বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০১৬

ইসলামী সংস্কৃতি বনাম ইসলামের নামে প্রচলিত সংস্কৃতি

১.
সংস্কৃতি শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। অারবীতে এটাকে 'ছাক্বাফাহ' এবং 'তাহযীব' বলা হয়। কোনো জাতীর তাহযীব বা ছাক্বাফাহ বলতে ঐ জাতীর সভ্যতা, অাচার-অনুষ্ঠান, লেবাছ পোশাক, অানন্দ-উৎসব সহ অনেক কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।
২.
ইসলামী সংস্কৃতি বলতে ইসলাম কর্তৃক অনুমোদিত সংস্কৃতি ও সভ্যতাই বুঝায়। সাধারণ মানুষের অনেকেই এই ভুল ধারণা করে বসে অাছেন যে ইসলামের অালাদা কোনো সংস্কৃতি নেই। একারণেই তারা বিভিন্ন অাচার-অনুষ্ঠান কিংবা উৎসব পালনের ক্ষেত্রে বৈধ অবৈধের পরোওয়া করেন না। তারা মনে করেন, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ইসলামের কোনো বাধা নিষেধ নেই; যেভাবে ইচ্ছা যেকোনো ধরণের অনুষ্ঠান কিংবা উৎসব পালন করা যাবে। একারণেই পহেলা বৈশাখী বা এধরণের উৎসব পালনের ক্ষেত্রে শরয়ী নিষেধাজ্ঞাকে অনেকেই উড়িয়ে দিতে চান। অথচ একজন মানুষ ঘুম থেকে জাগার পর থেকে অাবার নিদ্রায় যাওয়ার অাগ পর্যন্ত; জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন প্রতিটি মুহুর্তে রয়েছে ইসলামী নির্দেশনা। যখন ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা কোনো উৎসব পালনের বৈধতা ইসলামে নেই। 
৩.
অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো ইসলামী সংস্কৃতির বিষয়টিও বাড়াবাড়ি এবং ছাড়াছাড়ি মুক্ত নয়। উপরে ছাড়াছাড়ির একটি নমুনা দেয়া হলো। বাড়াবাড়িও একেবারে কম নয়। ইসলামী সংস্কৃতির নামে এমন অনেক কিছুই চালিয়ে দেয়া হয় যা কোরঅান-সুন্নাহের অালোকে সমর্থিত নয়। অথবা মূল বিষয়টি সমর্থনযোগ্য হলেও অানুসাঙ্গিক অনেক বিষয় জুড়ে দেয়া হয় যা কোরঅান-সুন্নাহের অালোকে অাপত্তিজনক।
৪.
কাব্য চর্চা কিংবা সংঙ্গীত চর্চার কথাই ধরুন, ইসলামী সংস্কৃতির নামে যারা এগুলোর চর্চা করেন তাদের দাবী অপসংস্কৃতির মোকাবেলায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রয়োজন। কিন্তু তারা যা করছেন এগুলো কি ইসলামী সংস্কৃতি? এগুলো কি ইসলাম সমর্থন করে?

দেখুন, মুহিব খান লিখেছেন-
‘‘উল্টে ফেল সখের গদি পানের বাটায় আগুন দাও
কুল বালিশে হেলান দেয়া মহিষগুলোর পেঠ কমাও’’

কোরঅানে কারীমের সূরা শুঅারা'র ২২৪-২২৭ নং অায়াত এবং সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদীস-
‘‘পুঁজ দ্বারা পেট ভর্তি করা কবিতা দ্বারা পেঠ ভর্তি করার চাইতে উত্তম।’’

আয়াতের তাফসীর এবং হাদীসের ব্যাখ্যাকে সামনে রেখে যেকোনো বিজ্ঞ আলেমই নির্ধিদ্বায় বলতে পারবেন যে, মুহিব খানের কবিতাটি শরীয়ত সমর্থিত নয়।
না এখানেই শেষ নয়। সঙ্গীতের সাথে মিউজিক এবং বাজনা যুক্ত করেও যখন ইসলামী সঙ্গীত দাবী করা, ইসলামী শরীয়তের সাথে তামাশা করা ছাড়া আর কিইবা হতে পারে।
বর্তমানে যারা কাব্য চর্চা করেন তাদের কবিতা এবং বাস্তব জীবন দেখে বারবার মনে পড়ে কবিদের সম্পর্কে আল্লাহর বানী-
"বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুস্মরণ করে। তুমি কি দেখ না যে, তারা প্রতি ময়দানেই উদভ্রান্ত হয়ে ফিরে। এবং এমন কথা বলে, যা তারা করে না।"

এরপরও যখন তাদেরকে বলা হয় যুগের ইকবাল, আল্লামাতুয যামান বড্ড হাসি পায়।
নি:সন্দেহে সাহাবায়ে কেরাম কাব্য চর্চা করেছেন এমনকি আল্লাহর রাসূলের সামনে মসজিদে নববীতে তা পাঠও করেছেন। কা’ব বিন মালেক, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা, হাসসান বিন ছাবিত তাদের অন্যতম। খোদ আল্লাহর রাসূল মাঝেমধ্যে কবিতার অংশ বিশেষ পাঠ করেছেন।
তাদের কবিতাগুলো এবং কবিতা পাঠের আসরগুলো কি আজকের মতো ছিল? তাদের কবিতায় ছিল নবীজীর প্রশংসা, আল্লাহর প্রশংসা, কাফেরদের জবাব ইত্যাদি। তারা সেগুলো জীহাদে কিংবা সফরে পাঠ করতেন। কখনো মসজিদে নববীতে নবীজীর পক্ষ থেকে কাফেরদের জবাবী কবিতা পাঠ করা হতো তাদের কবিতার জবাব দেয়া হতো। এধরণের কাব্যচর্চা শুধু বৈধই নয়; অনেক সওয়াবের কাজ।
কিন্তু আজ ইসলামী সংস্কৃতির নামে যে কাব্য এবং সঙ্গীত চর্চা হয় সেগুলোর কোনোটি শুধু নামেই ইসলামী। তবে কিছু কিছু হামদ এবং না’তে আল্লাহ এবং তার রাসূলের বেশ চমৎকার প্রশংসা করা হয়েছে। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। যারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের মহব্বত নিয়ে এধরণের হামদ এবং না’ত তৈরী করবে এবং পাঠ করবে নি:সন্দেহে সওয়াব পাবে। তেমনিভাবে কোনো কাফেরদের জবাবী কবিতা বা এমন কবিতা যাতে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলা হয়েছে এগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয়।
তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়। নবীজীর যুগের কাব্যচর্চা বিনোদনমূলক ছিল না। অর্থাৎ ঢাকঢোল পিঠিয়ে সবাইকে আহব্বান করে বিনোদনের জন্য কোনো সঙ্গীত কিংবা কাব্যানুষ্ঠান করা হয়েছে এরকম একটি নজীরও নেই। বরং তারা হয়তো জীহাদে কিংবা সফরে কবিতা পাঠ করতেন কখনো মসজিদে কাফেরদের জবাবী অথবা আল্লাহ এবং নবীজীর প্রশংসামূলক কবিতা পাঠ করতেন। আজকের মতো শুধু বিনোদনের জন্য কোনো কবিতানুষ্ঠান করেছেন এর একটি নজীরও কেউ দেখাতে পারবে না।
ইসলামে বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই, বিষয়টি এমন নয়। সুযোগ রয়েছে তবে এগুলোরও কিছু মূলনীতি রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম এবং নবীজীর বিনোদন এবং রসিকতা দেখুন কেমন ছিল। সবগুলো ছিল ইত্তিফাক্বী অর্থাৎ ঘটনাক্রমে ঘটেছে। রসিকতা এবং বিনোদনের জন্য কোনো অনুষ্ঠান হয়েছে এর একটি নজীরও কেউ দেখাতে পারবেন না। একটি দ্বীনী মাহফিল হবে সেখানে হামদ, না’ত পাঠ করা কিংবা প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানে পাঠ করা এক কথা আর বিনোদনের জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ভিন্ন কথা। বিনোদনের জন্য বিনোদন একটি অনর্থক কাজ আর অনর্থক কোনো কাজই শরীয়ত কতৃক সমর্থিত নয়।
সুতরাং নবীজীর যুগের কাব্যচর্চা এবং কৌতুক-রসিকতাকে দলীল বানিয়ে ইচ্ছামতো ইসলামের নামে যেকোনো বিনোদন আনুষ্ঠানের আয়োজন করার সুযোগ নেই।
ইসলামী সংস্কৃতির নামে আজ অনেক কিছু করা হয়, যা ইসলাম সমর্থন করে না। কথা অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল তাই একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েই আলোচনার ইতি টানবো।
একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এক ভাই ইসলামী সংস্কৃতির আলোচনার এক পর্যায়ে অভিনয়ের প্রসঙ্গ টেনে যখন বললেন, জিবরীল আলাইহিস সালাম দিহয়াতুল কালবীর আকৃতিতে অভিনয় করেছিলেন তখন সেই মজলিস থেকে উঠে আসা ছাড়া আর উপায় রইল না।
সবকিছু চালাও ইসলামের নামে। ইসলামী মদ! ইসলামী জোয়ার আসর! ইসলামী কনসার্ট!
২১/০৭৭২০১৬ ইং

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন