শুক্রবার, ৯ জুন, ২০১৭

এক টুকরো সুখের খোঁজে:


সাবিহা মেয়েটা কেমন যেন অদ্ভুত, বোরকা,নিকাব,হাত মোজা,পা মোজা পরে ক্লাসে আসে আবার ক্লাসের পুরো সময়টাতেও এসব পরে থাকে!
কিভাবে পারে মেয়েটা! গরম ও লাগেনা নাকি! আর একবারও কি আয়নায় নিজেকে দেখেছে আগাগোড়া মোড়া কালো পোশাকে ওকে কেমন লাগে?
আর এটা তো গার্লস কলেজ,এখানে এত বাড়াবাড়ির কি এমন দরকার মনে মনে ভাবে শায়লা…
কলেজের প্রথম দিন থেকেই সাবিহা কে দেখে আসছে শায়লা কিন্তু কখনো কথা হয়নি। তবে সাবিহা কথা/বার্তায় আচরনে খুব অমায়িক অন্য ফ্রেন্ডদের থেকে শুনেছে শায়লা।
:
সেদিন সেমিনার রুমে একাকী বসে শায়লা আতিকের কথা ভাবছে। সম্পর্ক টা ভাল যাচ্ছেনা ইদানিং আতিকের সাথে।
এই আতিকের সাথে সেই আতিকের কোনই মিল নেই।কোচিংয়ে গিয়ে পরিচয় হয় আতিকের সাথে। শায়লাদের ক্লাস নিতে আসে ঢাবি তে পড়ুয়া আতিকুর রহমান। প্রথম দেখাতেই ভাল লেগে যায় শায়লার। শায়লা একদিন আতিকের ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে ফোন দেয় অংক বুঝার বাহানায়।
সেই থেকে কথায় কথায় আতিকের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠে শায়লার, শায়লার জন্য আতিক পাগল ছিল তখন।
শায়লা একটু অভিমান করলেই আতিক অস্থির হয়ে ফোনের পর ফোন দিত। আতিকের এমন অস্থিরতা দেখে ভালোই লাগত শায়লার।
কিন্তু এখন আতিক অনেক বদলে গেছে।
আজকাল কেমন যেন অল্পতেই রেগে যায়। সম্পর্ক রাখবেনা বলেও শাসায়! অথচ এই আতিকের জন্য কি না করেছে শায়লা?
আতিক কে কতটা ভালবাসে এটা প্রমাণ করার জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছিল আতিকের কাছে।
সেদিন আতিক বলেছিল খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলবে তারা..
অথচ আতিক এখন সম্পর্ক রাখবেনা বলে হুমকি দেয়! ভাবতে ভাবতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে শায়লার।
কাঁধে কারও স্পর্শ পেয়ে চমকে ঘুরে তাকায় শায়লা।
– সাবিহা!
– কি হয়েছে তোমার, শায়লা? কাঁদছ কেন?
– না কিছু না।
– আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। আমি তোমাকে অনেকক্ষন ধরেই খেয়াল করছি তুমি এখানে বসে কান্না করছো। কেউ কিছু বলেছে?
– জানো আমার বয়ফ্রেন্ড এখন আর আমাকে চায়না, অথচ আমি কি না করেছি ওর জন্য! এটুকু বলেই শায়লা কেঁদে উঠল।
– একটা ব্যাপার কি জানো শায়লা! দুনিয়ার কেউ তোমাকে বুঝবেনা, তোমার অন্তরের চাপা কষ্ট গুলো অনুভব করবেনা, তোমার কষ্টের ভাগ কেউ নিবেনা, একজন ছাড়া!
.
একজন আছেন যিনি তোমার সকল দুঃখের ভাগ নিবেন, তোমার প্রতিটি অশ্রুর ফোঁটা যাঁর কাছে দামী, তুমি যে প্রবলেম ফেস করছো তা দূর করে দেয়ার ক্ষমতা তিনিই রাখেন শুধু!
আমাদের রব।
তুমি আল্লাহর কাছে চাও, যা তোমার জন্য কল্যানকর তা তুমি চেয়ে নাও, কেবল তিনিই পারবেন তোমার সমস্ত দুঃখ কষ্ট দূর করে দিতে। তবে তুমি হয়ত জানোনা তুমি একটা হারাম সম্পর্কে আছ, প্রেম কত বড় গুনাহের কাজ তা তুমি উপলব্ধি করতে পারছোনা, মেয়েদের জন্য কন্ঠের পর্দার কথাও কোরআনে বলা হয়েছে আর সেখানে দিনের পর দিন একজন গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে প্রেমালাপ, ঘুরাঘুরি অবলিলায় স্পর্শ করে যিনার দিকে এগিয়ে যাওয়া কত জঘন্য গুনাহ তা কি বুঝতে পারছো?
একটা হারাম সম্পর্ক নিয়ে প্রতিনিয়ত যিনার দিকে অগ্রসর হয়ে তুমি ভাল থাকবে বলে আশা করছো?
– সাবিহা, প্রেম গুনাহ তা তো জানতাম না!
আর আমি যদি ভালবেসে কাউকে বিয়ে করি তবে তা গুনাহ হবে কেন?
– প্রথমত একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের তাকদীরের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আমার সঙ্গী কে হবে তা আমার তাকদীরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।
সুতরাং আমি কাউকে ভালবাসলেই যে তার সাথে আমার বিয়ে হবে এমন টা ধারনা করা ভুল। আমি একজন কে ভালবেসে বসে আছি অথচ আমার তাকদীরে আছে অন্য কেউ! তখন স্বভাবতই আমি প্রেমিকের সাথে যাই করি না করি রেজাল্ট হবে জিরো!
এই জিরো রেজাল্টের ফাইনাল রেজাল্ট কিন্তু ভয়াবহ!
একে তো যার সাথে বিয়ে তাকদীরে লিপিবদ্ধ আছে সেই বেচারার হক্ব নষ্টের গুনাহ এবং নিজের আমলনামায় যুক্ত হওয়া প্রেমিকের সাথে কাটানো প্রতিটি মুহুর্তের গুনাহের ফলাফল হল জাহান্নাম!
দ্বিতীয়ত মুসলিম নারীর জন্য পর্দা ফরজ, তুমি পর্দার আয়াতের গুরুত্ব অনুধাবন করলে চোখ বন্ধ করে বলতে বাধ্য হবে প্রেম বলে জগতে কিছু নেই, এটি শুধুমাত্র শয়তানের ধোঁকা।
আর তোমার জন্যও পর্দা এখন ফরজ শায়লা, তুমি বেপর্দায় আছ বলেই শয়তান তোমাকে দিয়ে একটা হারাম কাজ করাতে পেরেছে, এবং এখন যিনার দিকে নিয়ে যাবে সম্পর্কটাকে…
– কিন্তু পর্দা তো বিয়ের পর করলেও চলে। এখন আমি পর্দা করে চললে আমি দেখতে কেমন যেটা লোকে বুঝবে কি করে? আর এই বয়সে যদি একটু সাজগোজ না করি তবে কখন করব?
– এটা ঠিক পর্দা করে চললে লোকে দেখতে পাবেনা তুমি দেখতে কেমন। আর পর্দারও উদ্দেশ্য লোকে যাতে দেখতে না পায় তুমি দেখতে কেমন। আল্লাহর হুকুম ও হল নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শন করবেনা স্বামী ব্যতীত অন্য কারও সামনে।
– বুঝলাম, কিন্তু সাবিহা! আমার পর্দা ব্যাপার টা মোটেও ভাল লাগেনা।
আমাকে যদি আড়ালেই থাকতে বলা হয় তবে কেন আমাকে সৌন্দর্য দেয়া হল?
– সৌন্দর্য টা তোমার স্বামীর জন্য। আর তোমার পর্দা দুনিয়ার সব পুরুষের জন্য।
শায়লা আল্লাহর কাছে চাও এই হারাম সম্পর্ক থেকে তোমাকে উদ্ধার করতে, আর পর্দা টা করো বোন, নিশ্চয়ই জাহান্নাম অনেক ভয়ানক জায়গা! জাহান্নামের আগুন সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের কারও নেই। পর্দা একটি ফরজ বিধান। প্রদর্শনের মোহে তুমি হয়ত দুনিয়ার জীবন বেপর্দায় কাটিয়ে দিলে কিন্তু এরপর?
এরপর তোমাকে অবশ্যই আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে দুনিয়ার জীবনের কৃতকর্ম হাতে নিয়ে।
:
সাবিহা চলে গেল। শায়লা কেমন যেন একটা ধাক্কা খেল।
কি বলে গেল সাবিহা! আল্লাহর কাছে চাইতে যেন আতিকের সাথে সম্পর্ক ব্রেকআপ করে দেন? প্রেম গুনাহ? প্রেম যিনার দিকে নিয়ে যায়?
কিন্তু সে তো এসব বহু আগেই করে ফেলেছে আতিক কে ভালবেসে! তার কাছে তো এটা গুনাহ মনে হয়নি!
পর্দার কথা বলল সাবিহা!
শায়লা কত সেজেগুজে কলেজে আসে। ছেলে থেকে শুরু করে বুড়ো পর্যন্ত দ্বিতীয়বার ফিরে তাকাতে বাধ্য। আর শায়লা কিনা বোরকা পরবে! নিকাব করবে!
বাসায় ফিরেও শায়লা সাবিহার কথা ভুলতে পারলোনা কিন্তু কোনভাবেই নিজেকে সে রবের সামনে দাঁড় করাতে পারলোনা! কিসের যেন জড়তা এসে অবস করে দেয় ওকে!
আর কিই বা চাইবে?
আতিক কে ভালবাসে সে। তাকে ভুলে যেতে সে আল্লাহর কাছে চাইবে?
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে শায়লা। আতিক কে ছাড়া সে বাঁচবেনা, তার সমস্ত সুখের ঠিকানা যে আতিকের কাছে। আর আগামীকাল থেকে সাবিহা নামের মেয়েটার থেকে সে নিরাপদ দূরত্বে থাকবে।
প্রেম নাকি গুনাহ!! এখনই নাকি পর্দা করা ফরজ!!
শায়লা তার মার কাছে শুনেছ তার বাবা মা ও নাকি প্রেম করে বিয়ে করেছে। প্রেম যদি গুনাহ হত তবে কি তার বাবা-মা প্রেম করে বিয়ে করত?
আর তার মা তো বিয়ের আগে বোরকা পরতোনা, এখনো পরেনা। তাতে কি এমন হয়েছে!
নাহহ.. সাবিহার সাথে আর কোন কথা না কাল থেকে… মাথা খারাপ করে দিয়েছে মেয়েটা!
…..
..
১৫বছর পর।
..
….
…..
শায়লার বিয়ে হয়েছে আজ ১৩বছর হল। একটা মেয়েও হয়েছে শায়লার, নাম রেখেছে শায়ন্তি। শায়ন্তির ১১ বছর পূর্ণ হল। মেয়ে কে স্কুলে দিয়ে এসে শায়লা দোতলার বারান্দায় গিয়ে বসল। আজ কোন কাজেই মন বসছেনা শায়লার। হঠাৎ চোখ গেল নীচে বাসার গেইটে। নতুন ভাড়াটিয়া উঠছে মনেহয় পাশের ফ্ল্যাটে।
নিজের অতীতে ফিরে গেল শায়লা। ১৩বছর আগে দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে আতিকের হাত ধরে উঠেছিল এই বাসায়।
আতিককেই বিয়ে করেছিল শায়লা। আতিক বিয়ে করতে রাজি হয়নি শুরুতে কিন্তু শায়লা সাফ জানিয়ে দিল বিয়ে না করলে আত্মহত্যা করে বসবে শায়লা আর দোষ সব আতিকের। বাধ্য হয়ে বিয়েতে রাজি হয় আতিক।
শায়লা ভেবেছিল বিয়ে হলে সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু নাহ! আজ ১৩বছরেও কিছুই ঠিক হয়নি। আতিক এখন ওকে সহ্যই করতে পারেনা। আতিক আর শায়লার মাঝে সেতুবন্ধন শুধুমাত্র শায়ন্তি। শায়লা বুঝে গেছে একজন ভুল মানুষ কে সে বেছে নিয়েছে জীবনে আর দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে সে ভুলের গ্লানি টেনে যাচ্ছে। ১৩বছরের বিবাহিত জীবন কে আর যাই হোক সংসার বলেনা। একটা সময় আতিকের এমন রূঢ় আচরনের প্রতিবাদ করত শায়লা। প্রতিদিনই ঝগড়া হত। কখনো আতিক গায়েও হাত তুলত। প্রতিবাদ করে কপালে কয়েক ডজন চড়/থাপ্পড় জুটেছে আর কিছুই পরিবর্তন হয়নি!
আতিক কি জানে ভালবাসার মানুষটির বদলে যাওয়া কতটা পুড়ায়?
কিন্তু মেয়েটা হওয়ার পর এখন ঝগড়াঝাটি একটু কমেছে।
আতিক তার অফিস, কলিগ, বন্ধু-বান্ধবী নিয়ে পড়ে থাকে আর শায়লা বাস্তবতার কাছে হার মেনে ঘরের কাজ আর মেয়েটাকে নিয়ে আছে। সত্যি বলতে একজনের প্রতি আরেকজনের অভিযোগ করার সময় ই হয়না এখন।
হঠাৎ মনে হল সাবিহার কথা!
সাবিহা ঠিক ১৫বছর আগে শায়লা কে বলেছিল যা তার জন্য কল্যানকর তা আল্লাহর কাছে চেয়ে নিতে! সেদিন চাইতে পারেনি শায়লা। অন্ধ ছিল আতিকের মিথ্যা প্রেমে। কেন সেদিন সাবিহার কথা কে গুরুত্ব দেয়নি সে!
সাবিহা! না জানি কোথায় আছে এখন! সেদিনের পর আর কথা বলেনি ওর সাথে শায়লা। নিশ্চয় সাবিহা আমার চেয়ে অনেক ভাল আছে। সাবিহা তো তাঁর রবের কাছে চাইতে জানে যা আমি জানিনা। জীবনে আর কি কখনো দেখা হবে সাবিহার সাথে!
..
পরদিন সকালে কলিংবেলের শব্দ শুনে দরজার দিকে এগিয়ে গেল শায়লা। দরজা খুলে দেখল পূর্ণ পর্দাশীল একজন মহিলা, সাথে ছোট দুইটা মেয়ে। অদ্ভুত ব্যাপার এতটুকু মেয়ে দুইটাও বোরকা/নিকাব পড়ে আছে!
শায়লা কাকে চান জানতে চাওয়ার আগেই মহিলা টি বলে উঠল ‘আসসালামু আলাইকুম’
কণ্ঠ টা কি একটু পরিচিত মনে হল শায়লার!
সাবিহা নয়ত?
কিন্তু এত বছর পর.. এখানে!
নাহ.. কিভাবে সম্ভব!
সাবিহার সাথে তো কোন যোগাযোগ ই নেই। সাবিহা তার বাসার ঠিকানা জানবে কেমন করে?
সালামের উত্তর দিয়ে শায়লা বলল কে আপনি?
-আমি সাবিহা। একসাথে কলেজে পড়তাম, মনে আছে শায়লা?
-সাবিহা!! হুট করেই সাবিহা কে জড়িয়ে ধরল শায়লা। ঘটনার আকস্মিকতায় সাবিহা একটু থমকে গেল।
-আমি স্বপ্নেও ভাবিনি তোমার সাথে আবার দেখা হবে! আমি যে কি খুশি হয়েছি! এসো ভেতরে এসো… কিন্তু তুমি আমার ঠিকানা জানলে কি করে?
-আমরা তোমার পাশের ফ্ল্যাটেই উঠেছি গতকাল। বাসায় ঢুকার সময় তোমাকে বারান্দায় দেখেছি। সত্যি বলতে আমিও খুশি হয়েছি তোমাকে এতদিন পর দেখে। আর এটা আমার বড় মেয়ে মারঈয়াম, এটা ছোট মেয়ে আয়িশাহ।
– এত ছোট মেয়ে কেও বোরকা/নিকাব পরিয়েছ? এদের তো এখন খেলাধূলার বয়স। বাচ্চা মেয়ে।
– বাচ্চা কোথায়! বড়টার বয়স ১২,ছোটটার ৮। ওদের কে তো আরও ছোট থেকেই বোরকা পরিয়েছি আমি।
– আশ্চর্য! তোমার মেয়েরা পরতে রাজি হল? আমার শায়ন্তি তো চিৎকার করে মাথা খারাপ করে ফেলবে ও যা পরতে চায় তা পরতে না দিলে।
শায়ন্তি কে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দিল শায়লা। শায়ন্তির চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে বোরকা পরা এই মানুষ গুলো কে তার পছন্দ হয়নি মোটেও।
– শায়লা, বাচ্চাদের মানসিকতা, আচরন, আদব এসব তৈরি হয় সে কেমন পরিবেশে বড় হচ্ছে তার উপর। আমার মা ছোট থেকেই পর্দা করতেন কারন আমার নানী পর্দাশীল ছিলেন। আমি ছোট থেকেই আমার মা কে দেখেছি পর্দা করতে। আমিও কোন অভিযোগ ছাড়াই পর্দা শুরু করেছিলাম। আমার মেয়েরা আমাকে দেখেছে। তারাও কোন অভিযোগ ছাড়াই পর্দা শুরু করেছে। আমি জোর করে কখনোই আমার মেয়ে কে পর্দা করাতে পারতাম না। হয়ত তাকে সাময়িক বাধ্য করতে পারতাম কিন্তু এটা তার জীবনে প্রতিফলিত হত না।
শায়লার ভেতর তোলপার শুরু হয়ে গেল। শায়লা তার নানী কে কখনো দেখেনি পর্দা করতে, শায়লার মা ও কখনো করেনি, শায়লা ও করছেনা। তাহলে শায়ন্তি! সেও করবেনা…
শায়লার বাবা-মা প্রেম করে বিয়ে করেছে, তবু বাবা-মার মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকত। শায়লা নিজেই কি সুখি হতে পেরেছে?
নিজের জীবনে যা হওয়ার হয়েছে, শায়ন্তির জীবন টা নষ্ট হতে দিবে না শায়লা। সে নিজে যে ভুল গুলো করেছে শায়ন্তি যেন সেগুলো না করে তার জন্য এখনই শায়লা কে ব্যবস্থা নিতে হবে।
শায়লা চায়না তার মেয়ের জীবনটাও ভুলের উপর কাটুক। আজ সাবিহা কে দেখে কেমন যেন হাহাকার শুরু হয়েছে শায়লার বুকের ভেতর। কি পেয়েছে শায়লা তার জীবনে? মিথ্যে ভালবাসার মোহে সব হারিয়েছে সে।
অথচ সাবিহা! মিথ্যে মোহের পেছনে নিজেকে উৎসর্গ করেনি সে। সাবিহা কে দেখেই বুঝা যায় সুখী সংসার তার।
– শায়লা! কি চিন্তা করছো?
– একটা কথার উত্তর দিবে,সাবিহা?
– হ্যাঁ বলো..
– আমি সত্যিই এতদিন ভুল পথে ছিলাম, যে ভালবাসার জন্য নিজের সব হারিয়েছি সেই ভালবাসাই আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। আমি কেমন ছিলাম এতটা বছর আমার জানা নেই। কোন রকম বেঁচে ছিলাম তবে এই বেঁচে থাকা কে জীবন বলেনা। ১৫বছর আগে তুমি বলেছিলে আমার রবের কাছে আমার কল্যানের জন্য চাইতে। সেদিন আমি পারিনি রবের সামনে দাঁড়াতে। আজ আমি রবের সামনে দাঁড়াতে চাই। যে রবের ভয়ে তুমি এতটা বছর ধরে কালো পোশাকে নিজেকে আড়াল করেছ, যে রবের ভয়ে তুমি প্রেম থেকে দূরে ছিলে, যে রবের কাছে তুমি তোমার কল্যানের জন্য চাইতে, যে রব তোমাকে এমন সুখের জীবন দিয়েছেন সে রবের কাছে আজ আমি আত্মসমর্পণ করতে চাই।
কিন্তু সাবিহা, এতটা বছরে তো রব নামের মহান সত্তার সাথে আমার কখনো কথা হয়নি, আজ হঠাৎ তাঁর কাছে চাইতে গেলে তিনি কেন আমাকে দিবেন? কেন আমাকে ক্ষমা করবেন?
সাবিহা শায়লা কে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিল। শায়লার জন্য কত দোয়া করেছে সে! যেদিন থেকে শায়লা কোন কারন ছাড়াই ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল খুব কষ্ট পেয়েছিল সাবিহা। সে তো শায়লা কে ভাল পরামর্শ দিয়েছিল কিন্তু শায়লা তাকে ভুল বুঝল।
অবশ্য শায়লারও দোষ ছিলনা। শয়তান তার সামনে ভুল পথ টাকে সঠিক হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। সাবিহা শায়লার জন্য তাহাজ্জুদে খুব করে দোয়া করত। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ এতদিন পর শায়লা কে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন।
:
শায়লা নিজেও কাঁদছে। চোখ মুছে দিয়ে শায়লার সামনে বসল সাবিহা।
তোমার ফিরতে হয়ত একটু দেরি হয়েছে কিন্তু সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তুমি এখনো তওবা করে গুনাহ থেকে ফিরে আসলে আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে ক্ষমা করবেন। বান্দা গুনাহ করে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসলে আল্লাহ তো ক্ষমার ওয়াদা দিয়েছেন। আর আল্লাহর ওয়াদা নিঃসন্দেহে সত্য।
সেদিন শায়লা নামাযের নিয়ম শিখে নিল সাবিহার কাছ থেকে। প্রতি সন্ধ্যায় সাবিহার কাছে গিয়ে সে আর শায়ন্তি কোরআন ও শিখবে। সাবিহা রাতেই একটা কোরআন আর বোরকা-নিকাব এনে হাদিয়া দিল শায়লা কে। কোরআন টা হাতে নেয়ার পর শায়লার ভেতরটা কেঁপে উঠল। কোরআনের স্পর্শে শায়লার মনেহল বহু বছরের অশান্ত/অতৃপ্ত আত্মা আজ নিমেষেই শান্ত হয়ে গেল। বুকের বাম পাশে যে শক্ত বড় পাথর টা এতদিন চেপে বসে ছিল আজ হঠাৎই সেটা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
..
৬মাস পর।
.
মাঝ রাতে চাপা কান্নার শব্দে আতিকের ঘুম ভেঙে গেল। এত রাতে কে কান্না করছে বাসায়! একবার ভাবল যা ইচ্ছা হোক তাতে তার কি! সকালে অফিস আছে, ঘুমাতে হবে তাকে। কিন্তু কিসের যেন একটা টান ওকে ঘুমাতে দিল না। উঠে পাশের ঘরে উঁকি দিল যেখান থেকে শব্দ টা আসছিল। আবছা আলো-আঁধারি ঘরেও শায়লা কে চিনতে কষ্ট হল না আতিকের।
শায়লা!
ও এভাবে ফ্লোরে পড়ে কাঁদছে কেন! আবার অস্পষ্ট স্বরে কি যেন বলেও যাচ্ছে। ইদানিং কিছু একটা হয়েছে শায়লার। নামাযের ওয়াক্তে আতিক কে মসজিদে যেতে বলে, অফিসে থাকলেও ফোনে বলে নামায আদায় করে নিতে, যেন কত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজের ভার সে নিয়েছে যা আতিক মিস করলে সমস্ত দায়ভার শায়লা উপর বর্তাবে! আতিক তার কথা শুনে কখনো মসজিদে যায়নি তবু শায়লা হাল ছাড়েনি!
শায়লা এখন পর্দা করে বাইরে যায়, নামায আদায় করে, পাশের ফ্ল্যাটে কার কাছে গিয়ে নাকি আরবী ও শেখে! শায়ন্তিকে পরিবর্তনের চেষ্টা ও চালিয়ে যাচ্ছে। সেদিন এসে বলল শায়ন্তি কে মহিলা মাদ্রাসায় পড়াতে চায় সে। এক বাক্যে ‘না’ বলে দেয়ার পরও তার অভিব্যক্তির কোন পরিবর্তন হলনা। বলল শায়ন্তি মাদ্রাসাতেই পড়বে ইন শা আল্লাহ। আমার রব সব ব্যবস্থা করে দিবেন। কতটা দৃঢ়তার সাথে বলল শায়লা!
আজকাল রাগ বলতেই নেই যেন শায়লার। অফিস থেকে ফিরে ঘরে ঢুকতেই হাসিমুখে সালাম দেয়। কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে যায় আতিক। শায়লা তো এমন কখনো করেনি আগে! ৬মাস ধরে আতিকের কাপড় গুলো নিজেই গুছিয়ে রাখে, অফিসে যাওয়ার আগে শার্ট টা এগিয়ে দেয়, ঘড়ি টা হাতে তুলে দেয়! এমন কখনো করতনা শায়লা। প্রতিদিন রাতে একসাথে খাওয়ার জন্য ওয়েট করে এখন! সেদিন খাওয়ার টেবিলে বলে বসল আমাকে একটু তুলে খাইয়ে দেবে?
বলে কি মেয়েটা! আরেকটু হলেই হো হো করে হেসে উঠত আতিক। কিন্তু তা না করে মুখে গাম্ভির্য এনে বলে দিল এসব আবার কি ঢঙ শুরু করেছ?
শায়লা তবু রেগে গেলনা! একটু হেসে বলল আচ্ছা তাহলে আমি খাইয়ে দেই?
আতিক কি বলবে ভেবে পেল না!
শায়ন্তি যখন বলল মা আদর করে খাইয়ে দিতে চাচ্ছে, তুমি এমন করছো কেন বাবা?
আতিকের কিছু বলার ছিলনা আর। কিন্তু শায়লা খাইয়ে দেয়ার পর আতিকের অদ্ভুত এক অনুভূতি হল। কেমন যেন ভাল লাগতে শুরু করল শায়লার এমন আচরন! এই মেয়েটাই তো আতিকের স্ত্রী। অথচ কত অন্যায় আচরন করেছে এতটা বছর ওর সাথে! ১৩বছর পর আতিকের হঠাৎই মনেহল মেয়েটাকে আমি ভালবাসি!
:
শায়লা তখনো কেঁদেই যাচ্ছে। আতিকের খুব মায়া হতে লাগল। আজ সে শুনবেই শায়লা কেন সিজদায় এমন কান্নাকাটি করছে। মনের ভেতর উসখুস করতে শুরু করল আতিকের। শায়লা কে এত বছরেও কাঁদতে দেখেনি। কত গায়েও হাত তুলেছে আতিক, শায়লা রাগে ফুসেছে তবু কান্না করেনি। আর আজ কি এমন শায়লার হৃদয়টা কে এত নরম করে এতক্ষন ধরে কাঁদাচ্ছে?
শায়ন্তির কাছে শুনেছে পাশের বাসার সাবিহা নাকি শায়লার কলেজ ফ্রেন্ড ছিল। যেদিন প্রথম সে বাসায় এল সেদিন থেকেই শায়লার পরিবর্তন শুরু হয়েছে!
সাবিহা কি এমন করলো যা শায়লা কে পুরোপুরি চেঞ্জ করে দিল?
আজ সে সব শুনবে শায়লা কাছে।
..
শায়লা সিজদা থেকে উঠে দরজায় আতিক কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে গেল। আতিক কখন এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি শায়লা।
আতিক শায়লার কাছে এসে বসল। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ কেটে গেল। কারও মুখে কথা নেই। আতিক সন্তর্পনে শায়লার হাতটা ধরল। কি বলবে ভেবে না পেয়ে আতিক বলল আমাকে ক্ষমা করে দাও। এত গুলো বছর তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। তোমাকে এভাবে কাঁদতে দেখে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।
শায়লা হাসিমুখে বলল, আমি কোন কষ্টে কাঁদিনি। আমি সুখে কেঁদেছি। আল্লাহর জন্য একটা সিজদায় এত প্রশান্তি থাকতে পারে আগে জানলে আমি কখনোই ভুল পথে পা বাড়াতাম না। আতিক, তোমার হেদায়াতের জন্য আমি আল্লাহর কাছে চেয়ে যাচ্ছি, কারন আমি তোমাকে ভালবাসি।
আমরা অনেক গুনাহ করেছি জীবনে, প্রেম ইসলামে হারাম অথচ আমরা দিব্যি প্রেম করে গেছি, প্রেমের নামে আমরা ভয়ংকর সব গুনাহে লিপ্ত ছিলাম। রব্বুল আলামীন আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। আমি আমার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত। সাবিহা বলেছে, বান্দা গুনাহের পর অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমার ওয়াদা করেছেন। আতিক, সাবিহা আমাকে কোরআনে পড়ে শুনিয়েছে জাহান্নাম কত ভয়াবহ আযাবের স্থান।
একটাই আশা এখন জাহান্নাম থেকে বাঁচার! আল্লাহ যদি ক্ষমা করেন। তা না হলে কোন রক্ষা নেই আতিক।
অতীতে আমরা যাই করেছি আসো এখন তওবা করি, যে কয়দিন বেঁচে আছি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী জীবন টা পরিচালিত করি, আমরা যে ভুল করেছি আমাদের শায়ন্তি যেন তা না করে সেজন্য আমাদেরই সচেতন হতে হবে। আমি নিয়াত করেছি শায়ন্তি কে মাদ্রাসায় পড়াব। তুমি আর না করোনা। আমার মেয়ের জীবন টা সাবিহার মারঈয়াম, আয়িশাহর মত হোক আমার এখন এটাই স্বপ্ন।
শায়লা কে মমতায় জড়িয়ে ধরে আতিক। পরম আশ্রয়ে শায়লা ও কেঁদে উঠে। বহু বছরের পাথর চাপা ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া অনুভূতি গুলো আজ আবার সজীব হয়ে উঠেছে।
চুপ করে আছে আতিক। কি বলবে ভেবে পাচ্ছেনা। শায়লার পরিবর্তন দেখে ইদানিং আতিকেরও ধর্মের প্রতি দূর্বলতা বাড়ছে। কারন ধর্মের প্রতি শায়লা যখন থেকে আকৃষ্ট হয়েছে ওর আচরনে অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। আগের চেয়ে শান্ত, ধৈর্যশীল, ধীরস্থির হয়েছে। আতিকের প্রতি যত্নশীল হয়েছে। স্বামীর হক্ব কি জিনিস তা আতিক জানেনা তবে শায়লার কাছে প্রত্যাশিত আচরন গুলো এখন না চাইতেই পেয়ে যায় আতিক, শায়লা বলে এসবই নাকি স্বামীর হক্ব।
আযান হচ্ছে মসজিদে, ফজরের আযান। আজ মসজিদের দিকে আতিকের মন এত টানছে কেন?
আযানের অর্থ আতিক জানেনা তবু আযানের প্রতিটা কথা আতিকের হৃদয়ে গিয়ে যেন আঘাত করছে। শায়লার প্রার্থনা কি তবে আল্লাহ কবুল করে নিলেন? চোখের কোণা টা কি ভিজে উঠল আতিকের!
(সংগৃহিত)


কাতারের যুবরাজের একটি চমৎকার গল্প


ছবির লোকটি কাতারের বর্তমান বাদশাহ শেখ তামিম বিন হামদ বিন খলিফা আল সানির বড় ভাই যুবরাজ শেখ ফাহাদ বিন হামদ বিন খলিফা । তিনি কাতারের সাবেক সেনাপ্রধান। কাতারের ঐতিহ্য ও শাসনরীতি অনুযায়ী বর্তমান আমীর হওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু রাজসিংহাসনের মোহ ত্যাগ করে তিনি হযেছেন একজন আপাদমস্তক দা'য়ী ইলাল্লাহ। রাজ পরিবারের অঢেল বিলাস বৈভব ছেড়ে তিনি দিনহীন সাধারণ মানুষের মতো নেমে পড়েন আলোর পথে,আল্লাহর পথে। রাজমহল ছেড়ে তিনি পড়ে থাকেন মার্কাজ মসজিদে। অধিকাংশ সময়ই কাটান দেশ থেকে দেশান্তের তাবলীগী সফরে।.
রাজকীয় সমস্ত ভোগ-বিলাস ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন মানুষের দ্বারে দ্বারে ইসলামের আলো পৌঁছে দিতে। ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তিনি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ সফর করেছেন ইউরোপ-আমিরিকার বহু দেশ। বাংলাদেশে চার মাস সময় লাগিয়েছেন। গাট্টি-পোটলা কাঁধে নিয়ে ঘুরেছেন বাংলাদেশের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। থেকেছেন মাটির বিছানায়। টিনের চালা কিংবা মাটির দেয়াল ঘেরা অনেক মসজিদে। সাধারন গাম্য টয়লেট ব্যবহার করেছেন নিসংকোচভাবে। 

রাজকীয় পরিচয়ের বাহিরে তৈরি করেছেন সাধারন নাগরিক পরিচয়ের পাসর্পোট। প্রায় প্রতি বছরই আসেন বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমায়। তাঁর পরিবারের সদস্যরা রাজকীয় প্লেন নিয়ে আসলেও তিনি আসেন সাধারন মানুষের সাথে জামাত বন্দি হয়ে। রাজ-পরিবারের অতীব গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়েও নিজের জন্য তিনি দু'টি পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। রাজকীয় কোন সফরে গেলে তখনই শুধু রয়েল পাসপোর্টি ব্যবহার করেন।
মূলতঃ তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের হাফিজ-আলেমদের কাতারের সরকারী মসজিদ-মাদ্রাসায় খেদমতের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই দাঈ ইলাল্লাহকে আল্লাহ হায়াতে তায়্যিবা দান করুন। কাতারের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র আল্লাহ নস্যাৎ করে দিন এবং সমুন্নত রাখুন কাতারের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব। সংগৃহীত

তাযকিয়া, তাসাউফ ও হাসান বসরী র.

এক. ইমামু আহলিল বসরা সাইয়েদুনা হাসান বসরী র.। শীর্ষস্থানীয় তাবেয়ীদের একজন। সাহাবীদের হাতে বড় হয়েছেন। তাঁর ব্যাপারে সমকালীন উলামায়ে কিরামের বক্তব্য হচ্ছে: তার চেয়ে সাহাবাদের অধিক সদৃশ আর কেউ আমাদের চোখে পড়েনি।
দুই. ইসলামে যতগুলো ফিরক্বা ও দল-উপদল রয়েছে। হক হোক কিংবা বাতিল হোক- প্রত্যেকেই হক হওয়ার প্রমাণ স্বরূপ নবীজী সা. ও সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করে। এএটা একটা প্রশংসাপত্রের মতো। একারণে দেখা যায়, খাওয়ারেজ-কাদেরিয়া থেকে শুরু করে শিয়া ও (ভণ্ড) সুফিরাও সাহাবায়ে কিরাম কিংবা বড় কোনো ইমাম বা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিজের নিসবত আবিষ্কার করে। উদাহরণত শিয়ারা নিজেদের আলী রা. এর অনুসারী বলে দাবি করে। কিন্তু আলী কি শিয়া ছিলেন? তথাকথিত ইসলামী কমিউনিজমের দাবিদাররা আবু যর গিফারীর সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা দাবি করে। আবু যর গিফারী কি কমিউনিস্ট ছিলেন? ক্বাদেরিয়া সম্প্রদায় হাসান বসরীর সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা দাবি করতো এবং এ ব্যাপারে তার নামে কিতাবও লিখেছে। হাসান বসরী কি তকদীর অস্বিকারকারী ভ্রান্ত ক্বাদরিয়া সম্প্রদায়ের জনক ছিলেন? মাইজভাণ্ডারীরা তাদের গ্রন্থে আব্দুল হক্ব দেহলভী, ইমাম গাযালীসহ অনেকের নাম তাদের সালাফ হিসেবে উল্লেখ করে। এর মানে দেহলভী কিংবা গাযালী মাইজভাণ্ডারী? প্রত্যেকটির উত্তর না।
তিন. ইমাম আবু নুআইম ইস্পাহানী 'হিলয়াতুল আউলিয়া' গ্রন্থে তাসাউফের ইমামদের আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী রা. এর মতো বড় বড় সাহাবায়ে কিরামের জীবনীও এনেছেন। এর অর্থ তারাও সুফি ছিলেন! কেউ বলতে পারেন, যুহদ ও ইবাদতের ভিত্তি করে তাদের আলোচনা আনতে পারেন। ইবনুল জাওযী এর জবাবে বলেছেন, তাসাউফ একটি মতাদর্শ এবং কেবল যুহদ নয়; বরং আরও অনেক কিছু এর ভেতরে রয়েছে। বরং যাদের জীবনী তাতে এনেছেন, উদহারণত ইমাম শাফেয়ী, কথিত তাসাউফের বিরুদ্ধে তার বক্তব্য রয়েছে'।
চার. বর্তমান অনেক (হক এবং বাতিল) সুফী তরীকা হাসান বসরী র. এর দিকে নিজেদের নিসবত করে। হাসান বসরী- আলী- রাসূলুল্লাহ সা.। অথবা হাসান বসরী-আনাস বিন মালিক-রাসূল সা.। কোনো তরীকাতে আবু বকরও রা. রয়েছেন। এর অর্থ কী? দু'টি অর্থ করা যেতে পারে। এক. তারা বুযুর্গ ছিলেন অন্য আরও দশজনের মতোই। কিন্তু তাদের কোনো ছাত্র তাসাউফের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন এবং পরবর্তীতে পরম্পরায় তরীকার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। দুই. তাদের কাছে আলাদা কোনো ইলম ছিল, ইবাদতের আলাদা তরীকা ছিল, আলাদা দুআ-দরূদ ও অজীফা ছিল, বাইয়াত ও খিরকা ছিল। দ্বিতীয়টি অসম্ভব। আবু বকর কিংবা আলী রা. এর আলাদা কোনো ইলম ছিল না। আলাদা ইবাদত-পদ্ধতি কিংবা দুআ-অজীফা ছিল না। তবে প্রথমটি সম্ভব। কিন্তু কথা হলো- কোনো ছাত্র কিংবা ছাত্রের ছাত্র যদি নিজস্ব কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করে তার জন্য উস্তাদ দায়ী হন কীভাবে?
পাঁচ. হাসান বসরী র. এর আমলে ইবাদত-বন্দেগীর ওপর জোর দিতেন এমন একশ্রেণীর মানুষের সমাজে উদ্ভব ঘটেছিল। এরা খুব কান্নাকাটি, ইবাদত ও দুনিয়াবিমুখ ছিলেন। যিকির ও ইবাদত করতে গিয়ে কখনও বেহুঁশ হয়ে যেতেন। আসমা বিনতে আবু বকর, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর ও মুহাম্মাদ ইবনে সীরীনের মতো সাহাবী ও তাবেয়ীরা এদের সমালোচনা করতেন। সে যাই হোক, হাসান বসরী র. অত্যন্ত পরহেযগার ও বুযুর্গ তাবেয়ী ছিলেন। প্রচুর ইবাদত-বন্দেগী ও মুজাহাদ করতেন। তার কয়েকজন শিষ্য ছিলেন ইবাদতের ক্ষেত্রে আরও অগ্রগণ্য। ইবাদত করতে করতে হাদীস ও ইলমের প্রতিও দুর্বলতা এসে গিয়েছিল। হাসান বসরী র. তাদের সঙ্গে নিজ ঘরে আলাদা বৈঠক করতেন। সেখানে তাসাউফ-যুহদ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হতো। পরবর্তীতে এসব ছাত্ররা যেমন আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়দ ও আমর বিন উবায়েদের মতো বুযুর্গ মানুষ বিভিন্ন ত্বরীকা ও খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। আর হাসান বসরী হয়ে যান ত্বরীকার ইমাম!
ছাত্ররা খানকা প্রতিষ্ঠা করে সুফি ও ত্বরীকার প্রতিষ্ঠাতা হলে হাসান বসরীও ত্বরীকার প্রতিষ্ঠাতা হয়ে যান? তাহলে আলী রা. কেন শিয়া হবেন না? হাসানী বসরী কেন ক্বাদরী (তকদীর অস্বিকারকারী) হবেন না? আবু যর রা. কেন কমিউনিস্ট হবেন না? ত্বরীকা বলতে যা কিছু বোঝায়, সুফিবাদ বলতে যা কিছু বোঝায়- হাসান বসরী র. এর যুগে এসব কিছু ছিল না। তিনি ইবাদত করতেন, যাহেদ ছিলেন। তাকওয়া, যুহদ, ইলম, নুসুক ইত্যাদি নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন। তাঁর ছাত্র সুফি হলে তিনি সুফিদের ইমাম হতে যাবেন কেন? আবুদল ওয়াহিদ বিন যায়েদ আর হাসানের ইলম, চিন্তাগত মানহাজ, রাজনৈতিক মানহাজ কোনোকিছুই মিল ছিল না। 
ছয়. সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন, চার ইমাম, সিহাহ সিত্তার আইম্মায়ে কিরাম, মুহাদ্দিসীন হাতে গনা দুয়েকজন ব্যতীত কেউ ত্বরীকাপন্থী ছিলেন না। হুম সকলে ছিলেন যাহেদ, মুত্তাকী, বুযুর্গ, আল্লাহর অলী। আজও পৃথিবীতে ত্বরীকাপন্থী উলামােয়ে কিরামের চেয়ে ত্বরীকার বাইরের উলামায়ে কিরামের সংখ্যা বেশি। তাযকিয়া ও ইসলাহ ফরজ। তাই অঞ্চল কিংবা প্রেক্ষাপট ভেদে যদি ব্যক্তিবিশেষ কারও কাছ থেকে ইসলাহী ফায়েদা নিতে হয় সেটা নিতে সমস্যা নয়; বরং জরুরী। এটার বিরোধিতা করা হচ্ছে না। গুরত্বও অস্বীকার করা হচ্ছে না। অস্বীকার করা হচ্ছে জগতের বড়বড় আয়িম্মায়ে কিরাম যারা এগুলো চিনতেনও না তাদের নামের 'তাযকিয়া' নেয়াটাকে। আজ যদি হাসান বসরী কিংবা আব্দুল কাদের জিলানী র. দুনিয়াতে আসতেন, চিশতিয়া কিংবা ক্বাদেরিয়া ত্বরীকা দেখে তারা আবার মনোকষ্টে মরে যেতেন।

বৃহস্পতিবার, ৮ জুন, ২০১৭

সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ পর্যালোচনা

দারুল ইফতা, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা
সদাকায়ে ফিতর সম্পর্কিত হাদীসগুলো পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে মোট পাঁচ প্রকার খাদ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়: যব, খেজুর, পনির, কিসমিস ও গম। এ পাঁচ প্রকারের মধ্যে যব, খেজুর, পনির ও কিসমিস দ্বারা সদকা ফিতর আদায় করতে চাইলে প্রত্যেকের জন্য এক সা’ দিতে হবে। আর গম দ্বারা আদায় করতে চাইলে আধা ‘সা’ দিতে হবে। এটা হল ওজনের দিক দিয়ে তফাত। আর মূল্যের দিক থেকে তো পার্থক্য রয়েছেই। যেমন-
(ক) আজওয়া (উন্নতমানের) খেজুরের মূল্য প্রতি কেজি ১০০০/- টাকা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৩২৫৬/- তিন হাজার দুই শত ছাপ্পান্ন টাকা।
(খ) মধ্যম ধরনের খেজুর যার মূল্য প্রতি কেজি ৩০০/- টাকা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৯৭৭/- নয়শত সাতাত্তর টাকা।
(গ) কিসমিস প্রতি কেজি ২৩০/- টাকা করে হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৭৪৮/- (সাত শত আটচল্লিশ) টাকা।
ঘ) পনির প্রতি কেজি ৫০০/- টাকা করে ধরা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ১৬২৮/- (এক হাজার ছয় শত আটাশ) টাকা।
ঙ) গম প্রতি কেজি ৩৫/- টাকা হিসাবে ধরা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৫৭ টাকা।
হাদীসে এ ৫টি দ্রব্যের যেকোনোটি দ্বারা ফিতরা আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে যেন মুসলমানগণ নিজ নিজ সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী এর যেকোনো ১টি দ্বারা তা আদায় করতে পারে। এখন লক্ষণীয় বিষয় হল, সকল শ্রেণীর লোক যদি সবচেয়ে নিম্ন মূল্য-মানের দ্রব্য দিয়েই নিয়মিত সদকা ফিতর আদায় করে তবে হাদীসে বর্ণিত অন্য চারটি দ্রব্যের হিসেবে ফিতরা আদায়ের উপর আমল করবে কে? আসলে এক্ষেত্রে হওয়া উচিত ছিল এমন যে, যে ব্যক্তি উন্নতমানের আজওয়া খেজুরের হিসাবে সদকা ফিতর আদায় করার সামর্থ্য রাখে সে তা দিয়েই আদায় করবে। যার সাধ্য পনিরের হিসাবে দেওয়ার সে তাই দিবে। এর চেয়ে কম আয়ের লোকেরা খেজুর বা কিসমিসের হিসাব গ্রহণ করতে পারে। আর যার জন্য এগুলোর হিসাবে দেওয়া কঠিন সে আদায় করবে গম দ্বারা। এটিই্ উত্তম নিয়ম। এ নিয়মই ছিল নবী, সাহাবা-তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের স্বর্ণযুগে। এ পর্যন্ত কোথাও দুর্বল সূত্রে একটি প্রমাণ মেলেনি যে, স্বর্ণযুগের কোনো সময়ে সব শ্রেণীর সম্পদশালী সর্বনিম্ন মূল্যের দ্রব্য দ্বারা সদকা ফিতর আদায় করেছেন। এখানে এ সংক্রান্ত কিছু বরাত পেশ করা হচ্ছে।
হাদীস
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বোত্তম দান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ করেন-
أغلاها ثمنا وأنفسها عند أهلها
‘দাতার নিকট যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি’। -সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইতক ৩/১৮৮; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান বাব আফযালুল আমল ১/৬৯
সাহাবায়ে কেরাম-এর আমল
ক)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন,
كنا نخرج زكاة الفطر صاعًا من طعام أو صاعا من شعير أو صاعا من تمر أو صاعا من أقط أو صاعا من زبيب وذلك من صاع النبي صلى الله عليه وسلم.
আমরা সদকা ফিতর আদায় করতাম এক ‘সা’ খাদ্য দ্বারা অথবা এক ‘সা’ যব অথবা এক ‘সা’ খেজুর, কিংবা এক ‘সা’ পনির বা এক ‘সা’ কিসমিস দ্বারা। আর এক ‘সা’-এর ওজন ছিল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘সা’ অনুযায়ী। -মুয়াত্তা মালেক পৃ.১২৪; আল ইসতিযকার, হাদীস ৫৮৯, ৯/৩৪৮
এ হাদীসে রাসূলের যুগে এবং সাহাবাদের আমলে সদকা ফিতর কোন কোন বস্ত্ত দ্বারা আদায় করা হত তার সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।
(খ)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সারা জীবন খেজুর দ্বারাই সদকা ফিতর আদায় করেছেন। তিনি একবার মাত্র যব দ্বারা আদায় করেছেন। -আলইসতিযকার, হাদীস নং ৫৯০,৯/৩৫৪
ইবনে কুদামা রা.আবু মিজলাযের বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন, এ বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায় যে, সাহাবায়ে কেরাম অধিকাংশই যেহেতু খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করতেন তাই ইবনে ওমর রা. সাহাবাদের তরীকা অবলম্বন করতে সারা জীবন খেজুর দ্বারাই আদায় করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইবনে ওমরের ভাষ্য হল-
إن أصحابي سلكوا طريقا وأنا أحب أن أسلكه.
‘সাহাবীগণ যে পথে চলেছেন আমিও সে পথেই চলতে আগ্রহী।’
এবার দেখা যাক মাযহাবের ইমামগণ উত্তম সদকা ফিতর হিসেবে কোনটিকে গ্রহণ করেছেন।
উত্তম সদকা ফিতর
ইমাম শাফেয়ীর মতে উত্তম হল হাদীসে বর্ণিত বস্ত্তর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোচ্চ মূল্যের দ্রব্য দ্বারা সদকা দেওয়া। অন্য সকল ইমামের মতও এমনই।
ইমাম মালিক রাহ.-এর নিকট খেজুরের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত খেজুর ‘আজওয়া’ খেজুর দেওয়া উত্তম। আজওয়া খেজুরের ন্যূনতম মূল্য ১০০০-১২০০ টাকা প্রতি কেজি।
ইমাম আহমদ রাহ.-এর নিকট সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণে খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করা ভালো। -আলমুগনী ৪/২১৯; আওজাযুল মাসালিক ৬/১২৮
ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর নিকটেও অধিক মূল্যের দ্রব্যের দ্বারা ফিতরা আদায় করা ভালো। অর্থাৎ যা দ্বারা আদায় করলে গরীবের বেশি উপকার হয় সেটাই উত্তম ফিতরা।
সাহাবায়ে কেরামের যুগে আধা ‘সা’ গমের মূল্য এক সা খেজুরের সমপরিমাণ ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু্ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মদীনাতে গমের ফলন ছিল না বললেই চলে। পরবর্তীতে হযরত মুআবিয়া রা.-এর যুগে ফলন বৃদ্ধি পেলেও মূল্য ছিল সবচেয়ে বেশি। একাধিক বর্ণনায় এসেছে যে, সেকালে আধা ‘সা’গমের মূল্য এক সা খেজুরের সমপরিমাণ ছিল।
فلما كان زمن معاوية وكثرت الحنطة جُعِلَ نصف صاعٍ منها مثل صاع من تلك الأشياء.
হযরত মুআবিয়া রা.-এর যুগে গমের ফলন বৃদ্ধি পেলে আধা ‘সা’ গমকে সদকা ফিতরের অন্যন্য খাদ্যদ্রব্যের এক ‘সা’র মতো গণ্য করা হত। -আলইসতিযকার ৯/৩৫৫
ইবনুল মুনযির বলেন-
فلما كثر في زمن الصحابة رأووا أن نصف صاع منه يقوم مقام صاع من شعير.
সাহাবীদের যুগে যখন গম সহজলভ্য হল তখন তারা আধা ‘সা’ গমকে এক ‘সা’ যবের সমতুল্য গণ্য করলেন। -ফাতহুল মুলহিম ৩/১৫; আওজাযুল মাসালিক ৬/১৩
তাহলে বুঝা গেল য, হযরত মুআবিয়া রা.-এর যুগে গম দ্বারা সদকা ফিতর আদায়ের প্রচলন বেড়েছিল। এর কারণ হল যে, তখন গমই ছিল সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোচ্চ মূল্যমানের খাদ্য। এ সময় হযরত ইবনে ওমর সাহাবাদের অনুকরণে খেজুর দ্বারাই সদকা ফিতর আদায় করতেন। তখন তাঁকে আবু মিজলায রাহ. বললেন-
إن الله قد أوسع والبر أفضل من التمر
‘আল্লাহ তাআলা তো এখন সামর্থ্য দিয়েছেন। আর গম খেজুরের চেয়ে অধিক উত্তম। অর্থাৎ আপনার সামর্থ্য রয়েছে বেশি মূল্যের বস্ত্ত সদকা করার। তবুও কেন খেজুর দ্বারা তা আদায় করছেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আমি সাহাবাদের অনুকরণে এমন করছি।
যাক আমাদের কথা ছিল, সাহাবায়ে কেরাম গম দ্বারা এজন্যই সদকা ফিতর আদায় করতেন যে, এর মূল্য সবচেয়ে বেশি ছিল। হাদীসে পাঁচ প্রকারের খাদ্য দ্রব্যের মধ্যে বর্তমানে গমের মূল্য সবচেয়ে কম। তাহলে এ যুগে সর্ব শ্রেণীর জন্য এমনকি সম্পদশালীদের জন্যও শুধুই গম বা তার মূল্য দ্বারা সদকা ফিতর আদায় করা কী করে সমীচীন হতে পারে?
বড়ই আশ্চর্য! পুরো দেশের সব শ্রেণীর লোক বছর বছর ধরে সর্বনিম্ন মূল্যের হিসেবে ফিতরা আদায় করে আসছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সকলেই ফিতরা দিচ্ছে একই হিসাবে জনপ্রতি ৫৫/৬০ টাকা করে। মনে হয় সকলে ভুলেই গেছে যে, গম হচ্ছে ফিতরার ৫টি দ্রব্যের একটি (যা বর্তমানে সর্বনিম্ন মূল্যের)। সুতরাং আমরা এদেশের ফিতরা আদায়কারী ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি তারা যেন যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী হাদীসে বর্ণিত দ্রব্যগুলোর মধ্যে তুলনামূলক উচ্চমূল্যের দ্রব্যটির হিসাবে ফিতরা আদায় করেন। পনির, কিসমিস, খেজুর কোনোটির হিসাব যেন বাদ না পড়ে। ধনীশ্রেণীর মুসলিম ভাইদের জন্য পনির বা কিসমিসের হিসাবে ফিতরা আদায় করা কোনো সমস্যাই নয়। যেখানে রমযানে ইফতার পার্টির নামে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়, ঈদ শপিং করা হয় অঢেল টাকার, সেখানে কয়েক হাজার টাকার ফিতরা তো কোনো হিসাবেই পড়ে না। যদি এমনটি করা হয় তবে যেমনিভাবে পুরো হাদীসের উপর মুসলমানদের আমল প্রতিষ্ঠিত হবে এবং একটি হারিয়ে যাওয়া সুন্নত যিন্দা করা হবে, তেমনি এ পদ্ধতি দারিদ্র্যবিমোচনে অনেক অবদান রাখবে। গরীব-দুঃখীগণের মুখেও হাসি ফুটে উঠবে ঈদের পবিত্র দিনে।
আরেকটি আবেদন ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দেশের সম্মানিত মুফতীগণ, মাশায়েখ হযরাত ও দারুল ইফতাগুলোর কাছে, তারা যেন সদকাতুল ফিতর এর পরিমাণ ঘোষণা দেওয়ার সময় হাদীসে বর্ণিত সকল দ্রব্যের হিসাবেই পৃথক পৃথকভাবে বলে দেন এবং মানুষকে যথাসম্ভব উচ্চমূল্যের ফেতরা আদায়ের প্রতি উৎসাহিত করেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দিন।

বুধবার, ৭ জুন, ২০১৭

ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে উলামায়ে কিরাম, দরবারী আলেম এবং আরব অস্থিরতা প্রসঙ্গে

এক. ইমামুল মুহাদ্দিসীন ইমাম সুফিয়ান সাওরী র. হজ্জের মওসুমে মীনায় প্রতাপশালী আব্বাসী খলীফা আবু জাফর মনসূরের তাঁবুতে গেলেন। মনসূর বললেন, আপনার প্রয়োজন পেশ করুন। ইমাম বললেন, ‌'আল্লাহকে ভয় করুন। গোটা দুনিয়াটা জুলুম-অত্যাচারে ভরিয়ে ফেলেছেন'। মনসূর মাথা নত করে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, আপনার প্রয়োজন পেশ করুন। ইমাম বললেন, আজকেইর এই বিশাল অবস্থানে এসেছেন মুহাজির ও আনসারদের তরবারীর বদৌলতে। অথচ তাদের সন্তানরা আজ না খেয়ে মরছে। আল্লাহকে ভয় করুন। তাদের অধিকার তাদের কাছে পৌঁছে দিন। কিছুক্ষণ মাথা নত করে থেকে মনসূর আবার বললেন, আপনার প্রয়োজন পেশ করুন। ইমাম বললেন, উমর ইবনে খাত্তাব হজ্জ করে খাদেমকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কত খরচ হয়েছে। খাদেম বলেছিল দশ দিরহামের চেয়ে একটু বেশি হবে। আর আপনার হজ্জের সম্পদ ও সামগ্রী উট বহন করতে পারছে না। একথা বলে বেরিয়ে গেলেন। এমন অসংখ্য ঘটনায় ইসলামের ইতিহাস সমৃদ্ধ। চার ইমাম থেকে শুরু করে বড় বড় সকাল তাবেঈন, তাবে তাবেঈন ও উলামায়ে কিরামের এমন সব ঘটনায় ইসলামের ইতিহাসের গ্রন্থগুলো ভরপুর।
দুই. শাসকের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিহাসে আলেমদেরকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এক. দরবারী আলেম। এদের সম্পর্কে হাদীস ও আসারে অসংখ্য হুঁশিয়ারী এসেছে। যারা ন্যায়-অন্যায় সর্বক্ষেত্রে শাসকের পক্ষে কথা বলে; এরা শাসককে গোমরাহ করার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে বড় আলেম হলেই বাঁচা যায় না। বড় বড় আলেমরাও এমন দরবারী ছিলেন। মুকাতিল ইবনে সুলাইমান বলখী বড় মুফাসসির ছিলেন। শাসকদের সন্তুষ্টির জন্য তিনি হাদীস বানাতেন! দুই. শাসক থেকে সবসময় দূরত্ব রেখে চলতেন। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে কখনোই তাদের ধারেকাছেও ভিড়তেন না। আল্লামা ইবনে আব্দুল বার র. লিখেছেন, যে আলেম শাসকের যত কাছের, সে তত নিকৃষ্ট। সালাফের অনেক আলেম শাসকদের থেকে এতটাই দূরে থাকতেন যে তাদের সালামেরও জবাব দিতেন না, দাওয়াত কবুল করতেন না। এহইয়াতে ইমাম গাযালী শাসকের সঙ্গে তিনটি অবস্থা বর্ণনা করেছেন। ১. তাদের কাছে যাওয়া। এটা সবচেয়ে নিকৃষ্ট। ২. শাসকের আসা। ৩. তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। এবং এটাই সবেচেয় নিরাপদ বলেছেন তিনি। তিন. যারা শাসকের কাছে আসতেন। তবে নিজেদের প্রয়োজনে নয়; দীন, উম্মাহ ও শাসকের নিজের প্রয়োজনে। সালাফের যুগে এই শ্রেণীর আলেমদের সংখ্যা বেশি। যারা শাসকগোষ্ঠী থেকে দূরে থাকতেন, কিন্তু অন্যায়ে ছাড় দিতেন না। অনেকে এ পথে শহীদও হয়েছেন।
তিন. হাসান বসরী র.। বিখ্যাত তাবেয়ী ও বুযুর্গ। অনেক তরীকাপন্থীরা তাঁর দিকে তরীকার নিসবত করে থাকে (এবং এটা প্রমাণিত নয়)। শাসকগোষ্ঠী থেকে সবসময় দূরে থাকতেন। হাসানের যুগটি ছিল ইসলামী ইতিহাসের এক ভয়ংকর, উত্তপ্ত ও রক্তক্ষয়ী ফিতনাময় মুহূর্ত। উমাইয়া শাসকের অন্যায়-অত্যাচারে মানুষ ছিল অতিষ্ঠ। এই সময়ের হাসানের কর্মপন্থা পরবর্তীতে অসংখ্য আলেমের মানহাজ হয়ে যায়। তিনি মনে করতেন, উমাইয়া শাসকরা জালেম। কিন্তু ক্ষমতায়ও তারা ভারী। অপরদিকে বিদ্রোহীরা দুর্বল। ফলে তিনি শাসকের পক্ষেও যাননি; বিদ্রোহীদের পক্ষেও যাননি; বরং বিদ্রোহীদের আরও বারণ করতেন। মনে করতেন এটা ফিতনা বাড়িয়ে দিবে। তাকে হাজ্জাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে বললেন, সে কুরআন পড়ে। গরীবকে খাওয়ায়। জুলুম করে। জিজ্ঞাসা করা হলো বিদ্রোহ করা যাবে তার বিরুদ্ধে? তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করো। এর মানে তিনি কিন্তু তাদের জুলুমের ব্যাপারে নীরবও ছিলেন না; বরং হাজ্জাজেরও মুখামুখি সমালোচনা করতেন। পেছনের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে দেখা গেলো শাসকের থেকে দূরাবস্থানের অর্থ তাদের জুলুমের ব্যাপারে নীরব থাকা নয়। যেমনটা হাসান বসরীর জীবন থেকে পেলাম । তাদের ধারে-কাছেও যেতেন না। আবার বিদ্রোহের পক্ষেও ছিলেন না। কিন্তু জুলুমের ব্যাপারে নীরব ছিলেন না। বাস্তবতা হলো শাসকের অন্যায় ও জুলুমের ব্যাপারে নীরব ছিলেন, সালাফের এমন কাউকে বোধহয় পাওয়া যাবে না।
চার. অতীতে শাসকশ্রেণী জালেম হলেও বর্তমান শাসকশ্রেণী জুলুমের কিংবদন্তী। উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগের অনেক শাসক জালেম হলেও উলামায়ে কিরামের প্রতি সম্মান, মর্যাদা ও দীনের প্রতি নিষ্ঠা রাখতেন। বর্তমান শাসকের কাছে গদিই তাদের দীন ও ধর্ম। সেক্ষেত্রে হাসান বসরীর মানহাজ (সমালোচনা) প্রয়োগ করাও কঠিন। শাসকদের কথা হলো: আপনারা দীন, আক্বীদা, পর্দা, নামাজের সময় দোকান বন্ধ, মেয়েদের গাড়ি চালানো নিষেধ সব করুন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যাপারে নাক গলাবেন না। ফলে উলামায়ে কিরামের সব ব্যাপারে কথা বলতে পারেন; কেবল রাজনীতি নিয়ে কিছু বলতে পারেন না। বলতে গেলে হেনস্থা নয়; খুন-গুমই ঠিকানা। সুতরাং এ পরিস্থিতে আবেগ নয়; বাস্তবতা অনুযায়ী কাজ করা জরুরি। আরব বিশেষত সৌদি আরবের বড় বড় বুযুর্গ উলামায়ে কিরাম তথা শাইখ বিন বায, ইবনে উসাইমীন, ইবনে ইবরাহীম আলে শাইখ র. প্রমুখ উলামায়ে কিরামকে অনেকেই দরবারী আলেম হিসেবে আখ্যা দেন। এটা ভুল ও জুলুম। হয়তো এদের অনেকেই এসব আলেমের শাসকের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি ও এ তাদের সার্বিক বক্তব্য সম্পর্কে অজ্ঞ। অথবা আবেগ কিংবা দুরভিসন্ধিমূলক। শাসকের তাকফীরের ব্যাপারেও তাদের অসংখ্য বক্তব্য রয়েছে। তবে তাকফীরীদের সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে তারা ব্যক্তিবিশেষকে তাকফীর করেননি। কেবল হুকুম বর্ণনা করেছেন। এটাই হয়তো তাদের সাধ্যের সর্বশেষ ধাপ ছিল।
পাঁচ. কাতার মাসূম নয়। কিন্তু কাতারের যত দোষই থাক, এভাবে অন্তর্ঘাতী দ্বন্দ্বে ইয়াহুদি-খ্রিস্টান ও শিয়ারাই লাভবান হবে। ইসরাঈলের বিরুদ্ধে একজোট হতে না পারলেও মাথামোটাগুলো নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে একজোট হতে পারে। আবার কাতার প্রেক্ষাপটে যারা আলে সউদের বিপক্ষে মুখে ফেনা তুলছেন, তারা আলে সউদকে সরিয়ে কি ট্রাম্পের গণতন্ত্র চান? আরেকই লিবিয়া, তিউনিস কিংবা সিরিয়া? জিজ্ঞাসা রইলো। 
তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি এখানের আলেমদের রাজনৈতিক মানহাজের সঙ্গে পূর্ণ একমত নই। এ যুগে হয়তো সাঈদ বিন জুবায়েরের মতো হাজ্জাজীয় সমালোচনা করা যায় না; কমপক্ষে হাসান বসরীর মানহাজ তো ফলো করা যায়। হিকমতের সঙ্গে সমালোচনা ও জাতিকে জাগ্রত রাখার কাজটাও যদি না করা হয় আলেমদের পক্ষ থেকে; শাসকদের দৌরাত্ম্য ও স্বৈরাচার তো বাড়তেই থাকবে। আজকে মসজিদে তারাবীহের পর ইমাম সাহেবকে দেখলাম মুসলিম উম্মাহর একতার জন্য দুআ করছেন। এটাও প্রকারান্তরে জাতির প্রতি একটা ম্যাসেজ।
--
মীযান হারুন
রিয়াদ, সৌদি আরব

সোমবার, ৫ জুন, ২০১৭

মুক্তিযুদ্ধে বিধর্মী এবং মুক্তমনাদের অবদান কতটুকু ?


Emran Hossain Adib

মুসলমান উনাদের রক্তের উপর দাঁড়িয়েই যে বাংলাদেশ তার প্রমান নাম না জানা লক্ষ লক্ষ মুসলমান ছাড়াও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত - 
৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, 
৬৮ জন বীরউত্তম , 
১৭৫ বীর বিক্রম , 
৪২৬ বীর প্রতীকদের 
অর্থাৎ মোট খেতাব প্রাপ্ত - ৬৭৬ জন এর মাঝে মুসলিম হলেন - ৬৭১ জন, বিধর্মী মাত্র - ০৪ জন। সংখ্যা অনুপাতে মুসলিম হলেন - ৯৯.২৬%। 
সুতরাং খেতাবপ্রাপ্ত শহীদের তালিকা অনুযায়ী এটাই প্রমানিত হয় যে যুদ্ধে অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে এবং ৩০ লক্ষ শহীদের মাঝে মুসলিমের অনুপাত ৯৯% এরও বেশী।যে দেশের ৯৯.২৬% ধর্মের লোক সে দেশ সৃষ্টির যুদ্ধে বীরত্বের জন্য খেতাব পেয়েছে সে দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ যারা বানাতে চায় তারা ইতিহাস সম্পর্কে গন্ডমুর্খ, বকলম। গুটি কয়েক নামধারী মুক্তিযুদ্ধা তারা বলে ধর্ম নিরপেক্ষতার জন্য নাকি এই দেশ স্বাধীন করা হয়েছিল ??? মুক্তি যুদ্দের সময় কয়জন মক্তমনা যুদ্ব করেছিল তা আজও প্রশ্নবিদ্ধ .
মুসলিম জাতি যুদ্ব করেছিল ভাষার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য নয় .
আজ যারা মুক্তিযুদ্দা সেজে ইসলামের বিরুদ্বে কথা বলে আসলে তারা দেশ প্রেমিক নয় বরং দেশের শত্রু .
আজকে যারা সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকা নিয়ে বলতে চায় যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল ধর্ম নিরপেক্ষতার জন্য তারা কি লক্ষ লক্ষ মুসলমানের উপর মিথ্যাচার করছেনা ?
মুসলমান কখনোই ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য জীবন দেয়নি।মুসলমান জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন ধর্ম পালনের জন্যই।

রবিবার, ২৮ মে, ২০১৭

কামালুদ্দিন শামানী এর বিখ্যাত কবিতা-


من يأخذ العلم عن شيخ مشافهةً *** يكن من الزيف والتصحيف في حرمِ
ومن يكن آخذاً للعلم من صحف *** فعلمه عند أهل العلم كالعدم

“যে ব্যক্তি তাঁর শায়েখের নিকট থেকে সরাসরি ইলম শিক্ষা করে, সে বিকৃতি ও জালিয়াতি থেকে পবিত্র থাকে।
আর যে ব্যক্তি কিতাব পড়ে ইলম অর্জন করে, আলেমদের নিকট তার ইলম কোন ইলমই নয়”

আল্লামা শাওকানী (রহঃ) লিখেছেন,
إنَّ إنصاف الرجل لا يتمُّ حتَّى يأخذ كلَّ فنٍّ عن أهله كائناً ما كان

“কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত ন্যায়Ñনিষ্ঠার উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে জ্ঞানের প্রত্যেক শাখায় অভিজ্ঞ লোকদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করবে।”
আল্লামা শাওকানী (রহঃ) আরও বলেছেন,
وأمَّا إذا أخذ العلم عن غير أهله، ورجَّح ما يجده من الكلام لأهل العلم في فنون ليسوا من أهلها ، فإنَّه يخبط ويخلط

“আলেম যদি অযোগ্য লোকের কাছ থেকে ইলম শিক্ষা করে এবং জ্ঞানের সংশ্লিষ্ট শাখায় পারদর্শী নয় এমন লোকের বক্তব্যকে সে প্রাধান্য দেয়, তবে সে অনুমান নির্ভর এবং অবিমৃশ্যকারী।” [আদাবুত তলাব ও মুনতাহাল আরাব, পৃষ্ঠা-৭৬]
আল্লামা সাখাবী (রহঃ) লিখিত “আল-জাওয়াহিরু ওয়াদ দুরারু” নামক কিতাবে রয়েছে,
"من دخل في العلم وحده؛ خرج وحدَه"

“যে ব্যক্তি একাকী ইলমের পথে প্রবেশ করল, সে একাকী সেখান থেকে বের হয়ে গেল”
[আল জাওয়াহির ওয়াদ দুরার, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৫৮]

New Islamic Song 2017 | Ya Rab | Sayed Ahmad | Allama Iqbal Rah | Kalarab


শুক্রবার, ২৬ মে, ২০১৭

বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ে সাওম


[ বাংলা – Bengali – بنغالي ]

আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী
﴿ الصوم عند الديانات والشعوب ﴾
« باللغة البنغالية »
عبد الله المأمون الأزهري


বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ে সাওম
সিয়াম বা রোযা নাম ও ধরণভেদে বিভিন্ন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বহুল প্রচলিত একটি ধর্মীয় বিধান, যা মুসলমানদের জন্য অবশ্য পালনীয় (ফরজ) একটি ইবাদত। শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী‘য়তে যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে সিয়ামের বিধান দেয়া হয়েছে, তেমনি সিয়ামের বিধান দেয়া হয়েছিল পূর্ববর্তী নবীদের শরী‘য়তেও; পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ধর্ম-কর্মেও। আসমানী ধর্ম ছাড়াও মানব রচিত বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ে সাওমের বিধান রয়েছে। আল্লাহ তায়া‘লা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣] 
 “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে। যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার” [সূরা বাক্বারা: ১৮৩]। 
এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী ও প্রত্যেক জাতির মধ্যেই প্রচলিত ছিল ‘সিয়াম’ বা রোযা নামের এই ধর্মানুষ্ঠান।
তাফসীরে কুরত্ববীতে উক্ত আয়াতের ব্যাখায় বলা হয়েছে, 
الْمَعْنَى:"كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيامُ" أَيْ فِي أَوَّلِ الْإِسْلَامِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ،" كَما كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ" وَهُمُ الْيَهُودُ- فِي قَوْلِ ابْنِ عَبَّاسٍ- ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ. ثُمَّ نُسِخَ هَذَا فِي هَذِهِ الْأُمَّةِ بِشَهْرِ رَمَضَانَ. وَقَالَ مُعَاذُ بن جبل: نسخ ذلك" ب أَيَّامٍ مَعْدُوداتٍ" ثُمَّ نُسِخَتِ الْأَيَّامُ بِرَمَضَانَ.
অর্থাৎ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রত্যেক মাসে তিন দিন ও আশুরার দিনে সাওম ফরজ ছিল, যেমনি ভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী ইহুদি সম্প্রদায়ের উপর মাসে তিন দিন ও আশুরার দিনে সাওম ফরজ ছিল। পরবর্তীতে রমাদান মাসের দ্বারা এ সাওম রহিত হয়। মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উক্ত তিন দিনের সাওম নির্দিষ্ট কয়েক দিনের সাওমের দ্বারা রহিত হয়, অতঃপর উক্ত কয়েক দিনের সাওম আবার রমাদানের সাওম দ্বারা রহিত হয়। 
 عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: «صَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَاشُورَاءَ، وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ تُرِكَ»، وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ لاَ يَصُومُهُ إِلَّا أَنْ يُوَافِقَ صَوْمَهُ
ইবন ‘উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আশুরার দিন সিয়াম পালন করেছেন এবং এ সিয়ামের জন্য আদেশও পালন করেছে। পরে যখন রমাদানের সিয়াম ফরজ হল তখন তা ছেড়ে দেওয়া হয়। ‘আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এ সিয়াম পালিন করতেন না, তবে মাসের যে দিনগূলোতে সাধারন সিয়াম পালন করতেন, তাঁর সাথে মিল হলে করতেন। 
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا،: أَنَّ قُرَيْشًا كَانَتْ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ فِي الجَاهِلِيَّةِ، ثُمَّ أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِصِيَامِهِ حَتَّى فُرِضَ رَمَضَانُ، وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ شَاءَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ شَاءَ أَفْطَرَ»
‘আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার থেকে বর্নিত যে, জাহিলী যুগে কুরায়শগন ‘আশূরার দিন সাওম পালন করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পরে এ সাওম পালনের নির্দেশ দেন। অবশেষে রমাদানের সিয়াম ফরজ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যার ইচ্ছা ‘আশুরার সিয়াম পালন করবে এবং যার ইচ্ছা সে সাওম পালন করবে না। 
 আমরা এখানে আদি পিতা আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত বিভিন্ন আসমানী ধর্মে ও মানব রচিত অন্যান্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের যুগে যুগে সাওমের বিধান ও ধরণ নিয়ে আলোচনা করব। 
আদম আলাইহিস সালামের ধর্মে সাওম: 
প্রথম নবী আদম আলাইহিস সালামের শরী‘য়তে সিয়ামের বিধান দেয়া হয়েছিল বলে তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়। অবশ্য সেই সিয়ামের ধরণ ও প্রকৃতি কেমন ছিল তা আমাদের জানা নেই। এ বিষয়ে বাইবেল, কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসের কিতাব একেবারে নিশ্চুপ। বলা হয়ে থাকে, পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবীর শরী‘য়তেই চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সিয়ামের বিধান ছিল। এই সিয়াম আইয়্যামি বীদ বা বেজোড় সংখ্যক দিনের সাওম নামে খ্যাত। 
নূহ আলাইহিস সালামের সাওম: 
তাফসীরে ইবনে কাসীরে এসেছে, 
قَدْ كَانَ هَذَا فِي ابْتِدَاءِ الْإِسْلَامِ يَصُومُونَ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، ثُمَّ نُسِخَ ذَلِكَ بِصَوْمِ شَهْرِ رَمَضَانَ، كَمَا سَيَأْتِي بَيَانُهُ. وَقَدْ رُوي أَنَّ الصِّيَامَ كَانَ أَوَّلًا كَمَا كَانَ عَلَيْهِ الْأُمَمُ قَبْلَنَا، مِنْ كُلِّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ -عَنْ مُعَاذٍ، وَابْنِ مَسْعُودٍ، وَابْنِ عَبَّاسٍ، وَعَطَاءٍ، وَقَتَادَةَ، وَالضَّحَّاكِ بْنِ مُزَاحِمٍ. وَزَادَ: لَمْ يَزَلْ هَذَا مَشْرُوعًا مِنْ زَمَانِ نُوحٍ إِلَى أَنْ نَسَخ اللَّهُ ذَلِكَ بِصِيَامِ شَهْرِ رَمَضَانَ.
অর্থাৎ প্রসিদ্ধ তাফসিরবিদ হযরত মুয়াজ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, আতা, কাতাদা ও দহহাক (রহ.) বর্ণনা করেন, নূহ আলাইহিস সালাম থেকে শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত প্রত্যেক নবীর যুগেই প্রতি মাসে তিনটি করে সিয়ামের বিধান ছিল। পরবর্তীতে ইহা রমজানের সাওমের দ্বারা রহিত হয়। 
 عن عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو، يَقُولُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «صَامَ نُوحٌ الدَّهْرَ، إِلَّا يَوْمَ الْفِطْرِ وَيَوْمَ الْأَضْحَى» 
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন বাদে সারা বছর সাওম রাখতেন। 
 ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাওম: 
 মুসলিম মিল্লাতের পিতা সহিফাপ্রাপ্ত নবী ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের যুগে ৩০টি সিয়াম ছিল বলে কেউ কেউ লিখেছেন।
তাফসীরে মানারে আল্লামা রশিদ রেজা ইমাম মুহাম্মদ আব্দুর সূত্রে উল্লেখ করেন, 
قَالَ الْأُسْتَاذُ الْإِمَامُ: أَبْهَمَ اللهُ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا، وَالْمَعْرُوفُ أَنَّ الصَّوْمَ مَشْرُوعٌ فِي جَمِيعِ الْمِلَلِ حَتَّى الْوَثَنِيَّةِ، فَهُوَ مَعْرُوفٌ عَنْ قُدَمَاءِ الْمِصْرِيِّينَ فِي أَيَّامِ وَثَنِيَّتِهِمْ، وَانْتَقَلَ مِنْهُمْ إِلَى الْيُونَانِ فَكَانُوا يَفْرِضُونَهُ لَا سِيَّمَا عَلَى النِّسَاءِ، وَكَذَلِكَ الرُّومَانِيُّونَ كَانُوا يُعْنَوْنَ بِالصِّيَامِ، وَلَا يَزَالُ وَثَنِيُّو الْهِنْدِ وَغَيْرُهُمْ يَصُومُونَ إِلَى الْآنِ، وَلَيْسَ فِي أَسْفَارِ التَّوْرَاةِ الَّتِي بَيْنَ أَيْدِينَا مَا يَدُلُّ عَلَى فَرْضِيَّةِ الصِّيَامِ، وَإِنَّمَا فِيهَا مَدْحُهُ وَمَدْحُ الصَّائِمِينَ، وَثَبَتَ أَنَّ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ صَامَ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، وَهُوَ يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الصَّوْمَ كَانَ مَعْرُوفًا مَشْرُوعًا وَمَعْدُودًا مِنَ الْعِبَادَاتِ، وَالْيَهُودُ فِي هَذِهِ الْأَزْمِنَةِ يَصُومُونَ أُسْبُوعًا تِذْكَارًا لِخَرَابِ أُورْشَلِيمَ وَأَخْذِهَا، وَيَصُومُونَ يَوْمًا مِنْ شَهْرِ آبَ. 
 দাউদ আলাইহিস সালামের সাওম: 
 আসমানি কিতাব ‘যবুর’প্রাপ্ত বিখ্যাত নবী দাউদ আলাইহিস সালামের যুগেও সাওমের প্রচলন ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «صُمْ أَفْضَلَ الصِّيَامِ عِنْدَ اللهِ، صَوْمَ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَام كَانَ يَصُومُ يَوْمًا وَيُفْطِرُ يَوْمًا»
‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সাওম দাউদ আলাইহিস সালামের সাওম তিনি এক দিন সাওম পালন করতেন এবং এক দিন বিনা সাওমে থাকতেন। 
 মূসা আলাইহিস সালাম ও ইহুদি ধর্মে সাওম: 
ইহুদিদের ওপর প্রতি শনিবার, বছরের মধ্যে মহররমের ১০ তারিখে আশুরার দিন এবং অন্যান্য সময় সাওম ফরজ ছিল।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ المَدِينَةَ فَرَأَى اليَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ: «مَا هَذَا؟»، قَالُوا: هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى، قَالَ: «فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ»، فَصَامَهُ، وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করে ইহুদিদের আশুরার দিনে সাওম অবস্থায় পেলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজকে তোমরা কিসের সাওম করছ?’ তারা বলল, ‘এটা সেই মহান দিন যেদিন আল্লাহ তা‘আলা মূসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর কওম বনী ইসরাইল ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ মূসা আলাইহিস সালাম ওই দিনে সাওম রেখেছিলেন, তাই আমরা আজকে সাওম করছি।’ এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি তোমাদের অপেক্ষা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের অধিক নিকটবর্তী। এরপর তিনি এ দিন সওম পালন করেন এবং সবাইকে সাওম রাখার নির্দেশ দেন”।’ 
 মূসা আলাইহিস সালাম তুর পাহাড়ে আল্লাহর কাছ থেকে তাওরাতপ্রাপ্তির আগে ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করেছিলেন। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতে বর্ণিত আছে, মূসা আলাইহিস সালাম তুর পাহাড়ে ৪০ দিন পানাহার না করে কাটিয়েছিলেন। তাই ইহুদিরা সাধারণভাবে মূসা আলাইহিস সালামের অনুসরণে ৪০টি সাওম রাখা ভালো মনে করত। তন্মধ্যে ৪০তম দিনটিতে তাদের ওপর সাওম রাখা ফরজ ছিল। যা ইহুদিদের সপ্তম মাস তিসরিনের দশম তারিখে পড়ত। এ জন্য ওই দিনটিকে আশুরা বা দশম দিন বলা হয়। এ ছাড়া ইহুদি সহিফাতে অন্যান্য সাওমেরও সুস্পষ্ট হুকুম রয়েছে। ইহুদিরা বর্তমানে ৯ আগষ্ট ইহুদী হাইকাল বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস দিবসে সাওম রাখে, এদিন তারা খাদ্য, স্ত্রী সহবাস ও জুতা পরিধান থেকে বিরত থাকে। এছাড়াও ১৩ নভেম্ভর, ১৭ই জুলাই, ১৩ই মার্চ ও বিভিন্ন দিবসে সাওম পালন করে।
ঈসা আলাইহিস সালাম ও খৃস্টান ধর্মে সাওম: 
 আসমানি কিতাব ‘ইঞ্জিল’ প্রাপ্ত বিশিষ্ট নবী ঈসা আলাইহিস সালামের যুগে সাওমের প্রমাণ পাওয়া যায়। ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারী সম্প্রদায় সাওম রাখতেন। বর্তমানে তাদের দু'ধরণের সাওম আছে। প্রথম হলো, তাদের পিতার উপদেশে নির্দিষ্ট কয়েকদিন খাদ্য পানীয় থেকে বিরত থাকা, আর ইফতার হবে নিরামিষ দিয়ে, মাছ, মাংস ও দুগ্ধজাত জিনিস খাওয়া যাবেনা। যেমন: বড় দিনের সাওম, তাওবার সাওম যা ৫৫ দিন পর্যন্ত দীর্ঘায়ীত হয়, এমনিভাবে সপ্তাহে বুধ ও শুক্রবারে সাওম। দ্বিতীয় ধরণের সাওম হলো খাদ্য থেকে বিরত থাকা, তবে মাছ ভক্ষণ করা যাবে। এ সাওমের মধ্যে ছোট সাওম বা জন্মদিনের সাওম, ইহা ৪৩ দিন দীর্ঘায়িত হয়, দূতগণের সাওম, মারিয়ামের সাওম ইত্যাদি। তবে তাদের ধর্মে কোন সাওমই ফরজ নয়, বরং কেউ ইচ্ছা করলে রাখতে পারে। 
 তাফসীরে ত্বাবারীতে এসেছে,
حدثني موسى بن هارون قال، حدثنا عمرو بن حماد قال، حدثنا أسباط، عن السدي:"يا أيها الذين آمنوا كُتب عليكم الصيام كما كتب على الذين من قبلكم"، أما الذين من قبلنا: فالنصارى، كتب عليهم رمضان، وكتب عليهم أن لا يأكلوا ولا يشربوا بعد النوم، ولا ينكحوا النساءَ شهر رمضان. فاشتد على النصارى صيامُ رمَضان، وجعل يُقَلَّبُ عليهم في الشتاء والصيف. فلما رأوا ذلك اجتمعوا فجعلوا صيامًا في الفصل بين الشتاء والصيف، وقالوا: نزيد عشرين يومًا نكفّر بها ما صنعنا! فجعلوا صيامهم خمسين. فلم يزل المسلمون على ذلك يَصنعون كما تصنع النصارى، حتى كان من أمر أبي قيس بن صرمة وعمر بن الخطاب، ما كان، فأحل الله لهم الأكل والشرب والجماعَ إلى طُلوع الفجر.

ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর ধর্ম প্রচার শুরুতে ইঞ্জিল পাওয়ার আগে জঙ্গলে ৪০ দিন সিয়াম সাধনা করেছিলেন। একদা ঈসা আলাইহিস সালামকে তাঁর অনুসারীরা জিজ্ঞেস করেন যে, ‘আমরা অপবিত্র আত্মাকে কী করে বের করব?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘তা দু‘আ ও সাওম ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে বের হতে পারে না।’ 
গ্রীক ও রোমানদের সাওম: 
গ্রীস ও রোমানরা যুদ্ধের আগে সাওম রাখত যাতে ক্ষুধা ও কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। খ্রিষ্টান পাদরিদের ও পারসিক অগ্নিপূজকদের এবং হিন্দু যোগী ইত্যাকার ধর্মাবলম্ব্বীদের মধ্যে সাওমের বিধান ছিল। পারসিক ও হিন্দু যোগীদের সাওমের ধরন ছিল এরূপ—তারা সাওম থাকা অবস্থায় মাছ-মাংস, পাখি ইত্যাদি ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকত বটে; কিন্তু ফল-মূল এবং সামান্য পানীয় গ্রহণ করত। মূর্তিপূজক ঋষীরা সাওমের ব্যাপারে এতোই কঠোর ছিল যে, এরূপ—তারা সাওম থাকা অবস্থায় মাছ-মাংস, পাখি ইত্যাদি ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকত, স্ত্রী সহবাস করতনা। সারা বছর সাওম রেখে আত্মার কষ্ট দিত আর এভাবে তারা পবিত্রতা অর্জনের সাধনা করত। 
প্রাচীন চীনা সম্প্রদায়ের লোকরা একাধারে কয়েক সপ্তাহ সাওম রাখত। 
জাহেলী যুগে সাবেয়ী সম্প্রদায়ের সাওম: 
ইবন নাদিম তার ‘ফিহরাসাত’ কিতাবের নবম খন্ডে উল্লেখ করেন, সাবেয়ী সম্প্রদায়ের লোকেরা (যারা গ্রহ নক্ষত্র পূঁজা করে) ত্রিশ দিন সাওম পালন করত। আযার মাসের ৮দিন অতিবাহিত হলে এ সাওম শুরু হতো, কানুনে আউয়াল মাসে ৯টি, শাবাত মাসে ৭টি সাওম। এ সাত সাওম পালনের পরে তারা ঈদুল ফিতর উদযাপন করত। সাওমবস্থায় তারা খাদ্য, পানীয় ও স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি থেকে বিরত থাকত। 
হিন্দু ধর্মে সাওম বা উপবাস: 
বেদের অনুসারী ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত অর্থাৎ উপবাস ছিল। প্রত্যেক হিন্দি মাসের ১১ তারিখে ব্রাহ্মণদের ওপর ‘একাদশীর’ উপবাস রয়েছে। এ হিসাবে তাদের উপবাস ২৪টি হয়। কোনো কোনো ব্রাহ্মণ কার্তিক মাসে প্রত্যেক সোমবার উপবাস করেন। কখনো হিন্দু যোগীরা ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করে চল্লিশে ব্রত পালন করেন। হিন্দু মেয়েরা তাদের স্বামীদের মঙ্গল কামনায় কার্তিক মাসের ১৮তম দিবসে "কারওয়া চাওত" নামে উপবাস রাখে। 
বৌদ্ধ ধর্মে সাওম বা উপবাস: 
তারা তাদের চন্দ্রমাসের Upisata মাসে ১,৯,১৫ ও ২২ তারিখে ৪ দিন উপবাস পালন করে। এছাড়া বৌদ্ধ গুরুরা দুপুরের খাবারের পর থেকে সব ধরণের খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। তারা এভাবে খাদ্য থেকে বিরত থেকে সংযম ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণ করে। 
মংগোলীরা প্রতি ১০ দিন অন্তর ও যারাদাশতিরা প্রতি ৫ দিন অন্তর সাওম পালন করত। 
জাহেলী যুগে সাওম: 
ইসলামের সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভের আগে আরবের মুশরিকদের মধ্যেও সিয়ামের প্রচলন ছিল। যেমন আশুরার দিনে কুরাইশরা জাহেলি যুগে সাওম রাখত এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহেলি যুগে ওই সাওম রাখতেন।
রায়েলীদের নিকট সাওম: 
রায়েলী সম্প্রদায়ের লোকেরা শারীরিক সুস্থতার জন্য সপ্তাহে একদিন তথা ২৪ ঘন্টা সাওম পালন করে। 
ইসলাম ধর্মে সাওম:
আল্লাহ তায়া‘লা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣] 
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে। যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার” [সূরা বাক্বারা: ১৮৩]। 
ইসলামে সাওমের রয়েছে করিপয় শর্ত ও বৈশিষ্ট্য। সুর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত পর্যান্ত যাবতীয় পানাহার, স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম সাওম। সেহেরী খাওয়া ইসলামী শরিয়তের সাওমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলামে রমাদানের সাওম ফরজ, অন্যান্য সাওম মুস্তাহাব, যেমন, আরাফার সাওম, মহররমের সাওম, শবে বরাতের সাওম, প্রতি চন্দ্র মাসে ১৩.১৪.১৫ তারিখ সাওম ইত্যাদি। 
সমাজে সাওমের প্রভাব
সংযম অর্জন: 
সাওমের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে বিষয়টি বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে সংযম। মূলত সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্ম ও সমাজে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য সাওমের প্রচলন ছিল। ইসলামী শরীয়তে ফরজকৃত সাওম সেই লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহায়ক। তাই প্রতিটি মুমিনের জন্য কর্তব্য হলো সাওমের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে ব্রতী হওয়া।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, রমাদান মাস হলো ধৈর্যের মাস, আর ধৈর্যের প্রতিদান হলো জান্নাত। এই মাসেই আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে ধৈর্যের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। যাতে রমাদান পরবর্তী সময়ে প্রতিটি মুহূর্তে, কথায় কাজে ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোর জন্যই সাওম। 
পরহেযগারী অর্জন: 
সাওমের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তায়া'লা বলেছেন, 
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣] 
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে। যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার” [সূরা বাক্বারা: ১৮৩]।
(لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) যাতে তোমরা তাকওয়াবান হও। এখানেই সমাজ গঠনে সাওমের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠে। তাকওয়ার ভিত্তির উপর যে সমাজ গঠিত হবে সেখানে থাকবে না কোন হিংসা বিদ্বেষ, মারামারি, কাটাকাটি, দুর্নীতি ও রাহাজানি। সাওমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সকল প্রকার নাফরমানি কাজ থেকে দূরে থাকার নামই তাকওয়া। মানুষের মনের গোপন কোণে যে কামনা-বাসনা আছে, আল্লাহ তা‘আলা সে সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল। আল্লাহর কাছে বান্দার মান-মর্যাদা নির্ধারণের একমাত্র উপায় তাকওয়া। এ তাকওয়াই মানুষের মনে সৎ মানবিক গুণাবলি সৃষ্টি করে। সুতরাং যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে বিরত থেকে ভালো কাজ করতে পারলেই সাওম পালন সফল ও সার্থক হবে। এভাবে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে অর্জিত প্রশিক্ষণ দ্বারা নিজেদের একজন সৎ, আল্লাহভীরু নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে।
সাওম থেকে তাকওয়া শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহভীতি অর্জন করার ক্ষেত্রে সাওমের কোনো বিকল্প নেই। সাওমের শিক্ষা নিয়ে তাকওয়ার গুণাবলি অর্জনের মধ্য দিয়ে মানুষ ইহকালীন কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তি লাভ করতে পারে। ঈমান ও আত্মবিশ্লেষণের সঙ্গে সাওম রাখলে জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এ শিক্ষা যদি বাকি ১১ মাস কাজে লাগানো যেত, তাহলে পৃথিবীতে এত অশান্তি, অনাচার থাকত না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে 
﴿ قَدۡ أَفۡلَحَ مَن تَزَكَّىٰ ١٤ ﴾ [الاعلا: ١٤] 
“যে সংশোধিত হলো, সেই সফলকাম হলো”। (সূরা আল-আ‘লা, আয়াত-১৪) 
আত্মিক ও দৈহিক সুস্থতা অর্জন: 
সাওম মানুষের ভেতর ও বাহির—দুই দিকের সংশোধন করে। মানুষের বাতেন বা ভেতরের অবস্থা পরিবর্তন করা অর্থাৎ আলোকিত করা এবং তার স্বভাব, চরিত্র, আচার-আচরণ সংশোধনপূর্বক প্রকাশ্যভাবে সুন্দর করে গড়ে তোলা সাওমের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাওম মানুষকে পার্থিব লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়।
মানুষের শারীরিক অবকাঠামো ঠিক রাখতে বর্তমানে চিকিৎসকেরা সাওম রাখার নির্দেশ দিয়ে থাকেন। শরীর ঠিক মন ঠিক। সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শারীরিক সুস্থতা অত্যাবশ্যকীয়। 
ইবনে সিনা সাওমকে দুরারোগ্য সব রোগের চিকিৎসা বলতেন। 
মিশরে নেপোলিয়ানের আগ্রাসন পরবর্তী যুগে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার জন্য সাওম রাখলে বলা হতো। 
সুন্দর সমাজ গঠন: 
সাওমের মাধ্যমে দরিদ্র ও অভুক্ত মানুষের দুঃখ দুর্দশা অনুধাবন করা যায়, ফলে সমাজে এর প্রভাব সুদূর প্রসারী। সিয়াম সাধনা সহমর্মিতা শিক্ষা জাগ্রত করার কার্যকর মাধ্যম। অনাহার কাকে বলে, খাদ্যাভাব কাকে বলে যারা অনুভব করেনি, তারা সমাজের বঞ্চিত ও পীড়িত মানুষের কষ্ট কীভাবে বুঝবে? সাওম রাখার কারণে এই মানুষগুলো ক্ষুধার যন্ত্রণা সম্পর্কে সামান্য হলেও ধারণা পাবে। ফলে প্রতিবেশী ও কাছে অবস্থানকারীদের কষ্টের জীবন কিছুটা অনুধাবন করা সহজ হবে। সাওম রাখার কারণে শরীরের শক্তি কমে আসবে। তখন অধীনস্থদের কাজের ভার লাঘব করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হবে। আর এতে মনিব-ভৃত্যের দূরত্ব কমে একে অপরের পরিপূরক মনে করার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। মালিক পক্ষ ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে বৈরিতা থাকবে না।
সিয়াম সাধনার দ্বারা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক স্নেহ, ভালোবাসা, মায়া-মমতা, আন্তরিকতা, দানশীলতা, বদান্যতা, উদারতা, ক্ষমা, পরোপকারিতা, সহানুভূতি, সমবেদনা প্রভৃতি সদাচরণ জন্মায়। সাওমের এ মহান শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের সমাজ ও পারিবারিক জীবনে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রমাদান মাস আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি বেশি দান সদাকা করতেন। যেমন হাদীসে এসেছে, 
عَنْ ابْن عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: «كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالخَيْرِ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، وَكَانَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ يَلْقَاهُ كُلَّ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ، حَتَّى يَنْسَلِخَ، يَعْرِضُ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ القُرْآنَ، فَإِذَا لَقِيَهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ، كَانَ أَجْوَدَ بِالخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ المُرْسَلَةِ»
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধন সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে সকলের চেয়ে দানশীল ছিলেন। রমাদানে জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর সাথে দেখা করতেন, তখন তিনি আরো অধিক দান করতেন। রমযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি রাতেই জিবরীল আলাইহিস সালাম তাঁর একবার সাক্ষাৎ করতেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরআন শোনাতেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তখন তিনি রহমত প্রেরিত বায়ূর চেয়ে অধিক ধন-সম্পদ দান করতেন। 
তাই সাওম পালনের দ্বারা সমাজের দারিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। 
প্রকৃতপক্ষে সাওম প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক জীবনসহ সর্বস্তরে অনুশীলনের দীক্ষা দিয়ে যায়। তাই আসুন, সাওমের প্রকৃত শিক্ষা ও উদ্দেশ্যের প্রতি যত্নবান হয়ে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করি, মানবিক গুণাবলিতে জীবনকে আলোকিত করি; তাহলে আমাদের সিয়াম সাধনা অর্থবহ হবে। তখন মানুষের মধ্যে গড়ে উঠবে সুমধুর সম্পর্ক, বিদায় নেবে অরাজকতা, অন্যায়-অনাচার এবং দুর্নীতি ও ভেজালমুক্ত হয়ে আদর্শ জাতি হিসেবে আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব। সাওমের মাসের পরিসমাপ্তি বয়ে আনুক সমাজ জীবনে আমূল পরিবর্তন, খোদাভীতি, আত্মসংযম ও মানবপ্রেম। সাওমের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের আলোকে যেন সারা জীবন সৎভাবে অতিবাহিত করে আল্লাহর অশেষ করুণা ও ক্ষমা লাভ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে পারি, আল্লাহ পাক আমাদের সেই তাওফিক দান করুন। আমীন।

রামাযান মাসে মুমিনের দৈনন্দিন কর্মসূচী


আল্ হামদু লিল্লাহ, ওয়াস্ সালাতু ওয়াস্ সালামু আলা রাসূলিল্লাহ, আম্মা বাদ :
রহমতের মাস, বরকতের মাস, কল্যাণের মাস, ক্ষমার মাস, কুরআনের মাস মাহে রামাযান আমাদের মাঝে উপস্থিত। এ মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা কি রামাযানের এই মহামূল্যবান সময়গুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি? আসুন না একটি তালিকা তৈরি করি যেন এই মাসের প্রতিটি মুহূর্তে নেকী কুড়িয়ে আখেরাতের জন্য সঞ্চয় করে রাখতে পারি।
ফজর পূর্বে:
১) আল্লাহর দরবারে তাওবা-ইস্তেগফার ও দুয়া: কারণ মহান আল্লাহ প্রত্যেক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করে বলেন: “কে আছে আমার কাছে দুআকারী, আমি তার দুআ কবুল করবো”। (মুসলিম)
২) সাহরী ভক্ষণ : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “সাহরী খাও। কারণ সাহরীতে বরকত আছে”। (বুখারী মুসলিম)
ফজর হওয়ার পর:
১) ফজরের সুন্নত আদায়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “ফজরের দুই রাকাআত সুন্নত দুনিয়া ও দুনিয়ার মাঝে যা আছে তার থেকে উত্তম”। (মুসলিম )
২) ইকামত পর্যন্ত দুআ ও যিকিরে মশগুল: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :”আযান ও ইকামতের মাঝে দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না”। (আহমদ, তিরমিযী, আবূ দাউদ)
৩) ফজরের নামায আদায়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :”তারা যদি ইশা ও ফজরের ফযীলত জানতো, তো হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে উপস্থিত হত”। (বুখারী ও মুসলিম)
৪) সূর্যোদয় পর্যন্ত সকালে পঠিতব্য দুআ-যিকর ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মসজিদে অবস্থান: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজর নামাযের পর নিজ স্থানেই সূর্যোদয় পর্যন্ত অবস্থান করতেন”। (মুসলিম )
৫) সূর্যোদয়েরে পর দুই রাকাআত নামায: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :”যে ব্যক্তি জামায়াতের সহিত ফজরের নামায পড়লো, অতঃপর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে আল্লাহর যাকর করলো, তারপর দুই রাকাআত নামায আদায় করলো, তার জন্য এটা একটি পূর্ণ হজ্জ ও উমরার মত “। (তিরমিযী) 
৬) নিজ নিজ কর্মে মনোযোগ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “নিজ হাতের কর্ম দ্বারা উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাবার নেই”। )বুখারী(
যহরের সময় :
১) জামায়াতের সহিত জহরের নামায আদায়। অতঃপর কিছুক্ষণ কুরআন কিংবা অন্যান্য দীনী বই পাঠ।
২) আসর পর্যন্ত বিশ্রাম, কারণ তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ( তোমার উপর তোমার শরীরেরও হক আছে)।
আসরের সময় :
১) আসরের নামায জামাতের সাথে সম্পাদন: অতঃপর ইমাম হলে নামাযীদের উদ্দেশ্যে দারস প্রদান কিংবা দারস শ্রবণ কিংবা ওয়ায নসীহতের ক্যাসেট ও সিডির মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :”যে ব্যক্তি মসজিদে ভাল কিছু শিক্ষা নিতে কিংবা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গেল, সে পূর্ণ এক হজ্জের সমান নেকী পেল”। (ত্ববারানী)
২) পরিবারের সদস্যদের সাথে ইফতারির আয়োজনে সহায়তা করা: এর মাধ্যমে যেমন কাজের চাপ হাল্কা হয় তেমন পরিবারের সাথে ভালবাসাও বৃদ্ধি পায়।
মাগরিবের সময় 
১) ইফতারি করা এবং এই দুআ পাঠ করা: “যাহাবায্ যামাউ ওয়াব্ তাল্লাতিল্ উরূকু ওয়া সাবাতাল্ আজরু ইন্ শাআল্লাহু তাআলা”। অর্থ: পিপাষা নিবারিত হল, রগ-রেশা সিক্ত হল এবং আল্লাহ চাইলে সওয়াব নির্ধারিত হল। (আবূ দাউদ)
২) মাগরিবের নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা যদিও ইফতারি পূর্ণরূপে না করা যায়। বাকি ইফতারি নামাযের পর সেরে নেওয়া মন্দ নয়। অতঃপর সন্ধ্যায় পঠিতব্য যাকর-আযকার পাঠ করে নেওয়া।
৩) স্বভাবানুযায়ী রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে একটু বিশ্রাম করে তারাবীর নামাযের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
ইশার সময় :
১) জামায়াতের সহিত ইশার নামায আদায় করা।
২) ইমামের সাথে সম্পূর্ণ তারাবীর নামায আদায় করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমান ও নেকীর আশায় রমযানে কিয়াম করবে, (তারাবীহ পড়বে ) তার বিগত সমস্ত (ছোট গুনাহ) ক্ষমা করা হবে”। (বুখারী ও মুসলিম)
৩) সম্ভব হলে বিতরের নামায শেষ রাতে পড়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :তোমরা বিতরকে রাতের শেষ নামায কর”। (মুত্তাফিকুন আলাইহ)
লেখক: আব্দুর রাকীব (মাদানী) দাঈ, দাওয়াহ সেন্টার খাফজী, সৌদী আরব।
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহিল হাদী দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদী আরব।

সন্তানের প্রতি লোকমান হাকীমের উপদেশাবলিঃ

Emran Hossain Adib
প্রথমে লোকমান আ. তার ছেলেকে যেভাবে উপদেশ দিয়েছেন, তা আলোচনা করা হল। কারণ, লোকমান আ. তার ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছেন, তা এতই সুন্দর ও গ্রহণ যোগ্য যে, মহান আল্লাহ তা‘আলা তা কুরআনে করীমে উল্লেখ করে কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত উম্মতের জন্য তিলাওয়াতে উপযোগী করে দিয়েছেন এবং কিয়ামত পর্যন্তের জন্য তা আদর্শ করে রেখেছেন।
লোকমান আ. তার ছেলেকে যে উপদেশ দেন তা নিম্নরূপ:
মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ ﴾
অর্থ, “আর স্মরণ কর, যখন লোকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল...।”
এ উপদেশগুলো ছিল অত্যন্ত উপকারী, যে কারণে মহান আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে করীমে লোকমান হাকিমের পক্ষ থেকে উল্লেখ করেন।

প্রথম উপদেশ: তিনি তার ছেলেকে বলেন,
﴿يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ﴾
অর্থ, “হে প্রিয় বৎস আল্লাহর সাথে শিরক করো না, নিশ্চয় শিরক হল বড় যুলুম।”

এখানে লক্ষণীয় যে, প্রথমে তিনি তার ছেলেকে শিরক হতে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন। একজন সন্তান তাকে অবশ্যই জীবনের শুরু থেকেই আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাসী হতে হবে। কারণ, তাওহীদই হল, যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বিশুদ্ধতা ও নির্ভুলতার একমাত্র মাপকাঠি। তাই তিনি তার ছেলেকে প্রথমেই বলেন, আল্লাহর সাথে ইবাদতে কাউকে শরিক করা হতে বেচে থাক। যেমন, মৃত ব্যক্তির নিকট প্রার্থনা করা অথবা অনুপস্থিত ও অক্ষম লোকের নিকট সাহায্য চাওয়া বা প্রার্থনা করা ইত্যাদি। এছাড়াও এ ধরনের আরও অনেক কাজ আছে, যেগুলো শিরকের অন্তর্ভুক্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “দোআ হল ইবাদত” الدعاء هو العبادة সুতরাং আল্লাহর মাখলুকের নিকট দোআ করার অর্থ হল, মাখলুকের ইবাদত করা, যা শিরক।
মহান আল্লাহ তা‘আলা যখন তার বাণী, ﴿وَلَمْ يَلْبِسُواْ إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ﴾ অর্থাৎ “তারা তাদের ঈমানের সাথে যুলুমকে একত্র করে নি।” এ আয়াত নাযিল করেন, তখন বিষয়টি মুসলিমদের জন্য কষ্টকর হল, এবং তারা বলাবলি করল যে, আমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে তার উপর অবিচার করে না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আলোচনা শোনে বললেন,
} ليس ذلك ، إنما هو الشرك ، ألم تسمعوا قول لقمان لابنه :يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ﴾ .
অর্থাৎ, “তোমরা যে রকম চিন্তা করছ, তা নয়, এখানে আয়াতে যুলুম দ্বারা উদ্দেশ্য হল, শিরক। তোমরা কি লোকমান আ. তার ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছে, তা শোন নি? তিনি তার ছেলেকে বলেছিলেন,
}يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ﴾ .
অর্থ, হে প্রিয় বৎস আল্লাহর সাথে শিরক করো না, নিশ্চয় শিরক হল বড় যুলুম।”

দ্বিতীয় উপদেশ: মহান আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে যে উপদেশ দিয়েছেন, তার বর্ণনা দিয়ে বলেন,
﴿وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ﴾ .
অর্থ, “আর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার ব্যাপারে [সদাচরণের] নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে, তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে; সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন-তো আমার কাছেই।” [সূরা লোকমান: ১৪]
তিনি তার ছেলেকে কেবলই আল্লাহর ইবাদত করা ও তার সাথে ইবাদতে কাউকে শরীক করতে নিষেধ করার সাথে সাথে মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করার উপদেশ দেন। কারণ, মাতা-পিতার অধিকার সন্তানের উপর অনেক বেশি। মা তাকে গর্ভধারণ, দুধ-পান ও ছোট বেলা লালন-পালন করতে গিয়ে অনেক জ্বালা-যন্ত্রণা ও কষ্ট সইতে হয়েছে। তারপর তার পিতাও লালন-পালনের খরচাদি, পড়া-লেখা ও ইত্যাদির দায়িত্ব নিয়ে তাকে বড় করছে এবং মানুষ হিসেবে ঘড়ে তুলছে। তাই তারা উভয় সন্তানের পক্ষ হতে অভিসম্পাত ও খেদমত পাওয়ার অধিকার রাখে।

তৃতীয় উপদেশ: মহান আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে করীমে মাতা-পিতা যখন তোমাকে শিরক বা কুফরের নির্দেশ দেয়, তখন তোমার করণীয় কি হবে তার বর্ণনা দিয়ে বলেন,
﴿وَإِن جَاهَدَاكَ عَلى أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ﴾
অর্থ, “আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না। এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে করবে সদ্ভাবে। আর আমার অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা করতে।” [সূরা লোকমান: ১৫]
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. আয়াতের তাফসীরে বলেন, ‘যদি তারা উভয়ে তোমাকে পরি-পূর্ণরূপে তাদের দ্বীনের আনুগত্য করতে বাধ্য করে, তাহলে তুমি তাদের কথা শুনবে না এবং তাদের নির্দেশ মানবে না। তবে তারা যদি দ্বীন কবুল না করে, তারপরও তুমি তাদের সাথে কোন প্রকার অশালীন আচরণ করবে না। তাদের দ্বীন কবুল না করা তাদের সাথে দুনিয়ার জীবনে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করাতে কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। তুমি তাদের সাথে ভালো ব্যবহারই করবে। আর মুমিনদের পথের অনুসারী হবে, তাতে কোন অসুবিধা নাই।’
এ কথার সমর্থনে আমি বলব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীও বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী করেন, তিনি বলেন,
« لا طاعة لأحد في معصية الله ، إنما الطاعة في المعروف »
“আল্লাহর নাফরমানিতে কোন মাখলুকের আনুগত্য চলবে না। আনুগত্য-তো হবে একমাত্র ভালো কাজে।”

চতুর্থ উপদেশ: লোকমান হাকিম তার ছেলেকে কোন প্রকার অন্যায় অপরাধ করতে নিষেধ করেন। তিনি এ বিষয়ে তার ছেলেকে যে উপদেশ দেন, মহান আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে তার বর্ণনা দেন। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِن تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُن فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَاوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ﴾ .
অর্থ, “হে আমার প্রিয় বৎস! নিশ্চয় তা [পাপ-পুণ্য] যদি সরিষা দানার পরিমাণও হয়, অত:পর তা থাকে পাথরের মধ্যে কিংবা আসমান সমূহে বা জমিনের মধ্যে, আল্লাহ তাও নিয়ে আসবেন; নিশ্চয় আল্লাহ সুক্ষ্মদর্শী সর্বজ্ঞ।” [সূরা লোকমান: ১৬]
আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন, অন্যায় বা অপরাধ যতই ছোট হোক না কেন, এমনকি যদি তা শস্য-দানার সমপরিমাণও হয়, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তা‘আলা তা উপস্থিত করবে এবং মীযানে ওজন দেয়া হবে। যদি তা ভালো হয়, তাহলে তাকে ভালো প্রতিদান দেয়া হবে। আর যদি খারাপ কাজ হয়, তাহলে তাকে খারাপ প্রতিদান দেয়া হবে।

পঞ্চম উপদেশ: লোকমান হাকিম তার ছেলেকে সালাত কায়েমের উপদেশ দেন। মহান আল্লাহ তা‘আলা তার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ﴿يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ﴾ অর্থাৎ, “হে আমার প্রিয় বৎস সালাত কায়েম কর”, তুমি সালাতকে তার ওয়াজিবসমূহ ও রোকনসমূহ সহ আদায় কর।
ষষ্ঠ উপদেশ:
﴿وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ﴾
অর্থাৎ “তুমি ভালো কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ হতে মানুষকে নিষেধ কর।” বিনম্র ভাষায় তাদের দাওয়াত দাও, যাদের তুমি দাওয়াত দেবে তাদের সাথে কোন প্রকার কঠোরতা করো না।

সপ্তম উপদেশ: আল্লাহ বলেন, ﴿وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ﴾ “যে তোমাকে কষ্ট দেয় তার উপর তুমি ধৈর্য ধারণ কর।” আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, যারা ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ ও মন্দ কাজ হতে মানুষকে নিষেধ করবে তাকে অবশ্যই কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে এবং অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে। যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে তখন তোমার করণীয় হল, ধৈর্যধারণ করা ও ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। রাসূল সা. বলেন,
«المؤمن الذي يخالط الناس ويصبر على أذاهم ، أفضل من المؤمن الذي لا يخالط الناس ولا يصبر على أذاهم».
“যে ঈমানদার মানুষের সাথে উঠা-বসা ও লেনদেন করে এবং তারা যে সব কষ্ট দেয়. তার উপর ধৈর্য ধারণ করে, সে— যে মুমিন মানুষের সাথে উঠা-বসা বা লেনদেন করে না এবং কোন কষ্ট বা পরীক্ষার সম্মুখীন হয় না—তার থেকে উত্তম।”
﴿إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ﴾
অর্থ, “নিশ্চয় এগুলো অন্যতম সংকল্পের কাজ।” অর্থাৎ, মানুষ তোমাকে যে কষ্ট দেয়, তার উপর ধৈর্য ধারণ করা অন্যতম দৃঢ় প্রত্যয়ের কাজ।

অষ্টম উপদেশ:
﴿وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ﴾
অর্থ, “আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।”
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন, ‘যখন তুমি কথা বল অথবা তোমার সাথে মানুষ কথা বলে, তখন তুমি মানুষকে ঘৃণা করে অথবা তাদের উপর অহংকার করে, তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে না। তাদের সাথে হাস্যোজ্জ্বল হয়ে কথা বলবে। তাদের জন্য উদার হবে এবং তাদের প্রতি বিনয়ী হবে।’
কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
تبسمك في وجه أخيك لك صدقة .
“তোমার অপর ভাইয়ের সম্মুখে তুমি মুচকি হাসি দিলে, তাও সদকা হিসেবে পরিগণিত হবে।”

নবম উপদেশ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: 
﴿وَلا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحاً﴾
“অহংকার ও হঠকারিতা প্রদর্শন করে জমিনে হাটা চলা করবে না।” কারণ, এ ধরনের কাজের কারণে আল্লাহ তোমাকে অপছন্দ করবে। এ কারণেই মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ﴾
“নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”
অর্থাৎ যারা নিজেকে বড় মনে করে এবং অন্যদের উপর বড়াই করে, মহান আল্লাহ তা‘আলা তাদের পছন্দ করে না।

দশম উপদেশ: নমনীয় হয়ে হাটা চলা করা। মহান আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে করীমে বলেন: ﴿وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ﴾ “আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর।” তুমি তোমার চলাচলে স্বাভাবিক চলাচল কর। খুব দ্রুত হাঁটবে না আবার একেবারে মন্থর গতিতেও না। মধ্যম পন্থায় চলাচল করবে। তোমার চলাচলে যেন কোন প্রকার সীমালঙ্ঘন না হয়।
একাদশ উপদেশ: নরম সূরে কথা বলা। লোকমান হাকীম তার ছেলেকে নরম সূরে কথা বলতে আদেশ দেন। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَاغْضُضْ مِن صَوْتِكَ﴾ “তোমার আওয়াজ নিচু কর।” আর কথায় কোন তুমি কোন প্রকার বাড়াবাড়ি করবে না। বিনা প্রয়োজনে তুমি তোমার আওয়াজকে উঁচু করো না। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ أَنكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ﴾
“নিশ্চয় সবচাইতে নিকৃষ্ট আওয়াজ হল, গাধার আওয়াজ।”
আল্লামা মুজাহিদ বলেন, ‘সবচাইতে নিকৃষ্ট আওয়াজ হল, গাধার আওয়াজ। অর্থাৎ, মানুষ যখন বিকট আওয়াজে কথা বলে, তখন তার আওয়াজ গাধার আওয়াজের সাদৃশ্য হয়। আর এ ধরনের বিকট আওয়াজ মহান আল্লাহ তা‘আলার নিকট একেবারেই অপছন্দনীয়। বিকট আওয়াজকে গাধার আওয়াজের সাথে তুলনা করা প্রমাণ করে যে, বিকট শব্দে আওয়াজ করে কথা বলা হারাম। কারণ, মহান আল্লাহ তা‘আলা এর জন্য একটি খারাপ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। যেমনিভাবে—
ক. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
»ليس لنا مثل السوء ، العائد في هبته كالكلب يعود في قيئه«
“আমাদের জন্য কোন খারাপ ও নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারে না। কোন কিছু দান করে ফিরিয়ে নেয়া কুকুরের মত, যে কুকুর বমি করে তা আবার মুখে নিয়ে খায়।”
খ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
»إذا سمعتم أصوات الديكة ، فسلوا الله من فضله ، فإنها رأت ملكاً ، وإذا سمعتم نهيق الحمار فتعوذوا بالله من الشيطان ، فإنها رأت شيطاناً» .
“মোরগের আওয়াজ শোনে তোমরা আল্লাহর নিকট অনুগ্রহ কামনা কর, কারণ, সে নিশ্চয় কোন ফেরেশতা দেখেছে। আর গাধার আওয়াজ শোনে তোমরা শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর। কারণ, সে অবশ্যই একজন শয়তান দেখেছে।”
দেখুন: তাফসীর ইবন কাসীর, খ. ৩ পৃ. ৪৪৬

আয়াতের দিক-নির্দেশনা:-
1. আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয়, যে সব কাজ করলে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত হয়, পিতা তার ছেলেকে সে বিষয়ে উপদেশ দিবে।
2. উপদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে তাওহীদের উপর অটল ও অবিচল থাকতে এবং শিরক থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেবে। কারণ, শিরক হল, এমন এক যুলুম বা অন্যায়, যা মানুষের যাবতীয় সমস্ত আমলকে বরবাদ করে দেয়।
3. প্রত্যেক ঈমানদারের উপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব হল, মাতা-পিতার কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া আদায় করা। তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা, কোন প্রকার খারব ব্যবহার না করা এবং তাদের উভয়ের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখা।
4. আল্লাহর নাফরমানি হয় না, এমন কোন নির্দেশ যদি মাতা-পিতা দিয়ে থাকে, তখন সন্তানের উপর তাদের নির্দেশের আনুগত্য করা ওয়াজিব। আর যদি আল্লাহর নাফরমানি হয়, তবে তা পালন করা ওয়াজিব নয়। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «لا طاعة لأحد في معصية الله إنما الطاعة في المعروف» অর্থ: “আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধে কোন মাখলুকের আনুগত্য চলে না; আনুগত্য-তো হবে ভালো কাজে”।
5. প্রত্যেক ঈমানদারের উপর কর্তব্য হল, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী মুমিন-মুসলিমদের পথের অনুকরণ করা, আর অমুসলিম ও বিদআতিদের পথ পরিহার করা।
6. প্রকাশ্যে ও গোপনে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করতে হবে। আর মনে রাখবে কোন নেক-কাজ তা যতই ছোট হোক না কেন, তাকে তুচ্ছ মনে করা যাবে না এবং কোন খারাপ-কাজ তা যতই ছোট হোক না কেন, তাকে ছোট মনে করা যাবে না এবং তা পরিহার করতে কোন প্রকার অবহেলা করা চলবে না।
7. সালাতের যাবতীয় আরকান ও ওয়াজিবগুলি সহ সালাত কায়েম করা প্রত্যেক মুমিনের উপর ওয়াজিব; সালাতে কোন প্রকার অবহেলা না করে, সালাতের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হওয়া এবং খুশুর সাথে সালাত আদায় করা ওয়াজিব।
8. জেনেশুনে, সামর্থানুযায়ী সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করার দায়িত্ব পালন করতে হবে। না জেনে এ কাজ করলে অনেক সময় হিতে-বিপরীত হয়। আর মনে রাখতে হবে, এ দায়িত্ব পালনে যথা সম্ভব নমনীয়তা প্রদর্শন করবে; কঠোরতা পরিহার করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«من رأى منكم منكراً فليغيره بيده ، فإن لم يستطع فبلسانه ، فإن لم يستطع فبقلبه ، وذلك أضعف الإيمان»
অর্থ: “তোমাদের কেউ যদি কোন অন্যায় কাজ সংঘটিত হতে দেখে, তখন সে তাকে তার হাত দ্বারা প্রতিহত করবে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে তার মুখ দ্বারা। আর তাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে। আর এ হল, ঈমানের সর্বনিম্নস্তর।”
9. মনে রাখতে হবে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে বারণকারীকে অবশ্যই-অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্যের কোন বিকল্প নাই। ধৈর্য ধারণ করা হল, একটি মহৎ কাজ। আল্লাহ তা‘আলা ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন।
10. হাটা চলায় গর্ব ও অহংকার পরিহার করা। কারণ, অহংকার করা সম্পূর্ণ হারাম। যারা অহংকার ও বড়াই করে আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না।
11. হাটার সময় মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে হাটতে হবে। খুব দ্রুত হাঁটবে না এবং একেবারে ধীর গতিতেও হাঁটবে না।
12. প্রয়োজনের চেয়ে অধিক উচ্চ আওয়াজে কথা বলা হতে বিরত থাকবে। কারণ, অধিক উচ্চ আওয়াজ বা চিৎকার করা হল গাধার স্বভাব। আর দুনিয়াতে গাধার আওয়াজ হল, সর্ব নিকৃষ্ট আওয়াজ।
শিশুদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গুরুত্বপূর্ণ উপদেশঃঃ
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে ছিলাম, তখন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “হে বৎস! আমি কি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দেব?” এ বলে রাসূল আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে কিছু উপদেশ দেন। নিম্নে তা তুলে ধরা হল:
প্রথম উপদেশ: 
احفظ الله يحفظك “তুমি আল্লাহর হেফাজত কর আল্লাহ তোমার হেফাজত করবে” : অর্থাৎ, তুমি আল্লাহর নির্দেশ মেনে চল এবং যে সব কাজ হতে আল্লাহ তোমাকে নিষেধ করেছে, সে সব কাজ হতে বিরত থাক। আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা বিধান করবে।
দ্বিতীয় উপদেশ:
احفظ الله تجده تجاهك (أمامك) “তুমি আল্লাহকে হেফাজত কর, তখন তুমি তাঁকে তোমার সম্মুখেই পাবে।” অর্থাৎ, তুমি আল্লাহ তা‘আলার বিধানের সংরক্ষণ ও আল্লাহর হক রক্ষা কর; তবে তুমি আল্লাহকে এমন পাবে যে, তিনি তোমাকে ভাল কাজের তাওফিক দেবে এবং তোমাকে তোমার যাবতীয় কর্মে সাহায্য করবে।
তৃতীয় উপদেশ:
إذا سألت فاسأل الله ، وإذا استعنت فاستعن بالله “যখন তুমি কোন কিছু চাইবে, আল্লাহর নিকট চাইবে। যখন কোনো সাহায্য চাইবে, আল্লাহ্‌র কাছেই চাইবে।” অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতের কোন বিষয়ে সাহায্যের প্রয়োজন হলে, তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাও। বিশেষ করে, যে কাজ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সমাধান করতে পারে না, তা আল্লাহর নিকটই চাইবে; কোন মাখলুকের নিকট চাইবে না। যেমন, সুস্থতা, রিযক, হায়াত, মওত ইত্যাদি। এগুলি এমন কাজ, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সমাধান করতে পারে না।
চতুর্থ উপদেশ:
وأعلم أن الأمة لو اجتمعوا على أن ينفعوك بشيء لم ينفعوك إلا بشيء قد كتبه الله لك ، وإن اجتمعوا على أن يضروك بشيء لم يضروك إلا بشيء قد كتبه الله عليك
“একটি কথা মনে রাখবে, যদি সমস্ত উম্মত একত্র হয়ে তোমার কোন উপকার করতে চায়, আল্লাহ তা‘আলা তোমার জন্য যতটুকু উপকার লিপিবদ্ধ করেছে, তার বাইরে বিন্দু পরিমাণ উপকারও তোমার কেউ করতে পারবে না, যদি আল্লাহ তোমার উপকার না চায়। আর সমস্ত উম্মত একত্র হয়ে যদি তোমার কোন ক্ষতি করতে চায়, আল্লাহ তা‘আলা তোমার জন্য যতটুকু ক্ষতি লিপিবদ্ধ করেছে, তার বাইরে বিন্দু পরিমাণ ক্ষতিও তোমার কেউ করতে পারবে না, যদি আল্লাহ তোমার ক্ষতি না চায়।” অর্থাৎ, আল্লাহ তা‘আলা মানুষের জন্য ভালো ও মন্দের যে, ভাগ্য নির্ধারণ করেছে, তার বাইরে কোন কিছুই বাস্তবায়িত হবে না। এ বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা আবশ্যক।
পঞ্চম উপদেশ:
رفعت الأقلام وجفت الصحف “কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে ও কাগজ শুকিয়ে গেছে।” তাই আল্লাহর উপর তাওয়াককুল করতে হবে। তাওয়াককুল করার অর্থ হল, উপকরণ অবলম্বন করে তাওয়াককুল/ভরসা করা। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উষ্ট্রীর মালিককে বলেন, তুমি আগে উষ্ট্রীকে বেঁধে রাখ এবং আল্লাহর উপর তাওয়াককুল কর।
ষষ্ঠ উপদেশ:
تعرف إلى الله في الرخاء يعرفك في الشدة “সচ্ছল অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর, বিপদে তোমাকে আল্লাহ স্মরণ করবে।” অর্থাৎ, সচ্ছল অবস্থায় তুমি আল্লাহর হক ও মানুষের হক্ব আদায় কর, বিপদে আল্লাহ তোমাকে মুক্তি দেবে।
সপ্তম উপদেশ:
وأعلم أن ما أخطأك لم يكن ليصيبك ، وما أصابك لم يكن ليخطئك
“মনে রেখো— যা তুমি পেলে না, তা তোমার পাবার ছিল না; আর যা তুমি পেলে তা তুমি না পেয়ে থাকতে না।” অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাকে কোন কিছু দান না করলে, তা কখনোই তুমি লাভ করতে পারবে না। আর যদি আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে কোন কিছু দান করে, তা বাধা দেয়ার কেউ নাই।
অষ্টম উপদেশ:
واعلم أن النصر مع الصبر “আর জেনে রাখ, বিজয় ধৈর্যের সাথে।” অর্থাৎ, শত্রু ও নফসের বিপক্ষে সাহায্য বা বিজয় লাভ ধৈর্য ধারণের উপর নির্ভর করে। সুতরাং, আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
নবম উপদেশ:
وأن الفرج مع الكرب “বিপদের সাথেই মুক্তি আসে।” মুমিন বান্দা যেসব বিপদের সম্মুখীন হয়, তারপরই মুক্তি আসে।
দশম উপদেশ:
وأن مع العسر يسرا “কষ্টের সাথেই সুখ।” এক মুসলিম যে কষ্টের মুখোমুখি হয়, তা কখনোই স্থায়ী হয় না। কারণ, তারপর অবশ্যই আরাম বা সুখ আসে এবং আসবেই।

হাদিসের নির্যাস:
1. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের ভালোবাসতেন। তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. কে নিজের পিছনে বসান এবং আদর করে তিনি তাকে হে বৎস বলে আহ্বান করেন, যাতে সে সতর্ক হয় এবং রাসুলের কথার প্রতি মনোযোগী হয়।
2. শিশুদের তিনি আল্লাহর আনুগত্য করা ও তার নাফরমানি হতে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিতেন, যাতে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
3. যখন কোন বান্দা সচ্ছলতা, সুস্থতা ও ধনী অবস্থায় আল্লাহ ও তার বান্দাদের অধিকার আদায় করে, আল্লাহ তা‘আলা বিপদে তাকে মুক্তি দেবে এবং সাহায্য করবে।
4. আল্লাহর নিকট কোন কিছু চাওয়া ও সাহায্য প্রার্থনার তালীম দেয়ার মাধ্যমে শিশুদের অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করে দেয়া, মাতা-পিতা ও অভিভাবকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ছোট বেলা থেকেই শিশুদের অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করে দিতে হবে, যাতে বড় হলে তার পথভ্রষ্ট না হয়।
5. ঈমানের রোকনসমূহ হতে একটি রোকন হল, ভাল ও মন্দের তকদীরের উপর বিশ্বাস করা। বিষয়টি শিশুদের অন্তরে গেঁথে দিতে হবে।
6. শিশুদের ইতিবাচক মনোভাবের উপর গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা আশা, আকাঙ্ক্ষা ও সাহসিকতার সাথে তাদের জীবনের ভবিষ্যৎ রচনা করে এবং তাদের জাতির জন্য কর্ণধার ও ত্রাণকর্তা হিসেবে আর্ভিভাব হতে পারে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«وأعلم أن النصر مع الصبر ، وأن الفرج مع الكرب ، وأن مع العسر يسرا» .
“আর জেনে রাখ: ধৈর্যের সাথেই বিজয়, বিপদের সাথেই মুক্তি, কষ্টের সাথেই সুখ।