চার খলীফা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
চার খলীফা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৭

১৬ হিজরি সনে ওমর রা.


১৬ হিজরি সনে ওমর রা. -এর সিরিয়া সফরকালে অন্যান্য সামরিক অফিসারদের সাথে 'বিলাল হাবশি' রা.- ও ‘জাবিয়া’ নামক স্থানে খলিফাতুল মুসলিমীনকে স্বাগত জানান এবং ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’ সফরে তিনি খলিফার সঙ্গী হন। সফরের এক পর্যায়ে একদিন খলিফা বিলালকে অনুরোধ করলেন আযান দেওয়ার জন্য। বিলাল বললেন, ‘যদিও আমি অঙ্গীকার করেছি, রাসূলুল্লাহ সা. - এর পর আর কারো জন্য আযান দিব না, তবে আজ আপনার ইচ্ছা পূরণ করবো।’ এ কথা বলে তিনি এমন হৃদয়গ্রাহী আওয়াযে আযান দিলেন যে, উপস্থিত জনতার মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিল। হযরত ওমর রা. - এত কাঁদলেন যে, তাঁর বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। হযরত আবু উবাইদা ও হযরত মুয়ায বিন জাবাল রা.- ও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। সবারই মনে তখন নবী-যুগের ছবি ভেসে উঠছিল, অন্তরে তখন এক বিশেষ অনুভূতি জেগে উঠেছিল।
:
রাসূল সা. -এর মৃত্যুর পর বিলাল রা. - মদিনা ছেড়ে দীর্ঘদিন যাবত সিরিয়ায় বসবাস করতে থাকেন। একদিন স্বপ্নে দেখলেন, রাসূল সা.- বলছেন, ‘বিলাল, এমন নিরস জীবন আর কতকাল? আমার যিয়ারতের সময় কি তোমার এখনো হয়নি?’ এ স্বপ্ন তাঁর প্রেম ও ভালোবাসার ক্ষত আবার তাজা করে দিল। তখুনি তিনি মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন এবং পবিত্র রওজা মুবারকে হাজির হয়ে জবাই করা মোরগের মত ছটফট করতে লাগলেন। 
:
রাসুলুল্লাহ সা. - এর কলিজার টুকরা হযরত হাসান ও হুসাইন রা. - কে জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকেন। তাঁরা দু’জন সে দিন সকালে ফজরের আযান দেওয়ার জন্য হযরত বিলাল রা.- অনুরোধ করেন। তাঁদের অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। সুবহে সাদিকের সময় মসজিদে নববীর ছাদে দাঁড়িয়ে তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলছিলেন, আর সে ধ্বনি মদীনার অলিতে গলিতে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরছিল। তাঁর সে আযান ধ্বনি শুনে মদীনার জনগণ তাকবীর ধ্বনি দিয়ে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলছিল।
:
তিনি যখন ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ’ বললেন, তখন মদীনার নারী-পুরুষ সকলেই অস্থিরভাবে কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে মসজিদের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। বর্ণিত আছে, এমন ভাব-বিহ্বল দৃশ্য মদীনায় আর কখনো দেখা যায়নি।
:
:
সুত্র- আরবের জনপ্রিয় ফেইসবুক পেইজ (التاريخ الاسلامي -Islamic History) হতে অনূদিত


শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

খিলাফতে রাশেদার সময়কার কথা


খিলাফতে রাশেদার সময়কার কথা। ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. তখন রাজধানী মদীনা মুনাওয়ারায় খিলাফতের মসনদে সমাসীন। শামের গভর্নর কাতিবে ওহী হযরত মু'আবিয়া রা.।
.
ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. শামের দিকে রওয়ানা হলেন। অতঃপর যখন দামেশকের নিকটবর্তী হয় গেলেন, তখন একটি আড়ম্বরপূর্ণ, অভিজাত শোভাযাত্রা দলের মাঝে হযরত মু'আবিয়া রা. এর দেখা পাওয়া গেল। ওমর রা. একটি গাধার উপর আরোহী ছিলেন, পাশেই ভিন্ন আরেকটি গাধায় আরোহী ছিলেন হযরত আব্দুর রাহমান বিন আওফ রা.। কিন্তু মু'আবিয়া রা. তা দেখতে পেলেননা, তাই তিনি উভয়কে অতিক্রম করে আগে চলে গেলেন।
.
কিছুদূর যাওয়ার পর মু'আবিয়া রা. কে বলা হল যে, আপনি খলীফাতুল মুসলিমীন ওমর রা. কে পেছনে ফেলে এসেছেন! তা শুনে তিনি পেছন ফিরে আসলেন। অতঃপর যখন ওমর রা. কে দেখতে পেলেন, নিজ বাহন থেকে অবতরণ করলেন। কিন্তু ওমর রা. তাঁকে দেখে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন! মু'আবিয়া রা. ও ওমর রা. এর বাহনজন্তুর পাশে পাশে পায়ে হেঁটে চললেন! 
.
ব্যাপারটি হযরত আব্দুর রাহমান বিন আওফ রা. এর কাছে বিব্রতকর ঠেকল। তিনি বলে উঠলেন, হে আমীরুল মু'মিনীন, আপনি তো মানুষটাকে কষ্ট দিচ্ছেন! তখন ওমর রা. মু'আবিয়া রা. এর দিকে চেহারা ফিরালেন এবং বললেন
-হে মু'আবিয়া, আপনি কি শোভাযাত্রা দলের অধিপতি?! 
- মু'আবিয়া রা. জবাব দিলেন, হ্যাঁ, হে আমীরুল মু'মিনীন! 
- ওমর রা. বললেন, কিন্তু এইসব কেনো?! 
- মু'আবিয়া রা. জবাব দিলেনঃ হে আমীরুল মু'মিনীন! আমি এমন একটি শহরে অবস্থান করি, যেখানে শত্রুপক্ষের চরদের থেকে নিরাপদ থাকা যায়না। সুতরাং তাদের জন্য সুলতানের পক্ষ থেকে এমন কিছু অতীব প্রয়োজন, যা তাদেরকে ভীতসন্ত্রস্থ করবে! এতে যদি আপনি আমায় অনুমতি প্রদান করেন, তাহলে আমি তা বলবৎ রাখব, অন্যথায় আমি তা পরিত্যাগ করব।
.
তা শুনে ওমর রা. বললেন, হে মু'আবিয়া, আল্লাহর কসম! যখনই আমার কাছে আপনার ব্যাপারে কোনো বিষয় পৌঁছে; যা আমি অপছন্দ করি এবং এক্ষেত্রে আপনাকে ভরৎসনা করতে চাই, তখনই আপনি আমায় পেষনদন্তগুলোর সন্ধিস্থলের চেয়েও আরো বেশি সংকীর্ণ স্থানে ফেলে দেন! আপনি যা বলেছেন, তা যদি সত্য হয়, তাহলে ইহা একজন বুদ্ধিমানের দৃষ্টিভঙ্গি, আর যদি সত্য না হয়, তাহলে ইহা একজন সাহিত্যিকের ধোঁকা! আমি এ ব্যাপারে আপনাকে আদেশও করবনা; নিষেধও করবনা! 
.
সূত্র-
(মুখতাসার তারীখু দিমাশক্ব_ ইবনে মানযূর রাহ., মৃত্যু ৭১১ হি.)
.
আল্লাহু আকবার! এমনই ছিলেন তাঁরা! হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ রা. এর ভাষায়- এঁরাই আসহাবে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে নির্বাচন করেছেন তাঁর রাসুলের সাহচর্যের জন্য। কারও সুন্নাহ অনুসরণ করতে হলে এঁদের সুন্নাহ- ই অনুসরণ করতে হবে। কেননা জীবিত ব্যক্তির ব্যাপারে ফিৎনার আশংকামুক্ত হওয়া যায়না। (শারহুস সুন্নাহ, ১/২১৪, সংক্ষিপ্ত)।
.
আল্লাহ রহমত বর্ষণ করুন রাসুলের মজলুম সাহাবী হযরত মু'আবিয়া রা. এর উপর। আর তার বিদ্ধেষীদের হিদায়াত দান করুন। আমীন।


বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

খলিফাতুল মুসলিমীন আবু বকর রা. এর খিলাফতকাল।

খলিফাতুল মুসলিমীন আবু বকর রা. এর খিলাফতকাল। আল্লাহর তলোয়ার খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. একে একে পারস্যের ভূমি জয় করে চলছেন। ৬৩৩ খৃষ্টাব্দে ১২ হিজরী সালে কুফুরের শক্তিশালী ঘাটি আনবারের দিকে ৯ হাজার যোদ্ধা নিয়ে রওয়ানা হলেন। যখন আনবারে পৌঁছলেন, দেখলেন আনবার অধিবসীরা শহরের বাইরে বিরাট বিরাট পরিখা খনন করে রেখেছে।
.
পারস্যের সাসানী সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল আনবারের শাসনকর্তা শেরযাদ অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। মুসলিম বাহিনীকে শায়েস্তা করার জন্য এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। পরিখার ওপার থেকেই মুসলিম বাহিনীর উপর তীর বর্ষণের নির্দেশ দিল। খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. ও শত্রুদের চোঁখ লক্ষ্য করে তীর বর্ষণের পাল্টা আদেশ করলেন। মুসলিম যোদ্ধাদের তীরের তীক্ষ্ণ ফলা শত্রুদের চোঁখকেই টার্গেট করল। মুহুর্তেই শত্রু বাহিনীর একহাজার চোঁখ উপড়ে গেল! শত্রুদের মাঝে চিৎকার আর চেঁচামেচি শুরু হল - আনবার বাসীর চোঁখ চলে গেল...আনবার বাসীর চোঁখ চলে গেল...! 
.
অবস্থা বেগতিক দেখে শেরযাদ সন্ধি করার জন্য চিঠি প্রেরণ করল। খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এমন কিছু শর্তারোপ করলেন, যা মানতে পারলনা শেরযাদ! খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. ঘুরেঘুরে পরিখার অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ স্থান সনাক্ত করলেন। মুসলিম বাহিনীকে নিজেদের বাহনজন্তু উট জবাই করে পরিখায় ফেলার আদেশ দিলেন। মুসলিম বাহিনী উটের মরদেহের উপর দিয়ে পরিখার সংকীর্ণ স্থান পার হয়ে গেলেন। শত্রুরা ভয়ে পালিয়ে আনবারের দূর্গে আশ্রয় নিয়ে নিল! 
.
উপায়ান্তর না দেখে শেরযাদ শর্তগুলো মেনে নিল! খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এর কাছে নিরাপত্তা ভিক্ষা চাইল। তিনি নিরাপত্তা দিলেন। তবে শর্ত করলেন, সে যেন কোনো ধরণের অস্ত্র, সম্পদ ব্যতিত একাকি ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেরিয়ে যায়। ঠিক তদ্রূপই শেরযাদ একাকি ঘোড়ার পিঠে চড়ে বাহমন জাদওয়াহর কাছে আশ্রয় নিল।
.
যুদ্ধটি ইতিহাসে 'আনবারের যুদ্ধ' বলে পরিচিত। তেমনি 'যা-তুল উয়ূন' বা 'চোঁখ উপড়ানোর যুদ্ধ' বলেও প্রসিদ্ধ।
.
উল্লেখ্য, আনবার তৎকালিন পারস্যের একটি অঞ্চল ছিল। বর্তমানে ইরাকের একটি প্রসিদ্ধ প্রদেশ।
.
চিন্তার বিষয়- মুসলিম যোদ্ধারা কতটুকু পারদর্শী ছিল তীরন্দাজীতে! কুফ্ফারদের রণকৌশল যেখানে শেষ হত, মুসলিম যোদ্ধাদের শুরু হত সেখান থেকে! 
.

[আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬/২৩৯] 
..................অথবা......................



বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৬

হাসান বিন আলি রা.

শায়খ আতীকুল্লাহ
তিনি তৃতীয় হিজরীতে জন্মগ্রহন করেন। নবিজী (সা.)এর খুবই প্রিয় ছিলেন। হযরত আলি (রা.)এর প্রথম সন্তান। নবিজী (সা.)এর প্রথম নাতি। 
নবিজী তার দুই কানে আযান দিয়েছেন। জন্মের সাতদিন পর আম্মাজান ফাতিমা তার মাথা মুন্ডিয়ে দিয়েছেন। নবিজীর আদেশে মুন্ডানো চুলের ওযন পরিমান রুপা সদকা করে দিয়েছেন। 
নবিজী নিজের পক্ষ থেকে একটা (বা দুইটা) দুম্বা যবেহ করে আকীকা দিয়েছেন। একই দিন খতনা করানোর আদেশও দিয়েছেন। 
.
নবিজী তার এ-নাতিটাকে এত ভালোবাসতেন, বলার নয়! বারা বিন আযেব (রা.) বর্ণনা করেছে:
-আমি দেখেছি হাসান নবিজীর কাঁধে চড়ে বসে আছে। নবিজী বলছেন: হে আল্লাহ! আমি একে ভালোবাসি, আপনিও তাকে ভালোবাসুন!
.
একদিন নবিজী নাতিকে কাঁধে চড়িয়ে হাঁটছিলেন, একলোক দেখে বললো:
-হে বালক! কতো উত্তম বাহনে চড়েছো!
নবিজী তাকে উত্তরে বললেন: আরে সে নিজেই তো কত উত্তম আরোহী!
.
একদিন মিম্বরে বসে খুতবা দিচ্ছিলেন। হাসান পাশে বসা ছিলেন। নবিজী একবার নাতির দিকে আরেকবার শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে বললেন:
-আমার এই নাতি একজন নেতা হবে। সে দু’টি মুসলিম জামাতের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা করবে!
.
হাসান রা. প্রতিদিন ঘুমের আগে সূরা কাহফ তেলাওয়াত করতেন। 
প্রতিদিন ফজর নামায পড়ার পর মসজিদে নববীতে সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে থাকতেন। তারপর ইশরাক পড়ে উম্মাহাতুল মুমিনীনের সাথে দেখা করতে যেতেন। 
তিনি সারা জীবনে পঁচিশ বার পায়ে হেঁটে হজ করেছেন। 
তিনি ছিলেন একজন সহনশীল, ধীরস্থির মেজাজের অধিকারী। উদার-মুক্তহস্ত। তিনি ফিতনা-ফাসাদ অপছন্দ করতেন। 
.
নবিজীর ইন্তেকালের পর, আবু বকর (রা.) একদিন আসর নামায পড়ে, আলি (রা.)এর সাথে কথা বলতে বলতে ফিরছিলেন। সামনেই দেখলেন হাসান (রা.) কয়েকটি ছেলের সাথে খেলা করছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে হাসানকে একেবারে কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে বললেন:
-একেবারে নবির মতো হয়েছে। আলির মতো নয়। 
হযরত আলি দৃশ্যটা দেখে হাসছিলেন। আবু বকর (রা.) হাসানকে খুবই স্নেহ করতেন। হযরত হাসানও আবু বকর (রা.)কে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। এমনকি নিজের একটা ছেলের নামও আবু বকর রেখেছিলেন। 
.
উমার (রা.) হাসান ও হুসাইন উভয়কেই বদরী সাহাবীদের মর্যাদা দিয়ে পাঁচ হাযার দিরহাম ভাতা দিতেন। তিনি নিজের সন্তানের চেয়েও হাসান-হুসাইনকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। 
.
উসমান রা.এর আমলে হাসান-হুসাইন আফ্রিকার এক অভিযানে অংশ নিয়েছেন। উসমান রা. যখন বিদ্রোহীদের হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেন, তখন হাসান রা. তরবারি উঁচিয়ে দরজায় পাহারার দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু উসমান রা. ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন, তার নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হয়ে পড়লেন। জোর-জবরদস্তি করে হাসানকে ফেরত পাঠালেন। 
.
হযরত আলি রা. এর আমলে তিনি সব সময় বাবার পাশেই থাকতেন। প্রশাসনিক কাজকর্ম শিখতেন। বাবাও ছেলেকে নানা ভাবে দীক্ষা দিতেন। 
.
আবদুল্লাহ বিন যুবায়ের বলতেন:
-হাসান বিন আলির মতো সন্তান আর কোনও মা জন্ম দিতে পারেনি। 
.
তিনি কোথাও কোনও বাড়িতে গেলে, আশেপাশের সবাই ভেঙে পড়তো তাকে দেখার জন্যে। তার জন্যে মানুষের ভালোবাসা-শ্রদ্ধা ছিল অতুলনীয়। 
.
হযরত আলির শাহাদাতের পর, মানুষজন তার হাতে বাইয়াত হন। সর্বপ্রথম বাইআত হয কায়স বিন সা‘দ বিন উবাদা। এটা ছিল ৪০ হিজরীর ঘটনা। 
.
হাসান (রা.) এর খিলাফাহ ছিল খেলাফতে রাশেদার অন্তুর্ভুক্ত। নবিজী বলেছিলেন:
-আমার পরে ত্রিশ বছর খিলাফাহ থাকবে। তারপর আসবে রাজা। 
হযরত হাসানের খিলাফতকাল ত্রিশ বছরের মধ্যেই পড়ে। তার খিলাফতকাল ছিল সাত মাস। 
.
৪১ হিজরীতে হযরত হাসান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি মু‘আবিয়া (রা.)-এর সাথে আপোষ করে ফেলবেন। তাই করেছিলেন। এতে করে বাস্তবায়িত হয়েছে নবিজীয় সেই ভবিষ্যদ্বাণী। 
.
এরপর হযরত হাসান কুফা থেকে মদীনায় চলে এলেন। সন্ধির কারণে কিছু লোক নারায হলেও, তিনি ছিলেন খুবই সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত। এমনকি জীবনে বাকি দিনগুলোতেও হযরত মুয়াবিয়ার সাথে তার সম্পর্ক ছিল খুবই আন্তরিক। বার্ষিক এক লাখ দিরহাম ভাতা পেতেন হযরত হাসান। 
.
সন্ধিচুক্তির দশ বছর পর, হযরত হাসান অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এর রোগেই তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তার মৃত্যু নিয়ে অনেক বর্ণনা আছে। তাকে বিশ খাওয়ানো হয়েছে, এ মর্মে। একটা বর্ণনায় হযরতা হাসান নিজেই বলেছেন:
= যন্ত্রণায় তার কলিজা ফেটে যাচ্ছে। তাকে বেশ কয়েকবার বিষ খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু এবার খুব শক্তিশালী বিষ খাওয়ানো হয়েছে। 
হুসাইন জিজ্ঞাসা করলেন:
-কে খাইয়েছে বিষ?
হযরত হাসান উত্তর দেননি। 
.
তাকে বিষ খাওয়ানো নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ হলো, তার স্ত্রী জা‘দা বিনতে আশ‘আস তাকে বিষ খাইয়েছেন। মুয়াবিয়া রা. এক লাখ দিরহাম দিয়েছিলেন তাকে। এবং তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হাসানকে মারতে পারলে, ইয়াযিদের সাথে তার বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। হযরত হাসানের মৃত্যুর পর জা‘দা ইয়াযিদের সাথে যোগাযোগ করলে ইয়াযিদ উত্তর দিয়েছিলো:
-আমরা তোমাকে হাসানের জন্যে পছন্দ করিনি, আমাদের জন্যে পছন্দ করবো, এটা তুমি কিভাবে ভাবতে পারলে?
.
.
আমরা এবার এ বিষয়ক বর্ণনাগুলো একটু যাচাই করে দেখি:
এক: স্ত্রীর নাম কিন্তু হযরত হাসান নিজে বলেননি। অন্যরা বলেছে। আর জা‘দা বিষয়ে যে বর্ননা আছে, সেটার সনদ দুর্বল। বিশুদ্ধ নয়। 
.
দুই: ইয়াযিদ কর্তৃক জা‘দাকে বিষ দেয়ার সংবাদ সংবলিত যে বর্ণনা আছে, সেটার সনদে একজন রাবী আছে ইয়াযিদ বিন ইয়ায। এ লোকটা চরম মিথ্যাবাদী। সুতরাং তার বর্ণনা বাতিল। 
.
তিন: সে বর্ণনায় একটা কথা এমন আছে: মুয়াবিয়া রা. সরাসরি আদেশ করেছিলেন জা‘দা-এর পিতা আশ‘আস বিন কায়সকে: তুমি তোমার মেয়েকে বলো তার স্বামীকে বিষ খাওয়াতে। 
= ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন:
-আরে আশ‘আস মারা গেছে চল্লিশ হিজরীতে। হাসানের ইন্তেকালের দশ বছর আগে। তিনি এত আগে মেয়েকে বিষ খাওয়ানোর কথা বলে যাবেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। 
আর জা‘দা টাকা বা ইয়াযিদের বৌ হওয়ার লোভে এমন ন্যাক্কারজনক কাজ করবেন, এটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ তিনি নিজেই অনেক বড় নেতার মেয়ে। তার নিজের ধন-সম্পদের কমতি ছিল না। আর হাসানের চেয়ে ইয়াযিদ কোন দিক দিয়ে ভাল? এটা বুঝি একজন স্ত্রী বুঝতে পারবে না?
এ-বর্ণনাটার বক্তব্যও যুক্তিসঙ্গত নয়। আর সনদের দুর্বলতার কথা তো আগেই বলা হলো। 
.
চার: এছাড়াও হাসানের ইন্তেকাল বিষয়ক বর্ণনাগুলোতে কিছু লোক আছে যাদের পরিচয় খুবই স্পষ্ট:
ক: আহমাদ বিন আবদুল্লাহ। এ ব্যাটা একজন স্বীকৃত শী‘আ। 
খ: ঈসা বিন মারওয়ান। এ মুহাদ্দিসপ্রবর (!!!)ও একজন রাফেযী। কাযযাব। 
গ: হাইসাম বিন আদাস। এই গুণধরও একজন কাযযাব!
.
তাহলে কি হাসানকে বিষ খাওয়ানো হয়নি? তিনি নিজেই যে বললেন?
= আমরা যদি বলি বিষ খাওয়ানো হয়েছে, তাহলে কে খাইয়েছে সেটা স্পষ্ট নয়। শুধু শুধু কেন একজন সাহাবী, একজন মহিলাকে সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে দোষারোপ করা?
= আর যদি বলি বিষ খাওয়ানো হয়নি। তাহলে হাসানের উক্তি?
সেটার সমাধান ড. আলি সাল্লাবী এভাবে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:
-আমি ডা. কামালুদ্দীন হুসাইন তাহেরর সাথে এ-ব্যাপারে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন: রক্তস্বল্পতার কারণে অনেক সময় এমন অনুভূতি হতে পারে। অন্ত্রে টিউমার হলেও এমন হতে পারে। এক প্রকার ক্যান্সারের কারণে এমনটা হয়ে থাকে। 
.
পরিশেষে বলবো:
= কী ঘটেছে সেটা আজ এতদিন পরে, নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আমরা শুধু প্রমান ও অনুমানের ভিত্তিতে কিছু কথা বলতে পারি। 
.
ও হাঁ, আরেকটা কথা রয়ে গেলো:
= হযরত হাসান সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে: তিনি অসংখ্য বিয়ে করেছিলেন। কেউ কেউ তো বলেছে তিনি কয়েকশ বিয়ে করেছেন। একদিন হযরত আলি মিম্বরে বসেই ঘোষণা দিয়েছেন:
-তোমরা আমার ছেলে হাসানের কাছে মেয়ে বিয়ে দিওনা। সে শুধু বিয়ে করে আর তালাক দেয়। 
এমনি আরও অসংখ্য বর্ণনা আছে। এগুলো যে কতোটা বানোয়াট আর ভ্রান্ত, সেটা প্রমাণের জন্যে আলাদা লেখা প্রয়োজন। 
ইনশাআল্লাহ নবিজী (সা.)এর আহলে বাইতকে শী‘আ-রাফেযীদের ভ্রান্ত ছোবল থেকে রক্ষার জন্যে, আমরা এগিয়ে আসবো। যে কোনও ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবো।
.
পাশাপাশি মহান সাহাবী মুয়াবিয়া (রা.)-এর সম্মান রক্ষায়ও আমরা প্রস্তুত থাকবো। ইনশাআল্লাহ। 
.
ফিরাকে শী‘আ!
মুর্দাবাদ! মুর্দাবাদ!
.
সিপাহে সাহাবা
যিন্দাবাদ ! যিন্দাবাদ!

বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

তাবুক যুদ্ধে হযরত ওমর (রা)

তাবুক যুদ্ধের আগে নবী (সা) জিহাদের জন্য অনুদান সংগ্রহের ঘোষনা দিলেন।
প্রত্যেকে যার- যার সামর্থ অনুযায়ী অনুদান নিয়ে এলেন। হযরত ওমর (রা) ভাবলেন, আজ আমি আবু বক্করকে হারাতে পারব। আজ না পারলে আর কোন দিন পারবনা!

তিনি নিজের সমুদয় সম্পদকে দুই ভাগ করে এক ভাগ ঘরে রেখে বাকিটা নিয়ে দরবারে-নবুওতে হাজির হলেন।
প্রশ্নটা যদি এই হত যে, ওমর তুমি কী পরিমান এনেছ? আবু বক্কর, তুমি কী পরিমান এনেছ? তা হলে নিশ্চয়ই আজ ওমর জয়ী হতেন।
আমরা যখন মসজিদ-মাদরাসার জন্য চাঁদা সংগ্রহ করি, তখন কিন্তু এভাবেই মূল্যায়ন করি যে, কে কত দিল। কে কত-কী রেখে এল, তা কিন্তু আমরা দেখি না।
কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সা) মূল্যায়ন করলেন ভিন্নভাবে। নবী (সা) জিজ্ঞেস করলেন, ওমর, ঘরে কী রেখে এসেছ?
হযরত ওমর(রা) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, সম্পদ যা ছিল, তার অর্ধেক রেখে বাকি অর্ধেক নিয়ে এসেছি।
নবী করীম (সা) বললেন, তুমি ঘরে কী রেখে এসেছ? আবুবক্কর বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, ঘরে আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি। বাকি সমস্ত সম্পদ তন্ন তন্ন করে খুজে নিয়ে এসেছি।
তাফসীরে আযীযিতে আছে, হযরত আবুবক্কর (রা)ঘরের বেড়ায় কি যেন খুঁজতে ছিলেন।
মেয়ে জিজ্ঞেস করল, আব্বাজান, আপনি কি তালাশ করছেন?
বললেন, একটি সুই রাখা ছিল, সেটি খুঁজছি।

আল্লাহর পথে দানের এই প্রতিযোগিতায়ও হযরত আবুবক্কর (রা) জয়ী হলেন। 
( সহীহ বুখারী )

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১৬

চার খলিফার প্রতি মিলাদুন্নবী পালনের নেসবত আগাগোড়া মিথ্যা ও ভিত্তিহীন হওয়ার প্রমাণ

চার খলিফার প্রতি মিলাদুন্নবী পালনের নেসবত আগাগোড়া মিথ্যা ও বানোয়াট হওয়ার প্রমাণ দেখুন!!
.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

প্রিয় মুসলিম বন্ধুরা! রেজভি তথা বেরলবি সহ বিদয়াতিদের একটি অংশ কতিপয় ভুল ও বানোয়াট রেওয়ায়েত দ্বারা বিশিষ্ট চার খলিফার প্রতি মিলাদুন্নবী পালনের মিথ্যা দাবি করে থাকে। আমরা তাদের দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হাদিসের কিতাব সমূহে সেগুলোর সূত্র বা সনদ অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কিছুই পাইনি। তাদের দেওয়া রেওয়ায়েতগুলোর সনদ তো দূরের কথা, হাদিস এবং গ্রহণযোগ্য সিরাতের কোনো কিতাবে তাদের দেওয়া রেওয়ায়েতগুলোও খুঁজে পাওয়া যায় না।
.
কিন্তু আল্লামা ইমাম সুয়ূতী, ইবনে কাছীর, ইবনে খালদূন, ইমাম হাফেজ সাখাবী ও আল্লামা ইবনে হাজার আল-হাইছামী (আলাইহিমুর রহমাহ) উনাদের প্রত্যেকের বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলাম যে, মিলাদুন্নবী নামক প্রচলিত আমলটি ৬০৪ হিজরী মুতাবেক ১২০৮ খ্রিষ্টাব্দের গোড়ার দিকেই ইরাকি বাদশাহ মুজাফফর উদ্দিনের আমলে মুসল শহরে সর্বপ্রথম উদ্ভাবিত হয়েছিল। ইতিপূর্বে এর কোনো অস্তিত্ব ছিলনা। বিস্তারিত পড়ুন!
.
প্রথমত তাদের দেওয়া রেওয়ায়েতগুলো (জাল হাদিসগুলো) নিচে উল্লেখ করছি। তারপর আমাদের জবাব নিয়ে আসা হবে। জাল হাদিস গুলো দেখুন!
.
(১) ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা)-এর নামে প্রচার করা হয় যে, তিনি নাকি বলেছেন- ﻣَﻦْ ﺍَﻧْﻔَﻖَ ﺩِﺭْﻫَﻤًﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻗِﺮﺍ ﺓَ ﻣَﻮْ ﻟِﺪِ ﺍﻟﻨَّﺒﻰُ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥ ﺭﻓﻴﻘﻲ ﻓﻰِ ﺍﻟﺠَﻨّﺔِ

অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে এক দিরহাম খরচ করবে সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে”।
.
(২) দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা)
-এর নামে প্রচার করা হয় যে, তিনি নাকি বলেছেন- ﻣَﻦْ ﻋَﻈَّﻢَ ﻣَﻮْﻟِﺪِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰُ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻓَﻘَﺪْ َﺍﺣﻴﺎ ﺍﻻﺳْﺎﻻَﻡُ

অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মান করলো, সে অবশ্যই ইসলামকে জীবিত করলো”।
.
(৩) তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান বিন আফফান (রা) -এর নামে প্রচার করা হয় যে, তিনি নাকি বলেছেন – ﻣَﻦْ ﺍَﻧْﻔَﻖَ ﺩِﺭْﻫَﻤًﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻗﺮﺃﺓ ﻣَﻮْﻟِﺪِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰُ ﺻَﻠّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢْ ﻓَﻜَﺎ ﻧَّﻤَﺎ ﺛَﻬِﻴﺪ ﻏَﺰُﻭَﺓِ ﺑَﺪَﺭ َﻭﺣُﻨَﻴْﻦُ
.
অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করার জন্য এক দিরহাম খরচ করল- সে যেন বদর ও হুনাইনের জিহাদে শরীক হলো”।
.
(৪) চুতর্থ খলিফা হযরত আলি কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু -এর নামে প্রচার করা হয় যে, তিনি নাকি বলেছেন- ﻣَﻦْ ﻋَﻈَّﻢَ ﻣَﻮْ ﻟِﺪِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰ ﺻَﻠّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَ ﺳَﻠَّﻢَ ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺳَﺒَﺒَﺎ ﻟِﻘﺮﺍ ﺗﻪ ﻻ ﻳَﺨﺮﺝ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﺍِﻻ َّﺑِﺎﻻِ ﻳْﻤَﺎﻥِ ﻭَﻳَﺪْﺧُﻞُ ﺍﻟﺠَﻨَّﻪَ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﺣِﺴَﺎﺏ

অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাকে সম্মান করবে, সে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করবে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে”।
.
(সংগৃহীত : আন-নি’মাতুল কুবরা আলাল আ’লাম, পৃষ্ঠা নং ৭-৮)।
.
√ এবার আমাদের পক্ষ থেকে উক্ত রেওয়ায়েতগুলোর ভিত্তিহীনতার প্রমাণ :
.
শুরুতে জেনে নিন যে, শরিয়তে মুহাম্মদি এর ভেতর মিলাদুন্নবী নামের কোনো আমলের অস্তিত্ব ছাহাবী, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ী উনাদের কারো যুগে ছিলনা।
.
শরিয়তে মুহাম্মদি এর ভেতর দরূদুন্নবী সর্বকালে ছিল, আছে এবং থাকবে। মিলাদুন্নবী আর দরূদুন্নবী এদুটির ভেতর আক্ষরিক এবং ব্যবহারিক দু’দিক থেকে অসম ব্যবধান রয়েছে। বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম থেকে এ বিষয়টি জেনে নেয়া যেতে পারে। কাজেই দুটিকে একাকার করে গুলিয়ে ফেলা মারাত্মক জুলুম ও অজ্ঞতার শামিল। ইতিহাস স্বাক্ষী রয়েছে যে, মিলাদুন্নবী নামের আমলটি একটি নতুন বানোয়াট আমল। যার সাথে নবী, সাহাবি, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ী এঁদের কারোই সম্পর্ক নেই।
.
খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রায় ৫৭৪ বছর পর, সাহাবাদের যুগের প্রায় ৪৯৪ বছর পর, তাবেঈনদের যুগের ৪৩৪ বছর পর, তাবে তাবেঈনদের যুগের ৩৮৪ বছর পর, ইমামে আযম আবু হানিফা রহঃ এর যুগের ৪৫৪ বছর পর, ইমাম শাফেয়ীর যুগের ৪০০ বছর পর, ইমাম মালেক এর যুগের ৪৩৫ বছর পর, ইমাম আহমদ এর যুগের ৩৬৩ বছর পর, ইমাম বুখারীর যুগের ৩৪৮ বছর পর, ইমাম মুসলিম এর ৩৪৩ বছর পর, ইমাম আবু দাউদ এর ৩২৯ বছর পর, ইমাম নাসায়ী এর ৩০১ বছর পর, ইমাম তিরমিযী এর ৩২৫ বছর পর, ইমাম ইবনে মাজা এর ২৯৫ বছর পর ইতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী ৬০৪ হিজরী মুতাবিক ১২০৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রচলিত মিলাদুন্নবী উদযাপন করার প্রথাটির আবিস্কার হয়।
.

√ এবার দেখা যাক, মিলাদী আমলটির আবিস্কার কাল সম্পর্কে মুহাদ্দেসীন ও ঐতিহাসিকদের কোনো বক্তব্য রয়েছে কিনা?
.
আলহামদুলিল্লাহ, ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ্‌! আমরা খুব মজবুতির সাথেই এমন কিছু তথ্য পেয়ে যাই যা রেজভি ও বেরলবি সহ তাবত মিলাদি বিদয়াতিদের নিকটও গ্রহণযোগ্য হবে। সংক্ষেপে নিম্নরূপ —
.
১-
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাসসির, তাফসীরে জালালাইন কিতাবের রচয়িতা আল্লামা জালালুদ্দিন আস-সুয়ূতী (রহ) [মৃত ৯১১ হিজরী] খোদ নিজেও “আল-হাভী লিল ফাতাওয়া” নামক কিতাবের অন্তর্গত ‘হুসনুল মাকছাদ ফী আমালিল মওলিদ’ নামক একটি পত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে লিখেছেন :

.ﺤﺎﻓﻆ ﺟﻼﻝ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺍﻟﺴﻴﻮﻃﻲ ﺍﻟﻤﺘﻮﻓﻰ ﺳﻨﺔ 911 ﻫـ ﻛﺘﺎﺏ ﺳﻤﺎﻩ ﺍﻟﺤﺎﻭﻯ ﻟﻠﻔﺘﺎﻭﻯ ﻓﻴﻪ ﺭﺳﺎﻟﺔ ﺳﻤﺎﻫﺎ ( ﺣﺴﻦ ﺍﻟﻤﻘﺼﺪ ﻓﻲ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ) ﻗﺎﻝ : ﻓﻘﺪ ﻭﻗﻊ ﺍﻟﺴﺆﺍﻝ ﻋﻦ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﻓﻲ ﺷﻬﺮ ﺭﺑﻴﻊ ﺍﻷﻭﻝ ﻣﺎ ﺣﻜﻤﻪ ﻣﻦ ﺣﻴﺚ ﺍﻟﺸﺮﻉ ؟ ﻭ ﻫﻞ ﻫﻮ ﻣﺤﻤﻮﺩ ﺃﻡ ﻣﺬﻣﻮﻡ ؟ ﻭ ﻫﻞ ﻳﺜﺎﺏ ﻓﺎﻋﻠﻪ ﺃﻡ ﻻ ؟ ﻭ ﺍﻟﺠﻮﺍﺏ ﻋﻨﺪﻱ : ﺃﻥ ﺃﺻﻞ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﻫﻮ ﺍﺟﺘﻤﺎﻉ ﺍﻟﻨﺎﺱ ، ﻭﻗﺮﺍﺀﺓ ﻣﺎ ﺗﻴﺴﺮ ﻣﻦ ﺍﻟﻘﺮﺀﺍﻥ ﻭ ﺭﻭﺍﻳﺔ ﺍﻷﺧﺒﺎﺭ ﺍﻟﻮﺍﺭﺩﺓ ﻓﻲ ﻣﺒﺪﺃ ﺃﻣﺮ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻭ ﻣﺎ ﻭﻗﻊ ﻓﻲ ﻣﻮﻟﺪﻩ ﻣﻦ ﺍﻵﻳﺎﺕ ﺛﻢ ﻳﻤﺪ ﻟﻬﻢ ﺳﻤﺎﻁ ﻳﺄﻛﻠﻮﻧﻪ ﻭ ﻳﻨﺼﺮﻓﻮﻥ ﻣﻦ ﻏﻴﺮ ﺯﻳﺎﺩﺓ ﻋﻠﻰ ﺫﻟﻚ ﻫﻮ ﻣﻦ ﺍﻟﺒﺪﻉ ﺍﻟﺤﺴﻨﺔ ﺍﻟﺘﻲ ﻳﺜﺎﺏ ﻋﻠﻴﻬﺎ ﺻﺎﺣﺒﻬﺎ ﻟﻤﺎ ﻓﻴﻪ ﻣﻦ ﺗﻌﻈﻴﻢ ﻗﺪﺭ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻭ ﺇﻇﻬﺎﺭ ﺍﻟﻔﺮﺡ ﻭ ﺍﻻﺳﺘﺒﺸﺎﺭ ﺑﻤﻮﻟﺪﻩ ﺍﻟﺸﺮﻳﻒ .
ﻭ ﺃﻭﻝ ﻣﻦ ﺃﺣﺪﺙ ﻓﻌﻞ ﺫﻟﻚ ﺻﺎﺣﺐ ﺇﺭﺑﻞ ﺍﻟﻤﻠﻚ ﺍﻟﻤﻈﻔﺮ ﺃﺑﻮ ﺳﻌﻴﺪ ﻛﻮﻛﺒﺮﻱ ﺑﻦ ﺯﻳﻦ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﻋﻠﻲ ﺑﻦ ﺑﻜﺘﻜﻴﻦ ﺃﺣﺪ ﺍﻟﻤﻠﻮﻙ ﺍﻷﻣﺠﺎﺩ ﻭ ﺍﻟﻜﺒﺮﺍﺀ ﺍﻷﺟﻮﺍﺩ ، ﻭ ﻛﺎﻥ ﻟﻪ ﺀﺍﺛﺎﺭ ﺣﺴﻨﺔ ، ﻭ ﻫﻮ ﺍﻟﺬﻱ ﻋﻤّﺮ ﺍﻟﺠﺎﻣﻊ ﺍﻟﻤﻈﻔﺮﻱ ﺑﺴﻔﺢ ﻗﺎﺳﻴﻮﻥ . ﺍﻧﺘﻬﻰ ﻛﻼﻣﻪ . .
অর্থাৎ …..সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী সাঃ পালনের সূচনা করেছেন তিনি ছিলেন ইরবলের বাদশাহ আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন কূকবরী ইবনে যাইনুদ্দী ইবনে বুকতকীন (মৃত ৬৩৫ হিজরী) ।তিনি অতিব প্রতাবশালী ও বড় দানবীর। তার সুন্দর সুন্দর কতেক কীর্তিও রয়েছে।
.
সুতরাং প্রমাণ হয়ে গেল, খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীকালের ইরাকি বাদশাহ মুজাফফর উদ্দিন এর পূর্বে মিলাদুন্নবী নামের কোনো আমল বিদ্যমান থাকার দাবি সঠিক নয়। কাজেই চার খলিফার নামে প্রচারিত উপরের বর্ণনাগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট, হাদিসের কোনো কিতাবেই এগুলো খুঁজে পাওয়া যায়না। তাই এগুলো দিয়ে মিলাদুন্নবী নামের নতুন উদ্ভাবিত আমলটির আত্মরক্ষা করা সম্ভব নয়।

.
√ প্রিয়পাঠক! হয়ত ভাবছেন যে, আল্লামা সুয়ূতী (রহ) এর উক্ত বক্তব্যটির সমর্থনে বিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য কোনো মুহাক্কিক সালফে-সালেহীনের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য আছে কি? .

শুনে খুব অবাক হবেন যে, একই বক্তব্য আরো অনেক মুহাক্কিক ও মুহাদ্দিসের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। তন্মধ্যে তাফসীরে ইবনে কাছীর প্রণেতা, দামেস্ক বংশোদ্ভূত আল্লামা হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ) স্বীয় রচিত ইতিহাস গ্রন্থ “আল-বাদায়া ওয়ান নিহায়া” কিতাবের ৩নং খন্ডের ১৩৬ নং পৃষ্ঠায় সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন : ﻗﺎﻝ ﺍﺑﻦ ﻛﺜﻴﺮ ﻓﻲ ﺗﺎﺭﻳﺨﻪ ﺍﻟﻤﺴﻤﻰ ﺍﻟﺒﺪﺍﻳﺔ ﻭ ﺍﻟﻨﻬﺎﻳﺔ ( 3/136 ) : ” ﻛﺎﻥ ﻳﻌﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﺍﻟﺸﺮﻳﻒ ـ ﻳﻌﻨﻲ ﺍﻟﻤﻠﻚ ﺍﻟﻤﻈﻔﺮ ـ ﻓﻲ ﺭﺑﻴﻊ ﺍﻷﻭﻝ ﻭ ﻳﺤﺘﻔﻞ ﺑﻪ ﺍﺣﺘﻔﺎﻟًﺎ ﻫﺎﺋﻠًﺎ
.
অর্থাৎ রবিউল আওয়াল মাসে বাদশাহ মুজাফফর মিলাদুন্নবীর আমল পালন করত এবং খুব আড়ম্বরপূর্ণ মাহফিল করত।
.
৩-
বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ “তারিখে ইবনু খালদূন” গ্রন্থের লেখক, বিখ্যাত ঐতিহাসিক মুসলিম স্কলার আল্লামা ইবনে খালদূন (রহ) তিনি “ওয়াফাইয়াতুল আ’ইয়ান” কিতাবের ৩নং খন্ডের ৪৪৯ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন : ﻗﺎﻝ ﺍﺑﻦ ﺧﻠﻜﺎﻥ ﻓﻲ ﻭﻓﻴﺎﺕ ﺍﻟﻌﻴﺎﻥ ( 3/449 ) ﻓﻲ ﺗﺮﺟﻤﺔ ﺍﻟﺤﺎﻓﻆ ﺍﺑﻦ ﺩﺣﻴﺔ : ” ﻛﺎﻥ ﻣﻦ ﺃﻋﻴﺎﻥ ﺍﻟﻌﻠﻤﺎﺀ ﻭ ﻣﺸﺎﻫﻴﺮ ﺍﻟﻔﻀﻼﺀ ، ﻗﺪﻡ ﻣﻦ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻓﺪﺧﻞ ﺍﻟﺸﺎﻡ ﻭﺍﻟﻌﺮﺍﻕ ، ﻭ ﺍﺟﺘﺎﺯ ﺑﺈﺭﺑﻞ ﺳﻨﺔ ﺃﺭﺑﻊ ﻭ ﺳﺘﻤﺎﺋﺔ ﻓﻮﺟﺪ ﻣﻠﻜﻬﺎ ﺍﻟﻤﻌﻈﻢ ﻣﻈﻔﺮ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺑﻦ ﺯﻳﻦ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﻳﻌﺘﻨﻲ ﺑﺎﻟﻤﻮﻟﺪ ﺍﻟﻨﺒﻮﻱ ، ﻓﻌﻤﻞ ﻟﻪ ﻛﺘﺎﺑﺎ ( ﺍﻟﺘﻨﻮﻳﺮ ﻓﻲ ﻣﻮﻟﺪ ﺍﻟﺒﺸﻴﺮ ﺍﻟﻨﺬﻳﺮ ) ، ﻭ ﻗﺮﺃﻩ ﻋﻠﻴﻪ ﻓﺄﺟﺎﺯﻩ ﺑﺄﻟﻒ ﺩﻳﻨﺎﺭ ” . ﺍﻧﺘﻬﻰ ﻛﻼﻣﻪ
.
অর্থাৎ ইবনে দিহইয়া বিখ্যাত ও নেতৃস্থানীয় বিদ্যান ব্যক্তিদের অন্যতম ছিল। তিনি মরক্কো থেকে দামেস্ক এবং ইরাকে ঢুকলেন। ৬০৪ হিজরীতে “ইরবল” নগরে এলেন। ইরবলের সম্মানিত বাদশাহ আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন কূকবরী ইবনে যাইনুদ্দীনকে মিলাদুন্নবী পালনকরা অবস্থায় পেলেন। তিনি তাকে (মিলাদি আমলের) একখানা পুস্তকও রচনা করে দেন। বাদশাহ বিনিময় হিসেবে তাকে একহাজার স্বর্ণমুদ্রা দেন।
.
৪-
বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ সাখাবী (রহ) তিনিও স্বীয় ফতুয়ার কিতাব “আল-আজবিবাতুল মারদ্বিয়্যাহ” কিতাবের ৩নং খন্ডের ১১১৬ নং পৃষ্ঠায় একই বক্তব্য পাওয়া গেছে। তিনি লিখেছেন : ﺍﻟﺤﺎﻓﻆ ﺍﻟﺴﺨﺎﻭﻱ ﻓﻲ ﻓﺘﺎﻭﻳﻪ ﻓﻲ ﺍﻻﺟﻮﺑﺔ ﺍﻟﻤﺮﺿﻴﺔ ﺝ 3 ﺹ 1116 ﻋﻦ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﻓﻘﺎﻝ ﻟﻢ ﻳﻨﻘﻞ ﻋﻦ ﺍﺣﺪ ﻣﻦ ﺍﻟﺴﻠﻒ ﺍﻟﺼﺎﻟﺢ ﻓﻲ ﺍﻟﻘﺮﻭﻥ ﺍﻟﺜﻼﺛﺔ ﺍﻟﻔﺎﺿﻠﺔ، ﻭﺇﻧﻤﺎ ﺣﺪﺙ ﺑﻌﺪ، ﺛﻢ ﻣﺎ ﺯﺍﻝ ﺃﻫﻞ ﺍﻹﺳﻼﻡ ﻣﻦ ﺳﺎﺋﺮ ﺍﻷﻗﻄﺎﺭ ﻭ ﺍﻟﻤﺪﻥ ﺍﻟﻌﻈﺎﻡ ﻳﺤﺘﻔﻠﻮﻥ ﻓﻲ ﺷﻬﺮ ﻣﻮﻟﺪﻩ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻭ ﺷﺮﻑ ﻭ ﻛﺮﻡ ﻳﻌﻤﻠﻮﻥ ﺍﻟﻮﻻﺋﻢ ﺍﻟﺒﺪﻳﻌﺔ ﺍﻟﻤﺸﺘﻤﻠﺔ ﻋﻠﻰ ﺍﻻﻣﻮﺭ ﺍﻟﺒﻬﺠﺔ ﺍﻟﺮﻓﻴﻌﺔ، ﻭﻳﺘﺼﺪﻗﻮﻥ ﻓﻲ ﻟﻴﺎﻟﻴﻪ ﺑﺄﻧﻮﺍﻉ ﺍﻟﺼﺪﻗﺎﺕ، ﻭﻳﻈﻬﺮﻭﻥ ﺍﻟﺴﺮﻭﺭ ، ﻭ ﻳﺰﻳﺪﻭﻥ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﺒﺮﺍﺕ ﺑﻞ ﻳﻌﺘﻨﻮﻥ ﺑﻘﺮﺍﺀﺓ ﻣﻮﻟﺪﻩ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢ ، ﻭﺗﻈﻬﺮ ﻋﻠﻴﻬﻢ ﻣﻦ ﺑﺮﻛﺎﺗﻪ ﻛﻞ ﻓﻀﻞ ﻋﻤﻴﻢ ﺑﺤﻴﺚ ﻛﺎﻥ ﻣﻤﺎ ﺟُﺮﺏ ﻗﺎﻟﻪ ﺍﻻﻣﺎﻡ ﺷﻤﺲ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺍﺑﻦ ﺍﻟﺠﺰﺭﻱ …
.
অর্থাৎ সালফে-সালেহীনের সর্বোত্তম তিন যুগে এর কোনো প্রমাণ নেই। নিঃসন্দেহ এটি (অনেক দিন) পরেই উদ্ভাবিত হয়েছে। কালক্রমে মুসলিম উম্মাহ এটি সর্বোপরি ও বড় বড় শহরগুলোতে নবীজির জন্মদিবসে মিলাদুন্নবীর মাহফিল করা আরম্ভ করে।
.
৫-
অনুরূপ অভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে হাজার আল-হাইছামী (রহ) এর কিতাব “আল-ফাতাওয়াল কুবরা” নামক কিতাবের ১নং খন্ডের ১৯৬ নং পৃষ্ঠায়ও। তিনি লিখেছেন : ﻗﺎﻝ ﺍﻹﻣﺎﻡ ﺍﺑﻦ ﺣﺠﺮ ﺍﻟﻌﺴﻘﻼﻧﻲ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ : ( ﺃﺻﻞ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﺑﺪﻋﺔ ﻟﻢ ﺗﻨﻘﻞ ﻋﻦ ﺃﺣﺪ ﻣﻦ ﺍﻟﺴﻠﻒ ﺍﻟﺼّﺎﻟﺢ ﻣﻦ ﺍﻟﻘﺮﻭﻥ ﺍﻟﺜﻼﺛﺔ ﻭﻟﻜﻨﻬﺎ ﻣﻊ ﺫﻟﻚ ﻗﺪ ﺍﺷﺘﻤﻠﺖ ﻋﻠﻰ ﻣﺤﺎﺳﻦ ﻭﺿﺪﻫﺎ، ﻓﻤﻦ ﺗﺤﺮﻯ ﻓﻲ ﻋﻤﻠﻬﺎ ﺍﻟﻤﺤﺎﺳﻦ، ﻭﺟﻨّﺐ ﺿﺪّﻫﺎ ﻛﺎﻥ ﺑﺪﻋﺔ ﺣﺴﻨﺔ، ﻭﺇﻻ ﻓﻼ،
.

অর্থাৎ মিলাদুন্নবী পালনের এ আমল নতুন আবিষ্কৃত। সালফে-সালেহীনের সর্বোত্তম তিন যুগে এর কোনো প্রমাণ নেই। তথাপি এতে ভাল মন্দ দুটোই রয়েছে…।
.
৬-
মিলাদীদের অন্যতম শীর্ষ নেতা মৌঃ সালামত উল্লাহ সাহেব তার “আদ্দুররুল মুনাযযাম” পুস্তকেরহ ৭২ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন: ﺍﻭﻝ ﻛﺴﻲ ﻛﻪ ﺍﺑﺘﺪﺍﺋﺲ ﺳﺎﺧﺘﻪ ﺷﻴﺦ ﻋﻤﺮ ﺑﻦ ﻣﻼ ﻣﺤﻤﺪ ﻣﻮﺻﻠﻲ ﺍﺳﺖ ﻭ ﺍﻭﻝ ﻛﺴﻴﻜﻪ ﺍﺯ ﻣﻠﻮﻙ ﺑﺎﺷﺘﻬﺎﺭﺵ ﺑﺮ ﺩﺍﺧﺘﻪ ﻣﻠﻚ ﻣﻈﻔﺮ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺍﺑﻮ ﺳﻌﻴﺪ ﻛﻮﻛﻮﺭﻱ ﺑﻦ ﺯﻳﻦ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺑﺎﺩﺷﺎﻩ ﺍﺭﺑﻞ ﺍﺳﺖ .

অর্থাৎ সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী সাঃ পালনের সূচনা করেছেন তিনি ছিলেন শেখ উমর বিন মোল্লা মুসলী (মৃত ৬৩৫ হিজরী) । আর যে বাদশাহ সর্বপ্রথম এর প্রচলন করেন তিনি হলেন মুজাফফর উদ্দিন আবু সাঈদ কুকুরী বিন যাইনুদ্দীন শাহে ইরবল।”
.

উপসংহার :
আগাগোড়া বিশ্লেষণ করে আমরা বলতে পারি যে, আল্লামা ইমাম সুয়ূতী, ইবনে কাছীর, ইবনে খালদূন, ইমাম হাফেজ সাখাবী ও আল্লামা ইবনে হাজার আল-হাইছামী (আলাইহিমুর রহমাহ) উনাদের প্রত্যেকের বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, মিলাদুন্নবী নামক প্রচলিত আমলটি ৬০৪ হিজরী মুতাবেক ১২০৮ খ্রিষ্টাব্দের গোড়ার দিকেই ইরাকি বাদশাহ মুজাফফর উদ্দিনের আমলে মুসল শহরে সর্বপ্রথম উদ্ভাবিত হয়েছিল। ইতিপূর্বে এর কোনো অস্তিত্ব ছিলনা।
.
কাজেই চার খলিফা (আবুবকর, উমর, উসমান ও আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)’র জীবনকাল যেহেতু আরো অনেক আগেই অতিবাহিত হয়ে গেছে সেহেতু বর্তমানকালের নব উদ্ভাবিত “মিলাদুন্নবী” নামক ভুঁইফোড় আমলটির সাথে উনাদের কোনো প্রকারের সম্পর্ক না থাকাই প্রমাণিত হল। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই পরিষ্কার হয়ে গেল যে, চার খলিফার সাথে সম্পর্কযুক্ত উল্লিখিত রেওয়ায়েতগুলো জাল ও ভিত্তিহীন। ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের নিকট এ সমস্ত রেওয়ায়েতগুলোর কোনো মূল্যই নেই। জ্ঞানীদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। ওয়াসসালাম।
.
লেখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

জীবন সায়াহ্নে হযরত ওমর রা. : সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী

আমর বিন মাইমুন রা. বলেন, যেদিন সকালে উমর রা. আহত হন, সেদিন সকালে আমি তার সাথে দাঁড়ানো ছিলাম। আমাদের দুজনের মাঝে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ছিলেন। আর তখন ছিল ফজরের সময়। তিনি যখন নামাযের মুহূর্তে দুই কাতারের মাঝখান দিয়ে আতিক্রম করতেন, তখন তিনি মুসল্লিদের লক্ষ করে বলতেন, তোমরা কাতার সোজা করে দাঁড়াও তখন মুসল্লিগণ ঠিকভাবে কাতার সোজা করে দাঁড়াতো, এসময় তিনি লক্ষ করতেন যে কোন কাতারে খালি জায়গা আছে কিনা। যদি তিনি কাতারে খালি জায়গা দেখতে না পেতেন তখন তিনি মুসল্লিদের সামনে গিয়ে তাকবীর বলে নামায শুরু করতেন। আর তিনি অধিকাংশ সময় ফজরের নামাযের প্রথম রাকাতে সূরা “ইউসুফ” বা সূরা “নাহল” অথবা এজাতীয় অন্য কোন দীর্ঘ সূরা পড়তেন যাতে লোকজন সবাই জা’মাতে শামিল হতে পারে। আমর বিন মাইমুন রা. বলেন সেদিন তাকবীর দিয়ে নামায শুরু করতেই আমি শুনলাম তিনি বলে উঠলেন, আমাকে কুকুরটি খেয়ে ফেললো বা মেরে ফেললো, কারণ এসময় একটি কালো নিগ্রো কাফের উমর রা.-কে দু’ধারী তরবারি দিয়ে আঘাত করে পালাতে লাগলো এবং আশে পাশে যারই পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছে তাকেই আঘাত করেছে। এভাবে সে একে একে তের জনকে আহত করল। এর মধ্যে আঘাতপ্রাপ্ত সাত জনই মারা গেলেন। এই মুহূর্তে একজন মুসলমান লক্ষ করল যে, হত্যাকারী লোকটি পলায়ন করছে, তখন তিনি কানটুপিওয়ালা একটি ভারী পোশাক তার দিকে ছুড়ে মারলেন। ফলে হত্যাকারী লোকটি মাটিতে পড়ে গেলো এবং সে বুঝতে পারল যে, সে ধরা পড়ে যাবে। তাই সে আত্মহত্যা করল। এমন অবস্থায় হযরত উমর রা. আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. এর হাত ধরে নামাযের ইমামতির জন্য তাকে সামনে বাড়িয়ে দিলেন। তখনো আমি উমর রা. এর নিকটেই ছিলাম। ফলে আমি সব কিছুই লক্ষ করছিলাম এবং আমার আশপাশে যারা ছিল তারাও তা লক্ষ্য করলো। আর যারা মসজিদের প্রান্তে ছিল তারা কিছুই বুঝতে পারছিল না। তবে তারা এটুকু বুঝতে পারল যে তারা উমর রা. এর নামাযের কিরাত শুনতে পাচ্ছেনা। তাই তারা সুবহানাল্লাহ বলে তাকবীর দিতে লাগল। কিন্তু ততক্ষণে আবদুর রহমান বিন আউফ রা. সংক্ষিপ্তভাবে নামায শেষ করে দিলেন। যারা এঘটনা বুঝতে পারেনি তারা যার যার বাড়িতে চলে গেলেন। আর তাঁর কাছে ডানে বামে যারা ছিলেন তারা নামাযের পর উমর রা. এর সামনে জমায়েত হয়ে গেলেন। তখন উমর রা. বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, তুমি দেখোতো কে আমাকে আঘাত করলো? তাই তিনি ঐ লোকটিকে দেখে এসে বললেন, মুগিরার নিগ্রো গোলামটি আপনাকে আঘাত করেছে। একথা শুনে উমর রা. বললেন সেই দক্ষ কারিগরটি নাকি? ইবনে আব্বাস রা. বললেন হ্যাঁ, সেই লোকটিই। তখন তিনি বললেন- আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন, তবে শোনো আমি তোমাদেরকে তার সাথে ভালো ব্যবহার করার আদেশ দিচ্ছি। কারণ আমাকে তার সাথে ভাল ব্যবহার করার আদেশ দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি বললেন, সমস্ত প্রসংশা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য। যিনি আমার মৃত্যু এমন একজন লোকের হাতে নির্ধারণ করেননি যে ব্যক্তি ইসলামের দাবীদার। কাফেরের হাতে মৃত্যু বরণ করা আল্লাহর পথে শাহাদত বরণের সমতুল্য। হে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস! তবে আমার একটা জিনিসের জন্য আফসোস হয়। সেটা হলো তুমি ও তোমার পিতা মদীনায় নিগ্রো গোলামদের আধিক্য পছন্দ করতো। আর তিনি একথা বলার কারণ হল সাহাবায়ে কেরামেরও মাঝে হযরত আব্বাস রা. সবচে বেশি গোলামের অধিকারী ছিলেন। ইবনে আব্বাস রা. একথা শুনে হযরত উমর রা. কে বললেন, আমি সমস্ত গোলামকে হত্যা করে দিব। কিন্তু উমর রা. বললেন, হে ইবনে আব্বাস! তুমি ভুল বললে। কারণ তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তাছাড়া তাদের মাঝে অনেকেই রয়েছে যারা তোমাদেরমত হজ্জ আদায় করে, তোমাদের কেবলার দিকে অভিমুখী হয়ে নামায আদায় করে। তাই কিভাবে তাদেরকে হত্যা করা যেতে পারে?
আমর ইবনে মাইমুন রা. বলেন, এসমস্ত আলাপ আলোচনার পর উমর রা. কে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। সাথে আমরাও তার বাড়িতে গেলাম। হযরত উমর রা. বাড়িতে গিয়ে বললেন আমার মনে হচ্ছে ইতিপূর্বে মুসলমানেরা এধরণের বিপদের সম্মুখিন হয়নি। কারণ তিনি গুরুতর আহত ছিলেন। যার কারণে সমস্ত মানুষ পেরেশান হয়ে পড়ল। তবে তাদের মধ্য হতে একজন বলল, আমার মনে হচ্ছে তার কোন বিপদ হবে না, তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। একথা শুনে অন্য একজন বলল, আমার মনে হচ্ছে আমরা তার ব্যাপারে আশঙ্কা মুক্ত নই। কিছুক্ষণ পর পান করার জন্য তার সামনে শরবত নিয়ে আসা হলো, তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার উদর থেকে বের হয়ে গেলো। আবার দুধ আনা হলো এবং তিনি তা পান করলেন তাও তার উদর থেকে বের হয়ে গেলো। ফলে লোকেরা বুঝতে পারলো তার মৃত্যু অবধারিত। আমর বিন মাইমুন রা. বলেন, অতপর আমরা কয়েকজন তার সাথে একান্তে মিলিত হলাম এবং কিছুক্ষণ তার সাথে কথা বললাম তারপর আরো কিছু মানুষ উপস্থিত হলো এবং তারা প্রশংসা করতে লাগল। তাদের মধ্যে একটি যুবক বলতে লাগলো, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কারণ আপনিতো রাসূল সা. এর সান্নিধ্য লাভ করেছেন এবং আমার জানামতে আপনি সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন। তারপর রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পর (হযরত আবু বকর রা. এন্তেকালের পর) আপনি রাষ্ট পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন। এবং ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারপর আপনি মৃত্যুর সময় আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করতে যাচ্ছেন। একথা শুনার পর তিনি বললেন, আমি আশা করছি জীবনে আমি যা করেছি তা আমার জন্য যথেষ্ট হবে। আল্লাহর কাছে আমি তারই কামনা করি। এ আলোচনা শেষ হওয়ার পর যুবকটি চলে যাচ্ছিল, ঠিক তখনি হযরত উমর রা. দেখলেন যে তার লুঙ্গিটি মাটি স্পর্শ করছে, তখন তিনি বললেন হে ভাতিজা! তুমি তোমার কাপড় টাখনুর উপরে পরিধান কর। কেননা তা তোমার কাপড়ের জন্য অধিক পরিচ্ছন্নতাকর এবং আল্লাহর তাকওয়া অর্জনের ক্ষেত্রে বড় সহায়ক। তারপর উমর রা. তার ছেলেকে বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর! তুমি দেখতো আমার কাছে মানুষের কত টাকা পাওনা আছে? তখন তিনি উপস্থিত সকলকে নিয়ে হিসাব করে দেখলেন প্রায় ছিয়াশি হাজার দিরহাম। তখন উমর রা. শুনে বললেন যদি আমার সম্পদ দ্বারা তা আদায় করা সম্ভব হয় তাহলে এই সম্পদ দ্বারাই তা আদায় করে দাও। আর যদি আমার সম্পদ এর জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে আদি ইবনুল খিয়ার গোত্রের নিকট যাবে, তারপর যদি তাদের মাল দ্বারাও আদায় করা সম্ভব না হয় তাহলে কোরাইশদের থেকে সহযোগিতা নিবে। উল্লেখিত ব্যক্তিরা ব্যতিত অন্যের নিকট চাইবে না। বরং পরবর্তীতে তুমি আমার পক্ষ থেকে তা আদায় করতে চেষ্টা করবে। আমি এটাই কামনা করি। হে আমার বৎস! এখন তুমি আয়েশা রা. এর কাছে গিয়ে বল, উমর রা. আপনার কাছে সালাম পাঠিয়েছেন। তবে তুমি আমীরুল মু’মিন বলবে না কারণ এ অবস্থায় আমি রাষ্টের দায়ীত্বের উপর বহাল থাকছিনা, কেননা আমার মৃত্যু অবধারিত। যাহোক তুমি আয়েশা রা. কে বলবে যে, উমর তার সাথীদের সাথে দাফন হওয়ার অনুমতি চাচ্ছে। এরপর তিনি আয়েশা রা. এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে সালাম জানালেন এবং তিনি ভিতরে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। তিনি ভিতরে প্রবেশ করে দেখলেন যে আয়েশা রা. বসে বসে কাঁদছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. তাকে বললেন, আমার বাবা আপনার কাছে সালাম পাঠিয়েছেন এবং এই মর্মে আবেদন করেছেন যে, তিনি তার সাথীদ্বয়ের সাথে সমাহিত হওয়ার আশা রাখছেন। একথা শুনার পর তিনি বললেন, আমি এই স্থানটি আমার জন্য নির্বাচন করে ছিলাম। কিন্তু আজ আমি তাকে আমার উপর প্রাধান্য দিলাম। তুমি নিশ্চিন্তে ফিরে যাও তার কথামত এখানেই তার সমাধি হবে। তারপর যখন তিনি আয়েশা রা. এর কাছ থেকে ফিরে এলেন, তখন বলা হল, এইতো আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এসে গেছেন। একথা শুনে তিনি বলেন আমাকে উঠিয়ে বসাও তখন একজন লোক তাকে উঠিয়ে বসালেন। তিনি বললেন কি সংবাদ হে বৎস? ইবনে উমর বললেন, হে আমীরুল মু’মিন আপনি যা কামনা করেছেন তাই হয়েছে। আপনাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন এটাই আমার নিকট সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। যখন আমার মৃত্যু হবে তখন আমাকে আয়েশা রা. এর নিকট বহন করে নিয়ে যাবে, তারপর সালাম দিয়ে বলবে- উমর আপনার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করছে। তখন যদি আমাকে অনুমতি দেয়া হয়, তাহলে আমাকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করবে। আর যদি ফিরিয়ে দেয়া হয়, তাহলে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে সাধারণ মুসলমানের কবরস্থানে আমাকে দাফন করবে। এই মুহূর্তে উম্মুল মুমিনীন হরত হাফসা রা. উপস্থিত হলেন এবং তার সাথে কয়েকজন মহিলাও এলেন। আমরা তাকে দেখার পর উঠে গেলাম এবং তিনি তার নিকট উপস্থিত হয়ে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করলেন। কিছুক্ষণ পর আবার কিছু লোক এসে অনুমতি নিয়ে তাদের ভেতরের কক্ষে প্রবেশ করলেন। এসময় আমরা ভিতরের কক্ষ থেকে কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তারপর উপস্থিত লোকেরা বলল, হে আমিরুল মুমিনীন আপনি আমাদেরকে কিছু উপদেশ দিন এবং আপনার পরবর্তী খলিফা নিযুক্ত করে যান। তিনি বললেন এদলটি যাদের ব্যাপারে রাসূল সা. সন্তুষ্ট হয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন, তাদের চেয়ে খলিফা নিযুক্তির ব্যাপারে অন্য কাউকে বেশি হকদার মনে করছিনা। তখন তিনি ছয় ব্যক্তির নাম উল্লেখ করলেন- ১. হযরত আলী রা. ২. হরত উসমান রা. ৩. হযরত যুবাইর রা. ৪. হযরত সাআদ রা. ৫. হযরত তালহা রা. ৬. হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ রা.। আর নিজের ছেলের ব্যাপারে বললেন, আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. তোমাদের সাথে উপস্থিত থাকবে, তবে এ বিষয়ে তার কোন কর্তৃত্ব থাকবে না। কারণ এটা তার জন্য সান্ত্বনা মূলক কথা ছিল। তিনি বলেন, দায়িত্ব যদি সা’আদের নিকট আসে তাহলে তো আসলোই। আর যদি না আসে তাহলে তোমাদের মধ্যে যাকে দায়িত্ব দেয়া হবে সে যেন তার সাথে পরামর্শ করে। কারণ ইতিপূর্বে আমি তার অক্ষমতা বা খেয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি। তিনি বলেন আমি আমার পরবর্তী খলিফাকে প্রাথমিক পর্যায়ের মুহাজিরের ব্যপারে ওসিয়ত করে যাচ্ছি, তিনি যেন তাদের প্রাপ্য আদায়ে সচেষ্ট থাকেন এবং তাদের সম্মান রক্ষা করেন। সাথে সাথে আমি তাকে ঐ সমস্ত আনসারদের ব্যাপারে কল্যাণের আদেশ দিচ্ছি, যারা তাদের পূর্বেই ঈমান এনেছিলো এবং হিজরতের জন্য তাদের দেশকে তৈরি করে রেখে ছিল। অর্থাৎ তাদের ভালো বিষয়গুলো কবুল করা হবে এবং তাদের ভুল ত্র“টিকে মার্জনা করা হবে। অনুরুপ আমি তাকে শহরবাসীর ব্যাপারেও কল্যাণের আদেশ দিচ্ছি, কারণ তারা হচ্ছেন ইসলামের সাহায্যকারী, ট্যাক্স আদায়কারী এবং শত্র“র অন্তর্জ্বালার কারণ। তাই তাদের অতিরিক্ত মাল যেন তাদের সন্তুষ্টি ব্যতীত গ্রহণ করা না হয়। অনুরূপ আরব-বেদুইনদের ব্যাপারেও আমি তাকে কল্যাণের আদেশ দিচ্ছি। কেননা তারা হচ্ছেন মূল আরব এবং ইসলামের খুঁটি। আর তাদের সাধারগণ যাকাতের মাল গ্রহণ করে নিজেদের দারিদ্রদের মাঝে বন্টন করে দেওয়া হবে। কারণ এক্ষেত্রে এটা তাদের প্রাপ্য এবং আমি তাকে (পরবর্তী খলীফাকে) আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্বের অসিয়ত করছি। যেন তিনি সাধারণ মুসলমানদের প্রতিশ্র“তি পূরণ করেন। আর উল্লেখিত ব্যক্তিরা ব্যতীত যারা রয়েছে প্রয়োজনে তাদের ব্যাপারে যুদ্ধ করা হবে। তবে তাদেরকে যেন তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয়া না হয়। এ অসিয়তের পর যখন তিনি মারা গেলেন, তখন আমরা তাকে নিয়ে বের হলাম এবং হাঁটতে হাঁটতে আয়েশা রা. এর ঘরের কাছে পৌঁছলাম। তখন আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. সালাম দিয়ে বললেন, উমর রা. অনুমতি চাচ্ছেন। তখন আয়েশা রা. বলেন তাকে ভিতরে নিয়ে এসো, তারপর তাকে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হল এবং তাকে তার সাথীদ্বয়ের সাথে দাফন করা হলো। তার দাফনের কাজ সম্পন্ন হলে খিলাফতের জন্য প্রস্তাবিত ব্যক্তিবর্গ সমবেত হলেন। তখন আবদুর রহমান বিন আউফ রা. বললেন, তোমরা তোমাদের বিষয়টি তিন জনের উপর ন্যস্ত কর। তখন যুবাইর রা. বললেন আমি আমার দায়িত্ব হযরত আলী রা. এর উপর ন্যস্ত করলাম। ত্বলহা রা. বললেন আমি আমার কর্তৃত্ব উসমান রা. এর উপর ন্যস্ত করলাম। সা’আদ রা. বললেন আমি আমার কর্তৃত্ব আ. রহমান বিন আউফ রা. এর উপর ন্যস্ত করলাম। তখন আবদুর রহমান বিন আউফ রা. বললেন তোমাদের মধ্যে থেকে যে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে বিরত থাকবে আমরা সম্মিলিত ভাবে তাকেই দায়িত্ব অর্পণ করবো আর আল্লাহ ও তার ইসলামের পক্ষ থেকে তার জন্য সাহায্য থাকবে এবং অবশ্যই দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে তাদের মধ্য হতে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য রাখা হবে। তখন একথা শুনেই তাদের দু’জনই চুপ হয়ে গেলেন। তাই আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. বললেন তোমরা কি খলিফা নিযুক্তির বিষয়টি আমার নিকট অর্পণ করবে? আল্লাহর কসম তোমাদের মধ্যে হতে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নির্বাচন করতে আমি কোন ত্র“টি করবো না। তারা বললেন ঠিক আছে, আমরা এতে সম্মত আছি। তখন তিনি তাদের দুজনের মধ্যে হতে একজনের হাত ধরে বললেন আমার জানামতে আপনার রয়েছে রাসূল সা. এর সাথে আত্মীয়তার বন্ধন। তাছাড়া আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন সর্বাগ্রে। আর  আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন। তাই যদি আমি আপনাকে খলিফা নিযুক্ত করি, তাহলে আপনি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। আর আমি যদি ওসমান রা. কে খলিফা নিযুক্ত করি তাহলে আপনি তার কথা শুনবেন এবং তার আনুগত্য করবেন। তারপর তিনি আপরজনের সাথে মিলিত হয়ে তাকেও একথাগুলোই বললেন। যখন তিনি তাদের উভয় থেকে প্রতিশ্র“তি নিলেন তখন তিনি বললেন হে উসমান! আপনি আপনার হাত উঠান। অর্থাৎ সবার পক্ষ থেকে আমি আপনাকে খলিফা নিযুক্ত করছি। তারপর আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করলেন এবং আলী রা. নিজে তার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলেন। আর মদীনা বাসীরা দলে দলে এসে তার হাতে বাইয়াত হতে লাগলেন।
ভাষান্তর : মাওলানা যুবাইর আহমদ
শিক্ষক, মায়নারটেক মাদরাসা।