বুধবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

গুরুত্বপূর্ণ কিছু হারাম কাজ যা আমরা নিজের অজান্তেই করে ফেলি। বেখেয়ালে কিছু নিষিদ্ধ কাজ আমরা করি অথচ জানিনা যে এগুলো করা হারাম!




✒ গোসলখানায় প্রসাব করা যাবে না। (ইবনে মাজাহঃ ৩০৪)

✒ কেবলামুখি বা তার উল্টো হয়ে প্রসাব, পায়খানা করা যাবে না। (সহিহ বুখারি ৩৯৫,
নাসায়ীঃ ২১, আত তিরমিজিঃ ৮)

✒ গুলি বা তীরের নিশানা প্রশিহ্মণের জন্য প্রাণী ব্যাবহার করা যাবে না। (মুসলিমঃ ৫১৬৭, সুনানে আবু দাউদঃ ২৮১৭, ইবনে মাজাহঃ ৩১৭০, আত তিরমিজিঃ ১৪০৯)

✒ ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান ও মুশরিক কাউকে বিয়ে করা যাবে না। আল কোরআন (সূরা আন নিসা/নুর)

✒ স্বামী ব্যাতিত অন্য কারোর জন্য সাজা হারাম। আল কোরআন (আহজাবঃ ৩৩)

✒ মুর্তি কেনা, বেঁচা, পাহারা দেওয়া হারাম। আল কোরআন (মাইদাহঃ ৯০, ইবরাহীমঃ ৩৫)

✒ কারো মুখমণ্ডলে আঘাত করা যাবে না। আল হাদিস (মুসলিমঃ ৬৮২১, আবু দাউদঃ ৪৪৯৬, আহমদঃ ৫৯৯১)

✒কাপড় পরিধাণ থাকা সত্তেও কারো গোপন অঙ্গের জায়গার দিকে দৃষ্টিপাত করা যাবে না। (মুসলিমঃ ৭৯৪, তিরমিজিঃ ২৭৯৩, ইবনে মাজাহঃ ৬৬১, আহমদঃ ১১৫০১)

✒ আল্লাহ ব্যাতিত কারো নামে কসম করা যাবে না। বাপ দাদার নাম, কারো হায়াত,
মসজিদ বা কোরআন এর নামে কসম করা, মাথায় নিয়ে সত্যতা প্রকাশ করা যাবে না।
(আবু দাউদঃ ৩২৫০, নাসায়ীঃ ৩৭৭৮)

✒ কোন প্রাণীকে আগুনে পুড়িয়ে মারা যাবে না। আল হাদিস (আবু দাউদঃ ২৬৭৭,
আহমদঃ ১৬০৩৪)

✒
যারা এগুলো করে তারা জান্নাতের গন্ধও পাবে না। (আবু দাউদঃ ৩৬৬৮, ইবনে মাজাহঃ ২৫২)

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন উনার কাছে প্রার্থনা করি “হে আমার প্রতিপালক! তুমি নিজ হতে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান কর এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা কর।

☛ ☛ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির চেহারা উজ্জ্বল করে দিন, যে আমার কোনো হাদীস শুনেছে। অতঃপর অন্যের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।’[-সুনানে আবু দাউদ ২/৫১৫]

সকল মুসলিমের দায়িত্ব ছবিটা নিজ উয়ালে শেয়ার করে অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন 'আমিন' —

রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

আরাফার মিম্বর থেকে.........


আরাফার খুতবা ১৪৩৭ হিজরি মোতাবেক ২০১৬ ইংরেজি
খতিব: শায়খ ড. আব্দুর রহমান সুদাইস
হামদ ও ছানা এবং দরুদ পাঠের পর খতীব বলেন, আমি সকলকেই তাকওয়া অর্জনের অসিয়ত করছি।
হে মুসলিম জাতি, আল্লাহ তায়ালা সারা বিশ্ব বাসির জন্য অস্ংখ্য নবী পাঠিয়েছেন। তারা মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। সবশেণষে আমাদের নবী মুহাম্মদ স. কে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহর নির্দেশে মানুষকে হেদায়েতের পথ দেখিয়েছেন। তাওহীদের দীক্ষা দিয়েছেন।সম্মানিত হাজি সাহেবগন, এই মাঠেই আমাদের নবী দাড়িয়েছেন। ইসলামের মূল বিষয়ুগুলি নিয়ে আলোচনা করেছেন। জাহিলিয়াতের সকল খারাপ বিষয়গুলোকে মিটিয়ে দিয়েছেন।
মানবাধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। মানুষকে অন্ধকার ও অজ্ঞতা থেকে আলো ও জ্ঞানের দিকে আহবান জানিয়েছেন।নারির প্রতি সহানুভূতি এবং তাদের সকল অধিকারের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে বলেছেন। মুসলমানের রক্ত সম্মানিত। এক্ষেত্রে সকলকেই সতর্ক থাকতে বলেছেন।
হে মুসলিম নেতৃবৃন্দ, সারা বিশ্বব্যাপী মুসলমানেদের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটু সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। এ বিষয় নিয়ে প্রয়োজনে আলোচনায় বসতে হবে। মসজিদে আকসাকে মুক্ত করতে হবে।
হে মুসলিম তরুন। বর্তমানে সারা বিশ্বে যে বিষয়টি নিয়ে সবচাইতে বেশী সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে তা হলো সন্ত্রাসবাদ। অনেক তরুণ ইসলমের মূল শিক্ষা ভুলে ভিন্ন স্থান থেকে ইসলাম শিখছে।বিভিন্নভাবে ভিবিষিকা ও উগ্রবাদ ছড়াচ্ছে। অযথাই মানুষকে কাফের বলে দিচ্ছে। হেতরুণ তোমরাই জাতির মেরুদন্ড। অতএব তোমরা সতর্ক হও। অন্যকে যেকোন কিছুতেই কাফের বলা থেকে বিরত থাকো। যেকোন বিষয় তোমরা আলেমদের নিকট থেকে গ্রহন কর। তোমাদের নিকট অনেক প্রত্যাশা। তোমরা সুন্দর আদর্শ গ্রহন কর। নিজেকে বিনির্মান করো।
হে অভিভাবক ও মুরুব্বিগণ। চরিত্র প্রধান এক সম্পদ। ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবারের সকলের চরিত্র বিনির্মানের প্রত্রি লক্ষ্য রাখতে হবে। বিশেষত বর্তমানে যে চারিত্রিক যুদ্ধ সে ব্যাপরে সচেতন হতে হবে। প্রত্যেক সদস্যের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
হে ওলামায়ে কেরাম। আপনার সকলেই রাসুলের উ্ত্তরসূরী। অপনারা মানুষকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত না করে কোরআন সুন্নাহর প্রতি উদ্বুদ্ধে করুন। মানুষকে সঠিক বিষয়টি শিক্ষা দিন।
হে ইসলামের দায়ী ও আহবায়কগণ। আপনারা মানুষের প্রতি সহজ করুন্। দলা দলি মুক্ত থাকুন্। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর দিকে ডাকুন। মানুষের প্রতি দয়া করুন, রহমত করুন।
হে মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আপনারা সতর্ক হোন। মানুষের চারিত্রিক বিষয় গুরুত্ব দিন। ইসলামমের শিক্ষা ও দীক্ষা প্রচার করুন
হে হাজি সাহেববৃন্দ, আপনারা শুকরিয়া আদায় করুন। আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে হজের জন্য কবুর করেছেন। এই আরাফায় অবস্থানের তাওফীৗক দিয়েছেন। সাথে সাথে আপনাদের জন্য যারা এই ব্যবস্বথা করেছেন, তাদের জন্য দো্‌াআ করুন। বিশেষ করে খাদেমুল হারামাই মালিক সালমানের জন্য। এবং যারা সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন
হে বায়তুল্লাহর হাজি সাহেবগণ। আপনারা আরাফায় অধিক পরিমানে দোআ করুন। আরাফার দোআ সব থেকে উত্তম দোআ। এদিন আল্লহ তাআলা গর্ব করেন। অধিক পরিমানে মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এখানে জোহর আছর কসর করে জমা করুন। দোআয় লিপ্ত থাকুন। সূযাস্ত পর্যন্ত দোআ করতে থাকুন। এর পর শান্তভাবে মুযদালিফার দিকে রওয়ানা হোন। সেখানে পৌঁছে মাগরিব এশা এক আজানে দুই এক্বামতে আদয়া করুন।
এরপর জামারায় পাথর নিক্ষেপের জন্য যেথে থাকুন্। কোরবানী করুন্। মাথা চেছে বা ছেটে হালাল হোন। এভাবে হজের কার্যক্রম সমাপ্ত করুন।
দোআর মাধ্যমে শায়খ খুতবা সমাপ্ত করেন। মধ্যখানে শায়খ বলেন যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করাও আমাদের প্রয়োজন। দীর্ঘ ৩৫ বছর এই মিম্বরে দাড়িয়ে শায়খ আব্দুল আযীয আলে শায়খ খুতবা দিয়েছেন। মানুষকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নসীহত করেছেন। অসুস্থতার কারণে তিনি আজ খুতবা দিতে সক্ষম হননি। তার জন্য দোআ করি, আল্লাহ তায়ালা তার ইলমে, হায়াতে বরকত দান করুন। তাকে সুস্থতা দান করুন।
কৃতজ্ঞতাঃ শাইখ Mohiuddin Faroqi

কাবা শরিফের পুরাতন গিলাফ পরিবর্তন করে নতুন গিলাফ পরানো হচ্ছে আজ হজের দিন।


৯ জিলহজ হজের দিন ফজরের নামাজের পর পবিত্র দুই মসজিদের খাদেম এবং সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের নেতৃত্বে কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়।কাবা শরিফের গিলাফকে কিসওয়া বলা হয়। এটি প্রস্তুত করতে নয় মাস সময় লেগেছে। কিসওয়া পশমি কাপড়ে স্বর্ণের সুতোর এমব্রয়ডারি দিয়ে বানানো হয়। এটা মক্কায় স্থাপিত বিশেষ কারখানায় প্রস্তুত করা হয়।এবারে গিলাফ তৈরিতে ৬৭০ কেজি সিল্ক কাপড় ব্যবহৃত হয়েছে। উন্নতমানের এই সিল্ক আমদানি করা হয়েছে ইতালি ও সুইজারল্যান্ড থেকে। সেই কাপড়ে প্রায় ১২০ কেজি খাঁটি স্বর্ণ ও রৌপ্যের সুতোয় হাত দিয়ে গিলাফে নকশার কাজ করা হয়।অনেক হজপালনকারি হজের সময় কিসওয়ার অংশবিশেষ কেটে বাড়িতে নিয়ে যায়। ওই ছেঁড়া অংশ মেরামতের জন্য আলাদা রক্ষণাবেক্ষণ টিম রয়েছে। তারা দ্রুত ছেঁড়া অংশ মেরামত করে থাকে।পুরনো কিসওয়াকে টুকরো টুকরো কেটে ফেলা হয় এবং বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রীয় অতিথি ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে বিতরণ করা হয়।
আরব নিউজ অবলম্বনে

শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অারাফার রোযা: জিলহজ্বের নয় তারিখে,


((আমীনুল ইসলাম আমীন))

যিলহজ্বের প্রথম দশকের অনেক ফযীলতের কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষভাবে যিলহজ্বের নয়তারিখের রোযার বিষয়ে হাদীসে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একটি হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-ﺻﻴﺎﻡ ﻳﻮﻡ ﻋﺮﻓﺔ ﺃﺣﺘﺴﺐ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻥ ﻳﻜﻔﺮ ﺍﻟﺴﻨﺔ ﺍﻟﺘﻲ

 ﻗﺒﻠﻪ ﻭﺍﻟﺴﻨﺔ ﺍﻟﺘﻲ ﺑﻌﺪﻩ .
ইয়াওমে আরাফা'র রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা আগের এক বছরের ও পরের এক বছরের গোনাহ মাফ করবেন।- সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৬২
বায়হাকী ও ইস্পাহানী এক সহীহ সনদে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, আরাফার দিন (অর্থাৎ জিলহজের নবম দিন) মর্যাদা এবং ফজিলতের ক্ষেত্রে দশ হাজার দিনের ন্যায়। সুবহানাল্লাহ -(লাওয়াক্বিহুল আনওয়ার পৃঃ ৯২) অর্থাৎ অন্যান্য মময়ে দশ হাজার দিনে রাত দিন ইবাদত করার যে পরিমাণ ছওয়াব হবে, আরাফার মাত্র এক দিনেই সে পরিমাণ ছওয়াব হবে। "আল্লাহুআকবার"
হাদীসে ‘ইয়াওমু আরাফা’র যে রোযার কথা বলা হয়েছে এর অর্থ কি? হাজীগণ যেদিন আরাফায় অবস্থান করেন সেই দিনের রোযা, না জিলহজ্বের নয় তারিখের রোযা? সঠিক ব্যাখ্যা হলো জিলহজ্বের নয় তারিখের রোযা। কারণ-
এক. এই রোযা 'আরাফা' বা 'উকুফে আরাফা'র আমল নয়; বরং ঐ তারিখের আমল। ‘ইয়াওমে আরাফা’ হচ্ছে ঐ তারিখের (নয় যিলহজ্বের) পারিভাষিক নাম। যেহেতু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান হজ্বের প্রধান রোকন উকুফে আরাফা’ নয় যিলহজ্বে আদায় করা হয় তাই এ তারিখের নাম পড়ে গেছে ‘ইয়াওমে আরাফা’। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমান নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী জিলহজ্বের নয় তারিখেই রোজা রাখবে। বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝা যেতে পারে। ‘ইয়াওমু আরফা’র মত হাদীসে আরেকটি শব্দ এসেছে ‘সওমু ইয়াওমি আশুরা’ এটি একটি ইসলামী পরিভাষা। এর দ্বারা মহররম মাসের দশ তারিখের রোযাকে বোঝানো
হয়েছে। যেমনিভাবে প্রত্যেক মুসলমান নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী দশ মহররম রোজা রাখে; সউদী অারবের দশ তারিখের প্রতি লক্ষ করে না তেমনিভাবে 'ইয়াওমু অারাফা'র ক্ষেত্রেও নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী নয় তারিখেই রোজা রাখবে;
সউদী অারবের নয় তারিখে অর্থাৎ হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে নয়।
দুই. তাকবীরে তাশরীক আরাফা বা উকূফে আরাফা’র বিশেষ আমল নয়। বরং এটি প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ দেশের হিসাব অনুযায়ী যিলহজ্বের নয় তারিখ ফজর থেকে শুরু হয়ে তের তারিখ অাছরের
মধ্যবর্তী সময়ের অামল। অথচ যে দলীল দ্বারা নয় তারিখ থেকে তাকবীরে তাশরীক শুরু হওয়া প্রমাণিত তাতেও ইয়াওমে আরাফা শব্দই আছে।
দলীলের আরবী পাঠ এই-
ﻋﻦ ﻋﻠﻲ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ : ﺃﻧﻪ ﻛﺎﻥ ﻳﻜﺒﺮ ﺑﻌﺪ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﻔﺠﺮ
ﻳﻮﻡ ﻋﺮﻓﺔ، ﺇﻟﻰ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﻌﺼﺮ ﻣﻦ ﺁﺧﺮ ﺃﻳﺎﻡ ﺍﻟﺘﺸﺮﻳﻖ، ﻭﻳﻜﺒﺮ
ﺑﻌﺪ ﺍﻟﻌﺼﺮ .
(আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা,
(আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা,
হাদীস : ৪/১৯৫ হাদীস ৫৬৭৭, ৫৬৭৮ শায়খ
আওয়ামাহ তাহকীককৃত) [হাফিজ ইবনে
হাজার রহ. তাঁর আদ দিরায়া গ্রন্থে
বলেন-এর সনদ সহীহ]♦
__________________________________________
এখানে ইয়াওমে আরাফা শব্দটি কি নয় যিলহজ্ব এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় নাই? এটা কি ভুল?
সুতরাং বুঝা গেল 'ইয়াওমু অারাফা' অর্থ নয় জিলহজ্ব হওয়া একটি প্রসিদ্ধ এবং স্বীকৃত বিষয় তাই 'সওমু ইয়াওমি অারাফা' অর্থ জিলহজ্বের নয়
তারিখের রোজা হবে এটাই সঠিক কথা।
তিন. হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিনে একসাথে বিশ্বের সকল মুসলামের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভবও নয়। কারণ, যেদিন হাজীরা অারাফায় অবস্থান করবে দেখা যাবে বিশ্বের কোন কোন দেশে তখন রাত চলছে যেমন অামেরিকার কথাই দরুন সউদিয়ারবের দিন হলে অামেরিকার রাত তাই
তাদের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভব নয়। সুতরাং ইয়ামু অারাফা'র এমন অর্থ গ্রহণ করতে হবে যে অর্থ অনুযায়ী বিশ্বের সকল মুসলামানের পক্ষে ইয়াওমু
অারাফা'র রোযা রাখা সম্ভব হয়। অার এটা ইয়াওমু অারাফা'র অর্থ নয় জিলহজ্ব ধরলেই সম্ভব।
চার. গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা রয়েছে যে, ইয়াওমে আরাফার পরের দিনটিই ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিন। পৃথিবীর কোন অালেম বলেন নি যে, ইয়াওমে আরাফা এবং ইয়াওমুন নাহর
তথা কোরবানির দিনের মাঝে তৃতীয় কোন দিন থাকতে পারে। এখন অামাদের বাংলাদেশের কথাই দরুন, সউদী অারবের সাথে এখানকার অধিবাসীদের অারবী তারিখে সাধারণত এক দিনের ব্যবধান হয়ে থাকে। অার ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিন দশ জিলহজ্বে হওয়াটাতো নির্ধারিত। সুতরাং এই অঞ্চলের অধিবাসীরা যদি 'ইয়াওমে আরাফা'র অর্থ হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিন (যা অামাদের দেশের হিসাব
অনুযায়ি জিলহজ্বের অাট তারিখ হয়) ধরে নেয় তাহলে ইয়াওমু অারাফা এবং ইয়াওমুন নাহর তথা কোরবানির দিনের মাঝে তৃতীয় অারেকটি দিন
অতিরিক্ত হয়ে যায়, যা সম্পূর্ণ উদ্ভট এবং ইজমা বিরোধী। তো এ জাতীয় বিচ্ছিন্ন চিন্তা ও বক্তব্য আরো কিছু ক্ষেত্রেও বিচ্ছিন্নতাকে অনিবার্য করে তুলবে। সুতরাং হাদীসে বর্ণিত ইয়াওমু অারাফা'র অর্থ জিলহজ্বের নয় তারিখ এটাই সঠিক কথা।
হায়! অামাদের ঐসকল ভাইয়েরা যারা মানুষদেরকে হাজীদের অারাফায় অবস্থানের দিন রোযা রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন তারা যদি উপরোক্ত
বিষয়গুলো নিয়ে একটু চিন্তা করতেন এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বেঁচে থাকতেন! হাদীস : ৪/১৯৫ হাদীস ৫৬৭৭, ৫৬৭৮ শায়খ আওয়ামাহ তাহকীককৃত)



তাকবীরে তাশরীক ওয়াজিব ১২ তাং সোমবার ফজর থেক ১৬ তাং জুমারদিন আসর পর্যন্ত, পড়তেই হবে।

(আমীনুল ইসলাম আমীন)
মাসআলা : ০৯ জিলহজ্ব ফজর নামাজের পর থেকে ১৩ ই জিলহজ্জ আছর পর্যন্ত (সর্বমোট ২৩ ওয়াক্ত নামাজ অর্থাৎ ১২ তারিখ সোমবার ফজর থেকে ১৬ তারিখ জুমারদিন আসর পর্যন্ত) সকল ফরজ নামাজের পর একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি জামাতে নামাজ আদায় করুক বা একাকী আদায় করুক, পুরুষ - মহিলা, মুকীম, মুসাফির, মুনফারিদ, গ্রামবাসী, শহরবাসী সকলের উপর একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। পুরুষগণ উচ্চস্বরে এবং মহিলাগণ আস্তে আস্তে বলবে। (শামী) 
★ উল্লেখ্য যে আইয়্যামে তাশরীক হল তিন দিন অর্থাৎ ১১, ১২, ১৩ জিলহজ্জ। (হেদায়া - ৪/৪৪৬)
★আর আইয়্যামে তাকবীরাতে তাশরীক হল পাঁচ দিন অর্থাৎ ৯, ১০, ১১ , ১২, ও ১৩ জিলহজ্জ (হেদায়া)
তাকবীরে তাশরীক হলো :
"আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ"
বি : দ্র : - তকবীরে তাশরীক একবার পড়া ওয়াজিব, বেশী পড়া বেদয়াত তাই সাবধান।


♦এই তাকবীরে তাশরীক্ব আল্লাহর তিনজন সম্মানিত ও নৈকট্যপ্রাপ্ত নবী, রাসূল ও ফেরেশতার মুখনিঃসৃত বাণী। হযরত ইব্রাহীম আ. যখন সজোরে সুতীক্ষ্ণ ছুরি হযরত ইসমাঈল আ. এর গলিয় চালানো সুরু করলেন, এমন সময় হযরত জিবরাঈল আ. আসমান থেকে দুম্বা নিয়ে সেখানে হাজির হয়ে এ ভয়াবহ দৃশ্য দেখে বলে উঠলেনঃ "আল্লাহুআকবার আল্লাহুআকবার" হযরত ইব্রাহীম আ. যখন আসমানী কুরবানী দেখলেন, তখন তিনি বলে উঠলেনঃ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহুআকবার" এদিকে হযরত ইসমাঈল আ. যখন ঘটনা উপলব্দি করতে পারলেন তখন তিনি বলে উঠলেনঃ "ওয়াল্লাহুআকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ"। অর্থাৎ এর মাদ্যমে আমাদের শিক্ষা দেওয়া হলে যে, বিপদে - আপদে, আনন্দে ও খুশীতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর বড়ত্ব বর্ণনা করা আর নিজের সবকিছুকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করা উচিৎ। আর এটিই কুরবানীর মূলকথা।



শরীয়তের যে বিধান ওয়াজিব, তা শিক্ষা করাও কিন্তু ওয়াজিব, তাই তাকবীরে তাশরীক যারা জানিনা জেনে নেওয়া ওয়াজিব। কেউ যদি তাকবীরে তাশরীকের এই পাঁচ দিন নামায না পড়ে কিবা কাযা করে তার গুনাহ হবে দ্বিগুণ, এক হল ফরজ নামায ছাড়ার কঠিন গুনাহ, আরেকটি হল তাকবীর ওয়াজিব ছাড়ার গুণাহ। আল্লাহ আমাকে মাফ করে দেন আমীন। তাই বন্ধু সাবধান কোন অবস্থাতেই যেন আপনার নামায এবং তাকবীর ছুটে না যায়। এক ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে গিয়ে কত ফরজ ও ওয়াজিবকে কুরবানী করে দিচ্ছি। কুরবানীর গোশত খাওয়া নফল, খেতে খুব মজা। নামায, তাকবীর, পর্দা সহ অন্য বিধানগুলো ফরজ ওয়াজিব, তা করতে খুব কষ্ট কিন্তু কেন বন্ধু?



মুসলিম বিদ্বেষী জালিম হিন্দু রাজা "গৌড় গোবিন্দের" করুণ পরিণতি


সনটি ছিলো ১৩৪৪ ইংরেজী । সিলেটে হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দের রাজ্যের এক মহল্লায় ১৩টি মুসলিম পরিবার বাস করতেন। তারই একজন ছিলেন শেখ বুরহান উদ্দিন। তিনি হিন্দু জালিম রাজা গৌর গোবিন্দের কারণে গোপনে ইবাদত-বন্দেগী করতেন।কারণ, সেখানে প্রকাশ্যে মুসলমানদের জন্য ইবাদত-বন্দেগী করা নিষিদ্ধ ছিলো।কেউই গরু জবাই ও কুরবানী করতে পারতো না।
.
শেখ বুরহান উদ্দিনের কোনো সন্তান ছিলো না। সন্তানের জন্য মহান আল্লাহ পাকের নিকট দোয়া করে তিনি নিয়ত করলেন- যদি তার একটি সন্তান হয় তাহলে তিনি শুকরিয়া স্বরূপ মহান আল্লাহর নামে একটি গরু কুরবানী করবেন। কিছুদিন অপেক্ষার পর সত্যি সত্যিই ঘরআলো করে একজন ফুটফুটে সন্তান জন্ম নিলো। খুশি হয়ে বুরহানুদ্দীন শুকরিয়া করে নিয়ত মুতাবিক একদিন গোপনে একটি গরু কুরবানী করে গোশত মুসলমানদের মধ্যে বিলি করতে লাগলেন। এমন সময় একটি কাক এসে ছোঁ মেরে এক টুকরা গোশত নিয়ে গেলো। মহান আল্লাহ পাক উনার কি কুদরত, কাক গোশতের টুকরাটি ফেললো গৌর গোবিন্দের মন্দিরের প্রধান প্রবেশ পথে।
.
গোবিন্দ এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সৈন্য পাঠিয়ে শেখ বুরহান উদ্দিনকে রাজার সামনে উপস্থিত করলো।
জালিম হিন্দু রাজা গৌড় গোবিন্দ বুরহান উদ্দিনের ডান হাত কেটে দিলো। নিষ্পাপ সদ্য জন্ম নেয়া শিশু (গুলজার)-কে কথিত দেবতার সামনে বলি দিলো।
.
এ অবস্থা দেখে শিশুটির মা অর্থাৎ শেখ বুরহান উদ্দিনের স্ত্রী অজ্ঞান হয়ে মৃত্যু বরণ করলেন। শুধুএতটুকুই নয়, ওই যালিম গোবিন্দ ওই দিনই আক্রমণ চালিয়ে ওই এলাকার সকল মুসলমানদেরকে নির্মমভাবে শহীদ করে ফেললো!
.
অত্যন্ত ব্যথিত অন্তরে শেখ বুরহান উদ্দিন পায়ে হেঁটে উপস্থিত হলেন সোনারগাঁয়ে শামসুদ্দিন ইলিয়াসশাহের দরবারে। ইলিয়াস শাহ সব শুনে যালিম হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দকে শাস্তি দেয়ার জন্য সৈন্য-সামন্ত পাঠালেন যুদ্ধ করার জন্য। বেশ কিছুদিন যুদ্ধ হলো, শত শত মুসলিম সৈন্য শহীদ হলো। কিন্তু জয় করা হলো না।
.
এরপর শেখ বুরহান উদ্দিন রওয়ানা হলেন দিল্লির পথে। দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ তুঘলকের সামনে। তিনি বুরহান উদ্দিনের নিকট হতে সব বিষয় শুনে যবন গোবিন্দকে শায়েস্তা করার জন্য সৈন্যসহ সিকান্দার গাজীকে সেনাপতি করে অভিযানে পাঠালেন। কিন্তু পথিমধ্যে অনেক প্রতিকূলতার কারণে তারা দিল্লিতে ফিরে গেলেন।
.
অতঃপর নতুন কিছু সৈন্যসহ আর একজন বীর সাইয়্যিদ নাসির উদ্দিনকে সেনাপতি করা হলো। সম্রাটের আদেশ পেয়ে তিনি দোয়া নিতে গেলেন তাঁর পীর শায়েখ হযরত খাজা নিজাম উদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবারে। তখন ওখানেই অবস্থান করছিলেন হযরত শাহ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি। সবকিছু শুনে হযরত শাহ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনিও সাইয়্যিদ নাসির উদ্দিনের সাথে এই অভিযানে যাবেন।
অতঃপর হযরত শাহ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ৩৬০ জন সঙ্গী নিয়ে সাইয়্যিদ নাসির উদ্দিনের সৈন্যবাহিনীর সাথে রওয়ানা দিলেন।
.
পথিমধ্যে গৌর গোবিন্দের সৈন্যদের সাথে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। ওলীয়ে কামিলগণ উনাদের দোয়া, মহান আল্লাহ পাক উনার গায়েবী মদদ এবং হযরত শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার রূহানিয়তের নিকট গৌর গোবিন্দের যাদুমন্ত্র অকার্যকর হয়ে তার বাহিনীর চরম পরাজয় হলো। নিহত হলো গোবিন্দের সেনাপতি মনা রায়।মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হতে থাকলো গৌর গোবিন্দের রাজধানী অভিমুখে। সুরমা নদী পার হয়ে মুসলিম বাহিনী যখন প্রাসাদের নিকটবর্তী হলো, তখন হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দ প্রাসাদ ছেড়ে পালিয়ে যায়। মুসলমানের আযানের ধ্বনিতে গৌর গোবিন্দের প্রাসাদ ও মন্দির ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
.
উদিত হলো নতুন সূর্য। উড়তে লাগলো ইসলামের পতাকা।গৌর গৌবিন্দের রাজ্যের নতুন নাম হলো জালালাবাদ।।
.
(কৃতজ্ঞতাঃ ভাই মুরাদ চৌধুরী)
.
মোরাল : সূফীরাও জিহাদ করেছেন। এক মুসলিম আরেক মুসলিমের জন্য সাহায্যের হাত বাড়াতে দূর থেকে ছুটে এসেছেন। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে ষড়যন্ত্র চলছে! সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসীরা সজাগ থাকুন। নয়তো ৭০০ বছর আগের শাহ জালালের রূহ অন্য মুসলিমের উপর আছর করতে পারে!

তাওবার দরজা মৃত্যু পর্যন্ত খোলা থাকে।

হযরত ওমর (রা)-এর আমলে এক গায়ক ছিল। লোকটি গোপনে গোপনে গান গেয়ে শখ পূরন করত এবং তার গান শুনে মানুষ তাকে পয়সা দিত। এ দিয়ে তার জীবন চলত। কন্ঠ ছিল তার পূঁজি। এক সময় সে বৃদ্ধ হয়ে গেল। কন্ঠ শেষ হয়ে গেল। এখন আর কেউ তার গান শোনে না, পয়সা দেয় না। শুরু হলো অভাবের জীবন। অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটে তার।
একদিন লোকটি ক্ষুধার্ত অবস্হায় জান্নাতুল বাকীর এক ঝোঁপের আড়ালে বসে বলতে লাগল, হে আল্লাহ! আমার সুরেলা কন্ঠ ছিল। আমার গান শুনে মানুষ আমাকে পয়সা দিত। এখন বার্ধক্যের কারনে কন্ঠ শেষ হয়ে গেছে। কেউ আমার গানও শোনে না, পয়সাও দেয় না। তুমি তো সকলের কথাই শুনে থাক, আমার ফরিয়াদও শোনো। আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি, আমার শক্তি শেষ হয়ে গেছে। একথা সত্য যে, আমি তোমার অবাধ্য। তবু তুমি আমার অভাব দূর করে দাও, আমার প্রয়োজন মিটিয়ে দাও।
হযরত ওমর (রা) মসজিদে শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ তার কানে আওয়াজ আসল, আমার বান্দা আমাকে ডাকছে, তুমি গিয়ে তাকে সাহায্য করো। জান্নাতুল বাকীতে এক ফরিয়াদি আছে, তুমি তার ফরিয়াদ পূরন করে দাও। আদেশ পেয়ে হযরত ওমর(রা) খালি পায়েই ছুটে গিয়ে দেখলেন, এক বৃদ্ধ ঝোপের আড়ালে বসে আছে। বৃদ্ধ হযরত ওমরকে দেখে সে উঠে পালাতে উদ্যত হলে হযরত ওমর (রা) বললেন দাড়াও, আমাকে তোমার কাছে পাঠানো হয়েছে। লোকটি থমকে গিয়ে বলল, আপনাকে কে পাঠিয়েছেন? হযরত ওমর(রা) বললেন, তুমি যার কাছে ফরিয়াদ করছো তিনিই তো আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন।
লোকটি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, হে আল্লাহ! সওরটি বছর তোমার নফরমানি করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে একটিবারও তোমাকে স্মরন করিনি। আর এখন যখন করলাম পেটের খাতিরে করলাম। কিন্তু তার পরও তুমি আমার ডাকে সাড়া দিয়েছ। হে আল্লাহ ! আমি নফরমানকে তুমি ক্ষমা করে দাও - ক্ষমা করে দাও - ক্ষমা করে দাও। এ বলে লোকটি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল আর এ অবস্হায়ই সে মহান আল্লাহ তা‘আলার সন্নিধ্যে পরলোক গমন করেন। তার জানাযার ইমামতি হযরত ওমর (রা) করেন। 
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! আজ আমার মনটা অনেক খারাপ লাগছে। আমি যে আল্লাহর সাথে কতই নফরমানি করেছি তার কোন সীমানা নেই। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমাদেরকে আল্লাহপাক পাকড়াও এজন্য করেন না যে , তিনি দয়ালু ও মহান। তিনি বান্দার কল্যানই কামনা করেন। বান্দাকে তিনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে চান না।

তাই যত বড় নফরমানই হোক, সব মানুষের জন্য মৃত্যু পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা থাকে। তারপরও যদি কেউ তাওবা করে ক্ষমা নিতে না পারে, তা হলে সে কপাল পোড়া।

শুক্রবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ফরয নামায না পড়ে ঘুমিয়ে পড়ার শাস্তিঃ

একবার এক স্বপ্নে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কয়েকটি পাপের শাস্তি দেখানো হয়। উল্লেখ্য, নবী-রাসুলদের সব স্বপ্ন ওহী, অর্থাত আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য স্বপ্নঃ “একদিন সকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আজ রাতে আমার কাছে দুইজন আগন্তুক এসেছিল। তারা আমাকে বললো, আমাদের সাথে চলুন। আমি তাদের সাথে গেলাম। আমরা এমন এক লোকের কাছে পৌঁছলাম, যে চিত হয়ে শুয়ে ছিলো। অপর এক ব্যক্তি পাথর নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে পাথর দিয়ে শুয়ে থাকা ব্যক্তির মাথায় আঘাত করছে এবং থেঁতলে দিচ্ছে। যখন সে পাথর নিক্ষেপ করছে তা গড়িয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। লোকটি গিয়ে পাথরটি পুনরায় তুলে নিচ্ছে। এবং তা নিয়ে ফিরে আসার সাথে সাথেই লোকটির মাথা পুনরায় পূর্বের মতো ভালো হয়ে যাচ্ছে। সে আবার লোকটির কাছে ফিরে আসছে এবং তাকে পূর্বের মতো শাস্তি দিচ্ছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি আমার সংগী দুইজনকে জিজ্ঞাস করলামঃ সুবহা’ন-আল্লাহ! এরা কারা? তারা পরবর্তীতে উত্তর দেন, সে হচ্ছে এমন ব্যক্তি যারা কুরান মুখস্থ করে তা পরিত্যাগ করে এবং ফরয নামায না পড়েই ঘুমিয়ে পড়ে” (সহীহ বুখারী, রিয়াদুস সালেহীনঃ ১৫৪৬)
নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক, হে আল্লাহ আমাদের অতীতের ভুল ত্রুটিগুলো মাফ করো এবং ভবিষ্যতে সমস্ত গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তোওফিক দান করো, আমীন।

আল্লাহ মানুষকে অট্রালিকা বানানোর জন্য সৃষ্টি করেননি!

দিগ্বিজয়ী শাষকদের মধ্যে দ্বিতীয় হলেন সুলতান মাহমুদ গজনবি(রহ)! এক নম্বরে চেঙ্গিসখান। তিন নম্বরে তৈমুরে লং।
সুলতান মাহমুদ আলিশান এক মহল নির্মাণ করলেন। তার অর্থের অভাব ছিল না। মহল তৈরির কাজ সম্পন্ণ করে পিতাকে বললেন, আব্বাজান! আমি একটি ঘর তৈরী করেছি” এসে দেখে যান।
পিতার নাম সবুক্তগিন। অত্যন্ত নেককার মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা তাকে সাধারন সৈনিক থেকে বাদশাহ বানিয়েছেন। আতীতকে স্মরন রেখেছেন। রাজা হয়েও আল্লাহকে ভোলেননি।
পুএের আহ্বানে সবুক্তগিন মহল দেখতে গেলেন। অত্যন্ত সুরম্য এক অট্রালিকা। ঘুরে ফিরে মহলটা দেখলেন। কিন্তু কোন মন্তব্য করলেন না। সুলতান মাহমুদ মনে মনে ক্ষুদ্ব হলেন, এমন একটি মহল নির্মাণ করলাম আর আব্বাজান দেখে কিছুই বলছেন না।
ঘুরে ফিরে দেখে বের হওয়ার সময় সুবক্তগিন খন্জরটা বের করে কারুকার্যখচিত দেওয়ালে এমন জোরে আঘাত হানলেন যে, দেওয়ালের কারুকাজ ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেল।
এবার তিনি মুখ খুললেন— বেটা, এমন এক বস্তুর উপর মেহনত করেছ, যা খন্জরের একটি আঘাতেই সহ্য করতে পারল না! আল্লাহ তোমাকে মাটির গায়ে কারুকাজ করার জন্য, ইট পাথরের উপর রং চড়ানোর জন্য সৃষ্টি করেননি বরং তোমার দিলকে গড়ার জন্য সৃষ্টি করেছেন।
প্রিয় পাঠকগন! একটু গভীর ভাবে চিন্তা করিয়া দেখুন— আমরা ক্লাস নার্সারী থেকে আনারর্স পর্যন্ত এক থেকে একশরো আধিক বই পড়ে থাকি! এর উদ্দেশ্য কি? এর উদ্দেশ্যে হল আমরা একটি জায়গা ক্রয় করে তার উপর একটি বাড়ি বানাবো, আলিসান ফার্ণিচার, একটি গাড়ি ক্রয় করবো। তাহলে আমরা আল্লাহ সুবহানা তা‘আলার জন্য কি করছি?

আমরা কত বড় নাফরমান!

হে আমার মুখলেস বুযুর্গ এবং ইসলাম ও মুসলমানের উন্নতিকামী বন্দুগন! আপন পরিবার—পরিজন, সন্তান—সন্ততি অধীনস্হ ও ছোটদের প্রতি একটু লক্ষ করিয়া দেখুন তাহারা কি পরিমান প্রকাশ্য গোনাহের মধ্যে লিপ্ত রহিয়াছে” আর আপনারা তাদেরকে বাধা প্রদান করিতেছেন কিনা। অথবা এই আশঙ্কা আপনার মনে আসে কিনা যে, আমার প্রিয়পুএ কি করিতেছে। যদি সে সরকারের বিরুদ্ধে কোন অন্যায় কাজ করে বা অপরাধও নহে শুধু সরকার বিরোধী কোন রাজনৈতিক সভা সম্মেলনে অংশগ্রহন করে, তবে আপনিও উহাতে জড়াইয়া পড়ার ভয়ে চিন্তিত হইয়া যান!তাহাকে শাসন করা হয় এবং নিজে নির্দোষ ও দায়মুক্ত থাকিবার জন্য বিভিন্ন রকম তদবীর করা হয় ।
কিন্তু আহকামুল হাকেমীন আল্লাহ তায়ালার নাফরমানের সাথেও কি সেই আচরন করা হয় যাহা এই ক্ষনস্হায়ী দুনিয়ার নগন্য সরকারী অপরাধীর সাথে করা হয়।
আপনি ভাল করিয়া জানেন—আপনার প্রিয়পুএ দাবা খেলায় তাসখেলায় ডুবিয়া থাকে, কয়েক ওয়াক্তের নামায ছাড়িয়া দেয়। কিন্তু আফসোস! কখনও আপনার মুখ হইতে ভুলেও এই কথা বাহির হয়না যে, বেটা!কি করিতেছ? ইহা তো মুসলমানের কাজ নয়।
এমন আনেক লোক পাওয়া যাবে, যাহার ছেলের উপর এইজন্য নারাজ যে, ছেলে অলস ও ঘরে বসিয়া থাকে” চাকরির চেষ্টা করে না অথবা দোকানের কাজে মনোযোগ দেয় না” কিন্তু এমন লোক খুব কমই পাওয়া যাইবে যাহারা ছেলের উপর এই জন্য নারাজ হয় যে, সে জামাতে নামায আদায় করে না কিংবা নামায কাজা করিয়া দেয়।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা দ্বীনের প্রতি উদাসীনতা যদি শুধু আখেরাতের জন্যই ক্ষতিকর হইত তবুও ইহা হইতে বহু দূরে সরিয়া থাকা উচিত ছিল। কিন্তু সর্বনাশ তো এই যে, যে দুনিয়াকে আমরা কর্যতঃ আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিয়া থাকি, চিন্তা করুন—এই অন্ধত্বের কোন সীমা আছে?

বিশ্বনবী (সা)-এর বিদায় হজ্বের ভাষন

 যিলহজ্ব মাসের নবম তারিখ শুক্রুবার নবী করীম (সা) সমস্ত মুসলমানগন সহ আরাফাতের ময়দানে সমবেত হলেন। অন্যুন একলক্ষ পঁচিশ হাজার মুসলমান সেদিন একএিত হয়েছিলেন।
সেই বিশাল জনসমুদ্রের সম্মুখে বিশ্বনবী (সা) স্বীয় উটনীর পিঠে সওয়ার হয়ে তার শেষ ভাষন দান করলেন। এ ভাষনের মধ্যে দিয়েই নবী করীম (সা)এর জীবন-সন্ধ্য ঘনিয়ে আসার আভাস সুচিত হয়েছিল।
নবী করীম (সা) বললেন— হে মুসলিমগন! হয়ত এখানে আর তোমাদের সাথে আমার মিলন ঘটবে না। অতএব, আমার কথাগুলি তোমরা মনোযোগ সহকারে শ্রবন কর।
তারপর তিনি ভাষন আরম্ভ করলেন, হে আল্লাহর বান্দাগন! আজ হজ্বের দিন, পবিএ যিলহজ্ব মাস, এই মক্কা নগরী যেমন পবিএ, তোমাদের পরস্পরের জান মালও পরস্পরের নিকট তেমনি পবিএ। তোমাদের কাছে কারও কোন মাল গচ্ছিত থাকলে তা ফেরত দিয়ে দাও।
হে মীসলিমগন! তোমরা একে অপরের ভাই। তোমরা একের সম্পদ তার অনুমতি ব্যতিরেকে অন্যে খরচ করো না।
হে মুসলিম নরগন! মুসলিম নারীদের প্রতি তোমাদের কর্তব্য রয়েছে।
হে মুসলিম নারীগন! মুসলিম পুরুষদের প্রতি তোমাদেরও কর্তব্য আছে। তোমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্তব্যগুলো পালন কর।
হে মুসলিমগন! স্ত্রীলোকদের সহিত নরম এবং উদার ব্যবহার করিও। ক্রীতদাসগনের সহিত সদ্ব্যবহার প্রদর্শন করিও। যা নিজেরা ভক্ষন কর, তাদের তা খেতে দিও। নিজেরা যা পরিধান কর, তাদেরকে তাই পরতে দিও। যদি কোন কাজে তারা ক্রুটি করে ফেলে তবে তা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখ।
হে মুসলিমগন! তোমরা আমার অবর্তমানে দ্বীন পরিত্যাগ করো না। সাবধান! আমার পরে তোমরা সত্য পথ হতে ফিরে যেওনা। তোমরা একে অপরের প্রতি অত্যাচার করো না। তোমরা একে অন্যকে হত্যা করতে লিপ্ত হয়ো না। কাল কিয়ামতে নিশ্চয়ই তোমাদের আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে। সেখানে তোমাদের কার্যাবলীর হিসাব গ্রহন করা হবে। হুশিয়ার থেকো। আমি তোমাদের জন্য আমার আদর্শ এবং আল্লাহর কিতাব পবিত্র কোরআন রেখে গেলাম। যদি তোমারা কোরআনকে এবং আমার আদর্শকে দৃঢ়ভাবে ধারন কর, তবে কখনই পথব্রষ্ট হবে না। যে কাজ করবে সরল হ্নদয়ে করিও। মুসলমানদের কল্যান কামনা করিও। পরস্পরে ঐক্য বজায় রেখো।
হে উম্মতগন! তোমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। তোমরা সবাই হযরত আদম(আ)-এর বংশধর। আল্লাহপাক মৃওিকার দ্বারা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের মধ্যে সেই বেশি মর্যাদাশীল যে আল্লাহকে বেশি ভয় করে। ধর্মভিরুতা ছাড়া আরব এবং অনারবের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। অনারবের প্রতি আরাবের, আরবের প্রতি অনারবের এবং সাদার প্রতি কালোর বা কালোর প্রতি সাদার কোন প্রাধান্য বা অভিজাত্য নাই। বিশ্বের সমগ্র মুসলিমগন তোমরা এক ভ্রাতৃ সম্পর্কে আবদ্ধ।
হে মুসলিমগন! তোমরা জানিও আমিই দুনিয়ার শেষ পয়গাম্বার। আমার পরে আর কেউ পৃথিবীতে নবী হিসাবে আগমন করবে না এবং আমার উম্মতের পরে নতুন কোন উম্মত হবে না। এখন সকলে তোমাদের মা‘বুদের প্রশংসায় নিয়োজিত থাক। নামায আদায় কর। রমযানের রোযা রাখ। মালের যাকাত আদায় কর। হজ্ব পালন কর। নেতৃস্হানীয়দের মান্য কর। আর এ সকল কাজ দ্বারা বেহেশতে নিজেদের জায়গা করে লও।
ভাষনের সমাপ্তিক্ষনে রাসূলুল্লাহ (সা) উম্মতগনকে জিজ্ঞেস করলেন, কাল কেয়ামতের দিন আল্লাহ আমার কর্তব্য পালন সম্পর্কে তোমাদের কাছে সাক্ষ্য গ্রহন করবেন, তখন তোমরা কি বলবে?
উপস্তিত জনতা সমস্বরে বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনি আল্লহর নির্দেশসমূহ প্রচারঅ করেছেন। আপনি আপনার রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনি সৎ অসতের পার্থক্য ঘোষনা করেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) পর পর তিনবার বললেন, আয় মা‘বুদ! তুমি সাক্ষী থেকো, আয় মা‘বুদ! তুমি সাক্ষী থেকো! আয় মা‘বুদ! তুমি সাক্ষী থেকো। আয় মাবুদ তুমি দেখ, ইহারা সকলেই সাক্ষী দিতেছে।
তারপর নবী করীম (সা) বললেন, তোমরা এখানে যারা উপস্তিত আছ, তারা অনুপস্হিত লোকদেরকে আমার উপদেশ বানী পৌছে দিও।
হযরত রাসূলে করীম (সা)-এর ভাষনের পর ফেরেশতা জিব্রাইল(আঃ) আল্লাহর পক্ষ হতে এসে ইসলামের পূর্নতা লাভের মহা সংবাদ ঘোষনা করলেন— “আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম ওয়া আতাতমামতু আলাইকীম নি‘মাতী ওয়া রাদিয়াতু লাকুমুল ইসলামা দ্বীনা।” (বয়ানুল কোরআন)
অর্থ— আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমার প্রতি আমার নিয়ামাতের সমাপ্তি ঘটল। আর ধর্ম হিসেবে ইসলামকেই আমি মনোনীত করলামl

খলীফা হারুন উর রশীদ (রহঃ) এর ছেলের হৃদয় বিদারক ঘটনা!

বাদশাহ হারুন উর রশীদ (রহঃ) একটি ছেলে ছিলো। তার ১৬ বছর বয়স ছিলো। সে অধিকাংশ সময় দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত ও বুযুর্গ লোকদের মজলিশে থাকত এবং প্রায় সময়ে কবরস্হানে চলে যেতো। সেখানে গিয়ে বলতোঃ “তোমরা আমাদের পূর্বে দুনিয়াতে ছিলে। দুনিয়ার মালিক ছিলে। কিন্তু এই দুনিয়া তোমাদেরকে মুক্তি দেয় নাই। অবশেষে তোমরা কবরে পৌছিয়ে গেছো। হায়! কোনভাবে যদি আমি জানতে পারতাম তোমাদের উপর কি অতিবাহিত হচ্ছে এবং তোমাদের সাথে কি কি সওয়াল জবাব হচ্ছে?” আর অধিকাংশ সময় এই কবিতা পাঠ করতঃ “আমাকে জানাযা প্রতিদিন ভয় দেখায় এবং মৃত্যুবরণকারীদের ওপর ক্রন্দনকারিনীদের আওয়াজ আমাকে চিন্তিত করিয়া রাখে।”
একদিন সে তার বাবা বাদশাহের মজলিশে আসলো। তার কাছে উজির আমির সকলেই উপস্হিত ছিলো। ছেলের গায়ে সাধারণ একটি কাপড় আর মাথায় একটি লুঙ্গী বাঁধা ছিলো। রাজ্যের উর্ধত্বন কর্মকর্তাগণ বলতে লাগলঃ “এই পাগল ছেলটির কাজকর্ম আমীরুল মুমিনীনকে অন্যান্য বাদশাহের দৃষ্টিতে ছোট করে রেখেছে। আমীরুল মুমিনীন যেন তাকে সতর্ক করে দেন, তবে সে হয়তো তার অবস্হা পরিবর্তন করবে। আমিরুল মুমিনীন এই কথা শুনিয়া ছেলেকে বললেনঃ “হে পুত্র! তুমি আমাকে লোকের দৃষ্টিতে ছোট করে রেখেছো।” সে এই কথা শুনে পিতাকে তো কোন জবাব দিল না; কিন্তু একটি পাখি সেখানে বসে ছিলো, তাকে বললোঃ “ঐ মহান সত্তার দোহাই যিনি তোমাকে পয়দা করেছেন। তুমি আমার হাতের ওপর এসে বসে যাও।” সেই পাখিটি ঐখান থেকে উড়ে এসে তার হাতের ওপর বসে গেল।
তারপর বললোঃ “এখন তুমি তোমার জায়গায় ফিরে যাও।” পাখিটি তার হাত থেকে উড়ে নিজ জায়গায় বসে গেলো।

অতঃপর সে আরজ করলোঃ “হে আব্বাজান। দুনিয়ার প্রতি আপনার মহব্বত প্রকৃতপক্ষে আমাকে ছোট করে রেখেছে। এখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আপনার কাছ থেকে পৃথক হয়ে যাবো। এই বলে সে ঐখান থেকে রওয়ানা হয়ে গেল। শুধু এক জিলদ কুরআন শরীফ সঙ্গে নিলো। বিদায়ের সময় তার মা তাকে একটি মুল্যবান আঙটি দিলেন। (যাতে প্রয়োজনের সময় একে বিক্রী করে কোন কাজে লাগাতে পারে।) সে সেইখান থেকে রওয়ানা হয়ে বসরা শহরে পৌছালো এবং মজদুরদের সাথে কাজ করতে লাগলো। সপ্তাহে একদিন শুধু শবিবার কাজ করতো আর আটদিন ঐ মজুরীর পয়সা খরচ করতো। এক দিরহাম ও এক দানিক (এক দিরহামের ৬ ভাগের এক ভাগ) মজুরী নিতো। অষ্টমদিন আবার শনিবার সে কাজ করতো।
আবু আমের বসরী (রহঃ) বলেনঃ “আমার একটি দেওয়াল পড়ে গিয়াছিলো। ঠিক করার জন্য আমি একজন মিস্ত্রীর সন্ধানে বের হলাম। (কেউ বললোঃ “এই ব্যাক্তিও নির্মাণের কাজ করে) আমি দেখলাম অত্যান্ত সুশ্রী একটি ছেলে বসে আছে। কাছে একটি খালি লোটা আছে এবং দেখে কুরআন শরীফ পড়িতেছে। আমি বললামঃ “হে ছেলে! কাজ করবে? সে বলতে লাগলোঃ “কেন করবো না? কাজ করার জন্যই তো পয়দা হয়েছি। আপনি বলুন, আমার দ্বারা কি কাজ নিতে চান?” আমি বললামঃ “গাড়া মাটির নির্মানের কাজ নিবো।”
সে বললোঃ “এক দিরহাম ও এক দানিক মজুরী হবে এবং নামাজের সময় কাজ করবো না আমাকে নামাজের জন্য যেতে হবে।” আমি তার উভয় শর্ত মন্জুর করলাম এবং তাকে নিয়া কাজে লাগিয়ে দিলাম। মাগরীবের সময় যখন আমি দেখলাম তখন সে দশজন লোকের কাজ করেছে। আমি তাকে দুই দিরহাম মজুরী দিলাম সে শর্তের অধিক মজুরী নিতে অস্বীকার করলো এবং এক দিরহাম এক দানিক নিয়ে চলে গেল।
দ্বিতীয় দিন আমি আবার তার সন্ধানে বের হলাম কিন্তু আমি তাকে দেখতে পেলাম না। আমি লোকজনদের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম (যে, এইরকম চেহারা বিশিষ্ট একটি ছেলে মজদুরী করে, কারও কি জানা আছে যে, তাকে কোথায় পাবো?) লোকজন বললো, সে শুধু শনিবার দিনই মজদুরী করে। এই দিনের আগে তুমি কোথাও তাকে খু্ঁজে পাবে না। কাজ দেখে তার প্রতি আমার এইরকম আগ্রহ সৃষ্টি হলো যে, আমি আটদিন পর্যন্ত আমার নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখলাম এবং শনিবারদিন আবার সন্ধানে বের হলাম। আগের মতই তাকে বসে কুরআন শরীফ পাঠরত অবস্হায় পেলাম। সে আগের মত দুই শর্ত রাখলো। আমি মন্জুর করে নিলাম। সে আমার সাথে এসে কাজে লেগে গেল। আমি এই ব্যাপারে অবাক হচ্ছিলাম যে, গত শনিবারে সে একা দশজন লোকের কাজ কিভাবে করলো। এইজন্য আমি এমনভাবে তাকিয়ে রইলাম যে, সে যেন আমাকে না দেখে। আমি তার কাজের অবস্হা দেখলাম। আমি এই দৃশ্য দেখলাম যে, সে মাটির গাড়া নিয়ে দেয়ালের ওপর রাখে আর পাথর নিজে নিজেই একটি অপরটির সাথে লেগে যেতে থাকে। আমার ইয়াক্বীন হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর ওলী হবে আর আল্লাহর ওলীদের কাজে গায়েব থেকে সাহায্য হয়ে থাকে। যখন সন্ধা হয়ে গেল তখন আমি তাকে তিন দিরহাম দিতে চাইলাম। সে তা নিতে অস্বীকার করে বললোঃ “আমি এতো দিরহমে কি করবো? সে এক দিরহাম এক দানিক নিয়ে চলে গেল।
আমি এক সপ্তাহ পুনরায় অপেক্ষা করলাম। তৃতীয় শনিবার আবার তালাশে বের হলাম। কিন্তু আমি তাকে পেলাম না। লোকদের জিজ্ঞাসা করলাম। এক ব্যাক্তি বললোঃ “সে তিনদিন যাবৎ অসুস্হ অমুক নির্জন জঙ্গলে পড়ে আছে। আমি এক ব্যাক্তিকে বিনিময় দিয়ে রাজী করাইলাম যে, সে আমাকে ঐ জঙ্গলে পৌঁছে দিবে। সে আমাকে সঙ্গে নিয়ে ঐ বিরান জঙ্গলে পৌঁছালো। তখন আমি দেখলাম সে বেহুঁশ অবস্হায় পড়ে আছে। একটি ইটের অর্ধেক টুকরা তার মাথার নিচে রহিয়াছে। আমি তাকে সালাম করলাম সে নিরব রইলো। আমি দ্বিতীয়বার সালাম করলাম সে চোখ খুললো এবং আমাকে চিনে ফেললো। আমি তৎক্ষণাত তার মাথা ইটের ওপর থেকে নিয়ে আমার কোলে রাখলাম। সে সরিয় নিলো এবং মৃদুস্বরে কবিতার কয়েকটি চরণ পড়লো।
অর্থঃ “হে বন্ধু। দুনিয়ার নিয়ামত দ্বারা ধোকায় পড়িও না। জীবন শেষ হইতেছে আর এই নিয়ামত খতম হইয়া যাইবে। যখন তুমি কোন জানাযা লইয়া কবরস্হানে যাও তখন চিন্তা করিয়া থাকিও যে, এমনিভাবে তোমার জানাযা ও উঠানো হইবে।”

সে, আমাকে বললোঃ “হে আবু আমের! যখন আমার রুহ বের হয়ে যাবে তখন আমাকে গোছল দিয়ে আমার এই কাপড়েই আমাকে দাফন করিও।”
আমি বললাম “হে আমার প্রীয় এতে কি সমস্যা আছে যে, আমি আপনাকে নতুন কাফনের কাপড় পরাবো”?
সে বললঃ “নতুন কাপড়ে জীবিত লোককেই মানায়।”

হজরত আবু বকর (রাঃ) ও তার ইন্তেকালের পূর্বে এটাই বলেছিলেন যে, “আমার এই চাদরগুলোর দ্বারাই আমাকে দাফন করিও।” সকলে তাকে নতুন কাপড়ের অণুমতির কথা বলিলে তিনিও ঐ একই জবাব দিয়েছিলেন।
ছেলেটি বললোঃ “কাফন তো পুরাতন হোক বা নতুন তা একদিন পুরাতন হবেই। মানুষের সাথে শুধু তার আমল রয়ে যাবে।” আর আমার এই লুঙ্গী ও লোটা কবর খননকারীকে দিয়ে দিবে আর এই কুরআন শরীফ ও আংটি হারুন-উর-রশীদ এর কাছে পৌছিয়ে দিও। আর খেয়াল রেখ যে, তুমি নিজে তার হাতে দিবে এবং এই বলে দিবে যে, “এক পরদেশী ছেলের পক্ষ থেকে এটি আমার কাছে আমানত ছিলো। সে আপনাকে এই কথা বলে দিয়েছে যে, “এমন যেন না হয় যে, এই গাফেলত ও ধোকার অবস্হাতেই আপনার মৃত্যু এসে যায়।” এই পর্যন্ত বলতে বলতেই তার প্রাণ বের হয়ে গেল। তখন আমি জানতে পারলাম সে, শাহজাদা ছিলো।

বর্তমান সমাজে অহরহ পরকিয়া , ডিভোর্স , দাম্পত্য জীবনে অশান্তির মূল কারণ পরিবারের মধ্যে ইসলাম না থাকা


বর্তমান সমাজে অহরহ পরকিয়া , ডিভোর্স , দাম্পত্য জীবনে অশান্তির মূল কারণ পরিবারের মধ্যে ইসলাম না থাকা । আর যে পরিবারে ইসলাম থাকবে না সে পরিবারে থাকবেনা আল্লাহ ভীতি এবং নিজ কর্মের জবাবদিহিতা । এতে করে শয়তানের পরিকল্পনা অনুযায়ী যাচ্ছে তাই করে যাওয়া যায় । যার দরুন ঘরে বৌ থাকা সত্তেও পর-নারীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ কিছু অনৈসলামিক পুরুষের জন্য মামুলি ব্যাপার।
এভাবে একটা পর্যায়ে ঐ পুরুষরা নিজ বৌয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং পরকিয়ায় জড়িয়ে যায় , এরপর পারিবারিক অশান্তি, এমনকি ডিভোর্সের মত ঘটনাও ঘটে । আর এটা ঘটে ঐ পুরুষ গুলোর মধ্যে আল্লাহ ভীতি না থাকার কারণে । আল্লাহ ভীতি তো সেটাই যা স্বামী-স্ত্রীর পরস্পর আল্লাহর জন্য নিজেদের চোখ ও অন্তরকে হেফাজত করে এবং আল্লাহর জন্য একে অপরকে গভীর ভাবে ভালবাসে । যে ভালবাসে বিয়ের দিন যেমন থাকে, বিয়ের ৩০ বছর পরেও একই রকম থাকে । আর এটা হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য রাহমাত । তারা আল্লাহর জন্য নিজেদের চরিত্র হেফাজত করেছেন বলে আল্লাহ তাদের দু'জনের মধ্যে এমন গভীর ভালবাসা স্থাপন করে দিয়েছেন । ইসলামের বিপরীত স্রোতের মানুষগুলোর জন্য যা শুধু কল্পনা !
আমাদের সমাজে তথাকথিত মা-বাবারা তাদের সন্তানদের বিয়ে দেয়ার সময় তাকওয়া দেখে বিয়ে দিতে চাই না । তারা দেখে ছেলে কত টাকার মালিক , কত উচ্চে তার বংশ , কত গুলো ডিগ্রী আছে ছেলের বাস্কেটে । অথচ , একবারের জন্য ভাবতে চাই না , যে ছেলের কাছে সারা জীবনের জন্য তার মেয়েকে দিচ্ছে , সে ছেলের চরিত্র ঠিক কিনা বা ছেলেটির পরিচালিত জীবনে আল্লাহ ভীরুতা আছে কিনা ! একইভাবে দেখা যায় ছেলেদের ক্ষেত্রে , সুন্দরী বৌয়ের খুঁজে তারা তাকওয়াবান স্ত্রীর কথা ভুলে যায় । একসময় দেখা যায় , সেই সুন্দরী বৌ তাকে ফেলে চলে যায় বা পরকিয়ায় পতিত হয় বা তার নিজের রুপের অহংকারে সংসারে সবসময় অশান্তি লেগেই থাকে ।
অথচ , রাসুল(সাঃ) বলেছেন , দুনিয়ার যত সম্পদ আছে , তার মধ্যে উত্তম সম্পদ হচ্ছে একজন নেককার স্ত্রী ।
আমাদের মা-বাবাদের উচিত তাদের কন্যাদের সু-পাত্রস্থ করতে চাইলে দ্বীনদার, পরহেজগার , তাকওয়াবান যুবকদের সাথে বিয়ে দেয়া । এতে করে কন্যাও সুখী হোল এবং সমাজেও পরকিয়া , ডিভোর্সের মত ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে । এই ব্যাপারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনা হল :-
"যার দ্বীনদারী ও আখলাক-চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, এমন কেউ প্রস্তাব দিলে তার সাথে তোমরা বিবাহ সম্পন্ন কর । তা না করলে পৃথিবীতে ফিৎনা দেখা দেবে ও ব্যাপক ফ্যাসাদ ছড়িয়ে পড়বে ।"
[তিরমিযী, হাদীস : ১০৮৪]
আল্লাহ আমাদের বুঝার তৌফিক দান করুন । আমীন ।

মানুষের পাপ গোপন রাখার গুরুত্ব

শুধুমাত্র মুনাফিক আর দুর্বল ঈমানের লোকেরাই মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ায় এবং তা প্রকাশ করে বেড়ায়... "
লজ্জা আর অপমানের ভয় অনেকসময় মানুষকে অনেক খারাপ কাজ করা থেকে বিরত রাখে। হতে পারে এই ভয়টাই একদিন তাকে আল্লাহ্‌র দিকে নিয়ে যাবে, যখন সে তার ভুল বুঝতে পারবে এবং তার কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু যখন তার অপরাধ জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়া হয় তখন সেই ভয়টা আর তার মাঝে কাজ করে না । সে তখন ভাবতে থাকে, ‘কি হবে আর ভাল থেকে, ক্ষতি যা হবার তা তো হয়েই গেছে, লোকজন তো জেনেই গেছে ইতোমধ্যে’, তখন সে প্রাকাশ্যে পাপ কাজে লিপ্ত হতে থাকবে।
তাছাড়া বারবার পাপের কথা বলতে থাকলে মানুষের অন্তর থেকে পাপের ভয় দূর হয়ে যায়। তখন পাপকে আর পাপ বলে মনেই হয়না। যে পাপের কথা বলে বেড়াতে লজ্জাবোধ করেনা, একই পাপে লিপ্ত হওয়া তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়। আর এভাবেই সমাজে পাপ ছড়িয়ে পড়তে থাকে!
তাই এক মুসলমান অন্য কোন মুসলমানকে পাপ করতে দেখলে তার উচিত তা গোপন রাখা। সেই পাপ প্রকাশ করে দিয়ে লোকজনকে পাপের দিকে ঠেলে দেওয়া তার পক্ষে সমীচীন নয়। আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে শুধুমাত্র গুনাহগারদেরকেই সতর্ক করেননি, যারা গুনাহের কথা বলে বেড়ায় তাদেরকেও সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ
“যারা পছন্দ করে যে,ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার লাভ করুক, নিঃসন্দেহে ইহাকাল ও পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ্ জানেন,তোমরা জানো না”। [সূরা আন-নূর; ২৪:১৯]

যিলহজ মাসের ১ম দশ দিনের ফযিলত:

১. যিলহজ মাসের ১ম মাসের প্রথম দশদিন আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরকালের পুঁজি সঞ্চয় করা যেতে পারে। এ দিনগুলো গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَٱلۡفَجۡرِ ١ وَلَيَالٍ عَشۡرٖ ٢ ﴾ [الفجر: ١، ٢]
“কসম ভোরবেলার। কসম দশ রাতের”।[1] ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এর দ্বারা উদ্দেশ্য যিলহজ মাসের দশ দিন।
২. আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ ٢٨ ﴾ [الحج : ٢٨]
‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।[2]‌’
এ আয়াতে নির্দিষ্ট দিনসমূহ বলতে কোনো দিনগুলোকে বুঝানো হয়েছে
সে সম্পর্কে ইমাম বুখারি রহ. বলেন,“ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন”।

বিশিষ্ট সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে নেক আমল করার মত অধিক প্রিয় আল্লাহর নিকট আর কোনো আমল নেই। তারা প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ করাও কি তার চেয়ে প্রিয় নয়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে ঐ ব্যক্তির কথা আলাদা যে তার জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে বের হয়ে গেল অতঃপর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই ফিরে এলো না।[3]

৪. ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট কোনো দিন অধিক প্রিয় নয়, আর না তাতে আমল করা, এ দিনের তুলনায়। সুতরাং, তাতে তোমরা বেশি করে তাহলীল, তাকবীর ও তাহমীদ পাঠ কর।[4]
৫. সাঈদ ইবনে জুবায়ের রাহিমাহুল্লাহর অভ্যাস ছিল, যিনি পূর্বে বর্ণিত ইবনে আব্বাসরে হাদিস বর্ণনা করেছেন: যখন যিলহজ মাসরে ১ম দশ দিন প্রবেশ করত, তখন তিনি খুব মুজাহাদা করতেন, যেন তার উপর তিনি শক্তি হারিয়ে ফেলবেন।[5]
৬. ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: যিলহজ মাসের দশ দিনের ফযিলতের তাৎপর্যের ক্ষেত্রে যা স্পষ্ট, তা হচ্ছে এখানে মূল ইবাদতগুলোর সমন্বয় ঘটছে। অর্থাৎ সালাত, সিয়াম, সদকা ও হজ, যা অন্যান্য সময় আদায় করা হয় না।[6]
৭. উলামায়ে কেরাম বলেছেন: যিলহজ মাসরে ১ম দশদিন সর্বোত্তম দিন, আর রমযান মাসের শেষ দশ রাত, সব চেয়ে উত্তম রাত।
[1] সূরা ফাজর, আয়াত: ১-২ [2] সূরা হজ, আয়াত: ২৮ [3] বুখারি: ৯৬৯, তিরমিযি: ৭৫৭ [4] তাবরানী ফীল মুজামিল কাবীর [5] দারামী: ২৫৬৪ হাসান সনদে [6] ফাতহুল বারী ১/২৬৩

অহংকার ছাড়া টাখনোর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে রাখলে কি গোনাহ হবে না


টাখনোর নিচে কাপড় ঝুলানো সম্পর্কে আমাদের অনেক ভ্রান্তি রয়েছে। ইতিপূর্বে দু’টি পোস্টে কিছুটা আলোচনা করেছি। এখন যে বিষয়টি আলোচনা করতে চাচ্ছি তা হচ্ছে, অহংকার ছাড়া কেউ যদি কাপড় ঝুলিয়ে রাখে তাহলে সেটা নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে কি না। অনেক ভাই হাদীসের ‘খুইয়ালা’ শব্দ দেখে মনে করেন, অহংকারের কারণে ঝুলিয়ে রাখলেই শুধু নিষেধাজ্ঞাটি প্রয়োগ হবে নতুবা কাপড় ঝুলানো নিন্দনীয় নয়। তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কেননা-
১.
প্রথম কথা হলো, যদিও কিছু কিছু হাদীসে নিষেধাজ্ঞাকে অহংকারের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে কিন্তু এর বিপরিত অসংখ্য হাদীসে অহংকারের শর্ত ছাড়াই সাধারণভাবে কাপড় ঝুলানো থেকে নিষেধ করা হয়েছে এবং কঠিন শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে। যেমন-
*হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, লুঙ্গির যে অংশ দু’টাখনোর নিচে থাকবে, তা জাহান্নামে যাবে। (সহীহ বুখারী, হা.৫৭৮৭)

*হযরত আবু যর রা. থেকে বর্ণিত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিনি ব্যক্তি এমন কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে দৃষ্টিও দিবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না... 
এরপর এই তিনি ব্যক্তির মধ্যে কাপড় ঝুলন্তকারীকে (অহংকারের শর্ত উল্লেখ ছাড়াই) উল্লেখ করেছেন (দেখুন, সহীহ মুসলিম, হা. ১০৮)

*হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাপড় ঝুলিয়ে রাখতে নিষেধ করেছেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, হা.)
*হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মুসলিমের লুঙ্গি পায়ের নলার অর্ধভাগ পর্যন্ত। তবে নলা এবং টাখনো পর্যন্ত থাকতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু লুঙ্গির যে অংশ দু’টাখনোর নিচে যাবে, তা জাহান্নামে যাবে। (সুনানানে আবু দাউদ, হা.৪০৯৩; ইবনে মাজা, হা. ৩৫৭৩; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা.১২/২৬৩)
*হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা লুঙ্গি ঝুলন্ত কারীর দিকে দৃষ্টি (রহমতের) দিবেন না। (সুনানে নাসায়ী: হা.৫৩৩২)
*হযরত মুগীরা বিন শু’বা রা. থেকে বর্ণিত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে সুফিয়ান বিন সাহল! কাপড় ঝুলিও না। কেননা আল্লাহ তাআলা কাপড় ঝুলন্তকারীকে পছন্দ করেন না। (সুনানে ইবনে মাজা, হা.৩৫৭৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা.১২/২৫৯)
উপরে কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে, অনুসন্ধান করলে এরকম অনেক বর্ণনা পেশ করা যাবে যেগুলো থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, টাখনোর নিচে কাপড় ঝুলানো অহংকারের সাথে হোক কিংবা অহংকার ছাড়াই হোক সর্ববস্থায় তা নিষেধ।
হযরত ইবেন উমর রা. সর্বাবস্থায় কাপড় ঝুলানো অপছন্দ করতেন। হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন, ইবনে আবী শাইবাহ এটি বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি বলেন, ইবনে উমরের এই অপছন্দ হচ্ছে যদি ইচ্ছাকৃত ঝুলিয়ে রাখে অহংকার থাক বা না থাক। (ফাতহুল বারী: ১০/২৫৫)

২.
দ্বিতীয় কথা হলো, অহংকার থাকা না থাকার বিবেচনা ছাড়াই অন্য অনেক কারণে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। যতটুকু লম্বা কাপড়ের প্রয়োজন এরচেয়ে বেশি লম্বা কাপড় পরিধান করলে নিষেধাজ্ঞার কি কি কারণ হতে পারে এসম্পর্কে হাফেজ ইবন হাজার রহ. বলেন-
ক.ইসরাফ যা হারাম
খ.মহিলার সাথে সামঞ্জস্যতা। এটি প্রথমটির চেয়েও মজবুত। তিনি বলেন হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ পুরুষকে লা’নত করেছেন যে মহিলার মতো কাপড় পরে।
হাকীম রহ. উক্ত হাদীসকে সহীহ বলেছেন।(হাদীসটি মুসনাদে আহমদ; সহীহ ইবনে হিব্বান সহ অন্যান্য হাদীসের গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে)
গ.পরিধানকারী ব্যক্তি নাজাসত লেগে যাওয়া থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না। এদিকে ইঙ্গিত করেই শামায়েলে তিরমিযি (হা.১১১) এবং নাসায়ী (কুবরা, হা.৯৬০৩) তে হযরত উবাইদ বিন খালিদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে-‘‘তিনি বলেন, আমি টাখনোর নিচে একটি চাদর ঝুলিয়ে হাটছিলাম এক ব্যক্তি আমকে বলল, তোমার কাপড় উঠাও কেননা এটা তোমার কাপড়ের পবিত্রতা এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার বেশি উপযোগী। পিছনে ফিরিয়ে দেখি সেই লোকটি হলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।’’
৩.
আমাদের অনেক ভাই টাখনোর নিচে কাপড় পরেন এবং নিজেদের আমলের বৈধতা প্রমাণে হযরত আবু বকর রা. এর আমল পেশ করেন। তারা বলেন, হযরত আবু বকরের অহংকার ছিল না তাই তা নিষেঘজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হয় নি আমরাও অহংকারের কারণে পরি না সুতরাং আমাদেরটাও বৈধ।

ঐসকল ভাইদের জেনে রাখা দরকার অহংকার ছাড়া কাপড় ঝুলানোর দাবী করার দু’টি সুরত:
ক.অহংকার ছাড়া অনিচ্ছায় কাপড় ঝুলানো। যেমন বেখায়ালে কারো লুঙ্গি কিংবা কাপড় টাখনোর নিচে চলে যায় কিন্তু যখনই খেয়াল হয় উঠিয়ে নেয়।
খ.ইচ্ছাকৃত কাপড় ঝুলিয়ে দাবী করা যে, আমি অহংকার ছাড়া করেছি।

হযরত আবু বকর রা. ছিলেন প্রথম সূরতের অন্তর্ভুক্ত। দেখুন, সহীহ বুখারী শরীফে (হা. ৩৬৬৫; ৫৭৮৪) হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের শেষে হযরত আবু বকর রা. এর প্রশ্ন এবং নবীজীর জবাব উল্লেখিত হয়েছে এভাবে-হযরত আবু বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার লুঙ্গির এক অংশ খেয়াল না করলে ঢিলা হয়ে যায়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যারা অহংকারের কারণে ঝুলিয়ে রাখে।’’
তাড়াহুড়ো করে চলার কারণে এরকম তো নবীজীরও হয়েছিল। সহীহ বুখারী শরীফে (হা. ৫৭৮৫) হযরত আবু বাকরা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজীর সময়ে একবার সূর্য-গ্রহণ হলো। তিনি দ্রুত কাপড় ঝুলিয়ে মসজিদে আসলেন।
তাছাড়া হযরত আবু বকর রা.অহংকার থেকে মুক্ত একথার সার্টিফিকেট খোদ নবীজী দিয়েছেন কিন্তু অন্য ঝুলন্তকারীদের যে অহংকার নেই একথার সার্টিফিকেট কে দিবে? সুতরাং হযরত আবু বকর রা.কে দলীল বানানোর কোনো সুযোগ নেই।
৪.
ইচ্ছাকৃত কাপড় ঝুলিয়ে যে দাবী করবে, আমি অহংকারমুক্ত তার এই দাবী সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হবে। ইবনুল আরাবী রহ. বলেন-
‘‘টাখনোর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে একথা দাবী করা যে, আমি অহংকারের কারণে করি নি, এটা জায়েয নয়। কেননা নিষেধাজ্ঞার শব্দটি এটাকেও অন্তর্ভুক্ত করে (কোরআন হাদীসের) শব্দ যখন কাউকে বিধানগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করে একথা বলার সুযোগ নেই যে, আমি এটা পালন করবো না, কেননা এই ইল্লত (কারণ) আমার মধ্যে নেই। এটি অগ্রহণযোগ্য দাবী। বরং (কাপড়ের) অগ্রভাগ ঝুলানোই একথা প্রমাণ কর যে, তার মধ্যে অহংকার রয়েছে।’’

হাফেজ ইবনে হাজার রহ. ফাতহুল বারীতে (১০/২৬৪) উপরোক্ত বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন, সারকথা হলো, কাপড় ঝুলানোর দ্বারা ‘জাররুস সাওব’ অত্যাবশ্যক আর ‘জাররুস সাওব’ এর জন্য অহংকার অত্যাবশ্যক যদিও পরিধানকারী অহংকারের উদ্দেশ্য না করে।
তিনি বলেন, ‘‘এটি (এই বক্তব্যটি) সুদৃঢ় হয় ইবনে উমর রা. থেকে অন্য সূত্রে আহমদ ইবনে মানী’ (আল মাতাবিলবুল আলিয়া: ১০/২৯১) এর বর্ণনা থেকে। নবীজী (এক আ’রাবীকে) বলেছেন, তুমি লুঙ্গি ঝুলানো থেকে বেঁচে থাকো। কেননা লুঙ্গি ঝুলানো অহংকারের অন্তর্ভুক্ত।
এবং তাবারানীতে (হা.৭৯০৯) আবু উমামার বর্ণনা দ্বারাও উক্ত বিষয়টি সুদৃঢ় হয়। তিনি বলেন, আমরা নবীজীর কাছে ছিলাম ইতিমধ্যে আমর ইবনে যুরারা রা. আমাদের কাছে একটি লুঙ্গি এবং চাদর ঝুলিয়ে আসলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাপড় ধরতে লাগলেন এবং আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশ করতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন- اللَّهُمَّ عَبْدُكَ، وَابْنُ عَبْدِكَ، وَابْنُ أَمَتِكَ হযরত আমর ইবনে যুরারা শুনতে পেয়ে নবীজীর দিকে ফিরে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পায়ের নলা শক্ত। নবীজী বললেন, হে আমর ইবনে যুরারা! আল্লাহ তাআলা তার সকল মাখলূককে সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন। হে আমর ইবনে যুরারা! আল্লাহ তাআলা কাপড় ঝুলন্তকারীদেরকে পছন্দ করেন না।’’

দেখুন, এটা তো সুস্পষ্ট সাহাবী আমর ইবনে যুরারা অহংকার ছাড়াই টাখনোর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে ছিলেন তথাপি নবীজী কাপড় উঠাতে বলেছেন এবং বলেছেন, আল্লাহ তাআলা কাপড় ঝুলন্তকারীদেরকে পছন্দ করেন না। বুঝা গেল অহংকার না থাকলেও কাপড় ঝুলানো নিষেধ।
শায়খুল ইসলাম আল্লাম তাক্বী উসমানী দা. বা. বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন-
‘‘টাখনোর নিচে কাপড় ঝুলানো হারাম হওয়ার মূল কারণ তো অহংকার যেমন হাদীস শরীফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু অহংকার প্রমাণিত হওয়া একটি লুকায়িত বিষয় অনেক সময় অহকারে আক্রান্ত ব্যক্তি অবগত হতে পারে না তাই অহকারের সববকে ইল্লতের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। আর এটা হচ্ছে কাপড় ঝুলন্ত করা। (অর্থাৎ কাপড় ঝুলন্ত করাই তার অহংকার আছে একথার প্রমাণ বহণ করে) এটা সফরের কসর পড়ার মতো। কেননা কসরের ইল্লত হচ্ছে ‘মুশক্কত’ (কষ্ট)। কিন্তু ‘মুশক্কত’ একটি অস্পষ্ট বিষয়, কোনো নিয়ম-নীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রন করা যায় না। তাই সববকে (সফর) ইল্লতের (মুশক্কত) স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। এহিসেবে যখনই কাপড় ঝুলন্ত করা পাওয়া যাবে নিষেধাজ্ঞা আসবে। তবে অনিচ্ছার অবস্থা ভিন্ন। কেননা তখন অহংকার না থাকা নিশ্চিত। কারণ অহংকার এমন কাজের দ্বারা প্রমাণিত হয় না যাতে বান্দার কোনো এখতিয়ার নেই। এ দিক বিবেচনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর রা. কে অনুমতি দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যারা অহংকারের কারণে ঝুলিয়ে রাখে।’’ (তাকমিলায়ে ফাতুল মুলহিম:৪/১০৭-১০৮)
শায়খুল ইসলামের উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা সব প্রশ্ন এবং সন্দেহ নিরসন হয়ে যয়।
৫.
উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, কাপড় ঝুলিয়ে রাখাই অহংকার আছে একথার প্রমাণ বহণ করে। তাই একথা বলার সুযোগ নেই আমার মধ্যে অহংকার নেই তাই নিষেধাজ্ঞাটি আসবে না। তথাপি যারা ঐসকল আলেমদের বক্ত্বব্যকে ঢাল বানাতে চান যারা অহংকার থাকা না থাকার মধ্যে পার্থক্য করেছেন যেমন ইবনু আব্দুল বার, নভভী, আইনী, ইবনুল মালিক, মুল্লা আলী ক্বারী। ঐসকল ভাইদের জেনে রাখা দরকার যারা পার্থক্য করেছেন তারা একথা বলেননি যে, অহংকার না থাকলে ঝুলিয়ে রাখতে কেনো অসুবিধা নেই। বরং তারা বলেছেন হারাম কিংবা মাকরূহে তাহরীমী হবে না। তবে অহংকার ছাড়াও ঝুলিয়ে রাখা নিন্দনীয় এবং মাকরূহে তানযীহী। (দেখুন, আত তামহীদ: ৩/২৪৪; আল মিনহাজ:১৪/৬২; ফাতহুল বারী:১০/২৬৩-২৬৪; আল হিন্দিয়্যাহ: ৩/৩৩৩; তাকমিলায়ে ফাতহুল মুলহিম:৪/১০৫)

৬.
সারকথা: আমার মধ্যে অহংকার নেই তাই নিষেধজ্ঞাটি আমার ক্ষেত্রে আসবে না, একথা বলে কাপড় ঝুলিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই।


কোরবানীর দিনে নখ-চুল কাটার আদেশ কি শুধু কোরবানী দাতার জন্য!

কোরবানী দাতার জন্য জিলহজ্ব মাস শুরু হওয়ার পর নখ-চুল কাটা থেকে বিরত থাকা এবং কোরবানীর পর তা কাটা উত্তম, এটা তো অনেকেরই জানা কথা। কেননা এটা সুস্পষ্ট সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
"যখন যিলহজ্বের দশক শুরু হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানী করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫২৩)
উক্ত হাদীসের উপর ভিত্তি করে ফকীহগণ কুরবানীকারীর জন্য নখ-চুল না কাটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। অবশ্য কোন কোন ফক্বীহ উক্ত হাদীসের কারণে কোরবানীর আগে নখ-চুল কাটা হারাম বলেছেন। অনেক কিতাবে হানাফী মাযহাব এর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে যে, তাদের মতে কোরবানীর আগে নখ-চুল কাটা হারামও নয় মাকরূহও নয়। এসম্পর্কে শায়খুল ইসলাম আল্লাম তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেন যে, হানাফীদের কিতাবে আমি এটা পাই নি। (তাকমিলায়ে ফাতহুল মুলহিম: ৩/৪৮৬)
তবে এ হুকুম তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে যারা যিলকদের শেষে নখ-চুল কেটেছে। অন্যথায় নখ-চুল বেশি লম্বা হয়ে যাবে যা সুন্নাতের খেলাফ।
এটা তো গেল ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা যে ব্যক্তি কুরবানী আদায় করবে। কিন্তু যে কোরবানী আদায় করবে না তার জন্য এ হুকুম প্রযোজ্য হবে কি না এ ব্যাপারে কেউ কেউ বলেছেন যে, এ হুকুম শুধুমাত্র কুরবানী দাতার জন্য প্রযোজ্য। আর কেউ কেউ বলেছেন, কুরবানী যারা করবে না তাদের জন্যও এই বিধান।
তারা দলীল হিসেবে হযরত আমর ইবনুল আস রা. এর হাদীসকে পেশ করেন। তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে কুরবানীর দিবসে ঈদ (পালনের) আদেশ করা হয়েছে। যা আল্লাহ এ উম্মতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। এক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানিহা থাকে (অর্থাৎ অন্যের থেকে নেওয়া দুগ্ধ দানকারী উটনী) আমি কি তা কুরবানী করতে পারি? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। তবে তুমি চুল, নখ ও মোঁচ কাটবে এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর দরবারে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৩৬৫; মুসনাদে আহমদ: ১১/১৩৯; সহীহ ইবনে হিব্বান:১৩/১৬৩; মুসতাদরাকে হাকীম: ৪/২২৪)
হাদীসটির মান:
শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ. উক্ত হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। (দেখুন যয়ীফু আবু দাউদ, হা. ৪৮২; মিশকাতুল মাসাবীহ, হা. ১৪৭৯)
তিনি বলেছেন-
وهذا اسناد ضعيف عندي، رجاله ثقات؛ غير الصدفي؛ فإنه لم يوثقه فيما ذكروا غير ابن حبان.
এই হচ্ছে তাঁর বক্তব্য তিনি দুর্বলতার কারণ হিসেবে ঈসা ইবনে হেলাল আস সাদাফীর এর জাহালতকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেন যে ইবনে হিব্বান রহ. ছাড়া অন্য কেউ তার তাওসীক করেন নি।

এটা শায়খ রহ. এর তাসামুহ ছাড়া আর আর কি বলা যেতে পারে। সম্ভবত তিনি আবু ইয়া’কুব ফাসাওয়ী রহ. এর তাওসীক সম্পর্কে অবগত হতে পারেন নি, নতুবা তিনি এমন বলতেন না। কেননা ফাসাওয়ী রহ. তার আল মা’রেফা ওয়াত তারীখ গ্রন্থে (২/৪৮৭) মিসরের নির্ভরযোগ্য তাবেয়ীনদের আলোচনা শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে (২/৫১৫) সেই নির্ভরযোগ্য তাবেয়ীদের মধ্যে এই সাদাফী’র নাম উল্লেখ করেন।
এছাড়া মিশরের প্রসিদ্ধ পাঁচ ব্যক্তিত্ব এই সদফী’র কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তারা হলেন-১.আইয়াশ বিন আব্বাস আল কিতবানী ২.কা’ব বিন আলকামা ৩.ইয়াযীব ইবনে আবী হাবীব ৪.দাররাজ আবুস সামাহ ৫.আব্দুল মালেক বিন আব্দুল্লাহ আত তুজীবী। (দেখুন, আস সিকাত, ইবনে হিব্বান: ৫/২১৩; জখীরুতুল উক্ববা শরহুল মুজতাবা: ৩৩/২৮৩) 
সুতরাং তাকে মাজহুল বলা ঠিক নয়।

হাফেজ ইবনে হাজার রহ. তাঁর আত তাকরীব এ সাদাফীকে ‌‘সাদূক’ বলেছেন। এছাড়া ফাতহুল বারীতে (১০/৮) তিনি অন্য এক আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, এ বিষয়ে আমর ইবনুল আস এর হাদীস দিয়ে দলীল দেয়া যায় অত:পর উপরোক্ত হাদীসকে উল্লেখ করে ইবনে হিব্বানের তাসহীহের কথা উদ্ধৃত করেন।
আর হাকীম রহ. হাদীসের সনদকে সহীহ বলেছেন হাফেয যাহাবী রহ.ও এতে একমত হয়েছেন। (আল মুসতাদরাক: ২/২২৪)
শায়খ আলবানী রহ. এর সমসায়িক আলেম শায়খ শুআইব আল আরনাউত উক্ত হাদীসের সনদকে মুসনাদে আহমদে (১১/১৩৯) হাসান বলেছেন আর সহীহ ইবনে হিব্বানে (১৩/১৬৩) সহীহ বলেছেন।
সারকথা: উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেল যে, হাদীসটি নির্ভযোগ্য।
উক্ত হাদীসে যেহেতু কুরবানীর দিন চুল-নখ কাটার কথা আছে তাহলে এর আগে না কাটার দিকে ইঙ্গিত বুঝা যায়। কিন্তু কতদিন আগে থেকে কাটবে না? যেহেতু কোরবানী দাতাকে জিলহজ্বের শুরু থেকে কাটা বন্ধ করতে বলেছেন এর উপর কিয়াস করে বলা যায় তার ক্ষেত্রেও এমনই হবে। এটা শুধু ধারণা বা কিয়াস নয় বরং এর সমর্থনে বিভিন্ন আসারও পাওয়া যায়। যেমন-
১.ওলীদ বিন মুসলিম বলেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আজলানকে যিলহজ্বের দশকে চুল কাটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, আমাকে নাফে রাহ বলেছেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এক নারীর নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। মহিলাটি যিলহজ্বের দশকের ভেতর তার সন্তানের চুল কেটে দিচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, যদি ঈদের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে তবে বড় ভাল হত। (মুস্তাদরাকে হাকেম,হাদীস ২/২২১)
২.মুতামির ইবনে সুলাইমান আততাইমী বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি যে ইবনে সীরীন রাহ. যিলহজ্বের দশকে চুল কাটা অপছন্দ করতেন। এমনকি এই দশকে ছোট বাচ্চাদের মাথা মুণ্ডণ করাও অপছন্দ করতেন। (মুসনাদে মুসাদ্দাদ-ইতহাফুল খিয়ারাহ: ৫/৩১১; আল মাতালিবুল আলিয়া: ১০/৪৪৮)
এসব দলীলের কারণে কারো কারো মতে সকলের জন্যই যিলহজ্বের প্রথম দশকে নখ, গোফ ও চুল না-কাটা উত্তম। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, এ বিধানটি কুরবানিদাতার জন্য তাকিদপূর্ণ সুন্নত। তার জন্য এই অামল অন্যের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।