বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০১৬

নামাযের চেয়ে খুতবা দীর্ঘ হওয়া খেলাফে সুন্নত

Mohiuddin Kasemi


সুন্নত হচ্ছে খুতবার চেয়ে নামায প্রলম্বিত হওয়া। খুতবা হবে নামায থেকে সংক্ষিপ্ত । রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময়ই সংক্ষিপ্ত খুতবা দিতেন; আর খুতবার চেয়ে নামায দীর্ঘ করতেন। তবে মাঝেমধ্যে অবস্থার প্রেক্ষিতে দীর্ঘ খুতবা দিতেন বলে জানা যায়। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. এমনটিই বলেছেন। [যাদুল মাআদ : খ. ১, পৃ. ১৯১]
এ বিষয়ে কয়েকটি হাদিস দেখা যেতে পারে : 
عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ السُّوَائِىِّ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- لاَ يُطِيلُ الْمَوْعِظَةَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِنَّمَا هُنَّ كَلِمَاتٌ يَسِيرَاتٌ.
অর্থ : হযরত জাবের ইবনে সামুরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমুআর দিন লম্বা নসিহত করতেন না; কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কথা বলতেন। [সুনানে আবী দাউদ, হাদিস নং- ১১০৯, অধ্যায় : باب إِقْصَارِ الْخُطَبِ]

عَنْ عَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ قَالَ أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- بِإِقْصَارِ الْخُطَبِ.
অর্থ : হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. বলেন, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে খুতবা সংক্ষিপ্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। [সুনানে আবী দাউদ, হাদিস নং- ১১০৮] 
قَالَ أَبُو وَائِلٍ خَطَبَنَا عَمَّارٌ فَأَوْجَزَ وَأَبْلَغَ فَلَمَّا نَزَلَ قُلْنَا يَا أَبَا الْيَقْظَانِ لَقَدْ أَبْلَغْتَ وَأَوْجَزْتَ فَلَوْ كُنْتَ تَنَفَّسْتَ. فَقَالَ إِنِّى سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ إِنَّ طُولَ صَلاَةِ الرَّجُلِ وَقِصَرَ خُطْبَتِهِ مَئِنَّةٌ مِنْ فِقْهِهِ فَأَطِيلُوا الصَّلاَةَ وَاقْصُرُوا الْخُطْبَةَ.
অর্থ : তাবেয়ি আবু ওয়ায়েল রহ. বলেন, একবার হযরত আম্মার রা. সংক্ষিপ্ত (জুমুআর) খুতবা দিলেন। পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবুল ইয়াকযান! খুতবা বেশি সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে; আরেকটু লম্বা হলে ভালো হতো। তখন তিনি বলেন, আমি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন : নামায লম্বা এবং খুতবা সংক্ষিপ্ত হওয়া ব্যক্তির বিচক্ষণতার পরিচয়। সুতরাং তোমরা নামায লম্বা করো আর খুতবা দাও সংক্ষিপ্ত। [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ২০৪৬, অধ্যায় : باب تَخْفِيفِ الصَّلاَةِ وَالْخُطْبَةِ] 
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : 
كان رسول الله صلى الله عليه و سلم ... و يطيل الصلاة و يقصر الخطبة.
অর্থ : রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায লম্বা করতেন আর খুতবা দিতেন সংক্ষিপ্ত। [শুআবুল ইমান, হাদিস নং- ৮১১৪]

عَنْ عُمَرَ رضي اللَّهُ عنه أَنَّهُ قال طَوِّلُوا الصَّلَاةَ وَقَصِّرُوا الْخُطْبَةَ
অর্থ : হযরত উমর রা. বলেন, তোমরা নামায লম্বা করো আর খুতবা দাও সংক্ষিপ্ত। [বাদায়েউস সানায়ে : খ. ১, পৃ. ২৬৩] 
. 
সুতরাং প্রমাণিত হল, জুমুআর নামায খুতবা থেকে দীর্ঘ হবে। আর এর বিপরীত হচ্ছে মাকরুহ ও খেলাফে সুন্নত। ফিকহ ও ফতোয়ার কিতাবেও বিষয়টি স্পষ্টভাবেই বিধৃত হয়েছে। ফিকহুস সুন্নাহর মধ্যে (খ. ১, পৃ. ১১২) রয়েছে : 
مكروهات الخطبة : ১. التطويل لما روي عن جابر بن سمرة السوائي رضي الله عنه...

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। দেখুন : ইকতিজাউস সিরাতিল মুস্তাকিম, পৃ. ১০২। 
الشرح المختصر على بلوغ المرনামক কিতাবের ৩ নং খ-ের ২৯৫ নম্বর পৃষ্ঠায় আছে : 
كان الأفضل أن يقصر الخطبة بشرط إلا يكون تقصيرا يخل بالمقصود أما الصلاة فيطولها لان الصلاة هي صلة بين العبد وربه والمصلي يناجي ربه عز وجل.

এছাড়াও আরো দেখা যেতে পারে : 
ইমাম নববী রহ. রচিত আল-মাজমু : খ.৪, পৃ.৫২৮;
ইবনে কুদামা লিখিত আল-মুগনী : খ.৩, পৃ.১৭৯।
.
প্রতিটি সুন্নত পালনে আগ্রহী হওয়া দরকার। নিজের বিবেক ও যুক্তির চেয়ে সুন্নাহ কি অগ্রগণ্য নয়?
সুতরাং খুতবাকে ভাষণ বলে যুক্তি দেখিয়ে দীর্ঘ খুতবা দেওয়া কোনোক্রমেই ঠিক নয়। যারা হাদিস হাদিস করে চিল্লায়ে বেড়ায় তাদের নজরে কি এসব হাদিস পড়ে না?
দেড় ঘণ্টা খুতবা হয়, নামায হয় সাত/আট মিনিট!
এটা কি সুন্নত?

তাহিয়্যাতুল অজু ও তাহিয়্যাতুল মসজিদ কেবল জুমুআর দিন!

Mohiuddin Kasemi
তাহিয়্যাতুল অজু হল- যখনই অজু করা হয়, তখন দু’রাকাত নামায পড়া। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, তাহিয়্যাতুল মসজিদ কেবল জুমুআর দিনে পড়তে হয়। ধারণাটি ভুল।
একটি হাদিসে এসেছে : 
عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ تَوَضَّأَ فَأَحْسَنَ وُضُوءَهُ ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ لَا يَسْهُو فِيهِمَا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
-হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ আল-জুহানি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে দুই রাকাত নামায পড়ে, যে নামাযে কোনো ভুল হয় না- তাহলে তার যাপিত জীবনের সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-১৭০৫৪; সুনানে আবি দাউদ, হাদিস নং- ৯০৫।]

মাসআলা : অজু করার পর স্বাভাবিকভাবে অঙ্গ শুকানোর পূর্বেই তাহিয়্যাতুল অজু পড়তে হয়, এটাই হচ্ছে এর সময়।
দুখুলুল মসজিদ/তাহিয়্যাতুল মসজিদ
তাহিয়্যাতুল মসজিদ হল, মসজিদে প্রবেশ করে বসার পূর্বে দু’রাকাত নামায পড়া। দুখুলুল মসজিদ ও তাহিয়্যাতুল মসজিদ- একই নামাযের দুই নাম। কেউ কেউ মনে করেন, কেবল জুমুআর দিলে এ নামায পড়তে হয়। তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। 
সহিহ বুখারি শরিফের একটি হাদিস : 
عَنْ أَبِي قَتَادَةَ السَّلَمِيِّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمْ الْمَسْجِدَ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ أَنْ يَجْلِسَ
الكتاب : الجامع المسند الصحيح المختصر من أمور رسول الله صلى الله عليه وسلم وسننه وأيامه.
-হযরত কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করে তার জন্য উচিত হল, বসার পূর্বে দু’রাকাত নামায পড়া। [বুখারি- ১/৬৩, হাদিস নং- ৪৪৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৬৮৭; সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং- ৩১৬, ইমাম তিরমিযি হাদিসটি বর্ণনা করার পর বলেন : حديث حسن صحيح মুআত্তা ইমাম মালেক, হাদিস নং- ২৭৫]

মাসআলা : যদি অল্পক্ষণের ভিতর বারবার মসজিদে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে একবারই তাহিয়্যাতুল মসজিদ যথেষ্ট।
মাসআলা : যদি কেউ মসজিদের অজুখানায় গিয়ে অজু করে এবং মসজিদে প্রবেশ করে তাহিয়্যাতুল অজু পড়ে, তবে এক্ষেত্রে তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ার প্রয়োজন নেই।
মাসআলা : যদি কেউ মসজিদে প্রবেশ করার পরপরই সুন্নত নামায পড়তে শুরু করে কিংবা জামাতে শরিক হয়ে যায়, তাহলে তার তাহিয়্যাতুল মসজিদ সেই সুন্নত বা ফরজের মধ্যেই আদায় হয়ে যাবে। পৃথকভাবে পড়ার প্রয়োজন নেই।
.
আমার জানার বিষয় হল, জুমুআবারে খুতবার সময় মসজিদে প্রবেশ করলে তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়তে হবে কিনা?
যদি পড়তে হয়, তাহলে খুতবা শুনাও তো ওয়াজিব।
ওয়াজিব রেখে নফল পড়া কি ঠিক?

আচ্ছা ঠিক আছে, যারা খুতবার সময় তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়াকে ওয়াজিব মনে করেন ও আমলও করেন, তারা কি সবসময় মসজিদে প্রবেশ করেই তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়েন?

ইসলামী সংস্কৃতি বনাম ইসলামের নামে প্রচলিত সংস্কৃতি

১.
সংস্কৃতি শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। অারবীতে এটাকে 'ছাক্বাফাহ' এবং 'তাহযীব' বলা হয়। কোনো জাতীর তাহযীব বা ছাক্বাফাহ বলতে ঐ জাতীর সভ্যতা, অাচার-অনুষ্ঠান, লেবাছ পোশাক, অানন্দ-উৎসব সহ অনেক কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।
২.
ইসলামী সংস্কৃতি বলতে ইসলাম কর্তৃক অনুমোদিত সংস্কৃতি ও সভ্যতাই বুঝায়। সাধারণ মানুষের অনেকেই এই ভুল ধারণা করে বসে অাছেন যে ইসলামের অালাদা কোনো সংস্কৃতি নেই। একারণেই তারা বিভিন্ন অাচার-অনুষ্ঠান কিংবা উৎসব পালনের ক্ষেত্রে বৈধ অবৈধের পরোওয়া করেন না। তারা মনে করেন, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ইসলামের কোনো বাধা নিষেধ নেই; যেভাবে ইচ্ছা যেকোনো ধরণের অনুষ্ঠান কিংবা উৎসব পালন করা যাবে। একারণেই পহেলা বৈশাখী বা এধরণের উৎসব পালনের ক্ষেত্রে শরয়ী নিষেধাজ্ঞাকে অনেকেই উড়িয়ে দিতে চান। অথচ একজন মানুষ ঘুম থেকে জাগার পর থেকে অাবার নিদ্রায় যাওয়ার অাগ পর্যন্ত; জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন প্রতিটি মুহুর্তে রয়েছে ইসলামী নির্দেশনা। যখন ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা কোনো উৎসব পালনের বৈধতা ইসলামে নেই। 
৩.
অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো ইসলামী সংস্কৃতির বিষয়টিও বাড়াবাড়ি এবং ছাড়াছাড়ি মুক্ত নয়। উপরে ছাড়াছাড়ির একটি নমুনা দেয়া হলো। বাড়াবাড়িও একেবারে কম নয়। ইসলামী সংস্কৃতির নামে এমন অনেক কিছুই চালিয়ে দেয়া হয় যা কোরঅান-সুন্নাহের অালোকে সমর্থিত নয়। অথবা মূল বিষয়টি সমর্থনযোগ্য হলেও অানুসাঙ্গিক অনেক বিষয় জুড়ে দেয়া হয় যা কোরঅান-সুন্নাহের অালোকে অাপত্তিজনক।
৪.
কাব্য চর্চা কিংবা সংঙ্গীত চর্চার কথাই ধরুন, ইসলামী সংস্কৃতির নামে যারা এগুলোর চর্চা করেন তাদের দাবী অপসংস্কৃতির মোকাবেলায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রয়োজন। কিন্তু তারা যা করছেন এগুলো কি ইসলামী সংস্কৃতি? এগুলো কি ইসলাম সমর্থন করে?

দেখুন, মুহিব খান লিখেছেন-
‘‘উল্টে ফেল সখের গদি পানের বাটায় আগুন দাও
কুল বালিশে হেলান দেয়া মহিষগুলোর পেঠ কমাও’’

কোরঅানে কারীমের সূরা শুঅারা'র ২২৪-২২৭ নং অায়াত এবং সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদীস-
‘‘পুঁজ দ্বারা পেট ভর্তি করা কবিতা দ্বারা পেঠ ভর্তি করার চাইতে উত্তম।’’

আয়াতের তাফসীর এবং হাদীসের ব্যাখ্যাকে সামনে রেখে যেকোনো বিজ্ঞ আলেমই নির্ধিদ্বায় বলতে পারবেন যে, মুহিব খানের কবিতাটি শরীয়ত সমর্থিত নয়।
না এখানেই শেষ নয়। সঙ্গীতের সাথে মিউজিক এবং বাজনা যুক্ত করেও যখন ইসলামী সঙ্গীত দাবী করা, ইসলামী শরীয়তের সাথে তামাশা করা ছাড়া আর কিইবা হতে পারে।
বর্তমানে যারা কাব্য চর্চা করেন তাদের কবিতা এবং বাস্তব জীবন দেখে বারবার মনে পড়ে কবিদের সম্পর্কে আল্লাহর বানী-
"বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুস্মরণ করে। তুমি কি দেখ না যে, তারা প্রতি ময়দানেই উদভ্রান্ত হয়ে ফিরে। এবং এমন কথা বলে, যা তারা করে না।"

এরপরও যখন তাদেরকে বলা হয় যুগের ইকবাল, আল্লামাতুয যামান বড্ড হাসি পায়।
নি:সন্দেহে সাহাবায়ে কেরাম কাব্য চর্চা করেছেন এমনকি আল্লাহর রাসূলের সামনে মসজিদে নববীতে তা পাঠও করেছেন। কা’ব বিন মালেক, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা, হাসসান বিন ছাবিত তাদের অন্যতম। খোদ আল্লাহর রাসূল মাঝেমধ্যে কবিতার অংশ বিশেষ পাঠ করেছেন।
তাদের কবিতাগুলো এবং কবিতা পাঠের আসরগুলো কি আজকের মতো ছিল? তাদের কবিতায় ছিল নবীজীর প্রশংসা, আল্লাহর প্রশংসা, কাফেরদের জবাব ইত্যাদি। তারা সেগুলো জীহাদে কিংবা সফরে পাঠ করতেন। কখনো মসজিদে নববীতে নবীজীর পক্ষ থেকে কাফেরদের জবাবী কবিতা পাঠ করা হতো তাদের কবিতার জবাব দেয়া হতো। এধরণের কাব্যচর্চা শুধু বৈধই নয়; অনেক সওয়াবের কাজ।
কিন্তু আজ ইসলামী সংস্কৃতির নামে যে কাব্য এবং সঙ্গীত চর্চা হয় সেগুলোর কোনোটি শুধু নামেই ইসলামী। তবে কিছু কিছু হামদ এবং না’তে আল্লাহ এবং তার রাসূলের বেশ চমৎকার প্রশংসা করা হয়েছে। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। যারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের মহব্বত নিয়ে এধরণের হামদ এবং না’ত তৈরী করবে এবং পাঠ করবে নি:সন্দেহে সওয়াব পাবে। তেমনিভাবে কোনো কাফেরদের জবাবী কবিতা বা এমন কবিতা যাতে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলা হয়েছে এগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয়।
তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়। নবীজীর যুগের কাব্যচর্চা বিনোদনমূলক ছিল না। অর্থাৎ ঢাকঢোল পিঠিয়ে সবাইকে আহব্বান করে বিনোদনের জন্য কোনো সঙ্গীত কিংবা কাব্যানুষ্ঠান করা হয়েছে এরকম একটি নজীরও নেই। বরং তারা হয়তো জীহাদে কিংবা সফরে কবিতা পাঠ করতেন কখনো মসজিদে কাফেরদের জবাবী অথবা আল্লাহ এবং নবীজীর প্রশংসামূলক কবিতা পাঠ করতেন। আজকের মতো শুধু বিনোদনের জন্য কোনো কবিতানুষ্ঠান করেছেন এর একটি নজীরও কেউ দেখাতে পারবে না।
ইসলামে বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই, বিষয়টি এমন নয়। সুযোগ রয়েছে তবে এগুলোরও কিছু মূলনীতি রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম এবং নবীজীর বিনোদন এবং রসিকতা দেখুন কেমন ছিল। সবগুলো ছিল ইত্তিফাক্বী অর্থাৎ ঘটনাক্রমে ঘটেছে। রসিকতা এবং বিনোদনের জন্য কোনো অনুষ্ঠান হয়েছে এর একটি নজীরও কেউ দেখাতে পারবেন না। একটি দ্বীনী মাহফিল হবে সেখানে হামদ, না’ত পাঠ করা কিংবা প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানে পাঠ করা এক কথা আর বিনোদনের জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ভিন্ন কথা। বিনোদনের জন্য বিনোদন একটি অনর্থক কাজ আর অনর্থক কোনো কাজই শরীয়ত কতৃক সমর্থিত নয়।
সুতরাং নবীজীর যুগের কাব্যচর্চা এবং কৌতুক-রসিকতাকে দলীল বানিয়ে ইচ্ছামতো ইসলামের নামে যেকোনো বিনোদন আনুষ্ঠানের আয়োজন করার সুযোগ নেই।
ইসলামী সংস্কৃতির নামে আজ অনেক কিছু করা হয়, যা ইসলাম সমর্থন করে না। কথা অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল তাই একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েই আলোচনার ইতি টানবো।
একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এক ভাই ইসলামী সংস্কৃতির আলোচনার এক পর্যায়ে অভিনয়ের প্রসঙ্গ টেনে যখন বললেন, জিবরীল আলাইহিস সালাম দিহয়াতুল কালবীর আকৃতিতে অভিনয় করেছিলেন তখন সেই মজলিস থেকে উঠে আসা ছাড়া আর উপায় রইল না।
সবকিছু চালাও ইসলামের নামে। ইসলামী মদ! ইসলামী জোয়ার আসর! ইসলামী কনসার্ট!
২১/০৭৭২০১৬ ইং

আল্লাহ কি সর্বত্র বিরাজমান?

Mohiuddin Kasemi

রাসুলে কারিম সা. এর ওপর দু প্রকার অহী নাযিল হয়েছে। অহীয়ে মাতলু ও গায়রে মাতলু। মাতলু হচ্ছে কুরআন। আর গায়রে মাতলু হচ্ছে হাদিস। কুরআনের কোনো আয়াত কিংবা কোনো হাদিস ব্যাখ্যা করতে হলে এমন ব্যাখ্যা করতে হবে, যা অন্য কোনো আয়াত বা হাদিসের পরিপন্থী না হয়। কারণ, তখন একটিকে গ্রহণ করা হলেও অন্যটি পরিত্যাজ্য হয়ে যাবে। পৃথিবীর যে কোনো সংবিধান ব্যাখ্যারও নীতি এটি। সংবিধানের কোনো ধারার ব্যাখ্যা অন্য ধারার বিপরীত হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং অতি অবশ্যই ব্যাখ্যাটি অন্য সকল ধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। 
.
কুরআন ও হাদিসের কিছু বিষয় সত্যিই দুর্বোধ্য ও জটিল। মানুষের বিবেক ও জ্ঞান দিয়ে সেগুলোর স্বরূপ উদঘাটন করতে পারে না। এ জটিল বিষয়গুলোর সমাধান বের করা মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য না। মানুষের প্রতি আল্লাহর বিধি-নিষেধ মেনে চলাই প্রধান কর্তব্য। এবং আল্লাহ মানুষকে যতটুকু অহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন, ততটুকুই জানতে পারে; এর বাইরে তারা কিছুই জানে না। সেসব জটিল বিষয়গুলোর একটি হল আল্লাহর সত্তার পরিচয় ও তাঁর অবস্থান। 
কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন : 
يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا
অর্থ : আল্লাহ জানেন যা কিছু তাদের সামনে ও পশ্চাতে রয়েছে এবং তারা আল্লাহকে জ্ঞান দ্বারা আয়ত্ব করতে পারে না। (সূরা তোয়া হা : ১১০) 
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে : 
يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ
অর্থ : তাদের সামনে ও পেছনে যাকিছু রয়েছে সবই আল্লাহ জানেন। আল্লাহর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনোকিছুই পরিবেষ্টন করতে পারে না; কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। (সূরা বাকারা : ২৫৫) 
অন্যত্র পরিষ্কার বলা হয়েছে : 
وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا
অর্থ : তোমাদেরকে অতি সামান্য জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। (সূরা বনি ইসরাইল : ৮৫) 
.
কুরআনে কারিম ও হাদিসে দু ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। কিছু বক্তব্য দ্বারা বোঝা যায় আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। আবার কিছু বক্তব্য প্রমাণ করে তিনি আরশে সমাসীন। বাহ্যত দু বক্তব্যের মাঝে বিরোধ পরিলক্ষিত হলেও বাস্তবে কোনো বিরোধ নেই। দুনো বক্তব্যই সঠিক ও যথার্থ। উভয় বক্তব্যের প্রতি ঈমান আনা আবশ্যক। 
আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমানের মানে হল, তিনি সবকিছুই দেখছেন, শুনছেন। কুল মাখলুকাত তাঁর কতৃত্বে ও করায়ত্বে। কোনোকিছুই তাঁর ক্ষমতা ও রাজত্বের বাইরে নয়। আর আরশে তিনি আছেন সত্তাগতভাবে। যেভাবে তিনি আরশে আছেন সেভাবে তিনি আমাদের কাছে নেই। তাহলে আরশে অধিষ্ঠিত ও সমাসীন হওয়ার আয়াতগুলোর কোনো যথার্থতা থাকে না। তবে আরশে তাঁর অধিষ্ঠিত ও সমাসীন হওয়ার প্রকৃতি, ধরন ও পদ্ধতি আমাদের জানা নেই। 
এ বিষয়টিই নিকট অতীতের বিখ্যাত ফকিহ আল্লামা আবদুল হাইল লখনোবি রহ. এভাবে বলেন : 
نعتقد بانه علي العرش مستو عليه استواء منزها عن التمكن والاستقرار وانه فوق العرش و مع ذلك هو قريب من كل موجود وهو اقرب من حبل الوريد ولا يماثل قربه قرب الاجسام. 
অর্থ : আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ তাআলা আরশে অধিষ্ঠিত আছেন; তবে স্থান গ্রহণ করা ও স্থায়িত্ব হতে পবিত্র তিনি। তিনি আরশে থাকা সত্ত্বে প্রত্যেক সৃষ্টির নিকটবর্তী। তিনি গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিত নিকটবর্তী। তবে এ নিকটবর্তী হওয়া কোনো বস্তুর সাথে সাদৃশ্য রাখে না। 
তিরমিযি শরিফের একটি হাদিস এসেছে : 
لَوْ أَنَّكُمْ دَلَّيْتُمْ بِحَبْلٍ إِلَى الْأَرْض السُّفْلَى لَهَبَطَ عَلَى اللَّه , ثُمَّ قَرَأَ { هُوَ الْأَوَّل وَالْآخِر وَالظَّاهِر وَالْبَاطِن وَهُوَ بِكُلِّ شَيْء عَلِيم } .
অর্থ : তোমরা যদি রশিতে বেঁধে কাউকে সপ্তম জমিনে ফেলে দাও, তাহলে সে আল্লাহর ওপর গিয়ে পড়বে। এরপর রাসুল সা. এ আয়াত পড়লেন : ‘তিনিই সর্বপ্রথম, তিনিই সর্বশেষ; তিনিই প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য। সববিষয়ে তিনি সম্যক অবগত। (তিরমিযি, হাদিস নং- ৩২৯৮) 
এ হাদিস বর্ণনার পর ইমাম তিরমিযি রহ. বলেন : 
إنما هبط على علم الله وقدرته وسلطانه. علم الله وقدرته وسلطانه في كل مكان وهو على العرش كما وصف في كتابه. 
অর্থ : ওলামায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যায় বলেন, ওই ব্যক্তি আল্লাহর ইলম, কুদরত ও রাজত্বে গিয়ে পড়বে। কারণ, আল্লাহর ইলম, কুদরত ও রাজত্ব প্রত্যেক স্থানে রয়েছে। যদিও তিনি আরশে সমাসীন; যেমনটি কুরআনে আল্লাহ নিজেই বর্ণনা দিয়েছেন। (মাজমুআয়ে ফাতাওয়া মাওলানা আবদুল হাই : পৃ. ৫২-৫৩, মাকতাবা থানবী দেওবন্দ)

আল্লাহ মানুষের সঙ্গে আছেন, মানে এই না যে, তিনি যেভাবে আরশে সমাসীন সেভাবে সর্বত্র আছেন। মানুষের সঙ্গে থাকার মতলব হল, সবকিছুই তিনি দেখছেন, সাহায্য করছেন। একটি আয়াতে বলা হয়েছে :
قَالَ لَا تَخَافَا إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
অর্থ : আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় করো না; অবশ্যই আমি তোমাদের সঙ্গে রয়েছি, আমি শুনছি ও দেখছি। (সূরা তোয়া হা : ৪৬)

বিষয়টি নিয়ে আল্লাম লখনোবি রহ. নীতিদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। অনেক আলেম এ বিষয়ে স্বতন্ত্র কিতাবও লিখেছেন। যাই হোক, সারসংক্ষেপ হিসেবে উপরের কথাগুলো মনে রাখলেই কোনোরূপ ঝামেলায় পড়তে হবে না।
والله اعلم

পাঁচকল্লি সমাচার

মুফতী মুহিউদ্দীন কাসেমী

১৯৯৮ সন। স্মরণকালের ভয়াবহ স্থায়ী বন্যার বছর। আমি তাইসির [৫ম শ্রেণী] পড়ি। জামিআ আনওয়ারিয়া বরমী, শ্রীপুর, গাজীপুরে। তখন সাদা পাঁচকল্লি টুপি পরতাম। যাতে কোনো কাজ থাকত না।হঠাৎ একদিন একবন্ধু কাজকরা একটি পাঁচকল্লি হাদিয়া দিল; কী যে খুশি হয়েছিলাম বলে বুঝাতে পারব না। ১৯৯৯ সনে ঢাকার বনানীতে অবস্থিত একটি মাদরাসায় মিজান জামাতে দাখেলা নিলাম। ২০০৫ সনে মেশকাতে বেফাক পরীক্ষা দিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দে গিয়ে দাওরা ও আদব পড়লাম; ২০০৬-২০০৭ সনে। ইফতা পড়তে চেন্নাই এক্সপ্রেসে নয়াদিল্লি থেকে তামিলনাডুর সায়লামে গেলাম। ২০০৮।
মাদরাসা মাজাহিরুল উলুম সায়লামের প্রতিষ্ঠাতা মাও. শফিক খান কাসেমী রহ.। যিনি হযরত শায়খুল হাদিস মাও. যাকারিয়া রহ. এর খলিফা। হযরতের একাধিক পুত্র মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহি রহ. এর খলিফা। সে মাদরাসায় আাকবিরে উম্মত এবং পীর-মাশায়েখ যাতায়াত করেন। মাও. ইবরাহিম আফ্রিকিও সেখানে যান। সায়লাম শহরটি বেঙ্গালুর ও চেন্নাইয়ের মাঝে অবস্থিত একটি মনোরম শহর। 
সেখানের আদব ও ইফতা বিভাগের উস্তাদ মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহি রহ. এর খলিফা মাও. আবুল কালাম দা.বা. একদিন ক্লাসে বলেন : হযরত থানবী রহ. এর খলিফা গঞ্জেমুরাদাবাদী রহ. দরজির দোকানে জামা সেলাই করতে দেন। দরজি অতিরিক্ত টুকরো কাপড় দিয়ে একটি টুপি সেলাই করে দেয়। ঘটনাচক্রে টুকরো কাপড়ের সংখ্যা ছিল পাঁচটি। তিনি ওই টুপি মাথায় দিয়ে হযরত থানবী রহ. এর মজলিসে যান। তিনি টুপিটি অনেক পছন্দ করেন। 
মাও. আবুল কালাম দা.বা. বলেন : হযরত থানবী রহ. পাঁচকল্লি টুপি মাথায় দিয়েছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই। মাও. আবুল কালাম উপরের ঘটনার সনদ বয়ান করেছিলেন, এখন আমার মনে নেই।
বনানীতে পড়াকালীন পাঁচকল্লি ‘ইউনিরফম’ (?) ছিল। পাঁচকল্লির ফজিলত ও মাহাত্ম্য শুনতে শুনতে এটাকেই সুন্নত মনে করতাম। অন্য টুপি দেখলে মনের মধ্যে খচখচ করত। সমস্যা হলো দেওবন্দে গিয়ে পাঁচকল্লি টুপি আর কিনতে পাওয়া যায় না। দেখলাম, একেকজনে একেক টুপি পরছেন। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। এতদিন কী শুনলাম! দেওবন্দেও গায়রে সুন্নতের উপর আল হয়। এমনকি দেওবন্দে হারদুই হযরত রহ. এর দুজন খলিফার মাথায়ও পাঁচকল্লি-ভিন্ন অন্য টুপি দেখলাম। 
দেওবন্দ থেকে গোমরাহ (?) হয়ে দেশে ফিরে কাঙ্ক্ষিত ও লালিত স্বপ্ন তাদরিসে যোগ দিলাম। 
পাঁচকল্লির পাশাপাশি জালি টুপিও সঙ্গে করে নিয়ে আসলাম। ভুলক্রমে জালি টুপি মাথায় দিয়ে আমার উস্তাদের সামনে গেলে তিনি বললেন, পাঁচকল্লি কই? পাঁচকল্লিকে মনে স্থান দিতে পার নাই? আরও অনেক কিছু। 
তখন আমার মনে পড়ল, উস্তাদগণ পাঁচকল্লিকে ইউনিফরম বলতেন মুখে মুখে, আর মনে মনে পাঁচকল্লিকেই সুন্নত মনে করতেন। তা নাহলে আমি তো এখন ওই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র না, আমাকে ইউনিফরম স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন কেন?
উপরন্তু ইউনিফরম কেবল মাথায় হয়, জামা ও পায়জামায় হয় না? 
একজনে সাদা, আরেকজনে কালো, কত যে কালার জামা পরে ছাত্ররা ক্লাস করে। একজনে লুঙ্গি আরেকজনে জুব্বা, আরেকজনে পায়জামা পরে ক্লাস করছে। উস্তাদগণও তাই। 
ঢাকার একটি মাদরাসার মিটিং হচ্ছে। আমি সেখানের উস্তাদ। ওই মাদরাসার ইউনিফরম (?) হচ্ছে পাঁচকল্লি। দাখেলা ফরমে পাঁচকল্লি বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা আছে। ঘটনাচক্রে আমি জালি টুপি পরে বসেছি। আরো দুইজন জালি পরা ছিল। মিটিং শুরুর পরপরই একজন উস্তাদ বলল, উস্তাদরা যদি মাদরাসার কানুন না মানে তাহলে ছাত্রদেরকে কীভাবে শাসন করব? মুহতামিম বললেন, পরিষ্কার করে বলুন। সে বলল, অনেক উস্তাদ পাঁচকল্লি পরে না। ছাত্রদেরকে বললে তারা উত্তর দেয় অমুক উস্তাদ তো পাঁচকল্লি পরে না। অথচ ভরতির ফরমে পাঁচকল্লির কথা আছে। 
আমি শুধু বলেছিলাম, ভরতির ফরম দিয়ে আমি ভরতি হইনি। সে চিল্লায়ে উঠল, পাঁচকল্লি না পরলে বুযুরগ বুযুরগ লাগে না। 
সঙ্গে সঙ্গে কড়া প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, দেওবন্দের আমার উস্তাদগণ কেউ (অধিকাংশ) পাঁচকল্লি পরে না, তাহলে তারা মুত্তাকি না? বিশ্বের কয়জন আলেম পাঁচকল্লি পরে?
এভাবে আমরা পাঁচকল্লিকে সাধারণ জায়েযের স্তর থেকে সুন্নতের স্তরে নিয়ে যাচ্ছি। পাঁচকল্লি পরা সুন্নত না, টুপি পরা সুন্নত। 
পাঁচকল্লিতে ইসলামের পাঁচকি স্তম্ভ রয়েছে।আমি বলব, আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই; তাই এককল্লি টুপি পরা দরকার।কালেমার দুটি অংশ হচ্ছে আল্লাহ ও রাসুল; তাই টুপি হবে দুই কল্লি।ঈমানের মৌলিক শাখা তিনটি, তাওহীদ রিসালাত ও আখিরাত; তাই তিনকল্লি টুপি হওয়া বাঞ্ছনীয়।শরিয়তের দলিল চারটি, কুরআন হাদিস ইজমা ও কিয়াস; তাই টুপি হবে চারকল্লি।ঈমানের সাতাত্তরটির অধিক শাখা রয়েছে; তাই সাতাত্তরকল্লি টুপি চাই।এভাবে আঠার হাজার মাখলুকাতের স্মরণে আঠার হাজারকল্লি টুপির কথা বললেও অযৌক্তিক হবে না। আমি পাঁচকল্লিকে অবজ্ঞা করার উদ্দেশ্যে এসব বলছি না। যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের কাজটি যে অযৌক্তিক সেটাই বুঝাতে চাচ্ছি। পাঁচকল্লির প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে, অতিরিক্ত টান নেই। উম্মতের হক্কানী ওলামায়ে কেরাম ও সুলাহায়ে ইজাম যে টুপি পরেন তা-ই সুন্নত হবে। আবারও বলি, বারবারই বলব, ইউনিফরম কেবল টুপিতেই! এমন ইউনিফরম পৃথিবীর কোথাও নেই।


সালামের ক্ষেত্রে কিছু ভুল ও কুসংস্কারের চিত্র

Mohiuddin Kasemi

১. অশুদ্ধ উচ্চারণে সালাম দেওয়া 
এটি মারাত্মক ভুল কাজ। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ হচ্ছে পূর্ণ সালাম। শুধু আসসালামু আলাইকুম বললেও চলবে। তবে উচ্চারণে ভুল করা যাবে না। যেমন অনেকে স্লামালেকুম বলে। এ ধরনের ভুল উচ্চারণ হতে বিরত থাকা আবশ্যক।

২. বড় বা বয়স্ক মানুষের সালাম না দেওয়া 
এটিও ভুল প্রচলন। বড় বা বয়স্ক মানুষ ছোটদের সালাম দিতে কোনো বাধা নেই। তদ্রƒপ শিক্ষক ছাত্রদেরকে এবং পিতা-মাতা সন্তানদেরকে সালাম দিবে। আগে সালামকারী বেশি সওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকে।

৩. অপরিচিত কাউকে সালাম না দেওয়া 
পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। তাই পরিচিত ও মুখ চিনে সালাম দেওয়া গর্হিত ও নিন্দিত কাজ। হাদিসের লঙ্ঘন হবে। 
৪. সালাম দেওয়ার সময় মাথা ও বুক ঝুঁকানো
সালাম দেওয়ার সময় মাথা ও বুক ঝুঁকানো নিষেধ। অনেকে পদস্থ বা বড় কোনো ব্যক্তিকে সালাম দেওয়ার সময় এমন করে থাকে। হাদিসে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়।

৫. সালামের উত্তর দিয়ে আবার সালাম
আপনাকে কেউ সালাম দিল। আপনি উত্তর দেওয়ার পর ওই সালামকারীকে আবার সালাম দিলেন। অনেকে এ কাজটি অজ্ঞতাবশত করে থাকে। উত্তম হল, কারো সালামের অপেক্ষা না করে নিজে আগে সালাম দেওয়া। কিন্তু কেউ আগে সালাম দিয়ে ফেললে তার সালামের উত্তর দেওয়াই নিয়ম। তাকে আবার সালাম দিতে হবে না।

৬. সালামের উত্তর না দিয়ে আবার সালাম 
সালাম পাওয়ার পর উত্তর দেওয়াই বিধান। কিন্তু অনেক মানুষকে সালাম দেওয়ার পর উত্তর না দিয়ে সালামদাতাকে আবার সালাম দেয়। এমনটি ঠিক নয়। কারণ, বিধান হল দুজনের একজন সালাম দিবে; আর অপরজন সালামের উত্তর দিবে।

৭. সালাম দেওয়ার পর সালাম দিয়েছি বলা
কাউকে সালাম দেওয়ার পর সালাম না শুনলে বা উত্তর না-দিলে আমরা বলি, ‘আপনাকে সালাম দিয়েছি’। এভাবে বলা ঠিক নয়। তাকে আবার পূর্ণ সালাম দেওয়াই বিধেয়।

৮. সালাম পাঠানোর পদ্ধতি 
কারো কাছে সালাম পাঠানোর দরকার হলে আমরা বলি, অমুককে গিয়ে আমার সালাম দিবেন/বলবেন। এভাবে বলা ঠিক নয়। নিয়ম হল এভাবে বলা, অমুককে আমার পক্ষ থেকে আসসালামু আলাইকুম... বলবেন। তদ্রূ প সালাম পৌঁছানোর পরও ‘অমুকে আপনাকে সালাম দিয়েছে’ এ রকম না বলে এভাবে বলা উচিত, অমুক আপনাকে আসসালামু আলাইকুম... বলেছে। 
এক্ষেত্রে সালামের উত্তরদাতাও কেবল প্রেরককে উত্তর দিবে না। বরং প্রেরক ও বাহক উভয়কে দুআয় শরিক করবে। এভাবে উত্তর দিবে, ওয়া আলাইকা ওয়া আলাইহিস সালাম।

৯. ফোনে বা সাক্ষাতে সালামের আগে হ্যালো বা অন্যকিছু বলা 
ফোন বা মোবাইলে সালাম দেওয়ার আগে হ্যালো বা অন্য কোনো কথা বলা ঠিক নয়। আগে সালাম দিবে তারপর অন্য কথা বলবে। হ্যালো বলার দরকার হলে সালাম দেওয়ার পর বলবে। ফোন ছাড়া সাক্ষাতের বেলায়ও কথাবার্তার আগে সালাম দেওয়াই সুন্নত। কেননা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
السَّلَامُ قَبْلَ الْكَلَامِ
অর্থ : কথাবার্তা বলার আগে সালাম দিতে হয়। (তিরমিযি, হাদিস নং- ২৬৯৯)

১০. মুসাফাহার পর বুকে হাত রাখা 
মুসাফাহা করার পর বুকে হাত রাখতে দেখা যায়-- এর কোনো ভিত্তি নেই। হাত মেলানোর পর হাত ছেড়ে দিবে। বুকে হাত রাখা সুন্নত মনে করলে বিদআত হবে। অথবা হাত মেলানোর পর নিজের হাতে চুমু খায় অনেকে-- এটাও বিদআত।

১১. অনুষ্ঠানশেষে বা বিয়ের আকদ হওয়ার পর সালাম
অনেক জায়গায় দেখা গেছে, কোনো অনুষ্ঠান-- বিশেষত দোয়া বা এ ধরনের কোনো মজলিস শেষ হওয়ার পর সালাম দেয়। তদ্রƒপ বিয়ের আকদ হওয়ার পর বর উপস্থিত সবাইকে সালাম দেয়। বর সালাম না দিতে চাইলে বা ভুলে গেলে অন্যরা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সালাম দেও। না দিলে খারাপ এবং বেয়াদব মনে করা হয়। এসবই কুসংস্কার ও ভুল প্রচলন। সালাম হবে সাক্ষাতের সময়। সুতরাং কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর কারো সাথে দেখা হলে তাকে সালাম করবে। কিন্তু অনুষ্ঠানশেষে সালামের এ নিয়ম কোত্থেকে এল? এসব বর্জন করা উচিত।

বুধবার, ২০ জুলাই, ২০১৬

......পোশাক সম্পর্কে নির্দেশনা ........

Md Harun
(১)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ঐসব পুরুষদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন যারা মহিলাদের ন্যায় পোশাক পরিধান করে এবং ঐসব মহিলাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন যারা পুরষদের ন্যায় পোশাক পরিধান করে।"(আবু দাউদ ২য় খঃ৫৬৬পৃঃ)


(২)
"যে ব্যক্তি দুনিয়াতে প্রসিদ্ধি লাভের পোশাক পরিধান করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননার পোশাক পরিধান করাবেন।"(আবু দাউদ২য় খঃ৫৫৮পৃঃ)

(৩)
"পায়জামা বা লুঙ্গি দ্বারা টাখনুদ্বয়ের যে অংশ আবৃত থাকবে, তা জাহান্নামে যাবে।"(বুখারী ২য় খঃ৮৬)

(৪)
আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ও রেশমী কাপড় ব্যবাহার হারাম করা হয়েছে এবং মহিলাদের জন্য তা হালাল করা হয়েছে।"(তিরমিযী ২য় খঃ৩০২পৃঃ)

(৫)
তোমরা সাদা রঙের পোশাক পরিধান কর। কেননা এটি অধিক পবিত্র ও পরিস্কার। আর সাদা কাপড়েই তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের কাফন দাও।"(শামায়েলে তিরমিজি পৃষ্ঠা ৫)

(৬)
"যে ব্যক্তি যেই জাতি বা সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদের দলভুক্ত হিসেব গন্য হবে। অর্থাৎ পরকালে তাদের সাথে তার হাশর হবে।"(আবু দাউদ ২য় খঃ৫৫৯পৃঃ)

নবীজির কাছে আমাদের ঋণ আছে-(নবিজী-হুমায়ূন আহমেদ)


অসমাপ্ত এই মহান কাজটার কিছু স্মৃতির অংশ আপনিও হয়ে থাকুন। নবী প্রেমের কারণে যদি আপনি আপ্লুত হন তাহলে আশা করাই যায় যে শেষ বিচারে সুপারিশ হবে। 
হুমায়ুন মরহুমের মনে জেগেছিল নবী প্রেম। লিখেছেন অসমাপ্ত রচনা। এই ধারা বাংলার অন্যান্য মুসলিম লেখকগণও অনুসরণ করতে পারেন। আশাকরি। 
----------------------------------------------------------------------------
তখন মধ্যাহ্ন।
আকাশে গনগনে সূর্য। পায়ের নিচের বালি তেতে আছে। ঘাসের তৈরি ভারী স্যান্ডেল ভেদ করে উত্তাপ পায়ে লাগছে। তাঁবুর ভেতর থেকে বের হওয়ার জন্যে সময়টা ভালো না। আউজ তাঁবু থেকে বের হয়েছে। তাকে অস্থির লাগছে। তার ডান হাতে চারটা খেজুর। সে খেজুর হাতবদল করছে। কখনো ডান হাতে কখনো বাম হাতে।
আউজ মনের অস্থিরতা কমানোর জন্যে দেবতা হাবলকে স্মরণ করল। হাবল কা’বা শরিফে রাখা এক দেবতা- যার চেহারা মানুষের মতো। একটা হাত ভেঙে গিয়েছিল বলে কা’বা ঘরের রক্ষক কোরেশরা সেই হাত সোনা দিয়ে বানিয়ে দিয়েছে। দেবতা হাবলের কথা মনে হলেই সোনার তৈরি হাত চোখে চকমক করে। দেবতা হাবলকে স্মরণ করায় তার লাভ হলো। মনের অস্থিরতা কিছুটা কমল। সে ডাকল, শামা শামা। তাঁবুর
ভেতর থেকে শামা বের হয়ে এল। শামা আউজের একমাত্র কন্যা। বয়স ছয়। তার মুখ গোলাকার। চুল তামাটে। মেয়েটি তার বাবাকে অসম্ভব পছন্দ করে। বাবা একবার তার নাম ধরে ডাকলেই সে ঝাঁপ দিয়ে এসে তার বাবার গায়ে পড়বে। শামার মা অনেক বকাঝকা করেও মেয়ের এই অভ্যাস দূর করতে পারেন নি। আজও নিয়মের ব্যতিক্রম হলো না। শামা এসে ঝাঁপ দিয়ে বাবার গায়ে পড়ল। সে হাঁটতে পারছে না। তার বাঁ পায়ে খেজুরের কাঁটা ফুটেছে। পা ফুলে আছে। রাতে সামান্য জ্বরও এসেছে। শামা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাবার কাছে আসতেই তার বাবা এক হাত বাড়িয়ে তাকে ধরল। এক হাতে বিচিত্র ভঙ্গিতে শূন্যে ঝুলিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল। শামা খিলখিল করে হাসছে। তার বাবা যেভাবে তাকে কোলে তোলেন অন্য কোনো বাবা তা পারেন না। আউজ বলল, মা খেজুর খাও। শামা একটা খেজুর মুখে নিল। সাধারণ খেজুর এটা না। যেমন মিষ্টি স্বাদ তেমনই গন্ধ। এই খেজুরের নাম মরিয়ম। আউজ মেয়েকে ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। রওনা হয়েছে উত্তর দিকে। শামার খুব মজা লাগছে। কাজকর্ম না থাকলে বাবা তাকে ঘাড়ে নিয়ে বেড়াতে বের হন। তবে এমন কড়া রোদে কখনো না। 
আউজ বলল, রোদে কষ্ট হচ্ছেরে মা ?
শামা বলল, না। তার কষ্ট হচ্ছিল। সে না বলল শুধু বাবাকে খুশি করার জন্যে।
-বাবা!
-হুঁ।
-আমরা কোথায় যাচ্ছি ?
-তোমাকে অদ্ভুত একটা জিনিস দেখাব।
-সেটা কী ?
-আগে বললে তো মজা থাকবে না।
-তাও ঠিক। বাবা, অদ্ভুত জিনিসটা শুধু আমি একা দেখব ? আমার মা দেখবে না ?
-বড়রা এই জিনিস দেখে মজা পায় না। আউজ মেয়েকে ঘাড় থেকে নামাল। সে সামান্য ক্লান্ত। তার কাছে আজ শামাকে অন্যদিনের চেয়েও ভারী লাগছে। পিতা এবং কন্যা একটা গর্তের পাশে এসে দাঁড়াল। কুয়ার মতো গর্ত, তবে তত গভীর না। আউজ বলল, অদ্ভুত জিনিসটা এই গর্তের ভেতর আছে। দেখো ভালো করে। শামা আগ্রহ এবং উত্তেজিত হয়ে দেখছে। আউজ মেয়ের পিঠে হাত রাখল। তার ইচ্ছা করছে না মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলতে। কিন্তু তাকে ফেলতে হবে। তাদের গোত্র বনি হাকসা আরবের অতি উচ্চ গোত্রের একটি। এই গোত্র মেয়েশিশু রাখে না। তাদের গোত্রের মেয়েদের অন্য গোত্রের পুরুষ বিবাহ করবে ? এত অসম্মান ? ছোট্ট শামা বলল, বাবা, কিছু তো দেখি না। আউজ চোখ বন্ধ করে দেবতা হাবলের কাছে মানসিক শক্তির প্রার্থনা করে শামার পিঠে ধাক্কা দিল। মেয়েটা ‘বাবা’ ‘বাবা’ করে চিৎকার করছে। তার চিৎকারের শব্দ মাথার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। আউজকে দ্রুত কাজ সারতে হবে। গর্তে বালি ফেলতে হবে। দেরি করা যাবে না। একমুহূর্ত দেরি করা যাবে না। শামা ছোট্ট হাত বাড়িয়ে ভীত গলায় বলছে, বাবা, ভয় পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি। আউজ পা দিয়ে বালির একটা স্তূপ ফেলল। শামা আতঙ্কিত গলায় ডাকল, মা! মা গো! তখন আউজ মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, উঠে আসো। আউজ মাথা নিচু করে তাঁবুর দিকে ফিরে চলেছে। তার মাথায় পা ঝুলিয়ে আতঙ্কিত মুখ করে ছোট্ট শামা বসে আছে। আউজ জানে সে মস্ত বড় ভুল করেছে। গোত্রের নিয়ম ভঙ্গ করেছে। তাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। তাকে অবশ্যই গোত্র থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। এই অকরুণ মরুভূমিতে সে শুধুমাত্র তার স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে বাঁচতে পারবে না। জীবনসংগ্রামে টিকে থাকতে হলে তাকে গোত্রের সাহায্য নিতেই হবে। গোত্র টিকে থাকলে সে টিকবে। বেঁচে থাকার সংগ্রামের জন্যে গোত্রকে সাহায্য করতেই হবে। গোত্র বড় করতে হবে। পুরুষশিশুরা গোত্রকে বড় করবে। একসময় যুদ্ধ করবে। মেয়েশিশুরা কিছুই করবে না। গোত্রের জন্যে অসম্মান নিয়ে আসবে। তাদের নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে যাওয়াও কষ্টকর। আউজ আবার গর্তের দিকে ফিরে যাচ্ছে। ছোট্ট শামা ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না মরুভূমিতে দিকচিহ্ন বলে কিছু নেই। সবই এক। আজ থেকে সতেরো শ’ বছর আগে আরব পেনিসুয়েলার এটি অতি সাধারণ একটি চিত্র। রুক্ষ কঠিন মরুভূমির অতি সাধারণ নাটকীয়তাবিহীন ঘটনা। যেখানে বেঁচে থাকাই অসম্ভব ব্যাপার সেখানে মৃত্যু অতি তুচ্ছ বিষয়।
আরব পেনিসুয়েলা। বিশাল মরুভূমি। যেন আফ্রিকার সাহারা। পশ্চিমে লোহিত সাগর, উত্তরে ভারত মহাসাগর, পূর্বে পার্শিয়ান গালফ। দক্ষিণে প্যালেস্টাইন এবং সিরিয়ার নগ্ন পর্বতমালা। সমস্ত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটি অঞ্চল। এখানে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা বলে কিছু নেই, সারা বৎসরই মরুর আবহাওয়া। দিনে প্রখর সূর্যের উত্তাপ সব জ্বালিয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। সারা দিন ধরে বইছে মরুর শুষ্ক হাওয়া। হাওয়ার সঙ্গে উড়ে আসছে তীক্ষ্ণ বালুকণা। কোথাও সবুজের চিহ্ন নেই। পানি নেই। তারপরেও দক্ষিণের পর্বতমালায় বৃষ্টির কিছু পানি কীভাবে কীভাবে চলে আসে মরুভূমিতে। হঠাৎ খানিকটা অঞ্চল সবুজ হয়ে ওঠে। বালি খুঁড়লে কাদা মেশানো পানি পাওয়া যায়। তৃষ্ণার্ত বেদুইনের দল ছুটে যায় সেখানে। তাদের উটগুলির চোখ চকচক করে ওঠে। তারা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কাঁটাভর্তি গুল্ম চিবায়। তাদের ঠোঁট কেটে রক্ত পড়তে থাকে। তারা নির্বিকার। মরুর জীবন তাদের কাছেও কঠিন। অতি দ্রুত পানি শেষ হয়। কাটাভর্তি গুল্ম শেষ হয়। বেদুইনের দলকে আবারও পানির সন্ধানে বের হতে হয়। তাদের থেমে থাকার উপায় নেই। সব সময় ছুটতে হবে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। কোথায় আছে পানি ? কোথায় আছে সামান্য সবুজের রেখা ? ক্লান্ত উটের শ্রেণী তাদেরকে মরুভূমির একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিয়ে চলে। মাঝেই যুদ্ধ। এক গোত্রের সঙ্গে আরেক গোত্রের হামলা। পরিচিত গোত্রের পুরুষদের হত্যা করা। রূপবতী মেয়েদের দখল নিয়ে নেওয়া। রূপবতীরা সম্পদের মতো, তাদের
বেচাকেনা করা যায়। প্রতিটি গোত্র নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টাতেই যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা মালামাল নিয়ে সিরিয়া বা ইয়ামেন থেকে যখন আসা-যাওয়া করে তখন তাদের উপরও ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। মালামাল লুট করতে হয়। বেঁচে থাকতে হবে। সারভাইবেল ফর দ্য ফিটেস্ট। ভয়ঙ্কর এই মরুভূমিতে যে ফিট সে-ই টিকে থাকবে। তাদের কাছে জীবন মানে বেঁচে থাকার
ক্লান্তিহীন যুদ্ধ। এই ছোটাছুটির মধ্যেই মায়েরা গর্ভবতী হন। সন্তান প্রসব করেন। অপ্রয়োজনীয় কন্যাসন্তানদের গর্ত করে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হয়। পবিত্র কোরান শরিফে সূরা তাকবীরে জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যা বিষয়ে আয়াত নাজেল হলো। কেয়ামতের বর্ণনা দিতে দিতে পরম করুণাময় বললেন- সূর্য যখন তার প্রভা হারাবে, যখন নক্ষত্র খসে পড়বে, পর্বতমালা অপসারিত হবে। যখন পূর্ণ গর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিত হবে, যখন বন্যপশুরা একত্রিত হবে, যখন সমুদ্র স্ফীত হবে, দেহে যখন আত্মা পুনঃসংযোজিত হবে, তখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাস করা হবে- কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল ? যে মহামানব করুণাময়ের এই বাণী আমাদের কাছে
নিয়ে এসেছেন, আমি এক অকৃতী তাঁর জীবনী আপনাদের জন্যে লেখার বাসনা করেছি। সব মানুষের পিতৃঋণ-মাতৃঋণ থাকে। নবিজীর কাছেও আমাদের ঋণ আছে। সেই বিপুল ঋণ শোধের অতি অক্ষম চেষ্টা। ভুলভ্রান্তি যদি কিছু করে ফেলি তার জন্যে ক্ষমা
চাচ্ছি পরম করুণাময়ের কাছে। তিনি তো ক্ষমা করার জন্যেই আছেন। ক্ষমা প্রার্থনা করছি নবিজীর কাছেও। তাঁর কাছেও আছে ক্ষমার অথৈ সাগর।
‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে।’ বিখ্যাত এই গানের কলি শুনলেই অতি আনন্দময় একটি ছবি ভেসে ওঠে। মা মুগ্ধ চোখে নবজাত শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর কোলে পূর্ণিমার স্নিগ্ধ চন্দ্র। তাঁর চোখ-মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। ঘটনা কি সে রকম? সে রকম হওয়ার কথা না। শিশুটির বাবা নেই। বাবা আবদুল্লাহ তাঁর সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারেন নি। মা আমিনার হৃদয় সেই দুঃখেই কাতর হয়ে থাকার কথা। আরবের শুষ্ক কঠিন ভূমিতে পিতৃহীন একটি ছেলের বড় হয়ে ওঠার কঠিন সময়ের কথা মনে করে তাঁর শঙ্কিত থাকার কথা। শিশুর জন্মলগ্নে মা আমিনার দুঃখ-কষ্ট যে মানুষটি হঠাৎ দূর করে দিলেন, তিনি ছেলের দাদাজান। আবদুল মোতালেব। তিনি ছেলেকে দু’হাতে তুলে নিলেন। ছুটে গেলেন কা’বা শরিফের দিকে। কা’বার সামনে শিশুটিকে দু’হাতে উপরে তুলে উচ্চকণ্ঠে বললেন, আমি এই নবজাত শিশুর নাম রাখলাম, মোহাম্মদ! সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। নতুন ধরনের নাম। আরবে এই নাম রাখা হয় না। একজন বলল, এই নাম কেন ? উত্তরে মোতালেব বললেন, মোহাম্মদ শব্দের অর্থ প্রশংসিত। আমি মনের যে বাসনায় নাম রেখেছি তা হলো- একদিন এই শিশু স্বর্গে ও পৃথিবীতে দুই জায়গাতেই প্রশংসিত হবে। শিশুর জন্ম উপলক্ষে (জন্মের সপ্তম দিনে) দাদা মোতালেব বিশাল ভোজের আয়োজন করলেন। শিশুর চাচারাও আনন্দিত। এক চাচা আবু লাহাব তো আনন্দের আতিশয্যে একজন ক্রীতদাসীকে আজাদ করে দিলেন। ক্রীতদাসীর নাম সুয়াইবা। সে-ই প্রথম
আবু লাহাবের কাছে শিশু মোহাম্মদের জন্মের খবর পৌঁছে দিয়েছিল। এই সুয়াইবাই এক সপ্তাহ মোহাম্মদকে তাঁর বুকের দুধ পান করিয়েছিলেন। নবীজি তাঁর দ্বিতীয় ও তৃতীয় কন্যা রুকাইয়া ও কুলসুমকে বিয়ে দিয়েছিলেন আবু লাহাবের দুই পুত্রের সঙ্গে। একজনের নাম উৎবা, অন্যজনের নাম উতাইবা। দুই বোনকে একসঙ্গে না। রুকাইয়াকে প্রথমে। রুকাইয়ার মৃত্যুর পর কুলসুমকে। যদিও পরবর্তী সময়ে আবু লাহাবের নামে পবিত্র কোরানে আয়াত নাজেল হলো- ধ্বংস হোক সে। তার ধনসম্পদ ও উপার্জন তার কোনো কাজে আসবে না। সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে। তার স্ত্রীও যে ইন্দন বহন করে। তার গলদেশ খেজুর গাছের আঁশের দৃঢ় রজ্জু নিয়ে। (সূরা লাহাব)
শিশু মোহাম্মদের জন্ম তারিখটা কী ? যাকেই জিজ্ঞেস করা হোক সে বলবে- ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ। বারোই রবিউল আওয়াল। দিনটা ছিল সোমবার। সারা পৃথিবী জুড়ে এই দিনটিই জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়। ঈদে মিলাদুন্নবীতে বাংলাদেশে সরকারি ছুটি পালন করা হয়। নবিজীর জন্মের সঠিক তারিখ নিয়ে কিন্তু ভালো জটিলতা আছে। ইতিহাসবিদরা মোটামুটি সবাই একমত যে তাঁর জন্ম হয়েছে হস্তিবর্ষে (Year of the Elephant, 570)। নবিজীর আদি জীবনীকারদের একজন ইবনে আব্বাস বলছেন, তাঁর জন্ম হস্তি দিবসে (Day of the Elephant)। একদল ইতিহাসবিদ বলছেন মোটেই এরকম না। নবিজী জন্মেছেন এর পনেরো বছর আগে। আবার একদল বলেন, নবিজীর জন্ম হস্তি বছরের অনেক পরে, প্রায় সত্তুর বছর পরে। জন্ম মাস নিয়েও সমস্যা। বেশির ভাগ ইতিহাসবিদ বলছেন চন্দ্রবৎসরের তৃতীয় মাসে তাঁর জন্ম। তারপরেও একদল বলছেন, তাঁর জন্ম মোহররম মাসে। আরেকদল
বলছেন, মোটেই না। তাঁর জন্ম সাফার মাসে। জন্ম তারিখ নিয়েও সমস্যা। একদল বলছেন রবিউল আউয়ালের ৩ তারিখ, একদল বলছেন ৯ তারিখ, আবার আরেক দল ১২ তারিখ। এখন বেশির ভাগ মানুষই নবিজীর আদি জীবনীকারের বক্তব্যকে সমর্থন
করছেন। ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার জন্ম তারিখ ধরা হচ্ছে। তারপরও কথা থেকে যাচ্ছে- বারই রবিউল আউয়াল কিন্তু সোমবার না। এই হিসাব আধুনিক পঞ্জিকার।বিতর্ক বিতর্কের মতো থাকুক। একজন মহাপুরুষ জন্মেছেন, যাঁর পেছনে একদিন পৃথিবীর বিরাট এক জনগোষ্ঠি দাঁড়াবে- এটাই মূল কথা। তখনকার আরবে অভিজাত মহিলারা নিজের শিশু পালন করতেন না। শিশুদের জন্যে দুধমা ঠিক করা হতো। দুধমা’রা আসতেন মক্কার বাইরের বেদুইনের ভেতর থেকে। দুধমা’র প্রচলনের পেছনে প্রধান যুক্তি, আভিজাত্য রক্ষা। দ্বিতীয় যুক্তি, শিশুরা বড় হতো মরুভূমির খোলা প্রান্তরে হেসে-খেলে। এতে তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকত। অর্থনৈতিক বিষয়ও মনে হয় ছিল। সম্পদের বণ্টন হতো। হতদরিদ্র কিছু বেদুইন পরিবার উপকৃত হতো শহরের ধনীশ্রেণীর কাছ থেকে। অতি ভাগ্যবানদের কেউ কেউ মরুভূমির সবচেয়ে দামি উপহার এক-দুইটা উট পেয়ে যেত। নবিজীর জন্যে দুধমা খোঁজা হতে লাগল। মা আমিনার অর্থনৈতিক অবস্থা তখন শোচনীয়। সম্পদের মধ্যে আছে মাত্র পাঁচটা উট এবং একজন মাত্র ক্রীতদাসী। ক্রীতদাসীর নাম ‘বাহিরা’। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু পরিবারের এতিম ছেলের জন্যে কে আসবে দুধমা হিসেবে! নবিজীর প্রথম দুধমা’র নাম আইমান। তিনি আবিসিনিয়ার এক খ্রিষ্টান তরুণী। অনেক পরে এই মহিলার বিয়ে হয় যায়েদ বিন হারিসের সঙ্গে। যায়েদ বিন হারিস নবিজীর পালকপুত্র। আইমানের পরে আসেন থুআইবা। তৃতীয়জন হালিমা। যিনি বানু সাদ গোত্রের রমণী।
নবিজীর দুধমা হিসেবে আমরা হালিমাকেই জানি। আগের দু’জনের বিষয়ে তেমন কিছু জানি না। হালিমার অবস্থাটা দেখি। বানু সাদ গোত্রের সবচেয়ে দরিদ্র মহিলা। ঘরে তার নিজের খাওয়ার ব্যবস্থাই নেই। বুকে দুধ নেই যে নিজের শিশুটিকে দুধ খাওয়াবেন। মক্কায় অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তিনি দত্তক নেওয়ার মতো কোনো শিশু পেলেন না। কে এমন দরিদ্র মহিলার কাছে আদরের সন্তান তুলে দেবে! প্রায় অপারগ হয়েই তিনি শিশু মোহাম্মদকে নিলেন। পরের ঘটনা নবিজীর জীবনীকার ইবনে ইসহাকের ভাষ্যে শুনি- ‘যেই মুহূর্তে আমি এই শিশুটিকে বুকে ধরলাম, আমার স্তন হঠাৎ করেই দুধে পূর্ণ হয়ে গেল। সে তৃপ্তি নিয়ে দুধ পান করল। তার দুধভাইও তা-ই করল। দুজনই শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। আমার স্বামী উঠে গেল মেয়ে উটটাকে দেখতে। কী আশ্চর্য, তার শুকনো ওলানও দুধে পূর্ণ। আমার স্বামী দুধ দুয়ে আনলো। আমরা দুজন প্রাণভরে সেই দুধ খেয়ে পরম শান্তিতে রাত্রে ঘুমালাম। পরদিন সকালে আমার স্বামী বলল, হালিমা, তুমি কি বুঝতে পারছ তুমি এক পবিত্র শিশুকে (Blessed One) ঘরে এনেছ ?’
শিশু মোহাম্মদের দুধভাইয়ের নাম আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহর তিন বোন- শায়মা, আতিয়া ও হুযাফা। বোন শায়মা সবার বড়। শিশু মোহাম্মদকে তার বড়ই পছন্দ। সারা দিনই সে চন্দ্রশিশু কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এখানে-ওখানে চলে যায়। একদিন বিবি হালিমা মেয়ের উপর খুব বিরক্ত হলেন। মেয়েকে ধমক দিয়ে বললেন, দুধের শিশু কোলে নিয়ে তুমি প্রচ-রোদে রোদে ঘুরে বেড়াও। এটা কেমন কথা! বাচ্চাটার কষ্ট হয় না! শায়মা তখন একটা অদ্ভুত কথা বলল। সে বলল, মা, আমার এই ভাইটার রোদে মোটেও কষ্ট হয় না। যখনই আমি তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হই, তখনই দেখি আমাদের মাথার উপর মেঘ। মেঘ সূর্যকে ঢেকে রাখে। নবিজীকে মেঘের ছায়া দান বিষয়টি জীবনীকার অনেকবার এনেছেন। তাঁর চাচা আবু তালেবের সঙ্গে প্রথম সিরিয়ায় বাণিজ্য যাত্রাতেও মেঘ তাঁর মাথায় ছায়া দিয়ে রেখেছিল। (অসমাপ্ত)