বুধবার, ৮ জুলাই, ২০১৫

শহীদ জননী (২)

শহীদ জননী (২)
ছয়.
১৮.০৩.৮৮ তারিখে হামাস-এর পক্ষ থেকে একটি ঘোষণা ছাপা হয় পত্রিকায়। সেখানে বলা হয়্—
'আজ হৃদয়ে রক্তক্ষরণের দিন। এইদিনে উত্তর গাজা'র একটি মসজিদে ঘৃণ্য অভিযান চালিয়েছিলো ইহুদী সৈন্যরা। নষ্ট করেছিলো মসজিদের সম্মান ও পবিত্রতা। আজ শুক্রবার উক্ত মসজিদে জুমা আদায়ের পর এক প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত মিছিলে অংশ গ্রহণ করে আওয়াজ তুলুন্— হে অভিশপ্ত ইহুদীরা! আমাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ এখনো বন্ধ হয় নি। তোমাদের অপকর্ম আমরা ভুলি নি! কোনোদিন ভুলবো না!'
হানিও পড়লো সংবাদটা। পড়ে নিজের ভিতরে অদ্ভুত এক তোলপাড় অনুভব করলো। ওর ভিতর থেকে যেনো ভেসে আসছে— হানি! তোমাকেও যেতে হবে! মসজিদের সেই ভাঙা দেয়াল তোমাকে ডাকছে! ওখানে লুটিয়ে পড়া রক্তাক্ত শহীদান তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, যাবে না?!
হানি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। ও এ-আহ্বানে সাড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে! জুমা'র আগে ভালো করে গোসল করে! তারপর নতুন জামা পরে মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে!
ষোল বছরের হানি এগিয়ে চলেছে মজলুম মসজিদের দিকে— অপমানের প্রতিবাদ জানাতে। ইহুদীদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্ষোভ বুকে নিয়ে। এই মুহূর্তে চোখে ভাসছে বাবা'র ছবিটা। বাবা যেনো ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। ওর এ-পথচলাকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তার সামনে আরো ভাসছে জান্নাতের ছবি! শহীদরা তো জান্নাতে সবুজ পাখি হয়ে উড়ে বেড়ায়! ও কি পারবে জান্নাতের সবুজ পাখি হতে? আরেকটা ছবি এখন ভাসছে ওর চোখের সামনে। মায়ের ছবি! কী কষ্ট করেন মা সারাটা দিন হাসপাতালে— শুধু ওদের একটু আরামের জন্যে! হানির দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে!
সাত.
অনেক বড় মিছিল। লোকে লোকারণ্য। আজকের এ মিছিলকে ঘিরে দখলদাররা ছিলো ভীষণ সতর্ক। ওরা মসজিদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিলো, প্রচুর সংখ্যায়। তবু দামাল ফিলিস্তিনীদের চোখের দিকে তাকাতে ওরা ভয় পাচ্ছিলো। কী জ্বলন্ত দৃষ্টি! একেকটা যেনো অগ্নিগোলা! সংঘর্ষের প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছিলো। শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ বেধেই গেলো। হানি ছিলো একেবারে সামনে। বুক চেতিয়ে বীরের মতো সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সশস্ত্র ইহুদী সৈন্যদেরকে ও একদম ভয় পাচ্ছিলো না। 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি তুলে হানি সবাইকে সামনে বাড়তে বলছিলো। ওর চেহারা লালচে দেখাচ্ছিলো। যেনো শাহাদতের ‘লাল’ এসে ভিড় করেছিলো সারা মুখাবয়বে! ইহুদীরা বিপদ টের পেয়ে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করতে লাগলো। প্রথমে এলোপাথাড়ি তারপর সরাসরি মিছিলে! 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি আর গোলাগুলির শব্দে গাজা'র আকাশ বাতাস কেঁপে উঠতে লাগলো বারবার।
আট.
হঠাৎ হানি গুলিবিদ্ধ হলো! গুরুতর আহত হলো! ফিনকি দিয়ে বইতে লাগলো রক্ত! সবাই ধরাধরি করে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। হানি'র দিকে এগিয়ে আসছিলো কি শাহাদতের ভাগ্য? পূরণ হচ্ছে কি সবুজ পাখি হওয়ার সবুজ স্বপ্ন?!
খবর পেয়ে মা ছুটে এলেন হানি'র কাছে। কেঁদে উঠলেন ডুকরে ডুকরে! ডাক্তার তাকে আশ্বাসবাণী শোনালেন। বললেন :
— আশা করছি ও সেরে ওঠবে, রক্তক্ষরণটা একটু বেশি! আপনি পেরেশান হবেন না! সবর করুন!
উম্মে হানি এবারও ডাক্তারের কথা বুঝতে পারলেন না!
একটু পর ডাক্তারকে আবার আসতে দেখা গেলো! উম্মে হানি’র ভিতরটা কেঁদে উঠলো! ডাক্তার কিছুক্ষণ নীরব থেকে শান্ত গলায় উচ্চারণ করলেন :
— হানি এখন শহীদ! আপনি শহীদ জননী!!
একই দৃশ্য! আগে বাবা, এখন ছেলে!!
হে আল্লাহ! উম্মে হানিকে ধৈর্য দাও!
নয়.
উম্মে হানি আবার শোকে শোকে পাথর হয়ে গেলেন। এক শহীদ জননী হিসাবে আত্মিক তৃপ্তিটুকু ছাড়া বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন রইলো না তার সামনে! হানি'র বন্ধুরা এর মধ্যেই হানিকে দ্রুত হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করলো। কেননা ইহুদীরা হাসপাতালে চলে আসতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। অপমান করতে পারে হানি'র লাশ।
কিছুক্ষণের ভিতরেই তারা হানিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হলো সমুদ্র তীরের তাঁবুপল্লীতে। কিন্তু জালিমরা ততোক্ষণে জেনে ফেলেছে হানি'র সংবাদ। তারা এসে তাঁবুপল্লী ঘেরাও করে ফেললো। আবার শুরু হলো ভয়াবহ লড়াই। হানি সাধারণ কোনো যুবক ছিলো না। ও ছিলো ইহুদীদের মাথা ব্যথা। তাই ওকে ঘিরে এই তাণ্ডব। ওরা চেয়েছিলো হানিকে হত্যা করতে। পেরেছে। কিন্তু তার লাশকে অসম্মান করতে পারে নি! ফিলিস্তিনের দামালরা তার লাশের ইযযত রক্ষা করেছে!
ইহুদীরা কয়জনকে হত্যা করবে? লক্ষ লক্ষ তরুণ যুবক শহীদ হতে প্রস্তুত! ইহুদীদের চোখে যা হত্যা, হানিসহ সব ফিলিস্তিনীর চোখেই তা গরবের মৃত্যু, শহিদী মৃত্যু। এ মৃত্যুর জন্যে ফিলিস্তিনের প্রতিটি মুসলমানই ইহুদীদের সাথে লড়াই করে শহিদী তামান্না বুকে নিয়ে। শহিদী মৃত্যু কী দামী এবং তা এই সব যুবকদের কাছে কী কাম্য— তা কী করে বুঝবে এই অভিশপ্ত ইহুদীরা?! বানর শূকরের এইসব উত্তরসুরিরা?!
দশ.
হ্যাঁ, এখান থেকেই শুরু হয়েছিলো ফিলিস্তিনের প্রথম ইন্তেফাদা। এ ইন্তেফাদার ঢেউয়ে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল কবেই ভেসে যেতো। কিন্তু দেশী-বিদেশী কতিপয় গাদ্দারদের কারণে আজো তা সম্ভব হয় নি। ইন্তেফাদা আজো চলছে। ফিলিস্তিনের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিতা না হওয়া পর্যন্ত এ ইন্তেফাদা বন্ধ হবে না। এ ইন্তেফাদা বন্ধ না হওয়ার আরেকটা কারণ হলো, ফিলিস্তিনীরা রক্ত ঢালতে ভয় পায় না। এক তরুণ শহীদ হলে হাজার তরুণ এগিয়ে আসে। এ জন্যে সাতষট্টি বছরের ইতিহাসে বারবার চেষ্টা করেও ইহুদীরা ফিলিস্তিনের দামাল ছেলেদেরকে কাবু করতে পারে নি। এক হানি’র জায়গা পূরণ করছে হাজারো হানি! বিধ্বংসী টেংক-কামান ও সাঁজোয়া যান নিয়ে কতোবারই তো ওরা এদের উপর হামলে পড়েছে! বারবারই মনে হয়েছিলো— এবার বুঝি হামাসের কোমর ভেঙে পড়ছে! ফিলিস্তিনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে! কিন্তু না, ফিলিস্তিন শেষ হয় নি! প্রতিবারই ফিলিস্তিন জ্বলে উঠেছে! প্রতিবারই ছোট ছোট পাথরকণা আর সেকেলে বন্দুক রাইফেলের ধাওয়া খেয়ে ইহুদীরা পালিয়েছে!
এগার.
উম্মে হানি এক সময় ছেলের শোক ভুলে যান। আবার ফিরে আসেন স্বাভাবিকভাবে কাজের ময়দানে—হাসপাতালে। সেবা করে যান অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনীদের। এরাই এখন তার স্বামী-সন্তান। এখানে বসে বসেই উম্মে হানি স্বপ্ন দেখেন— স্বাধীন ফিলিস্তিনের। হাসপাতালে আসা-যাওয়ার পথে যখনই কোনো মিছিল তার চোখে পড়ে, তখন নিজের অজান্তেই থমকে দাঁড়ান। মিছিলের ভিড়ে তিনি খুঁজে ফিরেন হানিকে! ঝাঁঝালো মিছিলের মুখে যখন ভেসে আসে গগনবিদারি শ্লোগান—
الله غايتنا .....والرسول قدوتنا
والقران دستورنا
والجهاد سبيلنا
والموت في سبيل الله اسمى امانينا
আল্লাহ আমাদের লক্ষ্য
রাসূল আমাদের আদর্শ
কুরআন আমাদের সংবিধান
জিহাদ আমাদের পথ
আল্লাহর পথে জীবন বিলিয়ে দেয়া আমাদের শ্রেষ্ঠ চাওয়া!
তখন উম্মে হানি’র মন কেঁদে ওঠে! চোখ নেমে আসে ‘শ্রাবণধারা’! অনেকক্ষণ ধরে তিনি তাকিয়ে থাকেন মিছিলটার দিকে! মনে হয়্— এরা সবাই যেনো হানি!!
=================================================
শ্রাবণধারা : ইচ্ছে করেই আমাদের দেশের এই প্রিয় শব্দটা ব্যবহার করলাম, এখন আকাশ অবিরাম কাঁদছে! একটু যোগসূত্র সৃষ্টি করলে যদি মহিয়সী উম্মে হানিকে স্পর্শ করা যায়, কেনো করবো না?!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন