বুধবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৬

ম‌রে‌তো যা‌বোইঃ মৃত্যুটা হোক পাহাড়পুরী রহঃ এর মত লা‌খো দ্বীনদা‌রের কান্না‌মি‌শ্রিত দুআয়!

Lutfor Faraji

হাজা‌রো উলামার উস্তাদ। বহু মাদরাসার মুরুব্বী এবং আল্লাহ ভোলা মানু‌ষের আধ্যা‌ত্মিক রাহব‌ার শাইখুল হাদীস আল্লামা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী রহঃ। 
ক্ষণজন্মা এক মহা পুরুষ। জমীন যেমন মানু‌ষের পদস্প‌র্শে গর্ব‌বোধ ক‌রে। সমাজ যা‌কে নি‌য়ে স্বপ্ন দে‌খে। পা‌পিষ্ট যার সংস্প‌র্শে প‌রিণত হয় খাঁ‌টি সোনায়। যার কথায় ইলম আর তাক্বওয়ার নূর ঝ‌রে। দেখ‌লে মা‌লি‌কের কথা স্মরণ হয়। আম‌লে আখলা‌কে সুন্ন‌তে নববীর দ্যু‌তি ঝিল‌কে উ‌ঠে।
এমনি এক খাঁ‌টি মানুষ। মা‌টির মানুষ। প্রিয় মানুষ ছি‌লেন পাহাড়পুরী রহঃ। মৃত্যুর ছয় ঘন্টার মাথায় নির্ধা‌রিত জানাযায় তিল ধার‌ণের ঠাঁই নেই সু‌বিশাল মা‌ঠে। উপ‌ছে পড়া উলামা তুলাবা ও মুস‌ল্লি‌দের স্রোত কামরা‌ঙ্গিরচর মাদরাসা মাঠ, প্র‌তি‌টি বি‌ল্ডিং পে‌ড়িয়ে আশপা‌শের রাস্তা ভরপুর ক‌রে দেয়। 
ঢাকার শীর্ষ উলামা থে‌কে নি‌য়ে সর্বস্ত‌রের মানু‌ষের বিপুল সমাগম সা‌ক্ষি দেয় "মানুষটা ভাল ছিল"। যার বি‌য়ো‌গে কেঁ‌দে উ‌ঠে‌ছে লা‌খো মু‌মি‌নের হৃদয়। ভালবাসার টা‌নে পঙ্গপা‌লের ন্যায় ছু‌টে এ‌সে‌ছে প্রিয় মানুষ‌টির শেষ কৃত্যানুষ্ঠা‌নে।
তীব্র ভীর ঠে‌লে, মাওলানা আকরাম হুসাই‌নের কল্যা‌ণে হযর‌তের নিথর চেহারাটা যখন দে‌খি, তখন ম‌নের ম‌ণি‌কোঠায় বাসনা জা‌গেঃ মৃত্যুটা এম‌নি হোক। লা‌খো মানু‌ষের চো‌খের অশ্রু‌তে। কল্যাণী দুআর প‌রি‌বে‌শে। জীবনটা হোক হযর‌তের মত তাক্বওয়াময়। উম্মাহ দরদী কর্মব্যস্ততার। মা‌লি‌কের রা‌হে ইবাদত ও রোনাজারীময়।
আমীন। ছুম্মা আমীন।

আল্লাহ তাআলা হযরত‌কে জান্না‌তের উঁচু মাকাম দান করুন। হযর‌তের আমলী যি‌ন্দেগী সবার জন্য হোক রা‌হে হিদায়াত। আমীন


১ম শতক থেকে ১৪ শতক পর্যন্ত মুজাদ্দেদীনে কেরাম

Mohiuddin Kasemi

মুজাদ্দেদ অর্থ সংস্কারক। যারা ইসলামী দুনিয়ার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকেন। প্রত্যেক শতক ও শতাব্দীতেই এক বা একাধিক এমন মুজাদ্দেদ আল্লাহ তাআলা পাঠিয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞ আলেমদের মত, ব্যক্তি যেমন মুজাদ্দেদ হতে পারে, তদ্রপ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনও মুজাদ্দেদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 
--
১ম হিজরি শতকে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ.।
২য় হিজরি শতকে মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস শাফেঈ রহ.।
৩য় হিজরি শতকে আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে শুরাইহ রহ.।
৪র্থ হিজরি শতকে আবুবকর ইবনুল খতিব বাকিল্লানি রহ.।
৫ম হিজরি শতকে আবু হামেদ গাজালি রহ.।
৬ষ্ঠ হিজরি শতকে আবু আব্দল্লাহ রাজি রহ.।
৭ম হিজরি শতকে তাকিউদ্দিন ইবনে দাকিকুল ঈদ রহ.।
৮ম হিজরি শতকে জাইনুদ্দিন ইরাকি, শামসুদ্দিন জাযারি ও সিরাজুদ্দিন বালকীনি রহ.।
৯ম হিজরি শতকে জালালুদ্দিন আবদুর রহমান সূয়ুতি ও শামসুদ্দিন সাখাবি রহ.।
১০ম হিজরি শতকে শিহাবুদ্দিন রামলি ও মোল্লা আলি কারী রহ.।
১১শ হিজরি শতকে শায়খ আহমদ সেরহিন্দি মুজাদ্দেআলফেসানী রহ.।
১২শ হিজরি শতকে শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবি রহ.।
১৩শ হিজরি শতকে সাইয়্যেদ আহমদ শহিদ রহ.।
১৪শ হিজরি শতকে আশরাফ আলী থানবী ও মুহাম্মদ ইলয়াস রহ.।

জ্ঞানচর্চা ও সময়ের মূল্যায়নে মনীষীগণ

Mohiuddin Kasemi

১. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন : আমার সবচেয়ে বেশি আফসোস এমন দিনের জন্য, যে দিনের সূর্য ডুবে গেল, আমার দুনিয়ার হায়াত কমে গেল, অথচ সেদিনে আমার নেক আমল বৃদ্ধি পেল না!
২. হাসান বসরী র. বলেন : হে আদম সন্তান! তুমি তো কতক দিনের সমষ্টি মাত্র, যখন একটি দিন অতিবাহিত হল তোমার জীবনের একাংশ হারিয়ে গেল।
৩. খলিল ইবনে আহমদ আল-ফারাহিদি (জন্ম- ১০০ হি., মৃত্যু ১৭০ হি.) বলতেন, আমার কাছে সবচে অসহনীয় হল খাওযার সময়। কারণ, এসময় জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা থেকে বিরত থাকতে হয়।
৪. ইমাম আবু ইউসুফ (১১৩-১৮২হি.) ২৯ বছর ইমাম আবু হানিফা রহ. এর সাহচর্যে থাকেন। দীর্ঘ এ সময়ে কখনো তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেন নি। একবার ইমাম আবু ইউসুফের এক সন্তান ইন্তেকাল করল। সন্তানের দাফনকাফনের দায়িত্ব আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ওপর ন্যস্ত করে আবু হানিফার দরসে চলে যান। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, যদি উস্তাদের একটি দরস ছুটে যায় সারাজীবন এই অনুতাপ আমার শেষ হবে না।
৫. উবাইদ ইবনে ইয়াঈশের মৃত্যু হয় ২২৯ হিজরি সনে। ইমাম বুখারি ও মুসলিমের উস্তাদ। তিনি বলেন : একাধারে ত্রিশ বছর যাবৎ নিজ হাতে রাতের খাবার কখনো খাওয়ার সুযোগ হয়নি। এ সময় আমি হাদীস লিখে যেতাম আর আমার বোন আমার মুখে খাবার তুলে দিতেন।
৬. ফুযায়ল ইবনে ইয়ায বলেন : আমি তো এমন ব্যক্তি সম্পর্কেও জানি, যিনি সময়ের অপচয় রোধ করার জন্য এক জুমা থেকে পরের জুমা পর্যন্ত নিজের কথাগুলো লিখে রাখতেন।
৭. দাউদ আত্তায়ী রহ. সময় বাচাতে ছাতু গুলিয়ে পান করতেন। নিজেই এর কারণ বর্ণনা করে বলেন : ছাতু গিলে খাওয়া আর রুটি চিবিয়ে খাওয়ার মধ্যে যে সময়ের ব্যবধান সে সময়ে প্রায় পঞ্চাশ আয়াত তেলাওয়াত করা যায়।
৮. ইবনুল জাওযী রহ. যেসকল কলম দিয়ে শুধু হাদিস লিখতেন সেগুলোর চাঁছা, কাটামাথা জমিয়ে রাখতেন। মৃত্যুর পূর্বে অছিয়ত করে গেছেন, তার শেষ গোসলের পানি এগুলি দিয়ে যেন গরম করা হয়। ঠিক তাই করা হলো। 
৯. ইমাম তাইমিয়া (৫৫০-৬৫৩ হি.) সম্পর্কে ইবনুল কাইয়িম বলেন : ইবনে তাইমিয়ার পৌত্র বলেন, আমার দাদা যখন প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যেতেন আমাকে বলতেন, এই কিতাবটি এতটা জোরে পড় যেন আমি শুনতে পাই। এতে আমার সময়টুকু অনর্থক কাটবে না।
১০. ইমাম নববী রহ. বলেন : আমি প্রায় দুবছর এভাবে কাটিয়েছি যে, বিছানায় আমার পিঠ স্পর্শ করে নি।

সোমবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৬

ওয়াজ শোনার সময় চিৎকার করা, লাফানো

Mohiuddin Kasemi

কোনো লেখাই কারো বিরুদ্ধে লিখি না। সহিহ সুন্নাহ ও ফিকহে ইসলামীর আলোকে লেখার চেষ্টা করি। কারো বিরুদ্ধে চলে গেলে আমাকে মাজুর মনে করার অনুরোধ রইল)
--
ওয়াজ শুনতে হয় অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে। গভীর ধ্যান ও খেয়ালের সাথে ওয়াজ শ্রবণ করাই সাহাবিদের তরিকা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ওয়াজ করতেন, কথা বলতেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম এমন মনোযোগের সাথে শুনতেন যে, তাঁদের মাথার ওপর পাখিও বসে যেত! 
মালিকুল উলামা আল্লামা কাসানি রহ. স্বীয় বিখ্যাত কিতাব বাদায়েউস সানায়েতে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন : 
عن قَيْسِ بن عُبَادَةَ أَنَّهُ قال كان أَصْحَابُ رسول اللَّهِ صلى اللَّهُ عليه وسلم يَكْرَهُونَ الصَّوْتِ عِنْدَ ثَلَاثَةٍ عِنْدَ الْقِتَالِ وَعِنْدَ الْجِنَازَةِ وَالذِّكْرِ.
অর্থ : হযরত কায়েস ইবনে উবাদা হতে বর্ণিত, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিগণ যুদ্ধ, জানাযা ও জিকরের সময় কণ্ঠস্বর বুলন্দ করা অপছন্দ করতেন। (বাদায়েউস সানায়ে : খ. ১, পৃ. ৩১০) 
এখানে জিকর শব্দ দ্বারা ওয়াজ-নসিহত উদ্দেশ্য। আল্লামা ইবনে নুজাইম রহ. বলেন : وَالْمُرَادُ بِالذِّكْرِ الْوَعْظُ
শামসুল আইম্মা সারাখসি রহ. বলেন, উপরের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, কুরআন তেলাওয়াত ও ওয়াজের সময় আওয়াজ বুলন্দ করা মাকরুহ।

তদ্রƒপ ওয়াজ শোনার সময় লাফালাফি করা, দৌঁড়াদৌঁড়ি করা, কাপড় ছিড়ে ফেলা সবই মাকরুহ ও অপছন্দনীয় কাজ। এসব হতে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লামা ইবনে নুজাইম রহ. ইমাম সারাখসি রহ. এর অভিমত উল্লেখ করেন : 
وقال الْإِمَامُ شَمْسُ الْأَئِمَّةِ السَّرَخْسِيُّ فَفِي هذا الحديث بَيَانُ كَرَاهَةِ رَفْعِ الصَّوْتِ عِنْدَ سَمَاعِ الْقُرْآنِ وَالْوَعْظِ فَتَبَيَّنَ بِهِ أَنَّ ما يَفْعَلُهُ الَّذِينَ يَدَّعُونَ الْوَجْدَ وَالْمَحَبَّةَ مَكْرُوهٌ لا أَصْلَ له في الدِّينِ وَتَبَيَّنَ بِهِ أَنَّهُ يُمْنَعُ الْمُتَقَشِّفَةُ وحمقاء ( وحمقى ) أَهْلِ التَّصَوُّفِ مِمَّا يَعْتَادُونَهُ من رَفْعِ الصَّوْتِ وَتَمْزِيقِ الثِّيَابِ عِنْدَ السَّمَاعِ لِأَنَّ ذلك مَكْرُوهٌ في الدِّينِ عِنْدَ سَمَاعِ الْقُرْآنِ وَالْوَعْظِ.
(আল-বাহরুর রায়েক : খ. ৫, পৃ. ৮২)

আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী রহ. ফাতাওয়া আলমগিরির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন : 
( قَوْلُهُ وَإِزْعَاجُ الْأَعْضَاءِ ) قَالَ فِي الْهِنْدِيَّةِ : رَفْعُ الصَّوْتِ عِنْدَ سَمَاعِ الْقُرْآنِ وَالْوَعْظِ مَكْرُوهٌ ، وَمَا يَفْعَلُهُ الَّذِينَ يَدَّعُونَ الْوَجْدَ وَالْمَحَبَّةَ لَا أَصْلَ لَهُ ، وَيُمْنَعُ الصُّوفِيَّةُ مِنْ رَفْعِ الصَّوْتِ وَتَخْرِيقِ الثِّيَابِ ، كَذَا فِي السِّرَاجِيَّةِ .
(ফাতাওয়া শামী : খ. ৪, পৃ. ১১৪) 
--
তবে কেউ যদি ওয়াজ শুনে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়, তখন তার যে কোনো কাজ গোনাহ হবে না। তার আকল ও জ্ঞান না থাকার কারণে। যাদের এমন হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাদের ওয়াজ না শোনাই উত্তম; যেন তার কারণে অন্যের ওয়াজ শুনতে সমস্যা না হয়।

মসজিদে থাকা-খাওয়া, ঘুমানো ও রাতযাপন

Mohiuddin Kasemi

মসজিদে থাকা-খাওয়া, ঘুমানো ও রাতযাপন করা প্রসঙ্গে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। কেউ বলছে, এটা নাজায়েয। আবার অনেকে মাকরুহ বলছেন। মূলত তাবলিগের ভাইয়েরা মসজিদে অবস্থান করেন, খাওয়া-দাওয়া করেন, ঘুমান; তাদের বিরুদ্ধবাদীরা এসব বলে বেড়াচ্ছে। আসলেই কি মসজিদে ঘুমানো নাজায়েয? বা মাকরুহ? 
মূলত মসজিদ হচ্ছে ইবাদতের ঘর। জিকির-আজকার, তেলাওয়াতের স্থান। বসবাস করার জায়গা না। তবে ইবাদতের প্রয়োজনে মসজিদে অবস্থান করা জায়েয। নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণ, কুরআন শিক্ষা করা বা দেওয়া ইত্যাদি প্রয়োজনে মসজিদে অবস্থান করা জায়েয। অবস্থান করা যেহেতু জায়েয তাই সেখানে খাওয়া-দাওয়া করা, ঘুমানো ও রাতযাপন করাও জায়েয। তবে আশপাশে বসবাস করার মতো নিজের বাসা-বাড়ি থাকলে মসজিদে অবস্থান না করাই উত্তম। তদ্রƒপ মুসাফিরের জন্যেও মসজিদে অবস্থান করা বৈধ। ফাতাওয়া শামী ও আলমগীরিতে আছে, কেউ মসজিদে শুইতে চাইলে ইতিকাফের নিয়তে প্রবেশ করবে; তারপর কিছু নামায বা ইবাদত করবে। অতঃপর যা ইচ্ছা তা করতে পারবে। এভাবেই মসজিদে থাকা উত্তম। তখন আর কেউ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না। 
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষদশকের ইতিকাফ ছাড়া মসজিদে ঘুমিয়েছেন বলে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই মসজিদে অবস্থান করতেন, ঘুমুতেন। তিরমিযি শরিফের বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ তুহফাতুল আহওয়াযিতে রয়েছে : وقد كان أصحاب النبي صلى الله عليه و سلم يبيتون في المسجد সাহাবিগণ মসজিদে ঘুমুতেন। 
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন : 
عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ كُنَّا نَنَامُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَسْجِدِ وَنَحْنُ شَبَابٌ
অর্থ : রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আমরা মসজিদে ঘুমুতাম; তখন আমরা যুবক ছিলাম। (তিরমিযি, হাদিস নং- ; এ হাদিসটি বর্ণনার পর ইমাম তিরমিযি হাদিস ও বিষয় সম্পর্কে মন্তব্য করেন : 
قَالَ أَبُو عِيسَى حَدِيثُ ابْنِ عُمَرَ حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ وَقَدْ رَخَّصَ قَوْمٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ فِي النَّوْمِ فِي الْمَسْجِدِ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ لَا يَتَّخِذُهُ مَبِيتًا وَلَا مَقِيلًا وَقَوْمٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ ذَهَبُوا إِلَى قَوْلِ ابْنِ عَبَّاسٍ
--
প্রখ্যাত তাবেয়ি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব ও সুলাইমান ইবনে ইয়াসারকে মসজিদে ঘুমানো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে দুনোজন বলেন : 
فقالا كيف تسألون عنها وقد كان أهل الصفة ينامون فيه وهم قوم كان مسكنهم المسجد
অর্থ : মসজিদে ঘুমানো সম্পর্কে কিভাবে জিজ্ঞেস কর; অথচ আহলে সুফফার সাহাবিগণ মসজিদেই ঘুমুতেন। মসজিদই তাঁদের বসবাসের স্থান ছিল। 
উপরের বক্তব্য তুহফাতুল আহওয়াযি (খ. ২, পৃ. ২২৮) থেকে নেওয়া। সেখানে আরো রয়েছে :
وذكر الطبري عن الحسن قال رأيت عثمان بن عفان نائما فيه وليس حوله أحد وهو أمير المؤمنين قال وقد نام في المسجد جماعة من السلف بغير محذور للانتفاع به فيما يحل كالأكل والشرب والجلوس وشبه النوم من الأعمال

এক্ষেত্রে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. মসজিদে ঘুমানো অপছন্দ করেছেন। তবে তিনিও বলেছেন, নামায পড়ার উদ্দেশ্যে হলে মসজিদে ঘুমানোও কোনো অসুবিধা নেই। আরবি ইবারত দেখুন :
عن بن عباس فروى عنه أنه قال لا تتخذ المسجد مرقدا . وروى عنه أنه قال إن كنت تنام فيه لصلاة لا بأس.

সুতরাং বুঝতে পারলাম, মুসাফির ও ঘরবাড়িহীন লোকজন মসজিদে থাকতে পারবে। তদ্রƒপ ইবাদতের উদ্দেশ্যও মসজিদে থাকা যায়। তবে মসজিদে যেই থাকুক ইতিকাফ ও ইবাদতের নিয়তে থাকবে। তখন আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না। তখন তা সম্পূর্ণ জায়েয হয়ে যাবে। হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ও ফিকহের কিতাবগুলোতে আরো বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

জাল হাদিস, ভিত্তিহীন রেওয়ায়াত, মিথ্যা ঘটনা ইত্যাদি বর্ণনা করা

Mohiuddin Kasemi

ওয়াজ-নহিসতের মধ্যে আরেকটি বড় খারাবি হল, হাদিস ও ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয় না। অধিকাংশ বক্তারই খেয়াল থাকে কিভাবে শ্রোতাদের মন আকর্ষণ করা যাবে। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যে অনেক ওয়ায়েজ জাল হাদিস, ভিত্তিহীন রেওয়ায়াত, মিথ্যা ঘটনা কিংবা অনির্ভরযোগ্য ইসরাইলি রেওয়ায়াত ইত্যাদির আশ্রয় গ্রহণ করে। 
কথা বলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা কাম্য। অনির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবের ঘটনা বা বিষয় পূর্ণ তাহকীক না করে বলা কোনোক্রমেই উচিত নয়। পূর্বসূরিগণ ওয়াজের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। ইমাম গাজালি রহ. বলেন : 
ما ترى أكثر الوعاظ في هذا الزمان يواظبون عليه وهو القصص والأشعار والشطح والطامات أما القصص فهي بدعة وقد ورد نهي السلف عن الجلوس إلى القصاص وقالوا لم يكن ذلك في زمن رسول الله صلى الله عليه و سلم . حديث : لم تكن القصص في زمن رسول الله صلى الله عليه و سلم رواه ابن ماجه من حديث عمر بإسناد حسن . ولا في زمن أبي بكر ولا عمر رضي الله عنهما حتى ظهرت الفتنة وظهر القصاص وروى أن ابن عمر رضي الله عنهما خرج من المسجد فقال ما أخرجني إلا القاص ولولاه لما خرجت. 
(এহইয়াউ উলুমুদ্দীন : খ. ১, পৃ. ৩৪) 
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন : 
أَكْذَبُ النَّاسِ الْقُصَّاصُ ، وَالسُّؤَالُ
অর্থ : মানুষের মাঝে সবচেয়ে বড় মিথ্যবাদী হল কাহিনীকার ওয়ায়েজ ও ভিক্ষাপ্রার্থী। (ইবনুল হাজ মালেকী রহ. রচিত আল-মাদখাল : পৃ. ২, পৃ. ১৪৬)

সুতরাং কোনো ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কোনো কাহিনী যদি মিথ্যার কালিমামুক্ত ও বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয় এবং তা কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়; উপরন্তু তা ঈমান ও আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে ও তা শিক্ষামূলক হয়, তাহলে এমন কাহিনী বর্ণনা করতে কোনো দোষ নেই। পবিত্র কুরআন ও হাদিসেও অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হাসান বসরি, সাঈদ ইবনে যুবায়ের, উবায়েদ ইবনে উমায়ের, কাব আহবার, মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাযি রহ. প্রমুখ তাবেয়ি ওয়াজ-নসিহতে ঘটনা বর্ণনা করতেন বলে জানা যায়। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা : খ. ৬, পৃ. ১৯৫)

বুধবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৬

হজ্ব কার উপর কখন ফরজ হজ্জের আহকাম আরকানসমূহ


আমীনুল ইসলাম আমীন

আল্লাহর সন্তুষ্টিরর জন্য মানুষের উপর বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্ব ফরজ করা হইয়াছে ঐ সব লোকের উপর, যাহারা যাতায়াতের সামর্থ রাখে। (আল ইমরান) এই আয়াত দ্বারা হজ্ব ফরজ সাব্যস্ত হইয়াছে। কেউ যদি হজ্বকে অস্বীকার করে সে কাফের হয়ে যাবে, আর হজ্ব ফরজ হয়েছে যদি না করে কঠিন গুনাহগার হবে। রহমতে আলম সা. এরশাদ করেন ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি তার মধ্যে অন্যতম হল হজ্ব আদায় করা। (মুসলিম) রাসূল সা. বলেন আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর হজ্ব ফরজ করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ্ব কর। (মুসলিম) হজ্ব কাকে বলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মক্কা মোয়াজ্জমায় বিশেষ স্থান নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশেষ কার্যপদ্ধতি সহকারে পরিদর্শন করাকে হজ্ব বলে। নবম হিজরিতে হজ্ব ফরজ হয়েছে। 

হজ্ব ফরজ হওয়ার জন্য শর্তসমূহ:- (১) মুসলমান হওয়া (২) আযাদ হওয়া (৩) বালেগ হওয়া (৪) আক্বেল হওয়া (৫) সুস্থ হওয়া (৬) পরিবারের খরচ ব্যতিত হজ্বের কাজ সম্পাদন করার মত সম্পত্তি থাকা (৭) হজ্বের রাস্তা নিরাপদ হওয়া (৮) মহিলার জন্য মুহরিম সাথে থাকা।★
::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
হজ্ব তিন প্রকার :- (১) ইফরাদ " হজের মাসে কেবলমাত্র হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধে হজ্ব করাকে হজ্জে ইফরাদ বলে। এরুপ হাজীকে বলা হয় মুফরিদ। (২) তামাত্তু :- হজের মাসে প্রথমে উমরাহর নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরাহ শেষ করে পুনরায় ৮ ই যিলহজ্ব মক্কা থেকে হজের ইহরাম বেঁধে হজ্ব করাকে হজ্জে তামাত্তু বলে। এরুপ হাজীকে বলা হয় মুতামাত্তি। (৩) ক্বিরান:- একই ইহরামে হজ্ব ও উমরাহ এক সাথে মিলিয়ে করাকে বলা হয় হজ্বে কিরান। এরুপ হাজীকে বলা হয় ক্বারিন। এই তিন প্রকার হজের মধ্যে ক্বিরান হজই উত্তম। রাসূল সা. এর জীবনের শেষ হজ ছিল হজ্বে ক্বিরান। (মিশকাত) 
হজ্বের ফরজ ৩ টি :- (১) এহরাম বাঁধা। (২) ৯ ই যিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা, (৩) তাওয়াফে যিয়ারত করা। 
হজ্বের ওয়াজিব ৬ ছয়টি :- (১) মুজদালাফার ময়দানে অবস্থান, (২) ছাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয়ের মধ্যে দৌড়ানো, (৩) শয়তানকে কংকর মারা, (৪) বিদেশীদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা, (৫) মাথা মুড়ানো অথবা চুল ছাঁটা স্ত্রীলোকের চুল হইতে কিছু কর্তন করা (৬) কাফফারা বা হজ্বের কার্যসমূহ ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য দম বা একটি কোরবানী করা। উপরোল্লিখিত ফরয ও ওয়াজিব কার্যাবলী ব্যতীত অন্যান্য সকল আমল সুন্নত ও মুস্তাহাব।
হজ্বে মাবরুর এর ফাজীলত ও হজ্বের উৎসাহ, হে মাওলা কবুল কর আমায়। পুরাটা পড়লে উপকৃত হবেন। ২য় পর্ব
-----------------------------------------------------------------------
★রহমতে আলম সা. এরশাদ করেন যেই ব্যক্তি শুধু আল্লাহর রেজামন্দীর জন্য হজ্ব করে, উহাতে কোন ফাহেশা কথা কাজ বা অবাধ্যাচরণমূলক কাজ করে না, সে হজ্ব হইতে এমনভাবে নিষ্পাপ প্রত্যাবর্তন করে যেমন সে আজ মায়ের গর্ভ হইতে জন্ম নিল। (সু্বহানাল্লাহ) ওলামাগণ লিখিয়াছেন, এই সব হাদীসের অর্থ হইল, ছগীরা গুনাহ সমূহ মাফ হইয়া যায়। অবশ্য কোন কোন আলেম এই সিদ্বান্তে পৌঁছিয়াছেন যে, হজ্বের দ্বারা ছগীরা কবীরা উভয় প্রকার গুনাহ মাফ হইয়া যায় বান্দাহর হক্ব ব্যতীত।®রহমতে আলম সা. এরশাদ করেন নেকীওয়ালা হজ্বের বদলা (কবুল হজ্বের বদলা) জান্নাত ব্যতীত আর কিছু নয়। ,সুবহানাল্লাহ, (বোখারী মুসলিম)
®হুজুর সা. এরশাদ করেন হাজী যখন লাব্বায়িক বলিতে থাকে তখন তাহার ডানে বামের যাবতীয় পাথর, বৃক্ষ এবং ধূলাবালি লাব্বায়িক বলিতে থাকে। এমনকি জমিনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ইহা বলিতে থাকে। "সুবহানাল্লাহ" (মিশকাত)
®রহমতে আলম সা. বলেন, হজ্বের মধ্যে খরচ করা জেহাদের মধ্যে খরচ করার সমতূল্য। অর্থাৎ এক টাকায় সাত শত টাকার ছওয়াব। (তারগীব)
®হজুর সা. এরশাদ করেন কেহ হজ্ব করিতে এরাদা করিলে তাড়াতাড়ি আদায় করা উচিৎ। (আবু দাউদ) ®হজুর সা. আরো বলেন যে ব্যক্তি হজ্বে রওয়ানা হইয়া পথিমধ্যে মারা যায়, কেয়ামত পর্যন্ত সে হজ্বের ছওয়াব পাইতে থাকিবে। সু্বহানাল্লাহ। (তারগীব)★
:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
রহমতে আলম সা. এরশাদ করেন, হজ্বের এরাদা করিয়া ঘর হইতে বাহির হইলে ছওয়ারীর প্রতি কদম উঠানামায় তোমাদের আমলনামায় এক একটি নেকী লেখা যাইবে। এবং একটি করিয়া গোনাহ মাফ হইয়া যাইবে। তওয়াফের পরের দুই রাকাত নামায়ে একজন আরবী গোলাম আজাদের ছওয়াব পাওয়া যাইবে। ছাফা মারওয়া দৌড়াইলে সত্তরটি গোলাম আযাদ করার ছওয়াব পাওয়া যায়। আরাফাতের ময়দানে মানুষ যখন একত্রিত হয় তখন আল্লাহ পাক প্রথম আসমানে আসিয়া (আল্লাহর রহমত) ফেরেশতাদের নিকট গর্ব করিয়া বলেন যে, আমার বান্দারা দূর - দূরান্ত হইতে এলোমেলো চুল নিয়া আসিয়াছে, তাহারা আমার রহমতের বিখারী। হে বান্দাগণ তোমাদের গোনাহ যদি জমিনের ধূলিকণা বরাবরও হয় অথবা সমুদ্রের ফেনা বরাবরও হয়, তবুও উহা আমি মাফ করিয়া দিলাম। এবং কি যাহাদের জন্য তোমরা সুপারিশ করিবে তাহাদেরকেও ক্ষমা করিয়া দিলাম। প্রিয় বান্দারা আমার ক্ষমাপ্রাপ্ত হইয়া তোমরা নিজ নিজ বাড়ী চলিয়া যাও। শয়তানকে পাথর মারার ছওয়াব এই যে, প্রত্যেক পাথর টুকরায় তাহাকে ধ্বংস করার উপযোগী এক একটা পাপ মাফ হইয়া যায়। আর কোরবানীর বদলে আল্লাহর দরবারে তোমাদের জন্য পুঁজি জমা রহিল। এহরাম খোলার সময় মাথার চুল কাটার মধ্যে প্রত্যেক চুলের বদলে একটি করিয়া নেকী, একটা করিয়া গোনাহ মাফ। সর্বশেষ যখন জিয়ারত করা হয় তখন বান্দার আমলনামায় কোন গোনাহই থাকে না। বরং একজন ফেরেশতা তাহার কাঁধে হাত বুলাইয়া বলিতে থাকে তুমি এখন হইতে নতুন করিয়া আমল করিতে থাক, তোমার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হইয়াছে। (সুবহানাল্লাহ) (তারগীব)
===================================
হুজুর সা. এরশাদ করেন, কা'বা শরীফের উপর দৈনিক আল্লাহ তায়ালার তরফ হতে একশত বিশটা রহমত নাজেল হয়, তন্মধ্যে ষাট রহমত তওয়াফকারীদের জন্য, চল্লিশ রহমত নামাজীদের জন্য এবং বিশ রহমত দর্শকদের জন্য। সুবহানাল্লাহ (বায়হাকী)
আয় রাব্বে কা'বা জীবনে একটাই চাওয়া কাপনের কাপড় পরার আগে এহরামের কাপড় পরার তাওফীক্ব দিয়ে দেন আমীন।







বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৬

হিজাব...........................


(ইমরান হুসাইন আদিব)

পর্দা বা হিজাব নারীর ভূষণ।পর্দা নারীকে মানুষের কু দৃষ্টি থেকে হেফাজত করে এবং পর্দার দরুন মেয়েরা ইভটিজিং এবং ধর্ষণ নামক মহা প্রলয় থেকে রক্ষা পায়।পর্দা বা হিজাবের মাঝেই মেয়েদের নিরাপত্তা অনেকটাই পরিলক্ষিত হয়।যা আমাদের সমাজের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি।

,
কিন্তু আমাদের সমাজে কতিপয় লুচি আজ পর্দা বিমুখিতায় অনড় ভূমিকা পালন করছে।কলেজ ভার্সিটি থেকে হিজাব পরিহিত মেয়েদের লাঞ্চিত করে তাড়িয়ে দিয়ে ১৪ শত বছরের কৃষ্টি কালচার নিধনে অনেকটাই নাস্তিকতার ভূমিকা পালন করছে।ওরা মেয়েদের রাস্তায় পর্দাবিহীন দেখতে ভাল বাসে।জিন্স আর ফতুয়া পরলে ওদের জন্য আরো ভাল।এটাই নাকি ফ্যাশন.........?
,
পর্দাবিহীন থাকা এটা পশ্চিমা সংস্কৃতি।আর পশ্চিমা সংস্কৃতি কখনো আমাদের অনুকরণের বস্ত্ত হতে তথা ফ্যাশন পারে না। ঐ সভ্যতায় কি নারীর বিন্দুমাত্র মর্যাদা আছে? সেখানে তো নারী নিছক ভোগের বস্ত্ত। বিভিন্ন উপায়ে নারীকে প্রলুব্ধ করা হয়েছে পুরুষের আনন্দের চিতায় আত্মাহুতি দেওয়ার জন্য। এটাই নাকি আধুনিক! নারীর পরম মোক্ষলাভ!
,
তাই সুশীল সমাজ বাদী তসলিমার চেলাদের থিউরি হচ্ছে আমরা শুটকি ঝুলিয়ে রাখবো,কিন্তু বিড়াল কে খেতে দিবো না।অর্থাৎ মেয়েরা পর্দা করতে পারবে না আবার রাস্তায় কিছু হলে পাগলি কুকুরের ন্যয় হাক ডাক শুরু করে দেয়।দু দিন প্রতিবাদের ঝড় উঠে তৃতীয়দিনের মাথায় মামলা খালাস। কোন বিচার নেই বললেই চলে।এই পর্যন্ত একটি ধর্ষণের বিচার হতে দেখিনি।
,
হিজাব বা পর্দা নারীকে সম্মানিত করেছে ।হিজাব এমনই একটি যৌক্তিক বিধান যা ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্য যথেষ্ট।কেননা পাশ্চাত্যের অসংখ্য অমুসলিম নারী ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে শুধু হিজাব আর পর্দার সুফল লক্ষ্য করে।
,
কেননা হিজাব গ্রহনকারী নারীদের ইভ-টিজিং এর শিকার হতে হয়না। বখাটে-মাস্তানরা পর্যন্ত তাদের সম্মান করে। অনেক অধার্মিককেও দেখা যায় যে, সে চায় তার মা, বোন, স্ত্রী হিজাব মেনে চলুক। কারন ধর্মীয় দিক নাহোক যৌক্তিক দিককে তারাও অস্বীকার করতে পারে না।


বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০১৬

পবিত্র কুরআনের বিষয়বস্তু

Mohiuddin Kasemi

মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞানের উৎস। আল্লাহ পাকের পরিচিতি, মানবসৃষ্টির ইতিবৃত্ত, স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের পন্থা, নাগরিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বিনির্মাণ, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সফলতা ও মুক্তি লাভের পদ্ধতি ইত্যাকার হাজারো জ্ঞানের আধার এ কুরআন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন কোনো দিক রয়েছে যা পবিত্র কুরআনে নেই? মানবকল্যাণের এমন কোনো পন্থা আছে যার নির্দেশ কুরআন দেয় নি? মানব-মনের এমন কোনো জিজ্ঞাসা রয়েছে যার সমাধান কুরআনে নেই? 
কাজি আবুবকর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আরাবি রহ. লিখেন : পবিত্র কুরআনে সত্তর হাজার ইলম রয়েছে। বিগত ১৪শ বছর ধরে ওলামায়ে কেরাম কুরআনের মর্মবাণী উপলব্ধি করার জন্য যে অক্লান্ত সাধনা করছেন এর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই এ বিষয়ে কিঞ্চিৎ ধারণা লাভ করা যাবে।
মুসনিদুল হিন্দ হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. লিখেন : পবিত্র কুরআনে যে জ্ঞানভা-ার রয়েছে তাকে আমরা সংক্ষিপ্তভাবে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করতে পারি। এগুলো সামনে রেখে কুরআনচর্চায় লিপ্ত হলে কুরআনের মর্ম ও ভাব হৃদয়ঙ্গম করা সহজতর হবে।
১. : علم الاحكام বিধি-বিধান সম্পর্কিত জ্ঞান। অর্থাৎ ইবাদত, মুআমালাতÑলেনদেন, গার্হস্থ্য-ব্যবস্থা, সামাজিক আচার-আচরণ ও রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ের বিধি-বিধান; যেমন : ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব, মুবাহ, মাকরুহ ও হারাম সম্পর্কিত জ্ঞান। কুরআনে কারিমের পাঁচশত আয়াত বিধি-বিধান সংবলিত। এ প্রকার জ্ঞানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দায়িত্ব ফিক্হশাস্ত্রবিদগণ ও মুফতি সাহেবদের ওপর। 
২. : علم الجدل তর্কবিদ্যা। অর্থাৎ ইহুদি, খ্রিস্টান, মুশরিক ও মুনাফিক এই চার পথভ্রষ্ট দলের সাথে তর্ক ও বাদানুবাদ সম্পর্কিত জ্ঞান। কুরআনের এ জ্ঞানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা ও একে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত করার দায়িত্ব متكلم তথা ধর্মতত্ত্ববিদগণ আলেমদের ওপর ন্যস্ত।
৩. : علم التذكير بآلآء الله আল্লাহর নেয়ামতসমূহ উল্লেখপূর্বক উপদেশদান সম্পর্কিত জ্ঞান। যেমন- আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির বর্ণনা। মানুষকে প্রাকৃতিকসূত্রে তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শিক্ষাদান ও আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ গুণাবলির বর্ণনা।
৪. : علم التذكير بايام الله অনুগত বান্দাদেরকে অনুগ্রহদান এবং অপরাধীদেরকে শাস্তিপ্রদান সম্পর্কিত যেসব ঘটনা আল্লাহ তাআলা অতীতকালে সংঘটিত করেছেন সেগুলো উল্লেখপূর্বক মানুষকে উপদেশদান সম্পর্কিত জ্ঞান।
৫. : علم التذكير بالموت ومابعده মৃত্যু ও মৃত্যুপরবর্তী বিষয়াদি যেমনÑ পুনরুত্থান, হাশর বা সমবেতকরণ, হিসাব-নিকাশ, পাপ-পুণ্য পরিমাপের তুলাদ- এবং জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি বর্ণনা করে মানুষকে উপদেশ সম্পর্কিত জ্ঞান।
শেষোক্ত এ তিন বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণদান এবং আনুষঙ্গিক হাদিস ও সাহাবাদের বাণী উল্লেখ করা মুবাল্লিগ, ওয়ায়েজ ও খতিবগণের দায়িত্ব। (আল-ফাউযুল কাবির, প্রথম বাব)
এ ছাড়া কুরআনে আকাঈদ তথা ধর্মবিশ্বাসের আলোচনাও বিধৃত হয়েছে। উল্লিখিত পাঁচ প্রকারের তৃতীয় প্রকারে এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। হযরত মাও. আবদুল হক হাক্কানি রহ. ইলমে নাহু, সরফ, তাজবিদ, মাআনি, বালাগাত, ফিক্হ, ফারায়েজ এবং ইলমে তাসাওউফসহ আরো অনেক ইলমের উল্লেখ করেছেন। 
মূলত পবিত্র কুরআন জ্ঞানের মহাসমুদ্র। সমুদ্রের মণি-মুক্তা ও ভা-ার যেমনি যুগ-যুগান্তরে আহরণ করেও শেষ করা যায় না, তেমনি কুরআনের মহাসমুদ্র থেকে জ্ঞান আহরণ করা হচ্ছে এবং হবে; তবুও এ জ্ঞানভা-ার কখনো নিঃশেষ হবে না, ফুরিয়ে যাবে না। গোটা মানবতার মুক্তির সনদ ও সাবির্ক কল্যাণের নিশ্চিত সংবিধানরূপে অবতীর্ণ হয়েছে এ পবিত্র কুরআন। সর্বোপরি কুরআনের জ্ঞান শাশ্বত, চিরন্তন, অনন্ত, অসীম ও অফুরন্ত। সকল জ্ঞানের আধার ও মূল উৎস এ পাক কুরআন।

কুরআন হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহর তাওরাত-ইঞ্জিল হেফাজতের দায়িত্ব উম্মতের

Mohiuddin Kasemi

কুরআনে যে আদৌ পরিবর্তন সম্ভব নয়, এ প্রসঙ্গে বাদশা ‘মামুনুর রশিদ’-এর দরবারের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। ইমাম কুরতুবি রহ. বর্ণনা করেন :
বাদশা মামুনের দরবারে মাঝে মাঝে জ্ঞানচর্চা ও বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হত। এতে বিভিন্ন বিষয়ের পণ্ডিতগণ অংশগ্রহণ করতেন। জাতি-ধর্মের কোনো ভেদাভেদ সেখানে ছিল না। এমনই এক আলোচনাসভায় একজন ইহুদি পণ্ডিতও অংশগ্রহণ করল। পোশাক-পরিচ্ছদের দিক দিয়েও তাকে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মনে হল। এছাড়া তার বিজ্ঞজনসুলভ আলোচনাও সকলকে মুগ্ধ করে ফেলল। আলোচনা শেষে বাদশা তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন- আপনি কি ইহুদি? সে জওয়াবে বলল, হাঁ। অতঃপর পরীক্ষার উদ্দেশে বাদশা তাকে বললেন- আপনি মুসলমান হলে আপনার সাথে খুবই উত্তম ব্যবহার করা হবে। কিন্তু সে জওয়াব দিল- “আমি পৈতৃক ধর্ম বিসর্জন দিতে পারি না”। সেদিন আলোচনা এখানেই শেষ হয়। আর লোকটিও চলে যায়। 
এক বছর পর সে মুসলমান হয়ে পুনরায় বাদশার দরবারে এল এবং ইসলামি ফিক্হ সম্পর্কে সারগর্ভ বক্তব্য দিল। আলোচনা শেষে বাদশা তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন- আপনি কি সেই ব্যক্তি যে গত বছর এসেছিল? তিনি বললেন- হাঁ। পরে বাদশা তাকে বললেন, সেদিন তো আপনি ইসলাম গ্রহণে রাজি হন নি। এরপর এমন কী ঘটল যে, মুসলমান হয়ে গেলেন। এবার লোকটি পুরো ঘটনা বর্ণনা করল। 
সে বলল : এখান থেকে ফিরে আমি বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা করার মনস্থ করি। এদিকে আমি একজন কাতেব (হস্তলিপি বিশারদ); স্বহস্তে গ্রন্থাদি লিখে চড়া দামে বিক্রি করি। একবার পরীক্ষার উদ্দেশে তাওরাতের তিনটি কপি লিপিবদ্ধ করলাম। এগুলোতে অনেক জায়গায় নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তন করে লিখলাম। কপিগুলো নিয়ে যখন আমি ইহুদিদের উপাসনালয়ে উপস্থিত হলাম তখন ইহুদিরা আগ্রহভরে আমার নিকট থেকে সেগুলো খরিদ করে নিল। অতঃপর ইঞ্জিলেরও তিনটি কপি কম-বেশ করে লিখে খ্রিস্টানদের উপাসনালয়ে গেলাম। সেখানেও তারা খুব খাতির যতœ সহকারে সেগুলো আমার নিকট থেকে ক্রয় করে নিল। 
এরপর কুরআনের ক্ষেত্রেও তাই করলাম। অর্থাৎ এরও তিনটি কপি প্রস্তুত করলাম এবং নিজের পক্ষ থেকে অনেক জায়গায় পরিবর্তন করে দিলাম। আর এগুলো বিক্রয়ের জন্য যখন বের হলাম, তখন যে-ই দেখল সে-ই প্রথমে আমার প্রস্তুতকৃত কপিগুলো নির্ভুল কি-না, তা যাচাই করে দেখল। ফলে যে পরিবর্তনগুলো আমি করেছিলাম সেগুলো প্রকাশ পেয়ে গেল। সুতরাং কেউ একটি কপিও খরিদ করল না। এতে আমি এ শিক্ষাই পেলাম যে, কুরআন হুবহু সংরক্ষিত আছে এবং আল্লাহ পাক স্বয়ং এর সংরক্ষণ করেছেন। ফলে আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি।” 
--
এ ঘটনার বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া ইবনে আকতাম বলেন, সৌভাগ্যবশত সে বছরই আমার হজ পালনের সুযোগ হয়। সেখানে প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনা রহ. -এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে এ ঘটনাটি তাঁর কাছে বর্ণনা করি। অতঃপর তিনি বললেন : নিঃসন্দেহে এমনই হওয়ার কথা। কেননা, কুরআনে এ সত্যের সমর্থন রয়েছে। ইবনে আকতাম তাঁর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন- কুরআনের কোন্ আয়াতে এ আলোচনা রয়েছে? সুফিয়ান রহ. বললেন- কুরআনে কারিম যেখানে তাওরাত ও ইঞ্জিলের আলোচনা করেছে সেখানে বলেছে-
بِمَا اسْتُحْفِظُوا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ 
‘ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে আল্লাহর কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জিল সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’ [সূরা মায়িদা : ৪৪]
এ কারণেই যখন তারা সংরক্ষণের এ গুরু দায়িত্ব পালন করেনি, তখন উক্ত গ্রন্থদ্বয় বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন : وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ ‘আমিই এর সংরক্ষক’। (সূরা হিজর- ৯) এজন্য বিগত সাড়ে চৌদ্দশত বছরেও কুরআনের একটি অক্ষর, একটি যের বা যবরও পরিবর্তন হয়নি।

কুরআন মুদ্রণের ইতিহাস

Mohiuddin Kasemi

কুরআন নাযিলের সূচনালগ্ন থেকে আরম্ভ করে দীর্ঘকাল পর্যন্ত হস্তলিপির সাহায্যে এর সঙ্কলনের কাজ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। একদল নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান এ কাজটিকে নিজেদের জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেন। তাঁরা কুরআনের অসংখ্য কপি তৈরি করে মুসলিম বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রেরণ করতে থাকেন। ফলে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার হওয়ার বহু পূর্বেই বিশ্বের আনাচে-কানাচে কুরআনের লক্ষ লক্ষ কপি পৌঁছে যায়।
মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পর ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ ‘হিংক্যাল ম্যান’ ‘হ্যামবুগ’ শহরে সর্বপ্রথম কুরআন মুদ্রণের কাজ সম্পন্ন করেন। অবশ্য কোনো কোনো ঐতিহাসিক লিখেন, এরও বহু পূর্বে জনৈক প্রাচ্যবিদের বিশেষ উদ্যোগে ‘আল-বান্দকিয়া’ নামক স্থানে কুরআন মুদ্রিত হয়েছিল। তবে তখন কে এই মুদ্রণকাজ সম্পাদন করেছিলেন, তা নিশ্চিত জানা যায় নি। 
যাক, এরপর ‘মারাকি’ নামক আরেক প্রাচ্যবিদ ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ‘পাডু’ শহরে কুরআন মুদ্রণ করেন। কিন্তু খ্রিস্টানরা চরম ইসলাম বিদ্বেষী হওয়ার কারণে তাদের মুদ্রিত এসব কপি মুসলিম বিশ্বে আদৌ সমাদৃত হয় নি।

মুসলমানদের মাঝে সর্বপ্রথম মাওলায়ে ওসমান রহ. কুরআন মুদ্রণের গৌরব অর্জন করেন। তিনি ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার সেন্টপিটার্স শহরে ইসলামি ছাপাখানায় তা সম্পন্ন করেন। তাঁর মুদ্রিত কপি মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক সমাদৃত হয়। উপরন্তু প্রায় একই সময়ে ‘কাযান’ শহরেও মুসলমানদের ছাপাখানায় কুরআন মুদ্রিত হয়েছিল বলে জানা যায়। তৎপরবর্তীতে ইরানের তেহরান ও তিবরিয শহরে আঞ্চলিক মুলমানদের উদ্যোগে ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে নতুনভাবে কুরআন মুদ্রিত হয়।
এ দিকে ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে ‘লিপযিগ’ শহরে প্রাচ্যবিদ মিস্টার ফ্লুযিল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নতুনভাবে কুরআন মুদ্রণ করেন। তার মুদ্রিত কপি ইউরোপে ব্যাপক সমাদৃত হলেও মুসলিম বিশ্বে কোনো গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি।

এর কিছুকাল পর পাক-ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর কয়েকবার কুরআান মুদ্রিত হয়। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে কুরআন মুদ্রিত হয় ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে। এরপর মিসরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিজের তত্ত্বাবধানে নতুনরূপে কুরআন মুদ্রণ করেন; যা পুরো বিশ্বে ব্যাপক সমাদৃত হয়। এরপর থেকে পৃথিবীর সর্বত্র কুরআন মৃদ্রণের কাজ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। যা আজও চালু আছে।
তবে বর্তমান বিশ্বে কুরআন শরিফের সবচেয়ে বড় ছাপাখানা হল ‘বাদশাহ ফাহাদ কুরআন মুদ্রণ প্রকল্প’। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ খাদিমুল হারামাইনিশ শরিফাইন ফাহাদ ইবনে আবদুল আজিজ রহ. তা প্রতিষ্ঠা করেন। যা দৈনিক পঞ্চাশ হাজার কপি কুরআন ছাপার ক্ষমতা রাখে। এ প্রকল্প থেকে শুধু মূল কুরআন শরিফই নয় বরং বিভিন্ন ভাষায় কুরআনের অনুবাদ ও তাফসির ছেপে সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষীদের অঞ্চলে বিতরণ করা হয়।

বরকতের মর্মকথা রিজিকে বরকত হওয়ার কারণসমূহ রিজিকে বরকত বন্ধের কারণসমূহ

মাও. আতীক উল্লাহ আতীক হাফি.
ড. আবদুর রাহীম। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। বায়োকেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট। ঢাকা ভার্সিটি। তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন জার্মানিতে। গল্প করতে বসলেই জার্মানির গল্প শোনাতেন। সেখানকার বন্ধুবান্ধবের কথা বলতেন। 
.
কাজ ও পড়াশোনার সূত্রে তার বাসায় নিত্যদিন মেহমান লেগেই থাকতো। তাদের বেশির ভাগই জার্মান। তার একটা অভ্যেস ছিল, কেউ এলে, যত সামান্যই হোক, কিছু একটা দিয়ে মেহমানের আপ্যায়ন করা। আগন্তুকরা বেশ অবাক হতো। ড. সাহেব চলেন নির্ধারিত বেতনের টাকায়। কিন্তু এভাবে হাতখুলে মেহমানদারী করার টাকা পান কোত্থেকে? এক মহিলা থাকতে না পেরে প্রশ্নটা সরাসরি ডক্টর সাহেবকে করেই ফেলেছিলেন:
-হের ডক্টর! তুমি তো বাড়তি কোনও জব করো না, তবুও আমরা যখনই আসি, কিছু না খাইয়ে ছাড়ো না, এত টাকা কোথায় পাও! আমার ‘সেলারি’ও তো তোমার স্কেলেরই! সংসারে লোক বলতে আমি আর মুলার! তার রুজি-রোজগার ভালোই, তবুও মাসশেষে দেখা যায়, ধারকর্জ করতে হয়! কিন্তু তুমি দিব্যি আরামেই থাকো! এ কী করে সম্ভব?
-ফ্রাউ ড. লিন্ডা! মেহমানদারী করা সুন্নাত। 
-সুন্নাত কী?
-আমাদের প্রফেট হের মুহাম্মাদ (সা.)-এর আদর্শ!
-সে না হয় বুঝলাম! কিন্তু এত খায়-খরচার পয়সা আসে কোত্থেকে?
-মেহমানদারী রিযিকে বরকত আনে!
-রিযিক?
-রিযিক মানে ‘আয়রোজগার’। আর বরকত মানে বৃদ্ধি। 
-কী বলছো তুমি! আমাদেরকে মেহমানদারী করলে, তোমার সেলারি দ্বিগুন হয়ে যায়! ওহ জেসাস!
-না ব্যাপারটা ঠিক সে রকম নয়! 
-তবে?
-ব্যাপারটা ঠিক বোঝানো যাবে না, তুমি মুসলমান হলে বুঝতে পারবে! তোমার সীমিত আয়েও যদি মেহমানদারী করো! মাস শেষে দেখবে, তোমার টাকায় টান পড়েনি! ঠিকই মাসকাবার হয়ে গেছে!
.
একদিন নবীজি সা. এলেন বেলালের কাছে। বেলালের কাছে কিছু খেজুর ছিল:
-এগুলো কী বেলাল?
-খেজুর হুযুর! আপনি ও আপনার মেহমানের জন্যে রেখে দিয়েছি!
- (মিয়া) বেলাল! খরচ করে ফেলো! আরশের অধিপতির কাছ থেকে ‘কমতির’ আশংকা করো না (বায়হাকী)
.
বরকত লাভের আর কী কী উপায় আছে?
এক: আল্লাহর ভয়। তাকওয়া অর্জন করা: সরাসরি আল্লাহর স্বীকৃতি, সন্দেহের অবকাশ নেই:
= যদি জনপদবাসী ঈমান আনে ও তাকওয়া অর্জন করে, আমি অবশ্যই আসমান-যমীন থেকে বরকত (এর দরজা) খুলে দেবো! (আ‘রাফ: ৯৬)। 
.
দুই: আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা। নবীজি সা. বলেছেন:
= যদি তোমরা আল্লাহর ওপর সত্যিকার তাওয়াক্কুল করো, আল্লাহ তোমাদেরকে পাখির মতোই রিযিক দান করবেন। পাখি খালি পেটে সকালে বের হয়, ভরপেট হয়ে সন্ধ্যায় ফেরে। (তিরমিযী)। 
.
তিন: সম্পদে, সময়ে, স্ত্রীতে, সন্তানে, সমস্ত বিষয়ে বরকতের দু‘আ করা। নিজের জন্যে করা, অন্যের জন্যেও দু‘আ করা:
বিয়ে করছে, এমন মানুষের জন্যে দু‘আ:
بارك اللهم لك وبارك عليك وجمع بينكما فى الخير
খাবারের সময় দু‘আ:
اللهم بارك لنا فيما رزقتنا وارزقنا خيرا منه
.
চার: বিয়ে করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
= তোমাদের মধ্যে যারা বিধবা, তাদেরকে বিয়ে করিয়ে দাও। তোমাদের নেককার দাসী-বাঁদীদেরকেও বিয়ে করিয়ে দাও! যদি তারা ফকীর হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে ধনী করে দিবেন (নূর: ৩২)। 
.
পাঁচ: মোহরানা ধরার সময় বাড়াবাড়ি না করা। নবীজি সা. বলেছেন:
= যে নারীর মোহরানা যত কম হবে, তার মধ্যে বরকত তত বেশি হবে (মুসনাদে আহমাদ)। 
.
ছয়: হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন করা। নবীজি সা. বলেছেন:
= যে ব্যক্তি হকপন্থায় সম্পদ অর্জন করবে, তার মধ্যে বরকত দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন করলো, তার দৃষ্টান্ত হলো: এমন ব্যক্তির মতো, যে শুধু খেতেই থাকে, কিন্তু পরিতৃপ্তি আসে না (মুত্তাফাকুন)। 
.
সাত: লোভহীন মনে সম্পদ অর্জন করা। হাকীম বিন হিযাম রা. বলেন:
-আমি নবীজি সা.-এর কাছে ‘সুওয়াল’ করলাম, তিনি আমাকে দিলেন। আবার চাইলাম, তিনি দিলেন। আবার চাইলাম, তিনি দিলেন। আবার চাইলাম, তিনি দিলেন। আবার চাইলাম, তিনি দিলেন। তারপর বললেন:
-হাকীম! এই সম্পদ হলো সুমিষ্ট সজীব বস্তু! যে এটাকে (নির্লোভ ) উদারচিত্তে গ্রহণ করবে, তাতে বরকত দেয়া হবে। আর যদি কেউ সম্পদকে লোভী হয়ে, পীড়াপীড়ি করে অর্জন করে: তার অবস্থা হবে, এমন ব্যক্তির মতো যে, খেয়েই চলছে,কিন্তু তৃপ্তি আসছে না (মুত্তাফাক)
.
আট: বেচাকেনায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে, লেনদেনে সততা বজায় রাখা:
= ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে কেনাবেচার ক্ষেত্রে স্বাধীন। যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা স্থান ত্যাগ করে। যদি তারা সততা অবলম্বন করে, তাদের কেনাবেচায় বরকত দেয়া হবে। আর যদি মিথ্যা বলে, কোনও কিছু গোপন করে, লেনদেনে বরকত উঠিয়ে নেয়া হবে (বুখারী)। 
.
নয়: ভোরে ভোরে কাজ শুরু করা। ব্যবসা-বাণিজ্য, সফর-ভ্রমণ, ইলমতলব ইত্যাদি। প্রিয় নবীজি সা. বলেছেন:
-ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতের সকালের মাঝে বরকত দান করুন! (মুসনাদে আহমাদ)। 
.
দশ: ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেয়া:
= বৎস (আনাস)! তুমি যখন ঘরে প্রবেশ করবে, সালাম দিবে। এটা তোমার ও তোমার পরিবারের জন্যে বরকত নিয়ে আসবে (তিরমিযী)। 
.
এগার: খাবারের সময় সুন্নাতের অনুসরণ করা:
ক: একত্রে খাওয়া ও বিসমিল্লাহ পড়া। কিছু সাহাবী অভিযোগ করলেন:
-আমরা খাই কিন্তু তৃপ্ত হই না!
-তোমরা সম্ভবত পৃথক পৃথক খাও!
-জ্বি!
-একত্রে খাবে, বিসমিল্লাহ পড়বে। তাহলে তোমাদের খাবারে বরকত দান করা হবে! (আবু দাউদ)। 
.
খ: বরতনের একপাশ থেকে খাওয়া। মধ্যখান থেকে খাওয়া পরিহার করা। নবীজি বলেছেন:
= বরকত খাবারের মাঝামাঝিতে অবতীর্ণ হয়। তোমরা একপাশ থেকে খাও। মধ্যখান থেকে খেয়ো না (তিরমিযি)। 
.
গ: আঙুল চেটে খাওয়া। নবীজি খাওয়ার সময় আঙুল চেটে খেতেন। বরতনও চেটে খেতেন। খাবার পড়ে গেলে, ময়লা ঝেড়ে সেটা খেয়ে নিতেন। না হলে, খাবারটা শয়তানের খাবারে পরিণত হয়। তিনি সাহাবীদেরকে বরতন চেটে খেতে আদেশ করতেন:
= কারণ তোমরা জানো না, খাবারের কোন অংশে বরকত আছে (মুসলিম)। 
.
ঘ: খাবার ঠান্ডা হওয়ার অপেক্ষা করা। আসমা বিনতে আবী বকর রা. রান্না করলে, প্রথমে কিছু দিয়ে ঢেকে রাখতেন, যাতে আগুনের উত্তাপের তীব্রতা কমে আসে। তিনি বলতেন: আমি নবীজি সা.কে বলতে শুনেছি:
-এটা (গরম কমে আসার অপেক্ষা করা) খাবারের বরকত বাড়িয়ে দেয়! (মুসনাদে আহমাদ)। 
.
ঙ: খাবার ঢেকে রাখা। নবীজি সা. বলেছেন:
-তোমরা খাবারের পাত্রকে ঢেকে রাখো! (বুখারী)। 
.
চ: খাবার শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা (বুখারী)। 
.
বারো: ইস্তেখারা করা। মানে সবকিছুতে কল্যাণ কামনা করা। দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, আল্লাহ আমার জন্যে যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা পুরোটাই আমার জন্যে কল্যাণকর। আমি নিজে যা ঠিক করি, তাতে কল্যান নেই। বান্দা সব সময় দু‘আ করবে:
-ইয়া আল্লাহ! আমার সবকিছুতে কল্যাণ দান করুন। বরকত দান করুন (বুখারী অবলম্বনে)। 
.
তেরো: আল্লাহর দেয়া রিযিকে সন্তুষ্ট থাকা। নবীজি সা. বলেছেন:
= আল্লাহ বান্দাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে পরীক্ষা করেন। বান্দা যা তাকে দেয়া হয়েছে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ বরকত বাড়িয়ে দেন। প্রাচুর্য দান করেন। অন্যথায় বরকত লাভে বঞ্চিত হয় (মুসনাদে আহমাদ)। 
.
চৌদ্দ: আদল। ন্যায়বিচার। শেষ যমানায় ঈসা আ. নেমে আসবেন। যমীনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। বরকত বেড়ে যাবে। যমীনকে সম্বোধন করে বলা হবে: তোমার শস্য উৎপন্ন করো, বরকত ফিরিয়ে দাও! একেকটা গমের দানা হবে খেজুর আঁটির মতো (মুসনাদে আহমাদ)। 
.
পনের: আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা ও পিতামাতার প্রতি সদাচার। হাদীসে আছে:
-যে চায় তার রিযিকে প্রাচুর্য আসুক, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে (মুত্তাফাক)। 
বাবা-মায়ের প্রতি সদাচার সৌভাগ্যের কারণ। তাদের দু‘আ আল্লাহ কবুল করেন। তাদের সন্তুষ্টি আল্লাহর সন্তুষ্টি। 
.
ষোল: দান-সাদাকা। 
=তোমরা যা (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয় করবে, তিনি (আল্লাহ) তার বিনিময় দিয়ে দিবেন। তিনি শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা (সূরা সাবা: ৩৯)। 
.
= আসমা! তুমি খরচ করো, আল্লাহও তোমার জন্যে খরচ করবেন। তুমি ধরে রাখলে, আল্লাহও ধরে রাখবেন (তিরমিযী)। 
.
কষ্টেপড়া ব্যক্তির অবস্থাকে সহজ করে দিলে, আল্লাহও দুনিয়া-আখেরাতে তার জন্যে সবকিছু সহজ করে দিবেন। যে কারো বিপদ দূর করলো, আল্লাহও দুনিয়া-আখেরাতে তার বিপদ দূর করে দিবেন (মুসলিম)। 
.
সতের: কুরআন তিলাওয়াত করা:
= এটা বরকতময় কিতাব (আনআম)। 
.
= তোমরা সূরা বাকারা পড়ো। যে সূরা বাকারাকে আঁকড়ে ধরবে, বরকত লাভ করবে। যে ছেড়ে দিবে, আফসোস করবে। সুরা বাকারা পাঠকারীকে কোনও শয়তান ছুঁতে পারবে না (মুসলিম)। 
.
আঠার: সর্বদা ইস্তেগফার পড়া। 
= যে ব্যক্ত নিয়মিত ইস্তেফগার পড়বে, সব ধরনের সমস্যা-সংকট থেকে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেবেন (আবু দাউদ)। 
.
উনিশ: বেশি বেশি দুরুদ শরীফ পড়া। 
-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি দু‘আতে শুধু দুরুদ শরীফই পাঠ করি। 
-তাহলে তোমার দুশ্চিন্তা দূর হবে। গুনাহ মাফ হবে (তিরমিযী)। 
.
বিশ: রমযান মাস:
= তোমাদের কাছে রমযান মাস এসেছে। বরকতের মাস। এই মাসে আল্লাহ তোমাদেরকে বেষ্টন করে রাখবেন। রহমত নাযিল হবে। গুনাহ মাফ হবে। দু‘আ কবুল হবে। তোমরা আল্লাহকে ভাল কিছু দেখাও। যে রমযান মাসে রহমত থেকে বঞ্চিত হয়, সে দুর্ভাগা (তারগীব তারহীব)। 
.
একুশ: সাহরী খাওয়া। 
= তোমরা সাহরী খাও, কারন তাতে বরকত রয়েছে (মুত্তাফাক)। 
.
বাইশ: দুই ঈদ। উম্মে আতিয়া রা. বলেছেন:
= আমাদেরকে ঈদের দিন বের হওয়ার আদেশ করা হতো। আবাল-বৃদ্ধা-বণিতা-কুমারি সবাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তো। এমনকি হায়েযগ্রস্তারাও। মহিলারা পুরুষের পেছনে নামাযে দাঁড়াতো। তাকবীর বলতো। তাদের মতো দু‘আ করতো। তারা বরকতের আশা করতো (বুখারী)। 
.
তেইশ: যমযমের পানি পান করা:
= নিশ্চয় যমযমের পানি বরকতময়। সেটা উত্তর খাবার। রোগের নিদান (মুসলিম)। 
.
চব্বিশ: কদরের রাত্রির অন্বেষণ:
= আমি কুরআনকে এক বরকতময় রাতে নাযিল করেছি (দুখান:৩)। 
সব মুসলমারেই উচিত, এই রাতের অন্বেষণ করা। আল্লাহর কাছে এ রাতের বরকত লাভের দু‘আ করা। 
.
পঁচিশ: বেশি বেশি আল্লাহ শুকরিয়া ও প্রশংসা করা। 
= তোমরা যদি শুকরিয়া আদায় করো, তাহলে আমি তোমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেবো (ইবরাহীম: ৭)। 
.
ছাব্বিশ: নামায কায়েম করা, পরিবারকে নামায কায়েমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা:
= তুমি তোমার পরিবারকে নামাযের আদেশ করো। নামায আদায়ে অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে রিযিক চাই না। আমিই তোমাকে রিযিক দান করবো (তাহা:১৩২)।
.
সাতাশ: চাশতের নামায। 
(ক) শকীক বলখী রহ, বলেছেন:
-আমরা পাঁচটি বস্তু তলব করেছি। সেগুলোকে পাঁচটি বস্তুর মধ্যে পেয়েছি। রিযিক তলব করেছি, সেটাকে চাশতের নামাযের মাধ্যমে পেয়েছি। 
.
(খ) যায়তুনের তেল:
= (বাতি) জ্বালানো হয় রবকতময় যায়তুন বৃক্ষ (এর তেল) হতে (নূর: ৩৫)। 
= তোমরা (যায়তুনের তেল খাও, মাখো, কারণ তা এক বরকতময় বৃক্ষ হতে নিঃসৃত হয় (তিরমিযী)। 
.
আঠাশ: খেজুর। 
= তোমরা খেজুর দিয় ইফতার করবে, কারণ খেজুর বরকতময় বস্তু (আবু দাউদ)। 
.
ঊনত্রিশ: মধু ও কালোজ্বিরা। 
= মধুতে রয়েছে আরোগ্য (নাহল:৬৯)। 
= তিন বস্তুতে আরোগ্য রয়েছে: আগুনের সেঁক। সিঙা লাগানো। মধু পানে (বুখারী)। 
= এই কালো জিরায় সর্বরোগের ওষুধ রয়েছে। মৃত্যু ছাড়া (বুখারী)। 
.
ত্রিশ: দুধ।
= যে ব্যক্তি দুধ পান করবে, সে যেন বলে:
اللهم بارك لنا فيه وزدنا منه
কারণ একমাত্র দুধ পানেই সওয়াবের প্রতিশ্রুতি রয়েছে (ইবনে মাজাহ)। 
.
একত্রিশ: মক্কা ও মদীনার বরকত। 
= মানুষের জন্যে সর্বপ্রথম ঘর বরকতময় মক্কাতেই নির্মিত হয়েছে (আলে ইমরান: ৯২)। 
= ইয়া আল্লাহ! আপনি মদীনাতে মক্কার চেয়েও দ্বিগুন বরকত দান করুন (মুত্তাফাক)। 
.
বত্রিশ:বৃষ্টির পানি। 
= আমি আকাশ থেকে বরকতময় বৃষ্টি নাযিল করেছি (ক্বাফ: ৯)। 
= নবীজি পোষাক অনাবৃত করেছিলেন, যেন শরীরে বৃষ্টির পানি পড়ে (মুসলিম)। 
.
তেত্রিশ: আলিমদের সঙ্গ। নেককারদের সঙ্গ। দুর্বল ভালো লোকের সঙ্গ। আলিমগন সমাজে কল্যাণের প্রসার ঘটান। মানুষের অবস্থার সংশোধন করেন। এই কাজে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। ফলে বিপদাপদ দূর হয়। 
আর দুর্বল ভালো লোকদের সম্পর্কে নবীজি বলেছেন:
= তোামদেরকে তোমাদের দুর্বলদের কারণে সাহায্য করা হবে (বুখারী)। 
কারণ দুর্বলরা অন্যদের তুলনায় বেশি মনোযোগ দিয়ে দু‘আ করে। খুশু-খুযুর সাথে ইবাদত করে। তাদের হৃদয়ে দুনিয়ার প্রভাব কম থাকে। 
.
চৌত্রিশ: বরকত না আসার কারণগুলো থেকে দূরে থাকা। 
ক: সুদ খাওয়া। 
= আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করবেন, সাদাকাকে বৃদ্ধি করে দেবেন (বাকারা: ২৭৪)। 
= আল্লাহ সুদ গ্রহীতা ও দাতা উভয়কে অভিশাপ দিয়েছেন (আহমাদ)। 
.
খ: অন্যকে ধোঁকা দেয়া। 
= যে আমাদেরকে ধোঁকা দিল, সে আমাদের দলভুক্ত নয় (মুসলিম)। 
.
গ: মাপে কম দেয়া। 
= মানুষকে মাপে কম দিলে, দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকটা ও শাসকের যুলুম নেমে আসবে (ইবনে মাজাহ)। 
.
ঘ: জুয়া খেলা।
= মদ, জুয়া হলো শয়তানের নাপাক কর্ম, সেগুলো পরিহার করে চলো। তাহলে সফল হতে পারবে (মায়েদা:৯০)। 
.
ঙ: হারাম পণ্য, হারাম কাজ, জনমানুষের জন্যে ক্ষতিকর কাজে লেগে থাকা। যেমন মদের ব্যবসা, শুকরের ব্যবসা, মৃত-রক্ত-মূর্তি-কুকুরের ব্যবসা করা। এসবকে কুরআন হাদীস উভয়টাতে নিষেধ করা হয়েছে। 
.
চ: অন্যের প্রাপ্য আদায়ে, ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা:
= যে ব্যক্তি আদায় করে দেয়ার নিয়তে, মানুষ থেকে সম্পদ নিল, আল্লাহ তা আদায় করাটা সহজ করে দিবেন। আর যদি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে কারো কাছ থেকে টাকা নেয়, আল্লাহই সেটা বিনষ্ট করে দিবেন (বুখারী)। 
.
ছ: নামাযের সময়ে মুআমালা-লেনদেন করা। 
= যে কাজ নামায থেকে বিমুখ করে দেয়, আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন না (এটা লোকমুখে প্রচারিত বানী। তবে সূরা নূরের ৩৭ নং আয়াতের সাথে মিলে যায়:
= কিছু (নেককার) পুরুষকে ব্যবসা-বাণিজ্য আল্লাহর যিকির ও নামায কায়েম থেকে বিরত রাখতে পারে না। 
.
জ: ইহতেকার। মজুতদারী। খাদ্যশস্য-পণ্যদ্রব্য কমদামে কিনে, গুদামে তুলে রাখা। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা। 
= পাপী লোকই শুধু ইহতিকার করে (মুসলিম)। 
.
ঝ: ব্যবসা করতে গিয়ে অতিরিক্ত শপথ করা। 
= অচল পণ্য সচলকারী মিথ্যা শপধ, বরকতকে দূর করে দেয় (মুসলিম)। 
.
ঞ: ইসরাফ-তাবযীর। অপচয় করা। খাবার-দাবারে। পোশাক-আশাকে। পানাহারে। এটা শয়তানী কাজ। 
= অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই (বনী ইসরাঈল: ২৭)। 
.
ট: খেয়ানত ও অশ্লীলতা। এক বুযুর্গ বলেছেন:
-তিনটা বস্তু কোনও ঘরে থাকলে, বরকত উঠিয়ে নেয়া হয়:
অপচয়। যিনা। খেয়ানত। 
.
ঠ: যুলুম। অন্যকে যুলুম করলেও জীবন থেকে বরকত চলে যায়।
.
ড: ব্যভিচার, হারাম তরীকায় নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শন। খোলামেলা পোশাকের প্রচলন। উল্কি আঁকা। ভ্রুপ্লাক ইত্যাদি কাজের প্রতি আল্লাহর লা‘নত আছে। এসব করলেও বরকত উঠিয়ে নেয়া হয়।

মধু চিকিৎসা!


    অসুস্থ হলে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা সুন্নত। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সুন্নত। বিপদ এলে আল্লাহর আশ্রয় নেয়া, দু‘আ করাও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অন্তুর্ভুক্ত। নবীজি বলেছেন:
    لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءُ الدَّاءِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ...
    সব রোগেরই ওষুধ আছে। যখন রোগের ওষুধ গ্রহণ করা হবে, আল্লাহর অনুগ্রহে বান্দা আরোগ্য লাভ করবে (মুসলিম)। 
    -
    হাদীশ শরীফে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার কথা আলোচিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে মধুর চিকিৎসা। বিশেষ করে উদর-সম্পর্কিত রোগের ক্ষেত্রে। 
    একলোক এসে নবীজি সা.-এর কাছে এসে বললো:
    -আমার ভাইয়ের পেটে অসুখ!
    -তাকে মধু পান করাও!
    -
    লোকটা আবার এসে বললো:
    -আমার ভাইয়ের পেটের অসুখ!
    -তাকে মধু পান করাও!
    এভাবে তৃতীয়বার এলো। একই সমস্যার কথা বললো। নবীজিও একই উত্তর দিলেন। লোকটা বললো: পান করিয়েছি। তখন নবীজি বললেন:
    صَدَقَ اللهُ، وَكَذَبَ بَطْنُ أَخِيكَ، اسْقِهِ عَسَلاً
    আল্লাহ সত্য বলেছেন, তোমার ভাইয়ের উদর মিথ্যা বলেছে! তাকে মধু পান করাও (বুখারী)!
    তাকে আবার পান করানো হলো। লোকটার ভাই নিরাময় লাভ করলো। 
    -
    অসুস্থ লোকটা প্রথম প্রথম মধুকে অতটা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেনি। পরিপূর্ণ আস্থা নিয়েও পান করেনি, তাই কাঙ্খিত ফলোদয় হয় নি। পরে নবীজির দৃঢ় বক্তব্যের কারণে তার মধ্যে আস্থা তৈরী হয়েছে। শতভাগ নির্ভরতা নিয়েই মধু পান করেছে, সাথে সাথে আল্লাহর ইচ্ছায় শেফা লাভ করেছে। 
    -
    শুধু হাদীসে নয়, কুরআন কারীমেও মধুর কথা গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে:
    يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ
    মৌমাছির উদর থেকে পানীয় (মধু) নির্গত হয়, বিভিন্ন রঙের। তাতে মানুষের জন্যে রয়েছে শিফা (নাহল: ৬৯)। 
    -
    আমরা নিয়মিত মধু পান করতে পারি। অসুখ হলে প্রথমেই সুন্নাতের নিয়তে, নিরাময় লাভের আশায় মধু পান করতে পারি। পাশাপাশি না হয় ডাক্তারি চিকিৎসাও চলতে থাকলো। শেফাও হবে আবার সুন্নাত পালনের কারনে সওয়াবও হবে। 
    -
    হাতের কাছে মধুর একটা শিশি রাখতে পারি। ঘরের তাকে যত্নের সাথে মধুর একটা শিশি পুষতে পারি। সুন্নত পালনের নিয়তেই! সওয়াব হবে। সওয়াবের সুযোগ সৃষ্টি হবে।