কুরবানী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কুরবানী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

কুরবানীঃ ত্যাগের মহিমায় প্রেরণা যোগায়

মুনির আহমদ

আদিকাল হতেই কুরবানীর রীতি চলে আসছে। হযরত আদম (আ.)এর পুত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিল এক বিশেষ ব্যাপারে ফলাফল নির্ণয়ের জন্য যথাক্রমে হাবিল একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বা এবং কাবিল কিছু শস্য কুরবানী স্বরূপ পেশ করেছিলেন। হাবিলের কুরবানী কবুল হল। আসমান থেকে একটি অগ্নি শিখা এসে হাবিলের দুম্বা ভস্ম করে দিল। আর কাবিলেরটা কবুল হল না, তার শস্য আসমানী আগুন জ্বালালো না। সে সময় কুরবানী কবুল হওয়া না হওয়ার এরূপ নিশানাই সাব্যস্ত ছিল।হযরত ইব্রাহীম (আ.)কে আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে বহু রকমের পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় এবং তিনিও প্রতিটি পরীক্ষায় চরম কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ফলে তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘খলিলুল্লাহ্ (আল্লাহর অন্তরঙ্গ বন্ধু)’ উপাধীতে ভূষিত হন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় ছেলে হযরত ইসমাঈল (আ.)কে কুরবানী করতে আদিষ্ট হয়ে সকল স্বার্থ দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে, সকল মায়া-মুহাব্বত বিসর্জন দিয়ে হুকুমের যথার্থ তা’মীল করেছিলেন। ফলে ইরশাদে ইলাহী নাযিল হয়, “ক্বাদ সাদ্দাকতার রুইয়া…” অর্থাৎ- ‘হে নবী! আপনি স্বপ্নের আদেশকে যথানুরূপ বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর কর্তব্য পরায়ণতা, খোদাভক্তি ও নিষ্ঠার চরম পরাকাষ্ঠা প্রত্যক্ষ করে মহান আল্লাহ্ খুশী হয়ে বেহেশতি দুম্বা পাঠিয়ে দেন। ইসমাঈল (আ.)এর পরিবর্তে দুম্বা কুরবানী হয়। তাই আজ কুরবানীর নামে হযরত ইব্রাহীম (আ.)এর ত্যাগ-তিতিক্ষা, সংগ্রাম-সাধনা ও প্রেম-নৈকট্যের দৃষ্টান্ত ও আত্মত্যাগ নিয়ে প্রতি বছর বিশ্ব মুসলিম আল্লাহর দুয়ারে সমাগত হয়। সুতরাং আমাদের মাঝে হযরত ইব্রাহীম (আ.)এর চরম আত্মত্যাগ অবিস্মৃত স্মৃতিরূপে ভাস্কর হয়ে আছে। সাথে সাথে আল্লাহ্ তাআলা পরবর্তীদের জন্য সেই কুরবানীকে একটি পালনীয় রীতি হিসেবে সাব্যস্ত করেন। ইরশাদ হচ্ছে- “ফাত্তাবিউ মিল্লাতা ইব্রাহীমা হানীফা” অর্থাৎ- ‘একনিষ্ঠভাবে তোমরা ইব্রাহীমী মিল্লাতের অনুসরণ কর।’ (সূরা আলে ইমরান- ৯৫)। মোটকথা, ‘কুরবানী’ হচ্ছে ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রদর্শনের মাধ্যমে মাহান আল্লাহর অধিক নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনের অনন্য সোপান। কুরবানীর মাধ্যমে বান্দা স্বীয় খাহেশাতকে বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর সমীপে আত্মনিবেদন পূর্বক তাঁর আদেশ সম্পর্কিত হুকুম পালন করতঃ তাঁর নৈকট্য লাভে অগ্রসর হয় বিধায় এটিকে ‘কুরবান’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। লক্ষণীয় যে, হযরত ইসমাঈল (আ.) যবেহ না হলেও হযরত ইব্রাহীম (আ.)এর আন্তরিকতা ও পূর্বাপর সকল প্রস্তুতিকেই আল্লাহ্ তাআলা ‘বাস্তবায়ন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা কবুল করেছেন। বস্তুতঃ আল্লাহ্ তাআলা তো দেখেন মানুষের আন্তরিকতাময় ইচ্ছাকে।প্রতি বছর আমরা যে পশু কুরবানী করছি, তার গোশত তো আমরাই খাচ্ছি। তার চামড়া-হাড় দ্বারা তো আমারাই উপকৃত হচ্ছি। কুরবানীর পশুর কোন কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। তাহলে এই কুরবানীর উদ্দেশ্য কি? কালামে পাকে ইরশাদ হচ্ছে, “লাঁই ইয়ানালাল্লাহা লুহুমুহা ওলা দিমাউহা ওলা কিন ইয়ানালাল্লাহুত্ তাক্বওয়া মিনকুম”। অর্থাৎ-‘ কুরবানীর পশুর গোস্ত আল্লাহ্ তাআলার কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে  না তার রক্ত। তবে তোমাদের তাক্বওয়াই তাঁর কাছে যায়। (সূরা হজ্ব- ৩৭)। আল্লাহ্ তাআলা পরীক্ষা নেন কেবল আমাদের মনোবৃত্তিরই। কিন্তু আজ আমাদের সামাজের দিকে তাকালে কি দেখতে পাই? আমারা দেখতে পাই, কুরবানীকে যেন গোশত ভক্ষণের এক মহোৎসব মনে করা হয়। সমাজের যারা সম্পদশালী, তারা যেন কুরবানীর পশু ক্রয় করতে এক রকম প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। কে কত চড়া দামে পশু ক্রয় করবেন, এটাই হয়ে উঠে মূখ্য বিষয়। আর যারা অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল, দরিদ্র, তারা ঈদুল আযহা আসলেই এক মহাচিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তারা কুরবানী না দিতে পারায় মনো বেদনায় ব্যথিত হন। নিজেদের সমর্থহীনতার কথা বিবেচনা করা হয় না; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু সামাজিকতা মেইনটেন করার জন্য কুরবানী করা হয়। এমন কি তারা কুরবানী করার জন্য ঋণ পর্যন্ত করতেও বাধ্য হয়। জিজ্ঞেস করলে বলে- সবাই দিচ্ছে, আমি দিব না; এটা কেমন হয়। তাছাড়া বাড়ীতে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে গোশত খাওয়ার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। সাত ভাগে কুরবানী দেওয়া যায়। সাতভাগে কুরবানী দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের নিয়্যাতের কতটা নিষ্ঠতা থাকে, তা ভাবার বিষয়। যে সমাজে দুই জন লোক এক হতে পারে না, ভাই ভাই দ্বন্দ্ব-কলহ্ লেগেই থাকে। ফলে সাত ভাগের কুরবানীর ক্ষেত্রে গোশত ভাগ বণ্টনের সময় দেখা যায় তুমুল বাক বিতন্ডা। এতে গোশ্ত ভক্ষণের উদ্দেশ্যটাই যেন ফুটিয়ে তোলা হয়। অথচ একমাত্র মহান আল্লাহর হুকুম তা’মিল ও তাঁকে রাজি-খুশী করার জন্যই কুরবানী দেয়ার ব্যাপারে সবার নিয়্যাত এক থাকা অপরিহার্য। না হলে কুরবানী হবে না। অথচ আমরা ক’জনই বা সেদিকে লক্ষ্য রাখি! কিন্তু যদি হযরত ইসমাঈল (আ.)এর যবেহই মঞ্জুরে ইলাহী হত এবং হযরত ইব্রাহীম (আ.)এর হাতে তাঁর কুরবানী হত, আর সেই আমলের পরম্পরায় আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানদেরকে যবেহ করার হুকুম হত, তা কত কঠিন ব্যাপারই না ছিল! তথাপি মুসলমান হিসেবে জীবন যাপন করলে আমাদের তা পালন করতেই হত। এ ক্ষেত্রে পরম করুণাময় আল্লাহ্ আমাদের উপর বড় মেহেরবানী করেছেন যে, তিনি পশু কুরবানীকে তার স্থলাভিষিক্ত করেছেন। তাই ইব্রাহীমী কুরবানীর স্মৃতি গাঁথা ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। খলীলী ইশকের দীক্ষায় উজ্জিবিত হয়ে আহকামে ইলাহীর সামনে নিজের খাহেশাত বা কামনা বাসনাকে কুরবান করতে হবে। সর্বান্তকরণে নিজেকে সঁপে দিতে হবে ইসলামের তরে। প্রকৃতপক্ষে কুরবানী হচ্ছে ত্যাগের এক সমুজ্জল দৃষ্টান্ত। বলাবাহুল্য, পশু কুরবানী তো একটি প্রতিকী আমল। এর অন্তর্নিহিত কৃতজ্ঞতা-ই একে অর্থবহ করে তুলেছে। কারণ, আল্লাহর জন্য সবচেয়ে প্রিয় বস্তু বিসর্জন দেয়ার মধ্য দিয়েই কুরবানীর সূচনা হয়। তাই কুরবানীর প্রক্কালে সর্বাগ্রে নফ্সানী খাহেশাত, প্রবৃত্তি, লোভ-লালসা ও দুনিয়ামুখিতার গলায় ছুরি চালাতে হবে। নিজের মনের খেয়াল খুশিতে নয়, বরং আল্লাহ্ ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মোতাবেক সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত পথে চলার সংকল্প করতে হবে। যে কোন পরিস্থিতিতে আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের জবাবদিহিতার আশঙ্কায় সর্বপ্রকার অনৈসলামিক বা মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। মানুষ যেখানে সারাক্ষণ নিজের সামান্য কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য, নিজের চাহিদা পূরণের জন্য যে কোন রকম ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে, সেখানে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নির্দেশ পালন কল্পে, তাঁর রহ্মতের দারে কড়া নাড়ার জন্য, তাঁর দয়া দৃষ্টি নিজের দিকে আকর্ষণ করার জন্য ত্যাগ স্বীকার করে সর্বোচ্চ কুরবানী করতে হবে। এ ত্যাগ এ কুরবানী পশু কুরবানী থেকে শুরু করে আত্মোৎসর্গ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। খোদাভীতির সামনে পরিবেশ পরিস্থিতি, সমাজ সংস্কার আর পার্থিব ভয়-ভীতিকে এবং আল্লাহ্ ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালবাসার সামনে মানুষের সহায় সম্পদ পরিবার পরিজন এবং নিজের জীবনের ভালবাসাসহ অন্যান্য যাবতীয় প্রেম-ভালবাসাকে উৎসর্গ করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। আল্লাহর হুকুম পালনে হযরত ইব্রাহীম (আ.) যেরূপ প্রবল মনোবল নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন, ইবলীস শয়তানও তত কঠোর প্রতিরোধ নিয়ে বাঁধা দিয়েছিল। কিন্তু শয়তান তাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি রমিয়ে জিমার (পাথর নিক্ষেপ) করে শয়তানকে বিতাড়িত করেছিলেন। যার স্মৃতি আজ হজ্বের আমল হিসেবে গন্য। আর মরদুদ শয়তান পরাস্ত হয়ে চির লাঞ্ছনা কুড়িয়েছে। আজ মীনা প্রান্তরের সেই ‘জমরাত’ জগৎকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃত মু’মিনের নিকট শয়তানী চক্রান্ত অতি তুচ্ছ এবং প্রস্তরাঘাতে দূরে নিক্ষিপ্ত হওয়ার যোগ্য। ঐ স্তম্ভ জগদ্বাসীকে বলছে যে, যে কোন প্রকার সৎকাজে অগ্রসর হওয়ার সময় যদি শয়তান কোন প্রকার বাঁধার সৃষ্টি করে, তাহলে আল্লাহর এ ক’জন সেরা নবীর নিদর্শন স্মরণ করে তওবা স্বরূপ ভীষণ প্রস্তরাঘাতে তাকে ক্ষত-বিক্ষত করে অনেক দূরে নিক্ষেপ কর। আল্লাহর আদেশ পেয়ে হযরত ইব্রাহীম (আ.) পার্থিব মায়া পরিত্যাগ করে প্রাণপ্রিয় পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়ে ছিলেন। অনুরূপভাবে আমাদেরকেও প্রকৃত মুসলমান হতে হলে কিভাবে শত প্রেম ভালবাসা, মায়া-মুহাব্বাত ছিন্ন করে, শত বাধাবিঘ্ন, শয়তানী কুচক্র পদদলিত করে কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, আর কিভাবেই বা পরম দয়ালু আল্লাহ্ তাআলা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য লালায়িত বান্দাকে শত সহস্র বিপদ হতে অচিন্তনীয় ভাবে সম্পূর্ণ রূপে রক্ষা করেন, কুরবানী তাই শিক্ষা দেয়। আজও কুরবানীর ব্যাপারে শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়ে প্রতিরোধে তৎপর হয়। কিন্তু মিল্লাতে ইব্রাহীমির ধারক আল্লাহর খাঁটি মুসলমান বান্দাগণ শয়তানকে পরাজিত করে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন করেন। তথাপি শয়তান কতক লোককে তার দলে ভিড়াতে সক্ষম হয়। তাদের কেউ শয়তানী প্ররোচণায় কুরবানী দ্বারা কেবল নাম কামনার ধান্ধায় থাকে। আবার কেউ ওয়াজীব দায়িত্ব আদায়ে অনীহা দেখায়। উপরন্তু অনেকে কুরবানীকে নির্মম পশু হত্যা ও অপচয় বলে ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি পর্যন্তও করে বসে। ইসলাম তো হচ্ছে সবান্তকরণে আল্লাহর সমীপে আত্মনিবেদন করার নাম। আল্লাহর বান্দারা আল্লাহর সৃষ্টি পশু কুরবানী করবে, এতে সংকীর্ণমনা হওয়ার আবকাশ নেই। এ ব্যাপারে যারা বিরূপ উক্তি করে, তাদের অনেকে ইসলামী নামের অধিকারী হলেও মূলতঃ তারা ধর্মদ্রোহী নাস্তিক মুরতাদদের কাতারেই তাদের অবস্থান আবিষ্কার করা উচিত। ঈদুল আযহার পশু কুরবানী যেহেতু আল্লাহর আদেশ পালন ও ইবাদত; তাই এক্ষেত্রে মনে কোন সংকীর্ণতার স্থান দেয়া জায়েয নেই। বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর এ হুকুম পালন করতে হবে। তাই তো এ দিনের নাম ‘ঈদ’ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি কুরবানী তথা আল্লাহর হুকুম পালন করতে পারার খুশির দিন। মূলতঃ হযরত ইব্রাহীম (আ.) যেমন কঠিন পরীক্ষার মুহূর্তে প্রমাণ করেছিলেন, “ইন্নাসালাতি ওয়া নুসুকি ওয়ামাহ্ ইয়াইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন” অর্থাৎ- “আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সবই বিশ্ব পালনকর্তা মহান আল্লাহর জন্যই নিবেদিত।” (সূরা আন্আম- ১৬২)। আমাদেরকেও কুরবানীতে ঐ আদর্শই অনুসরণ করতে হবে। ‘কুরবানী’ প্রতি বছর আসে যায়, আমাদের বারবার ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত করে। সারা বছরের কর্মতৎপরতায় কুরবানীর শিক্ষাকে ধারণ করে রাখাই সচেতন ধার্মিকের কাজ। সুতরাং, আসুন! আমরা কুরবানীর  শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করি। আল্লাহর অধিক নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজেকে সর্বান্তকরণে সঁপে দেই ইসলামের তরে। আল্লাহ্ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন॥

শুক্রবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

কোরবানীর দিনে নখ-চুল কাটার আদেশ কি শুধু কোরবানী দাতার জন্য!

কোরবানী দাতার জন্য জিলহজ্ব মাস শুরু হওয়ার পর নখ-চুল কাটা থেকে বিরত থাকা এবং কোরবানীর পর তা কাটা উত্তম, এটা তো অনেকেরই জানা কথা। কেননা এটা সুস্পষ্ট সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
"যখন যিলহজ্বের দশক শুরু হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানী করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫২৩)
উক্ত হাদীসের উপর ভিত্তি করে ফকীহগণ কুরবানীকারীর জন্য নখ-চুল না কাটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। অবশ্য কোন কোন ফক্বীহ উক্ত হাদীসের কারণে কোরবানীর আগে নখ-চুল কাটা হারাম বলেছেন। অনেক কিতাবে হানাফী মাযহাব এর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে যে, তাদের মতে কোরবানীর আগে নখ-চুল কাটা হারামও নয় মাকরূহও নয়। এসম্পর্কে শায়খুল ইসলাম আল্লাম তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেন যে, হানাফীদের কিতাবে আমি এটা পাই নি। (তাকমিলায়ে ফাতহুল মুলহিম: ৩/৪৮৬)
তবে এ হুকুম তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে যারা যিলকদের শেষে নখ-চুল কেটেছে। অন্যথায় নখ-চুল বেশি লম্বা হয়ে যাবে যা সুন্নাতের খেলাফ।
এটা তো গেল ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা যে ব্যক্তি কুরবানী আদায় করবে। কিন্তু যে কোরবানী আদায় করবে না তার জন্য এ হুকুম প্রযোজ্য হবে কি না এ ব্যাপারে কেউ কেউ বলেছেন যে, এ হুকুম শুধুমাত্র কুরবানী দাতার জন্য প্রযোজ্য। আর কেউ কেউ বলেছেন, কুরবানী যারা করবে না তাদের জন্যও এই বিধান।
তারা দলীল হিসেবে হযরত আমর ইবনুল আস রা. এর হাদীসকে পেশ করেন। তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে কুরবানীর দিবসে ঈদ (পালনের) আদেশ করা হয়েছে। যা আল্লাহ এ উম্মতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। এক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানিহা থাকে (অর্থাৎ অন্যের থেকে নেওয়া দুগ্ধ দানকারী উটনী) আমি কি তা কুরবানী করতে পারি? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। তবে তুমি চুল, নখ ও মোঁচ কাটবে এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর দরবারে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৩৬৫; মুসনাদে আহমদ: ১১/১৩৯; সহীহ ইবনে হিব্বান:১৩/১৬৩; মুসতাদরাকে হাকীম: ৪/২২৪)
হাদীসটির মান:
শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ. উক্ত হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। (দেখুন যয়ীফু আবু দাউদ, হা. ৪৮২; মিশকাতুল মাসাবীহ, হা. ১৪৭৯)
তিনি বলেছেন-
وهذا اسناد ضعيف عندي، رجاله ثقات؛ غير الصدفي؛ فإنه لم يوثقه فيما ذكروا غير ابن حبان.
এই হচ্ছে তাঁর বক্তব্য তিনি দুর্বলতার কারণ হিসেবে ঈসা ইবনে হেলাল আস সাদাফীর এর জাহালতকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেন যে ইবনে হিব্বান রহ. ছাড়া অন্য কেউ তার তাওসীক করেন নি।

এটা শায়খ রহ. এর তাসামুহ ছাড়া আর আর কি বলা যেতে পারে। সম্ভবত তিনি আবু ইয়া’কুব ফাসাওয়ী রহ. এর তাওসীক সম্পর্কে অবগত হতে পারেন নি, নতুবা তিনি এমন বলতেন না। কেননা ফাসাওয়ী রহ. তার আল মা’রেফা ওয়াত তারীখ গ্রন্থে (২/৪৮৭) মিসরের নির্ভরযোগ্য তাবেয়ীনদের আলোচনা শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে (২/৫১৫) সেই নির্ভরযোগ্য তাবেয়ীদের মধ্যে এই সাদাফী’র নাম উল্লেখ করেন।
এছাড়া মিশরের প্রসিদ্ধ পাঁচ ব্যক্তিত্ব এই সদফী’র কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তারা হলেন-১.আইয়াশ বিন আব্বাস আল কিতবানী ২.কা’ব বিন আলকামা ৩.ইয়াযীব ইবনে আবী হাবীব ৪.দাররাজ আবুস সামাহ ৫.আব্দুল মালেক বিন আব্দুল্লাহ আত তুজীবী। (দেখুন, আস সিকাত, ইবনে হিব্বান: ৫/২১৩; জখীরুতুল উক্ববা শরহুল মুজতাবা: ৩৩/২৮৩) 
সুতরাং তাকে মাজহুল বলা ঠিক নয়।

হাফেজ ইবনে হাজার রহ. তাঁর আত তাকরীব এ সাদাফীকে ‌‘সাদূক’ বলেছেন। এছাড়া ফাতহুল বারীতে (১০/৮) তিনি অন্য এক আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, এ বিষয়ে আমর ইবনুল আস এর হাদীস দিয়ে দলীল দেয়া যায় অত:পর উপরোক্ত হাদীসকে উল্লেখ করে ইবনে হিব্বানের তাসহীহের কথা উদ্ধৃত করেন।
আর হাকীম রহ. হাদীসের সনদকে সহীহ বলেছেন হাফেয যাহাবী রহ.ও এতে একমত হয়েছেন। (আল মুসতাদরাক: ২/২২৪)
শায়খ আলবানী রহ. এর সমসায়িক আলেম শায়খ শুআইব আল আরনাউত উক্ত হাদীসের সনদকে মুসনাদে আহমদে (১১/১৩৯) হাসান বলেছেন আর সহীহ ইবনে হিব্বানে (১৩/১৬৩) সহীহ বলেছেন।
সারকথা: উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেল যে, হাদীসটি নির্ভযোগ্য।
উক্ত হাদীসে যেহেতু কুরবানীর দিন চুল-নখ কাটার কথা আছে তাহলে এর আগে না কাটার দিকে ইঙ্গিত বুঝা যায়। কিন্তু কতদিন আগে থেকে কাটবে না? যেহেতু কোরবানী দাতাকে জিলহজ্বের শুরু থেকে কাটা বন্ধ করতে বলেছেন এর উপর কিয়াস করে বলা যায় তার ক্ষেত্রেও এমনই হবে। এটা শুধু ধারণা বা কিয়াস নয় বরং এর সমর্থনে বিভিন্ন আসারও পাওয়া যায়। যেমন-
১.ওলীদ বিন মুসলিম বলেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আজলানকে যিলহজ্বের দশকে চুল কাটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, আমাকে নাফে রাহ বলেছেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এক নারীর নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। মহিলাটি যিলহজ্বের দশকের ভেতর তার সন্তানের চুল কেটে দিচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, যদি ঈদের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে তবে বড় ভাল হত। (মুস্তাদরাকে হাকেম,হাদীস ২/২২১)
২.মুতামির ইবনে সুলাইমান আততাইমী বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি যে ইবনে সীরীন রাহ. যিলহজ্বের দশকে চুল কাটা অপছন্দ করতেন। এমনকি এই দশকে ছোট বাচ্চাদের মাথা মুণ্ডণ করাও অপছন্দ করতেন। (মুসনাদে মুসাদ্দাদ-ইতহাফুল খিয়ারাহ: ৫/৩১১; আল মাতালিবুল আলিয়া: ১০/৪৪৮)
এসব দলীলের কারণে কারো কারো মতে সকলের জন্যই যিলহজ্বের প্রথম দশকে নখ, গোফ ও চুল না-কাটা উত্তম। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, এ বিধানটি কুরবানিদাতার জন্য তাকিদপূর্ণ সুন্নত। তার জন্য এই অামল অন্যের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কোরবানীর সাথে আকীকা সুন্নাহর অালোকে বিভ্রান্তি-নিরসন

Mahbubul Hasan Arife

কোরবানীর মত আকীকাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষ গুরুত্বের সাথে আকীকার কথা উল্লেখ করেছেন, যা হাদীস শরীফের কিতাবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। বাচ্চা জন্মের সপ্তম দিনে এই কাজটি সম্পাদন করতে হয়। কোন কারণে এই দিনে আকীকা দিতে না পারলে পরবর্তীতে তা আদায় করার সুযোগ রয়েছে।
কোরবানী ও আকীকা আলাদাভাবেই করা উচিৎ। প্রশ্ন হল, কেউ যদি আকীকা এবং কোরবানী একসাথে দিয়ে দেয়, তাহলে সেটা কি অবৈধ হবে? বা একারণে আকীকা ও কোরবানী আদায় হবে না?
কোরআন সুন্নাহর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালে আকীকার সাথে কোরবানী দেয়ার বৈধতাই প্রমাণিত হয়। বিষয়টি বুঝতে হলে কয়েকটি বিষয় বুঝতে হবে।
এক.
আকীকাও এক ধরণের কোরবানী। হাদীস শরীফে আকীকাকে কোরবানী বলা হয়েছে এবং কোরবানীর জন্য যে শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে আকীকার ক্ষেত্রে সেই শব্দটিই প্রয়োগ করা হয়েছে।

সূরা আনআমের ১৬২ নং অায়াতে কোরবানীকে ‘নুসুক’ বলা হয়েছে তেমনিভাবে সহীহ বুখারী ও মুসলিমসহ হাদীসের অসংখ্য কিতাবে কোরবানীকে নুসুক বলা হয়েছে। অপরদিকে কোরবানীর মত আকীকার ক্ষেত্রেও হাদীস শরীফে ‘নুসুক’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে যার অর্থ কুরবানী। 
(দ্র. আলমুসান্নাফ, আব্দুর রাযযাক : ৪/৩৩০, হাদীস ৭৯৬১; আলমুসনাদ, আহমদ : ১১/৩২০; আসসুনান, আবু দাউদ (আকীকা অধ্যায়) ২৮৪২;আস সুনান, নাসায়ী : হাদীস ৪২১২; আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২৪ হাদীস : ২৪৭২৭)
(দ্র. আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২১, হাদীস : ২৪৭২২; আলমুয়াত্তা, ইমাম মালিক, আকীকা অধ্যায়, হাদীস : ১৪৪১)

সুতরাং বুঝা গেল, আকীকাও এক ধরণের কোরবানী। একারণেই তো হাসান বাসারী রহ. এবং ইবেনে সীরীন রহ. বলেছেন, বাচ্চার পক্ষ থেকে কোরবানী দিলে এটাই তার আকীকার জন্য যথেষ্ট হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২৯ হাদীস ২৪৭৪৩)
অার একারণেই তো কোরবানী এবং আকীকার গোশত, চামড়া ইত্যাদির বিধান এক।
হিশাম ইবনে হাসসান রহ., হাসান বাসারী রহ. এবং ইবনে সীরীন রহ. সম্পর্কে বলেন, আকীকা তাদের মতে কোরবানির মর্যাদা রাখে; আকীকা আদায়কারী নিজে এর গোশত খাবে এবং অন্যকে খাওয়াবে (যেমনিভাবে কোরবানীর গোশত নিজে খায় অন্যকে খাওয়ায়) [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২৭ হাদীস ২৪৭৫০,২৪৭৫১)

এ-সম্পর্কে ইমাম মালিক রহ. এর বক্তব্য খুবই সুস্পষ্ট। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার সন্তানের আকীকা করল তার সেই আকীকা কোরবানীর পর্যায়ে; সেই আকীকায় চোখের জ্যোতি ক্ষতিগ্রস্ত, শীর্ণকায়, শিং ভাংগা, অসুস্থ প্রাণী জবাই করা যায়েজ হবে না। এর গোশত এবং চামড়া বিক্রি করা যাবে না....(যেমনিভাবে এগুলো দিয়ে কোরবানী যায়েজ হয় না) (মুয়াত্তা: হাদীস ১৪৪৮)
ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেন, জুমহুর ফুকাহার মতও তাই। অর্থাৎ আকীকার মধ্যে ঐ-সকল দোষ থেকে পরিহার করা হবে, কোরবানীর মধ্যে পরিহার করা হয়। (আল-ইসতিযকার: ১৫/৩৮৪)
তিনি অন্যত্র বলেন, এ-বিষয়ে উলামাদের ইজমা রয়েছে যে, গবাদী পশুর মধ্য থেকে কোরবানির মধ্যে যা যায়েজ হয়, আকীকার মধ্যে শুধু ঐসকল পশুই জবাই করা যায়েজ হবে। (আল-ইসতিযকার: ১৫/৩৮৩)
দুই.
দুই ধরনের কুরবানী (যেমন এখানে আকীকা এবং ওয়াজিব কোরবান দুটি) একটি পশু দ্বারা আদায় করা যায়েজ আছে কি না? তো এটি একটি ইজতিহাদী বিষয়। একারণে মুজতাহিদ ইমামগণের মাঝে এ বিষয়ে কিছু মতপার্থক্যও আছে। কিন্তু নস বা কুরআন-সুন্নাহর সুষ্পষ্ট কোনো বিধানে এ বিষয়ে নিষেধ আছে বলে আমাদের জানা নেই; বরং অনুমোদনের পক্ষে হাদীস-আছারের প্রমাণ রয়েছে।

বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ‘আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ. এর ফতোয়াটিই সম্ভবত বিজ্ঞজনের জন্য যথেষ্ট হবে। তিনি বলেছেন, ‘উট ও গরু সাতজনের পক্ষ হতে কুরবানী হতে পারে। আর এতে শরীক হতে পারে কুরবানীকারী, তামাত্তু হজ্বকারী এবং হজ্বের ইহরাম গ্রহণের পর হজ্ব আদায়ে অপারগ ব্যক্তি।
(দ্র. আসসুনান, সায়ীদ ইবনে মানসূর-আল কিরা লি-কাসিদি উম্মিল কুরা, পৃ. ৫৭৩)

দেখুন, সালাফের যুগেই একটি পশু দ্বারা তিন ধরনের কুরবানী আদায় হওয়ার ফতোয়া কত স্পষ্টভাবে দেয়া হয়েছে।
তিন.
গরু বা উটের ক্ষেত্রে একটি পশু সাত জনের সাতটি জবাইয়ের স্থলাভিষিক্ত গণ্য হয়। একারণেই একটি উট বা গরু সাত জনের পক্ষে যথেষ্ট হয়। সহীহ মুসলিম শরীফে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমরা হজ্বের ইহরাম বেঁধে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বের হলাম। তিনি আমাদেরকে আদেশ করলেন যেন প্রত্যেক উট ও গরুতে সাতজন করে শরীক হয়ে কুরবানী করি। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল হজ্ব, হাদীস : ১৩১৮/৩৫১)

অন্য বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (একটি) গরু সাতজনের পক্ষ হতে এবং (একটি) উট সাতজনের পক্ষ হতে (কুরবানী করা যাবে)। (আস-সুনান, আবু দাউদ, হাদীস : ২৮০৮, কিতাবুল আযাহী)
চার.
সারকথা অাকীকাও একধরণের কোরবানী অপরদিকে ‘নুসুক’ বা কুরবানীর ক্ষেত্রে শরীয়তের প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি এই যে, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে একটি পশু দ্বারা একটি কুরবানী আদায় হলেও উট ও গরুর ক্ষেত্রে একটি পশু দ্বারা সাতটি কুরবানী আদায় হতে পারে। আকীকাও যেহেতু ‘নুসুক’ বা কুরবানী তাই এ মূলনীতিতে আকীকাও শামিল থাকবে। সুতরাং ‘একটি পশু জবাই’ করা দ্বারা যেমন তা আদায় হবে, তেমনিভাবে গরু বা উটের সপ্তমাংশে শরীক হওয়ার দ্বারাও তা আদায় হয়ে যাবে।

এখানে এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, ‘আকীকায় তো পশু জবাই করতে বলা হয়েছে। অতএব অন্তত একটি পশু জবাইয়ের দ্বারাই তা আদায় হতে পারে।’ কারণ শরীয়তের দৃষ্টিতে পশু জবাই-এর দায়িত্ব যেমন একটি পশু জবাই করার দ্বারা আদায় হয় তেমনিভাবে নির্ধারিত পশুতে অন্যদের সাথে শরীক হওয়ার দ্বারাও আদায় হয়আকীকার ক্ষেত্রে এই মূলনীতি প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করলে ব্যতিক্রমের বিধানসম্বলিত দলীল লাগবে। আমাদের জানামতে এমন কোনো দলীল নেই।
বাকি থাকল দুই ধরনের কুরবানী এক পশু দ্বারা আদায় হওয়ার প্রশ্ন, এ বিষয়ে উপরে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।
আমাদের কিছু ভাই খুব সহজেই বলে দেন কোরবানীর সাথে আকীকা দেয়া যাবে না। হায়! তারা যদি উপরোক্ত কথাগুলো নিয়ে একটু ভাবতেন। আচ্ছা তারা যে সব কিছুতে হাদীস পেশ করার কথা বলেন, কোরবানীর সাথে আকীকা দেয়া নিষেধ, এ সংক্রান্ত কোন হাদীস কি তারা পেশ করেছেন?
ইয়া আল্লাহ আপনি সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন, আমিন।


রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

★ কুরবানী কার উপর ওয়াজিব

Mufti Abu Tasnim


প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫



★নেসাবের মেয়াদ
কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২

★ কুরবানীর সময়
মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম। -মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ২৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫

★নাবালেগের কুরবানী
নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

★মুসাফিরের জন্য কুরবানী 
যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১

★দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম
. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২

★কুরবানী করতে না পারলে
কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

ঈদুল আয্হার তাৎপর্য ও কুরবানীর ইতিহাস

# কুরবানীর বিধান আল্লাহ প্রদত্ত সকল শরীয়তেই বিদ্যমান ছিল
কুরবানীর ইতিহাস ততোটাই প্রাচীন যতোটা প্রাচীন মানব অথবা ধর্মের ইতিহাস। আল্লাহ পুরস্তির কুরবানী নামক এ মহান নিদর্শন মানব জাতির প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত সকল শরীয়তেই কার্যকর ছিলো। সকল নবীর উম্মতকেই কুরবানী করতে হয়েছে। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটা অপরিহার্য অংশ। আল্লাহতায়ালার এ বিধান মানব জাতির সৃষ্টি লগ্ন থেকেই কার্যকর হয়ে আসছে ।
মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস এটাই সাক্ষ্য দেয় যে, পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোন না কোন ভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেদের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করে । এটাই মানুষের চিরন্তন স্বভাব বা ফিতরাত।
এ ফিতরাতের স্বীকৃতি প্রদান করে মহান আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করেছেন ঃ
وَلِـكُلِّ اُمَّةٍ جَعَـلْـنَا مَنْسَكًا لِّـيَـذْكُرُوْا اسْمَ اللهِ عَلى مَـا رَزَقَـهُمْ مِنْ بَـهِيـْمَةِ الْاَنْـعَـامِ
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানীর এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নিতে পারে যে সব আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন”। { সূরা আল হজ্জ-৩৪}

মানব ইতিহাসের সর্ব প্রথম কুরবানী
মানব ইতিহাসের সর্ব প্রথম কুরবানী হযরত আদম আ. এর দু’পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানী। এ ঘটনাটি বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী সনদ সহ বর্ণিত হয়েছে। ইবনে কাসীর একে ওলামায়ে মোতাকাদ্দেমীন ও ওলামায়ে মোতায়াখ্খেরীনের সর্ব সম্মত উক্তি বলে আখ্যা দিয়েছেন। ঘটনাটি এই :
যখন আদম ও হাওয়া আ. পৃথিবীতে আগমন করেন এবং সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ যমজ সন্তান জন্ম গ্রহণ করত। তখন এক শ্রেণীর ভাই বোন ছাড়া হযরত আদমের আর কোন সন্তান ছিলনা। অথচ ভাই বোন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না।
তাই মহান আল্লাহ উপস্থিত প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে আদম আ. এর শরীয়তে বিশেষ ভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্ম গ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন গণ্য হবে। সুতরাং তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্ম গ্রহণকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে কন্যা সহোদরা বোন গণ্য হবে না। তাই তাদের পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ হবে।
কিন্তু ঘটনাক্রমে কাবিলের সহজাত সহোদরা বোনটি ছিল খুবই সুশ্রী-সুন্দরী তার নাম ছিল ‘আকলিমা’ আর হাবিলের সহজাত বোনটি ছিল তুলনামূলক কম সুন্দরী তার নাম ছিল ‘গাজা’। বিবাহের সময়ে হলে নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত অসুন্দরী কন্যা কাবিলের ভাগে পড়ল। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু হয়ে গেল। সে জেদ ধরল যে, আমার সহজাত বোনকেই আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। হযরত আদম আ. তাঁর শরীয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন।

অতঃপর তিনি হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা উভয়েই আল্লাহর জন্য নিজ নিজ কুরবানী পেশ কর। যার কুরবানী গৃহীত হবে, সে-ই উক্ত কন্যার পানি গ্রহণ করবে। হযরত আদম আ. এর নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, যে সত্য পথে আছে, তার কুরবানীই গৃহীত হবে।
তৎকালে কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নি শিখা এসে কুরবানীকে ভস্মীভূত করে আবার অন্তর্হিত হয়ে যেত। যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন ঃ
بِـقُـرْبَـانٍ تَـأكُـلُـهُ الـنَّـارُ “ঐ কুরবানী যাকে আগুন গ্রাস করে নিবে”। { সূরা আলে ইমরান-১৮৩।}
আর যে কুরবানীকে অগ্নি ভস্মীভূত করত না, সেটাকে প্রত্যাখ্যাত গণ্য করা হত। কুরবানীর এ তরীকা খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সা. এর যুগ পর্যন্ত সকল পূর্বেকার নবীর যুগে বলবৎ ছিল।
হাবিল ভেড়া, দুম্মা ইত্যাদি পশু পালন করত। সে একটি উৎকৃষ্ট দুম্বা কুরবানী করল। কাবিল কৃষি কাজ করত। সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানীর জন্যে পেশ করল। { তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূত্র হযরত ইবনে আব্বাস রা. কর্তৃক বর্ণিত। } অতঃপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নি শিখা অবতরণ করে হাবিলের কুরবানীটি ভস্মীভূত করে দিল এবং কাবিলের কুরবানী যেমন ছিল তেমনি পড়ে রইল। এ অকৃতকার্যতায় কাবিলের দুঃখ ও ক্ষোভ বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না। তাই সে হাবিলকে হত্যা করার সংকল্প করল এবং এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করে ফেলল। { মাআ’রেফুল কুরআন বাংলা সংস্করণ-৩২৪ পৃষ্ঠা। }
হাবিল ও কাবিলের কুরবানীর ঘটনা পবিত্র কুরআনে এ ভাবে বর্ণিত হয়েছে,

وَاتْلُ عَلَيْـهِمْ نَبَاَ ابْـنَـىْ ادَمَ بِـالْـحَـقِّ- اِذْ قَـرَّبَـا قُـرْبَانًا فَـتُـقُـبِّـلَ مِنْ اَحَدِهِمَا وَلَمْ يُـتَـقَبَّلْ مِنَ الْاخَرِ- قَالَ لَاَقْتُلَـنَّكَ- قَالَ اِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ- لَئِنْ بَسَطْتَّ اِلَىَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِىْ مَا اَنَا بِبَاسِطٍ يَّدِىَ اِلَيْكَ لِاَ قْتُلَكَ- اِنِّىْ اَخَافُ اللهَ رَبَّ الْعلَمِيْنَ- اِنِّىْ اُرِيْدُ اَنْ تَبُـوْاَ بِـاِثْمِىْ وَاِثْمِكَ فَتَكُـوْنَ مِن اَصْحبِ النَـارِ- وَذلِكَ جَزؤُ الظّلِمِيْنَ- فَطَوَّعَتْ لَـهُ نَـفْسُه قَـتْلَ اَخِـيْـهِ فَقَـتَـلَهُ فَاَصْبَحَ مِنَ الْـخسِرِيْنَ- فَبَـعَـثَ اللهُ غُـرَابًا يَبْحَثُ فِى الْاَرْضِ لِيُرِيَهُ كَـيْـفَ يُـوَارِىْ سَـوْءَةَ اَخِيْهِ- قَالَ يـوَ يْلَتـى اَعَجَزْتُ اَنْ اَكُوْنَ مِـثْلَ هـذَا الْغُرَابِ فَاُوَارِىَ سَـوْءَةً– فَاَصْبَحَ مِنَ النّدِمِيْنَ
“আপনি তাদেরকে আদমের দু’ পুত্রের ঘটনাটি ঠিকভাবে শুনিয়ে দিন। (তা হচ্ছে এই যে,) যখন তারা উভয়ে কুরবানী পেশ করলো, তখন তাদের একজনের কুরবানী গৃহীত হল আর অপর জনের কুরবানী গৃহীত হলোনা। তখন সে ভাইকে বলল- অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব। সে উত্তরে বলল আল্লাহ তো মুত্তাকীদের কুরবানীই কবুল করেন।
যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবে আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হস্ত প্রসারিত করব না। নিশ্চয়ই আমি বিশ্ব জগতের পালন কর্তা আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই যে, আমার পাপ ও তোমার পাপ তুমি নিজের মাথায় চাপিয়ে নাও। অত:পর তুমি দোযখীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাও। এটাই অত্যাচারীদের শাস্তি। অতঃপর তার অন্তর তাকে ভ্রাতৃ হত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। অনন্তর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতি গ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল।
আল্লাহ এক কাক প্রেরণ করলেন। সে মাটি খনন করছিল যাতে তাকে শিক্ষা দেয় যে, আপন ভ্রাতার মৃতদেহ সে কিভাবে সমাহিত করবে। সে বললো, আফসোস! আমি কি এ কাকের সমতুল্যও হতে পারলাম না যে, আপন ভ্রাতার মৃতদেহ সমাহিত করি! অত:পর সে অনুতাপ করতে লাগল”। { সূরা আল মায়িদাহ, ২৭-৩১ আয়াত। }
উল্লেখ্য যে, হযরত আদম আ. এর পর সকল উম্মতের মধ্যেই অবিচ্ছন্ন ভাবে কুরবানীর ধারাবাহিকতা চলতে থাকে।

আমাদের কুরবানী সুন্নাতে ইবরাহীমী
কুরবানী ইবাদত হিসেবে যদিও আদম আ. এর যুগ হতে হয়ে আসছে কিন্তু পরবর্তীতে হযরত ইবরাহীম আ. এর এক ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে শুরু হয়েছে। আমরা হযরত ইবরাহীম আ. এর মিল্লাতের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি। এ মিল্লাতের প্রতিষ্ঠাতা ও মুসলিম জাতির পিতা হচ্ছেন হযরত ইবরাহীম আ.। তিনি যেমন আল্লাহর নির্দেশে জীবনের সবচাইতে প্রিয় বস্তু- পুত্র ইসমাঈলকে তাঁর উদ্দেশ্যে কুরবানী করতে প্রস্তুত ছিলেন, ঈদুল আয্হার দিন মুসলমানরাও তেমনি পশু কুরবানীর মাধ্যমে নিজেদের প্রিয়তম জান-মাল আল্লাহর পথে কুরবানী করার সাক্ষ্য প্রদান করেন।
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম আ. এর সেই মহত্ব ও মাকবুল কুরবানীকে শাশ্বত রূপদানের জন্যেই আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল সা. এই দিনে মুসলমানদেরকে ঈদুল আয্হা উপহার দিয়েছেন এবং এ কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছেন।

হযরত ইবরাহীম আ. কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইসমাঈলের কুরবানীর জীবন্ত ইতিহাস
মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মহান নবী হযরত ইবরাহীম আ. কে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন ধরনের কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষা করেছেন। তিনি প্রত্যেকটি পরীক্ষায় পূর্ণ সফলকাম প্রমাণিত হয়েছেন। পরীক্ষাগুলি হলো-
এক. তাওহীদের হেফজতের প্রয়োজনে চিরদিনের জন্য প্রিয় জ¤œভূমি ত্যাগ করে হিজরত করলেন। হযরত লূত আ. যিনি ইতিপূর্বে তাঁর উপর ঈমান এনেছিলেন তাকে সাথে নিয়ে নিজ জ¤œভূমি ইরাক থেকে হিজরত করে ফিলিস্তিনের কেনানে অবস্থান নিলেন। ৮৬ বৎসর বয়সে সেখানে বসে আওলাদের জন্য দোয়া করলেন
رَبِّ هَـبْ لِىْ مِـنَ الـصَّالِـحِيْـنَ “হে আল্লাহ আমাকে সৎ পুত্র দান করুন”। { সূরা আসসাফ্ফাত-১০০।}

মহান আল্লাহ তায়ালা সুসংবাদ দিয়ে বললেন
فَـبَـشَّـرْنهُ بِـغُـلـمٍ حَـلِـيْـمٍ
“ইবরাহীমকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। ৯৯ বৎসরের সময় আরেক জন ছেলে হয়েছে তার নাম ইসহাক”। { সূরা আসসাফ্ফাত-১০১।}

দুই. নমরুদ কর্তৃক প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হয়ে চরম ধৈর্য্যরে ও আল্লাহ প্রেমের পরাকাষ্ঠ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর খলীলের জন্য আগুনকে ফুলবাগীচায় পরিণত করে দিয়েছিলেন।
মহান আল্লাহ্ বলেন
قُلْنَا يا نَارُ كُوْ نِىْ بَرْدًا وَ سَلَا مًا عَلى اِبْرَاهِيْمَ
“আমি বললাম, হে আগুন, তুমি ইবরাহীমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও”। { সূরা আল আম্বিয়া -৬৯। }

তিন. অতঃপর যখন তাঁর প্রিয় আদরের পুত্র ইসমাঈল ও প্রিয় স্ত্রী হযরত হাজেরা আ. কে মক্কার বিরাণ মরুভূমিতে ছেড়ে আসার আদেশ হলো। সেটাও ছিল কঠিন পরীক্ষা। কেননা বার্ধক্য ও শেষ বয়সের বহু আকাংখার স্বপ্নসাধ, দিবা রাত্রির প্রার্থণার ফল এবং পরিবারের একমাত্র আশার আলো হযরত ইসমাঈল কে শুধু আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পানি ও জনমানবহীন মরু প্রান্তরে রেখে এসেছেন। অথচ একবারও পিছনের দিকে ফিরেও তাকাননি। যেন এমন না হয় যে, পিতৃ¯েœহ উথলিয়ে উঠে এবং আল্লাহর আদেশ পালনে কোন প্রকার বিচ্যুতি ঘটে যায়। স্ত্রী ও পুত্রকে সেখানে রেখে এসে তিনি কেবল আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করলেন:
رَبَّناَ اِنِّىْ اَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِىْ بِوَادٍ غَيْرِ ذِىْ زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ- رَبَّنَا لِيُقِيْمُوْا الصَّلوةَ فَا جْعَلْ اَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِىْ اِلَيْهِمْ وَاَرْزُقْهُمْ مِّنَ الثَمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُوْنَ
“হে আল্লাহ! আমি নিজের এক বংশধরকে আপনার পবিত্র ঘরের নিকট অনাবাদ জায়গায় বসবাস করালাম। হে আল্লাহ ! যেন তারা নামায কায়েম করে। অত;পর আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফল ফলাদি দ্বারা রুজি দান করুন। আশা করি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে”। { সূরা আল ইবরাহীম -৩৭।}

চার. উপরোল্লিখিত পরক্ষিাগুলির কঠিন মঞ্জিল অতিক্রম করার পর হযরত ইবরাহীম আ. কে স্বপ্নের মাধ্যমে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়। যা বিগত পরীক্ষাগুলির চেয়ে ও অধিক কঠিন, হৃদয় বিদারক ও আল্লাহ প্রেমের কঠিন পরীক্ষা। কোন কোন বর্ণনা মতে জানা যায় যে, এই স্বপ্ন তিনি পরপর তিন রাত্রি দেখেন।
স্বপ্নে তিনি একমাত্র প্রিয় পুত্র ইসমাঈল কে কুরবানী করতে আদিষ্ট হন। প্রাণ প্রিয় পুত্রকে কুরবানী করার নির্দেশ তাঁকে এমন সময় দেয়া হয়েছিল, যখন অনেক দোয়া কামনা করে পাওয়া সন্তানকে লালন পালন করার পর পুত্র পিতার সাথে চলাফেরা করতে পারে এবং তাঁকে সাহায্য করার যোগ্য হয়েছে। তাফসীরবিদগণ লিখেছেন: এ সময় হযরত ইসমাঈলের বয়স ছিল তের বছর। কেউ কেউ বলেছেন তিনি তখন বয়প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন। { তাফরীরে মাযহারী।}
তবে তাফসীরে রুহুল বয়ানে আছে ৯ বছরের কথা। এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত সত্য যে, নবী রাসূলগণের স্বপ্নও ওহীর অর্ন্তভূক্ত। তাই এ স্বপ্নের অর্থ ছিল এই যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হযরত ইবরাহীম আ. এর প্রতি একমাত্র পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এ হুকুমটি স্বপ্নের মাধ্যমে দেয়ার কারণ হলো হযরত ইবরাহীম আ. এর আনুগত্যের বিষয়টি পূর্ণমাত্রায় প্রমাণিত করা। হযরত ইবরাহীম আ. মহান প্রতি পালকের নির্দেশ সত্বর পালনের নিমিত্তে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। কিন্তু এ পরীক্ষাটি যেহেতু ইবরাহীম আ. এর ব্যক্তিত্বের সাথে সাথে তার পুত্রও সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাই তিনি তার পুত্র ইসমাঈলকে লক্ষ্য করে বললেন
قَالَ يبُنَىَّ اِنِّىْ اَرى فِى الْمَنَـامِ اَنِّى اَذْ بَـحُـكَ فَـانْـظُـرْ مَـاذَا تَـرى-
“হে প্রাণ প্রিয় পুত্র আমার! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি। সুতরাং তুমি চিন্তা ভাবনা করে দেখ এবং এ স্বপ্নের ব্যাপারে তোমার অভিমত কি? তা বল”। { সূরা আস-সাফফাত-১০২ ।}

যেমন বাপ, তেমন বেটা। পুত্রও ছিলেন যেন হযরত ইবরাহীম আ. এর ছাঁচে গড়া, কেননা তিনি ও ভাবী নবী। তাই তৎক্ষণাৎ আত্মসর্ম্পনে মস্তক অবনত করে পুত্র জবাবে বললেন :
قَالَ يـاَبَتِ افْـعَـلْ مَا تُـؤْمَرُ- سَـتَـجِـدُ نِىْ اِنْ شَـاءَ اللهُ مِنَ الـصّـبِـرِيْـنَ-
“হে আমার পিতাজী! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন”। { সূরা আস সাফ্ফাত-১০২।}

পুত্রের সাথে পরামর্শের হিকমত ছিল এই যে,
প্রথমত: পুত্রের দৃঢ়তা, হিম্মত এবং আল্লাহর আনুগত্যের জয্বা সৃষ্টি হওয়ার পরীক্ষা স্বরূপ।
দ্বিতীয়ত : সে আনুগত্য স্বীকার করলে সওয়াব ও প্রতিদানের অধিকারী হবে। কেননা সওয়াবের জন্য নিয়ত ও আগ্রহ জরুরী।

তৃতীয়ত : যবেহের সময় মানুষ হিসেবে এবং স্বভাবজাত পিতৃ¯েœহের কারণে কোন ভূল ভ্রান্তি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে অনেকটা মুক্ত থাকার প্রবল আশা সৃষ্টি হবে।{ তাফসীরে রুহুল বয়ান।}
পরামর্শ শেষে পিতা ও পুত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে কুরবানীর নির্দেশ পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং এ কাজ সমাধার জন্য তারা মিনা প্রান্তরে গমন করেন।

ইতিহাস ও তাফসীর ভিত্তিক কোন কোন রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, শয়তান কুরবানীর মহান একাজে বিভিন্নভাবে বাঁধার সৃষ্টি করে । সে প্রথমে মা হাজেরা ও ইসমাঈল আ. কে উল্টো বুঝিয়ে এ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁরা শয়তানের প্ররোচনায় কোন পাত্তা দিলেন না। মরদুদ শয়তান হযরত হাজেরা আ. ও হযরত ইসমাঈল আ. কে ধোঁকা দেয়া থেকে নিরাশ হয়ে মিনা যাওয়ার পথে ‘জামরায়ে আকাবাহ’, ‘জামারায়ে উসত্বা’ এবং ‘জামরায়ে উলা’ এই তিন জায়গায় তিনবার হযরত ইবরাহীম আ. কে প্ররোচিত করার চেষ্টা করে এবং হযরত ইবরাহীম আ. প্রত্যেকবারই তাকে সাতটি করে কংকর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাড়িয়ে দেন। অদ্যাবধি এ প্রশংসনীয় কাজের স্মৃতি স্বরূপ মিনায় ঐ তিনটি স্থানে কংকর নিক্ষেপ করার বিধান হাজীদের জন্য ওয়াজিব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
অবশেষে পিতা-পুত্র উভয়ে যখন এই মহান কুরবানীর ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানগাহে পৌঁছলেন এবং ইবরাহীম আ. কুরবানী করার জন্য ইসমাঈল আ. কে শোয়ালেন, তখন পুত্র ইসমাঈল আ. পিতা ইবরাহীম আ. কে বললেন আব্বাজান! আমার হাত পা খুব শক্ত করে বেঁধে নিন যাতে আমি নড়াচড়া করতে না পারি। আর আপনার পরিধেয় বস্ত্রাদি সামলে নিন, যাতে আমার রক্তের ছিটা না পড়ে। অন্যথায় এতে আমার ছওয়াব হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া রক্ত দেখলে আমার মা অধিক ব্যাকুল হবেন। আপনার ছুরিটি ধার দিয়ে নিন এবং আমার গলায় দ্রুত চালাবেন, যাতে আমার প্রাণ সহজে বের হয়ে যায়। কারণ, মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার। আপনি আমার আম্মাজানের নিকট আমার শেষ বিদায়ের সালাম টুকু অনুগ্রহ পূর্বক পৌঁছে দিবেন। যদি আমার জামা তার নিকট নিয়ে যেতে চান, তবে নিয়ে যাবেন।
একমাত্র আদরের সন্তানের মুখে এমন কথা শুনে পিতার মানসিক অবস্থা কি যে হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু হযরত ইবরাহীম আ. দৃঢ়তায় অটল পাহাড় হয়ে জবাব দিলেন, ওগো আমার প্রাণ প্রিয় বৎস! আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্য তুমি আমার চমৎকার সহায়ক হয়েছ। অতঃপর তিনি পুত্রকে আদর করে চুম্বন করলেন এবং অশ্রু সজল নয়নে তাকে বেঁধে নিলেন ।
অতঃপর তাঁকে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে তার গলায় ছুরি চালালেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার যে, বার বার ছুরি চালানো সত্বেও গলা কাটছে না। কেননা আল্লাহ তায়ালা স্বীয় কুদরতে পিতলের একটা টুকরা মাঝখানে অন্তরায় করে দিয়েছিলেন।

তখন পুত্র নিজেই আবদার করে বললেন, আব্বাজী! আমাকে উপুড় করে শুইয়ে নিন। কারণ, আমার মুখমন্ডল দেখে আপনার মধ্যে পিতৃ ¯েœহ উথলে উঠে। ফলে গলা কাটা যাচ্ছে না। এ ছাড়া ছুরি দেখে আমি ঘাবড়ে যাই। সে মতে হযরত ইবরাহীম আ. তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন এবং পুনরায় সজোরে প্রাণপণে ছুরি চালালেন।
কিন্তু তখন ও গলা কাটতেছেনা। হযরত ইবরাহীম আ. চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। হযরত ইবরাহীম আ. এর এ প্রাণন্তর প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেন এবং হযরত ইসমাঈলের বিনা যবেহেই তার কুরবানী কবুল করে নিলেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবরাহীম আ. এর উপর ওহী নাযিল হলো। { তাফসীরে রুহুল মাআ’নী। সূত্র হযরত কাতাদাহ রা. হতে বর্নিত, তাফসিরে ইবনে কাসীর মসনদে আহমদ থেকে নকল করা হয়েছে। সূত্র হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত।}
فَلَمَّا اَسْلَمَا وَتَلَّه لِلْجَبِيْنِ- وَنَادَيْنهُ اَنْ يَّا اِبْرَاهِيْمَ- قَدْ صَدَّقْتَ الرُّءْيَا- اِنَّا كَذلِكَ نَـجْـزِى الْـمُحْسِنِيْـنَ- اِنَّ هـذَا لَهُـوَ الْـبَلـؤُ الْمُبِيْـنُ- وَقَـدَيْنهُ بِـذِبْحٍ عَـظِـيْمٍ-
“অবশেষে যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আল্লাহর কাছে নিজেদের কে সোপর্দ করলো এরং ইবরাহীম আ. পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন (যবেহ করার জন্যে), তখন আমরা তাকে সম্বোধন করে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি সপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমরা সৎকর্মশীলদের এরূপ প্রতিদানই দিয়ে থাকি। বস্তুত এ এক সুস্পষ্ট কঠিন পরীক্ষা। আর আমরা বিরাট কুরবানী ফিদিয়া স্বরূপ দিয়ে তাকে (ইসমাঈলকে) উদ্ধার করেছি”। { সূরা আস-সাফ্ফাত ১২০-১০৭।}
অতঃপর আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন এখন পুত্রকে ছেড়ে দিন এবং আপনার নিকট যে দুম্বাটি দাঁড়ানো রয়েছে, পুত্রের পরিবর্তে সেটাকে যবেহ করুন। তখন ইবরাহীম আ. পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখেন, একটি হৃষ্ট পুষ্ট দুম্বা দাঁড়ানো আছে। আল্লাহর শোকর আদায় করে তিনি সেই দুম্বাটিকে যবেহ করলেন।
এটাই সেই কুরবানী যা আল্লাহর দরবারে এতই প্রিয় ও মাকবুল হয়েছিল যে, আল্লাহ তায়ালা পরবর্তী সকল উম্মতের মধ্যে তা অবিস্মরণীয় রূপে বিরাজমান রাখার ব্যবস্থা করে দিলেন।
যদ্দরুণ মিল্লাতে ইবরাহীমে তথা দ্বীন ইসলামে এক মহান ওয়াজিব ইবাদত ও শিয়ার প্রতীক হিসেবে এ কুরবানী আজও পালিত হয়ে আসছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা পালিত হতে থাকবে।

তাই মহান আল্লাহ বলেন
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِى الْا خِرِيْنَ
“আর আমরা ভবিষ্যতের উম্মতের মধ্যে ইবরাহীমের এ সুন্নাত স্মরণীয় করে রাখলাম”। { সূরা আস আস সাফ্ফাত ১০৮।}

বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রতি কুরবানীর নির্দেশ
আল কুরআনে নবী করীম সা. কে সালাত আদায় করার মতো কুরবানী করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে ঃ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“তোমার রবের জন্য নামায পড় এবং কুরবানী করো”। { সূরা আল কাউসার -০২}
মহান আল্লাহ কুরবানী ও জীবন দানের প্রেরণা ও চেতনা সমগ্র জীবনে জাগ্রত রাখার জন্যে নবী সা. কে আরো নির্দেশ দিয়ে বলেছেন
قُلْ اِنَّ صَلوتِىْ وَنُسُكِىْ وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِىْ لِلّهِ رَبِّ الْعلَمِيْنَ– لَا َشَرِيْكَ لَه وَبِذ لِكَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ-
“বলুন! হে মুহাম্মদ! আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সব কিছুই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্যে। তাঁর কোন শরীক নেই। আমাকে তাঁরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমি সকলের আগে তাঁর অনুগত ও ফরমাবরদার”। { সূরা আল আনআম-১৬২}

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সা. মদীনায় দশ বৎসর অবস্থান করেন। এ সময় তিনি প্রতি বছর কুরবানী করতেন। { সুনানে আত তিরমিযী}

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

আগে মুসলমানদের ঈদে পশু কুরবানী দেখে আমার খুব অমানবিক বলে মনে হতো।


আগে মুসলমানদের ঈদে পশু কুরবানী দেখে আমার খুব অমানবিক বলে মনে হতো।ভাবতাম “আহারে ! মুসলমানরা জবাই করার পর গরুগুলো কিভাবে ছটপট করে, কত কষ্টই না হয় তাদের, অথচ খ্রিস্টানরা কি সুন্দর মাথায় ‍একটা গুলি করে, আর পশুটা নিশ্চুপ হয়ে যায়, দেখে মনে হয় তার তেমন কষ্টই হয় না। অপরদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এক কোপে পাঠা/মহিষের গলা কাটে, এতে ঐ পশুটাও মুসলমানদের জবাইকৃত পশুর মত এত নড়াচড়া করে না।
বিষয়টি নিয়ে আমি মাঝে মাঝে মুসলমানদের কোরবানীর বিরুদ্ধে বলতাম, কিন্তু হঠাৎ পাওয়া একটি গবেষণা রিপোর্ট আবার সব ধারণা চেঞ্জ করে দেয়, আসুন রিপোর্টটি দেখি:
---------------------------------------------------------------------------
আপনার কি মনে হয় ইসলামিক পশু জবাই পদ্ধতিটি খুব নিষ্ঠুর?
আসুন দেখা যাক, বিজ্ঞান কি বলে :
western world এ পশু জবাইয়ের প্রচলিত নিয়ম(CPB Method):
Captive bolt pistol(CPB ) নামের এক ধরনের যন্ত্র দ্বারা পশুর কপালে প্রচন্ড আঘাত করা হয়......ধারনা করা হয় এতে পশু unconcious হয়ে পড়ে এবং জবাইয়ের পর ব্যথা অনুভব করে না ......
গবেষণা :
জার্মানির Hanover University এর প্রফেসর Wilhelm Schulze এবং তার সহযোগী Dr. Hazim এর নেতৃত্বে একটি গবেষণা পরিচালিত হয় ...গবেষনার বিষয়বস্তু ছিল : ১.western world এ প্রচলিত নিয়মে(CPB Method) এবং ২.ইসলামিক নিয়মে পশু জবাইয়ে পশুর যন্ত্রণা এবং চেতনাকে চিহ্নিত করা......
Experimental Setup:
brain এর surface কে touch করে পশুর মাথার খুলির বিভিন্ন জায়গায় surgically কিছু electrode ঢুকিয়ে দেয়া হয় ...... পশুকে এরপর সুস্থ হওয়ার জন্য কিছু সময় দেয়া হয়......তারপর পশুগুলোকে জবাই করা হয়......কিছু পশুকে ইসলামিক নিয়মে আর কিছু পশুকে western world এর নিয়মে...... জবাই করার সময় electroencephalograph (EEG) এবং electrocardiogram (ECG) করে পশুগুলোর brain এবং heart এর condition দেখা হয়......
Result:
ইসলামিক পদ্ধতিতে জবাইয়ের ফলাফলঃ
১. জবাইয়ের প্রথম ৩ সেকেন্ড EEG graph এ কোন change দেখা যায় না ......তারমানে পশু কোন উল্লেখযোগ্য ব্যথা অনুভব করে না ...
২. পরের ৩ সেকেন্ডের EEG record এ দেখা যায় , পশু গভীর ঘুম এ নিমগ্ন থাকার মত অচেতন অবস্থায় থাকে...... হঠাৎ প্রচুর পরিমানে রক্ত শরীর থেকে বের হয়ে যাবার কারনে brain এর vital center গুলোতে রক্তসরবরাহ হয়না.........ফলে এই অচেতন অবস্থার সৃষ্টি হয়......
৩. উপরিউল্লিখিত ৬ সেকেন্ড এর পর EEG graph এ zero level দেখায় ...... তারমানে পশু কোন ব্যথাই অনুভব করেনা ......
৪. যদিও brain থেকে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না , তবুও heart স্পন্দিত হচ্ছিল এবং তীব্র খিঁচুনি হচ্ছিল (spinal cord এর একটা reflex action) । এভাবে শরীর থেকে প্রচুর পরিমানে রক্ত বের হয়ে যাচ্ছিল এবং এর ফলে ভোক্তার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত মাংস নিশ্চিত হচ্ছিল ।
western world এ প্রচলিত পদ্ধতিতে(CPB Method) জবাইয়ের ফলাফলঃ
১. মাথায় প্রচন্ড আঘাত করার পরের মুহূর্তে পশুটিকে দৃশ্যত অচেতন মনে হচ্ছিল
২. কিন্তু EEG এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছিল পশুটি খুব কষ্ট পাচ্ছে ।
৩. ইসলামিক পদ্ধতিতে জবাই করা পশুর তুলনায় CBP দিয়ে আঘাত করা পশুটির heart স্পন্দন আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । যার ফলে পশুটির শরীর থেকে সব রক্ত বের হতে পারে নি । এবং ফলশ্রুতিতে, পশুটির মাংস ভোক্তার জন্য অস্বাস্থ্যকর হয়ে যাচ্ছিল ।
western world এর পদ্ধতি(CPB Method) এবং MAD COW রোগঃ
Texas A & M University এবং Canada এর Food Inspection Agency একটা পদ্ধতি(Pneumatic Stunning) আবিষ্কার করেছে যেটাতে একটা metal bolt পশুর brain এ fire করা হয় এবং এর ফলে brain এর টিস্যু পশুর সারা শরীরে ছড়িয়ে পরে । brain tissue এবং spinal cord হল Mad Cow আক্রান্ত গরুর সবচেয়ে সংক্রামক অংশ ।
এছাড়াও brain এবং heart এ electric shock এর মাধ্যমে পশুকে অচেতন করেও কিছু কিছু জায়গায় পশু জবাই করা হয় যেটা মাংসের quality এর উপর খুব খারাপ প্রভাব ফেলে ।
ভারতীয় পদ্ধতিঃ
ভারতে পশুর মাথা এক কোপে আলাদা করে ফেলা হয় । এতে করে ঐচ্ছিক পেশীগুলো হঠাৎ করে সঙ্কুচিত হয়ে পরে যা অনেক পুষ্টি সমৃদ্ধ তরল বের করে দেয় এবং heart হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শরীর থেকে রক্ত বের হতে পারে না , যা বের হওয়া স্বাস্থ্যকর মাংসের জন্য দরকার ।
এছাড়া ইসলামে spinal cord না কেটে শ্বাসনালী , এবং jugular vein দুটো কাটার
ব্যাপারে জোর দেয়া হয়েছে । এর ফলে রক্ত দ্রুত শরীর থেকে বের হয়ে যেতে পারে । spinal cord কাটলে cardiac arrest এর সম্ভাবনা থাকে যার ফলে রক্ত শরীরে আটকে যাবে যা রোগজীবানু এর উৎস ।
(http://www.somewhereinblog.net/blog/tasfi/29476202)
---------------------------------------------------------------------
মানুষকে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় প্রাণী খেতেই হবে। কিন্তু কোন উপায়ে খাবে, সেটাই হলো কথা। উপরের দলিল দ্বারা এটা স্পষ্ট- ইউরোপের মত গুলি করে খেলে একদিক দিয়ে পশুটার কষ্ট হয় বেশি অন্যদিকে পশুটার মাংশ হয়ে পড়ে দূষিত। ভারতীয়দের সিস্টেমের ফলাফলও একই রকম। তাই আমার মন হয়, মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম হোক, সবার জন্য ইসলামী সিস্টেম ফলো করাই সবেচেয়ে ‍উত্তম হবে।

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ঈদ মোবারাক


পশুর হাঁটের হাঁটাহাঁটি 
সবই শেষ বাকি শুধু নিয়তখানি ,
কাল সকালে নামাজ পড়েই 
আল্লাহ্‌র নামে দিব কোরবানি । 

খেয়াল রেখ এই ঈদে মুখে মিষ্টি নয় 
ত্যাগের পশুর তিনভাগের একভাগ দিয়েই যেন ঈদের খাওয়া শুরু হয় ।
প্রতি নামাজের পর “তাকবীরে তাশরীক” যেন না হয় মিস
কোরবানির পর সব বর্জ্য ফেলে কাজ যেন করি ফিনিশ !
বাকি দুইভাগ গোশতের বণ্টন 
বন্ধ যেন হয় গরীবের কিঞ্চিৎ ক্রন্দন , 
ঈদের দিনগুলিতে শুধু যেন না করি লুটোপুটি 
খাওয়া দাওয়া আর বেড়ানোর মাঝে নামাজ যেন না ছাড়ি ।

ঈদের গোশত খাওয়ার দাওয়াত নয়, 
ঈদে তোমার আমার আত্মীয়তার ছেড়া বাঁধন যেন দৃঢ় হয় ,
ঈদের আনন্দে কষ্টগুলো বিদায় যেন নেয় ,
আমাদের প্রার্থনা সর্বদা যেন জাগ্রত রয় , 
খোদার রহমত অবিরত যেন বয় । 

ঈদের দিনে তোমাকে আমার কি নিমন্ত্রণ করতে হয় ?
ঈদের দিনে সবার ঘরেই সবার দাওয়াত রয় । 

ঈদ মোবারাক । 

ইসলামি কলামের ব্লগার ইমরান হুসাইন আদিব এর পক্ষ থেকে সকল ধর্মপ্রান মুসলমানদের কে জানাই ঈদ মোবারাক


ঈদের দিনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত করনীয়-

১-ফজরের নামাজ জামায়াতে আদায় করা।
.
২-ঈদের দিন গোসল করা । (মুয়াত্তা মালেক-৪২৮)
.
৩-নতুন বা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা। (বায়হাকি-৩/২৮১)
.
৪-ঈদুল ফিতরে বিজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে যাওয়া আর ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদে কিছু না খেয়ে যাওয়া এবং এসে কুরবানির গোস্ত প্রথমে খাওয়া সুন্নাত, যদি খুব দেরি না হয় তবে সুন্নাতটা পালন করা উচিত। (বুখারি-৯৫৩,তিরমিযী-৫৪২,দারেমী-১৬০৩)
.
৫-পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া এবং আসার সময় পায়ে হেটেই আসা এবং ভিন্ন রাস্তা দিয়ে আসা।(সহিহ ইবনে মাযাহ-১০৭০)
.
৬- ঈদের নামাজ মসজিদে না পড়ে ঈদের মাঠে পড়া তবে বৃষ্টির কারণে মসজিদে পড়া জায়েজ রয়েছে।(বুখারি)
.
৭-আরাফার দিন ফজরের সলাত থেকে ১৩ জিলহয আসর সলাত পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয সলাতের পড় এই তাকবীর পাঠ করা- ‘‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’’ এছাড়াও ১৩ তারিখ পর্যন্ত যে কোন সময় পরাও উত্তম।(বুখারি)
.
৮-ঈদের সালাতে নিজেরা যাওয়ার পাশাপাশি মহিলাদেরকে সাথে নেওয়া এবং তাদের জন্য ঈদের মাঠে অবশ্যই আলাদা ব্যবস্থা রাখা। (বুখারি-৩২৪)
.
৯- প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরিমাসহ অর্থাৎ প্রথম তাকবিরসহ ৭ তাকবীর এবং ২য় রাকাতে ৫ তাকবীর দিয়ে মোট ১২ তাকবীরে ঈদের সলাত আদায় করা। (সহিহ আবুদাউদ-১০১৮)
.
১০-একে অন্যকে এই বলে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো- ‘তাকাববালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনক’ অর্থ- আল্লাহতায়ালা আমাদের ও আপনার ভাল কাজগুলো কবুল করুন। (ফাতহুল বারি,অধ্যায়-২, পৃঃ ৪৪৬)
.
১১- অবশ্যই ঈদের সলাত আগে আদায় করে এসে তারপর কুরবানি করা, সলাতের আগে কুরবানি করলে কুরবানিই হবে না। (বুখারি-৯৫৫)

আইয়ামুত তাশরীক এর ফযিলত এ দিনগুলোর ফযিলত সম্পর্কে যে সকল বিষয় এসেছে তা নীচে আলোচনা করা হল: —

[১] এ দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগি, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জিকির ও তার শুকরিয়া আদায়ের দিন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:— ﴿ ۞ ﻭَﭐﺫۡﻛُﺮُﻭﺍْ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻓِﻲٓ ﺃَﻳَّﺎﻡٖ ﻣَّﻌۡﺪُﻭﺩَٰﺕٖۚ ٢٠٣ ﴾ [ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ٢٠٣ ] ‘তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করবে।’[ সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২০৩] এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারি রহ. বলেন:— ﻋﻦ ﺃﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﻤﺎ ... ﺍﻷﻳﺎﻡ ﺍﻟﻤﻌﺪﻭﺩﺍﺕ : ﺃﻳﺎﻡ ﺍﻟﺘﺸﺮﻳﻖ . [ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ، ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻌﻴﺪﻳﻦ ] ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন—‘নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে আইয়ামুত-তাশরীককে বুঝানো হয়েছে।’ ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন: ইবনে আব্বাসের এ ব্যাখ্যা গ্রহণে কারো কোনো দ্বি-মত নেই। আর মূলত এ দিনগুলো হজের মওসুমে মিনাতে অবস্থানের দিন। কেননা হাদিসে এসেছে— ... ﺃﻳﺎﻡ ﻣﻨﻰ ﺛﻼﺛﺔ : ﻓﻤﻦ ﺗﻌﺠﻞ ﻓﻲ ﻳﻮﻣﻴﻦ ﻓﻼ ﺇﺛﻢ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﻣﻦ ﺗﺄﺧﺮ ﻓﻼ ﺇﺛﻢ ﻋﻠﻴﻪ . [ ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ ﻭﺻﺤﺤﻪ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻲ ] মিনায় অবস্থানের দিন হল তিন দিন। যদি কেউ তাড়াতাড়ি করে দু দিনে চলে আসে তবে তার কোনো পাপ নেই। আর যদি কেউ বিলম্ব করে তবে তারও কোনো পাপ নেই। [আবু দাউদ: ১৯৪৯] হাদিসে এসেছে— ﻋﻦ ﻧﺒﻴﺸﺔ ﺍﻟﻬﺬﻟﻲ ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ - ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ - ﻗﺎﻝ : « ﺃﻳﺎﻡ ﺍﻟﺘﺸﺮﻳﻖ ﺃﻳﺎﻡ ﺃﻛﻞ ﻭﺷﺮﺏ ﻭﺫﻛﺮ ﺍﻟﻠﻪ . » [ ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ] নাবীশা হাজালী থেকে বর্ণিত যে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘আইয়ামুত-তাশরীক হল খাওয়া-দাওয়া ও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের যিকিরের দিন।’[মুসলিম: ১১৪১] ইমাম ইবনে রজব রহ. এ হাদিসের ব্যাখ্যায় চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি বলেন: আইয়ামুত-তাশরীক এমন কতগুলো দিন যাতে ঈমানদারদের দেহের নেয়ামত ও স্বাচ্ছন্দ্য এবং মনের নেয়ামত তথা স্বাচ্ছন্দ্য একত্র করা হয়েছে। খাওয়া- দাওয়া হল দেহের খোরাক আর আল্লাহর জিকির ও শুকরিয়া হল হৃদয়ের খোরাক। আর এভাবেই নেয়ামতের পূর্ণতা লাভ করল এ দিনসমূহে।
,
[২] আইয়ামুত-তাশরীকের দিনগুলো ঈদের দিন হিসেবে গণ্য। যেমন হাদিসে এসেছে — ﻋﻦ ﻋﻘﺒﺔ ﺑﻦ ﻋﺎﻣﺮ - ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ - ﺃﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ : «ﻳﻮﻡ ﻋﺮﻓﺔ، ﻭﻳﻮﻡ ﺍﻟﻨﺤﺮ، ﻭﺃﻳﺎﻡ ﻣﻨﻰ ﻋﻴﺪﻧﺎ ﺃﻫﻞ ﺍﻹﺳﻼﻡ، ﻭﻫﻲ ﺃﻳﺎﻡ ﺃﻛﻞ ﻭﺷﺮﺏ» . [ ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ ﻭﺻﺤﺤﻪ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻲ ] ‘সাহাবি উকবাহ ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণিত যে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আরাফাহ দিবস, কুরবানির দিন ও মিনার দিনসমূহ [কুরবানি পরবর্তী তিন দিন] আমাদের ইসলাম অনুসারীদের ঈদের দিন।’[আবু দাউদ: ২৪১৩]
,
[৩] এ দিনসমূহ যিলহজ মাসের প্রথম দশকের সাথে লাগানো। যে দশক খুবই ফযিলত পূর্ণ। তাই এ কারণেও এর যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে।
,
[৪] এ দিনগুলোতে হজের কতিপয় আমল সম্পাদন করা হয়ে থাকে। এ কারণেও এ দিনগুলো ফযিলতের অধিকারী। যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন, ঈদ, কুরবানি ও আইয়ামে তাশরীকের দিনসমূহ করনীয়, বর্জনীয় ও সুন্নাহ সমূহ

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

আজ ফজর থেকেই শুরু হবে তাকবীরে তাশরীক৷

নয় তারীখ থেকে তের তারীখ, পাচ দিন হল আইয়্যামে তাশরীক৷ প্রত্যেক নামাযের পর একবার তাকবীর বলা ওয়াজীব, তিনবার বলা সুন্নত পরিপন্থি৷ তবে যদি সংখ্যা নির্ধারন ছাড়া এমনি কেউ একাধিক বার তাকবীর বলে তাহলে অসবিধা নেই৷ তের তারীখ আছর পর্যন্ত তাকবীর বলবে৷ তাই পাচ দিনে তেইশ ওয়াক্ত ফরজ নামাযের পর প্রত্যেক নামাযীর জন্য, পুরুষ হোক, মহিলা হোক, একাকি হোক, জামাতে হোক, মকীম হোক মুসাফীর হোক সবার জন্য তাকবীর বলতে হবে৷ সুত্র: আদ দুররুল মুখতার 1/178 ঈদের নামাযের পর তাকবীর বলা ওয়াজিব নয়৷ বরং সুন্নত৷ আল্লাহ সহীহ বুঝে আমল করে উভয় জাহানে ধন্য হওয়ার তাওফীক দান করুন৷