শুক্রবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অারাফার রোযা: জিলহজ্বের নয় তারিখে না হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে!

Mahbubul Hasan Arife

যিলহজ্বের প্রথম দশকের অনেক ফযীলতের কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষভাবে যিলহজ্বের নয় তারিখের রোযার বিষয়ে হাদীসে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একটি হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
صيام يوم عرفة أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله والسنة التي بعده.
ইয়াওমে আরাফা'র রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা আগের এক বছরের ও পরের এক বছরের গোনাহ মাফ করবেন।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৬২
হাদীসে ‘ইয়াওমু আরাফা’র যে রোযার কথা বলা হয়েছে এর অর্থ কি? হাজীগণ যেদিন আরাফায় অবস্থান করেন সেই দিনের রোযা, না জিলহজ্বের নয় তারিখের রোযা?
সঠিক ব্যাখ্যা হলো জিলহজ্বের নয় তারিখের রোযা। কারণ-
এক.
এই রোযা 'আরাফা' বা 'উকুফে আরাফা'র আমল নয়; বরং ঐ তারিখের আমল। ‘ইয়াওমে আরাফা’ হচ্ছে ঐ তারিখের (নয় যিলহজ্বের) পারিভাষিক নাম। যেহেতু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান হজ্বের প্রধান রোকন ‘উকুফে আরাফা’ নয় যিলহজ্বে আদায় করা হয় তাই এ তারিখের নাম পড়ে গেছে ‘ইয়াওমে আরাফা’। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমান নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী জিলহজ্বের নয় তারিখেই রোজা রাখবে।

বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝা যেতে পারে। ‘ইয়াওমু আরফা’র মত হাদীসে আরেকটি শব্দ এসেছে ‘সওমু ইয়াওমি আশুরা’ এটি একটি ইসলামী পরিভাষা। এর দ্বারা মহররম মাসের দশ তারিখের রোযাকে বোঝানো হয়েছে। যেমনিভাবে প্রত্যেক মুসলমান নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী দশ মহররম রোজা রাখে; সউদী অারবের দশ তারিখের প্রতি লক্ষ করে না, তেমনিভাবে 'ইয়াওমু অারাফা'র ক্ষেত্রেও নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী নয় তারিখেই রোজা রাখবে; সউদী অারবের নয় তারিখে অর্থাৎ হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে নয়।
দুই.
তাকবীরে তাশরীক আরাফা বা উকূফে আরাফা’র বিশেষ আমল নয়। বরং এটি প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী যিলহজ্বের নয় তারিখ ফজর থেকে শুরু হয়ে তের তারিখ অাছরের মধ্যবর্তী সময়ের অামল। অথচ যে দলীল দ্বারা নয় তারিখ থেকে তাকবীরে তাশরীক শুরু হওয়া প্রমাণিত তাতেও ইয়াওমে আরাফা শব্দই আছে। 
দলীলের আরবী পাঠ এই-
عن علي رضي الله عنه : أنه كان يكبر بعد صلاة الفجر يوم عرفة، إلى صلاة العصر من آخر أيام التشريق، ويكبر بعد العصر.:
(আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৪/১৯৫ হাদীস ৫৬৭৭, ৫৬৭৮ শায়খ আওয়ামাহ তাহকীককৃত) [হাফিজ ইবনে হাজার রহ. তাঁর আদ দিরায়া গ্রন্থে বলেন-এর সনদ সহীহ]

এখানে ইয়াওমে আরাফা শব্দটি কি নয় যিলহজ্ব এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় নাই? এটা কি ভুল?
সুতরাং বুঝা গেল 'ইয়াওমু অারাফা' অর্থ নয় জিলহজ্ব হওয়া একটি প্রসিদ্ধ এবং স্বীকৃত বিষয় তাই 'সওমু ইয়াওমি অারাফা' অর্থ জিলহজ্বের নয় তারিখের রোজা হবে এটাই সঠিক কথা।
তিন.
হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে একসাথে বিশ্বের সকল মুসলামের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভবও নয়। কারণ, যেদিন হাজীরা আরাফায় অবস্থান করবে দেখা যাবে বিশ্বের কোন কোন দেশে তখন রাত চলছে যেমন আমেরিকার কথাই দরুন সউদিয়ারবের দিন হলে আমেরিকার রাত তাই তাদের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভব নয়। সুতরাং ইয়ামু অারাফা'র এমন অর্থ গ্রহণ করতে হবে যে অর্থ অনুযায়ী বিশ্বের সকল মুসলামানের পক্ষে ইয়াওমু অারাফা'র রোযা রাখা সম্ভব হয়। অার এটা ইয়াওমু অারাফা'র অর্থ নয় জিলহজ্ব ধরলেই সম্ভব।

চার.
গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা রয়েছে যে, ইয়াওমে আরাফার পরের দিনটিই ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিন। পৃথিবীর কোন অালেম বলেন নি যে, ইয়াওমে আরাফা এবং ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিনের মাঝে তৃতীয় কোন দিন থাকতে পারে। এখন অামাদের বাংলাদেশের কথাই দরুন, সউদী অারবের সাথে এখানকার অধিবাসীদের অারবী তারিখে সাধারণত এক দিনের ব্যবধান হয়ে থাকে। অার ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিন দশ জিলহজ্বে হওয়াটা তো নির্ধারিত। সুতরাং এই অঞ্চলের অধিবাসীরা যদি 'ইয়াওমে আরাফা'র অর্থ হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিন (যা অামাদের দেশের হিসাব অনুযায়ি জিলহজ্বের অাট তারিখ হয়) ধরে নেয় তাহলে ইয়াওমু অারাফা এবং ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিনের মাঝে তৃতীয় অারেকটি দিন অতিরিক্ত হয়ে যায়, যা সম্পূর্ণ উদ্ভট এবং ইজমা বিরোধী।

তো এ জাতীয় বিচ্ছিন্ন চিন্তা ও বক্তব্য আরো কিছু ক্ষেত্রেও বিচ্ছিন্নতাকে অনিবার্য করে তুলবে। সুতরাং হাদীসে বর্ণিত ইয়াওমু অারাফা'র অর্থ জিলহজ্বের নয় তারিখ এটাই সঠিক কথা।
হায়! অামাদের ঐসকল ভাইয়েরা যারা মানুষদেরকে হাজীদের আরাফায় অবস্থানের দিন রোযা রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন তারা যদি উপরোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে একটু চিন্তা করতেন এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বেঁচে থাকতেন!
মাহবুবুল হাসান আরিফী
জামিয়া ইসলামিয়া মোমেনশাহী
তারিখ ০৬/০৯/২০১৫ ইং রি-পোস্ট


কোরবানীর সাথে আকীকা সুন্নাহর অালোকে বিভ্রান্তি-নিরসন

Mahbubul Hasan Arife

কোরবানীর মত আকীকাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষ গুরুত্বের সাথে আকীকার কথা উল্লেখ করেছেন, যা হাদীস শরীফের কিতাবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। বাচ্চা জন্মের সপ্তম দিনে এই কাজটি সম্পাদন করতে হয়। কোন কারণে এই দিনে আকীকা দিতে না পারলে পরবর্তীতে তা আদায় করার সুযোগ রয়েছে।
কোরবানী ও আকীকা আলাদাভাবেই করা উচিৎ। প্রশ্ন হল, কেউ যদি আকীকা এবং কোরবানী একসাথে দিয়ে দেয়, তাহলে সেটা কি অবৈধ হবে? বা একারণে আকীকা ও কোরবানী আদায় হবে না?
কোরআন সুন্নাহর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালে আকীকার সাথে কোরবানী দেয়ার বৈধতাই প্রমাণিত হয়। বিষয়টি বুঝতে হলে কয়েকটি বিষয় বুঝতে হবে।
এক.
আকীকাও এক ধরণের কোরবানী। হাদীস শরীফে আকীকাকে কোরবানী বলা হয়েছে এবং কোরবানীর জন্য যে শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে আকীকার ক্ষেত্রে সেই শব্দটিই প্রয়োগ করা হয়েছে।

সূরা আনআমের ১৬২ নং অায়াতে কোরবানীকে ‘নুসুক’ বলা হয়েছে তেমনিভাবে সহীহ বুখারী ও মুসলিমসহ হাদীসের অসংখ্য কিতাবে কোরবানীকে নুসুক বলা হয়েছে। অপরদিকে কোরবানীর মত আকীকার ক্ষেত্রেও হাদীস শরীফে ‘নুসুক’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে যার অর্থ কুরবানী। 
(দ্র. আলমুসান্নাফ, আব্দুর রাযযাক : ৪/৩৩০, হাদীস ৭৯৬১; আলমুসনাদ, আহমদ : ১১/৩২০; আসসুনান, আবু দাউদ (আকীকা অধ্যায়) ২৮৪২;আস সুনান, নাসায়ী : হাদীস ৪২১২; আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২৪ হাদীস : ২৪৭২৭)
(দ্র. আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২১, হাদীস : ২৪৭২২; আলমুয়াত্তা, ইমাম মালিক, আকীকা অধ্যায়, হাদীস : ১৪৪১)

সুতরাং বুঝা গেল, আকীকাও এক ধরণের কোরবানী। একারণেই তো হাসান বাসারী রহ. এবং ইবেনে সীরীন রহ. বলেছেন, বাচ্চার পক্ষ থেকে কোরবানী দিলে এটাই তার আকীকার জন্য যথেষ্ট হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২৯ হাদীস ২৪৭৪৩)
অার একারণেই তো কোরবানী এবং আকীকার গোশত, চামড়া ইত্যাদির বিধান এক।
হিশাম ইবনে হাসসান রহ., হাসান বাসারী রহ. এবং ইবনে সীরীন রহ. সম্পর্কে বলেন, আকীকা তাদের মতে কোরবানির মর্যাদা রাখে; আকীকা আদায়কারী নিজে এর গোশত খাবে এবং অন্যকে খাওয়াবে (যেমনিভাবে কোরবানীর গোশত নিজে খায় অন্যকে খাওয়ায়) [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২৭ হাদীস ২৪৭৫০,২৪৭৫১)

এ-সম্পর্কে ইমাম মালিক রহ. এর বক্তব্য খুবই সুস্পষ্ট। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার সন্তানের আকীকা করল তার সেই আকীকা কোরবানীর পর্যায়ে; সেই আকীকায় চোখের জ্যোতি ক্ষতিগ্রস্ত, শীর্ণকায়, শিং ভাংগা, অসুস্থ প্রাণী জবাই করা যায়েজ হবে না। এর গোশত এবং চামড়া বিক্রি করা যাবে না....(যেমনিভাবে এগুলো দিয়ে কোরবানী যায়েজ হয় না) (মুয়াত্তা: হাদীস ১৪৪৮)
ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেন, জুমহুর ফুকাহার মতও তাই। অর্থাৎ আকীকার মধ্যে ঐ-সকল দোষ থেকে পরিহার করা হবে, কোরবানীর মধ্যে পরিহার করা হয়। (আল-ইসতিযকার: ১৫/৩৮৪)
তিনি অন্যত্র বলেন, এ-বিষয়ে উলামাদের ইজমা রয়েছে যে, গবাদী পশুর মধ্য থেকে কোরবানির মধ্যে যা যায়েজ হয়, আকীকার মধ্যে শুধু ঐসকল পশুই জবাই করা যায়েজ হবে। (আল-ইসতিযকার: ১৫/৩৮৩)
দুই.
দুই ধরনের কুরবানী (যেমন এখানে আকীকা এবং ওয়াজিব কোরবান দুটি) একটি পশু দ্বারা আদায় করা যায়েজ আছে কি না? তো এটি একটি ইজতিহাদী বিষয়। একারণে মুজতাহিদ ইমামগণের মাঝে এ বিষয়ে কিছু মতপার্থক্যও আছে। কিন্তু নস বা কুরআন-সুন্নাহর সুষ্পষ্ট কোনো বিধানে এ বিষয়ে নিষেধ আছে বলে আমাদের জানা নেই; বরং অনুমোদনের পক্ষে হাদীস-আছারের প্রমাণ রয়েছে।

বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ‘আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ. এর ফতোয়াটিই সম্ভবত বিজ্ঞজনের জন্য যথেষ্ট হবে। তিনি বলেছেন, ‘উট ও গরু সাতজনের পক্ষ হতে কুরবানী হতে পারে। আর এতে শরীক হতে পারে কুরবানীকারী, তামাত্তু হজ্বকারী এবং হজ্বের ইহরাম গ্রহণের পর হজ্ব আদায়ে অপারগ ব্যক্তি।
(দ্র. আসসুনান, সায়ীদ ইবনে মানসূর-আল কিরা লি-কাসিদি উম্মিল কুরা, পৃ. ৫৭৩)

দেখুন, সালাফের যুগেই একটি পশু দ্বারা তিন ধরনের কুরবানী আদায় হওয়ার ফতোয়া কত স্পষ্টভাবে দেয়া হয়েছে।
তিন.
গরু বা উটের ক্ষেত্রে একটি পশু সাত জনের সাতটি জবাইয়ের স্থলাভিষিক্ত গণ্য হয়। একারণেই একটি উট বা গরু সাত জনের পক্ষে যথেষ্ট হয়। সহীহ মুসলিম শরীফে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমরা হজ্বের ইহরাম বেঁধে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বের হলাম। তিনি আমাদেরকে আদেশ করলেন যেন প্রত্যেক উট ও গরুতে সাতজন করে শরীক হয়ে কুরবানী করি। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল হজ্ব, হাদীস : ১৩১৮/৩৫১)

অন্য বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (একটি) গরু সাতজনের পক্ষ হতে এবং (একটি) উট সাতজনের পক্ষ হতে (কুরবানী করা যাবে)। (আস-সুনান, আবু দাউদ, হাদীস : ২৮০৮, কিতাবুল আযাহী)
চার.
সারকথা অাকীকাও একধরণের কোরবানী অপরদিকে ‘নুসুক’ বা কুরবানীর ক্ষেত্রে শরীয়তের প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি এই যে, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে একটি পশু দ্বারা একটি কুরবানী আদায় হলেও উট ও গরুর ক্ষেত্রে একটি পশু দ্বারা সাতটি কুরবানী আদায় হতে পারে। আকীকাও যেহেতু ‘নুসুক’ বা কুরবানী তাই এ মূলনীতিতে আকীকাও শামিল থাকবে। সুতরাং ‘একটি পশু জবাই’ করা দ্বারা যেমন তা আদায় হবে, তেমনিভাবে গরু বা উটের সপ্তমাংশে শরীক হওয়ার দ্বারাও তা আদায় হয়ে যাবে।

এখানে এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, ‘আকীকায় তো পশু জবাই করতে বলা হয়েছে। অতএব অন্তত একটি পশু জবাইয়ের দ্বারাই তা আদায় হতে পারে।’ কারণ শরীয়তের দৃষ্টিতে পশু জবাই-এর দায়িত্ব যেমন একটি পশু জবাই করার দ্বারা আদায় হয় তেমনিভাবে নির্ধারিত পশুতে অন্যদের সাথে শরীক হওয়ার দ্বারাও আদায় হয়। আকীকার ক্ষেত্রে এই মূলনীতি প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করলে ব্যতিক্রমের বিধানসম্বলিত দলীল লাগবে। আমাদের জানামতে এমন কোনো দলীল নেই।
বাকি থাকল দুই ধরনের কুরবানী এক পশু দ্বারা আদায় হওয়ার প্রশ্ন, এ বিষয়ে উপরে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।
আমাদের কিছু ভাই খুব সহজেই বলে দেন কোরবানীর সাথে আকীকা দেয়া যাবে না। হায়! তারা যদি উপরোক্ত কথাগুলো নিয়ে একটু ভাবতেন। আচ্ছা তারা যে সব কিছুতে হাদীস পেশ করার কথা বলেন, কোরবানীর সাথে আকীকা দেয়া নিষেধ, এ সংক্রান্ত কোন হাদীস কি তারা পেশ করেছেন?
ইয়া আল্লাহ আপনি সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন, আমিন।


বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

আবু জাহেলের জুলুম প্রতিরোধে রাসূলুল্লাহ (সা:)

জাহেলিয়াতের যুগে আবু জাহল জনৈক ইয়াতিমের অভিভাবক ছিল। সে ঐ ইয়াতিমের পৈতৃক সম্পত্তি দেখাশুনার নামে নিজেই ভোগ দখল করত এবং ইয়াতিমকে তার কোন অংশই দিত না। একদিন সেই ইয়াতিম বালক তার কাছে এসে পিতার পরিত্যক্ত সম্পত্তির কিছু অংশ চাইল। তার গায়ে তখন কাপড় চোপড়ও ছিল না। কিন্তু পাষন্ড আবু জাহল তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করলোনা।
ছেলেটি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে হতাশ হয়ে ফিরে চলল। কোরায়েশ নেতাদের কয়েকজন দুষ্টমি করে তাঁকে বললোঃ “মুহাম্মদের(সা) কাছে নালিশ করে দে। সে আবু জাহলের কাছে সুপারিশ করে তোর সম্পত্তি আদায় করে দেবে।” আসলে তাদের মতলব ছিল আবু জাহলের সাথে একটা টক্কর লাগিয়ে দিয়ে রাসূল(সা) কে জব্দ করা।
ছেলেটি জানতোই না যে, আবু জাহলের সাথে তার সম্পর্ক কী এবং তারা কোন্ উদ্দেশ্যে তাকে এই পরামর্শ দিচ্ছে। সে সরল মনে রাসূল(সা)এর কাছে হাজির হলো এবং নিজের পুরো ঘটনা বর্ণনা করলো।
রাসূল(সা) তৎক্ষণাত উঠলেন এবং তাঁর কট্টর দুশমন আবু জাহলের কাছে চলে গেলেন। তাঁকে দেখে আবু জাহল স্বাগত জানালো। তিনি যখন বললেন যে, এই ছেলেটার পাওনা দিয়ে দাও, তখন সে নির্বিবাদে মেনে নিল এবং তার পাওনা দিয়ে দিল।
ওদিকে কুরায়শ নেতারা অপেক্ষায় ছিল আবু জাহল ও মুহাম্মদের(সা) মধ্যে কী কান্ড ঘটে তা দেখার জন্য। তারা একটা মজার সংঘর্ষ ঘটার খবরের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু যখন পুরো ঘটনার খবর পেল, তখন অবাক হয়ে গেল এবং আবু জাহলকে এসে ভৎসর্না করতে লাগলো যে, সে এমন সুযোগ হাতছাড়া করলো কেন এবং সেও ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে বলে চিৎকার করতে লাগলো।
আবু জাহল তাদেরকে বললোঃ “আল্লাহর কসম, আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করি নি। কিন্তু আমি দেখতে পেলাম যেন মুহাম্মদের ডানে ও বামে এক একটা বর্শা রয়েছে, আমি তার কথামত কাজ না করলে তা আমার বুকের মধ্যে ঢুকে যাবে।”
শিক্ষাঃ ইয়াতিম ও দুস্থ মানুষের উপর কেউ নির্যাতন করলে তা নীরবে বরদাশত করা উচিত নয়। সমাজের প্রভাবশালী লোকদের উচিত আল্লাহর উপর ভরসা করে যুলুম প্রতিরোধের চেষ্টা করা। যালেমদের সাধারণতঃ মনোবল কম থাকে।
দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে তারা প্রায়ই হার মানে।
এ কাজে একাকী অগ্রসর হলেও আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার আশা করা যায়।

ইবরাহীম (আঃ) এর বায়তুল্লাহ নির্মাণের ঘটনা!

বায়তুল্লাহ প্রথমে ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেন।
অতঃপর হযরত আদম (আঃ) পুনর্নিমাণ করেন জিব্রীলের ইঙ্গিত মতে। তারপর নূহের তূফানের সময় বায়তুল্লাহর প্রাচীর বিনষ্ট হ’লেও ভিত্তি আগের মতই থেকে যায়। পরবর্তীতে আল্লাহর হুকুমে একই ভিত্তিভূমিতে ইবরাহীম তা পুনর্নির্মাণ করেন।
এই নির্মাণকালে ইবরাহীম (আঃ) কেন‘আন থেকে মক্কায় এসে বসবাস করেন। ঐ সময় মক্কায় বসতি গড়ে উঠেছিল এবং ইসমাঈল তখন বড় হয়েছেন এবং বাপ-বেটা মিলেই কা‘বা গৃহ নির্মাণ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তখন থেকে অদ্যাবধি কা‘বা গৃহে অবিরত ধারায় হজ্জ ও ত্বাওয়াফ চালু আছে এবং হরম ও তার অধিবাসীগণ পূর্ণ শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সহকারে সেখানে বসবাস করে আসছেন।
এ বিষয়ে কুরআনী বর্ণনা সমূহ নিম্নরূপ:
আল্লাহ বলেন, 
-‘আর যখন আমরা ইবরাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, ছালাতে দন্ডায়মানদের জন্য ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য’ (হজ্জ ২২/২৬)।

আল্লাহ বলেন,
-‘আর তুমি মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা জারি করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং (দীর্ঘ সফরের কারণে) সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত হ’তে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং (কুরবানীর) নির্দিষ্ট দিনগুলিতে (১০, ১১, ১২ই যিলহাজ্জ) তাঁর দেওয়া চতুষ্পদ পশু সমূহ যবেহ করার সময় তাদের উপরে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং আহার করাও অভাবী ও দুস্থদেরকে’ (হজ্জ ২২/২৭-২৮)।

উপরোক্ত আয়াতগুলিতে কয়েকটি বিষয় জানা যায়। যেমন-
(১) বায়তুল্লাহ ও তার সন্নিকটে কোনরূপ শিরক করা চলবে না
(২) এটি স্রেফ তাওয়াফকারী ও আল্লাহর ইবাদতকারীদের জন্য নির্দিষ্ট হবে
(৩) এখানে কেবল মুমিন সম্প্রদায়কে হজ্জের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
হযরত ইবরাহীম (আঃ) মাক্বামে ইবরাহীমে দাঁড়িয়ে এবং কোন কোন বর্ণনা মতে আবু কুবায়েস পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে দুই কানে আঙ্গুল ভরে সর্বশক্তি দিয়ে উচ্চ কণ্ঠে চারদিকে ফিরে বারবার হজ্জের উক্ত ঘোষণা জারি করেন।
ইমাম বাগাভী হযরত ইবনু আববাসের সূত্রে বলেন যে, ইবরাহীমের উক্ত ঘোষণা আল্লাহ পাক সাথে সাথে বিশ্বের সকল প্রান্তে মানুষের কানে কানে পৌঁছে দেন। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ইবরাহীমী আহবানের জওয়াবই হচ্ছে হাজীদের ‘লাববায়েক আল্লা-হুম্মা লাববায়েক’ (হাযির, হে প্রভু আমি হাযির) বলার আসল ভিত্তি। সেদিন থেকে এযাবত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হ’তে মানুষ চলেছে কা‘বার পথে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ উটে, কেউ গাড়ীতে, কেউ বিমানে, কেউ জাহাযে ও কেউ অন্য পরিবহনে করে।
আবরাহার মত অনেকে চেষ্টা করেও এ স্রোত কখনো ঠেকাতে পারেনি। পারবেও না কোনদিন ইনশাআল্লাহ। দিন-রাত, শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে সর্বদা চলছে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও ছাফা-মারওয়ার সাঈ।
আর হজ্জের পরে চলছে কুরবানী। এভাবে ইবরাহীম ও ইসমাঈলের স্মৃতি চির অম্লান হয়ে আছে মানব ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে। এক কালের চাষাবাদহীন বিজন পাহাড়ী উপত্যকা ইবরাহীমের দো‘আর বরকতে হয়ে উঠলো বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সম্মিলন স্থল হিসাবে।
যেমন আল্লাহ বলেন,
- ‘যখন আমরা কা‘বা গৃহকে লোকদের জন্য সম্মিলনস্থল ও শান্তিধামে পরিণত করলাম (আর বললাম,) তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানোর স্থানটিকে ছালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ কর। অতঃপর আমরা ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ই‘তেকাফকারী ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর’ (বাক্বারাহ ২/১২৫)।

–‘(স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম বলল, পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তির নগরীতে পরিণত কর এবং এর অধিবাসীদেরকে তুমি ফল-ফলাদি দ্বারা রূযী দান কর- যারা তাদের মধ্যে আল্লাহ ও ক্বিয়ামত দিবসের উপরে বিশ্বাস স্থাপন করে। (আল্লাহ) বললেন, যারা অবিশ্বাস করে, আমি তাদেরকেও কিছু ভোগের সুযোগ দেব। অতঃপর তাদেরকে আমি যবরদস্তি জাহান্নামের আযাবে ঠেলে দেব। কতই না মন্দ ঠিকানা সেটা’ (বাক্বারাহ ২/১২৬)।
ইবরাহীমের উপরোক্ত প্রার্থনা অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে।
যেমন আল্লাহ বলেন, 
-‘যখন ইবরাহীম বলল, হে আমার পালনকর্তা! এ শহরকে তুমি শান্তিময় করে দাও এবং আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখ’ (ইবরাহীম ৩৫)। ‘হে আমার পালনকর্তা! এরা (মূর্তিগুলো) অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতএব যে আমার অনুসরণ করে, সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্যতা করে, নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (ইবরাহীম ১৪/৩৬)।

অতঃপর কা‘বা গৃহ নির্মাণ শেষে পিতা-পুত্র মিলে যে প্রার্থনা করেন, তা যেমন ছিল অন্তরভেদী, তেমনি ছিল সুদূরপ্রসারী ফলদায়ক।
যেমন আল্লাহ বলেন-
‘স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা‘বা গৃহের ভিত নির্মাণ করল এবং দো‘আ করল- ‘প্রভু হে! তুমি আমাদের (এই খিদমত) কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’। ‘হে প্রভু! তুমি আমাদের উভয়কে তোমার আজ্ঞাবহে পরিণত কর এবং আমাদের বংশধরগণের মধ্য থেকেও তোমার প্রতি একটা অনুগত দল সৃষ্টি কর। তুমি আমাদেরকে হজ্জের নীতি-নিয়ম শিখিয়ে দাও এবং আমাদের তওবা কবুল কর।

নিশ্চয়ই তুমি তওবা কবুলকারী ও দয়াবান’। ‘হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি এদের মধ্য থেকেই এদের নিকটে একজন রাসূল প্রেরণ কর, যিনি তাদের নিকটে এসে তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী ও দূরদৃষ্টিময়’ (বাক্বারাহ ২/১২৭-১২৯)।
ইবরাহীম ও ইসমাঈলের উপরোক্ত দো‘আ আল্লাহ কবুল করেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে তাদের বংশে চিরকাল একদল মুত্তাকী পরহেযগার মানুষের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। তাঁদের পরের সকল নবী তাঁদের বংশধর ছিলেন। কা‘বার খাদেম হিসাবেও চিরকাল তাদের বংশের একদল দ্বীনদার লোক সর্বদা নিয়োজিত ছিল। কা‘বার খেদমতের কারণেই তাদের সম্মান ও মর্যাদা সারা আরবে এমনকি আরবের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিল। আজও সঊদী বাদশাহদের লক্বব হ’ল ‘খাদেমুল হারামায়েন আশ-শারীফায়েন’ (দুই পবিত্র হরমের সেবক)। কেননা বাদশাহীতে নয়, হারামায়েন-এর সেবক হওয়াতেই গৌরব বেশী।
ইবরাহীমের দো‘আর ফসল হিসাবেই মক্কায় আগমন করেন বিশ্বনবী ও শেষনবী মুহাম্মাদ (সাঃ)।
তিনি বলতেন,َ-‘আমি আমার পিতা ইবরাহীমের দো‘আর ফসল ও ঈসার সুসংবাদ’।
এই মহানগরীটি সেই ইবরাহীমী যুগ থেকেই নিরাপদ ও কল্যাণময় নগরী হিসাবে অদ্যাবধি তার মর্যাদা বজায় রেখেছে। জাহেলী আরবরাও সর্বদা একে সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখত।
এমনকি কোন হত্যাকারী এমনকি কোন পিতৃহন্তাও এখানে এসে আশ্রয় নিলে তারা তার প্রতিশোধ নিত না। হরমের সাথে সাথে এখানকার অধিবাসীরাও সর্বত্র সমাদৃত হ’তেন এবং আজও হয়ে থাকেন।

ন্যায় বিচার — খলিফা হারুন অর রশিদের গল্প

সিরিয়ার একটি শহরের নাম রাকা। সেখান থেকে খলিফা হারুনুর-রশিদের নিকট চিঠি আসলো। চিঠিতে লেখা ছিল: শহরের বিচারক এক মাস যাবত অসুস্থ,বিচার কাজ স্থবির হয়ে আছে । খলিফা যেন দ্রুত ব্যবস্থা করেন । খলিফা চিঠির জবাব পাঠালেন । আগামী সপ্তাহের মধ্যে নতুন বিচারক আসবেন । এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন বিচারক এসে যোগ দিলেন ।

বিচার কাজ শুরু হয়েছে । স্থানীয় প্রহরীরা একজন বৃদ্ধা মহিলাকে আসামী হিসেবে দরবারে হাজির করলেন । তার অপরাধ ছিল তিনি শহরের এক রেস্তারাঁ থেকে কিছু রুটি আর মধু চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পরেন ।
বিচারক: আপনি চুরি করেছেন?
– জ্বি ।
– আপনি কি জানেন চুরি করা কতো বড় অপরাধ ও পাপ ?
– জ্বি ।
– জেনেও কেন চুরি করলেন ?
– কারণ আমি গত এক সপ্তাহ যাবত অভুক্ত ছিলাম । আমার সাথে এতিম দু’নাতিও না খেয়ে ছিল । ওদের ক্ষুদারত চেহারা ও কান্না সহ্য করতে পারিনি তাই চুরি করেছি। আমার আর এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না হুজুর ।
বিচারক এবার পুরো দরবারে চোখবুলালেন। বললেন কাল যেন নগর, খাদ্য,শরিয়া, পুলিশ প্রধান ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যাক্তিগন সবাই উপস্থিত থাকেন ।তখন এর রায় দেওয়া হবে ।
পরদিন সকালে সবাই হাজির হলেন । বিচারক ও যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে রায় ঘোষণা করলেন-“ বৃদ্ধা মহিলার চুরির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ৫০টি চাবুক, ৫০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা আর অনাদায়ে এক বছর কারাদণ্ড দেওয়া করা হলো। তবে অকপটে সত্য বলার কারণে হাত কাটা মাফ করা হলো। বিচারক প্রহরীকে চাবুক আনার নির্দেশ দিয়ে নিচে নেমে ঐ বৃদ্ধা মহিলার পাশাপাশি দাঁড়ালেন ।
বিচারক বললেন যে নগরে একজন ক্ষুধার্তবৃদ্ধ মহিলা না খেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় চুরি করতে বাধ্য হয় সেখানে তো সবচেয়ে বড় অপরাধী সে দেশের খলিফা। আর আমি এসেছি খলিফার প্রতিনিধি হয়ে । আমি যেহেতু তাঁর অধীনে চাকরি করি তাই ৫০টি চাবুকের ২০টি আমার হাতে মারা হউক । আর এটাই হলো বিচারকের আদেশ । আদেশ যেন পালন করা হয় এবং বিচারক হিসাবে আমার উপর চাবুক মারতে যেন কোনো রকম করুণা বা দয়া দেখানো না হয়।
বিচারক হাত বাড়িয়ে দিলেন । দুই হাতে পর পর ২০টি চাবুক মারা হলো। চাবুকের আঘাতের ফলে হাত থেকে রক্ত গড়িয়ে পরছে । ঐ অবস্থায় বিচারক পকেট থেকে একটি রুমাল বের করলেন । কেউ একজন বিচারকের হাত বাঁধার জন্য এগিয়ে গেলে বিচারক নিষেধ করেন। এরপর বিচারক বললেন “ যে শহরে নগর প্রধান, খাদ্য গুদাম প্রধান ও অন্যান্য সমাজ হিতৈষীরা একজন অভাব গ্রস্হ মহিলার ভরন-পোষণ করতে পারেন না। সেই নগরে তারা ও অপরাধী। তাই বাকি ৩০টি চাবুক সমান ভাবে তাদেরকে মারা হোক ।“
এরপর বিচারক নিজ পকেট থেকে বের করা রুমালের উপর ৫০টি রৌপ্য মুদ্রা রাখলেন । তারপর বিচারপতি উপস্থিত সবাইকে বললেন “যে সমাজ একজন বৃদ্ধমহিলাকে চোর বানায়, যে সমাজে এতিম শিশুরা উপবাস থাকে সে সমাজের সবাই অপরাধী । তাই উপস্থিত সবাইকে ১০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানা করা হলো।“
এবার মোট ৫০০দিনার রৌপ্য মুদ্রাথেকে ১০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানাবাবদ রেখে বাকি ৪০০টি রৌপ্য মুদ্রা থেকে ২০টি চুরি যাওয়া দোকানের মালিককে দেওয়া হলো। বাকি ৩৮০টি রৌপ্য মুদ্রা বৃদ্ধা মহিলাকে দিয়ে বললেন “ এগুলো আপনার ভরণপোষণের জন্য । আর আগামী মাসে আপনি খলিফা হারুনুর রশিদের দরবারে আসবেন । খলিফা হারুনুর রশিদ আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী । “
একমাস পরে বৃদ্ধা খলীফার দরবারে গিয়ে দেখেন ; খলীফার আসনে বসা লোকটিকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে । মহিলা ভয়ে ভয়ে খলীফার আসনের দিকে এগিয়ে যান। কাছে গিয়েবুঝতে পারেন লোকটি সেদিনের সেই বিচারক। খলীফা চেয়ার থেকে নেমেএসে বললেন —আপনাকে ও আপনার এতিম দু’নাতিকে উপোস রাখার জন্য সেদিন বিচারক হিসেবে ক্ষমা চেয়েছিলাম । আজ দরবারে ডেকে এনেছি প্রজা অধিকারসমুন্নত করতে না পারা অধম এই খলীফাকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য ।আপনি দয়াকরে আমাকে ক্ষমা করুন ।

এক নর্তকীর ইসলাম গ্রহনের চমকপ্রদ ঘটনা!

২০১১— বাংলাদেশ থেকে একটি তাবলীগ জামাত কানাডায় গিয়েছিল। ওখানকার এক কর্নেলের নাম আমীরুদ্দীন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকটি এখন কানাডার নাগরিক। ডানভিরে একটি ক্লাব আছে মুসলমানদের সেখানে নাচ-গান হয়।
জামাত সেখানে গাশ-তে গেল ক্লাবের অশ্লীল পরিবেশ বিধায় বেছে-বেছে বৃদ্ধদের পাঠানো হলো। মঞ্চে এক বিবসনা যুবতী নাচছিল। এক যুবক তার ড্রামা বাজাচ্ছিল।
-দর্শক কারা?
- সকলেই মুসলমান।

মুতাকাল্লিম আমাদের সাথী আমাদের কর্নেল আমীরুদ্দীন। প্রভাবশালী চেহারা। মুখজুড়ে সাদা ঘন দাড়ি। ক্লাবে প্রবেশ করেই তিনি সজোরে একটা হাঁক দিলেন।
- নর্তকী মেয়েটির কন্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার নৃত্যও বন্ধ হয়ে গেল, কিছু লোক মদ্যপান করছিল। তারা হঠাৎ কেঁপে ওঠল। কি ব্যাপার/একসাথে একাধিক কন্ঠ ভেসে ওঠল।
আমার কথা শোনো! কর্নেল আমীরুদ্দীন তাদেরকে দাওয়াত দিলেন। তিনি উপস্হিত সকলকে উদ্দেশ্য করে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন।
কিছুক্ষন মনোযোগ সহকারে তার বক্তব্য শুনে নর্তকী মেয়েটি মঞ্চ থেকে নেমে এল। আশপাশ থেকে একটি কাপর সংগ্রহ করে নিজেকে ঢেকে নিল। ক্লাবের অধিকংশ দর্শক মদে মাতাল অচেতন অবস্হায় পড়ে আছে।
কর্নেল আমীরুদ্দীন বললেন- মেয়েটি তাদের অগোচরে আস্তে-আস্তে আমার পিছনে এসে দাড়িয়ে গেল বলল, আপনি যা কিছু বলেছেন, আমি বুঝে ফেলেছি” কিন্তু ওরা বোঝেনি। এখন বলুন, 
- আমি কি করব?
আপনি যে জিন্দেগির কথা বলেছেন, আমি সেই জিন্দেগি কামনা করি।

মুতাকাল্লিম বললেন- আমারা মানুষকে কালেমার দাওয়াত দিয়ে থাকি। তুমি জন্মগতভাবে মুসলমান, কিন্তু ইসলামের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই। 
- এই যে পেশাটা তুমি অবলম্বন করেছ, এ-পেশা অবলম্বন করলে মানুষের ঈমান থাকে না। তুমি কালেমা পড়ে পুনরায় মুসলমান হয়ে যাও।

-মেয়েটি বলল, আমি কালেমা জানি না, আপনি পড়িয়ে দিন। মুতাকাল্লিম তাকে কালেমা পড়ালেন। নিজে কলেমা পাঠ করে মেয়েটি বলল, আমার সাথে যে ছেলেটি ড্রামা বাজাচ্ছিল, ও আমার স্বামী!আপনি ওকেও কালেমা পড়িয়ে দিন। তারা দুজনে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল। আমাদের মুতাকাল্লিম কর্নেল ভাই তাদের ইলম শিখাতে থাকলেন।
তিন দিন পর উক্ত অঞ্চল ত্যাগ করে চলে আসবার সময় তারা আমাদেরকে একটি ফোন নম্বর দিয়ে বলল, খোজখবর নেবেন। আমরা তাদেরকে ডানভিরের একটি ইসলামিক সেন্টারের ঠিকানা দিয়ে বললাম, প্রয়োজন হলে এখানে যোগাযোগ করো।
- দুমাস পর মেয়েটির ফোন এল। আস্ সালামু আলাইকুম,টরেন্টাে থেকে বলছি, আমাকে চিনতে পেরেছেন?
আমি সেই নর্তকী, যার সাথে ডানভিরে কথা হয়েছিল এবং আমরা স্বামী-স্ত্রী আপনাদের হাতে মুসলমান হয়েছিলাম।

- অামি সালম এর উওর দিয়ে বললাম, হ্যা, চিনতে পেরেছি। 
-তা তোমরা কেমন আছ?
- বলল” আমরা একটি সমস্যায় পরেছি-অনেক বড় সমস্যা। 
- বলো কি সমস্যা?
- আমি যখন নাচতাম তখন একরাত পাঁচশত ডলার উপার্জন হতো। ইসলাম গ্রহন করার পর সেই পেশা ছেড়ে দিয়ে স্বামীকে বললাম, ইসলামের বিধান মোতাবেক তুমি উপার্জন করো আর আমি ঘর সামলাই। কিন্তু তারও তো পেশা ছিল নাচগান করা। এখন এসব ছেড়ে সে ও বেকার। হালাল কোন কাজ পাচ্ছে না। অবশেষে নিরুপায় হয়ে সে একটি সরাইখানায় শ্রমিকের কাজ নিয়েছে। রোজ পায় চল্লিশ ডলার।

আগে ছিল রোজ পাঁচশত ডলার আর এখন চল্লিশ ডলার। সংসারে চরম অভাব ও সংকট দেখা দিয়েছে। বাড়িটা বিক্রি করে ফেলেছি। গাড়িগুলো বিক্রি করে দিয়েছি। এখন দুই রুমের একটি বাড়া বাসায় থাকি।
কিন্তু এর জন্য আমাদের কোন আক্ষেপ নেই। আমরা দীনের সন্ধান পেয়েছি, অন্ধকার জীবন থেকে আলোর জীবনে ফিরে এসেছি, এ আমাদের জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া। এই সম্পদের কাছে দুনিয়ার সব সম্পদই তুচ্ছ।
-আমি বললাম আল্লাহ তোমাদের কবুল করেছেন। আখেরাতে শান্তি পেতে দুনিয়ার জীবনে কিছু কষ্ট ভোগ করতেই হয়। দ্বীনের উপর অটল থাকা মুমিনের সব চেয়ে বড় কাজ। আল্লাহ্ সুবহানা ওয়াতা’আলা তোমাদের আরও হিম্মত দান করুন! আমীন।

ইমাম আবু হানিফা খলীফার কাছে হাত পাতলেন!

ইমাম আবু হানিফা (র)-এর একজন মুচি প্রতিবেশী ছিল।
মুচি তার ঘরের দরজায় বসে সারাদিন কাজ করতো এবং সারারাত ধরে মদ খেয়ে মাতলামি করতো
এবং অশ্লীল হৈচৈ ও গণ্ডগোল করে ইমামের মনোযোগ নষ্ট করতো।
এক রাতে ইমাম মুচির ঘর থেকে হৈচৈ শুনলেন না।
সে রাতে তিনি নিরিবিলি ইবাদত করতে পারলেন, কিন্তু মনে শান্তি পেলেন না।
পরদিন খুব সকালে ইমাম মুচির ঘরে গেলেন এবং মুচির খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলেন যে, তার মদ খেয়ে মাতলামির জন্যে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে জেলে পুরেছে।
খলীফা মানসূর তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়।
ইমাম আবু হানিফা (র) কোনদিন কোন ব্যাপারেই খলীফার দ্বারস্থ হননি।
বরং খলীফাই মাঝে মাঝে তাঁর দ্বারস্থ হয়েছেন।
কিন্তু আজ প্রতিবেশীর বিপদ তাকে অস্থির করে তুলল এবং তিনি দরবারে গিয়ে হাজির হলেন।
দরবারের দ্বাররক্ষকরা মহান অতিথির সম্মানে দ্বার খুলে দিলেন।
ইমামকে দেখে দরবারের আমীর-উমরাদের চোখ বিস্ফোরিত হল এবং স্বয়ং খলীফা আসন থেকে উঠে তাঁর দিকে অগ্রসর হলেন।
তিনি ইমাম কে নিয়ে তাঁর আসনে বসালেন এবং জানতে চাইলেন, কষ্ট করে তাঁর এ আগমনের কারণ কি?
ইমাম বললেন, ‘আপনার পুলিশ আমার একজন প্রতিবেশীকে গ্রেফতার করে জেলে পুরেছে।
আমি তার মুক্তির প্রার্থনা নিয়ে এসেছি।’খলীফা একটু চিন্তা করলেন।
তারপর বললেন, ‘হে সম্মানিত ইমাম, শুধু তাকে নয়, আপনার সম্মানে ঐ জেলের সবাইকে আমি মুক্তি দিলাম।’
ইমাম আবু হানিফা (র) তাঁর প্রতিবেশীকে নিয়ে ফিরে এলেন।
প্রতিবেশী ঐ মুচি এরপর আর কোনদিন মদ স্পর্শ করেনি।

তাবুক যুদ্ধে হযরত ওমর (রা)

তাবুক যুদ্ধের আগে নবী (সা) জিহাদের জন্য অনুদান সংগ্রহের ঘোষনা দিলেন।
প্রত্যেকে যার- যার সামর্থ অনুযায়ী অনুদান নিয়ে এলেন। হযরত ওমর (রা) ভাবলেন, আজ আমি আবু বক্করকে হারাতে পারব। আজ না পারলে আর কোন দিন পারবনা!

তিনি নিজের সমুদয় সম্পদকে দুই ভাগ করে এক ভাগ ঘরে রেখে বাকিটা নিয়ে দরবারে-নবুওতে হাজির হলেন।
প্রশ্নটা যদি এই হত যে, ওমর তুমি কী পরিমান এনেছ? আবু বক্কর, তুমি কী পরিমান এনেছ? তা হলে নিশ্চয়ই আজ ওমর জয়ী হতেন।
আমরা যখন মসজিদ-মাদরাসার জন্য চাঁদা সংগ্রহ করি, তখন কিন্তু এভাবেই মূল্যায়ন করি যে, কে কত দিল। কে কত-কী রেখে এল, তা কিন্তু আমরা দেখি না।
কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সা) মূল্যায়ন করলেন ভিন্নভাবে। নবী (সা) জিজ্ঞেস করলেন, ওমর, ঘরে কী রেখে এসেছ?
হযরত ওমর(রা) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, সম্পদ যা ছিল, তার অর্ধেক রেখে বাকি অর্ধেক নিয়ে এসেছি।
নবী করীম (সা) বললেন, তুমি ঘরে কী রেখে এসেছ? আবুবক্কর বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, ঘরে আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি। বাকি সমস্ত সম্পদ তন্ন তন্ন করে খুজে নিয়ে এসেছি।
তাফসীরে আযীযিতে আছে, হযরত আবুবক্কর (রা)ঘরের বেড়ায় কি যেন খুঁজতে ছিলেন।
মেয়ে জিজ্ঞেস করল, আব্বাজান, আপনি কি তালাশ করছেন?
বললেন, একটি সুই রাখা ছিল, সেটি খুঁজছি।

আল্লাহর পথে দানের এই প্রতিযোগিতায়ও হযরত আবুবক্কর (রা) জয়ী হলেন। 
( সহীহ বুখারী )

ইমাম আবু হানিফা ও নাস্তিক

একবার খলিফা হারুনুর রশীদের নিকট এক নাস্তিক এসে বললেন যে আপনার সাম্রাজ্যে এমন কোন জ্ঞানী
ব্যক্তিকে ডাকুন আমি তাকে তর্ক করে প্রমান করে দেব যে এই পৃথীবির কোন স্রস্টা নেই।
এগুলো নিজে নিজে সৃস্টি হয়েছে এবং আপনা থেকেই চলে ।
খলিফা হারুনুর রশীদের কিছুক্ষন ভেবে একটি চিরকুট মারাফত ইমাম আবু হানিফাকে ডাকলেন ও এই নাস্তিকের সাথে বিতর্কে অংশ নিতে অনুরোধ করলেন।
ইমাম আবু হানিফা দুত মারাফত খবর পাঠালেন যে তিনি আগামীকাল যোহরের সময়
আসবেন খলিফার প্রাসাদে নামায পড়ে তারপর বির্তকে অংশ নেবেনপরদিন যোহরের নামাযের সময়
খলিফা তার সভাসদ বর্গ ও নাস্তিক তি অপেক্ষা করতে লাগল।
কিন্তু যোহরের নামায তো দুরের কথা আসর শেয় হয়ে গেল তিনি মাগরীবের নামাযের সময় আসলেন।
নাস্তিকটি তার কাছে এত দেরীতে আসার কারন জনতে চাইল
তিনি বললেন আমি দজলা নদীর ওপারে বাস করি।আমি খলীফার দাওয়াত পেয়ে নদীতে এসে দেখি কোন নৌকা নেই।
অনেকক্ষন অপেক্ষা করেও কোন নৌকা পেলাম না।
সহসা আমি দেখলাম একটি গাছ আপনা-আপনা উপরে পড়ল্তার পর সেটি চেরাই হয়ে নিজ থেকেই তক্তায় পরিনত হল।
তারপরএটি নিজেনিজে একটি নৌকায় পরিনত হল।অত:পর আমি এটায় চড়ে বসলাম।
নৌকাটি নিজে নিজে চলতে চলতে আমাকে এপারে পৌছিয়ে দিল।
নাস্তিকটি একথা শুনে হো হো করে হেসে ফেলল।
তাপর বলল ইমাম সাহেব আমাকে কি বোকা পেয়েছেন যে আমি এমন গাজাখুরি গল্প বিশ্বাস করব।
একটা গাছ আপনা থেকে নৌকায় পরিনত হবে, এটা কি করে সম্ভব?
ইমাম আবু হানিফা বললেন ওহে নাস্তিক সাহেব একটা গাছ যদি আপনা থেকে নৌকায় পরিনত না হতে পারে এবং নদী পরাপার না হতে পারে, তাহলে কিভাবে এই বিশাল আকাশ চন্দ্র সূর্য নক্ষত্র আপনা আপনি তৈরী হতে এবং চালু থাকতে পারে ??
নাস্তিকটি লা-জওয়াব হয়ে মুখ কাচুমাচু করে বিদায় নিল।
খলিফা হারুনুর রশীদ তার তাৎক্ষনিক জবাবে মুগ্ধ হয়ে ইমাম সাহেব কে সসম্মানে বিদায় দিলেন।
কোন তর্কে যাওয়ার আগেই নাস্তিকটি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে গেল।
শিক্ষাঃ নাস্তিক ও খোদাদ্রোহীদের কোন যুক্তি থাকে না।
বিচক্ষণতা ও সাহস নিয়ে তাদের মোকাবিলা করলেই তারা পরাজিত হতে বাধ্য।
তবে এ যুগের নাস্তিক ও খোদাদ্রোহীরা যুক্তির অভাবে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য মুসলমানদেরকে মাথা ঠান্ডা রেখে সুপরিকল্পিতভাবে শক্তি অর্জন করে জেহাদের জন্য প্রস্ততি নিতে হবে।

মুমিনদের শাফা‘আত!

ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর বিচারের পরে যারা সৎকর্মশীল তারা জান্নাতে চলে যাবে। আর মুমিনরা অন্য মুমিনদের জন্য আল্লাহর কাছে সুফারিশ করবে। ফলে বহুমানুষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। এ সম্পর্কেই নিম্নোক্ত হাদীছটি।
-- আবু সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, একদা কতিপয় লোক জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! ক্বিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব?
-তিনি বললেন, হ্যাঁ। মেঘমুক্ত দ্বিপ্রহরের আকাশে সূর্য দেখতে কি তোমাদের কষ্ট হয় এবং মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে কি তোমাদের কোন অসুবিধা হয়?
-তারা বলল না, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এ সময় চন্দ্র-সূর্য দেখতে তোমাদের যে অসুবিধা হয় ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখতে এর চেয়ে বেশী কোন অসুবিধা হবে না। যখন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা দিবেন, প্রত্যেক উম্মত যে যার ইবাদত করত সে যেন তার অনুসরণ করে। তখন যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করত, তাদের একজনও বাকী থাকবে না। সকলেই জাহান্নামের মধ্যে গিয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত এক আল্লাহর ইবাদতকারী নেক্কার ও গুনাহগার ছাড়া আর কেউ বাকী থাকবে না। তারপর আল্লাহ তাদের নিকট আসবেন এবং বলবেন, তোমরা কার অপেক্ষায় আছ? প্রত্যেক উম্মত, যে যার ইবাদত করত, সে তার অনুসরণ কর। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো সে সব লোকদেরকে দুনিয়াতেই বর্জন করেছিলাম, যখন আজকের অপেক্ষায় তাদের কাছে আমাদের বেশী প্রয়োজন ছিল। আমরা কখনও তাদের সঙ্গে চলিনি।
-আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে, তখন তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রব আমাদের নিকট না আসেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এ স্থানে অপেক্ষা করব। যখন আমাদের প্রতিপালক আসবেন, তখন আমরা তাকে চিনতে পারব।
-আর আবু সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে, আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমাদের এবং তোমাদের প্রতিপালকের মধ্যে এমন কোন চিহ্ন আছে কি যাতে তোমরা তাঁকে চিনতে পারবে? তারা বলবে, হ্যাঁ। তখন আল্লাহর পায়ের নলা প্রকাশ করা হবে এবং বিশেষ আলো প্রকাশিত হবে। তখন যে ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহকে সিজদা করত, শুধু তাকেই আল্লাহ সিজদার অনুমতি দিবেন। আর যারা কারো ভয়ে কিংবা মানুষকে দেখানোর জন্য সিজদা করত, তারা থেকে যাবে। তারা পিঠের পিছনের দিকে চিৎ হয়ে উল্টে পড়ে যাবে। তারপর জাহান্নামের উপর দিয়ে পুলছিরাত পাতানো হবে এবং শাফা‘আতের অনুমতি দেওয়া হবে। তখন নবী রাসূলগণ স্ব স্ব উম্মতের জন্য এ প্রার্থনা করবেন, হে আল্লাহ! নিরাপদে রাখ, নিরাপদে রাখ। অনেক মুমিন এ পুলছিরাতের উপর দিয়ে চোখের পলকে পার হয়ে যাবে। অনেকেই বিদ্যুতের গতিতে পার হবে। অনেকেই বাতাসের গতিতে পার হবে। অনেকেই ঘোড়ার গতিতে পার হবে। আবার অনেকেই উটের গতিতে পার হবে। কেউ ছহীহ-সালামতে বেঁচে যাবে। আবার কেউ এমনভাবে পার হয়ে আসবে যে তার দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাবে। আবার কেউ খন্ড-বিখন্ড হয়ে জাহান্নামে পড়বে। অবশেষে মুমিনগণ জাহান্নাম হ’তে নিষ্কৃতি লাভ করবে।
তারপর নবী করীম (ছাঃ) কসম করে বললেন, তোমাদের যে কেউ নিজের হক বা অধিকারের দাবীতে কত কঠোর তা তো তোমাদের কাছে স্পষ্ট। কিন্তু মুমিনগণ তাদের সে সমস্ত ভাইদের মুক্তির জন্য আল্লাহর সাথে আরও অধিক ঝগড়া করবে, যারা তখনও জাহান্নামে পড়ে রয়েছে।
তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! এ সমস্ত লোকেরা আমাদের সাথে ছিয়াম পালন করত, ছালাত আদায় করত এবং হজ্জ পালন করত। সুতরাং তুমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ দাও। তখন আল্লাহ বলবেন, যাও তোমরা যাদেরকে চিন তাদেরকে জাহান্নাম হ’তে মুক্ত করে আন। তাদের মুখের আকৃতি জাহান্নামের আগুনের প্রতি হারাম করা হয়েছে। এজন্য তারা মুখ দেখে চিনতে পারবে। তখন তারা জাহান্নাম হ’তে অনেক লোক বের করে আনবে।

-তারপর বলবেন, হে আমাদের প্রতিপালক! এখন সেখানে আর এমন একজন লোকও নেই যাকে বের করার জন্য আপনি আদেশ করেছেন। তখন আল্লাহ বলবেন, আবার যাও যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে বের করে আন। এতেও তারা বহু সংখ্যক লোককে বের করে আনবে। তারপর আল্লাহ বলবেন, পুনরায় যাও যাদের অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে বের করে আন। সুতরাং তাতেও তারা বহু সংখ্যক লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে।
-তারপর আল্লাহ বলবেন, আবার যাও যাদের অন্তরে এক বিন্দু পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে বের করে আন। এবারও তারা বহুসংখ্যক লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে এবং বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! ঈমানদার কোন ব্যক্তিকে আমরা জাহান্নামে রেখে আসিনি। তখন আল্লাহ বলবেন, ফেরেশতাগণ, নবীগণ এবং মুমিনগণ সকলেই শাফা‘আত করেছেন। এখন আমি পরম দয়ালু ব্যতীত আর কেউ বাকী নেই। এ বলে তিনি মুষ্টি ভরে এমন একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করবেন যারা কখনও কোন নেক কাজ করেনি, যারা জ্বলে-পুড়ে কালো কয়লা হয়ে গেছে। অতঃপর তাদেরকে জান্নাতের সামনে একটি নহরে ঢেলে দেওয়া হবে, যার নাম হ’ল ‘নহরে হায়াত’। এতে তারা স্রোতের ধারে যেমনভাবে গাছের বীজ গজায়, তেমনিভাবে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সজীব হয়ে উঠবে। তখন তারা সেখান থেকে বের হয়ে আসবে মুক্তার মত চকচকে হয়ে। তাদের কাঁধে সীল মোহর থাকবে। জান্নাতীরা তাদের দেখে বলবে এরা পরম দয়ালু আল্লাহর মুক্তকৃত দাস। আল্লাহ্ তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, অথচ তারা পূর্বে কোন আমল বা কোন কল্যাণের কাজ করেনি। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, এ জান্নাতে তোমরা যা দেখছ, তা তোমাদেরকে দেওয়া হ’ল এর সঙ্গে অনুরূপ পরিমাণ আরও দেওয়া হ’ল’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৩৪১)।
আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা- দুনিয়াতে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করলে কিংবা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করলে পরকালে ঐ উপাস্য-মা‘বূদ ও শরীকদের সাথেই জাহান্নামে যেতে হবে। পক্ষান্তরে যারা কেবল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখত, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করতো না; তারা কোন নেকীর কাজ না করলেও এক সময় জান্নাতে যাবে তাদের ঈমানের কারণে। তাই আল্লাহর প্রতি খালেছ অন্তরে ঈমান আনতে হবে। তাহ’লে জান্নাত লাভ করা যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রতি একনিষ্ঠভাবে ঈমান আনার তাওফীক্ব দিন- আমীন!

সংগৃহীত_________আদিব 

রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

সকাল বিকাল আমলের কিছু গুরুত্বপুর্ণ দোয়া


★ কুরবানী কার উপর ওয়াজিব

Mufti Abu Tasnim


প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫



★নেসাবের মেয়াদ
কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২

★ কুরবানীর সময়
মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম। -মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ২৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫

★নাবালেগের কুরবানী
নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

★মুসাফিরের জন্য কুরবানী 
যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১

★দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম
. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২

★কুরবানী করতে না পারলে
কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

হজ্জের নিয়মাবলী

 হজ্জের ফরজ ৩টি
১। ইহরাম বাধা ২। উ'কুফে আ'রাফা (আরাফাতের ময়দানে অবস্থান) ৩। তাওয়াফুয্ যিয়ারাত
হজ্জের ওয়াজিব ৬টি
(১) 'সাফা ও মারওয়া' পাহাড় দ্বয়ের মাঝে ৭ বার সায়ী করা।
(২) অকুফে মুযদালিফায় (৯ই জিলহজ্জ) অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে সুর্যদয় পর্যন্ত একমুহুর্তের জন্য
হলেও অবস্থান করা।
(৩) মিনায় তিন শয়তান (জামারাত) সমূহকে পাথর নিপে করা।
(৪) 'হজ্জে তামাত্তু' ও 'কি্বরান' কারীগণ 'হজ্জ' সমাপনের জন্য দমে শোকর করা।
(৫) এহরাম খোলার পূর্বে মাথার চুল মুন্ডানো বা ছাটা।
(৬) মক্কার বাইরের লোকদের জন্য তাওয়াফে বিদা অর্থাৎ মক্কা থেকে বিদায়কালীন তাওয়াফ করা।
এছাড়া আর যে সমস্ত আমল রয়েছে সব সুন্নাত অথবা মুস্তাহাব।
ওমরাহর ফরজ, ওয়াজিব
দুইটি ফরজ: (১) ইহরাম পরিধান করা (২) তাওয়াফ
দুইটি ওয়াজিব: (১) সাফা ও মারওয়া মধ্যবর্তী (সবুজ বাতি) স্থানে সাতবার সায়ী করা (২) মাথার চুল
মুন্ডানো বা ছাটা।
তালবিয়া
''লাব্বাঈক আল্লাহুম্মা লাব্বাঈক, লাব্বাঈক, লা-শারীকা-লাকা লাব্বাঈক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নি'মাতা লাকা ওয়াল-মুল্ক, লা শারীকালাক।"
অর্থ: আমি হাজির হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত! আপনার ডাকে সাড়া দিতে আমি হাজির। আপনার কোন অংশীদার নেই। নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা ও সম্পদরাজি আপনার এবং একচ্ছত্র আধিপত্য আপনার।
আপনার কোন অংশীদার নেই।
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ
(১) সেলাইযুক্ত যে কোন কাপড় বা জুতা ব্যবহার, এক্ষেত্রে স্পঞ্জ সেন্ডেলের ব্যবহার করা।
(২) মস্তক ও মুখমন্ডল (ইহরামের কাপড়সহ যে কোন কাপড় দ্বারা) ঢাকা,
(৩) পায়ের পিঠ ঢেকে যায় এমন জুতা পরা।
(৪) চুলকাটা বা ছিড়ে ফেলা,
(৫) নখকাটা,
(৬) ঘ্রানযুক্ত তৈল বা আতর লাগানো।
(৭) স্ত্রীর সঙ্গে সংগম করা।
(৮) যৌন উত্তেজনামূলক কোন আচরণ বা কোন কথা বলা।
(৯) শিকার করা।
(১০) ঝগড়া বিবাদ বা যুদ্ধ করা।
(১১) চুল দাড়িতে চিরুনী বা আঙ্গুলী চালনা করা, যাতে ছিড়ার আশংকা থাকে।
(১২) শরীরে সাবান লাগানো।
(১৩) উকুন, ছারপোকা, মশা ও মাছিসহ কোন জীবজন্তু হত্যা করা বা মারা।
(১৪) কোন গুনাহের কাজ করা, ইত্যাদি।
হজ্জের প্রকার ও নিয়তসমূহ
প্ রথম প্রকার হজ্জে ইফরাদ
বর্ণনা: ওমরাহ্ ব্যতিত শুধু হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধা এবং হজ্জের সাথে ওমরাহকে না মিলানো। (বদলী হজ্জের জন্যও এই হজ্জ)।
নিয়্যাত: আল্লাহুমা ইন্নী উরীদুল হাজ্জা ফায়াসছির হুলিওয়াতা কাব্বালহুমিনি্ন। (বাংলা নিয়ত- আল্লাহ আমি ইফরাদ হজ্জের উদ্দেশ্যে আপনার সন্তুষ্টির জন্য ইহরাম বাধলাম। তা সহজ করে দিন ও কবুল করে নিন)।
দ্বিতীয় প্রকার হজ্জে কি্বরান
বর্ণনা: একত্রে একই স্থান থেকে হজ্জ ও ওমরার নিয়্যাত করে হজ্জের সাথে ওমরাহকে মিলানো এবং একই ইহ্রামে উভয়টি আদায় করা।
নিয়্যাত: আল্লাহুমা ইন্নী উরীদুল উ'মরাতা ফায়াচ্ছির লী-ওয়াতাক্াব্বাল মিন্নী। বাংলা নিয়ত- হে আল্লাহ আমি আপনার উদ্দেশ্যে হজ্জে কি্বরানের জন্য ইহরাম বাধলাম তা সহজ করে দিন ও কবুল করে নিন।
তৃতীয় প্রকার হজ্জে তামাত্তু
বর্ণনা: একই সফরে পৃথক পৃথক ভাবে 'ইহরাম' পরিধান করে 'হজ্জ ও ওমরাহ' আদায় করা। প্রথম ইহ্রামে ওমরাহর নিয়্যাত করে তা পালন শেষে চুল কেটে 'ইহরাম' খুলে হালাল হয়ে দ্বিতীয় বার নতুন করে
হজ্জের নিয়্যাতে ৮ই জিলহজ্জ 'মক্ক শরীফ' থেকে হজ্জের জন্য ইহরাম বাধা। তামাত্তু করার ইচ্ছা থাকলে প্রথমে ওমরার নিয়্যাত করে এহরাম বাঁধুন।
শুধু ওমরাহর নিয়্যাত
আল্লাহুমা ইন্নী উরীদুল উম'রাতা ফায়াচ্ছির লী-ওয়াতাক্াব্বাল মিন্নী। বাংলা নিয়ত- হে আল্লাহ আমি ওমরাহ্ পালনের জন্য ইহরাম বাধলাম তা সহজ করে দিন এবং কবুল করে নিন।
শুধু হজ্জের নিয়্যাত
আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল হাজ্জা ফায়াচ্ছিরহু-লী অ-তাকাব্বালহু মিন্নী। বাংলা নিয়ত- হে আল্লাহ আমি পবিত্র হজ্জ পালনের জন্য ইহরাম বেধে নিয়ত করলাম তা সহজ করে দিন এবং কবুল করে নিন।
তাওয়াফের বিবরণ
হাজীদের সর্বপ্রথম কাজই হলো (তামাত্তু ও ক্বেরান কারীগণ) নিজের মালছামানগুছিয়ে রেখে পাকপবিত্র হয়ে মোটেই দেরী না করে 'হারাম শরীফে' হাজিরা দেওয়া এবং 'তাওয়াফ' করা। ওমরাহ এবং হজ্জের
তাওয়াফ ব্যাতিত নফল তাওয়াফ ও করা যায়। যেমন: রাসূল (দঃ), সাহাবা-আওলিয়া, আহ্লে বাইত, মা-বাবা, পীর-উস্তাদ ও অন্যান্য মুরুব্বী বা সন্তানদের স্মরনে বা তাঁদের নামে তাওয়াফ করা।
তাওয়াফের ওয়াজিব সমূহ
(১) শরীর পাক-সাফ রাখা, ওজু করা। মহিলাদের হায়েজ নেফাছ অবস্থায় তাওয়াফ করা জায়েজ নাই।
(২) ছতর ঢাকা। অর্থাৎ যেটুকু ঢাকা প্রত্যেক পুরুষ-নারীর জন্য ফরজ।
(৩) 'হাতীমে কা'বার' বাইরে থেকে 'তাওয়াফ' করা।
(৪) পায়ে হেঁটে 'তাওয়াফ' করা। অম ব্যক্তি খাটিয়ার মাধ্যমে 'তাওয়াফ' করতে পারেন।
(৫) 'হাজ্রে আস্ওয়াদ' থেকে শুরু করে ডানদিক দিয়ে 'তাওয়াফ' শুরু করা।
(৬) এক নাগাড়ে বিরতিহীন ভাবে 'সাতবার চক্কর' দিয়ে 'তাওয়াফ' পূর্ণ করা।
(৭) 'সাত চক্করে' এক 'তাওয়াফ', এটা পূর্ণ হলেই 'তাওয়াফের' নামাজ পড়া।
তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী
(১) 'তাওয়াফে'র শুরুতে 'হাজারে আসওয়াদ' এর দিকে মুখ করা।
(২) সম্ভব হলে 'হাজ্রে আস্ওয়াদ' চুম্বন করা। নতুবা হাত দ্বারা দূর থেকে ইশারা করা, এবং মুখে
'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আক্বার ওয়ালিল্লাহিল হ্ামদ' বলা।
(৩) 'হা্জ্রে অস্ওয়াদ' বরাবর দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরিমা'র ন্যায় উভয় হাত সিনা পর্যন্ত উঠান।
(৪) যে 'তাওয়াফে'র পরে 'সাঈ' আছে তাতে 'এযতেবা' করা। অর্থাৎ ইহরামের চাদরের (উপরের
অংশের) দুই মাথা ডান বগলের নিচ দিয়ে বাম কাঁধের উপর ফেলে দেওয়া।
(৫) 'সাঈ' যুক্ত 'তাওয়াফে'র প্রথম তিন চক্করে 'রমল' করা। অথর্াৎ বীরের মত হেলে দুলে জোর ক্বদমে
(একের পর এক পা ফেলে) চলা।
(৬) বাকী চার চক্কর সাধারণ গতিতে (ধীরে ধীরে) সম্পন্ন করা।
(৭) প্রত্যেক চক্কর তাওয়াফ শেষ করে এবং শেষ চক্করেরও পরে 'হাজ্রে অস্ওয়াদ'কে চুম্বন করা।
সম্ভব না হলে দূর থেকে ইশারা করে বিসমিল্লাহে আল্লাহ আকবর ওয়ালিল্লাহিল হামদ্"দোয়াটি পাঠ
করা এবং ৩ নং নিয়মের ন্যায় দাড়িয়ে ইশারা করে 'তাওয়াফ' শেষ করা।
তাওয়াফের নিয়্যাত
আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদু তাওয়াফা বাইতিকাল হারাম ফায়াচ্ছিরহু-লী, ওয়া তাক্বাব্বাল-হু-মিন্নী, সাবাআ'তা আশ্ওয়াতি্বন লিল্লাহি তায়া'লা। বাংলায় নিয়ত- হে আল্লাহ আমি তাওয়াফ পালনের জন্য নিয়ত করলাম।
সায়ীর নিয়ম
'হজ্জ ও ওমরাহ' ছাড়া নফল 'তাওয়াফে'র কোন সায়ী নাই। কারো নামে ওমরাহ করতে হলেও সায়ী করতে হবে। সায়ী অর্থ দৌড়ানো। এটা 'ছাফা' পাহাড় থেকে প্রথমে শুরু করতে হবে। ছাফা থেকে মারওয়া।
মারওয়া থেকে ছাফায়। এভাবে সাতবার সায়ীর সময় প্রথম তিন চক্কর সবুজ বাতির মাঝের অংশটুকু দৌড়ে দৌড়ে হেলে দুলে যাওয়া সুন্নাত (পুরুষদের জন্য)। পরের চার চক্কর সাধারণ গতিতে সম্পন্ন করতে হবে।
সায়ীর সহজ দোয়া
সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার ওয়া লা-হাওলা, ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আ'লিয়্যিল আ'যীম, রাবি্বগফির ওয়ারহাম ওয়াআনতাল আ-আজ্জুল আকরাম।
সায়ীর কুরআনী দোয়া
'ইন্নাছ্ ছাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন্ শাআ'ইরিল্লাহ্ ফামান হাজ্জাল বাইতা আও-ই' তামারা ফালা জুনাহা আ'লাইহি আইয়াত্ত্বাওয়াফা বিহিমা ওমান তাত্বাওয়াআ খাইরান ফা-ইন্নাল্লাহা শাকিরুণ আ'লীম।" উপরোক্ত
দুই দোয়া সাতবার চক্করের সময় হাটতে চলতে পড়তে হবে। পরেরটি না পারলে উপরেরটিই যথেষ্ট হবে।