ইসলামি গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইসলামি গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৭

সিরিয়ায় ফ্রান্সের ঔপনিবেশিকতার সময়ের কাহিনী


সিরিয়ায় ফ্রান্সের ঔপনিবেশিকতার সময়ের কাহিনী। জনৈক ফরাসি কর্মকর্তা দামেশকে একটি ভোজের আয়োজন করল। দামেশকের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও শাইখদের দাওয়াত করল। 
.
আমন্ত্রিত শাইখদের মধ্যে ধবধবে সাদা দাড়ি ও সাদা পাগড়িধারী একজন শাইখ ছিলেন। ভোজের মধ্যখানে ফরাসি কর্মকর্তা লক্ষ্য করল যে, এই শাইখ চাকু ও চামচ ব্যবহার না করে হাত লাগিয়ে খাচ্ছেন। শাইখের এই ধরণের ভক্ষণ কর্মকর্তার ভাল লাগলোনা। সে মনে করল যে, এই শাইখ পুরো ভোজ্যানুষ্ঠানের সৌন্দর্যই নষ্ট করে দিচ্ছেন! কর্মকর্তা রেগে গেল। কিন্তু তা হজম করল। প্রকাশ করলনা। 
.
কিছুক্ষণ পর সে দোভাষীর মাধ্যমে শাইখকে জিজ্ঞেস করল
-শাইখ! আপনি আমাদের মতো খাচ্ছেননা কেন?
-আপন কি দেখছেন যে, আমি নাক দিয়ে খাচ্ছি?!
-না, মানে আমি জানতে চাচ্ছি আপন চাকু ও চামচ ব্যবহার করছেন না কেন?
- আমার হাত যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সে ব্যাপারে আমি শিউর। আপনি কি আপনার চাকু ও চামচ যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সে ব্যাপারে শিউর?
.
শাইখের এই জবাবটা শুনে কর্মকর্তার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠল। কিন্তু কিছুই বললনা, সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল। শাইখকে উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকল।
.
ফরাসি কর্মকর্তা ভোজ্যানুষ্ঠানের তার ডানে বামে স্ত্রী ও মেয়ে নিয়ে বসে ভক্ষণ করছিল। একটুপর সে মদের অর্ডার করল। যা উপস্থিত ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ ও দেশের সংস্কৃতির সম্পূর্ণ উল্টো ছিল। এতদসত্বেও সে এই ভরা মজলিসে মদের অর্ডার দিয়ে বসল। মদ পরিবেশন করা হলে সে তার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে তা এমনভাবে পান করতে শুরু করল, যাতে ঐ শাইখের গাত্রদাহ আরম্ভ হয়।
.
মদের পেয়ালায় চুমুকের একফাঁকে সে ঐ শাইখকে লক্ষ্য করে বলল
-শাইখ! একটু শুনুন। আপনি তো আঙুর পছন্দ করেন এবং তা খানও- তাইনা?
-হ্যাঁ, কিন্তু কেন?
এবার কর্মকর্তা যেন সুযোগটা পেল। সে তার পাশে রাখা আঙুরের কাঁদির দিকে ইংগিত করে বলল
-এ মদটাকে কিন্তু এই আঙুর থেকেই তৈরি করা হয়েছে। আপনি আঙুর খান ঠিকই, কন্তু মদটাকে পান করেননা কেন?
.
উপস্থিত সকলের নজর গিয়ে নিবদ্ধ হল ঐ শাইখের দিকে। সকলেই অপেক্ষা করতে লাগল যে, দেখি, এবার শাইখ কী জবাব দেন! কিন্তু শাইখ মোটেই বিচলিত হলেননা। তিনি কেবল ঈষৎ মুচকি হাসলেন। তারপর জবাব দিলেন
-এ আপনার স্ত্রী এবং ও আপনার মেয়ে- তাইতো? আপনার জন্য একে ভোগ করা হালাল কিন্তু ওকে ভোগ করা হালাল নয় কেন, অথচ এর জন্ম কিন্তু ও-র থেকেই হয়েছে?! 
.
এবার কর্মকর্তা একেবারেই থ হয়ে গেল! বেশ কিছুক্ষণ কোন টু শব্দ করতে পারলনা। শেষপর্যন্ত রাগে গজর গজর করতে করতে দস্তরখানা থেকে ততক্ষণাতই মদ উঠিয়ে নেয়ার আদেশ দিল! 
.
সুত্রঃ شوام ظرفاء, পৃষ্ঠা-৩৯, উস্তাদ আদিল আবু শানাব।

বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ন্যায় বিচার — খলিফা হারুন অর রশিদের গল্প

সিরিয়ার একটি শহরের নাম রাকা। সেখান থেকে খলিফা হারুনুর-রশিদের নিকট চিঠি আসলো। চিঠিতে লেখা ছিল: শহরের বিচারক এক মাস যাবত অসুস্থ,বিচার কাজ স্থবির হয়ে আছে । খলিফা যেন দ্রুত ব্যবস্থা করেন । খলিফা চিঠির জবাব পাঠালেন । আগামী সপ্তাহের মধ্যে নতুন বিচারক আসবেন । এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন বিচারক এসে যোগ দিলেন ।

বিচার কাজ শুরু হয়েছে । স্থানীয় প্রহরীরা একজন বৃদ্ধা মহিলাকে আসামী হিসেবে দরবারে হাজির করলেন । তার অপরাধ ছিল তিনি শহরের এক রেস্তারাঁ থেকে কিছু রুটি আর মধু চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পরেন ।
বিচারক: আপনি চুরি করেছেন?
– জ্বি ।
– আপনি কি জানেন চুরি করা কতো বড় অপরাধ ও পাপ ?
– জ্বি ।
– জেনেও কেন চুরি করলেন ?
– কারণ আমি গত এক সপ্তাহ যাবত অভুক্ত ছিলাম । আমার সাথে এতিম দু’নাতিও না খেয়ে ছিল । ওদের ক্ষুদারত চেহারা ও কান্না সহ্য করতে পারিনি তাই চুরি করেছি। আমার আর এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না হুজুর ।
বিচারক এবার পুরো দরবারে চোখবুলালেন। বললেন কাল যেন নগর, খাদ্য,শরিয়া, পুলিশ প্রধান ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যাক্তিগন সবাই উপস্থিত থাকেন ।তখন এর রায় দেওয়া হবে ।
পরদিন সকালে সবাই হাজির হলেন । বিচারক ও যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে রায় ঘোষণা করলেন-“ বৃদ্ধা মহিলার চুরির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ৫০টি চাবুক, ৫০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা আর অনাদায়ে এক বছর কারাদণ্ড দেওয়া করা হলো। তবে অকপটে সত্য বলার কারণে হাত কাটা মাফ করা হলো। বিচারক প্রহরীকে চাবুক আনার নির্দেশ দিয়ে নিচে নেমে ঐ বৃদ্ধা মহিলার পাশাপাশি দাঁড়ালেন ।
বিচারক বললেন যে নগরে একজন ক্ষুধার্তবৃদ্ধ মহিলা না খেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় চুরি করতে বাধ্য হয় সেখানে তো সবচেয়ে বড় অপরাধী সে দেশের খলিফা। আর আমি এসেছি খলিফার প্রতিনিধি হয়ে । আমি যেহেতু তাঁর অধীনে চাকরি করি তাই ৫০টি চাবুকের ২০টি আমার হাতে মারা হউক । আর এটাই হলো বিচারকের আদেশ । আদেশ যেন পালন করা হয় এবং বিচারক হিসাবে আমার উপর চাবুক মারতে যেন কোনো রকম করুণা বা দয়া দেখানো না হয়।
বিচারক হাত বাড়িয়ে দিলেন । দুই হাতে পর পর ২০টি চাবুক মারা হলো। চাবুকের আঘাতের ফলে হাত থেকে রক্ত গড়িয়ে পরছে । ঐ অবস্থায় বিচারক পকেট থেকে একটি রুমাল বের করলেন । কেউ একজন বিচারকের হাত বাঁধার জন্য এগিয়ে গেলে বিচারক নিষেধ করেন। এরপর বিচারক বললেন “ যে শহরে নগর প্রধান, খাদ্য গুদাম প্রধান ও অন্যান্য সমাজ হিতৈষীরা একজন অভাব গ্রস্হ মহিলার ভরন-পোষণ করতে পারেন না। সেই নগরে তারা ও অপরাধী। তাই বাকি ৩০টি চাবুক সমান ভাবে তাদেরকে মারা হোক ।“
এরপর বিচারক নিজ পকেট থেকে বের করা রুমালের উপর ৫০টি রৌপ্য মুদ্রা রাখলেন । তারপর বিচারপতি উপস্থিত সবাইকে বললেন “যে সমাজ একজন বৃদ্ধমহিলাকে চোর বানায়, যে সমাজে এতিম শিশুরা উপবাস থাকে সে সমাজের সবাই অপরাধী । তাই উপস্থিত সবাইকে ১০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানা করা হলো।“
এবার মোট ৫০০দিনার রৌপ্য মুদ্রাথেকে ১০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানাবাবদ রেখে বাকি ৪০০টি রৌপ্য মুদ্রা থেকে ২০টি চুরি যাওয়া দোকানের মালিককে দেওয়া হলো। বাকি ৩৮০টি রৌপ্য মুদ্রা বৃদ্ধা মহিলাকে দিয়ে বললেন “ এগুলো আপনার ভরণপোষণের জন্য । আর আগামী মাসে আপনি খলিফা হারুনুর রশিদের দরবারে আসবেন । খলিফা হারুনুর রশিদ আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী । “
একমাস পরে বৃদ্ধা খলীফার দরবারে গিয়ে দেখেন ; খলীফার আসনে বসা লোকটিকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে । মহিলা ভয়ে ভয়ে খলীফার আসনের দিকে এগিয়ে যান। কাছে গিয়েবুঝতে পারেন লোকটি সেদিনের সেই বিচারক। খলীফা চেয়ার থেকে নেমেএসে বললেন —আপনাকে ও আপনার এতিম দু’নাতিকে উপোস রাখার জন্য সেদিন বিচারক হিসেবে ক্ষমা চেয়েছিলাম । আজ দরবারে ডেকে এনেছি প্রজা অধিকারসমুন্নত করতে না পারা অধম এই খলীফাকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য ।আপনি দয়াকরে আমাকে ক্ষমা করুন ।

এক নর্তকীর ইসলাম গ্রহনের চমকপ্রদ ঘটনা!

২০১১— বাংলাদেশ থেকে একটি তাবলীগ জামাত কানাডায় গিয়েছিল। ওখানকার এক কর্নেলের নাম আমীরুদ্দীন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকটি এখন কানাডার নাগরিক। ডানভিরে একটি ক্লাব আছে মুসলমানদের সেখানে নাচ-গান হয়।
জামাত সেখানে গাশ-তে গেল ক্লাবের অশ্লীল পরিবেশ বিধায় বেছে-বেছে বৃদ্ধদের পাঠানো হলো। মঞ্চে এক বিবসনা যুবতী নাচছিল। এক যুবক তার ড্রামা বাজাচ্ছিল।
-দর্শক কারা?
- সকলেই মুসলমান।

মুতাকাল্লিম আমাদের সাথী আমাদের কর্নেল আমীরুদ্দীন। প্রভাবশালী চেহারা। মুখজুড়ে সাদা ঘন দাড়ি। ক্লাবে প্রবেশ করেই তিনি সজোরে একটা হাঁক দিলেন।
- নর্তকী মেয়েটির কন্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার নৃত্যও বন্ধ হয়ে গেল, কিছু লোক মদ্যপান করছিল। তারা হঠাৎ কেঁপে ওঠল। কি ব্যাপার/একসাথে একাধিক কন্ঠ ভেসে ওঠল।
আমার কথা শোনো! কর্নেল আমীরুদ্দীন তাদেরকে দাওয়াত দিলেন। তিনি উপস্হিত সকলকে উদ্দেশ্য করে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন।
কিছুক্ষন মনোযোগ সহকারে তার বক্তব্য শুনে নর্তকী মেয়েটি মঞ্চ থেকে নেমে এল। আশপাশ থেকে একটি কাপর সংগ্রহ করে নিজেকে ঢেকে নিল। ক্লাবের অধিকংশ দর্শক মদে মাতাল অচেতন অবস্হায় পড়ে আছে।
কর্নেল আমীরুদ্দীন বললেন- মেয়েটি তাদের অগোচরে আস্তে-আস্তে আমার পিছনে এসে দাড়িয়ে গেল বলল, আপনি যা কিছু বলেছেন, আমি বুঝে ফেলেছি” কিন্তু ওরা বোঝেনি। এখন বলুন, 
- আমি কি করব?
আপনি যে জিন্দেগির কথা বলেছেন, আমি সেই জিন্দেগি কামনা করি।

মুতাকাল্লিম বললেন- আমারা মানুষকে কালেমার দাওয়াত দিয়ে থাকি। তুমি জন্মগতভাবে মুসলমান, কিন্তু ইসলামের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই। 
- এই যে পেশাটা তুমি অবলম্বন করেছ, এ-পেশা অবলম্বন করলে মানুষের ঈমান থাকে না। তুমি কালেমা পড়ে পুনরায় মুসলমান হয়ে যাও।

-মেয়েটি বলল, আমি কালেমা জানি না, আপনি পড়িয়ে দিন। মুতাকাল্লিম তাকে কালেমা পড়ালেন। নিজে কলেমা পাঠ করে মেয়েটি বলল, আমার সাথে যে ছেলেটি ড্রামা বাজাচ্ছিল, ও আমার স্বামী!আপনি ওকেও কালেমা পড়িয়ে দিন। তারা দুজনে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল। আমাদের মুতাকাল্লিম কর্নেল ভাই তাদের ইলম শিখাতে থাকলেন।
তিন দিন পর উক্ত অঞ্চল ত্যাগ করে চলে আসবার সময় তারা আমাদেরকে একটি ফোন নম্বর দিয়ে বলল, খোজখবর নেবেন। আমরা তাদেরকে ডানভিরের একটি ইসলামিক সেন্টারের ঠিকানা দিয়ে বললাম, প্রয়োজন হলে এখানে যোগাযোগ করো।
- দুমাস পর মেয়েটির ফোন এল। আস্ সালামু আলাইকুম,টরেন্টাে থেকে বলছি, আমাকে চিনতে পেরেছেন?
আমি সেই নর্তকী, যার সাথে ডানভিরে কথা হয়েছিল এবং আমরা স্বামী-স্ত্রী আপনাদের হাতে মুসলমান হয়েছিলাম।

- অামি সালম এর উওর দিয়ে বললাম, হ্যা, চিনতে পেরেছি। 
-তা তোমরা কেমন আছ?
- বলল” আমরা একটি সমস্যায় পরেছি-অনেক বড় সমস্যা। 
- বলো কি সমস্যা?
- আমি যখন নাচতাম তখন একরাত পাঁচশত ডলার উপার্জন হতো। ইসলাম গ্রহন করার পর সেই পেশা ছেড়ে দিয়ে স্বামীকে বললাম, ইসলামের বিধান মোতাবেক তুমি উপার্জন করো আর আমি ঘর সামলাই। কিন্তু তারও তো পেশা ছিল নাচগান করা। এখন এসব ছেড়ে সে ও বেকার। হালাল কোন কাজ পাচ্ছে না। অবশেষে নিরুপায় হয়ে সে একটি সরাইখানায় শ্রমিকের কাজ নিয়েছে। রোজ পায় চল্লিশ ডলার।

আগে ছিল রোজ পাঁচশত ডলার আর এখন চল্লিশ ডলার। সংসারে চরম অভাব ও সংকট দেখা দিয়েছে। বাড়িটা বিক্রি করে ফেলেছি। গাড়িগুলো বিক্রি করে দিয়েছি। এখন দুই রুমের একটি বাড়া বাসায় থাকি।
কিন্তু এর জন্য আমাদের কোন আক্ষেপ নেই। আমরা দীনের সন্ধান পেয়েছি, অন্ধকার জীবন থেকে আলোর জীবনে ফিরে এসেছি, এ আমাদের জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া। এই সম্পদের কাছে দুনিয়ার সব সম্পদই তুচ্ছ।
-আমি বললাম আল্লাহ তোমাদের কবুল করেছেন। আখেরাতে শান্তি পেতে দুনিয়ার জীবনে কিছু কষ্ট ভোগ করতেই হয়। দ্বীনের উপর অটল থাকা মুমিনের সব চেয়ে বড় কাজ। আল্লাহ্ সুবহানা ওয়াতা’আলা তোমাদের আরও হিম্মত দান করুন! আমীন।

বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০১৬

মধু চিকিৎসা!


    অসুস্থ হলে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা সুন্নত। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সুন্নত। বিপদ এলে আল্লাহর আশ্রয় নেয়া, দু‘আ করাও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অন্তুর্ভুক্ত। নবীজি বলেছেন:
    لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءُ الدَّاءِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ...
    সব রোগেরই ওষুধ আছে। যখন রোগের ওষুধ গ্রহণ করা হবে, আল্লাহর অনুগ্রহে বান্দা আরোগ্য লাভ করবে (মুসলিম)। 
    -
    হাদীশ শরীফে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার কথা আলোচিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে মধুর চিকিৎসা। বিশেষ করে উদর-সম্পর্কিত রোগের ক্ষেত্রে। 
    একলোক এসে নবীজি সা.-এর কাছে এসে বললো:
    -আমার ভাইয়ের পেটে অসুখ!
    -তাকে মধু পান করাও!
    -
    লোকটা আবার এসে বললো:
    -আমার ভাইয়ের পেটের অসুখ!
    -তাকে মধু পান করাও!
    এভাবে তৃতীয়বার এলো। একই সমস্যার কথা বললো। নবীজিও একই উত্তর দিলেন। লোকটা বললো: পান করিয়েছি। তখন নবীজি বললেন:
    صَدَقَ اللهُ، وَكَذَبَ بَطْنُ أَخِيكَ، اسْقِهِ عَسَلاً
    আল্লাহ সত্য বলেছেন, তোমার ভাইয়ের উদর মিথ্যা বলেছে! তাকে মধু পান করাও (বুখারী)!
    তাকে আবার পান করানো হলো। লোকটার ভাই নিরাময় লাভ করলো। 
    -
    অসুস্থ লোকটা প্রথম প্রথম মধুকে অতটা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেনি। পরিপূর্ণ আস্থা নিয়েও পান করেনি, তাই কাঙ্খিত ফলোদয় হয় নি। পরে নবীজির দৃঢ় বক্তব্যের কারণে তার মধ্যে আস্থা তৈরী হয়েছে। শতভাগ নির্ভরতা নিয়েই মধু পান করেছে, সাথে সাথে আল্লাহর ইচ্ছায় শেফা লাভ করেছে। 
    -
    শুধু হাদীসে নয়, কুরআন কারীমেও মধুর কথা গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে:
    يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ
    মৌমাছির উদর থেকে পানীয় (মধু) নির্গত হয়, বিভিন্ন রঙের। তাতে মানুষের জন্যে রয়েছে শিফা (নাহল: ৬৯)। 
    -
    আমরা নিয়মিত মধু পান করতে পারি। অসুখ হলে প্রথমেই সুন্নাতের নিয়তে, নিরাময় লাভের আশায় মধু পান করতে পারি। পাশাপাশি না হয় ডাক্তারি চিকিৎসাও চলতে থাকলো। শেফাও হবে আবার সুন্নাত পালনের কারনে সওয়াবও হবে। 
    -
    হাতের কাছে মধুর একটা শিশি রাখতে পারি। ঘরের তাকে যত্নের সাথে মধুর একটা শিশি পুষতে পারি। সুন্নত পালনের নিয়তেই! সওয়াব হবে। সওয়াবের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন, ২০১৬

নাচঘরে মসজিদের ইমাম

একজন বুড়ো আলেম ছিলেন। এক মহল্লার মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করতেন। নামায ও কুরআন তালীমের পিছনেই জীবনের সময় ব্যয় করেছিলেন তিনি। একদিন তিনি অনুভব করলেন, দিনদিন নামাযীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বিষয়টি তাঁকে পেরেশান করছিল। মুসল্লীদেরকে তিনি নিজের সন্তানের মত ভালোবাসতেন। একদিন নামায শেষে মুসল্লীদের দিকে ফিরে বললেন, ব্যাপার কী, মানুষ নামাযে আসে না যে? বিশেষত মসজিদে যুবকদের দেখাই পাওয়া যাচ্ছে না।
মুসল্লীরা বললেন, লোকজন রং-তামাশা ও উম্মাদনায় ব্যস্ত। নাচঘরে গিয়ে সবাই নাচ দেখছে। ইমাম সাহেব বললেন, নাচঘর! তা আবার কী জিনিস?
এক যুবক মুসল্লী বললেন, অনেক বড় একটি কামরা। তার একপাশে কাঠের তৈরী লম্বা-চওড়া মঞ্চ। তাতে তরুণীরা খুব সংক্ষিপ্ত কাপড়চোপড় পরে কুদাকুদি করে; বেসামাল হয়ে নাচে। লোকজন তাদের সামনে বসে তৃষ্ণকাতর দৃষ্টিতে সেই নাচ দেখে, তালি বাজায় এবং নর্তকীদের ভূয়ষী প্রশংসা করে।
বুযুর্গ ইমাম বললেন, নাউযু বিল্লাহ! আচ্ছা, এই নর্তকীদের নাচ যারা দেখে, তারা কি মুসলমান?
বৃদ্ধ ইমাম অত্যন্ত মনোক্ষুণ্ন হয়ে বললেন, ‘লা হাওলা, ওয়া লা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’। এ তো মারাত্মক ঘৃণ্য পরিস্থিতি। আমাদের কর্তব্য এসব লোককে হেকমতের সাথে নসীহত করা এবং সিরাতে ‍মুস্তাকীমে তোলার জন্য চেষ্টা করা।
ইমামের কথা শুনে মুসল্লীরা হয়রান হয়ে গেলেন। তারা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি নাচঘরে গিয়ে লোকজনকে নসীহত করবেন?
বৃদ্ধ ইমাম ‘হাঁ, করব’ বলে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, আপনারা চলুন আমার সাথে। আমরা নচঘরে যাব।
মুসল্লীরা তাঁকে এই সিদ্ধান্ত থেকে ফেরানোর জন্য অনেক চেষ্টা করলেন। তারা বললেন, জনাব! আপনি নাচঘরে যাবেন না। ওটা হচ্ছে পাপের কারখানা। ওখানে যারা থাকে, তারা মানুষ নয়; হিংস্র প্রাণী; শয়তানের চেলা। বদতমীযরা আপনাকে নিয়ে হাসি-মজাক করবে; ঠাট্টা-বিদ্রূপ করবে। আপনাকে বিভিন্ন প্রকারে কষ্ট দিবে। নানা ধরণের মন্তব্য করবে। গালাগালির তীর নিক্ষেপ করবে। আপনি ওদের হাসির পাত্রে পরিণত হবেন।
বুড়ো ইমাম ভারী গলায় বললেন, প্রিয় মুসল্লী ভাইয়েরা! চিন্তা করে বলুন তো, আমরা কি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। তিনি কি হকের দাওয়াত দিতে গিয়ে পরীক্ষায় পড়েননি? তাঁকে নিয়ে মজাক করা হয়নি? তাঁকে কি যাদুগর ও পাগল বলা হয়নি? কী বলেন, তাঁর রাস্তায় কি কাঁটা বিছানো হয়নি? জুলুম-অত্যাচারের এমন কোন পদ্ধতি আছে, যা মানবকুলের এই সর্বশ্রেষ্ঠ সত্তার উপর প্রয়োগ করা হয়নি? এরপর আমি আপনি কি?
ইমাম সাহেব এক মুসল্লীর হাত ধরে বললেন, নাচঘরে কোন দিকে, আমাকে দেখিয়ে দিন। একথা বলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে রওয়ানা হলেন। দুই-একজন মুসল্লী তাঁর সঙ্গী হলেন।
নাচঘরের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছলেন তাঁরা। নাচঘরের মালিক দূর থেকেই তাদেরকে দেখে ফেলল। সে ভাবছিল, হয়তো ইমাম সাহেব কোন ওয়াজ-মাহফিলে যাবেন। কিন্তু ইমাম সাহেব সঙ্গীদের নিয়ে সোজা তার কাছে এসে উপস্থিত হলেন।
নাচঘরের মালিক তাজ্জব হয়ে গেল। বলল, আপনারা কী চান, বলুন তো!
ইমাম সাহেব বললেন, ‘নাচঘরে উপস্থিত লোকদেরকে ওয়াজ করতে চাই।’ একথা শুনে হলমালিকের বিস্ময়ের সীমা থাকল না। ইমামের আবেদন রক্ষার অপারগতা প্রকাশ করল সে। বৃদ্ধ ইমাম খুব নরম ভাষায় তার সাথে কথা বললেন। আখেরাতে বড় প্রতিদান লাভের সুসংবাদ দিলেন। কিন্তু সে পরিষ্কার ভাষায় অস্বীকার করল। তখন ইমাম সাহেব বললেন, বুঝতে পেরেছি, আপনার ব্যবসায় বিঘ্ন সৃষ্টি হবে বলে, আপনি রাজি হচ্ছেন না। আচ্ছা, আমরা আপনাকে একদিনের পুরো অর্থ পরিশোধ করে দিচ্ছি।
এরপর ইমাম সাহেব একদিনের আয় হিসেব করে হলমালিককে দিয়ে দিলেন। তখন মালিক বলল, আচ্ছা, আগামী কাল প্রদর্শনী শুরু হলে আসবেন।
পরের দিন যথাসময়ে প্রদর্শনী শুরু হল। লোকজন পূর্ণ মনোযোগের সাথে নাচ দেখায় মত্ত। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে শয়তানের আওয়াজ ভেসে আসছিল। সমস্ত দর্শকের দিল ছিল তখন শয়তানের হাতে। লোকজন তালি বাজাচ্ছিল। এমন সময় একবার পর্দা পড়ে গেল। আবার যখন পর্দা উঠল, তখন দর্শকরা সব হতভম্ব। বৃদ্ধ ইমাম গাম্ভীর্যের সাথে একটি চেয়ারে উপবিষ্ট। তিনি বিসমিল্লাহ পড়লেন। আল্লাহ তাআলার হামদ-সানা বয়ান করলেন।
এরপর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় সত্তার উদ্দেশ্যে দরুদ পড়ে ওয়াজ শুরু করলেন। দর্শকরা সব হাক্কাবাক্কা হয়ে গেল। একজন আরেক জনের দিকে দেখতে লাগল তারা। কেউ কেউ হাসিমজাক শুরু করে দিল। কিন্তু বৃদ্ধ ইমাম সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। ওয়াজের ধারা অব্যাহত রাখলেন তিনি। অবশেষে দর্শকদের মধ্য থেকে একজন দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বললেন, প্রিয় দর্শকমণ্ডলি! একটু নীরব হোন। দেখুন, ইমাম সাহেব কী বলতে চান।
তার এই কথায় পুরো হলে নীরবতা ছেয়ে গেল। দর্শকদের অন্তরে সকীনা নাযিল হতে থাকল। থেমে গেল হাসিমজাকের আওয়াজ। চারদিক ভেসে আসতে লাগল ইমাম সাহেবের আওয়াজ। তিনি খোদাভীতির এমনসব আয়াত তেলাওয়াত করতে লাগলেন, যেগুলো পাহাড়ে কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। এরপর তিনি মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণকামী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু হাদীস উল্লেখ করলেন। ঈমান ও আমালে সালেহ’র বরকত ও প্রতিদান তুলে ধরলেন। নেককারদের উচ্চ মর্যাদার বিবরণ দিলেন। আল্লাহর না-ফরমান, শয়তান ও বদকারদের ভয়ানক পরিণতির চিত্র আঁকলেন।
শিক্ষাপ্রদ অনেক কাহিনী উল্লেখ করে তিনি বললেন, আমার ভাইয়েরা! তোমরা অনেক দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেছ। মেহেরবান মাওলার অনেক না-ফরমানী করেছ। খাব ও গাফলতে বহু সময় চলে গেছে। এখন একটু ভাবো। নিজের অবস্থার উপর চিন্তা করো। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে একটু বলো, আল্লাহর না-ফরমানী করে তোমরা কী পেয়েছ? তোমাদের গুনাহ তোমাদের আমলনামায় লেখা হয়েছে। এখন তোমাদের গুনাহের মজা কোথায়? নিঃসন্দেহে মজা শেষ হয়ে গেছে; অথচ তোমাদের অপকর্মের ফল রয়ে গেছে। অতিসত্বর তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে। সেই সময় খুবই কাছে, যখন সবকিছু ফানা হয়ে যাবে। সূর্যের আলো থাকবে না। চাঁদ-তারা উদয়-অস্তের কাহিনী থামিয়ে দিবে। বাদল হারিয়ে যাবে। ছেয়ে যাবে অন্ধকার। শুরু হবে ঘুর্ণিঝড়। জমীন কাঁপতে কাঁপতে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। পাহাড়-পর্বত তুলার আঁশের মত উড়তে থাকবে। দরিয়ার মৌজ, শয়তানের ফৌজ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। স্রোতের পানি রাস্তা ভুলে যাবে। রুক্ষ হয়ে যাবে বসন্ত। ফুল আর ফুটবে না। চারদিকে শুরু হবে মৃত্যুর নাচন। জীবনের একটি শ্বাসও অবশিষ্ট থাকবে না। শুরু ওয়াহেদ ও কাহ্‌হার আল্লাহ থাকবেন। নিজের হাতটা একটু বুকের উপর রাখো। কখনও নিজের অন্তরের দিকে উঁকি দিয়ে দেখেছ? নিজের আমলের খবর নিয়েছ। তোমাদের কি মনে আছে, অতিসত্বর তোমরা কোথায় যাবে? তোমরা দুনিয়ার আগুন বরদাশত করতে পার না। অথচ জাহান্নামের আগুন এর চেয়েও সত্তর গুণ অধিক শক্তিশালী। জাহান্নামের অগ্নিশিখাকে ভয় করো। সময় নষ্ট করো না। ওঠো! তওবা করো। অনুতাপের অশ্রু প্রবাহিত করো। রুষ্ঠ রবকে সন্তুষ্ট করো। আহ! তোমরা প্রভুর সামনে কোন মুখ নিয়ে উঠবে। কখনও কি চিন্তা করেছ, আল্লাহ তাআলার কত এহসান রয়েছে তোমাদের উপর?
তাঁর রহমত কি তোমাদের উপর হারদম নাযিল হয় না এবং তোমাদের গুনাহের বোঝা কি তাঁর কাছে উপস্থিত হয় না? তিনি তোমাদেরকে হাজারও নেয়ামত দিতে থাকেন, আর তোমরা প্রতি মুহূর্তে তাঁর না-ফরমানীতে ডুবে থাক। নিজের সীমালঙ্ঘন দেখো, তাঁর অনুকম্পাও দেখো! বৃদ্ধ ইমাম দিলের গভীর থেকে কথা বলছিলেন। তাঁর ওয়াজ হৃদয়ে ঝঙ্কার সৃষ্টি করছিল। প্রতিটি বাক্য তীর হয়ে দর্শকের বুকে গাঁথছিল। তাদের দিলের কায়া বদলে গেল। জীবনের মূল হাকীকত সূর্যের মত স্পষ্ট হয়ে গেল। লোকজন কাঁদতে লাগল। অনেকের হেচকি শুরু হল।
ইমাম সাহেব তাদেরকে তাসাল্লী দিলেন। বললেন, বন্ধুরা! দিলের ভিতরে পরিবর্তন সৃষ্টি করো। তওবা করো। গুনাহ থেকে পলায়ন করো। মৌসুম যেমন বদলায়, ঠিক সেভাবে বদলে যাও। আমাদের রব মহানুভব, উদার ও অত্যন্ত দয়ালু। বন্ধুরা! রব্বে করীমের উপর ভরসা করো। দেখতে পাবে, করুণাময় স্রষ্টা খুব দ্রুত তোমার উপর সন্তুষ্ট হবেন এবং তোমার মাথায় ইযযত ও অনুগ্রহের তাজ বসিয়ে দিবেন।
সবশেষে ইমাম সাহেব দোআ করলেন, হে রব্বে যুল-জালাল! আমরা তোমার আলীশান দরবারের ভিক্ষুক। যে তোমার উঠানে আসে, সে নিরাশ ফিরে যায় না। আমরা ভিক্ষার হাত তোমার সামনে প্রসারিত করেছি। তুমি অসীম দয়ালু। তোমার অনুগ্রহের ভাণ্ডার অফুরন্ত। মাফ করে দেওয়া তোমার মহান বৈশিষ্ট্য। তওবাকারী ও ক্ষমাপ্রার্থীদেরকে তুমি খুব পছন্দ কর। আমরা গুনাহগার বান্দা তোমার কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাইছি। আমাদের গুনাহ মাফ করে দাও। আমাদেরকে বদ কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দাও। আমাদেরকে নেকীর জীবন দান করো।
ইমাম সাহেব যখন এভাবে দোআ করছিলেন, তখন পাপ-পঙ্কিলতার আখড়া নাচঘরে ‘আমীন’ ‘আমীন’ ‘আমীন’ পবিত্র ধ্বনীতে গুঞ্জরিত হচ্ছিল। ইমাম সাহেব অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। নাচঘর থেকে বের হয়ে চলে গেলে মসজিদের দিকে। তাঁর পিছনে পিছনে বের হলো নাচঘরের সমস্ত দর্শক। সবাই এই মহান ইমামের হাতে তওবা করল। তারা বুঝতে পারল, জীবনের গুরুত্ব। আরও বুঝতে পারল, এই নাচগান, রং-তামাশা কোন কাজে আসবে না, যখন হাতে হাতে আমলনামা দেওয়া হবে এবং পাপগুলো বিশাল আকার ধারণ করবে।
দর্শকদের সাথে তওবা করল নাচঘরের মালিকও। তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হল 

সুবহা'নাল্লাহ্! প্রকৃত লাভজনক ব্যবসা তো একেই বলে!

মদীনার বাগানগুলোর মধ্যে এক ইয়াতীম ছেলের একটি বাগান ছিল। তার বাগানের সাথে লাগোয়া বাগানের মালিক ছিলেন আবু লুবাবা নামের এক লোক। সেই ইয়াতীম ছেলেটি নিজের বাগান বরাবর একটি প্রাচীর দিতে গিয়ে দেখল, প্রতিবেশীর একটি খেজুর গাছ সীমানার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। ছেলেটি তার প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে সমস্যার কথা বলে সীমানার খেজুর গাছটি কিনতে চাইলো যাতে প্রাচীরটি সোজা হয়। কিন্তু প্রতিবেশী আবু লুবাবা কোনভাবেই রাজী হচ্ছিল না।
কোন উপায় না পেয়ে সেই ইয়াতীম রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা বুঝিয়ে বললো। আল্লাহর রাসুল ﷺ ডেকে পাঠালেন আবু লুবাবাকে। সে মসজিদে নববীতে আসলে নবী করীম ﷺ সেই খেজুর গাছটি অর্থের বিনিময়ে হলেও ইয়াতীম ছেলেটিকে দিয়ে দিতে অনুরোধ করলেন।
আবু লুবাবা যথারীতি রাজী হলো না। রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এক পর্যায়ে তাকে বললেন, "তোমার ভাইকে ওই খেজুর গাছটি দিয়ে দাও। আমি তোমার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছের জিম্মাদার হব।"

বিস্ময়কর হলেও আবু লুবাবা তারপরেও সেই খেজুর গাছ দিতে রাজী হলো না। রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এই পর্যায়ে চুপ হয়ে গেলেন। এর চেয়ে বেশী তিনি ﷺ তাকে আর কী বলতে পারেন!
উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে সাবিত (রাঃ)ও ছিলেন। তিনি আবু দাহদাহ নামে পরিচিত ছিলেন। মদীনায় তাঁর খুব সুন্দর একটি বাগান ছিল। প্রায় ৬০০ খেজুর গাছ ছাড়াও একটি মনোরম বাড়ি ও একটি পানির কুয়া ছিল সেখানে। মদীনার সব বড় ব্যবসায়ীদের কাছে আবু দাহদাহ (রাঃ) এর বাগানটি সুপরিচিত ছিল। তিনি স্বপরিবারে সেখানে বসবাসও করতেন।
আবু দাহদাহ (রাঃ) হঠাৎ রাসুলুল্লাহ্ ﷺ -এর কাছে গিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ্'র রাসুল ﷺ ! আমি যদি আবু লুবাবার কাছ থেকে ঐ খেজুর গাছটি কিনে এই ইয়াতীমকে দিয়ে দেই, তাহলে আমিও কি জান্নাতে একটি খেজুর গাছের মালিক হবো?' রাসুলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, "হ্যাঁ, তোমার জন্যও জান্নাতে খেজুর গাছ থাকবে।" আবু দাহদাহ (রাঃ) সাথে সাথে আবু লুবাবাকে বললেন, 'আপনি আমার সেই সম্পূর্ণ বাগানটি গ্রহণ করে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দিন।'

আবু লুবাবা 'দুনিয়াবী' এই বিনিময় বিশ্বাস করতে পারছিল না! হুঁশ ফিরলেই সে বলল, 'হ্যাঁ আমি আপনার খেজুর গাছের বাগানটি গ্রহণ করলাম। বিনিময়ে আমার সেই খেজুর গাছটি আপনাকে দিয়ে দিলাম।'
হযরত আবু দাহদাহ (রাঃ) সেই মূহুর্তেই খেজুর গাছটি ইয়াতীম ছেলেটিকে উপহার হিসাবে দিয়ে দিলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে রাসুলুল্লাহ্ ﷺ ! এখন আমি কি জান্নাতে একটি খেজুর গাছের মালিক হলাম'? রাসুলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, "আবু দাহদাহ'র জন্য জান্নাতে এখন কত বিশাল বিশাল খেজুরের বাগান অপেক্ষা করছে।"

বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, এ কথাটি রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এক, দুই বা তিনবার বলেননি; বরং খুশী হয়ে বারবার বলেছেন।
শেষে আবু দাহদাহ (রাঃ) সেখান থেকে বের হয়ে সদ্য বিক্রি করে দেয়া সেই বাগানে ফিরে গেলেন। বাড়ির দরজায় এসে স্ত্রীকে ডাক দিলেন তিনি, 'হে উম্মে দাহদাহ! বাচ্চাদেরকে নিয়ে এ বাগান থেকে বের হয়ে আসো। আমি দুনিয়ার এই বাগান বিক্রি করে দিয়েছি'। তাঁর স্ত্রী বললেন, 'আপনি কার কাছে এটি বিক্রি করেছেন? কে কত দাম দিয়ে এটি কিনে নিয়েছে?'
আবু দাহদাহ (রাঃ) বললেন, 'আমি জান্নাতে একটি খেজুর বাগানের বিনিময়ে তা বিক্রি করে দিয়েছি'। তাঁর স্ত্রী বললেন, 'আল্লাহু আকবার! হে আবু দাহদাহ! আপনি অবশ্যই অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা করেছেন'।

[মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২৫০৪; ইবনে হীব্বান, হাদীস ৭১৫৯; আস-সিলসিলা সাহীহাহ, হাদীস ২৯৬৪; মুস্তাদরাকে হাকীম, হাদীস ২১৯৪]
-Minhajul I. Mahim 

জীবনের সফলতা কি ?


জীবনের সফলতার অর্থ যদি টাকা-পয়সা উপার্জন করা হয় তাহলে শহীদকে যে ধন-সম্পদ দেয়া হবে তার তুলনায় দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ মাছির পাখার সমানও নয়।।
.
যদি সফলতা উন্নতমানের খাবার-দাবারের নাম হয়ে থাকে তবে শহীদদের মেহমানদারী মাছ দিয়ে করা হবে।।
.
যদি সফলতা সুন্দর সুন্দর ঘর-বাড়ি বানানো হয়ে থাকে,তবে শহীদকে এমন ঘর দেওয়া হবে যেটার ব্যাপারে রাসূল [সাঃ] বলেছেন;
"শহীদদের জন্য এমন ঘর রয়েছে যার প্রশস্ততা ইয়ামানের শহর সানা থেকে শামের সহর জাবিইয়াহ পর্যন্ত।।যেটা বানানো হয়েছে বাহিরে হীরা ও ইয়াকুত দিয়ে এবং ভিতরে মিসক ও কাফুর দিয়ে।।"
.
যদি সফলতা সুন্দরী রমণীকে বিয়ে করা হয়ে থাকে,তবে এক্ষেত্রেও শহীদের মোকাবেলা দুনিয়ার কোনো মানুষ করতে পারবে ?
যে কেউ শহীদ হওয়ার সাথে সাথেই জান্নাতের দুই হুর জান্নাত থেকে একশ জোড়া পোশাক নিয়ে শহীদের কাছে পৌঁছে যায় এবং তার চেহারায় হাত বুলিয়ে তাঁর আগমনের সুসংবাদ শোনায়।।
.
এমন হুর যাদের সৌন্দর্যের সামনে দুনিয়ার সব সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যাবে,যাকে দেখে পূর্নিমার চাঁদও শরম পাবে।।
.
যদি সফলতা এটাকে বলা হয় যে, সন্তান পিতা-মাতা নিজ পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের উপকারে আসবে,তবে শহীদ কিয়ামতের দিন নিজের পিতা-মাতা এবং আত্মীয়স্বজনের উপকারে আসবে যেদিন কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করবে না ।।
মানুষ নিজের ঘামে ডুবে এক এক নেকীর সন্ধানে নিজের আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবের কাছে ধরনা দিতে থাকবে।।
ঐদিন শহীদ সেসব আত্মীয়স্বজনের উপকারে আসবে যাদের ব্যাপারে জাহান্নাম নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে;
মদিনার সর্দার নবী [সাঃ] ইরশাদ করেন; "শহীদ নিজের আত্মীস্বজনদের থেকে সত্তর জনের ব্যাপারে সুপারিশ করবে"
.
জীবনের সফলতা আসলে কি ??
.
এটাই সবচেয়ে সফল জীবন যে, এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তরুণদের অন্তর ছোট ছোট জিনিসের মধ্যে আটকে থাকে না,তাঁরা সবকিছুকে পিছনে রেখে সবচেয়ে উচু জিনিসকে নির্বাচন করে।।
.
না দুনিয়ার ধন-সম্পদ এদের দৃষ্টি কাড়ে, না দুনিয়ার যশ-খ্যাতি তাদের প্রভাবিত করে,না এসব যুবকদের মনে বেপরোয়া আকর্ষণ প্রভাব বিস্তার করে, না দুনিয়ার মোহ এদের প্রলুদ্ধ করতে পারে।।
.
বরঞ্চ তাদের অন্তর চিরস্থায়ী জান্নাতের নেয়ামত সমূহের প্রতি লেগে থাকে,যেখানকার সম্মানের কোনো তুলনা নেই,
যেখানকার সৌন্দর্য কখন মলিন হবেনা,যেখানে জীবনের স্থায়িত্ব সর্বদা যৌবনের শীর্ষে থাকবে,না কোনো দুঃখ-দুর্দশা তাঁদের স্পর্শ করবে,যেখানে সব কিছু থাকবে যা কোনো অন্তর তামান্না করতে পারে,
যেখানে সব মনোবাসনা পূর্ণ করা হবে যা কোনো অন্তর চাইতে পারে,যেগুলো বাস্তবতার রূপ ধারণ করবে ।।
.
জগতের প্রতিপালক ইরশাদ করেনঃ
"সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা দাবী কর"
.
তাহলে আপনিই চিন্তা করুন যাদের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি এতটা উঁচু তাঁদের কাছে দুনিয়ার জীবনের স্থান কোথায় যা কিনা মাছির ডানার পরিমাণও নয়!!
.
যুবক ভাইয়েরা, নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুণ,কারা জীবনের ব্যাপারে উত্তম পরিকল্পনা করেছেন,
কারা নিজেদের বোধশক্তি খাটিয়েছেন,
কাদের সংকল্প ও অভিপ্রায় দৃঢ়দৃষ্টি সম্পন্ন,
কারা জীবনের বহু দূর পর্যন্ত গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করেছেন ?
কারা জীবনের সফলতায় পৌঁছাতে পেরেছেন ?...
.
'আর এটাই মহা সাফল্য'
.
.
______________মাওলানা আসিম ওমর [হাফিঃ]

সোমবার, ১৩ জুন, ২০১৬

জীবন বদলে দেওয়ার মত ঘটনা


বরেণ্য মুহাদ্দিস, বিচক্ষণ রাজনীতিক, ক্ষণজন্মা সাধক, শাইখুল ইসলাম হজরত মাওলানা সাইয়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) ছিলেন জ্ঞান-পাণ্ডিত্য, তাকওয়া-পরহেজগারি, ইবাদত ও দাওয়াত- এক কথায় আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামের বিজয় ও প্রতিষ্ঠা সাধনের ভুবনে এক কিংবদন্তী পুরুষ। তিনি ছিলেন শাইখুল হিন্দ হজরত মাহমুদ হাসান দেওবন্দি (রহ.)-এর যোগ্যতম উত্তরসূরী। এই মনীষীর ইবাদত-বন্দেগি, কোরআন তেলাওয়াত, সিয়াম সাধনা, তারাবি ও রাতভর তাহাজ্জুদের কান্নাপ্লাবিত সাধনা ছিল উপমাময়।
কোরআন হিফজের অনুপম দৃষ্টান্ত
রমজান এলে পূর্বেকার মনীষীরা কোরআনময় হয়ে যেতেন! কোরআনের সঙ্গে গড়ে তুলতেন গভীর সখ্যতা। কোরআনই হয়ে যেতো তাদের জীবনসঙ্গী, সফরসঙ্গী তথা নিত্যসঙ্গী। পবিত্র কোরআনের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অমলিন ঈর্ষণীয় ও সীমাহীন। নিম্নের ঘটনাটি থেকে আমরা তার কিছুটা আঁচ করতে পারি।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে তখন কঠোর আন্দোলন চলছিল। এক পর্যায়ে গ্রেফতার করা শাইখুল হিন্দ হজরত মাহমুদ হাসান দেওবন্দিকে। তারপর তাকে নির্বাসন দেওয়া হয় আন্দামানে। স্বীয় উস্তাদ ও শাইখের কষ্টের কথা চিন্তা করে তার একাকী নির্বাসনকে মেনে নিতে পারলেন না প্রিয় শাগরেদ হজরত হোসাইন আহমদ মাদানি। তিনি বললেন, আমার উস্তাদের সঙ্গে আমাকেও তোমরা নির্বাসনে পাঠাও। আমি তার সঙ্গে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইংরেজরা শেষ পর্যন্ত তার আবেদন মঞ্জুর করল। তাকেও পাঠিয়ে দেয় আন্দামানে।
কিছুদিন পর তাদের বন্দী জীবনে এলো রহমত ও বরকতের মাস রমজান। হজরত শাইখুল হিন্দ (রহ.) প্রিয় শাগরেদ হজরত হোসাইন আহমদ মাদানিকে লক্ষ্য করে গভীর আক্ষেপের সুরে বললেন, এ রমজানে আমরা হয়তো কোরআনে কারিমের তেলাওয়াত শুনতে পারব না!
কথাটি হজরত শাইখুল হিন্দ (রহ.) এ জন্য বলেছিলেন যে, তিনি এবং হজরত মাদানি কেউ কোরআনে কারিমের হাফেজ ছিলেন না। তাছাড়া এখানেও অন্য কোনো হাফেজও ছিলো না; যাকে ইমাম বানিয়ে তারা খতমে তারাবি পড়তে পারেন।

উস্তাদের কথা শুনে প্রিয় নবী সুন্নতের প্রেম আর আল্লাহর কিতাবের প্রতি অমলিন ভালোবাসা উথলে উঠে মাদানির হৃদয়ে। তিনি মুহূর্তকাল মাথা নিচু করে কী যেন ভাবলেন। তারপর আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস ও তার অসীম রহমতের প্রতি ভরসা রেখে বলে ফেললেন, হজরত! আপনি দোয়া করুন। ইনশাআল্লাহ আমিই খতমে তারাবি পড়াব।
হজরত আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে পড়াবে? তুমি তো হাফেজ নও। জবাবে মাদানি (রহ.) বললেন, দিনে মুখস্থ করে রাতে নামাজ পড়াব।
হজরত বললেন, ঠিক আছে তাই হবে।
রমজানের আগের দিন। হজরত হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) কোরআন শরিফ নিয়ে বসলেন। শুরু করলেন মুখস্থ করা। দেখা গেল, সেদিন থেকে হজরত মাদানি (রহ.) দিনে এক পারা করে মুখস্থ করে ফেলতেন আর রাতে তা তারাবির নামাজে স্বীয় শায়েখকে শোনাতেন। এভাবে তিনি ত্রিশ দিনে পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করে হাফেজ হলেন আর আপন উস্তাদের মনের আশা পূর্ণ করেন। -সূত্র: বীস বড়ে মুসলমান, মালফুযাতে হাকিমুল উম্মত, আনওয়ারুল আউলিয়া, পৃষ্ঠা- ১৪৫
তারাবি, তাহাজ্জুদ ও কোরআন তেলাওয়াত
শায়খুল ইসলাম হজরত হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) আসরের নামাজের পর দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষক হাফেজ মাওলানা আবদুল জলিল (রহ.)-এর সঙ্গে সোয়া পারা করে কোরআন পরস্পরে শোনাতেন। সূর্যাস্তের পূর্বে কোরআন শোনানো শেষ হয়ে গেলে মাদানি (রহ.) মোরাকাবা ধ্যানে মগ্ন হয়ে যেতেন। এরপর হালকা ইফতার করে মাগরিবের নামাজ খুব সংক্ষিপ্ত পড়তেন। পরে লম্বা লম্বা সূরা দিয়ে নফল নামাজ পড়তেন, যাতে প্রায় আধা ঘন্টা সময় লেগে যেতো। এরপর দীর্ঘক্ষণ ধরে দোয়া করতে থাকতেন।
হজরত হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর বিশেষ ধরণের বাচনভঙ্গি এবং নামাজে একাগ্রতা ও খুশুখুজু কেবল ভারতেই নয়; বরং আরব দেশেও প্রসিদ্ধ ও স্বীকৃত ছিল। সিলেট অবস্থানকালে রমজানে তারাবিসহ প্রত্যেক নামাজের ইমামতি মাদানি (রহ.) করতেন। তার পেছনে নামাজ পড়ার জন্য অনেক দূর থেকে লোকজন এসে ভীড় করতো। এমনকি তাহাজ্জুদের জামাতে শরিক হওয়ার জন্যও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত। তাহাজ্জুদে দুই খতম কোরআন তেলাওয়াত করা হতো। মাদানি (রহ.) নিজে এক খতম করতেন। তাহাজ্জুদে যাওয়ার সময় তিনি খুব সতর্কতা অবলম্বন করতেন, যেন আওয়াজ না হয় এবং কারো ঘুম ভেঙ্গে না যায়। -আকাবির কা রমজান: ৫৪

সাহরি ও ইফতার
জনৈক সাহাবির সূত্র ধরে হজরত আবদুল্লাহ বিন হারেস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলের নিকট হাজির হলাম, তিনি সাহরি খাচ্ছিলেন। রাসূল বললেন, নিশ্চয় তা বরকতস্বরূপ, আল্লাহপাক বিশেষভাবে তা তোমাদেরকে দান করেছেন, সুতরাং তোমরা তা ত্যাগ করো না। -সুনানে নাসাঈ, ২১৬২
অন্যত্র হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘এক ঢোক পানি দ্বারা হলেও, তোমরা সাহরি গ্রহণ করো। -ইবনে হিব্বান, ৩৪৭৬
হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে রমজান যাপন করেছেন ভারতীয় উপমহাদেশের আলেম মনীষীদের জীবনাচারেও আমরা এর গভীর অনুশীলন দেখতে পাই।
মাদানি (রহ.)-এর দস্তরখানে ইফতারের সময় সাধারণত খেজুর, জমজম, নাশপাতি, আনারস, সাগর কলা, পেয়ারা, আম, বসরি খেজুর, ডাব, পেঁপে, জর্দ্দা, চানাবুট, ফুলরি এবং সেদ্ধ ডিম থাকতো। ইফতারের সময় দস্তরখানজুড়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে যেতো। কিন্তু হজরত মাদানি (রহ.) ধ্যানের মধ্যে নিমগ্ন থেকে নিশ্চুপ থাকতেন।
হাদিসে এসেছে রোজাদারের জন্য দু’টি মুহূর্ত আনন্দের। তার মধ্যে একটি হলো ইফতারের সময়। হজরতের দস্তরখানে সেই হাদিসের বাস্তব নমুনা ছিল।
ইফতারের জায়গা ছিল মসজিদের নিকটেই। কিন্তু আসরের পর কোরআন তেলাওয়াত শেষ হলে মোরাকাবা এবং ধ্যানে এতো গভীরভাবে নিমগ্ন হতেন যে, অনেক দিন মাগরিবের আজানের কথা পর্যন্ত বলে দেওয়া লাগতো। বিভিন্ন ধরণের ইফতারির আয়োজন থাকা সত্ত্বেও হজরত শুধু খেজুর ও জমজম গ্রহণ করার পর কোনো ফলের একটি ফালি খেয়ে ডাবের পানি পান করতেন। পরে এক-আধ পেয়ালা চা পান করতেন। তবে সবার খাবার শেষ হওয়া পর্যন্ত দস্তরখানে বসে থাকতেন। কখনও কখনও সঙ্গিদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের কথা বলতে থাকতেন। ইফতারিতে প্রায় আট-দশ মিনিট সময় ব্যয় হতো। -আকাবির কা রমজান: ৪৮

বুধবার, ৮ জুন, ২০১৬

হাদিসের গল্প

মক্কার এক কিশোর, যিনি তখনও যৌবনে পদার্পণ করেননি। কুরাইশ গোত্রের এক সর্দার 'উকবা ইবন আবু মু'ইতের একপাল ছাগল নিয়ে তিনি মক্কার গিরিপথগুলোতে চরিয়ে বেড়াতেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে উঠে 'উকবার ছাগলের পাল নিয়ে বের হয়ে যেতেন আর সন্ধ্যায় ফিরতেন।
একদিন এ কিশোর ছেলেটি দেখতে পেলেন, দু'জন বয়স্ক লোক, যাদের চেহারায় আত্মমর্যাদার ছাপ বিরাজমান, দূর থেকে তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছেন। তাঁরা এত পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত ছিলেন যে, তাঁদের ঠোঁট ও গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। নিকটে এসে লোক দু'টি সালাম জানিয়ে বললেন, 'বৎস! এ ছাগলগুলি থেকে কিছু দুধ দুইয়ে আমাদেরকে দাও। আমরা পান করে পিপাসা নিবৃত্ত করি এবং আমাদের শুকনা গলা একটু ভিজিয়ে নেই।'
ছেলেটি বললেনঃ 'এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। ছাগলগুলি তো আমার নয়। আমি এগুলির রাখাল ও আমানতদার মাত্র।' লোক দু'টি তার কথায় অসন্তুষ্ট হলেন না, বরং তাদের মুখ মন্ডলে এক উৎফুল্লতার ছাপ ফুটে উঠলো। তাঁদের একজন আবার বললেনঃ 'তাহলে এমন একটি ছাগী আমাকে দাও যা এখনো পাঁঠার সংস্পর্শে আসেনি।' ছেলেটি নিকটেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট ছাগীর দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিলেন। লোকটি এগিয়ে গিয়ে ছাগীটি ধরে ফেলেন এবং 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলে হাত দিয়ে ধরে তার ওলান মলতে লাগলেন।
অবাক বিস্ময়ে ছেলেটি এ দৃশ্য দেখে মনে মনে বললেনঃ 'কখনও পাঁঠার সংস্পর্শে আসেনি এমন ছোট ছাগী কি করে দুধ দেয়?'
কিন্তু কি আশ্চর্য! কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাগীর ওলানটি ফুলে উঠে এবং প্রচুর পরিমাণ দুধ বের হতে থাকে। দ্বিতীয় লোকটি গর্তবিশিষ্ট পাথর উঠিয়ে নিয়ে বাঁটের নীচে ধরে তাতে দুধ ভর্তি করেন। তারপর তাঁরা উভয়ে পান করেন এবং ছেলেটিকেও তাঁদের সাথে পান করালেন। ছেলেটি যা কিছু দেখছিলেন সবই তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। সবাই যখন পরিতৃপ্ত হলেন তখন সেই পুণ্যবান লোকটি ছাগীর ওলানটি লক্ষ্য করে বললেনঃ 'চুপসে যাও।' আর অমনি সেটি পূর্বের ন্যায় চুপসে গেল।

এরপর কিশোর ছেলেটি সেই পুণ্যবান লোকটিকে অনুরোধ করলেনঃ 'আপনি যে কথাগুলি উচ্চারণ করলেন, তা আমাকে শিখিয়ে দিন।' লোকটি বললেনঃ 'তুমি তো শিক্ষাপ্রাপ্ত বালক।'
এ মহাপুণ্যবান ব্যক্তিটি আর কেউ নন, তিনি স্বয়ং বিশ্ব মানবতার মহান মুক্তিদূত, সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আর তাঁর সঙ্গীটি ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা). কুরাইশদের অত্যাচার উৎপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য এ সময় তাঁরা মক্কার গিরিপথ সমূহে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাসূল (সা) ও তাঁর সঙ্গীকে যেমন ছেলেটির ভালো লেগেছিল তেমনি তাঁদের কাছেও ছেলেটির আচরণ, আমানতদারী ও বিচক্ষণতা খুব চমৎকার মনে হয়েছিল।
এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই সেই কিশোর ছেলেটি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠতম মানুষের খাদিম হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করেন।
ছাগলের রাখালী সেই সৌভাগ্যবান বালকটি ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা). তিনি নবী গৃহে প্রতিপালিত হন, তাঁকে অনুসরণ করেন এবং তাঁরই মত আচার-আররণ ও চরিত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হন। এ কারণে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, "হিদায়াত প্রাপ্তি, আচার-আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তিনি-ই হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট উত্তম ব্যক্তি।"

আত্মার খোরাক- ৯০

Fahim Muhammad Ataullah

জনৈক বাদশাহ একটি মেয়েকে বিয়ে করে খুব আদর যত্নের সাথে রাজমহলে নিয়ে এলেন। হিরা-জহরতে সারা অঙ্গ রাঙিয়ে দিলেন। কিন্তু মেয়েটি ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যেতে লাগলো। দিনে দিনে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে লাগলো। তার চেহারাতে ফুটে উঠতে লাগলো অসুখীর চিহ্ন। একান্তে উদাস হয়ে বসে থাকতো সারাক্ষণ। রাজা কতো ডাক্তার বৈদ্য দেখালেন। কোনো লাভ হলো না।
:
সেকালে নামকরা একজন চিকিৎসক ছিলেন। রাজা তাঁকেও দরবারে ডেকে পাঠালেন। যিনি শরীরের সাথে সাথে মনোরোগ বিশেষজ্ঞও ছিলেন। ডাক্তার রাণীকে দেখলেন।বললেন, বাদশাহ সালামাত!!! আপনার অনুমতি হলে আমি রাণীর চিকিৎসার ভার গ্রহণ করতে চাই। বাদশাহ অনুমতি দিলেন।
:
চিকিৎসক রাণীর সব বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তার জন্য ইতোপূর্বে যতো বিয়ের প্রস্তাব এসেছিলো সব একে একে নোট করলেন। যারা তার প্রত্যাশিত ছিলো তাদের নামও জেনে নিলেন।
:
এরপর রাণীকে পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন তিনি। বুঝতে পেলেন শারীরিক কোনো ত্রুটি নেই তাঁর। তিনি আঁচ করতে লাগলেন, এটা হৃদয়ঘটিত সমস্যা।
:
একদিন ডাক্তার রাণীর শিরায় হাত রেখে তার সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। যাদের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছিলো একে একে সবার নাম নিতে লাগলেন। পর্যায়ক্রমে তিনি এক স্বর্ণকারের নাম নিলেন। সে ছিলো রাণীর খালাতো ভাই। স্বর্ণকারের সাথে তার ভাব ছিলো।
:
ডাক্তার অনুভব করলেন, স্বর্ণকারের নাম নেয়ার সাথে সাথে তার পাল্স বেড়ে গেছে। রাণী প্রকৃতপক্ষে তাকেই বিয়ে করতে চেয়েছিলো। কিন্তু বাবা-মা জোর করে বাদশার সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। এখন এই মেয়ে সংসার করছে বাদশার কিন্তু অন্তরে স্বর্ণকার।
:
চিকিৎসক যখন দেখলেন তার শিরার গতি বেড়ে গেছে তখন তিনি তাকে বললেন, দেখো মা!!! সত্যি করে বলতো, তুমি কি স্বর্ণকারকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে?
:
রাণী স্বীকার করলো। সব খুলে বললো ডাক্তারকে। ডাক্তার পরবর্তীতে বাদশাহকে বুঝিয়ে একটা বিহিত করলেন।
:
বন্ধুরা!!! আমরা মুসলমান। আল্লাহ আমাদের মাহবুবে হাকীকি। দুনিয়ার সাথে বিয়ে হয়ে গেছে আমাদের। ধীরে ধীরে দুনিয়াতেই মগ্ন হয়ে গেছি আমরা। হৃদয়ের সেই প্রেমের উপর পর্দা পড়ে গেছে। আমাদের হারানো প্রেমকে জাগিয়ে তোলার জন্য আমাদের প্রেমাস্পদ বিভিন্ন উপলক্ষ এনে দেন সামনে। কাছে টানার বন্দোবস্ত করেন। কিন্তু আমাদের প্রেম জাগে না। 
:
নামাযে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়ে তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ দেন, তাও আমাদের অন্তরে নিভু নিভু প্রেমাগ্নি জ্বলে উঠে না।
:
বন্ধু!! কেমন প্রেমিক আমরা? এ কেমন প্রেমের দাবী আমাদের?? তিনি ডাকছেন। কাছে এসো। আজ সব তোমাদের। আমি তোমাদের। আমাকে জিতে নাও। জয় করে নাও আমাকে। আমার ভাণ্ডার তোমাদের জন্য মুক্ত করে দিলাম।
:
আমার জান্নাত তোমাদের। সব তোমাদের। তবু আমরা বেখবর। 
:
বন্ধু!!! জাগো। প্রভুর প্রেমে জাগো। ভালোবাসার তড়প জাগাও অন্তরে। মুক্ত ভাণ্ডার থেকে গ্রহণ করো সব। মিটিয় নাও সব চাওয়া। সুযোগ সবসময় মিলে না।
:
আল্লাহ আমাদের সকলকে কবুল করে নাও। তোমার রহমতের ভাগী বানাও। আমীন।

বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১৬

তিন ওলীর চমৎকার ঘটনা৷

ইবনে উমার (রাঃ) নবী (সাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, অতীত কালে তিনজন লোক পথ চলতেছিল। পথিমধ্যে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে তারা একটি পাহাড়ের গুহায় ঢুকে পড়ল। উপর থেকে বিশাল আকারের একটি পাথর গড়িয়ে এসে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তাদের জন্য বের হওয়ার কোন সুযোগ অবশিষ্ট রইলনা। তাদের একজন অপরজনকে বলতে লাগল, তোমরা প্রত্যেকেই আপন আপন সৎআমল আল্লাহর দরবারে তুলে ধরে তার উসীলা দিয়ে দু’আ কর। এতে হয়ত আল্লাহ আমাদের জন্য বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দিবেন। তাদের একজন বলল, হে আল্লাহ! আমার পিতা-মাতা অতি বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হয়েছিল, আমার কতিপয় শিশু সন্তানও ছিল। আমি ছিলাম তাদের জন্য একমাত্র উপার্জনকারী। আমি প্রতিদিন ছাগল চরানোর জন্য মাঠে চলে যেতাম। বিকালে ঘরে ফেরত এসে দুধ দহন করে আমি প্রথমে পিতা-মাতাকে পান করাতাম, পরে আমার শিশু সন্তানদেরকে পান করাতাম। এটি ছিল আমার প্রতিদিনের অভ্যাস। একদিন ঘাসের সন্ধানে আমি অনেক দূরে চলে গেলাম। এসে দেখি আমার পিতা-মাতা ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার অভ্যাসমত আমি দুধ দহন করে দুধের পেয়ালা নিয়ে তাদের মাথার পাশে দাড়িয়ে রইলাম। আমি তাদেরকে ঘুম থেকে জাগ্রত করাকে অপছন্দ করলাম। যেমনভাবে অপছন্দ করলাম পিতা-মাতার পূর্বে সন্তানদেরকে দুধ পান করানোকে। শিশু সন্তানগুলো আমার পায়ের কাছে ক্ষুধার তাড়নায় চিৎকার করতেছিল। এভাবে সারা রাত কেটে গিয়ে ফজর উদীত হল। আমার পিতা-মাতা ঘুম থেকে জাগলেন। আমি তাদেরকে প্রথমে পান করালাম অতঃপর আমার ছেলে-মেয়েদেরকে পান করালাম।
হে আল্লাহ! আপনি অবশ্যই জানেন যে, আমি একাজটি একমাত্র আপনার সন’ষ্টি অর্জনের জন্য সম্পাদন করেছি। এই আমলটির উসীলায় আমাদের জন্য বের হওয়ার রাস্তা করে দিন। এভাবে দু’আ করার সাথে সাথে পাথরটি একটু সরে গেল, তারা আকাশ দেখতে পেল, কিন’ তখনও বের হওয়ার মত রাস্তা হয়নি। দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ! আমার একজন চাচাতো বোন ছিল। সে ছিল আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং একজন পুরুষ কোন মহিলার প্রতি যতদূর আসক্ত হতে পারে, আমি ছিলাম তার প্রতি ততটুকু আসক্ত। আমি তার কাছে আমার মনোবাসনা পেশ করলাম। সে একশত স্বর্ণমুদ্রা দেয়ার শর্তে তাতে সম্মত হল। আমি অনেক পরিশ্রম করে একশত স্বর্ণমুদ্রা সংগ্রহ করে তার কাছে গমণ করলাম। সে সম্মতি প্রকাশ করার পর আমি তার উভয় উরুর মধ্যে বসে পড়লাম। এমন সময় সে বলে উঠল, হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর, আমার স্বতীত্ব নষ্ট করোনা। একথা শুনে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।
হে আল্লাহ! আপনি যদি মনে করেন যে, আমি আপনার ভয়ে সেদিন পাপের কাজ থেকে বিরত হয়েছি, তাহলে আজ আমাদেরকে এখান থেকে বের হওয়ার ব্যবসা করে দিন। সাথে সাথে পাথরটি আরো একটু সরে গেল কিন’ তখনও বের হওয়ার মত রাস্তা হয়নি।
তৃতীয়জন বললঃ হে আল্লাহ! নির্ধারিত বেতনের বিনিময়ে আমি একজন শ্রমিক নিয়োগ করলাম। কাজ শেষ করে সে আমার কাছে পারিশ্রমিক চাইলে আমি তা প্রদান করলাম, কিন’ সে উহা গ্রহণ না করেই চলে গেল। আমি তার প্রাপ্য টাকা বাড়াতে থাকলাম। একপর্যায়ে তা একপাল গরুতে পরিণত হল। আমি গরুগুলো মাঠে চরানোর জন্য একজন রাখালও নিয়োগ করলাম। অনেক দিন পর সেই লোকটি আমার কাছে এসে তার মজুরী চাইল। আমি বললামঃ তুমি রাখালসহ উক্ত গরুর পালটি নিয়ে চলে যাও। সে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! আমার প্রাপ্য দিয়ে দাও এবং আমার সাথে বিদ্রুপ করোনা। আমি বললাম, বিদ্রুপ করি নাই। বরং এগুলো তোমার। আমি তোমার এক দিনের মজুরী দিয়ে এগুলো করেছি। তাই তুমি রাখালসহ গরুর পালটি নিয়ে চল। অতঃপর সে গরুর পালটি নিয়ে চলে গেল। একটিও রেখে যায়নি।
হে আল্লাহ! আপনি যদি মনে করেন যে, আমি আপনার সন’ষ্টির জন্য একাজটি করেছি, তাহলে আজ আমাদেরকে এখান থেকে বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। সাথে সাথে পাথরটি সম্পূর্ণরূপে সরে গেল। তারা নিরাপদে সেখান থেকে বের হয়ে এল। (বুখারী, অধ্যায়ঃ আহাদীছুল আম্বীয়া)

বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

তাম্বুরির পাদুকা!


তম্বুরির বাড়ি সেকালের বাগদাদে। অনেক বড় ধনী ব্যবসায়ী। হলে কী হবে, সে ছিল অত্যন্ত কৃপণ। সেই যে কবে এক জোড়া জুতো কিনেছে, সেটা দিয়েই চালাচ্ছে। ছিঁড়ে গেলে জোড়াতালি দিয়ে দিব্যি পায়ে দিয়ে বেড়াচ্ছে। 
শেষে এমন হলো, জুতোর গায়ে চামড়ার নামগন্ধও রইল না। তালির ত্যানা আর রঙবেরঙের সুতাই হলো জুতার বর্তমান রূপ। 
.
পুরো বাগদাদে তম্বুরির বিদঘুটে জুতোর খ্যাতি (!) ছড়িয়ে পড়ল। সবাই তাকে জুতা-তম্বুরি নামেই একডাকে চেনে। 
.
তম্বুরির বখিলীর কুখ্যাতি প্রবাদপ্রতীম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। এতদিন তো যাওবা জুতার তলাটা ‘অরিজিনাল’ ছিল, এখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে সুখতলাটাও তালিযুক্ত হয়ে বিচিত্র কিসিমের এক পদার্থ হয়ে দাঁড়াল তার জুতো। 
.
রাস্তায় বেরোলেই দুষ্ট ছেলের দল তার পিছু নেয়। মসজিদে গেলে মুসল্লিরা টিটকারি মারে। বাজারে গেলে ব্যবসায়ীরা জুতো গল্প শুনতে চায়। 
.
এতসব ফ্যাচাং আর কাঁহাতক সহ্য হয়? তম্বুরি ঠিক করলো সে বখিলি ছেড়ে দিবে। জুতো জোড়া ফেলে দিবে। তার বখিলির কারণে বুড়ো হতে চলল, এখনো একটা টুকটুকে বউ ঘরে তুলতে পারলো না। কোনও বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে গেলে তার জুতো দেখেই সবাই তাকে চিনে ফেলে। মেয়ের মা ঝামটা মেরে তাকে বাড়ি ছাড়া করে। 
.
একদিন সকালে উঠে ঠিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। আজই জুতোর শেষ দিন। হাঁটতে হাঁটতে বাজারের শেষ মাথার ভাগাড়ে নিয়ে ফেলে দিল। 
.
ফেরার পথে সুন্দর কাঁচভর্তি মেশকে আম্বর বিক্রি হতে দেখে তার ব্যবসায়িক বুদ্ধি চকচক করে উঠলো। আতরবিক্রেতাকে নাজেহাল-নাস্তানাবুদ করে নামমাত্র মূল্যে মেশক কিনে নিল। বাড়ি এনে তাকের ওপর রেখে দিল। 
.
ওদিকে বাজারের মেথর ময়লা ফেলতে গিয়ে দেখল, তম্বুরির জুতো ময়লার মধ্যে পড়ে আছে। হায় হায় করে জুতোজোড়া তুলে নিল। ভাবল তাম্বুরি নিশ্চয় জুতো হারিয়ে এখন দিশেহারা! 
মেথর জুতো নিয়ে বাড়ি এসে দেখে, দরজা বন্ধ, অনেক ধাক্কাধাক্কির পরও দরজা খুলল না দেখে, জানালা দিয়ে জুতোজোড়া ঘরের ভেতরে ছুঁড়ে ফেলল। 
.
পড়বি তো পড়, মালির ঘাড়ে। জুতো গিয়ে পড়ল সকালে কিনে আনা আতরের জারে। কাঁচের জার প্রবল পরাক্রান্ত তালিযুক্ত বিশমণী জুতার আঘাত সইতে পারবে কেন? 
.
তম্বুরি রাতে ফিরে দেখে তার সব শেষ। আরেক জনকে ঠকিয়ে কেনা মেশকে আম্বর তো নেই নেই, পুরো ঘরটাও ভাঙা কাঁচে বিপদজনক হয়ে আছে। কিভাবে ভাঙল? কে আমার এমন সর্বোনাশ করলো? খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে চোখ পড়লো, ঘরের কোনে নিরীহ ভঙ্গিতে জুতোজোড়া পড়ে আছে। আর বুঝতে বাকি রইল না, কালপ্রিটটা কে?
-খোদার লা‘নত পড়–ক! তোদের মাথায় আসমান ভেঙে পড়–ক। আমি তোদের ছাড়লেও দেখি তোরা আমার পিছু ছাড়ছিস না! তবে রে বেল্লিক! তোদের দেখাচ্ছি মজা!
.
তম্বুরি জুতা নিয়ে রাতের আঁধারে দজলার একেবারে মধ্যখানে ফেলে দিয়ে এল। এবার নিশ্চিন্ত। অভিশপ্ত জুতো রাহুগ্রাস থেকে রেহাই পাওয়া গেছে। ওফ!। 
.
অন্যদিনের মতো আজও খায়ের মাঝি নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে বের হলো। প্রথম খেপ মেরে জাল টানতে গিয়ে দেখে, বেজায় ভারী। আহ! নিশ্চয় বড় কোনও বোয়াল মাছ পড়েছে! জাল তোলার পর দেখা জুত! আরে এগুলো তো তম্বুরির জুতো। আহ বেচারা না জানি কত কষ্টে আছে! এত বছরের সঙ্গী! যাই গিয়ে দিয়ে আসি! 
.
তম্বুরি চোখ কটমট করে চুপচাপ জুতো গ্রহণ করলো। মাঝিকে কিছুই বলল না। মুখের ওপর ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিল। জুতো নিয়ে বাড়ির ছাদে শুকোতে দিল। 
.
পাশের বাড়ির একটা বিশাল হুলো বিড়ালটা সব সময় তম্বুরির ছাদে ঘুমায়। একটু পর বিড়াল মাছের গন্ধ পেয়ে শুঁকে শুঁকে জুতোর কাছে এল। ভাবল জুতোর মধ্যে মাছ আছে। কামড়া-কামড়ি শুরু করে দিল। 
তাম্বুরি দেখে বেড়ালটাকে তাড়াতে গেল। বেড়াল একটা জুতো মুখে নিয়েই দৌড়ে পালাল। ছাদ টপকাতে গিয়ে বেড়ালের মুখ থেকে জুতোটা মুখ থেকে ছুটে গেল। সোজা গিয়ে পড়ল এক মহিলার মাথায়। মহিলা ছিল গর্ভবতী। এমন ভারী জুতার আঘাত সইতে না পেরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল। বেকায়দা পড়ার কারণে আঘাত পেয়ে গর্ভ খালাস হয়ে গেল। 
মহিলার স্বামী এসে দেখল জুতোটা তম্বুরির। সোজা কাযির কাছে গিয়ে বিচার দিল। বিচারের রায় হলো, তম্বুরিকে ভ্রƒণ হত্যার জন্যে ‘দিয়ত’ (রক্তপণ) দিতে হবে। অবশ্য বিচারক বিশেষ বিবেচনায়, জুতোজোড়া তাম্বুরিকে ফেরত দিয়ে দিলেন। 
.
তম্বুরি দু’চোখকে ভাঁটার মতো লাল করে বললো:
-ওরে মানুষখেকো জুতো! দেখ এবার তোদের কী করি! এমন জায়গায় তোদেরকে ফেলে দিয়ে আসব, যেখানে মানুষও পৌঁছতে পারে না। 
.
তম্বুরি জুতোজোড়া নিয়ে বাগদাদের পয়ঃপ্রণালীর সবচেয়ে বড় ড্রেনটাতে ফেলে দিয়ে এল। মুহূর্তেই সোতে ভেসে জুতো কোথায় চলে গেল! ফুরফুরে মেজাজে শীস দিতে দিতে বাড়ি এল। 
.
কয়েক ঘণ্টা পর দেখা গেল, বাগদাদের রাস্তাঘাট ময়লা-নোংরা পানিতে সয়লাব। বোটকা দুর্গন্ধে টেকা দায়। মেথর ডাকা হলো। দেখা গেল একজোড়া জুতে ভেসে গিয়ে পাইপের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। জুতোগুলো তম্বুরির। মেথর আবারও দয়া করে হারানো জুতো মালিককে ফেরত দিয়ে এল। কিন্তু জনগনের দুর্ভোগের কারণ হওয়াতে কাযি ধরে নিয়ে তম্বুরিকে দু’চার ঘা দিয়ে বিদেয় করলো। 
.
ইয়া আল্লাহ! এ কোন অভিশাপ আমার পিছু লেগেছে! 
ঠিক আছে এতদিন তো মাটির ওপরে ফেলেছি। এবার মাটির দশহাত নিচে পুঁতে রাখবো। দেখি কোন বাপর বেটার সাধ্যি, খুুঁজে পায়? রাতের গভীরে বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে গর্ত খুঁড়তে শুরু করলো। গহীন রাতে খন্তার খুপ খুপ আওয়াজে প্রতিবেশির ঘুম ভেঙে গেল। তারা চুপি চুপি এসে দেখল, একটা চোর তাদের ঘরে সিঁধ কাটছে। সাথে সাথে পুলিশ ডেকে চোর ধরিয়ে দিল। 
সারারাত বন্দী থাকার পর, সকারে বিচারে আনা হলো। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণ হলো, সে চুরি করার চেষ্টা করছিল। আচ্ছামতো ধোলাই দিয়ে সতর্ক করে ছেড়ে দেয়া হলো। 
.
মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়। জেলখানা থেকে ঘরে না গিয়ে, বাগদাদের বড় হাম্মামে (গোসলখানা) গিয়ে ঢুকলো। বের হওয়ার সময়, জুতো জোড়া না নিয়ে, খালি পায়েই চলে এল। নিশ্চই কেউ না কেউ তার জুতো নিয়ে যাবে বা ফেলে দিবে। এখানে তো সবাই বিদেশী। কেউ তার জুতো চিনবে না। ভারমুক্ত হয়ে ঘরে ফিরে এল।
.
হাম্মামে তখন একজন বড় শাহযাদা গোসল করছিল। বের হয়ে দেখল মণিমাণিক্যখচিত জুতোজোড়া নেই। হুলুস্থ’ূল পড়ে গেল। কে নিল? নিল কে? সবার গর্দান ফেলে দেয়া হবে! তাড়াতাড়ি খুঁজে আন! হাম্মামের দারোয়ান দেখল, তম্বুরির জুতোজোড়া পড়ে আছে, ব্যস! হিসেব সোজা! সে তো ইদানীং চুরি ধরেছে! সেই চোর। 
.
বিচার গেল কাযির কাছে। যেহেতু দশ দেরহাম হয়নি,তাই হাত কাটা গেল না। আচ্ছা করে, আজকের মতো দ্বিতীয়বার আড়ঙ ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দিলেন। দয়া করে (!) জুতোজোড়াও তাকে দিয়ে দিলেন। 
.
ওরে আল্লাহ রে! আমি এখন কোথায় যাব, কী করবো রে! এমন জানলে আমি প্রতিদিন একজোড়া নতুন জুতো কিনে পরতাম! 
ঠিক আছে, শহরে হবেনা। আমি মরুভূমিকে নিয়ে অভিশপ্ত জুতো পুঁতে আসবো। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রচন্ড রোদের মধ্যে দরদর ঘামতে ঘামতে বালু খুঁড়তে শুরু করে দিল। আচানক কিছু বুজে ওঠার আগেই, একদল ঘোড়সওয়ার এসে, হাত-পা বেঁধে চ্যাঙদোলা করে, কাযির দরবারে নিয়ে এল:
-হুযুর! এই তো হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া গেছে। 
.
ঘটনা হলো, সেই রাতে একজন মানুষ নিহত হয়েছিল। লোকটা ছিল ধনকুবের। কেউ একজন তাকে মেরে, তার টাকাপয়সা মরুভূমিতে পুঁতে রেখেছিল। লাশটাও সেখানে ফেলে রেখেছিল। নিহত ব্যক্তির আত্মীয়রা বুঝতে পেরেছিল, হত্যাকারী টাকা-পয়সা নিয়ে যেতে পারে নি। এখানেই আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। বাস্তবেই তাই। দেখা গেল, তম্বুরি যেখানে গর্ত করছিল, সেখাইে দীনারের বড়সড় একটা থলে পড়ে আছে। ব্যস! দুয়ে দুয়ে চার!
.
এরপর আর প্রমাণের কী প্রয়োজন? তম্বুরি অনেক বোঝালো। কিন্তু কে শোনে কার কথা! তার ফাঁসীর হুকুম হয়ে গেল। তখন জেলখানার একজন রক্ষীর মনে দয়া এল। সে এগিয়ে এসে কাযিকে বললো:
-হুযুর! তম্বুরি তো গতরাতে জেলখানায় আটক ছিল!
-ও হাঁ, তাইতো! তাইতো!
বেকসুর খালাস দেয়া হলো। 
.
কিন্তু কাযী বারবার ঝামেলা পাকানোর অপরাধে, আবারও বাংলাধোলাই দিয়ে ছেড়ে দিতে বললো। 
.
মার খাওয়ার পর, মুখের কষার রক্ত মুছতে মুছতে তম্বুরি বললো:
-হুযুর! আমার একটা কথা ছিল!
-কী কথা, বলে ফেল দিকিনি!
-আমাকে একটা সত্যয়নপত্র লিখে দিতে হবে। 
-কিসের সত্যয়নপত্র?
-আমি ভেবে দেখেছি, আমার জুতোজোড়াই যতসব নষ্টের গোড়া। আমি চাই, একথা লিখিতভাবে ঘোষণা দিতে, আমার সাথে এ-জুতোর সাথে আজ থেকে কোনও সম্পর্ক নেই। 
কাযি হাসতে হাসতে বললেন:
-আচ্ছা, ঠিক আছে যা, লিখে দিলাম!

এক পড়ন্ত বিকেলে মদীনার বাজারে একজন ইহুদি ক্রেতা এসে দাঁড়ালেন এক


★ এক পড়ন্ত বিকেলে মদীনার বাজারে একজন ইহুদি ক্রেতা এসে দাঁড়ালেন এক সাহাবীর দোকানের সামনে। একটা পণ্যের দাম শুনে কিনতে সম্মত হলেন ঐ ক্রেতা। কিন্তু তাকে আশ্চর্য করে দিয়ে সাহাবীটি দূরের আরেকটি দোকান দেখিয়ে দিয়ে বললেন,পণ্যটি সেখান থেকে কিনতে। দাম একই, জিনিসও একই। ক্রেতাটি সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গেলেন অন্য দোকানটায়। পণ্যটা কিনে ফেরত আসলেন প্রথম দোকানে। সাহাবীটি জিজ্ঞেস করলেন ক্রেতাকে, ‘তোমার জিনিস কি পাওনি সেখানে?’ ক্রেতা বললেনঃ পেয়েছি, কিন্তু আমি অন্য একটা কথা জানার জন্য এসেছি
সাহাবীঃ- কী?
ইহুদিঃ- তুমি যার কাছে আমাকে পাঠিয়েছিলে সে তো হচ্ছে আমার ধর্মের মানুষ—ইহুদি। আমরা তো তোমাদের পছন্দ করি না। কিন্তু তুমি একজন ব্যবসায়ী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে আমাকে পাঠালে, মুসলিম হয়ে একজন ইহুদিকে ব্যবসার সুযোগ করে দিলে কেন?
★সাহাবীটি বললেনঃ মহান আল্লাহ আমাকে আজকের মতো যথেষ্ট রিযিক দিয়েছেন। আর ঐ বেচারা সকাল থেকে বসে আছে। আজ কোন বেচাকেনা হয়নি ওর। তার তো পরিবার আছে। একজন ক্রেতা পেলে তার ন্যুনতম চাহিদাটুকু হয়ত মিটবে। ক্রেতাটি হতবাক হয়ে ভাবলেন। যে ধর্ম মানুষের কল্যাণের কথা এভাবে মানুষকে ভাবতে শেখায়, সেটা সত্য বৈ মিথ্যা হতে পারে না। পণ্য কিনতে এসে ইহুদি ব্যক্তিটি জান্নাত কিনে নিয়ে চলে গেল। অর্থাৎ মুসলমান হয়ে গেল। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবর!
ইসলাম কিন্তু এভাবেই পৃথিবীতে ছড়িয়েছে। সাহাবায়ে কেরামদের চরিত্র এরকমই ছিল। এভাবেই সাহাবায়ে কেরাম নবীজি (সাঃ) এর দ্বীন ও আদর্শ নিয়ে সারা দুনিয়া সফর করেছিলেন। বিধর্মীরা মুসলমানদের চলাফেরা ও চরিত্র দেখে আবির্ভূত হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
★সাহাবারা কোন বিজনেজ স্কুলের ছাত্র ছিলেন না, তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে নববীর ছাত্র ছিলেন।

শিক্ষণীয়_গল্পঃ

শিক্ষণীয়_গল্পঃ*এক বাদশাহ ছিলেন। তার ছিল একপরমা সুন্দরী কন্যা।এক চোর সেইকন্যার উপর আশেক ছিল। কিন্তুতাকে পাওয়া বড় কঠিন ব্যাপারছিল।ঘটনাক্রমে একদিন সে চুরি করারউদ্দেশ্যে বাদশাহর ঘরে প্রবেশকরলো।তখন বাদশাহ এবং বেগম তাদেরমেয়েরবিবাহেরব্যাপারে আলোচনা করছিলেন।বাদশাহ বললেন, ‘আমাদের মেয়েরবিবাহ দিব আল্লাহওয়ালা,পরহেজগার লোকের সাথে।’চোর এইকথা শুনে চুরি করা ভুলে গেলএবং বাদশাহর সিদ্ধান্তেরকথাকে একবিরাট গণীমত মনে করলো যে তারপ্রিয়তমাকে পাওয়ারসঠিক ব্যবস্থা জানা হয়ে গেছে।এখনপরহেজগার হয়ে যাওয়াই ভাল।বাদশাহর ঘর থেকে বাহিরহয়ে সে একমসজিদে গিয়ে বসলো এবং রাতদিনআল্লাহর এবাদতে মশগুল হয়ে পড়লো।ফলে তারখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো যে 'একজনখুব বড় দরবেশ এসেছে।এদিকে বাদশাহ তার শাজাদীরবিবাহের পাত্র খোঁজারজন্যে লোক লাগিয়ে দিলেন।পরহেজগার পাত্র খোঁজারজণ্যে চারিদিকে লোক ছুটলো।অনেক খোঁজাখুজির পরঅবশেষে জানা গেল যে,অমুক মসজিদে এমন একআল্লাহওয়ালা আছেন যারচেয়ে অধিকমুত্তাকী সারাদেশে আরএকটিও নাই।সুতরাং বিশেষ ব্যবস্থাপনায়বিবাহেরপয়গাম নিয়ে বাদশাহর দূত তারকাছে গিয়ে হাজির হলো।কিন্তু চোরের কাজততদিনে সারা হয়ে গিয়েছিল।আল্লাহর এবাদতের শান্তিতে তারঅন্তর এত ভরপূর হয়ে উঠেছিল যে,রাজকন্যা এবং সাতরাজার ধনও তার কাছে তখন তুচ্ছমনে হতে লাগলো।সে দূতকে বললো, ‘আপনারা যান,আমারসময় নষ্ট করবেন না।’সে দূতকে ফিরিয়ে দিল।সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে লাগল।তাই তার নিকটশাহজাদিকে বিয়ে/ক্ষণস্থায়ী সুখকে বিসর্জনদিয়ে আল্লাহর ইবাদতকরে জান্নাতে চীরস্থায়ী সুখউপভোগ করাকে উত্তম মনে করল।আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে দুনিয়াতে শুধুমাত্রআল্লাহর ইবাদত করার জন্যপাঠিয়েছেন, আমাদেরপ্রতিটি কাজ ইবাদত হবে যখনআমরা আল্লাহ হুকুম মেনে রাসূলুল্লাহ[সাঃ] এর তরিকায় করব।তখন আমাদের ঘুম ইবাদত হবে।খাওয়া ইবাদত হবে।আল্লাহ তায়ালা আমাদেকে দ্বীনমোতাবেক জীবন পরিচালিত করারতৌফিক দান করুন।