বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২০

গরুর ক্রেতা ও বিক্রেতার জন্য গরুর ওজন মাপার সূত্র!!




গরুর আনুমানিক ওজন বের করতে আপনার প্রয়োজনীয় উপকরন যা যা লাগবে:
১. গজ/ফিতা
২. ক্যালকুলেটর
আপনি যে গরুটার ওজন নির্ণয় করতে চাচ্ছেন, সেই গরুকে প্রথমে সোজা করে দাড়া করান।
প্রথমেই আপনি ছবিতে দেখানো মত একটি গজ/ফিতার সাহায্যে গরুর সামনের পাজরের উঁচু হাড় থেকে পশ্চাৎদেশ পর্যন্ত দৈর্ঘ্য(L) মেপে নিন। এরপর আমরা যেভাবে কোমরের মাপ নেই সেভাবে গরুটির বেড়(G) মেপে নিন। দৈর্ঘ্য(L) আর বেড়(G) মাপা হয়ে গেল,এবার আমরা হিসাব করে ফেলতে পারব গরুটির আনুমানিক ওজন কত।

সুত্র = (L X G X G)/660 কেজি

উদাহারনঃ ধরে নিলাম আপনার গরুটির দৈর্ঘ্য ৫১ইঞ্চি এবং বেড় ৫৬ ইঞ্চি।

তাহলে গরুর আনুমানিক লাইভ ওজন হবে , (৫১X৫৬X৫৬)/৬৬০ = ২৪২.৩৩ কেজি গরুটির মাথা, পা ও কলিজা, চামড়া, ভুড়ি সহ।

প্রশ্ন এখন মাংস কতটুকু হবে? ২৪২.৩৩ লাইভ ওয়েট একটি গরু থেকে মাংস পাবেন (হাটুর উপরের হাড় সহ) ৫৫%-৬০%, অর্থাৎ ২৪২.৩৩ *৫৫% = ১৩৩.২৮ কেজি। বাকী টুকু ভুড়ি, কলিজা, মাথা, পায়া, চামড়া ইত্যাদি।

(সূত্র দিয়ে প্রয়োগ করে দেখতে পারেন)
ইনশাল্লাহ আশা রাখি,,,সঠিক ওজন নির্নয় করতে পারবেন।
ওজন নির্নয় হলে দাম নির্ধারণ করা খুব সহজ

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০

কুরবানীর ফাযায়েল ও মাসায়েল

                                                      ණ মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া 

কুরবানীর গুরুত্ব ও ফযীলত
---------------------------------------
কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সামর্থ্যবান নর-নারীর উপর কুরবানী ওয়াজিব। এটি মৌলিক ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আদম আ. থেকে সকল যুগে কুরবানী ছিল। তবে তা আদায়ের পন্থা এক ছিল না। শরীআতে মুহাম্মাদীর কুরবানী মিল্লাতে ইবরাহীমীর সুন্নত। সেখান থেকেই এসেছে এই কুরবানী। এটি শাআইরে ইসলাম তথা ইসলামের প্রতীকি বিধানাবলির অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এর মাধ্যমে শাআইরে ইসলামের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এছাড়া গরীব-দুঃখী ও পাড়া-প্রতিবেশীর আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শর্তহীন আনুগত্যের শিক্ষা রয়েছে কুরবানীতে। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলার জন্য ত্যাগ ও বিসর্জনের ছবকও আছে এতে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

فصل لربك وانحر
(তরজমা) অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানী আদায় করুন।
অন্য আয়াতে এসেছে-
قل ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العالمين.
(তরজমা) (হে রাসূল!) আপনি বলুন, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ (অর্থাৎ আমার সবকিছু) আল্লাহ রাববুল আলামীনের জন্য উৎসর্গিত। (সূরা আনআম : ১৬২)
পশু জবাই করে কুরবানী করার মধ্যে এই হিকমত ও ছবকও আছে যে, আল্লাহর মুহববতে নিজের সকল অবৈধ চাহিদা ও পশুত্বকে কুরবানী করা এবং ত্যাগ করা। সুতরাং কুরবানী থেকে কুপ্রবৃত্তির দমনের জযবা গ্রহণ করা উচিত। তাই কুরবানীর মধ্যে ইবাদতের মূল বিষয় তো আছেই, সেই সাথে তাকওয়ার অনুশীলনও রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
لن ينال الله لحومها ولا دمائها ولكن يناله التقوى منكم
(তরজমা) (মনে রেখো, কুরবানীর জন্তুর) গোশত অথবা রক্ত আল্লাহর কাছে কখনোই পৌঁছে না; বরং তাঁর কাছে কেবলমাত্র তোমাদের পরহেযগারিই পৌঁছে। (সূরা হজ্ব : ৩৭)
কুরবানীর ফযীলত
--------------------------

عن عائشة رضي الله تعالى عنها أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : ما عمل آدمي من عمل يوم النحر أحب إلى الله من إهراق الدم، إنه ليأتي يوم القيامة بقرونها وأشعارها وأظلافها، وإن الدم ليقع من الله بمكان قبل أن يقع من الأرض، فطيبوا بها نفسا.
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কুরবানীর দিনের আমলসমূহের মধ্য থেকে পশু কুরবানী করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহ তাআলার নিকট অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন এই কুরবানীকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কুরবানীর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহ তাআলার নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানী কর। (জামে তিরমিযী, হাদীস : ১৪৯৩)
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না তার ব্যাপারে হাদীস শরীফে কঠোর ধমকি এসেছে,
عن أبي هريرة قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من وجد سعة لأن يضحي فلم يضح فلا يقربن مصلانا.
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যার কুরবানীর সামর্থ্য আছে তবুও সে কুরবানী করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-মুসনাদে আহমদ ২/৩২১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৭৬৩৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫
ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী সম্পাদন করা। এখানে কুরবানীর কিছু জরুরি মাসায়েল উপস্থাপিত হল।
.
কার উপর কুরবানী ওয়াজিব
---------------------------------------
মাসআলা : ১. প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫
.
নেসাবের মেয়াদ
----------------------
মাসআলা ২. কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২
.
কুরবানীর সময়
---------------------
মাসআলা : ৩. মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম। -মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ২৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫
.
নাবালেগের কুরবানী
----------------------------
মাসআলা : ৪. নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬
.
মুসাফিরের জন্য কুরবানী
----------------------------------
মাসআলা : ৫. যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫
.
নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী
-------------------------------------------
মাসআলা : ৬. নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।-রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
.
দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম
-----------------------------------------
মাসআলা : ৭. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২
.
কুরবানী করতে না পারলে
------------------------------------
মাসআলা : ৮. কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
.
প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে
---------------------------------------------------------
মাসআলা : ৯. যেসব এলাকার লোকদের উপর জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয় তাহলে ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানী করা জায়েয।-সহীহ বুখারী ২/৮৩২, কাযীখান ৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
.
রাতে কুরবানী করা
--------------------------
মাসআলা : ১০. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কুরবানী করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, কাযীখান ৩/৩৪৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
.
কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর যবাই করলে
---------------------------------------------------------------------------
মাসআলা : ১১. কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১
.
কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে
--------------------------------------------------------
মাসআলা : ১২. উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
.
নর ও মাদা পশুর কুরবানী
------------------------------------
মাসআলা : ১৩. যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয সেগুলোর নর-মাদা দুটোই কুরবানী করা যায়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
.
কুরবানীর পশুর বয়সসীমা
------------------------------------
মাসআলা : ১৪. উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।
উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে না। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬
.
এক পশুতে শরীকের সংখ্যা
--------------------------------------
মাসআলা : ১৫. একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯, কাযীখান ৩/৩৪৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮
.
সাত শরীকের কুরবানী
-------------------------------
মাসআলা : ১৬. সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
মাসআলা : ১৭. উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েয। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
.
কোনো অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে
---------------------------------------------------
মাসআলা : ১৮. যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানী হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাযীখান ৩/৩৪৯
.
কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ
----------------------------------------------
মাসআলা : ১৯. কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২
মাসআলা : ২০. শরীকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না।
মাসআলা : ২১. যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কুরবানী দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা করলে অন্যকে শরীক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে একা কুরবানী করাই শ্রেয়। শরীক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরীব হয়, যার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, তাহলে সে অন্যকে শরীক করতে পারবে না। এমন গরীব ব্যক্তি যদি কাউকে শরীক করতে চায় তাহলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিবে।-কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০
.
কুরবানীর উত্তম পশু
----------------------------
মাসআলা : ২২. কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম।-মুসনাদে আহমদ ৬/১৩৬, আলমগীরী ৫/৩০০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
.
খোড়া পশুর কুরবানী
-----------------------------
মাসআলা : ২৩. যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশুর কুরবানী জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩, আলমগীরী ৫/২৯৭
.
রুগ্ন ও দুর্বল পশুর কুরবানী
-------------------------------------
মাসআলা : ২৪. এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, আলমগীরী ৫/২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪
.
দাঁত নেই এমন পশুর কুরবানী
-----------------------------------------
মাসআলা : ২৫. যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না এমন পশু দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয নয়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৫, আলমগীরী ৫/২৯৮
.
যে পশুর শিং ভেঙ্গে বা ফেটে গেছে
-----------------------------------------------
মাসআলা : ২৬. যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে
মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানী করা জায়েয। -জামে তিরমিযী ১/২৭৬, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪, আলমগীরী ৫/২৯৭
.
কান বা লেজ কাটা পশুর কুরবানী
----------------------------------------------
মাসআলা : ২৭. যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কুরবানী জায়েয। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ ১/৬১০, ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ৫/২৯৭-২৯৮
.
অন্ধ পশুর কুরবানী
---------------------------
মাসআলা : ২৮. যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪
.
নতুন পশু ক্রয়ের পর হারানোটা পাওয়া গেলে
-------------------------------------------------------------
মাসআলা : ২৯. কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার পরে যদি আরেকটি কেনা হয় এবং পরে হারানোটিও পাওয়া যায় তাহলে কুরবানীদাতা গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) দুটি পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব। আর ধনী হলে কোনো একটি কুরবানী করলেই হবে। তবে দুটি কুরবানী করাই উত্তম। -সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪, ইলাউস সুনান ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯, কাযীখান ৩/৩৪৭
.
গর্ভবতী পশুর কুরবানী
-------------------------------
মাসআলা : ৩০. গর্ভবতী পশু কুরবানী করা জায়েয। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ। -কাযীখান ৩/৩৫০
.
পশু কেনার পর দোষ দেখা দিলে
---------------------------------------------
মাসআলা : ৩১. কুরবানীর নিয়তে ভালো পশু কেনার পর যদি তাতে এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যে কারণে কুরবানী জায়েয হয় না তাহলে ওই পশুর কুরবানী সহীহ হবে না। এর স্থলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। তবে ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই কুরবানী করতে পারবে। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, ফাতাওয়া নাওয়াযেল ২৩৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫
.
পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথা
----------------------------------------------------
মাসআলা : ৩২. যদি বিক্রেতা কুরবানীর পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানী করা যাবে। -আহকামে ঈদুল আযহা, মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. ৫
.
বন্ধ্যা পশুর কুরবানী
---------------------------
মাসআলা : ৩৩. বন্ধ্যা পশুর কুরবানী জায়েয। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫

নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা
-------------------------------------------------------
মাসআলা : ৩৪. কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো। -মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩, আলমগীরী ৫/৩০০, ইলাউস সুনান ১৭/২৭১-২৭৪
.
জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে
-------------------------------------------------
মাসআলা : ৩৫. অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪
.
কুরবানীর পশু থেকে জবাইয়ের আগে উপকৃত হওয়া
------------------------------------------------------------------------
মাসআলা : ৩৬. কুরবানীর পশু কেনার পর বা নির্দিষ্ট করার পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়। যেমন হালচাষ করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি।সুতরাং কুরবানীর পশু দ্বারা এসব করা যাবে না। যদি করে তবে পশমের মূল্য, হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দিবে।-মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, নায়লুল আওতার ৩/১৭২, ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০০
.
কুরবানীর পশুর দুধ পান করা
-----------------------------------------
মাসআলা : ৩৭. কুরবানীর পশুর দুধ পান করা যাবে না। যদি জবাইয়ের সময় আসন্ন হয় আর দুধ দোহন না করলে পশুর
কষ্ট হবে না বলে মনে হয় তাহলে দোহন করবে না। প্রয়োজনে ওলানে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেবে। এতে দুধের চাপ কমে যাবে। যদি দুধ দোহন করে ফেলে তাহলে তা সদকা করে দিতে হবে। নিজে পান করে থাকলে মূল্য সদকা করে দিবে। -মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭,
রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৯, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১
.
কোনো শরীকের মৃত্যু ঘটলে
--------------------------------------
মাসআলা : ৩৮. কয়েকজন মিলে কুরবানী করার ক্ষেত্রে জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার অনুমতি দেয় তবে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। অবশ্য তার
স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬, কাযীখান ৩/৩৫১
.
কুরবানীর পশুর বাচ্চা হলে
-------------------------------------
মাসআলা : ৩৯. কুরবানীর পশু বাচ্চা দিলে ওই বাচ্চা জবাই না করে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম। যদি সদকা না করে তবে কুরবানীর পশুর সাথে বাচ্চাকেও জবাই করবে এবং গোশত সদকা করে দিবে।-কাযীখান ৩/৩৪৯, আলমগীরী ৫/৩০১, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩
.
মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী
-----------------------------------
মাসআলা : ৪০. মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে তবে সেটি নফল কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কুরবানীর ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব-মিসকীনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। -মুসনাদে আহমদ ১/১০৭, হাদীস ৮৪৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, কাযীখান ৩/৩৫২
.
কুরবানীর গোশত জমিয়ে রাখা
------------------------------------------
মাসআলা : ৪১. কুরবানীর গোশত তিনদিনেরও অধিক জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েয।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, সহীহ মুসলিম ২/১৫৯, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৮, ইলাউস সুনান ১৭/২৭০
.
কুরবানীর গোশত বণ্টন
--------------------------------
মাসআলা : ৪২. শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।-আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১
মাসআলা : ৪৩. কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলমগীরী ৫/৩০০
.
গোশত, চর্বি বিক্রি করা
--------------------------------
মাসআলা : ৪৪. কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। -ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১
.
জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া
---------------------------------------------------
মাসআলা : ৪৫. জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।
.
জবাইয়ের অস্ত্র
--------------------
মাসআলা : ৪৬. ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উত্তম।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
.
পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা
-----------------------------------------------------
মাসআলা : ৪৭. জবাইয়ের পর পশু
নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
.
অন্য পশুর সামনে জবাই করা
-----------------------------------------
মাসআলা : ৪৮. এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করবে না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট না দেওয়া।
.
কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেওয়া
-----------------------------------------------
মাসআলা : ৪৯. কুরবানীর গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয।-ইলাউস সুনান ৭/২৮৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০
.
অন্য কারো ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে চাইলে
----------------------------------------------------------------------
মাসআলা : ৫০. অন্যের ওয়াজিব কুরবানী দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কুরবানী আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করে তাহলে তাদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।
.
কুরবানীর পশু চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে
-----------------------------------------------------------
মাসআলা : ৫১. কুরবানীর পশু যদি চুরি হয়ে যায় বা মরে যায় আর কুরবানীদাতার উপর পূর্ব থেকে কুরবানী ওয়াজিব থাকে তাহলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) তার জন্য আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯
.
পাগল পশুর কুরবানী
-----------------------------
মাসআলা : ৫২. পাগল পশু কুরবানী করা জায়েয। তবে যদি এমন পাগল হয় যে, ঘাস পানি দিলে খায় না এবং মাঠেও চরে না তাহলে সেটার কুরবানী জায়েয হবে না। -আননিহায়া ফী গরীবিল হাদীস ১/২৩০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৫২
.
নিজের কুরবানীর গোশত খাওয়া
--------------------------------------------
মাসআলা : ৫৩. কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর গোশত খাওয়া মুস্তাহাব। -সূরা হজ্ব ২৮, সহীহ মুসলিম ২২/১৫৯, মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৯০৭৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪
.
ঋণ করে কুরবানী করা
-------------------------------
মাসআলা : ৫৪. কুরবানী ওয়াজিব এমন ব্যক্তিও ঋণের টাকা দিয়ে কুরবানী করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সুদের উপর ঋণ নিয়ে কুরবানী করা যাবে না।
.
হাজীদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী
-----------------------------------------------------
মাসআলা : ৫৫. যেসকল হাজী কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে তাদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী ওয়াজিব নয়। কিন্তু যে হাজী কুরবানীর কোনো দিন মুকীম থাকবে সামর্থ্যবান হলে তার উপর ঈদুল আযহার কুরবানী করা জরুরি হবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৩, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/১৬৬
.
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানী করা
---------------------------------------------------------------------------
মাসআলা : ৫৬. সামর্থ্যবান ব্যক্তির রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা.কে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার ওসিয়্যত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকেও কুরবানী দিতেন। -সুনানে আবু দাউদ ২/২৯, জামে তিরমিযী ১/২৭৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, মিশকাত ৩/৩০৯
.
কোন দিন কুরবানী করা উত্তম
-----------------------------------------
মাসআলা : ৫৭. ১০, ১১ ও ১২ এ তিন দিনের মধ্যে প্রথম দিন কুরবানী করা অধিক উত্তম। এরপর দ্বিতীয় দিন, এরপর তৃতীয় দিন। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬
.
খাসীকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী
-----------------------------------------
মাসআলা : ৫৮. খাসিকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী করা উত্তম। -ফাতহুল কাদীর ৮/৪৯৮, মাজমাউল আনহুর ৪/২২৪, ইলাউস সুনান ১৭/৪৫৩
.
জীবিত ব্যক্তির নামে কুরবানী
----------------------------------------
মাসআলা : ৫৯. যেমনিভাবে মৃতের পক্ষ থেকে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা জায়েয তদ্রূপ জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ইসালে সওয়াবের জন্য নফল কুরবানী করা জায়েয। এ কুরবানীর গোশত দাতা ও তার পরিবারও খেতে পারবে।
.
বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির কুরবানী অন্যত্রে করা
-------------------------------------------------------------------
মাসআলা : ৬০. বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য নিজ দেশে বা অন্য কোথাও কুরবানী করা জায়েয।
.
কুরবানীদাতা ভিন্ন স্থানে থাকলে কখন জবাই করব
---------------------------------------------------------------------
মাসআলা : ৬১. কুরবানীদাতা এক স্থানে আর কুরবানীর পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে কুরবানীদাতার ঈদের নামায পড়া বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায় আছে ওই এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই করা যাবে। -আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
.
কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা
----------------------------------------------------------
মাসআলা : ৬২. কুরবানীর চামড়া কুরবানীদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরি। -আদ্দুররুল মুখতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১
.
কুরবানীর চামড়া বিক্রির নিয়ত
------------------------------------------
মাসআলা : ৬৩. কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রি করলে মূল্য সদকা করে দেওয়ার নিয়তে বিক্রি করবে। সদকার নিয়ত না করে নিজের খরচের নিয়ত করা নাজায়েয ও গুনাহ। নিয়ত যা-ই হোক বিক্রিলব্ধ অর্থ পুরোটাই সদকা করে দেওয়া জরুরি। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১, কাযীখান ৩/৩৫৪
.
কুরবানীর শেষ সময়ে মুকীম হলে
---------------------------------------------
মাসআলা : ৬৪. কুরবানীর সময়ের প্রথম দিকে মুসাফির থাকার পরে ৩য় দিন কুরবানীর সময় শেষ হওয়ার পূর্বে মুকীম হয়ে গেলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে প্রথম দিনে মুকীম ছিল অতপর তৃতীয় দিনে মুসাফির হয়ে গেছে তাহলেও তার উপর কুরবানী ওয়াজিব থাকবে না। অর্থাৎ সে কুরবানী না দিলে গুনাহগার হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৬, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৯
.
কুরবানীর পশুতে ভিন্ন ইবাদতের নিয়তে শরীক হওয়া
------------------------------------------------------------------------
মাসআলা : ৬৫. এক কুরবানীর পশুতে আকীকা, হজ্বের কুরবানীর নিয়ত করা যাবে। এতে প্রত্যেকের নিয়তকৃত ইবাদত আদায় হয়ে যাবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, আলমাবসূত সারাখছী ৪/১৪৪, আলইনায়া ৮/৪৩৫-৩৪৬, আলমুগনী ৫/৪৫৯
.
কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা
-----------------------------------------------------
মাসআলা : ৬৬. ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য। ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়। -জামে তিরমিযী ১/১২০, শরহুল মুনয়া ৫৬৬, আদ্দুররুল মুখতার ২/১৭৬, আলবাহরুর রায়েক ২/১৬৩
.
কুরবানীর পশুর হাড় বিক্রি
------------------------------------
মাসআলা : ৬৭. কুরবানীর মৌসুমে অনেক মহাজন কুরবানীর হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এদের ক্রয়-বিক্রয় জায়েয। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কোনো কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর কোনো কিছু এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে। আর জেনে শুনে মহাজনদের জন্য এদের কাছ থেকে ক্রয় করাও বৈধ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১
.
রাতে কুরবানী করা
--------------------------
মাসআলা : ৬৮. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতে কুরবানী করা জায়েয। তবে রাতে আলোস্বল্পতার দরুণ জবাইয়ে ত্রুটি হতে পারে বিধায় রাতে জবাই করা অনুত্তম। অবশ্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলে রাতে জবাই করতে কোনো অসুবিধা নেই। -ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৬, আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫১০
.
কাজের লোককে কুরবানীর গোশত খাওয়ানো
--------------------------------------------------------------
মাসআলা : ৬৯. কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। গোশতও পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও গোশত খাওয়ানো যাবে।-আহকামুল কুরআন জাস্সাস ৩/২৩৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলবাহরুর রায়েক ৮/৩২৬, ইমদাদুল মুফতীন
.
জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া
----------------------------------------------
মাসআলা : ৭০. কুরবানী পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া যাবে না। -কিফায়াতুল মুফতী ৮/২৬৫
.
মোরগ কুরবানী করা
---------------------------
মাসআলা : ৭১. কোনো কোনো এলাকায় দরিদ্রদের মাঝে মোরগ কুরবানী করার প্রচলন আছে। এটি না জায়েয। কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে কুরবানীর নিয়তে করা যাবে না। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৪, ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৬/২৯০, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২০০
.
[ মাসিক আলকাউসার » যিলহজ্ব ১৪৩৪ || অক্টোবর ২০১৩ ]
.
=====================================

কুরবানী বিষয়ক অন্যান্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ সমূহ
.
কুরবানী ও ঈদের পয়গাম
-- মুহাম্মাদ ত্বহা হুসাইন
.
ঈদুল আযহা ও কুরবানী বিষয়ক কিছু হাদীস
-- মুহাম্মাদ ফজলুল বারী
.
যিলহজ্ব ও কুরবানী : ফযীলত, গুরুত্ব ও আহকাম
-- মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া
.
কুরআন ও সুন্নাহয় কুরবানী
-- মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
.
কুরবানী বিষয়ক কিছু হাদীস
-- মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ
.
কুরবানী ও কুরবানীর তাৎপর্য : ইবাদত সম্পর্কে বিভ্রান্তি থাকা উচিত নয়
.
কুরবানীর ফাযায়েল ও মাসায়েল
-- মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া
.
হাদীস ও আসারের আলোকে কুরবানীর কিছু জরুরি মাসায়েল
-- ফজলুদ্দীন মিকদাদ
.
কুরবানী সংক্রান্ত কিছু জরুরি মাসায়েল
-- মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া
.
কোরবানীর সময়সীমা : একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর
-- মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ
.
দুটি প্রশ্ন ও তার উত্তর : ইয়াওমে আরাফার রোযা ও কোরবানির সাথে আকীকা
-- মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ
.
প্রসঙ্গ : কুরবানীর গোশত বিতরণ
-- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম
.
কুরবানীর শরীক সংখ্যা কি বেজোড় হওয়া জরুরি
.
হজ্ব ও কুরবানী : আলোকিত সময়ের আলোকিত শিক্ষা
.
হজ্ব ও কুরবানী : জাগুক ঈমান, জ্বলুক ঈমানের প্রদীপ
.
ছোট্ট সা‘দের কুরবানী ঈদ
-- উম্মে হাবীবা তামান্না
.
হজ্ব ও কুরবানী : হজ্ব ও কুরবানীর প্রাণ আল্লাহর স্মরণ
.
একটি কিনলে একটি ফ্রি! প্রতারিত যেন না হই
-- মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ
.
এদের প্রতিহত করার কি কোনো উপায় নেই?
মাওলানা রাশেদ, খিঁলগাও চৌরাস্তা, ঢাকা
.
হজ্ব ও কুরবানীর পর : চেতনায় চিরন্তন হোক ‘আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা’

কুরবানী ও ঈদের পয়গাম

মুহাম্মাদ ত্বহা হুসাইন

বছর ঘুরে আবারো এল ঈদুল আযহা। মুসলিম জীবনে ঈদুল ফিতরের মতো আরেকটি আনন্দোৎসব। এদিন ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা সকলেই ঈদগাহে সমবেত হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দু’রাকাত নামায আদায় করবে। আর সামর্থ্যবান মুমিন বান্দারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের জন্য শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় তাদের কুরবানীর পশু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করবে। এরপর তাঁর আম মেহমানদারী গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করবে। ঐতিহাসিক, তবে ... ঈদুল আযহা মুসলমানদের অন্যতম উৎসবের দিন। যার মূল বিষয় হল কুরবানী। এটি কুরআন-সুন্নাহয় অকাট্যভাবে প্রমাণিত বিধান এবং আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ হতে নির্দেশিত অন্যতম প্রধান ইবাদত। এই দিনের আনন্দ হল, দশই যিলহজ্ব আল্লাহর ব্যাপক মাগফিরাত লাভের আনন্দ এবং ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জল আনুগত্য-কুরবানী পেশ করার আনন্দ। আর যে মাহবুব মাওলার ভালবাসা ও নৈকট্য অর্জনের জন্য এত সাধনা তিনি যদি দয়া করে কবুল হওয়া কুরবানীর মাধ্যমে ‘আম যিয়াফত’ বা ব্যাপক মেহমানদারী করেন, তাহলে তো মুমিন-হৃদয়ে আনন্দের জোয়ার আসবেই। তাৎপর্যগত দিক থেকে ইসলামী ঈদ আর অন্যান্য ধর্মের পর্ব উৎসবের মাঝে এই পার্থক্য রয়েছে যে, অন্যান্য ধর্মে যেখানে শত বছরের পুরনো কোনো ঘটনা কিংবা বিশেষ কোনো ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে বছর বছর উৎসব উদযাপিত হয় সেখানে ইসলাম নিজেরই সদ্য করা ইবাদতের সৌভাগ্য-আনন্দে উজ্জীবিত হতে বলে। তাই এক মাস সিয়াম সাধনার সৌভাগ্যের আনন্দ উৎসব হল ঈদুল ফিতর। আর হজ্ব, কুরবানী ও মাওলার মেহমানদারী লাভের খুশির উৎসব হচ্ছে ঈদুল আযহা। মনে রাখতে হবে যে, এই কুরবানীর মূল সূত্র যদিও মিল্লতে ইবরাহীমিতে বিদ্যমান ছিল কিন্তু মিল্লাতে ইবরাহীমির ‘সেই’ ঘটনাই আমাদের আনন্দের মৌলিক উৎসব নয়; বরং আমাদের আনন্দের অন্তর্নিহীত কারণ তাই যা উপরোল্লেখিত হয়েছে। কারণ কুরবানী ইসলামেরই একটি স্বতন্ত্র বিধান এবং শরীয়তে মুহাম্মাদীর শিআর। যুগে যুগে কুরবানী কুরবানী বা প্রিয় বস্তুটি মাহবুব মাওলার দরবারে উৎসর্গ করার ইতিহাস সুদীর্ঘ। হযরত আদম আ.-এর দুই সন্তানের কুরবানীর কথা বিবৃত হয়েছে সূরা মায়েদায়। এই কুরবানীর প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে উত্তম সূত্রে বর্ণিত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর একটি রেওয়ায়েতে। হযরত আদম আ.-এর দুজন ছেলে ছিল। হাবিল আর কাবিল। হযরত হাওয়া আ. প্রত্যেকবার এক জোড়া সন্তান প্রসব করতেন। একটি ছেলে অপরটি মেয়ে। এই জমজ ভাইবোনদের বিয়ে ছিল হারাম। তাই তখন এক গর্ভে জন্মলাভ করা ছেলের সাথে ভিন্ন গর্ভে জন্মলাভ করা মেয়ের বিয়ের নিয়মই প্রচলিত ছিল। কাবিলের জমজ বোনটি ছিল সুশ্রী। জমজ হওয়ার কারণে তাকে কাবিল বিয়ে করার নিয়ম না থাকলেও তার জেদ ও হঠকারিতা ছিল যে, সে তাকে বিয়ে করবেই। অন্যদিকে হকদার হওয়ার দাবি ছিল হাবিলের। এই দ্বন্দের ফয়সালা হল এভাবে-প্রত্যেকে আল্লাহর সান্নিধ্যে কিছু কুরবানী করবে। যার কুরবানী কবুল হবে তার দাবিই গ্রহণযোগ্য হবে। হাবিল একটি দুম্বা ও কাবিল কিছু ফলফলাদির কুরবানী পেশ করল। তখনকার দিনে কুরবানী কবুল হওয়ার আলামত ছিল, আকাশ থেকে আগুন নেমে কবুলকৃত কুরবানী খেয়ে ফেলত। যথারীতি আগুন এসে হাবিলের দুম্বাটি খেল, কাবিলের কুরবানী রয়ে গেল তথৈবচ। কিন্তু তা মেনে নিতে পারেনি কাবিল। প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে সে হত্যা করে ফেলল তার ভাইকে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর ২/৪৮) সূরা মায়েদার ২৭ থেকে ৩১ আয়াত পর্যন্ত এই ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বিবৃত হয়েছে। যার প্রথম আয়াতটি হল, (তরজমা) আর (হে নবী) আপনি তাদের সামনে আদম আ.-এর দুই ছেলের ঘটনা সঠিকভাবে পাঠ করে শুনিয়ে দিন। যখন উভয়েই এক একটি কুরবানী পেশ করেছিলেন। তাদের মধ্য থেকে একজনের কুরবানী কবুল হল আর অপরজনেরটি কবুল হল না। সেই (অপরজন) বলতে লাগল, আমি নিশ্চয়ই তোমাকে হত্যা করে ফেলব। সেই (প্রথম জন) বলল, আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আমলই কবুল করেন। হযরত আদম আ.-এর পর প্রত্যেক উম্মত বা জাতির মধ্যেই এই মুবারক আমল বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, (তরজমা) আর প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানী নির্ধারণ করেছি। যেন তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ পশুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ। অতএব তোমরা তারই অনুগত থাক এবং (হে নবী) আপনি সুসংবাদ দিন বিনীতদের।-সূরা হজ্ব : ৩৪ উল্লেখ্য যে, সকল উম্মতের কুরবানীর নিয়ম এক ছিল না। ইসলামী শরীয়তে যে পদ্ধতিতে কুরবানী করা হয় তাও আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নির্দেশিত এবং তা মিল্লাতে ইবরাহীমির অংশ। হযরত ইবরাহীম আ. আল্লাহ তাআলার আদেশে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানী দিতে উদ্যত হওয়ার ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ। মূল ঘটনাটি কুরআন মজীদে আছে। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক কিচ্ছা-কাহিনী রচিত হয়েছে, যা ইসরাঈলী রেওয়ায়েতনির্ভর। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনা যতটুকু বর্ণনা করেছেন তাই মুমিনের জন্য যথেষ্ট।’ আল্লামা ইবনে কাসীর রাহ. বলেন, অতঃপর এ ব্যাপারে যে সমস্ত আছার বর্ণিত তার অধিকাংশই হচ্ছে ইসরাঈলী। এই সুন্দর ঘটনা, মহান পরীক্ষা ও আল্লাহর পক্ষ হতে বিশাল দুম্বা প্রেরণ সম্পর্কিত ঘটনার জন্য কুরআন মজীদের বর্ণনাই যথেষ্ট। অতএব এই ব্যাপারে ইসরাঈলী রেওয়ায়েত বা অলীক কল্প-কাহিনীতে না গিয়ে কুরআন মজীদে বর্ণিত ঘটনার উপরই সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। তাই এখানে কুরআন মজীদের সূরা সাফফাতের আয়াত ৯৯ হতে ১০৭ পর্যন্ত বর্ণিত ঘটনার সরল মর্মার্থ তুলে ধরছি। আর তিনি ইবরাহীম আ. বললেন, আমি আমার রবের দিকে চললাম। তিনি অবশ্যই আমাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন। হে আমার রব, আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাকে এক ধৈর্য্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হল তখন তিনি (ইবরাহীম) বললেন, প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে যবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী বল? সে বলল, হে আমার পিতা! আপনি যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। তারা উভয়ে যখন আনুগত্য প্রকাশ করল এবং পিতা পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিলেন তখন আমি (আল্লাহ) তাকে আহ্বান করলাম, হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নাদেশকে সত্যে পরিণত করেছ। আমি এভাবেই সৎকর্ম পরায়ণদের পুরষকৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটি ছিল একটি স্পষ্ট পরীক্ষা। এবং আমি তাকে মুক্ত করলাম একটি বড় যবাইয়ের পশুর বিনিময়ে। এর চার আয়াত পর হযরত ইবরাহীম আ.কে ইসহাক নামে আরেকটি পুত্র-সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। ইহুদী-খৃষ্টানরা যদিও বলে যে, কুরবানীর ঘটনা হযরত ইসহাক আ.-এর সঙ্গে ঘটেছিল কিন্তু বর্ণনা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, হযরত ইসমাঈল আ.-এর সঙ্গেই কুরবানীর ঘটনা ঘটেছিল। এটিই সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে অধিকাংশ মুফাসসিনের রায়। হাফেয ইবনে কাসীর রাহ. বলেন, এটিই কুরআন দ্বারা সুস্পষ্ট; বরং যবীহ ইসমাঈল আ. হওয়ার তো আরো বড় দলীল হল কুরআন প্রথমে যবাইয়ের ঘটনার উল্লেখ করেছে। এরপর ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দান করেছে। যারা যবীহ ইসহাক আ. বলে থাকে তাদের দলীলের সূত্র হল বিভিন্ন ইসরাঈলী রেওয়ায়েত। তাদের কিতাবে রয়েছে তাহরীফ। (বিদায়া ১/৩৬৬) এছাড়া এটা যে আহলে কিতাবদের তাহরীফ তার আরো সুস্পষ্ট দলীল বর্তমান বাইবেলেও বিদ্যমান রয়েছে। কারণ বাইবেলের (বাংলা সংস্করণে) আদি পুস-কের ১৬-১৭ পৃষ্ঠায় বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায় যে, ইবরাহীমের স্ত্রী সারার তখনও কোনো ছেলে মেয়ে হয়নি। তখন আদেশ এল তিনি তাকে আরও বললেন, দেখ, তুমি গর্ভবতী। তোমার একটি ছেলে হবে। আর সেই ছেলেটির নাম তুমি ইশ্মায়েল রাখবে।’ (আদি পুস-ক পৃ. ১৭) বাইবেলের বর্ণনা মতেই তখন ইবরাহীম আ.-এর বয়স ছিয়াশি বছর। আর তাঁর একশ বছর বয়সে জন্ম নেন ইসহাক। (দেখুন : আদি পুস-ক পৃ. ২৩) এরপর আদি পুস্তকের ২৪-২৫ পৃষ্ঠায় কুরবানীর ঘটনা উল্লেখিত। এখানে আছে, ‘ঈশ্বর বললেন, তোমার ছেলেকে, ‘অদ্বিতীয়’ ছেলে ইসহাককে, যাকে তুমি এত ভালবাস তাকে নিয়ে তুমি মোরিয়া এলাকায় যাও। সেখানে যে পাহাড়টার কথা আমি বলব তার উপর তুমি তাকে পোড়ানো-উৎসর্গ হিসাবে উৎসর্গ কর।’ পরে বলা হয়েছে, ‘তুমি তোমার ছেলেকে, অদ্বিতীয় ছেলেকে উৎসর্গ করতে পিছপা হওনি। এখানে বাইবেলে বারবার আসা ‘অদ্বিতীয়’ শব্দটি মনোযোগের দাবিদার। বাইবেলের বর্ণনামতেই ইসমাঈলের জন্ম আগে তাই ইসহাক আ.-এর জন্মের আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন ইবরাহীম আ.-এর এক মাত্র পুত্র। এই জন্যে ইবনে কাসীর রাহ. বলেন, এখানে ইসহাক শব্দটি প্রক্ষিপ্ত। কেননা, ইসহাক তো একক ও অদ্বিতীয় সন্তান নন। একক ও অদ্বিতীয় সন্তান তো ইসমাঈল। প্রকৃতপক্ষে আরবদের প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়ে তারা এমন মিথ্যা তাহরীফে লিপ্ত হয়েছে। কারণ ইসমাঈল আ. হলেন ইয়াকুব আ.-এর পিতা, ইয়াকুব আ. মানে যার দিকে তারা নিজেদের সম্পৃক্ত করে থাকে। তারা ইসমাঈল আ.-এর মর্যাদা নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার জন্য তাদের ধর্মগ্রন্থে তাহরীফ করেছে। তাদের জানা নেই যে, ইযযত ও সম্মান আল্লাহরই হাতে। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করে থাকেন। (বিদায়া ১/৩৬৬-৩৬৭) পরিশেষে একটি ঘটনা উল্লেখ করে এ প্রসঙ্গের ইতি টানতে চাই। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীযের খেলাফতকালে সিরিয়ার এক ইহুদী আলেম মুসলমান হলেন। তখন খলীফা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইবরাহীমের কোন সন্তানকে যবাই করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! সে তো ইসমাঈলই হে আমীরুল মুমিনীন। ইহুদীরাও এ কথা জানে। কিন্তু হে আরবজাতি! তোমাদের সাথে হিংসার বশবর্তী হয়ে তারা এই কাজ করেছে।(বিদায়া ১/৩৬৯-৩৭০) সে যাই হোক, মিল্লাতে ইবরাহীমের সে মহান কুরবানীর সূত্র ধরেই আমাদের জন্য আল্লাহ ও রাসূল প্রবর্তন করেছেন এই মহান ইবাদতের। ত্যাগ ও বিসর্জনের এই নিঃশর্ত আনুগত্যের। কুরবানীর মূল প্রাণ কুরবানীর প্রাণ কথা হল তাকওয়া-খোদাভীতি, আল্লাহর প্রতি নিখুঁত মহব্বত ও ইখলাস। তাকওয়া, মহব্বত ও ইখলাস প্রত্যেকটি কলবের সাথে সম্পৃক্ত। কারণ আল্লাহর গোস্তের প্রয়োজন নেই, রক্তের প্রয়োজন নেই। তিনি তো শুধু মুমিনের তাকওয়ার পরীক্ষা নিতে চান। লোক দেখানো, মানুষের বাহবা কুড়ানো, পার্থিব বড়ত্বের প্রতিযোগিতা, বড় লোকের কাতারে শামিল হওয়া এবং ‘আমার ছেলেরা কার দুয়ারে গোশতের জন্য ধর্ণা দেবে’-এ ধরনের ছোট এ পার্থিব মানসিকতার কুরবানী হয়তো সেই সব সামান্য উদ্দেশ্যকে পূরণ করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গিত নজরানা হতে পারে না। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের কুরবানীই কবুল করেন।-সূরা মায়িদা : ২৭ তিনি আরো বলেন, আল্লাহর কাছে না এসব পশুর গোশত পৌঁছে, না তার রক্ত; বরং তার নিকট তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে থাকে।-সূরা হজ্ব : ৬৭ এই কারণেই পূর্ণ ইখলাস ও মহাব্বতের সাথে শুধুই আল্লাহর রেযামন্দীর জন্য কেউ কুরবানী করলে তা আল্লাহর দরবারে মকবুল হয়। এমনকি পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার কথা হাদীস শরীফে এসেছে।-জামে তিরমিযী হাদীস : ১৪৯৩ ফ্রিজ সমাচার কুরবানীর গোশতের এক ভাগ গরীব-মিসকীনদের আরেক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের এবং বাকি এক অংশ কুরবানীদাতাদের খেতে বলা হয়। এটি মুস্তাহাব। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, এসব পশুর গোশত থেকে তোমরা খাও এবং বিপন্ন অভাবগ্রস্তদের খাওয়াও। -সূরা হজ্ব : ২৮ আরো বলেছেন, তখন তা হতে তোমরা খাও এবং ধৈর্য্যশীল ও যাচনা উভয় ধরনের অভাবগ্রস্তকে খাওয়াও।-প্রাগুক্ত ৩৬ ইসলামের প্রথম যুগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বছর কুরবানীর গোস্ত তিন দিনের চেয়ে বেশি খেতে নিষেধ করেছিলেন। এ সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, নবীজীর যুগে কুরবানীর সময় কিছু গ্রাম্য দরিদ্র মানুষ নবীজীর দরবারে এসেছিলেন। তাদের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য লক্ষ্য করে তিনি এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। আর বাকি গোস্তগুলো অভাবীদের দান করতে বলেছিলেন। পরের বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নিষেধ তুলে নেন এবং অনুমতি দিলেন, (যতদিন ইচ্ছা) খাও, সদকা কর এবং জমা রাখ।-সহীহ বুখারী হাদীস : ৫৪২৩; সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস : ৫৯২৭ উপরোক্ত হাদীসে ক্ষুধার্ত লোকদের অবস্থার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার একটি শিক্ষা নিহিত রয়েছে। আমাদের দেশে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে অবস্থান করে, কিন্তু এ দারিদ্র্য পীড়িত দেশে কুরবানী উপলক্ষে ফ্রিজের বাজার যেভাবে সরগরম হয়ে উঠে তাতে সহজেই অনুমান করা যায়, ধনীর কুরবানীর গোশতের কয়টি টুকরো দরিদ্রের ঝুপড়িতে পৌঁছে। এ দেশে এমন বিচিত্র মানুষও আছেন যারা কুরবানীর পর আস্ত পশুটিই ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখেন আর সারা বছরের গোস্তের প্রয়োজন পুষিয়ে নেন। আইনের দৃষ্টিতে তা জায়েয হতে পারে কিন্তু মানবিকতা বলেও তো একটা কথা আছে। আর উপরে যে হাদীসটি বলা হল, তাতেও বলা হয়েছে যে, কুরবানীর গোস্ত ঈদ ও পরবর্তী দিনগুলোতে নিজেরাও খাও এবং গরীব-মিসকীনদের মাঝে বণ্টন কর। এই হাদীসের হিদায়েত মোতাবেক আমাদের আমল করা উচিত। পরিচ্ছন্নতা কাম্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। একটি ইবাদত আদায় করতে গিয়ে পশুর বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা দ্বারা ঘরের আঙ্গিনা ও পথ-ঘাটকে দূষিত করে তোলা মোটেই উচিত নয়। এতে মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয় যা একটি ভিন্ন গুনাহ। এসব উদাসীনতার কারণে ইবাদতের মর্যাদা ম্লান হয়ে যায়। এদিকে সবার সতর্কতা ও সচেতনতা একান্ত জরুরি। পরিশেষে আসুন হৃদয় মনের সবটুকু মহব্বত নিয়ে সামর্থ্যের মধ্যে সবচেয়ে ভালো পশুটি ক্রয় করি আর একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য তার দরবারে তা উৎসর্গ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রিয়া থেকে বেঁচে ইখলাসের সাথে কুরবানী করার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জনের তাওফীক দান করুন। আমীন।

কুরবানীর প্রয়োজনীয় ৭২টি মাসআলা/ মাসায়েল


কার উপর
 কুরবানী ওয়াজিবমাসআলা : ১. প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন
প্রত্যেক
মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২
যিলহজ্ব
সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত
নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর
কুরবানী
করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা,
অলঙ্কার,
বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি,
প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও
অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর
নেসাবের
ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫)
ভরি,
রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি,
টাকা-পয়সা ও
অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য
সাড়ে
বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া।
আর
সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর
কোনো
একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে
কিন্তু
প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে
বায়ান্ন
তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও
তার
উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল
বুরহানী ৮/৪৫৫;
ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫
নেসাবের মেয়াদ
মাসআলা ২. কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা
জরুরি নয়;
বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন
থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস
সানায়ে
৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২
কুরবানীর সময়
মাসআলা : ৩. মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়।
যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
তবে
সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা
উত্তম। -
মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে
৪/১৯৮, ২৩,
ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫
নাবালেগের কুরবানী
মাসআলা : ৪. নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে
সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও
তাদের
উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার
অভিভাবক নিজ
সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা
সহীহ হবে।-
বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার
৬/৩১৬
মুসাফিরের জন্য কুরবানী
মাসআলা : ৫. যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে
মুসাফির
থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮
কিলোমিটার দূরে
যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার
উপর
কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান
৩/৩৪৪,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার
৬/৩১৫
নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী
মাসআলা : ৬. নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী
দেওয়া
অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।-
রদ্দুল
মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম
মাসআলা : ৭. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা
ওয়াজিব
নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে
তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/১৯২
কুরবানী করতে না পারলে
মাসআলা : ৮. কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে
ওয়াজিব
কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু
ক্রয় না
করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি
ছাগলের
মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে
ছিল,
কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে
ঐ পশু
জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে
৪/২০৪,
ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে
মাসআলা : ৯. যেসব এলাকার লোকদের উপর
জুমা ও ঈদের
নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের
আগে
কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা
অন্য
কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয়
তাহলে
ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম
দিনেও
কুরবানী করা জায়েয।-সহীহ বুখারী ২/৮৩২,
কাযীখান
৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
রাতে কুরবানী করা
মাসআলা : ১০. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত
রাতেও কুরবানী
করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো। -
মুসনাদে
আহমাদ, হাদীস : ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ
৪/২২,
আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, কাযীখান ৩/৩৪৫,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২২৩
কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর যবাই
করলে
মাসআলা : ১১. কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই
করতে না
পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে।
তবে
যদি(সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো
গোশত
সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি
জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ
মূল্য
হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।-বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১
কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে
মাসআলা : ১২. উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও
দুম্বা দ্বারা
কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু
ছাড়া অন্যান্য
পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী
করা
জায়েয নয়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২০৫
নর ও মাদা পশুর কুরবানী
মাসআলা : ১৩. যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয
সেগুলোর
নর-মাদা দুটোই কুরবানী করা যায়। -কাযীখান
৩/৩৪৮,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
কুরবানীর পশুর বয়সসীমা
মাসআলা : ১৪. উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে।
গরু ও মহিষ
কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও
দুম্বা
কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি
বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে,
দেখতে ১
বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও
কুরবানী করা
জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের
হতে
হবে।
উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো
অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে
না।
-কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে
৪/২০৫-২০৬
এক পশুতে শরীকের সংখ্যা
মাসআলা : ১৫. একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা
দ্বারা শুধু
একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু
কয়েকজন
মিলে কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না।
আর উট,
গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে।
সাতের
অধিক শরীক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। -
সহীহ
মুসলিম ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯,
কাযীখান ৩/৩৪৯,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮
সাত শরীকের কুরবানী
মাসআলা : ১৬. সাতজনে মিলে কুরবানী করলে
সবার অংশ
সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম
হতে
পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড়
ভাগ।
এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না।
-
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
মাসআলা : ১৭. উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং
সাতের কমে
যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয়
ভাগে
কুরবানী করা জায়েয। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২০৭
কোনো অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে
মাসআলা : ১৮. যদি কেউ আল্লাহ তাআলার
হুকুম পালনের
উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার
নিয়তে
কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে
না। তাকে
অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানী
হবে না।
তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন
করতে হবে। -
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাযীখান ৩/৩৪৯
কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ
মাসআলা : ১৯. কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে
আকীকার
নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও
আকীকা
দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬,
রদ্দুল মুহতার
৬/৩৬২
মাসআলা : ২০. শরীকদের কারো পুরো বা
অধিকাংশ
উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কুরবানী
সহীহ হবে
না।
মাসআলা : ২১. যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা
কুরবানী
দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা
করলে অন্যকে শরীক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে
একা
কুরবানী করাই শ্রেয়। শরীক করলে সে টাকা
সদকা করে
দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরীব হয়,
যার উপর
কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, তাহলে সে অন্যকে
শরীক
করতে পারবে না। এমন গরীব ব্যক্তি যদি কাউকে
শরীক
করতে চায় তাহলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে
নিবে।
-কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে
৪/২১০
কুরবানীর উত্তম পশু
মাসআলা : ২২. কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া
উত্তম।-মুসনাদে
আহমদ ৬/১৩৬, আলমগীরী ৫/৩০০, বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২২৩
খোড়া পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৩. যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা
মাটিতে
রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন
পশুর
কুরবানী জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫,
সুনানে আবু
দাউদ ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪, রদ্দুল
মুহতার ৬/৩২৩,
আলমগীরী ৫/২৯৭
রুগ্ন ও দুর্বল পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৪. এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা
জবাইয়ের স্থান
পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা
কুরবানী করা
জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, আলমগীরী
৫/২৯৭,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪
দাঁত নেই এমন পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৫. যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত
বেশি দাঁত
পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না
এমন পশু
দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয নয়। -বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২১৫, আলমগীরী ৫/২৯৮
যে পশুর শিং ভেঙ্গে বা ফেটে গেছে
মাসআলা : ২৬. যে পশুর শিং একেবারে গোড়া
থেকে
ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর
অর্ধেক
শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং
একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানী করা জায়েয। -
জামে
তিরমিযী ১/২৭৬, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪,
আলমগীরী ৫/২৯৭
কান বা লেজ কাটা পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৭. যে পশুর লেজ বা কোনো কান
অর্ধেক বা
তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়।
আর যদি
অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কুরবানী
জায়েয।
তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে
অসুবিধা
নেই। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ
১/৬১০,
ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮, কাযীখান ৩/৩৫২,
আলমগীরী
৫/২৯৭-২৯৮
অন্ধ পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৮. যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক
চোখ পুরো
নষ্ট সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে
তিরমিযী
১/২৭৫, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ২৯৭,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৪
নতুন পশু ক্রয়ের পর হারানোটা পাওয়া গেলে
মাসআলা : ২৯. কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার
পরে যদি
আরেকটি কেনা হয় এবং পরে হারানোটিও পাওয়া
যায়
তাহলে কুরবানীদাতা গরীব হলে (যার উপর
কুরবানী
ওয়াজিব নয়) দুটি পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব।
আর ধনী
হলে কোনো একটি কুরবানী করলেই হবে। তবে দুটি
কুরবানী করাই উত্তম। -সুনানে বায়হাকী
৫/২৪৪, ইলাউস
সুনান ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯,
কাযীখান
৩/৩৪৭
গর্ভবতী পশুর কুরবানী
মাসআলা : ৩০. গর্ভবতী পশু কুরবানী করা
জায়েয।
জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায়
তাহলে
সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন
হলে
সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ। -কাযীখান
৩/৩৫০
পশু কেনার পর দোষ দেখা দিলে
মাসআলা : ৩১. কুরবানীর নিয়তে ভালো পশু
কেনার পর
যদি তাতে এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যে কারণে
কুরবানী জায়েয হয় না তাহলে ওই পশুর
কুরবানী সহীহ হবে
না। এর স্থলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে।
তবে
ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই
কুরবানী করতে
পারবে। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, ফাতাওয়া নাওয়াযেল ২৩৯,
রদ্দুল মুহতার
৬/৩২৫
পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথা
মাসআলা : ৩২. যদি বিক্রেতা কুরবানীর পশুর
বয়স পূর্ণ
হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের
অবস্থা
দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর
নির্ভর
করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানী করা
যাবে। -
আহকামে ঈদুল আযহা, মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ.
বন্ধ্যা পশুর কুরবানী
মাসআলা : ৩৩. বন্ধ্যা পশুর কুরবানী জায়েয। -
রদ্দুল মুহতার
৬/৩২৫
নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা
মাসআলা : ৩৪. কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা
উত্তম।
নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে
পারবে।
এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে
তার
উপস্থিত থাকা ভালো। -মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩, আলমগীরী
৫/৩০০, ইলাউস
সুনান ১৭/২৭১-২৭৪
জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে
মাসআলা : ৩৫. অনেক সময় জবাইকারীর জবাই
সম্পন্ন হয়
না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে
থাকে।
এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে
‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি
কোনো
একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না
এবং
জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। -রদ্দুল মুহতার
৬/৩৩৪
কুরবানীর পশু থেকে জবাইয়ের আগে উপকৃত হওয়া
মাসআলা : ৩৬. কুরবানীর পশু কেনার পর বা
নির্দিষ্ট করার
পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়। যেমন
হালচাষ
করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি।সুতরাং
কুরবানীর
পশু দ্বারা এসব করা যাবে না। যদি করে তবে
পশমের মূল্য,
হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দিবে।-
মুসনাদে
আহমদ ২/১৪৬, নায়লুল আওতার ৩/১৭২, ইলাউস
সুনান ১৭/২৭৭,
কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০০
কুরবানীর পশুর দুধ পান করা
মাসআলা : ৩৭. কুরবানীর পশুর দুধ পান করা
যাবে না। যদি
জবাইয়ের সময় আসন্ন হয় আর দুধ দোহন না করলে
পশুর
কষ্ট হবে না বলে মনে হয় তাহলে দোহন করবে না।
প্রয়োজনে ওলানে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেবে। এতে
দুধের চাপ কমে যাবে। যদি দুধ দোহন করে ফেলে
তাহলে
তা সদকা করে দিতে হবে। নিজে পান করে থাকলে
মূল্য
সদকা করে দিবে। -মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, ইলাউস
সুনান
১৭/২৭৭, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৯, কাযীখান
৩/৩৫৪, আলমগীরী
৫/৩০১
কোনো শরীকের মৃত্যু ঘটলে
মাসআলা : ৩৮. কয়েকজন মিলে কুরবানী করার
ক্ষেত্রে
জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার
ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার
অনুমতি
দেয় তবে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের
টাকা ফেরত
দিতে হবে। অবশ্য তার
স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে। -বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২০৯, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬, কাযীখান
৩/৩৫১
কুরবানীর পশুর বাচ্চা হলে
মাসআলা : ৩৯. কুরবানীর পশু বাচ্চা দিলে ওই
বাচ্চা
জবাই না করে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম।
যদি
সদকা না করে তবে কুরবানীর পশুর সাথে
বাচ্চাকেও
জবাই করবে এবং গোশত সদকা করে দিবে।-
কাযীখান
৩/৩৪৯, আলমগীরী ৫/৩০১, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩
মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী
মাসআলা : ৪০. মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা
জায়েয।
মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে তবে সেটি
নফল
কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক
গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং
আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত
ব্যক্তি
কুরবানীর ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত
নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব-মিসকীনদের
মাঝে
সদকা করে দিতে হবে। -মুসনাদে আহমদ ১/১০৭,
হাদীস ৮৪৫,
ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬,
কাযীখান ৩/৩৫২
কুরবানীর গোশত জমিয়ে রাখা
মাসআলা : ৪১. কুরবানীর গোশত তিনদিনেরও
অধিক
জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েয।-বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২২৪, সহীহ মুসলিম ২/১৫৯, মুয়াত্তা মালেক
১/৩১৮,
ইলাউস সুনান ১৭/২৭০
কুরবানীর গোশত বণ্টন
মাসআলা : ৪২. শরীকে কুরবানী করলে ওজন
করে গোশত
বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয
নয়।-
আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১
মাসআলা : ৪৩. কুরবানীর গোশতের এক
তৃতীয়াংশ গরীব-
মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন
ও পাড়া-
প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি
নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। -
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলমগীরী ৫/৩০০
গোশত, চর্বি বিক্রি করা
মাসআলা : ৪৪. কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি
বিক্রি
করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে
দিতে
হবে। -ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯, বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২২৫,
কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১
জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া
মাসআলা : ৪৫. জবাইকারী, কসাই বা কাজে
সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর
পশুর
কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে
না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি
ছাড়া
হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া
যাবে।
জবাইয়ের অস্ত্র
মাসআলা : ৪৬. ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই
করা উত্তম।-
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা
মাসআলা : ৪৭. জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার
আগে
চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা
মাকরূহ। -
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
অন্য পশুর সামনে জবাই করা
মাসআলা : ৪৮. এক পশুকে অন্য পশুর সামনে
জবাই করবে
না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট না
দেওয়া।
কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেওয়া
মাসআলা : ৪৯. কুরবানীর গোশত হিন্দু ও অন্য
ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয।-ইলাউস সুনান
৭/২৮৩,
ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০
অন্য কারো ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে
চাইলে
মাসআলা : ৫০. অন্যের ওয়াজিব কুরবানী দিতে
চাইলে ওই
ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির
কুরবানী
আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি
স্ত্রী বা
সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে
কুরবানী করে
তাহলে তাদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে
অনুমতি
নিয়ে আদায় করা ভালো।
কুরবানীর পশু চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে
মাসআলা : ৫১. কুরবানীর পশু যদি চুরি হয়ে যায়
বা মরে
যায় আর কুরবানীদাতার উপর পূর্ব থেকে
কুরবানী
ওয়াজিব থাকে তাহলে আরেকটি পশু কুরবানী
করতে হবে।
গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়)
তার জন্য
আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।-
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯
পাগল পশুর কুরবানী
মাসআলা : ৫২. পাগল পশু কুরবানী করা
জায়েয। তবে যদি
এমন পাগল হয় যে, ঘাস পানি দিলে খায় না এবং
মাঠেও
চরে না তাহলে সেটার কুরবানী জায়েয হবে না।
-
আননিহায়া ফী গরীবিল হাদীস ১/২৩০,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৫২
নিজের কুরবানীর গোশত খাওয়া
মাসআলা : ৫৩. কুরবানীদাতার জন্য নিজ
কুরবানীর গোশত
খাওয়া মুস্তাহাব। -সূরা হজ্ব ২৮, সহীহ মুসলিম
২২/১৫৯,
মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৯০৭৮, বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২২৪
ঋণ করে কুরবানী করা
মাসআলা : ৫৪. কুরবানী ওয়াজিব এমন ব্যক্তিও
ঋণের
টাকা দিয়ে কুরবানী করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে
যাবে।
তবে সুদের উপর ঋণ নিয়ে কুরবানী করা যাবে না।
হাজীদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী
মাসআলা : ৫৫. যেসকল হাজী কুরবানীর
দিনগুলোতে
মুসাফির থাকবে তাদের উপর ঈদুল আযহার
কুরবানী
ওয়াজিব নয়। কিন্তু যে হাজী কুরবানীর কোনো দিন
মুকীম
থাকবে সামর্থ্যবান হলে তার উপর ঈদুল আযহার
কুরবানী
করা জরুরি হবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৩,
আদ্দুররুল
মুখতার ৬/৩১৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫,
ইমদাদুল
ফাতাওয়া ২/১৬৬
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের পক্ষ
থেকে কুরবানী করা
মাসআলা : ৫৬. সামর্থ্যবান ব্যক্তির
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ
থেকে
কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও
বটে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম আলী
রা.কে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার ওসিয়্যত
করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ
থেকেও
কুরবানী দিতেন। -সুনানে আবু দাউদ ২/২৯, জামে
তিরমিযী ১/২৭৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮,
মিশকাত ৩/৩০৯
কোন দিন কুরবানী করা উত্তম
মাসআলা : ৫৭. ১০, ১১ ও ১২ এ তিন দিনের মধ্যে
প্রথম দিন
কুরবানী করা অধিক উত্তম। এরপর দ্বিতীয় দিন,
এরপর
তৃতীয় দিন। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬
খাসীকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী
মাসআলা : ৫৮. খাসিকৃত ছাগল দ্বারা
কুরবানী করা
উত্তম। -ফাতহুল কাদীর ৮/৪৯৮, মাজমাউল
আনহুর ৪/২২৪,
ইলাউস সুনান ১৭/৪৫৩
জীবিত ব্যক্তির নামে কুরবানী
মাসআলা : ৫৯. যেমনিভাবে মৃতের পক্ষ থেকে
ঈসালে
সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা জায়েয তদ্রূপ
জীবিত
ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ইসালে সওয়াবের জন্য
নফল
কুরবানী করা জায়েয। এ কুরবানীর গোশত
দাতা ও তার
পরিবারও খেতে পারবে।
বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির কুরবানী অন্যত্রে
করা
মাসআলা : ৬০. বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য
নিজ
দেশে বা অন্য কোথাও কুরবানী করা জায়েয।
কুরবানীদাতা ভিন্ন স্থানে থাকলে কখন জবাই
করবে
মাসআলা : ৬১. কুরবানীদাতা এক স্থানে আর
কুরবানীর পশু
ভিন্ন স্থানে থাকলে কুরবানীদাতার ঈদের
নামায পড়া
বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায়
আছে ওই
এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই
করা যাবে। -
আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা
মাসআলা : ৬২. কুরবানীর চামড়া
কুরবানীদাতা নিজেও
ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার
না
করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা
করা জরুরি। -আদ্দুররুল মুখতার, ফাতাওয়া
হিন্দিয়া ৫/৩০১
কুরবানীর চামড়া বিক্রির নিয়ত
মাসআলা : ৬৩. কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রি
করলে মূল্য
সদকা করে দেওয়ার নিয়তে বিক্রি করবে। সদকার
নিয়ত
না করে নিজের খরচের নিয়ত করা নাজায়েয ও
গুনাহ।
নিয়ত যা-ই হোক বিক্রিলব্ধ অর্থ পুরোটাই সদকা
করে
দেওয়া জরুরি। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১,
কাযীখান
৩/৩৫৪
কুরবানীর শেষ সময়ে মুকীম হলে
মাসআলা : ৬৪. কুরবানীর সময়ের প্রথম দিকে
মুসাফির
থাকার পরে ৩য় দিন কুরবানীর সময় শেষ হওয়ার
পূর্বে
মুকীম হয়ে গেলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব
হবে।
পক্ষান্তরে প্রথম দিনে মুকীম ছিল অতপর তৃতীয়
দিনে
মুসাফির হয়ে গেছে তাহলেও তার উপর কুরবানী
ওয়াজিব
থাকবে না। অর্থাৎ সে কুরবানী না দিলে
গুনাহগার হবে
না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, ফাতাওয়া
খানিয়া
৩/৩৪৬, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৯
কুরবানীর পশুতে ভিন্ন ইবাদতের নিয়তে শরীক
হওয়া
মাসআলা : ৬৫. এক কুরবানীর পশুতে আকীকা,
হজ্বের
কুরবানীর নিয়ত করা যাবে। এতে প্রত্যেকের
নিয়তকৃত
ইবাদত আদায় হয়ে যাবে।-বাদায়েউস সানায়ে
৪/২০৯,
রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, আলমাবসূত সারাখছী
৪/১৪৪,
আলইনায়া ৮/৪৩৫-৩৪৬, আলমুগনী ৫/৪৫৯
কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা
মাসআলা : ৬৬. ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ
কুরবানীর
গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল
থেকে
কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া
সুন্নত। এই
সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য। ১১ বা ১২
তারিখের গোশত
দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়। -জামে তিরমিযী
১/১২০,
শরহুল মুনয়া ৫৬৬, আদ্দুররুল মুখতার ২/১৭৬,
আলবাহরুর রায়েক
২/১৬৩
কুরবানীর পশুর হাড় বিক্রি
মাসআলা : ৬৭. কুরবানীর মৌসুমে অনেক মহাজন
কুরবানীর
হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে
হাড়
সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এদের ক্রয়-
বিক্রয় জায়েয। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু
কোনো কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর কোনো
কিছু
এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে
মূল্য
সদকা করে দিতে হবে। আর জেনে শুনে মহাজনদের
জন্য
এদের কাছ থেকে ক্রয় করাও বৈধ হবে না। -
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, ফাতাওয়া
হিন্দিয়া
৫/৩০১
রাতে কুরবানী করা
মাসআলা : ৬৮. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতে
কুরবানী
করা জায়েয। তবে রাতে আলোস্বল্পতার দরুণ
জবাইয়ে
ত্রুটি হতে পারে বিধায় রাতে জবাই করা
অনুত্তম। অবশ্য
পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলে রাতে জবাই
করতে
কোনো অসুবিধা নেই। -ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৫,
আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া
৫/২৯৬,
আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫১০
কাজের লোককে কুরবানীর গোশত খাওয়ানো
মাসআলা : ৬৯. কুরবানীর পশুর কোনো কিছু
পারিশ্রমিক
হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। গোশতও পারিশ্রমিক
হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ
সময়
ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও
গোশত খাওয়ানো যাবে।-আহকামুল কুরআন
জাস্সাস
৩/২৩৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলবাহরুর
রায়েক
৮/৩২৬, ইমদাদুল মুফতীন
জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া
মাসআলা : ৭০. কুরবানী পশু জবাই করে
পারিশ্রমিক
দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর কোনো
কিছু
পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া যাবে না। -
কিফায়াতুল
মুফতী ৮/২৬৫
মোরগ কুরবানী করা
মাসআলা : ৭১. কোনো কোনো এলাকায় দরিদ্রদের
মাঝে
মোরগ কুরবানী করার প্রচলন আছে। এটি না
জায়েয।
কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে
কুরবানীর নিয়তে করা যাবে না। -খুলাসাতুল
ফাতাওয়া
৪/৩১৪, ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৬/২৯০,
আদ্দুররুল মুখতার
৬/৩১৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২০০

প্রশ্ন:কুরবানীর পশুর চামড়া বা এর টাকা পাওয়ার
প্রকৃত হকদার
কারা?
উত্তর:
কুরবানীর পশুর চামড়ার মালিক
কুরবানীদাতা। সে ইচ্ছা
করলে তা ব্যবহারও করতে পারে। সে যদি
চামড়াটি দান
করে দিতে চায় তবে বিক্রি না করে আস্ত দান
করাই
উত্তম। বিক্রি করলে এর মূল্যের হকদার হয়ে যায়
ফকীর-
মিসকীন তথা যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত লোকজন।
আর এদের
মধ্যে আত্মীয়-স্বজনও দ্বীনদারগণ
অগ্রাধিকারযোগ্য।
-রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৮-৯; শরহুল কানয, বদরুদ্দীন
আইনী ২/২০৬কুরবানীর প্রয়োজনীয় ৭২টি মাসআলা/
মাসায়েল
-------------------------------------
কার উপর কুরবানী ওয়াজিব
মাসআলা : ১. প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন
প্রত্যেক
মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২
যিলহজ্ব
সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত
নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর
কুরবানী
করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা,
অলঙ্কার,
বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি,
প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও
অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর
নেসাবের
ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫)
ভরি,
রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি,
টাকা-পয়সা ও
অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য
সাড়ে
বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া।
আর
সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর
কোনো
একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে
কিন্তু
প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে
বায়ান্ন
তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও
তার
উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল
বুরহানী ৮/৪৫৫;
ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫
নেসাবের মেয়াদ
মাসআলা ২. কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা
জরুরি নয়;
বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন
থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস
সানায়ে
৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২
কুরবানীর সময়
মাসআলা : ৩. মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়।
যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
তবে
সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা
উত্তম। -
মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে
৪/১৯৮, ২৩,
ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫
নাবালেগের কুরবানী
মাসআলা : ৪. নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে
সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও
তাদের
উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার
অভিভাবক নিজ
সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা
সহীহ হবে।-
বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার
৬/৩১৬
মুসাফিরের জন্য কুরবানী
মাসআলা : ৫. যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে
মুসাফির
থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮
কিলোমিটার দূরে
যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার
উপর
কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান
৩/৩৪৪,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার
৬/৩১৫
নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী
মাসআলা : ৬. নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী
দেওয়া
অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।-
রদ্দুল
মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম
মাসআলা : ৭. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা
ওয়াজিব
নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে
তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/১৯২
কুরবানী করতে না পারলে
মাসআলা : ৮. কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে
ওয়াজিব
কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু
ক্রয় না
করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি
ছাগলের
মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে
ছিল,
কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে
ঐ পশু
জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে
৪/২০৪,
ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে
মাসআলা : ৯. যেসব এলাকার লোকদের উপর
জুমা ও ঈদের
নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের
আগে
কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা
অন্য
কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয়
তাহলে
ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম
দিনেও
কুরবানী করা জায়েয।-সহীহ বুখারী ২/৮৩২,
কাযীখান
৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
রাতে কুরবানী করা
মাসআলা : ১০. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত
রাতেও কুরবানী
করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো। -
মুসনাদে
আহমাদ, হাদীস : ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ
৪/২২,
আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, কাযীখান ৩/৩৪৫,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২২৩
কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর যবাই
করলে
মাসআলা : ১১. কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই
করতে না
পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে।
তবে
যদি(সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো
গোশত
সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি
জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ
মূল্য
হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।-বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১
কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে
মাসআলা : ১২. উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও
দুম্বা দ্বারা
কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু
ছাড়া অন্যান্য
পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী
করা
জায়েয নয়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২০৫
নর ও মাদা পশুর কুরবানী
মাসআলা : ১৩. যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয
সেগুলোর
নর-মাদা দুটোই কুরবানী করা যায়। -কাযীখান
৩/৩৪৮,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
কুরবানীর পশুর বয়সসীমা
মাসআলা : ১৪. উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে।
গরু ও মহিষ
কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও
দুম্বা
কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি
বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে,
দেখতে ১
বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও
কুরবানী করা
জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের
হতে
হবে।
উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো
অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে
না।
-কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে
৪/২০৫-২০৬
এক পশুতে শরীকের সংখ্যা
মাসআলা : ১৫. একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা
দ্বারা শুধু
একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু
কয়েকজন
মিলে কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না।
আর উট,
গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে।
সাতের
অধিক শরীক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। -
সহীহ
মুসলিম ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯,
কাযীখান ৩/৩৪৯,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮
সাত শরীকের কুরবানী
মাসআলা : ১৬. সাতজনে মিলে কুরবানী করলে
সবার অংশ
সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম
হতে
পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড়
ভাগ।
এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না।
-
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
মাসআলা : ১৭. উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং
সাতের কমে
যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয়
ভাগে
কুরবানী করা জায়েয। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২০৭
কোনো অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে
মাসআলা : ১৮. যদি কেউ আল্লাহ তাআলার
হুকুম পালনের
উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার
নিয়তে
কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে
না। তাকে
অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানী
হবে না।
তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন
করতে হবে। -
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাযীখান ৩/৩৪৯
কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ
মাসআলা : ১৯. কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে
আকীকার
নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও
আকীকা
দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬,
রদ্দুল মুহতার
৬/৩৬২
মাসআলা : ২০. শরীকদের কারো পুরো বা
অধিকাংশ
উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কুরবানী
সহীহ হবে
না।
মাসআলা : ২১. যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা
কুরবানী
দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা
করলে অন্যকে শরীক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে
একা
কুরবানী করাই শ্রেয়। শরীক করলে সে টাকা
সদকা করে
দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরীব হয়,
যার উপর
কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, তাহলে সে অন্যকে
শরীক
করতে পারবে না। এমন গরীব ব্যক্তি যদি কাউকে
শরীক
করতে চায় তাহলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে
নিবে।
-কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে
৪/২১০
কুরবানীর উত্তম পশু
মাসআলা : ২২. কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া
উত্তম।-মুসনাদে
আহমদ ৬/১৩৬, আলমগীরী ৫/৩০০, বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২২৩
খোড়া পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৩. যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা
মাটিতে
রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন
পশুর
কুরবানী জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫,
সুনানে আবু
দাউদ ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪, রদ্দুল
মুহতার ৬/৩২৩,
আলমগীরী ৫/২৯৭
রুগ্ন ও দুর্বল পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৪. এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা
জবাইয়ের স্থান
পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা
কুরবানী করা
জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, আলমগীরী
৫/২৯৭,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪
দাঁত নেই এমন পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৫. যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত
বেশি দাঁত
পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না
এমন পশু
দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয নয়। -বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২১৫, আলমগীরী ৫/২৯৮
যে পশুর শিং ভেঙ্গে বা ফেটে গেছে
মাসআলা : ২৬. যে পশুর শিং একেবারে গোড়া
থেকে
ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর
অর্ধেক
শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং
একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানী করা জায়েয। -
জামে
তিরমিযী ১/২৭৬, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪,
আলমগীরী ৫/২৯৭
কান বা লেজ কাটা পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৭. যে পশুর লেজ বা কোনো কান
অর্ধেক বা
তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়।
আর যদি
অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কুরবানী
জায়েয।
তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে
অসুবিধা
নেই। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ
১/৬১০,
ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮, কাযীখান ৩/৩৫২,
আলমগীরী
৫/২৯৭-২৯৮
অন্ধ পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৮. যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক
চোখ পুরো
নষ্ট সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে
তিরমিযী
১/২৭৫, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ২৯৭,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৪
নতুন পশু ক্রয়ের পর হারানোটা পাওয়া গেলে
মাসআলা : ২৯. কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার
পরে যদি
আরেকটি কেনা হয় এবং পরে হারানোটিও পাওয়া
যায়
তাহলে কুরবানীদাতা গরীব হলে (যার উপর
কুরবানী
ওয়াজিব নয়) দুটি পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব।
আর ধনী
হলে কোনো একটি কুরবানী করলেই হবে। তবে দুটি
কুরবানী করাই উত্তম। -সুনানে বায়হাকী
৫/২৪৪, ইলাউস
সুনান ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯,
কাযীখান
৩/৩৪৭
গর্ভবতী পশুর কুরবানী
মাসআলা : ৩০. গর্ভবতী পশু কুরবানী করা
জায়েয।
জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায়
তাহলে
সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন
হলে
সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ। -কাযীখান
৩/৩৫০
পশু কেনার পর দোষ দেখা দিলে
মাসআলা : ৩১. কুরবানীর নিয়তে ভালো পশু
কেনার পর
যদি তাতে এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যে কারণে
কুরবানী জায়েয হয় না তাহলে ওই পশুর
কুরবানী সহীহ হবে
না। এর স্থলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে।
তবে
ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই
কুরবানী করতে
পারবে। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, ফাতাওয়া নাওয়াযেল ২৩৯,
রদ্দুল মুহতার
৬/৩২৫
পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথা
মাসআলা : ৩২. যদি বিক্রেতা কুরবানীর পশুর
বয়স পূর্ণ
হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের
অবস্থা
দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর
নির্ভর
করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানী করা
যাবে। -
আহকামে ঈদুল আযহা, মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ.
বন্ধ্যা পশুর কুরবানী
মাসআলা : ৩৩. বন্ধ্যা পশুর কুরবানী জায়েয। -
রদ্দুল মুহতার
৬/৩২৫
নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা
মাসআলা : ৩৪. কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা
উত্তম।
নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে
পারবে।
এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে
তার
উপস্থিত থাকা ভালো। -মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩, আলমগীরী
৫/৩০০, ইলাউস
সুনান ১৭/২৭১-২৭৪
জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে
মাসআলা : ৩৫. অনেক সময় জবাইকারীর জবাই
সম্পন্ন হয়
না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে
থাকে।
এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে
‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি
কোনো
একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না
এবং
জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। -রদ্দুল মুহতার
৬/৩৩৪
কুরবানীর পশু থেকে জবাইয়ের আগে উপকৃত হওয়া
মাসআলা : ৩৬. কুরবানীর পশু কেনার পর বা
নির্দিষ্ট করার
পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়। যেমন
হালচাষ
করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি।সুতরাং
কুরবানীর
পশু দ্বারা এসব করা যাবে না। যদি করে তবে
পশমের মূল্য,
হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দিবে।-
মুসনাদে
আহমদ ২/১৪৬, নায়লুল আওতার ৩/১৭২, ইলাউস
সুনান ১৭/২৭৭,
কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০০
কুরবানীর পশুর দুধ পান করা
মাসআলা : ৩৭. কুরবানীর পশুর দুধ পান করা
যাবে না। যদি
জবাইয়ের সময় আসন্ন হয় আর দুধ দোহন না করলে
পশুর
কষ্ট হবে না বলে মনে হয় তাহলে দোহন করবে না।
প্রয়োজনে ওলানে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেবে। এতে
দুধের চাপ কমে যাবে। যদি দুধ দোহন করে ফেলে
তাহলে
তা সদকা করে দিতে হবে। নিজে পান করে থাকলে
মূল্য
সদকা করে দিবে। -মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, ইলাউস
সুনান
১৭/২৭৭, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৯, কাযীখান
৩/৩৫৪, আলমগীরী
৫/৩০১
কোনো শরীকের মৃত্যু ঘটলে
মাসআলা : ৩৮. কয়েকজন মিলে কুরবানী করার
ক্ষেত্রে
জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার
ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার
অনুমতি
দেয় তবে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের
টাকা ফেরত
দিতে হবে। অবশ্য তার
স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে। -বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২০৯, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬, কাযীখান
৩/৩৫১
কুরবানীর পশুর বাচ্চা হলে
মাসআলা : ৩৯. কুরবানীর পশু বাচ্চা দিলে ওই
বাচ্চা
জবাই না করে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম।
যদি
সদকা না করে তবে কুরবানীর পশুর সাথে
বাচ্চাকেও
জবাই করবে এবং গোশত সদকা করে দিবে।-
কাযীখান
৩/৩৪৯, আলমগীরী ৫/৩০১, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩
মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী
মাসআলা : ৪০. মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা
জায়েয।
মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে তবে সেটি
নফল
কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক
গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং
আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত
ব্যক্তি
কুরবানীর ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত
নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব-মিসকীনদের
মাঝে
সদকা করে দিতে হবে। -মুসনাদে আহমদ ১/১০৭,
হাদীস ৮৪৫,
ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬,
কাযীখান ৩/৩৫২
কুরবানীর গোশত জমিয়ে রাখা
মাসআলা : ৪১. কুরবানীর গোশত তিনদিনেরও
অধিক
জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েয।-বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২২৪, সহীহ মুসলিম ২/১৫৯, মুয়াত্তা মালেক
১/৩১৮,
ইলাউস সুনান ১৭/২৭০
কুরবানীর গোশত বণ্টন
মাসআলা : ৪২. শরীকে কুরবানী করলে ওজন
করে গোশত
বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয
নয়।-
আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১
মাসআলা : ৪৩. কুরবানীর গোশতের এক
তৃতীয়াংশ গরীব-
মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন
ও পাড়া-
প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি
নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। -
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলমগীরী ৫/৩০০
গোশত, চর্বি বিক্রি করা
মাসআলা : ৪৪. কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি
বিক্রি
করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে
দিতে
হবে। -ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯, বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২২৫,
কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১
জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া
মাসআলা : ৪৫. জবাইকারী, কসাই বা কাজে
সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর
পশুর
কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে
না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি
ছাড়া
হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া
যাবে।
জবাইয়ের অস্ত্র
মাসআলা : ৪৬. ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই
করা উত্তম।-
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা
মাসআলা : ৪৭. জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার
আগে
চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা
মাকরূহ। -
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
অন্য পশুর সামনে জবাই করা
মাসআলা : ৪৮. এক পশুকে অন্য পশুর সামনে
জবাই করবে
না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট না
দেওয়া।
কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেওয়া
মাসআলা : ৪৯. কুরবানীর গোশত হিন্দু ও অন্য
ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয।-ইলাউস সুনান
৭/২৮৩,
ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০
অন্য কারো ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে
চাইলে
মাসআলা : ৫০. অন্যের ওয়াজিব কুরবানী দিতে
চাইলে ওই
ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির
কুরবানী
আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি
স্ত্রী বা
সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে
কুরবানী করে
তাহলে তাদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে
অনুমতি
নিয়ে আদায় করা ভালো।
কুরবানীর পশু চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে
মাসআলা : ৫১. কুরবানীর পশু যদি চুরি হয়ে যায়
বা মরে
যায় আর কুরবানীদাতার উপর পূর্ব থেকে
কুরবানী
ওয়াজিব থাকে তাহলে আরেকটি পশু কুরবানী
করতে হবে।
গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়)
তার জন্য
আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।-
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯
পাগল পশুর কুরবানী
মাসআলা : ৫২. পাগল পশু কুরবানী করা
জায়েয। তবে যদি
এমন পাগল হয় যে, ঘাস পানি দিলে খায় না এবং
মাঠেও
চরে না তাহলে সেটার কুরবানী জায়েয হবে না।
-
আননিহায়া ফী গরীবিল হাদীস ১/২৩০,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৫২
নিজের কুরবানীর গোশত খাওয়া
মাসআলা : ৫৩. কুরবানীদাতার জন্য নিজ
কুরবানীর গোশত
খাওয়া মুস্তাহাব। -সূরা হজ্ব ২৮, সহীহ মুসলিম
২২/১৫৯,
মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৯০৭৮, বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২২৪
ঋণ করে কুরবানী করা
মাসআলা : ৫৪. কুরবানী ওয়াজিব এমন ব্যক্তিও
ঋণের
টাকা দিয়ে কুরবানী করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে
যাবে।
তবে সুদের উপর ঋণ নিয়ে কুরবানী করা যাবে না।
হাজীদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী
মাসআলা : ৫৫. যেসকল হাজী কুরবানীর
দিনগুলোতে
মুসাফির থাকবে তাদের উপর ঈদুল আযহার
কুরবানী
ওয়াজিব নয়। কিন্তু যে হাজী কুরবানীর কোনো দিন
মুকীম
থাকবে সামর্থ্যবান হলে তার উপর ঈদুল আযহার
কুরবানী
করা জরুরি হবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৩,
আদ্দুররুল
মুখতার ৬/৩১৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫,
ইমদাদুল
ফাতাওয়া ২/১৬৬
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের পক্ষ
থেকে কুরবানী করা
মাসআলা : ৫৬. সামর্থ্যবান ব্যক্তির
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ
থেকে
কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও
বটে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম আলী
রা.কে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার ওসিয়্যত
করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ
থেকেও
কুরবানী দিতেন। -সুনানে আবু দাউদ ২/২৯, জামে
তিরমিযী ১/২৭৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮,
মিশকাত ৩/৩০৯
কোন দিন কুরবানী করা উত্তম
মাসআলা : ৫৭. ১০, ১১ ও ১২ এ তিন দিনের মধ্যে
প্রথম দিন
কুরবানী করা অধিক উত্তম। এরপর দ্বিতীয় দিন,
এরপর
তৃতীয় দিন। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬
খাসীকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী
মাসআলা : ৫৮. খাসিকৃত ছাগল দ্বারা
কুরবানী করা
উত্তম। -ফাতহুল কাদীর ৮/৪৯৮, মাজমাউল
আনহুর ৪/২২৪,
ইলাউস সুনান ১৭/৪৫৩
জীবিত ব্যক্তির নামে কুরবানী
মাসআলা : ৫৯. যেমনিভাবে মৃতের পক্ষ থেকে
ঈসালে
সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা জায়েয তদ্রূপ
জীবিত
ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ইসালে সওয়াবের জন্য
নফল
কুরবানী করা জায়েয। এ কুরবানীর গোশত
দাতা ও তার
পরিবারও খেতে পারবে।
বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির কুরবানী অন্যত্রে
করা
মাসআলা : ৬০. বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য
নিজ
দেশে বা অন্য কোথাও কুরবানী করা জায়েয।
কুরবানীদাতা ভিন্ন স্থানে থাকলে কখন জবাই
করবে
মাসআলা : ৬১. কুরবানীদাতা এক স্থানে আর
কুরবানীর পশু
ভিন্ন স্থানে থাকলে কুরবানীদাতার ঈদের
নামায পড়া
বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায়
আছে ওই
এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই
করা যাবে। -
আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা
মাসআলা : ৬২. কুরবানীর চামড়া
কুরবানীদাতা নিজেও
ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার
না
করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা
করা জরুরি। -আদ্দুররুল মুখতার, ফাতাওয়া
হিন্দিয়া ৫/৩০১
কুরবানীর চামড়া বিক্রির নিয়ত
মাসআলা : ৬৩. কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রি
করলে মূল্য
সদকা করে দেওয়ার নিয়তে বিক্রি করবে। সদকার
নিয়ত
না করে নিজের খরচের নিয়ত করা নাজায়েয ও
গুনাহ।
নিয়ত যা-ই হোক বিক্রিলব্ধ অর্থ পুরোটাই সদকা
করে
দেওয়া জরুরি। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১,
কাযীখান
৩/৩৫৪
কুরবানীর শেষ সময়ে মুকীম হলে
মাসআলা : ৬৪. কুরবানীর সময়ের প্রথম দিকে
মুসাফির
থাকার পরে ৩য় দিন কুরবানীর সময় শেষ হওয়ার
পূর্বে
মুকীম হয়ে গেলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব
হবে।
পক্ষান্তরে প্রথম দিনে মুকীম ছিল অতপর তৃতীয়
দিনে
মুসাফির হয়ে গেছে তাহলেও তার উপর কুরবানী
ওয়াজিব
থাকবে না। অর্থাৎ সে কুরবানী না দিলে
গুনাহগার হবে
না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, ফাতাওয়া
খানিয়া
৩/৩৪৬, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৯
কুরবানীর পশুতে ভিন্ন ইবাদতের নিয়তে শরীক
হওয়া
মাসআলা : ৬৫. এক কুরবানীর পশুতে আকীকা,
হজ্বের
কুরবানীর নিয়ত করা যাবে। এতে প্রত্যেকের
নিয়তকৃত
ইবাদত আদায় হয়ে যাবে।-বাদায়েউস সানায়ে
৪/২০৯,
রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, আলমাবসূত সারাখছী
৪/১৪৪,
আলইনায়া ৮/৪৩৫-৩৪৬, আলমুগনী ৫/৪৫৯
কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা
মাসআলা : ৬৬. ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ
কুরবানীর
গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল
থেকে
কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া
সুন্নত। এই
সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য। ১১ বা ১২
তারিখের গোশত
দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়। -জামে তিরমিযী
১/১২০,
শরহুল মুনয়া ৫৬৬, আদ্দুররুল মুখতার ২/১৭৬,
আলবাহরুর রায়েক
২/১৬৩
কুরবানীর পশুর হাড় বিক্রি
মাসআলা : ৬৭. কুরবানীর মৌসুমে অনেক মহাজন
কুরবানীর
হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে
হাড়
সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এদের ক্রয়-
বিক্রয় জায়েয। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু
কোনো কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর কোনো
কিছু
এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে
মূল্য
সদকা করে দিতে হবে। আর জেনে শুনে মহাজনদের
জন্য
এদের কাছ থেকে ক্রয় করাও বৈধ হবে না। -
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, ফাতাওয়া
হিন্দিয়া
৫/৩০১
রাতে কুরবানী করা
মাসআলা : ৬৮. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতে
কুরবানী
করা জায়েয। তবে রাতে আলোস্বল্পতার দরুণ
জবাইয়ে
ত্রুটি হতে পারে বিধায় রাতে জবাই করা
অনুত্তম। অবশ্য
পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলে রাতে জবাই
করতে
কোনো অসুবিধা নেই। -ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৫,
আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া
৫/২৯৬,
আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫১০
কাজের লোককে কুরবানীর গোশত খাওয়ানো
মাসআলা : ৬৯. কুরবানীর পশুর কোনো কিছু
পারিশ্রমিক
হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। গোশতও পারিশ্রমিক
হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ
সময়
ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও
গোশত খাওয়ানো যাবে।-আহকামুল কুরআন
জাস্সাস
৩/২৩৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলবাহরুর
রায়েক
৮/৩২৬, ইমদাদুল মুফতীন
জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া
মাসআলা : ৭০. কুরবানী পশু জবাই করে
পারিশ্রমিক
দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর কোনো
কিছু
পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া যাবে না। -
কিফায়াতুল
মুফতী ৮/২৬৫
মোরগ কুরবানী করা
মাসআলা : ৭১. কোনো কোনো এলাকায় দরিদ্রদের
মাঝে
মোরগ কুরবানী করার প্রচলন আছে। এটি না
জায়েয।
কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে
কুরবানীর নিয়তে করা যাবে না। -খুলাসাতুল
ফাতাওয়া
৪/৩১৪, ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৬/২৯০,
আদ্দুররুল মুখতার
৬/৩১৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২০০
প্রশ্ন:
কুরবানীর পশুর চামড়া বা এর টাকা পাওয়ার
প্রকৃত হকদার
কারা?
উত্তর:
কুরবানীর পশুর চামড়ার মালিক
কুরবানীদাতা। সে ইচ্ছা
করলে তা ব্যবহারও করতে পারে। সে যদি
চামড়াটি দান
করে দিতে চায় তবে বিক্রি না করে আস্ত দান
করাই
উত্তম। বিক্রি করলে এর মূল্যের হকদার হয়ে যায়
ফকীর-
মিসকীন তথা যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত লোকজন।
আর এদের
মধ্যে আত্মীয়-স্বজনও দ্বীনদারগণ
অগ্রাধিকারযোগ্য।
-রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৮-৯; শরহুল কানয, বদরুদ্দীন
আইনী ২/২০৬কুরবানীর প্রয়োজনীয় ৭২টি মাসআলা/
মাসায়েল
-------------------------------------
কার উপর কুরবানী ওয়াজিব
মাসআলা : ১. প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন
প্রত্যেক
মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২
যিলহজ্ব
সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত
নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর
কুরবানী
করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা,
অলঙ্কার,
বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি,
প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও
অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর
নেসাবের
ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫)
ভরি,
রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি,
টাকা-পয়সা ও
অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য
সাড়ে
বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া।
আর
সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর
কোনো
একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে
কিন্তু
প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে
বায়ান্ন
তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও
তার
উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল
বুরহানী ৮/৪৫৫;
ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫
নেসাবের মেয়াদ
মাসআলা ২. কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা
জরুরি নয়;
বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন
থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস
সানায়ে
৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২
কুরবানীর সময়
মাসআলা : ৩. মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়।
যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
তবে
সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা
উত্তম। -
মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে
৪/১৯৮, ২৩,
ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫
নাবালেগের কুরবানী
মাসআলা : ৪. নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে
সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও
তাদের
উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার
অভিভাবক নিজ
সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা
সহীহ হবে।-
বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার
৬/৩১৬
মুসাফিরের জন্য কুরবানী
মাসআলা : ৫. যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে
মুসাফির
থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮
কিলোমিটার দূরে
যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার
উপর
কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান
৩/৩৪৪,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার
৬/৩১৫
নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী
মাসআলা : ৬. নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী
দেওয়া
অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।-
রদ্দুল
মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম
মাসআলা : ৭. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা
ওয়াজিব
নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে
তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/১৯২
কুরবানী করতে না পারলে
মাসআলা : ৮. কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে
ওয়াজিব
কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু
ক্রয় না
করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি
ছাগলের
মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে
ছিল,
কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে
ঐ পশু
জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে
৪/২০৪,
ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে
মাসআলা : ৯. যেসব এলাকার লোকদের উপর
জুমা ও ঈদের
নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের
আগে
কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা
অন্য
কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয়
তাহলে
ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম
দিনেও
কুরবানী করা জায়েয।-সহীহ বুখারী ২/৮৩২,
কাযীখান
৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
রাতে কুরবানী করা
মাসআলা : ১০. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত
রাতেও কুরবানী
করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো। -
মুসনাদে
আহমাদ, হাদীস : ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ
৪/২২,
আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, কাযীখান ৩/৩৪৫,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২২৩
কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর যবাই
করলে
মাসআলা : ১১. কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই
করতে না
পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে।
তবে
যদি(সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো
গোশত
সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি
জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ
মূল্য
হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।-বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১
কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে
মাসআলা : ১২. উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও
দুম্বা দ্বারা
কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু
ছাড়া অন্যান্য
পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী
করা
জায়েয নয়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২০৫
নর ও মাদা পশুর কুরবানী
মাসআলা : ১৩. যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয
সেগুলোর
নর-মাদা দুটোই কুরবানী করা যায়। -কাযীখান
৩/৩৪৮,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
কুরবানীর পশুর বয়সসীমা
মাসআলা : ১৪. উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে।
গরু ও মহিষ
কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও
দুম্বা
কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি
বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে,
দেখতে ১
বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও
কুরবানী করা
জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের
হতে
হবে।
উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো
অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে
না।
-কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে
৪/২০৫-২০৬
এক পশুতে শরীকের সংখ্যা
মাসআলা : ১৫. একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা
দ্বারা শুধু
একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু
কয়েকজন
মিলে কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না।
আর উট,
গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে।
সাতের
অধিক শরীক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। -
সহীহ
মুসলিম ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯,
কাযীখান ৩/৩৪৯,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮
সাত শরীকের কুরবানী
মাসআলা : ১৬. সাতজনে মিলে কুরবানী করলে
সবার অংশ
সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম
হতে
পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড়
ভাগ।
এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না।
-
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
মাসআলা : ১৭. উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং
সাতের কমে
যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয়
ভাগে
কুরবানী করা জায়েয। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২০৭
কোনো অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে
মাসআলা : ১৮. যদি কেউ আল্লাহ তাআলার
হুকুম পালনের
উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার
নিয়তে
কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে
না। তাকে
অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানী
হবে না।
তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন
করতে হবে। -
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাযীখান ৩/৩৪৯
কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ
মাসআলা : ১৯. কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে
আকীকার
নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও
আকীকা
দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬,
রদ্দুল মুহতার
৬/৩৬২
মাসআলা : ২০. শরীকদের কারো পুরো বা
অধিকাংশ
উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কুরবানী
সহীহ হবে
না।
মাসআলা : ২১. যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা
কুরবানী
দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা
করলে অন্যকে শরীক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে
একা
কুরবানী করাই শ্রেয়। শরীক করলে সে টাকা
সদকা করে
দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরীব হয়,
যার উপর
কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, তাহলে সে অন্যকে
শরীক
করতে পারবে না। এমন গরীব ব্যক্তি যদি কাউকে
শরীক
করতে চায় তাহলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে
নিবে।
-কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে
৪/২১০
কুরবানীর উত্তম পশু
মাসআলা : ২২. কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া
উত্তম।-মুসনাদে
আহমদ ৬/১৩৬, আলমগীরী ৫/৩০০, বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২২৩
খোড়া পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৩. যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা
মাটিতে
রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন
পশুর
কুরবানী জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫,
সুনানে আবু
দাউদ ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪, রদ্দুল
মুহতার ৬/৩২৩,
আলমগীরী ৫/২৯৭
রুগ্ন ও দুর্বল পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৪. এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা
জবাইয়ের স্থান
পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা
কুরবানী করা
জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, আলমগীরী
৫/২৯৭,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪
দাঁত নেই এমন পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৫. যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত
বেশি দাঁত
পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না
এমন পশু
দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয নয়। -বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২১৫, আলমগীরী ৫/২৯৮
যে পশুর শিং ভেঙ্গে বা ফেটে গেছে
মাসআলা : ২৬. যে পশুর শিং একেবারে গোড়া
থেকে
ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর
অর্ধেক
শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং
একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানী করা জায়েয। -
জামে
তিরমিযী ১/২৭৬, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪,
আলমগীরী ৫/২৯৭
কান বা লেজ কাটা পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৭. যে পশুর লেজ বা কোনো কান
অর্ধেক বা
তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়।
আর যদি
অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কুরবানী
জায়েয।
তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে
অসুবিধা
নেই। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ
১/৬১০,
ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮, কাযীখান ৩/৩৫২,
আলমগীরী
৫/২৯৭-২৯৮
অন্ধ পশুর কুরবানী
মাসআলা : ২৮. যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক
চোখ পুরো
নষ্ট সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে
তিরমিযী
১/২৭৫, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ২৯৭,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৪
নতুন পশু ক্রয়ের পর হারানোটা পাওয়া গেলে
মাসআলা : ২৯. কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার
পরে যদি
আরেকটি কেনা হয় এবং পরে হারানোটিও পাওয়া
যায়
তাহলে কুরবানীদাতা গরীব হলে (যার উপর
কুরবানী
ওয়াজিব নয়) দুটি পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব।
আর ধনী
হলে কোনো একটি কুরবানী করলেই হবে। তবে দুটি
কুরবানী করাই উত্তম। -সুনানে বায়হাকী
৫/২৪৪, ইলাউস
সুনান ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯,
কাযীখান
৩/৩৪৭
গর্ভবতী পশুর কুরবানী
মাসআলা : ৩০. গর্ভবতী পশু কুরবানী করা
জায়েয।
জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায়
তাহলে
সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন
হলে
সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ। -কাযীখান
৩/৩৫০
পশু কেনার পর দোষ দেখা দিলে
মাসআলা : ৩১. কুরবানীর নিয়তে ভালো পশু
কেনার পর
যদি তাতে এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যে কারণে
কুরবানী জায়েয হয় না তাহলে ওই পশুর
কুরবানী সহীহ হবে
না। এর স্থলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে।
তবে
ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই
কুরবানী করতে
পারবে। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯,
বাদায়েউস
সানায়ে ৪/২১৬, ফাতাওয়া নাওয়াযেল ২৩৯,
রদ্দুল মুহতার
৬/৩২৫
পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথা
মাসআলা : ৩২. যদি বিক্রেতা কুরবানীর পশুর
বয়স পূর্ণ
হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের
অবস্থা
দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর
নির্ভর
করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানী করা
যাবে। -
আহকামে ঈদুল আযহা, মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ.
বন্ধ্যা পশুর কুরবানী
মাসআলা : ৩৩. বন্ধ্যা পশুর কুরবানী জায়েয। -
রদ্দুল মুহতার
৬/৩২৫
নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা
মাসআলা : ৩৪. কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা
উত্তম।
নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে
পারবে।
এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে
তার
উপস্থিত থাকা ভালো। -মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭,
বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩, আলমগীরী
৫/৩০০, ইলাউস
সুনান ১৭/২৭১-২৭৪
জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে
মাসআলা : ৩৫. অনেক সময় জবাইকারীর জবাই
সম্পন্ন হয়
না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে
থাকে।
এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে
‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি
কোনো
একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না
এবং
জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। -রদ্দুল মুহতার
৬/৩৩৪
কুরবানীর পশু থেকে জবাইয়ের আগে উপকৃত হওয়া
মাসআলা : ৩৬. কুরবানীর পশু কেনার পর বা
নির্দিষ্ট করার
পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়। যেমন
হালচাষ
করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি।সুতরাং
কুরবানীর
পশু দ্বারা এসব করা যাবে না। যদি করে তবে
পশমের মূল্য,
হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দিবে।-
মুসনাদে
আহমদ ২/১৪৬, নায়লুল আওতার ৩/১৭২, ইলাউস
সুনান ১৭/২৭৭,
কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০০
কুরবানীর পশুর দুধ পান করা
মাসআলা : ৩৭. কুরবানীর পশুর দুধ পান করা
যাবে না। যদি
জবাইয়ের সময় আসন্ন হয় আর দুধ দোহন না করলে
পশুর
কষ্ট হবে না বলে মনে হয় তাহলে দোহন করবে না।
প্রয়োজনে ওলানে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেবে। এতে
দুধের চাপ কমে যাবে। যদি দুধ দোহন করে ফেলে
তাহলে
তা সদকা করে দিতে হবে। নিজে পান করে থাকলে
মূল্য
সদকা করে দিবে। -মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, ইলাউস
সুনান
১৭/২৭৭, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৯, কাযীখান
৩/৩৫৪, আলমগীরী
৫/৩০১
কোনো শরীকের মৃত্যু ঘটলে
মাসআলা : ৩৮. কয়েকজন মিলে কুরবানী করার
ক্ষেত্রে
জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার
ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার
অনুমতি
দেয় তবে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের
টাকা ফেরত
দিতে হবে। অবশ্য তার
স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে। -বাদায়েউস
সানায়ে
৪/২০৯, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬, কাযীখান
৩/৩৫১
কুরবানীর পশুর বাচ্চা হলে
মাসআলা : ৩৯. কুরবানীর পশু বাচ্চা দিলে ওই
বাচ্চা
জবাই না করে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম।
যদি
সদকা না করে তবে কুরবানীর পশুর সাথে
বাচ্চাকেও
জবাই করবে এবং গোশত সদকা করে দিবে।-
কাযীখান
৩/৩৪৯, আলমগীরী ৫/৩০১, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২