সোমবার, ১৩ জুন, ২০১৬

জীবন বদলে দেওয়ার মত ঘটনা


বরেণ্য মুহাদ্দিস, বিচক্ষণ রাজনীতিক, ক্ষণজন্মা সাধক, শাইখুল ইসলাম হজরত মাওলানা সাইয়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) ছিলেন জ্ঞান-পাণ্ডিত্য, তাকওয়া-পরহেজগারি, ইবাদত ও দাওয়াত- এক কথায় আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামের বিজয় ও প্রতিষ্ঠা সাধনের ভুবনে এক কিংবদন্তী পুরুষ। তিনি ছিলেন শাইখুল হিন্দ হজরত মাহমুদ হাসান দেওবন্দি (রহ.)-এর যোগ্যতম উত্তরসূরী। এই মনীষীর ইবাদত-বন্দেগি, কোরআন তেলাওয়াত, সিয়াম সাধনা, তারাবি ও রাতভর তাহাজ্জুদের কান্নাপ্লাবিত সাধনা ছিল উপমাময়।
কোরআন হিফজের অনুপম দৃষ্টান্ত
রমজান এলে পূর্বেকার মনীষীরা কোরআনময় হয়ে যেতেন! কোরআনের সঙ্গে গড়ে তুলতেন গভীর সখ্যতা। কোরআনই হয়ে যেতো তাদের জীবনসঙ্গী, সফরসঙ্গী তথা নিত্যসঙ্গী। পবিত্র কোরআনের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অমলিন ঈর্ষণীয় ও সীমাহীন। নিম্নের ঘটনাটি থেকে আমরা তার কিছুটা আঁচ করতে পারি।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে তখন কঠোর আন্দোলন চলছিল। এক পর্যায়ে গ্রেফতার করা শাইখুল হিন্দ হজরত মাহমুদ হাসান দেওবন্দিকে। তারপর তাকে নির্বাসন দেওয়া হয় আন্দামানে। স্বীয় উস্তাদ ও শাইখের কষ্টের কথা চিন্তা করে তার একাকী নির্বাসনকে মেনে নিতে পারলেন না প্রিয় শাগরেদ হজরত হোসাইন আহমদ মাদানি। তিনি বললেন, আমার উস্তাদের সঙ্গে আমাকেও তোমরা নির্বাসনে পাঠাও। আমি তার সঙ্গে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইংরেজরা শেষ পর্যন্ত তার আবেদন মঞ্জুর করল। তাকেও পাঠিয়ে দেয় আন্দামানে।
কিছুদিন পর তাদের বন্দী জীবনে এলো রহমত ও বরকতের মাস রমজান। হজরত শাইখুল হিন্দ (রহ.) প্রিয় শাগরেদ হজরত হোসাইন আহমদ মাদানিকে লক্ষ্য করে গভীর আক্ষেপের সুরে বললেন, এ রমজানে আমরা হয়তো কোরআনে কারিমের তেলাওয়াত শুনতে পারব না!
কথাটি হজরত শাইখুল হিন্দ (রহ.) এ জন্য বলেছিলেন যে, তিনি এবং হজরত মাদানি কেউ কোরআনে কারিমের হাফেজ ছিলেন না। তাছাড়া এখানেও অন্য কোনো হাফেজও ছিলো না; যাকে ইমাম বানিয়ে তারা খতমে তারাবি পড়তে পারেন।

উস্তাদের কথা শুনে প্রিয় নবী সুন্নতের প্রেম আর আল্লাহর কিতাবের প্রতি অমলিন ভালোবাসা উথলে উঠে মাদানির হৃদয়ে। তিনি মুহূর্তকাল মাথা নিচু করে কী যেন ভাবলেন। তারপর আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস ও তার অসীম রহমতের প্রতি ভরসা রেখে বলে ফেললেন, হজরত! আপনি দোয়া করুন। ইনশাআল্লাহ আমিই খতমে তারাবি পড়াব।
হজরত আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে পড়াবে? তুমি তো হাফেজ নও। জবাবে মাদানি (রহ.) বললেন, দিনে মুখস্থ করে রাতে নামাজ পড়াব।
হজরত বললেন, ঠিক আছে তাই হবে।
রমজানের আগের দিন। হজরত হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) কোরআন শরিফ নিয়ে বসলেন। শুরু করলেন মুখস্থ করা। দেখা গেল, সেদিন থেকে হজরত মাদানি (রহ.) দিনে এক পারা করে মুখস্থ করে ফেলতেন আর রাতে তা তারাবির নামাজে স্বীয় শায়েখকে শোনাতেন। এভাবে তিনি ত্রিশ দিনে পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করে হাফেজ হলেন আর আপন উস্তাদের মনের আশা পূর্ণ করেন। -সূত্র: বীস বড়ে মুসলমান, মালফুযাতে হাকিমুল উম্মত, আনওয়ারুল আউলিয়া, পৃষ্ঠা- ১৪৫
তারাবি, তাহাজ্জুদ ও কোরআন তেলাওয়াত
শায়খুল ইসলাম হজরত হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) আসরের নামাজের পর দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষক হাফেজ মাওলানা আবদুল জলিল (রহ.)-এর সঙ্গে সোয়া পারা করে কোরআন পরস্পরে শোনাতেন। সূর্যাস্তের পূর্বে কোরআন শোনানো শেষ হয়ে গেলে মাদানি (রহ.) মোরাকাবা ধ্যানে মগ্ন হয়ে যেতেন। এরপর হালকা ইফতার করে মাগরিবের নামাজ খুব সংক্ষিপ্ত পড়তেন। পরে লম্বা লম্বা সূরা দিয়ে নফল নামাজ পড়তেন, যাতে প্রায় আধা ঘন্টা সময় লেগে যেতো। এরপর দীর্ঘক্ষণ ধরে দোয়া করতে থাকতেন।
হজরত হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর বিশেষ ধরণের বাচনভঙ্গি এবং নামাজে একাগ্রতা ও খুশুখুজু কেবল ভারতেই নয়; বরং আরব দেশেও প্রসিদ্ধ ও স্বীকৃত ছিল। সিলেট অবস্থানকালে রমজানে তারাবিসহ প্রত্যেক নামাজের ইমামতি মাদানি (রহ.) করতেন। তার পেছনে নামাজ পড়ার জন্য অনেক দূর থেকে লোকজন এসে ভীড় করতো। এমনকি তাহাজ্জুদের জামাতে শরিক হওয়ার জন্যও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত। তাহাজ্জুদে দুই খতম কোরআন তেলাওয়াত করা হতো। মাদানি (রহ.) নিজে এক খতম করতেন। তাহাজ্জুদে যাওয়ার সময় তিনি খুব সতর্কতা অবলম্বন করতেন, যেন আওয়াজ না হয় এবং কারো ঘুম ভেঙ্গে না যায়। -আকাবির কা রমজান: ৫৪

সাহরি ও ইফতার
জনৈক সাহাবির সূত্র ধরে হজরত আবদুল্লাহ বিন হারেস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলের নিকট হাজির হলাম, তিনি সাহরি খাচ্ছিলেন। রাসূল বললেন, নিশ্চয় তা বরকতস্বরূপ, আল্লাহপাক বিশেষভাবে তা তোমাদেরকে দান করেছেন, সুতরাং তোমরা তা ত্যাগ করো না। -সুনানে নাসাঈ, ২১৬২
অন্যত্র হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘এক ঢোক পানি দ্বারা হলেও, তোমরা সাহরি গ্রহণ করো। -ইবনে হিব্বান, ৩৪৭৬
হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে রমজান যাপন করেছেন ভারতীয় উপমহাদেশের আলেম মনীষীদের জীবনাচারেও আমরা এর গভীর অনুশীলন দেখতে পাই।
মাদানি (রহ.)-এর দস্তরখানে ইফতারের সময় সাধারণত খেজুর, জমজম, নাশপাতি, আনারস, সাগর কলা, পেয়ারা, আম, বসরি খেজুর, ডাব, পেঁপে, জর্দ্দা, চানাবুট, ফুলরি এবং সেদ্ধ ডিম থাকতো। ইফতারের সময় দস্তরখানজুড়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে যেতো। কিন্তু হজরত মাদানি (রহ.) ধ্যানের মধ্যে নিমগ্ন থেকে নিশ্চুপ থাকতেন।
হাদিসে এসেছে রোজাদারের জন্য দু’টি মুহূর্ত আনন্দের। তার মধ্যে একটি হলো ইফতারের সময়। হজরতের দস্তরখানে সেই হাদিসের বাস্তব নমুনা ছিল।
ইফতারের জায়গা ছিল মসজিদের নিকটেই। কিন্তু আসরের পর কোরআন তেলাওয়াত শেষ হলে মোরাকাবা এবং ধ্যানে এতো গভীরভাবে নিমগ্ন হতেন যে, অনেক দিন মাগরিবের আজানের কথা পর্যন্ত বলে দেওয়া লাগতো। বিভিন্ন ধরণের ইফতারির আয়োজন থাকা সত্ত্বেও হজরত শুধু খেজুর ও জমজম গ্রহণ করার পর কোনো ফলের একটি ফালি খেয়ে ডাবের পানি পান করতেন। পরে এক-আধ পেয়ালা চা পান করতেন। তবে সবার খাবার শেষ হওয়া পর্যন্ত দস্তরখানে বসে থাকতেন। কখনও কখনও সঙ্গিদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের কথা বলতে থাকতেন। ইফতারিতে প্রায় আট-দশ মিনিট সময় ব্যয় হতো। -আকাবির কা রমজান: ৪৮

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন