মাযহাব ও তাকলিদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মাযহাব ও তাকলিদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১৬

" হাদিসের ইমামগণ যে মাযহাবের ছিলেন

ইমাম বুখারী রহঃ , ইমাম মুসলিম রহঃ , ইমাম তিরমিযী রহঃ সহ হাদিসের অন্যান্য ইমামগণ মাযহাব অনুসরণ করতেন। 
লা-মাযহাবী ভাইয়েরা বলে ' মাযহাব মানা শিরক ! ' আমি তাদের বলি — ' মাযহাব মানা যদি শিরক-বিদআতই হয় তাহলে ছিহাহ ছিত্তা সহ হাদিসের অন্যান্য ইমামগণ কি মুশরিক বা বিদ’আতী ছিলেন ? '
'
বড় আশ্চর্যের বিষয় হল লা-মাযহাবীদের প্রথম কাতারের নেতা নবাব ছিদ্দীক হাসান খান তার স্বলিখিত বইয়ের মাঝে " হাদিসের ইমামগণ কোন মাযহাবের অনুসারী ছিলেন " তা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। 
'
যা নিম্নরূপ : 
'
১। ইমাম বুখারী রহঃ শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। 
( সুত্রঃ নবাব ছিদ্দিক হাসান খান লিখিত আবজাদুল উলুম পৃষ্ঠা নং ৮১০, আলহিত্তা পৃষ্ঠা নং ২৮৩ এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহঃ লিখিত আল-ইনসাফ পৃষ্ঠা নং ৬৭ , আল্লামা তাজ উদ্দীন সুবকী রহঃ লিখিত ত্ববকাতুশ শাফেয়ী পৃষ্ঠা নং ২/২ ) 
'
২। ইমাম মুসলিম রহঃ শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন ।
(সুত্রঃ ছিদ্দিক হাসান খান লিখিত আল-হিত্তা পৃষ্ঠা নং ২২৮ ) 
'
৩। ইমাম তিরমিজী নিজে মুজতাহিদ ছিলেন। 
তবে হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। 
( সুত্রঃ শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহঃ লিখিত আল-ইনসাফ পৃষ্ঠা নং ৭৯ ) 
'
৪। ইমাম নাসাঈ শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। 
( সুত্রঃ নওয়াব ছিদ্দিক হাসান লিখিত আল-হিত্তা পৃষ্ঠা নং ২৯৩ ) 
'
৫। ইমাম আবু দাউদ রহঃ শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। 
( সুত্রঃ আল-হিত্তা পৃষ্ঠা নং ২২৮ , 
আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহঃ ইবনে তাইমিয়ার উদ্দৃতি দিয়ে ফয়জুল বারী ১/৫৮ তে ইমাম আবু দাউদ রহঃ কে হাম্বলী বলে উল্যেখ করেছেন। ) 
'
৬। ইমাম ইবনে মাজাহ শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। 
( সুত্রঃ ফয়জুলবারী ১/৫৮ )
'
অতএব ছিহাহ ছিত্তার ইমামগণ মাযহাবের অনুসারী ছিলেন তা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট । 
এছাড়াও হাদিসের অন্যান্য ইমামগণ কোন কোন মাযহাবের অনুসারী ছিলেন তার বর্ণনায় প্রখ্যাত লা-লাযহাবী আলেম নবাব ছিদ্দিক হাসান খান সাহেব তার লিখিত " আল-হিত্তা " কিতাব লিখেন — 
'
৭। মিশকাত শরিফ প্রণেতা শাফেয়ী, পৃঃ১৩৫ 
৮। ইমাম খাত্তাবী রহঃ শাফেয়ী, পৃঃ ১৩৫ 
৯। ইমাম নববী রহঃ শাফেয়ী, পৃঃ ১৩৫ 
১০। ইমাম বাগভী রহঃ শাফেয়ী, পৃঃ ১৩৮ 
১১। ইমাম ত্বহাবী হাম্বলী, পৃঃ১৩৫ 
১২। বড় পীর আঃ কাদের জিলানী রহঃ হাম্বলী, পৃঃ ৩০০ 
১৩। ইমাম ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী, পৃঃ ১৬৮ 
১৪। ইবনে কায়্যিম রহঃ হাম্বলী, পৃঃ১৬৮ 
১৫। ইমাম আঃ বার রহঃ মালেকী, পৃঃ১৩৫ 
১৬। ইমাম আঃ হক রহঃ হানাফী, পৃঃ১৬০ 
১৭। শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহঃ হানাফী, পৃঃ১৬০-১৬৩ 
১৮। ইমাম ইবনে বাত্তাল মালেকী, পৃঃ২১৩ 
১৯। ইমাম হালাবী রহঃ হানাফী ,পৃঃ২১৩ 
২০। ইমাম শামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুদ দায়েম রহঃ শাফেয়ী , পৃঃ২১৫ 
২১। ইমাম বদরুদ্দীন আঈনী রহঃ হানাফী,পৃঃ২১৬ 
২২। ইমাম যারকানী রহঃ শাফেয়ী, পৃঃ ২১৭ 
২৩। ইমাম ক্বাজী মুহিব্বুদ্দীন হাম্বলী, পৃঃ২১৮ 
২৪। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী, পৃঃ২১৯ 
২৫। ইমাম বুলকিনী শাফেয়ী, পৃঃ ২১৯ 
২৬। ইমাম মার্যুকী মালেকী পৃঃ ২২০ 
২৭। ইমাম জালালুদ্দীন বকরী শাফেয়ী, পৃঃ২২০ 
২৮। ইমাম কুস্তলানী শাফেয়ী, পৃঃ২২২ 
২৯। ইমাম ইবনে আরাবী মালেকী, পৃঃ ২২৪ 
'
এমন কি তাদের মডেল আব্দুল ওয়াহ্হাব নজদীকেও হাম্বলী বলে উল্লেখ করেছেন তার 'আল্-হিত্তাতু ফিস সিহাহিস সিত্তাহ’র ১৬৭ পৃষ্ঠায়-
'
পরিশেষে বলবো মাযহাবের অনুসরন করা শিরক হলে উপরে বর্ণিত সম্মানিত ইমামগণ কি মুশরিক ছিলেন ? তাঁরা শিরক চিনতে পারেন নাই ! শিরক চিনেছে ১৮৮৬ সালে জন্ম নেওয়া " আহলে হাদিস " নামক লা-মাযহাবী ভাইয়েরা ! যারা কিনা " আহলে হাদিস " নামটাও বৃটিশ সরকারের কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়েছেন । 
( সূত্র — ইশারায়ে সুন্নাহ : ১১/৩২-৩৯)

সুতরাং যারা বলে মাযহাব অনুসরণ করা শিরক তাদের উচিত তাওবা করা । অন্যথায় তারা তাদের দাবির উপর অটল থেকেই মাযহাবি আলেমের লেখা কিতাবকে গ্রহণযোগ্য মনে করলে বুঝতে হবে তারা ফেতনাবাজ , উম্মাহর ঐক্যের শত্রু , সকল মুসলমানের শত্রু ! বুঝতে হবে তাদের মাঝে মুনাফিকের আলামত বিদ্যমান রয়েছে ।

মঙ্গলবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

নবী একজন কিন্তু মাযহাব চারটি কেন? একটি চমৎকার কথোপথন

অনুবাদ– লুৎফুর রহমান ফরায়েজী
একদা মুহাম্মদ আমীন সফদর রহঃ এর কাছে কয়েকজন কথিত আহলে হাদীসের লোক এল। এসে হযরতের কাছে বসল। বসেই বলতে লাগল-“আমরা অনেক পেরেশানীতে আছি। বহুত পেরেশানীতে আছি”।
সফদর রহঃ-“যারাই বড়দের ছেড়ে দেয়, তারা সারা জীবনই পেরেশানীতে থাকে। মওদুদী এই পেরেশানীতেই ছিল। কাদিয়ানীও এই পেরেশানীতেই ছিল। আপনারাও মনে হয় বড়দের ছেড়ে নিজেরাই সব বুঝতে চাচ্ছেন। এজন্যই পেরেশানীতে আছেন”।
কথিত আহলে হাদীস-চারজন ইমাম। চার, চার, চার। কি করবো আমরা?
সফদর রহঃ-আপনি এখানে চারজন পেলেন কোথায়? এখানেতো কোন হাম্বলী নেই। শাফেয়ীও নেই। মালেকীও নেই।
কথিত আহলে হাদীস-যদি চারজন হয়ে যায়!
সফদর রহঃ-হলে ভিন্ন কথা। সেই পেরেশানী এখনই কেন টেনে আনছেন?
কথিত আহলে হাদীস-এটা কেমন কথা যে, আল্লাহ এক আর  ইমাম হল চারজন?
সফদর রহঃ-এটা কেমন কথা যে, আল্লাহ এক আর নবী এক লাখ চব্বিশ হাজার? ওখানে যেমন বল যে, এক নবীকে মান, আর বাকিদের ছেড়ে দাও। এখানেওতো ব্যাপার তাই। এক ইমামকে মান। বাকিদের ছেড়ে দাও। কোথাও কি আছে নাকি যে, ইমাম বেশি হতে পারবে না? যদি থাকে বলেন আমি মেনে নিব। আমি দেখি ইমাম বেশি হতে পারবে কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ فَلا تَكُنْ فِي مِرْيَةٍ مِنْ لِقَائِهِ وَجَعَلْنَاهُ هُدىً لِبَنِي إِسْرائيلَ وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا
অর্থাৎ বাস্তব কথা হল আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছি, সুতরাং (হে রাসূল!) তুমি তার সাক্ষাত সম্পর্কে কোন সন্দেহে থেকো না। আমি সে কিতাবকে বনী ইসরাঈলের জন্য বানিয়েছিলাম পথ-নির্দেশ।
আর আমি তাদের মধ্যে কিছু লোককে, এমন ইমাম বানিয়ে দিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথ প্রদর্শন করত। {সূরা সাজদা-২৩,২৪}
এক রাসূলের উম্মতের মাঝে কয়েকজন ইমাম হতে পারে। এটাতো কুরআন বলছে। কুরআনের শব্দ ইমামের বহুবচন আইয়িম্মাহ ব্যবহৃত হয়েছে।
কথিত আহলে হাদীস- চার ইমামই কি সঠিক?
সফদর রহঃ-হ্যাঁ, চার ইমামই সঠিক।
কথিত আহলে হাদীস-তাহলে চার ইমামের অনুসরণ করেন না কেন? শুধু নিজের ইমামের অনুসরণ করেন কেন?
সফদর রহঃ-যেমন সবাই এক লাখ চব্বিশ হাজার নবীকে সঠিক মানি, কিন্তু অনুসরণ করি আমাদের নবীর। তেমনি সঠিক মানি চার ইমামকেই। কিন্তু অনুসরণ করি নিজের ইমামকে।
কথিত আহলে হাদীস-কোন হাদীসে আছে নাকি এক ইমামের অনুসরণ কর?
সফদর রহঃ-আপনি কুরআন পড়েন?
কথিত আহলে হাদীস-হ্যাঁ পড়ি।
সফদর রহঃ-এক কেরাতে? না সাত কেরাতে?
কথিত আহলে হাদীস-এক কেরাতে?
সফদর রহঃ-সারা জীবন এক কেরাতে কুরআন পড়া আর বাকি কেরাতকে ছেড়ে দেবার কথা কুরআন বা হাদিসের কোথাও আছে?
কথিত আহলে হাদীস-আমাদের কাছে আছেই এটা। তাই পড়ি। কিন্তু এক ইমামের অনুসরণ করলেতো চতুর্থাংশ দ্বীন মানা হয়।
সফদর রহঃ-এক কেরাতে কুরআন পড়লে কি সাত ভাগের একভাগ সওয়াব পাওয়া যায়?
কথিত আহলে হাদীস-না, না, এক কিরাতে পড়লে পূর্ণ কুরআন পড়ার সওয়াবই পাওয়া যায়।
সফদর রহঃ-তেমনি এক ইমামকে মানলে পূর্ণ শরীয়তেরই অনুসরণ হয়।
কথিত আহলে হাদীস-আপনাদের আকল কখনো হবে না? ইমামদের মাঝেতো হারাম-হালালের মতভেদ। একজন যেটাকে হালাল বলেন, অন্যজন সেটাকে হারাম বলেন। তাহলে যিনি হারাম বলেন তিনিও সঠিক। আর হালাল যিনি বলেন তিনিও সঠিক! এটা কি করে সম্ভব?
সফদর রহঃ-আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা আকল দিয়েছেন। নবীগণ সবাই সঠিক।
আদম আঃ এর সময়ে আপন বোনকে বিবাহ করা জায়েজ। আমাদের দ্বীনে হারাম। কিন্তু উভয় নবীই সঠিক।
ইয়াকুব আঃ এর দুইজন স্ত্রী আপন বোন ছিল। এটা সে সময় জায়েজ ছিল। কিন্তু আমাদের নবীর দ্বীনে তা হারাম। উভয়ই সঠিক। সবার আল্লাহ একই। অথচ হুকুম ভিন্ন। তেমনি চার ইমামই সঠিক। কিন্তু তাদের হুকুম ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
কথিত আহলে হাদীস-আরে এখানেতো নাসেখ মানসুখের বিষয়। একটি হুকুম এসে অন্যটাকে রহিত করে দিয়েছে।
সফদর রহঃ-আর ইমামদের ইখতিলাফের মাঝে রাজেহ-মারজুহ এর মাসআলা। তথা একটি হুকুমের উপর অন্যটিকে প্রাধান্য দেবার মাসআলা। যেমন রহিত হওয়া বিষয়ের উপর আমল জায়েজ নয়, তেমনি প্রাধান্য পাওয়া হুকুম রেখে অপ্রাধান্য পাওয়া বিষয়ের উপর আমল করাও জায়েজ নয়।
কথিত আহলে হাদীস-আপনারা যেহেতু অন্য ইমামদের মানেন না, তাহলে তাদের বাতিল বলেন না কেন? সঠিক বলেন কেন?
সফদর রহঃ-আদম আঃ সঠিক নবী হলে কেন বোনকে বিবাহ করা যায় না? ইয়াকুব আঃ সঠিক নবী হলে দুইবোনকে এক সাথে বিবাহ করা কেন করা যাবে না?
কথিত আহলে হাদীস-আমরা শুধু আমাদের নবীকে মানি। বাকিরাও হক একথা ঠিক আছে।
সফদর রহঃ-আমরাও বলি-অন্য ইমাম ঠিক আছে, কিন্তু আমরা মানি আমাদের ইমামকে।
কথিত আহলে হাদীস-সেখানেতো সময় আলাদা আলাদা।
সফদর রহঃ-এখানে এলাকা আলাদা আলাদা। শাফেয়ী শ্রীলংকায় আর হানাফী পাকিস্তানে [বাংলাদেশে]। সেখানে সময় আলাদা আলাদা, আর এখানে এলাকা আলাদা আলাদা।
কথিত আহলে হাদীস-যদি কোন মাসআলায় তিন ইমাম একদিকে হয় আর এক ইমাম একদিকে হয় তাহলে কী করবেন?
সফদর রহঃ-তিন জন নয়, তিন হাজার হলেও আমাদের ইমামকেই মানবো।
কথিত আহলে হাদীস-এটা কোন ইনসাফ হল?
সফদর রহঃ-অবশ্যই এটা ইনসাফ।
কথিত আহলে হাদীস-আরে অপরদিকে তিন ইমাম।
সফদর রহঃ-তাতে কি? আমরাতো আমাদের ইমামের অনুসরণ করবো। তিন হাজার হলেও কি?
কথিত আহলে হাদীস-আপনি কি জিদ করছেন নাকি?
সফদর রহঃ-নাহ, জিদ করবো কেন? ইউসুফ আঃ তার পিতা ইয়াকুব আঃ কে সিজদা করেছিলেন এটা কুরআনে আছে কি?
কথিত আহলে হাদীস-হ্যাঁ আছে।
সফদর রহঃ-সে আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরীনরা বলেন-হুজুর সাঃ এর নবুওয়াতের আগে সকল নবীর যুগে সম্মান করে সেজদা দেয়া জায়েজ ছিল। তো একদিকে এক লাখ তেইশ হাজার নয় শত নিরান্নবই নবীর কাছে সম্মানসূচক সেজদা জায়েজ। আর একজন হযরত মুহাম্মদ সাঃ বলেন জায়েজ নয়। আপনি বলছেন তিন জনের কথা। এখানে লাখের বিষয়। কাকে মানবেন? বিশাল জামাতকে? না একজনকে?
মুফাসসিরীনরা বলেন-প্রথম সকল নবীর শরীয়তে দেহযুক্ত ছবি আঁকা জায়েজ ছিল। কেবল আমাদের নবীর শরীয়তে না জায়েজ। তাহলে এক লাখ তেইশ হাজার নয় শত নিরান্নব্বই নবীর শরীয়ত মানবেন না আমাদের এক নবীর শরীয়ত মানবেন? বেশি কে না একজনকে?
কুরবানীর গোস্ত খাওয়া আমাদের নবীর আগে কারো শরীয়তে জায়েজ ছিল না। তাহলে কাকে মানবেন? লাখ নবীকে না আমাদের এক নবীকে?
কথিত আহলে হাদীস-[কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে] দ্বীন মক্কা-মদীনায় এসেছে? না কুফায়?
সফদর রহঃ-মক্কা-মদিনায়।
কথিত আহলে হাদীস-তাহলে মক্কা-মদিনার ইমামকে মানা উচিত না কুফার ইমামের?
সফদর রহঃ-আপনার মন কি বলে?
কথিত আহলে হাদীস-মক্কা-মদিনার ইমামদের মানা উচিত।
সফদর রহঃ-বড় একটি মিথ্যা কথা বলেছেন আপনি। কখনো এটা মাফ হবে না।
কথিত আহলে হাদীস-ভুল হইছে?
সফদর রহঃ-হ্যাঁ, বহুত বড়।
কথিত আহলে হাদীস-কিভাবে?
সফদর রহঃ-কুরআন মক্কা-মদিনায় নাজিল হয়েছে না?
কথিত আহলে হাদীস-হ্যাঁ।
সফদর রহঃ-সাত জন ক্বারী ছিল। এর মাঝে মক্কা-মদীনার ক্বারীও ছিল। বসরার ক্বারীও ছিল। কিন্তু সবাই ক্বারী আসেম কুফীর কিরাতে কুরআন কেন পড়েন? কুফী ক্বারীর কেরাতে কুরআন পড়লে আপনাদের থেকে বড় কুফী আর কে আছে? কুরআন নাজিল হয়েছে মক্কা-মদিনায় আর কেরাত পড় কুফীর! এটা কেমন কথা?
কথিত আহলে হাদীস-কুফার লোকেরাতো আর কুরআন নিজেরা বানায়নি। কুফাতে যে সাহাবারা এসেছেন তারা কুরআন সাথে নিয়ে এসেছিলেন।
সফদর রহঃ-মক্কা-মদিনা থেকে সাহাবারা গিয়ে কুরআন যদি কুফায় নিয়ে নতুন না বানিয়ে থাকেন, তাহলে নামায কি মক্কা-মদিনা থেকে সাহাবারা কুফায় নিয়ে গিয়ে নতুন নামায বানিয়ে ফেলেছেন?
খামোশ হয়ে গেল কথিত আহলে হাদীসের লম্বা জিহবা।

বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৬

ইমাম আবু হানীফা রহঃ কার তাকলীদ করতেন?

প্রশ্ন —ইমাম আবু হানীফা রহঃ কার তাকলীদ করতেন?
উত্তর : ১।
তাকলীদ করবে গায়রে মুজতাহিদ। আর মুজতাহিদ করবে ইজতিহাদ। এ কারণে গায়রে মুকাল্লিদদের অভিযোগ যে, আমাদের ইমাম গায়রে মুকাল্লিদ। আমরা বলি যে, ইমাম গায়রে মুকাল্লিদ মানে হল, তিনি মুজতাহিদ। তাই তার মুকাল্লিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আর তোমরা গায়রে মুকাল্লিদ মানে হল, তোমরা মুজতাহিদও নয়, আবার তাকলীদও করো না, এর নাম গায়রে মুকাল্লিদ।
২।
এক ব্যক্তি হয়তো ইমাম হবে, নতুবা মুক্তাদী। একজন এমন যে ইমামও নয়, মুক্তাদী নয়। এমতাবস্থায় সে হয় ফাসাদকারী। কোনো ব্যক্তি হয় তো রাজা হবে, নয়তো প্রজা। উভয়টির কোনটি না হলে, হবে বিদ্রোহী। যেমন গায়রে মুকাল্লিদ। ইমাম আবু হানীফা রহঃ হলেন রাজাওয়ালা, আর ইমামওয়ালা আর গায়রে মুকাল্লিদরা হল, ফাসাদকারী, বিদ্রোহী।
৩।
মুসলমান হওয়ার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নবীর কালিমা পড়া জরুরী। নবীজী সাঃ নিজেও মুসলমান। কিন্তু তিনি কার কালিমা পড়েছেন? কারো নয়। তারপরও তিনি সাচ্চা মুসলমান। কারণ তিনি নিজেই নবী। তার জন্য অন্য কারো কালিমা পড়ার প্রয়োজনই নেই।
তেমনি ইমাম আবু হানীফা রহঃ মুজতাহিদ। তাই তার কারো তাকলীদ করার প্রয়োজনই নেই।
৪।
মুক্তাদী ইমামের ইত্তেবা করে জামাআতে নামায পড়ে। আর ইমামও জামাআতে নামায পড়ছে যদিও তিনি কারো ইত্তেবা করছে না। কেননা, তিনি নিজেই ইমাম। এমনিভাবে ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর অনুসারীরা তার তাকলীদ করে থাকে, কিন্তু তিনি কারো তাকলীদ করেন না। কারণ তিনি নিজেই ইমাম।

পবিত্র কুরআনে তাকলীদ বা ইজতিহাদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইংগিত

পবিত্র কুরআনে তাকলীদ বা ইজতিহাদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইংগিত :
প্রশ্ন— আল্লাহর কালাম আর নবীর হাদিস, এসব মেনে চলার জন্য আমাদের আদেশ করা হয়েছে। কিন্তু মাযহাব মেনে চলার জন্য আদেশ করা হয়েছে কি?
আমাদের জবাব —
জেনে রাখতে হবে যে, কথিত আহলে হাদিস দলের ইতিহাস ১৮১৮ সালের পরের ইতিহাস। ইতিপূর্বে এদের কোনো অস্তিত্বই ছিলনা। ১৮১৮ সালে এসে ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে বর্তমান “আহলে হাদিস” নামটি তারা বরাদ্দ করে নেয়।
একনিষ্ঠ শীয়া মতাবলম্বী আব্দুল হক বেনারসি [ মৃত ১২৭৫ হিজরী] ছিলেন উক্ত দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সর্বোচ্চ ইমাম (!)। এবার উল্লিখিত প্রশ্নের জবাব।
১-
আসলে এরকম প্রশ্নকারীরা মূলত “মাযহাব” কী এবং কেন—এসবের কিছুই জানেনা। যার ফলে তারা তাদের পলাতক শায়খদের শিখিয়ে দেয়া বুলি তোতাপাখির মত অহর্নিশি আওড়ায়।

২-
পবিত্র কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে মুজতাহিদ বা ইজতিহাদ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে ইংগিত রয়েছে। যদি কেউ চোখ থাকিতে অন্ধ হয়, তাতে আমাদের কিবা করার আছে!

সূরা নিসা, আয়াত নং ৮৩: আল্লাহ তায়ালার ভাষ্য, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কালামে ইরশাদ করেন- ﻭﺍﺫﺍﺟﺎﺀﻫﻢ ﺍﻣﺮﻣﻦ ﺍﻻﻣﻦ ﺍﻭﺍﻟﺨﻮﻑ ﺍﺫﺍﻋﻮﺑﻪ ﻭﻟﻮﺭﺩﻭﻩ ﺍﻟﻰ ﺍﻟﺮﺳﻮﻝ ﻭﺍﻟﻰ ﺍﻭﻟﻰ ﺍﻻﻣﺮﻣﻨﻬﻢ ﻟﻌﻠﻤﻪ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﻳﺴﺘﻨﺒﻄﻮﻧﻪ ﻣﻨﻬﻢ
অনুবাদ , আর যখন তাদের (সাহাবায়ে কেরাম) নিকট শান্তি বা শংকা সংক্রান্ত কোনো খবর এসে পৌঁছে, তখন তাঁরা এর প্রচারে লেগে যান। অথচ বিষয়টি যদি তাঁরা রাসূল এবং ঊলূল আমর (ফকিহ বা মুজতাহিদ অথবা ইসলামী রাষ্ট্রের প্রসাশক)-এর নিকট পেশ করতেন তাহলে তাঁদের ভেতর সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারীরা (মুজতাহিদরা) বিষয়টির যথার্থতা উদঘাটন করতে পারতেন।”
আয়াতের তাফসির : প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম আবু হাফস (রহ) “আল-লুবাব ফী উলূমিল কিতাব” -এ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন : فنقول دلت الآية علي امور منها: ان في الاحكام مالا يعرف بالنص، بل بالاستنباط. ومنها : ان الاستنباط حجة و منها: ان العامي يجب عليه تقليد العلماء في احكام الحوادث. الخ
অর্থাৎ উল্লিখিত আয়াত দ্বারা বেশ কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হল।
যেমন – (১) মুজতাহিদদের কিয়াস শরিয়তের দলিল।

(২) কিছু বিধান এমন রয়েছে যা নস দ্বারা জানা যায়না। বরং ইস্তেম্বাত তথা সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা জানতে হয়।
(৩) ইজতিহাদ ও ইস্তেম্বাত তথা সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা রিসার্চ করে বের করা শরয়ী সমাধান শরিয়তের দলিল।
(৪) নতুন (অমীমাংসিত) মাসয়ালার ক্ষেত্রে ইজতিহাদে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য মুজতাহিদ উলামায়ে কেরামের তাকলীদ করা ওয়াজিব। ….।”
এ রকম ব্যাখ্যা শব্দের সামান্য বিভিন্নতা সহ আরো অনেক তাফসীরের কিতাবে পাওয়া যায়।
তন্মধ্যে তাফসীরে কবীর (১০/২০০),
তাফসীরে খাজেন (১/৪৭১),
তাফসীরে হাক্কানী (৫/২৫),
তাফসীরে মা’আরেফুল কুরআন (২/৪৯৩),
আহকামুল কুরআন (২/২১৫)
এবং লামাযহাবী শায়খ কর্তৃক লেখিত তাফসীর “তাফসীরে ফাতহুল বয়ান” (২/৮৪) প্রভৃতি অন্যতম।
লামাযহাবী শায়খ নবাব ছিদ্দিক হাসান খান সাহেব কর্তৃক লেখিত তাফসীর “তাফসীরে ফাতহুল বয়ান” (সূরা নিসা, আয়াত নং ৫৯-এর তাফসীর দ্রষ্টব্য ) গ্রন্থে তো আরো সুস্পষ্টভাবে লেখা আছে : الظاهر انه خطاب مستقل مستأنف موجه للمجتهدين.
অর্থাৎ “এটা সুস্পষ্ট যে, এখানে মুজতাহিদদেরকে স্বতন্ত্রভাবে সম্বোধন করা হয়েছে।”
তাহলে এবার কুরআনের ভেতর তাকলীদ বা মাযহাব মানার জন্য ইংগিত পাওয়া গেল কিনা? নিশ্চয় পাওয়া গেল ।
৩-
যদি আপনার বক্তব্য এরকম হয় যে, আল্লাহ’র কালাম (কুরআন মাজিদ) আর নবীর হাদিস অনুযায়ী চলতে হবে। এর বাহিরে মাযহাব বা অন্য কোনো মুজতাহিদ উম্মতির ফতুয়া বা রায় মানা যাবেনা। তাহলে তো আপনার প্রতি আমারও প্রশ্ন থাকছে। তাহল, আপনি আল্লাহ’র কালাম আর নবীর হাদিস মেনে চলবেন, ব্যাস ভাল কথা।

কিন্তু আমরা তো দেখতে পাচ্ছি যে, আপনি সরাসরি আল্লাহ’র কালাম না মেনে, বরং এমদাদিয়া প্রকাশনী সহ বিভিন্ন প্রকাশনীর কালাম (কুরআন মাজিদ) মেনে চলেছেন।
অনুরূপ ভাবে নবীর (সা) হাদিস না মেনে বুখারি, মুসলিম, আবুদাউদ এবং তিরমিযি প্রভৃতির হাদিস সমূহ মেনে চলছেন!
সুতরাং এমতাবস্থায় আপনি নিজেও নিজের দাবিতে স্থীর থাকতে পারলেন কিভাবে, তা কি একটু বুঝিয়ে বলবেন!! (সংক্ষেপে)
আর হ্যাঁ আপনার মতে, যদি এমদাদিয়া প্রকাশনী সহ বিভিন্ন প্রকাশনীর কালাম মেনে চলার মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালার কালাম (কুরআন মাজিদ) মান্য করা হয়, অনুরূপভাবে বুখারি, মুসলিম, আবুদাউদ এবং তিরমিযি প্রভৃতির হাদিস সমূহ মেনে চলার দ্বারা মূলত নবীপাকেরই হাদিস মান্য করা হয়। এর প্রতিউত্তরে আমাদেরও সে একই জবাব। অর্থাৎ মাযহাব চারটের উৎসই হল, আল্লাহ’র কালাম আর নবীপাকের হাদিস।
সুতরাং মাযহাব বা ইজতিহাদ ও ইস্তেম্বাত তথা সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা রিসার্চ করে বের করা শরয়ী রায় মেনে চলার আরেক নাম হল আল্লাহ’র কালাম আর নবীর হাদিস মেনে চলা।
আল-হামদুলিল্লাহ। আশাকরি বুঝতে পেরেছেন ।
লেখক, প্রিন্সিপাল।

মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৫

বিচার বিশ্লেষণ করে একেক সময় একেক মাযহাব মানতে সমস্যা কোথায়?

প্রশ্ন
আসসালামু আলাইকুম
আমার একটা বিষই জানার আছে, বিষয়টিই হল, ধরুন আমি নির্দিষ্ট একজন ইমামকে অনুসরন করি, যেমন ইমাম মালেকের সমস্ত নিয়ম কানুন এবং ফতোয়াগুলো অনুসরন করে চলি। কিন্তু ইমাম মালেকের কোনো এক ফতোয়া বিচার বিশ্লেষণ করে কুরআন এবং বিশুদ্ধ হাদিস অনুসারে দেখা গেল যে ইমাম শাফেই এর ফতোয়া থেকে কম বিশুদ্ধ। আবার ইমাম শাফেই এর কোনো এক ফতোয়া বিশুদ্ধ হাদিসের বিরুদ্ধে যাই অথবা ইমাম আবু হানিফা এর ফতোয়া থেকে কম বিশুদ্ধ, র্কুআন এবং সুন্নাহর আলোকে। আবার দেখা যায় কোনো এক ইমামের বর্ণিত হাদিস দুর্বল আবার অন্য ইমামের বর্ণিত হাদিস বিশুদ্ধ। এক্ষেত্রে প্রত্যেক ইমামের মধ্যে কম বেশি ভুল ত্রুটি আছে। আল্লাহ মাফ করুন। আমরা কেও ভুলের উর্ধে নই। সেক্ষেত্রে আমি কি নির্দিষ্ট করে একজন ইমামকে অনুসরন করে চলব, যেখানে তার কনো ফতোয়া যদিও ভুল হয় এবং অন্য জনের ফতোয়া ঠিক হয়। নাকি সবাইকে অনুসরন করে চলব, সঠিকটা গ্রহনের ম্যাধ্যমে। আশা করি আমার বিষয়টা বুঝতে পেরেছেন। সাহিহ হাদিস ও র্কুআন আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।
Md.shakil parvez
kumarkhali,kushtia
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
আপনার এ প্রশ্নটি মূলত ডাক্তার জাকির নায়েকের উর্বর মস্তিস্ক প্রসূত একটি তথ্য। তাই নয় কি? এখানে যে যুক্তি তুলে ধরা হল যে, চার ইমামের মত থেকে যার মতটিকে বিচার-বিশ্লেষণ করে অধিক দলীলযোগ্য বলে মনে হবে, তার মতকে গ্রহণ করা হবে, আর অন্য মতকে ছেড়ে দেয়া হবে।
এখন প্রশ্ন হল দু’টি। যথা-
১-বিচার বিশ্লেষণটা করবে কে?
২-কোন মূলনীতির আলোকে বিচার বিশ্লেষণ করা হবে?
বিচার বিশ্লেষণ কে করবে?
এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন। কে বিচার বিশ্লেষণ করবে? যে ব্যক্তি কুরআন ও হাদীসকে অনুবাদ ছাড়া মূল কিতাব থেকে বুঝতে সক্ষম নয়। জানেনা আরবী শুদ্ধ করে পড়তেও। কোন হাদীসই সনদসহ মুখস্ত নেই। সনদের প্রতিটি রাবীর জীবনী মুখস্ত নয়। রাবীদের বিরুদ্ধে বা পক্ষে বলা মুহাদ্দিসীনদের বক্তব্য মুখস্ত নেই। মুহাদ্দিসীনগণ কোন কারণে রাবীকে দুর্বল বা সহীহ বলেছেন তা জানা নেই। আরবী ব্যকরণ শাস্ত্র সম্পর্কে নেই পর্যাপ্ত জ্ঞান। কুরআনের অলংকারশাস্ত্র সম্পর্কে নেই কোন জ্ঞান। পূর্ণ কুরআনের নাসেখ-মানসূখ, হাদীসের নাসেখ মানসূখ, সকল আয়াতের শানে নুজুল, হাদীসের শানে ওরূদ সম্পর্কে নেই কোন ইলম।
এরকম অজ্ঞ ব্যক্তি কি করে বুঝবে যে, কোন ইমামের বক্তব্যটি সঠিক আর কোন ইমামের বক্তব্যটি বেঠিক?
এমন অজ্ঞ ব্যক্তি যদি শুধু অনুবাদ পড়ে, কিংবা রাসূল সাঃ এর বলা খাইরুল কুরুন তথা শ্রেষ্ঠ যুগের পরের কোন উম্মতীর ব্যাখ্যার আলোকে নিজের মনমত যেটাকে ইচ্ছে গ্রহণ-বর্জন করার অধিকার থাকা কতটা ইসলাম মানা হবে? একবার ভেবে দেখবেন কি?
কোন মূলনীতির আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে?
মুহাদ্দিসীনদের বক্তব্যের আলোকে? যদি বলেন যে, হ্যাঁ, তাই। মুহাদ্দিসীনরা যে হাদীসকে সহীহ বলেছেন, আমরা কেবল সেই হাদীস অনুপাতেই আমল করবো। আর ফুক্বাহায়ে কেরামের বক্তব্যটি যদি মুহাদ্দিসীনের নির্ধারিত করা সহীহ হাদীসের খেলাফ হয়, তাহলে মুহাদ্দিসীনের কথা মানবো। ফক্বীহের কথা ছেড়ে দিব।
যদি এমনটিই করে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন হল, আপনি মুহাদ্দিসীদের কথা মেনে একটি হাদীসকে আমলযোগ্য সাব্যস্ত করছেন, মুহাদ্দিস ফক্বীহের কথা মেনে তিনি যে হাদীসকে আমলযোগ্য বলে ঘোষণা করছেন সেটি মানছেন না কেন?
এ কেমন বিচার? যিনি শুধু মুহাদ্দিস, তার কথা মেনে হাদীস সহীহ দুর্বল নির্ণয় করছেন, কিন্তু যিনি মুহাদ্দিস হওয়ার সাথে সাথে ফক্বীহ তার কথা মেনে তার বলা হাদীসকে কেন সহীহ মানছেন না?
এ বৈষম্য কেন? মুহাদ্দিসতো আর তার হাদীস সহীহ হওয়ার দলীল কুরআন থেকে বা হাদীস থেকে দিচ্ছে না, শুধুমাত্র নিজের ইজতিহাদ দ্বারা হাদীস সহীহ-জঈফ বলছেন, ঠিক একই কাজ করেছেন মুহাদ্দিস ফুক্বাহায়ে কেরাম। তারাও হাদীস যাচাই-বাছাই করে তার নিকট আমলযোগ্য সহীহ হাদীসের উপর নিজের মাযহাবকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে আপনি শুধু মুহাদ্দিসের কথা মেনে তার সহীহ বলা হাদীসকেই সহীহ মানবেন, অথচ মুহাদ্দিস ফক্বীহের বলা হাদীসকে জঈফ বলবেন কোন যুক্তিতে?
মুহাদ্দিস ফক্বীহ তার বর্ণিত মাসায়েলের বিপক্ষ হাদীসকে দলীলযোগ্য নয়, বা জঈফ মনে করেছেন বলেই ছেড়ে দিয়েছেন। আর যে হাদীসকে সহীহ ও আমলযোগ্য মনে হয়েছে, সে হাদীসের উপর স্বীয় মাযহাব অন্তর্ভূুক্ত করেছেন। তাহলে আপনি একজন ইমামের মাযহাবের মাসআলাকে যা তিনি কুরআন বা হাদীসের আলোকে দাঁড় করিয়েছেন। তাকে আরেক মুহাদ্দিসের বক্তব্যের আলোকে বাদ দিবেন কি করে?
এর কি কোন যৌক্তিক কারণ আছে? যে যুক্তিতে আপনি মাযহাবকে বাদ দিতে চাচ্ছেন, সে যুক্তিতেতো মুহাদ্দিসের বলা সহীহ হাদীসও পরিত্যাজ্য হয়।
উদাহরণতঃ নামাযে আমীন জোরে আস্তে বলার ক্ষেত্রে মুহাদ্দিস ফক্বীহ ইমাম আবু হানীফা রহঃ ওয়াইল বিন হুজুর থেকে বর্ণিত আস্তে বলার বর্ণনাকে সহীহ ও আমলযোগ্য সাব্যস্ত করে এর উপর স্বীয় মাযহাব বানিয়েছেন। আর আমীন জোরে বলার বর্ণনাকে দুর্বল বা কোন কারণে আমলযোগ্য নয়, বলে পরিত্যাজ্য করেছেন।
অপরদিকে কতিপয় মুহাদ্দিস আমীন জোরে বলার বর্ণনাকে সহীহ সাব্যস্ত করেছেন। সেই সাথে আমীন আস্তে বলার বর্ণনাকে জঈফ সাব্যস্ত করেছেন।
এখন কথা হল, আপনি কার বক্তব্য নিবেন? আপনার প্রশ্ন অনুপাতে আপনার ধারণা হল, এক্ষেত্রে মুহাদ্দিস ফক্বীহের বলা সহীহ হাদীসকে ছেড়ে দিয়ে শুধু মুহাদ্দিসের বলা সহীহ হাদীসকে গ্রহণ করবেন? সে হিসেবে বলবেন যে, মুহাদ্দিস যেহেতু আমীন আস্তে বলার বর্ণনাকে জঈফ বলেছেন, আর জোরে বলার বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন, তাই আমি মুহাদ্দিস ফক্বীহ ইমাম আবু হানীফার মাযহাব ছেড়ে দিয়ে আমীন জোরে বলার মাযহাব গ্রহণ করলাম।
এটা করবেন কেন? কিসের ভিত্তিতে করছেন? শুধু মুহাদ্দিস যে হাদীসকে সহীহ বললো, আপনার কাছে সেটি সহীহ। আর যে হাদীসকে মুহাদ্দিস ফক্বীহ সহীহ বললেন, সেটি সহীহ নয় কেন?
যিনি হাদীসের সনদ আর ইবারত সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ আপনি তার কথাই গ্রহণীয় সাব্যস্ত করছেন, অথচ যিনি হাদীসের সনদ ও ইবারতের সাথে সাথে হাদীসের অন্তর্নিহিত অর্থ ও আগে পরের সকল ঘটনাসহ জানেন উক্ত ব্যক্তির কথাকে ছেড়ে দেয়ার ধৃষ্টতা কেন দেখাবেন?
ইমাম আবু হানীফা রহঃ থেকে বর্ণিত সকল মাসআলার ভিত্তিই সহীহ হাদীস
ইমাম আবু হানীফা রহঃ স্বীয় মাযহাবের ভিত্তি রেখেছেন সহীহ হাদীসের উপর। কোন জঈফ হাদীসের উপর তার মাযহাবের ভিত্তি রাখেন নি। তাই হানাফী মাযহাবের সকল মাসআলা যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত তা সকলই সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত। কোন জঈফ হাদীস দিয়ে হাদীসে বর্ণিত মাসআলা প্রমানিত করা হয়নি। এর সবচে’বড় দলীল হল, ইমাম আবু হানীফা রহঃ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন যে,
“যখন হাদীস সহীহ হবে, সেটিই আমার মাযহাব”।
যিনি এ ঘোষণা দিচ্ছেন যে, সহীহ হাদীস তার মাযহাব, তিনি কি করে দুর্বল হাদীসের উপর নিজের মতাদর্শের ভিত্তি রাখবেন? সুতরাং একথা আমরা নির্ধিদ্ধায় বলতে পারি যে, ইমাম আবু হানীফা রহঃ বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিক সকল মাসআলাই সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
একটি প্রশ্ন ও জবাব
হানাফী মাযহাবের ভিত্তি সহীহ হাদীসের উপর হলে, বিভিন্ন মাসআলায় কেন হানাফী মাযহাবের হাদীসকে জঈফ বলে মুহাদ্দিসীনে কেরাম মন্তব্য করেছেন?
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু উত্তরটি খুবই যৌক্তিক ও সহজ। আসলে ইতোপূর্বেই এর একটি জবাব অতিক্রান্ত হয়েছে। তথা- হাদীস সহীহ জঈফ হওয়ার প্রমাণ কুরআন ও হাদীস নয়। বরং ব্যক্তির মতামত। তথা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা যে হাদীসকে সহীহ বলেছেন, আমরা সে হাদীসকে সহীহ বলি। যে হাদীসকে দুর্বল বলেন, আমরা সে হাদীসকে দুর্বল বলি। এ সহীহ বা জঈফ বলার উপর আমাদের কাছে কুরআন বা হাদীসের কোন দলীল নেই। পুরোটাই মুহাদ্দিসীনদের ইজতিহাদ তথা গবেষণা নির্ভর।
এ কারণেই এক হাদীসের ক্ষেত্রে একাধিক বক্তব্য এসেছে। এক হাদীসকে একদল মুহাদ্দিস সহীহ বলেছেন, অপরদল তাকে হাসান বলেছেন, কেউবা জঈফ বলেছেন।
যেহেতু হাদীস সহীহ বা জঈফ হওয়ার কোন দলীল কুরআন বা হাদীসে বর্ণিত নয়। এসবই গবেষকদের গবেষণার সৃষ্টি। যদি কুরআন বা হাদীসে কোন হাদীসকে সহীহ বা জঈফ বলা হতো, তাহলে আমরা কিছুতেই কারো গবেষণা মেনে হাদীসকে সহীহ বা জঈফ মানতাম না। বরং সরাসরি কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সহীহ এবং জঈফকেই মেনে নিতাম। কিন্তু যেহেতু কুরআন ও হাদীসে সহীহ বা জঈফের কথা উল্লেখ নেই, তাই আমাদের মূলনীতি হল, যিনি কুরআন ও হাদীসের শব্দের সাথ তার অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে সম্মক অবগত, সেই সাথে যিনি আল্লাহর নবীর বলা শ্রেষ্ঠ যুগের মুহাদ্দিস ফক্বীহ তার কথার আলোকে হাদীসকে সহীহ ও জঈফ নির্ণিত করবো। তথা শ্রেষ্ঠ যুগের মুহাদ্দিস ফক্বীহ যে হাদীসকে গবেষণা করে সহীহ সাব্যস্ত করে আমলযোগ্য হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন, তার হাদীসকে সহীহ ধরে আমল করবো। আর তিনি যে হাদীসকে জঈফ বা কোন কারণ সংশ্লিষ্ট সাব্যস্ত করে বাদ দিয়েছেন, আমরা উক্ত হাদীসকে আমলহীন ধরে আমল করবো না।
শ্রেষ্ঠ যুগের পরের কোন মুহাদ্দিসের গবেষণা মেনে হাদীস সহীহ বা জঈফ বলার চেয়ে শ্রেষ্ঠ যুগের মুহাদ্দিস ফক্বীহের গবেষণা মেনে হাদীসকে সহীহ বা জঈফ বলা কি অধিক নিরাপদ নয়?
আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয়
ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর জন্ম ৮০ হিজরী। মৃত্যু-১৫০ হিজরী।
ইমাম মালিক রহঃ এর জন্ম-৯৩ হিজরী। মৃত্যু-১৭৯।
ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর জন্ম-১৫০ হিজরী। মৃত্যু-২০৪ হিজরী।
ইমাম আহমাদ বিন বিন হাম্বল রহঃ এর জন্ম-১৬৪, মৃত্যু-২৪১ হিজরী।
ইমাম আবু ইউসুফ রহঃ এর জন্ম-১১৩ হিজরী এবং মৃত্যু-১৮২ হিজরী।
ইমাম মুহাম্মদ রহঃ এর জন্ম ১৩১ হিজরী এবং মৃত্যু-১৮৯ হিজরী।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ইমাম মুহাম্মদ রহঃ নাবালেগ থেকে বালিগ হওয়ার সাথে সাথেই ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
মুহাদ্দিসীনদের জন্ম ও মৃত্যু
মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী রহঃ এর জন্ম-১৯৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৫৬ হিজরী।
মুসলিম বিন হাজ্জাজ ইমাম মুসলিম রহঃ এর জন্ম ২০৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৬১ হিজরী।
মুহাম্মদ বিন ঈসা বিন সাওরা ইমাম তিরমিজী জন্ম-২১০ হিজরী এবং মৃত্যু ২৭৯ হিজরী।
মুহাম্মদ বিন ইয়াজিদ ইমাম ইবনে মাজাহ এর জন্ম-২০৯ হিজরী এবং মৃত্যু-২৭৩ হিজরী।
সুলাইমান বিন আসআস ইমাম আবু দাউদ রহঃ এর জন্ম- ২০২ হিজরী এবং মৃত্যু-২৭৫ হিজরী।
আবু আব্দুর রহমান আহমদ ইমাম নাসায়ী রহঃ এর জন্ম ২১৫ হিজরী এবং মৃত্যু ৩০৩ হিজরী।
এই হল সিহাহ সিত্তার জন্ম ও মৃত্যুর সন। লক্ষ্য করুন যে,
ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মৃত্যুর ৪৪ বছর পর জন্ম লাভ করেছে ইমাম বুখারী রহঃ।
ইমাম মুসলিম রহঃ এর জন্ম গ্রহণ করেছেন ৫৪ বছর পর।
ইমাম তিরমিজী রহঃ জন্ম গ্রহণ করেছেন ৬০ বছর পর।
ইমাম আবু দাউদ রহঃ জন্ম লাভ করেছেন ৫২ বছর পর।
ইমাম ইবনে মাজাহ রহঃ জন্ম গ্রহণ করেছেন ৫৯ বছর পর।
ইমাম নাসায়ী রহঃ জন্ম গ্রহণ করেছেন ৬৫ বছর পর।
ইলমে হাদীসের সাথে সম্পর্ক রাখেন এমন একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও জানেন যে, হাদীস সহীহ বা জঈফ হয় মৌলিকভাবে সনদের দুর্বলতার কারণে। আরে অনেক কারণেও হয়, তবে মূল কারণ সনদের দুর্বলতা। অর্থাৎ সনদের মাঝে দুর্বল রাবী থাকার কারণে সহীহ হাদীসও জঈফ হয়ে যায়, এমনকি মুনকারও হয়ে যায়। আর সনদের মাঝে রাবীগণ শক্তিশালী থাকার কারণে হাদীস সহীহ হয়ে থাকে।
আমরা যদি ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করি যে, ইমাম আবু হানীফা রহঃ যখন হাদীসের আলোকে মাযহাব সংকলিত করেন, তখন যে হাদীস সনদের শক্তিশালীত্বের কারণে সহীহ ছিল, উক্ত হাদীসটি ৪০/৫০ বছর পরেও সহীহ থাকা শর্ত কি না? অবশ্যই নয়। কারণ, একটি হাদীস যখন ইমাম আবু হানীফা রহঃ দেখলেন, সে হাদীসটি তার কাছে সহীহ, কারণ তার মাঝে এবং সাহাবীর মাঝে একজন বা সর্বোচ্চ দুইজনের মাধ্যম বিদ্যমান। সেই একজন বা দুইজনও শ্রেষ্ঠ যুগের লোক। তাদের মাঝে হাদীস জঈফ হওয়ার কোন কারণ বিদ্যমান হওয়া প্রায় অসম্ভব। যেখানে ইমাম আবু হানীফা রহঃ নিজেই একজন জাঁদরেল মুহাদ্দিস এবং জারাহ তাদীলের ইমাম। সেখানে তিনি কোন সহীহ হাদীস ছাড়া গ্রহণ করতেই পারেন না। যেমনটি আমাদের গায়রে মুকাল্লিদরাও অকপটে স্বীকার করে প্রচার করে বেড়ায় যে, ইমাম আবু হানীফা রহঃ বলেছেন“যখন হাদীস সহীহ হবে, তখন সেটাই আমার মাযহাব”।
তাই তিনি হাদীসের ভিত্তিতে যেসব মাসআলা বলেছেন, তার সব ক’টিই ছিল সহীহ হাদীস। যেহেতু তার এবং রাসূল সাঃ এর মাঝে মাধ্যম ছিল দুই বা একজন। তাই সনদের মাঝে দুর্বলতা আসা ছিল খুবই দূরের কথা। কিন্তু উক্ত হাদীসটি, যেটাকে ইমাম আবু হানীফা রহঃ সনদ শক্তিশালী হওয়ার কারণে সহীহ হিসেবে মত দিয়ে তার মাঝে নিহিত মাসআলাকে সহীহ সাব্যস্ত করেছেন, ঠিক সেই হাদীসটিই ৪০/৫০ বছর পর সনদের দুর্বলতার কারণে পরবর্তীদের কাছে যেতে পারে।
কারণ ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর কাছে যে হাদীস সহীহ হিসেবে এল সনদ শক্তিশালী হওয়ার দ্বারা উক্ত হাদীসটি যদি পরবর্তীতে কোন দুর্বল রাবী বর্ণনা করে, তাহলে উক্ত হাদীসটি উক্ত দুর্বল ব্যক্তির বর্ণনার কারণে যার কাছে বর্ণনা করল, তার কাছে উক্ত হয়ে যাচ্ছে দুর্বল তথা জঈফ। কিন্তু সে হাদীস কিন্তু ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর জমানায় সহীহই ছিল। সেটি জঈফ হয়েছে পরবর্তীতে এসে। তাহলে সহীহ থাকা অবস্থায় উক্ত হাদীসের ভিত্তিতে যেহেতু ইমাম আবু হানীফা রহঃ স্বীয় মাযহাব দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন, তাই ৪০/৫০ বছর পরের কোন মুহাক্কিকের কাছে জঈফ সুত্রে পৌঁছার কারণে জঈফ মনে হলেও আবু হানীফা রহঃ এর মাযহাব কিন্তু জঈফ হাদীস নির্ভর হয়ে যাচ্ছে না।
আরো সহজভাবে বুঝুন! ইমাম আবু হানীফা রহঃ তাবেয়ী হিসেবে চার জন সাহাবী থেকে সরাসরি হাদীস পেয়েছেন। যথা-
হযরত আব্দুল্লাহ বিন উনাইস রাঃ থেকে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা রাঃ থেকে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন হারেস রাঃ থেকে।
হযরত মালেক বিন আনাস রাঃ থেকে।
এখন বলুন, এ চারজন থেকে পাওয়া হাদীস বা সুন্নতে নববীতে কোন জুউফ তথা দুর্বলতা পাওয়ার সুযোগ আছে?
তাহলে তাদের বক্তব্যের আলোকে তিনি যেসব মাসআলা তার ফিক্বহে হানাফীতে সংকলিত করেছেন, তা জঈফ হাদীস নির্ভর হয় কি করে?
তবে উক্ত হাদীসগুলোই পরবর্তীতে কোন দুর্বল হাদীস বর্ণনাকারী বলার কারণে দুর্বল হতেই পারে। বিশেষ করে যেখানে ৪০ থেকে ৬০/৭০ বছরের পর।
সুতরাং হানাফী মাযহাবের যেসকল মাসআলা হাদীস নির্ভর। কিন্তু সহীহ হাদীসের উপর নির্ভর করে মাসআলা সংকলিত হওয়ার পর পরবর্তী কোন হাদীস সংকলকের কাছে আসার পর পরবর্তী কোন রাবীর দুর্বলতার কারণে হাদীসটি জঈফ হয়ে গেলেও হানাফী মাযহাবকে দুর্বল হাদীস সম্বলিত বলে এড়িয়ে যাওয়াটা হবে অযৌক্তিক এবং বিবেকশূণ্য মতামত।
তবে কোন মুজতাহিদ এর বিরোধিতা করে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন তার ইজতিহাদী যোগ্যতার কারণে। যেমনটি ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ প্রমূখগণ করেছেন। কোন ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই এমন কোন সাধারণ মুসলমানের কোন অধিকার নেই, মনমত একটি মতকে পরবর্তী মুহাদ্দিসের বক্তব্যের আলোকে একটি প্রাধান্য দিয়ে দেয়া। আর মুহাদ্দিস ফক্বীহ ইমামের মতকে ভুল বলে আখ্যায়িত করা। এরকম আচরণ চরম ধৃষ্টতা বৈ কিছু নয়।
মুজতাহিদ ভুল করলেও একটি সওয়াব
عَنْ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ فَأَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ
হযরত আমর বিন আস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ যখন কোন বিশেষজ্ঞ হুকুম বলতে গিয়ে ইজতিহাদ করে, আর তার ইজতিহাদ সঠিক হয়, তাহলে তার জন্য রয়েছে দু’টি সওয়াব। আর যদি ইজতিহাদে ভুল হয়, তাহলে তার জন্য রয়েছে একটি সওয়াব। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৯১৯, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৪৫৮৪, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৫৭৬}
মুজতাহিদের অনুসারী মুকাল্লিদের কোন চিন্তার কারণ নেই। অতিরিক্ত পন্ডিতিরও কোন দরকার নেই। কারণ রাসূল সাঃ ঘোষণা অনুযায়ী মুজতাহিদের যদি মাসআলা বলতে ভুলও হয়, তাহলেও তিনি একটি নেকি পাচ্ছেন। আর সঠিক হলে দুইটি নেকি পাবেন।
তাই মুজতাহিদের ইজতিহাদকৃত মাসআলায় চলার দ্বারা সওয়াব পাওয়া নিশ্চিত। চাই একটি হোক বা দুইটি। সওয়াবহীন কখনোই হবে না। তাই ভুলের উর্ধে কেউ নয় একথা সত্য। কিন্তু সবার ভুলেই সওয়াব হবে একথা কিন্তু নেই। কিন্তু মুজতাহিদের ভুলেও সওয়াবের নিশ্চয়তা রয়েছে। তাই মোটা ব্রেইনে চিন্তা করে নিজের ধারণার মতে মুজতাহিদের ভুল সিদ্ধান্ত ধরে নিজের মনগড়া মত মানা, যে ভুলের উপর জাহান্নামী হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে তার দিকে যাওয়াটা কতটুকু যৌক্তিক? সেই হিসেবে মুজতাহিদের সওয়াব নিশ্চিত মতামত মানাটা অধিক যৌক্তিক নয়?
তাই নিজের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে কারো মতকে খেয়ালখুশি মত প্রাধান্য দেয়ার মানসিকতা ভ্রান্তিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
যাকে ইচ্ছে তাকে মানা শরীয়তের অনুসরন নয় মন পূজা
যখন যে ইমামকে ইচ্ছে তাকে মানার প্রবণতা দ্বীনে শরীয়তের পাবন্দী হবে না, হবে কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ। মন যখন চাইবে ইমাম আবু হানীফার অনুসরণ করা, আবার মন যখন চাইবে ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর মতকে অনুসরন করা, কিংবা অন্য কোন ইমামের অনুসরণ করা এটা দ্বীনে শরীয়তের আনগত্ব হবে? না মন আর খাহেশাতের আনুগত্ব হবে?
যখন মন চাইল ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মাযহাব অনুসরণ করে বলে দিলেন যে, মহিলাদের স্পর্শ করলে অজু ভাঙ্গবে না। আর ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর বক্তব্য যে, মহিলা স্পর্শ করলে অজু ভেঙ্গে যায়, মতটিকে ছেড়ে দিলেন সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য।
আবার কিছুক্ষণ পর হাত কেটে গেল, এবার যখন দেখা গেল যে, ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মাযহাব অনুপাতে অজু ভেঙ্গে গেছে, আর ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর মতে অজু ভাঙ্গেনি। তখন সাথে সাথেই মাযহাব পাল্টে বলতে শুরু করে দিলেন যে, না, না আমি হানাফী না, আমি শাফেয়ী। তাই আমার অজু ভাঙ্গেনি।
এভাবে প্রতিটি মাসআলায় স্বীয় খাহেশাত অনুযায়ী মত পাল্টাতেই থাকলে এর নাম দ্বীন মানা? না মনপূজা?
এ কারণেই শায়েখ ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেনঃ “লাগামহীনভাবে যে মাযহাব যখন মনে চায়, সেটাকে মানা সুষ্পষ্ট হারাম ও অবৈধ। {ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া-২/২৪১}
সাত কিরাতের এ কিরাতে কুরআন পড়ার বিধান যেমন চার মাযহাবের এক মাযহাব তেমনি
কুরআন নাজিল হয়েছিল সাত কিরাতে। যার এক কিরাত অন্য কিরাতের সাথে মতভেদ ছিল। হযরত উসমান রাঃ এর আমলে সাত কিরাতের মাঝে এক কিরাতকে আবশ্যক করে দেয়া হয়েছে। বাকি ৬ কিরাতকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। যে কিরাতটি ছিল আসেম কুফী রহঃ এর কিরাত। মক্কা মদীনার কারীদের কিরাত রেখে হযরত উসমান রাঃ কুফার কারীর কিরাত হিসেবে কুরআন পড়ার সারা পৃথিবীর মুসলমানদের জন্য আবশ্যকীয় করে দিলেন।
এর একটাই কারণ ছিল, সেটি হল, বিশৃংখলা রোধ করা। আর মনের খাহেশাত পূজা বন্ধ করা। কারণ সাত কিরাত চালু থাকলে, কুরআন সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা কারণে আন্দাজে একটি কিরাতের বিকৃত অর্থ করে মানুষ আমল করতে থাকতো। এক স্থানে এক আয়াত একভাবে তিলাওয়াত করতো, অন্য স্থানে গিয়ে মন চাইলে কিরাতে স্টাইল পাল্টে মানুষকে বিভ্রান্ত করতো। এরকম বিভ্রান্তির পথকে রুদ্ধ করার জন্য বাকি ৬ কিরাতকে হযরত উসমান রাঃ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেন।
ঠিক তেমনিভাবে চার মাযহাবের অবস্থা। যদি সবাইকে বলা হয় যে, তোমাদের গবেষণা অনুযায়ী যে মাযহাবের যে বক্তব্য ভাল লাগে সে বক্তব্যকে গ্রহণ করবে, তাহলে অধিকাংশ মানুষ যেখানে কুরআন হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞ, সেসব মানুষ বাংলা আর অনুবাদ পড়ে যখন যে ইমামের বক্তব্যকে সহজ আর নিজের মনের মত পাবে, তা গ্রহণ করতো, আর যেটাকে ইচ্ছে ছেড়ে দিতো। আবার যখন মনে চায় আরেকজনের গ্রহণ করতো। এভাবে দ্বীনে শরীয়তকে একটি ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলতো। তাই চতুর্থ শতাব্দির উলামায়ে কেরাম এ লাগামহীনতার পথকে রুদ্ধ করে দিলেন। উম্মতের ইজমা হয়ে গেছে যে, এ ৪র্থ শতাব্দির পর থেকে লাগামহীনভাবে যখন যে মাযহাব ইচ্ছে সে মাযহাব মানা যাবে না। সুনির্দিষ্টভাবে একটি মাযহাবকে মানতে হবে। {আলইনসাফ-৫২, ৫৭-৫৯, মাদারে হক-৩৪১, ইন্তিসারুল হক বজওয়াবে মিয়ারে হক-১৫৩, আলমুআফাকাত-৪/১৪৬, আলমাজমূহ শরহুল মুহাজ্জাব-১/৯১}
দলীলের ভিত্তিতে কারো মত প্রাধান্য দেয়ার যুক্তির জবাব ইতোপূর্বেই অতিক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ ঠিক কার দলীল সঠিক, কোনটি সহীহ হাদীসের উপর নির্ভরশীল, আর কোনটি জঈফ হাদীসের উপর নির্ভরশীল। তা আল্লাহ ও রাসূল সাঃ থেকে বর্ণিত নয়। তাই উম্মতীর কথা শুনতে হয়। আর উম্মতীদের মাঝে সবচে’গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি তারাই হতে পারেন, যারা মুহাদ্দিস হওয়ার সাথে সাথে ফক্বীহ। যারা শুধু হাদীসের শব্দ জানেন, তারা কখনোই মুহাদ্দিস ফক্বহী মুজতাহিদের উপর প্রাধান্য পেতে পারে না।
তাই যে এলাকায় যে মাযহাব উসুল ও ফুরূ তথা মূলনীতি ও শাখাগত মাসায়েলসহ মুতাওয়াতিসূত্রে পৌঁছেছে সে সকল এলাকার মানুষের উপর উক্ত মাযহাব অনুযায়ী আমল করা উচিত। তাহলেই আর কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। হাদীসের ইবারত শুদ্ধ করে না পড়তে পারলেই নিজেই মুজতাহিদ দাবি করে বসাটা পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছু হবে না।
অন্ধ তাক্বলীদ কাকে বলে?
আজ কালের অতি পন্ডিত গায়রে মুকাল্লিদ ভাইয়েরা বলে বেড়ান যে, মুজতাহিদদের অনুসরণে দ্বীনের অনুসরণ করা নাকি অন্ধ তাকলীদ।
আফসোস! এই বেচারারা অন্ধ তাকলীদের অর্থও জানেনা। অন্ধ তাকলীদ এটাকে বলে, যেখানে অন্ধ অন্ধের পিছনে চলে। তখন উভয়ে কোন গর্তে নিপতিত হয়। এটা অন্ধ তাকলীদ। আর যদি অন্ধ দৃষ্টিবান মানুষের পিছনে চলে, তো এই দৃষ্টিবান ব্যক্তি এই অন্ধকেও তার চোখের বরকতে সকল গর্ত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাবে। আর মানজিলে মাকসাদে পৌঁছিয়ে দিবে।
আইয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন (নাউজুবিল্লাহ) অন্ধ নয়। তারা দৃষ্টিবান। তারা কুরআন সুন্নাহ ও সাহাবাদের ফাতওয়া ও জীবনাচার সম্পর্কে, সেই সাথে আরবী ভাষাসহ ইলমী সকল বিষয়ে প্রাজ্ঞ ও গভীর দৃষ্টির অধিকারী। তাদের ভুল হলেও একটি সওয়াব আর সঠিক হলে দুইটি সওয়াব হবে মর্মে হাদীসে স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে।
তবে অন্ধ ব্যক্তি আছে। আছে অন্ধ মুকাল্লিদও। যারা নিজেরাও অন্ধ। তাদের পথিকৃত ও অন্ধ। অর্থাৎ তাদের ইজতিহাদের চোখ নাই। এই জন্যই নবীজী সাঃ বলেছেন যে, যে মুর্খকে দ্বীনের পথিকৃত বানায়, সেই মুর্খ নিজেও গোমড়া হয়, আর তার অনুসারীদেরও গোমড়া করে। এর নাম অন্ধ তাকলীদ।
আল্লাহ তায়ালা নিষ্পাপ নবী সাঃ আর পূণ্যবান মুজতাহিদীনদের গবেষণা-সম্পাদনার উপর আমলে করার তৌফিক দান করুন। আর নব্য নব্য ফেতনা থেকে হিফাযত করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের হককে বুঝার, এবং বাতিলকে বাতিল বুঝার তৌফিক দান করুন। সেই সাথে মুখরোচক স্লোগানের আড়ালে শয়তানের ঈমান বিধ্বংসী বক্তব্যের অনুসরণ থেকে পুরো মুসলিম জাতিকে হিফাযত করুন। আমীন। ছুম্মা আমীন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৫

লা মাজহাবী সম্পর্কে মুফতি তাকী উসমানী দাঃবাঃ এর হাতেগড়া ছাত্র



মুফতি দেলাওয়ার সাহেব দা.বা. এর সংক্ষিপ্ত অথচ মহামূল্যবান কথা 

"লা মাজহাবী"ফেতনাবাজরা প্রথমে তারা নিজেদেরকে পরিচয় দিতো "ওয়াহাবী"নামে। যখন তারা দেখলো, এই নামে 
জনগনের কাছে তারা ঘৃণিত হচ্ছে, (ঘৃণিত হওয়ার বিশেষ কারণও আছে) তখন নামকরণ করে "মুয়াহহিদ "নামে।

 তারপরও মানুষ তাদেরকে চিনে ফেলে, তাই তাদের বিভ্রান্তিকর মতাদর্শকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হল।

 এরপর তারা নতুন করে "মুহাম্মাদিয়া"নামে প্রকাশ পেল। তারপরও সচেতন জনগন তাদের চিনে ফেলে, তাই নাম দেয় "আহলে হাদীস "। বর্তমানেও এই নাম প্রচার করে।

তবে এই নামটাও অনেক "লা মাজহাবী"র কাছে ভালো লাগে নি। কারণ হাদীস তো অনেক প্রকার। যেমন 

মুতাওয়াতার, মাশহুর, খবরে ওয়াহিদ, সহীহ লি আইনিহী, সহীহ লিগাইরিহী, হাসান লি আইনিহী, হাসান লিগাইরিহী, জয়ীফ, মুরসাল, জাল, লা আসলা লাহু, ইত্যাদি।

তাই প্রশ্ন জাগে তারা কোন প্রাকারের আহলে হাদীস?

"
মুতাওয়াতার আহলে হাদীস নাকি মশহুর আহলে হাদীস? "জয়ীফ" আহলে হাদীস নাকি "কওয়ী" আহলে হাদীস,

জাল আহলে হাদীস নাকি "লা আসলা লাহু" আহলে হাদীস?

কারণ অনেক হাদীস আমলযোগ্য না হলেও সবগুলোকেই হাদিস বলা হয়। একারণেই রসুল সাঃ হাদিস অনুসরণ করতে বলেন নি, বলেছেন সুন্নাহ অনুসরণ করতে।

এসব কারণে বর্তমানে "লা মাজহাবী"দের অনেকে নিজেদেরকে "আহলে হাদীস" পরিচয় না দিয়ে নিজেদেরকে "সালাফী" পরিচয় দেয়।

তাও তাদের মতাদর্শের সাথে এই নামটি যথাযথ হয় না। কারণ "সালাফী" বলা হয় দূরবর্তী অতীতের ভালো 

অনুসরণীয় ইমামদেরকে। অথচ তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুসরণ করে "আলবানী, ইবনে তাইমিয়া ইত্যাদি নিকটবর্তী 

আলেমদেরকে। তাই কিছুদিন পর এই নামটিও চেঞ্জ হয়ে অন্য কোনো নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করবে

রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৫

পবিত্র কুরআনে তাকলীদ বা ইজতিহাদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইংগিত

পবিত্র কুরআনে তাকলীদ বা ইজতিহাদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইংগিত :
প্রশ্ন— আল্লাহর কালাম আর নবীর হাদিস, এসব মেনে চলার জন্য আমাদের আদেশ করা হয়েছে। কিন্তু মাযহাব মেনে চলার জন্য আদেশ করা হয়েছে কি?
আমাদের জবাব —
জেনে রাখতে হবে যে, কথিত আহলে হাদিস দলের ইতিহাস ১৮১৮ সালের পরের ইতিহাস। ইতিপূর্বে এদের কোনো অস্তিত্বই ছিলনা। ১৮১৮ সালে এসে ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে বর্তমান “আহলে হাদিস” নামটি তারা বরাদ্দ করে নেয়।
একনিষ্ঠ শীয়া মতাবলম্বী আব্দুল হক বেনারসি [ মৃত ১২৭৫ হিজরী] ছিলেন উক্ত দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সর্বোচ্চ ইমাম (!)। এবার উল্লিখিত প্রশ্নের জবাব।
১-
আসলে এরকম প্রশ্নকারীরা মূলত “মাযহাব” কী এবং কেন—এসবের কিছুই জানেনা। যার ফলে তারা তাদের পলাতক শায়খদের শিখিয়ে দেয়া বুলি তোতাপাখির মত অহর্নিশি আওড়ায়।
২-
পবিত্র কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে মুজতাহিদ বা ইজতিহাদ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে ইংগিত রয়েছে। যদি কেউ চোখ থাকিতে অন্ধ হয়, তাতে আমাদের কিবা করার আছে!
সূরা নিসা, আয়াত নং ৮৩: আল্লাহ তায়ালার ভাষ্য, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কালামে ইরশাদ করেন- ﻭﺍﺫﺍﺟﺎﺀﻫﻢ ﺍﻣﺮﻣﻦ ﺍﻻﻣﻦ ﺍﻭﺍﻟﺨﻮﻑ ﺍﺫﺍﻋﻮﺑﻪ ﻭﻟﻮﺭﺩﻭﻩ ﺍﻟﻰ ﺍﻟﺮﺳﻮﻝ ﻭﺍﻟﻰ ﺍﻭﻟﻰ ﺍﻻﻣﺮﻣﻨﻬﻢ ﻟﻌﻠﻤﻪ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﻳﺴﺘﻨﺒﻄﻮﻧﻪ ﻣﻨﻬﻢ
অনুবাদ , আর যখন তাদের (সাহাবায়ে কেরাম) নিকট শান্তি বা শংকা সংক্রান্ত কোনো খবর এসে পৌঁছে, তখন তাঁরা এর প্রচারে লেগে যান। অথচ বিষয়টি যদি তাঁরা রাসূল এবং ঊলূল আমর (ফকিহ বা মুজতাহিদ অথবা ইসলামী রাষ্ট্রের প্রসাশক)-এর নিকট পেশ করতেন তাহলে তাঁদের ভেতর সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারীরা (মুজতাহিদরা) বিষয়টির যথার্থতা উদঘাটন করতে পারতেন।”
আয়াতের তাফসির : প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম আবু হাফস (রহ) “আল-লুবাব ফী উলূমিল কিতাব” -এ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন : فنقول دلت الآية علي امور منها: ان في الاحكام مالا يعرف بالنص، بل بالاستنباط. ومنها : ان الاستنباط حجة و منها: ان العامي يجب عليه تقليد العلماء في احكام الحوادث. الخ
অর্থাৎ উল্লিখিত আয়াত দ্বারা বেশ কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হল।
যেমন – (১) মুজতাহিদদের কিয়াস শরিয়তের দলিল।
(২) কিছু বিধান এমন রয়েছে যা নস দ্বারা জানা যায়না। বরং ইস্তেম্বাত তথা সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা জানতে হয়।
(৩) ইজতিহাদ ও ইস্তেম্বাত তথা সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা রিসার্চ করে বের করা শরয়ী সমাধান শরিয়তের দলিল।
(৪) নতুন (অমীমাংসিত) মাসয়ালার ক্ষেত্রে ইজতিহাদে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য মুজতাহিদ উলামায়ে কেরামের তাকলীদ করা ওয়াজিব। ….।”
এ রকম ব্যাখ্যা শব্দের সামান্য বিভিন্নতা সহ আরো অনেক তাফসীরের কিতাবে পাওয়া যায়।
তন্মধ্যে তাফসীরে কবীর (১০/২০০),
তাফসীরে খাজেন (১/৪৭১),
তাফসীরে হাক্কানী (৫/২৫),
তাফসীরে মা’আরেফুল কুরআন (২/৪৯৩),
আহকামুল কুরআন (২/২১৫)
এবং লামাযহাবী শায়খ কর্তৃক লেখিত তাফসীর “তাফসীরে ফাতহুল বয়ান” (২/৮৪) প্রভৃতি অন্যতম।
লামাযহাবী শায়খ নবাব ছিদ্দিক হাসান খান সাহেব কর্তৃক লেখিত তাফসীর “তাফসীরে ফাতহুল বয়ান” (সূরা নিসা, আয়াত নং ৫৯-এর তাফসীর দ্রষ্টব্য ) গ্রন্থে তো আরো সুস্পষ্টভাবে লেখা আছে : الظاهر انه خطاب مستقل مستأنف موجه للمجتهدين.
অর্থাৎ “এটা সুস্পষ্ট যে, এখানে মুজতাহিদদেরকে স্বতন্ত্রভাবে সম্বোধন করা হয়েছে।”
তাহলে এবার কুরআনের ভেতর তাকলীদ বা মাযহাব মানার জন্য ইংগিত পাওয়া গেল কিনা? নিশ্চয় পাওয়া গেল ।
৩-
যদি আপনার বক্তব্য এরকম হয় যে, আল্লাহ’র কালাম (কুরআন মাজিদ) আর নবীর হাদিস অনুযায়ী চলতে হবে। এর বাহিরে মাযহাব বা অন্য কোনো মুজতাহিদ উম্মতির ফতুয়া বা রায় মানা যাবেনা। তাহলে তো আপনার প্রতি আমারও প্রশ্ন থাকছে। তাহল, আপনি আল্লাহ’র কালাম আর নবীর হাদিস মেনে চলবেন, ব্যাস ভাল কথা।
কিন্তু আমরা তো দেখতে পাচ্ছি যে, আপনি সরাসরি আল্লাহ’র কালাম না মেনে, বরং এমদাদিয়া প্রকাশনী সহ বিভিন্ন প্রকাশনীর কালাম (কুরআন মাজিদ) মেনে চলেছেন।
অনুরূপ ভাবে নবীর (সা) হাদিস না মেনে বুখারি, মুসলিম, আবুদাউদ এবং তিরমিযি প্রভৃতির হাদিস সমূহ মেনে চলছেন!
সুতরাং এমতাবস্থায় আপনি নিজেও নিজের দাবিতে স্থীর থাকতে পারলেন কিভাবে, তা কি একটু বুঝিয়ে বলবেন!! (সংক্ষেপে)
আর হ্যাঁ আপনার মতে, যদি এমদাদিয়া প্রকাশনী সহ বিভিন্ন প্রকাশনীর কালাম মেনে চলার মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালার কালাম (কুরআন মাজিদ) মান্য করা হয়, অনুরূপভাবে বুখারি, মুসলিম, আবুদাউদ এবং তিরমিযি প্রভৃতির হাদিস সমূহ মেনে চলার দ্বারা মূলত নবীপাকেরই হাদিস মান্য করা হয়। এর প্রতিউত্তরে আমাদেরও সে একই জবাব। অর্থাৎ মাযহাব চারটের উৎসই হল, আল্লাহ’র কালাম আর নবীপাকের হাদিস।
সুতরাং মাযহাব বা ইজতিহাদ ও ইস্তেম্বাত তথা সূক্ষ্ম উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা রিসার্চ করে বের করা শরয়ী রায় মেনে চলার আরেক নাম হল আল্লাহ’র কালাম আর নবীর হাদিস মেনে চলা।
আল-হামদুলিল্লাহ। আশাকরি বুঝতে পেরেছেন ।
লেখক, প্রিন্সিপাল।

ইমামে আ’জম (রহ) সম্পর্কে কানকাটা লা-মাযহাবীদের অকথ্য সমালোচনার দাঁতভাঙ্গা জবাব

মাযহাব ও ইমাম আবূ হানীফা (রহ)-এর ব্যাপারে লা- মাযহাবীদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও তার জবাব :
প্রাককথন:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, ”তোমার পালনকর্তার পথে আহবান করো, হৃদয়গ্রাহী হিকমাতের সহিত বুঝিয়ে এবং শুভেচ্ছামূলক আকর্ষণীয় উপদেশ শুনিয়ে এবং তোমরা (প্রয়োজনে) বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়।” ( সূত্র— আন-নাহল,১২৫)।
আয়াত : ﺍﺩﻉ ﺍﻟﯽ ﺳﺒﯿﻞ ﺭﺑﮏ ﺑﺎﻟﺤﮑﻤۃ ﻭﺍﻟﻤﻮﻋﻈۃ ﺍﻟﺤﺴﻨۃ ﻭﺟﺎﺩﻟﮭﻢ ﺑﺎﻟﺘﯽ ﮬﯽ ﺍﺣﺴﻦ ) )
আরো এক আয়াতে আছে, “তোমরা আহলে কিতাবদের সঙ্গে মতবিরোধে উত্তমপন্থা পরিহার করোনা।” ( সূত্র— আনকাবুত-৪৬)।
আয়াত : ﻻ ﺗﺠﺎﺩﻟﻮﺍ ﺍﮬﻞ ﺍﻟﮑﺘﺎﺏ ﺍﻻ ﺑﺎﻟﺘﯽ ﮬﯽ ﺍﺣﺴﻦ
এভাবে আল্লাহ তা’য়ালা মূসা (আ) এবং হারুন (আ) দু’জনকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন “ফিরাউনের মতো অবাধ্য কাফেরের সাথেও নম্র আচরণ করা উচিত।” ( সূত্র— ত্বোয়া- হা,৪৪)
আয়াতের ভাষ্য :
ﻓﻘﻮﻻ ﻟﮧ ﻗﻮﻻ ﻟﯿﻨﺎ
বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) অশ্লীলতাকে কোন ক্ষেত্রেই পছন্দ করতেন না। ( সূত্র— আহমাদ,২/১৯৩ হা.৬৮২৯)
ﻟﻢ ﯾﮑﻦ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﮧ ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﺎﺣﺸﺎ ﻭﻻ ﻣﺘﻔﺤﺸﺎ
আরেক হাদীসে তিনি বলেন, “ঈমানদারকে গালি দেয়া ফাসেক্বী এবং হত্যা করা কাফেরের কাজ।” ( সূত্র— আহমাদ – ১/৪৩৯ হা. ৪১৭৭)।
ﺳﺒﺎﺏ ﺍﻟﻤﺆﻣﻦ ﻓﺴﻖ ﻭﻗﺘﺎﻟﮧ كفر.
রাসূলুল্লাহ (সা) আরও ইরশাদ করেন, ”তোমরা পরস্পর ক্রোধ- ক্ষোভ, হিংসা-নিন্দা, গীবত ও সমালোচনা পরিহার করে ভাই ভাই হয়ে যাও। এভাবে তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। ( সূত্র— আবু দাউদ-৫/২১হা. ৪৯১০)
( ﻻﺗﺒﺎﻏﻀﻮﺍ ﻭﻻ ﺗﺤﺎﺳﺪﻭﺍ ﻭﻻ ﺗﺪﺍﺑﺮﻭﺍ ﻭﮐﻮﻧﻮﺍ ﻋﺒﺎﺩ ﺍﻟﻠﮧ ﺍﺧﻮﺍﻧﺎ )
Π মাযহাব ও মাযহাব-অবলম্বীদের প্রতি লা-মাযহাবীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া:
মাযহাব মানা বা তাক্বলীদ করা এবং মাযহাব-অবলম্বীদের প্রতি বিরাগ-বিদ্বেষ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়েই কথিত “আহলে হাদীস” মতবাদের আত্মপ্রকাশ। তাই, মাযহাব ও মাযহাবপন্থীদের প্রতি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অসঙ্গতিপূর্ণ, জঘন্যতম ও ন্যক্কারজনক কটুক্তিপূর্ণ বই-পুস্তক তারা বিনামূল্যে ও স্বল্পমূল্যে বিতরণ করে যাচ্ছে।
উদাহরণ স্বরূপ তাদের পুস্তকগুলো থেকে কয়েকটি উক্তি নিম্নে উল্লেখ করা হল।
(ক)
লা-মাযহাবীদের বহুল আলোচিত বই “কাটহুজ্জাতীর জাওয়াব” বইয়ের লিখক মৌ. আবু তাহের বর্দ্ধমানী লিখেছে “তাক্বলীদ হচ্ছে ঈমানদারদের জন্য শয়তানের সৃষ্ট বিভ্রান্তি।” ( সূত্র— কাটহুজ্জাতীর জওয়াব, পৃ.৮৩)।
(খ)
অত্যন্ত বিতর্কিত বই “তাওহীদী এটম বোম” বইয়ের প্রণেতা মৌ. আব্দুল মান্নান সিরাজনগরী (বগুড়া) লিখেন ”মুক্বাল্লিদগণকে মুসলমান মনে করা উচিত নয়।” ( সূত্র— তাওহীদী এটম বোম, পৃ.১৫)।
(গ)
রংপুর শাইলবাড়ী নিবাসী মুহা. আব্দুল কাদের লিখেন, “মাযহাবীগণ ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত, তাদের মধ্যে ইসলামের কোন অংশ নেই।” ( সূত্র— তাম্বিহুল গাফেলীন, আব্দুল কাদির রচিত পৃ.৭)
(ঘ)
মৌ. আব্দুল্লাহ মুহাম্মদী লিখেন ”চার ইমামের মুক্বাল্লেদ এবং চার তরিকার অনুসারীগণ মুশরিক ও কাফির।” ( সূত্র— ইতেছামুস সুন্নাহ পৃ.৭-৮)।
এভাবে ‘জফরুল মুবিন’ প্রণেতা মৌ. মুহিউদ্দীন, ‘তরজুমানে ওহহাবিয়্যাহ’ প্রণেতা নবাব ছিদ্দীক হাসান খান এবং লা- মাযহাবীদের সর্বশ্রেষ্ঠ ফাতওয়ার (?) কিতাব ‘ফতোয়ায়ে নাজিরিয়া’র সংকলক মৌ. নাজিমুদ্দীন প্রমুখ মাযহাব অবলম্বীদেরকে কাফির, মুশরিক, বি’দআতী ও জাহান্নামী বলে ফতোয়া দিয়েছেন। ( সূত্র— জফরুল মুবিন, পৃ.১৮৯-২৩০-২২৩ তরজমানে ওহহাবিয়্যাহ পৃ. ৩৫-৩৬ ফতোয়ায়ে নাযীরিয়া।১/৬৯-৯৭)।
ΠΠ পর্যালোচনা :
হানাফী মাযহাবের সুখ্যাতি আজ জগৎজুড়ে, পরিধি বিশ্বজুড়ে। হানাফী মাযহাব ও ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব- বৈশিষ্ট্য এবং অন্যান্য তথ্যপূর্ণ ও তাত্ত্বিক গুণাবলীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চলমান বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশী মুসলমান এ মাযহাবের সুধাপানে তৃপ্তি লাভ করছেন।
এ মাযহাবের বিপুল গ্রহণযোগ্যতা লক্ষ্য করেই একটি কুচক্রী মহল গভীর ষড়যন্ত্র ও হিংসাত্মক আক্রমণে মেতে উঠেছে। তারা কি জানে না যে, এ মাযহাবে রয়েছে কুরআনে কারীমের অগ্রাধিকার, হাদীস শরীফের যথাযথ মূল্যায়ন, শ্রেষ্ঠ ও নির্ভুল দলীল প্রমাণের প্রাধান্য, কুরআন সুন্নাহ ও সমকালীন মাসাইলের লিপিবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত সম্ভার, সীমাহীন সতর্কতায় অটল, অপূর্ব তাত্ত্বিক গবেষণার শ্রেষ্ঠ সমাহার, যুগশ্রেষ্ঠ ও যুগোপযোগী সমাধানের অনন্য উপকরণ।
আর ইমাম আবু হানীফার শ্রেষ্ঠত্ব ও বুৎপত্তি তো আছেই। এ সমস্ত বিষয় আমি “মাযহাব মানি কেন” বইয়ে কুরআন সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত তত্ত্বপূর্ণ ও তথ্যবহুল আলোচনা করেছি। সবাইকে অধ্যয়নের আমন্ত্রন জানিয়ে চলমান পরিসরে অতি সংক্ষেপে কতিপয় তথ্য পেশ করার প্রয়াস পাবো।
ইমাম আবু হানীফা (রহ) একটি নাম, একটি ইতিহাস, হাজার-হাজার বই পুস্তকের শিরোনাম। কোটি-কোটি মানুষের স্মরণীয় বরণীয় ও অনুসরণীয়-অনুকরণীয় মহান ব্যক্তি।
শ্রদ্ধেয় ও প্রাণপ্রিয় মুখপাত্র, অসাধারণ পথিকৃত ও অপ্রতিদ্বন্ধী পথ প্রদর্শক এবং বিশ্ব মুসলিম জাতির এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা। কুরআন-সুন্নাহর দিক নির্দেশনায় তাঁর অসামান্য অবদানের কথা মুসলিম বিশ্ব স্মরণ করবে যুগ যুগ ধরে। তাঁর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা এবং কুরআন সুন্নাহর গবেষণায় সুনিপূণ কৃতিত্ব আদর্শ হয়ে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত আগত উত্তরসূরীদের পাথেয় হিসেবে। তাঁর মহৎ ব্যক্তিত্ব ও অসাধারণ কৃতিত্ব এবং অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্য শীর্ষক বই-প্স্তুক আজকের বিশ্বে অসংখ্য-অগণিত।
আমার জানামতে রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যতীত ইমাম আবু হানীফার সমতূল্য আর কারও জীবনী শীর্ষক এতো সংখ্যক বই-পুস্তক লিখা হয়নি। হানাফী মাযহাবের আলিমগণতো লিখেছেনই, অন্যান্য মাযহাবের যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের সংখ্যাও বেশুমার।
Π প্রিয়পাঠকগণকে নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলো অধ্যয়নের আমন্ত্রণ জানিয়ে তা হতে নির্বাচিত কয়েকটি উক্তি নিম্নে পেশ করছি-
খতীবে বাগদাদী (রহ) ইমাম হাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আসাদ বিন আমরকে বলতে শুনেছেন যে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) সাধারণতঃ প্রতি রাতেই পরিপূর্ণ কুরআন শরীফ খতম করতেন। তাঁর কান্নার করুণ শব্দ শুনে প্রতিবেশীদেরও দয়া জাগতো।
বিশুদ্ধ সূত্রে সংরক্ষিত আছে যে, ইমাম আবু হানীফা (রহ) যে স্থানে ইন্তিকাল করেছেন সেখানেই তিনি ৭ হাজার বার কুরআন খতম করেছেন। ( সূত্র— তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৫৪)।
অপর সূত্রে লিখেন যে, তিনি (নিষিদ্ধ দিনগুলো ব্যতীত) ধারাবাহিক ৩০ বছর রোযা রেখেছেন। ( সূত্র— তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৫৬)।
ইমাম আবু জাফর শীযমারী (রহ.) বর্ণনা করেন, ইমাম শাক্বীক বালখী থেকে, তিনি বলেন- ﮐﺎﻥ ﺍﻻﻣﺎﻡ ﺍﺑﻮ ﺣﻨﻔﯿۃ ﻣﻦ ﺍﻭﺭﻉ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﻭﺍﻋﻠﻢ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﺍﻋﺒﺪ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻭﺍﮐﺮﻡ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﻭﺍﮐﺜﺮ ﮬﻢ ﺍﺣﺘﯿﺎﻃﺎ ﻓﯽ ﺍﻟﺪﯾﻦ۔
অর্থাৎ ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ছিলেন সর্বাপেক্ষা খোদাভীরু, সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞ আলিম, সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী, সর্বাপেক্ষা সম্মানী এবং দ্বীন- ধর্মের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা সতর্কতা অবলম্বনকারী।”
( সূত্র— আল- মিযানুল কুবরা, ১/৮৬)।
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বলেন “আমি কুফায় প্রবেশ করতঃ সেখানকার তদানীন্তন বিজ্ঞ উলামাগণকে জিজ্ঞেস করি,
তোমাদের এ শহরে সর্বাপেক্ষা বড় আলিম কে?
সবাই ঐক্যমতে উত্তর দেয়, ইমাম আবু হানীফা (রহ)।
অতঃপর জিজ্ঞেস করি , সর্বাপেক্ষা খোদাভীরু কে?
সবাই বলে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
আমি বলি , আধ্যাত্মিকতায় কে সর্বশ্রেষ্ঠ?
সবাই বলে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
আমি জিজ্ঞেস করি, কে সর্বাপেক্ষা পরহেজগার?
সবাই বলে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
আমি জিজ্ঞেস করি, কে সর্বাপেক্ষা ইবাদতকারী ও ধর্মীয় ইলম নিয়ে ব্যস্ত?
সবাই বলে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
মোটকথা, এমন কোন ভাল গুণ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করি নি , যে ব্যাপারে সবাই বলেনি যে, আমরা ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর থেকে শ্রেষ্ঠ কাউকে জানি না।
( সূত্র— আল-মিযানুল কুবরা, ১/৮৭ তারীখে বাগদাদ , ১৩/৩৫৮)।
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন-
ﻟﻮﮐﺎﻥ ﺍﻟﺪﯾﻦ ﻋﻨﺪ ﺍﻟﺜﺮﯾﺎ ﻟﺬﮬﺐ ﺑﮧ ﺭﺟﻞ ﻣﻦ ﻓﺎﺭﺱ
অর্থাৎ দ্বীন ও ধর্মের জ্ঞান আহরণ করা মানুষের পক্ষে যদি এতো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে যে, আকাশের দুর্গম প্রান্ত বা সুরাইয়্যা তারকায় যেয়ে বিলুপ্ত হয়, তবুও পারস্যের এক ব্যক্তি সেখান থেকে দ্বীন আহরণ করতে সক্ষম হবে।”
( সূত্র— বুখারী, পৃ.৬/৩৭০ হাদীন নং ৪৮৯৭, মুসলিম ৪/১৯৭২, হা. নং-২৫৪৬ )
রাসুলুল্লাহ (সা.) উপরোক্ত হাদীসে যে পারস্য ব্যক্তির অসাধারণ কৃতিত্বের সুসংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, বিশেষজ্ঞ উলামাদের মতে, বিশেষ করে ইমাম সুয়ূতী , ইমাম ইবনে হাজার মক্কী ও শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (রহ.) প্রমুখের গবেষণার আলোকে সে সুসংবাদপ্রাপ্ত পারস্য ব্যক্তি হলেন ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
কেননা পারস্য বা অনারবে ইমাম আবু হানীফাই ইতিহাসের একমাত্র প্রথিতযশা ও ক্ষণজন্মা ব্যক্তি যিনি ইলম-প্রজ্ঞা ও ইজতিহাদ-গবেষণায় এ চরম উৎকর্ষতা অর্জন করেছিলেন।
( সূত্র— তাবয়ীযুছ ছাহীফা, ২০-২১, আল- খাইরাতুল হিসান-২৯; উকুদুয যামান-৪৫)।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন- ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻋﯿﺎﻝ ﻋﻠﯽ ﺍﺑﯽ ﺣﻨﻔﯿۃ ﻓﯽ ﺍﻟﻔﻘﮧ “ফিক্বহের জগতে পরবর্তীকালের সমস্ত মানুষ ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর সন্তান- সন্ততি ও পারিবারিক সদস্য হিসেবে গণ্য”।
( সূত্র— তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৪৬)।
ইমাম বুখারীর অন্যতম উস্তাদ মাক্কী বিন ইবরাহীম (রহ.) বলেন- ﮐﺎﻥ ﺍﺑﻮ ﺣﻨﻔﯿۃ ﺃﻋﻠﻢ ﺍﮬﻞ ﺯﻣﺎﻧﮧ
“ইমাম আবু হানীফা সকল বিষয়ে যুগশ্রেষ্ঠ আলিম ছিলেন।”
( সূত্র— মাকনাতু ইমাম আবী হানীফা, ডঃ হারেসী-১৯২)।
হাদীস বিশারদদের সর্বজ্ঞ পর্যবেক্ষক ও সর্বশ্রেষ্ঠ নিরীক্ষক ইমাম ইবনে মঈন (রহ. মৃত ২৩৩হি.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) কি নির্ভরযোগ্য হাদীস বিশারদ?
উত্তরে তিনি বলেন- ﻧﻌﻢ، ﺛﻘۃ ﺛﻘۃ ”হ্যাঁ অন্যতম নির্ভরযোগ্য , অন্যতম নির্ভরযোগ্য।”
( সূত্র— তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৪৫)।
বুখারী-মুসলিমের শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী ইমাম শু’বা (রহ.) বলেন- ﮐﺎﻥ ﻭﺍﻟﻠﮧ ﺣﺴﻦ ﺍﻟﻔﮭﻢ ﺟﯿﺪ ﺍﻟﺤﻔﻆ
“আল্লাহর শপথ! আবু হানীফার অনুধাবন শক্তি অতি আকর্ষণীয় এবং স্মৃতি শক্তি খুবই প্রখর ছিল।”
( সূত্র— আল-খাইরাতুল হিসান-৩৪)।
ইমাম আব্দুল হাই লক্ষ্ণৌভী (রহ.) ইমাম আবু হানীফার উপর অর্পিত অভিযোগ খণ্ডন করতে গিয়ে লিখেন-
ﺍﯼ ﺷﻨﺎﻋۃ ﻓﻮﻕ ﮬﺬﺍ ‏(؟ (! ﻓﺎﻧﮧ ﺍﻣﺎﻡ ﺗﻘﯽ ﻧﻘﯽ ﺧﺎﺋﻒ ﻣﻦ ﺍﻟﻠﮧ، ﻭﻟﮧ ﮐﺮﺍﻣﺎﺕ ﺷﮭﯿﺮۃ ﻓﺎﯼ ﺷﺊ ﺗﻄﺮﻕ ﺍﻟﯿﮧ ﺍﻟﻀﻌﻒ؟
অর্থাৎ এর চেয়ে জঘন্যতম ন্যক্কারজনক ও মারাত্মক বিদ্বেষী অপকর্ম আর কী হতে পারে(!) আবু হানীফা মুত্তাক্বী ও খোদাভীরু ইমাম। তাঁর অসংখ্য কারামত সর্বত্র প্রসিদ্ধ আছে, তাহলে কোন কারণে তাঁকে দুর্বলতার অপবাদ দিতে সাহস করেছে?”
( সূত্র— আর রাফউ ওয়াত্তাকমীল-পৃ.৭০)
বলাবাহুল্য যে, বিদ্বেষীদের চক্রান্ত আর অবান্তর অভিযোগ থেকে নবী-রাসূল এবং সাহাবাগণও রেহাই পাননি।
Π সতর্কীকরণ :
সর্বজনগৃহীত বড়দের জন্য বড়দের আক্রমণাত্মক যে কোনো বক্তব্যই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। এতদ্ব্যতীত উসূলে হাদীসের অবধারিত নিয়ম হলো- যার ইমামাত ও ন্যায়পরায়ণতা সর্বত্র প্রসিদ্ধ হয়েছে ও ব্যাপকতা লাভ করেছে, তার ব্যাপারে কোনো অশুভ উক্তি গ্রহণ করা যাবে না।
কে জানি বলেছিল, আল্লামা ইবনুল হাব্বান (রহ) তিনি নাকি ইমামে আ’জম হযরত আবু হানিফা (রহ)-কে ”মুরজিয়্যাহ’ ফেরকার ইমাম বলিয়া তাঁর সমালোচনা করেছেন।
আমরা বলি, উনার উক্ত কথাটি এতটুকুর মধ্যেই শেষ হয়ে যায়নি। যদি উনার পূর্ণ বক্তব্যটি ও তার কারণ ভালভাবে খুঁজতে যাই তাহলে প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসবে। ফলে কথিত আহলে হাদিসদের উপরিউক্ত মতলবসিদ্ধ অপপ্রচার পুরোই গুড়েবালি হবে।
আমরা “বৃটিশ সৃষ্ট ফেরকা” কথিত আহলে হাদিস (লা-মাযহাবী দল) মতাবলম্বীদের এ সমস্ত অর্থহীন বাগাড়ম্বর প্রসূত বক্তব্যের জবাব বহু আগেই দিয়েছি। আজ এখানে অভিনব কিছু জবাব দেব, যাতে তাদের বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতার পরিবর্তন হয়।
বিজ্ঞপাঠক লক্ষ্যকরুন!
১-
ইমাম বুখারীর উস্তাদ ইমাম জুহালী (রহ) ইমাম বুখারীকে মু’তাযিলা, বাতিল ইত্যাদি বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং মুসলমানদের কবরস্থানে ইমাম বুখারীকে কবর দিতে নিষেধ করেছেন, তাঁকে পরিত্যাগযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন।
(সূত্র— সিয়ার আলামিন নুবালা, ১২/৪৫৬, তারীখে বাগদাদ , ২/১৩ তাবকাতুশ শাফেয়ীয়াতুল কুবরা, ২/২২৯)।
২-
ইমাম আবু হাতেম ও ইমাম আবু যুর’আ ইমাম বুখারী (রহ) থেকে হাদীস সংগ্রহ করা পরিত্যাগ করেছেন।
( সূত্র— আল জারহ-ওয়াত্তা’দীল, ৭/১৯১)।
৩-
ইমাম ইবনে খাল্লিকান ইমাম মুসলিম (রহ)-কে ‘জাহমিয়া’ বলেছেন।
( সূত্র— ওফায়া’তুল আয়ান , ২/৯১)
৪-
অনেকে আবার ইমাম নাসাঈ (রহ)-কে শীয়া বলেছেন।
(সূত্র— বোস্তানুল মুহাদ্দিসীন, পৃ.১১১)।
৫- ইমাম ইবনে হাজম ইমাম তিরমীযীকে বলেছেন (ﻣﺠﮭﻮﻝ) অজ্ঞাত পরিচিত।
( সূত্র— মিযানুল ই’তেদাল ৩/৬৭৮)।
৬-
ইমাম নাসাঈ তিনিও ইমাম আহমাদ ইবনে ছালেহ (রহ)-এর সমালোচনা করেছেন।
(সূত্র— ক্বাইদাতুন ফিল জারহে ওয়াত্তা’দীল, ২৪-২৮)।
৭-
এভাবে ইমাম মালেক (রহ)-কে ইবনে আবী জীব (রহ) এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ)-কে ইবনে মঈন (রহ) অনেক অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।
( সূত্র— ক্বাইদাতুন ফিল জারহে ওয়াত্তা’দীল, ২৪-২৮; যিকরু আসমায়ি মান তুকুল্লিমা-৪৯)।
কিন্তু মুসলিম উম্মাহ এ সমস্ত অতি উৎসাহীমূলক কথার প্রতি কখনো ভ্রুক্ষেপই করেনি। কারণ, এ সমস্ত অনর্থক কথা গ্রহণ করলে কি তাঁদের হাদীস গ্রহণ করা যেতো?

তেমনি ইমাম আবু হানীফার ব্যাপারেও আজে-বাজে অতি উৎসাহীমূলক কথা-বার্তা অনেকে বলেছেন, যা অনর্থক ও অগ্রহণযোগ্য ।
মুসলিম উম্মাহ এগুলোর প্রতি কোনো কর্ণপাত করেনি; বরং উসূলে হাদীসের অবধারিত নিয়ম হলো- যার ইমামাত ও ন্যায়পরায়ণতা সর্বত্র প্রসিদ্ধ হয়েছে ও ব্যাপকতা লাভ করেছে, তার ব্যাপারে কোনো অশুভ উক্তি গ্রহণ করা যাবে না।
(সূত্র—ক্বাইদাতুন ফিল জারহে ওয়াত্তা’দীল , পৃ. ২৩, দেরাসাতুন ফিল জারহে ওয়াত্তা’দীল, পৃ.৭৬)।
আশাকরি, এবার আপনারা বুঝতে পেরেছেন।
লেখক : http://ahlehaqmedia.com/3287
[মুফতি রফিকুল ইসলাম মাদানি (দা বা) রচিত ‘মাযহাব মানি কেন?’ পুস্তক অবলম্বনে।]