চার ইমাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
চার ইমাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৭

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত হানাফী


লেখকঃ মুহাম্মদ আমীন সফদর রহঃ
অনুবাদ– লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

প্রিয় পাঠকেরা! এই দুনিয়ার মাঝে অনেক ধর্ম পাওয়া যায়, কিন্তু এর মাঝে সত্য ধর্ম শুধু ইসলামই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালার কাছে মনোনিত ধর্ম হল ইসলাম (সূরা আলে ইমরান-১৯) “
.
আর যারা ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম চায় তা কখনো গ্রহণীয় হবেনা। আর সে আখেরাতে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত”। (সূরা বাকারা-৮৫)
.
এমনিভাবে মুসলমানদের মাঝে বেশ কিছু ফিরক্বা পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের মাঝে নাজাত পাবে শুধু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত।
.
রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-“নাজাতপ্রাপ্ত হবে তারা, যারা আমার এবং সাহাবাদের মত ও পথে থাকবে” ( তিরমীজী শরীফ, হাদিস নং-২৬৪১)
.
তিনি আরো বলেন-“আমার এবং আমার খুলাফায়ে রাশেদীনদের সুন্নত অবশ্যই আঁকড়ে ধর” (তিরমিজী শরীফ)
.
নবীজী আরো ইরশাদ করেন-“যে আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে আমার থেকে নয়” (বুখারী শরীফ-হাদিস নং-৪৭৭৬)
.
আর এক বর্ণনায় নবীজী সাঃ তার সুন্নাত পরিত্যাগকারীকে বলেছেন অভিশপ্ত (মিশকাত শরীফ) আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ছাড়া বাকি দলকে জাহান্নামী বলেছেন নবীজী সাঃ (তিরমীজী শরীফ, হাদিস নং-২৬৪১)
.
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ বলেন-যখন নবীজী সাঃ এর কাছে আয়াতে কারীমা- ﻳﻮﻡ ﺗﺒﻴﺾ ﻭﺟﻮﻩ এর তাফসীর জিজ্ঞেস করা হল, তখন নবীজী সা. ইরশাদ করেন-“যাদের চেহারা কিয়ামতের দিন আলোকিত হবে তারা হল “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত”। আর আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ ও এরকম ইরশাদ করেছেন (আদ দুররুল মানসুর-২/৬৩)
.
নবীজী সাঃ আরো বলেন- “হাসান রাঃ এবং হুসাইন রাঃ আহলে সুন্নাতের চোখের শীতলতা”।(আল কামিল লি ইবনে আছীর-৪/৬২)
.
ব্যাখ্যা
.
নবীজী সাঃ বলেন-আমার উম্মতের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। এ দু’টিকে মজবুতভাবে আঁকড়ে রাখলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবেনা, আল্লাহ তায়ালার কিতাব, এবং আমার সুন্নাত (মুয়াত্তা মালিক-হাদিস নং-৭০২)
.
কুরআনে কারীম আল্লাহ তায়ালার সর্বশেষ এবং পূর্ণাঙ্গ কিতাব। যা সর্ব প্রকার সন্দেহ থেকে পবিত্র। তা শাব্দীক ইলহাম তথা ওহীয়ে মাতলু’।
.
আর নবীজী সা. এই কিতাবের উপর খোদ আল্লাহ তায়ালার বুঝানো হিসেবে তিনি যে আমলী নমুনা আমাদের সামনে পেশ করেছেন তাই হল সুন্নাত। আর এতে আহলে সুন্নাত এর অর্থটাও বুঝে এসে গেল। অর্থাৎ যারা কুরআন পাকের উপর নিজের সিদ্ধান্ত নয় বরং রাসূল সা. এর আমলী নমুনা সামনে রেখে আমল করে তাদেরকেই বলা হয় “আহলে সুন্নাত”। কেননা শব্দটা কুরআনের আর আমলের নমুনা হল নবীজী সা. এর। আর এইতো সুন্নাত!
.
ওয়াল জামা’আত
.
যেমন কুরআনে কারীম সহীহভাবে বুঝার জন্য কেবল আরবী ভাষাই যথেষ্ট নয়। বরং নবীজী সা. এর আমলী জীবনই হল এর সহীহ তাফসীর।
রাসূল সা. আগত উম্মতদের জন্য সাহাবায়ে কিরামের একটি বিরাট দল তৈরী করলেন, যারা তাঁর তত্বাবধানে তাঁরই সুন্নাতের আমল করেছেন। আর পরবর্তী আগত উম্মতের জন্য তারা সুন্নাতের আমলী নমুনা হলেন। তারা শুধু নবীর নিগারানীতেই তৈরী হননি, বরং আল্লাহ তায়ালাও তাদের পূর্ণাঙ্গ তত্বাবধায়ন করেছেন। সাথে সাথে ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﻢ ﻭﺭﺿﻮ ﻋﻨﻪ (আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহ তায়ালার উপর সন্তুষ্ট।) সার্টিফিকেটও আল্লাহ তায়ালা দিলেন।
.
নবীজী সা. তাগীদের সাথে হুকুম করেছেন-ﻋﻠﻴﻜﻢ ﺑﺎﻟﺠﻤﺎﻋﺔ 
.
এই জামাআতকে দৃঢ়তার সাথে আঁকড়ে ধর। নবীজী সা. জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে শয়তানের লোকমা বলেছেন। আর ঐ বকরীর সাথে তুলনা করেছেন- যে রাখালের নিয়ন্ত্রণ এবং বকরীর পাল থেকে বেরিয়ে কোন নেকড়ের শিকারে পরিণত হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ)
.
শায়েখ ইবনে তাইমিয়া র. বলেন-
.
ﻓﺎﻫﻞ ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻭﺍﻟﺠﻤﺎﻋﺔ ﻫﻢ ﺍﻟﻤﺘﺒﻌﻮﻥ ﻟﻠﻨﺺ ﻭﺍﻹﺟﻤﺎﻉ 
.
অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত হল ঐ সকল লোক-যারা কুরআন সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মতের অনুসরণ করে (আল মানহাজুস সুন্নাহ-৩/২৭২)
.
দ্বীন পূর্ণাঙ্গকরণ
.
আল্লাহ তায়ালা তাঁর শেষ এবং এবং পূর্ণাঙ্গ কিতাবের মাঝে দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতার ঘোষণা দিয়েছেন-
.
ﺍﻟْﻴَﻮْﻡَ ﺃَﻛْﻤَﻠْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﺩِﻳﻨَﻜُﻢْ ﻭَﺃَﺗْﻤَﻤْﺖُ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻧِﻌْﻤَﺘِﻲ ﻭَﺭَﺿِﻴﺖُ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻹِﺳْﻼﻡَ ﺩِﻳﻨﺎً ‏[ ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ 3: ] 
.
অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, আর তোমাদের উপর আমার নিয়ামতকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। আর তোমাদের জন্য ধর্ম হিসেবে নির্বাচিত করলাম ইসলামকে।(সূরা মায়িদা-৩)
.
দ্বীন শক্তিশালীকরণ
.
রাসূল সাঃ যেই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনে ইসলাম নিয়ে এসেছেন গোটা পৃথিবীর জন্য। আরবে তা নবীজী সা. এর জীবদ্দশায়ই পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করে। বাকি অনারবে নবীজীর সাহাবা যারা নবীজীর সুন্নাতের নমুনা ছিলেন তাদের দ্বারা তা বিকাশ লাভ করে। একথার সুসংবাদতো খোদ কুরআনে কারীমেই বিদ্যমান-“আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন ঐ সকল লোকদের জন্য যারা তোমাদের মাঝে ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের পৃথিবীতে খলীফা বানাবো, যেমন তাদের পূর্ববর্তীদের বানিয়েছি। এবং তাদের জন্য নির্বাচিত দ্বীনকে তাদের জন্য দৃঢ় করে দিব। আর তাদের জন্য ভীতিকে নিরাপত্তা দিয়ে পাল্টে দিব। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কারো শরীক করবেনা। তারপরও যারা কুফরী করবে তারাই নাফরমান”। (সূরা নূর-৫৫)
.
সুতরাং যেই দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা হুজুর সা. উপর হয়েছিল তা সাহাবায়ে কিরামের মেহনত এবং চেষ্টায় দুনিয়ায় মজবুতির সাথে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই পবিত্র জামাআত, যাদের সুন্দর উল্লেখ্যতা আমাদের নামের মাঝে জামাআত নামে চলে এসেছে। আহলে সুন্নাত ছাড়া কোন আহলে বিদআতের নাম না ওয়াল জামাআত, না এর দ্বারা সাহাবাদের জামাআত উদ্দেশ্য।
.
দ্বীনি বিষয় সংকলন
.
কুরআনে কারীমের পূর্ণাঙ্গ আমলী ব্যাখ্যা সুন্নাত। এই সুন্নাতের পূর্ণাঙ্গ আমলী নমুনা সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন, যারা নবীজী সা. এর তত্বাবধানে তৈরী হয়েছিলেন। তাদের মাধ্যমে নবীজী সা. এর সুন্নাত দুনিয়ায় বিকাশ লাভ করেছে। নবীজী সা. হেদায়াতের সূর্য ছিলেন। আর তাঁর সাহাবারা রা. ছিলেন তারকার মত। তাদের মাধ্যমে দুনিয়াজুড়ে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে। এই সকল পবিত্রাত্মাদের জীবন জিহাদে অতিবাহিত হয়েছে। তাদের এই সুযোগ ছিলনা যে, তারা নবীজীর সুন্নাতকে সাজানো গোছানোভাবে সন্নিবিষ্ট করবেন। কিন্তু এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যে, যে দ্বীন কিয়ামত পর্যন্তের জন্য এল। তার সহজ এবং সাধারণ্যের বুঝার অনুকূল করে সাজিয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাসহ একত্রিত করে দেয়া হবে। যেন কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানরা এ থেকে তাদের প্রিয় নবীজী সা. এর সুন্নাতের উপর সহজে আমল করতে পারে। এই কারণে এই মহান কর্ম সাহাবায়ে কিরামের শেষ জমানায় শুরু হয়। আর সংকলনের প্রথম পদক্ষেপ সাইয়্যিদুনা ইমামে আজম নু’মান বিন সাবেত আবু হানীফা কুফী রহ. গ্রহণ করেন। এটির সুসংবাদও কুরআনে কারীম এবং হাদিসে বিদ্যমান। 
.
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-“তোমরা শুন! তোমাদের আল্লাহর পথে খরচ করার জন্য আহবান করা হচ্ছে, তোমাদের মাঝে কিছু লোক এমন আছে যারা কৃপণতা করে, আর যারা কৃপণতা করে, তারা মূলত নিজের সাথেই কৃপণতা করে। আল্লাহ তায়ালাতো অমুখাপেক্ষি, তোমরাই মুখাপেক্ষি, সুতরাং তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে তোমাদের বদলে অন্য এক জাতিকে নিয়ে আসবেন। তারা তোমাদের মত হবেনা”। (সূরা মুহাম্মদ-৩৮)
.
আল্লামা উসমানী রহ বলেন-“অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা যেই হিকমত এবং উপকারিতার জন্য বান্দাদের খরচ করার হুকুম দিয়েছেন তা অর্জিত হওয়া তোমাদের উপর নির্ভরশীল নয়। যদি এমন হয় যে, তোমরা কৃপণতা করবে, আর তার আদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তাহলে তিনি তোমাদের স্থানে অন্য এক জাতিকে দাঁড় করিয়ে দিবেন, যারা তোমাদের মত কৃপণ হবেনা। বরং অনেক আনন্দের সাথেই আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালন করবে। আর তার রাস্তায় খরচ করবে। যেভাবেই হোক আল্লাহ তায়ালার হিকমত এবং উপকারিতাতো পূর্ণ হবেই কিন্তু এই সৌভাগ্য থেকে তোমরা হবে বঞ্চিত।
.
হাদিসের মধ্যে এসেছে সাহাবায়ে কিরাম প্রশ্ন করলেন-“হে আল্লাহর রাসূল! দ্বিতীয় জাতি কারা হবে...? যাদের দিকে ইঙ্গিত করা হল...?” নবীজী সা. হযরত সালমান ফারসী রা. এর উপর হাত রেখে বললেন-“ তাঁর জাতি” আর বললেন-“আল্লাহর কসম! যদি ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্র পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে তাহলে পারস্যের লোকেরা তা সেখান থেকেও নামিয়ে নিয়ে আসবে”। (বুখারী শরীফ-হাদিস নং-৪৩১৫ মুসলিম শরীফ-হাদিস নং-৬৬৬২)
.
আলহামদুলিল্লাহ! সাহাবায়ে কিরাম এরকম নজীরবিহীন কর্মতৎপরতা আর ঈমানের জোশ দেখিয়েছেন যে, তাদের স্থলে অন্যদের রাখার সুযোগই হয়নি। এমনকি পারস্যবাসী ইসলামে প্রবিষ্ট হয়ে ইলম ও ঈমানের শানদার প্রকাশ করেছেন। আর এমন জবরদস্ত দ্বীনী খিদমাত করেছেন যে, যা দেখে যে কেউ চিন্তা ছাড়াই স্বীকার করবে যে, নিশ্চয় হুজুর সা. এর ভবিষ্যতবাণীর তারাই ছিলেন উদ্দেশ্য। যারা প্রয়োজনের সময় আরবের স্থলাভিষিক্ত হতে পারতেন। হাজারো উলামায়ে কিরাম ও আইয়িম্মায়ে কিরামের দিকে না তাকিয়েও শুধু ইমাম আবু হানীফা রহ. এর বিদ্যমানতাই এই ভবিষ্যতবাণীর সত্যতার জন্য যথেষ্ঠ। বরং মহান ভবিষ্যতবাণীর পূর্ণাঙ্গ এবং প্রথম মিসদাক হযরত আবু হানীফা রহ.।
.
অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা স্বাক্ষ্যরতাহীন (আহলে আরব) ব্যক্তিদের উল্লেখের পর ইরশাদ করেন-“আর নবীকে পাঠানো হয়েছে দ্বিতীয় আরেকটি জাতির জন্য যারা এখনো তার সাথে একত্র হয়নি, তিনিই পরাক্রমশালী ও হিকমতওয়ালা। এসব আল্লাহ তায়ার করুণা, আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছে দান করেন। আল্লাহ তায়ালা বড়ই করুণাকারী” (সূরা জুমআ-৩-৪)
.
আল্লামা উসমানী রহ. বলেন-“হযরত শাহ সাহেব রহ. লিখেন যে,-আল্লাহ তায়ালা আরবদের সৃষ্টি করেছেন এই দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য যাদের পিছনে রয়েছে অনারবী কামেল লোকেরা”।
.
হাদিসের মধ্যে এসেছে-“যখন নবীজী সা. কে এই আয়াত 
.
ﺁﺧﺮﻭﻥ ﻣﻨﻬﻢ ﻟﻤﺎ ﻳﻠﺤﻘﻮﺍ ﺑﻬﻤﻮ 
.
এর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হল তখন নবীজী সা. হযরত সালমান ফারসী রা. এর কাঁধে হাত রেখে বললেন-“যদি ইলম বা দ্বীন “সুরাইয়া” পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে তাহলে তাঁর জাতি পারস্যের লোকেরা সেখান থেকেও তা নিয়ে আসবে। শায়েখ জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহ. প্রমুখগণ একথা স্বীকার করেছেন যে, এই ভবিষ্যতবাণীর বড় মিসদাক (লক্ষ্য) হল ইমামে আজম আবু হানীফা রহ.”। (তাফসীরে উসমানী হাশিয়া নং-৭)
.
সুতরাং এই ভবিষ্যতবাণী অনুযায়ী সাইয়্যিদুনা ইমাম আজম আবু হানীফা রহ. দ্বীন সংকলন করেছেন। যেহেতু কুরআনে কারীমের দ্বিতীয় নাম “লুকায়িত দ্বীন”। যার পূর্ণাঙ্গতা নবীজী সা. এর উপর, শক্তিশালীত্ব সাহাবায়ে কিরামের দ্বারা, আর সংকলনের মহান দায়িত্বে প্রথম হবার সৌভাগ্য হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর হয়েছে। আর একারণেই সর্বসম্মতভাবে তার উপাধী আবু হানীফা নির্ধারিত হয়েছে, অর্থাৎ দ্বীনে হানীফের প্রথম সংকলক।
.
ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মূল নাম নু’মান।
.
ইবনে হাজার মক্কী রহ. নু’মান এর তিনটি অর্থ লিখেছেন-
.
১. “নিয়ামত থেকে ইসমে মুবালাগা”, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা পূর্ণ হবার ঘোষণা দিয়েছেন। তাহলে সবচে’ বড় নিয়ামতের সংকলন যার হাতে হয়েছে তিনি অবশ্যই নামের সাথে মিলে নু’মান।
.
২. “নু’মান” এক ঘাসের নাম। যার খুশবো বহুদূর পর্যন্ত পাওয়া যায়। বিশ্বনবী সা. এর সার্বজনীন সুন্নাতের খুশবো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছেন হযরত নুমান বিন সাবেত রাহ.। অন্য কোন ইমামের মাজহাব তার চারপাশেই ছড়েনি। এ জন্যই তিনি নামের সাথে মিলে “নু’মান”।
.
৩.... “নু’মান” ঐ রক্তকে বলে যার উপর জীবন নির্ভরশীল। যা শরীরের প্রতিটি রন্দ্রে রন্দ্রে পৌঁছে। তিনি প্রিয় নবীজীর প্রিয় সুন্নাতকে এরকম ব্যাখ্যা করেছেন যে, মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের ছোট বড় প্রায় সকল মাসআলার সমাধান সুন্নাত থেকে অনুসন্ধান করে নিয়েছেন। এই অর্থেও তিনি “নুমান”। এছাড়া তার ফিক্বহ পরবর্তীদের জন্য মূল ভিত্তির কাজ দেয়।
.
ইমাম মালিক রহ. ইমাম শাফেয়ী রহ. এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. সবাই তার থেকে উপকৃত হয়েছেন। তাই এই অর্থেও তিনি নামের সাথে মিলে ‘নুমান”।
.
তার উপাধী “ইমামে আজম” কারণ নবীজী সা. বলেছেন- ﺃﻋﻈﻢ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻧﺼﻴﺒﺎ ﻓﻲ ﺍﻹﺳﻼﻡ ﺃﻫﻞ ﻓﺎﺭﺱ অর্থাৎ ইসলামে বড় অংশ পারস্যবাসীর!
.
(কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আক্বওয়াল-হাদিস নং-৩৪১২৬)
.
বিষয়টি সুষ্পষ্ট। যাদের ইসলামে বড় (আজম) অংশ হবে, তাদের ইমামও বড় (আজম) হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই ইমাম আবু হানীফা রহ. এর উপাধী “ইমামে আজম”। সাহাবায়ে কিরামের পর তাঁকেই মানুষ আজম মেনেছেন। আর দুনিয়ার মাঝে এক বিশাল জামাআত এখনো তার মুকাল্লিদ বা অনুসারী।
.
মোদ্দাকথা হল-রাসূল সা. হিদায়াতের সূর্য। সাহাবায়ে কিরাম হিদায়াতের তারকা। আর সুরাইয়া তারকা পর্যন্ত পৌঁছাকারী ব্যক্তিত্ব হযরত ইমামে আজম রহ.। আহলে সুন্নাতের মাঝে আমাদের নিসবত হিদায়াতের সূর্য পর্যন্ত গিয়ে মিশেছে। ওয়াল জামাআতের মাঝে আমাদের নিসবত হিদায়াতের তারকাপুঞ্জ পর্যন্ত সুরাইয়া তারকায় পৌঁছাকারী হানাফী ইমামের সাথে।
.
রাসূল সা. দ্বীন আনয়নকারী। সাহাবায়ে কিরাম দ্বীনকে প্রসারকারী। আর চার মাজহাবের ইমাম দ্বীনকে লিখাকারী। 
.
সাহাবায়ে কিরাম সুনিশ্চিতভাবে ঐ দ্বীনই প্রসার করেছেন যা নবী সা. এনেছেন। আর আইয়িম্মায়ে কিরাম ঐ দ্বীনই লিখেছেন যা সাহাবায়ে কিরাম প্রসার করেছেন। আমাদের এই নাম “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত হানাফী’ আমাদের মাজহাবের নিরবচ্ছিন্ন সনদ। যা নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরার আমলের উপর নির্ভরশীল। নবী কারীম সা. এর সুন্নাত সাহাবায়ে কিরাম স্বচক্ষে দেখেছেন। আর এর উপরই নিরবচ্ছিন্নভাবে আমল প্রচলন হয়েছে। আর ইমাম সাহেব রহ. সাহাবীদের দেখেছেন। তাদের নিরবচ্ছিন্ন আমল দেখেছেন। তাদের নিরবচ্ছিন্ন আমলকে কিতাবে সংকলন করেছেন। আর আমল হিসেবে পূর্ণ দুনিয়ায় তা নিরবচ্ছিন্নতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। প্রত্যেক স্থানে সুন্নাতের উপর আমল প্রচলন হয়ে গেছে।
.
যেমনিভাবে আমাদের এই নাম নবীজী সা. পর্যন্ত মিলিত। এমনিভাবে এই নামে পূর্ণাঙ্গতাও রয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত ধারাবাহিকতার সাথে চার দলিলে শারইয়্যাহকে মানেন। কিতাবুল্লাহ, সন্নাতে রাসূল, ইজমায়ে উম্মাত, কিয়াস। এই নামের মাঝে চারটি দলিলেরই সমাবেশ আছে।
.
সুন্নাতে রয়েছে কুরআনের শব্দ আর নবীজী সা. এর আমলী নমুনা। ওয়াল জামাআতের মাঝে ইজমা এবং হানাফী কিয়াস অন্তর্ভূক্ত।
ফিক্বহে হানাফীর চার আসাস(ভিত্তি)
কিতাব, সুন্নাত, ইজমা, কিয়াস
এখন এই বিস্তারিত এবং সনদপূর্ণ মত ও পথের উল্টো কথিত আহলে হাদিসদের পর্যালোচনাও জেনে নিন। 
.
প্রফেসর আব্দুল্লাহ ভাগলপুরী নিজের কিতাবে লিখেন-“কতটা আফসোসের ব্যাপার যে, খৃষ্টান, আর মির্যায়ীরা যে কাফের। তারাতো তাদের নিসবত তাদের নবীর দিকে করে ঈসায়ী এবং আহমদী বলে। আর তোমরা মুসলমান হয়ে নিজ নবী ছেড়ে নিজের ইমামের দিকে করে হানাফী বলো। মির্যায়ী এবং ঈসায়ীরা কি ভাল না....? যারা নিজেদের নিসবত অন্তত তাদের নবীর দিকে করে যারা তাদের নিসবত তাদের ইমামের দিকে করে তাদের তুলনায়?” (আসলী আহলে সুন্নাত-৩) 
.
তিনি আরো বলেন-“আসল বাপ রেখে অন্য কারো দিকে নিসবত করা কোন শরীয়তের মাসআলা...? যখন নবীজী সা. আমাদের রুহানী পিতা। তো পিতাকে ছেড়ে অন্য কারো দিকে নিসবত করার অর্থ হল যে, হয়তো নবীজী তাদের পিতা নয়!!!! নতুবা তারা ভুলে আছে। রাসূল সা. বলেছেন-“যেই ব্যাক্তি তার পিতা থেকে নিজের নিসবত ভেঙ্গে দেয় সে কুফরী করল। সাথে সাথে তার জন্য জান্নাত হারাম”।(আসলী আহলে সুন্নাত-৪)
.
সম্মানিত পাঠক/পাঠিকাগণ! আপনারা আহলে হাদিসদের মৌলিকত্ব দেখেন-সমস্ত হানাফী মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী, মুহাদ্দিসীন, ফুক্বাহা, মুফাসসিরীন, ওয়ালী আল্লাহরা সবাই নবীকে ছেড়ে দিয়েছেন। তারা ঈসায়ী আর মির্যায়ী থেকেও জঘন্য। তাদের মাঝে কেউই নিজেরে বাপ থেকে নয়। তারা সবাই কাফের! তাদের উপর জান্নাত হারাম!! এরকম আহলে হাদিসের জন্য জীবন উৎস্বর্গ হোক!
.
কয়েক লাইন পরেই তিনি লিখেন-ইসলামের কোন সংস্করণ কিংবা কোন প্রকার যেমন সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র নয়, তেমনি শাফেয়িয়্যাত এবং হানাফিয়্যাত ও ইসলামের কোন প্রকার নয়। সোস্যালিজম হোক বা গণতন্ত্র হোক বা হানাফিয়্যাত বা শাফিয়ীয়্যাত কিংবা দেওবন্দীয়্যাত হোক অথবা বেরলবীয়্যাত হোক, এসব কিছুই ইসলামের মাঝে অতিরঞ্জন। যা ইসলামে একেবারেই নেই। (আসলী আহলে সুন্নাত-১৩)
.
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! কথিত আহলে হাদিসদের হাদিসের উপর আমলের পরিণাম দেখুন! দুনিয়াতে কোথাও মুসলমান পাওয়া যায়...??
.
ইখতিলাফ এবং স্বাতন্ত্রতা
.
সাহাবায়ে কিরামের মাঝে এ ব্যাপারে ঐক্যমত্ব ছিল যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. সবচে’ উত্তম ছিলেন। এজন্য কাউকে আবু বকরী বলা হয়না। তারপর হযরত ওমর রা. এর ব্যাপারেও কোন মতভেদ ছিলনা। এজন্য কাউকে ওমরী বলা হয়না। হযরত উসমান রা. এবং হযরত আলী রা. এর ব্যাপারে কিছু ইখতিলাফ ছিল।
.
জমহুর সাহাবীরা হযরত উসমান রা. কে হযরত আলী রা. থেকে উত্তম বলতেন। স্বাতন্ত্রতার জন্য হযরত উসমানকে উত্তম বর্ণানাকারীদের উসমানী বলা হয়। আর আলী রা. কে উত্তম বর্ণনাকারীদের আলিয়ী বলা হয়।
.
কিছু তাবেয়ীকে উসমানী এবং আলিয়ী বলার বর্ণনা বুখারী শরীফের ১ নং খন্ডের ৪৩৩ নং পৃষ্টায় আছে।
.
কুরআনে পাকের ক্বিরাতের মাঝে যখন ইখতিলাফ হয় তখন স্বাতন্ত্রতার জন্য ক্বারী আসেম রহ. এর ক্বিরাত এবং ইমাম হামযাহ রাহ. এর ক্বিরাত রাখা হল। এটাকে কেউতো এই উদ্দেশ্য নেয়নি যে, এটা আল্লাহর কুরআন নয়, বরং ক্বারী আসেমের বানানো! হাদিসের মাঝে মতভেদ হলে বলা হয় এটা আবু দাউদের হাদিস আর এটা বুখারীর হাদিস। এই কথার উপরও কেউ কুফরীর নিসবত করেনাতো!
.
ঠিক এমনি হাল ফিক্বহী বিষয়ে মতভেদের সময় ‘হানাফী” আর “শাফেয়ী” বলাটা। আমরা ঈসায়ীদের বিপরীতে নিজেকে মুসলমান বলি। আহলে বিদআতি খারেজী মুতাজিলীদের বিপরীতে নিজেদের আহলে সুন্নাত বলি। আর শাফেয়ীদের বিপরীতে নিজেদের হানাফী বলি।
.
যেমন আমরা ভারতীদের বিপরীতে নিজেদের পাকিস্তানী বলি। (আমরা বলি বাংলাদেশী-অনুবাদক) জাতিভেদের বিপরীতে বলি আমরা পাঞ্জাবী, লাহোরীদের বিপরীতে এসে বলি ওকারওয়ী। ওকারওয়ী পাঞ্জাবী, পাকিস্তানিকে মেনে বলা হয়। ছেড়ে নয়। বেচারা প্রফেসর সাহেবের এই অবস্থা হল যে, “নাকি” শব্দের ব্যবহারও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানেননা। এই শব্দটি একই প্রকারের ক্ষেত্রে আসে।
.
যেমন আজ শনিবার নাকি রবিবার...? আজ নভেম্বর নাকি ডিসেম্বর...? সুতরাং প্রশ্ন হবে-“তুমি মুহাম্মদী না ঈসায়ী...? তুমি হানাফী না শাফেয়ী...?” কিন্তু একথা বলা ভুল এবং হাস্যকর যে, “তুমি পাকিস্তানী না পাঞ্জাবী..? আজ নভেম্বর না শনিবার...? তুমি হানাফী না মুহাম্মদী...?”
.
যে লোক উর্দুর একটি শব্দের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানেনা সে কুরআন হাদিস ঘোড়ার ডিম বুঝবে!
.
.
.
আল্লাহ তায়ালা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতকে সকল প্রকার সন্দেহ থেকে হিফাযত করুন। আমীন হে রাব্বুল আলামীন।

বৃহস্পতিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

হযরত ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর জীবনের একটা ঘটনা!


একবার ইমাম বুখারী (রহঃ) জাহাজে উঠেছেন। দীর্ঘ সফরে একজন মানুষের সাথে আলাপ এবং হৃদ্যতা। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বলে ফেললেন তাঁর কাছে ১০০০ দিনার আছে।
পরদিনই লোকটার ভোল পাল্টে গেল। সে জাহাজের মাঝে মরাকান্না জুড়ে দিল – “আমার ১০০০ সোনার দিনার কোথায় গেল? আমার সারা জীবনের জমানো সম্পদ কে চুরি করে নিল? এখন আমার কী হবে”…?
জাহাজের কর্তৃপক্ষ ভারী বিপদে পড়ল। কিন্তু কর্তব্যের খাতিরে সবার সামান তল্লাশি করা হলো। ইমাম বুখারীর সামান-ও। নাহ, কোথাও নেই। লোকটাকে সবাই আচ্ছামত গালাগালি করল। কত সম্মানী মানুষের সম্মানহানী। ছিঃ ছিঃ, সবাই কী মনে করল? লোকটার দুনিয়া তখন ছোট্ট হয়ে এতটুকু।
সে জাহাজ থেকে নেমে ইমাম বুখারীকে বললো,
আপনি এত বড় মুহাদ্দিস, মিথ্যা কথা বলেন না,
অথচ আমাকে মিথ্যা বললেন?”
ইমাম বুখারী (রহঃ)বললেন, “আমি মিথ্যা বলিনি। তুমি যখনই আমাকে চোরের অপবাদ দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেছ তখনই আমি দিনারের থলি সাগরে ফেলে দিই। কত দূর-দূরান্ত থেকে আমি হাদিস সংগ্রহ করেছি। সারা দুনিয়ার মানুষ আমার বিশ্বস্ততায় আস্থা রাখে। হাদীসের প্রচারের প্রয়োজনীয় এই বিশ্বস্ততার দাম দিনার দিয়ে মাপা যাবে না।”
“সুবহানআল্লাহ!

প্রিয় ভাই ও বোনেরা আমার! আজ যে পৃথিবীর ঘরে ঘরে আল্লাহ তাঁর কিতাবের পাশাপাশি ইমাম বুখারীর হাদিস সংকলনকে কবুল করে নিয়েছেন তার পিছনে পরীক্ষা আছে, ত্যাগ আছে, বিচক্ষণতা আছে। এই ঘটনা থেকে আমাদের জন্য বেশ কিছু শেখার জিনিসও আছে। আল্লাহ্ তাঁর কবরকে নুরে পরিপূর্ণ করে দিন আমিন।
লিখেছেনঃ আবু আনাছ!

সোমবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৬

পিতা পুত্রকে!

Atik Ullah


ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ। চার ইমামের কনিষ্ঠতম। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে আজীব ইস্তেকামত দান করেছিলেন। তাকে দ্বিতীয় আবু বাকর বলা হয়। রিদ্দার যুদ্ধে প্রথম খলীফার মতো, খলকে কুরআনের মাসয়ালায়, তিনি একাই লড়ার হিম্মত করেছেন। এজন্য তাকে অমানুষিক নির্যাতন সইতে হয়েছে। খলীফা মুতাওয়াক্কিল (৮৪৭-৮৬১) আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলো। ইমাম আহমাদকে সসম্মানে মুক্তি দেয়া হলো। 
.
খলীফার মনে চাচা মামুন, বাবা মুতাসিম ও ভাই ওয়াসেকের কর্মকান্ডের কারনে অনুশোচনা ছিল। এই তিনজন ইমাম আহমদের প্রতি যা করেছে, পুরো আব্বাসী খিলাফতকেই কালিমাযুক্ত করে দিয়েছে। বংশীয় গুনাহের কাফফারা আদায়ের অংশ হিশেবে কিছু কাজ হাতে নিলেন। ইমাম আহমদের সুখ-শান্তির প্রতি নজর দিলেন। ইমাম আহমাদ এক অর্থে তার গুরুভাইও বটে। কারণ মুতাওয়াক্কিলই আব্বাসী খলীফাদের মধ্যে প্রথম শাফেয়ী মাযহাব গ্রহণ করেন। দাদাজান হারুনুর রশীদ রহ. ছিলেন হানাফী। ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর সঙ্গ লাভের কারণে। মুতাওয়াক্কিলকে নিয়ে অনেক আগে একটা দিনলিপি দেয়া হয়েছিল। আজ আর বেশি কিছু না বলাই ভাল। ইমাম আহমাদ ছিলেন ইমাম শাফেয়ীর প্রিয় ছাত্র।
.
মুতাওয়াক্কিল হাদিয়া পাঠালেন। ইমাম সাহেবের দরবারে। পোশাক, তেল, খাবার-পানীয় ইত্যাদি। ইমাম সাহেব এসব দেখে বললেন:
-কে পাঠিয়েছে এসব?
-আমীরুল মুমিনীন। 
-আমি কি এসব পাঠাতে বলেছিলাম?
-জ্বি না বলেন নি। খলীফা আপনার জন্যে এসব হাদিয়াস্বরূপ পাঠিয়েছেন। 
-সুবহানাল্লাহ!
-জাযাকাল্লাহু খাইরান। আপনি হাদিয়াগুলো রেখে দিন। 
.
সেখানে ইমাম সাহেবের ছেলে আবদুল্লাহও উপস্থিত ছিলেন। তিনি আর থাকতে না পেরে বললেন:
-আব্বু! আপনি আমাদের দুরবস্থা দেখতে পাচ্ছেন না? আমরা কী কষ্টে আছি একটু ভেবে দেখবেন না? এই হাদিয়াগুলো আমাদের যে কী প্রয়োজন, আপনাকে তা কী করে বোঝাই!
-বৎস! একসময় এসবের কিছুই থাকবে না রে! সব ফুরিয়ে যাবে! যা থাকবে না, তা রেখে লাভ কী?
-আপনি কি আমাদের চরম আর্থিক অনটন দেখার পরও একথা বলছেন?
ইমাম সাহেব ছেলের অবুঝপনা দেখে, ভর্ৎসনা করে বললেন:
-এগুলো প্রহরীদেরকে দিয়ে এসো। তাদেরকে জাযাকাল্লাহ বলতে ভুলো না যেন!
ইমামপুত্রের পক্ষে বাবার এই কঠোর আদর্শবাদ মেনে নেয়া কঠিনই ছিল বৈ কি। হাদিয়া গ্রহণ করা তো সুন্নাত। আর এখন প্রয়োজনের সময় গ্রহণ করা আবশ্যকও বটে। পুত্র বাবার আদর্শকে ধরতে না পারার কারণেই চিন্তার পার্থক্যটা প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছে। নইলে আবদুল্লাহ রহ.ও অন্য সব দিক দিয়ে যোগ্য পিতার মোটামুটি যোগ্য সন্তানই ছিলেন। লেখাপড়া-তাকওয়া পরহেযগারিতে। বাবার জীবনীও লিখেছিলেন। কিন্তু ইমাম সাহেব শাসকের কাছ থেকে কোনও প্রকারের সাহায্য নিবেন না, এটাই ছিল তার পণ। মনে গেলেও না। পুত্র হয়তো এক্ষেত্রে খানিকটা নমনীয় ঘরানার ছিলেন। এখন যেমন কওমী সনদ নিয়ে দুই দল! 
.
ঘটনার পর এক বছর পার হয়ে গেছে। একদিন পুত্রকে কাছে ডেকে বললেন:
-বাছা, কাছে এসে বসো! তোমার কি খলীফার পাঠানো সেই পোশাক আর খাবারদাবারের কথা মনে পড়ে?
-জ্বি আব্বাহুজুর!
-তোমার কি মনে হয়, আমরা যদি সেদিন হাদিয়াগুলো গ্রহণ করতাম, আজ সেগুলোর কিছু অবশিষ্ট থাকতো?
-জ্বি না। সবই নিঃশেষে ফুরিয়ে যেতো! বাকি থাকতো না কিছুই!
-বাবারে! গত এক বছরে এমন কি কখনো হয়েছে, তুমি ক্ষুধার্ত হওয়ার পরও খাবার পাওনি? 
-জ্বি না আব্বু! সব সময়ই রুটি বা খেজুর যা হোক একটা কিছু পেয়েই যেতাম!
-গত একটা বছর কখনো কি তুমি আদুল গায়ে ছিলে? বস্ত্রহীন থাকার কারনে তোমার কোনও কাজ কি আটকে গিয়েছিল?
-জ্বি না। মোটামুটি ধরনের হলেও পরিধেয় পোশাক সব সময়ই ছিল। 
-বাবা! খাবার, পানীয়, পোশাক এক রকম হলেই দিন চলে যায়! এজন্য খলীফার কাছে হাত পাততে হয় না। খলীফার সাহায্যও নিতে হয় না!
.
বাবার হাতে গড়ে ওঠা আবদুল্লাহ রহ. সময়ের বড় আলিম হতে পেরেছিলেন। কিতাবুস সুন্নাত রচনা করেছিলেন। বাবার নামে প্রসিদ্ধ কিতাব ‘মুসনাদে আহমাদ’ তারই সংকলন করা। 
.
কেউ বিশ টাকা দিয়ে আহার সারে, কেউ বিশ হাজার দিয়ে। কেউ মসজিদের কল থেকে পানি পান করে পেটের ক্ষুধানিবৃত্তি করে, কেউ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চায়নিজে গিয়ে। কেউ সাতকোর্সের ডিনার সারে, কেউ পাউরুটি-কলা খেয়েই রাত পার করে দেয়। 
কেউ পঞ্চাশ টাকা গজের কাপড় পরে দিন কাটিয়ে দেয়, কেউ পঞ্চাশ হাজার টাকার। দিন কি কারো থেমে থাকে? যত কম তত গম!

বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ইমাম আবু হানিফা খলীফার কাছে হাত পাতলেন!

ইমাম আবু হানিফা (র)-এর একজন মুচি প্রতিবেশী ছিল।
মুচি তার ঘরের দরজায় বসে সারাদিন কাজ করতো এবং সারারাত ধরে মদ খেয়ে মাতলামি করতো
এবং অশ্লীল হৈচৈ ও গণ্ডগোল করে ইমামের মনোযোগ নষ্ট করতো।
এক রাতে ইমাম মুচির ঘর থেকে হৈচৈ শুনলেন না।
সে রাতে তিনি নিরিবিলি ইবাদত করতে পারলেন, কিন্তু মনে শান্তি পেলেন না।
পরদিন খুব সকালে ইমাম মুচির ঘরে গেলেন এবং মুচির খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলেন যে, তার মদ খেয়ে মাতলামির জন্যে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে জেলে পুরেছে।
খলীফা মানসূর তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়।
ইমাম আবু হানিফা (র) কোনদিন কোন ব্যাপারেই খলীফার দ্বারস্থ হননি।
বরং খলীফাই মাঝে মাঝে তাঁর দ্বারস্থ হয়েছেন।
কিন্তু আজ প্রতিবেশীর বিপদ তাকে অস্থির করে তুলল এবং তিনি দরবারে গিয়ে হাজির হলেন।
দরবারের দ্বাররক্ষকরা মহান অতিথির সম্মানে দ্বার খুলে দিলেন।
ইমামকে দেখে দরবারের আমীর-উমরাদের চোখ বিস্ফোরিত হল এবং স্বয়ং খলীফা আসন থেকে উঠে তাঁর দিকে অগ্রসর হলেন।
তিনি ইমাম কে নিয়ে তাঁর আসনে বসালেন এবং জানতে চাইলেন, কষ্ট করে তাঁর এ আগমনের কারণ কি?
ইমাম বললেন, ‘আপনার পুলিশ আমার একজন প্রতিবেশীকে গ্রেফতার করে জেলে পুরেছে।
আমি তার মুক্তির প্রার্থনা নিয়ে এসেছি।’খলীফা একটু চিন্তা করলেন।
তারপর বললেন, ‘হে সম্মানিত ইমাম, শুধু তাকে নয়, আপনার সম্মানে ঐ জেলের সবাইকে আমি মুক্তি দিলাম।’
ইমাম আবু হানিফা (র) তাঁর প্রতিবেশীকে নিয়ে ফিরে এলেন।
প্রতিবেশী ঐ মুচি এরপর আর কোনদিন মদ স্পর্শ করেনি।

ইমাম আবু হানিফা ও নাস্তিক

একবার খলিফা হারুনুর রশীদের নিকট এক নাস্তিক এসে বললেন যে আপনার সাম্রাজ্যে এমন কোন জ্ঞানী
ব্যক্তিকে ডাকুন আমি তাকে তর্ক করে প্রমান করে দেব যে এই পৃথীবির কোন স্রস্টা নেই।
এগুলো নিজে নিজে সৃস্টি হয়েছে এবং আপনা থেকেই চলে ।
খলিফা হারুনুর রশীদের কিছুক্ষন ভেবে একটি চিরকুট মারাফত ইমাম আবু হানিফাকে ডাকলেন ও এই নাস্তিকের সাথে বিতর্কে অংশ নিতে অনুরোধ করলেন।
ইমাম আবু হানিফা দুত মারাফত খবর পাঠালেন যে তিনি আগামীকাল যোহরের সময়
আসবেন খলিফার প্রাসাদে নামায পড়ে তারপর বির্তকে অংশ নেবেনপরদিন যোহরের নামাযের সময়
খলিফা তার সভাসদ বর্গ ও নাস্তিক তি অপেক্ষা করতে লাগল।
কিন্তু যোহরের নামায তো দুরের কথা আসর শেয় হয়ে গেল তিনি মাগরীবের নামাযের সময় আসলেন।
নাস্তিকটি তার কাছে এত দেরীতে আসার কারন জনতে চাইল
তিনি বললেন আমি দজলা নদীর ওপারে বাস করি।আমি খলীফার দাওয়াত পেয়ে নদীতে এসে দেখি কোন নৌকা নেই।
অনেকক্ষন অপেক্ষা করেও কোন নৌকা পেলাম না।
সহসা আমি দেখলাম একটি গাছ আপনা-আপনা উপরে পড়ল্তার পর সেটি চেরাই হয়ে নিজ থেকেই তক্তায় পরিনত হল।
তারপরএটি নিজেনিজে একটি নৌকায় পরিনত হল।অত:পর আমি এটায় চড়ে বসলাম।
নৌকাটি নিজে নিজে চলতে চলতে আমাকে এপারে পৌছিয়ে দিল।
নাস্তিকটি একথা শুনে হো হো করে হেসে ফেলল।
তাপর বলল ইমাম সাহেব আমাকে কি বোকা পেয়েছেন যে আমি এমন গাজাখুরি গল্প বিশ্বাস করব।
একটা গাছ আপনা থেকে নৌকায় পরিনত হবে, এটা কি করে সম্ভব?
ইমাম আবু হানিফা বললেন ওহে নাস্তিক সাহেব একটা গাছ যদি আপনা থেকে নৌকায় পরিনত না হতে পারে এবং নদী পরাপার না হতে পারে, তাহলে কিভাবে এই বিশাল আকাশ চন্দ্র সূর্য নক্ষত্র আপনা আপনি তৈরী হতে এবং চালু থাকতে পারে ??
নাস্তিকটি লা-জওয়াব হয়ে মুখ কাচুমাচু করে বিদায় নিল।
খলিফা হারুনুর রশীদ তার তাৎক্ষনিক জবাবে মুগ্ধ হয়ে ইমাম সাহেব কে সসম্মানে বিদায় দিলেন।
কোন তর্কে যাওয়ার আগেই নাস্তিকটি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে গেল।
শিক্ষাঃ নাস্তিক ও খোদাদ্রোহীদের কোন যুক্তি থাকে না।
বিচক্ষণতা ও সাহস নিয়ে তাদের মোকাবিলা করলেই তারা পরাজিত হতে বাধ্য।
তবে এ যুগের নাস্তিক ও খোদাদ্রোহীরা যুক্তির অভাবে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য মুসলমানদেরকে মাথা ঠান্ডা রেখে সুপরিকল্পিতভাবে শক্তি অর্জন করে জেহাদের জন্য প্রস্ততি নিতে হবে।

বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০১৬

ইনসাফপূর্ণ মেজাজ ও ইমাম মালেক রহ. Mohiuddin Kasemi

আল্লামা ইবনে আবদুল বার কুরতুবি রহ. বলেন : ইলমের আদব ও বরকতসমূহের মধ্যে এটাও গরিগণিত যে, মানুষ ইনসাফপূর্ণ মেজাজ-স্বভাবের অধিকারী হবে। কারণ, যে ব্যক্তির মধ্যে ইনসাফ থাকবে না, সে নিজেও বুঝতে পারবে না, অন্য কেউ তাকে বোঝাতেও অক্ষম হবে। [মুখতাসার জামে বয়ানুল ইলম : ১১৯]
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে উমর ওয়াকেদি রহ. বলেন, আমি নিজে ইমাম মালেক রহ. থেকে শুনেছি : আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মনসুর হজে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে প্রস্তাব দিল, আমার আকাঙ্ক্ষা হল, আপনার লিখিত ‘মুআত্তা’ কিতাব কয়েকটি কপি তৈরি করে ইসলামি বিশ্বের বড় বড় শহরে প্রেরণ করব, আর সেখানকার লোকদেরকে বলে দিব, তারা যেন সব বিষয়ে কেবল এ কিতাবের অনুসরণ করে এবং এর পরিপন্থী যত মতামত আছে সব যেন পরিহার করে। কেননা, এ কিতাবের সব বিষয় মদিনাবাসী থেকে বর্ণিত- যা অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য। 
ইমাম মালেক রহ. বলেন : এ প্রস্তাব শুনে আমি তাকে উত্তরে বললাম, আমিরুল মুমিনিন! আপনি কখনো এমন ইচ্ছা পোষণ করবেন না। কারণ, বিভিন্ন অঞ্চলে সাহাবায়ে কেরাম এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য আলেমদের কথা ও মতামত পূর্বেই পৌঁছে গেছে; এবং প্রত্যেক এলাকাবাসী দীর্ঘদিন যাবৎ সে অনুপাতে আমল করে আসছে। এখন তাদেরকে নিজস্ব আকিদা-বিশ্বাস থেকে সরানো বিরাট কঠিন ব্যাপার। তাই মানুষদেরকে নিজেদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দিন। যে মতামতের ওপর সে আমল করে আসছে এর ওপরই তাকে আমল করতে দিন।’ 
এ কথা শুনে খলিফা মনসুর বলল, আল্লাহর কসম! আপনি আমার প্রস্তাব মেনে নিলে আমি অবশ্যই তা বাস্তবায়ন করতাম। [মুখতাসার জামে বয়ানুল ইলম : ১২১]
আমরা হলে কী করতাম?
বলতাম, জ্বি জনাব, বড়ই উত্তম কাজ। এ কাজ করলে আপনার জান্নাত নিশ্চিত! যেভাবেই হোক নিজের পছন্দনীয় মতবাদ প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করতাম। ইমাম মালেকের মতো আজও যদি হানাফি ও আহলে হাদিসের ভাইয়েরা বিসয়টি উপলব্ধি করত! 
এ দেশে যুগ যুগ ধরে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী আমল চলে আসছে; তাই এখানকার মানুষকে বিভ্রান্ত করার অধিকার কে দিয়েছে?
হা, কোনো এলাকায় যদি কোনো বিষয় সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী প্রচলন ঘটে থাকে, তাহলে হিকমতের সঙ্গে সংশোধন করা ভালো কাজ।

বুধবার, ৯ মার্চ, ২০১৬

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল আশ্ শায়বানী আল-মারুযী (রহ:)-এর জন্ম ১৬৪ হিজরী মোতাবেক ৭৮০ সালে বাগদাদ নগরীতে এবং বেসালও সেখানেই ২৪১ হিজরী/৮৫৫ সালে। তিনি হাদীস ও ফেকাহ উভয় শাস্ত্রেই ইমাম ছিলেন। সুন্নাহ’র সূক্ষ্ম ও অন্তর্নিহিত বিষয়গুলোতেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। যুহদ ও ওয়ারায় তাঁর প্রসিদ্ধি ছিল। হাদীস সংগ্রহের উপলক্ষে তিনি কুফা, বসরা, মক্কা মোয়াযযমা, মদীনা মোনাওয়ারা, ইয়েমেন, দামেশক ও মেসোপটেমিয়ায় ভ্রমণ করেন। ইমাম সাহেব ফেকাহ-শাস্ত্র ইমাম শাফেঈ (রহ:)-এর কাছে শিক্ষা করেন, যিনি পাল্টা তাঁর কাছ থেকে হাদীস-শাস্ত্র শিক্ষা করেন। ইবরাহীম আল-হারবী বলেন,
আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:)-কে দেখেছি। আল্লাহতা’লা তাঁকে ইসলামী জ্ঞানের সকল শাখায় সমৃদ্ধ করেছিলেন।
কুতায়বা ইবনে সাঈদ বলেন,
যদি ইমাম আহমদ (রহ:) সর্ব-হযরত (সুফিয়ান) সাওরী (রহ:), আল-আওযাঈ (রহ:), ইমাম মালেক (রহ:) ও লায়েস্ ইবনে সাআদ (রহ:) প্রমুখের যুগে জীবিত হতেন, তবে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে যেতেন।
তিনি দশ লক্ষ হাদীস মুখস্থ করেছিলেন। ইমাম শাফেঈ (রহ:) একবার তাঁকে মিসর থেকে একখানি পত্র পেরণ করেন। এই চিঠি পড়ার সময় তিনি কাঁদতে থাকেন। তাঁকে কাঁদবার কারণ জিজ্ঞেস করার পরে তিনি জবাব দেন,
ইমাম শাফেঈ (রহ:) স্বপ্নে দেখেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে, যিনি তাঁকে আদেশ করেছেন এই বলে, ‘আবূ আব্দিল্লাহ আহমদ ইবনে হাম্বলকে আমার সালাম-সহ একটি পত্র লেখো। কুরআন মজীদ সৃষ্টি কি-না সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। তাকে বলবে ওই প্রশ্নের উত্তর না দিতে’।
আট লক্ষ পুরুষ ও ৬০,০০০ মহিলা ইমাম সাহেব (রহ:)-এর জানাযায় শরীক হন। যেদিন তিনি বেসালপ্রাপ্ত হন, সেই দিন ২০,০০০ ইহুদী, খৃষ্টান ও প্রাচীন পারসিক পুরোহিত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

ইমাম মালেক (রহঃ)

ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রা:) ৯৫ হিজরী মোতাবেক ৭১৫ খৃষ্টাব্দে মদীনা মোনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৭৯ হিজরী/৭৯৫ খৃষ্টাব্দ সালে সেখানেই বেসালপ্রাপ্ত হন। তিনি বলেন যে সত্তরজন ইমাম তাঁকে ফতোওয়া জারি করার তাকিদ দেয়ার পর তিনি তা দেয়া আরম্ভ করেন। তিনি আরও বলেন,
আমার শিক্ষকদের মধ্যে এমন খুব কম সংখ্যক-ই ছিলেন যাঁরা আমার কাছ থেকে ফতোওয়া নেননি।
ইমাম এয়াফী-ই বলেন যে ইমাম সাহেবের এই কথাটি বড়াই করার জন্যে বলা হয়নি, বরং তা আল্লাহতা’লার রহমত-বরকত প্রকাশের উদ্দেশ্যেই বলা হয়েছিল। ইমাম যুরকানী মালেকী ‘মুওয়াত্তা’ গ্রন্থের ওপর কৃত তাঁর শরাহ’র মধ্যে লেখেন:
ইমাম মালেক (রহ:) ছিলেন বিখ্যাত ইমাম আল-মযহাব; শীর্ষ স্থানীয় আলেমদের অন্যতম। তিনি ছিলেন সুতীক্ষ্ণ ধীশক্তি ও সুনৈতিকতার অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর আহাদীসের তিনি-ই ছিলেন উত্তরাধিকারী। তিনি আল্লাহতা’লার ধর্ম তাঁরই সৃষ্টির মাঝে প্রচার-প্রসার করেন। নয়’শ উলামা-এ-হাক্কানী/রব্বানীর সান্নিধ্য লাভ করে তিনি ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হন। তিনি সংকলন করেন ১ লক্ষ হাদীস। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি শিক্ষা দান আরম্ভ করেন। তাঁর প্রভাষণ শুনতে আসা শ্রোতার সংখ্যা তাঁরই শিক্ষকদের প্রদত্ত প্রভাষণের শ্রোতা সংখ্যার চেয়ে বেশি ছিল। হাদীস ও ফেকাহ শিখতে শ্রোতারা তাঁর দরজার সামনে জড়ো হতো। এতে তাঁকে বৈতনিক একজন দারোয়ান নিয়োগ করতে হয়েছিল। প্রথমে তাঁর শিষ্যদের, তারপর সর্বসাধারণের প্রত্যেককে প্রবেশাধিকার দেয়া হতো। তিনি প্রতি তিন দিনে একবার হাউজে (গোসলখানায়) গমন করতেন। হযরত ইমাম বলতেন, ‘হাউজে দীর্ঘক্ষণ থাকতে আমি লজ্জাবোধ করি।’ ‘মুওয়াত্তা’ গ্রন্থটি লেখার সময় তিনি নিজের বিশ্বস্ততা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। তিনি বইটি (হাউজের) পানিতে রাখেন। তিনি এ সময় বলেন, ‘যদি বইটি ভিজে যায়, তাহলে এর কোনো প্রয়োজন আর আমার কাছে থাকবে না।’ আশ্চর্য, বইটির কোনো অংশ-ই ভেজে নি।
আবদুর রহমান ইবনে আনাস (রহ:) বলেন,
হাদীসের জ্ঞানে ইমাম মালেক (রহ:)-এর চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য আর কেউই বর্তমান পৃথিবীতে নেই। তাঁর চেয়ে জ্ঞানী আর কাউকেই আমি দেখিনি। হযরত সুফিয়ান সাওরী (রহ:) হাদীসের একজন ইমাম, কিন্তু তিনি সুন্নাহ’র ইমাম নন। আল-আওযাঈ (রহ:) সুন্নাহ’র ইমাম, কিন্তু হাদীসের ইমাম নন। ইমাম মালেক (রহ:)-ই হাদীস ও সুন্নাহ উভয়েরই ইমাম।” ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ (রহ:) বলেন, “ইমাম মালেক (রহ:) হলেন দুনিয়ার বুকে আল্লাহতা’লার সৃষ্টিকুলের জন্যে মহান প্রভুর সাক্ষীস্বরূপ।
ইমাম শাফেঈ (রহ:) বলেন,
যেখানেই হাদীস অধ্যয়ন করা হবে, ইমাম মালেক (রহ:) সেখানে আকাশের তারকাসদৃশ। (এতদসংক্রান্ত) জ্ঞানের মুখস্থকরণ, উপলব্ধি ও সংরক্ষণে কেউই ইমাম মালেক (রহ:)-এর মতো হতে পারবেন না। আল্লাহ-সম্পর্কিত জ্ঞানেও কেউ তাঁর মতো আস্থাভাজন নন। আল্লাহ পাক ও আমার মাঝে সাক্ষী হলেন ইমাম মালেক (রহ:)। ইমাম মালেক (রহ:) ও হযরত সুফিয়ান ইবনে উবায়না (রহ:) না হলে এতোদিনে হেজায অঞ্চল থেকে জ্ঞান তিরোহিত হতো।
হযরত আবদুল্লাহ (রহ:) যখন তাঁর পিতা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:)-কে জিজ্ঞেস করেন কে ইমাম যাহরী (রহ:)-এর শিষ্যদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী, তখন তিনি জবাবে বলেন ইমাম মালেক (রহ:)-ই (ইসলামী) জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় সবচেয়ে বেশি জানেন। ইবনে ওয়াহহাব বলেন,
ইমাম মালেক (রহ:) ও লায়েস (রহ:) না হলে আমরা সবাই পথভ্রষ্ট হতাম।” ইমাম মালেক (রহ:)-এর নাম মোবারক যখনই আল-আওযাঈ (রহ:) শুনতেন, তৎক্ষণাৎ তিনি বলতেন, ”তিনি জ্ঞানীদের মাঝে সর্বাধিক জ্ঞানী এবং মদীনা মোনাওয়ারার সেরা আলেম; আর তিনি মুফতী-এ-হারামাইন শরীফাইন-ও।
হযরত ইমামের বেসাল হওয়ার খবর শুনে হযরত সুফিয়ান ইবনে উবায়না (রহ:) বলেন,
তাঁর মতো কাউকে আর বর্তমানে ধারণ করে না এই পৃথিবী। তিনি ছিলেন এই দুনিয়ার ইমাম, হেজায অঞ্চলের আলেম, তাঁর সময়ের সাক্ষী এবং উম্মতে মোহাম্মদীয়ার সূর্যতুল্য পুণ্যাত্মা। আমাদেরও তাঁর পথে চলতে হবে।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:) বলেন যে ইমাম মালেক (রহ:) হযরত সুফিয়ান আস্ সাওরী (রহ:), ইমাম লায়েস, ইমাম হাম্মাদ ও আল-আওযাঈ (রহ:)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। হযরত সুফিয়ান ইবনে উবায়না (রহ:) জানান যে নিম্নের হাদীসটি ইমাম মালেক (রহ:)-কেই উদ্দেশ্য করে বিবৃত হয়েছে; মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান,
মানুষদের যখন (কারোর খোঁজ করা) জরুরি প্রয়োজন দেখা দেবে, তখন তারা মদীনায় অবস্থিত আলেমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কাউকে পাবে না।
ইমাম মালেক (রহ:) বলেন যে তিনি প্রতি রাতেই রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে স্বপ্নে দেখতেন। মুসা’আব বর্ণনা করেন তাঁরই পিতা হতে শ্রুত বাণী, যিনি বলেন,
ইমাম মালেক (রহ:) ও আমি একবার মসজিদে নববীতে অবস্থান করছিলাম। কেউ একজন এসে জিজ্ঞেস করেন আমাদের মধ্যে কে আবূ আব্দিল্লাহ মালেক (রহ:)। আমরা ইমাম সাহেবকে দেখিয়ে দেই। ওই ব্যক্তি তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে কপালে চুম্বন করেন। অতঃপর তিনি বলেন, ’আমি স্বপ্নে দেখেছি হুযূর পূর নূর (দ:) এখানে বসে আছেন। তিনি আদেশ দেন, মালেককে ডাকো। আপনি কাঁপতে কাঁপতে ছুটে আসেন। মহানবী (দ:) এরশাদ করেন, এয়া আবা আবদ-আল্লাহ, শান্ত হও! বসো এবং নিজ বক্ষ বিদীর্ণ করো! অতঃপর আপনার বক্ষ বিদীর্ণ হলে সর্বত্র সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।’ এ কথা শুনে ইমাম মালেক (রহ:) অনেক কাঁদেন। তিনি বলেন, এই স্বপ্নকে জ্ঞান হিসেবে ব্যাখ্যা করতে হবে।

ইমাম শাফেঈ (রহঃ)

ইমাম শাফেঈ (রহ:)-এর পুরো নাম মোহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস ইবনে আব্বাস ইবনে উসমান ইবনে শাফেঈ। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে ৮ম প্রপিতামহ হাশেম ইবনে আব্দিল মোত্তালেবের চাচা হাশেম ছিলেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর পূর্বপুরুষ। ইমাম সাহেবের ৫ম প্রপিতামহ সায়িব বদরের যুদ্ধে শত্রু পক্ষে অবস্থান করলেও পরবর্তীকালে তিনি ও তাঁর ছেলে শাফেঈ সাহাবী হবার মর্যাদা লাভ করেন। এই কারণে ইমাম সাহেবকে ‘আশ্ শাফেঈ’ বলা হয়। তাঁর মাতা সাহেবানী ছিলেন একজন শরীফা, মানে ইমাম হাসান (রা:)-এর বংশধর। ইমাম শাফেঈ (রহ:)-এর জন্ম গাযায় ১৫০ হিজরী মোতাবেক ৭৬৭ সালে এবং বেসাল মিসরে ২০৪ হিজরী/৮২০ সালে। দু’বছর বয়সে তাঁকে মক্কা মোকাররমায় নেয়া হয, যেখানে তিনি শৈশবকালে আল-কুরআন হেফয করেন এবং মাত্র ১০ বছর বয়সে ইমাম মালেক (রা:)-এর ‘মুওয়াত্তা’ হাদীসের গ্রন্থটি মুখস্থ করেন। পনেরো বছর বয়সে তিনি ফতোওয়া জারি আরম্ভ করেন। একই বছর তিনি মদীনা মোনাওয়ারায় যান এবং সেখানে ইমাম মালেক (রহ:)-এর কাছ থেকে ইসলামী জ্ঞান ও ফয়েয (আধ্যাত্মিক জ্ঞান) লাভ করেন। তিনি বাগদাদে আসেন ১৮৫ হিজরী সালে। দু’বছর পরে তিনি হজ্জ্ব উপলক্ষে মক্কা মোয়াযযমায় গমন করেন। হিজরী ১৯৮ সালে তিনি আবার বাগদাদে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১৯৯ সালে মিসরে বসতি আরম্ভ করেন। তাঁর বেসাল শরীফের দীর্ঘকাল পরে কেউ কেউ তাঁর জিসম মোবারক বাগদাদে ফেরত নিতে চাইলে তাঁর মাযার খনন করা হয়। ওই সময় মাযার শরীফ থেকে কস্তুরিগন্ধ বের হয়ে খননকারী লোকদেরকে বেহাল করে দেয়। তারা খনন কাজ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইসলামী জ্ঞান, এবাদত-বন্দেগী, যুহদ, মা’রেফত, ধীশক্তি, স্মরণশক্তি ও কুলপরিচয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়কার ইমামবৃন্দের পাশাপাশি তাঁর আগেকার ইমামদেরও পুরোধা। তাঁর মযহাব দূর-দূরান্তে প্রসার লাভ করে। আল-হারামাইন ও আল-আরদ্ আল-মুকাদ্দাস (প্যালেস্টাইন)-এর অধিবাসীরা সবাই শাফেঈ মযহাবের অনুসারী হন। ইমাম শাফেঈ (রহ:) ছিলেন নিম্নবর্ণিত হাদীসে কৃত ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব রূপ; মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান,
কুরাইশ গোত্রের আলেম-ব্যক্তি পৃথিবীকে জ্ঞান দ্বারা পরিপূর্ণ করবেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:)-এর পুত্র আবদুল্লাহ তাঁর বাবাকে ইমাম শাফেঈ (রহ:)-এর জন্যে কেন এতো বেশি বেশি তিনি দোয়া করেন এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁর বাবা ইমাম সাহেব জবাবে বলেন,
ওহে পুত্র! মানুষের মাঝে ইমাম শাফেঈ (রহ:)-এর মর্যাদা হলো আকাশে সূর্যের উপস্থিতির মতো। তিনি আত্মার (ব্যাধি) নিরাময়কারীস্বরূপ।
ওই দিনগুলোতে ‘মুওয়াত্তা’ হাদীসগ্রন্থে সংকলিত হয়েছিল ৯৫০০ হাদীস। পরবর্তীকালে তা থেকে যাচাই-বাছাই করে বর্তমানের ১৭০০টি হাদীসের সংকলন হিসেবে এটি আকৃতি পায়। ইমাম শাফেঈ (রহ:)-এর উপনাম ছিল ‘নাসিরুস্ সুন্নাহ’ (ধর্মের সাহায্যকারী)। মাত্র চার বছরের অল্প সময়ে তিনি একটি মযহাবের গোড়াপত্তন করার ঘটনাটি সত্যি বিস্ময়কর। ইমাম সাহেবের জীবনী ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে ৪০টিরও বেশি বই অদ্যাবধি লেখা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

ইমাম আযম আবু হানিফা রহ,এর ফিরাসাত

এক লোক রাগান্বিত হয়ে স্ত্রীকে বলল, খোদার কসম! যতক্ষণ তুমি কথা না বলবে ততক্ষণ আমি তোমার সাথে কোন কথা বলব না। এদিকে তার স্ত্রীও ক্ষিপ্ত ছিল। সেও বলল, আল্লাহর কসম! যতক্ষণ তুমি আমার সাথে কোন কথা না বলবে আমিও তোমার সাথে কোন কথা বলব না। রাগ নেমে যাওয়ার পর স্বামী স্ত্রী উভয়েই বিপদে পড়ে গেল। এখন যেই আগে কথা বলবে কসম ভাংগার কারণে তার উপর বিরাট কাফফারা আরোপিত হবে। আর যদি কথা না বলে তাহলে তো আরো বড় বিপদ। সারা জীবন অতিবাহিত করবে কী করে? বেচারা গরিব মানুষ। দ্রুত সমাধান লাভের জন্য যামানার অন্যতম ইমাম সুফিয়ান ছাওরি রহ,এর নিকট মাসআলাটি জিজ্ঞেস করল। তিনি বললেন, যেই কথা বলবে তাকেই কাফফারা দিতে হবে। কসম ভাংগার কাফফারা। এছাড়া দ্বিতীয় কোন সুরত নেই।
এরপর লোকটি অসহায় হয়ে ইমাম আযমের নিকট আসল। শেষ চেষ্টা। কোন সহজ রাস্তা বের হয় কি না! ইমাম আযম পুরা ঘটনা শুনে বললেন, যাও তুমি গিয়ে তোমার বিবির সাথে কথা বলো। কারো উপর কোন কাফফারা আসবে না। এ জবাব সুফিয়ান ছাওরির নিকট পৌঁছতেই তিনি বেশ ক্রুদ্ধ হলেন। ইমাম আযমের নিকট এসে বললেন, আপনি তো মানুষকে গলত মাসআলা বলে বেড়াচ্ছেন! ইমাম সাহেব ঐ লোককে ডেকে এনে বললেন, তুমি আবার পুরা ঘটনাটা বলো তো। সে শোনাল।
তখন সুফিয়ান ছাওরিকে ইমাম আযম আবার বললেন, আমি আমার মতের উপর এখনো অটল আছি। সুফিয়ান ছাওরি বললেন, কেন? ইমাম আযম বললেন, দেখুন, যখন স্বামীর কসমের পর স্ত্রী কসম খেয়েছে তখন তো স্ত্রী কথা বলেছে। স্ত্রী যেহেতু স্বামীকে উদ্দেশ্য করে কথা বলেছে তাহলে আর স্বামীর কসম বাকি থাকল কই?
পরম বিস্ময় প্রকাশ করে সুফিয়ান ছাওরি বললেন, যে কথা আপনি সহসাই বুঝে ফেলেন সেদিকে আমাদের চিন্তাই কাজ করে না।

ইমাম আবু হানিফা: অপপ্রচারে আগাছা, যাত্রীরা হুশিয়ার!

কুফা নগরী। ১১০ হিজরির শুরুর দিকে সেখানে ততকালীন সময়ের বিশ্বনন্দিত, জগতখ্যাত বড়বড় আলেম-উলামা ও ফুকাহাদের মাজমা বসতো। বিদগ্ধ মুফতি, মুহাদ্দিস, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও ব্যাকরণবিদদের পদচারনায় মুখর ছিল সেই মাজমা। বারো অথবা তেরো বছরের অসাধারণ মেধা ও স্মৃতি শক্তির অধিকারী, অদম্য জ্ঞান পিপাসু নুমান নামক একজন বালক প্রথমে প্রিয়নবী সা. র অন্যতম খাদেম ও জলিলুল কদর সাহাবী হযরত আনাস বিন মালেক রাহ.’র তত্বাবধানে পবিত্র কুরআন শরীফ হেফজ করে ইলমে কালামের দিকে মনোনিবেশ করেন। অত:পর হিজরী ১০০ সালে হযরত হাম্মাদ রাহ.’র দরসগাহে ভর্তি হয়ে একাধারে ১০ বছর  ইলিম অর্জন করেন। পরে তিনি কুফা নগরীর আলেম-উলামা, ফুকাহাদের মাজমায় পা রাখেন। কুফা তখনকার সময়ে ইসলামি নগর হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।
সেই কুফায় আগমনকারী নুমান নামের অদম্য জ্ঞান আহরনকারীই পরবর্তীতে ইমামে আযম হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। সেই নুমান বিন সাবিতই হানাফি মাযহাবের গুরু। যাকে সমস্ত জাহানবাসী ইমাম আবু হানিফা নামেই জানে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাহ.’র মূলধারার শিষ্য হযরত হাম্মাদ রা. ছিলেন ততকালীন একজন ফিকহ শাস্ত্রের গুরু। তাঁর কাছ থেকে ইমাম আবু হানিফা রাহ. জ্ঞান আহরণ করেন তাঁর কাছ থেকে। ফিকহ শাস্ত্রের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন কুফা থেকে বিজ্ঞ ফকিহদের কাছ থেকে। ১২০ হিজরিতে হযরত হাম্মাদ রা. ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন হযরত ইমাম আবূ হানিফা। এরপর থেকে ইমাম আযম রাহ.’র নেতৃত্বে পরিচালিত হতে থাকে কুফার ইলমি মারকায। যাকে ততকালীন ফোকাহায়ে কেরামও কেয়াসের প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আমিরুল মুমিনুন হযরত অবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, হাফস ইবনে গিয়াস, ইমাম আবু ইউসূফ, ইমাম যুফার , হাসান ইবনে যিয়াদ, প্রমুখরা  ছিলেন ইমাম আবূ হানিফা রা.’র মজলিসের মধ্যমনি।
ইমাম আবু হানিফা রাহ.। একটি সংগ্রামের নাম। একটি আলোকরশ্মির নাম। ইলমের একটি সাগরের নাম। একটি চেতনার নাম। কুরআন-হাদিস, ইজমা-কিয়াসের সমষ্ঠির নাম। জিহাদময় জীবনের নাম ইমাম আবু হানিফ। ইমাম আবু হানিফা তিনিই যার মাসআলার সমাধান দেখে চিনেছেন ইমাম আওযায়ী। যার সম্পর্কে ইমাম মক্কি ইব্রাহিম রাহ. বলেছেন, যার জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জিহাদ। দারুল হিজরতের (মদীনার) ইমাম মালেক রাহ. তাঁর সম্পর্কে বলেন, ও যদি এই লোকটা কাঠের পালঙ্গকে যুক্তি দিয়ে স্বর্ণ বানাতে চান, পারবেন।
যিনি সরাসরি চারজন সাহাবি এবং প্রায় চার সহস্রাধিক তাবেঈ মাশায়েখের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহন করেছেন। ফিকহ শাস্ত্রের অদ্বিতীয় পন্ডিত ছিলেন যে ইমাম আবু হানিফা। তাছাড়া ইলমে হাদীস, ইলমে কালাম, ইলমে বালাগাত, ইলমে নাহু, ইলমে সরফ, ইলমে তাফসীর প্রভৃতি বিষয়ে যার তুলনা তিনি শুধু তিনি নিজেই। সেই মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধর্মের নামে আগাছা লা-মাযহাবিরা বলে তিনি নাকি মুহাদ্দিস ছিলেন না। হাস্যকর এসব কথার প্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই তোমার কথা মতো ধরে নিলাম ইমাম আবু হানিফা মুহাদ্দিস ছিলেন না ঠিক। তিনি ছিলেন উস্তাযুল মুহাদ্দিসীন। শতশত মহান ব্যক্তিরা তাঁর কাছ থেকে হাদিসের দারস গ্রহণ করে স্বীয় যুগে জগতখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন আটশত আশিজন শিষ্যের উস্তায।  আমর ইবনে মাইমুনা, ইমাম যুফার, সুফিকুল শিরোমণি দাউদ তায়ী, হাববান ইবনে আলী, কাসেম ইবনে মায়ান, আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ., কযিউল কুযাত ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ বিদগ্ধ মুফতি-মুহাদ্দিস ও ফকিহবিদদের উস্তাদ ছিলেন ইমাম আযম রাহ.।
অপপ্রচারে আগাছাযাত্রীরা হুশিয়ার
হাল যামানা ডিজিটালের হাওয়ায় ভাস্বর একটি যুগ। যুগের সাথে তাল মেলাতে পাশ্চাত্যের গোলামির শিকলে নিজেকে বেঁধে স্যুর্ট-কোর্ট, টাই পড়ে মিডিয়ার সামনে বকবক করে পর্দাবেপর্দা, এগানা-বেগানা নারীদের বাহ্বা কুঁড়িয়ে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হওয়া যেতে পারে। ইমাম আবু হানিফা রাহ.’র মতো বিশ্ববাসীর কল্যাণে ইসলামি দিকনির্দেশনাকারী, জটিল সমস্যার সমাধানে গভীরে যাওয়ার যোগ্যতা লাভ করা যায়না।
যুগ ডিজিটাল। চিন্তা-ফিকিরও হবে ডিজিটাল। সমস্যা ডিজিটাল। এর সমাধানও হবে ডিজিটাল তরিকায়। এটাই ডিজিটালের চাহিদা। শ্রোতারা স্যুর্ট-কোর্ট, টাই পরিহিত, বক্তাও হবেন ঠিক এমন। এভাবে চলছে। চলুক। যুগ চাহিদার খোরাক যোগাচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে চলেছেন। লাইভ প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছেন। বইপুস্তক বাজারজাত করছেন। ভালো। বেশ ভালো। তবে ইসলামের প্রচারের নামে অপপ্রচার। মানা যায়না। মাযহাব ছাড়া ধর্মপালন অসম্ভব। তবে কেন রোগাক্রান্ত হলে ডাক্তার প্রয়োজন হয়। ডাক্তারের দেওয়া প্রেসক্রিপশন মানা হয়। অনেক হালাল আহার্য্য খাদ্যদ্রব্য ডাক্তারের নির্দেশে খাওয়া থেকে বিরত থাকা হয়।
মিডিয়ায় কিছু দাঁড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি পরিহিত নামধারী মৌলভীদের আনাগুনা বেড়ে গেছে। যাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয় যেনো তারা ধর্মের ঠিকাদারী পেয়ে গেছেন।  যার কারণে একটি মহলকে রাজি আর খুশি করার মানসে তারা  কিতাব পড়ার সময় পান না। তবে আগে বেশ ভালো করে পড়ালেখা করার দরুণ মুখস্ত রেফারেন্স দেওয়ায় খুব পারদর্শী।
এসব টিভি মৌলভী আর আহলে হাদিস নামধারী হাদিস বিরোধী চক্র ইমামে আযম আবু হানিফা সম্পর্কে বলে থাকে তিনি নাকি হাদিস জানতেন না। তিনি নাকি সহিহ হাদিসের পরিবর্তে দুর্বল হাদিস বর্ণনা করতেন। বগলে বাংলা বুখারি বহন করে পাড়া-মহল্লায় ঘুরে বেড়ায়। আর বিবেদ সৃষ্ঠি করে। বাংলা বুখারি শরিফ পড়ে তারা  সহিহ হাদিস পায়। আর ইমাম আবু হানিফা বিশ্ববিখ্যাত মনিষীদের কাছ থেকে থেকে হাদিসের সবক নিয়েও সহিহ হাদিস পেলেননা। আজব তেলেসমাতি। আজিব বাতচিত। ইছি হায় আহলে হাদিস।
সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদিস সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান নেই। এবং ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র জ্ঞান সম্পর্কেও তাদের কোন ধারনা নেই। ইমামে আযম আবু হানিফা রাহ. যেভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন আজ পর্যন্ত কেউ এতসুন্দর সামাধান দিতে পারেনি এবং তাঁর প্রদত্ত কিয়াসগুলোর খন্ডন আজও কেউ করতে পারেনি।
ইমাম আওযায়ী রা. যিনি ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র সমকালিন মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন তিনি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহ. কে বললেন, কুফায় গজিয়ে উঠা এই বেদাআতির পরিচয় কি? যাকে আবু হানিফা উপনামে ডাকা হয়? ইমামে আযম আবু হানিফা রাহ.‘র প্রাণপ্রিয় শিষ্য ইবনে মুবারক এ কথা শুনে চুপ থাকেন, এসময় তিনি কিছু জটিল ও দুর্বোধ্য মাসআলা বর্ণনা করেন এবং সর্বজনগ্রাহ্য ফতোয়ার দিক নির্ণয় করেন। ইমাম আওযায়ী রা. বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে বলেন কে দিয়েছেন এই ফতোয়া? ইবনে মুবারক বলেন ইরাকের জনৈক শায়খ যার সাক্ষাতে এই মাসআলা ও ফতোয়া জেনেছি। ইমাম আওযায়ী রা. বলেন যিনি এই ফতোয়া দিয়েছেন তিনি মাশায়েখকুল শিরমণি। যাও তার কাছে গিয়ে আরো ইলিম হাসিল করো। ইবনে মুবারক বললেন, হযরত! সেই শায়খের নাম আবু হানিফা। পরবর্তীতে মক্কায় ইমামে আযমের সাথে ইমাম আওযায়ী রা. এর সাক্ষাত হয় এবং অনেক মাসআলা নিয়ে আলোচনা (তর্ক-বিতর্ক) হয়। অবশেষে ইমাম আওযায়ী রাহ. ইমাম আবু হানিফা রাহ. সম্পর্কে বলেন, লোকটার গভীর জ্ঞান ও অসামান্য বুদ্ধি বিবেকের প্রতি খামোখাই সমালোচনার তীর ছুড়েছি। এজন্য আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। সত্যি বলতে কি আমি প্রকাশ্য ভুলের মাঝে ছিলাম। মহামানবের চরিত্রে এলজাম দিয়েছিলাম। লোকমুখে যা শুনেছি এর থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
লোকমুখে শুনে ইমাম আওযায়ী রা. ইমাম আবূ হানিফা রা. সর্ম্পকে সঠিক ধারনা পোষন করেননি। কিন্তু যখন ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র গভীর জ্ঞানের কথা শুনলেন তখন তিনি তাকে মাশায়েখকুল শিরমণি বলেছেন। আর আজকে যারা ইমাম আবূ হানিফা রাহ. সর্ম্পকে মন্তব্য করার মত দু:সাহস করে তাদের অস্তিত্ব ঠিক আছে কিনা খবর নাই। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা আধুনিক যুগের সংস্কারক।
অতএব পরিশেষে বলতে চাই যারা বলেন ইমাম আবু হানিফা রাহ. হাদিস জানতেন না। তিনি মুহাদ্দিস ছিলেননা। তাদের এই কথার কোন ভিত্তি নেই। বরং যারা এসব কথা বলে তাদের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা যেখানে শেষ ইমাম আযম আবু হানিফা রাহ.’র জ্ঞান-চিন্তাভাবনা সেখান থেকে শুরু। ইমাম আবু হানিফা রাহ. সম্পর্কে কোনো কিল ও ক্বাল না করে বরং তাঁর প্রদত্ত মাসআলা তথা হানাফি মাযহাব অনুসারে নিজের জীবনকে বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহিহ সমুঝ দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্রঃ ১. বুখারী শরিফ, ২. মুসলিম শরীফ, ৩. খতিবে বাগদাদী, ৪. মানাকিবু ইমামিল আযম আবী হানিফা, ৫. আল খাইরাতুল হিসান
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

যেভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো ইমাম আবু হানিফাকে


যুগে যুগে বহু ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব ইসলামের সেবা করে অমর হয়ে আছেন। ইমামে আজম হজরত আবু হানিফা (রহ.) তাদেরই একজন। তিনিইসলামের জ্ঞান ভান্ডারে যে অবদান রেখে গেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ তার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে।জন্ম ও বংশ পরিচয়।ইমাম আজমের পূর্ব পুরুষরা আদিতে কাবুলের অধিবাসী হলেও ব্যবসায়িক সূত্রে তারা কুফাতে নিবাস গড়েন। তার পিতা সাবিত ছিলেন একজন তাবেয়ি। প্রসিদ্ধ মতানুসারে তিনি ৬৯৯ ঈসায়ি সালের ৫ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ৮০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার মূল নাম ছিলনোমান। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আবু হানিফা উপনামে সুখ্যাতি লাভ করেন।শিক্ষাজীবনবিখ্যাত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান হওয়ায় ইমামে আজম ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। লেখাপড়ার প্রতি তার কোনোআগ্রহ ছিল না। কিন্তু ১৯ বা ২০ বছরের দিকে ইমাম শাবীর (রহ.) নজরে পড়েন তিনি। ইমাম শাবী (রহ.) তাকে ডেকে দ্বীনী জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করেন। শাবীর ক্ষণিকের সান্নিধ্য তার জীবনের মোড় বদলে দেয়। তিনি জ্ঞানার্জনের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহী হয়ে উঠেন। ব্যবসার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে জন্মভূমি কুফার বড় বড় শায়েখদের থেকে জ্ঞানার্জন করতে থাকেন। তিনি বিশেষভাবে ইমাম হাম্মাদের শিষ্যত্ব বরণ করেন। ইমাম হাম্মাদ হলেন ইবরাহিম নখঈ’র প্রিয় ছাত্র। আর ইবরাহিম ইবনে নখঈ (রহ.) হাদিস শাস্ত্র ও ইলমে শরিয়ত শিক্ষা লাভ করেছিলেন হজরত আলী (রা.) এবং হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে।ইমাম হাম্মাদ একাধারে বিশ বছর পরম যত্নের সঙ্গে মেহনত করে নোমান ইবনে সাবিতকে ইমামে আজমরূপে গড়ে তোলেন।
ইমাম আজম শুধু কুফার প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস ও ফকিহদের জ্ঞানভান্ডারের ওপর সন্তুষ্ট না থেকে জ্ঞান আহরণের জন্য হারামাইন শরিফাইন ভ্রমণ করেন।১৩০ হিজরি থেকে ১৩৬ হিজরি পর্যন্ত একটানা ৬ বছর হারামাইন শরিফাইনে অবস্থান করে সেখানকার বিখ্যাত মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে হাদিস আহরণ করেন। ঐতিহাসিকদেরর মতে তিনি প্রায় চার হাজার মুহাদ্দিস থেকে হাদিস শিক্ষা লাভ করেছিলেন। কর্মজীবন১২০ হিজরিতে উস্তাদ হাম্মাদের ইন্তেকালের পর তিনি উস্তাদের মাদ্রারাসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাঠদানের পাশাপশি পৈতৃক কাপড়ের ব্যবসাও ধরে রেখেছিলেন। তাবেয়ি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জনইমামে আজম (রহ.) আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সান্নিধ্য ধন্য বেশ কয়েকজন সাহাবির সঙ্গলাভ করে তাবেয়ি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. (৯৩ হি.), হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আউফা রা. (৮৭ হি.), হজরত সাহল ইবনে সাদ রা. (৮৮ হি.) হজরত আবু তুফাইল রা. (১১০ হি.), হজরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইদি রা. (৯৯ হি.), হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. (৯৪ হি.) ও হজরত ওয়াসেনা ইবনে আসকি রা. (৮৫ হি.)।জীবনচিত্রআল্লাহতায়ালাইমাম আবু হানিফাকে অতুলনীয় জ্ঞান দান করেছিলেন।
যে মসজিদের পাশে শায়িত ইমামে আজম
তিনি প্রচুর পরিমাণে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। তিনি প্রায় ৫৫ বার হজব্রত পালন করেন। আদায় করেন অসংখ্য ওমরা। প্রতি রমজানে অসংখ্যবার কোরআন খতম করতেন। কথিত আছে, তিনি দীর্ঘ চল্লিশ বছরএশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ পড়েছিলেন। ব্যবসায়ী কার্যক্রমে কোনো লেনদেনের ব্যপারে সামান্যতম সন্দেহ দেখা দিলে সে লেনদেনের সম্পূর্ণ অর্থ দান করে দিতেন। সততা ও নৈতিকতা ছিল তার ব্যবসার মূলভিত্তি। উপার্জিত সম্পদের বৃহৎ একটি অংশ জনসেবায় খরচ করতেন। অবদানপাঠদানের দীর্ঘ জীবনে অসংখ্যা ছাত্রকে ফকিহরূপে তৈরি করেছেন। তদানীন্তন সময়ের বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রায় সব শহরের বিচারপতির আসন তার ছাত্ররা অলঙ্কৃত করেছিলেন। তার প্রিয় ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ছিলেন প্রধান বিচারপতি।ইমাম আবু হানিফার রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মুসনাদে আবু হানিফা, আল ফিকহুল আকবার, ওয়াসিয়াতু আবু হানিফা ও কিতাবুল আসার।
গবেষকদের মতে তিনি চল্লিশ হাজার হাদিস থেকে বাছাই করে কিতাবুল আসার সঙ্কলন করেছিলেন। তার সবচেয়ে বড় অবদান হলো কোরআন ও হাদিস থেকে জনসাধারণের আমল উপযোগী মাসয়ালা বের করার মূলনীতি দাঁড় করানো। তার সম্পাদিত এ শাস্ত্রের নাম উসূলুল ফিক্হ। এ কাজের জন্যই তিনি ইমামে আজম খ্যাতি লাভ করেন। তার প্রণীত ফিকাহ আমাদের কাছে ফিকহে হানাফি নামে পরিচিত।মৃত্যুখলিফা মনসুর তাকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি জালেম শাসকের সমর্থনের দায় এড়ানোর জন্য এ পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। এতে অপমানে ক্ষুব্ধ হয়ে খলিফা ইমাম আবু হানিফাকে কারাগারে বন্দী করেন। প্রতিদিন তাকে কারাগার থেকে বের করে প্রকাশ্যে দশটি করে চাবুক মারা হতো। চাবুকের আঘাতে তার শরীর থেকে রক্ত বের হতো। সে রক্তে কুফার মাটি রঞ্জিত হতো। পানাহেরর কষ্টসহ বিভিন্নভাবে সত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধ ইমামকে নির্যাতন করা হয়। অবশেষে জোর করে বিষ পান করানো হয়। ৭৬৭ ঈসায়ি সালের ১৪ জুন মোতাবেক ১৫০ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের নিয়ামত দানে ধন্য করুন। তার রেখে যাওয়া আদর্শের ওপর আমাদের জীবন পরিচালিত করার তওফিক দান করুক। আমিন।