বুধবার, ৮ জুলাই, ২০১৫

শহীদ জননী এক.

শহীদ জননী
এক.
উম্মে হানি বসে আছেন বাড়ির ছোট্ট আঙ্গিনায়। গল্প বলছেন, জীবনের গল্প। জীবনের গল্পে তো আনন্দ-বেদনার মিশেল থাকে, কিন্তু তার গল্পে আছে শুধু বেদনা, শুধু অশ্রু এবং শুধু রক্তের ঘ্রাণ। তাকে ঘিরে আছে সন্তানরা। দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলের নাম হানি।
'১৯৭২ সালে আমরা থাকতাম এই ছোট্ট কুটিরেই। আমি, তোমাদের আব্বু—মাহমুদ আবু হাম্মাম এবং তোমরা। হানি'র বয়স যখন নয় মাস, তখনই আমাদের ঘরে ইহুদী সৈন্যরা হানা দিয়েছিলো। ওরা তো মানুষ নামের জন্তু। হিংস্রতায় জন্তুকেও হার মানায়। যে ঘরেই হানা দেয় সে ঘরেই তাণ্ডব চালায়। মুহূর্তেই সবকিছু তছনছ করে দেয়। ওরা ঢুকতেই তোমাদের আব্বু ওদেরকে বাধা দিলেন। রুখে দাঁড়ালেন। তখন একটা সৈন্য লোহার বাট দিয়ে তার মাথায় সজোরে আঘাত করলো। তিনি মারাত্মক আহত হলেন।'
থেমে গেলেন উম্মে হানি! দরদর করে অশ্রু পড়তে লাগলো! আঁচলচাপা দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেন তিনি। আবার বলা শুরু করলেন—
'আঘাত ছিলো প্রচণ্ড। সাথে সাথে তিনি লুটিয়ে পড়লেন! ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগলো। রক্তে সব ভেসে গেলো। আমি চিৎকার করে উঠলাম। চিৎকার শুনে প্রতিবেশিরা ছুটে এলো। দ্রুত এ্যম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাঁকে হাসপাতালে নেয়া হলো। যে কামরাটায় তার চিকিৎসা চলছিলো, আমি নিথর দাঁড়িয়েছিলাম তার দরোজায়। মনে শঙ্কা ও আশঙ্কা— আর কি দেখা হবে না! আর কি কথা হবে না! আল্লাহ তুমি তাকে বাঁচাও! আল্লাহ তুমি সুস্থ করে তোলো!
একটু পর ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। বললেন : 'প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছে।' এই বলে ডাক্তার আবার অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি অবস্থাটা পুরোপুরি বুঝতে পারলাম না। একটু পর আবার দেখলাম ভদ্রলোকটি বেরিয়ে এলেন। তার অবস্থার ভাষা বলছিলো : 'আপনার স্বামী চলে গেছেন!' আমি আর সইতে পারলাম না। ভিতরটা হাহাকার করে উঠলো। ভিতরটা এক ভয়াবহ শূন্যতায় ভরে গেলো। শোকে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ইহুদীদেরকে অভিশাপ দিতে লাগলাম।'
মা বলে যাচ্ছিলেন। ছেলে মেয়েরা শুনছিলো। মায়ের অশ্রু ও দুঃখের সাথে ওদের অশ্রু ও দুঃখও মিশে গেলো। হানি তো তখন অনেক ছোট ছিলো। মাত্র ন' মাস। বাবার কথা ও শুনেছে শুধু মায়ের মুখেই। কতোবার শুনেছে। শুনতে শুনতে ইচ্ছে করেছে বাবাকে কাছে পেতে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে। বাবার কথা ভাবতে-ভাবতে এবং মায়ের কাছে শুনতে-শুনতে বাবার একটা সুন্দর ছবি গেঁথে গেছে ওর মনে। চোখ বন্ধ করলেই এখন বাবাকে দেখতে পায়। বাবা যেনো ওর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসেন আর বলেন : 'হানি! বড় হও, মানুষ হও! মানুষের মতো মানুষ হও! ইহুদীদের মতো অমানুষ হয়ো না!'
হানি গরম নিঃশ্বাস ফেলে বাবাকে স্মরণ করে। মনে মনে বলে : 'বাবা! একটু বলবে, কোন্‌ ইহুদীর বাচ্চাটা তোমাকে মেরেছিলো? আমি প্রতিশোধ নেবো! কঠিন প্রতিশোধ!'
হানি'র কচি হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়। পাথরকণার দিকে ওর দৃষ্টি চলে যায়। একেকটা পাথরকণাকে মনে হয় একেকটা বিধ্বংসী গোলা।
সব ফিলিস্তিনী শিশু কিশোরের চোখেই এইসব পাথরকণা মূল্যবান। কেননা এগুলো দিয়ে ইহুদী সৈন্যদেরকে তাড়া করা যায়। পাথরকণার গুঁড়ি বৃষ্টিতে 'সিক্ত হয়ে' ওরা যখন পালিয়ে যায়, তখন মনে হয় এক পাল নেড়ি কুত্তা পালিয়ে যাচ্ছে ধাওয়া খেয়ে!
দুই.
কঠিন জীবন সংগ্রামের মুখোমুখি উম্মে হানি। মাথার উপর আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ছায়া নেই। ছেলেমেয়েকে মানুষ করতে হবে। আয়-রোজগারের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। নিজের লেখাপড়া কিছুই করা হয় নি। পরাধীন ফিলিস্তিনে লেখাপড়া করা ক'জনের পক্ষে সম্ভব? সব জায়গায় ওঁৎ পেতে আছে ইহুদী সৈন্যরা। যখন তখন যেখানে সেখানে ঝেঁপে পড়ছে। এদের হিংস্র তাণ্ডবে ফিলিস্তিনীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। আজ এ মায়ের বুক খালি হলে কাল ও মায়ের বুক খালি হচ্ছে। অমানবিক নিষ্ঠুরতায় ইহুদীরা নিরপরাধ ফিলিস্তিনীদেরকে পাখির মতো গুলি করে করে মারছে। উম্মে হানি অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনীদের সেবা করার জন্যে গাজার একটা হাসপাতালে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
তিন.
এভাবেই এই শহীদ পরিবারের চাকাটা আস্তে আস্তে ঘুরতে লাগলো। মেয়েরা বড় হতে লাগলো। উম্মে হানি'র 'স্বপ্ন'—হানিটাও বড় হতে লাগলো। এখন ও গাজা'র একটা মাদরাসায় পড়ে। মা দেখেন, একটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হানি মাদরাসায় যাচ্ছে আবার ক্লাস শেষে ফিরে আসছে। দেখতে কী ভালো লাগে! ছেলের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নের ভুবনটাকে বড় করেন। সেখানে সুন্দর সুন্দর আশা নির্মাণ করেন। তার স্বপ্ন একদিন বাস্তব হবে। হানি একদিন বড় হবে। লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। কবরে বসে শান্তি পাবেন বাবা। দুনিয়ায় বসে চোখ জুড়াবেন মা।
হানি শিক্ষার প্রাথমিক স্তর শেষ করে দ্বিতীয় স্তরে উপনীত হয়েছে। মা'র স্বপ্নের ভুবনটা আরেকটু বড় হয়। সেখানে সবুজ সবুজ কিশলয় দেখা দেয়! ডালে ডালে ফুলকলিরা ফোট ফোট হয়ে তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসে!
উম্মে হানি কল্পনায় এ-সব ভাবেন আর আনন্দে সাঁতার কাটতে থাকেন। হে আমার স্বপ্ন! কাছে এসো! বাস্তব হয়ে আলো ছড়াও! স্বাধীন ফিলিস্তিনের শামিয়ানার শীতল ছায়ায় আমাদেরকে একটু জায়গা দাও!
চার.
হানি সমুদ্রঘেঁষা তাঁবু পল্লী'র ছোট ছোট গলিপথে ঘুরে বেড়ায়। এখানে এক দু'জনের বেশি এক সঙ্গে চলাই মুশকিল। একেবারে ঘুপচি গলি। ঘিঞ্জি এলাকা। তবুও এ-সব এখন গা-সওয়া গেছে। চোখ মেলেই তো এ-সব দেখে চলেছে ওরা। এখানেই শিশুরা ছুটে বেড়ায়। দৌড়াদৌড়ি করে। নানা রকমের খেলা নিয়ে মেতে ওঠে। ওদের কাছে সবচে' প্রিয় খেলাটা হলো— গাজা'র সমুদ্র তীরের বিস্তীর্ণ বালির বুকে বালি-ঘর বানানো। এই খেলনা ঘরকে ওরা 'এই প্রাসাদ' 'সেই প্রাসাদ' নাম দিয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হাসে। সে হাসিতে যেনো রুপালি আভা ছড়ায় সমুদের জলরাশি। তাবুপল্লীর এই বঞ্চিত শিশুরা এ-সব খেলনা প্রাসাদে কী খুঁজে ফিরে? হারানো ফিলিস্তিন?
এমনও হতে পারে যে, তাঁবুপল্লীর ছোট্ট ঘরে থাকতে থাকতে ওদের বিরক্তি ধরে গেছে । তাই বালির বুকে বড় বড় প্রাসাদ গড়ে ওরা মনের আশ মেটায়। বালির বুকে এই 'প্রাসাদ প্রাসাদ' খেলা হানি'রও খুব প্রিয়। বন্ধুদের সাথে এখানে ওর অনেক মধুর সময় কাটে।
পাঁচ.
একদিন হানি বন্ধুদের সাথে বসে আছে। চুপচাপ, কোনো কথা বলছে না। নীরবে তাকিয়ে আছে সমুদ্রের নিস্তরঙ্গ জলরাশির দিকে। এক বন্ধু হানিকে মৃদু ধাক্কা দিলো। বললো :
— অমন গম্ভীর হয়ে কী ভাবছো, হানি?
হানি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো :
— শিশুদের চোখের দিকে আমি তাকাতে পারি না! ওদের চোখে যেনো হাজার হাজার দুঃখ-পাখি ডিম পেড়ে রেখে গেছে। তাই ওরা তাকালেই যেনো সামনে দেখতে পায় দুঃখ। ওরা ঘুমোলেও স্বপ্নে দেখে কেবল দুঃখ। ওদের হাসিও দুঃখঘেরা। ওদের কণ্ঠও কান্নাভেজা। বর্তমান ওদের দুঃখঘেরা, ভবিষ্যতও ওদের দুঃখে-ছাওয়া। দুঃখ যেনো ওদের উত্তরাধিকার। বাবার কাছ থেকে ছেলে পেয়েছে। ছেলের কাছ থেকে ছেলে পাবে, নাতিরা পাবে। আমরা কি এভাবেই দুঃখের কাছে পরাজিত হবো, হেরে যাবো?
এক বন্ধু জানতে চাইলো :
— হানি! বলেছো তো আমাদের মনের কথাটিই। কিন্তু এ থেকে উত্তরণের পথ কী? এ-সবের সমাধান কী?!
— সমাধান হলো আরো রক্ত! বুকের তাজা রক্ত!! রক্ত ছাড়া মুক্তি মিলবে না! কোনোদিনই ফিলিস্তিন আযাদ হবে না। গাজা নামের এই বড় কারাগারটাতেই আমাদেরকে বন্দি থাকতে হবে। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর।
— কেনো, 'ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা' তো কাজ করছেই!
— রাখো তোমার .. সংস্থা! তুমি ভালো করেই জানো, সংস্থাটা এখন আর মুক্তি সংস্থা নেই। এখন শুধু আরাম-আয়েশ চায়। বিলাসিতায় তার দেহ এখন ভারি। চলতেই পারছে না। আজ এ চুক্তি। কাল ও চুক্তি! এ-সব চুক্তি করে কী লাভ? তাও আবার এই বজ্জাত ইহুীদের সাথে? ওরা কি চুক্তিতে বিশ্বাস করে? চুক্তির আড়ালে ওরা লুকিয়ে রাখে শুধুই অবিশ্বাস আর দুশমনি।
................

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন