ইসলামি বেক্তিত্ত্ব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইসলামি বেক্তিত্ত্ব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৭

গাজি ইমাম শামিল রহ.।


গাজি ইমাম শামিল রহ.। দাগিস্থানের মহাবীর। চেচনিয়ার রণবীর। রুশ শ্বেতভল্লুকদের যমদূত। দাগিস্থান-চেচনিয়ার প্রতিরোধ যুদ্ধের বীর সেনানী। কুকাজের সিংহ। চেচনিয়ার পাহাড়ি ঈগল। দাগিস্থান-চেচনিয়া জিহাদের তৃতীয় আধ্যাত্মিক নেতা। প্রথম মুসলিম গেরিলা যোদ্ধা।
:
যখন রুশ সরকার এই ফরমান জারি করল যে, "যে ব্যক্তি ইমাম শামিল রহ. কে জীবিত গ্রেফতার করে দেবে, তাকে ৪৫ হাজার রাশান মুদ্রা উপহার দেয়া হবে"- তখন ইমাম শামিল রহ. প্রতিউত্তরে রুশ জেনারেলকে চিঠি লিখলেন-
"আমার কতোইনা সৌভাগ্য, যখন আমি জানতে পারলাম যে, আমার মাথা এতো মোটা অংকের মুদ্রার বরাবর, কিন্তু তুমি কখনও সৌভাগ্যবান হতে পারবেনা, যখন জানতে পারবে যে, তোমার মাথা; বরং স্বয়ং রুশ সরকারের মাথা আমার কাছে এক পয়সারও বরাবর নয়!"
:
সূত্র- ড. রাগিব আস-সারজানির মাওক্বিয়ু' ক্বিসসাতিল ইসলাম।
:
এরকম যুগান্তকারী সাহসী উচ্চারণ করতে বুকের পাটা লাগে, আর তা যে কারও হয়না; একমাত্র তাঁদেরই হয়, যাঁরা বারুদের পোড়া গন্ধে জান্নাতের খুশবু খুঁজে পায়। যাঁরা আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করতে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু বিলিয়ে দেয়ার প্রয়াসে বুক চেতিয়ে দাঁড়ায় ময়দানে জগদ্দল পাথর হয়ে। যুগে যুগে এরকম সাহসী উচ্চারণ করে মুসলিম উম্মাহর শৌর্য-বীর্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে গেছেন মুসলিম উম্মাহর শিংহ শার্দুলেরা। নিকট অতীতেও এরকম একটি সাহসী উচ্চারণ করে বুকের পাটা প্রদর্শন করেছিলেন আলাহর পথের এক লড়াকু সৈনিক শাইখ খালিদ আল-হাসীনান রহ. যুগের ফিরাঊন ওবামাকে লক্ষ্য করে। তিনি হুংকার ছুঁড়েছিলেন, "আমার শাহাদাতের দিনই আমার সৌভাগ্যের দিন হে ওবামা!" 
.
সত্যিই ৬/১২/২০১২ সালের ফজরের সময় রোজাদার অবস্থায় আফগানিস্তানের এক দূর্গম পাহাড়ে আমেরিকান ড্রোন হামলার শিকার হয়ে শাহাদত বরণ করে জান্নাতের পাখি হয়ে চিরসৌভাগ্য লাভ করেন। তাক্বাব্বালাহুল্লাহ ওয়া আসকানাহু জান্নাতাল ফিরদাঊস। 
:
সূত্র- আস-সাহাব মিডিয়া আরবি।


সায়্যিদ কুতুব রহ. কে কি ফাঁসি দেয়া হয়েছিল?


১৯৬৫ সালে আমি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে শুরু করলাম। এ বছরই সায়্যিদ কুতুব রহ. কে গ্রেফতার করে জালিম সামরিক আদালতে পেশ করা হয়। 
.
আমি তখন দৈনিক খবরের পাতায় চোখ বুলাতাম। মিশরীয় "আল-মাখুরি" পত্রিকায় ফলাও করে এ সংবাদ প্রচার করা হতো যে, 'সায়্যিদ কুতুব সরকারের পতন ঘটাতে চান! কায়রো সেতুগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে চান! শিল্পীদের হত্যা করতে চান!
.
"আল-আহরাম" পত্রিকায় তখন কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে ছাপা হতো আল-আজহার, সুফি ও সালাফি আলেমদের ফতোয়া। তারা সায়্যিদ কুতুবকে অপরাধী সাব্যস্ত করতেন। সায়্যিদ কুতুব ও তাঁর অনুসারীরা নাকি অপরাধী, পথভ্রষ্ট ও জমিনে অনিষ্টকারের দল! তাঁদেরকে হত্যা করা হোক! 
.
সায়্যিদ কুতুবের ফাঁসির রায় দেয়া হল। তিনি হাসিমুখে তা বরণ করে নিলেন।
.
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক ক্লাসমেটের ভাই, যিনি ফাসি কার্যকর করার সময়কার পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি আমাকে বর্ণনা করলেন যে, শহীদ ওমর মুখতার রহ. এর মতো অত্যন্ত বড়ত্বের ভাব নিয়ে সায়্যিদ কুতুব শান্তশিষ্ঠভাবে ফাঁসির কাষ্ঠের দিকে এগিয়ে গেলেন। 
.
তিনি বলেন, এরপর সায়্যিদ কুতুব সামান্য সময় থামলেন। ফাঁসি কার্যকরকারী লোকজনও কিছুক্ষণ থামল। তিনি সুরা গাফির- এর আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতে শুরু করলেন- وَقَالَ رَجُلٌ مُؤْمِنٌ مِنْ آلِ فِرْعَوْن َ يَكْتُمُ إِيمَانَهُ أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَبِّكُمْ ۖ وَإِنْ يَكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهُ ۖ وَإِنْ يَكُ صَادِقًا يُصِبْكُمْ بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ.
.
এরপর তিনি দু'রাকআত নামাজ পড়ার অনুমতি চাইলেন। ঠিক তখন তার দিকে এগিয়ে আসলেন একজন পাগড়িধারী শাইখ। তিনি সায়্যিদ কুতুবকে আখেরি কালেমাহ পড়াতে চাইলেন! সায়্যিদ কুতুব তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'হে শাইখ! তারা তো আমাকে এই কালেমার সাক্ষ্য দান করার কারণেই ফাঁসি দিচ্ছে! তো এখানে কালেমা পড়ানোর কী দরকার?' 
.
সায়্যিদ কুতুব নামাজ পড়তে শুরু করলেন। শেষ সিজদাহে লোকেরা অপেক্ষা করছে যে, তিনি সিজদাহ থেকে মাথা উত্তোলন করবেন আর তারা ফাঁসি কার্যকর করবে। কিন্তু নাহ, সায়্যিদ কুতুব সিজদাহ দীর্ঘায়ীত করতে লাগলেন। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। তিনি সিজদাহ থেকে মাথা উত্তোলন করছেননা! 
.
শেষমেশ তারা তাঁকে উঠাতে গেল। উঠাতে গিয়ে দেখতে পেল যে, তাঁর রূহ অনেক আগেই আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছে! মৃত অবস্থায়ই তারা তাঁকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দিল। যাতে তাগুত জামাল আব্দুন নাসেরের সামনে তারা তাঁর ফাঁসিদেয়া দেহ উপস্থাপন করতে পারে। 
.
১৯৭৬ সালে আমি রিয়াদের আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিক্বহ সম্মেলনে তাঁর ভাই উস্তাদ মুহাম্মদ কুতুবকে এই ঘটনা বলি। তখন তিনিও বলেছিলেন যে, হ্যা! লোকেরা আমাকেও এই ঘটনা বর্ণনা করেছে! 
:
ড. মুহসিন আব্দুল হামিদ
অধ্যাপক শরী'আহ বিভাগ (সাবেক) 
বাগদাদ ইউনিভারসিটি।


বৃহস্পতিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৭

সাইয়্যেদ কুতুবের চিন্তার পুনর্পাঠ: প্রেক্ষিত মাইলস্টোনস

সামাজিক পর্যায়ে ইসলামি মূলনীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধের অভাবে যেসব সমস্যা একটার পর একটা প্রকট হয়ে উঠছিল, সেগুলোই জায়গা করে নিয়েছিল বিশ শতকের শেষের দিকের ইসলামি চিন্তাধারায়। সাইয়্যেদ কুতুব এই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন কুর’আন প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের আলোকে এবং সামাজিক বলয়ে এর প্রয়োগকে সম্প্রসারিত করার মাধ্যমে। কুর’আন থেকে তিনি যেসব ধারণা নিয়েছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল “জাহেলিয়াত” (অজ্ঞতা ও অবিশ্বাসের যুগ; ওহী নাযিলের পূর্ববর্তী সময়)-এর ধারণা।
মাইলস্টোনস প্যামফ্লেটে জাহেলিয়াতের যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, প্রায়ই সেটাকে মুসলিম বিশ্বে সহিংসতার কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। বলা হয়, মুসলিম বিশ্বে ঔপনিবেশিকতার জের ধরে সভ্যতার সংঘাতের ফলে যে সমসাময়িক রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে তার উৎখাতে কুতুবের জাহেলিয়াতের ধারণা প্রভাব ফেলছে। আল-কুর’আনে জাহেলিয়াতের ধারণাটি যেভাবে এসেছে তার প্রেক্ষিতে জাহেলিয়াতের পরিভাষাগত তত্ত্বায়নের সমর্থনে নুসুসি (textual) প্রমাণ রয়েছে। তবে অনেকে আপত্তি তুলতে পারেন যে, জাহেলিয়াত শব্দটির আভিধানিক অর্থকে কুতুব ছোটো করে দেখেছেন এবং এর পরিবর্তে এমন এক ভিন্ন অর্থ চাপিয়ে দিয়েছেন যার র‍্যাডিকাল রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। গত শতকের শেষ ভাগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনেকের বোঝাপড়াকেই পক্ষপাতিত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে কুতুবকে ভুলভাবে পাঠ করা হয়েছে। তাঁকে ঔপনিবেশিকতাবাদের কারণে উদ্ভুত সামাজিক বাস্তবতার রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
কুতুবের মাইলস্টোনসকে বিপ্লব ও সহিংসতার প্রচারপত্র হিসেবে যে তকমা দেওয়া হয় সেটাও তাঁর লেখাকে সঠিকভাবে না বোঝার পরিণতি। যেমন এই লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা জাহেলিয়াতকেই বিকৃত অর্থে নেওয়া হয়েছে। তাঁর লেখা পড়ে অনেকে এই তর্ক করতে পারেন যে, জাহেলিয়াতের যে ধারণা তিনি দিয়েছেন তা সহিংসতাকে বৈধতা দেয় কেননা এই ধারণা অনুযায়ী ইসলামি শাসন বাদে অন্য যেকোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই অবৈধ মনে করা হয়। অন্যকথায় এটা সহিংসতাকে বৈধতা দেয়।
কিন্তু এই অর্থটা সঠিক নয়। অমুক বা তমুক রাজনৈতিক ব্যবস্থা কুতুবের উদ্বেগের বিষয় নয়। বরং ক্ষয়ে যাওয়া ও ম্লান হয়ে যাওয়া ইসলামি মূল্যবোধ নিয়েই তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কাছে ইসলামি শাসনব্যবস্থার অভাব জাহেলিয়াত নয়, বরঞ্চ জাহেলিয়াত হল সেই অবস্থা যেখানে ইসলামি মূল্যবোধের অভাব রয়েছে। এটি তাঁর লেখনির কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়। সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন কেননা মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকেই এর উৎপত্তি। মুসলিম হিসেবে ইসলামি মূল্যবোধ ও ইসলামি জীবন থেকে আমরা কতটা দূরে তার বোঝাপড়া নিয়েই তিনি আচ্ছন্ন। তাঁর মতে আল-কুর’আনকে তার মর্যাদাপূর্ণ আসন থেকে সরিয়ে দেওয়ার ফলেই উদ্ভব হয়েছে এমন পরিস্থিতির। ফলে আমরা দেখি যে, নয়া জাহেলিয়াতে আল-কুর’আন মুসলিমদের জীবনে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নেই। আল-কুর’আন মুসলিমদের জীবনকে পরিচালিত করে না। আর সমাজে মূল্যবোধের সংকটের পেছনে এটাই কারণ।
তারপরও কেউ হয়তো বলতে পারেন যে, মুসলিম জীবন থেকে আল-কুর’আনের কেন্দ্রীয় ভূমিকার অপসারণ নয় বরঞ্চ ইসলামি আইনের অভাবই কুতুবের লেখনির মূল বিষয় এবং একেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুতুবের মাইলস্টোনস-এ কেবলমাত্র রাজনৈতিক ব্যবস্থার সহিংস উৎখাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে- এভাবে ধরে নিলে তাঁর চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক আমাদের নজরের বাইরে থেকে যাবে। কুতুবের মতে সভ্যতাকে মানুষের মানবিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে হবে; মানবিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারগুলো মূল্যবোধ থেকে তৈরি হয়, ঐ অর্থে বিপ্লব থেকে নয়।
গণতন্ত্র-পুঁজিবাদ এবং সামরিক-সমাজতন্ত্রকে কুতুব দেখেছেন এমন কিছু চিন্তাপদ্ধতি (systems of thought) ও প্রয়োগ আকারে যা ঐতিহাসিকভাবে অন্তিম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কেননা এই প্রক্রিয়াগুলোতে বস্তুগত উন্নতি হলেও এগুলোতে রয়েছে সেসব মূল্যবোধের অভাব যা মনুষ্যত্বকে সংরক্ষণ করে। গণতন্ত্র-পুঁজিবাদে মানুষ ভোগবাদী বস্তুবাদের বশীভূত হয়ে পড়েছে। পুঁজিবাদ যদিও মানুষের বস্তুগত অবস্থা উন্নত করেছে, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষকেই এটি প্রান্তিক করে ফেলেছে, তাদের মনুষ্যত্বকে কেড়ে নিয়েছে। অন্যদিকে কুতুবের মতে, সামরিক-সমাজতন্ত্র অন্তর্গতভাবেই অসংখ্য দ্বৈততায় পরিপূর্ণ। এটা জন্ম দিয়েছে বিপর্যয়কর সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রের (totalitarianism)জাহেলিয়াত তাই এমন একটি সময়ের কথা বলছে যেখানে মূল্যবোধের অভাব তার রাজত্ব কায়েম করেছে যা কার্ল জেসপারের “axial age”-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কুতুবের মাইলস্টোনস এর পঠন-পাঠনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে ঘাটতি দেখা যায় তা হল মূল্যবোধ এবং সমাজ সংস্কারে মূল্যবোধ চর্চার প্রতি তাঁর অবস্থান ধরতে ব্যর্থ হওয়া। সাইয়্যেদ কুতুবের মতে একটি সভ্যতার মূল্য নিহিত সেসব মূল্যবোধের মধ্যে যেগুলো মানবতার চর্চা করে। আর সেই চর্চা শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মধ্যে আছে আধ্যাত্মিকতা, বুদ্ধিবৃত্তিকতা এবং আবেগ। মূল্যবোধ সংক্রান্ত কুতুবের এই চিন্তা বিশেষ করে আমরা যারা পশ্চিমে বাস করি তাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।*
দুর্ভাগ্যজনকভাবে কুতুবের মাইলস্টোনসকে অনেকে শুধু সহিংসতার উস্কানি হিসেবে পড়ে থাকেন এবং একে সহিংসতার বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দানকারী হিসেবে বিবেচনা করেন। এভাবে পড়ার কারণে তিনি সমাজ ও সভ্যতা সম্পর্কে যে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক আমাদের শেখাচ্ছেন তা লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়।  আর তা হচ্ছে সমাজ ও সভ্যতা যদি অস্তিত্বমান থাকতে চায় তাহলে তাদেরকে মানবতার সেবা করতে হবে। আর সেটা হতে হবে এমন মূল্যবোধ সঞ্চারের মাধ্যমে যা জীবনের অর্থ খুঁজে দেয়, যা গোটা মানবজাতিকে সংরক্ষণ করে, গড়ে তোলে; কেবল বস্তুবাদী মানবিক সংস্কৃতিকে মদদ দেয় না। অন্তত মাইলস্টোনস বইয়ের প্রথম দিকে চিন্তার যে ধারা সঞ্চারিত করা হয়েছে তা হচ্ছে মূল্যবোধগুলো পুনরায় স্থাপনের মাধ্যমে সমাজের সংস্কার করা, সমাজকে পুনর্জাগরিত করা। এ মূল্যবোধগুলো গোটা মানবজাতির পরিস্থিতির কথা তুলে ধরবে আর তা এমনভাবে করবে যার মাধ্যমে বস্তুগত উন্নতির সঙ্গে মিশেল হবে উদ্দেশ্য ও তাৎপর্যের।
রাজনৈতিক-দার্শনিক হব্‌সের প্রকৃতি ও সমাজ সংক্রান্ত দর্শন বিষয়ক কিছু আলাপ:
প্রকৃতিগতভাবে মানুষ আসলে ভালো নয়। বরং সে স্বার্থপর সুখবাদী (hedonist) – “প্রতিটি মানুষ ঐচ্ছিকভাবে যে কাজগুলো করে তার মধ্যে তার নিজের কিছু না কিছু ভালো লাগা আছে।” প্রকৃতিগত পর্যায়ে মানবিক প্রেরণা অনালোকিত স্বার্থ দ্বারা চালিত হয়। এগুলোকে যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা না-হয় তাহলে এগুলোর পরিণতি হতে পারে মারাত্মক ধ্বংসাত্মক। যদি অনিয়ন্ত্রিত রাখা হয় তাহলে মানুষ তার অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রেরণায় একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। কোনো সিভিল স্টেট বা আইনের শাসনের পূর্বে কোনো সমাজের প্রকৃতিগত চরিত্র কেমন হবে সেটা কল্পনা করতে চেয়েছেন হব্‌স। তাঁর উপসংহার ছিল হতাশাব্যঞ্জকঃ জীবন হবে “নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, জঘন্য, নৃশংস ও সংক্ষিপ্ত” এবং “প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে প্রত্যেক মানুষের লড়াই”।
কিন্তু তারপরও যেহেতু সব মানুষ সমান (নৈতিকভাবে নয়, শারীরিকভাবে), সবার মধ্যেই রয়েছে টিকে থাকার অদম্য আগ্রহ (প্রাকৃতিক অধিকার), এবং কিছু পরিমাণে বিচারবুদ্ধি (প্রাকৃতিক আইন), এ থেকে হব্‌স এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, উপরোক্ত দুই বিপরীতধর্মী শক্তির মাঝেই সাম্যবস্থার উদ্ভব হবে, একটি সমর্থ ও কার্যকরী সমাজ গড়ে উঠবে। যুক্তিটা বেশ সরল। যেকোনো ব্যক্তির প্রকৃতিজাত অধিকার প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেয়। ফলস্বরূপ, ব্যক্তিগতভাবে টিকে থাকার স্বার্থে মানুষ এ ব্যাপারে একমত হবে যে, তাদেরকে এই সহিংসতার অধিকার ছাড়তে হবে। তবে এর ফলে উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্থির ভারসাম্যের সৃষ্টি হয়। যে মুহূর্তে কোনো একজন ব্যক্তি তার ওয়াদা ভঙ্গ করবে, তখন সবাই ভঙ্গ করবে, ফলে পুনরায় শুরু হবে লড়াই।
মৌলিকভাবে সাইয়্যেদ কুতুবের “জাহেলিয়াত”-র ধারণা এটাই। প্রধানতঃ মাইলস্টোনস-এর শুরুতে তিনি ইসলামিক নৃতত্ত্বের মূল ধারণাগুলোর রূপকল্প তুলে ধরেছেন আর এগুলো তিনি আল-কুর’আন থেকেই নিয়েছেন। এগুলোই তাঁর এই লেখনির গতি নির্ধারণ করেছে। তাঁর তত্ত্ব দুটো মৌলিক মূলনীতিকে ঘিরে:
১) পৃথিবীতে মানুষের প্রতিনিধিত্ব
২) ‘ইবাদাতই মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য
কুরআন নির্দেশিত এ দুটো ধারণাকে অন্যান্য আনুষঙ্গিক ধারণার মাধ্যমে সমকালীন করে ব্যক্ত করা হয়েছে। এগুলো কুতুবের অ্যানথ্রো-পলিটিকস তত্ত্বের (সমাজে মানুষের ধারণা সংক্রান্ত তত্ত্ব)  নির্দেশক এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। মানুষ যখন বিশ্বজগতে, আরও ভালোভাবে বললে সমাজে (আল-মুজতামা’) তার মর্যাদা ও উদ্দেশ্যকে উপলব্ধি করতে শেখে এবং “ব্যবহারিকভাবে” তার প্রকাশ ঘটায় তখনই তার নিজ সম্পর্কিত জ্ঞান পূর্ণ বিকাশ লাভ করে এবং ব্যক্তি হিসেবে তার চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে। স্থান-কালের এ জগতে মানুষকে প্রতিনিধিত্বের (খিলাফাহ্‌) মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সুবিন্যস্ত বস্তুজগতে “মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড নয়”; বরং এটা আল্লাহর কাজ। কুতুব এটা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহই মানুষকে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন। এর মানে এটাই যে সৃষ্টিজগতে মানুষই সবচেয়ে ওপরে। আর আল্লাহর কাছে থেকেই মানুষ এবং অন্যান্য সৃষ্টি জীবনের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য খুঁজে পায়।
কুতুবের দৃষ্টিতে অস্তিত্ব হচ্ছে সত্ত্বার থিও-সেন্ট্রিক বিন্যাস। এখানে সত্ত্বার অর্থ ও উদ্দেশ্য স্বভাবজাত ও অন্তর্গত। এটা মানুষের অলীক কল্পনা ও ব্যাখ্যার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। এ কাঠামোতে “মানুষ সবকিছুর মানদণ্ড নয়, বরং সবকিছুর জন্য তারা আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ।” উপরন্তু মানুষ একা বাস করে না। সৃষ্টিজগতে অন্যান্য মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে তার সহাবস্থান। এই জায়গায় এসে কুতুব “ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায্য বিচার” (আদ্‌ল ওয়াল-কিস্‌ত)-এর কথা বলেছেন। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, মনুষ্য সমাজে অন্যান্য মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানের ক্ষেত্রে তার জীবন ও সম্পর্কের মান কেমন হবে সেটা নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধীনতাই বিবেচ্য বিষয় হবে, তবে চূড়ান্ত স্বাধীনতা সম্ভব নয় যা অন্যের ক্ষতির কারণ হয় যেমনটি দেখা যায় জাহেলিয়াতের ক্ষেত্রে; স্বাধীনতার সাথে অবশ্যই দায়িত্বশীলতা থাকতে হবে। কুতুবের ভাবনা অনুসারে মানুষের সঙ্গে মানুষের ঐক্যই সমাজ। কিন্তু সেই সমাজ যদি জীবন্ত হতে চায়, মানব অস্তিত্বের বাস্তবতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে লালন করতে চায় এবং জীবনের উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করতে চায় তাহলে অবধারিতভাবে এর ঐক্যের ভিত্তি হবে আইনি বিধি (হাকিমিয়্যাহ)।
সর্বপ্রথম মৌলনীতি হল সার্বভৌম কর্তৃত্ব এবং “আইনী বিধি প্রণয়নের হক” (হক আল-ওয়াদা’আ) একমাত্র আল্লাহর। এর সমর্থনে তিনি দুটো উৎসের উল্লেখ করেছেনঃ নুসুসি ও ঐতিহাসিক। প্রথমটি আল-কুর’আন আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে রাসূল (সা) ও সাহাবিদের (রা) সময়। কুতুবের মতে রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবিদের সময়টা মাননির্ধারক। এই সময়ে ইসলাম ছিল জীবন্ত, মূর্ত ও বাস্তব যা ঐতিহাসিক বাস্তবতায় প্রোথিত।
কুতুবের অ্যানথ্রো-পলিটিকস অনুযায়ী আল-কুর’আনে শুধু মানুষের সূচনা এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা বলা হয়নি, বরং এখানে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য নিয়েও কথা বলা হয়েছে। তবে কুরআন শুধু সেখানেই থেমে থাকেনি বরং সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছে। এই সম্পর্ক বৈধ হতে হলে যেসব মূল্যবোধ ও গুণাবলির ভিত্তিতে তাদের পরিচালিত হওয়া উচিত সেগুলোকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
সাইয়্যেদ কুতুব ও নবীজীর সমজের পরিস্থিতি ও মানদণ্ডের ভিন্নতার কারণে তিনি বিশেষভাবে রাজনীতির ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র সার্বভৌমত্বের কথা বলেছেন তবে রাজনীতিই সেখানে মূখ্য বিষয় নয়। তাঁর মতে জীবনের জরুরী মূল্যবোধ (কিয়াম), জীবন-দুনিয়া ও আইন (শরীয়াহ্‌) এবং এর মানদণ্ড (কানুন) সংক্রান্ত মৌলিক ধারণা (তাসাউরাত) নির্ধারণের একচ্ছত্র অধিকার আল্লাহরই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাইলস্টোনস-এ তিনি হাকিমিয়্যাহর ধারণাটিকে যেভাবে তুলে ধরেছেন বেশিরভাগ পর্যালোচনায় সেটাকে সংকীর্ণ অর্থে তুলে ধরা হয়। হাকিমিয়্যার যে বহুমাত্রিক দিক তিনি তুলে ধরেছেন তার স্থলে কেবল এর রাজনৈতিক গুরুত্বকেই মূখ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। তিনি যে বিভিন্ন বাস্তবতার গুরুত্ব মাইলস্টোনে উল্লেখ করেছেন অধিকাংশ পাঠেই তা অবহেলিত থেকে যায়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:
১) পৃথিবীতে মানুষের ভূমিকা
২) সামগ্রিক ধারণা আকারে ‘ইবাদাতের ভূমিকা
৩) মানুষের জীবনে এবং সমাজে মূল্যবোধের (কিয়াম) ভূমিকা
৪) বস্তুগত সংস্কৃতি তথা জ্ঞান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা, উৎপাদন ইত্যাদির ভূমিকা
৫) পৃথিবীর রূপান্তরে বুদ্ধিবৃত্তি ও তাত্ত্বিক ধারণার (conceptualization) ভূমিকা
৬) ব্যক্তি ও সামাজিক সত্ত্বা হিসেবে সমাজ (মুজতামা’) এবং গোটা উম্মাহর কল্যাণে মানুষের ভূমিকা
৭) সমাজ নির্মিত মূল্যবোধের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য নেতিবাচকতা এবং দর্শনের সীমাবদ্ধতা
৮) জালিম শাসনব্যবস্থার সমস্যা
৯) নেতৃত্বের রূপরেখা
১০) মানুষ ও সমাজজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে এ ধরণের “আকীদাহ” বিষয়ক বইয়ের ঘাটতি
*প্রবন্ধটি ইংরেজী ভাষা থেকে অনুবাদ করা হয়েছে এবং এর লেখক আমেরিকাতে বাস করেন
সূত্রঃ VirtualMosque.com


রবিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ


শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.। অনেক বড় মুহাদ্দিস। তার মতা মুহাদ্দিস সব সময় জন্ম নেয় না। এতবড় আলেম হয়েও নিজের উস্তাজ শায়খ মুস্তাফা যারকা রহ.-কে কোট পরতে সহায়তা করছেন। ভঙ্গিটাও লক্ষ্যণীয়! শায়খের ভঙ্গি থেকে বিনয় আগ্রহ ইহতিরাম (সম্মানদান) আনন্দ যেন চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে! শায়খ আবদুল ফাত্তাহ রহ. আমাদের মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব দা. বা. এর খাস ওস্তাদ!
-
ওস্তাজের খেদমত, এই উম্মাহর অন্যতম বৈশিষ্ট্য! আবু বকর রা. থেকে বর্তমান পর্যন্ত! ওস্তাজের খেদমতের এই ধারা চলে আসছে! গারে সাওর থেকে হালের খানকা পর্যন্ত ব্যাপ্ত!
.
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আল্লাহ তা‘আলা এই অধমকেও গতকাল ঈশার পর, নিজের শায়খকে ‘কোট’ পরতে সহযোগিতা করার তাওফীক দিয়েছেন। মাদরাসায় আসার পর এক আরব ভাইয়ের ওয়ালে এই ছবি চোখে পড়লো! ইন্না হাজা লাশাইয়ুন উজাব! তবে কাজের ধরনটাই শুধু এক! নইলে:দুই ঘটনায় আকাশ-পাতাল তফাত! চার ব্যক্তির স্তরেও যোজন যোজন ফারাক!সুবহা-নাল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহু আকবার!


বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

শায়খুল ইসলাম হযরত মাদানি রহ. -এর বদান্য


হযরত সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. -এর দান-দক্ষিণা ও অতিথিপরায়ণতা কেমন যেন তাঁর নামের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর নাম শ্রবণের সাথে সাথেই অন্তরে তাঁর অতুলনীয় বদান্যতার কথা স্মরণ হতো। সাধারণভাবেই তাঁর খাবারের মজলিসে ৪০/৫০ জন মেহমান উপস্থিত থাকত। আর তিনি সহাস্য চেহারায় তাদের খোঁজ-খবর নিতেন। কোনো কোনো মানুষ সাধারণ প্রয়োজনে দেওবন্দে আসত আর আহারকালে হযরতের এখানে এসে শরিক হতো। তথাপি তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন না। কেউ তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসে যদি অন্য কোনো স্থানে অবস্থান করতেন বা অন্যত্র খানাপিনা করতেন, জানতে পারলে তিনি এ ব্যাপারে তার নিকট সঠিক কারণ জিজ্ঞেস করতেন। কখনো এমনও হয়েছে যে, কোনো মেহমানের মেহমাখানায় দীর্ঘদিন অবস্থানের দরুন কেউ যদি তাকে এ ব্যাপারে কিছু বলত তাহলে জানতে পারলে তিনি তাকে ধমক দিতেন ও রাগান্বিত হতেন।
তিনি নিজে সব সময় মেহমানের সাথেই নাশতা ও আহার করতেন। শেষ বয়সে ডাক্তারগণ যখন তাঁকে বড় প্রাণীর গোশত খেতে নিষেধ করলেন এবং ছোট প্রাণীর গোশত খাওয়ার পরামর্শ দিলেন তখন যতক্ষণ পর্যন্ত সকল মেহমানের জন্য ছোট প্রাণীর গোশতের বন্দোবস্ত না হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি ডাক্তারের পরামর্শ মানেন নি। মোটকথা তাঁর মধ্যে মেহমানদারির এতো উৎসাহ ও আগ্রহ ছিল যে, মেহমানের খাতিরে সর্বস্ব উজাড় করে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। অনেক সময় এমনও দেখা গেছে যে, মেহমানকে শীতকালে লেপ-কম্বল দিয়ে নিজে আবা-জুব্বা গায়ে দিয়ে রাত কাটিয়েছেন। 
তিনি বলতেন : আমার মনে চায় আমার ঘরে মেহমানদের প্রয়োজনাতিরিক্ত কোনো বস্তু না থাকুক। সফরকালে সঙ্গে মেহমান থাকলে সাথীদের টিকিট, পানাহার ইত্যাদি যাবতীয় ব্যয়ভার নিজেই বহন করার চেষ্টা করতেন। মদিনা শরিফের খেজুর এলে সারা হিন্দুস্তানের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ পাঠিয়ে দিতেন। মাদ্রাসার নির্দিষ্ট বেতন ছাড়া আয়ের তেমন কোনো উপায় না থাকা সত্ত্বেও তিনি বেশ কয়েকজন গরিব-দুঃখী ও বিধবাকে প্রতিমাসে নিজ পক্ষ থেকে ভাতা প্রদান করতেন। কেউ তাঁর নিকট কিছু চাইলে তিনি তাকে খালি হাতে ফিরাতেন না। সাধ্যানুযায়ী সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। অনেক সময় অন্যদের ঋণও পরিশোধ করতেন। তিনি স্বীয় নিকটতমদের ঋণ পরিশোধ করে অতীত মনীষীগণের আদর্শ বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর এতো উদার প্রাণে ও মুক্তহস্তে ব্যয় করার কারণ এটাই যে, পার্থিবসামগ্রী ও অর্থ সম্পদের কোনো কদর তাঁর হৃদয়ে ছিল না। হযরতের এ আদর্শের নমুনা তাঁর সাহেবজাদা সাইয়েদ আসআদ মাদানি রহ. -এর মধ্যেও লক্ষ্য করা যেত। বর্তমানে তাঁর জীবিত সাহেবজাদা মাও. আরশাদ মাদানি ও মাও. আসজাদ মাদানি এবং গোাটা মাদানি পরিবারেই দানশীলতা ও মেহমানদারির ঐতিহ্য আছে।

ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা রহ. -এর তাকওয়া


ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা রহ. -এর তাকওয়া পরহেযগারি তো দৃষ্টান্ততুল্য ছিল। তাঁর সমকালীন উলামায়ে কেরাম বলতেন যে, আমরাপ আমাদের যুগে ইমাম আবু হানিফা রহ. -এর তুলনায় অধিক মুত্তাকী পরহেযগার কাউকে দেখিনি।
আলি ইবনে হাফস বলেন, হাফস ইবনে আব্দুর রহমান ব্যবস্য় ইমাম আবু হানিফা রহ. -এর সাথে অংশীদার ছিলেন। একবার ইমাম সাহেব রহ. তার নিকট ব্যবসার কিছু সামগ্রী দিয়ে তাকে তা বিক্রির জন্য পাঠালেন। সাথে সাথে একথাও বলে দেন যে, এ কাপড়গুলোর মধ্য থেকে এই একটি কাপড়ে কিছু খুঁত আছে। সুতরাং বিক্রি করার সময় তা ক্রেতাকে দেখিয়ে বিক্রি করবে। কিন্তু ঘটনাক্রমে অন্যান্য কাপড়ের সাথে তিনি তাকে একত্রে বিক্রি করে ফেলেন। খুঁত জায়গাটি ক্রেতাকে দেখাতে ভুলে যান। আর উক্ত কাপড়টি কোন ক্রেতা কিনেছিল তা সঠিক জানাও ছিল না। পরে হযরত ইমাম সাহেবের নিকট ফিরে এসে ব্যবসা সংক্রান্ত খবরাদি অবহিত করেন। এ সময় তিনি তাকে উক্ত কাপড়টির কথা জিজ্ঞেস করেন। হাফ্স ইবনে আব্দুর রহমান বললেন, হযরত সেটির কথা আমার মনেই ছিল না। হযরত ইমাম সাহেব রহ. তখন এ ব্যবসার সম্পূর্ণ অর্থ সাদকা করে দিলেন। আর সে সময় তার মূল্য ছিল ২০ হাজার দেরহাম। ওপরন্ত এরপর তিনি হাফ্স ইবনে আব্দুর রহমানের সাথে যৌথ ব্যবসা-ই বন্ধ করে দেন।
একবার কিছু লোক কোন এক এলাকা থেকে বণ্ড ছাগল লুট করে নিয়ে এসে তা কুফায় বিক্রি করল। ছাগলগুলো শহরের ব্যবসায়ীদের অন্যান্য ছাগলের সাথে মিশে গেল। লুণ্ঠিত ছাগল আলাদা করার কোন উপায় ছিল না। ইমাম সাহেব রহ. যখন এ সংবাদ অবগত হলেন তখন তিনি মানুষের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, ছাগল আনুমানিক কত বছর পর্যন্ত জীবিত থাকে? লোকেরা উত্তর দিল যে, ৭ বছর পর্যন্ত জীবিত থাকে। তখন থেকে ৭ বছর পর্যন্ত তিনি কুফায় ছাগলের গোশত ভক্ষণ করেননি। যাতে তাঁর উক্ত চোরাই ছাগলের গোশত আহারের সন্দেহ দূরীভূত হয়ে যায়।
একবার হযরত ইমাম সাহেব রহ. এক ঘরের পার্শ্বে রোদের মধ্যে বসেছিলেন। ইয়াহইয়া ইবনে আবু যাহিদ তাঁর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তাঁকে ঘরের দেয়ালের ছায়ায় না বসে রোদে বসা দেখে জিজ্ঞেস করলেন- হযরত! ঘরের ছায়ায় না বসে রোদে বসার কারণ কি? ঘরে বসলে তো গরমের কষ্ট হতো না। ইমাম সাহেব রহ. উত্তর দিলেন, এ ঘরের মালিকের নিকট আমার ঋণের টাকা পাওনা রয়েছে। আমি যদি তার ঘরের দেয়ালের ছায়া দ্বারা উপকার গ্রহণ করি তাহলে হতে পারে তা ঋণ দিয়ে কোন প্রকার উপকার লাভ করার আযাবের ণ্ডমকীর অধীনে শামিল হয়ে যাবো। আর এটা যদিও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ধর্তব্য নয়, তবে আলেমদের জন্য ইলমের ওপর সর্বসাধরণের তুলনায় অনেক বেশি আমলকারী হওয়া উচিত।

বুধবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

মসজিদুল হারামের সম্মানিত মুয়াজ্জিন


শায়খ আলি রইস রহ.। মসজিদুল হারামের সম্মানিত মুয়াজ্জিন। ছবিটা প্রায় ১৮৮৫ সালের দিকে তোলা। শায়খ আলি ছিলেন মহান সাহাবী যোবায়ের ইবনুল আউয়াম রা.-এর বংশধর!

শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৭

আব্দুল হাফিজ মক্কী রহ. –এর সংক্ষিপ্ত জীবনী


মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. ছিলেন মুজাদ্দিদে ইসলাম শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া কান্দলভী রহ. –এর উল্লেখযোগ্য ছাত্র ও খলীফা। তিনি অখণ্ড হিন্দুস্তান থাকাকালীন পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে ১৯৪৬ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
পারিবারিকভাবে মূলত তাঁরা কাশ্মীরের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষ ‘আব্দুস সালাম মালিক’ কাশ্মীরের কুলিগাম অঞ্চলের শাসক ছিলেন। তিনি ১৪০০ শতকের প্রসিদ্ধ সূফী-সাধক সায়্যিদ আলী আল হামদানি’র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।
দেশভাগের সময় শায়খ আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. –এর পরিবার হিজরত করে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে চলে আসেন। এখানে তিনি তাঁর দাদির নিকট কুরআন শরীফ অধ্যয়ন শুরু করেন। দেশবিভাগের ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার কারণে তাঁর পিতা ১৯৫৩ খৃস্টাব্দে পবিত্র মক্কা মুকাররামায় হিজরত করেন। ১৯৬০ খৃস্টাব্দে তাঁরা স্থায়ীভাবে সৌদি আরবে বসবাসের অনুমতি পান।
মক্কা মুকাররামায় ক্বারী আব্দুর রউফ রহ. –এর কাছে তিনি পুনরায় কুরআনে কারীম তাজভীদ –সহ অধ্যয়ন শুরু করেন। অতঃপর ১৯৫৪ খৃস্টাব্দে মক্কা মুকাররামার মাদরাসায়ে সাদিয়া’য় দ্বীনী ও সাধারণ শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি ভর্তি হন। পবিত্র মক্কা নগরীর আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানেও মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী পড়ালেখা করেন।
১৯৬৪ খৃস্টাব্দে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তাঁর মুহতারাম পিতা, পবিত্র মক্কা নগরীর তাবলীগ জামাতের অন্যতম জিম্মাদার ‘হাজি মালিক আব্দুল হক’ রহ. –এর নির্দেশে তৎকালীন দাওয়াত ও তাবলীগের আমীর হযরতজী ইউসুফ রহ. –এর সাথে পুরো একবছর তাবলীগের সফর করেন। তাবলীগের সফরে থাকাকালীন দাওয়াত ও তাবলীগের তৃতীয় আমীর হযরত ইনামুল হাসান রহ. –এর সাথে তাঁর সুসম্পর্ক তৈরি হয়।
১৩৮৫ হিজরি/১৯৬৫ খৃস্টাব্দে মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. তাঁর পিতার অনুমতি ও হজরত ইনামুল হাসান রহ. –এর নির্দেশনায় শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া কান্দলভী রহ. –এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। অতঃপর মক্কা মুকাররামায় প্রত্যাবর্তন করে তাবলীগের মেহনতে জড়িয়ে পড়েন। পাশাপাশি তিনি দারসে নেযামির কিতাবাদি অধ্যয়ন শুরু করেন।
২ বছর পর ১৯৬৭ খৃস্টাব্দে তিনি ভারতের বিখ্যাত দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুরে আগমন করে ‘মাওক্বুফ আলাইহি’(মিশকাতুল মাসাবিহ -জামাত) –এ ভর্তি হন। কিছুদিন অধ্যয়নের পর তিনি পুনরায় মক্কা নগরীতে ফিরে গিয়ে দ্বীনী ইলম অর্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। পরবর্তী বছর তিনি পুনরায় মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুরে দাওরায়ে হাদিসে ভর্তি হন। সেখানে শায়খুল হাদীস যাকারিয়া কান্দলভী রহ. –এর কাছে সহীহ বুখারী শরীফ অধ্যয়নের সৌভাগ্য তাঁর অর্জিত হয়। তিনি মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থানও অধিকার করেন।
মাত্র ২০ বছর বয়সে ২৭ রমযান ১৯৬৬ খৃস্টাব্দে তিনি শায়খুল হাদীস রহ. –এর কাছ থেকে ইজাযতপ্রাপ্ত হন। মাওলানা যাকারিয়া কান্দলভী রহ. স্বহস্তে তাঁর মাথায় পাগড়ি পরিয়ে চার তরীক্বায় খিলাফত প্রদান করেন।
শায়খুল হাদীস রহ. –এর ইন্তেকালের (১৯৮২ খৃস্টাব্দ) পূর্ব পর্যন্ত মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী ব্যবসা-বাণিজ্য, দারস-তাদরীস, পরিবার-পরিজনের মোহ ত্যাগ করে স্বহস্তে শায়খের যাবতীয় খিদমাতের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন।
শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. জীবিত থাকাকালীন ‘আল মাদরাসাহ আল সাওলাতিয়্যাহ’ –তে হাদিসের দারস প্রদান, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ –সহ যাবতীয় কাজ তিনি শায়খ রহ. –এর দোয়া ও নির্দেশনায় পরিচালনা করতেন। শায়খুল হাদীস রহ. পরামর্শে তিনি ‘আল মাকতাবা আল ইমদাদিয়্যা’ নামে পবিত্র মক্কা নগরীতে লাইব্রেরী ও ‘আল রাশীদ প্রিন্টিং’ নামে পবিত্র মদীনা নগরীতে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
শায়খুল হাদীস রহ. –এর লিখিত মুয়াত্তা মালিক –এর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আওজাযুল মাসালিক’ ও হযরত মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী রহ. –এর ‘বাযলুল মাজহুদ’ প্রকাশনার কাজে তিনি দীর্ঘদিন মিশরে অবস্থান করেন। শায়খ যাকারিয়া রহ. –এর ইন্তেকালের পর তাঁর কিতাবাদি আরবি ও উর্দু ভাষায় প্রকাশনার মহান দায়িত্বও তিনি আঞ্জাম দেন।
শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. –এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর প্রতি যাকারিয়া রহ. –এর মমতার কারণে শায়খের আত্মজীবনী ‘আপবিতি’ এবং মুফাক্কিরে ইসলাম সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. –এর লিখিত ‘শায়খুল হাদীস রহ.’ –এর জীবনীতে একাধিকবার (আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ.) –তাঁর নাম উল্লিখিত হয়েছে।
মক্কায় অবস্থানের সুবাদে মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. আরব বিশ্বকে উলামায়ে দেওবন্দের দ্বীনী খিদমাত সম্বন্ধে অবগত করেন। আকাবিরে দেওবন্দের তাসাউফের মেহনত সম্বন্ধে আরব ভাষাভাষীদের সঠিক ধারণা প্রদান করেন।
মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. ছিলেন দীর্ঘদিন যাবত মাদরাসায়ে সাওলাতিয়া মক্কায় বুখারী শরীফের দারস প্রদান করেন। পাশাপাশি দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে বিশ্বব্যাপী সফর করেন। তাসাউফের মেহনতেও তাঁর অবদান অপরিসীম। পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, সাউথ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নেপাল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও সৌদি আরব –সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর খলীফাদের অবস্থান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফরের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত পাকিস্তান ও সাউথ আফ্রিকায় সফর করতেন।

তাঁর খলীফাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন, হাফিজ প্যাটেল রহ. (ব্রিটেন), হযরত মাওলানা ইব্রাহীম আদম (সাউথ আফ্রিকা), মাওলানা জুনাইদ হাশিম (সাউথ আফ্রিকা), মাওলানা আসআদ মাহমুদ (মক্কা মুকাররামা), মাওলানা মাসুদ আজহার (পাকিস্তান), মাওলানা ইলিয়াস ঘুম্মান (পাকিস্তান), মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াক্বুব (ভারত)।
বাংলাদেশেও উনার ২৮জন খুলাফা রয়েছেন।

গত১৬ জানুয়ারি ২০১৭ সোমবার সাউথ আফ্রিকায় সফর করাকালীন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!
আল্লাহ্‌ তায়ালা শায়েখের ক্ববরকে জান্নাতের আলোয় আলোকিত করুন। তাঁর মর্যাদাকে বৃদ্ধি করুন।
ইয়া আল্লাহ রব্বুল কারীম শায়েখকে জান্নাতের উচুঁ মাকাম দান করুন,আমিন,,।
শায়েখের জন্য সকলের নিকট দোয়ার দরখাস্ত,
আবু আব্দুল্লাহ মাহমুদী,,
সৌদি আরব প্রবাসী,,

বৃহস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৬

মাও. মুহিউদ্দীন খান রহ. এর অপ্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকার

Mohiuddin Kasemi

সমকালীন অজানা অনেক বিষয় আলোচিত হয়েছে; যেগুলোর প্রতি আমাদের আকর্ষণ আছে। তাই পড়ে দেখতে পারেন। অনেক জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়া যাবে।
কওমিয়ত-গাইরে কওমিয়ত চিন্তা থেকে বেরুতে হবে ঐক্যের অপেক্ষায় নিজের দায়িত্বে অবহেলা নয়
-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.

[এতো বড় একজন লেখকের কাছে যাবো- কোনোরকম ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া কী করে হাজির হই? জিজ্ঞেস করলে কী বলবো- শুধু পড়াশোনা? এলাকার ছেলে?... অপেক্ষার প্রহর গড়াতে গড়াতে কখন সন্ধ্যা নেমে এলো, টেরই পেলাম না। কিছু একটা বলার মতো অবস্থান তৈরি করে যখন সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম- তিনি অসুস্থতায় জর্জরিত। এই ভালো তো এই খারাপ। কথা বলতেও কষ্ট। তবু এটা-সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করি- তিনি বলে যান। মিশুক প্রকৃতির ছিলেন, তরুণদের এমনিতেই খুব প্রশ্রয় দিতেন। গফরগাঁয়ের হওয়ায় আমি হয়তো প্রশ্রয়টা একটু বেশিই পেতাম। অপ্রিয় এবং স্পর্শকাতর বিষয়েও তাই হাসিমুখেই আমার প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে যেতেন। পড়াশোনা-ক্যারিয়ার বিষয়ে পরামর্শ, লেখালেখি, সময় ও তারুণ্য, সমাজ বা রাজনীতি- কতো কথাই তো হয়েছে। একসময় মনে হলো কিছু কথা রেকর্ড করে রাখি। বেশ কিছু আলোচনার রেকর্ড জমা হলো। সেগুলো শুনে আরো কিছু প্রশ্ন সাজিয়ে রাখলাম- বড় একটা সাক্ষাৎকার নেবো বলে কিংবা একটা সিরিজ আলোচনা। তিনি কথাও দিলেন। হায় কপাল, পারলাম কই! কিছুই না বলে রমজানের পবিত্র মাসে তিনি তার মাহবুবের ডাকে সাড়া দিয়ে ফেললেন। আমরা বঞ্চিত হলাম। রয়েই গেলাম। সেদিন হেরার জ্যোতি পরিবারের ফোন পেয়ে আবার রেকর্ডগুলো শুনলাম। মোবাইলের দুর্বল রেকর্ডিংয়ে তার আরও ক্ষীণতম কণ্ঠ- বেশ বেগ পেতে হলো। তবু কীভাবে যে ঘন্টা তিনেক সময় পেরিয়ে গেলো। কতোসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই তো জমা হয়ে আছে!... 
 তাকে নিয়ে অনেক কিছুই লেখা যায়। বরং প্রশ্ন- কী লেখা যায় না?...কথার রেকর্ডগুলো নামালেও তো বিশাল আকার দাঁড়াবে। নিজের ব্যস্ততা আর হেরার জ্যোতি পরিবারের তাড়াহুড়োয় এ মুহূর্তে কোনোটিই দেখলাম সম্ভব নয়। আলোচনার যে কোনো একটা পার্ট উদ্ধারের ভাবনাকেই আপাতত শ্রেয় মনে হলো। আমার সাথে করা ব্যক্তিগত আলোচনার রেকর্ডে বেশ অনেকগুলো স্পর্শকাতর ইস্যু, হুট করে সেগুলো তুলে ধরা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে শেষ সাক্ষাৎটা চমৎকার একটা ইস্যু উপলক্ষে হয়েছিলো। লেখক ও সাংবাদিক নোমান বিন আরমানের আগ্রহে হযরতের প্রিয় বিষয় নবীজীর সীরাতকে কেন্দ্র করে একটি গ্রুপ আলোচনা। বেশ কিছু সাম্প্রতিক ইস্যুও যুক্ত হয়ে আলোচনাটি দীর্ঘতর এবং দারুণ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলো। নোমান বিন আরমান, মনযূরুল হক এবং আমার সঞ্চালনায় সে সাক্ষাতে পরে আরো ক’জন মেহমানও যুক্ত হয়েছিলেন। মৌসুমের আগেই বাজারে আসা বিশেষ প্রজাতির বরই খেতে খেতে সেদিন সন্ধ্যায় বেশ সপ্রতিভ ভঙ্গিতেই কথা বলছিলেন পরম প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। সে আলোচনার ছোট্ট একটা অংশ এখানে তুলে ধরলাম, প্রায় হুবহু। সংশ্লিষ্ট সবাই আশা করি দারুণ কিছু তথ্য এবং চিন্তার খোরাক পাবেন। ধন্যবাদান্তে- শাকিল আদনান ]

শাকিল আদনান: হুজুর, সীরাত বিষয়ে সিলেট থেকে একটা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে..
নোমান বিন আরমান: আমার ক’জন বন্ধু যারা মূলত বাইরে থাকে, আমরা মিলে একটা সীরাত মিডিয়া ফাউন্ডেশন করতে চাচ্ছি। এর অধীনে সীরাত টিভি এবং অনলাইনে সীরাত- এমন কিছু কাজ আমরা করতে চাই। উদ্যোগের প্রাথমিক পুঁজি হিসেবে কোরআনে বর্ণিত ২৫ জন নবীকে নিয়ে একটা গ্রন্থ করতে চাচ্ছি। সবার পক্ষে তো বিস্তৃত সীরাত পড়া সম্ভব না, তাই সংক্ষিপ্ত একটা গ্রন্থ তৈরি করা। অন্তত নবীদের মৌলিক বিষয়গুলো যেনো চলে আসে। যেমন যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়- হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের স্ত্রী কে ছিলেন, সবাই ভাবা শুরু করবে কে যেনো ছিলেন! কিন্তু তিনি তো বিয়েই করেন নি। এসব মাথায় রেখেই একটা কাজ করতে চাই, যাতে বড় নবীদের নিয়ে মৌলিক তথ্যগুলো সামনে চলে আসে। এ ব্যাপারে আপনার কাছে আসছি কারণ এ দেশে সীরাত নিয়ে এককভাবে আপনিই সবচে’ বেশি কাজ করেছেন। আমরা এক্ষেত্রে কী কী করতে পারি বা এ মুহূর্তে আপনার ভাবনাই বা কী?
মুহিউদ্দীন খান রহ.: নাম কি দিচ্ছেন? (প্রস্তাবনার খসড়াটা হাতে নিয়ে)- নবীকোষ?... কেমন শোনায় না!...
নোমান: জ্বি, এটা নিয়েও যদি কিছু বলার থাকে, আমরা প্রাথমিকভাবে এটা রেখেছি।
শাকিল: কোষ বলতে তো ব্যাপক কিছু বোঝায়, এটা তেমন নয়। শুধু সংক্ষিপ্ত একটা আদল তৈরি করার চেষ্টা। পরে ধীরে ধীরে আরও বড় এঙ্গেলে কাজ করা। সীরাত যেনো বাৎসরিক বা সাময়িক ভাবনায় আটকে না থেকে সবসময়ের চর্চায় পরিণত হয় বা হতে পারে এমন একটা চিন্তা থেকেই উদ্যোগ...
[লিফলেটটা পড়ছিলেন খুব মনোযোগ দিয়ে...কিছু প্রশ্নও করলেন পড়তে পড়তে। যেমন- হযরত ঈসার পর কোনো নবী এসেছেন কি? এটা একটা প্রশ্ন ছিলো, বললেন- কোনো নবী ছিলেন কিনা এটা একটা প্রশ্ন, থাকলে কে বা কারা সেটাও একটা প্রশ্ন। কিতাবে পাওয়া যায় দুজন নবী এসেছিলেন। মশহুর বর্ণনায় পাওয়া যায় না। তবে এসেছিলেন। নাম তো এ মুহূর্তে মনে নেই। তবে তাদের কোনো কিতাব বা নতুন শরীয়ত ছিলো না।]
শাকিল: এসব ক্ষেত্রে সীরাতের কোন কিতাবকে আমরা মূলে রাখতে পারি?
মুহিউদ্দীন খান: সীরাতুননবী। 
শাকিল: লেখক?
মুহিউদ্দীন খান: আল্লামা শিবলী নোমানী। সীরাতুননবীর সম্ভবত তৃতীয় খ-ে এই তথ্য আছে।
শাকিল: আমাদের নবীসহ সকল নবীদের নিয়ে সীরাতের এই চিন্তাটা কেমন?
মুহিউদ্দীন খান: ভালো।
শাকিল: আমরা তো সীরাত বলতে কেবল আমাদের নবীকে নিয়েই বুঝি বা বুঝতে চাই...
নোমান: মানে সীরাতের ধারণাটা কি শুধু হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন্দ্রিক, না সামগ্রিক?
মুহিউদ্দীন খান: সামগ্রিক...
নোমান: প্রশংসা তো সবারই করা উচিত, ঈমানও তো সবার ওপরই আনতে হবে।
শাকিল: এই চর্চার মডেলটা কেমন হওয়া উচিত? 
মুহিউদ্দীন খান: কোনটা?
শাকিল: রবিউল আউয়াল থেকে বেরিয়ে সামগ্রিক করা বা এই যে অনলাইন কার্যক্রম শুরুর চিন্তা এসব কেমন? নিউজের মতো প্রতিমুহূর্তে আলোচনা ও তথ্য বিনিময় হতে থাকলো। মানে স্বতন্ত্র এই চিন্তার ধারাটা...
মুহিউদ্দীন খান: আমি তো কতো চিন্তাই করে রাখছি। সব তো মনে থাকে না। এই যে দুজন নবীর নাম ভুলে গেলাম। এইটুকু মনে আছে যে কোথাও পড়েছি- দুজনের নাম।
শাকিল: বেসিকটাও তো দরকার। আপনার যেমন কাজ করে অভিজ্ঞতা বা ব্যাপক জানাশোনা হয়েছে- সে হিসেবে তো আমরা কোনো ধারণাই রাখি না। আমরা এখন কোন পথে আগাতে পারি বা কোন বিষয়গুলোকে বড় করে সামনে আনতে পারি।
মুহিউদ্দীন খান: খুব জটিল কিছু তো না। বড় বড় কিছু কিতাব আছে। এগুলো পাঠে রাখলেই হয়। সীরাতুননবী। এটা ৬ খ- ছিলো। আরেক খ- পাকিস্তানে পরে পাওয়া গেছে। আল্লামা সৈয়দ সুলায়মান নদভী সাহেবের কিছু লেখায় এবং ডায়রিতে এ তথ্য ছিলো যে, সীরাতুননবীর আরো কিছু পার্ট আছে। পরে পাকিস্তানের তাকি উসমানী সাব, ইনারা দায়িত্ব নিয়ে সেটা খুঁজে বের করলেন। এটা এখন সাত খ-ের।
শাকিল: আর কোন কিতাব নিতে পারি? ..ইবনে হিশাম, সীরাতে ইবনে হিশাম?
মুহিউদ্দীন খান: এগুলো তো থাকবেই। মৌলিক কিতাব।
নোমান: উপমহাদেশের আর কাকে আমরা পাঠে রাখতে পারি। আপনি শিবলী নোমানীর কথা বললেন- এর বাইরে আর কেউ?
মুহিউদ্দীন খান: তার ওজনের আর কেউ নেই।
শাকিল: কিছু ব্যাপার তো এমনও যে, অতীতে বড় যতো সব কাজ হয়েছে এগুলোকে সামনে রেখে বা সেগুলোর নির্যাস নিয়েই তারা মানে দেওবন্দী আলেমরা গত শতাব্দীতে কাজগুলো করেছেন- সুতরাং তাদেরকে পড়লেও তো ইতিহাসের পুরো নির্যাসটা পাওয়ার কথা...
মুহিউদ্দীন খান:...(ভাবলে বা স্বাস্থ্যে কোনো অস্বস্তি অনুভব করলে নীরব হয়ে যেতেন)
মনযূরুল হক: ভালো একটা বই করা নিয়ে আমরা অনেক সময় সংকটে ভুগি। কী করা উচিত, কী করা উচিত না। আর একটা বিষয় যে, একজন ছেলের ২৫-৩০ বছর বয়সের মধ্যে কোন কোন বইগুলো পড়ে ফেলা উচিত?
মুহিউদ্দীন খান: (বেশ অনেক্ষণের নীরবতা ভেঙে)...সীরাতুননবী পুরোটার অনুবাদ আমি করেছিলাম। আর তখন তো আমাদেরও দুর্দিন, ইসলামী সাহিত্যেরও দুর্দিন। তো আমার এক বন্ধু সেটা প্রকাশ করবেন বলে নিয়ে গেলেন। আল্লাহ পাকের কি ইচ্ছা হঠাৎ তিনি হার্ট এ্যাটাকে মারা গেলেন। সেই পা-ুলিপিটা তার স্ত্রী রেখে দিয়েছিলেন। পরে তার এক পরিচিত জন সেটা নিয়ে যায়। টুকরো টুকরো করে কিছু সে প্রকাশও করেছিলো।
শাকিল: সামগ্রিকটা আর পাওয়া যায় না?
মুহিউদ্দীন খান: সব মিলালে হতেও পারে।
নোমান: পরে তো আপনার মদীনা পাবলিকেশন্স প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনীতে পরিণত হলো- তখন কোনো উদ্যোগ নেন নি?
মুহিউদ্দীন খান: পা-লিপিটা আর পাওয়া যায় নি।
শাকিল: সীরাতের বিশেষ কোন কোন ক্ষেত্র- আপনার মতে যেগুলো নিয়ে কাজ এখনো বাকি বা আরো বেশি করে করা উচিত?
মুহিউদ্দীন খান: আমার ধারণায়, বিশেষ একটা ব্যাপার হতে পারে- পুরো কুরআনে রাসূলে কারীম সা. যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছেন তা তুলে আনা। কোথায় কীভাবে রাসূলের আলোচনা এসেছে এগুলো।
নোমান: আমাদের এই গ্রন্থণাতেও অবশ্য কুরআনে নবীর একটা পার্ট আমরা রেখেছি। ২৫ নবী কীভাবে কুরআনে এসেছেন তাও থাকবে। এগুলোর সাথে আর কী কী এড করা যায়?
মুহিউদ্দীন খান: এগুলোই করে দেখেন না আগে।
শাকিল: এই যে ভাবনাটা বললেন- কুরআনে নবী- এ নিয়ে কি আরবি-উর্দুতে কোনো কাজ আছে, না মৌলিক কাজ করবো আমরা?
মুহিউদ্দীন খান: আমার চোখে এখনো পড়ে না। মৌলিকই হতে হবে।
শাকিল: আর একটা বিষয়। ব্যক্তি নবী, তার সংসার বা দিনযাপন- নবুওয়ত থেকে আলাদা করে- এই চিন্তা থেকে কি কাজ হয়েছে বা করা যায়? নবুওয়তের আগে-পরের বিবরণ তো পাওয়া যায়- কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত জীবন বা মানুষ নবীর হালাতটা?
মুহিউদ্দীন খান: আমরা যেটুকু জানি বা কুরআন যেভাবে জানায় সে অনুপাতে নবীদের ব্যক্তি জীবন বলতে কিছু ছিলো না। আল্লাহ পাক কতৃক তারা নিয়ন্ত্রিত ছিলেন এবং পরিচালিত হতেন। যখন যা-ই তারা করেছেন, আল্লাহর হুকুমেই করেছেন। সুতরাং ব্যক্তি জীবন বলে আলাদা কিছু করার সুযোগ নেই।
নোমান: আপনর তো সীরাত বিষয়ক পাঠ সবচে বেশি। নবীরা যে দাওয়াতি কাজ করেছেন, তাদেরকে যে সমস্যা ফেস করতে হয়েছে সেগুলো কি একইরকম ছিলো না ভিন্ন ভিন্ন?
মুহিউদ্দীন খান: সমস্যা ছিলো তা ঠিক তবে ধরন-ধারণ ছিলো সে সময়ের আর্থ সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে। আরেকটা বিষয়কে আপনারা গুরুত্ব দেন- নবীরা যখন যে সমাজে এসেছেন সে সমাজের উন্নয়ন এবং আদর্শীকরণে তাদের অবদান এবং ভূমিকা কেমন ছিলো বা কতোটুকু ছিলো এগুলো লেখেন।
নোমান: জ্বি, আমরা সেটাও আনতে চাচ্ছি। একই সাথে নবী নিজে কেমন অবস্থানের ছিলেন, কেমন পরিবারের বা কেমন আর্থিক অবস্থানের- ইত্যাদি। এই ব্যাপারগুলো কোথায় পাওয়া যেতে পারে?
মুহিউদ্দীন খান: একসাথে এগুলো কোথাও পবেন না। সীরাতুননবীই পড়েন না।
মনযূর: পরে কি এটা কেউ আর অনুবাদ করছেন বা বাংলা কি পাওয়া যায়?
মুহিউদ্দীন খান: নাহ...
মনযূর: অনেক দেশে তো সফর করছেন। সফরনামা কি লিখেছেন?
মুহিউদ্দীন খান: নোট আছে। প্রকাশিত হয় নি।
মনযূর: ফিলিস্তিনে গিয়েছিলেন? কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?
মুহিউদ্দীন খান: গিয়েছি। তারপর জর্ডান হয়ে আসহাবে কাহাফের গুহাও দেখে এসেছি।
নোমান: একটা বিষয় জানতে চাওয়া। আপনি তো কাছ থেকে দেখেছেন। আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানুষের ছবি দেখলে দেখি অসহায় আর ভগ্ন স্বাস্থের সব মানুষ। প্রায় হাড্ডিসার। আর ফিলিস্তিনের দিকে তাকালে, যারা দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধাবস্থায় আছে- তারা তো বেশ ভালো স্বাস্থের অধিকারী। সুস্বাস্থ্য ও লাবণ্য দুটোই সমানভাবে তারা ঠিক রাখছে- কীভাবে?
মুহিউদ্দীন খান: এটা একটা ভালো প্রশ্ন। তবে কথা কি- যারা মূলত যুদ্ধ করে তাদেরকে তো আমরা দেখি না । দেখি যারা যুদ্ধের বাইরে আছে বা বিভিন্ন দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে তাদের। তারা তো মোটামুটি ঠিকই থাকবে। ফলে বাস্তব অবস্থা বলা মুশকিল।
মনযূর: ওখানে কখনো দুর্ভিক্ষ হয়েছে বলেও তো শুনি নি।
মুহিউদ্দীন খান: না, সেরকম নয়।
শাকিল: উল্টোচিত্রটা বারবার সামনে আসার কারণ তো রাজনৈতিকই।
মুহিউদ্দীন খান: হুম। আরেকটা ব্যাপার হলো তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান আমাদের চেয়ে ভালো ছিলো সবসময়। জীবনমানও।
শাকিল: আপনি তো সীরাত নিয়ে প্রচুর কাজ করেছেন। অনুবাদ। মৌলিকও। একটু যদি মনে করতে বলি তালিকায়নের প্রয়োজনে, তাছাড়া আর কী কী করার ইচ্ছে বা করতে চাইতেন সেগুলোও যদি বলতেন।
মুহিউদ্দীন খান: সীরাতুননবী করেছি। ৭ খ-ের। তারপর সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া। তারপর... মনেই তো করতে পারছি না... 
নোমান: সীরাত নিয়ে আর কি কাজের স্বপ্ন ছিলো আপনার?
মুহিউদ্দীন খান: সীরাতে হালাবিয়ার অনুবাদসহ আরো অনেক কিছুই...
শাকিল: আপনার বইগুলো তো মদীনা থেকেই বেরিয়েছিলো, বাইরেও আছে কি?
মুহিউদ্দীন খান: কিছু কিছু। বাংলা একাডেমি, এমদাদিয়া লাইব্রেরি। তারপর আরেকটা কী লাইব্রেরি যেনো...
শাকিল: এগুলোর তালিকা কি কোথাও সংরক্ষিত আছে?
মুহিউদ্দীন খান: এগুলো মনে করতে হবে। একদিন সকালে বসলে রাত্রে গিয়ে হয়তো মোটামুটি মনে করে শেষ করা যাবে।
শাকিল: আপনি অনুমতি দিলে আমরা একদিন আসলাম। তালিকাটা হলো। তাহলে তো এগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি পরে যারা কাজ করবে তাদেরও সুবিধে হবে। পুনরাবৃত্তিও এড়ানো যাবে। আপনার সাথে সীরাত নিয়ে সমসাময়িক আর কেউ ভালো কাজ করেছেন বলে মনে পড়ে?
মুহিউদ্দীন খান: একজন ছিলেন ওয়েস্ট বেঙ্গলের। নাম যেনো কী মনে পড়ছে না। দু বছর আগে মারা গেছেন।
শাকিল: বই কি বাংলাদেশ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে না ওখান থেকে?
মুহিউদ্দীন খান: বাংলাদেশ থেকে। মাঝে-মধ্যে আসতেন আমার কাছে।
শাকিল: পুরনো কোনো লাইব্রেরিতে খুঁজলে কি পাওয়া যেতে পারে?
মুহিউদ্দীন খান: পারে। আরেকজন ছিলো, মোটামুটি ভালোই করতো। সংগ্রামের সম্পাদক ছিলো। মারা গেছেন।
শাকিল: আবুল আসাদের আগে?
মুহিউদ্দীন খান: হ্যাঁ...
শাকিল: আব্দুল মান্নান তালিব?
মুহিউদ্দীন খান: তালিব, হ্যাঁ, আব্দুল মান্নান তালিব।
শাকিল: আপনি তো রাবেতার সদস্য ছিলেন। সেখানে ভারত-পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আলেমরাও ছিলেন- তারে মধ্যে কে কে ভালো কাজ করেছেন?
মুহিউদ্দীন খান: আমার মতে, এই ভাবনা বা সীরাত নিয়ে মাথা ঘামাইছে এমন লোক আমি দেখি নাই। ভারত-পাকিস্তানের আলেমরাই যা একটু ভালো কাজ করেছেন।
নোমান: অন্য এ্যাঙ্গেল থেকে একটা প্রশ্ন। আমরা বলি হযরত ঈসা আ., খ্রিস্টানরা বলে যিশু, আবার অনেকে বলে হিন্দুরা যাকে শ্রীকৃ- বলে তিনিই মুসা আ.- এগুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মুহিউদ্দীন খান: আমার কাছে একটা বই ছিলো তাতে লেখা যে, পৃথিবীর প্রথম নবী হিন্দুদের মধ্যেই ছিলেন।
নোমান: জ্বি, আমিও ভারতীয় এক আলেমের এমন একটা আলোচনা শুনেছি। ভিডিও লিংকও আছে আমার কাছে..
মুহিউদ্দীন খান: এগুলো তারা লেখছে ঠিক আছে কিন্তু তারা তো নির্ভরযোগ্য নয়। তবে প্রথম দিকের নবী-রাসূলগণ এই দক্ষিণ এশিয়াতেই এসেছিলেন। হযরত আদমের আ. চুলাও তো এখানেই পাওয়া গেছে।
আমরা: চুলা না পায়ের ছাপ?
মুহিউদ্দীন খান: না, চুলা। তাছাড়া এখন যেটা আরব সাগর সেটা একসময় ছিলো না। 
শাকিল: সেখানে কি মানব বসতি ছিলো?
মুহিউদ্দীন খান: হ্যাঁ, মানব বসতি ছিলো। লেখক সে বইয়ে প্রমাণ করেছেন যে হযরত নূহ আ. এর কিশতিতে ৬ কোটি মানুষ ছিলো।
মনযূর: ছয় কোটি!
শাকিল: এবং তারা আরব সাগরের জায়গাটিতে বসবাস করতেন?
মুহিউদ্দীন খান: আরব সাগর আর ...মনেই আসছে না। বইটা খুব দামি ছিলো। করাচি থেকে বেরিয়েছিলো।
শাকিল: আপনার সতীর্থ কেউ ছিলেন এসব কাজে, এই চিন্তার বা এগুলো জানতেন- আমরা যার সাথে কথা বলতে পারি? বা মাঝে-মধ্যে এলে আপনি একটু কষ্ট করে সময় দিলেন...
মুহিউদ্দীন খান: আমি যেটুকু পারি সহযোতিা করতে রাজি আছি।
শাকিল: সীরাত বিষয়ক এই প্রেরণাটা আপনি কীভাবে পেলেন? আপনার সমসাময়িক কেউ কাজ করছে না- না দেশের, না বাইরের...আর আপনি সারাজীবন কাজ করে গেলেন...
নোমান: আপনি নতুন একটা ধারা তৈরি করলেন বাংলা সাহিত্যে- এই প্রেরণা কীভাবে এলো, সূচনাটা কীভাবে?
মুহিউদ্দীন খান: এটা আমি সৈয়দ সুলায়মান নদভীর সীরাতুননবী থেকেই পাইছি।
শাকিল: বই পড়ে?
মুহিউদ্দীন খান: হ্যাঁ...
শাকিল: বিশেষ কোনো প্যাসন না থাকলে একটা বই পড়ে পাওয়া প্রেরণার বলে কি সারাজীবন কাজ করা যায়?
মুহিউদ্দীন খান: ব্যাপার তো রাসূলের ইলমি দায়িত্বের...
শাকিল: কেন একটা বই পড়ে এমন প্রেরণা আপনি পেলেন বা এতোটা প্রভাবিত হলেন যে সারাজীবন এই কাজটা ধরে রাখলেন- যা আরো হাজারজন পড়ছে তাদের কারো মধ্যে এই বোধ আসছে না।
মুহিউদ্দীন খান: বইটা পড়ার সময় মনে এলো যে সীরাত নিয়ে তেমন কাজ হয়নি। যথাযথ কাজ হয়নি। তো আমি এতে আত্মনিয়োগ করি। 
নোমান: আরকটা বিষয়। একটা সময় মদীনার সীরাত সংখ্যাটা খুবই সমৃদ্ধ কলেবরে বেশ আয়োজন নিয়ে প্রকাশ পেতো। এরপর এই চর্চার ধারা থেকে আমরা কেন সরে এলাম বা মদীনার অবস্থানটাই বা কী?
মুহিউদ্দীন খান: মানে আমার গায়ে যতোদিন বল ছিলো আমি করেছি। এখন যারা করছে এদের তো এ ধৈর্য্য নাই।
শাকিল: এমন কোনো বিষয়ও কি যে, পাঠকেরা চাইলে পত্রিকাগুলো এমন আয়োজন করতে বাধ্য কিন্তু পাঠকের আগ্রহের ঘাটতির কারণে এখন হচ্ছে না- এমন কানো ব্যাপারও কি থাকতে পারে?
মুহিউদ্দীন খান: না, যে পরিমাণ আশা করেছিলাম সে পরিমাণ আগ্রহ পাঠকেরও নাই।
নোমান: আপনি যেমন ধারণা করতেন সেরকম নাই?
মুহিউদ্দীন খান: না...
মনযূর: মানুষ কি এগুলোকে অনেক আগের কথা বা সেকেলে কথা মনে করে- এরকম?
মুহিউদ্দীন খান:...
নোমান: সীরাতের সংখ্যগুলো আপনাদের সংগ্রহে আছে কি-না?
মুহিউদ্দীন খান: বাংলাবাজার গিয়ে একদিন খোঁজ করেন। গুদামে আছে। সব হয়তো নেই।
শাকিল: আপনার অনুমতি পেলে তো যাওয়া যায়- একটা কাজ হলো।
মুহিউদ্দীন খান: যান না...
শাকিল: আমাদের পাঠবিমুখতার যে একটা ব্যাপার- বিশেষত বাঙালি মুসলমানের। আমরা পড়তে চাই না। দেখা যায় মাহফিল ওয়াজে খুব যাচ্ছি। মসজিদের বয়ানও শুনি। নিজে পড়ে জ্ঞান অহরণের চর্চাটা নেই। শিক্ষিত যারা তারাও পড়ছে নিজেদের মতো করে, মৌলিক জায়গায় আসতে চায় না। এই সংকট কী করে কাটানো যায় কিংবা এই দূরত্ব কী করে ঘুচানো যায়?
মুহিউদ্দীন খান: হাসি...
শাকিল: মানে কোনো সম্ভাবনা আছে?
মুহিউদ্দীন খান: কী বলা যায়? এটা তো ঐতিহাসিক ব্যাপারের মতো। বাংলার মুসলমানদের এই মানসিকতাটা ভালো না...
মনযূর: যেটা বলছিলেন যে, গোড়ায় সমস্যা...
শাকিল: আপনার মদীনার যে পাঠকগোষ্ঠী, একটু শিক্ষিত- একটু সাধারণ সমাজ। এটা কীভাবে হলো বা মদীনা একটু তাদের ঘরানার হলো কী 
করে?
নোমান: আমরা যাদেরকে একটু প্রগতিশীল মনে করি, যারা সমাজের মূল স্্েরাত- ধর্মীয় পত্রিকা হওয়া সত্ত্বেও মদীনা তাদের কাছে কী করে পৌঁছলো? আমাদের যারা করে তারা তো বিশেষ শ্রেণীর পত্রিকা করে। কেউ মুরিদদের জন্য, কেউ তালেবুল ইলমদের জন্য, কেউ তাবলিগের জন্য, আপনার পত্রিকা গণমানুষের হলো কী করে?
মুহিউদ্দীন খান: সাধারণ মানুষের যে চাহিদা সেদিকে খেয়াল রেখেছি। এদেশের মানুষেরা নাস্তিক হলেও সীরাত নিয়ে, ইসলামের বিষয় নিয়ে জানতে বুঝতে চায়...
নোমান: জ্বি, এই ব্যাপারটা খুব আছে। কালকে রাতে আমাকে হোটেলে থাকতে হয়েছে। রাত দুটোয় বাস থেকে নেমে হোটেলে গেলাম। একটু পর দেখি ম্যানেজার তার কাউন্টার থেকে বেরিয়ে তাহাজ্জুদ পড়ছে। মহিলারা আজান হলে সাথে সাথে মাথায় কাপড় দেয়। পুরো সমাজে এই ব্যাপারটা আছে। তাদের ফিতরতেই ব্যাপারটা রয়ে গেছে...
শাকিল: আপনি তখন মানুষের এই মানসিকতাটা কীভাবে ধরতে পারলেন, তাদের মনের ভাষাটা কী করে পড়লেন?
মুহিউদ্দীন খান: আমি আমার কর্মজীবন শুরু করি একটা উর্দু পত্রিকায়। তো উর্দু পত্রিকার পাঠকেরা খুব পড়–য়া হয়। দেখা যায় সারাজীবন নামাজ পড়েনি, কিন্তু নবীজীর বিষয়ে জানতে উদগ্রীব। নবীপ্রেম নিয়ে কিছু বাড়াবাড়ি আছে তাদের, প্রেমও তো আছে...
শাকিল: আপনি যে লেভেলটা নিয়ে কাজ করলেন। তাদের ভাবনা ও অবস্থন তো এতোদিনে নিশ্চয় উন্নীত হয়েছে। আমরা এখন সে স্তর থেকে কাজ করবো না নতুন যারা আসছে, তরুণ প্রজন্ম- তাদের কথা ভেবে কাজ করবো? প্লাটফর্ম তো আলাদা আলাদা হয়ে যাচ্ছে...
মুহিউদ্দীন খান: আমার মনে হয় একটা সার্ভে করতে পারেন। যে পর্যন্ত কাজ হয়েছে সেটা বের করতে পারলে সেটাকে ভূমিকা হিসেবে রেখে বাকি কাজ সামনে নিতে পারেন।
নোমান: একটা ব্যাপার। মদীনাকে যে শেকড়ে আপনি নিয়ে গিয়েছিলেন বা যে প্রত্যাশায় উন্নীত করেছিলেন- আপনার কি মনে হয় মদীনা এখন সে শিকড়ে আছে? এই না থাকা বা মদীনা আরো বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান না হওয়ার কারণ কি? আপনার নিশ্চয় স্বপ্ন ছিলো এটি একটি মিডিয়া হাউজ হবে, এই মিডিয়া হাউজ না হওয়ার কারণ কি?
মুহিউদ্দীন খান: এটা আমার অযোগ্যতা...
নোমান: আপনার অযোগ্যতা নয়। আপনি যে গতিতে যে পর্যন্ত নিয়ে আসছেন সেটা তো অবশ্যই আপনার যোগ্যতার বলেই। একটা সময় তো লাখের ওপর সার্কুলেশন ছিলো। কিন্তু এখন যে হাল- মানে আমি শেষ কবে মদীনা পড়েছি বলতে পারি না। অথচ একটা সময় মদীনা পড়ে আমাদের সকাল হয়েছে। মুসলিম জাহান পড়ে আমরা বাংলা শিখেছি- এখন সে মদীনা কেন চোখে পড়ে না? এখন সার্কুলেশন-প্রভাব কোনোটাই তো নেই।
মুহিউদ্দীন খান: (ফোনে রিং। দেখলেন, রিসিভ হলো না...।) আমি এক সময় চিন্তা করেছি যে কখন কী হয়ে গেলো? এবং কেন হলো? আমি তো স্বেচ্ছায় এমন করি নাই। কিন্তু আস্তে আস্তে কমে গেলো কেন। এখন ৫০-৫৫ হাজার ছাপা হয়। এখনও ৫০ এর উপরে। একসময় দেড় লাখ কপি ছাপতে হতো। কখনো কখনো একাধিক এডিশনও ছাপতে হয়েছে। বিশেষ করে সীরাত সংখ্যা।
নোমান: জ্বি, সীরাত সংখ্যা তো অবশ্যই। একটা সময় তো এমন ছিলো যে বামপন্থীদের ঈদসংখ্যা আর ইসলামী সাহত্যের সীরাত সংখ্যা।
শাকিল: এমন কি হতে পারে- এর মধ্যে পাঠকদের মধ্যেই ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। মিডিয়া বিপ্লবের কারণে হোক- অনলাইন , টেলিভিশন বা অন্য কোনো কারণে- আমরা যা টের পাই নি।
মুহিউদ্দীন খান: এটাই হব, পরিবর্তন হয়ে গেছে আমরা টের পাই নি।
নোমান: মানে পাঠকের চিন্তা অগ্রসর হয়েছে, আমরা সে অনুযায়ী অগ্রসর হতে পারি নি বা সমন্বয় করতে পারি নি।
মুহিউদ্দীন খান: হুম, হয় নাই।
মনযূর: খেয়াল করেছেন কিনা- এখন কিন্তু ইসলামী পত্রিকা আগে যে কয়টা ছিলো এখন সে কয়টাও নাই। 
আমরা: না-ই বলতে গেলে। আপনি কি পান কোনোটা?
মুহিউদ্দীন খান: নেয়ামত, নতুন করে ছাপছে। আরো কয়েকটা কী যেনো দেখলাম...এক দুই মাস পরপর একটা বের হয়, তৃতীয় মাসে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়।
[-একটু চুপচাপ। নিরবতা।]
শাকিল: খারাপ লাগছে না তো কথা বলতে? আমরা না হয় অন্য কোনো দিন আসি?
মুহিউদ্দীন খান: নাহ, বসেন...
শাকিল: আপনি যাদের নিয়ে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে কারো নাম বিশেষভাবে মনে পড়ে- মদীনা বা মুসলিম জাহানে?
মুহিউদ্দীন খান: মদীনায় প্রথম যাদের নিয়ে কাজ করেছি তারা কেউ তো বেচে নেই। দুয়েকজন থাকলেও খুব জবুথবু অবস্থা। নতুন যারা আছে, মান তেমন নেই। ঐ আগ্রহ, চেতনাটা নাই।
শাকিল: মুসলিম জাহানে যারা কাজ করেছেন তাদের লাইন তো অনেক বড় হওয়ার কথা। তাদের মধ্যে দুয়েকজনের কথা মনে পড়ে যারা বেরিয়ে আসতে পরেন কাজের প্রশ্নে? ধরে রাখবেন বা সামনে আগাবেন?
মুহিউদ্দীন খান: পাই নাই তো...
শাকিল: এই ব্যাপারটা কেন, লোক কেন তৈরি হচ্ছে না? তিন চার দশক যাচ্ছে একটা দেশে কয়েকটা লোক তৈরি হচ্ছে না। এই সংকট কেন?
মুহিউদ্দীন খান: যারা তৈরি হয়েছিলো বা তৈরি ছিলো মদীনায় এসে আরেকটু অগ্রগামী হলো- তারা তো প্রায় সবাই মারাই গেছেন। এখনও যে ক’জন আছেন তাদের অবস্থা জবুথবু।
শাকিল: যেমন দুয়েকজনের নাম যদি বলতেন...
মুহিউদ্দীন খান: যেমন আবুল কাসেম ভূঁইয়া একজন। খুব কাহিল। তারপর সিলেটে ছিলো চার-পাঁচ জন।
নোমান: আচ্ছা, কে কে...
মুহিউদ্দীন খান: কবি...
নোমান: মুস্তফা কামাল না আব্দুল জাব্বার...
মুহিউদ্দীন খান: আব্দুল জাব্বার। তিনি যে গদ্য লেখতো অনেকে জানে না। তারপর...নামই তো ভুলে গেছি। দেওয়ান আজরফ সাহেবের চাচাতো ভাই একজন ছিলেন। নাম তো ভুলে গেলাম...
শাকিল: আরেকটা ব্যাপার যে, মদীনায় যারা লিখতেন বা লেখেন তারা জেনারেল শিক্ষিত বা সে ধারা থেকেই উঠে আসা। আলেম সমাজের প্রতিনিধিত্ব তেমন নেই। আলেম সমাজের অনেকেই ফাউন্ডেশনে কাজ করলেন। একটা মদীনা, একটা ফাউন্ডেশন- দুটো ধারা হয়ে গেলো। এখন যদিও দুটোই দুর্বল, তো এই ধারাটা কীভাবে তৈরি হলো- একদিকে মদীনার সাধারণ শিক্ষিত সমাজ আরেক দিকে মাদরাসা শিক্ষিত আলেম সমাজ?
মুহিউদ্দীন খান: মাদরাসা শিক্ষিত যারা, খুব কম বেরিয়ে এসেছে আমাদের সময়। এর চাইতে বরং সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত যাদের মধ্যে ইসলামী চেতনাবোধ ছিলো আমি তাদেরকে একটু বাতাস দেওয়ার চেষ্টা করছি।
শাকিল: তাদের শিক্ষার ভিত্তি কেমন ছিলো? দুর্বল শিক্ষার ভিত্তি নিয়ে ইলমি কাজ করা কতোটা নির্ভরযোগ্য?
মুহিউদ্দীন খান: আমার ধারণা- যাদের মধ্যে ইসলামের চেতনা আছে, তাদেরকে পরিচর্যা করতে পারলে ভালো লেখক বেরিয়ে আসবে। এবং আমি প্রমাণও পেয়েছি।
শাকিল: আপনারা যখন গড়ে ওঠেন, তখন তো বড় বড় আলেমরা ছিলেন। তারা আপনাদের সমর্থন করতেন বা একসাথে নিয়ে কাজ করতেন। তো তাদের মতো ব্যক্তিত্বদের সাথে যারা কাজ করেছেন বা ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছেন তাদের মধ্যে আর তেমন লোক কেন গড়ে উঠতে পারলেন না?
মুহিউদ্দীন খান: আমি যখন ঢাকায় আসি তখন তো অনেক বড় বড় লোক ছিলেন, এখন তো কেউ নেই । মাওলানা আকরাম খাঁ। মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী। পীরজি হুজুর। সিদ্দিকুর রহমান খান। মাওলানা আব্দুল্লাহিল বাকী। এই ধরনের কয়েক ডজন লোক ছিলেন ঢাকায়। মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান খান। এখন তো তেমন লোকই নাই।
শাকিল: এখন ইলম থাকলে কলম নেই আর কলম থাকলে ইলম নেই- এমন একটা ব্যাপার দাঁড়িয়েছে। এটা ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নিতে পারে?
মুহিউদ্দীন খান: আমি তো আর ভবিষ্যৎ বলতে পরবো না। তবে আমার ধারণা মতে এই সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
শাকিল: কীভাবে হতে পারে?
মুহিউদ্দীন খান: কিছু চেতনাবোধ সম্পন্ন লোক এগিয়ে আসবে।
মনযূর: হেফাজত নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত মতামত কি? তখন যেমন ছিলো, এখন সরকার যা চায়...তাদের প্রতি ভরসা রাখা যায় কি-না, সার্বিকভাবে?
নোমান: কদিন আগে বাবুনগরী সাহেব আপনার কাছে আসছিলেন- বিশেষ কোনো কথা হলো আপনাদের মধ্যে?
শাকিল: বা বিশেষ কোনো পরামর্শ?
মুহিউদ্দীন খান: বাবুনগরী আসে মাঝে-মধ্যে। খুব মুখলিস লোক। খুব মুখলিস। তার ভিতরে কোনো খাদ নাই। কিন্তু মাওলানা আহমদ শফী সাব তার মতো আর কোনো লোক পান নাই। সব দু নম্বর, দেড় নম্বর...
নোমান: ৫-৬ মে’র সময় যা ঘটলো। কেউ কেউ বাইরেও চলে গেলেন। কখন টিকিট কাটলেন আর কখন ভিসা নিলেন- বাতাসে নানা কথা ভেসে বেড়ায়- আপনার কি মনে হয়?
মুহিউদ্দীন খান: কিছু মানুষ, এরা বহু আগে থেকেই এমনই...হাওয়া কাজে লাগায়।
শাকিল: তারা এখন বড় নাম নিয়ে উচ্চ লেভেলে কাজ করছেন তাদের অবস্থা এমন হলে তাহলে বাকিদের কী হাল...
নোমান: আপনি যে বাবুনগরী সাহেবকে মুখলিস বললেন- তিনিও তো এদের সাথে নিয়েই কাজ করছেন বা যাদের নিয়ে প্রশ্ন তাদেরকে বাইরে রাখছেন না। 
মুহিউদ্দীন খান: ব্যাপার হলো কি, সংগঠন করতে যে মেধা বা যোগ্যতা সম্পন্ন লোক দরকার সেটার বরাবরই অভাব আমাদের। এখন কাউকে না কাউকে নিয়ে তো কাজ করতে হবে। 
শাকিল: এই আপস কি ঠিক হচ্ছে। ভুল মানুষদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষদের মধ্যে ব্যাপক কুধারণার জন্ম নিচ্ছে। এর ক্ষতিটা মারাত্মক না?
মুহিউদ্দীন খান: বলেই তো দিলেন...
শাকিল: মিডিয়ায় খোলাখুলি এসব সমালোচনা এসেছে তারপরও তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তখন তো মানুষ বিশ্বাস করবেই...
মুহিউদ্দীন খান: আমার তো মনে হয় তারা পত্রিকা পড়েই না...হে হে হে। মিডিয়া যে এগুলো লেখে তারা হয়তো জানেই না।
[কিছুক্ষণ নীরবতা...]
নোমান: আপনার কি কষ্ট হচ্ছে, আমরা উঠবো?
মুহিউদ্দীন খান: নাহ...থাকেন
নোমান: আপনার কি এখন নি:সঙ্গ বোধ হয়, যখন একা থাকেন?
মুহিউদ্দীন খান: না, তবে স্মৃৃতিবিভ্রমটা খুব কষ্ট দেয়।
মনযূর: এটা কি স্মৃতিবিভ্রম না কষ্ট ভুলতে চাওয়া?
মুহিউদ্দীন খান: আমার তেমন কোনো কষ্ট বা আক্ষেপ নেই।
শাকিল: আলহামদুলিল্লাহ, এটা তো অনেক বড় প্রশান্তির জায়গা...
আমরা: আপনি সামগ্রিকভাবে সবাইকে সাথে নিয়েই কাজ করেছেন- আলিয়ায় পড়েও আপনি কওমিরই প্রতিনিধি সবক্ষেত্রে- তারপরও আপনার কিছু সমালোচনা বাজারে ছড়ানো। জামাতঘেষা বা এই টাইপের...এগুলো কি আপনাকে কষ্ট দেয়?
মুহিউদ্দীন খান: আমি এগুলোকে পাত্তা দেই না। 
আমরা: এগুলোর কোনো ভিত্তি তো নেই, তবুও...
মুহিউদ্দীন খান: তা বটেই, তবে আমি এসবকে কখনো পরোয়া করি না।
নোমান: লীগ এখন যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সর্বত্র- বিরোধী জোটের নেতা বা আলেম হিসেবে ইসলামপন্থীদের ভবিষ্যৎ কেমন দেখেন- বিশেষত কওমিদের?
মুহিউদ্দীন খান: কওমিদের হালত হবে না ঘরকা না ঘাটকা। ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। বৃহত্তর ঐক্যের। তবে সবাই একত্রিত হয়ে প্লাটফর্ম তৈরি করে দিবে বা সুদিন আসবে- এসবের অপেক্ষা না করে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। যেটুকু সমঝ আছে তা নিয়েই কাজ করে যেতে হবে।... 
(অসমাপ্ত)

সংরক্ষণ ও অনুলিখন
শাকিল আদনান

বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

অন্তিম শয়ানে জুনাইদ জমশেদ।।


জানাযা ও বিরল রাষ্টীয় মর্যাদা শেষে দারুলউলুম করাচীর মাকবারায় দাফন।তিনি মরে দেখিয়ে গেলেন, দুনিয়ার স্যালিব্রেটিরা তোমরাও তাবলীগের এই মকবুল মেহনত করো। তাহলে দুনিয়া- আখেরাতে ইজ্জতওয়ালা হবে। খোদার কসম দ্বীনের উপর চললে জনপ্রিয়তা কিংবা সম্মান বাড়বে ছাড়া একটুও কমবে না।
গত ৭/১২/১৬ বৃহস্পতিবার ইন্তেকাল করেন পৃথিবীখ্যাত শিল্পী দাঈ জুনাইদ জমশেদ৷ দাওয়াতি প্রোগ্রাম শেষে তিনি বিমান দূর্ঘটনায় শহীদ হন৷ ডি এন এ টেস্ট করে সনাক্ত করা হয় লাশ৷ রাষ্ট্রীয় মর্যদায় লাশ হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে৷
গত ১৪/১২/১৬ইং তারিখে করাচিতে রাষ্টিয় মর্যাদায় সরকারের উচ্চপ্রদস্থ মন্ত্রী,বিভিন্ন বাহিনীর সামরিক কর্মকর্তা ও শীর্ষ আমলাদের উপস্থিতিতে সম্মান জানানোর পর প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্টিত হয়। বিরল সম্মান জানান দেশটির রাষ্টপতি প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই।
১৫/১২/১৬ইং দুপুর ২টায় মুঈন খান ক্রিকেট মাঠে লাখো মানুষের উপস্থিতে মূল নামাযে জানাযা অনুষ্টিত হয়৷ দাঈয়ে ইসলাম মাওলানা তারিক জামিল জানাজার নামাজ পড়ান৷ জানাযা শেষে তারঁ শেষ ইচ্ছা অনোযায়ী দারুল উলূম করাচীর গোরস্তানে দাফন করা হয়৷ জানাজা ও দাফননে দৃশ্য সম্প্রচার করে দেশটির সকল টিভি চ্যানেল।
আল্লামা মুফতী তাকি উসমানির কাছে কোনো এক সময় দারুল উলুম করাচীর গোরস্থানে দাফনের আগ্রহ ব্যাক্ত করেছিলেন পৃথিবীর সেরা পাঁচশত শীর্ষ প্রভাবশালী মানুষের একজন মরহুম হম জুনাইদ জমশেদ রহমতুল্লাহ আলাইহি।
তথ্যসূত্র- চ্যানেল আর.টি.এন

তিনি মানুষের দিল বদলের মিশন নিয়ে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ করেছেন আমৃত্যু৷মহান আল্লাহ প্রিয় জুনাইদ ভাইকে জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান বানিয়ে নিন।
আমীন।।