কবিতা ও রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবিতা ও রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৮ মে, ২০১৭

কামালুদ্দিন শামানী এর বিখ্যাত কবিতা-


من يأخذ العلم عن شيخ مشافهةً *** يكن من الزيف والتصحيف في حرمِ
ومن يكن آخذاً للعلم من صحف *** فعلمه عند أهل العلم كالعدم

“যে ব্যক্তি তাঁর শায়েখের নিকট থেকে সরাসরি ইলম শিক্ষা করে, সে বিকৃতি ও জালিয়াতি থেকে পবিত্র থাকে।
আর যে ব্যক্তি কিতাব পড়ে ইলম অর্জন করে, আলেমদের নিকট তার ইলম কোন ইলমই নয়”

আল্লামা শাওকানী (রহঃ) লিখেছেন,
إنَّ إنصاف الرجل لا يتمُّ حتَّى يأخذ كلَّ فنٍّ عن أهله كائناً ما كان

“কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত ন্যায়Ñনিষ্ঠার উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে জ্ঞানের প্রত্যেক শাখায় অভিজ্ঞ লোকদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করবে।”
আল্লামা শাওকানী (রহঃ) আরও বলেছেন,
وأمَّا إذا أخذ العلم عن غير أهله، ورجَّح ما يجده من الكلام لأهل العلم في فنون ليسوا من أهلها ، فإنَّه يخبط ويخلط

“আলেম যদি অযোগ্য লোকের কাছ থেকে ইলম শিক্ষা করে এবং জ্ঞানের সংশ্লিষ্ট শাখায় পারদর্শী নয় এমন লোকের বক্তব্যকে সে প্রাধান্য দেয়, তবে সে অনুমান নির্ভর এবং অবিমৃশ্যকারী।” [আদাবুত তলাব ও মুনতাহাল আরাব, পৃষ্ঠা-৭৬]
আল্লামা সাখাবী (রহঃ) লিখিত “আল-জাওয়াহিরু ওয়াদ দুরারু” নামক কিতাবে রয়েছে,
"من دخل في العلم وحده؛ خرج وحدَه"

“যে ব্যক্তি একাকী ইলমের পথে প্রবেশ করল, সে একাকী সেখান থেকে বের হয়ে গেল”
[আল জাওয়াহির ওয়াদ দুরার, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৫৮]

বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৬

ওহে নাবী.......................


ওহে তুমি তো আমার কাণ্ডারি,
তুমি তো আমার পথের দিশারি।
,
তুমি আমার অন্ধকারের জোনাকি আলো,
তোমার আলোয় আলোকিত এই শিষ্য।
,
তুমি আমার সত্য পথের সম্বল,
তুমি বিহীন জীবন আমার অচল।
,
তুমি এসেছিলে মরু প্রান্তরে,
দাওয়াত দিয়েছে মানব প্রানে। 
.
আমি যেন হতে পারি তোমার আদর্শের প্রদীপ,
সেই প্রদীপে আলোকিত হবে সৃষ্টির সেরা জীব। 
,
তুমি ঘুমিয়ে আছ সবুজ গম্বুজের ছায়ায়,
আমি তোমায় স্মরণ করি শাফায়াতের আশায়।
,
স্মরণ করো সেদিন এই উম্মত কে,
যে দিবানিশি দুরুদ পরে তোমারি তরে।


মঙ্গলবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৬

আর্তনাদ...............

Emran Hossain Adib

খারাপ বন্ধু,আর হারাম পানীয় আজ আমায় অন্ধকার জগতে নিয়ে গেছে।সত্যের আলো আজ আমার সম্মুখে আলোকিত হয় না।মাদক আমার আলোকে নির্বাপিত করে দিয়েছে।ভাল কথা শুনলে বরদাশত হয় না।আমার অন্তর আজ সংকুচিত,মদ আমার অন্তর কে সত্য উন্মোচিত হওয়া থেকে আবদ্ধ করে রেখেছে।

শয়তান আমার পিছু ছাড়ছে না।শয়তান রূপী বন্ধু গুলো আমায় সে পথে বাধ্য করেছে।মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি আমার অন্তরে ধ্বনিত হয় না।বন্ধুদের আড্ডা আমায় মাতিয়ে রাখে সারাক্ষণ।জান্নাত আমার সম্মুখে আজ মদের ছায়ায় আবৃত। জাহান্নামের পর্দা আমার সম্মুখে উন্মোচিত।


বাবা মার কথা যেন আর ভাল লাগেনা। বড় ভাইয়ার কথা গুলো কর্ণে ধ্বনিত হয় না।ছোট বোনের কান্নার অশ্রু আমায় কাঁদায় না।মৃত্যু শয্যায় কাতর ছোট ভাইয়ের সেই উক্তি গুলো আমায় সাড়া দেয় না।শিক্ষকদের সেই নসিহত আমার স্বরন হয় না।
সব খারাপ বন্ধুদের আসৎ সঙ্গের কারন।একজন খারাপ বন্ধু আপনার সুন্দর জগত কে অন্ধকার করে দিতে পারে।একজন ভাল বন্ধু আপনার অন্ধকার জগত কে আলোকিত করে দিতে পারে।আপনার নামাজি বন্ধু আপনাকে নামাজের দিকে ডাকবে।আর খারাপ বন্ধু আপনাকে আলোকহীন পথের পথিক বানাবে।
তাই সৎ সঙ্গ চাই। সমাজে একজন ভাল বন্ধুর বরই প্রয়োজন।আপনি আপনাকে চিনুন।কে আপনি ? কেন আপনার এই আগমন ?আল্লাহ্‌ আপনার কাছে কি চান। বিবেক কে কাজে লাগান। অন্যথয় জাহান্নাম আপনার জন্য অপেক্ষমান।
দুনিয়া আপনাকে ত্যগ করতেই হবে।আর যা আপনার কাছে চাঁদের আলোর ন্যয় স্পস্ট। কিন্তু তা সত্যও আমরা আজ শয়তানের জালে আবদ্ধ। আল্লাহ্‌ আমাদের কে সত্য পথের পথিক বানাক।


শুক্রবার, ২৪ জুন, ২০১৬

ওহে নাবী. ইমরান হুসাইন আদিব


ওহে নাবী......................................................
তুমিতো আমাদেৱ সর্দাৱ ৱহমাতুল লিল আলামিন৷
তুমিতো আমাদেৱ সুপাৱিশ কারী সাফিয়ুল
মুজনিবীন৷
তুমিতো সব নবীৱ সর্দার সাইয়েদুল মূরসালিন৷
তুমিতো আল্লাহর প্রেরিত দুত আখিরুন্নাবিয়্যিন৷
তুমিতো সকলেৱ বিশ্বস্ত মানব আলআমিন৷
,
ওহে নাবী .........................................................
তুমিঁতো আমার জীবন পথে চলার দিশারী।
তুমিতো আমার জীবন পথে অনুপ্রেরনার বানী
তুমিতো আমার জীবনের ভালবাসার স্পন্দন ।
,
ওহে নাবী.........................................................
তুমিতো উজ্জ্বল নক্ষত্রের চাইতেও অতি সুন্দর। 
তুমিতো সূর্যের আলোর চাইতেও বেশি প্রখর।
তুমিতো চাঁদের আলোর চাইতেও বেশি উজ্জ্বল।
,
ওহে নাবী..................................................................
তোমায় ভাল বেশে পেতে চাই রোজ হাশরের
সেই সাফাআত।
তোমায় ভাল বেশে পেতে চাই সেই নেয়ামত 
সুখময় জান্নাত।
তোমায় ভাল বেশে যেন পাই মেহেরবান খোদার
দর্শন সেই রুয়াত।
হে নাবী
তাই আমি  তোমার আলোয় আলোকিত হয়ে 

সোনার জীবন গড়তে চাই। আমি হতে চাই সে
 পথের পথিক,যে পথের জন্য তুমি তোমার জীবন 
কে বিলিয়েদিয়েছিলে।সত্যিই তুমি মহান 
আল-আলামিন

বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৫

রণ-ভেরী

কাজী নজরুল ইসলাম
[গ্রীসের বিরুদ্ধে আঙ্গোরা-তুর্ক-গভর্ণমেন্ট যে যুদ্ধ চালাইতেছিলেন, সেই যুদ্ধে কামাল পাশার সাহায্যের জন্য ভারতবর্ষ হইতে দশ হাজার স্বেচ্ছা-সৈনিক প্রেরণের প্রস্তাব শুনিয়া লিখিত। ]
ওরে আয় !
ঐ মহা-সিন্ধুর পার হ’তে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়-
ওরে আয় !
ঐ ইসলাম ডুবে যায় !
যত শয়তান
সারা ময়দান
জুড়ি’ খুন তার পিয়ে হুঙ্কার দিয়ে জয়-গান শোন্ গায়!
আজ শখ ক’রে জুতি-টক্করে
তোড়ে শহীদের খুলি দুষমন পায় পায়-
ওরে আয় !
তোর জান যায় যাক, পৌরুষ তোর মান যেন নাহি যায়!
ধরে ঝঞ্ঝার ঝুঁটি দাপটিয়া শুধু মুসলিম-পঞ্জায়!
তোর মান যায় প্রাণ যায়-
তবে বাজাও বিষাণ, ওড়াও নিশান! বৃথা ভীরু সমঝায়!
রণ-দুর্ম্মদ রণ চায়!
ওরে আয়!
ঐ মহাসিন্ধুর পার হ’তে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়!
ওরে আয়!
ঐ ঝন-নন-নন রণ-ঝন-ঝন ঝঞ্ঝনা শোনা যায়!
শুনি এই ঝঞ্ঝনা-ব্যঞ্জনা নেবে গঞ্জনা কে রে হায়?
ওরে আয়!
তোর ভাই ম্লান চোখে চায়,
মরি লজ্জায়,
ওরে সব যায়,
তবু কবজায় তোর শমশের নাহি কাঁপে আফসোসে হায়?
রণ দুন্দুভি শুনি’ খুন-খুবী
নাহি নাচে কি রে তোর মরদের ওরে দিলীরের গোর্দ্দায় ?
ওরে আয় !
মোরা দিলাবার খাঁড়া তলোয়ার হাতে আমাদেরি শোভা পায়
তারা খিঞ্জির যারা জিঞ্জীর-গলে ভূমি চুমি’ মুরছায়!
আরে দূর দূর! যত কুক্কুর
আসি শের-বব্বরে লাথি মারে ছি ছি ছাতি চ’ড়ে! হাতি
ঘাল হবে ফেরু-ঘায় ?
ঐ ঝননননন রণঝন ঝন ঝঞ্ঝনা শোনা যায়!
ওরে আয় !
বোলে দ্রিম্ দ্রিম্ তানা দ্রিম্ দ্রিম্ ঘন রণ-কাড়া নাকাড়ায়!
ঐ শের নর হাঁকড়ায়-
ওরে আয়!
ছোড়্ মন-দুখ,
হোক্ কন্দুক
ঐ বন্দুক তোপ, সন্দুক তোর পড়ে থাক্, স্পন্দুক বুক ঘায় !
নাচ্ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ।
থৈ তান্ডব, আজ পান্ডব সম খান্ডব-দাহ চাই!
ওরে আয় !
কর্ কোরবান আজ তোর জান দিল্ আল্লার নামে ভাই!
ঐ দীন্ দীন্-রব আহব বিপুল বসুমতী ব্যোম ছায়!
শেল- গর্জ্জন
করি’ তর্জ্জন
হাঁকে ‘বর্জ্জন নয় অর্জ্জন’ আজ, শির তোর চায় মা’য়!
সব গৌরব যায় যায়;
ওরে আয়!
বোলে দ্রিম্ দ্রিম্ তানা দ্রিম্ দ্রিম্ ঘণ রণ-কাড়া-নাকাড়ায়!
ওরে আয়!
ঐ কড় কড় বাজে রণ-বাজা, সাজ সাজ রণ-সজ্জায়!
ওরে আয়!
মুখ ঢাকিবি কি লজ্জায়?
হুর্ হুররে!
সেই পুর রে যথা-খুন-খোশ্ রোজ খেলে হররোজ দুষমন-খুনে ভাই!
সেই বীর-দেশে চল বীর-বেশে,
আজ মুক্ত দেশে রে মুক্তি দিতে রে বন্দীরা ঐ যায়!
ওরে আয়!
বল্ ‘জয় সত্যম্ পুরুষোত্তম্’ ভীরু যারা মা’র খায়!
নারী আমাদেরি শুনি’ রণ-ভেরী হাসে খল খল হাত-তালি দিয়ে রণে ধায় !
মোরা রণ্ চাই রণ চাই,
তবে বাজহ দামামা, বাঁধহ আমামা, হাথিয়ার পাঞ্জায়!
মোরা সত্য ন্যায়ের সৈনিক, খুন-গৈরিক বাস গা’য়
ওরে আয়!
ঐ কড় কড় বাজে রণ-বাজা, সাজ সাজ রণ-সজ্জায়!
ওরে আয়!
অব- রুদ্ধের দ্বারে যুদ্ধের হাঁক নকীব ফুকারি’ যায়!
তোপ্ দ্রুম্ দ্রুম্ গান গায় !
ওরে আয় !
ঐ ঝনন রণণ খঞ্জর-ঘাত পঞ্জরে মূরছায়!
হাঁকো হাইদার,
নাই নাই ডর,
ঐ ভাই তোর ঘুর-চর্খীর সম খুন খেয়ে ঘুর্ খায়!
ঝুটা দৈত্যেরে নাশি’ সত্যেরে
দিবি জয়-টীকা তোরা, ভয় নাই ওরে ভয় নাই হত্যায়!
ওরে আয়!
মোরা খুন্-জোশী বীর, কঞ্জুশী লেখা আমাদের খুনে নাই!
দিয়ে সত্য ও ন্যায়ে বাদশাহী, মোরা জালিমের খুন খাই!
মোরা দুর্দ্দম, ভর্ পুর্ মদ
খাই ইশকের, ঘাত শমশের ফের নিই বুক নাঙ্গায়!
লাল- পল্টন মোরা সাচ্চা,
মোরা সৈনিক, মোরা শহীদান বীর বাচ্চা,
মরি জালিমের দাঙ্গায় !
মোরা অসি বুকে বরি’ হাসি মুখে করি’ জয় স্বাধীনতা গাই!
ওরে আয়!
ঐ মহা-সিন্ধুর পার হ’তে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়!!

শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৫

কবিতাগুচ্ছ : সুখ পাখি, রহমতে রাসূল, তোমরা হবে


[সুখ পাখি]
সৈয়দা সুফিয়া খাতুন:

সুখ পাখিরে আমায় একটি সুখের বড়ি এনে দাও
দুঃখ পাখি যে মনের ভিতর বাসা বেঁধেছে,
সুখ যে আমার চলে গেছে অচিন পুরের দেশে।
এতো ডাকি তবু কেন আসে নাকো কাছে?
ঘুম আসেনা রাতে দিনে ঘুমের বড়ি খেয়ে মরি,
দাওনা আমায় সুখের বড়ি,
লক্ষ টাকা দিয়ে কিনবো আমি।

আমার রাজ প্রসাদ নিয়ে যাও
সুখের বাড়ি দিয়ে যাও,
আমার হীরার গহনা নিয়ে যাও
সুখের গহনা দিয়ে যাও।
আমার দামী কাপড় নিয়ে যাও
সুখের কাপড় দিয়ে যাও
সুখ পাখিরে কোথায় গেলি
আয়না ফিরে আয়।

আমার যা কিছু আছে সব দিব তোকে
আর পারিনা সইতে আমি, ছটফট করে মন।
ঘরে আমার মন বসে না,
বাহিরে গেলে কেহ আমায় ভালবাসেনা।
কষ্টে আমার কলিজা ফেটে যায়।
জীবন আমার জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেল।

কি করিব কোথায় যাব, কিছুই বুঝিনা।
কে আছ আমায় এনে দাওনা একটি সুখের বড়ি।
আমার যা কিছু আছে সব দিব তোমায়
আমায় একটি সুখের বড়ি এনে দাও।
ও পাখিরে আমায় একটা কিছু বল না!
চুপটি করে থাকিস না।

সুখ পাখি বলে, সুখের বড়ি আছেরে আমার কাছে
জীবনে যত পাপ করেছিলে ক্ষমা চেয়ে নে রে তাদের কাছে,
তোর যা কিছু আছে সব বিলিয়ে দে রে আল্লাহর রাহে।
একদিন দেখবিরে তোর সুখপাখি
ফিরে এসে গেছে তোরই মনের মাঝে।

[রহমতে রাসূল]
আলী আশরাফ:

তুমি স্বর্গীয় পুষ্পকানন;
ধরায় করেছো আগমন।
তব সৌরভে বিশ্ব মাতোয়ারা;
গাছপালা নদী নালা।
আকাশ বাতাস আর রৌশন সিতারা;
সবি তোমার প্রেমে পাগল পারা।
কোথাও যখন ছিল না মানবতা,
বিরাজ করছিল পাশবিকতা,
তখন ছড়িয়ে দিলে রহমতের বারিধারা।
তুমি হেদায়াতের ফোয়ারা; আলোর মিনারা।
তব চরনে ধন্য আরবের মরু সাহারা।
তুমি প্রেমের ফুল; রহমতে রাসূল।
তোমায় দেখতে আমি ব্যকুল।
শয়নে স্বপনে তুমি,
হৃদয় গভীরে তুমি;
বিজনে শুধু তোমায় ভাবি,
তব বিনে সর্বহারা আমি।

[তোমরা হবে]
আব্দুল হাকিম:
তোমরা হবে এ জাযানার
নাবিক সিন্দাবাদ।
আনবে ছিনে তারার মিছিল
পূর্ণিমার ঐ চাঁদ।
তোমরা হবে গগন মানিক
ভোরের প্রভাকর
নিত্যদিনই উঠবে জেগে
দূর করে আধার।
তোমরা হবে সত্য ন্যায়ের,
দ্বীন বিজয়ের ঝান্ডা
আসবে ফিরে আগের মত
ইসলামের মানটা।
তোমরা হবে অটুট পাহাড়,
প্রাচীর সীসা ঢালা
সমন্বয়ে চলবে সবাই হবে
দ্বীনের ফেরিওয়ালা।
তোমরা হবে বনের কোকিল
গাইবে ন্যায়ের গান
ঘুমন্ত সব উঠবে জেগে
ফিরবে দেহে প্রাণ।

[রূপের বাহার]
মোবাশ্বির আহমদ:

দেশটা আমার রূপে ভরা;
রূপের নেইকো শেষ।
যেথায় তাকাই সেথাই দেখি
রূপে সমাবেশ।
মাঠের পরে মাঠ শুধু
ফুল ফসলে ভরা;
ঝরনা পাহাড় সাগর নদী
সবই নয়ন কাড়া।
রূপে গুনে কোনো দিকে
নেই কোনো কমি।
এই দেশেতে জন্ম নিয়ে
ধন্য তুমি আমি।


মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০১৫

এক আল্লাহ জিন্দাবাদ

-কাজী নজরুল ইসলাম
উহার প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ;
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্রাহ জিন্দাবাদ।
উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ,ডোবার ক্লেদ,
আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অবেদ।
উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদী দর্জা চাই;
নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুজে বেড়াই!
ওরা মরিবেনা, যুদ্ব বাধিঁলে ওরা লুকাইবে কচুবনে,
দন্তনখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে ।
ওরা নির্জবি জীব নাড়ে তবু শুধূ স্বার্থ ও লোভবশে,
ওরা জিন,প্রেত, যজ্ঞ, উহারা লালসার পাঁকে মুখ ঘষে ।
মোরা বাংলার নব যৌবন,মৃত্যুর সাথে সঞ্ঝরী,
উহাদের ভাবি মাছি পিপীলিকা, মারি না ক তাই দয়া করি।
মানুষের অনাগত কল্যাণে উহারা চির অবিশ্বাসী,
অবিশ্বাসীরাই শয়তানী-চেলা ভ্রান্ত-দ্রষ্টা ভুল-ভাষী।
ওরা বলে, হবে নাস্তিক সব মানুষ, করিবে হানাহানি ।
মোরা বলি, হবে আস্তিক, হবে আল্লাহ মানুষে জানাজানি।
উহার‍া চাহুক অশান্তি; মোরা চাহিব ক্ষমাও প্রেম তাহার,
ভূতেরা চাহুক গোর ও শ্মশান, আমরা চাহিব গুলবাহার !
আজি পশ্চিম পৃথিবীতে তাঁর ভীষণ শাস্কি হেরি মানব
ফিরিবে ভোগের পথ ভয়ে, চাহিবে শান্তি কাম্য সব।
হুতুম প্যোচারা কহিছে কোটরে, হইবেনা আর সূর্যোদয়,
কাকে আর টাকে ঠোকরাইবেনা, হোক তার নখ চঞ্জু ক্ষয়।
বিশ্বাসী কভু বলেনা এ কথা, তারা আলো চাই, চাহে জ্যোতি;
তারা চাহে না ক এই উৎপীড়ন এই অশান্তি দূর্গতি।
দাঙ্গা বাঁধায়ে লুট করে যারা, তার লোভী , তারা গুন্ডাদল
তার দেখিবেনা আল্লাহর পথ চিরনির্ভয় সুনির্মল ।
ওরা নিশিদিন মন্দ চায় , ওরা নিশিদিন দ্ন্ধ চায়,
ভূতেরা শ্রীহীন ছন্দ চায়, গলিত শবের গন্ধ চায়!
নিত্য সজীব যৌবন যার, এস এস সেই নৌ-জোয়ান
সবূক্লৈব্য করিয়েছে দূর তোমাদেরই চির আত্বদান !
ওরা কাদা ছুড়ে বাধা দেবে ভাবে -ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ,
মোরা ফুল ছড়ে মারিব ওদের, বলিব - ‘‘আল্লাহ জিন্দাবাদ”

শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০১৫

খুকী ও কাঠবিড়ালি

খুকী ও কাঠবিড়ালি
—কাজী নজরুল ইসলাম
কাঠবিড়ালি! কাঠবিড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি-নেবু? লাউ?
বিড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও—
ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক,
খাও একা পাও যেথায় যেটুক!
বাতাবি-নেবু সকলগুলো
একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো!
তবে যে ভারি ল্যাজ উঁচিয়ে পুটুস পাটুস চাও?
ছোঁচা তুমি! তোমার সঙ্গে আড়ি আমার! যাও!
কাঠবিড়ালি! বাঁদরীমুখী! মারবো ছুঁড়ে কিল?
দেখবি তবে? রাঙাদাকে ডাকবো? দেবে ঢিল!
পেয়ারা দেবে? যা তুই ওঁচা!
তাই তোর নাকটি বোঁচা!
হুতমো-চোখী! গাপুস গুপুস
একলাই খাও হাপুস হুপুস!
পেটে তোমার পিলে হবে! কুড়ি-কুষ্টি মুখে!
হেই ভগবান! একটা পোকা যাস পেটে ওর ঢুকে!
ইস! খেয়ো না মস্তপানা ঐ সে পাকাটাও!
আমিও খুবই পেয়ারা খাই যে! একটি আমায় দাও!
কাঠবিড়ালি! তুমি আমার ছোড়দি’ হবে? বৌদি হবে? হুঁ!
রাঙা দিদি? তবে একটা পেয়ারা দাও না! উঃ!
এ রাম! তুমি ন্যাংটা পুঁটো?
ফ্রকটা নেবে? জামা দুটো?
আর খেয়ো না পেয়ার তবে,
বাতাবি-নেবুও ছাড়তে হবে!
দাঁত দেখিয়ে দিচ্ছ ছুট? অ’মা দেখে যাও!
কাঠবেড়ালি! তুমি মর! তুমি কচু খাও!!

বুধবার, ৮ জুলাই, ২০১৫

প্রিয় আন্দালুস! তোমাকে মনে পড়ে-৩

প্রিয় আন্দালুস! তোমাকে মনে পড়ে-৩
যেতে হবে সমুদ্রপথে। জাহাজ লাগবে অনেক। কারো মতে তখন ব্যবস্থা ছিলো মাত্র ৪টি জাহাজের। তাও আবার ভাড়া করা। কেউ বলেন― না, তখন এ অভিযানকে সামনে রেখেই তৈরী করা হয়েছিলো অনেক জাহাজ। কিন্তু জাহাজ-যে কম ছিলো― এটিই ঐতিহাসিকভাবে বেশি নির্ভরযোগ্য মত। যাইহোক; সেই জাহাজে করেই শুরু হলো আন্দালুস অভিমুখে নৌ-অভিযান। সবাই একসঙ্গে যাওয়া সম্ভব হলো না। যেতে হলো দলে দলে। যারা গেলো তারা পাহাড়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় বেছে নিলো। আত্মগোপনের মতো করে অবস্থান করলো। সবাই আসার পর তারিক বিন যিয়াদ যুদ্ধের জন্যে ধীরে ধীরে সবাইকে প্রস্তুত করতে লাগলেন। রণকৌশলের অংশ হিসাবে প্রথমেই আশপাশের এলাকাগুলো তিনি বিজয় করে ফেললেন। আলজাযিরাতুল খাযরা বা ‘সবুজ দ্বীপ’ এলাকাটি ছিলো পাহাড়ের (জাবালুত তারিক-এর) মুখোমুখি। প্রথমেই তিনি এ সবুজ-শ্যামল এলাকাটি দখল করে ফেললেন। সেই সঙ্গে আশপাশের আরো কিছু এলাকা। এরমধ্যেই সম্রাট লডারিকের কাছে সংবাদ পৌঁছে গেলো যে, মুসলিম সৈন্যরা আন্দালুসে পা রেখেছে। লডারিক অবিলম্বে তাদেরকে মুকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিলো। প্রথমেই পাঠালো একটি বিশেষ বাহিনী। কিন্তু সে বিশেষ বাহিনী শোচনীভাবে পরাস্ত হলো তারিক বাহিনীর কাছে। একজন মাত্র জানে বেঁচে পালিয়ে গিয়ে লডারিককে জানাতে পারলো শুধু নিজের বেঁচে-যাওয়ার আশ্চর্য কাহিনী!
এরপর লডারিক নিজেই যুদ্ধযাত্রার ঘোষণা দিলো। সাজসাজ রবে প্রস্তুত হলো এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী। এক সময় যাত্রা হলো এ বাহিনীর। ওদের চোখে-মুখে দম্ভ ও অহমিকা ঠিকরে পড়ছিলো। লডারিকের নেতৃত্বে এগিয়ে আসছে খৃষ্টান বাহিনী― এ-খবর যথা সময়ে তারিক জানতে পারলেন। লডারিকের সাথে মহাযুদ্ধে নামার আগেই তারিক আরো সৈন্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন মূসা ইবনে নোসায়রের কাছে। যথা সময়ে সে সাহায্যও এসে গেলো। আরো ৫০০০ সৈন্য এসে যোগ দিলো মুসলিম শিবিরে। এখন মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ১২ হাজার।
‘শাদূনা’ শহরের কাছে ‘ওয়াদি লাক্কা’য় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তারিক বাহিনী ও লডারিক বহর। মাত্র ১২ হাজার সৈন্য দেখে লডারিক বাহিনীর আনন্দের কোনো সীমা রইলো না। ওদের চোখে মুখে একটা ভাবই কেবল ফুটে উঠছিলো― তোমাদের যুদ্ধসাধ মিটিয়ে দেবো আমরা মাত্র কয়েকঘন্টায়!
একদিকে এক লাখ আরেকদিকে বার হাজার। ভীষণ অসম চিত্র। মুসলিম সৈন্যদের মনোবলে যেনো দুশমনের সংখ্যাধিক্য কোনো চির ধরাতে না পারে, সে জন্যে তারিক বিন যিয়াদ সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে ঈমান জাগানিয়া এক ভাষণ দিলেন― লডারিকের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার ঠিক আগে। একটু পরই শুরু হবে যুদ্ধ। কিন্তু তার আগে আমরা নজর দেবোে একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে।
চার.
না! সে ভাষণের আগে কিংবা তারও আগে―জাহাজ থেকে নেমে তিনি সবগুলো জাহাজ কিংবা কোনো একটি জাহাজ পুড়িয়ে দেন নি! যারা এ জাহাজ পুড়ানোর ঘটনা প্রচার করে, না-জেনে .. না-বোঝেই প্রচার করে।
কেনো তিনি জাহাজ পুড়িয়ে দেবেন?
কার জাহাজ পুড়িয়ে দেবেন?
যদি ভাড়া করা হয়ে থাকে তাহলে তো এগুলো অন্যের সম্পদ! অন্যের সম্পদ কে পুড়িয়ে দেয়? আর যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ হয়, তাহলে কেনো তিনি এতো দামী জিনিস পুড়িয়ে নষ্ট করে দেবেন? অপচয় হবে না কি?
আর যদি শুধু এ-অজুহাতে তিনি সবগুলো জাহাজ পুড়িয়ে দিয়ে থাকেন যে, এতে মুসলিম সৈন্যরা আর পালিয়ে যেতে পারবে না, যুদ্ধ তাদেরকে করতেই হবে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, তাহলে মুসলিম সৈনিকদের শিশিরশুভ্র চরিত্রে কি ছুরি চালানো হয় না?! এমন বাহিনীই কি তারিখ আন্দালুস বিজয়ের জন্যে নিয়ে এসেছিলেন― যারা পালিয়ে যেতে পারে সুযোগ পেলেই!
আস্তাগফিরুল্লাহ!
পাঁচ.
তারিখ বিন যিয়াদের ভাষণে বুঝি যাদু ছিলো। ঈমানী চেতনায় ও জিহাদী জযবায় সৈন্যরা দ্যুতিময় বীরত্বের প্রহর গোনতে লাগলো। এরপর যুদ্ধ যখন শুরু হলো তখন সে চেতনা ও জযবা সত্যি সত্যি দ্যুতি ছড়াতে লাগলো। আটটি সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের পর মুসলিম শিবিরের পূব আকাশে মহাবিজয়ের লাল সূর্যটি যেনো হাসতে হাসতে উদিত হলো!
সঙ্গে সঙ্গে আন্দালুসের বুকে সূচিত হলো মহাবিজয়ের এক পুণ্যযাত্রা!
আগামী আটশত বছরে গড়ে ওঠবে যে-কালজয়ী গর্বিত সভ্যতা, এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হলো তার মুবারক সফর!
এ অসম লড়াইয়ে শহীদ হলেন তিনহাজার মুজাহিদ। আর লডারিক পালিয়ে গেলো এবং হারিয়ে গেলো। আর কখনো এ নামটা আন্দালুসের ইতিহাসে প্রবেশ করতে পারে নি। কেউ বলেন: যুদ্ধেই সে মারা গিয়েছিলো। কেউ বলেন পালিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু কিছুদূর যেতেই পানিতে ডুবে মারা গেলো।
বন্ধু!
যে-বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ও বাদশার এ-করুণ পরিণতি, সে বাহিনীর অবস্থা ‘ঐ জিজ্ঞাসে কোন্ জন’? তা-যে আরো বেশি করুণ, তা না-বললেও তো বোঝা যায়!
তবুও অগভীর কৌতূহল মিটানোর জন্যে এক কথায় বলা যায়― ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলো তার বিশাল সৈন্যবাহিনী!

সিরিজ : ফিলিস্তিনের পাথরশিশু ক্ষুদে বীর- ১

সিরিজ : ফিলিস্তিনের পাথরশিশু
ক্ষুদে বীর- ১
এক.
সমুদ্র ঘেষা গাজা শহরটি যেনো ফিলিস্তিনের রানী। ইসরাঈলী বিমান আক্রমণের আশঙ্কা না-থাকলে সমুদ্রের পাড়ে শিশু-কিশোর ও অন্যদের ভিড় লেগেই থাকে। শুধু সমুদ্রতীর বলেই কথা না, সুযোগ পেলেই শিশু-কিশোররা গাজার মাঠে ময়দানে এসে জড়ো হয়। কথা বলে। ঠিকমত ক্ষেতে না-পারার কষ্টের কথা। ঠিকমত মাদরাসায় যেতে না-পারার কষ্টের কথা। প্রিয়জন হারানোর বেদনার কথা। কর্মস্থল থেকে হঠাৎ বাবা’র আর ফিরে না-আসার কথা। নিরানন্দ ঈদের কথা। আরো কতো কথা। মাঝে মাঝে কথা ওঠে পাথর নিয়ে। পাথর সঞ্চয় করে রাখার কৌশল নিয়ে। কার কাছে কী পরিমাণ পাথর রাখা আছে— ওঠে সে কথাও। পাথর নিয়ে ওদের আলোচনা শুরু হলে শেষ হতে চায় না যেনো। ইসরাঈলী সৈন্য চোখে পড়লে ওদের মুখোমুখি হয় ওরা— এই পাথর নিয়েই। মাথা উঁচিয়ে .. বুক চেতিয়ে দখলদার সৈন্যদের সামনে দাঁড়াতে ওরা জীবনের কোনো মায়া করে না। শুধু পাথর হাতে একটা ধ্বংসাত্মক টেংককে চ্যালেঞ্জ করতেও ওদের বুক একটু কাঁপে না। এ দৃশ্য সকালের ¯িœগ্ধতা-ছড়ানো সূর্যি যেমন দেখে চলেছে তেমনি দেখে যাচ্ছে ফিকে আলোর অস্তাচলগামী লালিমা-ছড়ানো সূর্যি। আরো দেখছে ফিলিস্তিনময় ছড়ানো ত্বীন-যাইতুনের সারি। এ সবের নীরব সাক্ষি আহত আল আকসা। ঐতিহাসিক কুব্বাতুস সাখরা।
দুই.
গাজা’র একটা উন্মুক্ত মাঠের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে একদল শিশু। শিশুই সব। সবচে’ বড় শিশুটির বয়সও দশ পেরুবে না। ওরা বেশ উত্তেজিত। পাড়ায় ডাকাত পড়লে যে-উত্তেজনায় মানুষ যার যা আছে তা-ই নিয়ে বেরিয়ে আসে, ওরাও ঠিক সেভাবে হাতে পকেটে পাথর নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে ইহুদী সৈন্যদেরকে ধাওয়া করতে। গায়ে গতরে বা রক্তে মাংসে ওরা তো ষোলভাগ শিশু। কিন্তু এখন ওদেরকে ঠিক শিশু মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে একেকটা যেনো সিংহ-শার্দুল। এ দৃশ্য গাজায় নতুন না। ইন্তিফাদা শুরু হওয়ার পর থেকেই শিশুরা অনুপ্রবেশকারী ইহুদীদেরকে দেখলেই তাকবীর ধ্বনি দিয়ে পাথর যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে। এ দৃশ্যের সবচে’ মজাদার পর্বটি কি বলতে পারো? সে হলো— শিশুদের পাথরবৃষ্টির ঘাই খেতে-খেতে ভীত-সন্ত্রস্ত ইহুদী সৈন্যদের পড়ি-মরি করে সাঁজোয়াযানের দিকে ভু-দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া! এ দৃশ্যটা আসলেই দৃষ্টিনন্দন। উড়ে এসে জুড়ে-বসা দখলদারদের অমন ভাগুড়া ছবি সত্যি স্বাধীনতা-হারানো ফিলিস্তিনীদের কাছে অনেক মজার, অনেক কাক্সিক্ষত। তুমি ফিলিস্তিন ছাড়া অমন দৃশ্য আর কোথাও খুঁজে পাবে না। যখন থেকে ইন্তিফাদা শুরু হয়েছে তখন থেকেই ক্ষুদে ক্ষুদে শিশুরা পাথরশিশু হয়ে গেছে। শক্ত কঠিন পাথরের পরশে (সং¯্রবে) ওদের ¯িœগ্ধ-কোমল মোলায়েম হাতগুলো পাথরের মতোই শক্ত হয়ে গেছে। হাতে পাথর। বুকপকেটে পাথর। স্কুলব্যাগে পাথর। ঘরের ঐ কোণটায়ও পাথর। শুইতে যায় ওরা যে-বালিশটায়, তার নিচেও পাথর। মা-বাবা’র অলক্ষ্যে আরো কতো জায়গায় ওরা লুকিয়ে রাখে কতো পাথর! এভাবেই পাথরের সাথে গড়ে উঠেছে ওদের বন্ধু-বন্ধু ভাব। পাথর ধরতে-ধরতে ওদের হাতই শুধু শক্ত হয় নি, পাথরের সাথে থাকতে-থাকতে ওদের মনও এক রকম পাথর হয়ে গেছে। আত্মীয় ও আপন হারানোর বেদনায় এখন আর ওরা আগের মতো ব্যথিত হয় না। অশ্রু ঝরায় না। শোক ছাপিয়ে সামনে চলে আসে ক্ষোভ। ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় প্রতিশোধ-স্পৃহা। সেই স্পৃহায় জ্বলতে থাকে ওদের চোখে ক্ষোভের দাবানল। শহিদী লাশের পাশে দাঁড়িয়ে সেই জ্বলজ্বলে দীপ্ত অনলময় চোখে ওরা তাকায় একবার রক্তাক্ত লাশের দিকে আবার তাকায় আকাশের দূর শূন্যতায় উদাস চোখে। তখন মনে হয়, ওরা আর শিশু নেই। বড় হওয়ার আগেই বড় হয়ে গেছে। মনে হয়, ‘এক সাথে খেলি আর পাঠশালে যাই’— এই বয়সটাও অনেক পেছনে ফেলে এসে হঠাৎ বড় হয়ে গেছে ওরা। বয়সটা অনেকটাই মায়ের হাতে খাওয়ার বয়স হলেও সে আর খেতে ইচ্ছে করে না। কখনো মায়ের কাছে খেতে বসলে মা আদর করে মুখে নলাটা তুলে দেয়ার সাথে সাথেই চোখে ভেসে ওঠে— অসংখ্য শিশু বন্ধুর চোখ-মুখ, যারা বুলেটে কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে—শহীদ হয়ে চলে গেছে চিরতরে! এ-সব ছবি সব সময় ভাসতে থাকে ওদের চোখের সামনে। অনুভবের সাদা ক্যানভাসে। তখন আর মায়ের আদর পেতে ইচ্ছে করে না। কারো আদর নিতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে পাঠশালার ব্যাগটায় বই না-রেখে শুধু পাথর রাখতে। ঘরের বাইরে বেরুলেই চোখ শুধু পাথর খুঁজে বেড়ায়। চোখের এই ভাষাটা পড়া গেলে মনে হয় এমন হতো—
প্রিয় ফিলিস্তিন! পাথর চাই! অনেক পাথর! না! তোমার ত্বীন-যায়তুনের ছায়ায় আর বসবো না! আরাম আর করবো না! তোমার সবুজ প্রকৃতির মায়ায় আর বাধা পড়বো না। আমরা চাই তোমার বুকের সব .. স-ব পাথর হয়ে যাক। আমাদের অ--েন-ক পাথর দরকার!
তিন.
খালেদের হাতে একটা গোলাইল। ফিলিস্তিনের শিশুদের এ-ই সেরা অস্ত্র। দখলদাররা যতো আধুনিক সমরায়োজনে পুষ্ট হয়েই আসুক এখানে, শিশুরা তার কোনো পরোয়াই করে না। এই ‘ব্যাপক বিধ্বংসী’ গোলাইলই তাদের একমাত্র অস্ত্র। এ নিয়েই ওরা দাঁড়ায়— গুলির সামনে, টেংকের সামনে, সাঁজোয়া বহরের সামনে।
খালেদ ইহুদী সৈন্যদেরকে একের পর এক নিশানা বানিয়ে যাচ্ছিলো। গোলাইল থেকে পাথর-গুলি ছুঁড়ছিলো। খালেদকে ভয় দেখাতে ওদের টেংক ও সাঁজোয়াবহর যতো সামনে আসে খালেদের সাহস ততো বাড়ে। গোলাইলের গুলিনিক্ষেপ ততো বাড়ে। খালেদের সাথে যোগ দিয়েছে অন্য বন্ধুরাও। সোহাইল হাতের পাথর শেষ করে হাত দিয়েছে ব্যাগের পাথরে। ব্যাগেও আছে অনেক পাথর। এদিকে সামির একটা ইসরাঈলী পতাকায় আগুন ধরিয়ে দিলো। ইয়াসির তখন একটা ফিলিস্তিনী পতাকা নিয়ে উঁচু একটা ভবনে তরতরিয়ে উঠে সেটি টানিয়ে দিলো, ইহুদীদের চোখের সামনেই। গাজার মুক্ত আকাশে পতপতিয়ে উড়তে লাগলো ফিলিস্তিনী পতাকা।
চার.
শত শত শিশু এভাবেই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় মেতে ওঠে গাজা’র সীমান্তঘেষা খোলা মাঠে। এ খেলাটাই ধীরে ধীরে ওদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে। গাজায় আলাদা কোনো বিনোদন পার্ক নেই। তেমন কোনো খেলার মাঠও নেই। অন্যান্য স্বাধীন দেশে খেলাধুলার কতো আয়োজন থাকে কিন্তু গাজায় তার কিছুই নেই।
প্রায় প্রতিদিনই অমন করে পাথর-যুদ্ধে শরিক হচ্ছে নতুন নতুন শিশু। যে এসে একবার যোগ দেয় সে আর না-এসে পারে না। তাকে দেখে অন্যরাও উৎসাহী হয়ে ওঠে। তারাও এসে যোগ দেয়। ছোটরা এসে দেখে বড়রা কেমন করে গোলাইল দিয়ে দখলদারদের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করছে। ভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ওরাও তখন শেখে গোলাইল কীভাবে ধরতে হয়। গুলি কীভাবে ছুঁড়তে হয়। এটিই ওদের কাছে শ্রেষ্ঠ খেলা .. সেরা বিনোদন। গাদ্দার আগ্রাসী অস্ত্রসজ্জিত কাপুরুষ ইহুদীদের দিকে বীর বিক্রমে পাথর ছুঁড়ে মারার চেয়ে আনন্দদায়ক খেলা আর কী হতে পারে!
পাঁচ.
আহমদ আজ এই প্রথম একটা মিছিলে যোগ দিয়েছে। ওর বয়স সবচে’ কম। মাত্র সাত। গুটি গুটি পা ফেলে সবার পেছনে পেছনে হাটছে। মাঝে মাঝে চেষ্টা করছে সামনে যেতে, কিন্তু গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো ছোট ছোট পায়ে কতো আর জোরে হাঁটা যায়! পেছনে থাকলেও ভীষণ ভালো লাগছে আহমদের এই পাথর-যুদ্ধ-মিছিলে যোগ দিতে পেরে। ও আগে আর কখনো দেখে নি দখলদার সৈন্যদেরকে এতো কাছ থেকে, শুধু মায়ের কাছে ভাইয়ার কাছে ওদের নিষ্ঠুরতার গল্প শুনেছে। কাপুরুষোচিত পলায়নের গল্প শুনেছে।
হঠাৎ আহমদ দেখলো ভাইয়াদের পাথরবৃষ্টির তীব্রতা ভীষণ বেড়ে গেছে এবং দখলদাররা সে বৃষ্টি মাথায় করে সাঁজোয়াবহরে করে পালিয়ে যাচ্ছে।
আহা! কী মজার দৃশ্য! মনে হচ্ছে একদল নেকড়ে যেনো তাড়া করেছে একদল মেষশাবককে!
আহমদ দেখলো ওর চাচাতো ভাই সা‘দ এক ইসরাঈলীকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মেরেছে একটা পাথর।। অব্যর্থ লক্ষ্য! গায়ে পড়তেই ইহুদীটা ‘মাগো বাবাগো’ বলে আরো জোরে দৌড় দিলো।
ছয়.
আহমদের অনেক আফসোস হচ্ছে, কেনো ও ইন্তিফাদার শুরুতেই এসে যোগ দিলো না? বন্ধুরা-ভাইয়ারা ওকে ছাড়াই কতো মিছিল করেছে একা একা! কতো পাথর ছুঁড়েছে একা একা! এ মজার খেলাটা ওকে ছাড়াই সবাই কতো খেলেছে! ইস, কেনো-যে ও আগে আসতে পারে নি!
(বাবা আহমদ! তুমি অমন করে ভাবতেই পারো! কিন্তু তোমার যোগ দেয়াটা কি সম্ভব ছিলো? তখন তো তুমি আরো ছোট ছিলে! ঠিকমত হাঁটতেই পারতে না!)
আহমদ এভাবে আফসোস করতে-করতে একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করলো। সামনেই পড়ে ছিলো একটা পাথরের টুকরো। তা-ই কুড়িয়ে নিলো। তারপর সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগলো। সুযোগ একটা এসে গেলো! ছোট্ট দেহের সবটুকু শক্তি খাটিয়ে আহমদ ছুঁড়ে মারলো পাথরের টুকরোটি! ইস! একটুর জন্যে লাগলো না ঐ ইহুদীটার মাথায়! তবুও একটা পাথর ছুঁড়তে পারার আনন্দে মনটা কেবলই দুলছিলো। মনে হচ্ছিলো, ওর ক্ষুদে জীবনে যতো আনন্দ ও খুশির মুহূর্ত এসেছে, আজকের পাথর ছুঁড়ে মারতে পারার এই মুহূর্তটিই তার মধ্যে সবচে’ সেরা!
আহমদ এখানে এই মিছিলে দাঁড়িয়েই পণ করলো— নাহ্! আর কখনো আমি বাড়িতে বসে থাকবো না! আর কখনো আমি মিছিলে অংশ নিতে ভুল করবো না। প্রতিদিন আমি আসবো! সবার সাথে আসবো! পাথর কুড়াবো! ছুঁড়বো! ওদের মাথা ‘থেঁতলে’ দেবো! না, কেউ আমাকে ফেরাতে পারবে না! মাদরাসায় যাবো! তারপর এসে আর কিচ্ছু করবো না। শুধু এখানে আসবো! এ মিছিলে এসে যোগ দেবো! মিছিলে এসে আমি ভাইয়াদের সাথে এভাবে যুদ্ধ করবো। পাথর যুদ্ধ। এ যুদ্ধই আমার বিকেলের খেলা। সেরা আনন্দ বিনোদন! .........
সাত.
হঠাৎ ছেদ পড়লো ভাবনায়। ঝড়ের বেগে একদল ইহুদী সৈন্য চলে এলো। এসেই ওদের মিছিলটার মুখোমুখি অবস্থান নিলো। তারপর মিছিলটা লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। সাথে কাঁদানে গ্যাস। রাবার বুলেট। ক্ষুদে শিশুদের মিছিলটা মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। খালেদ চীৎকার করে উঠলো:
— আহমদ! আহমদ! সাবধান! শ্বাস বন্ধ করে ফেলো! জলদি পেছনে সরে এসো! গ্যাস ঢুকলে কিন্তু তুমি বেহুশ হয়ে যাবে! সরে এসো! ডান দিকে দৌড় দাও!
শিশুরা ডানে বামে পেছনে যে যেদিকে পারলো সরে পড়লো। সবার মুখেই ধ্বনিত হচ্ছিলো— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! কেউ কেউ আওড়াতে লাগলো প্রিয় ‘যুদ্ধ সঙ্গীত’—
بالروح بالدم ..... نفديك يا فلسطين
‘ফিলিস্তিন! রক্ত লাগবে? রক্ত দেবো!
দরকার হলে তোমার জন্যে জীবনটাই বিলিয়ে দেবো!
আট.
কিন্তু আহমদ পারলো না। খালেদের কথায় সতর্ক হলেও স্থানত্যাগ সম্ভব হলো না। সাত বছরের খোকার নিয়ন্ত্রণক্ষমতাই-বা কী! সুতরাং কিছুটা গ্যাস ওর ভিতরে ঢুকেই পড়লো! শরীরটা ঝিমঝিম করতে লাগলো। মাথাটা ঘুরতে লাগলো। এদিকে অপেক্ষায় থাকা দখলদাররা সুযোগটা হাতছাড়া করতে কোনো অবহেলা করলো না। ওরা ছুটে এসে আহমদকে বন্দি করে ফেললো। সাত বছরের এক ক্ষুদে শিশুকে মারাত্মক এক বন্দির মতো হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে গেলো।
শিশুদের প্রতি ওদের নিষ্ঠুরতাটা একটু বেশিই। শিশুরা নাকি ওদের বিরক্তিকর শত্রু। বিশেষ করে আজকের শিশুদলটা দখলদারদের চোখে ভীষণ ভয়ানক। প্রতিদিনই ওরা পাথর ছুঁড়ে-ছুঁড়ে দখলদারদেরকে ধাওয়া করে। এদিকটায় এলেই ওদের ধাওয়া খেতে হয়। পাথরের ঘাই খেতে হয়। রক্তাক্ত হতে হয়। তাই আজ একটা ‘মারাত্মক’ পাথরশিশুকে বন্দি করতে পেরে দখলদাররা ভীষণ খুশি। টহলসেনাদের প্রধান আস্তানায় ফেরার আগেই সু-সংবাদটা ফোনে জানিয়ে দিলো সামরিক আদালতের প্রধান বিচারককে। ওখানেই আজ আহমদের বিচার বসবে। গদগদ কণ্ঠে বললো— জনাব! একটু আগে আমরা একটি বিরাট সাফল্য অর্জন করেছি। আমাদের হাতে বন্দি হয়েছে এক পাথরশিশু! নাম আহমদ! বয়স সাত!
নয়.
এ সংবাদে সামরিক আদালতপাড়ায়ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়লো। প্রধান বিচারক এজলাস ছেড়ে সদলবলে বেরিয়ে এলো আজকের সফল অভিযানের নায়কদেরকে স্বাগত জানাতে। ঐ পাথরশিশুটাকে দেখতে।
কী অদ্ভুত আদালত আর কী অদ্ভুত তার বিচার! আসামী হাজির হওয়ার আগেই দোষী সাব্যস্ত হয়ে গেছে! বিচার শুরু হওয়ার আগেই বিচার হয়ে গেছে!
হে ইহুদীরা! ধিক তোমাদের এই জঘন্য বিচারক ও বিচারালয়কে! সাত বছরের একটা বাচ্চাকে ধরার পর হাতকড়া পরিয়ে ঘটা করে নিয়ে আসা তারপর এ খবরে খোদ আদালত প্রধানের এজলাস ত্যাগ করে আদালতের প্রধান ফটকে এসে প্রহরীদের নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকা— এসব আর যাই হোক, বিচার না! ন্যায়বিচার তো অবশ্যই না! বরং প্রহসন! বিচারের নামে অবিচার! ‘জাতের নামে বজ্জাতি’! তোমাদের পক্ষে সবই সম্ভব হে শিশুহত্যাকারীরা! কেননা তোমাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলো নবীঘাতক! সত্যি তোমরা হতভাগা .. দুর্ভাগা!
দশ.
কিছুক্ষণ পর বন্দিকে নিয়ে গাড়িবহর পৌঁছলো। সামরিক বিচারক নিজের আনন্দ লুকোতে পারলো না। আশ্চর্য! আমি বারবার এই লোকটাকে ‘বিচারক বিচারক’ বলছি! এই বেটা আবার কী বিচার করবে? যতোই সে শুনুক বাদী-বিবাদীর বক্তব্য, শেষ পর্যন্ত রায় তো হবে ইসরাঈলীদের পক্ষেই এবং অবশ্যই ফিলিস্তিনীদের বিপক্ষে! এমন কোনো নজির তুমি খুঁজে পাবেই না যে, ওদের কোনো বিচারক ওদের বিপক্ষে রায় দিয়েছে! এখন প্রশ্ন হলো, ছোট্ট আহমদের কী হবে! ও কি আসলেই দোষী সাব্যস্ত হবে? এতো ছোট্ট মানুষ কী করে দোষী হতে পারে? মাত্র সাত সাত বছর বয়সে?
এসো দেখি, কী হয়!
এগার.
— এই পিচ্চি! তোর বয়স কতো রে?
— সাত!
— তুইও পাথর ছুঁড়িস আমাদের উপর!
— আজই প্রথম ছুঁড়লাম!
— আচ্ছা! বেশ সাহসী তো দেখছি!
— আমি তোমাদের মতো কাপুরুষ না!
— আহারে কী বীরপুরুষটা! নাক টিপলে এখনো দুধ বেরুবে! আচ্ছা বল্ তো; তোর পাথর কয় মিটার দূরে গিয়ে পড়ে? দুই মিটার? নাকি তিন মিটার?
— মেপে দেখলেই পারতে!
— বাব্বা, তেজ কতো! আচ্ছা বল্ তো; এ কাজে কে তোকে নামিয়েছে?
আহমদ নিশ্চুপ।
— নাম বল্ জলদি— কে তোকে এই দৈত্যদের সাথে পাথর যুদ্ধে নামতে ফুসলেছে?
এবারও কোনো কথা বলছে না। বিচারকটা তখন আরো জ্বলে উঠলো:
— জলদি বল্! বেক্কেল হাদারাম! কথা বলছিসনে কেন্? বোবা-টোবা নাকি!
আহমদ মাথা তুলে সামরিক বিচারকের চোখে চোখ রেখে তাকালো। তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ ধরে। তারপর স্থির শান্ত কিন্তু আবেগ-বিগলিত কণ্ঠে বিচারকের উদ্দেশে বলে উঠলো সেই অমর সঙ্গীতটি—
بالروح بالدم ..... نفديك يا فلسطين
‘ফিলিস্তিন! রক্ত লাগবে? রক্ত দেবো!
দরকার হলে তোমার জন্যে জীবনটাই বিলিয়ে দেবো!
বার.
বিচারক আহমদকে যতোটা পিচ্চি ভেবেছিলো ততোটা পিচ্চি ও নয়, তা ওর উচ্চারণ ও কথা থেকেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এখন জানতেই হবে মূল কে। কে ওকে এ কাজে নামিয়েছে। কে ওকে শিখিয়েছে এই বীরোচিত দেশাত্মবোধক জাতীয় সঙ্গীত!
— ঠিক করে বল্, কে তোকে ময়দানে নামিয়েছে? কে তোকে এ সঙ্গীত শিখিয়েছে?
— মুহাম্মদ!
— মুহাম্মদ?
— হু, আমার ভাই!
এ-কথা শুনতেই বিচারকের মুখের আনন্দরেখাগুলো ঝিলমিল করে উঠলো। উপস্থিত সৈন্যদের উদ্দেশে বিচারক বলে উঠলো— মূল হোতার সন্ধান পাওয়া গেছে! ওকে বন্দি করতে হবে! প্রস্তুত হও সবাই! এক্ষুনি অভিযানে যেতে হবে! পাথর-ইন্তিফাদা’র মূল হোতাকে ধরতে হবে! আদালত আজকের মতো এখানেই মুলতবি।
তের.
সৈন্যরা আগে থেকেই কান খাড়া করে দাঁড়িয়েছিলো। তাই নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে দ্রুত সব আয়োজন শেষ হলো। এক্ষুনি বের হবে অভিযান। গাড়িবহরের প্রথম গাড়িটায় বিচারক নিজেও এসে ‘এজলাস’ গ্রহণ করলো। একেবারে চালকের পাশে। আহমদের দিকে সবাইকে সতর্ক নজর রাখতে নির্দেশ দিলো বিচারক।
গাড়িবহর চলতে শুরু করলো, গাজাপট্টির দিকে।
আহমদ চুপচাপ বসে আছে। চেহারায় আগেও ছিলো না ভীতির ছাপ। এখনো নেই।
চৌদ্দ.
একটু পরই গাজায় প্রবেশ করলো সৈন্যরা। বিচারক আহমদকে বললো:
— এই পিচ্চি! তোদের বাসাটা কোন্ দিকে?
— ভুলে গেছি!
— বলে কি বেটা! ভুলে গেছিস মানে? রসিকতা করছিস্ আমাদের সাথে? জলদি বল্!
— মনে হয় ডান দিকে হবে! না! বামে যান! না না! একটু পেছনে যেতে হবে মনে হচ্ছে!
বিচারক রোষ-মেশানো কণ্ঠে বললো:
— এই বেটা দৈত্য শিশু! ঠিক করে বলবি বাড়িটা কোথায়? নাকি শুরু করবো উত্তম-মধ্যম?!
পনেরো.
গাজা শহরের অধিকাংশ রাস্তা ও অলি-গলি ঘোরা শেষ, কিন্তু আহমদ এখনো নিজের বাড়ির ‘সন্ধান’ দিতে পারে নি। এমন কি কোন্ রাস্তাটা ওদের বাড়ির দিকে গিয়েছে, তাও বলতে পারলো না। বিচারকসহ অন্য সৈনিকরা এবার রাগে ক্ষোভে ফুঁসতে লাগলো এবং হতাশা ও আশঙ্কায় একটু ঘাবড়েও গেলো! এই যখন অবস্থা তখন আহমদ বললো:
— থামো! এই থামো! মনে হচ্ছে এ মহল্লাটাই আমাদের! একটু ঐ দিকে গেলেই পেয়ে যাবো আমাদের বাড়িটা! হ্যাঁ, এই তো, এই রাস্তা দিয়েই যেতে হবে!
— এবার ভুল করলে কিন্তু ক্ষমা নেই আর!
— বললাম তো! এটিই আমাদের বাড়ির রাস্তা!
বিচারক গাড়ি থামাতে বললো। সবাই নামলো। বিচারক আশপাশটা একটু দেখে নিয়ে বললো:
— এ জায়গাটা ঘিরে ফেলো! নজরদারি বাড়িয়ে দাও! এখান থেকে কেউ যেনো পালাতে না-পারে!
বিচারক আহমদকে কাছে ডেকে বললো:
— এবার তোদের ঘরটা দেখিয়ে দে! মনে রাখিস্, মিথ্যা ও প্রতারনার আশ্রয় নিলে পরিণতি কিন্তু মোটেই ভালো হবে না!
ষোল.
আহমদ একটুও ভয় পেলো না ওদের হুমকি-ধমকিতে। বরং শান্ত পায়ে এবং দৃঢ় ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো। ওকে অনুসরণ করছে সঙ্গের বিচারক ও তার সঙ্গীরা। আঁকাবাঁকা গলিপথ পেছনে ফেলে-ফেলে আহমদ এগিয়ে যেতে লাগলো। দখলদারদের চোখে নতুন করে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ফুটে উঠেছে! পথের কি আর শেষ হবে না? এর বাড়িটা কি উদয় হবে না? কিন্তু আহমদের মুখ হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছে। আশ্চর্য! এতোটা পথ হাঁটলে এ বয়সের শিশুদের তো ক্লান্তিতে রীতিমত ঝিমিয়ে পড়ার কথা! হঠাৎ রাস্তায় বসে ‘একটু জিরিয়ে নিই!’ বলে মিষ্টি একটা হাসি দেয়ার কথা! কিন্তু আহমদ চলছে তো চলছেই! সবার আগে আগে! যেনো বিশেষ বাহিনীর অগ্রাধিনায়ক!
শেষ পর্যন্ত আসলে কী হবে? বাড়ির কি দেখা মিলবে? .........
সতেরো.
গাজা শহরে কতো মানুষের বাস। দশ লাখ। এতোগুলো রাস্তা ও গলিপথে বন্দি আহমদকে নিয়ে এই-যে রাজ্যের ঘুরাঘুরি চলছে, তাতে কি লোকজনের মধ্যে জানাজানি হয় নি? অবশ্যই হয়েছে! আহমদ বুঝি এটিই চেযেছিলো? জানি না, চেয়েছিলো কি না! কিন্তু ঘটেছে তাই! এর মাঝে অনেক লোকজন এসে ভীড় জমিয়েছে! কারো চোখে কৌতূহল। কারো চোখে ক্ষোভ। কারো চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে।
মজার ব্যাপার হলো ভীড়টা বাড়ছে।
আরো মজার ব্যাপার হলো, সাথে সাথে বাড়ছে দখলদারদের অশ্বস্তি!
ভীড় যতো বাড়ে ওদের অশ্বস্তিও পাল্লা দিয়ে ততো বাড়ে!
আহমদের বাড়ি যতো কাছে আসতে লাগলো মজার ভীড়টাও ততো বাড়তে লাগলো!
সব মিলিয়ে যেনো বাড়াবাড়ির এক মস্ত প্রতিযোগিতা!
পেছনে তাকাচ্ছে সৈন্যরা। তাকাচ্ছে খোদ বিচারকও। আর বেড়ে চলেছে তাদের ভয়চকিত দৃষ্টি!
এ দৃষ্টির ভাষা পড়া গেলে ভাবটা হতো এমন—
নাহ! আর বুঝি পারা গেলো না! এই পিচ্চি আহমদটা আসলে কী চাইছে? কোনো বিপদের মুখে ঠেলে দেবে না তো! বিশ্বাস নেই! ফিলিস্তিনের দৈত্য শিশু! পাথরশিশু! আমাদের সাথে ওদের চিরবৈরিতা!
আঠারো.
দখলদারদের অশ্বস্তির মাত্রা অনেক বেড়ে গেলো! বিচারক চোখের ইশারায় কী যেনো বলতে চাইলো। অমনি শুরু হয়ে গেলো ফাঁকা গুলি। দ্রিম দ্রিম দ্রিম! ভয় থেকে মুক্তির এটা একটা শেষ অস্ত্র ওদের। কিন্তু কই! উদ্দেশ্যে-যে পূরণ হলো না! একটা মানুষও কমে নি!
কেনো কমবে? এটা কি ইসরাঈল? এটি ফিলিস্তিন!
দুশমনের ফাঁকাগুলিতে যারা দৌড়ে পালায় তারা তো কাপুরুষ!
গাজার মানুষ কবে ছিলো কাপুরুষ?
সুতরাং ফাঁকাগুলির ফল হলো উল্টো! যারা বাড়ির ভিতরে ছিলো এখন গুলির শব্দ পেয়ে তারাও বেরিয়ে এলো!
কী মজা! শত শত এখন হাজার হাজার!
ঊনিশ.
হাজার হাজার ফিলিস্তিনী যখন জড়ো হয় দখলদারদের গুলির আওয়াজ শোনে,
এসে পাশেই যখন দেখে সমর-পোশাকে আপদমস্তক ঢাকা দখলদারদের বানরময় চেহারা,
তখন ফিলিস্তিনের বীর জনতা কি নীরব থাকতে পারে?
নাকি থেকেছে কোনোদিন?
তাহলে এখন কেনো নীরব থাকবে?!
হাজার হাজার ক্ষুব্ধ কণ্ঠের শ্লোগানমুখরতায় গাজার আকাশে বাতাসে কম্পন সৃষ্টি হলো! সেই সাথে কম্পিত হলো এই কাপুরুষ দখলদারদের সংকীর্ন হৃদয়গুলি!
এখন কী করা? ফিরে যাবে দখলদাররা? পালাবে কি?
যতো রাগ গিয়ে পড়লো ছোট্ট আহমদের উপরে! বিচারকটা গর্জন করে উঠলো:
— এই হতভাগা! তোর মতলবটা আসলে কী, বল্ তো?! কেনো বাড়িতে নিয়ে যাওযার নাম করে আমাদেরকে এতোটা দূরত্ব মাড়াতে বাধ্য করছিস্? কোথায় তোদের ঘর?!
বিশ.
উদ্বাস্তু শিবিরের অনেকগুলো তাঁবু পেরিয়ে অবশেষে আহমদ একটি বাড়ির সামনে এসে বললো:
— এই আমাদের বাড়ি! এখানে আমরা বাস করি!
— না, বিশ্বাস করি না! মিথ্যে বলছিস্! তুই আমাদেরকে বারবার প্রতারিত করেছিস্! আমরা আর একবারও প্রতারিত হতে চাই না!
— আল্লাহর কসম! এটিই আমাদের বাড়ি!
তখন শোনা গেলো এক প্রতিবেশির গর্জন:
— কী চাও তোমরা আহমদের কাছে? পাঁচ মাস আগে-না ওর বাবাকে বন্দি করে নিয়ে গেছো? এখন আবার এখানে কী চাও?
একটা বেয়াদব ইহুদী তখন বলে উঠলো:
— চুপ কর বেটা! নইলে তোকেও আহমদের বাবার কাছে পাঠিয়ে দেবো!
একুশ.
ভীষণ জোরে ওরা দরোজায় করাঘাত করলো। আহমদের মা এসে দরোজা খুলে দাঁড়ালেন। ফিলিস্তিনী মায়েরা মহিয়সী। সাহসিনী। সহজে ভড়কে যান না। ভয় পান না। আহমদকে দেখেই বুঝলেন ও ওদের হাতে বন্দি। সামরিক আদালতের বিচারক নামের শয়তানটা ওকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। অন্যরা ওকে ঘিরে রেখেছে। কিন্তু এখানে এই মুহূর্তে ওরা কী চাইছে? বন্দি করার মতো আর কে আছে এ বাড়িতে? তিনি জানতে চাইলেন গম্ভীর কণ্ঠে:
— তোমরা আর কী চাও? আমার স্বামীকে নিয়েও কি তোমাদের অভিযান শেষ হয় নি? পিপাসা মেটে নি? তোমরা অভিশপ্ত! আল্লাহ তোমাদের বিচার করবেন!
— না! আমাদের পিপাসা মেটে নি! তোমরা সব পাথর-সন্ত্রাসী! তোমরা সবগুলি আমাদের শান্তি ও নিরাপত্তার দুশমন! তোমরা ফাসাদসৃষ্টিকারী! তোমরা অশান্তিপ্রিয়! তোমাদের কারো ‘ছাড়’ নেই! শোনো! এখন আমরা এসেছি আহমদের ভাই মুহাম্মদকে বন্দি করতে! বলো জলদি, কোথায় ম সে? এখানে আমাদের সামনে ওকে হাজির করো নয়তো আমরা ঘর তল্লাশি করে ওকে খুঁজে বের করবো!
— মুহাম্মদ? ওকেও তোমাদের বন্দি করতে হবে?!!
— বললাম তো, ওকে বন্দি করতেই আমরা এ অভিযানে এসেছি!
— আচ্ছা, তবে দাঁড়াও!
আহমদের মুখে তখন এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো। এ হাসির তাৎপর্য ইহুদীরা বুঝতে পারলো না।
বাইশ.
কয়েক মিনিট পরই মা কোলে করে একটা বাচ্চা নিয়ে এলেন! বললেন:
— এই নাও মুহাম্মদকে! পারলে একেও বন্দি করে নিয়ে যাও! আনো শেকল! পরাও হাতকড়া!
সামরিক আদালতের বিচারকের মুখটা ততোক্ষণে পাংশুবর্ণ হয়ে গেলো! আহমদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললো:
— মুহাম্মদের ব্যাপারেও তুমি আমাদেরকে প্রতারিত করলে! জানো, এ পর্যন্ত কতোবার তুমি আমাদেরকে প্রতারিত করেছো? তুমি কি বলতে চাও এ-ই (মুহাম্মদের দিকে ইশারা করে) তোমাকে পাথর যুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে?! তুমি তো আস্তো একটা দৈত্য! এখন কী বলবে বলো! কেনো তুমি আমাদেরকে প্রতারিত করে এখানে নিয়ে এসেছো, বলো! জলদি বলো!
আহমদকে কিছু আর বলতে হলো না! মায়ের কোলের তিন বছরের ছোট্ট মুহাম্মদই ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো আদরকাড়া কণ্ঠে .. ভাঙা-ভাঙা শব্দে:
— হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি-ই তো বলেছি, ভাইয়া শোনো, শোনো! আমি তো ছোট! পাথর ছুঁড়তে পারি না! তুমি তো অনেক বড়! কেনো সবার সাথে পাথর ছুঁড়তে যাও না?! আমি যখন আরেকটু বড় হবো তখন আমিও যাবো তোমার সাথে! জোরে জোরে পাথর মারবো! ওদের নাক ভেঙে দেবো! তোমরা কেনো এসেছো! আমার সাথে যুদ্ধ করবে? আমি কিন্তু জোরে ঘুষি মারতে পারি! এই দেখো, ভিম!!..................
তেইশ.
মুহাম্মদের কথা শেষ না-হতেই সমবেত জনতা হাসিতে ফেটে পড়লো। সেই সাথে শুরু হলো তাকবীরধ্বনি। হাসির এ শব্দ আর তাবীরের এ ধ্বনি বিঁধলো গিয়ে প্রতিটা ইহুদীর অন্তরে। সৃষ্টি করলো ভয়। মহা কম্পন। তাকবীরধ্বনির আওয়াজ উঁচু হতে লাগলো। জনতার চোখ-মুখের ক্ষুব্ধ উত্তেজনা উষ্ণতা ছড়াতে লাগলো। জনতা ফুঁসতে লাগলো। বিচারক প্রমাদ গুনলো। ভয়ে আহমদকে ছেড়ে দিলো। তবুও জনরোষ কমছে না দেখে পরস্পরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। এদিকে ওরা দেখলো অনেকে পাথর কুড়াচ্ছে। বিচারক সৈন্যদেরকে স্থান ত্যাগ করতে ইশারা করলো। ওরা তখন নিজেদের গাড়িবহরের দিকে দিলো একসঙ্গে সবক’টা দৌড়! ভু-দৌড়!!
চব্বিশ.
কিন্তু জনরোষ দমায় কে? প্রতিরোধ থামায় কে? পাথর নিক্ষেপ শুরু হয়ে গেলো। ইন্তিফাদা রঙ ছড়াতে লাগলো। এদিকে পলায়নের গতিও দ্রুত হতে লাগলো। আঁকাবাঁকা পথে আহমদ ওদেরকে এই ‘দৈত্য-শাসিত’ তাঁবুতে পায়দল নিয়ে এসেছিলো, অনেকটা পথ। আহ! কোথায় পড়ে আছে গাড়িবহর! দৌড় .. দৌড় ! জোরে! আরো জোরে!
পচিশ.
এদিকে ঘটেছে আরেক মজার কান্ড। দখলদার সৈন্যদের অসতর্কতার আশ্রয় নিয়ে খালেদ ওদের গাড়িতে একটি ফিলিস্তিনী পতাকা টানিয়ে দিয়েছিলো। সৈন্যরা এসে হুড়মুড় করে গাড়িতে উঠলো। সর্বশেষ সৈন্যটা সর্বশেষ পেছনের গাড়িটাতে ওঠার সাথে সাথে গাড়িবহর পালাতে লাগলো। আর ঐ গাড়িটাতে ফিলিস্তিনের পতাকাটি তখন বাতাসের তালে তালে পতপত করে উড়তে লাগলো। যেনো ঘোষণা করছিলো আগামী দিনের স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিনের কথা। পাশাপাশি চলতে লাগলো আশাপাশের বীর জনতার তাকবীর ধ্বনি এবং অবশ্যই পাথরগুলি!
আহমদ দ্রুত দৌড়ে এসে একটা ছাদে উঠলো আর পালিয়ে যাওয়া গাড়ি বহরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে লাগলো:
— কাল আমি আবার নামবো! আবার তোমাদের সাথে দেখা হবে! আসবে তো! আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!!
(জামিউল হুকুক মাহফুযাতুন

শহীদ জননী (২)

শহীদ জননী (২)
ছয়.
১৮.০৩.৮৮ তারিখে হামাস-এর পক্ষ থেকে একটি ঘোষণা ছাপা হয় পত্রিকায়। সেখানে বলা হয়্—
'আজ হৃদয়ে রক্তক্ষরণের দিন। এইদিনে উত্তর গাজা'র একটি মসজিদে ঘৃণ্য অভিযান চালিয়েছিলো ইহুদী সৈন্যরা। নষ্ট করেছিলো মসজিদের সম্মান ও পবিত্রতা। আজ শুক্রবার উক্ত মসজিদে জুমা আদায়ের পর এক প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত মিছিলে অংশ গ্রহণ করে আওয়াজ তুলুন্— হে অভিশপ্ত ইহুদীরা! আমাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ এখনো বন্ধ হয় নি। তোমাদের অপকর্ম আমরা ভুলি নি! কোনোদিন ভুলবো না!'
হানিও পড়লো সংবাদটা। পড়ে নিজের ভিতরে অদ্ভুত এক তোলপাড় অনুভব করলো। ওর ভিতর থেকে যেনো ভেসে আসছে— হানি! তোমাকেও যেতে হবে! মসজিদের সেই ভাঙা দেয়াল তোমাকে ডাকছে! ওখানে লুটিয়ে পড়া রক্তাক্ত শহীদান তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, যাবে না?!
হানি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। ও এ-আহ্বানে সাড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে! জুমা'র আগে ভালো করে গোসল করে! তারপর নতুন জামা পরে মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে!
ষোল বছরের হানি এগিয়ে চলেছে মজলুম মসজিদের দিকে— অপমানের প্রতিবাদ জানাতে। ইহুদীদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্ষোভ বুকে নিয়ে। এই মুহূর্তে চোখে ভাসছে বাবা'র ছবিটা। বাবা যেনো ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। ওর এ-পথচলাকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তার সামনে আরো ভাসছে জান্নাতের ছবি! শহীদরা তো জান্নাতে সবুজ পাখি হয়ে উড়ে বেড়ায়! ও কি পারবে জান্নাতের সবুজ পাখি হতে? আরেকটা ছবি এখন ভাসছে ওর চোখের সামনে। মায়ের ছবি! কী কষ্ট করেন মা সারাটা দিন হাসপাতালে— শুধু ওদের একটু আরামের জন্যে! হানির দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে!
সাত.
অনেক বড় মিছিল। লোকে লোকারণ্য। আজকের এ মিছিলকে ঘিরে দখলদাররা ছিলো ভীষণ সতর্ক। ওরা মসজিদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিলো, প্রচুর সংখ্যায়। তবু দামাল ফিলিস্তিনীদের চোখের দিকে তাকাতে ওরা ভয় পাচ্ছিলো। কী জ্বলন্ত দৃষ্টি! একেকটা যেনো অগ্নিগোলা! সংঘর্ষের প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছিলো। শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ বেধেই গেলো। হানি ছিলো একেবারে সামনে। বুক চেতিয়ে বীরের মতো সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সশস্ত্র ইহুদী সৈন্যদেরকে ও একদম ভয় পাচ্ছিলো না। 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি তুলে হানি সবাইকে সামনে বাড়তে বলছিলো। ওর চেহারা লালচে দেখাচ্ছিলো। যেনো শাহাদতের ‘লাল’ এসে ভিড় করেছিলো সারা মুখাবয়বে! ইহুদীরা বিপদ টের পেয়ে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করতে লাগলো। প্রথমে এলোপাথাড়ি তারপর সরাসরি মিছিলে! 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি আর গোলাগুলির শব্দে গাজা'র আকাশ বাতাস কেঁপে উঠতে লাগলো বারবার।
আট.
হঠাৎ হানি গুলিবিদ্ধ হলো! গুরুতর আহত হলো! ফিনকি দিয়ে বইতে লাগলো রক্ত! সবাই ধরাধরি করে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। হানি'র দিকে এগিয়ে আসছিলো কি শাহাদতের ভাগ্য? পূরণ হচ্ছে কি সবুজ পাখি হওয়ার সবুজ স্বপ্ন?!
খবর পেয়ে মা ছুটে এলেন হানি'র কাছে। কেঁদে উঠলেন ডুকরে ডুকরে! ডাক্তার তাকে আশ্বাসবাণী শোনালেন। বললেন :
— আশা করছি ও সেরে ওঠবে, রক্তক্ষরণটা একটু বেশি! আপনি পেরেশান হবেন না! সবর করুন!
উম্মে হানি এবারও ডাক্তারের কথা বুঝতে পারলেন না!
একটু পর ডাক্তারকে আবার আসতে দেখা গেলো! উম্মে হানি’র ভিতরটা কেঁদে উঠলো! ডাক্তার কিছুক্ষণ নীরব থেকে শান্ত গলায় উচ্চারণ করলেন :
— হানি এখন শহীদ! আপনি শহীদ জননী!!
একই দৃশ্য! আগে বাবা, এখন ছেলে!!
হে আল্লাহ! উম্মে হানিকে ধৈর্য দাও!
নয়.
উম্মে হানি আবার শোকে শোকে পাথর হয়ে গেলেন। এক শহীদ জননী হিসাবে আত্মিক তৃপ্তিটুকু ছাড়া বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন রইলো না তার সামনে! হানি'র বন্ধুরা এর মধ্যেই হানিকে দ্রুত হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করলো। কেননা ইহুদীরা হাসপাতালে চলে আসতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। অপমান করতে পারে হানি'র লাশ।
কিছুক্ষণের ভিতরেই তারা হানিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হলো সমুদ্র তীরের তাঁবুপল্লীতে। কিন্তু জালিমরা ততোক্ষণে জেনে ফেলেছে হানি'র সংবাদ। তারা এসে তাঁবুপল্লী ঘেরাও করে ফেললো। আবার শুরু হলো ভয়াবহ লড়াই। হানি সাধারণ কোনো যুবক ছিলো না। ও ছিলো ইহুদীদের মাথা ব্যথা। তাই ওকে ঘিরে এই তাণ্ডব। ওরা চেয়েছিলো হানিকে হত্যা করতে। পেরেছে। কিন্তু তার লাশকে অসম্মান করতে পারে নি! ফিলিস্তিনের দামালরা তার লাশের ইযযত রক্ষা করেছে!
ইহুদীরা কয়জনকে হত্যা করবে? লক্ষ লক্ষ তরুণ যুবক শহীদ হতে প্রস্তুত! ইহুদীদের চোখে যা হত্যা, হানিসহ সব ফিলিস্তিনীর চোখেই তা গরবের মৃত্যু, শহিদী মৃত্যু। এ মৃত্যুর জন্যে ফিলিস্তিনের প্রতিটি মুসলমানই ইহুদীদের সাথে লড়াই করে শহিদী তামান্না বুকে নিয়ে। শহিদী মৃত্যু কী দামী এবং তা এই সব যুবকদের কাছে কী কাম্য— তা কী করে বুঝবে এই অভিশপ্ত ইহুদীরা?! বানর শূকরের এইসব উত্তরসুরিরা?!
দশ.
হ্যাঁ, এখান থেকেই শুরু হয়েছিলো ফিলিস্তিনের প্রথম ইন্তেফাদা। এ ইন্তেফাদার ঢেউয়ে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল কবেই ভেসে যেতো। কিন্তু দেশী-বিদেশী কতিপয় গাদ্দারদের কারণে আজো তা সম্ভব হয় নি। ইন্তেফাদা আজো চলছে। ফিলিস্তিনের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিতা না হওয়া পর্যন্ত এ ইন্তেফাদা বন্ধ হবে না। এ ইন্তেফাদা বন্ধ না হওয়ার আরেকটা কারণ হলো, ফিলিস্তিনীরা রক্ত ঢালতে ভয় পায় না। এক তরুণ শহীদ হলে হাজার তরুণ এগিয়ে আসে। এ জন্যে সাতষট্টি বছরের ইতিহাসে বারবার চেষ্টা করেও ইহুদীরা ফিলিস্তিনের দামাল ছেলেদেরকে কাবু করতে পারে নি। এক হানি’র জায়গা পূরণ করছে হাজারো হানি! বিধ্বংসী টেংক-কামান ও সাঁজোয়া যান নিয়ে কতোবারই তো ওরা এদের উপর হামলে পড়েছে! বারবারই মনে হয়েছিলো— এবার বুঝি হামাসের কোমর ভেঙে পড়ছে! ফিলিস্তিনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে! কিন্তু না, ফিলিস্তিন শেষ হয় নি! প্রতিবারই ফিলিস্তিন জ্বলে উঠেছে! প্রতিবারই ছোট ছোট পাথরকণা আর সেকেলে বন্দুক রাইফেলের ধাওয়া খেয়ে ইহুদীরা পালিয়েছে!
এগার.
উম্মে হানি এক সময় ছেলের শোক ভুলে যান। আবার ফিরে আসেন স্বাভাবিকভাবে কাজের ময়দানে—হাসপাতালে। সেবা করে যান অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনীদের। এরাই এখন তার স্বামী-সন্তান। এখানে বসে বসেই উম্মে হানি স্বপ্ন দেখেন— স্বাধীন ফিলিস্তিনের। হাসপাতালে আসা-যাওয়ার পথে যখনই কোনো মিছিল তার চোখে পড়ে, তখন নিজের অজান্তেই থমকে দাঁড়ান। মিছিলের ভিড়ে তিনি খুঁজে ফিরেন হানিকে! ঝাঁঝালো মিছিলের মুখে যখন ভেসে আসে গগনবিদারি শ্লোগান—
الله غايتنا .....والرسول قدوتنا
والقران دستورنا
والجهاد سبيلنا
والموت في سبيل الله اسمى امانينا
আল্লাহ আমাদের লক্ষ্য
রাসূল আমাদের আদর্শ
কুরআন আমাদের সংবিধান
জিহাদ আমাদের পথ
আল্লাহর পথে জীবন বিলিয়ে দেয়া আমাদের শ্রেষ্ঠ চাওয়া!
তখন উম্মে হানি’র মন কেঁদে ওঠে! চোখ নেমে আসে ‘শ্রাবণধারা’! অনেকক্ষণ ধরে তিনি তাকিয়ে থাকেন মিছিলটার দিকে! মনে হয়্— এরা সবাই যেনো হানি!!
=================================================
শ্রাবণধারা : ইচ্ছে করেই আমাদের দেশের এই প্রিয় শব্দটা ব্যবহার করলাম, এখন আকাশ অবিরাম কাঁদছে! একটু যোগসূত্র সৃষ্টি করলে যদি মহিয়সী উম্মে হানিকে স্পর্শ করা যায়, কেনো করবো না?!

শহীদ জননী এক.

শহীদ জননী
এক.
উম্মে হানি বসে আছেন বাড়ির ছোট্ট আঙ্গিনায়। গল্প বলছেন, জীবনের গল্প। জীবনের গল্পে তো আনন্দ-বেদনার মিশেল থাকে, কিন্তু তার গল্পে আছে শুধু বেদনা, শুধু অশ্রু এবং শুধু রক্তের ঘ্রাণ। তাকে ঘিরে আছে সন্তানরা। দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলের নাম হানি।
'১৯৭২ সালে আমরা থাকতাম এই ছোট্ট কুটিরেই। আমি, তোমাদের আব্বু—মাহমুদ আবু হাম্মাম এবং তোমরা। হানি'র বয়স যখন নয় মাস, তখনই আমাদের ঘরে ইহুদী সৈন্যরা হানা দিয়েছিলো। ওরা তো মানুষ নামের জন্তু। হিংস্রতায় জন্তুকেও হার মানায়। যে ঘরেই হানা দেয় সে ঘরেই তাণ্ডব চালায়। মুহূর্তেই সবকিছু তছনছ করে দেয়। ওরা ঢুকতেই তোমাদের আব্বু ওদেরকে বাধা দিলেন। রুখে দাঁড়ালেন। তখন একটা সৈন্য লোহার বাট দিয়ে তার মাথায় সজোরে আঘাত করলো। তিনি মারাত্মক আহত হলেন।'
থেমে গেলেন উম্মে হানি! দরদর করে অশ্রু পড়তে লাগলো! আঁচলচাপা দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেন তিনি। আবার বলা শুরু করলেন—
'আঘাত ছিলো প্রচণ্ড। সাথে সাথে তিনি লুটিয়ে পড়লেন! ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগলো। রক্তে সব ভেসে গেলো। আমি চিৎকার করে উঠলাম। চিৎকার শুনে প্রতিবেশিরা ছুটে এলো। দ্রুত এ্যম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাঁকে হাসপাতালে নেয়া হলো। যে কামরাটায় তার চিকিৎসা চলছিলো, আমি নিথর দাঁড়িয়েছিলাম তার দরোজায়। মনে শঙ্কা ও আশঙ্কা— আর কি দেখা হবে না! আর কি কথা হবে না! আল্লাহ তুমি তাকে বাঁচাও! আল্লাহ তুমি সুস্থ করে তোলো!
একটু পর ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। বললেন : 'প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছে।' এই বলে ডাক্তার আবার অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি অবস্থাটা পুরোপুরি বুঝতে পারলাম না। একটু পর আবার দেখলাম ভদ্রলোকটি বেরিয়ে এলেন। তার অবস্থার ভাষা বলছিলো : 'আপনার স্বামী চলে গেছেন!' আমি আর সইতে পারলাম না। ভিতরটা হাহাকার করে উঠলো। ভিতরটা এক ভয়াবহ শূন্যতায় ভরে গেলো। শোকে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ইহুদীদেরকে অভিশাপ দিতে লাগলাম।'
মা বলে যাচ্ছিলেন। ছেলে মেয়েরা শুনছিলো। মায়ের অশ্রু ও দুঃখের সাথে ওদের অশ্রু ও দুঃখও মিশে গেলো। হানি তো তখন অনেক ছোট ছিলো। মাত্র ন' মাস। বাবার কথা ও শুনেছে শুধু মায়ের মুখেই। কতোবার শুনেছে। শুনতে শুনতে ইচ্ছে করেছে বাবাকে কাছে পেতে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে। বাবার কথা ভাবতে-ভাবতে এবং মায়ের কাছে শুনতে-শুনতে বাবার একটা সুন্দর ছবি গেঁথে গেছে ওর মনে। চোখ বন্ধ করলেই এখন বাবাকে দেখতে পায়। বাবা যেনো ওর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসেন আর বলেন : 'হানি! বড় হও, মানুষ হও! মানুষের মতো মানুষ হও! ইহুদীদের মতো অমানুষ হয়ো না!'
হানি গরম নিঃশ্বাস ফেলে বাবাকে স্মরণ করে। মনে মনে বলে : 'বাবা! একটু বলবে, কোন্‌ ইহুদীর বাচ্চাটা তোমাকে মেরেছিলো? আমি প্রতিশোধ নেবো! কঠিন প্রতিশোধ!'
হানি'র কচি হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়। পাথরকণার দিকে ওর দৃষ্টি চলে যায়। একেকটা পাথরকণাকে মনে হয় একেকটা বিধ্বংসী গোলা।
সব ফিলিস্তিনী শিশু কিশোরের চোখেই এইসব পাথরকণা মূল্যবান। কেননা এগুলো দিয়ে ইহুদী সৈন্যদেরকে তাড়া করা যায়। পাথরকণার গুঁড়ি বৃষ্টিতে 'সিক্ত হয়ে' ওরা যখন পালিয়ে যায়, তখন মনে হয় এক পাল নেড়ি কুত্তা পালিয়ে যাচ্ছে ধাওয়া খেয়ে!
দুই.
কঠিন জীবন সংগ্রামের মুখোমুখি উম্মে হানি। মাথার উপর আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ছায়া নেই। ছেলেমেয়েকে মানুষ করতে হবে। আয়-রোজগারের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। নিজের লেখাপড়া কিছুই করা হয় নি। পরাধীন ফিলিস্তিনে লেখাপড়া করা ক'জনের পক্ষে সম্ভব? সব জায়গায় ওঁৎ পেতে আছে ইহুদী সৈন্যরা। যখন তখন যেখানে সেখানে ঝেঁপে পড়ছে। এদের হিংস্র তাণ্ডবে ফিলিস্তিনীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। আজ এ মায়ের বুক খালি হলে কাল ও মায়ের বুক খালি হচ্ছে। অমানবিক নিষ্ঠুরতায় ইহুদীরা নিরপরাধ ফিলিস্তিনীদেরকে পাখির মতো গুলি করে করে মারছে। উম্মে হানি অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনীদের সেবা করার জন্যে গাজার একটা হাসপাতালে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
তিন.
এভাবেই এই শহীদ পরিবারের চাকাটা আস্তে আস্তে ঘুরতে লাগলো। মেয়েরা বড় হতে লাগলো। উম্মে হানি'র 'স্বপ্ন'—হানিটাও বড় হতে লাগলো। এখন ও গাজা'র একটা মাদরাসায় পড়ে। মা দেখেন, একটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হানি মাদরাসায় যাচ্ছে আবার ক্লাস শেষে ফিরে আসছে। দেখতে কী ভালো লাগে! ছেলের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নের ভুবনটাকে বড় করেন। সেখানে সুন্দর সুন্দর আশা নির্মাণ করেন। তার স্বপ্ন একদিন বাস্তব হবে। হানি একদিন বড় হবে। লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। কবরে বসে শান্তি পাবেন বাবা। দুনিয়ায় বসে চোখ জুড়াবেন মা।
হানি শিক্ষার প্রাথমিক স্তর শেষ করে দ্বিতীয় স্তরে উপনীত হয়েছে। মা'র স্বপ্নের ভুবনটা আরেকটু বড় হয়। সেখানে সবুজ সবুজ কিশলয় দেখা দেয়! ডালে ডালে ফুলকলিরা ফোট ফোট হয়ে তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসে!
উম্মে হানি কল্পনায় এ-সব ভাবেন আর আনন্দে সাঁতার কাটতে থাকেন। হে আমার স্বপ্ন! কাছে এসো! বাস্তব হয়ে আলো ছড়াও! স্বাধীন ফিলিস্তিনের শামিয়ানার শীতল ছায়ায় আমাদেরকে একটু জায়গা দাও!
চার.
হানি সমুদ্রঘেঁষা তাঁবু পল্লী'র ছোট ছোট গলিপথে ঘুরে বেড়ায়। এখানে এক দু'জনের বেশি এক সঙ্গে চলাই মুশকিল। একেবারে ঘুপচি গলি। ঘিঞ্জি এলাকা। তবুও এ-সব এখন গা-সওয়া গেছে। চোখ মেলেই তো এ-সব দেখে চলেছে ওরা। এখানেই শিশুরা ছুটে বেড়ায়। দৌড়াদৌড়ি করে। নানা রকমের খেলা নিয়ে মেতে ওঠে। ওদের কাছে সবচে' প্রিয় খেলাটা হলো— গাজা'র সমুদ্র তীরের বিস্তীর্ণ বালির বুকে বালি-ঘর বানানো। এই খেলনা ঘরকে ওরা 'এই প্রাসাদ' 'সেই প্রাসাদ' নাম দিয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হাসে। সে হাসিতে যেনো রুপালি আভা ছড়ায় সমুদের জলরাশি। তাবুপল্লীর এই বঞ্চিত শিশুরা এ-সব খেলনা প্রাসাদে কী খুঁজে ফিরে? হারানো ফিলিস্তিন?
এমনও হতে পারে যে, তাঁবুপল্লীর ছোট্ট ঘরে থাকতে থাকতে ওদের বিরক্তি ধরে গেছে । তাই বালির বুকে বড় বড় প্রাসাদ গড়ে ওরা মনের আশ মেটায়। বালির বুকে এই 'প্রাসাদ প্রাসাদ' খেলা হানি'রও খুব প্রিয়। বন্ধুদের সাথে এখানে ওর অনেক মধুর সময় কাটে।
পাঁচ.
একদিন হানি বন্ধুদের সাথে বসে আছে। চুপচাপ, কোনো কথা বলছে না। নীরবে তাকিয়ে আছে সমুদ্রের নিস্তরঙ্গ জলরাশির দিকে। এক বন্ধু হানিকে মৃদু ধাক্কা দিলো। বললো :
— অমন গম্ভীর হয়ে কী ভাবছো, হানি?
হানি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো :
— শিশুদের চোখের দিকে আমি তাকাতে পারি না! ওদের চোখে যেনো হাজার হাজার দুঃখ-পাখি ডিম পেড়ে রেখে গেছে। তাই ওরা তাকালেই যেনো সামনে দেখতে পায় দুঃখ। ওরা ঘুমোলেও স্বপ্নে দেখে কেবল দুঃখ। ওদের হাসিও দুঃখঘেরা। ওদের কণ্ঠও কান্নাভেজা। বর্তমান ওদের দুঃখঘেরা, ভবিষ্যতও ওদের দুঃখে-ছাওয়া। দুঃখ যেনো ওদের উত্তরাধিকার। বাবার কাছ থেকে ছেলে পেয়েছে। ছেলের কাছ থেকে ছেলে পাবে, নাতিরা পাবে। আমরা কি এভাবেই দুঃখের কাছে পরাজিত হবো, হেরে যাবো?
এক বন্ধু জানতে চাইলো :
— হানি! বলেছো তো আমাদের মনের কথাটিই। কিন্তু এ থেকে উত্তরণের পথ কী? এ-সবের সমাধান কী?!
— সমাধান হলো আরো রক্ত! বুকের তাজা রক্ত!! রক্ত ছাড়া মুক্তি মিলবে না! কোনোদিনই ফিলিস্তিন আযাদ হবে না। গাজা নামের এই বড় কারাগারটাতেই আমাদেরকে বন্দি থাকতে হবে। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর।
— কেনো, 'ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা' তো কাজ করছেই!
— রাখো তোমার .. সংস্থা! তুমি ভালো করেই জানো, সংস্থাটা এখন আর মুক্তি সংস্থা নেই। এখন শুধু আরাম-আয়েশ চায়। বিলাসিতায় তার দেহ এখন ভারি। চলতেই পারছে না। আজ এ চুক্তি। কাল ও চুক্তি! এ-সব চুক্তি করে কী লাভ? তাও আবার এই বজ্জাত ইহুীদের সাথে? ওরা কি চুক্তিতে বিশ্বাস করে? চুক্তির আড়ালে ওরা লুকিয়ে রাখে শুধুই অবিশ্বাস আর দুশমনি।
................

রক্তের ঘ্রাণ

রক্তের ঘ্রাণ
এক.
জেরুজালেমে তখন প্রায় দুপুর। আশ্‌-পাশ থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছিলো। পাশাপাশি শোনা যাচ্ছিলো আরেকটা শব্দ, পাথর ছুঁড়ার শব্দ এবং দখলদারদের দেহে গিয়ে তা আছড়ে পড়ার শব্দ। দ্বিতীয় শব্দটিই ফিলিস্তিনীদের কাছে অতি পরিচিত এবং প্রিয়। তখন এক বিধমা মা ঘরে বসে কাজ করছিলেন। হাতে পুরোনোকালের একটা যন্ত্র। অনেক অনেক দিন ধরে এটা সংরক্ষণ-করা। কাজ করছিলেন তিনি হাতে হাতে আর স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন মনে মনে। কোনো সুখ-স্মৃতি নয়— দুঃখ-ছাওয়া ও বেদনা-ঘেরা স্মৃতি! নিষ্ঠুরতাভরা ও রক্তঝরা স্মৃতি! একটা টেবিলের সামনে বসে যেনো একে একে উল্টে যাচ্ছিলেন তিনি রক্ত-রক্ত কালি দিয়ে লেখা দুঃখ-দুঃখ কথার বড় একটা বইয়ের পাতা।
একটু পর উঠে গিয়ে একমাত্র বেঁচে-থাকা ছোট্ট ছেলের খাটের নিচ থেকে ছোট্ট একটা থলে বের করে আনলেন। এটা তার প্রায় প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ও ঘুমোতে গেলেই এ সময়ে এসে তিনি থলেটি বের করেন। তারপর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ পাথর এখান থেকে সংগোপনে সরিয়ে রাখেন। ছেলের অগোচরে এই লুকোচুরি চলছে অনেক দিন থেকেই। কতোদিন আর চলবে কী জানি! ছেলে পাথর কুড়িয়ে এনে রাখবে আর তিনি তার একটা অংশ সংগোপনে সরিয়ে ফেলবেন!
দুই.
মাঝে মধ্যে তার মনে কষ্ট ও বেদনার ঝড় ওঠে। ছেলেকে আর কতোদিন এভাবে তিনি ফিরিয়ে রাখবেন? ছেলেটা প্রতিদিনই বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে চায় পাথর হাতে— ইসরাইলী সৈন্যদের সাথে লড়তে। ক্ষোভ, হতাশা আর দুঃখ নিয়ে এখন ও একাই বেঁচে আছে পরিবারে। বয়সে শিশু হলেও নিজেকে ও শিশু ভাবতে একদম নারাজ। ওর কথায় আচরণে মনে হয়— ও-ই যেনো এখন পরিবারের একমাত্র সক্ষম ব্যক্তি। বাবা ও ভাইয়াদের প্রতিশোধ নেয়ার দায়িত্বও যেনো এখন ওর একার কাঁধেই অর্পিত হয়েছে। আসলে এখন ফিলিস্তিনের সব পরিবারই এমন। সব শিশুই ওর মতো। দু'একটি ব্যতিক্রম হয়তো আছে। সে না থাকার মতোই।
ওর বয়স এখন সাত। ছোট ছোট পাথরকণা নিয়ে ও লড়াইয়ের ময়দানে নেমে যেতে চায় এক্ষুনি। কোনো তর সইছে না আর। মা ওকে বোঝান— আব্বু! তুমি তো এখনো অনেক ছোট! আর ক’টা দিন সবুর করো! এখন তুমি ওদের সাথে পেরে ওঠবে না।' কিন্তু না, কোনো কাজ হচ্ছে না। ছেলেকে ফেরানো যাচ্ছে না। প্রতিদিনই পাথর কুড়িয়ে নিয়ে এসে জমা করছে আর তিনি তা লুকিয়ে লুকিয়ে কমিয়ে দিচ্ছেন। এ কৌশলের কাহিনী আরেকটু পরে আসছে।
মা ভালো করেই জানেন, তার শান্তি ও স্বস্তির দিন শেষ। একমাত্র মানিককে নিয়েই এখন শুধু স্বপ্ন দেখা। স্বামী ও অন্যান্য ছেলেদের মতো একেও অদূর ভবিষ্যতে শহিদী কাফেলায় শরীক হওয়ার উপযোগী ও যোগ্য করে তোলা। যে কোনোদিন তার ঘরে হাজির হতে পারে ইসরাইলী সৈন্যরা। অপরাধ একটাই্ত এ ঘরে পুরুষ আছে। ফিলিস্তিনে সাত বছরের শিশুও ওদের চোখে 'পুরুষ'। ওরা যে পাথর ছুঁড়তে পারে! রাইফেল মেশিনগান ও পিস্তলের মুকাবিলায় পাথর ছুঁড়াও ওদের চোখে মহা অন্যায়। ফিলিস্তিনীরা গুলি খাওয়ার জন্যে যেনো বুক পেতে দিলেই ওরা খুশি।
তিন.
ছেলেটা এখন আর কোনো বাঁধ মানতে চায় না। পাথর নিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়। মা ওকে বারণ করেন, সামলে রাখার চেষ্টা করেন। বলেন :
—বাবা! আরেকটু বড় হও! এখন তোমাকে হারালে কাকে নিয়ে বাঁচবো আমি? তুমি যে আমার মানিক! তুমি যে আমার স্বপ্ন!
মায়ের চোখের পানির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে শিশুটি। বলে :
—ঠিক আছে আম্মি! আমি এখন ময়দানে যাবো না! কয়েকদিন পরে কিন্তু আমাকে যেতে দিতে হবে! তখন কিন্তু আমি আর 'না' শুনবো না। যেতে দিতেই হবে!
মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। আদর করে চুমু খান। চোখের পানিতে সব একাকার হয়ে যায়! মা চোখের পানি মোছেন। আদর-সিক্ত শিশুটি কান্না-কান্না চোখে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। মায়ের অশ্রু মোছা দেখতে দেখতে জ্বলজ্বল করে ওঠে ওর চোখের তারা। শিশুর চোখের দৃষ্টি ছাপিয়ে সেখানে এসে স্থান করে নেয় এক মুজাহিদের দৃঢ় ও প্রত্যয়ভরা শাণিত দৃষ্টি। মা যেমন সন্তানের চোখের পানি সইতে পারেন না সন্তানও মা’র চোখের পানি সইতে পারে না। একজনের চোখে পানি দেখলে আরেকজনের চোখ ছলছল করে ওঠে।
চার.
ওর বড় ভাই শহীদ হয়েছে দুই মাস আগে। ওকে গুলি করে শহীদ করেছে বর্বর ইহুদী সৈন্যরা। তার আগে শহীদ হয়েছে এক অভিযানে ওর আরেক বড় ভাই। ওর একমাত্র বোনটাও শহীদ হযেছে! আর বাবা? সে এক কষ্টের গল্প। তার এ ছোট্ট ছেলেটি যখন পৃথিবীতে আসি-আসি করছিলো, তখন তিনি সেই-যে সবাইকে 'আবার দেখা হবে' বলে বের হয়ে গেলেন, আর ফিরে আসেন নি! কেউ জানে না, তিনি বেঁছে আছেন না চলে গেছেন। কিন্তু শাহাদতের যে বীজ তিনি লাগিয়ে গিয়েছিলেন এখন তা পত্র-পল্লবিত। শাহাদত যেনো ছিলো বাবার রক্তে মেশানো উত্তরাধিকার। বাবা শহীদ হয়েছেন। তাই ছেলেরাও হেঁটেছে তাঁর পথে! মেয়েটিও! আর এখন বাবার পথে, ভাইয়াদের পথে, প্রিয় বোনটির পথে নিজেকে 'নিঃশেষ' করে দেয়ার স্বপ্নে বিভোর তাঁর এই ছোট্ট ছেলেটিও!!
এ পরিবারের মতো শাহাদতের উত্তাধিকার বহন করছে ফিলিস্তিনের অসংখ্য পরিবার।দূর আজমে বসে আমরা এ-সবের একটু খবর রাখারও প্রয়োজন মনে করি না। ফিলিস্তিন যেনো শুধু ফিলিস্তিনীদের। আল আকসা বে-দখল হয়ে থাকলে যেনো আমাদের কিছুই আসে যায় না! হে আজম! তুমি বড্ড উদাসীন।
পাঁচ.
সবার শাহাদতের দৃশ্য মা'র চোখের সামনে ভাসছে। সবার তাজা তাজা রক্ত তার চোখের সামনে 'লালিমা' ছড়াচ্ছে। শাহাদতের দৃশ্য দেখতে দেখতে এবং তার রক্তময় স্মৃতি কল্পনা করতে করতে এখন তিনি কাঁদতে ভুলে গেছেন। তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে শোকের খরাময় উত্তাপে। কথা বলতেও তিনি এখন ভুলে যাচ্ছেন। আশ্চর্য এক নীরবতায় সারাক্ষণ তিনি ডুবে থাকেন। সেই নীরবতায় জ্বলে যেতে চায় তার ভিতর। এভাবে জ্বলে জ্বলেই তা শক্তি সঞ্চয় করেছে। ধীরে ধীরে, স্তরে স্তরে। স্বামী হারিয়ে, ছেলে হারিয়ে, মেয়ে হারিয়ে!! সে পবিত্র কাফেলায় যোগদানের জন্যে ছেলের পীড়াপীড়িতে তাই এখন আর তিনি নীরব থাকতে পারলেন না। হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারলেন না। তাকে থামানোর চেষ্টা শুরু করলেন। কথায় আচরণে ও কৌশলের ছায়ায়। এর প্রতি তার দরদ ও হৃদয়-টানটা একটু বেশিই। কারণ বাবার অনুপস্থিতিতে ওকে একাই তিনি লালন পালন করেছেন। তিলে তিলে বড় করে তুলেছেন। ছায়া হয়ে ওর সাথে সাথে লেগে থেকেছেন। ওর মুখের দিকে তাকিয়েই তিনি সব শোক ভুলে থাকার চেষ্টা করেন।
দেখতে দেখতেই তার মানিক কতো বড় হয়ে গেছে। কীভাবে যে এক এক করে ও সা'তে পা রেখেছে, তিনি বুঝতেই পারেন নি। এখন ও শুধু কে বন্ধু আর কে শত্রু— তা-ই বুঝতে পারে না, বরং শত্রুর মাথা ফুটু করে দেওয়ার জন্যে পাথরকণা জমায়। প্রতিরোধ লড়াইয়ে শামিল হওয়ার জন্যে প্রতিদিনই তার কাছে বায়না ধরে। হায়, কী জঘন্য শত্রু। আকারে-আকৃতিতে মানুষ, কিন্তু আচার-আচরণে জন্তু। হৃদয়ে মায়া নেই, পাষাণে ঘেরা। বর্বর নিষ্ঠুরতায় ওরা হত্যা করে নিষ্পাপ কচি কচি শিশু-কিশোরকে। অস্ত্র-সজ্জিত শত্রুর মতো এই পাথর-বহন করা শিশু-কিশোররাও ওদের গুলির নিশানা হয়। কখনো কখনো কোনো অজুহাত ছাড়া এমনিতেই ওদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় শিশু-কিশোর বুক! পৃথিবীর আর কোথাও কি ঘটে এমন নির্মম শিশু-হত্যা? হে জাতিসংঘের ইউনিসেফ! তোমার ভিতরে বিবেক থাকলে জানতে চাই! উত্তর দেবে? পৃথিবীর কোন প্রতিপক্ষ শিশুদেরকে অমন নির্মম জিঘংসায় হত্যা করে? জানা আছে?
ছয়.
এভাবেই দিন চলছিলো। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। মা সোনামণিকে বিরত রেখে চলেছেন সর্বশেষ অস্ত্রটি ব্যবহার করে। ছেলের ব্যাকুল পীড়াপীড়িতেই এই অস্ত্রটার ধারণা এসেছে তার মাথায়। তিনি ছেলেকে বলে দিয়েছেন—
— শোনো মানিক! আমিও চাই শহিদী ঈদগাহে শামিল হবে তুমি! কিন্তু তোমার তো পর্যাপ্ত অস্ত্র নেই!
— কে বলেছে আমার অস্ত্র নেই? এই দেখো, আমার থলেতে কত্তো পাথর জমিয়েছি!
— পাথর জমিয়ে জমিয়ে থলেটা যখন একেবারে ভরে ফেলবে, তখন আমি তোমাকে অনুমতি দেবো! তখন তুমিও যাবে বন্ধুদের মতো পাথর-সজ্জিত হয়ে ইহুদী সৈন্যদের সাথে লড়তে! কিন্তু একটা শর্ত আছে!
— কী শর্ত আম্মি?
— একদিনে এক মুঠোর বেশি পাথর জমাতে পারবে না!
ছেলে সরল মনে 'হ্যাঁ' বলে মাথা দোলায়। আর মা হাসেন দুঃখ-মেশানো বিজয়ের হাসি! ছেলে প্রতিদিনই এক মুঠো করে পাথর কুড়িয়ে এনে থলেতে ভরে রাখে আর মা সুযোগ মতো তা সরিয়ে ফেলেন। এভাবে থলেও আর ভরে না, মা'ও আর ছেলেকে নিরস্ত রাখার দুশ্চিন্তায় ভোগেন না।
সাত.
একদিন মা স্মৃতির বেদনা-সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। হঠাৎ ছেলেটা ছুটে এসে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে চীৎকার করে বলতে লাগলো— 'মা! 'কুকুরের বাচ্চারা' (ইহুদী সৈন্যরা) আমাদের ঘরের দিকে আসছে!'
মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন! তার চোখে-মুখে ফুটে উঠলো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছায়া! ছেলেকে আরো গভীর করে তিনি জড়িয়ে ধরলেন! যেনো ছেলেকে তিনি আর কোনো দিন কাছে পাবেন না, আর কোনোদিন জড়িয়ে ধরতে পারবেন না!
মা'র বুকের ভিতরে শত শত হাহাকার চীৎকার করে উঠলো! দরোজায় ওরা এসে পড়েছে! সজোরে ধাক্কা দিচ্ছে!
যে ধাক্কায় নিষ্ঠুরতার কায়া!
যে ধাক্কায় অমানুষের ছায়া!
যে ধাক্কায় কেঁপে কেঁপে ওঠে ফিলিস্তিনের সব মায়ের অন্তরাত্মা!
যে ধাক্কায় অবুঝ শিশুও আশ্রয় নেয় মায়ের কোলে তারপর চীৎকার করতে করতে কাঁদতে থাকে— 'মা!' 'মা!' 'মা!'!!
আট.
দরোজা না খুলে উপায় নেই। খুলতেই দানবের মতো ছয় সাতটা অস্ত্র-সজ্জিত ইহুদী সৈন্য ভিতরে ঢুকে পড়লো। ওদের গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছিলো, ওরা যেনো রণাঙ্গনে আছে! ওরা ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো এবং বিভিন্ন আসবাবপত্র ঘাটাঘাটি করে তা ছুঁড়ে ফেলে দিতে লাগলো। মা ও ছেলে ভীত-বিহ্বল দৃষ্টিতে সব দেখছিলেন। আর ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে কেঁপে উঠছিলেন। একটুপর ছেলেটা মা'র কোল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে এক দৌড়ে গিয়ে উপস্থিত হলো নিজের কামরায়— প্রিয় থলেটার মায়ায়। থলেটা আছে তো! না শয়তানরা তার খোঁজ পেয়ে গেছে? অনেক দিন ধরে ও পাথর জমা করছে। আর কয়েকটা দিন গেলেই তো থলেটা ভরে যেতো! তখন একটা একটা করে এই দুশমনদের দিকে ছুঁড়ে মারার কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটা চলে আসতো!
কিন্তু না, ওর স্বপ্নটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো বুঝি! একটা ইহুদী সৈন্য তা খাটের নীচ থেকে বের করে ফেলেছে! এবং চামড়ার একটা সাধারণ থলেতে ব্যাপক বিধ্বংসী কোনো অস্ত্র পেয়ে গেছে— এমন একটা ভাব নিয়ে শয়তানটা তা উল্টেপাল্টে দেখছে আর শক্ত হাতে ধরে আছে। ও গিয়েই ওর হাত থেকে তা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু পাষাণ সৈন্যটা বন্দুকের বাট দিয়ে ওর মুখে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ওকে ফেলে দিলো! খাটের কাছে গিয়ে ও ছিটকে পড়লো! নাক দিয়ে .. মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরুতে লাগলো! আঘাতের প্রচণ্ডতায় ওর বেশ কয়েকটা দাঁতও ভেঙে গেলো! ঠোঁটও অনেকটা কেটে গেছে! চোখের অশ্রু আর মুখের রক্তে একাকার সাত বছরের নিষ্পাপ নিরপরাধ এই শিশু! এখন ওর মুখ থেকে শুধু রক্ত ঝরছে না! চোখ থেকে শুধু অশ্রুও ঝরছে না, সাথে সাথে ঝরছে রাশি রাশি ঘৃণা, ক্ষোভ! বেরুচ্ছে 'আগুনের ফুলকি'!! হঠাৎ ওর চোখ পড়লো মা'র হাত থেকে ফসকে-যাওয়া একটা পাথরের টুকরোর উপর! তা পড়েছিলো খাটের কাছেই। ও পাথরটা হাতের মুঠোয় ভরলো! তারপর? তারপর গায়ের পূর্ণ শক্তি দিয়ে সৈন্যটাকে লক্ষ্য করে পাথরটা হঠাৎ ছুঁড়ে মারলো! পরিণতির চিন্তা না করে!! তারপর ও বুক টান করে রক্তাক্ত মুখের জলন্ত দৃষ্টি তুলে দাঁড়িয়ে রইলো! উপভোগ করলো নিজের পাথর ছুঁড়াটা। উপভোগ করলো নিজের স্বপ্ন পূরণের প্রথম লগ্নটা! কিন্তু সময় বেশি ছিলো না ওর হাতে। গুলি-খাওয়া আহত ইহুদী সৈন্যরা প্রতিশোধ নিতে একটু সময় নিলেও পাথর-খাওয়া ইহুদীরা প্রতিশোধ নিতে মোটেই দেরী করে না! ওরা গুলিকে-না যতোটা ভয় পায়, পাথরকে তারচে' হাজার গুণ বেশি ভয় পায়। মুহূর্তেই গর্জে উঠলো বন্দুকটা! অনেক গুলো ঘাতক-বুলেট বেরিয়ে এলো! ঝাঁঝরা হয়ে গেলো সাত বছরের শিশুর কচি বুকটা!! লুটিয়ে পড়লো এ-বাড়ির সর্ব কনিষ্ঠ শহীদের দেহটা!
নয়.
শিশু হত্যাকারী কাপুরুষ অমানুষ সৈন্যটা সঙ্গীদের নিয়ে ওকে 'খাক ও খুনে' ফেলে রেখে চলে যাচ্ছিলো!
মা এবার আর সইতে পারলেন না!
মা এবার আর শুধু অশ্রু ফেলে শহীদকে বিদায় জানাতে পারলেন না!
মা এবার উঠে দাঁড়ালেন! মা এবার রুখে দাঁড়ালেন! ধারণ করলেন অগ্নিমূর্তি! কাতিল সৈন্যটার পিছু ধাওয়া করলেন তিনি! এবার তো হারানোর কিছু নেই! তার চোখের সামনে একে একে সবাই চলে গেলো! এখন চলে গেলো সর্বশেষ মানিকটি! এখন বেঁচে থাকবেন তিনি কার জন্যে? কী নিয়ে? ছেলের প্রতিশোধ নিতে তিনি এখন 'হযরত খাওলা'র ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন! কিন্তু নাপাক সৈন্যটা এক অবলা নারীর বুকে গুলি চালাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা বিলম্ব করলো না! ঝাঁঝরা হয়ে গেলো তারও বুকটা! কাঁপতে কাঁপতে তার নিথর দেহটাও লুটিয়ে পড়লো এ বাড়ির শহিদী ঈদগাহে!
এ বাঢ়িতে এখন আর কেউ নেই শহীদ হওয়ার মতো!
হে গর্বিত বাড়ি! এবার তোমার পালা! হয়তো যে কোনোদিন ঘাতক বিমান এসে তোমাকে গুড়িয়ে দেবে!
দশ.
শয়তানরা যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই বেরিয়ে গেলো। সাথে নিয়ে গেলো পাথরের থলেটা! ফেলে গেলো মা-ছেলের রক্তরাঙা তাজা লাশ! তাদের রক্তের ঘ্রাণের সাথে মিশে গেলো একটু আগে পাক করা মা'র তরকারীর ঘ্রাণ! আর সামান্য আগের বারুদের ঘ্রাণ!
বন্ধু! দেখলে ইহুদীদের কাপুরুষতা?
শিশুর বুকে গুলি চালাতে ওরা দ্বিধা করে না!
অসহায় নারীর বুকেও ওরা গুলি চালায় অমানবিক নিষ্ঠুরতায়!
তবুও এদের পক্ষেই কথা বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়!
এখন বলো, হাজার হাজার না হোক অন্তত একজন সালাহুদ্দীন আইয়ূবী না-হলে .. না-এলে এবং নিপীড়ত নির্যাতিত অসহায় নারী-শিশুকে উদ্ধার করতে না-পারলে কে রক্ষা করবে মানবতার লাজ?

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০১৫

জাগ্রত কবি মুহিব খানের কবিতা ইসলামি কলাম

জাগ্রত কবি মুহিব খানের কবিতা

জানো কি বন্ধু ! এদেশের কিছু শিক্ষিত গরু আছে,
বাঁচার জন্য খায় না তাহারা খাওয়ার জন্য বাঁচে।
নিজেদের ভাবে মহাপণ্ডিত জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবি,
আসলে মাথায় কিছু নেই, শুধু পচা গোবরের ডিবি।
মৌলভী দেখলে নাক সিটকায়,
মোল্লা দেখলে জ্বলে,
বানরের মতো মুখ ভেংচায়, নানা কটু
কথা বলে।
ভাবে হায় হায় ! হবে কি উপায় ! এই
মোল্লাদের দলে-
প্রগতির যুগে টেনে নিল হায় দেশটাকে রসাতলে।
মোল্লারা নাকি অপয়া, অধম, সমাজের
নাকি বোঝা।
হাল জামানার বোঝেনা কিছুই, কেবলি নামাজ,রোজা।
আমি বলি- 'বাছা, সবুর সবুর এতোটা তো নয় সোজা'!
কে কতোটা ভালো-মন্দ বা দোষী এসো শুরু করি খোঁজা।
প্রথমেই দেখ শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
করে কারা?
আমরা তো দেখি তোমরাই করো,
করে নাতো মোল্লারা ।
পার্কে-বাগানে, এখানে-সেখানে ভাঙ্গা বস্তির ফাঁকে,
গাঁজার আসরে দেখেছো কি বলো কভু
কোনো মোল্লাকে?
কোনোখানে কোনো মদের
আড্ডা কিংবা জুয়া খেলাতে-
তোমাদের কভু দেখা হয়েছে কি কোনো মোল্লার সাথে?
হাঁটে বা বাজারে অলিতে গলিতে কি-বা রাস্তার মোড়ে-
দেখেছ কি কোনো মোল্লা কখনো চুরি-রাহাজানী করে?
সাথে বে-শরম, বেহায়া, বে-লাজ, উদ্ভট
নারী নিয়ে-
কোনো মোল্লা কি তোমাদের মতো বেড়ায় রিক্সা দিয়ে?
রাস্তার পরে মাস্তানী বল
মোল্লারা করে কভু?
অযথাই কেন মোল্লাদেরকে দোষারোপ
করো তবু?
তোমরাই বলো- কোনোদিন
কোনো অফিসে বা আদালতে-
কোনো মোল্লাকে পেয়েছ কখনো কারো কাছে ঘুষ খেতে?
যত দুর্নীতি, কালোবাজারি বা মাদক
চোরাচালানে ক'জন মোল্লা পেয়েছ
বলতো হাতে আঙ্গুলে গুণে !
মাদ্রাসা পড়া শেষ শেষ করে তারা কিছু না কিছু তো করে।
বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে বসে তো থাকে না ঘরে।
কোন যুক্তিতে করো বাহাদুরি, কিসের
গরীমা এতো?
তোমরা তো করো দাঁড়িয়ে পেশাব
নেড়ী কুত্তার মতো।
মুখে বলো শুধু- আমরা বাঙালি,
আমরা স্বাধীন জাতি।
ইংরেজদের গোলামী ছাড়োনী আজো বাপ-দাদা-নাতি,
প্যান্টের নিচে শার্ট ইন করে দেখাও পাছার মাপ,
দাঁড়ি গোঁফ চেঁছে কচি খোকা সাজো এগারো ছেলের বাপ। tongue emoticon
বাংলার সাথে ইংরেজি মারো দেখাও আধুনিকতা।
বৈশাখ এলে ঢালো বটমূলে হৃদয়ের আকুলতা !
পাঞ্জাবী পড়ে বাঙালী সাজো মাটির
সানকী হাতে।
নারী-মদ নিয়ে নাচো ইংরেজি নববর্ষের রাতে।
ব্রেকফার্স্ট, লাঞ্চ, ডিনার কত কি শিখেছ নতুন ভাষা !
বাড়ীতে গরীব মায়েরা কিষাণী, বাপেরা গরীব চাষা।
মাম্মি-ড্যাডি তো হয়েছে মা বাপ ,আংকেল হলো চাচা,
হিসাবে তো দেখি তোমরাই বাপু সমাজের পরগাছা।
তোমরাই বাপু চরম বাচাল বেয়াদব,বেপরোয়া,
বাস ট্রেনে বসে সিগারেট টানো,বাতাসে ছড়াও ধোঁয়া।
পথে ঘাঁটে কোনো সুন্দরী পেলে তোমরাই মারো শীষ,
তোমরাই ডেকে এনেছ জাতির কপালের গরদিশ।
তোমারাই আনো বখাটে ফ্যাশন, বানরের বেশধরে,
জোড়াতালি মারা প্যান্টের সাথে স্কীন টাইট জামা পরে।
চুলের বাহারে বুঝিনা আহারে- কে পুরুষ,কে মহিলা,
কিছু লাল, কিছু বাদামী আবার কিছু আছে, কিছু ছিলা।
ব্যান্ডের তালে ভণ্ডের মতো মাতাল নৃত্য নেচে
দেশী সংস্কৃতি সভ্যতাটুকু তোমরাই
দিলে বেঁচে।
তোমরাই করো বস্ত্রহরণ টিএসসি চত্বরে।
খুন ধর্ষণে সেঞ্চুরি করে জানাও গর্বভরে।
তোমরাই হলে সমাজের কীট, সমাজের
নর্দমা,
দেশ জনতার গন-আদালতে তোমাদের নাই ক্ষমা।
মোল্লারা আজো নম্র ভদ্র, এখনো শান্ত ধীর,
তোমরাই হলে পাপে কলুষিত কলঙ্ক এ
জাতির।
নীতি-শৃঙ্খলা, শ্রদ্ধা-ভক্তি এখনো তাদের আছে।
দেশ জাতি যাহা করে না আশাই আজ
তোমাদের কাছে।
হয়তো তাহারা কিছুটা সরল চুপচাপ, সাদা-সিধা।
এদের কারণে সমাজের হলো কি এমন অসুবিধা?
ঈমান-আমল দেশপ্রেম সব আছে তাহাদের মাঝে।
জেনে বুঝে সব চুপচাপ তারা আছে তাহাদের কাজে।
তাই বলি- বাছা, অযথাই শুধু
খুঁচিওনা তাহাদেরে,
বলা তো যায় না, আরামের ঘুম
নিতে পারে তারা কেড়ে !
আঁতুড় ঘরে তো বাচ্চার কানে আজান দেবার তরে-
দিনে কি বা রাতে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুট মোল্লার ঘরে।
মোল্লা ছাড়া তো চলে না খতম,
থেমে থাকে শাদী বিয়ে,
মরার পরে তো কবরে নামায় মোল্লাই
কাঁধে নিয়ে।
তবে কেন এতো মোল্লা বিরোধী,মোল্লার প্রতি ঘৃণা?
তার চেয়ে দেখো কিছুটা মোল্লা,
নিজে হতে পারো কি না !
যৌবনে সোজা না হয়ে তোমরা জীবন কাটাও বেঁকে-
বুড়ো হয়ে পরে মসজিদে আস টুপী আর
দাঁড়ি রেখে।
বিজাতীয় রীতি, অপসংস্কৃতি নীতিহীনতার ফাঁদে-
মোল্লারা ছাড়া গোল্লায় সব, যাবে কিছুদিন বাদে।
হাজার পাপের বোঝা নিয়ে কাঁধে চুপচাপ
বসে থাকো,
সত্যের হাড়ি ভেঙ্গে দিলে আর নিস্তার
পাবে না-কো।
গর্তে ঢোকার সময়
জানো তো সোজা হয়ে ঢুকে সাপ!
ধরা খেলে সোজা তোমরা না শুধু,
হবে তোমাদের বাপ।
তারচেয়ে এসো একসাথে মেশো ঘৃণা-বিদ্বেষ ছাড়ো।
ইসলাম শিখো, চোখ মেলে দেখো বহু কিছু আছে আরও।
কভু যা দেখোনি, কভু যা বুঝনি, কভু
যা শুননি কানে
খাঁটি মোল্লার দরবার ছাড়া তা পাবে না কোনখানে।
মোল্লাকে বুঝো, মোল্লাকে খুঁজো,
মোল্লাকে মানো সবে,
তাহারাই হবে কামিয়াব যারা মোল্লার
সাথে রবে।
সহজ ভাষায় জানালাম কিছু অপ্রিয় সত্য
কথা,
মানো বা না মানো আসলে এটাই চরম
বাস্তবতা