রোজা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রোজা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০

রোজার কাজা-কাফফারা ও ফিদইয়া সংক্রান্ত মাসয়ালা

কোনো সুস্থ বালেগ মুসলমান ইচ্ছাকৃত রমজানের রোজা না রাখলে বা অনিচ্ছায় ভেঙে ফেললে অথবা কোনো ওজরের কারণে ভেঙে ফেললে পরে ওই রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
মাসয়ালা: কাফফারা আদায়ের ক্ষেত্রে লাগাতার ষাট দিন রোজা রাখার সময় যদি এক দিনও বাদ যায়, তাহলে আবার শুরু থেকে গণনা আরম্ভ হবে, পূর্বেরগুলো বাদ হয়ে যাবে। -মাবসুতে সারাখসি: ৩/৮২
মাসয়ালা: মুসাফির ও অসুস্থ ব্যক্তি রোজা রাখতে কষ্ট হলে ওই দিন না রেখে পরে কাজা করে নিতে পারবে, এ ক্ষেত্রে কাফফারা দিতে হবে না। -সূরা বাকারা: ১৮৪-১৮৫
মাসয়ালা: মাসিক পিরিয়ড ও সন্তান প্রসবোত্তর স্রাবের সময় রোজা রাখা জায়েয নেই। তবে সে দিনগুলোর রোজার কাজা দিতে হবে, কাফফারা দিতে হবে না।
মাসয়ালা: রোজা রাখার পর দিনের বেলায় যদি কোনো নারীর পিরিয়ড শুরু হয়, তখন ওই নারীর জন্য খাওয়া-দাওয়ার অনুমতি আছে। তবে লোকজনের সামনে না খেয়ে নির্জনে খাওয়া-দাওয়া করবে। আর যে মহিলা পিরিয়ডের কারণে রোজা রাখেনি, দিনের যে সময়ে তার রক্ত বন্ধ হবে, তখন থেকেই খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে রোজাদারের ন্যায় দিনের অবশিষ্ট অংশটুকু অতিবাহিত করবে এবং পরবর্তীতে উভয়েই ওই দিনের রোজা কাজা করে নিবে। -আল লুবাব: ১/১৭৩
মাসয়ালা: রোজার জন্য নারীদের ঔষধ খেয়ে পিরিয়ড সাময়িক বন্ধ রাখা অনুচিত। এতে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এ পদ্ধতিতে পিরিয়ড বন্ধ থাকা অবস্থায় রোজা-নামাজ করলে তা আদায় হয়ে যাবে। -ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া: ৬/৪০৪, আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল: ৩/২৭৮)
রোজার ফিদইয়া
মাসয়ালা: যদি কোনো ব্যক্তি অসুস্থতার কারণে অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তারের পরামর্শে রোজা রাখা খেকে বিরত থাকেন এবং পরবর্তীতে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে সুস্থ হওয়ার পর রোজার কাজা আদায় করতে হবে, ফিদইয়া দিলে আদায় হবে না। পক্ষান্তরে যদি আরোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে বা এমন বৃদ্ধ যে রোজা রাখতে অক্ষম তাহলে সে ফিদইয়া আদায় করবে। রোজা রাখতে অক্ষম বলতে শরিয়তের দৃষ্টিতে বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা, মারাত্মক রোগ ইত্যাদি বোঝায়, যা থেকে আরোগ্য লাভ করা এবং রোজা রাখার শক্তি ফিরে পাওয়া অসম্ভব বলে মনে হয়। -সূরা বাকারা: ১৮৪-১৮৫
মাসয়ালা: প্রত্যেক রোজার ফিদইয়া হলো, সদকা ফিতরের সমপরিমাণ, অর্থাৎ ১ কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি গম বা তার সমপরিমাণ অর্থ। -আওযানে শরইয়্যাহ, পৃ. ১৮
মাসয়ালা: শারীরিক সুস্থতা ফিরে আসলে এবং রোজার কাজার ওপর সক্ষম হলে অতীতের রোজা কাজা করতে হবে। -রদ্দুল মুহতার: ২/৪২৭
মাসয়ালা: ফিদইয়া আদায়ের ক্ষেত্রে ধনী-গরীবের মাঝে কোনো তারতম্য নেই, সবার ওপর সমানহার প্রযোজ্য। তবে দারিদ্রতার দরুন ফিদইয়া দিতে একেবারেই অক্ষম হলে তওবা করবে। পরবর্তীতে কখনও সামর্থ্যবান হলে অবশ্যই ফিদইয়া আদায় করে দিবে। -ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/২০৭
মাসয়ালা: ৬০ মিসকিনকে দু’বেলা খানা খাওয়ানোর পরিবর্তে প্রত্যেককে এক ফিতরা পরিমাণ অর্থাৎ ১ কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি গম বা তার সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া যেতে পারে। তবে শর্ত হলো, ওই টাকা দ্বারা মিসকিনকে খানা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একজন গরিবকে প্রতিদিন ১ ফিতরা পরিমাণ করে ৬০ দিনে দিলেও আদায় হবে। ৬০ দিনের ফিতরা পরিমাণ একত্রে বা এক দিনে দিলে আদায় হবে না। -ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৫১৩, রদ্দুল মুহতার: ৩/৪৭৮
ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙের কাফফারা
মাসয়ালা: কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে একাধিকবার একই রমজানের রোজা ভাঙার কারণে এক কাফফারাই যথেষ্ট। অর্থাৎ ভেঙে ফেলা সব রোজার জন্য ৬০ জন মিসকিনকে দু’বেলা খানা খাওয়াবে, অথবা প্রতি মিসকিনকে এক ফিতরা পরিমাণ সম্পদ সদকার মাধ্যমেও কাফফারা আদায় করা যাবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ২/১০১, রদ্দুল মুহতার: ২/৪১৩
মাসয়ালা: মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার কাজাকৃত রোজার কাফফারা হিসেবে অন্য কারো রোজা রাখার বিধান নেই। তবে মৃত্যুকালে সে ব্যক্তি ফিদইয়া প্রদানের অসিয়ত করলে (যা পূর্ণ করা ওয়াজিব) তার রেখে যাওয়া সম্পদের এক তৃতীয়াংশ মাল থেকে অসিয়ত পূর্ণ করা জরুরি। অসিয়ত না করলে ফিদইয়া দেয়া জরুরি নয়। তবে বালেগ ওয়ারিসরা নিজ নিজ অংশ হতে তা আদায় করলে আদায় হওয়ার আশা করা যায়। -আল জাওহারাতুন নায়্যিরাহ: ১/১৪৩, আদ্দুররুল মুখতার: ২/৪২৪


রোজার কাজা ও কাফফারার বিধান

প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান ইচ্ছাকৃত রমজানের রোজা না রাখা মারাত্মক অপরাধ ও গুনাহের কাজ। কেননা রমজানের একটি রোজা ছুটে যাওয়া অনেক বড় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়ার নামান্তর। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি শরিয়তসম্মত কারণ বা অসুস্থতা ছাড়া রমজানের একটি রোজা ভাঙে, তার ওই রোজার বিপরীতে সারা জীবনের রোজাও রমজানের একটি রোজার সমমর্যাদা ও স্থলাভিষিক্ত হবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৭২৩)
তবে অসুস্থতা বা অন্য ওজর থাকলে ভিন্ন কথা, সে ক্ষেত্রে অন্যদিন পালনের সুযোগ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে (রমজানে) উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। আর যে ব্যক্তি অসুস্থ বা মুসাফির হয়, সে অন্য দিনে সংখ্যা পূরণ করে নেবে, আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজটাই চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
রোজার কাজার বিধান : কোনো সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান ইচ্ছাকৃত রমজানের রোজা না রাখলে বা অনিচ্ছায় ভেঙে ফেললে অথবা কোনো ওজরের কারণে ভেঙে ফেললে পরে ওই রোজার কাজা আদায় করতে হবে। মুসাফির ও অসুস্থ ব্যক্তি রোজা রাখতে কষ্ট হলে, অনুরূপ গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী নারী যদি নিজের বা বাচ্চার ক্ষতির আশঙ্কা করে, তাহলে রমজানে রোজা না রেখে পরে তা কাজা করে নিতে পারবে, এ ক্ষেত্রে কাফফারা দিতে হবে না। (দেখুন : সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫, সুনানে তিরমিজি হাদিস : ৭১৫)
মাসিক ঋতুস্রাব ও সন্তান প্রসবের স্রাবের সময় রোজা রাখা জায়েজ নেই। তবে ওই দিনগুলোর রোজার কাজা দিতে হবে, কাফফারা দিতে হবে না।
রোজা রাখার পর দিনের বেলায় যদি কোনো নারীর মাসিক শুরু হয়, ওই নারীর জন্য খাওয়াদাওয়ার অনুমতি আছে। তবে লোকজনের সামনে না খেয়ে নির্জনে খাওয়াদাওয়া করবে। আর যে নারী মাসিকের কারণে রোজা রাখেনি, দিনের যে সময়ে তার রক্ত বন্ধ হবে, তখন থেকেই খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে রোজাদারের মতো দিনের অবশিষ্ট অংশ অতিবাহিত করবে এবং পরে ওই দিনের রোজা কাজা করে নেবে। (আললুবাব : ১/১৭৩)
নারীদের জন্য কৃত্রিম উপায়ে সাময়িক ঋতুস্রাব বন্ধ রাখা অনুচিত। এতে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তা সত্ত্বেও এ পদ্ধতিতে ঋতুস্রাব বন্ধ থাকা অবস্থায় রোজা-নামাজ করলে তা আদায় হয়ে যাবে। (ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া : ৬/৪০৪, আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল : ৩/২৭৮)
যেসব কারণে কাফফারা দিতে হয় : শরিয়তসম্মত কোনো কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃত পানাহার বা সহবাসের মাধ্যমে রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে তার কাজা ও কাফফারা অর্থাৎ লাগাতার ৬০ দিন রোজা রাখতে হবে। পানাহার ও সহবাস ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে ইচ্ছাকৃত ভাঙলেও কাফফারা দিতে হবে না, তবে কাজা করতে হবে। (মাবসুতে সারাখসি : ৩/৭২)
কাফফারা আদায়ের ক্ষেত্রে লাগাতার ৬০ দিন রোজা রাখার সময় যদি এক দিনও বাদ যায়, তাহলে আবার শুরু থেকে গণনা আরম্ভ হবে, আগেরগুলো বাদ হয়ে যাবে। (মাবসুতে সারাখসি : ৩/৮২)
কোনো ব্যক্তির ইচ্ছাকৃতভাবে একাধিকবার একই রমজানের রোজা ভাঙার কারণে এক কাফফারাই যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ ভেঙে ফেলা সব রোজার জন্য ৬০ জন মিসকিনকে দুবেলা খানা খাওয়াবে, অথবা প্রতি মিসকিনকে এক ফিতরা পরিমাণ সম্পদ সদকার মাধ্যমেও কাফফারা আদায় করা যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/১০১, রদ্দুল মুহতার : ২/৪১৩)
৬০ মিসকিনকে দুবেলা খানা খাওয়ানোর পরিবর্তে প্রত্যেককে এক ফিতরা পরিমাণ অর্থাৎ এক কেজি (৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি) গম বা তার সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া যেতে পারে। তবে শর্ত হলো, ওই টাকা দ্বারা মিসকিনকে খানা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একজন গরিবকে প্রতিদিন এক ফিতরা পরিমাণ করে ৬০ দিন দিলেও আদায় হবে। ৬০ দিনের ফিতরা পরিমাণ একত্রে বা এক দিনে দিলে আদায় হবে না। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/৫১৩, রদ্দুল মুহতার ৩/৪৭৮)

ফিতরা : ফাজায়েল ও মাসায়েল

ফিতরা কার ওপর ওয়াজিব?
প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী, যার মালিকানায় মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্য সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে— তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হয়। প্রত্যেকে তার নিজের পক্ষ হতে এবং তার নাবালেগ সন্তানের পক্ষ হতে ফিতরা আদায় করবে। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলংকার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি, বসবাসের অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য, অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র— এসবকিছুর মূল্য ফিতরার নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
উল্লেখ্য, যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হয় এবং ওই সম্পদ পুরো এক বছর তার মালিকানায় থাকতে হয়। কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে ওই পরিমাণ সম্পদ একবছর অতিবাহিত হওয়া আবশ্যক নয়, বরং রমজানের শেষের দিন ওই পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই ফিতরা ওয়াজিব হয়ে পড়ে।
.
রোযার পূর্ণতা অর্জনে ফিতরা
রোযা শেষে প্রত্যেক সচ্ছল ব্যক্তি নিজের এবং পরিবারের সবার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হয়। এরূপ আর্থিক অনুদানে দেশের অসহায় গরীব-মিসকিনদের জীবনে কিছুটা হলেও স্বাচ্ছন্দ্য আসে, তাদের জীবনেও বয়ে আনে ঈদের খানিকটা আনন্দ। অন্যথায় বিদ্রোহী কবির জিজ্ঞাসা :
‘জীবনে যাদের হররোজ রোযা ক্ষুধায় আসে না নিদ্,
নিদ্হারা সেই গরীবের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’
রমজানের রোযা পালন করতে গিয়ে ছোটখাট অনেক ত্রুটি-বিচ্যূতি হয়ে যাওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। দীর্ঘ এক মাস রোযা পালনে কোনো ঘাটতি থাকলে ফিত্রার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তা পূর্ণ করে দেন।
আবু দাউদ শরিফের হাদিসে এসেছে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত :
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ.
অর্থ : রাসূল সা. সাদকায়ে ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোযাকে অনর্থক কথা ও অশ্লীল কার্যকলাপ হতে পবিত্র করা এবং গরিবদের মুখে অন্ন দেওয়ার জন্য। [হাদিস নং- ১৬১১।]
...
ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার দুটি যুক্তি
উপর্যুক্ত হাদিসে ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার দুটি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম যুক্তি : যা রমজান মাসের রোযাদারদের সাথে সম্পৃক্ত। রোযা পালনকালে তারা কোনো বেহুদা ও অনর্থক কথা বলতে পারে, কিংবা কোনো অশ্ল¬ীল ও শরিয়তনিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। কেননা, রোযা তো তাই যা মুখ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পালন করে। কারণ রোযা থাকে পেট ও যৌনাঙ্গে। রোযার সংজ্ঞা হল :
هُوَ الِامسَاكُ عَنِ المُفَطِّرَاتِ الثَّلاَثَةِ : الأكْلِ و الشُّربِ والجِمَاعِ
‘খাওয়া, পান করা ও স্ত্রীসহবাস থেকে বিরত থাকার নাম রোযা।’
কাজেই রোযাদারের মুখ, কান ও চক্ষুদ্বয়, হাত কিংবা পা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সা. কর্তৃক নিষিদ্ধ কথা-কাজ দ্বারা কলুষিত হলে, সে ক্ষমার অযোগ্য হয়ে যাবে। আর মানবীয় দুর্বলতার দরুন রোযাদার সাধারণত এসব থেকে রক্ষা পেতে পারে না। এ কারণে রোযা শেষ হওয়ার পর এর যাকাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঠিক গোসলের মতো, শরীর দুর্গন্ধ ও নাপাক হলে। কেননা, ভালো ও উত্তম কার্যাবলি খারাপকে ধুয়ে মুছে দেয়— এতো সবার জানা।
যেমন- শরিয়তের বিধানদাতা পাঁচওয়াক্ত ফরজ নামাযের সাথে নিয়মিত সুন্নত নামায চালু করেছেন। কেননা, ফরজ নামাযে কোনো ত্রুটি বা নিয়ম পালনে ভুল হয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ইমাম এ ব্যবস্থাকে ‘সাহু সিজদার’ সাথে তুলনা করেছেন। ইমাম শাফেয়ির উস্তাদ ওয়াকী ইবনুল জাররাহ রহ. বলেছেন, “রমজান মাসের জন্য ফিতরের যাকাত নামাযের ‘সাহু সিজদা’র সমতুল্য। তা রোযার ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ করে দেয়। যেমন- সাহু সিজদা নামাযের ত্রুটির ক্ষতিপূরণ করে”।
আর দ্বিতীয় যুক্তি : যা সমাজ-সমষ্টির সাথে সম্পৃক্ত। সমাজের সর্বত্র— বিশেষ করে গরিব-মিসকিন ও অভাবগ্রস্ত লোকদের মাঝে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া।
কেননা, ঈদ তো সাধারণভাবে আনন্দ-ফুর্তির দিন। কাজেই সেদিন সমাজের সমস্ত লোক যাতে সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আনন্দে যোগদান করতে পারে— এর ব্যবস্থা করা একান্ত কাম্য ও বাঞ্ছনীয়। কিন্তু মিসকিনরা কখনোই আনন্দ লাভ করতে পারে না, যদি কেবল ধনী ও সচ্ছলরা রসনাবিলাস ও পেটপূজায় মেতে উঠে। শুধু তারাই চর্ব-চূষ্য-লেহ্য-পেয় ভোগ করে। আর এ মহা আনন্দের দিনে তাদের মুখে দু’মুঠো খাবারও জুটে না, জঠরজ্বালা নিবারণের ন্যূনতম উপকরণও মিলে না ।
এ কারণে শরিয়তের যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ এ দিনে এমন ব্যবস্থা গ্রহণের অপরিহার্যতা মনে করেছে, যার ফলে অভাবীরা অভাব ও ভিক্ষার লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত থাকতে পারে। উপরন্তু তার মনে এ চেতনাও জাগবে যে, সমাজ তাকে ভুলে যায় নি। তাকে উপেক্ষা করে নি। বিশেষ করে এ জাতীয় আনন্দ ও উৎসবের দিনে। সে কারণেই হাদিসে বলা হয়েছেÑ أَغْنُوهُمْ فِى هذا اليَوم ‘তোমরা এ দিনে তাদের সচ্ছল করে দাও।’ [নাসবুর রায়া : খ. ২, পৃ. ৪৩২]
শরিয়তের বিধানদাতা ফিতরার ওয়াজিব পরিমাণটা হ্রাস করে দিয়েছেন এবং লোকেরা নিজেদের খাদ্যদ্রব্য থেকে যাতে সহজেই দিতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করেছেন। এজন্য ফিতরা ওয়াজিবের ক্ষেত্রে লঘু শর্তারোপ করেছেন, যেমনটি যাকাতে করেন নি। যেন সম্ভাব্যভাবে জাতির বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এ মহা উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারে। এ মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই শরিয়তে তাৎক্ষণিক অবদান হিসেবে ‘সাদাকাতুল ফিত্র’ ওয়াজিব করার এ মহান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। [ড. ইউসুফ আল-কারযাবীর ফিকহুয যাকাত]
...
কী দিয়ে ফিতরা দিতে হবে এবং পরিমাণ কতটুকু?
গম, আটা বা ময়দা, ছাতু কিংবা কিশমিস অর্ধ সা অথবা সমপরিমাণ মূল্য। আর খেজুর বা যব এক সা অথবা সমপরিমাণ মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা যাবে।
অর্ধ সা- ১ কেজি ৬৩৫ গ্রাম।
এক সা- ৩ কেজি ২৭৯ গ্রাম।
ফাতাওয়া শামিতে আছে :
نصف صاع فاعل تجب من برّ او دقيقه او سويقه او زبيب او صاع تمر او شعير.
(শামি- ৩/৩১৮,৩১৯, বাদায়ে- ২/২০৩,২০৫, আলমগিরি- ১/১৯১)
এই হুকুম নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য। আর উচ্চবিত্ত ও বিত্তশালীদের জন্য কিশমিশ বা খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম। যাতে হাদিসে বর্ণিত সকল বস্তুর ওপর আমল হয়ে যায়। তা ছাড়া এতে গরিবরা অধিক লাভবান হবে, যা শরিয়তের কাম্য।
মূল্য নির্ধারণের সময় মধ্যম মানের বস্তু দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। উৎকৃষ্ট মানের বস্তু দিয়ে হলে তো আরো উত্তম।
...
ফিতরার ক্ষেত্রে খাদ্যশস্য দেওয়া উত্তম না মূল্য?
আল্লামা ইউসুফ আল-কারজাবি বলেন, খাদ্যশস্য নাকি মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম? ‘এতদুভয়ের মধ্যে উত্তম সাব্যস্ত করার ভিত্তি হচ্ছে গরিব ব্যক্তির পক্ষে কোন্টা দিলে অধিক সুবিধাজনক হয়, সেই জিনিসটি দেওয়া। যদি খাদ্যশস্য দিলে মূল্যের তুলনায় তার পক্ষে অধিক ভালো হয়, তবে সেটি দেওয়াই উত্তম। যেমন- দুর্ভিক্ষ ও কষ্টের সময় তা ভালো। আর নগদ টাকা পেলে তার যদি বেশি সুবিধা হয়, তাহলে তা-ই দেওয়াই উত্তম। এ হিসাবে গরিব ব্যক্তির একার সুবিধাটা না দেখে গোটা পরিবারের সুবিধাটার বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। কেননা, দেখা গেছে অনেক পারিবারিক দায়িত্বসম্পন্ন দরিদ্র ব্যক্তি নগদ পয়সা নিয়ে তা নিজের বাজে অভ্যাসে ব্যয় করে ফেলে অথচ তখন তার স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি হয়তো একবেলা খাবার থেকেও বঞ্চিত রয়েছে। এরূপ অবস্থায় খাদ্যশস্য দেওয়াই ভালো। [ড. ইউসুফ আল-কারযাবীর ফিকহুয যাকাত : খ. ২, পৃ. ৫০৫]
...
একনজরে ফিতরার মাসায়েল
 ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় ফিতরা ওয়াজিব হয়। সুতরাং যে সন্তান ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের পর জন্মগ্রহণ করবে, তার পক্ষ হতে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব না।
 রমজান মাসের ভেতর ফিতরা আদায় করে দেওয়া যায়। তবে ঈদের দিন নামাযে যাওয়ার আগে আদায় করা উত্তম। কোনো কারণে ঈদের নামাযের আগে ফিতরা দিতে না পারলে নামাযের পরেও দেওয়া যাবে এবং ফিতরা আদায় হবে।
 কেউ রমজানের রোযা রাখতে না পারলেও নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হয়ে যায়।
 পিতা-মাতা, স্ত্রী ও বালেগ সন্তানরা পৃথক পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তাদের ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। তারা নিজেরা ফিতরা আদায় করবে। তবে কর্তা আদায় করে দিলে আদায় হয়ে যাবে।
 নাবালেগ সন্তানের নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে অভিভাবক ইচ্ছে করলে নিজের সম্পদ দ্বারা ফিতরা আদায় করতে পারবে।
 একজন গরিবকে পূর্ণ একটি ফিতরা দেওয়া উত্তম। যদিও এক ফিতরা কয়েকজনকে ভাগ করে দেওয়া জায়েয।
 যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত গরিব-মিসকিনদের ফিতরা দেওয়া যায়। তবে অমুসলিমদেরকে যাকাত দেওয়া না গেলেও ফিতরা দেওয়া বৈধ। [ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৯০, বাদায়েউস সানায়ে ২/২০৭]

সোমবার, ১১ মে, ২০২০

রোজার কাজা ও কাফফারা আদায়


রমজান মাসে যাঁরা পীড়িত, অতিবৃদ্ধ, যাঁদের দৈহিক ভীষণ দুর্বলতার কারণে রোজা পালন করা খুবই কষ্টদায়ক হয়, যাঁরা ভ্রমণে থাকার কারণে সিয়াম পালন করতে পারেন না, তাঁদের জন্য রোজার কাজা, কাফফারা, ফিদইয়া ইত্যাদি বদলাব্যবস্থা স্থির করে ইসলামি শরিয়তে সুনির্দিষ্ট বিধি-ব্যবস্থা রয়েছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য তোমাদের মধ্যে কেউ পীড়িত হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। এটা (সিয়াম) যাদেরকে অতিশয় কষ্ট দেয় তাদের কর্তব্য এর পরিবর্তে “ফিদইয়া”—একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করা। যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎ কাজ করে, তবে সেটা তার পক্ষে অধিকতর কল্যাণকর। যদি তোমরা উপলব্ধি করতে তবে বুঝতে সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৪)

যেসব কারণে রমজান মাসে রোজা ভঙ্গ করা যাবে তবে পরে কাজা করতে হয় তা হচ্ছে; ১. মুসাফির অবস্থায়। ২. রোগ বৃদ্ধির বেশি আশঙ্কা থাকলে। ৩. গর্ভের সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে। ৪. এমন তৃষ্ণা বা ক্ষুধা হয়, যাতে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকতে পারে। ৫. শক্তিহীন বৃদ্ধ হলে। ৬. কোনো রোজাদারকে সাপে দংশন করলে। ৭. মেয়েদের হায়েজ-নেফাসকালীন সময় রোজা ভঙ্গ করা যায়। আর যেসব কারণে রোজার কাজা ও কাফফারা দুটোই ওয়াজিব হয় তা হলো, জেনেশুনে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করলে রোজা ভেঙে যাবে। এমতাবস্থায় কাজা ও কাফফারা দুটোই ওয়াজিব হয়।
মনে রাখবেন, শরিয়তে কঠোর নিষেধ থাকা সত্ত্বেও বিনা কারণে রোজা ভঙ্গ করলে তার অবশ্যই কাজা-কাফফারা উভয়ই আদায় করা ওয়াজিব। যতটি রোজা ভঙ্গ হবে, ততটি রোজা আদায় করতে হবে। কাজা রোজা একটির পরিবর্তে একটি অর্থাৎ রোজার কাজা হিসেবে শুধু একটি রোজাই যথেষ্ট। কাফফারা আদায় করার তিনটি বিধান রয়েছে। ১. একটি রোজা ভঙ্গের জন্য একাধারে ৬০টি রোজা রাখতে হবে। কাফফারা ধারাবাহিকভাবে ৬০টি রোজাই রাখতে হবে, মাঝে কোনো একটি রোজা ভঙ্গ হলে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। ২. যদি কারও জন্য ৬০টি রোজা পালন সম্ভব না হয়, তাহলে সে ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা খানা দেবে। অপর দিকে অসুস্থতাজনিত কারণে কারও রোজা রাখার ক্ষমতা না থাকলে ৬০ জন ফকির, মিসকিন, গরিব বা অসহায়কে প্রতিদিন দুই বেলা করে পেট ভরে খানা খাওয়াতে হবে। ৩. গোলাম বা দাসী আজাদ করে দিতে হবে।
রোজার ফিদইয়া: রোজা রাখা দুঃসাধ্য হলে একটা রোজার পরিবর্তে একজন দরিদ্রকে অন্নদান করা কর্তব্য। শরিয়ত মোতাবেক রোজা রাখার সামর্থ্যহীন হলে প্রতিটি রোজার জন্য একটি করে ‘সাদাকাতুল ফিতর’-এর সমপরিমাণ গম বা তার মূল্য গরিবদের দান করাই হলো রোজার ‘ফিদইয়া’ তথা বিনিময় বা মুক্তিপণ। অতিশয় বৃদ্ধ বা গুরুতর রোগাক্রান্ত ব্যক্তি, যার সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই অথবা রোজা রাখলে জীবনহানির আশঙ্কা থাকে, তারা রোজার বদলে ফিদইয়া আদায় করবে। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তি যদি সুস্থ হয়ে রোজা রাখার মতো শক্তি ও সাহস পায়, তাহলে তার আগের রোজার কাজা আদায় করতে হবে। তখন আগে আদায়কৃত ফিদইয়া সাদকা হিসেবে গণ্য হবে।
অসুস্থ ব্যক্তি ফিদইয়া বা মুক্তিপণ আদায় না করে মারা গেলে তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে ফিদইয়া আদায় করা কর্তব্য; যদি মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে যায়। অন্যথায় আদায় করা মুস্তাহাব। উল্লেখ্য যে প্রতিটি রোজার ফিদইয়া হলো একটি সাদাকাতুল ফিতর অর্থাৎ ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম আটা বা তার সমমূল্য ৬৬ টাকা দরিদ্র এতিম বা মিসকিনকে দান করা অথবা একজন ফকির বা গরিবকে দুই বেলা পেট পুরে খাওয়ানো। অনেক জায়গায় দেখা যায়, গরিব লোক কোনো ধনীর বদলি রোজা পালন করে দিচ্ছে। মনে রাখবেন, কোনো অবস্থাতেই একজনের রোজা অন্যজন বদলি হিসেবে পালন করতে পারবে না। কেউ কারও রোজা বদলি হিসেবে রাখলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা শুদ্ধ হবে না। রোজার ফিদইয়া গুনাহমাফির মাধ্যমে মানুষকে নিষ্কলুষ ও নির্ভেজাল করে। রোজাকে আল্লাহ তাআলা মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বান্দার জন্য নির্ধারণ করেছেন। রোজার কাজা, কাফফারা ও ফিদইয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা পাক বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে সওয়াবের আশায় যে ব্যক্তি রমজান মাসে রোজা রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার বিগত দিনের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (বুখারি)
বিনা কারণে যে ব্যক্তি একটি রোজা না রাখে এবং পরে যদি ওই রোজার পরিবর্তে সারা বছরও রোজা রাখে, তবু সে ততটুকু সওয়াব পাবে না, যতটুকু মাহে রমজানে ওই একটি রোজা পালনের কারণে পেত। এ সম্পর্কে ফিকহবিদদের মতে, দুই মাস একাধারে রোজা রাখলে স্বেচ্ছায়
ভাঙা একটি রোজার কাফফারা আদায় হয় আর এ কাফফারার বিনিময়ে একটি রোজার ফরজের দায়িত্বটাই কেবল আদায় হয়। আর যারা নানা অজুহাতে ও স্বেচ্ছায় পুরো মাহে রমজানের রোজা রাখে না, তাদের শাস্তি কত যে কঠিন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদের পরিণতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাহে রমজানের এক দিনে রোজা কোনো ওজর বা অসুস্থতা ব্যতীত ভঙ্গ করবে, সারা জীবনের
রোজায়ও এর ক্ষতি পূরণ হবে না, যদি সে সারা জীবনও রোজা রাখে।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদ)
ইচ্ছাকৃত রোজা না রাখলে যে কঠিন শাস্তির হুকুম এসেছে, সেই ব্যক্তি ইহকালে তা না পেলেও পরকালে জাহান্নামের দাউ দাউ অগ্নিকুণ্ডে তার শাস্তি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ; তাই রমজান মাসে রোজার সংখ্যা পূরণ করাই অধিক শ্রেয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ ও দাওয়াহ বিভাগ, ধর্মবিজ্ঞান অনুষদ, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

রোজার জরুরি মাসালা


প্রশ্ন : রোগীকে রক্ত দিলে বা পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে রোজা ভঙ্গ হয় কিনা?
উত্তর : না, কাউকে রক্ত দিলে বা পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে রোজা ভঙ্গ হয় না। কারণ হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে শরীর থেকে কোনো কিছু বের হওয়ার মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ হয় না। (মাজমাউল আনহুর, ১/৩৫৬, বাহরুর রায়েক ২/২৭৬, শামী ৩/৩৬৭, ফাতাওয়া ১/২৫৩, আহসানুল ফাত্তাওয়া ৪/৪২৫, আপকে মাসায়েল ৩/২১৬)।
সোহাইল, টাঙ্গাইল
প্রশ্ন : চোখে ড্রপ দিলে রোজা ভঙ্গ হবি কিনা?
উত্তর : না, চোখে ড্রপ দিলে মুখে তার স্বাদ অনুভব হলেও রোজা ভঙ্গ হবে না। তবে নাকে ড্রপ দিলে যদি তা পেটে বা মস্তিষ্কে পৌঁছে তা হলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। (আলমগীরি ১/২০৩, শামী, আহসানুল ফাতাওয়া ৪/৪২৯, বাদাইউস সানায়ে ২/৯৩, মাহমুদিয়া ১৫/১৬৮)।
সামিউল হক, দুবাই
প্রশ্ন : ইনসুলিন বা ইনজেকশন নিলে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা?
উত্তর : না, ইনসুলিন বা ইনজেকশন নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারণ সরাসরি পেটে বা মস্তিষ্কে কোনো কিছু পৌঁছলেই রোজা ভঙ্গ হয়। আর ইনজেকশন বা ইনসুলিন সরাসরি পেটে বা মস্তিষ্কে পৌঁছে না। (শামী ৩/৩৬৭, আলমগীরি ১/২০৩, আহসানুল ফাতাওয়া ৪/৪২২, মাহমুদিয়া ১৫/১৮১)।
আফরোজা আহমদ, লন্ডন
প্রশ্ন : ইনহেলার ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা?
উত্তর : হ্যাঁ, ইনহেলার ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। কারণ রোজা অবস্থায় কোনো ধরনের ধোঁয়া মুখে টেনে নিলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। বিড়ি-সিগারেট বা হুক্কা পান করার মাধ্যমেও এ কারণেই রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। ইনহেলার যেহেতু ধোঁয়াজাতীয় তাই ইনহেলার ব্যবহার করায় রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। (শামী ৩/৩৬৬, হেদায়া ১/২১৯, ফাতহুল কাদির ২/২৫৮, ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/১২৪)।
ইসমাইল, দ. কোরিয়া
প্রশ্ন : রোজা অবস্থায় টুথপেস্ট ব্যবহার করলে রোজার কোনো ক্ষতি হবে কিনা?
উত্তর : টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজলে মুখে একটা স্বাদ অনুভূত হয়। একটা মিষ্টি মিষ্টি কিছু গলার ভেতরেও যায়। এ কারণে অনেকের মতেই রোজা অবস্থায় টুথপেস্ট ব্যবহার করা মাকরুহ। সুতরাং তা বর্জন করাই শ্রেয়। (আলমগীরি ১/১৯৯)।
ইফতেখার কামাল, সিঙ্গাপুর
প্রশ্ন : তারাবির নামাজের কয়েক রাকাত ইমামের সঙ্গে পাওয়া না গেলে ইমাম যখন বিতির আদায় করবেন তখন কি ইমামের সঙ্গে বিতির পড়তে হবে নাকি আগে ছুটে যাওয়া তারাবির রাকাতগুলো আদায় করে পরে একাকী বিতির পড়বে?
উত্তর : এ ক্ষেত্রে ইমামের সঙ্গে জামাতে বিতির আদায় করবেন এবং পরে ছুটে যাওয়া তারাবি আদায় করবেন। (আলমগীরি ১/১১৭, শামী ২/৪৯৪, খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/৬৩, বাহরুর রায়েক ২/৬৮)।
মুফতি মুতীউর রাহমান
প্রধান মুফতি, চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসা
খতিব মুহম্মদিয়া দারুল উলুম জামে মসজিদ, ঢাকা

বুধবার, ৬ মে, ২০২০

রোজার প্রয়োজনীয় কিছু মাসালা

যেসব কারণে রোজা ভেঙে যায়
কুলি করার সময় অনিচ্ছায় গলার ভেতর পানি প্রবেশ করলে।
-প্রস্রাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে ওষুধ বা অন্যকিছু শরীরে প্রবেশ করালে।
-রোজাদারকে জোর করে কেউ কিছু খাওয়ালে।
-রাত অবশিষ্ট আছে মনে করে সুবেহ সাদেকের পর পানাহার করলে।
-ইফতারের সময় হয়েছে ভেবে সূর্যাস্তের আগে ইফতার করলে।
-মুখ ভরে বমি করলে স্ত্রীর ক্ষেত্রে। এতে স্বামীর রোজা ভাঙবে এবং তার কাফফারাও করতে হবে।
-ভুলবশত কোনো কিছু খেয়ে, রোযা ভেঙে গেছে ভেবে ইচ্ছা করে আরও কিছু খেলে।
-বৃষ্টির পানি মুখে পড়ার কারণে খেয়ে ফেললে।
-কান বা নাক দিয়ে ওষুধ প্রবেশ করালে।
-জিহ্বা দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে ছোলা পরিমাণ কোনো কিছু বের করে খেয়ে ফেললে।
-অল্প বমি মুখে আসার পর ইচ্ছাকৃতভাবে তা গিলে ফেললে।

এসব কারণে রোজা ভেঙে যায়। তবে এরপর কোনো খানাপিনা করা যাবে না। সারা দিন রোজার মতোই থাকতে হবে। এরূপ রোজার কাজা করা ওয়াজিব।

যেসব কারণে রোজা মাকরুহ হয়
-বিনা ওজরে কোনো জিনিস মুখে দিয়ে চিবানো।
-গরমের কারণে বারবার কুলি করা।
-টুথ পাউডার, পেস্ট, কয়লা বা অন্য কোনো মাজন দ্বারা রোজার দিনে দাঁত পরিষ্কার করা।
-বিনা ওজরে জিহ্বা দ্বারা কোনো বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করা। [তবে বদমেজাজি স্বামীর জন্য স্ত্রীর তরকারির স্বাদ গ্রহণ করার অনুমতি আছে।]
-রোজাদার অবস্থায় কারও গিবত করা।
-মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া।
-অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করা
-ঝগড়া বিবাদ করা।


যেসব কারণে রোজা ভাঙা যায়
যেসব কারণে রমজান মাসে রোজা না রাখা কিংবা রাখলেও ভাঙা যায় তা হলো-
-হঠাৎ ভীষণ পেট ব্যথা শুরু হলে, যা ওষুধ সেবন ছাড়া উপশম হওয়ার মতো নয়।
-সাপ, বিচ্ছু ইত্যাদি কোনো বিষাক্ত প্রাণী দংশন করলে এবং তার চিকিত্সায় রোজা ভাঙ্গার দরকার হলে।
-রোগ দুর্বলতার দরুন রোজা অবস্থায় ভীষণ পিপাসা পেলে এবং তাতে মৃত্যুর ভয় থাকলে।
-গর্ভবতী নারীর গর্ভ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা হলে।
-শিশুর মা সন্তানের দুধ না পাওয়ার আশঙ্কা করলে।
-রোজার কষ্টে প্রাণহানির আশঙ্কা হলে।
-অতি বার্ধক্যের কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হলে।
-মুসাফির অবস্থায় রোজা রাখতে কষ্ট ও অসুবিধা বোধ হলে।
-নারীদের হায়েজ কিংবা নেফাস শুরু হলে। হায়েযের নিম্ন সময় তিন দিন, সর্বোচ্চ ১০ দিন এবং নেফাসের সর্বোচ্চ সময় ৪০ দিন। কমের কোনো সীমা নির্দিষ্ট নেই।


রোজার কাফফারা
-স্বেচ্ছায় কোনো খাবার বা ওষুধ খেলে কিংবা ধূমপান করলে।
-স্বেচ্ছায় যে কোনো প্রকারে বীর্যপাত করলে।
-সঙ্গম করলে, যদিও বীর্যপাত না হয়।
এসব অবস্থায় রোজা ভেঙে যাবে। রোজার কাজা ও কাফফারা উভয়টি আদায় করতে হবে। কাফফারার জন্য বিরতিহীন দু’মাস (৬০টি) রোজা রাখতে হবে। দু’মাসের মধ্যে যদি কোনো এক দিন রোজা ভাঙে, তবে আবার একাধারে দু’মাস রোজা রাখতে হবে। আগের রোজা বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু এরই মধ্যে মহিলাদের হায়েয শুরু হলে আগের রোজা বাতিল হবে না। পাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার রোজা শুরু করতে হবে এবং ৬০টি রোজা রাখতে হবে।

রোজা রাখার শক্তি না থাকলে ৬০ জন মিসকিনকে দু’বেলা বা এক জনকে ৬০ দিন দু’বেলা করে তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়াতে হবে কিংবা ৬০ জন মিসকিনের প্রত্যেককে একটি করে সদকায়ে ফিতরের মূল্য দেবে।

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২০

শা‘বান মাসে নফল রোযা

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন-
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَصُومُ حَتّى نَقُولَ: لاَ يُفْطِرُ، وَيُفْطِرُ حَتّى نَقُولَ: لاَ يَصُومُ، فَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلّا رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ.
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (অবিরাম) রোযা রাখতেন, যার কারণে আমরা বলতাম, আর বাদ দিবেন না। আবার (অবিরাম) রোযাহীনও থাকতেন, যার কারণে আমরা বলতাম, আর রাখবেন না। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ছাড়া অন্য কোনো মাসে পুরো মাস রোযা রাখতে দেখিনি। তেমনি দেখিনি শা‘বানের চেয়ে বেশি অন্য কোনো মাসে রোযা রাখতে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৫৬

.
■ সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখা
.
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেছেন-

كَانَ النبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَتَحَرّى صَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالخَمِيسِ.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবারে রোযা রাখার ইহতিমাম করতেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৪৫
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
تُعْرَضُ الأَعْمَالُ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالخَمِيسِ، فَأُحِبّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ.
সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমলসমূহ পেশ করা হয়। তো আমার পছন্দ, আমার আমল যেন পেশ করা হয় আমি রোযাদার অবস্থায় । -জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৪৭

.
■ মাসে তিন রোযা
.
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

شَهْرُ الصَبْرِ، وَثَلَاثَةُ أَيّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ صَوْمُ الدّهْرِ.
সবরের মাস (রমযান) ও প্রতি মাসে তিন দিন সারা বছর রোযার সমতুল্য। -সুনানে নাসায়ী ৪/২১৮, হাদীস ২৪০৮; মুসনাদে আহমাদ ২/২৬৩, হাদীস ৭৫৭৭
হযরত আবু যর গিফারী রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِذَا صُمْتَ مِنْ شَهْرٍ ثَلَاثًا، فَصُمْ ثَلَاثَ عَشْرَةَ، وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ، وَخَمْسَ عَشْرَة.
তুমি যদি মাসে তিন দিন রোযা রাখ তাহলে তের তারিখ, চৌদ্দ তারিখ ও পনের তারিখ রোযা রেখো। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২১৪৩৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৬১; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২৪২৪
ইবনে মাজাহর বর্ণনায় আছে-
فَأَنْزَلَ اللهُ عَزّ وَجَلّ تَصْدِيقَ ذَلِكَ فِي كِتَابِهِ: مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا فَالْيَوْم بِعَشْرَةِ أَيّامٍ.
অর্থাৎ আল্লাহর কিতাবে এর সমর্থন রয়েছে, যে নেক কাজ করবে সে তার দশ গুণ পাবে। তো এক দিন সমান সমান দশ দিন। (দ্র. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭০৮)

শুক্রবার, ২৬ মে, ২০১৭

বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ে সাওম


[ বাংলা – Bengali – بنغالي ]

আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী
﴿ الصوم عند الديانات والشعوب ﴾
« باللغة البنغالية »
عبد الله المأمون الأزهري


বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ে সাওম
সিয়াম বা রোযা নাম ও ধরণভেদে বিভিন্ন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বহুল প্রচলিত একটি ধর্মীয় বিধান, যা মুসলমানদের জন্য অবশ্য পালনীয় (ফরজ) একটি ইবাদত। শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী‘য়তে যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে সিয়ামের বিধান দেয়া হয়েছে, তেমনি সিয়ামের বিধান দেয়া হয়েছিল পূর্ববর্তী নবীদের শরী‘য়তেও; পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ধর্ম-কর্মেও। আসমানী ধর্ম ছাড়াও মানব রচিত বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ে সাওমের বিধান রয়েছে। আল্লাহ তায়া‘লা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣] 
 “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে। যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার” [সূরা বাক্বারা: ১৮৩]। 
এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী ও প্রত্যেক জাতির মধ্যেই প্রচলিত ছিল ‘সিয়াম’ বা রোযা নামের এই ধর্মানুষ্ঠান।
তাফসীরে কুরত্ববীতে উক্ত আয়াতের ব্যাখায় বলা হয়েছে, 
الْمَعْنَى:"كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيامُ" أَيْ فِي أَوَّلِ الْإِسْلَامِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ،" كَما كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ" وَهُمُ الْيَهُودُ- فِي قَوْلِ ابْنِ عَبَّاسٍ- ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ. ثُمَّ نُسِخَ هَذَا فِي هَذِهِ الْأُمَّةِ بِشَهْرِ رَمَضَانَ. وَقَالَ مُعَاذُ بن جبل: نسخ ذلك" ب أَيَّامٍ مَعْدُوداتٍ" ثُمَّ نُسِخَتِ الْأَيَّامُ بِرَمَضَانَ.
অর্থাৎ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রত্যেক মাসে তিন দিন ও আশুরার দিনে সাওম ফরজ ছিল, যেমনি ভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী ইহুদি সম্প্রদায়ের উপর মাসে তিন দিন ও আশুরার দিনে সাওম ফরজ ছিল। পরবর্তীতে রমাদান মাসের দ্বারা এ সাওম রহিত হয়। মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উক্ত তিন দিনের সাওম নির্দিষ্ট কয়েক দিনের সাওমের দ্বারা রহিত হয়, অতঃপর উক্ত কয়েক দিনের সাওম আবার রমাদানের সাওম দ্বারা রহিত হয়। 
 عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: «صَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَاشُورَاءَ، وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ تُرِكَ»، وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ لاَ يَصُومُهُ إِلَّا أَنْ يُوَافِقَ صَوْمَهُ
ইবন ‘উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আশুরার দিন সিয়াম পালন করেছেন এবং এ সিয়ামের জন্য আদেশও পালন করেছে। পরে যখন রমাদানের সিয়াম ফরজ হল তখন তা ছেড়ে দেওয়া হয়। ‘আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এ সিয়াম পালিন করতেন না, তবে মাসের যে দিনগূলোতে সাধারন সিয়াম পালন করতেন, তাঁর সাথে মিল হলে করতেন। 
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا،: أَنَّ قُرَيْشًا كَانَتْ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ فِي الجَاهِلِيَّةِ، ثُمَّ أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِصِيَامِهِ حَتَّى فُرِضَ رَمَضَانُ، وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ شَاءَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ شَاءَ أَفْطَرَ»
‘আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার থেকে বর্নিত যে, জাহিলী যুগে কুরায়শগন ‘আশূরার দিন সাওম পালন করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পরে এ সাওম পালনের নির্দেশ দেন। অবশেষে রমাদানের সিয়াম ফরজ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যার ইচ্ছা ‘আশুরার সিয়াম পালন করবে এবং যার ইচ্ছা সে সাওম পালন করবে না। 
 আমরা এখানে আদি পিতা আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত বিভিন্ন আসমানী ধর্মে ও মানব রচিত অন্যান্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের যুগে যুগে সাওমের বিধান ও ধরণ নিয়ে আলোচনা করব। 
আদম আলাইহিস সালামের ধর্মে সাওম: 
প্রথম নবী আদম আলাইহিস সালামের শরী‘য়তে সিয়ামের বিধান দেয়া হয়েছিল বলে তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়। অবশ্য সেই সিয়ামের ধরণ ও প্রকৃতি কেমন ছিল তা আমাদের জানা নেই। এ বিষয়ে বাইবেল, কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসের কিতাব একেবারে নিশ্চুপ। বলা হয়ে থাকে, পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবীর শরী‘য়তেই চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সিয়ামের বিধান ছিল। এই সিয়াম আইয়্যামি বীদ বা বেজোড় সংখ্যক দিনের সাওম নামে খ্যাত। 
নূহ আলাইহিস সালামের সাওম: 
তাফসীরে ইবনে কাসীরে এসেছে, 
قَدْ كَانَ هَذَا فِي ابْتِدَاءِ الْإِسْلَامِ يَصُومُونَ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، ثُمَّ نُسِخَ ذَلِكَ بِصَوْمِ شَهْرِ رَمَضَانَ، كَمَا سَيَأْتِي بَيَانُهُ. وَقَدْ رُوي أَنَّ الصِّيَامَ كَانَ أَوَّلًا كَمَا كَانَ عَلَيْهِ الْأُمَمُ قَبْلَنَا، مِنْ كُلِّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ -عَنْ مُعَاذٍ، وَابْنِ مَسْعُودٍ، وَابْنِ عَبَّاسٍ، وَعَطَاءٍ، وَقَتَادَةَ، وَالضَّحَّاكِ بْنِ مُزَاحِمٍ. وَزَادَ: لَمْ يَزَلْ هَذَا مَشْرُوعًا مِنْ زَمَانِ نُوحٍ إِلَى أَنْ نَسَخ اللَّهُ ذَلِكَ بِصِيَامِ شَهْرِ رَمَضَانَ.
অর্থাৎ প্রসিদ্ধ তাফসিরবিদ হযরত মুয়াজ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, আতা, কাতাদা ও দহহাক (রহ.) বর্ণনা করেন, নূহ আলাইহিস সালাম থেকে শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত প্রত্যেক নবীর যুগেই প্রতি মাসে তিনটি করে সিয়ামের বিধান ছিল। পরবর্তীতে ইহা রমজানের সাওমের দ্বারা রহিত হয়। 
 عن عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو، يَقُولُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «صَامَ نُوحٌ الدَّهْرَ، إِلَّا يَوْمَ الْفِطْرِ وَيَوْمَ الْأَضْحَى» 
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন বাদে সারা বছর সাওম রাখতেন। 
 ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাওম: 
 মুসলিম মিল্লাতের পিতা সহিফাপ্রাপ্ত নবী ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের যুগে ৩০টি সিয়াম ছিল বলে কেউ কেউ লিখেছেন।
তাফসীরে মানারে আল্লামা রশিদ রেজা ইমাম মুহাম্মদ আব্দুর সূত্রে উল্লেখ করেন, 
قَالَ الْأُسْتَاذُ الْإِمَامُ: أَبْهَمَ اللهُ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا، وَالْمَعْرُوفُ أَنَّ الصَّوْمَ مَشْرُوعٌ فِي جَمِيعِ الْمِلَلِ حَتَّى الْوَثَنِيَّةِ، فَهُوَ مَعْرُوفٌ عَنْ قُدَمَاءِ الْمِصْرِيِّينَ فِي أَيَّامِ وَثَنِيَّتِهِمْ، وَانْتَقَلَ مِنْهُمْ إِلَى الْيُونَانِ فَكَانُوا يَفْرِضُونَهُ لَا سِيَّمَا عَلَى النِّسَاءِ، وَكَذَلِكَ الرُّومَانِيُّونَ كَانُوا يُعْنَوْنَ بِالصِّيَامِ، وَلَا يَزَالُ وَثَنِيُّو الْهِنْدِ وَغَيْرُهُمْ يَصُومُونَ إِلَى الْآنِ، وَلَيْسَ فِي أَسْفَارِ التَّوْرَاةِ الَّتِي بَيْنَ أَيْدِينَا مَا يَدُلُّ عَلَى فَرْضِيَّةِ الصِّيَامِ، وَإِنَّمَا فِيهَا مَدْحُهُ وَمَدْحُ الصَّائِمِينَ، وَثَبَتَ أَنَّ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ صَامَ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، وَهُوَ يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الصَّوْمَ كَانَ مَعْرُوفًا مَشْرُوعًا وَمَعْدُودًا مِنَ الْعِبَادَاتِ، وَالْيَهُودُ فِي هَذِهِ الْأَزْمِنَةِ يَصُومُونَ أُسْبُوعًا تِذْكَارًا لِخَرَابِ أُورْشَلِيمَ وَأَخْذِهَا، وَيَصُومُونَ يَوْمًا مِنْ شَهْرِ آبَ. 
 দাউদ আলাইহিস সালামের সাওম: 
 আসমানি কিতাব ‘যবুর’প্রাপ্ত বিখ্যাত নবী দাউদ আলাইহিস সালামের যুগেও সাওমের প্রচলন ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «صُمْ أَفْضَلَ الصِّيَامِ عِنْدَ اللهِ، صَوْمَ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَام كَانَ يَصُومُ يَوْمًا وَيُفْطِرُ يَوْمًا»
‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সাওম দাউদ আলাইহিস সালামের সাওম তিনি এক দিন সাওম পালন করতেন এবং এক দিন বিনা সাওমে থাকতেন। 
 মূসা আলাইহিস সালাম ও ইহুদি ধর্মে সাওম: 
ইহুদিদের ওপর প্রতি শনিবার, বছরের মধ্যে মহররমের ১০ তারিখে আশুরার দিন এবং অন্যান্য সময় সাওম ফরজ ছিল।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ المَدِينَةَ فَرَأَى اليَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ: «مَا هَذَا؟»، قَالُوا: هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى، قَالَ: «فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ»، فَصَامَهُ، وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করে ইহুদিদের আশুরার দিনে সাওম অবস্থায় পেলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজকে তোমরা কিসের সাওম করছ?’ তারা বলল, ‘এটা সেই মহান দিন যেদিন আল্লাহ তা‘আলা মূসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর কওম বনী ইসরাইল ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ মূসা আলাইহিস সালাম ওই দিনে সাওম রেখেছিলেন, তাই আমরা আজকে সাওম করছি।’ এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি তোমাদের অপেক্ষা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের অধিক নিকটবর্তী। এরপর তিনি এ দিন সওম পালন করেন এবং সবাইকে সাওম রাখার নির্দেশ দেন”।’ 
 মূসা আলাইহিস সালাম তুর পাহাড়ে আল্লাহর কাছ থেকে তাওরাতপ্রাপ্তির আগে ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করেছিলেন। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতে বর্ণিত আছে, মূসা আলাইহিস সালাম তুর পাহাড়ে ৪০ দিন পানাহার না করে কাটিয়েছিলেন। তাই ইহুদিরা সাধারণভাবে মূসা আলাইহিস সালামের অনুসরণে ৪০টি সাওম রাখা ভালো মনে করত। তন্মধ্যে ৪০তম দিনটিতে তাদের ওপর সাওম রাখা ফরজ ছিল। যা ইহুদিদের সপ্তম মাস তিসরিনের দশম তারিখে পড়ত। এ জন্য ওই দিনটিকে আশুরা বা দশম দিন বলা হয়। এ ছাড়া ইহুদি সহিফাতে অন্যান্য সাওমেরও সুস্পষ্ট হুকুম রয়েছে। ইহুদিরা বর্তমানে ৯ আগষ্ট ইহুদী হাইকাল বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস দিবসে সাওম রাখে, এদিন তারা খাদ্য, স্ত্রী সহবাস ও জুতা পরিধান থেকে বিরত থাকে। এছাড়াও ১৩ নভেম্ভর, ১৭ই জুলাই, ১৩ই মার্চ ও বিভিন্ন দিবসে সাওম পালন করে।
ঈসা আলাইহিস সালাম ও খৃস্টান ধর্মে সাওম: 
 আসমানি কিতাব ‘ইঞ্জিল’ প্রাপ্ত বিশিষ্ট নবী ঈসা আলাইহিস সালামের যুগে সাওমের প্রমাণ পাওয়া যায়। ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারী সম্প্রদায় সাওম রাখতেন। বর্তমানে তাদের দু'ধরণের সাওম আছে। প্রথম হলো, তাদের পিতার উপদেশে নির্দিষ্ট কয়েকদিন খাদ্য পানীয় থেকে বিরত থাকা, আর ইফতার হবে নিরামিষ দিয়ে, মাছ, মাংস ও দুগ্ধজাত জিনিস খাওয়া যাবেনা। যেমন: বড় দিনের সাওম, তাওবার সাওম যা ৫৫ দিন পর্যন্ত দীর্ঘায়ীত হয়, এমনিভাবে সপ্তাহে বুধ ও শুক্রবারে সাওম। দ্বিতীয় ধরণের সাওম হলো খাদ্য থেকে বিরত থাকা, তবে মাছ ভক্ষণ করা যাবে। এ সাওমের মধ্যে ছোট সাওম বা জন্মদিনের সাওম, ইহা ৪৩ দিন দীর্ঘায়িত হয়, দূতগণের সাওম, মারিয়ামের সাওম ইত্যাদি। তবে তাদের ধর্মে কোন সাওমই ফরজ নয়, বরং কেউ ইচ্ছা করলে রাখতে পারে। 
 তাফসীরে ত্বাবারীতে এসেছে,
حدثني موسى بن هارون قال، حدثنا عمرو بن حماد قال، حدثنا أسباط، عن السدي:"يا أيها الذين آمنوا كُتب عليكم الصيام كما كتب على الذين من قبلكم"، أما الذين من قبلنا: فالنصارى، كتب عليهم رمضان، وكتب عليهم أن لا يأكلوا ولا يشربوا بعد النوم، ولا ينكحوا النساءَ شهر رمضان. فاشتد على النصارى صيامُ رمَضان، وجعل يُقَلَّبُ عليهم في الشتاء والصيف. فلما رأوا ذلك اجتمعوا فجعلوا صيامًا في الفصل بين الشتاء والصيف، وقالوا: نزيد عشرين يومًا نكفّر بها ما صنعنا! فجعلوا صيامهم خمسين. فلم يزل المسلمون على ذلك يَصنعون كما تصنع النصارى، حتى كان من أمر أبي قيس بن صرمة وعمر بن الخطاب، ما كان، فأحل الله لهم الأكل والشرب والجماعَ إلى طُلوع الفجر.

ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর ধর্ম প্রচার শুরুতে ইঞ্জিল পাওয়ার আগে জঙ্গলে ৪০ দিন সিয়াম সাধনা করেছিলেন। একদা ঈসা আলাইহিস সালামকে তাঁর অনুসারীরা জিজ্ঞেস করেন যে, ‘আমরা অপবিত্র আত্মাকে কী করে বের করব?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘তা দু‘আ ও সাওম ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে বের হতে পারে না।’ 
গ্রীক ও রোমানদের সাওম: 
গ্রীস ও রোমানরা যুদ্ধের আগে সাওম রাখত যাতে ক্ষুধা ও কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। খ্রিষ্টান পাদরিদের ও পারসিক অগ্নিপূজকদের এবং হিন্দু যোগী ইত্যাকার ধর্মাবলম্ব্বীদের মধ্যে সাওমের বিধান ছিল। পারসিক ও হিন্দু যোগীদের সাওমের ধরন ছিল এরূপ—তারা সাওম থাকা অবস্থায় মাছ-মাংস, পাখি ইত্যাদি ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকত বটে; কিন্তু ফল-মূল এবং সামান্য পানীয় গ্রহণ করত। মূর্তিপূজক ঋষীরা সাওমের ব্যাপারে এতোই কঠোর ছিল যে, এরূপ—তারা সাওম থাকা অবস্থায় মাছ-মাংস, পাখি ইত্যাদি ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকত, স্ত্রী সহবাস করতনা। সারা বছর সাওম রেখে আত্মার কষ্ট দিত আর এভাবে তারা পবিত্রতা অর্জনের সাধনা করত। 
প্রাচীন চীনা সম্প্রদায়ের লোকরা একাধারে কয়েক সপ্তাহ সাওম রাখত। 
জাহেলী যুগে সাবেয়ী সম্প্রদায়ের সাওম: 
ইবন নাদিম তার ‘ফিহরাসাত’ কিতাবের নবম খন্ডে উল্লেখ করেন, সাবেয়ী সম্প্রদায়ের লোকেরা (যারা গ্রহ নক্ষত্র পূঁজা করে) ত্রিশ দিন সাওম পালন করত। আযার মাসের ৮দিন অতিবাহিত হলে এ সাওম শুরু হতো, কানুনে আউয়াল মাসে ৯টি, শাবাত মাসে ৭টি সাওম। এ সাত সাওম পালনের পরে তারা ঈদুল ফিতর উদযাপন করত। সাওমবস্থায় তারা খাদ্য, পানীয় ও স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি থেকে বিরত থাকত। 
হিন্দু ধর্মে সাওম বা উপবাস: 
বেদের অনুসারী ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত অর্থাৎ উপবাস ছিল। প্রত্যেক হিন্দি মাসের ১১ তারিখে ব্রাহ্মণদের ওপর ‘একাদশীর’ উপবাস রয়েছে। এ হিসাবে তাদের উপবাস ২৪টি হয়। কোনো কোনো ব্রাহ্মণ কার্তিক মাসে প্রত্যেক সোমবার উপবাস করেন। কখনো হিন্দু যোগীরা ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করে চল্লিশে ব্রত পালন করেন। হিন্দু মেয়েরা তাদের স্বামীদের মঙ্গল কামনায় কার্তিক মাসের ১৮তম দিবসে "কারওয়া চাওত" নামে উপবাস রাখে। 
বৌদ্ধ ধর্মে সাওম বা উপবাস: 
তারা তাদের চন্দ্রমাসের Upisata মাসে ১,৯,১৫ ও ২২ তারিখে ৪ দিন উপবাস পালন করে। এছাড়া বৌদ্ধ গুরুরা দুপুরের খাবারের পর থেকে সব ধরণের খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। তারা এভাবে খাদ্য থেকে বিরত থেকে সংযম ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণ করে। 
মংগোলীরা প্রতি ১০ দিন অন্তর ও যারাদাশতিরা প্রতি ৫ দিন অন্তর সাওম পালন করত। 
জাহেলী যুগে সাওম: 
ইসলামের সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভের আগে আরবের মুশরিকদের মধ্যেও সিয়ামের প্রচলন ছিল। যেমন আশুরার দিনে কুরাইশরা জাহেলি যুগে সাওম রাখত এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহেলি যুগে ওই সাওম রাখতেন।
রায়েলীদের নিকট সাওম: 
রায়েলী সম্প্রদায়ের লোকেরা শারীরিক সুস্থতার জন্য সপ্তাহে একদিন তথা ২৪ ঘন্টা সাওম পালন করে। 
ইসলাম ধর্মে সাওম:
আল্লাহ তায়া‘লা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣] 
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে। যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার” [সূরা বাক্বারা: ১৮৩]। 
ইসলামে সাওমের রয়েছে করিপয় শর্ত ও বৈশিষ্ট্য। সুর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত পর্যান্ত যাবতীয় পানাহার, স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম সাওম। সেহেরী খাওয়া ইসলামী শরিয়তের সাওমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলামে রমাদানের সাওম ফরজ, অন্যান্য সাওম মুস্তাহাব, যেমন, আরাফার সাওম, মহররমের সাওম, শবে বরাতের সাওম, প্রতি চন্দ্র মাসে ১৩.১৪.১৫ তারিখ সাওম ইত্যাদি। 
সমাজে সাওমের প্রভাব
সংযম অর্জন: 
সাওমের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে বিষয়টি বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে সংযম। মূলত সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্ম ও সমাজে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য সাওমের প্রচলন ছিল। ইসলামী শরীয়তে ফরজকৃত সাওম সেই লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহায়ক। তাই প্রতিটি মুমিনের জন্য কর্তব্য হলো সাওমের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে ব্রতী হওয়া।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, রমাদান মাস হলো ধৈর্যের মাস, আর ধৈর্যের প্রতিদান হলো জান্নাত। এই মাসেই আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে ধৈর্যের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। যাতে রমাদান পরবর্তী সময়ে প্রতিটি মুহূর্তে, কথায় কাজে ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোর জন্যই সাওম। 
পরহেযগারী অর্জন: 
সাওমের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তায়া'লা বলেছেন, 
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣] 
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে। যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার” [সূরা বাক্বারা: ১৮৩]।
(لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) যাতে তোমরা তাকওয়াবান হও। এখানেই সমাজ গঠনে সাওমের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠে। তাকওয়ার ভিত্তির উপর যে সমাজ গঠিত হবে সেখানে থাকবে না কোন হিংসা বিদ্বেষ, মারামারি, কাটাকাটি, দুর্নীতি ও রাহাজানি। সাওমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সকল প্রকার নাফরমানি কাজ থেকে দূরে থাকার নামই তাকওয়া। মানুষের মনের গোপন কোণে যে কামনা-বাসনা আছে, আল্লাহ তা‘আলা সে সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল। আল্লাহর কাছে বান্দার মান-মর্যাদা নির্ধারণের একমাত্র উপায় তাকওয়া। এ তাকওয়াই মানুষের মনে সৎ মানবিক গুণাবলি সৃষ্টি করে। সুতরাং যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে বিরত থেকে ভালো কাজ করতে পারলেই সাওম পালন সফল ও সার্থক হবে। এভাবে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে অর্জিত প্রশিক্ষণ দ্বারা নিজেদের একজন সৎ, আল্লাহভীরু নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে।
সাওম থেকে তাকওয়া শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহভীতি অর্জন করার ক্ষেত্রে সাওমের কোনো বিকল্প নেই। সাওমের শিক্ষা নিয়ে তাকওয়ার গুণাবলি অর্জনের মধ্য দিয়ে মানুষ ইহকালীন কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তি লাভ করতে পারে। ঈমান ও আত্মবিশ্লেষণের সঙ্গে সাওম রাখলে জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এ শিক্ষা যদি বাকি ১১ মাস কাজে লাগানো যেত, তাহলে পৃথিবীতে এত অশান্তি, অনাচার থাকত না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে 
﴿ قَدۡ أَفۡلَحَ مَن تَزَكَّىٰ ١٤ ﴾ [الاعلا: ١٤] 
“যে সংশোধিত হলো, সেই সফলকাম হলো”। (সূরা আল-আ‘লা, আয়াত-১৪) 
আত্মিক ও দৈহিক সুস্থতা অর্জন: 
সাওম মানুষের ভেতর ও বাহির—দুই দিকের সংশোধন করে। মানুষের বাতেন বা ভেতরের অবস্থা পরিবর্তন করা অর্থাৎ আলোকিত করা এবং তার স্বভাব, চরিত্র, আচার-আচরণ সংশোধনপূর্বক প্রকাশ্যভাবে সুন্দর করে গড়ে তোলা সাওমের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাওম মানুষকে পার্থিব লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়।
মানুষের শারীরিক অবকাঠামো ঠিক রাখতে বর্তমানে চিকিৎসকেরা সাওম রাখার নির্দেশ দিয়ে থাকেন। শরীর ঠিক মন ঠিক। সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শারীরিক সুস্থতা অত্যাবশ্যকীয়। 
ইবনে সিনা সাওমকে দুরারোগ্য সব রোগের চিকিৎসা বলতেন। 
মিশরে নেপোলিয়ানের আগ্রাসন পরবর্তী যুগে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার জন্য সাওম রাখলে বলা হতো। 
সুন্দর সমাজ গঠন: 
সাওমের মাধ্যমে দরিদ্র ও অভুক্ত মানুষের দুঃখ দুর্দশা অনুধাবন করা যায়, ফলে সমাজে এর প্রভাব সুদূর প্রসারী। সিয়াম সাধনা সহমর্মিতা শিক্ষা জাগ্রত করার কার্যকর মাধ্যম। অনাহার কাকে বলে, খাদ্যাভাব কাকে বলে যারা অনুভব করেনি, তারা সমাজের বঞ্চিত ও পীড়িত মানুষের কষ্ট কীভাবে বুঝবে? সাওম রাখার কারণে এই মানুষগুলো ক্ষুধার যন্ত্রণা সম্পর্কে সামান্য হলেও ধারণা পাবে। ফলে প্রতিবেশী ও কাছে অবস্থানকারীদের কষ্টের জীবন কিছুটা অনুধাবন করা সহজ হবে। সাওম রাখার কারণে শরীরের শক্তি কমে আসবে। তখন অধীনস্থদের কাজের ভার লাঘব করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হবে। আর এতে মনিব-ভৃত্যের দূরত্ব কমে একে অপরের পরিপূরক মনে করার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। মালিক পক্ষ ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে বৈরিতা থাকবে না।
সিয়াম সাধনার দ্বারা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক স্নেহ, ভালোবাসা, মায়া-মমতা, আন্তরিকতা, দানশীলতা, বদান্যতা, উদারতা, ক্ষমা, পরোপকারিতা, সহানুভূতি, সমবেদনা প্রভৃতি সদাচরণ জন্মায়। সাওমের এ মহান শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের সমাজ ও পারিবারিক জীবনে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রমাদান মাস আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি বেশি দান সদাকা করতেন। যেমন হাদীসে এসেছে, 
عَنْ ابْن عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: «كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالخَيْرِ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، وَكَانَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ يَلْقَاهُ كُلَّ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ، حَتَّى يَنْسَلِخَ، يَعْرِضُ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ القُرْآنَ، فَإِذَا لَقِيَهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ، كَانَ أَجْوَدَ بِالخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ المُرْسَلَةِ»
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধন সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে সকলের চেয়ে দানশীল ছিলেন। রমাদানে জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর সাথে দেখা করতেন, তখন তিনি আরো অধিক দান করতেন। রমযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি রাতেই জিবরীল আলাইহিস সালাম তাঁর একবার সাক্ষাৎ করতেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরআন শোনাতেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তখন তিনি রহমত প্রেরিত বায়ূর চেয়ে অধিক ধন-সম্পদ দান করতেন। 
তাই সাওম পালনের দ্বারা সমাজের দারিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। 
প্রকৃতপক্ষে সাওম প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক জীবনসহ সর্বস্তরে অনুশীলনের দীক্ষা দিয়ে যায়। তাই আসুন, সাওমের প্রকৃত শিক্ষা ও উদ্দেশ্যের প্রতি যত্নবান হয়ে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করি, মানবিক গুণাবলিতে জীবনকে আলোকিত করি; তাহলে আমাদের সিয়াম সাধনা অর্থবহ হবে। তখন মানুষের মধ্যে গড়ে উঠবে সুমধুর সম্পর্ক, বিদায় নেবে অরাজকতা, অন্যায়-অনাচার এবং দুর্নীতি ও ভেজালমুক্ত হয়ে আদর্শ জাতি হিসেবে আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব। সাওমের মাসের পরিসমাপ্তি বয়ে আনুক সমাজ জীবনে আমূল পরিবর্তন, খোদাভীতি, আত্মসংযম ও মানবপ্রেম। সাওমের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের আলোকে যেন সারা জীবন সৎভাবে অতিবাহিত করে আল্লাহর অশেষ করুণা ও ক্ষমা লাভ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে পারি, আল্লাহ পাক আমাদের সেই তাওফিক দান করুন। আমীন।

রামাযান মাসে মুমিনের দৈনন্দিন কর্মসূচী


আল্ হামদু লিল্লাহ, ওয়াস্ সালাতু ওয়াস্ সালামু আলা রাসূলিল্লাহ, আম্মা বাদ :
রহমতের মাস, বরকতের মাস, কল্যাণের মাস, ক্ষমার মাস, কুরআনের মাস মাহে রামাযান আমাদের মাঝে উপস্থিত। এ মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা কি রামাযানের এই মহামূল্যবান সময়গুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি? আসুন না একটি তালিকা তৈরি করি যেন এই মাসের প্রতিটি মুহূর্তে নেকী কুড়িয়ে আখেরাতের জন্য সঞ্চয় করে রাখতে পারি।
ফজর পূর্বে:
১) আল্লাহর দরবারে তাওবা-ইস্তেগফার ও দুয়া: কারণ মহান আল্লাহ প্রত্যেক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করে বলেন: “কে আছে আমার কাছে দুআকারী, আমি তার দুআ কবুল করবো”। (মুসলিম)
২) সাহরী ভক্ষণ : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “সাহরী খাও। কারণ সাহরীতে বরকত আছে”। (বুখারী মুসলিম)
ফজর হওয়ার পর:
১) ফজরের সুন্নত আদায়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “ফজরের দুই রাকাআত সুন্নত দুনিয়া ও দুনিয়ার মাঝে যা আছে তার থেকে উত্তম”। (মুসলিম )
২) ইকামত পর্যন্ত দুআ ও যিকিরে মশগুল: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :”আযান ও ইকামতের মাঝে দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না”। (আহমদ, তিরমিযী, আবূ দাউদ)
৩) ফজরের নামায আদায়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :”তারা যদি ইশা ও ফজরের ফযীলত জানতো, তো হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে উপস্থিত হত”। (বুখারী ও মুসলিম)
৪) সূর্যোদয় পর্যন্ত সকালে পঠিতব্য দুআ-যিকর ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মসজিদে অবস্থান: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজর নামাযের পর নিজ স্থানেই সূর্যোদয় পর্যন্ত অবস্থান করতেন”। (মুসলিম )
৫) সূর্যোদয়েরে পর দুই রাকাআত নামায: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :”যে ব্যক্তি জামায়াতের সহিত ফজরের নামায পড়লো, অতঃপর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে আল্লাহর যাকর করলো, তারপর দুই রাকাআত নামায আদায় করলো, তার জন্য এটা একটি পূর্ণ হজ্জ ও উমরার মত “। (তিরমিযী) 
৬) নিজ নিজ কর্মে মনোযোগ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “নিজ হাতের কর্ম দ্বারা উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাবার নেই”। )বুখারী(
যহরের সময় :
১) জামায়াতের সহিত জহরের নামায আদায়। অতঃপর কিছুক্ষণ কুরআন কিংবা অন্যান্য দীনী বই পাঠ।
২) আসর পর্যন্ত বিশ্রাম, কারণ তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ( তোমার উপর তোমার শরীরেরও হক আছে)।
আসরের সময় :
১) আসরের নামায জামাতের সাথে সম্পাদন: অতঃপর ইমাম হলে নামাযীদের উদ্দেশ্যে দারস প্রদান কিংবা দারস শ্রবণ কিংবা ওয়ায নসীহতের ক্যাসেট ও সিডির মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :”যে ব্যক্তি মসজিদে ভাল কিছু শিক্ষা নিতে কিংবা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গেল, সে পূর্ণ এক হজ্জের সমান নেকী পেল”। (ত্ববারানী)
২) পরিবারের সদস্যদের সাথে ইফতারির আয়োজনে সহায়তা করা: এর মাধ্যমে যেমন কাজের চাপ হাল্কা হয় তেমন পরিবারের সাথে ভালবাসাও বৃদ্ধি পায়।
মাগরিবের সময় 
১) ইফতারি করা এবং এই দুআ পাঠ করা: “যাহাবায্ যামাউ ওয়াব্ তাল্লাতিল্ উরূকু ওয়া সাবাতাল্ আজরু ইন্ শাআল্লাহু তাআলা”। অর্থ: পিপাষা নিবারিত হল, রগ-রেশা সিক্ত হল এবং আল্লাহ চাইলে সওয়াব নির্ধারিত হল। (আবূ দাউদ)
২) মাগরিবের নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা যদিও ইফতারি পূর্ণরূপে না করা যায়। বাকি ইফতারি নামাযের পর সেরে নেওয়া মন্দ নয়। অতঃপর সন্ধ্যায় পঠিতব্য যাকর-আযকার পাঠ করে নেওয়া।
৩) স্বভাবানুযায়ী রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে একটু বিশ্রাম করে তারাবীর নামাযের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
ইশার সময় :
১) জামায়াতের সহিত ইশার নামায আদায় করা।
২) ইমামের সাথে সম্পূর্ণ তারাবীর নামায আদায় করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমান ও নেকীর আশায় রমযানে কিয়াম করবে, (তারাবীহ পড়বে ) তার বিগত সমস্ত (ছোট গুনাহ) ক্ষমা করা হবে”। (বুখারী ও মুসলিম)
৩) সম্ভব হলে বিতরের নামায শেষ রাতে পড়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :তোমরা বিতরকে রাতের শেষ নামায কর”। (মুত্তাফিকুন আলাইহ)
লেখক: আব্দুর রাকীব (মাদানী) দাঈ, দাওয়াহ সেন্টার খাফজী, সৌদী আরব।
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহিল হাদী দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদী আরব।

মঙ্গলবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৭

আজীবন রোজা!


আমরা হয়তো খেয়াল করে থাকবো! এক ইবাদতের এক স্বাদ! এক রঙ! এক রূপ! সালাতের স্বাদ এক, সিয়ামের স্বাদ আরেক। ফজর সালতের ভাব এক, তারাবীহের স্বাদ আরেক। যাকাতের পরিতৃপ্তির ধরন এক, হজ্বের পরিতৃপ্তির ধরন আরেক! 
.
সিয়াম এমন এক ইবাদত, প্রায় সব ধর্মেই এর অস্তিত্ব বিদ্যমান। ধরন-প্রকরণে পার্থক্য থাকলেও মূল পদ্ধতি প্রায় এক: উপবাসযাপন! তার মানে এটা এক সার্বজনীন ইবাদত! পার্থক্য হলো, আমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশিত পন্থায় সিয়াম পালন করি, তারা মানবনির্দেশিত পন্থায় পালন করে। আমাদের সিয়াম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, তাদেরটা হবে না। 
.
সিয়ামের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য কী? 
-এর প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা নিজ হাতে দেবেন। আর কোনও ইবাদতের ক্ষেত্রে এমনটা বলেন নি। 
قَالَ اللَّهُ: كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ، إِلاَّ الصِّيَامَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ 
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: সিয়াম ছাড়া আদমসন্তানের প্রতিটি আমলই তার নিজের জন্যে, সিয়াম আমার জন্যে, আমিই তার প্রতিদান দেবো! (বুখারী)
.
সিয়াম পালনে জাহান্নাম আমাদের থেকে এত দূরে সরে যাবে, যা আমরা কল্পনাও করতে পারবো না। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের জন্যে চমৎকার আমলটা রেখে গেছেন। আমাদের মুক্তির কথা চিন্তা করে। তিনি সিয়ামের ইবাদতটা বিভিন্নভাবে করে গেছেন। তার একটা হলো: প্রতিমাসে তিন রোজা! যাকে আইয়ামে বীজের রোজাও বলা হয়। চাঁদের ১৩-১৪-১৫তারিখের রোজা। এই দিনগুলোতে চাঁদের আলোতে রাতগুলো শাদা থাকে বলে: বীজ (শাদা) বলা হয়। নবীজি সা. বলেছেন:
مَنْ صَامَ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللهِ، بَاعَدَ اللهُ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا
আল্লাহর রাস্তায় একদিন রোজা রাখলে, আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামকে সত্তর বছরের দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যাবেন (মুসলিম)। 
হাদীসে ফি-সাবীলিল্লাহ বলা হলেও, হাদীসের ব্যাখ্যাকারগন বলেছেন: ইখলাস ও পরিপূর্ণ আনগত্যের সাথে ঘরে থেকে রোজা রাখলেও এই ফযীলত লাভ করা যাবে। জাহান্নামকে সত্তর খারীফ (শরৎ) দূরে সরিয়ে নেয়ার কথা বলে, নবীজি মূলত আমাদেরকে উৎসাহিত করেছেন। রোজার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চেয়েছেন। সামান্য পরিশ্রমেই অনেক বড় অর্জন করার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। 
.
তিনরোজা সম্পর্কে নবীজি বলে গেছেন:
أَوْصَانِي خَلِيلِي بِثَلاَثٍ لاَ أَدَعُهُنَّ حَتَّى أَمُوتَ: صَوْمِ ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَصَلاَةِ الضُّحَى، وَنَوْمٍ عَلَى وِتْرٍ
আবু হুরায়রা রা. বলেছেন: আমার হাবীব (সা.) আমাকে তিনটি বিয়য়ের ওসীয়ত করে গেছেন। আমি আমৃত্যু এগুলো ছাড়বো না:
ক: প্রতি মাসে তিনরোজা। 
খ: সালাতুত-দুহা (ইশরাকের সালাত)। 
গ: বিতির আদায় করে ঘুমানো। (মুত্তাফাক)। 
.
এই হাদীসে কোন তিনদিন নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। আরেক হাদীসে আছে:
يَا أَبَا ذَرٍّ، إِذَا صُمْتَ مِنَ الشَّهْرِ ثَلاَثَةَ أَيَّامٍ فَصُمْ ثَلاَثَ عَشْرَةَ، وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ، وَخَمْسَ عَشْرَةَ"
নবীজি সা. আবু যর রা.কে বলছেন: তুমি প্রতি মাসে রোজা রাখতে চাইলে: ১৩ ১৪ ও ১৫ পনের তারিখে রোজা রাখো! (তিরমিযী)। 
.
তিনদিন রোজা রাখার মাহাত্ম্য কী? 
مَنْ صَامَ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ ثَلاَثَةَ أَيَّامٍ فَذَلِكَ صِيَامُ الدَّهْرِ

কেউ প্রতিমাসে তিনদিন রোজা রাখার মানে, আজীবন রোজা রাখা! (তিরমিযী)
.
প্রতিমাসে তিনদিন রোজা রাখলে আজীবন রোখার হিশেবটা কিভাবে হলো? সেটা কুরআনেই বলা আছে:
مَنْ جَاءَ بِالحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا
যে একটা নেককাজ করবে, তার জন্যে দশগুণ প্রতিদান থাকবে (আনআম: ১৬০)। 
তারমানে একদিন রোজা রাখাটা দশদিন রোজা রাখার সমান। একে দশ। তিনে ত্রিশ। এভাবে প্রতিমাসে তিনদিন রাখলে, সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব লেখা হয়ে যাবে। একবার আমল করা শুরু করলে, প্রতিমাসে তিনদিন রোজা রাখা কিন্তু খুবই সহজ? কতো কতো আমল আমাদের থেকে ছুটে যায় সামথ্য না থাকার কারনে। কিন্তু তাওফীকে থাকা আমলগুলো কেন ছুটবে? আমরাও কি পারি না আবু হুরায়রা রা.-এর মতো করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে:
(لاَ أَدَعُهُنَّ حَتَّى أَمُوتَ): আমি আমৃত্যু রোজাগুলো ছাড়বো না!

শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অারাফার রোযা: জিলহজ্বের নয় তারিখে,


((আমীনুল ইসলাম আমীন))

যিলহজ্বের প্রথম দশকের অনেক ফযীলতের কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষভাবে যিলহজ্বের নয়তারিখের রোযার বিষয়ে হাদীসে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একটি হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-ﺻﻴﺎﻡ ﻳﻮﻡ ﻋﺮﻓﺔ ﺃﺣﺘﺴﺐ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻥ ﻳﻜﻔﺮ ﺍﻟﺴﻨﺔ ﺍﻟﺘﻲ

 ﻗﺒﻠﻪ ﻭﺍﻟﺴﻨﺔ ﺍﻟﺘﻲ ﺑﻌﺪﻩ .
ইয়াওমে আরাফা'র রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা আগের এক বছরের ও পরের এক বছরের গোনাহ মাফ করবেন।- সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৬২
বায়হাকী ও ইস্পাহানী এক সহীহ সনদে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, আরাফার দিন (অর্থাৎ জিলহজের নবম দিন) মর্যাদা এবং ফজিলতের ক্ষেত্রে দশ হাজার দিনের ন্যায়। সুবহানাল্লাহ -(লাওয়াক্বিহুল আনওয়ার পৃঃ ৯২) অর্থাৎ অন্যান্য মময়ে দশ হাজার দিনে রাত দিন ইবাদত করার যে পরিমাণ ছওয়াব হবে, আরাফার মাত্র এক দিনেই সে পরিমাণ ছওয়াব হবে। "আল্লাহুআকবার"
হাদীসে ‘ইয়াওমু আরাফা’র যে রোযার কথা বলা হয়েছে এর অর্থ কি? হাজীগণ যেদিন আরাফায় অবস্থান করেন সেই দিনের রোযা, না জিলহজ্বের নয় তারিখের রোযা? সঠিক ব্যাখ্যা হলো জিলহজ্বের নয় তারিখের রোযা। কারণ-
এক. এই রোযা 'আরাফা' বা 'উকুফে আরাফা'র আমল নয়; বরং ঐ তারিখের আমল। ‘ইয়াওমে আরাফা’ হচ্ছে ঐ তারিখের (নয় যিলহজ্বের) পারিভাষিক নাম। যেহেতু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান হজ্বের প্রধান রোকন উকুফে আরাফা’ নয় যিলহজ্বে আদায় করা হয় তাই এ তারিখের নাম পড়ে গেছে ‘ইয়াওমে আরাফা’। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমান নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী জিলহজ্বের নয় তারিখেই রোজা রাখবে। বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝা যেতে পারে। ‘ইয়াওমু আরফা’র মত হাদীসে আরেকটি শব্দ এসেছে ‘সওমু ইয়াওমি আশুরা’ এটি একটি ইসলামী পরিভাষা। এর দ্বারা মহররম মাসের দশ তারিখের রোযাকে বোঝানো
হয়েছে। যেমনিভাবে প্রত্যেক মুসলমান নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী দশ মহররম রোজা রাখে; সউদী অারবের দশ তারিখের প্রতি লক্ষ করে না তেমনিভাবে 'ইয়াওমু অারাফা'র ক্ষেত্রেও নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী নয় তারিখেই রোজা রাখবে;
সউদী অারবের নয় তারিখে অর্থাৎ হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে নয়।
দুই. তাকবীরে তাশরীক আরাফা বা উকূফে আরাফা’র বিশেষ আমল নয়। বরং এটি প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী যিলহজ্বের নয় তারিখ ফজর থেকে শুরু হয়ে তের তারিখ অাছরের
মধ্যবর্তী সময়ের অামল। অথচ যে দলীল দ্বারা নয় তারিখ থেকে তাকবীরে তাশরীক শুরু হওয়া প্রমাণিত তাতেও ইয়াওমে আরাফা শব্দই আছে।
দলীলের আরবী পাঠ এই-
ﻋﻦ ﻋﻠﻲ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ : ﺃﻧﻪ ﻛﺎﻥ ﻳﻜﺒﺮ ﺑﻌﺪ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﻔﺠﺮ
ﻳﻮﻡ ﻋﺮﻓﺔ، ﺇﻟﻰ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﻌﺼﺮ ﻣﻦ ﺁﺧﺮ ﺃﻳﺎﻡ ﺍﻟﺘﺸﺮﻳﻖ، ﻭﻳﻜﺒﺮ
ﺑﻌﺪ ﺍﻟﻌﺼﺮ .
(আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা,
(আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা,
হাদীস : ৪/১৯৫ হাদীস ৫৬৭৭, ৫৬৭৮ শায়খ
আওয়ামাহ তাহকীককৃত) [হাফিজ ইবনে
হাজার রহ. তাঁর আদ দিরায়া গ্রন্থে
বলেন-এর সনদ সহীহ]♦
__________________________________________
এখানে ইয়াওমে আরাফা শব্দটি কি নয় যিলহজ্ব এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় নাই? এটা কি ভুল?
সুতরাং বুঝা গেল 'ইয়াওমু অারাফা' অর্থ নয় জিলহজ্ব হওয়া একটি প্রসিদ্ধ এবং স্বীকৃত বিষয় তাই 'সওমু ইয়াওমি অারাফা' অর্থ জিলহজ্বের নয়
তারিখের রোজা হবে এটাই সঠিক কথা।
তিন. হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে একসাথে বিশ্বের সকল মুসলামের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভবও নয়। কারণ, যেদিন হাজীরা অারাফায় অবস্থান করবে দেখা যাবে বিশ্বের কোন কোন দেশে তখন রাত চলছে যেমন অামেরিকার কথাই দরুন সউদিয়ারবের দিন হলে অামেরিকার রাত তাই
তাদের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভব নয়। সুতরাং ইয়ামু অারাফা'র এমন অর্থ গ্রহণ করতে হবে যে অর্থ অনুযায়ী বিশ্বের সকল মুসলামানের পক্ষে ইয়াওমু
অারাফা'র রোযা রাখা সম্ভব হয়। অার এটা ইয়াওমু অারাফা'র অর্থ নয় জিলহজ্ব ধরলেই সম্ভব।
চার. গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা রয়েছে যে, ইয়াওমে আরাফার পরের দিনটিই ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিন। পৃথিবীর কোন অালেম বলেন নি যে, ইয়াওমে আরাফা এবং ইয়াওমুন নাহর
তথা কোরবানির দিনের মাঝে তৃতীয় কোন দিন থাকতে পারে। এখন অামাদের বাংলাদেশের কথাই দরুন, সউদী অারবের সাথে এখানকার অধিবাসীদের অারবী তারিখে সাধারণত এক দিনের ব্যবধান হয়ে থাকে। অার ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিন দশ জিলহজ্বে হওয়াটাতো নির্ধারিত। সুতরাং এই অঞ্চলের অধিবাসীরা যদি 'ইয়াওমে আরাফা'র অর্থ হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিন (যা অামাদের দেশের হিসাব
অনুযায়ি জিলহজ্বের অাট তারিখ হয়) ধরে নেয় তাহলে ইয়াওমু অারাফা এবং ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিনের মাঝে তৃতীয় অারেকটি দিন
অতিরিক্ত হয়ে যায়, যা সম্পূর্ণ উদ্ভট এবং ইজমা বিরোধী। তো এ জাতীয় বিচ্ছিন্ন চিন্তা ও বক্তব্য আরো কিছু ক্ষেত্রেও বিচ্ছিন্নতাকে অনিবার্য করে তুলবে। সুতরাং হাদীসে বর্ণিত ইয়াওমু অারাফা'র অর্থ জিলহজ্বের নয় তারিখ এটাই সঠিক কথা।
হায়! অামাদের ঐসকল ভাইয়েরা যারা মানুষদেরকে হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিন রোযা রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন তারা যদি উপরোক্ত
বিষয়গুলো নিয়ে একটু চিন্তা করতেন এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বেঁচে থাকতেন! হাদীস : ৪/১৯৫ হাদীস ৫৬৭৭, ৫৬৭৮ শায়খ আওয়ামাহ তাহকীককৃত)



শুক্রবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অারাফার রোযা: জিলহজ্বের নয় তারিখে না হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে!

Mahbubul Hasan Arife

যিলহজ্বের প্রথম দশকের অনেক ফযীলতের কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষভাবে যিলহজ্বের নয় তারিখের রোযার বিষয়ে হাদীসে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একটি হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
صيام يوم عرفة أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله والسنة التي بعده.
ইয়াওমে আরাফা'র রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা আগের এক বছরের ও পরের এক বছরের গোনাহ মাফ করবেন।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৬২
হাদীসে ‘ইয়াওমু আরাফা’র যে রোযার কথা বলা হয়েছে এর অর্থ কি? হাজীগণ যেদিন আরাফায় অবস্থান করেন সেই দিনের রোযা, না জিলহজ্বের নয় তারিখের রোযা?
সঠিক ব্যাখ্যা হলো জিলহজ্বের নয় তারিখের রোযা। কারণ-
এক.
এই রোযা 'আরাফা' বা 'উকুফে আরাফা'র আমল নয়; বরং ঐ তারিখের আমল। ‘ইয়াওমে আরাফা’ হচ্ছে ঐ তারিখের (নয় যিলহজ্বের) পারিভাষিক নাম। যেহেতু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান হজ্বের প্রধান রোকন ‘উকুফে আরাফা’ নয় যিলহজ্বে আদায় করা হয় তাই এ তারিখের নাম পড়ে গেছে ‘ইয়াওমে আরাফা’। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমান নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী জিলহজ্বের নয় তারিখেই রোজা রাখবে।

বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝা যেতে পারে। ‘ইয়াওমু আরফা’র মত হাদীসে আরেকটি শব্দ এসেছে ‘সওমু ইয়াওমি আশুরা’ এটি একটি ইসলামী পরিভাষা। এর দ্বারা মহররম মাসের দশ তারিখের রোযাকে বোঝানো হয়েছে। যেমনিভাবে প্রত্যেক মুসলমান নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী দশ মহররম রোজা রাখে; সউদী অারবের দশ তারিখের প্রতি লক্ষ করে না, তেমনিভাবে 'ইয়াওমু অারাফা'র ক্ষেত্রেও নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী নয় তারিখেই রোজা রাখবে; সউদী অারবের নয় তারিখে অর্থাৎ হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে নয়।
দুই.
তাকবীরে তাশরীক আরাফা বা উকূফে আরাফা’র বিশেষ আমল নয়। বরং এটি প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী যিলহজ্বের নয় তারিখ ফজর থেকে শুরু হয়ে তের তারিখ অাছরের মধ্যবর্তী সময়ের অামল। অথচ যে দলীল দ্বারা নয় তারিখ থেকে তাকবীরে তাশরীক শুরু হওয়া প্রমাণিত তাতেও ইয়াওমে আরাফা শব্দই আছে। 
দলীলের আরবী পাঠ এই-
عن علي رضي الله عنه : أنه كان يكبر بعد صلاة الفجر يوم عرفة، إلى صلاة العصر من آخر أيام التشريق، ويكبر بعد العصر.:
(আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৪/১৯৫ হাদীস ৫৬৭৭, ৫৬৭৮ শায়খ আওয়ামাহ তাহকীককৃত) [হাফিজ ইবনে হাজার রহ. তাঁর আদ দিরায়া গ্রন্থে বলেন-এর সনদ সহীহ]

এখানে ইয়াওমে আরাফা শব্দটি কি নয় যিলহজ্ব এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় নাই? এটা কি ভুল?
সুতরাং বুঝা গেল 'ইয়াওমু অারাফা' অর্থ নয় জিলহজ্ব হওয়া একটি প্রসিদ্ধ এবং স্বীকৃত বিষয় তাই 'সওমু ইয়াওমি অারাফা' অর্থ জিলহজ্বের নয় তারিখের রোজা হবে এটাই সঠিক কথা।
তিন.
হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে একসাথে বিশ্বের সকল মুসলামের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভবও নয়। কারণ, যেদিন হাজীরা আরাফায় অবস্থান করবে দেখা যাবে বিশ্বের কোন কোন দেশে তখন রাত চলছে যেমন আমেরিকার কথাই দরুন সউদিয়ারবের দিন হলে আমেরিকার রাত তাই তাদের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভব নয়। সুতরাং ইয়ামু অারাফা'র এমন অর্থ গ্রহণ করতে হবে যে অর্থ অনুযায়ী বিশ্বের সকল মুসলামানের পক্ষে ইয়াওমু অারাফা'র রোযা রাখা সম্ভব হয়। অার এটা ইয়াওমু অারাফা'র অর্থ নয় জিলহজ্ব ধরলেই সম্ভব।

চার.
গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা রয়েছে যে, ইয়াওমে আরাফার পরের দিনটিই ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিন। পৃথিবীর কোন অালেম বলেন নি যে, ইয়াওমে আরাফা এবং ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিনের মাঝে তৃতীয় কোন দিন থাকতে পারে। এখন অামাদের বাংলাদেশের কথাই দরুন, সউদী অারবের সাথে এখানকার অধিবাসীদের অারবী তারিখে সাধারণত এক দিনের ব্যবধান হয়ে থাকে। অার ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিন দশ জিলহজ্বে হওয়াটা তো নির্ধারিত। সুতরাং এই অঞ্চলের অধিবাসীরা যদি 'ইয়াওমে আরাফা'র অর্থ হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিন (যা অামাদের দেশের হিসাব অনুযায়ি জিলহজ্বের অাট তারিখ হয়) ধরে নেয় তাহলে ইয়াওমু অারাফা এবং ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিনের মাঝে তৃতীয় অারেকটি দিন অতিরিক্ত হয়ে যায়, যা সম্পূর্ণ উদ্ভট এবং ইজমা বিরোধী।

তো এ জাতীয় বিচ্ছিন্ন চিন্তা ও বক্তব্য আরো কিছু ক্ষেত্রেও বিচ্ছিন্নতাকে অনিবার্য করে তুলবে। সুতরাং হাদীসে বর্ণিত ইয়াওমু অারাফা'র অর্থ জিলহজ্বের নয় তারিখ এটাই সঠিক কথা।
হায়! অামাদের ঐসকল ভাইয়েরা যারা মানুষদেরকে হাজীদের আরাফায় অবস্থানের দিন রোযা রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন তারা যদি উপরোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে একটু চিন্তা করতেন এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বেঁচে থাকতেন!
মাহবুবুল হাসান আরিফী
জামিয়া ইসলামিয়া মোমেনশাহী
তারিখ ০৬/০৯/২০১৫ ইং রি-পোস্ট