বুধবার, ৮ জুলাই, ২০১৫

সিরিজ : ফিলিস্তিনের পাথরশিশু ক্ষুদে বীর- ১

সিরিজ : ফিলিস্তিনের পাথরশিশু
ক্ষুদে বীর- ১
এক.
সমুদ্র ঘেষা গাজা শহরটি যেনো ফিলিস্তিনের রানী। ইসরাঈলী বিমান আক্রমণের আশঙ্কা না-থাকলে সমুদ্রের পাড়ে শিশু-কিশোর ও অন্যদের ভিড় লেগেই থাকে। শুধু সমুদ্রতীর বলেই কথা না, সুযোগ পেলেই শিশু-কিশোররা গাজার মাঠে ময়দানে এসে জড়ো হয়। কথা বলে। ঠিকমত ক্ষেতে না-পারার কষ্টের কথা। ঠিকমত মাদরাসায় যেতে না-পারার কষ্টের কথা। প্রিয়জন হারানোর বেদনার কথা। কর্মস্থল থেকে হঠাৎ বাবা’র আর ফিরে না-আসার কথা। নিরানন্দ ঈদের কথা। আরো কতো কথা। মাঝে মাঝে কথা ওঠে পাথর নিয়ে। পাথর সঞ্চয় করে রাখার কৌশল নিয়ে। কার কাছে কী পরিমাণ পাথর রাখা আছে— ওঠে সে কথাও। পাথর নিয়ে ওদের আলোচনা শুরু হলে শেষ হতে চায় না যেনো। ইসরাঈলী সৈন্য চোখে পড়লে ওদের মুখোমুখি হয় ওরা— এই পাথর নিয়েই। মাথা উঁচিয়ে .. বুক চেতিয়ে দখলদার সৈন্যদের সামনে দাঁড়াতে ওরা জীবনের কোনো মায়া করে না। শুধু পাথর হাতে একটা ধ্বংসাত্মক টেংককে চ্যালেঞ্জ করতেও ওদের বুক একটু কাঁপে না। এ দৃশ্য সকালের ¯িœগ্ধতা-ছড়ানো সূর্যি যেমন দেখে চলেছে তেমনি দেখে যাচ্ছে ফিকে আলোর অস্তাচলগামী লালিমা-ছড়ানো সূর্যি। আরো দেখছে ফিলিস্তিনময় ছড়ানো ত্বীন-যাইতুনের সারি। এ সবের নীরব সাক্ষি আহত আল আকসা। ঐতিহাসিক কুব্বাতুস সাখরা।
দুই.
গাজা’র একটা উন্মুক্ত মাঠের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে একদল শিশু। শিশুই সব। সবচে’ বড় শিশুটির বয়সও দশ পেরুবে না। ওরা বেশ উত্তেজিত। পাড়ায় ডাকাত পড়লে যে-উত্তেজনায় মানুষ যার যা আছে তা-ই নিয়ে বেরিয়ে আসে, ওরাও ঠিক সেভাবে হাতে পকেটে পাথর নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে ইহুদী সৈন্যদেরকে ধাওয়া করতে। গায়ে গতরে বা রক্তে মাংসে ওরা তো ষোলভাগ শিশু। কিন্তু এখন ওদেরকে ঠিক শিশু মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে একেকটা যেনো সিংহ-শার্দুল। এ দৃশ্য গাজায় নতুন না। ইন্তিফাদা শুরু হওয়ার পর থেকেই শিশুরা অনুপ্রবেশকারী ইহুদীদেরকে দেখলেই তাকবীর ধ্বনি দিয়ে পাথর যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে। এ দৃশ্যের সবচে’ মজাদার পর্বটি কি বলতে পারো? সে হলো— শিশুদের পাথরবৃষ্টির ঘাই খেতে-খেতে ভীত-সন্ত্রস্ত ইহুদী সৈন্যদের পড়ি-মরি করে সাঁজোয়াযানের দিকে ভু-দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া! এ দৃশ্যটা আসলেই দৃষ্টিনন্দন। উড়ে এসে জুড়ে-বসা দখলদারদের অমন ভাগুড়া ছবি সত্যি স্বাধীনতা-হারানো ফিলিস্তিনীদের কাছে অনেক মজার, অনেক কাক্সিক্ষত। তুমি ফিলিস্তিন ছাড়া অমন দৃশ্য আর কোথাও খুঁজে পাবে না। যখন থেকে ইন্তিফাদা শুরু হয়েছে তখন থেকেই ক্ষুদে ক্ষুদে শিশুরা পাথরশিশু হয়ে গেছে। শক্ত কঠিন পাথরের পরশে (সং¯্রবে) ওদের ¯িœগ্ধ-কোমল মোলায়েম হাতগুলো পাথরের মতোই শক্ত হয়ে গেছে। হাতে পাথর। বুকপকেটে পাথর। স্কুলব্যাগে পাথর। ঘরের ঐ কোণটায়ও পাথর। শুইতে যায় ওরা যে-বালিশটায়, তার নিচেও পাথর। মা-বাবা’র অলক্ষ্যে আরো কতো জায়গায় ওরা লুকিয়ে রাখে কতো পাথর! এভাবেই পাথরের সাথে গড়ে উঠেছে ওদের বন্ধু-বন্ধু ভাব। পাথর ধরতে-ধরতে ওদের হাতই শুধু শক্ত হয় নি, পাথরের সাথে থাকতে-থাকতে ওদের মনও এক রকম পাথর হয়ে গেছে। আত্মীয় ও আপন হারানোর বেদনায় এখন আর ওরা আগের মতো ব্যথিত হয় না। অশ্রু ঝরায় না। শোক ছাপিয়ে সামনে চলে আসে ক্ষোভ। ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় প্রতিশোধ-স্পৃহা। সেই স্পৃহায় জ্বলতে থাকে ওদের চোখে ক্ষোভের দাবানল। শহিদী লাশের পাশে দাঁড়িয়ে সেই জ্বলজ্বলে দীপ্ত অনলময় চোখে ওরা তাকায় একবার রক্তাক্ত লাশের দিকে আবার তাকায় আকাশের দূর শূন্যতায় উদাস চোখে। তখন মনে হয়, ওরা আর শিশু নেই। বড় হওয়ার আগেই বড় হয়ে গেছে। মনে হয়, ‘এক সাথে খেলি আর পাঠশালে যাই’— এই বয়সটাও অনেক পেছনে ফেলে এসে হঠাৎ বড় হয়ে গেছে ওরা। বয়সটা অনেকটাই মায়ের হাতে খাওয়ার বয়স হলেও সে আর খেতে ইচ্ছে করে না। কখনো মায়ের কাছে খেতে বসলে মা আদর করে মুখে নলাটা তুলে দেয়ার সাথে সাথেই চোখে ভেসে ওঠে— অসংখ্য শিশু বন্ধুর চোখ-মুখ, যারা বুলেটে কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে—শহীদ হয়ে চলে গেছে চিরতরে! এ-সব ছবি সব সময় ভাসতে থাকে ওদের চোখের সামনে। অনুভবের সাদা ক্যানভাসে। তখন আর মায়ের আদর পেতে ইচ্ছে করে না। কারো আদর নিতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে পাঠশালার ব্যাগটায় বই না-রেখে শুধু পাথর রাখতে। ঘরের বাইরে বেরুলেই চোখ শুধু পাথর খুঁজে বেড়ায়। চোখের এই ভাষাটা পড়া গেলে মনে হয় এমন হতো—
প্রিয় ফিলিস্তিন! পাথর চাই! অনেক পাথর! না! তোমার ত্বীন-যায়তুনের ছায়ায় আর বসবো না! আরাম আর করবো না! তোমার সবুজ প্রকৃতির মায়ায় আর বাধা পড়বো না। আমরা চাই তোমার বুকের সব .. স-ব পাথর হয়ে যাক। আমাদের অ--েন-ক পাথর দরকার!
তিন.
খালেদের হাতে একটা গোলাইল। ফিলিস্তিনের শিশুদের এ-ই সেরা অস্ত্র। দখলদাররা যতো আধুনিক সমরায়োজনে পুষ্ট হয়েই আসুক এখানে, শিশুরা তার কোনো পরোয়াই করে না। এই ‘ব্যাপক বিধ্বংসী’ গোলাইলই তাদের একমাত্র অস্ত্র। এ নিয়েই ওরা দাঁড়ায়— গুলির সামনে, টেংকের সামনে, সাঁজোয়া বহরের সামনে।
খালেদ ইহুদী সৈন্যদেরকে একের পর এক নিশানা বানিয়ে যাচ্ছিলো। গোলাইল থেকে পাথর-গুলি ছুঁড়ছিলো। খালেদকে ভয় দেখাতে ওদের টেংক ও সাঁজোয়াবহর যতো সামনে আসে খালেদের সাহস ততো বাড়ে। গোলাইলের গুলিনিক্ষেপ ততো বাড়ে। খালেদের সাথে যোগ দিয়েছে অন্য বন্ধুরাও। সোহাইল হাতের পাথর শেষ করে হাত দিয়েছে ব্যাগের পাথরে। ব্যাগেও আছে অনেক পাথর। এদিকে সামির একটা ইসরাঈলী পতাকায় আগুন ধরিয়ে দিলো। ইয়াসির তখন একটা ফিলিস্তিনী পতাকা নিয়ে উঁচু একটা ভবনে তরতরিয়ে উঠে সেটি টানিয়ে দিলো, ইহুদীদের চোখের সামনেই। গাজার মুক্ত আকাশে পতপতিয়ে উড়তে লাগলো ফিলিস্তিনী পতাকা।
চার.
শত শত শিশু এভাবেই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় মেতে ওঠে গাজা’র সীমান্তঘেষা খোলা মাঠে। এ খেলাটাই ধীরে ধীরে ওদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে। গাজায় আলাদা কোনো বিনোদন পার্ক নেই। তেমন কোনো খেলার মাঠও নেই। অন্যান্য স্বাধীন দেশে খেলাধুলার কতো আয়োজন থাকে কিন্তু গাজায় তার কিছুই নেই।
প্রায় প্রতিদিনই অমন করে পাথর-যুদ্ধে শরিক হচ্ছে নতুন নতুন শিশু। যে এসে একবার যোগ দেয় সে আর না-এসে পারে না। তাকে দেখে অন্যরাও উৎসাহী হয়ে ওঠে। তারাও এসে যোগ দেয়। ছোটরা এসে দেখে বড়রা কেমন করে গোলাইল দিয়ে দখলদারদের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করছে। ভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ওরাও তখন শেখে গোলাইল কীভাবে ধরতে হয়। গুলি কীভাবে ছুঁড়তে হয়। এটিই ওদের কাছে শ্রেষ্ঠ খেলা .. সেরা বিনোদন। গাদ্দার আগ্রাসী অস্ত্রসজ্জিত কাপুরুষ ইহুদীদের দিকে বীর বিক্রমে পাথর ছুঁড়ে মারার চেয়ে আনন্দদায়ক খেলা আর কী হতে পারে!
পাঁচ.
আহমদ আজ এই প্রথম একটা মিছিলে যোগ দিয়েছে। ওর বয়স সবচে’ কম। মাত্র সাত। গুটি গুটি পা ফেলে সবার পেছনে পেছনে হাটছে। মাঝে মাঝে চেষ্টা করছে সামনে যেতে, কিন্তু গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো ছোট ছোট পায়ে কতো আর জোরে হাঁটা যায়! পেছনে থাকলেও ভীষণ ভালো লাগছে আহমদের এই পাথর-যুদ্ধ-মিছিলে যোগ দিতে পেরে। ও আগে আর কখনো দেখে নি দখলদার সৈন্যদেরকে এতো কাছ থেকে, শুধু মায়ের কাছে ভাইয়ার কাছে ওদের নিষ্ঠুরতার গল্প শুনেছে। কাপুরুষোচিত পলায়নের গল্প শুনেছে।
হঠাৎ আহমদ দেখলো ভাইয়াদের পাথরবৃষ্টির তীব্রতা ভীষণ বেড়ে গেছে এবং দখলদাররা সে বৃষ্টি মাথায় করে সাঁজোয়াবহরে করে পালিয়ে যাচ্ছে।
আহা! কী মজার দৃশ্য! মনে হচ্ছে একদল নেকড়ে যেনো তাড়া করেছে একদল মেষশাবককে!
আহমদ দেখলো ওর চাচাতো ভাই সা‘দ এক ইসরাঈলীকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মেরেছে একটা পাথর।। অব্যর্থ লক্ষ্য! গায়ে পড়তেই ইহুদীটা ‘মাগো বাবাগো’ বলে আরো জোরে দৌড় দিলো।
ছয়.
আহমদের অনেক আফসোস হচ্ছে, কেনো ও ইন্তিফাদার শুরুতেই এসে যোগ দিলো না? বন্ধুরা-ভাইয়ারা ওকে ছাড়াই কতো মিছিল করেছে একা একা! কতো পাথর ছুঁড়েছে একা একা! এ মজার খেলাটা ওকে ছাড়াই সবাই কতো খেলেছে! ইস, কেনো-যে ও আগে আসতে পারে নি!
(বাবা আহমদ! তুমি অমন করে ভাবতেই পারো! কিন্তু তোমার যোগ দেয়াটা কি সম্ভব ছিলো? তখন তো তুমি আরো ছোট ছিলে! ঠিকমত হাঁটতেই পারতে না!)
আহমদ এভাবে আফসোস করতে-করতে একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করলো। সামনেই পড়ে ছিলো একটা পাথরের টুকরো। তা-ই কুড়িয়ে নিলো। তারপর সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগলো। সুযোগ একটা এসে গেলো! ছোট্ট দেহের সবটুকু শক্তি খাটিয়ে আহমদ ছুঁড়ে মারলো পাথরের টুকরোটি! ইস! একটুর জন্যে লাগলো না ঐ ইহুদীটার মাথায়! তবুও একটা পাথর ছুঁড়তে পারার আনন্দে মনটা কেবলই দুলছিলো। মনে হচ্ছিলো, ওর ক্ষুদে জীবনে যতো আনন্দ ও খুশির মুহূর্ত এসেছে, আজকের পাথর ছুঁড়ে মারতে পারার এই মুহূর্তটিই তার মধ্যে সবচে’ সেরা!
আহমদ এখানে এই মিছিলে দাঁড়িয়েই পণ করলো— নাহ্! আর কখনো আমি বাড়িতে বসে থাকবো না! আর কখনো আমি মিছিলে অংশ নিতে ভুল করবো না। প্রতিদিন আমি আসবো! সবার সাথে আসবো! পাথর কুড়াবো! ছুঁড়বো! ওদের মাথা ‘থেঁতলে’ দেবো! না, কেউ আমাকে ফেরাতে পারবে না! মাদরাসায় যাবো! তারপর এসে আর কিচ্ছু করবো না। শুধু এখানে আসবো! এ মিছিলে এসে যোগ দেবো! মিছিলে এসে আমি ভাইয়াদের সাথে এভাবে যুদ্ধ করবো। পাথর যুদ্ধ। এ যুদ্ধই আমার বিকেলের খেলা। সেরা আনন্দ বিনোদন! .........
সাত.
হঠাৎ ছেদ পড়লো ভাবনায়। ঝড়ের বেগে একদল ইহুদী সৈন্য চলে এলো। এসেই ওদের মিছিলটার মুখোমুখি অবস্থান নিলো। তারপর মিছিলটা লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। সাথে কাঁদানে গ্যাস। রাবার বুলেট। ক্ষুদে শিশুদের মিছিলটা মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। খালেদ চীৎকার করে উঠলো:
— আহমদ! আহমদ! সাবধান! শ্বাস বন্ধ করে ফেলো! জলদি পেছনে সরে এসো! গ্যাস ঢুকলে কিন্তু তুমি বেহুশ হয়ে যাবে! সরে এসো! ডান দিকে দৌড় দাও!
শিশুরা ডানে বামে পেছনে যে যেদিকে পারলো সরে পড়লো। সবার মুখেই ধ্বনিত হচ্ছিলো— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! কেউ কেউ আওড়াতে লাগলো প্রিয় ‘যুদ্ধ সঙ্গীত’—
بالروح بالدم ..... نفديك يا فلسطين
‘ফিলিস্তিন! রক্ত লাগবে? রক্ত দেবো!
দরকার হলে তোমার জন্যে জীবনটাই বিলিয়ে দেবো!
আট.
কিন্তু আহমদ পারলো না। খালেদের কথায় সতর্ক হলেও স্থানত্যাগ সম্ভব হলো না। সাত বছরের খোকার নিয়ন্ত্রণক্ষমতাই-বা কী! সুতরাং কিছুটা গ্যাস ওর ভিতরে ঢুকেই পড়লো! শরীরটা ঝিমঝিম করতে লাগলো। মাথাটা ঘুরতে লাগলো। এদিকে অপেক্ষায় থাকা দখলদাররা সুযোগটা হাতছাড়া করতে কোনো অবহেলা করলো না। ওরা ছুটে এসে আহমদকে বন্দি করে ফেললো। সাত বছরের এক ক্ষুদে শিশুকে মারাত্মক এক বন্দির মতো হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে গেলো।
শিশুদের প্রতি ওদের নিষ্ঠুরতাটা একটু বেশিই। শিশুরা নাকি ওদের বিরক্তিকর শত্রু। বিশেষ করে আজকের শিশুদলটা দখলদারদের চোখে ভীষণ ভয়ানক। প্রতিদিনই ওরা পাথর ছুঁড়ে-ছুঁড়ে দখলদারদেরকে ধাওয়া করে। এদিকটায় এলেই ওদের ধাওয়া খেতে হয়। পাথরের ঘাই খেতে হয়। রক্তাক্ত হতে হয়। তাই আজ একটা ‘মারাত্মক’ পাথরশিশুকে বন্দি করতে পেরে দখলদাররা ভীষণ খুশি। টহলসেনাদের প্রধান আস্তানায় ফেরার আগেই সু-সংবাদটা ফোনে জানিয়ে দিলো সামরিক আদালতের প্রধান বিচারককে। ওখানেই আজ আহমদের বিচার বসবে। গদগদ কণ্ঠে বললো— জনাব! একটু আগে আমরা একটি বিরাট সাফল্য অর্জন করেছি। আমাদের হাতে বন্দি হয়েছে এক পাথরশিশু! নাম আহমদ! বয়স সাত!
নয়.
এ সংবাদে সামরিক আদালতপাড়ায়ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়লো। প্রধান বিচারক এজলাস ছেড়ে সদলবলে বেরিয়ে এলো আজকের সফল অভিযানের নায়কদেরকে স্বাগত জানাতে। ঐ পাথরশিশুটাকে দেখতে।
কী অদ্ভুত আদালত আর কী অদ্ভুত তার বিচার! আসামী হাজির হওয়ার আগেই দোষী সাব্যস্ত হয়ে গেছে! বিচার শুরু হওয়ার আগেই বিচার হয়ে গেছে!
হে ইহুদীরা! ধিক তোমাদের এই জঘন্য বিচারক ও বিচারালয়কে! সাত বছরের একটা বাচ্চাকে ধরার পর হাতকড়া পরিয়ে ঘটা করে নিয়ে আসা তারপর এ খবরে খোদ আদালত প্রধানের এজলাস ত্যাগ করে আদালতের প্রধান ফটকে এসে প্রহরীদের নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকা— এসব আর যাই হোক, বিচার না! ন্যায়বিচার তো অবশ্যই না! বরং প্রহসন! বিচারের নামে অবিচার! ‘জাতের নামে বজ্জাতি’! তোমাদের পক্ষে সবই সম্ভব হে শিশুহত্যাকারীরা! কেননা তোমাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলো নবীঘাতক! সত্যি তোমরা হতভাগা .. দুর্ভাগা!
দশ.
কিছুক্ষণ পর বন্দিকে নিয়ে গাড়িবহর পৌঁছলো। সামরিক বিচারক নিজের আনন্দ লুকোতে পারলো না। আশ্চর্য! আমি বারবার এই লোকটাকে ‘বিচারক বিচারক’ বলছি! এই বেটা আবার কী বিচার করবে? যতোই সে শুনুক বাদী-বিবাদীর বক্তব্য, শেষ পর্যন্ত রায় তো হবে ইসরাঈলীদের পক্ষেই এবং অবশ্যই ফিলিস্তিনীদের বিপক্ষে! এমন কোনো নজির তুমি খুঁজে পাবেই না যে, ওদের কোনো বিচারক ওদের বিপক্ষে রায় দিয়েছে! এখন প্রশ্ন হলো, ছোট্ট আহমদের কী হবে! ও কি আসলেই দোষী সাব্যস্ত হবে? এতো ছোট্ট মানুষ কী করে দোষী হতে পারে? মাত্র সাত সাত বছর বয়সে?
এসো দেখি, কী হয়!
এগার.
— এই পিচ্চি! তোর বয়স কতো রে?
— সাত!
— তুইও পাথর ছুঁড়িস আমাদের উপর!
— আজই প্রথম ছুঁড়লাম!
— আচ্ছা! বেশ সাহসী তো দেখছি!
— আমি তোমাদের মতো কাপুরুষ না!
— আহারে কী বীরপুরুষটা! নাক টিপলে এখনো দুধ বেরুবে! আচ্ছা বল্ তো; তোর পাথর কয় মিটার দূরে গিয়ে পড়ে? দুই মিটার? নাকি তিন মিটার?
— মেপে দেখলেই পারতে!
— বাব্বা, তেজ কতো! আচ্ছা বল্ তো; এ কাজে কে তোকে নামিয়েছে?
আহমদ নিশ্চুপ।
— নাম বল্ জলদি— কে তোকে এই দৈত্যদের সাথে পাথর যুদ্ধে নামতে ফুসলেছে?
এবারও কোনো কথা বলছে না। বিচারকটা তখন আরো জ্বলে উঠলো:
— জলদি বল্! বেক্কেল হাদারাম! কথা বলছিসনে কেন্? বোবা-টোবা নাকি!
আহমদ মাথা তুলে সামরিক বিচারকের চোখে চোখ রেখে তাকালো। তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ ধরে। তারপর স্থির শান্ত কিন্তু আবেগ-বিগলিত কণ্ঠে বিচারকের উদ্দেশে বলে উঠলো সেই অমর সঙ্গীতটি—
بالروح بالدم ..... نفديك يا فلسطين
‘ফিলিস্তিন! রক্ত লাগবে? রক্ত দেবো!
দরকার হলে তোমার জন্যে জীবনটাই বিলিয়ে দেবো!
বার.
বিচারক আহমদকে যতোটা পিচ্চি ভেবেছিলো ততোটা পিচ্চি ও নয়, তা ওর উচ্চারণ ও কথা থেকেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এখন জানতেই হবে মূল কে। কে ওকে এ কাজে নামিয়েছে। কে ওকে শিখিয়েছে এই বীরোচিত দেশাত্মবোধক জাতীয় সঙ্গীত!
— ঠিক করে বল্, কে তোকে ময়দানে নামিয়েছে? কে তোকে এ সঙ্গীত শিখিয়েছে?
— মুহাম্মদ!
— মুহাম্মদ?
— হু, আমার ভাই!
এ-কথা শুনতেই বিচারকের মুখের আনন্দরেখাগুলো ঝিলমিল করে উঠলো। উপস্থিত সৈন্যদের উদ্দেশে বিচারক বলে উঠলো— মূল হোতার সন্ধান পাওয়া গেছে! ওকে বন্দি করতে হবে! প্রস্তুত হও সবাই! এক্ষুনি অভিযানে যেতে হবে! পাথর-ইন্তিফাদা’র মূল হোতাকে ধরতে হবে! আদালত আজকের মতো এখানেই মুলতবি।
তের.
সৈন্যরা আগে থেকেই কান খাড়া করে দাঁড়িয়েছিলো। তাই নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে দ্রুত সব আয়োজন শেষ হলো। এক্ষুনি বের হবে অভিযান। গাড়িবহরের প্রথম গাড়িটায় বিচারক নিজেও এসে ‘এজলাস’ গ্রহণ করলো। একেবারে চালকের পাশে। আহমদের দিকে সবাইকে সতর্ক নজর রাখতে নির্দেশ দিলো বিচারক।
গাড়িবহর চলতে শুরু করলো, গাজাপট্টির দিকে।
আহমদ চুপচাপ বসে আছে। চেহারায় আগেও ছিলো না ভীতির ছাপ। এখনো নেই।
চৌদ্দ.
একটু পরই গাজায় প্রবেশ করলো সৈন্যরা। বিচারক আহমদকে বললো:
— এই পিচ্চি! তোদের বাসাটা কোন্ দিকে?
— ভুলে গেছি!
— বলে কি বেটা! ভুলে গেছিস মানে? রসিকতা করছিস্ আমাদের সাথে? জলদি বল্!
— মনে হয় ডান দিকে হবে! না! বামে যান! না না! একটু পেছনে যেতে হবে মনে হচ্ছে!
বিচারক রোষ-মেশানো কণ্ঠে বললো:
— এই বেটা দৈত্য শিশু! ঠিক করে বলবি বাড়িটা কোথায়? নাকি শুরু করবো উত্তম-মধ্যম?!
পনেরো.
গাজা শহরের অধিকাংশ রাস্তা ও অলি-গলি ঘোরা শেষ, কিন্তু আহমদ এখনো নিজের বাড়ির ‘সন্ধান’ দিতে পারে নি। এমন কি কোন্ রাস্তাটা ওদের বাড়ির দিকে গিয়েছে, তাও বলতে পারলো না। বিচারকসহ অন্য সৈনিকরা এবার রাগে ক্ষোভে ফুঁসতে লাগলো এবং হতাশা ও আশঙ্কায় একটু ঘাবড়েও গেলো! এই যখন অবস্থা তখন আহমদ বললো:
— থামো! এই থামো! মনে হচ্ছে এ মহল্লাটাই আমাদের! একটু ঐ দিকে গেলেই পেয়ে যাবো আমাদের বাড়িটা! হ্যাঁ, এই তো, এই রাস্তা দিয়েই যেতে হবে!
— এবার ভুল করলে কিন্তু ক্ষমা নেই আর!
— বললাম তো! এটিই আমাদের বাড়ির রাস্তা!
বিচারক গাড়ি থামাতে বললো। সবাই নামলো। বিচারক আশপাশটা একটু দেখে নিয়ে বললো:
— এ জায়গাটা ঘিরে ফেলো! নজরদারি বাড়িয়ে দাও! এখান থেকে কেউ যেনো পালাতে না-পারে!
বিচারক আহমদকে কাছে ডেকে বললো:
— এবার তোদের ঘরটা দেখিয়ে দে! মনে রাখিস্, মিথ্যা ও প্রতারনার আশ্রয় নিলে পরিণতি কিন্তু মোটেই ভালো হবে না!
ষোল.
আহমদ একটুও ভয় পেলো না ওদের হুমকি-ধমকিতে। বরং শান্ত পায়ে এবং দৃঢ় ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো। ওকে অনুসরণ করছে সঙ্গের বিচারক ও তার সঙ্গীরা। আঁকাবাঁকা গলিপথ পেছনে ফেলে-ফেলে আহমদ এগিয়ে যেতে লাগলো। দখলদারদের চোখে নতুন করে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ফুটে উঠেছে! পথের কি আর শেষ হবে না? এর বাড়িটা কি উদয় হবে না? কিন্তু আহমদের মুখ হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছে। আশ্চর্য! এতোটা পথ হাঁটলে এ বয়সের শিশুদের তো ক্লান্তিতে রীতিমত ঝিমিয়ে পড়ার কথা! হঠাৎ রাস্তায় বসে ‘একটু জিরিয়ে নিই!’ বলে মিষ্টি একটা হাসি দেয়ার কথা! কিন্তু আহমদ চলছে তো চলছেই! সবার আগে আগে! যেনো বিশেষ বাহিনীর অগ্রাধিনায়ক!
শেষ পর্যন্ত আসলে কী হবে? বাড়ির কি দেখা মিলবে? .........
সতেরো.
গাজা শহরে কতো মানুষের বাস। দশ লাখ। এতোগুলো রাস্তা ও গলিপথে বন্দি আহমদকে নিয়ে এই-যে রাজ্যের ঘুরাঘুরি চলছে, তাতে কি লোকজনের মধ্যে জানাজানি হয় নি? অবশ্যই হয়েছে! আহমদ বুঝি এটিই চেযেছিলো? জানি না, চেয়েছিলো কি না! কিন্তু ঘটেছে তাই! এর মাঝে অনেক লোকজন এসে ভীড় জমিয়েছে! কারো চোখে কৌতূহল। কারো চোখে ক্ষোভ। কারো চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে।
মজার ব্যাপার হলো ভীড়টা বাড়ছে।
আরো মজার ব্যাপার হলো, সাথে সাথে বাড়ছে দখলদারদের অশ্বস্তি!
ভীড় যতো বাড়ে ওদের অশ্বস্তিও পাল্লা দিয়ে ততো বাড়ে!
আহমদের বাড়ি যতো কাছে আসতে লাগলো মজার ভীড়টাও ততো বাড়তে লাগলো!
সব মিলিয়ে যেনো বাড়াবাড়ির এক মস্ত প্রতিযোগিতা!
পেছনে তাকাচ্ছে সৈন্যরা। তাকাচ্ছে খোদ বিচারকও। আর বেড়ে চলেছে তাদের ভয়চকিত দৃষ্টি!
এ দৃষ্টির ভাষা পড়া গেলে ভাবটা হতো এমন—
নাহ! আর বুঝি পারা গেলো না! এই পিচ্চি আহমদটা আসলে কী চাইছে? কোনো বিপদের মুখে ঠেলে দেবে না তো! বিশ্বাস নেই! ফিলিস্তিনের দৈত্য শিশু! পাথরশিশু! আমাদের সাথে ওদের চিরবৈরিতা!
আঠারো.
দখলদারদের অশ্বস্তির মাত্রা অনেক বেড়ে গেলো! বিচারক চোখের ইশারায় কী যেনো বলতে চাইলো। অমনি শুরু হয়ে গেলো ফাঁকা গুলি। দ্রিম দ্রিম দ্রিম! ভয় থেকে মুক্তির এটা একটা শেষ অস্ত্র ওদের। কিন্তু কই! উদ্দেশ্যে-যে পূরণ হলো না! একটা মানুষও কমে নি!
কেনো কমবে? এটা কি ইসরাঈল? এটি ফিলিস্তিন!
দুশমনের ফাঁকাগুলিতে যারা দৌড়ে পালায় তারা তো কাপুরুষ!
গাজার মানুষ কবে ছিলো কাপুরুষ?
সুতরাং ফাঁকাগুলির ফল হলো উল্টো! যারা বাড়ির ভিতরে ছিলো এখন গুলির শব্দ পেয়ে তারাও বেরিয়ে এলো!
কী মজা! শত শত এখন হাজার হাজার!
ঊনিশ.
হাজার হাজার ফিলিস্তিনী যখন জড়ো হয় দখলদারদের গুলির আওয়াজ শোনে,
এসে পাশেই যখন দেখে সমর-পোশাকে আপদমস্তক ঢাকা দখলদারদের বানরময় চেহারা,
তখন ফিলিস্তিনের বীর জনতা কি নীরব থাকতে পারে?
নাকি থেকেছে কোনোদিন?
তাহলে এখন কেনো নীরব থাকবে?!
হাজার হাজার ক্ষুব্ধ কণ্ঠের শ্লোগানমুখরতায় গাজার আকাশে বাতাসে কম্পন সৃষ্টি হলো! সেই সাথে কম্পিত হলো এই কাপুরুষ দখলদারদের সংকীর্ন হৃদয়গুলি!
এখন কী করা? ফিরে যাবে দখলদাররা? পালাবে কি?
যতো রাগ গিয়ে পড়লো ছোট্ট আহমদের উপরে! বিচারকটা গর্জন করে উঠলো:
— এই হতভাগা! তোর মতলবটা আসলে কী, বল্ তো?! কেনো বাড়িতে নিয়ে যাওযার নাম করে আমাদেরকে এতোটা দূরত্ব মাড়াতে বাধ্য করছিস্? কোথায় তোদের ঘর?!
বিশ.
উদ্বাস্তু শিবিরের অনেকগুলো তাঁবু পেরিয়ে অবশেষে আহমদ একটি বাড়ির সামনে এসে বললো:
— এই আমাদের বাড়ি! এখানে আমরা বাস করি!
— না, বিশ্বাস করি না! মিথ্যে বলছিস্! তুই আমাদেরকে বারবার প্রতারিত করেছিস্! আমরা আর একবারও প্রতারিত হতে চাই না!
— আল্লাহর কসম! এটিই আমাদের বাড়ি!
তখন শোনা গেলো এক প্রতিবেশির গর্জন:
— কী চাও তোমরা আহমদের কাছে? পাঁচ মাস আগে-না ওর বাবাকে বন্দি করে নিয়ে গেছো? এখন আবার এখানে কী চাও?
একটা বেয়াদব ইহুদী তখন বলে উঠলো:
— চুপ কর বেটা! নইলে তোকেও আহমদের বাবার কাছে পাঠিয়ে দেবো!
একুশ.
ভীষণ জোরে ওরা দরোজায় করাঘাত করলো। আহমদের মা এসে দরোজা খুলে দাঁড়ালেন। ফিলিস্তিনী মায়েরা মহিয়সী। সাহসিনী। সহজে ভড়কে যান না। ভয় পান না। আহমদকে দেখেই বুঝলেন ও ওদের হাতে বন্দি। সামরিক আদালতের বিচারক নামের শয়তানটা ওকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। অন্যরা ওকে ঘিরে রেখেছে। কিন্তু এখানে এই মুহূর্তে ওরা কী চাইছে? বন্দি করার মতো আর কে আছে এ বাড়িতে? তিনি জানতে চাইলেন গম্ভীর কণ্ঠে:
— তোমরা আর কী চাও? আমার স্বামীকে নিয়েও কি তোমাদের অভিযান শেষ হয় নি? পিপাসা মেটে নি? তোমরা অভিশপ্ত! আল্লাহ তোমাদের বিচার করবেন!
— না! আমাদের পিপাসা মেটে নি! তোমরা সব পাথর-সন্ত্রাসী! তোমরা সবগুলি আমাদের শান্তি ও নিরাপত্তার দুশমন! তোমরা ফাসাদসৃষ্টিকারী! তোমরা অশান্তিপ্রিয়! তোমাদের কারো ‘ছাড়’ নেই! শোনো! এখন আমরা এসেছি আহমদের ভাই মুহাম্মদকে বন্দি করতে! বলো জলদি, কোথায় ম সে? এখানে আমাদের সামনে ওকে হাজির করো নয়তো আমরা ঘর তল্লাশি করে ওকে খুঁজে বের করবো!
— মুহাম্মদ? ওকেও তোমাদের বন্দি করতে হবে?!!
— বললাম তো, ওকে বন্দি করতেই আমরা এ অভিযানে এসেছি!
— আচ্ছা, তবে দাঁড়াও!
আহমদের মুখে তখন এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো। এ হাসির তাৎপর্য ইহুদীরা বুঝতে পারলো না।
বাইশ.
কয়েক মিনিট পরই মা কোলে করে একটা বাচ্চা নিয়ে এলেন! বললেন:
— এই নাও মুহাম্মদকে! পারলে একেও বন্দি করে নিয়ে যাও! আনো শেকল! পরাও হাতকড়া!
সামরিক আদালতের বিচারকের মুখটা ততোক্ষণে পাংশুবর্ণ হয়ে গেলো! আহমদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললো:
— মুহাম্মদের ব্যাপারেও তুমি আমাদেরকে প্রতারিত করলে! জানো, এ পর্যন্ত কতোবার তুমি আমাদেরকে প্রতারিত করেছো? তুমি কি বলতে চাও এ-ই (মুহাম্মদের দিকে ইশারা করে) তোমাকে পাথর যুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে?! তুমি তো আস্তো একটা দৈত্য! এখন কী বলবে বলো! কেনো তুমি আমাদেরকে প্রতারিত করে এখানে নিয়ে এসেছো, বলো! জলদি বলো!
আহমদকে কিছু আর বলতে হলো না! মায়ের কোলের তিন বছরের ছোট্ট মুহাম্মদই ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো আদরকাড়া কণ্ঠে .. ভাঙা-ভাঙা শব্দে:
— হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি-ই তো বলেছি, ভাইয়া শোনো, শোনো! আমি তো ছোট! পাথর ছুঁড়তে পারি না! তুমি তো অনেক বড়! কেনো সবার সাথে পাথর ছুঁড়তে যাও না?! আমি যখন আরেকটু বড় হবো তখন আমিও যাবো তোমার সাথে! জোরে জোরে পাথর মারবো! ওদের নাক ভেঙে দেবো! তোমরা কেনো এসেছো! আমার সাথে যুদ্ধ করবে? আমি কিন্তু জোরে ঘুষি মারতে পারি! এই দেখো, ভিম!!..................
তেইশ.
মুহাম্মদের কথা শেষ না-হতেই সমবেত জনতা হাসিতে ফেটে পড়লো। সেই সাথে শুরু হলো তাকবীরধ্বনি। হাসির এ শব্দ আর তাবীরের এ ধ্বনি বিঁধলো গিয়ে প্রতিটা ইহুদীর অন্তরে। সৃষ্টি করলো ভয়। মহা কম্পন। তাকবীরধ্বনির আওয়াজ উঁচু হতে লাগলো। জনতার চোখ-মুখের ক্ষুব্ধ উত্তেজনা উষ্ণতা ছড়াতে লাগলো। জনতা ফুঁসতে লাগলো। বিচারক প্রমাদ গুনলো। ভয়ে আহমদকে ছেড়ে দিলো। তবুও জনরোষ কমছে না দেখে পরস্পরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। এদিকে ওরা দেখলো অনেকে পাথর কুড়াচ্ছে। বিচারক সৈন্যদেরকে স্থান ত্যাগ করতে ইশারা করলো। ওরা তখন নিজেদের গাড়িবহরের দিকে দিলো একসঙ্গে সবক’টা দৌড়! ভু-দৌড়!!
চব্বিশ.
কিন্তু জনরোষ দমায় কে? প্রতিরোধ থামায় কে? পাথর নিক্ষেপ শুরু হয়ে গেলো। ইন্তিফাদা রঙ ছড়াতে লাগলো। এদিকে পলায়নের গতিও দ্রুত হতে লাগলো। আঁকাবাঁকা পথে আহমদ ওদেরকে এই ‘দৈত্য-শাসিত’ তাঁবুতে পায়দল নিয়ে এসেছিলো, অনেকটা পথ। আহ! কোথায় পড়ে আছে গাড়িবহর! দৌড় .. দৌড় ! জোরে! আরো জোরে!
পচিশ.
এদিকে ঘটেছে আরেক মজার কান্ড। দখলদার সৈন্যদের অসতর্কতার আশ্রয় নিয়ে খালেদ ওদের গাড়িতে একটি ফিলিস্তিনী পতাকা টানিয়ে দিয়েছিলো। সৈন্যরা এসে হুড়মুড় করে গাড়িতে উঠলো। সর্বশেষ সৈন্যটা সর্বশেষ পেছনের গাড়িটাতে ওঠার সাথে সাথে গাড়িবহর পালাতে লাগলো। আর ঐ গাড়িটাতে ফিলিস্তিনের পতাকাটি তখন বাতাসের তালে তালে পতপত করে উড়তে লাগলো। যেনো ঘোষণা করছিলো আগামী দিনের স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিনের কথা। পাশাপাশি চলতে লাগলো আশাপাশের বীর জনতার তাকবীর ধ্বনি এবং অবশ্যই পাথরগুলি!
আহমদ দ্রুত দৌড়ে এসে একটা ছাদে উঠলো আর পালিয়ে যাওয়া গাড়ি বহরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে লাগলো:
— কাল আমি আবার নামবো! আবার তোমাদের সাথে দেখা হবে! আসবে তো! আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!!
(জামিউল হুকুক মাহফুযাতুন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন