ইসলামিক খবর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইসলামিক খবর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

পিতা মাতার নাফরমানীর পরিনতি!!

এক সাহাবীর মৃত্যু কালে মুখ দিয়ে কালেমা বের হচ্ছে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিষয়টি জানানো হলো!!!
সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরিপ আনলেন। সাহাবীর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রথম দৃষ্টিতেই ধরে ফেললেন, এ কোন পাপের অভিশাপ। কোন পাপ তার মুখকে বন্ধ করে দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে তার মাকে ডেকে পাঠালেন।
তার মা আসলে বললেন-আপনি আপনার ছেলেকে ক্ষমা করে দেন।
মা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি তাকে ক্ষমা করবনা। কারন সে আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে আমি একে আগুনে পোড়াব।
মা বললেন, এটা আমি বরদাশত করতে পারব না।
নদী কারীম (সাঃ) বললেন, আপনি যদি তাকে ক্ষমা না করেন, তাহলে সে সোজা জাহান্নামে যাবে।
মা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তাহলে আমি তাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি। মায়ের মুখ থেকে এ কথা বের হবার সাথে সাথেই দেখা গেল ছেলের মুখে কালেমা জারি হয়ে গেছে এবং সাথে সাথেই সাহাবী শেষ নিঃষ্বাস ত্যাগ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা পড়ালেন।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা আমার! আপনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েছেন। নামায পড়ে কপালে কালো দাগ পরে গেছে। রোজা রেখেছেন, যাকাত আদায় করেছেন, বায়তুল্লাহ হজ্ব করেছেন, কিন্তু আপনি মা ও বাবার সাথে নাফরমানি করেছেন-ওয়াল্লাহি আপনি জান্নাত তো দূরের কথা জান্নাতের গ্রান ও আপনি পাবেন না। সারা জীবন ইবাদত বন্দীগি করেও আপনি জাহান্নামী। ভাইও বেহনো মা আর বাবা হলো জান্নাতের আটটি দরজা আপনি ইচ্ছা হলে যে কোন একটি দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন শুধুমাএ মা বাবার ক্ষেদমত করে। তাই আসুন আজ থেকে সকলেই প্রতিজ্ঞা করি আর কখোনো মা ও বাবাকে কষ্ট দিব না। তাদের সাথে ওহ শব্দটি উচ্চারন করব না।
আল্লাহ সুবহানা ওয়া ত’আলা আমাদের সকলকে, মা ও বাবার, বেশি বেশি করে ক্ষেদমত করার তৌফিক দান করুক-আমীন!!!!

সোমবার, ২০ জুন, ২০১৬

জামিয়া দারুল উলূম হাটহাজারী’র ফতোয়াঃ ফিতরা জনপ্রতি সর্বনিম্ন- ৫৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৯৮২ টাকা।


* আটার হিসাবে ফিতরার পরিমাণ জনপ্রতি ১ কেজি ৬৩৬ গ্রাম। প্রতি কেজি আটার বাজার দর ৩৩ টাকা হারে টাকার অংকে ফিতরা’র পরিমাণ হয় ৫৩.৯৮৮ টাকা। তবে বিতরণের সুবিধার্থে ৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

* খেজুরের হিসাবে ফিতরার পরিমাণ জনপ্রতি ৩ কেজি ২৭২ গ্রাম। প্রতি কেজি মধ্যম মান খেজুরের বাজার দর ১৬০/= টাকা হারে মোট ৫২৩.৫২ টাকা জনপ্রতি ফিতরা হিসাবে সদকা করতে হবে।

* কিসমিসের হিসাবে ফিতরার পরিমাণ জনপ্রতি ৩ কেজী ২৭২ গ্রাম। প্রতি কেজি মধ্যমানের কিসমিসের বাজার দর ৩০০/= টাকা হারে মোট ৯৮১.০৬ টাকা জনপ্রতি ফিতরা হিসাবে সদকা করতে হবে।

উল্লেখ্য, উপরোক্ত বাজার দর চট্টগ্রাম শহরের বাজার দর যাচাই ও পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন এলাকায় উল্লিখিত বাজার দরে তারতম্য দেখা দিলে উপরের পরিমাণ অনুযায়ী বাজার দর সমন্বয় করে টাকা নির্ধারণ করতে হবে।


বুধবার, ১ জুন, ২০১৬

অধিক সন্তান নিন


ইহুদী সংবাদ মাধ্যম পুরো বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষতঃ মুসলিম বিশ্বের দেশসমূহে ওদের প্রচারণা বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক ও প্রতারণামূলক। ইহুদী প্রচার মাধ্যমগুলোর কারণে মুসলিম বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই জনসংখ্যা বৃদ্ধি সমস্যা নিয়ে চিন্তিত। ইহুদীরা এ বিষয়টি Population Explosion বা জনসংখ্যা বিস্ফোরণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে এবং বলা চলে তা প্রায় প্রতিষ্ঠিত করিয়েছে।
মিডিয়া এবং বিভিন্ন এনজিও মুসলিম দেশে জনসংখ্যা কমাতে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে । কিন্তু অমুসলিম দেশে যখন সন্তান জন্ম বাড়াতে পুরষ্কার ঘোষন দেয় তখন এরা চুপ থাকে! যেমন- ১.তাইওয়ানে সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করতে সুন্দর স্লোগান!http://goo.gl/npgZPX ২. সন্তান নিলেই বোনাস, ৯০ টাকায় বিশাল প্লটhttp://goo.gl/O4bc3c
আজকে ইউরোপ আমেরিকা জনসংখ্যা হ্রাসে চিন্তিত হচ্ছে। সেখানে জন্মহার কমছে।পক্ষান্তরে বয়স্কদের সংখ্যা বাড়ছে।http://goo.gl/mV52C4 । যার ফলে কর্মক্ষম লোকের সংখায় কমছে।
এই দুনিয়া মানুষ দিয়ে চলে , রোবট দিয়ে নয়। একটা দেশে যদি কর্মক্ষম লোক না-ই থাকে তাহলে সে দেশ চলবে কি করে? মানুষকেই কাজ করতে হয়। মানুষকেই দুনিয়া টিকিয়ে রাখতে হয়। তো সে দুনিয়া টিকিয়ে রাখতে যদি সন্তান জন্মদান না-ই হয়ে থাকে কিংবা কমানোর কথা বলে তাহলে দুনিয়া টিকবে কি?
চক্রান্তকারীরা মুসলিম দেশে জনসংখ্যা কমাতে বলে। অতচ এই মুসলিম দেশের জনসংখ্যা ছাড়া তাদের দেশ চলতে পারেনা। 
জনসংখ্যা দেশের বোঝা নয় , সম্পদ । যার উত্তম প্রমান এই বাংলাদেশ।

তাই কাফির-মুশরিকদের কথায় প্ররোচিত না হয়ে অধিক সংখ্যক সন্তান নিন। রিজিকের মালিক আল্লাহ পাক , অন্য কেউ নয়।

মঙ্গলবার, ৩১ মে, ২০১৬

সকাল পর্যন্ত ঘুমানো মুমিনের কাজ নয়


আল্লাহর প্রিয় বান্দা যারা জান্নাতের পথে জীবন পরিচালনা করতে চায় তারা কখনো পুরো রাত ঘুমিয়ে কাটায় না। তারা রাতের কিয়দশ ঘুমায়, আবার ঘুম থেকে উঠে মনিবের কুদরতি পায়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে।বিনয়ী হয়ে আল্লাহর দরবারে পার্থনা করে।এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবীব কে লক্ষ করে ইরশাদ করেন- " হে বস্ত্রাবৃত ব্যক্তি! রাত্রিতে দন্ডায়মান হোক কিছু অংশ বাদ দিয়ে অর্ধরাত্র অথবা তদাপেক্ষা কিছু কম।অথ...বা তার চেয়ে বেশি পরিমাণ। এবং কুরআন আবৃত্তি করুন সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্ট ভাবে।
সূরা মুযযাম্মিল:১-৪

অত্র আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাঁর রাসূলকে সারা রাত্র নামাজ আদায়ের নির্দশ প্রদান করেছেন কিছু অংশ বাদ দিয়ে। অত:পর এর ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে এখন আপনি অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম অথব্ কিছু বেশি নামাযে মশগুল থাকুন।
সুতরাং রাসূল (সা) কে যদি রাত্রি জাগরনের নির্দেশ দেয়া হয়ে থাকে তাহলে যে ব্যাক্তি আল্লাহ পাকের রেজামন্দি হাসিল করতে চায়,তাঁর কুদরতি হস্তে তৈরী জান্নাতু্ল ফিরদাউসের বাসিন্দা হতে চায় সে কখনো সকাল পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে থাকতে পারে না।নিজের স্বার্থেই বিছানা থেকে পিঠ আলাদা করে রবকে পাওয়ার প্রত্যাশায় ইবাদতে মশগুল হয়ে যাবে।
এতদসত্ত্বেও কোন ব্যক্তি যদি একটানা সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে তাকে হাদীসে শয়তানের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং চরম অশালীন শব্দ তার ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন : ইরশাদ হচ্ছে-

" ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,নবী করীম (সা) নিকট এমন ব্যাক্তির কথা উল্লেখ করা হলো যে ব্যাক্তি ভোর পর্যন্ত পুরো রাত ঘুমে কাটিয়ে দেয়। তখন রাসূল (সা) বললেন, এ লোকটি তো এমন লোক, শয়তান যার উভয় কানে প্রস্রাব করে দিয়েছে।
বুখারী: ১ম খন্ড,১৫৩ পৃ.


" জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিব, তিনি বলেন,আমি রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি, নিশ্চই রাতের মধ্য এমন একটি মুহুর্ত আছে, যে মুহুর্তে কোন মুসলিম ব্যাক্তি দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যান বিষয়ে আল্লাহর নিকট যা প্রত্যাশা করবে তাই তিনি প্রদান করবেন।আর এটা প্রত্যেক রাতেই সংঘটিত হয়।
মুসলিম: ১ম খন্ড,২৫৮ পৃ.

শুক্রবার, ১ এপ্রিল, ২০১৬

আগামী সপ্তাহে উদ্ভোধন করবেন আমেরিকার বৃহত্তম মসজিদ।


গতকাল এরোদগান আমেরিকা সফরে গেছেন। আগামী সপ্তাহে উদ্ভোধন করবেন আমেরিকার বৃহত্তম মসজিদ। মসজিদটি ওয়াশিংটন ডিসির ম্যারিলেন্ডে অবস্থিত।
.
তুরস্ক সরকারের অর্থায়নে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। দুই মিনার বিশিষ্ট ছবিটিই মূল মসজিদ এবং পার্শ্ববর্তী আরো অনেক ভবন রয়েছে যা ইসলামী কমপ্লেক্স এর আওতায়। আশা করা হচ্ছে এই মসজিদটি আমেরিকার মাটিতে ইসলাম প্রচারে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
.
মসজিদ উদ্ভোধনে বারাক ওবামা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। ওয়াশিংটন প্রবাসী সকল বাংলাদেশী মুসলমান ভাই বোনদের প্রতি আগাম দাওয়াত রইল... (ছবি এবং বর্ণনা সংগৃহিত)
.
ধীরে ধীরে সবকিছুই আমাদের অনুকূলে আসছে। এভাবে চলতে চলতে এবং আমাদের মুসলমান অধিপতিদের দূরদর্শীতায় একদিন গোটা পৃথিবীতে ক্বায়েম হবে ইমলামের ঝাণ্ডা। সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করবে সবাই। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে দ্বীন-ইসলামের জন্য কবুল করেন। আমীন


বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

ইখতেলাফী ফুরুয়ী মাসয়ালার বিভিন্ন মতের ব্যাপারে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেনঃ


“এ বিষয়ে আমাদের নীতি, আর এটাই বিশুদ্ধতম নীতি, এই যে, ইবাদতের পদ্ধতির বিষয়ে (যেসব ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে তাতে) যে পদ্ধতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য আছার রয়েছে তা মাকরূহ হবে না; বরং তা হবে শরীয়াত সম্মত। সালাতুল খওফের বিভিন্ন পদ্ধতি, আযানের দুই নিয়ম : তারজীযুক্ত বা তারজীবিহীন, ইকামতের দুই নিয়ম :বাক্যগুলো দুইবার করে বলা কিংবা একবার করে, তাশাহহুদ, ছানা, আউযু এর বিভিন্ন পাঠ, কুরআনের বিভিন্ন কিরাআত, এই সবগুলো এই নীতিরই অন্তর্ভূক্ত। এভাবে ঈদের নামাযের অতিরিক্ত তাকবীর-সংখ্যা (ছয় তাকবীর বা বারো তাকবীর), জানাযার নামাযের বিভিন্ন নিয়ম, সাহু সিজদার বিভিন্ন নিয়ম, কুনুত পাঠ, রুকুর পরে বা পূর্বে, রাব্বানালাকাল হামদ, ওয়াসহ অথবা ওয়া ছাড়া, এই সবগুলোই শরীয়াতসম্মত। কোনো পদ্ধতি কখনো উত্তম হতে পারে কিন্তু অন্যটি মাকরূহ নয়”। (মাজমূউল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ২৪/২৪২-২৪৩; আল-ফাতাওয়া আল কুবরা ১/১৪০)

ইবনুল কাইয়্যিম (রঃ) যাদুল মাআদ গ্রন্থে' ফজরের সালাতে কুনুত পড়া প্রসংগে বলেছেন:

“এটা ওইসব মতভেদের অন্তর্ভূক্ত যাতে কোনো পক্ষই নিন্দা ও ভর্ৎসনার পাত্র নন। এটা ঠিক তেমনই যেমন সালাতে রাফয়ে ইয়াদাইন করা বা না করা, তদ্রূপ আত্তাহিয়্যাতুর বিভিন্ন পাঠ, আযান-ইকামাতের বিভিন্ন ধরন, হজ্বের বিভিন্ন প্রকার - ইফরাদ, কিরান, তামাত্তু বিষয়ে মতভেদের মতোই”। (যাদুল মায়াদ, ১/২৫৬)
দেখা যাচ্ছে, এই দুই সম্মানিত ইমামের (রঃ) মতে আমাদের সমাজে বর্তমানে যে সকল ফুরুয়ী ইখতিলাফী মাসয়ালা নিয়ে প্রচুর সময় ব্যয় করা হচ্ছে, তার বেশীরভাগকেই তাঁরা মুস্তাহাব পর্যায়ের বলছেন। যেমনঃ

- রাফে ইয়াদাইন করা বা না করা।
- ইকামাতের কথাগুলো দুইবার বনাম একবার বলা।
- ঈদের নামাজের ৬ তাকবীর বনাম ১২ তাকবীর।
- সিজদা সাহুর বিভিন্ন নিয়ম।
- দুয়া কুনুত রুকুর আগে বনাম রুকুর পরে। ইত্যাদি।

অর্থাৎ এগুলো করলে কিংবা না করলে নামাজের কোন ক্ষতি হবে না। নামাজ পুরোপুরিই আদায় হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। এসব বেশীরভাগ মাসয়ালায় এক ইমামের মতে এক পদ্ধতি উত্তম এবং অন্য ইমামের মতে অপর কোন পদ্ধতি উত্তম।

একসময় আমাদের সোনালী ইতিহাস ছিল,ছিল সমৃদ্ধির ইতিহাস।কারণ,আমাদের ছিল একতা,ইখতেলাফ তথা ভিন্নমত সবসবয়ই ছিল কিন্তু এর কারণে শ্রদ্ধাবোধ কখনোই উঠে যায়নি।আজ আমরা অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে লিপ্ত যখন অনেক বড় বড় ইস্যুতে আমরা অন্ধ থাকি।

ইসলামের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আমাদের একতার শিক্ষা দেয়,শিক্ষা দেয় পারস্পরিক ভেদাভেদ ভুলে একসাথে থাকার। 
smile emoticon

বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

মুবাল্লিগ ও দায়ী’র অপরিহার্য গুণাবলি ॥ হাফেজ মাওলানা আবদুস সাত্তার আইনী


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের প্রতি আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করবে উত্তম পন্থায়।’ [সুরা নাহ্ল : আয়াত ১২৫] নবী ও রাসুলগণের প্রধান কার্যাবলি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘(নবী ও রাসুল) তাঁর আয়াতসমূহ তাদের কাছে তেলাওয়াত করে, তাদেরকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিা দেয়।’ [সুরা আলে ইমরান : আয়াত ১৬৪]
পবিত্র কুরআন যেমন আহকাম ও শরিয়তের কিতাব তেমনি তা দাওয়াত ও হেদায়েতেরও কিতাব। দাওয়াত ও হেদায়েতের কথাই কুরআনে বেশি বলা হয়েছে। কারণ, ঈমাদের ভিত্তি হেদায়েতের ওপর প্রতিষ্ঠিত; আর ঈমান অর্জন বা গ্রহণ দাওয়াতের ওপর নির্ভরশীল। যাঁরা দওয়াত দেন তাদের জন্য কুরআন বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। দায়ী’ ও মুবাল্লিগের জন্য কুরআন বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি নির্দেশ করেছে।
১। ইলম ও হেকমত : নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) কাজ ছিলো কিতাবের জ্ঞান ও হিকমত শিা দেয়া। হিকমত শব্দের অর্থ হলো যাবতীয় বিষয়বস্তুকে যথার্থ জ্ঞান দ্বারা জানা। নবীগণ ওহির মাধ্যমে জ্ঞানপ্রাপ্ত হতেন। স্বয়ং আল্লাহ তআলাই তাঁদের শিক। তাই নবী সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ে ছিলেন চূড়ান্ত পর্যায়ের জ্ঞানী। তাঁদের জ্ঞান ছিলো যথার্থ ও পরিপূর্ণ। আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহির মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ে সত্যজ্ঞান লাভ করেছেন এবং সাহাবাগণকে শিাদান করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাহাবাগণ জ্ঞান ও হিকমত অর্জন করেছেন এবং পরবর্তী যুগের মানুষদেরকে শিাদান করেছেন। এভাবে এই ধারা অব্যাহত থেকেছে। সুতরাং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান একজন মুবাল্লিগ ও দায়ী’র প্রধান ও অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মূলত প্রজ্ঞাবান আলেম ও ইসলামি জ্ঞানে যথার্থ জ্ঞানীদের মাধ্যমেই দাওয়াত ও তাবলিগের কর্মধারা চলমান রয়েছে। উপমহাদেশে যাঁরা দাওয়াত ও তাবলিগের বর্তমান পদ্ধতির সূচনা করেছেন তাঁরাও ছিলেন মহান আলেমে দীন ও কুরআন-হাদিসের েেত্র অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁরা সাধারণ জনম-লীর মধ্যে সত্য ও শুদ্ধ জ্ঞানের আলো বিকশিত করার চেষ্টা করেছেন; জনগণের প থেকে যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে সেগুলোর জবাব দিয়েছেন কুরআন ও হাদিসের আলোকে এবং প্রজ্ঞা ও পরিমিতিবোধের সঙ্গে। সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহর বিষয়ে জ্ঞানের স্বল্পতা বা অপূর্ণাঙ্গ জ্ঞান দাওয়াত ও তাবলিগের েেত্র বিভ্রান্তি ও সঙ্কটের সৃষ্টি করতে পারে। প্রত্যেক দায়ী’ ও মুবাল্লিগই একজন শিক। শিককে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানী হতে হয়।
২। উত্তম চরিত্র : রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ [মুয়াত্তা, ইমাম মালেক : হাদিস ২৬৫৫] তিনি আরো বলেছেন, ‘ঈমানের দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’ [জামিউল আহাদিস, জালালুদ্দিন সুয়ুতি : হাদিস ৪৩৭৯] সবার জানা বিষয় যে, হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বোচ্চ সৎ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আপনি মহান চরিত্রের ধারক।’ [সুরা ক্বলাম : আয়াত ৪] তাঁর চরিত্রমাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে অসংখ্য অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছেন। পরবর্তী যুগে মুসলমানগণ তাঁদের চারিত্রিক গুণাবলির মাধ্যমে অমুসলিমদের আকর্ষণ করেছেন এবং তাঁদের হৃদয়ে ঈমানের শিখা প্রজ্জ্বলিত করেছেন। যাঁরা দায়ী’ ও মুবাল্লিগ, যাঁরা সাধারণ জনম-লী ও অমুসলিমদের মধ্যে ঈমান ও ইসলামের আলো জ্বালিয়ে দিতে চান তাঁদেরকে অবশ্যই উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। তাঁদের আচার-ব্যবহার হবে মাধুর্যপূর্ণ, লেনদেন হবে পরিষ্কার ও ইনসাফপূর্ণ, কথাবার্তা হবে শালীন ও চিত্তাকর্ষক। তাঁরা এমন কোনো কাজ করবেন না বা এমন কোনো কর্মকা-ে নিযুক্ত হবে না, যা অন্যদের বিরক্তি ও ােভের সৃষ্টি করে এবং তাঁদের সম্পর্কে সমালোচনা করতে অন্যদের সুযোগ করে দেয়। পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ববোধ ও আত্মমর্যাদাশীলতাও উত্তম চরিত্রের অংশ।
৩। ধৈর্য ও স্থিরচিত্ততা : পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘সুতরাং তারা যা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ করো এবং তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করো।’ [সুরা ক্বাফ : আয়াত ৩৯] ধৈর্য ও স্থিরচিত্ততা ছাড়া যেমন কোনো কাজেই সফলতা অর্জন করা যায় না, তেমনি ধৈর্য না থাকলে অনেক পাপকাজ থেকেও বিরত থাকা যায় না। ধৈর্য ও স্থিরচিত্ততা এমন একটি গুণ যা ছাড়া দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ কোনোভাবেই সুচারুরূপে আঞ্জাম দেয়া সম্ভব নয়। রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর গোটা জীবনভর ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। তবে ধৈর্যের অর্থ এই নয় যে, সব অন্যায় সহ্য করে নেয়া হবে এবং যে যা-ই বলুক মুখ বুজে মেনে নেয়া হবে। যদি তর্কের প্রয়োজন হয় তবে উত্তম পন্থায় (মৌখিক বা লিখিত) তর্ক করতে হবে, অন্যথায় কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যে-ব্যবস্থা প্রয়োজন ও সময়োপযোগী তা গ্রহণ করতে হবে।
৪। নিজে না করে অন্যকে বলা : পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, আর নিজেদেরকে ভুলে যাও! অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন করো। তবে কি তোমরা বুঝো না?’ [সুরা বাকারা : আয়াত ৪৪] কোন কাজ নিজে না করে অন্যকে তার নির্দেশ দেয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে কখনোই এমনটি করেন নি। এমনকি সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও এমন কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, তাঁরা নিজেরা করেন নি অথচ অন্যদের তা করতে নির্দেশ দিয়েছেন অথবা নিজেরা করেছেন অথচ অন্যদেরকে তা করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। এেেত্র দায়ী’ ও মুবাল্লিগণকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামকে অনুসরণ করাই হবে যথার্থ। বর্তমান যুগে বিভিন্ন কারণে অনৈতিক সামাজিক কর্মকা-, সুদি কার্যক্রম ও সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, ইসলামের নীতিবিরুদ্ধ সংগঠন ও কার্যকলাপ ইত্যাদরি সঙ্গে জড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকতা থেকে অবশ্যই আমাদের নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। আমরা নিজেরা অনৈতিক ও অনৈসলামিক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িয়ে থেকে অন্যদেরকে যত উপদেশই দিই না কেনো তা কোনো কাজে আসবে না।
৫। আত্মতুষ্টি ও আত্মম্ভরিতা : মানুষের আর যত গুণই থাকুক না কেনো, আত্মতুষ্টি ও আত্মম্ভরিতাই একজন মানুষকে ইহকালে ও পরকালে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। এই ব্যাধির কারণেই মানুষ অন্যকে ছোট করে দেখে, তাদের বদনাম করে, পরচর্চায় লিপ্ত হয়। মাওলানা তারিক জামিল বলেছেন, ‘পরচর্চা-পরনিন্দার মতো আমল ধ্বংসকারী আর কিছু নেই। যবানের অসংযত ব্যবহারই এর জন্য দায়ী। সৎলোকেরাও এই পাপ থেকে বাঁচতে পারেন না। হামলা করার জন্য শয়তানের কাছে বিভিন্ন অস্ত্র রয়েছে। একটি নয়, অনেকগুলো অস্ত্রে সে সজ্জিত। সৎলোকদের ঘায়েল করার হাতিয়ার হলো পরচর্চা ও পরনিন্দা। শয়তান তাঁদের কাছে পরচর্চাকে সুন্দররূপে পরিবেশন করে। তাঁরা নিজেদের সততা ও কামিয়াবি বড় চোখে দেখতে পান। অন্যদের তুচ্ছ ভাবতে প্রয়াস পান। তখন তাঁরা পরচর্চায় লিপ্ত হন এবং নিজেদের আমল বরবাদ করেন।’ [দেখুন : খাওয়াতিন কে লিয়ে ইসলাহি ও তারবিয়তি বায়ানাত, ২০১০, ফরিদ বুক ডিপো, নিউ দিল্লি]
আমাদের সকল কাজ মানুষের কল্যাণের জন্য হোক এবং তা আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন সৌভাগ্যের দলিল হোক—আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করি।

মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

মুশরিকদের ইবাদাত এবং ইবাদাত কেন্দ্রিক উৎসবের বৈশিষ্ট্য হল


মুশরিকদের ইবাদাত এবং ইবাদাত কেন্দ্রিক উৎসবের বৈশিষ্ট্য হল আচার-সর্বস্বতা। হঠাৎ ঢুকে পরা কোন দর্শকের পক্ষে বিয়ের অনুষ্ঠান আর নবরাত্রির অনুষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন। রোমানদের স্যাটারনেলিয়া আর কোলোসিয়াম কেন্দ্রিক মদ-মাংসের উৎসবের মধ্যেও নিরপেক্ষ ও অনভিজ্ঞ দর্শকের পক্ষে পার্থক্য করা কঠিন। শিরককে কেন্দ্র করা গড়ে ওঠা সব রিচুয়ালের মধ্যেই এটা কমন। মূল উদ্দেশ্য কি, মূল অন্তর্নিহিত শিক্ষা কি, আত্মার খোরাক কি - তা খুঁজে পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, উল্লাস, উত্তেজনার একটা মিশেল। কারণ যেখানে একমাত্র স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের ইচ্ছে নেই, সেখানে সৃষ্টির আনন্দ, ক্ষণিকের উত্তেজনাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। কাল মজার, কিন্তু ব্যাপকভাবে অ্যাপ্রোপ্রিয়েট কিছু লাইন পড়লাম। ২৬শে, ২১শে, ১৪ই কিংবা ১৬- সবই বাংলাদেশে এখন ভ্যালেন্টাইন। যখন মূল আদর্শের জায়গাতেই সমস্যা, তখন ঐ আদর্শকে ঘিরে গড়ে ওঠা অনুষ্ঠানের সস্তা “কাছে আসার গল্পে” পরিণত হওয়াটাই স্বাভাবিক। গ্রীক-রোমান-আর্য, কোন মুশরিক সভ্যতাই এ অমোঘ নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে নি। 
.
.
প্রতিবছর ধুমধাম করে জাতীয় দিবসগুলো পালিত হচ্ছে। চলছে ব্যাপক কাভারেজ, ফ্রি-কনসার্ট, স্পেশাল অফার –ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এ দিবসগুলো যে আচার সর্বস্বতা এবং মেইক-শিফট ভ্যালেন্টাইনে পরিণত হয়েছে এর প্রমাণ হল, দিবসগুলোর পেছনে যে আদর্শগুলো ছিল সেগুলোর কোন প্রকাশ ঘটছে না। যদি ভাষা নিয়ে আসলেই মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বাড়তো তবে তো হিন্দির দৌরাত্ব্য কমার কথা। কিন্তু বিয়ে, জন্মদিন, বিজয় দিবস, পহেল বৈশাখ, পারলে মিলাদ-মাহফিল আর কুলখানিতেও এখন লোকজন হিন্দি গান বাজায়। উৎসব পালিত হচ্ছে, প্রতি বছর উৎসবের আকার বাড়ছে, কিন্তু আদর্শের কি খবর?
.
.
৭১ সালে যে মুক্তিযুদ্ধ হয় তা কি আদর্শিক যুদ্ধ ছিল নাকি আত্ম্রক্ষার (Self Preservation) এ নিয়ে আমি সবসময়ই সন্দিহান ছিলাম। তার বেশ কিছু কারণ আছে। প্রথমত, যুদ্ধটি যদি আদর্শিক হয় তাহলে কেন ২৫ মার্চের ম্যাসাকারের আগে ঘোষণা আসলো না? কেন তার আগে ইউনিল্যাটেরাল ডিক্লারেইশান হল না? ২৬ শে মার্চের ঘোষণা কি সরাসরি রক্তাক্ত ২৫ মার্চের রিয়্যাকশান ছিল না? আরও আগেই কি যুদ্ধ শুরু করা যেত না? ২৬ শে মার্চের আগে এবং পরে পার্থক্য তো শুধু ২৫ শে মার্চের রাতটাই। 
.
দ্বিতীয়ত, যদি এটা আদর্শিক যুদ্ধ হয়ে থাকে তবে আদর্শটা ঠিক কি ছিল এটা নিয়ে কেন ৪৫ বছর পরও জাতি একমত হতে পারছে না? এটা কিভাবে হতে পারে যে ঘটনাটাকে এ ভূখন্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে ধরে নেওয়া হয়, সেটার ইতিহাস এবং আদর্শ কি ছিল তা নিয়ে জাতি একমত হতে পারছে না? 
.
তৃতীয়ত, যদি আদর্শের কারণে আমাদের এই যুদ্ধ হয়ে থাকে, এবং এই আদর্শের আলোয় আমাদের উচিত নিজেদের জীবনকে সাজানো, তখন প্রশ্ন হল একজন মানুষ হিসেবে আমার দৈনন্দিন জীবনে, ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে এই আদর্শ আমাকে কিরকম নির্দেশনা দিচ্ছে? আদৌ কি কিছু দিচ্ছে? 
.
চতুর্থত, সকল আদর্শের বৈশিষ্ট্য হল তা কোন নির্দিষ্ট স্থান-কাল-পাত্র দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে না। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য থাকতে পারে কিন্তু আদর্শ – আইডিওলজির ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য না। প্রশ্ন হল, যদি মুক্তিকামীতা, শাসকের বিরুদ্ধে শোষিতের সংগ্রাম ইত্যাদি সত্যিই আমাদের আদর্শ হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের কাজে এর প্রতিফলন থাকার কথা। যারা আমদের মতো একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, আমাদের তো তাদের সাহায্য করার কথা – কোন রাজনৈতিক বা স্ট্র্যাটিজিক অবস্থান থেকে না, আদর্শের জায়গা থেকে। কিন্তু কাশ্মীর, আরাকান কিংবা সেভেন সিস্টার্সের মুক্তিকামী জনগণের জন্য রাষ্ট্র বা জাতি হিসেবে আমরা কি করেছি? বরং আমরা শোষিতের বিরুদ্ধে শাসকের পক্ষে নিয়েছি। তার উপর আছে বিশ্ব জমিদারদের পেটোয়া বাহিনী জাতিসংঘের অশান্তি বাহিনীর হয়ে আমাদের উজ্জ্বল ভূমিকা। এখানে আদর্শ কোথায়?
.
.
এসব কিছুর পাশপাশি আর একটি বিষয় আমার কাছে খুব প্রবলেম্যাটিক মনে হয়েছে। আচ্ছা আমি ধরে নিলাম এ পুরো ব্যাপারটাই আদর্শিক, কিন্তু এটা তো মেনে নিতে হবে, এই আদর্শ সম্পর্কে একেক পক্ষ একেক রকম ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ এবং বক্তব্য দেয়। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সঠিক পাঠের জন্য আমার রেফারেন্স কি হবে? আছে কি কোন কিতাব বা নির্ভরযোগ্য সূত্র? নেই। ফলাফল হল আমরা মুখস্থ কিছু বুলি শিখি, কোন কোন তারিখে পাঞ্জাবী পরে সেজে-গুজে বের হতে হবে তা শিখি, কিছু মূর্তির সামনে বেদিতে ফুল দিতে শিখি, টিভি ক্যামেরার সামনে আমতা আমতা করে কি বলতে হবে তা শিখি – কিন্তু কোন আদর্শ শিখি না। তাই ঘুরে ফিরে চলে যাই হিন্দি গানের সুরে সুরে কাছে আসার গল্পে, সব কিছু গিয়ে শেষমেশ পর্যবসিত হয় ভ্যালেন্টাইনে। ইজিপশিয়ান টেম্পল রিচুয়াল, গ্রেকো-রোমান স্যাটারনেলিয়া আর ডাইনাইসিসের অরজি, আর ড্রুইডদের “ওয়েইক” - সব তো ঘুরে ফিরে একই কাহিনী। এখানে বিশ্বাসের জায়গাটা কোথায়? আত্মার খোরাক কোথায়?
.
.
ইবন তাইমিয়্যাকে দেখা যেত প্রতিদিন সকালে ফযরের সালাতের পর লোকালয় থেকে দূরে গিয়ে, একাকী খোলা মাঠ বা প্রান্তরের ধারে বসে থাকতে। লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করতো আপনি কি করেন এভাবে? ইবন তাইমিয়্যাহ জাবাব দিতেন - আমি আমার রব্বকে স্মরণ করি, এটা আমার সারা দিনের খোরাক, যদি আমি এটা না করি আমি সারা দিন দুর্বল অনুভব করবো। তিনি লিখেছেন, যখন ক্বুর’আনের কোন আয়াতের ব্যাখ্যা, কিংবা ফিকহের কোন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর খুজে পেতেন না তিনি হাজার বারের বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তেন, আল্লাহ আর-রাহমানের-র কাছে ক্ষমা চাইতেন, তারপর নির্জনে গিয়ে আল্লাহ-র উদ্দেশ্য সিজদায় অবনত হতেন, বলতেন – হে ইব্রাহীমের শিক্ষক, আপনি আমাকে শিক্ষা দিন। এ বোধ কি শুধু ইবন তাইমিয়্যাহর মধ্যে ছিল ? বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের মুসলিমদের মধ্যে এ বোধ কাজ করেছে। অন্তরের প্রকৃত শান্তি তো একমাত্র আল্লাহ্‌ ‘আযযা ওয়া জালের আনুগত্য তাঁর নিকটবর্তী হবার চেষ্টার মাধ্যমেই আসে। 
.
.
একথা সত্য বর্তমানে ঈদের দুটি দিনও আমাদের সমাজের একটা ব্যাপক অংশের কাছেই আচার-সর্বস্বতার দিকে চলে গেছে, কিন্তু সেটা হয়েছে ইসলামের দিকে থেকে সরে জাহেলিয়্যাতের দিকে যাবার কারণেই। ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে আল হাজর আল-আসওয়াদ ছিল দুধের চেয়েও সাদা। কিন্তু বানী আদমের পাপের কারণে তার রঙ কালোতে পরিণত হয়। জান্নাত থেকে প্রেরিত পাথরের যদি এ অবস্থা হয়, তবে কুফর এবং জাহেলিয়্যাতের সিস্টেমের অধীনে বেশিদিন থাকার কারণে দুর্বল মানুষের মধ্যে এরকম বিচ্যুতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। তারপরও এখনো কি আমাদের মাঝে এমন বান্দারা নেই, যারা দুনিয়ার বিচারে একেবার শোচনীয় অবস্থায় থেকেও কোটিপতির চেয়ে বেশি সন্তুষ্ট ও প্রশান্ত অন্তরের অধিকারী? এরকম এক উৎসবের দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা, ফুল দিয়ে, ছবি তুলে, ঘুরে-ফিরে, “কাছে গিয়ে”, বাসায় ফিরবার পর সত্যিকার ভাবে আত্মিক অবস্থাটা কেমন থাকে? খুব সতেজ লাগে? গভীর কোন আবেগ কাজ করে? নিজের অস্তিত্ব নিয়ে, বিশ্ব জগত নিয়ে কোন উপলব্ধি কাজ করে? 
.
.
তাহলে কেন আমরা আদর্শ হিসেবে আমি এমন কিছু গ্রহণ করবো যার কোন নির্দিষ্ট উৎস নেই, নির্দিষ্ট পাঠ নেই, যার আদর্শিক ভিত্তি সংশয়পূর্ন আর যে আদর্শ আমাকে নির্দেশনা দিতে পারছে না, ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা সামাজিক পরিসরে? যে আদর্শের সর্বসাকুল্যে কৃতিত্ব হল কিছু দিবস পালন, কিছু আগাছা প্রকৃতির লোকের জীবিকা অর্জনের উপলক্ষ হওয়া, কিছু ফিল্টার আর কিছু ফ্যাসিযমের খোরাক হওয়া? যে আদর্শের একমাত্র প্রকাশভঙ্গি হল মূর্তির সামনে কিছুক্ষন দাড়ানো, ফুল দেওয়া আর তারপর কাছে আসার গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েযে পরিণত হওয়া? সত্যি? আমি কি এটা আমার জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবো? এর ভিত্তিতে আমি আমার জীবন চালিত করবো? অথচ আমার কাছে আছে আসমান ও যমীনের অধিপতির কাছ থেকে প্রেরিত জীবনবিধান? কিভাবে এই অমূল্য সম্পদকে বিক্রি করবো এই ঠুনকো সস্তা হাওয়াইমিঠাইয়ের জন্য? এ প্রস্তাবটাই তো লজ্জাজনক। কিভাবে আমরা আমাদের জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করবো এমন কিছু যা বলে – সমস্ত ক্ষমতার মালিক জনগণ? আর এজন্য আমি ত্যাগ করবো সেই জীবনবিধান যা আমার জন্য, আপনার জন্য, সমগ্র মানবজাতির জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন মালিকুল মূলক আল্লাহ্‌ আল-আযীয? আমি শাশ্বতকে ছেড়ে দেবো পার্থিবের জন্য? চিন্তাশীল ব্যক্তি কোনটা গ্রহণ করবে? 
.
.
.
আকাশ পৃথিবী এতদুভয়ের মধ্যে যা আছে, তা আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। 
.
আমি যদি ক্রীড়া উপকরণ সৃষ্টি করতে চাইতাম, তবে আমি আমার কাছে যা আছে তা দ্বারাই তা করতাম, যদি আমি চাইতাম। 
.
বরং আমি সত্যকে মিথ্যার উপর নিক্ষেপ করি, অতঃপর সত্য মিথ্যার মস্তক চুর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, অতঃপর মিথ্যা তৎক্ষণাৎ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তোমরা যা বলছ, তার জন্যে তোমাদের দুর্ভোগ। 
.
নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলে যারা আছে, তারা তাঁরই। আর যারা তাঁর সান্নিধ্যে আছে তারা তাঁর ইবাদতে অহংকার করে না এবং অলসতাও করে না। 
.
তারা রাত্রিদিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে এবং ক্লান্ত হয় না। 
.
তারা কি মৃত্তিকা দ্বারা তৈরী উপাস্য গ্রহণ করেছে, যে তারা তাদেরকে জীবিত করবে? 
.
যদি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলে আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য উপাস্য থাকত, তবে উভয়ের ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র। 
.
তিনি যা করেন, তৎসম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে। 
[সূরাতুল আম্বিয়া, ১৬-২৩]
(Asif Adnan)

শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

ইসলামের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, প্রাণের ভাষা। জন্মের পরে ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামতের পরেই যে ভাষা শ্রবণ করি তা হলো, বাংলা ভাষা। তাই শিশুকালে মায়ের মুখ থেকে শুনে শুনে একটি দুটি করে বাংলা ভাষাতেই কথা বলতে শিখেছি। এ জন্য আমরা বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা বলি।

পৃথিবীতে বহু ভাষা রয়েছে। আল্লাহতায়ালা মানুষকে ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, ‘আর মহান আল্লাহর নিদর্শসমূহের হতে (একটি নিদর্শন হলো) আসমান ও জমিন সৃষ্টি এবং মানুষের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা। এর মধ্যে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য উপদেশ রয়েছে।’ -সূরা আর রূম : ২২

বর্ণিত আয়াতে আল্লাহতায়ালা পৃথিবীর মানুষের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতাকে তার একটি নিদর্শন বলে আখ্যায়িত করেছেন। ভাষার জ্ঞান ও হৃদয়গ্রাহী বর্ণনায় বক্তব্য উপস্থাপন করার যোগ্যতা ও দক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুন্দর ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন ও উত্তম বাচন ভঙ্গিতে কথা বলতে অপারগতার কারণে হজরত মুসা (আ.) দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার সময় সুন্দর ভাষা ও হৃদয়গ্রাহী কথা-বার্তায় পারঙ্গম স্বীয় ভাই হজরত হারুনকে (আ.) নিজের সঙ্গি করার জন্য আল্লাহর নিকট আবেদন জনিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার ভাই হারূন, তিনি আমার থেকে অনেক বেশি প্রাঞ্জল ভাষী। তাই আপনি তাকে আমার সহযোগী করে প্রেরণ করুন; যাতে সে আমাকে (দাওয়াতের ক্ষেত্রে তার প্রাঞ্জল ভাষার দ্বারা) সত্যায়িত করে। কেননা আমি আশঙ্কা করছি (আমার বক্তব্য সত্য হওয়া সত্বেও) তারা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করবে।’ -সূরা কাসাস : ৩৪
  
মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাদের প্রত্যেককেই তাদের মাতৃভাষায় বা স্বগোত্রীয় ভাষায় প্রেরণ করেছেন। যাতে তারা তাদের জাতিকে সুস্পষ্ট ভাষায় আল্লাহর হুকুম বা বিধান বুঝাতে পারেন এবং মানুষও নবী-রাসূলের ভাষা বুঝে আমল করতে পারে। এ জন্য আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক নবীর কিতাবকে তার ভাষাতেই অবতীর্ণ করেছেন। যেমন, হজরত মুসা (আ.)-এর ওপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন হিব্রু ভাষায়, হজরত দাউদ (আ.)-এর ওপর যবুর অবতীর্ণ করেছেন ইউনানি ভাষায়, আর হজরত ঈসা (আ.)-এর ওপর ইঞ্জিল অবতীর্ণ করেছেন সুরিয়ানি ভাষায়।

সমগ্র জাতির হেদায়েতের পথপ্রদর্শক শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তার প্রদর্শিত পথেই রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণ। তার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোরআনে কারিম। আর এ কোরআনের ভাষাও আরবি। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি প্রত্যেক নবীকেই তার নিজ নিজ জাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি; যেন তিনি তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে বুঝাতে পারেন।’ -সূরা ইবরাহিম : ০৪

বাংলাকে মাতৃভাষা করার দাবীতে এদেশের সাহসী যুবকেরা রক্ত ঝরিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি।

একদিকে কোরআন-হাদিসের মাধ্যমে মাতৃভাষার গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে জব্বার, রফিক, সালাম ও বরকতের মতো সাহসি মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলা ভাষার আলোকোজ্জ্বল সূর্য পৃথিবীর আকাশে উদিত হয়েছে। 

রক্ত দিয়ে কেনা এই বাংলা ভাষা কিন্তু তার কাঙ্খিত গন্তব্যে যেতে পারেনি। বর্তমান সময়ের বাংলা চর্চা ও ব্যবহারের করুণ অবস্থা দেখলে এর সত্যতা মেলে। প্রাণের ভাষা বাংলার সঙ্গে ভিনদেশি ভাষার সংমিশ্রণের আধিক্য দিন দিন শুধু বাড়ছে। যা প্রত্যাশিত নয়। বিষয়টির প্রতি যথাযথ দায়িত্বশীলরা নজর দিবেন বলে আশা রইল। 

লেখক : প্রিন্সিপাল ও মুহাদ্দিস, জামিআ রশীদিয়া এনায়েতুল উলুম, দক্ষিণখান, ঢাকা

বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

হায়! এমন মনযোগী ইলমপিপাসু আজ কোথায়?

পড়ছিলাম লা-মাযহাবী মতবাদের শুরু যুগের একনিষ্ট প্রচারক শায়েখ নওয়াব সিদ্দিক হাসান খানের লিখিত " আলহিত্তা ফী জিকরিস সিহাহ সিত্তাহ" নামক কিতাবটি। 
ইমাম বুখারী রহঃ এর জীবনের আজীব আজীব ঘটনা যা লা-মাযহাবী বন্ধুদের বর্তমান মানসিকতায় শিরক ও উদ্ভট এমন কিছু ঘটনাও সন্বিবেশিত করেছেন খান সাহেব। তাহারা লিখলে তাওহীদ থাকে আমরা লিখলে কিন্তু তাহা শিরক হইয়া যাইবে। এই মূলনীতি সর্বদা মনে রাখিতে হইবে।

যাইহোক পড়ছিলাম ইমাম মুসলিম রহঃ এর জীবনী। নওয়াব সাহেব জীবনী লেখার শেষ প্রান্তে এসে ইমাম মুসলিম রহঃ এর মৃত্যুর কারণ লিখতে গিয়ে একটি ঘটনা এনেছেন। যা আমরা উস্তাদদের মুখে ছাত্র জমানায়ই শুনেছিলাম। আজ আবার পড়ে ভাল লাগল। 
ইমাম মুসলিম রহঃ একদা একটি ইলমী মুজাকারার মজলিসে বসা ছিলেন। ঘটনাক্রমে একজন একটি হাদীস বলল, কিন্তু উক্ত হাদীসটি কোথায় আছে তা হযরতের মনে আসতে ছিল না। তখন তিনি মজলিশ থেকে ঘরে চলে গেলেন। তিনি সে সময় খেজুর খাচ্ছিলেন। খেজুর খেতে খেতেই কিতাবের মাঝে হাদীসটি খুঁজতেছিলেন। মনযোগ সহকারে হাদীস খুজছিলেন। আর অপর হাতে খেজুর একের পর এক মুখে দিচ্ছিলেন। তিনি হাদীস খোঁজায় এতটাই নিমগ্ন ছিলেন যে, খেজুর কতগুলো খাচ্ছেন? পেট ভরে গেছে কি না? এসব কিছুই তার অনুভবে ছিল না। তিনি হাদীস খুঁজতেই আছেন, আর খেজুর খেতেই আছেন। এভাবেই সকাল হয়ে গেল। ভোরের দিকে তিনি হাদীসটিও পেয়ে গেলেন। অপরদিকে তার পাত্রের খেজুরও শেষ হয়ে এল। সেই সাথে অতিরিক্ত খাবার ভক্ষণের কারণে তিনি ইন্তেকাল করলেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাহি রাজেউন। [আলহিত্তাহ ফী জিকরিস সিহাহ সিত্তাহ-৪৪৮]

হে আল্লাহ! আমাদের প্রাণ হয়তো তোমার রাহে কুরবান কর। কিংবা এভাবে ইলম সাগরে সাতার কাটতে কাটতে তোমার দরবারে ডেকে নিও। আমীন।

বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান

জ্ঞান অর্জন না করে নিজেকে জানা যায় না, সৃষ্টিতত্ত্ব বোঝা যায় না, আল্লাহকে চেনা যায় না, ক্ষমতাধর হওয়া এবং নেতৃত্বও দেয়া যায় না। ইকরা’ অর্থাত ‘পড়’। ‘পড় তোমার রবের নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। এ পড়ার মূল কথা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের সব শাখায় বিচরণ এবং মাতৃভাষায় জ্ঞানার্জন। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী নাগাদ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলমানেরা ছিল সর্বেসর্বা। আল কুরআনের পাশাপাশি তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ক সকল প্রকার বই পড়েছেন, গবেষণা করেছেন। তারা মহান আল্লাহর সৃষ্ট প্রকৃতির নিদর্শনাবলীর ওপর গবেষণার মাধ্যমে সত্য উপলব্ধি করেছেন। আত্মশুদ্ধি ঘটিয়েছেন। কুরআন ও অন্য যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই পড়েছেন। হিকমত অর্থাৎ বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। ইবনে আল হাইসাম ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্র্রেষ্ঠ একজন পদার্থ বিজ্ঞানী। তিনিই সর্বপ্রথম প্রদান করেন জড়তত্ত্ব ও আলোর প্রতিসরণ তত্ত্ব। পরবর্তীতে যা নিউটনের হাতে পুনরাবিষ্কৃত হয়। জাবির বিন হাইয়ান রসায়ন শাস্ত্রের ভিত্তি রচনা করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনা, জাবির হাসান বিন হাইয়ান, আল রাযীর নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের লিখিত বইয়ের ল্যাটিন অনুবাদ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল। কম্পিউটারের আবিষ্কার কিন্তু অঙ্ক শাস্ত্রনির্ভর। বস্তুর ‘সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিমাপ’ আল খাওয়ারিযমীই প্রথম প্রণয়ন করেছিলেন।
নিউটনের বহু আগেই কবি ওমর খৈয়াম ‘বাইনোমিয়াল থিউরাম’ আবিষ্কার করেন। পৃথিবীর প্রথম সম্পূর্ণ মানচিত্র প্রণয়ন করেন মুসলিম ভূগোলবিদ ইবনে হাক্কল। আলফারাবি ছিলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ও দার্শনিক। তিনি ৭০টি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। আল বিরুনি (প্রসিদ্ধ গ্রন্থ কিতাব আল হিন্দ), ইবনে বতুতা প্রমুখ মুসলিম মনীষী ভূবিদ্যার প্রসারে অনেক অবদান রাখেন। ইবনে খালদুনকে বলা হয় ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞানের জনক। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক ছিলেন ইবনে জাবির তাবারি। ‘তারিখ আল রাসূল ওয়া আল মুলুক’ তার এ গ্রন্থটি সারাবিশ্বে রেফারেন্স হিসেবে পঠিত হচ্ছে। আল ফিন্দি গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ৩৬৯টি গ্রন্থ রচনা করেন। অতীতে জ্ঞান- বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতেই নয়; বরং ব্যবসা- বাণিজ্য, শিল্প, কল-কারখানাতেও মুসলমানদের ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আব্বাসীয় খলিফা মামুন বাগদাদে ‘দারুল হিকমাহ’ নামে যে বিজ্ঞান কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন তাতে সে যুগেই প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল। ‘The Bible, The Quran and the Science’ গ্রন্থে ড. মরিস বুকাইলী উল্লেখ করেন, ‘অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। যখন খ্রিষ্টীয় জগতে বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছিল তখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বহুসংখ্যক গবেষণা ও আবিষ্কার সাধিত হয়। কর্ডোভার রাজকীয় পাঠাগারে ৪ লাখ বই ছিল। ইবনে রুশদ তখন সেখানে গ্রীক, ভারতীয় ও পারস্য দেশীয় বিজ্ঞানে পাঠদান করতেন। যার কারণে সারা ইউরোপ থেকে পণ্ডিতরা কর্ডোভায় পড়তে যেতেন, যেমন আজকের দুনিয়ায় মানুষ তাদের শিক্ষার পরিপূর্ণতার জন্য আমেরিকা যায়। ‘ইসলাম ও আরবি সভ্যতার ইতিহাস’ বইতে ওস্তাভলি বোঁ লিখেছেন, ‘ইউরোপে যখন বই ও পাঠাগারের কোন অস্তিত্ব ছিল না, অনেক মুসলিম দেশে তখন প্রচুর বই ও পাঠাগার ছিল। সত্যিকার অর্থে বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’য় ৪০ লক্ষ, কায়রোর সুলতানের পাঠাগারে ১০ লক্ষ, সিরিয়ার ত্রিপোলী পাঠাগারে ৩০ লক্ষ বই ছিল। অপরদিকে মুসলমানদের সময়ে কেবল স্পেনেই প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার বই প্রকাশিত হতো। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম দেশগুলোতে বইয়ের কদর নেই, বই প্রকাশের বিষয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অপ্রতুল। ইউরোপের একটি ক্ষুদ্র দেশ গ্রিসে বছরে ৫০০টির মতো বই অনুবাদ করে থাকে। মুসলমানদের অতীত ইতিহাস বই পড়ার ইতিহাস। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস। অতীত ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিয়ে জ্ঞান- বিজ্ঞানে পুনরায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য আজ সারাবিশ্বের মুসলমানদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কারণ আলকুরআনে বার বার জ্ঞান চর্চার বিষয়ে তাগিদ দেয়া হয়েছে। তাই মুসলমানদের জন্য জরুরি ধর্মীয় জ্ঞানের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ ব্যবহারিক জীবনের যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করা, জ্ঞান- বিজ্ঞানের বই পড়ার প্রতি উৎসাহিত হওয়া দরকার।

শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির সফলতা ও ব্যর্থতা


আমির উদ্দিন তানজিল
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ। মানুষকে দেয়া হয়েছে বিবেকবোধ। ভালো মন্দ বোঝার ক্ষমতা এবং সুখ-দুঃখের অনুভূতি। মানুষ ও জিন জাতির জন্য করা হয়েছে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা, সব সৃষ্টিই শেষ হয়ে যাবে, শুধু মানুষের বিনাশ নেই। মানুষ ইনতেকাল করে। এক জগত থেকে অন্য জগতে স্থানান্তরিত হয়। দৈহিক অবকাঠামোকেই মানুষ বলা হয় না,তার ভেতরে রয়েছে এমন শক্তি, যা নিঃশেষ হয়ে যায় না, জায়গা পরিবর্তন করে মাত্র। দেহটা শেষ হয়ে যায়। পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি, সবকিছুই করা হয়েছে এই মানুষের সেবার জন্য। মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর ইবাদাতের জন্য। পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে ইবাদত বলতে আমরা নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি বুঝিÑ যেগুলো নির্দিষ্ট কিছু সময়ে আমরা পালন করে থাকি। কিন্তু ইবাদাত এই গুটিকয়েক আমলের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধি-বিধান রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মানুষের চলার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা রেখেছেন। মানুষ কীভাবে বাঁচবে, কী খাবে, কী উপার্জন করবে, কীভাবে করবে, কী ব্যয় করবে, কীভাবে ব্যয় করবে, সমাজ পরিচালনা কে করবে, কীভাবে করবে ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ের নির্দেশনা ইসলামে পূর্ণরূপে রয়েছে। মানবজীবনের এমন কোনো দিক নেই, যে ব্যাপারে ইসলামের মৌলিক নির্দেশনা নেই। এসব কিছুর বাস্তব অনুশীলন রাসুল স. নিজে করে এবং সাহাবা রা. এর মাধ্যমে উম্মতকে প্রায়োগিক শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন। ভোরে ঘুম হতে জাগ্রত হওয়া থেকে শুরু করে রাতে আবার ঘুমানো পর্যন্ত প্রতিটি কাজেই আল্লাহর হুকুম ও রাসুল স. এর সুন্নাত রয়েছে আর এ সব হুকুম মান্য করাই ইবাদাত। এই ইহজাগতিক সময়ে মানুষকে কিছুটা স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। তাকে যাচাই বাছাই করার জন্য কিছুটা ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। তার সামনে ভালো মন্দের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ কোনটা গ্রহণ করে তার ওপর নির্ভর করবে পরকালীন সুখ শান্তির বিষয়টি। আর এ কথাটা মানুষ সৃষ্টির আনন্দে যেন ভুলে না যায়, তাই যুগে যুগে নবি রাসুল প্রেরণ করে সতর্ক করা হয়েছে। নবিগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী। তারা ভালো পথে চললে পরকালীন সুখের সু সংবাদ দিয়েছেন। আবার অবাধ্যকারীদের শুনিয়েছেন কঠোর শাস্তির হুশিয়ারি।
পৃথিবীর শুরুলগ্ন থেকেই আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা মানুষ অনেক কিছু আবিষ্কার করে চলছে। বিজ্ঞানের এই যুগে চাঁদ ও মঙ্গলে যাওয়ারও প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি জিনিসের আবিষ্কারকই তার আবিষ্কার পরিচালনার নির্ধারিত নিয়ম বলেছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত ওই বস্তু দ্বারা কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্য অর্জন হবে, কিন্তু যখনই নির্ধারিত নিয়মবহির্ভূত তা চালানো হবে, তখনই তা কার্যকারিতা হারাবে এবং তার দ্বারা উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি হবে। ঠিক অনুরুপভাবে মানবজাতির সফলতা ও মুক্তি আল্লাহর হুকুম ও রাসুল সা. এর আদর্শের মাঝেই রয়েছে।
মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম নিদর্শন হলো আল্লাহ প্রদত্ত বিবেক-বুদ্ধি, যা মানুষকে ভালো মন্দের পার্থক্য বোঝাতে সাহায্য করে। এ ক্ষেত্রে একজন মানুষের স্বাধীনতা তথা মতগ্রহণের যে ব্যাপারটি, তা অনেকাংশে তার শিক্ষা ও পারিপার্শিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ইতিহাসে আমরা এ বিষয়টির সুন্দর ধারণা পাই আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে। আমরা জানি যে, হানাহানি ও অরাজকতা ছিলো যাদের একমাত্র নেশা, খুন ও যুদ্ধবাজি ছিলো যাদের নিত্যদিনের কাজ, গোত্র ও সম্প্রদায়কেন্দ্রিক জাতিগত বিভাজনের মাঝেই যারা বেড়ে উঠতোÑ এক কথায় মানবসভ্যতার ছিটেফোঁটা থেকে হাজার মাইল দূরত্বে যারা ছিলো, তারাই যখন নববি আদর্শের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলো, তখন তারা পরিণত হলো সোনার মানুষে। ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির এমন নজির তারা স্থাপন করলো, ইতিহাস যার উপমা দিতে ব্যর্থ। স্বয়ং আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্টির জানান দিয়ে আয়াত নাজিল করেছেন। আমরা গর্ববোধ করি তাদের উত্তরসূরী হওয়ার গৌরবে। সুতরাং এ বিষয়টি সূর্যের আলোর চেয়ে বেশি সত্য যে, আল্লাহর হুকুম ও রাসুল স. এর আদর্শের মাঝেই মানবতার মুক্তি ও সফলতা।
আজ যদি আমরা সচেতন দৃষ্টিতে ইতিহাসের আয়নায় অতীতের আলোকে আমাদের বর্তমানকে মূল্যায়ন করি, তাহলে খুব সহজেই স্পষ্ট হবে যে, আমরাও কম বর্বতার যুগে নই। বর্তমান বিশ্বে শিক্ষার আনুপাতিক হার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এতে যদি আমরা খুব আত্মতৃপ্তি বোধ করি যে, আমরা সভ্যতার উচ্চশিখরে রয়েছি, তাহলে ইতিহাসে আমরা দেখতে পাবো, জাহেলিয়াতের যুগেও শিক্ষার হার কোনো অংশে কম ছিলো না। বরং ইতিহাস তো এমনও বলে যে, জাহেলিয়াতের যুগই ছিলো ভাষা ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ যুগ। এমনকি আধুনিক আরবি সাহিত্যও সে যুগের ভাষা সাহিত্যের সামনে বড় অসহায়।
যদি আমরা সে যুগের গোত্র ও সম্প্রদায়কেন্দ্রিক লড়াইয়ের দিকে লক্ষ করি, তাহলে বর্তমান বিশ্বের আধিপত্যের লড়াই আমাদের জাহেলি যুগের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যে যুগে গোত্রপতিরা দেশ বিভক্ত করত, কিন্তু বর্তমান রাজনীতির মাধ্যমে দেশ, জাতি, গোষ্ঠী এমনকি পাড়া মহল্লা পর্যন্ত বিভক্ত হয়ে আছে। রাজনৈতিক প্লাটফর্ম বিশ্বমানবতাকে বিভক্ত করে নিজ দলে ভিড়ানোর জন্য বিশেষভাবে কাজ করছে। দুর্নীতি ও কালোবাজারির ক্ষেত্রে প্রত্যেক পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন, কাউকে বলতে শোনা যায় না যে, যা হচ্ছে তা হওয়া উচিত নয়। বরং সবার কথা একটাই, যা হচ্ছে তা আমার নেতৃত্বে ও পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া উচিত। আইন-কানুন উল্টো চলছে, এতে কারো কোনো প্রশ্ন নেই। সকল রাগ ও আপত্তি তো এখানেই যে, তা আমার ছত্রছায়ার হলো না কেন? এই যদি হয় পরিস্থিতি, তাহলে এটাকে কি জাহেলিয়াত বলতে পারি না? আইয়ামে জাহেলিয়াতে কন্যাশিশুদের জীবন্ত দাফন করা হতো, আর আধুনিক জাহেলিয়াতে ছেলে মেয়ে কাউকেই পৃথিবীর আলো বাতাস উপভোগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, বরং গর্ভাবস্থায় হত্যা করা হচ্ছে জন্ম নিয়ন্ত্রণের নামে। এটাও কি কম জাহেলিয়াত?
সে যুগে নিজ হাতে খোদা তৈরি করে তার নামে বিভিন্ন বিধান দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হতো, আর এ যুগে আল্লাহর বিধান অস্বীকার করে মানবরচিত সংবিধানের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে বিশ্ব। আবার প্রতিমা বিসর্জনের মতো এর ধারাসমূহ পাল্টে বারবার দোহায় দেওয়া হয় সংবিধানের। সত্যিই যদি এভাবে চলে, তাহলে জাহেলিয়াত বললে কি মিথ্যা বলা হবে?
মোটকথা আল্লাহর হুকুম ও রাসুল সা. এর আদর্শ ছেড়ে অন্য কিছু গ্রহণ করার নামই জাহেলিয়াত। তা সে যুগে যেমন ছিলো এ যুগেও রয়েছে। যুগের হাওয়ায় এর ধরনটা বদলেছে মাত্র।

বৃষ্টি: স্রষ্টার অপূর্ব দান

জহির উদ্দিন বাবর
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অপার নিয়ামতের আধার এই পৃথিবী। এ জগতের প্রতিটি বস্তুর মাঝে প্রভুর ঐশী প্রেরণা কাজ করে। সৃষ্টি জগতের আবর্তন ও বিবর্তন সবই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কুদরতি নির্দেশনায় হয়ে থাকে। সৃষ্টির প্রবহমান ধারায় এমন কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় যার পেছনে সৃষ্টি জীবের কোনো দখল থাকে না। কেয়ামত, জন্ম, মৃত্যু, বৃষ্টি এবং গায়েব-এই পাঁচটি জিনিসের জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণ এককভাবে আল্লাহরই কাছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এর কোনো কোনোটিতে মানুষের ধারণা ও অনুমান কাজ করলেও চূড়ান্ত বিচারে এসব কিছু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত একমাত্র আল্লাহ। সরাসরি স্রষ্টার নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার অন্যতম বৃষ্টি। বৃষ্টি আল্লাহ তায়ালার

একটি বিশেষ নিয়ামতও বটে।
সুজলা-সুফলা, শষ্য-শ্যামলায় সুশোভিত এই বসুন্ধরা বৃষ্টির কারণেই হয়ে ওঠেছে মানুষের বাসযোগ্য। বৃষ্টি দ্বারা জমিনকে করেছেন ঊর্বর ও উৎপাদনশীল। প্রকৃতিতে লাগিয়েছেন সজীবতার ছোঁয়া। ফুলে ফলে ভরপুর করে দিয়েছেন জগৎ সম্ভার। তীব্র খরায়, গ্রীষ্মের দাবদাহে জমিন যখন ফেঁটে চৌচির হয়ে যায়, চারদিকে প্রকৃতি খাঁ খাঁ করতে থাকে, তখন মহান প্রভুর ঐশী প্রেরণায় এক পশলা বৃষ্টি জগতে সঞ্চার করে নতুন প্রাণের। প্রকৃতি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। মৃতপ্রায় বসুন্ধরা ফিরে পায় তার সজীবতা ও সৌরভ। বিস্ত্রীর্ণ মাঠ, শ্যামল প্রান্তর, সবুজ গাছ-গাছালি, অসহায় প্রাণীকূল সবই বৃষ্টির জন্য হাহাকার করতে থাকে। বৃষ্টির স্নিগ্ধ কোমল ফোটায় গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে বিরান হয়ে যাওয়া ভূমিতে নতুন প্রাণের ছোঁয়া লাগে । সঠিক সময়ে বৃষ্টির দেখা না পেলে সৃষ্টিকূলের জীবনধারা ব্যাহত হয়। এর গতিধারা শ্লথ হয়ে পড়ে। জমীনের পলে পলে বৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এসব বিবেচনায় বৃষ্টিকে স্রষ্টার অপূর্ব দান ও শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হিসেবে আখ্যা না দেয়ার কোনো অবকাশ থাকে না। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি জলধর মেঘমালা থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত করি যাতে এর দ্বারা উৎপন্ন করি শস্য উদ্ভিদ।’
দুনিয়ার সব উৎপাদনই নির্ভর করে বৃষ্টির ওপর। বৃষ্টির সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর কাছে ন্যস্ত। এখানে অন্য কারো হাত নেই। আল্লাহ তায়ালা তার বৃষ্টি বর্ষনের সামর্থ্য ও এর কার্যক্ষমতার ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বল তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্যে বর্ষণ করেছেন পানি, অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম বাগান সৃষ্টি করেছি। তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার শক্তিই তোমাদের নেই। অতঃপর আল্লাহর সাথে কোনো উপাস্য আছে কি? বরং তারা সত্যবিচ্যুত সম্প্রদায়।’
অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘তিনিই আল্লাহ যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্যে ফলের রিযিক উৎপন্ন করেছেন এবং নৌকাকে তোমাদের আজ্ঞাবহ করেছেন, যাতে তার আদেশে সমুদ্রে চলাফেরা করে এবং নদ-নদীকে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন।’
আল্লাহর বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিরাজি এই পৃথিবী তার কুদরতি ইশারায় চলছে নিরবধি। তিনি পৃথিবীর গতিধারা যেভাবে, যে গতিতে প্রবাহিত করতে চান সেভাবেই প্রবাহিত হচ্ছে। আল্লাহর নির্দেশনায় জগতের সবকিছুই সংঘটিত হয়। বৃষ্টিও এর ব্যতিক্রম নয়। হযরত মিকাঈল আ. আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক বৃষ্টি বর্ষণের কাজে নিয়োজিত আছেন। যখন যেখানে বৃষ্টির প্রয়োজন আল্লাহর নির্দেশ পেলে সেখানেই তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চোখ ধাঁধানো আবিষ্কারে বৃষ্টি বর্ষণের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হলেও তার মূলে রয়েছে অদৃশ্য কুদরতি হাত। তার সম্মতি না থাকলে কোনো প্রক্রিয়াই কার্যকর হবে না। আল্লাহ তায়ালা আকাশে ভাসমান মেঘমালা থেকে বৃষ্টি বর্ষণের ধাপসমূহ চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ মেঘমালাকে সঞ্চালিত করেন, অতঃপর তাকে পুঞ্জিভূত করেন, অতঃপর তাকে স্তরে স্তরে রাখেন, অতঃপর তুমি দেখ যে, তার মধ্য থেকে বারিধারা নির্গত হয়। তিনি আকাশাচ্ছিদ শিলাস্তুপ থেকে শিলাবর্ষন করেন এবং তা দ্বারা যাকে ইচ্ছা আঘাত করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা তা অন্যদিকে ফিরিয়ে দেন। তার বিদ্যুৎ ঝলক দৃষ্টি শক্তিকে যেন বিলীন করে দিতে চায়।’
বৃষ্টি আল্লাহর এক বিশেষ করুণা। তিনি দয়া করে বৃষ্টি দ্বারা এ জমিনকে সিক্ত না করলে পৃথিবীর রূপ-লাবণ্যতা বিলীন হয়ে যেত। জীব-জন্তুর জন্য পৃথিবী তার বাসযোগ্যতা হারাত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ সত্ত্বেও বৃষ্টির কোনো বিকল্প আবি®কৃত হয়নি। কৃষকের ফসল, জমিনের ঊর্বরতা, গাছ-গাছালীর সজীবতা, ফল-ফলাদির উৎপাদন সবকিছুই নির্ভর করে বৃষ্টি বর্ষণের ওপর। বৃষ্টি বর্ষণের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অবস্থার কোনো ব্যতিক্রম হলেই সহজাত প্রাকৃতিক ধারা ব্যাহত হয়। এই ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর রহমতের বারিধারা প্রবাহিত না হলে মানুষের আবাসন উপযোগী স্বচ্ছ, নির্মল প্রকৃতির সন্ধান মানুষ পেত না। পৃথিবীর মিষ্ঠ পানির প্রধান উৎস বৃষ্টি। পর্যাপ্ত মিষ্ঠ পানি না হলে পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন বাকি থাকবে না। প্রত্যেকটি প্রাণীর অস্তিত্বের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক ওৎপ্রোত। বৃষ্টি যেমন মানুষের জীবনের জন আশির্বাদ, তেমনি কখনো কখনো তা অভিসম্পাত হিসেবেও আবির্ভূত হয়। অনাবৃষ্টি যেমন অসহ্য দানবের রূপ লাভ করে তেমনি অতিবৃষ্টিও সৃষ্টিকূলের জন্য দুঃসহের কারণ। রাসূল সা. উম্মতকে অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি উভয় ধরনের দুর্যোগ থেকে পানাহ চাওয়ার কথা বলেছেন।
আল্লাহর চিরায়ত নেজাম হচ্ছে তিনি যে জিনিস দ্বারা সৃষ্টিকূলের ফায়দা পৌঁছান, যে জিনিস তার নিয়ামত হিসেবে পরিগণিত, সে গুলোকেই কখনো কখনো এর বিপরীত মেরু তথা শাস্তি ও গজবের জন্য ব্যবহার করেন। বৃষ্টিও তেমনি একটি নিয়ামত যা কখনো কখনো শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা মানুষেরই কৃতকর্মের ফসল। মানুষের জন্য আল্লাহর দানকৃত নিয়ামতসমূহের সঠিক ব্যবহার এবং তা ভোগ করার যথাযথ কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন না করলে নিয়ামতই অভিশাপের হিংস্র রূপ লাভ করে। শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা মানুষেরই কৃতকর্মের ফসল। মানুষের জন্য আল্লাহর দানকৃত নিয়ামতসমূহের সঠিক ব্যবহার এবং তা ভোগ করার যথাযথ শোকরিয়া না করলে নিয়ামতই অভিশাপের হিংস্র রূপ লাভ করে। এজন্য ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে আল্লাহর নিয়ামতরাজি উপভোগ করার পাশাপাশি তার প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা। বৃষ্টির ন্যায় মহান নিয়ামত মানুষকে আল্লাহর কুদরতের প্রতি বিশ্বাসীই করে না বরং তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধে বাধ্য করে। স্রষ্টার এই একটি মাত্র নিয়ামতের ওপর চিন্তা-গবেষণা করলে এর কোনো কূল-কিনারা পাবে না সৃষ্টিকূল

উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় দাওয়াত

আল্লামা শায়খ আবদুল ওয়াহেদ বিশিষ্ট দায়ী, ফিলিস্তিন
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِؕ ۰۰۱۱۰
‘তোমরা শ্রেষ্ট উম্মত। তোমাদের সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে। অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে।[১] নবী করীম সা. ইরশাদ করেন, দীন নামই হল, একজন আরেকজনের মঙ্গল কামনা করা। আল্লাহ তাআলা আমাকে ফিলিস্তিন থেকে আপনাদের সামনে আশা এবং বসার তাওফীক দান করেছেন, তাই তার অসংখ্য শুকরিয়া আদায় করছি। যে ফিলিস্তিনে মুসলমানের পূর্বের কেবলা বিদ্যমান রয়েছে এবং যে ভূমি বর্কতপূর্ণ। যেখানে সাহাবায়ে কেরামগণের অসংখ্য কবর রয়েছে। আমি যে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছি এবং এখন যেখানে তালীমের খেদমতে আছি, এর নাম মাদ্রাসাতুস সাহাবা। যেটি ফিলিস্তিনে অবস্থিত এবং মাকামে লুতফ যেখানে দাজ্জালকে ঈসা (আ.) হত্যা করবেন সেখানেই আমাদের মাদ্রাসাটা অবস্থিত। আমাদের মাদ্রাসা থেকে প্রতি বছরের ফারেগীনরা এক বছরের জন্য দাওয়াতী কাজ নিয়ে বের হয়। একটি জামাআত আমাদের মাদ্রাসা থেকে ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিল। সে জামাআতের আমির ছিলেন আমাদের মাদ্রাসার পরিচালক শায়খ মাহমুদ যাকারিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার লুসুকু নামক শহরের পাশে জামাআতটা অবস্থান করেছিল। সেই এলাকার অধিবাসী ছিল, প্রায় তিন হাজার। সেই শহরের প্রধান ছিলেন একজন মহিলা। মহিলাটি জামাআত সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর জামাআতের সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ করেন। পরে মহিলা এবং ওই এলাকার অধিবাসীদের আগ্রহের কারণে জামাআতটা লুসুকু এলাকায় আসে। মহিলাটি জামাআতের আমিরের কাছ থেকে কিছু জানতে চাইলে শায়খ মাহমুদ মহিলাকে আধা ঘণ্টা যাবৎ দীনের কিছু কথা বোঝালেন। অবশেষে মহিলাটি ইসলামগ্রহণ করেন। মহিলা শায়খ মাহমুদকে বললেন, আমাকে যেসব কথা বলেলেন, আমার গোত্রের লোকদেরও বলুন। শায়খ মাহমুদ তাদেরকে দীনী কথা বলার পর তারা সকলে ইসলামগ্রহণ করে। ২০১০ সালে আবার শায়খ মাহমুদ ওই লুসুকু শহরে একটি জামাআত নিয়ে গেলেন। মহিলাটি আরো সাত হাজার লোকসহ শায়খ মাহমুদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং বললেন, এদেরকে কিছু দীনের নসীহত করুন। শায়খ মাহমুদের নসীহতের পর তারা সকলে একত্রে ইসলাম গ্রহণ করেন। আমি এই ঘটনা সরাসরি শায়খ মাহমুদের কাছে শুনেছি।
নবী করীম (সা.)-কে আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তার চিন্তাধারা ছিল, সমগ্র মানবজাতি কীভাবে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ পাবে। শুধু মুসলমান কিংবা ঈমানদারের জন্য নবী করীম (সা.)-এর চিন্তধারা সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁর চিন্তাধারা কাফির, মুশরিকদের জন্যও ছিল। আমাদেরকে বিশেষ করে ওলামায়ে কেরামকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। হুযুুর (সা.) দু’ধারায় দীনের মেহনত করতেন। প্রথমত যাদের অন্তরে দীনের চেতনা আছে। তারা নিজ আগ্রহে নবী করীম (সা.)-এর কাছে এসে দীনের কথা শুনতেন। দ্বিতীয়ত যাদের অন্তরে দীনের আগ্রহ বলতে নেই তাদের কাছে রসুল (সা.) দাওয়াতের উদ্দেশ্যে স্বয়ং ছুটে যেতেন। যেমন- তায়েফের ঘটনা আমরা সকলে জানি। আমাদেরকেও এই দু’ধারায় দাওয়াত দিতে হবে।
উম্মতের যারা আলেম তাদেরকে রসুল (সা.) মেঘের সাথে তুলনা করেছেন। রসুল (সা.) বলেছেন,
«مَثَلُ مَا بَعَثَنِي اللهُ بِهِ مِنَ الْعِلْمِ وَالْـهُدَىٰ، كَمَثَلِ غَيْثٍ».
‘আমাকে যে ইলম ও হেদায়ত নিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে তার উদাহরণ হল বৃষ্টির ন্যায়।’[২] এ হাদীসে রসুল (সা.) ইলমকে বৃষ্টির সাথে তুলনা করেছেন। আর বৃষ্টির গুণ হল, এক জায়গায় স্থির না থাকা। বরং সারা জগতে ঘুরে বেড়ানো। তেমনি ওলামায়ে কেরাম, যারা ইলমের বাহক তাঁদেরকেও নবী (সা.)-এর নায়েব হিসেবে দাওয়াতের সেই গুরু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সুতরাং যারা নিজ আগ্রহে মাদ্রাসায় ভর্তি হয় তাঁদের কাছে দীনকে সীমাদ্ধ করা যাবে না। বরং এ দাওয়াত নিয়ে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে যেতে হবে এবং দীনহারা মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে দিতে হবে। যদি ওলামায়ে কেরাম আল্লাহর দীনের দাওয়াতে নিজের জান-মাল কুরবান করেন, তাহলে তাঁদেরকে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই সাহায্য করবেন। যা করে ছিলেন, আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) এবং সাহাবায়ে কেরামগণ (রাযি.)-কে।
শ্রীলংকায় দীনের দাওয়াত
শায়খ মাহমুদ যাকারিয়া তার মাদ্রাসার ফারেগীনসহ শ্রীলংকায় আরেকটা জামাআত নিয়ে গিয়ে ছিলেন। যখন শ্রীলংকায় সুনামি তুফান হয়েছিল। শায়খের মাহমুদের সেই জামাআত সমুদ্র তীরবর্তী এক মসজিদে অবস্থান করছিলেন। তখন হঠাৎ ওই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য সরকারি আদেশ এবং পত্রিকায় সতর্কবাণী আসল। এলাকার সব লোকজন নিজ এলাকা ছেড়ে পাহাড়ি অঞ্চলে চলে গেল। শুধু শায়খ মাহমুদের জামাআতটিই সমুদ্র তীরবর্তী ওই মসজিদে রয়ে গেল। পরামর্শ করে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা ওই মসজিদ ছেড়ে কোথাও যাবে না। কারণ তারা তো আল্লাহর রাস্তায় এসেছেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ তুফনের মধ্যেও তাদেরকে হেফাযত করবেন। তারা সারা রাত আল্লাহর ইবাদতের সাথে কাটালেন। সকালে দেখা গেল যে, রাতে তুফান চলে গেল। এলাকার সব দালান-কোটা , ঘর-বাড়ি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কিন্তু আল্লাহ সেই মসজিদ এবং তাঁদের সকলকে হেফাযত করেছেন।
আম্বিয়ায়ে কেরামের সংখ্যা কিতাবে আছে, এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যাও একই। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মক্কা আর মদীনাতে শুধু দশ থেকে পনের হাজার সাহবাদের কবর রয়েছে। বাকি সাহাবাদের কবর কোথায়? বাকী সাহাবাদর কবর পৃথিবীর দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে আছে। আমাদের ফিলিস্তিনেও ত্রিশ হাজার সাহাবায়ে কেরামের কবর রয়েছে। যেসংখ্যক মক্কা-মদীনাতেও নেই। একথায় কোন সন্দেহ নেই যে, সাহাবায়ে কেরাম কোন পার্থিব সম্পদ উপার্জনের জন্য কোন দেশে যাননি। বরং দীনহারা মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক জুড়ে দেওয়ার জন্য গিয়েছিলেন। মক্কা ও মদীনা শরীফে নামায পড়লে অনেক গুণ নেকী পাওয়া যায়। এসব ত্যাগ করে তারা পুরো বিশ্বে দীনের দাওয়াতের উদ্দেশ্যে ছুটে গেছেন। দীনের দাওয়াত দেওয়া কি শুধু তাঁদের ছিল? নাকি আমাদেরও রয়েছে? অবশ্যই আমাদেরও রয়েছে। বিশেষ করে আলেম সমাজের। সাহবায়ে কেরাম যদি আমাদের মতো মনে করতেন যে, ইবাদত নিজে করলে হবে। অন্যরা করুক আর না করুক। তাহলে দীন আমাদের পর্যন্ত আসত না। সাহাবাদের মেহনতের কারণেই আজকে দীন আমাদের পর্যন্ত পৌঁছছে। ছাত্রদেরকে লেখাপড়া শেষ করার পর এক বছরের জন্য দাওয়াতি কাজে বের হতে হবে। যারা আলেম নয়, তাদের উদ্দেশ্যে বলি, দীনী কাজ কি শুধু আলেমদের জন্য? নাকি আপনাদেরও রয়েছে? আলেমদের যদি এক বছর সময় লাগতে হয় তাহলে আপনাদের কয় বছর লাগাতে হবে? আসলে, এই কাজটা ভাগাভাগির কাজ নয় যে, কেউ তাবলীগ করবে। আর কেউ তা’লীম দেবে। আর কেউ ব্যবসা-বানিজ্য করবে। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং দীনের কাজ করা সকলের দায়িত্ব। মূলত আমরা সকলে তো তাবলীগঅলা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ هٰذِهٖ سَبِيْلِيْۤ اَدْعُوْۤا اِلَى اللّٰهِ١ؔ۫ عَلٰى بَصِيْرَةٍ اَنَا وَ مَنِ اتَّبَعَنِيْؕ ۰۰۱۰۸
অর্থাৎ হে নবী! আপনি বলে দিন যে, এটিই আমার রাস্তা। আমি মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করি এবং যারা আমার অনুসরণ করে তাদেরও এ দায়িত্ব।[৩] আমাদের পাশবর্তী দেশ ভারতে প্রায় একশ কোটি হিন্দু রয়েছে। আর চীনে প্রায় একশ বিশ-ত্রিশ কোটি বৌদ্ধ রয়েছে। তাহলে সাহাবায়ে কেরাম যদি দাওয়াত না দিতেন, চারপাশে শত কোটি হিন্দু আর বৌদ্ধের মাঝখানে আমরা দীনের দাওয়াত পেতাম? আর আমি যদি দীনের দাওয়াত না দিই। আর বাড়িতে আমি একজনই দীনদার আছি। তাহলে আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে দীনও আমার গৃহ হতে বের হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا قُوْۤا اَنْفُسَكُمْ وَاَهْلِيْكُمْ نَارًا ۰۰۶
অর্থাৎ জাহান্নামের আগুন থেকে তুমি নিজেও বেঁচে থাক এবং তোমার পরিবার-পরিজনকেও বাঁচাও।[৪] এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর আহ্বান করেছেন। আমরা পরিবার-পরিজনকে আহার, কাপড়-চোপড়, ঘর-বাড়ি যোগান দেওয়ার জন্য কত শত চেষ্টা করি। আখিরাত যেহেতু আমাদের সামনে নেই, তাই আখিরাত আর কবরের কথা বড় বড় মুসিবত হলেও আমাদের বুঝে আসে না।
ইমাম গাযালী (রহ.)-এর আখিরাতের যিন্দেগির দৃষ্টান্ত
ইমাম গাযালী (রহ.) আখিরাতের যিন্দেগির দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে বলেন, যদি আসমান-জমিনের মাঝখানের খালি জায়গা সরিসা দানা দিয়ে ভরে দেওয়া হয় এবং একটা পাখি এক হাজার বছর পর পর এসে এক একটা দানা নিয়ে যায়। তাহলে এই সরিসা দানা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আখেরাতের যিন্দেগির চেয়েও অনেক দীর্ঘ। অনন্তকালের সেই জিন্দেগি আমাদের সকলকে ভোগ করতে হবে। সেই জিন্দেগি আমাদের আড়াল হওয়ার কারণে আমরা তার গুরুত্ব দিই না।
ফিলিস্তিনের কিছু দৃশ্য
আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে ফিলিস্তিনের বায়তুল মাকদাসে জুমার নামাযে আধা কাতার মুসল্লী হত। তখন হিন্দুস্থান থেকে মাওলানা মুস্তাকিমসহ শীর্ষ আলেমদের একটি জামাআত গিয়েছিল। মাওলানা মুস্তাকিম জুমার খুতবায় উপস্থিত মুসল্লিদেরকে জিজ্ঞেস করছিলেন যে, বায়তুল মাকদাসের আশে-পাশের বাকি অধিবাসীরা কোথায়? মুসল্লিরা বললেন, উনারা জায়তুন চাষ আর জায়তুন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। তখন মাওলানা সাহেব তাদেরকে বলছিলেন, দীনের ব্যাপারে যদি তোমরা এত উদাসীন হও, তাহলে অতিসত্তর বায়তুল মাকদাস তোমাদের হাত ছাড়া হয়ে যাবে। কিছুদিন পর বায়তুল মাকদাস দীনের ব্যাপার উদাসীনতার ফলে মুসলমানদের হাত ছাড়া হয়ে যায়। এরপর আমাদের ফিলিস্তিনে আপনাদের বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে জামাআত যাওয়ার পর দীনের নকল ও হরকত এবং দীনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেছে। আল্লাহর রহমতে যেখানে দক্ষিণ ফিলিস্তিনে দুটি মসজিদ ছিল, সেখানে বর্তমানে তিনশত মসজিদ হয়ে গেছে। এটা কোন কাহিনী নয়, আমি এর প্রত্যক্ষদর্শী। উত্তর ফিলিস্তিনের মসজিদগুলোও এখন মুসল্লিতে ভরপুর হয়ে গেছে।
দীনের দাওয়াতের গুরুত্ব নিয়ে একটি দৃষ্টান্ত
দীনের দাওয়াতের জন্য হরকত মানে, নড়া-চড়া করা। দাওয়াত না থাকলে মানুষ জমে যায়। যেমন- আমাদের সামনে যদি একটা চিনি ছাড়া চা রাখা হয়। এরপর চিনি দেওয়া হয়। নড়া-চড়া না করে যদি খাওয়া হয়। তাহলে সেই চা কখনো মিষ্টি হবে না। বরং আগের মতো থেকে যাবে। আর যদি কাটি দিয়ে একটু নড়া-চড়া করা হয়, তখন মিষ্টি হয়ে যাবে। তাই আমাদের ফিলিস্তিনের মানুষকে যখন আপনাদের বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত ইত্যাদি রাষ্ট্র থেকে জামাআত গিয়ে দীনের দেওয়া হয়, তাদের ভেতরও দীনের বুঝ চলে আসছে। বায়তুল মাকদাসের চাবি এখনও আমাদের হাতে আসেনি। দাওয়াতি কাজ চালু থাকলে অতিসত্তর বায়তুল মাকদাস আমাদের হাতে আবার ফিরে আসবে বলে আশা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দীনের রাস্তায় বের হয়ে সারা বিশ্বে দাওয়াতের মিশন চালু করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
অনুলিখন: মুহাম্মদ ইসম

আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে ইসলাম

পৃথিবী অনেক বিশাল হলেও মহাবিশ্বের তুলনায় ছোট, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দুমাত্র। এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে যত মতবাদ (theory)-ই পেশ করা হোক না কেনো, প্রকৃত সত্য এই যে এই মহাবিশ্ব ও তন্মধ্যস্থিত সবকিছু মানুষের সৃষ্টি নয় বরং পরম জ্ঞানবান ও শক্তিধর কুশলী মহান আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি। সেই পরম শক্তিমান আল্লাহই এই পৃথিবী ও আসমান সৃষ্টি করেছেন। দিবা-নিশির পরিবর্তনের পূর্ণ রহস্য উদঘাটন ও তা জানার ব্যাপারে মানুষের অদম্য আগ্রহে আজও ভাটা পড়েনি। বর্তমান রকেটের যুগেও মানুষ সামুদ্রিক জলযানের ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টির পানি আল্লাহর আরেক বিস্ময়কর কুদরাত। পানির জন্য মানুষ আজও বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বায়ুপ্রবাহ যে কোন জায়গার আবহাওয়ার জন্য দায়ী। সমুদ্রের নাবিকরা বায়ুপ্রবাহের প্রভাব বেশ ভালভাবেই উপলব্ধি করেন। আধুনিক যন্ত্র ও রাডার নিয়ন্ত্রিত জাহাজ আবিষ্কারের পরও বায়ু প্রবাহের প্রভাব অক্ষুন্ন রয়েছে। মেঘমালাও আল্লাহর নিয়ন্ত্রনাধীন। আল্লাহর শক্তিমত্তার বর্ণনা কুরআনে এভাবে এসেছে-
“নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে, রাত-দিনের আবর্তনে, মানব কল্যাণের জন্য সাগরে বিচরণশীল যেসব নৌযান চলাচল করে, আল্লাহ আকাশ থেকে যে পানি বর্ষণ করেন এবং তার মাধ্যমে মৃত ভূমিকে জীবিত করেন, আর তাতে যাবতীয় জীবজন্তু বিস্তার করেন ও বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবানদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। “
বস্তুজগতের তথ্য উদঘাটন ও নতুন বস্তু আবিষ্কার যে বিদ্যার মাধ্যমে হয়, সেই বিশেষ জ্ঞানই বিজ্ঞান। এক কথায় বলতে পারি বস্তুজগতের জ্ঞানই বিজ্ঞান। উল্লিখিত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, বিজ্ঞান শিক্ষা করা ও বিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা করা আল্লাহর নির্দেশ। বিজ্ঞানে বুৎপত্তি অর্জন করে মহান স্রষ্ট্রার পরিচিতি লাভ করা যায়। সুতরাং বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
কুরআনের এ শিক্ষা যেদিন মুসলমানরা বাস্তবে পরিণত করেছিল, সেদিন তারা গোটা পৃথিবীতে সমগ্র মানবজাতির শিক্ষাদাতা হতে পেরেছিল। আল বিরুনী, আল হাইয়ান ও ইবনে সিনা ছিলেন এই বিজ্ঞানের মহাপুরোহিত ও জনক। কিন্তু যেদিন মুসলমানরা প্রাচুর্যের মোহে বিজ্ঞানচর্চা পরিহার করল, ভোগ-বিলাস ও তথাকথিত ললিতকলার সেবা শুরু করল; তখন থেকেই মুসলমানদের অধ:পতন ও জাতীয় জীবনে ধীরে ধীরে নেমে এলো পরাধীনতা, অবক্ষয় ও হীনমন্যতাবোধের ঘোর অমানিশা। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা যেমন ফরজ তেমনি বিজ্ঞান-চর্চাও আল্লাহর নির্দেশ। কুরআন বিজ্ঞান চর্চার প্রধান লক্ষ্য নির্দেশ করছে এভাবে-
“নিশ্চয়ই আসমান ও জমীন সৃষ্টিতে, রাত-দিনের পরিবর্তনে নিশ্চিত নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানবানদের জন্য। তারা আল্লাহকে স্মরণ করেন দাঁড়িয়ে, বসা ও শয়নরত অবস্থায়;আর আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে চিন্তা করে বলেন, হে আমাদের রব! এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। পবিত্রতা আপনার, আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচান।”
কুরআনে প্রায় আয়াতের শেষে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন। সৃষ্টিজগৎ ও সৃষ্টিজীব সম্বন্ধীয় তত্ত্ব উদঘাটন যদিও ফরজ নয়;তবে মহান স্রষ্ট্রার ঐকান্তিক বাঞ্ছা প্রত্যেক বান্দা সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে চিন্তা করুক। যারা চিন্তা-ভাবনা করবেন, তারা বুদ্ধিমান ও বিজ্ঞানী হবেন। এজন্যই সৃষ্টিভাবনা সম্পর্কে তাফসীরের এক মৌলিক নীতি হচ্ছে- (আল্লাহর সৃষ্টিজগৎ ও সৃষ্টিজীব নিয়ে গবেষণা করো;তবে আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তাও করো না।)
নতুনের প্রতি আকর্ষণ, নতুন কিছু জানার প্রতি অপার প্রেরণা মানুষের জন্মগত। নিত্যদিনের সংবাদ জানার কৌতুহল আজও অম্লান ও অনিঃশেষ। এই সংবাদ যদি বিজ্ঞান বিষয়ক হয়, তাহলে মানুষের আগ্রহ কেমন তুঙ্গে উঠে যায়। এই উদ্দীপনা না থাকলে মানুষ পাথরের যুগ থেকে এ্যাটমের যুগ পর্যন্ত পৌঁছতে পারত না, উট ও গরুর গাড়ি থেকে উড়োজাহাজ পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারত না, মাটির প্রদ্বীপ ও বা মোমবাতির থেকে বিজলিবাতি, সার্চ লাইট পর্যন্ত উন্নতি করতে পারত না। এসবই মানুষের বস্তুনিষ্ঠ উৎকর্ষ ও বৈজ্ঞানিক সাফল্য।
প্রকৃতির ধর্ম ইসলাম কেবল ‘নতুন’ হওয়ার কারণে কোনো বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। বরং কারিগরি, শিল্প, যুদ্ধের কলাকৌশল ও মানবকল্যাণে ব্যবহার্য বস্তু আবিষ্কারে বিপুল উৎসাহ দিয়েছে। হযরত সালমান ফারসী রা. এর পরামর্শক্রমেই নবীজী সা. তায়েফ যুদ্ধে দুটো নতুন যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করেছেন। কোনো কোনো বর্ণনামতে সেগুলো সালমান রা. নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন। একটি আধুনিক কালের আগ্নেয়াস্ত্র জাতীয় অস্ত্র ছিল, অপটি ট্যাংক জাতীয় ছিল। রাসূল সা. এর ঐকান্তিক অভিলাষ ছিল, একটি দল প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহার রপ্ত করুক। ইবনে কাসীর রহ. বর্ণনা করেছেন, রাসূল সা. হযরত উরওয়া ইবনে মাসউদ ও গায়লান ইবনে সালমাকে সিরিয়ার ‘ জরস্ ’ নামক শহরে পাঠিয়েছিলেন, যাতে সেখানে তারা আগ্নেয়াস্ত্র, কামান, ট্যাংক তৈরির প্রযু্ক্তি শিক্ষা লাভ করেন। এই দুই সাহাবী সিরিয়ার সমরাস্ত্র বিদ্যা অর্জনে বেশ গভীরভাবে নিবিষ্ট ছিলেন বলে হুনাইন ও তায়েফ যুদ্ধে শরীক হতে পারেননি। কৃষি ও খনিজ দ্রব্য থেকে উপকার লাভ করার জন্য রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন: ভূগর্ভে লুকায়িত নিয়ামাতের মাঝে রিযিক সন্ধান করো।
আরব্য জাতি নৌজাহাজ কী তা জানত না। রাসূল সা. হর্ষোৎফুল্ল হয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আমার উম্মাতের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে পরাক্রমশালী সম্রাটের মতো সামুদ্রিক তরঙ্গমালার ওপর দিয়ে সফর করবে। হযরত মুয়াবিয়া রা. সর্বপ্রথম নৌবহর পরিচালনা করেছেন।
নিছক নতুন হওয়ার দরুণ আধুনিক আবিষ্কার বা পদক্ষেপের ওপর ইসলাম আপত্তি তোলেনি। বৈধ উদ্দেশ্যে সাধনের জন্য বৈধ পরিধিতে অবস্থান করে আধুনিকতা প্রীতি প্রশংসিত।
সারা বিশ্বে আজ উলঙ্গপনা আর অশ্লীলতার নিত্যনতুন পন্থা ও পদ্ধতি আবি®কৃত হচ্ছে। পরস্পরের সন্তুষ্টিতে ব্যাভিচারকেও বৈধতার সনদ দেওয়া হচ্ছে, এমনকি আজ বৃটেনের সংসদে প্রবল করতালীর মাঝ দিয়ে সমকামিতার বিল মঞ্জুর করানো হয়েছে। এ কিসিমের আধুনিকতা প্রীতির পরিণতিতে আজ পশ্চিমা নারীরা গর্ভপাত ঘটানোর অনুমোদনের জন্য সোচ্চার হয়েছে। এ রকম আধুনিকতাপ্রীতি জঘন্য ও ধ্বংসাত্বক। তবে বিজ্ঞানের বহু আবিস্কার এমন যে, তার ব্যবহারের উপর বৈধতা ও অবৈধতা নির্ভর করে। যেমন টেপরেকর্ডার, এদ্বারা গানও শোনা যায় যা অবৈধ। আবার এ দ্বারা তিলাওয়াতও শোনা যায় যা বৈধ। বস্তুতঃ ব্যবহারকারী কোন কাজে তা ব্যবহার করবে তার উপর সেটি কল্যাণকর হওয়া বা অকল্যাণকর হওয়া নির্ভরশীল।
সর্বযুগের আলেমগণ সেযুগের অভিনব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। লোকদের সামনে বিদ্যুৎ, তার, টেলিফোন, টেলিপ্রিন্টার, ওয়্যারলেস, রেডিও, টেপরেকর্ডার, গাড়ি, মটর, হাওয়াই জাহাজ, ষ্টিমার, রেলগাড়ি, যুদ্ধাস্ত্রের মাঝে ট্যাংক, কামান নানান কিসিমের বোমা, ফাইটার বিমান, সাবমেরিন, রকেট, মিসাইল, রাডার, শিল্প বিষয়ক নানা রকমের মেশিন, কারখান; কৃষিবিষয়ক ট্রাকটর, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ঔষধ; চিকিৎসা বিষয়ক অপারেশনের যন্ত্রপাতি, রোগনির্ণয়ের যন্ত্রপাতি; শিক্ষাবিষয়ক কলা, বানিজ্য, হিসাব বিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, জ্যোতি বিদ্যা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের শিক্ষা অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে ইসলামের সাথে পরিচয় করাচ্ছে। ইসলামের সাথে মূলত: বিজ্ঞানের কোনো বৈপরীত্য নেই; যদি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রত্যক্ষ পরীক্ষা নিরীক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। ইসলাম চিরন্তন ও অপরিবর্তনশীল। খৃষ্টানদের মতো ইসলাম বিজ্ঞানশিক্ষাকে নিষেধ করেনি। ইউরোপের পুনর্জাগরণের সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ঈসায়ী ধর্ম ও তাদের পাদ্রীগণ। ইউরোপের উপর যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রন ছিল; ততক্ষণ সমগ্র ইউরোপ মূর্খতার আঁধারে আচ্ছন্ন ছিল। পাদ্রীগণ নিজস্ব নেতৃত্ব বজায় রাখার জন্য জনসাধারণের মাঝে শিক্ষাসচেতনতায় উদ্বুদ্ধ সকল আন্দলনকেই জোর করে দমন করার প্রানান্ত চেষ্টা করেছিল। জানহাস্ ও জেরুমের লোকদেরকে কন্সটান্স শহরে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নতুন নতুন পথ উন্মুক্ত করার অপরাধে বিজ্ঞানী গ্যালিলিত্তকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে চতুর্দিক থেকে এই জাগরণের প্রতিধ্বনি উঠতে থাকে। কোনো বাধাই তাদেরকে বিজ্ঞানচর্চা থেকে সরাতে পারেনি।
অবশেষে মার্টিন লুথার, জুহুলি সাহস করে পোপদের জগদ্দল পাথর রাস্তা থেকে অপসারণ করেছেন। সুযোগ করে দিয়েছেন এ বিপ্লবের প্রচার-প্রসারের। পরবর্তী যুগে রুশো, হারনিক, রেনানের মতো আধুনিকপন্থীরা ধর্মের ভিতর ব্যাপক পরিবর্তন করে ধর্মকে সেযুগের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন। জাতিকে পোপীয় আগ্রাসন থেকে মুক্তি দিয়েছেন, উৎকর্ষ ও অগ্রগতির পথ নিষ্কন্টক করেছেন। খৃষ্টান ধর্মের মতো ইসলাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতিতে শংকিত নয়। ইসলামের আলেমগণ পোপদের মতো কখনো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগ্রহণের বিরোধিতা করেননি। এ বিরোধিতা করার অধিকার কারো নেই। আলেগণ তো পোপদের মতো ধর্মপ্রবর্তক নন। তাছাড়া পোপ একটি নির্ধারিত গোত্র। যে কেউ পোপ হতে পারেন না। অথচ ইসলামে গোত্র-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই আলেম হওয়ার অধিকার রাখেন। প্রকৃত উদারতার ধর্ম ইসলাম। ফলে নিজস্ব ধর্মবাণী ও ব্যাখ্যা সুরক্ষিত। পোপতন্ত্রে ধর্ম অরক্ষিত, বিকৃত ও পরিবর্তিত।
বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল, কালজয়ী নয়। আজ যে থিওরি ও দর্শন সত্য বলে প্রতিভাত হচ্ছে; কাল তা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হচ্ছে। মূলত বৈজ্ঞানিক গবেষণা দুই ধরনের। ১. প্রত্যক্ষ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত। এ কিসিমের গবেষণা কখনো কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত প্রমাণিত হয়নি। হতে পারেই না। যেমন- মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ। এই তথ্য আধুনিক বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। অথচ কুরআন এ তথ্য চৌদ্দশ বছর আগে দিয়েছে- (আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে আকাশ সৃষ্টি করেছি এবং আমিই সম্প্রসারক।)
কুরআনের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিস্কৃত সম্প্রসারণ তথ্য সম্পূর্ণ মিলে যায়। এদেশ মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে আতংক। জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে মহাবিপদ মনে করছি। নবজাতকের মুখ দেখেই অস্থির। তার খাবার আসবে কোত্থেকে। বাসস্থান সংকুলান হবে কীভাবে। পশ্চিমারা জনসংখা হ্রাস করতে আজ জন্মনিয়ন্ত্রণে উৎসাহ দেয়। অথচ কুরআন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটার তথ্য দিয়েছে, দেশের আয়তন বৃদ্ধির প্রমাণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারপরও পশ্চিমাদের পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে প্রশান্তির ঢেকুর দিই। নবজাতকের হাত দুটো তো অকেজো নয়। গণচীন শতকোটি মানুষ নিয়ে কীভাবে জীবিত আছে! আমাদের দেশের মতো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেনি। জন্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়াই তারা এত অল্প সময়ের ভিতর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিস্ফোরণ ঘটাল। এখনো প্রতিটি নতুন শিশু তাদের জন্য আনন্দের বার্তা বয়ে আনে। তার মূলে আমরা দেখি যে, তারা প্রভাব তাড়িত নয়। পশ্চিমাদের ধোয়াটে কথা তাদের আদর্শের পথে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনি।
আরেকটি দৃষ্টান্ত। পৃথিবী ছাড়াও আরো অনেক গ্রহের অস্তিত্বের তথ্য প্রাচীন কাল থেকে মানুষ জানত (বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি)। আধুনিককাল আরো তিনটি গ্রহের অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। সেগুলো হল ইউরেনাস, নেপচুন ও প্লুটো। কুরআনে বর্ণিত হযরত ইউসুফ আ. স্বপ্নে ১১টি গ্রহ দেখেছিলেন। আমরা বিশ্বাস করি; অদূর ভবিষ্যতে আরো দুটো গ্রহ আবিস্কৃত হয়ে ১১টি সংখ্যা পূর্ণ হবে।
বিজ্ঞানীদের গবেষণার ২য় প্রকার ১. যা শুধু ধারণা অনুমানের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই প্রকারের বিজ্ঞানীরা নিশ্চত ফলাফলের সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনা। এ ধরনের আবিষ্কারই কুরআনের বিপরীত হয়ে থাকে। এ প্রকারের গবেষণার ব্যাপারে আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি ও মানসিকতা থাকবে এরূপ যে, সন্দেহতীতভাবে কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা উপর পূর্ণ ঈমান রাখতে হবে, আর অপূর্ণ জ্ঞানের কারণে বিজ্ঞান এখনো মূল তত্ত্ব উদঘাটন করতে পারেনি এরূপ বিশ্বাস রাখতে হবে। যেমন: আনষ্টাই ও তার মতালম্বী বিজ্ঞানীরা বলেছেন সূর্য ঘোরে। এ মত কুরআনের। সূরা ইয়াসিনে সূর্য ঘোরার বক্তব্য রয়েছে, সূর্য তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে।
কিন্তু নিউটন ও তার মতালম্বী বিজ্ঞানীরা বলেছেন, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে। এ দুটি মতের মাঝে বৈপরিত্য নেই। কেননা, সূর্য আপন কক্ষে পরিভ্রমনরত; এমতাবস্থায় পৃথিবী তার চারদিকে ঘুরে।
খৃষ্টানদের ধর্মগ্রন্থের চেয়ে বিপুল পরিমাণে বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্য, সূত্রের প্রতি কুরআনে আলোকপাত করা হয়েছে। কুরআন মূলত: হেদায়াতের গ্রন্থ। বৈজ্ঞানিক আলোচনা কুরআনে উদ্দেশ্যে নয়। তবু প্রাসঙ্গিকভাবে বহু ত্যথ কুরআনে আলোচিত হয়েছে।
বিজ্ঞানের যে সমস্ত তথ্য কুরআনে স্থান পায়নি, সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাদের দেওয়া তথ্য বিশ্বাসও করবো না, আবার মিথ্যারোপ করবো না। যেমন : পৃথিবী গোলাকার না চ্যাপ্টা, পৃথিবীর বয়স ইত্যাদি।
কিছু কিছু তথ্যের ব্যাপারে খোদ বিজ্ঞানীদের মাঝে মতভিন্নতা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে কুরআনে বা হাদীসে বর্ণিত তথ্যই আমরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবো। যেমন-‘ সূর্য থেকে পৃথিবীর জন্ম হওয়ার ধারনা। ’ বিষয়টি আমরা যেমন বিশ্বাসও করতে পারি না আবরা অবিশ্বাসও করতে পারি না। কোনো কোনো বিজ্ঞানী তা বলেছেন।
বিজ্ঞানীদের কিছু গবেষণা নিরর্থক। যেমন: মহাশূণ্য অভিযান। মহাশূণ্যযানের মাধ্যমে যদিও মানুষ প্রথমবার অতি কাছ থেকে চন্দ্র অবলোকন করেছে, নভোযান প্রেরণ থেকে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত মহাশূণ্য ভ্রমণের প্রতিটি স্তরই সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু মানবকল্যাণ এতে একদম অনুপস্থিত। অষ্টম এ্যাপোলো যাতায়াতে ব্যয় হয়েছিল বার হাজার কোটি টাকা। দশম এ্যাপোলোর ব্যয় তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি, ক্ষুধা ও দরিদ্রের কষাঘাতে পৃথিবী যেখানে জর্জরিত, কোঠি কোঠি আদম সন্তান পেট ভরে দুমুঠো খেতে পায় না, ঔষধ পথ্য ও চিকিৎসার অভাবে অসংক্ষ মানুষ কাতর-বিপন্ন , শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত; সেখানে লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ের এই অভিলাস কীভাবে করেন? যার মনে বিন্দুতম মানবতাবোধ আছে সে এরূপ নিঃস্ফল কাজে অর্থ ব্যায় করতে পারে না।
জাপানও বলেছে, ‘মহাশূণ্য অভিযান একদম অনর্থক খাটুনি। যুদ্ধবাজি ও শূণ্য বাজির পরিবর্তে সমুদ্র নিয়ে গবেষণা করে মানবকল্যাণ সাধন করা যায়। নিকটতম উপগ্রহ থেকেও সুমুদ্র মানুষের অভিযানের নাগালে। আমাদের পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ জুড়ে মহাসমুদ্র। বৈজ্ঞানিক গবেষণার বৃহৎ ক্ষেত্র যদি সুমুদ্রকে করাহয়, পৃথিবীর জনসংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দশগুণ বৃদ্বি পেলেও কেউ অন্ততপক্ষে না খেয়ে মরবে না। কারণ সমুদ্রের গভীরে খনিজ সম্পদের বিপুল সমাহার রয়েছে। তাছাড়া মহাশূণ্যের নভোচারীরা যদি অন্তর্দৃষ্টি খুলে গবেষণা করতেন, ইসলামের সত্যতার প্রামাণ্যচিত্র তাদের সামনে উদ্ভাসিত হত দিবালোকের মতো। রাসূল সা. এর মিরাজ গমনের সময় ‘বুরাক’ যানের দ্রুতগমন অগাধ আস্থা যুগিয়েছে এই মহাশূণ্য অভিযানে। বর্তমান যুগের নভোচারীরা এক ঘন্টার কম সময়ে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে প্রমাণ করেছেন, গতি নিদিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়।
বৈজ্ঞানিক তৎপরতা যতই সমৃদ্ধ হবে ইসলামের সত্যতা ততই সুস্পষ্ট হবে। একটি দেশ উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রধান চালিকাশক্তি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আবিষ্কারে ও ব্যবহারে অগ্রসরমানতা। যে জাতি যত বেশি উন্নত সে জাতি তত বেশি শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তি ব্যবহারে ঋদ্ধিমান। ইসলাম তো প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান চর্চাকে গুরুত্ব দিয়েছে। কোনো কোনো বিষয়ে ইসলাম প্রযুক্তিতে সম্পদশালী হওয়াকে অপরিহার্য করেছে। এমনকি প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হতে গিয়ে পরজাতি বা পরদেশের উপর নির্ভরশীলতাকেও ইসলাম অপছন্দ করেছে। প্রবাস থেকে প্রযুক্তি শিক্ষালাভ ভিন্ন ব্যাপার। তাই বলে স্বনির্ভর হওয়ার শক্তি পঙ্গু করে পরজাতির মুখাপেক্ষী থাকা সকলের কাছেই অগ্রহণযোগ্য।
উন্নয়নের একমাত্র সোপান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হওয়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আবশ্যক। আমাদের অতি আধুনিকমনা ভাইয়েরা নাচগান, বেপর্দা, সহশিক্ষা, খেলাধুলা ও পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রধান আকর্ষণ দিগম্বর হওয়াকে অগ্রগতির চাবিকাঠি মনে করেন। আর মোল্লাদের শিক্ষাকে মনে করেন অনগ্রসরমানতা ও স্থবিরতা। আল্লামা ইকবাল বলেছেন-
নগ্নঊরু প্রদর্শনীর যাদুতে বাড়েনি অগ্রগতি
দাড়ি গোঁফ কামিয়ে আসেনি উন্নতি
ধর্মহীনতায় পায়নি তারা সাফল্য
ইংরেজি অক্ষরে নেই কোনো যাদুমন্ত্র
পশ্চিমা উন্নতি এসেছে জ্ঞান-বিদ্যায়
আজ তারা মহাধনী মোদের ছেড়ে দেওয়া পেশায়
শার্ট-প্যান্ট-টাই পরার নাম নয় প্রগতি
দাড়ি-টুপি-পাগড়ী নয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিরোধী।
তাই আমাদেরকে উন্নতির সোপানে উঠতে হলে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষায় প্রতিযোগী হতে হবে। আইনকে শ্রদ্ধা করতে হবে। চারিত্রিক আচরণে অনন্য হতে হবে। বিজ্ঞান শিখবো আল্লাহর পরিচয় পাওয়ার জন্য। বিজ্ঞান শিখব নাস্তিক ও খোদাদ্রোহী শক্তিকে পরাস্ত করার জন্য। আল্লাহ তৌফিকদাতা।
লেখক: আব্দুল গাফ্ফার,