিগরির সংমিশ্রণ, যা এ প্রতিষ্ঠানে দেখেছি তা অন্য কোথাও আমার
দৃষ্টিগোচর হয়নি।’
কোনো মতবাদকে প্রতিষ্ঠা গণমাধ্যমের
প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আজ আমরা পদে পদে তা অনুভব করছি, কিন্তু আতহার আলী রহ. সে প্রয়োজনীয়তা
অর্ধশতাব্দী আগেই তা অনুভব করেছেন। তিনি সে সময়ে দৈনিক নাজাত ও সাপ্তাহিক নেজামে
ইসলাম নামে দুটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন।
শহিদী মসজিদকে কেন্দ্র করে যখন তিনি ধর্মীয়
ও সংস্কার কাজে ব্যস্ত ঠিক তখনই পাকিস্তান আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে তিনি
স্বীয় শিক্ষক আল্লামা শিবিক্ষর আহমদ উসমানীর রহ. নির্দেশে এ মসজিদ থেকেই জমিয়তে
উলামায়ে ইসলামের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করেন। ১৯৫৩ সালে দেশের খ্যাতনামা আলেম
ও বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে ‘নেজামে ইসলাম’ নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এ মসজিদ থেকেই ইসলামি আন্দোলনের ফর্মূলা তৈরি হতো এবং তা
দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছাতো। এখান থেকেই তিনি প্রাদেশিক ও জাতীয়
পরিষদের এমএনএ এবং এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে শেরে
বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষকপ্রজা পার্টি ও নেজামে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ নির্বাচনে নেজামে ইসলাম
জাতীয় এ্যসেম্বলীতে ৪টি এবং প্রাদেশিক এ্যসেম্বলীতে ৩৬টি আসন লাভ করে ১৯৫৪-৫৬ সাল
পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয়
এ্যসেম্বলীর স্পীকার ও ১জন মন্ত্রী এবং প্রাদেশিক এ্যসেম্বলীর ৩জন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নিযুক্ত হন নেজামে
ইসলাম পার্টি থেকে। আতহার আলী রহ. নিজে মন্ত্রী না হয়ে অনেককেই মন্ত্রীত্বের আসনে
বসিয়েছেন। ১৯৫৬ সালে সংবিধানে যে ইসলামি ভাবধারা সৃষ্টি হয়েছিলো তা তাঁরই
চেষ্টার ফল ছিলো।
তিনি জামিয়ায় বাংলা ভাষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের
মাধ্যমে মাতৃভাষা শিক্ষার ওপর এতোই জোর দিয়েছিলেন যে, অনেকে ভুল ধারণায় তাঁকে এমন দোষারোপও
করছিলেন, তিনি
জামিয়াকে কলেজে রূপান্তর করে ফেলেছেন!
১৯৫২ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ কিশোরগঞ্জের হয়বতনগরে
অনুষ্ঠিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ঐতিহাসিক সম্মেলনে যেসব প্রস্তাবনা পেশ করা
হয়েছিল তার অন্যতম ছিলো, ‘বাংলাকে
পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হোক।’ শুধু দাবি হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং
করাচীতে পশ্চিম পাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টি গঠনের সময় পার্টির সংবিধানের
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আদর্শগত ঘোষণা সংযোজন
করেছিলেন। ফলে এটাই সত্য প্রমাণিত হয় যে, তিনিই ছিলেন অবিভক্ত পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে
রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপনকারী প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
আতহার আলীকে রহ. আধুনিক কিশোরগঞ্জের স্থপতি
বললেও ভুল হবে না। কিশোরগঞ্জ শহরের বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও পাকা রাস্তা ঘাটের
ভিত্তিপ্রস্তর তাঁরই অমর কীর্তির নিদর্শন। জামিয়া ইমদাদিয়া পোস্ট অফিসও তার এক
কীর্তি।
তৎকালীন সময়ে কওমি মাদরাসার সংখ্যা ছিলো
প্রায় ত্রিশ হাজার। তিনিই সর্বপ্রথম মাদরাসাগুলোর ঐক্য, পাঠ্য তালিকায় সমন্বয় ও উদ্দেশ্য সফল করার
লক্ষ্যে ব্যাপক তৎপরতা চালান। তাঁর ডাকে ১৯৬২ সালে ‘মু‘তামারে
মাদারিসে ইসলামিয়া কওমিয়া, পুর্ব পাকিস্তান’ নামে একটি বোর্ড গঠন করেন। যার সদর দপ্তর
ছিলো জামিয়া ইমদাদিয়ায়। সংগঠনটি কিছুদিন পর নানা সমস্যার কারণে কার্যক্রমহীন
হয়ে পড়ে। এ স্বপ্নের ফলশ্রুতিতেই পরে দাঁড় হয় বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া
বাংলাদেশ।
জীবনের শেষভাগে ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়া
মোড়ের দারুল উলুম নামের ছোট্ট প্রতিষ্ঠানকে খুব অল্প সময়েই জামিয়া
(বিশ্ববিদ্যালয়) স্তরে উন্নীত করে কয়েক কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেন। বিদ্যুৎ
বেগে চলে কাজ; কয়েক
লক্ষ টাকার কাজ হতে না হতেই চির বিদায়ের ডাক এসে পড়ে তাঁর। ইসলামি শিক্ষা ও
আন্দোলনের এ পুরোধা ১৯৭৬-এর ৬ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন।
আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৬
কায়েদ ছাহেব হুজুরঃ তাঁকে যেমন দেখেছি
কবি রূহুল আমীন খান : সাহাবায়ে কেরামদের আমরা দেখিনি। তাঁদের কথা পড়েছি ইতিহাসে। তাঁদের ইখলাস-লিল্লাহিয়াত, ত্যাগ-কুরবানী, আদর্শ-নিষ্ঠার কথা পড়ে বিস্ময়াভিভূত হয়েছি। একালে তেমন মানুষ- দুনিয়ার প্রতি, সম্পদের প্রতি আড়ম্বরের প্রতি, তেমন নিরাসক্ত নির্মোহ ব্যক্তিত্ব পাওয়া দুষ্কর। সেই অনুপম চরিত্রের মানুষগুলোর কথা আমার মানসপটে যে রূপে অংকিত হয়েছে, তাঁদের যে চিত্র, যে ছবি আমার মনে বারবার উঁকি দিচ্ছে- আমার পরম শ্রদ্ধেয় উস্তাদ কায়েদ ছাহেব হুজুর হযরত মাওলানা আযীযুর রহমান নেছারাবাদী (রহ.) ছিলেন যেন তাঁদেরই প্রতিচ্ছবি। তাঁর ছাত্র হিসেবে, ভাবশিষ্য হিসেবে, আন্দোলনের কর্মী হিসেবে, সহকর্মী হিসেবে সুদীর্ঘ অর্ধশত বছরের আমার যে অভিজ্ঞতা, সে অভিজ্ঞতার নিরিখে আমি এ বিশেষণ ছাড়া তাঁকে অন্য কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করতে পারছি না।
ছিপছিপে লম্বা গড়নের এই মানুষটির চোখের তারায় যে জ্যোতি আমি প্রত্যক্ষ করেছি, এককথায় তা দুর্লভ। সে অপূর্ব দ্যুতিময় দৃষ্টি যখন তিনি নিক্ষেপ করতেন কর্মীদের প্রতি তখন তা তাদের অন্তর ভেদ করে যেত, সমগ্র সত্তায় ছড়িয়ে দিত বিদ্যুৎ প্রবাহ, মনোরাজ্যে সৃষ্টি করত প্রচ- আবেগ, আলোড়ন; জাগিয়ে তুলত আত্মোৎসর্গ করার উন্মাদনা। সেইসাথে তাঁর আদেশ, নির্দেশ, পরামর্শ মানার, তা বাস্তবায়িত করার যে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করত তা আমি ভুলতে পারব না কোনদিন। তার উত্তাপ আমি অনুভব করছি এখনও। সে দৃষ্টি অনন্য, অসাধারণ, অনুপম। এজন্য একালে তার দৃষ্টান্ত তিনি নিজেই। আধ্যাত্মিকতার পরিভাষায় একে ‘ফয়েজ’ বলে কিনা, ‘তাওয়াজ্জুহ’ বলে কিনা, তা ওই জগতের বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন; আমি জানি না। তবে এইটুকু জানি, পতঙ্গকে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে, প্রাণ উৎসর্গ করতে বাধ্য করে যে শক্তি, সে শক্তি ছিল কায়েদ ছাহেব হুজুরের দৃষ্টিতে।
যে কোন আন্দোলন ও তার নেতাকর্মীকে বুঝতে হলে তার ব্যাকগ্রাউন্ড বা পশ্চাৎভূমি জানা প্রয়োজন। কায়েদ ছাহেব হুজুরকে, তাঁর আন্দোলনকে বুঝতে হলেও প্রয়োজন ছারছীনাকেন্দ্রিক সর্বতোমুখী ইসলামী তাহরীককে বুঝা ও জানা। এ স্বল্প পরিসর নিবন্ধে তার বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। তবে সংক্ষেপে এটুকু বলা যায় ঃ বাংলার মুসলমানদের এক ঘোর দুর্দিনে ছারছীনার পীরে মরহুম হযরত মাওলানা নেছার উদ্দীন (রহ.)-এর আবির্ভাব। বাংলার মুসলমান, বিশেষ করে দক্ষিণ বাংলার মুসলমান ব্রিটিশ শাসনের যাঁতাকলে যখন নিপিষ্ট, তাদের ঈমান-আকীদা, তাহজীব-তমদ্দুন যখন বিলুপ্ত প্রায়, তখন এই মুর্শিদে কামিল তাঁর মুর্শিদ মুজাদ্দিদে যামান হযরত মাওলানা আবু বকর ছিদ্দীকী (রহ.)-এর দোয়া ও এজাযত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সমাজ সংস্কারের কাজে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে করেন হিদায়াত ও তাবলীগ। প্রতিষ্ঠা করেন শত সহস্র মাদ্রাসা ও তালীমী খানকাহ। এ আন্দোলন ছিল মূলত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (রহ.)-এর সর্বব্যাপী আন্দোলনেরই উত্তরাধিকার। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ছারছীনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সে আন্দোলন অর্থাৎ ইসলামী পুনর্জাগরণের সংগ্রাম। ১৯৪৬ সালে কলকাতা মোহাম্মদ আলী পার্কে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় উলামা সম্মেলনে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাস ভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতি জানানো হয় সমর্থন, সিলেটের রেফারেন্ডামকে পাকিস্তানের পক্ষে আনার জন্য চালানো হয় সক্রিয় তৎপরতা। পাকিস্তানে ইসলামী শরীয়াহ্ আইন জারী এবং কার্যকরীকরণের দাবীতে ছারছীনায় অনুষ্ঠিত হয় সর্বদলীয় উলামা ও মাশায়েখ সম্মেলন। ১৯৫১ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে ছারছীনার পীর ছাহেব হযরত মাওলানা শাহ্ আবুজাফর মোহাম্মদ ছালেহ (রহ.)-এর যোগদান এবং ওই সম্মেলনে পাকিস্তানের জন্য ইসলামী শাসনতন্ত্র রচনার পথপ্রদর্শক নীতি হিসেবে ২২ দফা আদর্শ প্রস্তাব পাস ইত্যাদির মধ্যে দেদীপ্যমান এ আন্দোলনের ব্যাপকতা ও কার্যকারিতা।
কায়েদ ছাহেব হুজুর ছারছীনা মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালেই বা‘আত গ্রহণ করেন পীরে কামিল হযরত মাওলানা নেছার উদ্দীন (রহ.)-এর হাতে। সে সময় থেকেই তিনি শরীক হন এ আন্দোলনে। পীরছাহেব কেবলা (রহ.)-এর বড় ছাহেবজাদা (তাঁর ইন্তেকালের পর গদ্দীনশীন পীর) হযরত মাওলানা শাহ আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহ (রহ.) এবং তিনি ছিলেন ছারছীনা মাদ্রাসার একই ক্লাসের ছাত্র। উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। ছারছীনায় অধ্যয়ন সমাপ্ত করে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে তিনি আবার ছারছীনায় প্রত্যাবর্তন করে শুরু করেন মাদ্রাসায় অধ্যাপনা। নবপ্রাণ সঞ্চার করেন জমিয়াতে হিযবুল্লাহ আন্দোলনে। পীরছাহেব কেবলা হযরত মাওলানা শাহ্ আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহ (রহ.) হন এই সংগঠনের আমীর এবং কায়েদ ছাহেব হুজুর নাজেমে আলা। ছারছীনাকেন্দ্রিক বিভিন্নমুখী দ্বীনী তৎপরতার মধ্যে আন্দোলনের দিকটার তিনিই দিতে থাকেন নেতৃত্ব। এ সময় মরহুম দাদা হুজুর ক্বিবলা হযরত মাওলানা নেছার উদ্দীন (রহ.) তাঁকে ‘কায়েদ’ অর্থাৎ নেতা খেতাবে ভূষিত করেন। এই খেতাবে তিনি এতটাই খ্যাত হয়ে ওঠেন যে ‘কায়েদ ছাহেব’ যেন তাঁর আসল নামে পরিণত হয়। অনেকে তাঁর মূল নাম জানে না কিন্তু ‘কায়েদ ছাহেব’ উপনামটি জানে। আমীরে হিযবুল্লাহ হযরত পীর ছাহেব কেবলা এবং নাযেমে হিযবুল্লাহ হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুরের চিন্তা, কর্ম একীভূত হয়ে যায়। তিনি পরিণত হন তাঁর অঘোষিত প্রধানমন্ত্রীতে, দক্ষিণ হস্তে। আমরা সাধারণ কর্মীরা কায়েদ ছাহেব হুজুরের কথাকে মনে করতাম পীর ছাহেব হুজুরেরই কথা, তাঁর সিদ্ধান্তকে মনে করতাম পীরছাহেব হুজুরেরই সিদ্ধান্ত। কায়েদ ছাহেব হুজুরের খেয়াল ছিল না আয়েশ-আরামের প্রতি, ধন-সম্পদের প্রতি, বিরাম-বিশ্রামের প্রতি। এমনকি নিজ পরিবার-পরিজনের প্রতি; নিজের স্বাস্থ্যের প্রতিও। উৎসর্গ করা যাকে বলে, আক্ষরিক অর্থেই নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন এই আন্দোলনে। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান, চিন্তা-চেতনা, যোগ্যতা, প্রতিভা, সময়- সবকিছুকে উজাড় করে দিয়েছিলেন দ্বীনি তাহরীকে। নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়াই ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হয় মন্ত্রের সাধন, নয় শরীর পতন- এর বাস্তব উদাহরণ কায়েদ ছাহেব হুজুর। আর এর সবকিছু ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তাঁর সবকিছুতে ছিল লিল্লাহিয়াত।
লিল্লাহিয়াত অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর জন্য। কায়েদ ছাহেব হুজুর সবসময় বলতেন, মুসলমান তাঁর জীবনের যাবতীয় কাজ করবে একমাত্র আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে। তাঁর লক্ষ্য হবে আখিরাত, দুনিয়া নয়। দুনিয়াকে ব্যবহার করবে এই লক্ষ্যে পৌঁছার সহায়ক বস্তু হিসেবে। তিনি ছিলেন, মাওলানা রূমী (রহ.)-এর মসনবীর অনুরাগী পাঠক। তিনি তাঁর বয়াত উদ্ধৃত করে বলতেন, পানির উপর দিয়েই নৌকা চালাতে হয়, কিন্তু পানি থাকতে হবে নৌকার তলদেশে। লক্ষ্য রাখতে হবে নৌকার ভেতরে যেন পানি প্রবেশ না করতে পারে। কারণ পানি নৌকার ভেতরে প্রবেশ করলেই নৌকা হবে ধ্বংস। তেমনি দুনিয়ার ওপর দিয়েই পাড়ি জমাবে তুমি আখিরাতের বন্দরের দিকে। দুনিয়া থাকবে তোমার পদতলে। তা না থেকে দুনিয়া তথা দুনিয়ার মোহ, আসক্তি যদি তোমাতে প্রবেশ করে তবে তোমার ধ্বংস অনিবার্য। একথা তিনি শুধু মুখেই বলতেন না, তাঁর প্রতিটি কাজ, সমস্ত তৎপরতা থেকে প্রকাশ পেত লিল্লাহিয়াত। তিনি ছিলেন লিল্লাহিয়াতের প্রতীক।
কায়েদ ছাহেব হুজুরকে আমি দেখেছি উস্তাদের আসনে বসে অধ্যাপনা করতে, দেখেছি প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠান চালাতে; সংগঠক হিসেবে সংগঠন গড়ে তুলতে, পরিচালনা করতে ও সময়োপযোগী কর্মসূচি দিতে; চিন্তাবিদ হিসেবে জটিল, কঠিন সমস্যার সঠিক সমাধান দিতে; বাগ্মী হিসেবে উদ্দীপনাময়ী, পথনির্দেশক অসাধারণ বক্তৃতা দিতে; লেখক হিসেবে গ্রন্থরাজি রচনা করতে; সম্পাদক হিসেবে নিপণ হাতে সম্পাদনার কাজ চালাতে; মুরিদ হিসেবে আদাবুশ শায়খের গভীর মনোযোগ দিতে; ধ্যানী হিসেবে মুরাকাবা-মুশাহাদা করতে; পীর হিসেবে তরীকতের সবক দিতে; চিকিৎসক হিসেবে ব্যবস্থাপত্র দিতে; ঝাড়-ফুঁক দিতে; পরামর্শ দাতা হিসেবে সঠিক পরামর্শ দিতে; সংগ্রামী মুজাহিদ হিসেবে অনৈসলামী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে, দুর্নীতি-দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে; মিছিলের পুরোভাগে থেকে মিছিল পরিচালনা করতে; দেখেছি উদার কণ্ঠে ইসলামী সংগীত গাইতে, নাট্য পরিচালনা করতে; দেখেছি চিন্তাবিদ, দার্শনিক হিসেবে বিষয়ের গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করে রহস্য উদ্ঘাটন করতে; দরদী মানুষ হিসেবে পরিচিতজনদের খোঁজ-খবর নিতে; দেখেছি দুস্থ, দুর্গত, অভাবগ্রস্ত লোকদের সমব্যথী হয়ে তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে সচেষ্ট হতে; রোগীদের সেবা করতে, অনাথ ইয়াতীমদের আশ্রয় দিতে, তাদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে এবং এসবের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠত তাঁর অপূর্ব নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, দ্বীনের দরদ ও মানব প্রেম। তিনি ছিলেন সাম্যের প্রতীক, মেহমান-নেওয়াজ অতিথি বৎসল, উদারদিল, ইনসানে কামিল, মর্দে মুমিন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সদা তৎপর ছিলেন তিনি। এজন্য হিন্দুরাও মনে করত আপনজন, তারা তাঁকে ভালোবাসত, অপরিসীম শ্রদ্ধা করত। তিনি ছিলেন- বিনয়ী, নিজ ছাত্রদের এমনকি কিশোর বালকদেরও তিনি আপনি বলে সম্বোধন করতেন। যে খাবার তাঁর সম্মুুখে হাজির করা হতো সবাইকে নিয়ে একাসনে বসে, সমভাবে বণ্টন করে তাই তিনি খেতেন, উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ, ধনী-গরীবের তারতম্য তিনি করতেন না, করা দেখতে পারতেন না। তাঁর অমায়িক ব্যবহার কেউ ভুলতে পারত না। তাঁর ছাত্ররা-যাদের অনেকে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন, অনেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন, অনেকে উচ্চপদে বিভিন্ন চাকরি করছেন, অনেকে অনেক সম্মানের আসনে আসীন হয়েছেন, অনেকে অবসর জীবনযাপন করছেন- কিন্তু ভুলতে পারেননি উস্তাদ কায়েদ ছাহেব হুজুরকে। যখনই তারা অবসর পেয়েছেন ছুটে গেছেন তাঁর সান্নিধ্যে।
কায়েদ ছাহেব হুজুরের যৌবন কেটেছে ছারছীনায়, প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও তিনি ছিলেন সেখানে। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন সেখানকার চাকরি থেকে। তাঁর প্রধান কর্মকেন্দ্র হয় নিজ জন্মভূমি ঝালকাঠী শহরের উপকণ্ঠে বাসন্ডা গ্রামে। এ গ্রামের নামকরণ করেন তিনি স্বীয় মুর্শিদের নামে নেছারাবাদ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার নাম করেন ছারছীনার মরহুম পীর ছাহেব হযরত মাওলানা নেছার উদ্দীন (রহ.)-এবং গদ্দীনশীন পীর ছাহেব হযরত মাওলানা শাহ আবুজাফর মোহামদ ছালেহ (রহ.)-এর নামে। নেছারাবাদ ছালেহীয়া মাদ্রাসা। কী অপূর্ব মুহব্বত!
সে যাই হোক, এক পর্যায়ে এসে তাঁর জীবনের যেন পট-পরিবর্তন ঘটে। গালেব হয় মজযুবিয়াত। সাধারণ পাঠকদের বোধগম্য হওয়ার জন্য এর কিছুটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন। তাসাউফের পরিভাষায় আধ্যাত্ম সাধনার উচ্চপর্যায়ের দুটি স্তরের একটির নাম ফানাফিল্লাহ, আরেকটি বাকাবিল্লাহ। ফানাফিল্লা’র স্তরে পৌঁছে সাধক আল্লাহর অস্তিত্বের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। তখন অবস্থা আর নিজের আয়ত্ত্বে থাকে না। এই আত্মলীন অবস্থায় মজযুবিয়াত প্রাধান্য লাভ করে। অনেক সময় সে যে কী করছে, কী বলছে তা নিজেও জানে না। এর পরবর্তী স্তর বাকাবিল্লা’র এখানে এসে সাধক স্থিত হয়। তার মধ্যে ফিরে আসে স্বাভাবিক অবস্থা। একে বলে সালেকিয়াত। কায়েদ ছাহেব হুজুর নেছারাবাদে স্থিত হওয়ার পর এ দু’অবস্থার মধ্যে অবস্থান করতেন। কখনো ফানাফিল্লায়, কখনো বাকাবিল্লায়, কখনো মজযুব, কখনো সালেক। এ সময় তাঁর থেকে প্রকাশ পেতে থাকে অতি প্রাকৃতিক ঘটনা, যাকে বলে কারামত। তাঁর ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং ভয় ও সমীহ মিলে এক স্বতন্ত্র ইমেজ। মানুষ আসতে থাকে দলে দলে তাঁর কাছে। বেড়ে যেতে থাকে ভক্ত-অনুরাগী-অনুসারীর সংখ্যা। আউলিয়ায়ে কেরামের জীবনে সাধারণত দুটি অবস্থা দেখা যায়। প্রথম ফাকাকাশি, তারপর ফতহুল গায়েব। অর্থাৎ তাদের শুরুর জিন্দেগী অভাব-অনাটনের এবং শেষের জীবন প্রাচুর্যের। কায়েদ ছাহেব হুজুরের জীবনেও তাই দেখা যায়। এ সময় তিনি হাত দেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে। মাদ্রাসা, মসজিদ, ছাত্রাবাস, ইয়াতীমখানা, মহিলা মাদ্রাসা, কারিগরি বিদ্যালয়সহ প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান কায়েম হয় নেছারাবাদে। ভক্তরা এগিয়ে আসে দানের হস্ত প্রসারিত করে। তবে সম্পদের প্রতি বিরাগ মনোভাব তাঁর আগের মতোই থাকে বহাল
বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তী ড. কাজী দীন মুহম্মদ
দেশের প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ ড. কাজী দীন মুহম্মদ শুক্রবার রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। নিরবেই চলে গেলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তী ড. কাজী দীন মুহম্মদ: মোসাহেবদের ভীড়ে ‘জাতির মননের প্রতীক’ বাংলা একাডেমী তাঁকে আজো কোনো পুরস্কার দিতে পারেনি!
বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্য যে, যে বাংলা একাডেমীর পরিচালক ছিলেন [তখন ডিজি ছিলেন না, পরিচালকই ছিলেন প্রধান], সেই বাংলা একাডেমী, সেই ‘জাতির মননের প্রতীক’ থেকে বাংলা সাহিত্যের এই সাধক পুরুষ কোনো পুরস্কার পাননি। জাতি হিসাবে আমাদের অবস্থান কোথায়-এতেই সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমার বেশ কয়েকবার সৌভাগ্য হয়েছিল এই বিরল গুণী ও আপদ-মস্তক জান্নাতি মানুষটির সান্যিধ্য লাভের। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ থেকে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। আমাদের আরো সৌভাগ্য হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯তম ব্যাচের পক্ষ থেকে এই বিরল গুণী মানুষটিকে গুণীজন সম্মাননা দেওয়ার।
নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার রূপসী গ্রামে ড. কাজী দীন মুহম্মদের জন্ম ১৯২৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক সংগঠকদের অন্যতম ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে বাংলা ভাষা গবেষণা ও উন্নয়নে, বাংলা ভাষায় প্রাথমিক-মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে তার ব্যাপক অবদান রয়েছে।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি হন। তাকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছিল। ডা. সিরাজুল হকের অধীনে চিকিত্সাধীন ড. দীন মুহাম্মদ দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. কাজী দীন মুহম্মদের ইন্তেকালে দেশের শিক্ষা এবং সাহিত্যাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ড. কাজী দীন মুহম্মদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় তিনি মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করে পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
২৯অক্টোবর সকালে ও দুপুরে ঢাকায় দু’দফা এবং বিকালে নারায়ণগঞ্জে তৃতীয় দফা জানাজা শেষে অধ্যাপক দীন মুহম্মদের লাশ নারায়ণগঞ্জে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি গত ১৬ সেপ্টেম্বর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে তাকে লাইফসাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছিল।
২৯অক্টোবর সকাল ১১টায় তার প্রথম জানাজা হয় ঢাকার কলাবাগান মাঠে। এতে তার অসংখ্য ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী অংশ নেন। জোহর নামাজ শেষে তার দ্বিতীয় জানাজা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ তার শুভাকাঙ্ক্ষী, স্বজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ আরও অনেকে অংশ নেন। ঢাকায় দু’দফা জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয় তার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসী গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে।
শোক : এক শোকবাণীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি আরেফিন সিদ্দিক বলেন, অধ্যাপক কাজী দীন মুহম্মদ বাংলাভাষা ও সাহিত্য অঙ্গনে একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষাজীবনের অধিকারী অধ্যাপক দীন মুহম্মদ ছিলেন একজন কৃতী শিক্ষক ও গবেষক, বিশিষ্ট ভাষাতত্ত্ববিদ ও দক্ষ প্রশাসক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যে অসাধারণ অবদান রেখে গেছেন জাতি তা চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহম্মদ ইসহাক, মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের এক শোকবার্তায় বলেন ড. কাজী দীন মুহম্মদের মৃত্যুতে জাতি একজন পণ্ডিত মুসলমানকে হারাল। এ মহান শিক্ষাবিদ জাতির জন্য যে অবদান রেখে গেছেন তা অবিস্মরণীয়।
বাংলাদেশে সংস্কৃতি কেন্দ্রের চেয়ারম্যান সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান, উপপরিচালক চিত্রনায়ক আবুল কাশেম মিঠুন, সহকারী পরিচালক হাসান মর্তুজাসহ সব স্তরের কর্মকর্তা ড. কাজী দীন মুহম্মদের ইন্তেকালে আন্তরিক শোক প্রকাশ করে বলেন, বাংলাভাষার একজন প্রকৃত সাধকের মৃত্যুতে বাংলাভাষা ও শিক্ষাঙ্গন এক অসাধারণ মনীষীকে হারাল।
এ ছাড়া সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের সভাপতি সাইফুল্লাহ মানছুর, সেক্রেটারি কবি আসাদ বিন হাফিজ তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
ড. কাজী দীন মুহম্মদের ইন্তেকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় লেখক ফোরামের সভাপতি রা.বি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ, সেক্রেটারি ড. মু. জাহিদুল ইসলামসহ সব কর্মকর্তা আন্তরিক শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তারা বলেন, তিনি ছিলেন বাংলাভাষা ও সাহিত্যের একজন ধ্রুবনক্ষত্র। তারা মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন।
প্রখ্যাত ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ড. কাজী দীন মুহাম্মদের ইনে-কালে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী আমির মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী সেক্রেটারি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এমপি। এক শোকবার্তায় নেতৃদ্বয় বলেন, মরহুম কাজী দীন মুহাম্মদ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ভাষা আন্দোলনে তিনি যেমন অবদান রেখেছেন ঠিক তেমনই অবদান রেখেছেন বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারে। জাতিকে সুশিক্ষায় গড়ে তুলতে তিনি নিরলসভাবে পরিশ্রম করে গেছেন। নেতৃদ্বয় ড. কাজী দীন মুহাম্মদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
এছাড়া সমন্বিত সাংস্কৃতিক সংসদ, সাইমুম, অনুপম, উচ্চারণ, সন্দিপন, জাগরণ, প্রবাহ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, দুর্নিবার (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), নিমন্ত্রণ (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়), পাঞ্জেরী (চট্টগ্রাম), প্রত্যয় (রাজশাহী), হেরাররশ্মী (বরিশাল), আল হেরা (ভোলা), টাইফুন (খুলনা), পারাবার (চট্টগ্রাম), সিন্দাবাদ ও প্লাবন (কুমিল্লা), লালমাই থিয়েটার (কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়)-সহ সারাদেশের বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন শোক জানিয়েছে।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভের পর ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান হন।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি এ বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০- এ তিন বছর তিনি বাংলা একাডেমীর পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে তিনি ভিসি ও প্রোভিসি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন শিক্ষা সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তিনি। তার লেখা উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে আছে ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’, ‘ভাষাতত্ত্ব’, ‘লোকসাহিত্যের ধাঁধা ও প্রবাদ’, ‘সমাজ সংস্কৃতি ও সাহিত্য’, ‘জীবন সৌন্দর্য’, ‘মানবজমিন’ ইত্যাদি।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ। আমাদের বাংলা সাহিত্যের এক বহুদর্শী প্রাজ্ঞপন্ডিত এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনুষঙ্গে এক অনিবার্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর হাতে উঠে এসেছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হীরকসমান অজস্র মণি-মাণিক্য। আমরা প্রথমতঃ তাঁর পরিচিতি ও সৃষ্টিপুঞ্জের দিকে দৃষ্টি দেব। একনজরে দেখে নেব ড. কাজী দীন মুহম্মদের বহুবর্ণিল চিত্রল চিত্রায়ন।
ড. কাজী দীন মুহম্মদের পিতা কাজী আলিমুদ্দিন আহমদ। মাতা-মোসাম্মৎ কাওসার বেগম; জন্ম-১ ফেব্রুয়ারি ১৯২৭; জন্মস্থান-নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার রূপসী গ্রাম। স্থায়ী ঠিকানা-গ্রাম ও ডাকঘর-রূপসী, থানা-রূপগঞ্জ, জেলা-নারায়ণগঞ্জ। পিতামহ-কাজী গোলাম হোসেন, পিতামহী-মোসাম্মৎ রহিমা খাতুন, মাতামহ-মাওলানা শরাফতুল্লাহ্ চিশতী, মাতামহী-মোসাম্মৎ সালেহা বেগম।
কর্মজীবন
ড. কাজী দীন মুহম্মদ ১৯৪৯ সালে এম. এ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। ১৯৫০ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় তাঁর লেখাপড়া শেষ করতে এক বছর দেরি হয়। লেখাপড়া শেষ করে সিএসপি হওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু একদিন মাস্টার্স পরীক্ষার পর ভিসি সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেনের সাথে দেখা করে নিজের ইচ্ছা ব্যক্ত করলে ভিসি তাঁকে তাঁর মনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে বলেন, ‘আপনাদের ইউনিভার্সিটি আপনারা রক্ষা না করলে কে করবে।’ এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষকদের সংখ্যা ছিল হাতে গোণা। তারপর মাত্র কিছুদিন হল দাঙ্গা শেষ হয়েছে। তখন তিনি আর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি, শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে চূড়ান্ত করেন। অবশ্য রেজাল্ট বের হওয়ার আগে তিনি দুই মাস রংপুর কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫১ সালে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ছিলেন। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এসোসিয়েট প্রফেসর [রিডার] হিসাবে শিক্ষকতা করার পর ১৯৭৬ সালে প্রফেসর হিসাবে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালে তিনি তাঁর পেশাগত জীবন থেকে অবসর নেন। এর মধ্যে তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত চার বছর বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। এই দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের মাঝে ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়ন কর্মকর্তা ছিলেন। এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমীর পরিচালকের [বর্তমান ডিজি] দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পর কিছুদিন তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি কিছুদিন সেখানে ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। শিক্ষানুরাগী এই ব্যক্তি আমৃত্যু শিক্ষাবিষয়ক কর্মকান্ডের সাথে নিজেকে সক্রিয়ভাবে জড়িত রেখেছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ‘ড. কাজী দীন মুহম্মদ আদর্শ শিক্ষাভবন’-এর রেক্টর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ‘কলেজ অব এডুকেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ [সেডস]‘-এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি ছিলেন।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ বাংলা একাডেমী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, ল্যাঙ্গুয়েজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, লাহোর, পাকিস্তানের জীবন সদস্য। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ আর্ট ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণা পরিষদের সদস্য হিসাবে অবদান রাখেন। তিনি বাংলা একাডেমীর নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ স্কুল টেক্সটবুক বোর্ডের পাঠ্যক্রম কমিটির সদস্য ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও তৎকালীন দেশের সকল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও কুমিল্লার সদস্য ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ইসলাম প্রচার সমিতি ও বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে গেছেন।
তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুই বছর জেল খেটেছেন। এতে তিনি মানসিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন তেমনি পারিবারিক জীবনেও বিপর্যয় নেমে আসে। যার রেশ এখনো তিনি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সেই সব স্মৃতি তাঁকে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। একাত্তরে তার সংগৃহীত অত্যন্ত মূল্যবান ও দামী বইপত্রসহ প্রায় ১৩ হাজার বই লুট হয়ে যায়, সেদিককার ক্ষতিও তিনি আজো পুশিয়ে উঠতে পারেননি। তার মধ্যে নিজের কিছু মূল্যবান পান্ডুলিপিও ছিল।
জীবনের বিভিন্ন সময় তিনি ওয়াজ মাহফিলের বক্তা ছিলেন। তিনি বেশ সুনামের সাথেও ওয়াজ করতেন। এটাকে তিনি কখনো পেশা হিসেবে না নিলেও জীবনে বহু ওয়াজ করেছেন।
তিনি সোনারগাঁও এর বিখ্যাত কাজী সিরাজুদ্দিন যিনি বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহকে আদালতে এক সাধারন বিধবার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তলব করেছিলেন সেই মহান বিচারকের সাক্ষাত বংশধর। প্রচার বিমুখ এই মানুষটি আমাদের ভাষাও সাহিত্যকে অনেককিছু দিয়ে গেছেন কিন্তু তার স্বিকৃতি পাননি। ১৯৭২ তিনি সাময়িকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকুরিচুত্য হন। আর তার সাথে সাথেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুর্ন অধ্যাপক পদে যোগদানের আমন্ত্রন পান যা তিনি গ্রহন করেননি। তিনিই বাংলা ভাষার ধ্বনি ও শব্দতত্ব সম্পর্কে প্রথম গবেষনা করেন এবং তার থিসিস এখনও এই বিষয়ে প্রামান্য হিসেবে গৃহিত।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কলাবাগানের ১২৯ নম্বর বাড়িতে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এই বাড়িকে কেন্দ্র করেই আজকের রাজধানী ঢাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কলাবাগান-এর নামকরণ করা হয়।
সাহিত্য জীবন
স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ড. কাজী দীন মুহম্মদ লেখালেখি শুরু করেন। ক্লাস সেভেনে থাকতেই স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ ছাপা হয়। পরপর তিনটি প্রবন্ধ তিনটি ইস্যুতে ছাপা হয়েছিল। পরে কলেজে উঠে সাপ্তাহিক ও মাসিক মোহাম্মদীতে লেখা শুরু করেন। স্কুলে থাকাবস্থায় ‘জঞ্জাল’ নামে একটি গল্প আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয়। গল্পের বিষয়বস্তু ছিল নায়ক অনেকের অসুবিধা, সমস্যা দূর করে পরে নিজে মারা যায়। সে সময় ড. কাজী দীন মুহম্মদ-এর বেশ কিছু কবিতাও পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর ভিতর লেখালেখির একটা প্রবণতা ছিল। পরবর্তীতে নানারকম আগ্রহ ও অগ্রজদের অনুপ্রেরণায় সাহিত্যের জগতে তিনি একনিষ্ঠ ভাবে কাজ শুরু করেন। প্রথমদিকে গল্প ও উপন্যাস দিয়ে লেখা শুরু করলেও পরে অনেক কবিতা লেখেন। তবু তিনি নিজেকে কবি বলে দাবি করতে চান না। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি তাঁর ১০টি মূল্যবান বইয়ের পান্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেন। তার ভিতর ভাষাতত্ত্বের বিষয়ও ছিল, গল্প-উপন্যাসও ছিল, প্রবন্ধ ছিল। সেই পান্ডুলিপির অনুরূপ নতুন প্রস্তুতিতে তিনি নিজেকে আর নিমগ্ন করতে পারেননি। জেলের দুই বছরের বিপর্যয়ের ফলে পরবর্তীতে তার পক্ষে মূল্যবান ক্রিয়েটিভ কিছু করা আর সম্ভব হয়নি। ভাষার ওপর তিনি বিশেষজ্ঞ এবং এর ওপরই তাঁর প্রধান কাজ ছিল। তিনি একজন খ্যাতিমান ভাষা বিজ্ঞানী হিসাবেই সমধিক পরিচিত।
ড. কাজী দীন মুহম্মদের প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো-
মানব মর্যাদা [১৯৬০; ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনস] ২. পাকিস্তান সংস্কৃতি [১৯৬১; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ৩. সাহিত্য শিল্প [১৯৬৪; আহমদ পাবলিশিং হাউস] ৪. সাহিত্য সম্ভার [১৯৬৫; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ৫. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস [১-৪ খন্ড] [১৯৬৮; স্টুডেন্টস ওয়েজ] ৬. লোকসাহিত্যে ধাঁধা ও প্রবাদ [১৯৬৮; বাংলা একাডেমী] ৭. সুফিবাদ ও আমাদের সমাজ [১৯৬৯; নওরোজ কিতাবিস্তান] ৮. সেকালের সাহিত্য [১৯৬৯; পুঁথিপুস্তক] ৯. সংস্কৃতি ও আদর্শ [১৯৬৯; পুঁথিপুস্তক] ১০. একালের সাহিত্য [১৯৭০ পুঁথিপুস্তক] ১১. ভাষাতত্ত্ব [১৯৭১; বইবিতান] ১২. জীবন সৌন্দর্য [১৯৭৩; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ১৩. বর্ণমালা [১৯৭৪; স্বকীয়তা] ১৪. প্রবাত [কাব্যগ্রন্থ, ১৯৭৫; স্বকীয়তা প্রকাশনী] ১৫. একুশের আগাছারা [কাব্যগ্রন্থ, ১৯৭৬] ১৬. সুফিবাদের গোড়ার কথা [১৯৮০; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ১৭. মানব জীবন [১৯৮১; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ১৮. প্রতিবর্ণায়ন নির্দেশিকা [১৯৮২; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ১৯. The verb structure in colloquial bengli [১৯৮৫; বাংলা একাডেমী] ২০. ঘুষ [গল্পগ্রন্থ, ১৯৮৫] ২১. সুখের লাগিয়া [১৯৮৯; পুঁথিপুস্তক] ২২. শিক্ষা [১৯৮৯; পুঁথিপুস্তক] ২৩. ইসলামী সংস্কৃতি [১৯৮৯ পুঁথিপুস্তক] ২৪. সমাজ সংস্কৃতি ও সাহিত্য ১৯৯০, পুঁথিপুস্তক] ২৫. বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাব [১৯৯০, স্বকীয়তা প্রকাশনী] ২৬. বিচিত্র প্রবন্ধ [১৯৯১; মারকাযুল কুরআন] ২৯. নাস্তিকতা ও আস্কিতা [১৯৯৩; মারকাযুল কুরআন] ৩০. আমি তো দিয়েছি তোমাকে কাওসার [১৯৯৩; মারকাযুল কুরআন] ৩১. মহানবীর বাণী শতক [১৯৯৮; মারকাযুল কুরআন] ৩২. বিধান তো আল্লাহরই [১৯৯৯; মারকাযুল কুরআন] ৩৩. অবিশ্বাস্য [১৯৯৯, স্বকীয়তা] ৩৪. বাণী চিরন্তন [১৯৯৯; পুঁথিপুস্তক] ৩৫. ছোটদের হযরত মোহাম্মদ [সাঃ] [১৯৯৯; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ৩৬. Thus spoke prophet Muhammad [sm] [২০০০; স্বকীয়তা প্রকাশনী] ৩৭. হাসাহাসি [২০০০; পুথিপুস্তক] ৩৮. বিসমিল্লাহর তাৎপর্য।
তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত কুরআন শরীফ, বোখারি, তিরমিযি, মোয়াত্তা, আবু দাউদ হাদিসগ্রন্থের অনুবাদ ও সম্পাদনার সাথে জড়িত।
আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলনে অংশগ্রহণ :
1. Third International Congress for classic studies, London, 1958.
2. Asian writers conference, New delhi, 1950.
3. Pakistan lingustic Association, Lahore, 1964, 65 & 68.
4. International Islamic conference, Colombo, 1978.
5. International seminer, Iran, 1984.
দেশ ভ্রমণ
ড. কাজী দীন মুহম্মদ একজন স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদের পাশাপাশি একজন ভ্রমণ পিপাসু ব্যক্তিও। নিজের দেশ বাংলাদেশের প্রায় অঞ্চলই তার দেখা। ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের জন্য বিলেত যাওয়া বাদেও তিনি নানা আন্তর্জাতিক সেমিনারে অনেক দেশে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। সরকারি কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হওয়ার কারণে পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছেন। তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও বিশাল। বিশ্বের প্রায় গুরুত্বপূর্ণ দেশেই তিনি গিয়েছেন।
যেসব দেশে তিনি ভ্রমণ করেছেন :
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, সাইপ্রাস, গ্রীস, সিরিয়া, বৃটেন, জার্মানি, ইতালী, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরী, আলজেরিয়া, মরক্কো, সুদান, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, মেক্সিকো, কিউবা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা, আমেরিকা, মিসর।
পুরস্কার ও সম্মাননা
১. বাংলাদেশ দায়েমী কমপ্লেক্স পুরস্কার [১৯৮৯]।
২. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার [১৯৯০]।
৩. Distinguished leadership award, American biographical institute published in 7th edition of biographical encyclopedia.
৪. Pandit iswar chandra vidyasagr gold plaque [2002] the Asiatic society, Calcutta, India.
৫. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রকল্প স্বর্ণপদক [২০০৩]।
৬. কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার [২০০৪]।
৭. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯তম ব্যাচের পক্ষ থেকে গুণীজন সম্মাননা।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ মূলত ভাষাতাত্ত্বিক রূপে আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী। তবে ভাষাতত্ত্ব ব্যতীত বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য বিষয়েও তার আলোচনা-গবেষণার নজির রয়েছে। কেবল ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যের নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপক এবং ইসলামী চিন্তাবিদ হিসাবেও তিনি সকলের নিকট সম্মানিত ও সুপরিচিত। একজন মৌলিক গবেষক, ভাষাতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ ড. কাজী দীন মুহম্মদ লিখেছেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসও। সেজন্য এই বহুমাত্রিক ও বহুকৌণিক সাহিত্য প্রতিভার সমগ্র পরিচয়-একটা সাধারণ নিবন্ধে দেয়া সম্ভব নয়।
ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতকে সমর্থন করে এই যুগে গৌড়ীয় অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব বলে জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন- ‘আধুনিক ভারতীয় আর্য ভাষাগুলোর প্রাচীনতম রূপ ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত। বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপ পরিবর্তন করে মধ্য বাংলায় [Meddle Bengali] পরিণত হয়। এ মধ্য বাংলা থেকে আধুনিক বাংলার [Modern Bengali] উৎপত্তি হয়েছে। প্রাচীন বাংলা ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। সন্ধি যুগ ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। মধ্য যুগ ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। নব্য যুগকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পুরাতনকাল এবং ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ হতে এখন পর্যন্ত বর্তমানকাল।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ সাত হাজার বছর পাড়ি দিয়ে বাংলা ভাষার রূপ রূপায়ণের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আজ পর্যন্ত কোন বিরোধের মুখোমুখি হয়নি।
সৈয়দ আলী আহসানের দৃষ্টিতে, ‘ড. কাজী দীন মুহম্মদ খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। নিম্ন শ্রেণী থেকে আরম্ভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শ্রেণীতে কুশলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রাবস্থা থেকে তাকে দেখে আসছি। সকল ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে তিনি অপরাজেয় ছিলেন কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার স্বধর্মে নিষ্ঠা। শরীয়তের নিয়মাবলী পালন করার সঙ্গে সঙ্গে সূফী তত্ত্বে তিনি দীক্ষা নিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তার ধর্ম চর্চার কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। মেধাবী ছাত্র অনেক দেখা যায়; কিন্তু মেধার সঙ্গে আত্মজিজ্ঞাসা অনেকের থাকে না। দীন মুহম্মদের আত্মজিজ্ঞাসা প্রবল ছিল। দীন মুহম্মদ আধুনিক নন, আবার প্রাচীনও নন। স্বাভাবিক শৃক্মখলায় তিনি মানুষ হয়েছেন। শিক্ষক হিসাবে দীন মুহম্মদ কি রকম তা আমি জানি না। কিন্তু তার ছাত্রদের মুখে আমি তার প্রশংসা শুনেছি। শুনেছি যে জটিল ভাষাতত্ত্বের ব্যাখ্যা তিনি অবলীলাক্রমে করতে পারেন। এক সময় তিনি টেলিভিশনে কুরআন শরীফ পাঠ করেছেন এবং ব্যাখ্যাসহ তা পরিবেশন করেছেন। আমার এ অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম তাঁর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায়। চকবাজারে এক হেকিম সাহেব ছিলেন। তিনি আমাদের পরিবারের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার সঙ্গে দীন মুহম্মদের খুব ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। দীন মুহম্মদ তার মাহফিলে প্রায়ই উপস্থিত থাকতেন এবং মনোযোগ দিয়ে তাসাউফের জটিল তত্ত্বের ব্যাখ্যা শুনতেন। আমি হুগলিতে তাকে দেখেছি যখন তিনি ছাত্র। তিনি ছিলেন মেধাবী, নিয়মতান্ত্রিক এবং সরল। বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। মধ্যবিত্তদের সুবিধা-অসুবিধা সবকিছু অতিক্রম করে তিনি মেধা ও মননে সকলের অগ্রগামী হয়েছিলেন। মেধাবী ছাত্র অনেক দেখা যায়, জীবনে তারা অনেককিছু সঞ্চয় করে। দীন মুহম্মদ সেরকম মেধাবী ছাত্র ছিলেন না। মেধার সঙ্গে ধর্মবোধের সাযুজ্য রক্ষা করে দীন মুহম্মদ জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তিনি সংসার জীবনে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার জন্য তার অভিমান ছিল না। আমি যখন বাংলা একাডেমীতে তখন একাডেমী বৃত্তি নিয়ে কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রী গবেষণা করতো। সে গবেষণা প্রকল্পে দীন মুহম্মদ সাহায্য করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি ছাত্রছাত্রীদের যথেষ্ট পরিশ্রম করিয়ে নিতেন। তার ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা প্রকল্পে আমি পরীক্ষক ছিলাম। যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় তিনি ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা পরিচালনা করেছেন তা খুবই প্রশংসনীয়। বাংলা একাডেমীর অনেক কাজে তিনি অংশ নিয়েছেন এবং দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেছেন।’
কথাশিল্পী শাহেদ আলীর দৃষ্টিতে- ‘ড. কাজী দীন মুহম্মদ আমাদের দেশের প্রবীণতম শিক্ষাবিদগণের অন্যতম। তিনি দীর্ঘকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের পদস্থ কর্মকর্তা, ছিলেন বাংলা একাডেমীর একজন সফল পরিচালক। তিনি ছাত্র হিসাবে প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পাঠ্য পুস্তক নির্বাচন এবং শিক্ষার সকল স্তরের পরীক্ষার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। তিনি কাজ করেন নীরবে। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছিলেন ভাষাতত্ত্বের ওপর। তিনি যে ডিগ্রিটি অর্জন করেছিলেন, শোনা যায়, এই উপমহাদেশের আর কেউ অনুরূপ ডিগ্রি আজও লাভ করেননি। কিন্তু এজন্য তার কোন অহমিকা নেই। তার চালচলনে, কথাবার্তায় কেউ বুঝতে পারবে না যে তিনি এদেশের একজন সেরা পন্ডিত।
সেই ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার মোহ থেকে মুক্ত ছিলেন। যেন-তেন প্রকারে জনপ্রিয়তা অর্জন কখনো তার লক্ষ্য ছিল না। তিনি নিজেকে কখনো স্রোতে ভাসিয়ে দেননি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তার অধ্যয়নের বিষয় হলেও তিনি তার চিন্তাকে প্রসারিত করেছেন। তিনি আজীবন পড়াশোনায় মগ্ন থেকে শিল্প-সাহিত্য ও সমাজের সকল অঙ্গনে বিচরণ করেছেন। তার অধ্যয়নের বিরাম ছিলনা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখেছেন। তার প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা ছোট-বড় মিলিয়ে কুড়িটির মতো। এর মধ্যে বিশাল পরিসরে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস। (প্রথম থেকে চতুর্থ খন্ড) আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসকে প্রকৃতই সমৃদ্ধ করেছে। ভাষাতত্ত্ব; সাহিত্য শিল্প; বর্ণমালা, একালের সাহিত্য, সেকালের সাহিত্য- এসব তার দীর্ঘ জীবনের সাহিত্য চিন্তার স্বাক্ষর বহন করে। মানব জীবন, জীবন সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও আদর্শ, মানব মর্যাদায, প্রভৃতি পুস্তকে জীবন রসিক কাজী দীন মুহম্মদ তার চিন্তার বিচিত্রগামিতার পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি ইসলামে গভীরভাবে বিশ্বাসী বলে তার সমস্ত রচনার মধ্যে একটি বলিষ্ঠ প্রত্যয় এবং প্রবল আশাবাদ ধ্বনিত হয়। তার সমস্ত কাজ কর্মেরই লক্ষ্য সমাজমুখী, সমাজের উন্নতি ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ। তিনি বিশ্বাস করেন ইসলামের মর্মবাণীতে। অনুরঞ্জিত ও অনুপ্রাণিত ব্যক্তি ও সমাজই মানব জীবনের সার্থকতা অর্জন করতে পারে। এই বিশ্বাসের বশে তিনি তার বিভিন্ন গ্রন্থে মানুষকে আলোকিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।’
ড. আনিসুজ্জামানের শিক্ষক ছিলেন ড. কাজী দীন মুহম্মদ। তিনি তার স্মৃতিতে এভাবে মূল্যায়ন করেন, ‘ড. কাজী দীন মুহম্মদ স্যারকে আমি তিন দশকের ও অধিককাল ধরে জানি। ঘনিষ্ঠ তা দু’দশকের বেশি সময়ের। এ সময় আমরা কলাভবনের দোতলায় পাশাপাশি রুমে বসতাম। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাসকালে তো বটেই, এমনকি ষাট বছর বয়স হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাড়া ছেড়ে কলাবাগানে তার নিজের বাড়িতে চলে যাওয়ার পরও স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত আসতেন এবং তার রুমে বসে কাজ করতেন। অনেক অধ্যাপকের মতো প্রায়ই অনুপস্থিত থাকতেন না। তাকে কেবল তার নিজ কক্ষ ও ক্লাসরুমেই নিয়মিত পাওয়া যেত না, প্রয়োজনে পরীক্ষার হলে তত্ত্বাবধায়কের কাজ করতেও তিনি ইতস্তত করতেন না, অথচ একটু সিনিয়র হলে আমাদের মাঝে অনেকেই পরীক্ষার হলে যেতে উৎসাহবোধ করতেন না। অথচ পরীক্ষার হলে তিনি অলসভাবে সময় কাটাতেন না। … স্যার অত্যন্ত কৃতি ছাত্র ছিলেন এবং আমাদের এ অঞ্চলে তিনিই ভাষাতত্ত্বের ওপর প্রথম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট ডিগ্রিপ্রাপ্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যানসহ দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করা ছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমির সর্বোচ্চ পদটিতে দীর্ঘদিন সমাসীন ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত সাদাসিধে ও সুফি প্রকৃতির মানুষ তিনি। তাকে দেখে কেউ বুঝতে পারবেন না যে তিনি বাংলার অধ্যাপক, অনেকগুলো বিদেশী ভাষা জানেন; সর্বোপরি, পাশ্চাত্যের অন্যতম অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লন্ডনে দীর্ঘদিন অধ্যয়ন ও গবেষণাসূত্রে বসবাস করেছেন এবং ভাষাতত্ত্বের মতো জটিল, বহুমাত্রিক ও আধুনিক বিষয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুনামের সাথে পি-এইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ভাষাতত্ত্বে বিশেষজ্ঞ হলেও তার পড়াশুনা ও গবেষণাডর গভীরতা ও ব্যপ্তি অনেক।
কর্মময় দীর্ঘজীবনে তিনি প্রচুর লিখেছেন:
বাংলাদেশের দু’জন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব-আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এবং ড. কাজী দীন মুহম্মদের ব্যাপারে কিছুটা ব্যক্তিগত কষ্টবোধ রয়ে গেছে। দু’জনই মেধাবী, পন্ডিত এবং স্ব স্ব বিষয়ে সমধিক প্রাজ্ঞ। কিন্তু আমার কষ্টবোধটা ঐখানে যে, তারা তাদের চারণক্ষেত্র ছাড়িয়ে বহুবিধ কমধারায় গোটা জীবনই ব্যস্ত থেকেছেন। বিষয়ী-সীমার মধ্যে থাকলে তাদের কাছ থেকে বাংলা সাহিত্য আর অনেক বেশি লাভবান হতে পারতো। এটাও হতে পারে যে, তারা সাহিত্যের পাশাপাশি আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু তাতে করে তারা তাদের মৌল কর্মক্ষেত্র থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন। আই অপূরণীয় ক্ষতিই আমাদের আজও ব্যথিত করে।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্য যে, যে বাংলা একাডেমীর পরিচালক ছিলেন [তখন ডিজি ছিলেন না, পরিচালকই ছিলেন প্রধান], সেই বাংলা একাডেমী, সেই ‘জাতির মননের প্রতীক’ থেকে বাংলা সাহিত্যের এই সাধক পুরুষ কোনো পুরস্কার পাননি। জাতি হিসাবে আমাদের অবস্থান কোথায়-এতেই সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই প্রবীণতম প্রাজ্ঞ পুরুষ ড. কাজী দীন মুহম্মদ বাংলা একাডেমী নয়, পুরস্কৃত ও সম্মাননার ভূষিত করছে চট্টগ্রাম সংস্কৃতির কেন্দ্র। এটা আমাদের জন্য অবশ্যই শ্লাঘার বিষয়। চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র তাকে পুরস্কৃত করে আমাদের এই হীনমন্য জাতির ঋণবার অনেকটাই হালকা করে দিল। এজন্য চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্রের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ মুবারকবাদ। আশা করি চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির এমনি মহৎ কর্মধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। সেটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশ্যা।
স্যার, প্লিজ ক্ষমা করুন এই অকৃতজ্ঞ জাতিকে- ধিক্কার জানাই এসব মিডিয়াকে: মহৎ কিংবদন্তীর মৃত্যুর খবরটিও যথাযথভাবে ঠাঁই পেলনা অধিকাংশ সুশীল মিডিয়ায়! ধিক্কার জানাই এসব মিডিয়াকে: অর্ধনগ্ন নায়িকা-গায়িকা-নর্তকী-নটিনীদের ঢাউস রঙিন ছবি ছাপানোর জায়গার অভাব হয় না। কিন্তু মহৎ কিংবদন্তী বাংলা সাহিত্যের এই সাধক পুরুষের মৃত্যুর খবরটিও ঠাঁই পেলনা? যে দেশে গুণীর সম্মান দেয়া হয় না, সে দেশে কখনো গুণী জন্মায় না।
আপসোস্ ঠিক এ জায়গাটিতেই। আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে নেতিবাচক বিষয়গুলোকে বড় করে না দেখিয়ে এই সব গুণী মানুষকে তুলে ধরা হলে আমরা ইভটিজার না পেয়ে এরকম বিরল গুণী ও আপদ-মস্তক জান্নাতি ড. কাজী দীন মুহম্মদদের পেতাম। আজকে কাদের দেখে তরুণ সমাজ বড় হবে? দেশে একজন শেরে বাংলা, শরীয়ত উল্লাহ, তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, ভাসানী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, বঙ্গবন্ধু কিংবা জিয়াউর রহমান কি আছেন?
একে একে সব গুণী মানুষই চলে যাচ্ছেন। সত্যিই আরেকজন জীবিত কাজী দীন মুহম্মদ নেই। কিভাবে যে এই শুন্যতা পূরণ হবে? তোষামোদকারী গুণীদের ভীরে সত্যিকার গুণী ও নিবেদিতপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের আজ বড়ই অভাব।
মহান প্রতিপালকের নিকট স্যারের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত ও জান্নাত প্রাপ্তির জন্য আমরা সবাই দোয়া করছি।
তথ্যসূত্র:
– ড. কাজী দীন মুহম্মদ প্রাজ্ঞ-পুরুষ, প্রখর প্রতিভা -মোশাররফ হোসেন খান
– মরহুম সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী
– দৈনিক নয়া দিগন্ত
– বার্তা২৪
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)


