চার খলিফার প্রতি মিলাদুন্নবী পালনের নেসবত আগাগোড়া মিথ্যা ও বানোয়াট হওয়ার প্রমাণ দেখুন!!
.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
প্রিয় মুসলিম বন্ধুরা! রেজভি তথা বেরলবি সহ বিদয়াতিদের একটি অংশ কতিপয় ভুল ও বানোয়াট রেওয়ায়েত দ্বারা বিশিষ্ট চার খলিফার প্রতি মিলাদুন্নবী পালনের মিথ্যা দাবি করে থাকে। আমরা তাদের দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হাদিসের কিতাব সমূহে সেগুলোর সূত্র বা সনদ অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কিছুই পাইনি। তাদের দেওয়া রেওয়ায়েতগুলোর সনদ তো দূরের কথা, হাদিস এবং গ্রহণযোগ্য সিরাতের কোনো কিতাবে তাদের দেওয়া রেওয়ায়েতগুলোও খুঁজে পাওয়া যায় না।
.
কিন্তু আল্লামা ইমাম সুয়ূতী, ইবনে কাছীর, ইবনে খালদূন, ইমাম হাফেজ সাখাবী ও আল্লামা ইবনে হাজার আল-হাইছামী (আলাইহিমুর রহমাহ) উনাদের প্রত্যেকের বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলাম যে, মিলাদুন্নবী নামক প্রচলিত আমলটি ৬০৪ হিজরী মুতাবেক ১২০৮ খ্রিষ্টাব্দের গোড়ার দিকেই ইরাকি বাদশাহ মুজাফফর উদ্দিনের আমলে মুসল শহরে সর্বপ্রথম উদ্ভাবিত হয়েছিল। ইতিপূর্বে এর কোনো অস্তিত্ব ছিলনা। বিস্তারিত পড়ুন!
.
প্রথমত তাদের দেওয়া রেওয়ায়েতগুলো (জাল হাদিসগুলো) নিচে উল্লেখ করছি। তারপর আমাদের জবাব নিয়ে আসা হবে। জাল হাদিস গুলো দেখুন!
.
(১) ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা)-এর নামে প্রচার করা হয় যে, তিনি নাকি বলেছেন- ﻣَﻦْ ﺍَﻧْﻔَﻖَ ﺩِﺭْﻫَﻤًﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻗِﺮﺍ ﺓَ ﻣَﻮْ ﻟِﺪِ ﺍﻟﻨَّﺒﻰُ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥ ﺭﻓﻴﻘﻲ ﻓﻰِ ﺍﻟﺠَﻨّﺔِ
অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে এক দিরহাম খরচ করবে সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে”।
.
(২) দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা)
-এর নামে প্রচার করা হয় যে, তিনি নাকি বলেছেন- ﻣَﻦْ ﻋَﻈَّﻢَ ﻣَﻮْﻟِﺪِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰُ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻓَﻘَﺪْ َﺍﺣﻴﺎ ﺍﻻﺳْﺎﻻَﻡُ
অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মান করলো, সে অবশ্যই ইসলামকে জীবিত করলো”।
.
(৩) তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান বিন আফফান (রা) -এর নামে প্রচার করা হয় যে, তিনি নাকি বলেছেন – ﻣَﻦْ ﺍَﻧْﻔَﻖَ ﺩِﺭْﻫَﻤًﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻗﺮﺃﺓ ﻣَﻮْﻟِﺪِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰُ ﺻَﻠّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢْ ﻓَﻜَﺎ ﻧَّﻤَﺎ ﺛَﻬِﻴﺪ ﻏَﺰُﻭَﺓِ ﺑَﺪَﺭ َﻭﺣُﻨَﻴْﻦُ
.
অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করার জন্য এক দিরহাম খরচ করল- সে যেন বদর ও হুনাইনের জিহাদে শরীক হলো”।
.
(৪) চুতর্থ খলিফা হযরত আলি কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু -এর নামে প্রচার করা হয় যে, তিনি নাকি বলেছেন- ﻣَﻦْ ﻋَﻈَّﻢَ ﻣَﻮْ ﻟِﺪِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰ ﺻَﻠّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَ ﺳَﻠَّﻢَ ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺳَﺒَﺒَﺎ ﻟِﻘﺮﺍ ﺗﻪ ﻻ ﻳَﺨﺮﺝ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﺍِﻻ َّﺑِﺎﻻِ ﻳْﻤَﺎﻥِ ﻭَﻳَﺪْﺧُﻞُ ﺍﻟﺠَﻨَّﻪَ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﺣِﺴَﺎﺏ
অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাকে সম্মান করবে, সে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করবে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে”।
.
(সংগৃহীত : আন-নি’মাতুল কুবরা আলাল আ’লাম, পৃষ্ঠা নং ৭-৮)।
.
√ এবার আমাদের পক্ষ থেকে উক্ত রেওয়ায়েতগুলোর ভিত্তিহীনতার প্রমাণ :
.
শুরুতে জেনে নিন যে, শরিয়তে মুহাম্মদি এর ভেতর মিলাদুন্নবী নামের কোনো আমলের অস্তিত্ব ছাহাবী, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ী উনাদের কারো যুগে ছিলনা।
.
শরিয়তে মুহাম্মদি এর ভেতর দরূদুন্নবী সর্বকালে ছিল, আছে এবং থাকবে। মিলাদুন্নবী আর দরূদুন্নবী এদুটির ভেতর আক্ষরিক এবং ব্যবহারিক দু’দিক থেকে অসম ব্যবধান রয়েছে। বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম থেকে এ বিষয়টি জেনে নেয়া যেতে পারে। কাজেই দুটিকে একাকার করে গুলিয়ে ফেলা মারাত্মক জুলুম ও অজ্ঞতার শামিল। ইতিহাস স্বাক্ষী রয়েছে যে, মিলাদুন্নবী নামের আমলটি একটি নতুন বানোয়াট আমল। যার সাথে নবী, সাহাবি, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ী এঁদের কারোই সম্পর্ক নেই।
.
খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রায় ৫৭৪ বছর পর, সাহাবাদের যুগের প্রায় ৪৯৪ বছর পর, তাবেঈনদের যুগের ৪৩৪ বছর পর, তাবে তাবেঈনদের যুগের ৩৮৪ বছর পর, ইমামে আযম আবু হানিফা রহঃ এর যুগের ৪৫৪ বছর পর, ইমাম শাফেয়ীর যুগের ৪০০ বছর পর, ইমাম মালেক এর যুগের ৪৩৫ বছর পর, ইমাম আহমদ এর যুগের ৩৬৩ বছর পর, ইমাম বুখারীর যুগের ৩৪৮ বছর পর, ইমাম মুসলিম এর ৩৪৩ বছর পর, ইমাম আবু দাউদ এর ৩২৯ বছর পর, ইমাম নাসায়ী এর ৩০১ বছর পর, ইমাম তিরমিযী এর ৩২৫ বছর পর, ইমাম ইবনে মাজা এর ২৯৫ বছর পর ইতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী ৬০৪ হিজরী মুতাবিক ১২০৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রচলিত মিলাদুন্নবী উদযাপন করার প্রথাটির আবিস্কার হয়।
.
√ এবার দেখা যাক, মিলাদী আমলটির আবিস্কার কাল সম্পর্কে মুহাদ্দেসীন ও ঐতিহাসিকদের কোনো বক্তব্য রয়েছে কিনা?
.
আলহামদুলিল্লাহ, ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ্! আমরা খুব মজবুতির সাথেই এমন কিছু তথ্য পেয়ে যাই যা রেজভি ও বেরলবি সহ তাবত মিলাদি বিদয়াতিদের নিকটও গ্রহণযোগ্য হবে। সংক্ষেপে নিম্নরূপ —
.
১-
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাসসির, তাফসীরে জালালাইন কিতাবের রচয়িতা আল্লামা জালালুদ্দিন আস-সুয়ূতী (রহ) [মৃত ৯১১ হিজরী] খোদ নিজেও “আল-হাভী লিল ফাতাওয়া” নামক কিতাবের অন্তর্গত ‘হুসনুল মাকছাদ ফী আমালিল মওলিদ’ নামক একটি পত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে লিখেছেন :
.ﺤﺎﻓﻆ ﺟﻼﻝ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺍﻟﺴﻴﻮﻃﻲ ﺍﻟﻤﺘﻮﻓﻰ ﺳﻨﺔ 911 ﻫـ ﻛﺘﺎﺏ ﺳﻤﺎﻩ ﺍﻟﺤﺎﻭﻯ ﻟﻠﻔﺘﺎﻭﻯ ﻓﻴﻪ ﺭﺳﺎﻟﺔ ﺳﻤﺎﻫﺎ ( ﺣﺴﻦ ﺍﻟﻤﻘﺼﺪ ﻓﻲ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ) ﻗﺎﻝ : ﻓﻘﺪ ﻭﻗﻊ ﺍﻟﺴﺆﺍﻝ ﻋﻦ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﻓﻲ ﺷﻬﺮ ﺭﺑﻴﻊ ﺍﻷﻭﻝ ﻣﺎ ﺣﻜﻤﻪ ﻣﻦ ﺣﻴﺚ ﺍﻟﺸﺮﻉ ؟ ﻭ ﻫﻞ ﻫﻮ ﻣﺤﻤﻮﺩ ﺃﻡ ﻣﺬﻣﻮﻡ ؟ ﻭ ﻫﻞ ﻳﺜﺎﺏ ﻓﺎﻋﻠﻪ ﺃﻡ ﻻ ؟ ﻭ ﺍﻟﺠﻮﺍﺏ ﻋﻨﺪﻱ : ﺃﻥ ﺃﺻﻞ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﻫﻮ ﺍﺟﺘﻤﺎﻉ ﺍﻟﻨﺎﺱ ، ﻭﻗﺮﺍﺀﺓ ﻣﺎ ﺗﻴﺴﺮ ﻣﻦ ﺍﻟﻘﺮﺀﺍﻥ ﻭ ﺭﻭﺍﻳﺔ ﺍﻷﺧﺒﺎﺭ ﺍﻟﻮﺍﺭﺩﺓ ﻓﻲ ﻣﺒﺪﺃ ﺃﻣﺮ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻭ ﻣﺎ ﻭﻗﻊ ﻓﻲ ﻣﻮﻟﺪﻩ ﻣﻦ ﺍﻵﻳﺎﺕ ﺛﻢ ﻳﻤﺪ ﻟﻬﻢ ﺳﻤﺎﻁ ﻳﺄﻛﻠﻮﻧﻪ ﻭ ﻳﻨﺼﺮﻓﻮﻥ ﻣﻦ ﻏﻴﺮ ﺯﻳﺎﺩﺓ ﻋﻠﻰ ﺫﻟﻚ ﻫﻮ ﻣﻦ ﺍﻟﺒﺪﻉ ﺍﻟﺤﺴﻨﺔ ﺍﻟﺘﻲ ﻳﺜﺎﺏ ﻋﻠﻴﻬﺎ ﺻﺎﺣﺒﻬﺎ ﻟﻤﺎ ﻓﻴﻪ ﻣﻦ ﺗﻌﻈﻴﻢ ﻗﺪﺭ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻭ ﺇﻇﻬﺎﺭ ﺍﻟﻔﺮﺡ ﻭ ﺍﻻﺳﺘﺒﺸﺎﺭ ﺑﻤﻮﻟﺪﻩ ﺍﻟﺸﺮﻳﻒ .
ﻭ ﺃﻭﻝ ﻣﻦ ﺃﺣﺪﺙ ﻓﻌﻞ ﺫﻟﻚ ﺻﺎﺣﺐ ﺇﺭﺑﻞ ﺍﻟﻤﻠﻚ ﺍﻟﻤﻈﻔﺮ ﺃﺑﻮ ﺳﻌﻴﺪ ﻛﻮﻛﺒﺮﻱ ﺑﻦ ﺯﻳﻦ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﻋﻠﻲ ﺑﻦ ﺑﻜﺘﻜﻴﻦ ﺃﺣﺪ ﺍﻟﻤﻠﻮﻙ ﺍﻷﻣﺠﺎﺩ ﻭ ﺍﻟﻜﺒﺮﺍﺀ ﺍﻷﺟﻮﺍﺩ ، ﻭ ﻛﺎﻥ ﻟﻪ ﺀﺍﺛﺎﺭ ﺣﺴﻨﺔ ، ﻭ ﻫﻮ ﺍﻟﺬﻱ ﻋﻤّﺮ ﺍﻟﺠﺎﻣﻊ ﺍﻟﻤﻈﻔﺮﻱ ﺑﺴﻔﺢ ﻗﺎﺳﻴﻮﻥ . ﺍﻧﺘﻬﻰ ﻛﻼﻣﻪ . .
অর্থাৎ …..সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী সাঃ পালনের সূচনা করেছেন তিনি ছিলেন ইরবলের বাদশাহ আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন কূকবরী ইবনে যাইনুদ্দী ইবনে বুকতকীন (মৃত ৬৩৫ হিজরী) ।তিনি অতিব প্রতাবশালী ও বড় দানবীর। তার সুন্দর সুন্দর কতেক কীর্তিও রয়েছে।
.
সুতরাং প্রমাণ হয়ে গেল, খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীকালের ইরাকি বাদশাহ মুজাফফর উদ্দিন এর পূর্বে মিলাদুন্নবী নামের কোনো আমল বিদ্যমান থাকার দাবি সঠিক নয়। কাজেই চার খলিফার নামে প্রচারিত উপরের বর্ণনাগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট, হাদিসের কোনো কিতাবেই এগুলো খুঁজে পাওয়া যায়না। তাই এগুলো দিয়ে মিলাদুন্নবী নামের নতুন উদ্ভাবিত আমলটির আত্মরক্ষা করা সম্ভব নয়।
.
√ প্রিয়পাঠক! হয়ত ভাবছেন যে, আল্লামা সুয়ূতী (রহ) এর উক্ত বক্তব্যটির সমর্থনে বিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য কোনো মুহাক্কিক সালফে-সালেহীনের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য আছে কি? .
শুনে খুব অবাক হবেন যে, একই বক্তব্য আরো অনেক মুহাক্কিক ও মুহাদ্দিসের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। তন্মধ্যে তাফসীরে ইবনে কাছীর প্রণেতা, দামেস্ক বংশোদ্ভূত আল্লামা হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ) স্বীয় রচিত ইতিহাস গ্রন্থ “আল-বাদায়া ওয়ান নিহায়া” কিতাবের ৩নং খন্ডের ১৩৬ নং পৃষ্ঠায় সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন : ﻗﺎﻝ ﺍﺑﻦ ﻛﺜﻴﺮ ﻓﻲ ﺗﺎﺭﻳﺨﻪ ﺍﻟﻤﺴﻤﻰ ﺍﻟﺒﺪﺍﻳﺔ ﻭ ﺍﻟﻨﻬﺎﻳﺔ ( 3/136 ) : ” ﻛﺎﻥ ﻳﻌﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﺍﻟﺸﺮﻳﻒ ـ ﻳﻌﻨﻲ ﺍﻟﻤﻠﻚ ﺍﻟﻤﻈﻔﺮ ـ ﻓﻲ ﺭﺑﻴﻊ ﺍﻷﻭﻝ ﻭ ﻳﺤﺘﻔﻞ ﺑﻪ ﺍﺣﺘﻔﺎﻟًﺎ ﻫﺎﺋﻠًﺎ
.
অর্থাৎ রবিউল আওয়াল মাসে বাদশাহ মুজাফফর মিলাদুন্নবীর আমল পালন করত এবং খুব আড়ম্বরপূর্ণ মাহফিল করত।
.
৩-
বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ “তারিখে ইবনু খালদূন” গ্রন্থের লেখক, বিখ্যাত ঐতিহাসিক মুসলিম স্কলার আল্লামা ইবনে খালদূন (রহ) তিনি “ওয়াফাইয়াতুল আ’ইয়ান” কিতাবের ৩নং খন্ডের ৪৪৯ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন : ﻗﺎﻝ ﺍﺑﻦ ﺧﻠﻜﺎﻥ ﻓﻲ ﻭﻓﻴﺎﺕ ﺍﻟﻌﻴﺎﻥ ( 3/449 ) ﻓﻲ ﺗﺮﺟﻤﺔ ﺍﻟﺤﺎﻓﻆ ﺍﺑﻦ ﺩﺣﻴﺔ : ” ﻛﺎﻥ ﻣﻦ ﺃﻋﻴﺎﻥ ﺍﻟﻌﻠﻤﺎﺀ ﻭ ﻣﺸﺎﻫﻴﺮ ﺍﻟﻔﻀﻼﺀ ، ﻗﺪﻡ ﻣﻦ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻓﺪﺧﻞ ﺍﻟﺸﺎﻡ ﻭﺍﻟﻌﺮﺍﻕ ، ﻭ ﺍﺟﺘﺎﺯ ﺑﺈﺭﺑﻞ ﺳﻨﺔ ﺃﺭﺑﻊ ﻭ ﺳﺘﻤﺎﺋﺔ ﻓﻮﺟﺪ ﻣﻠﻜﻬﺎ ﺍﻟﻤﻌﻈﻢ ﻣﻈﻔﺮ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺑﻦ ﺯﻳﻦ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﻳﻌﺘﻨﻲ ﺑﺎﻟﻤﻮﻟﺪ ﺍﻟﻨﺒﻮﻱ ، ﻓﻌﻤﻞ ﻟﻪ ﻛﺘﺎﺑﺎ ( ﺍﻟﺘﻨﻮﻳﺮ ﻓﻲ ﻣﻮﻟﺪ ﺍﻟﺒﺸﻴﺮ ﺍﻟﻨﺬﻳﺮ ) ، ﻭ ﻗﺮﺃﻩ ﻋﻠﻴﻪ ﻓﺄﺟﺎﺯﻩ ﺑﺄﻟﻒ ﺩﻳﻨﺎﺭ ” . ﺍﻧﺘﻬﻰ ﻛﻼﻣﻪ
.
অর্থাৎ ইবনে দিহইয়া বিখ্যাত ও নেতৃস্থানীয় বিদ্যান ব্যক্তিদের অন্যতম ছিল। তিনি মরক্কো থেকে দামেস্ক এবং ইরাকে ঢুকলেন। ৬০৪ হিজরীতে “ইরবল” নগরে এলেন। ইরবলের সম্মানিত বাদশাহ আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন কূকবরী ইবনে যাইনুদ্দীনকে মিলাদুন্নবী পালনকরা অবস্থায় পেলেন। তিনি তাকে (মিলাদি আমলের) একখানা পুস্তকও রচনা করে দেন। বাদশাহ বিনিময় হিসেবে তাকে একহাজার স্বর্ণমুদ্রা দেন।
.
৪-
বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ সাখাবী (রহ) তিনিও স্বীয় ফতুয়ার কিতাব “আল-আজবিবাতুল মারদ্বিয়্যাহ” কিতাবের ৩নং খন্ডের ১১১৬ নং পৃষ্ঠায় একই বক্তব্য পাওয়া গেছে। তিনি লিখেছেন : ﺍﻟﺤﺎﻓﻆ ﺍﻟﺴﺨﺎﻭﻱ ﻓﻲ ﻓﺘﺎﻭﻳﻪ ﻓﻲ ﺍﻻﺟﻮﺑﺔ ﺍﻟﻤﺮﺿﻴﺔ ﺝ 3 ﺹ 1116 ﻋﻦ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﻓﻘﺎﻝ ﻟﻢ ﻳﻨﻘﻞ ﻋﻦ ﺍﺣﺪ ﻣﻦ ﺍﻟﺴﻠﻒ ﺍﻟﺼﺎﻟﺢ ﻓﻲ ﺍﻟﻘﺮﻭﻥ ﺍﻟﺜﻼﺛﺔ ﺍﻟﻔﺎﺿﻠﺔ، ﻭﺇﻧﻤﺎ ﺣﺪﺙ ﺑﻌﺪ، ﺛﻢ ﻣﺎ ﺯﺍﻝ ﺃﻫﻞ ﺍﻹﺳﻼﻡ ﻣﻦ ﺳﺎﺋﺮ ﺍﻷﻗﻄﺎﺭ ﻭ ﺍﻟﻤﺪﻥ ﺍﻟﻌﻈﺎﻡ ﻳﺤﺘﻔﻠﻮﻥ ﻓﻲ ﺷﻬﺮ ﻣﻮﻟﺪﻩ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻭ ﺷﺮﻑ ﻭ ﻛﺮﻡ ﻳﻌﻤﻠﻮﻥ ﺍﻟﻮﻻﺋﻢ ﺍﻟﺒﺪﻳﻌﺔ ﺍﻟﻤﺸﺘﻤﻠﺔ ﻋﻠﻰ ﺍﻻﻣﻮﺭ ﺍﻟﺒﻬﺠﺔ ﺍﻟﺮﻓﻴﻌﺔ، ﻭﻳﺘﺼﺪﻗﻮﻥ ﻓﻲ ﻟﻴﺎﻟﻴﻪ ﺑﺄﻧﻮﺍﻉ ﺍﻟﺼﺪﻗﺎﺕ، ﻭﻳﻈﻬﺮﻭﻥ ﺍﻟﺴﺮﻭﺭ ، ﻭ ﻳﺰﻳﺪﻭﻥ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﺒﺮﺍﺕ ﺑﻞ ﻳﻌﺘﻨﻮﻥ ﺑﻘﺮﺍﺀﺓ ﻣﻮﻟﺪﻩ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢ ، ﻭﺗﻈﻬﺮ ﻋﻠﻴﻬﻢ ﻣﻦ ﺑﺮﻛﺎﺗﻪ ﻛﻞ ﻓﻀﻞ ﻋﻤﻴﻢ ﺑﺤﻴﺚ ﻛﺎﻥ ﻣﻤﺎ ﺟُﺮﺏ ﻗﺎﻟﻪ ﺍﻻﻣﺎﻡ ﺷﻤﺲ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺍﺑﻦ ﺍﻟﺠﺰﺭﻱ …
.
অর্থাৎ সালফে-সালেহীনের সর্বোত্তম তিন যুগে এর কোনো প্রমাণ নেই। নিঃসন্দেহ এটি (অনেক দিন) পরেই উদ্ভাবিত হয়েছে। কালক্রমে মুসলিম উম্মাহ এটি সর্বোপরি ও বড় বড় শহরগুলোতে নবীজির জন্মদিবসে মিলাদুন্নবীর মাহফিল করা আরম্ভ করে।
.
৫-
অনুরূপ অভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে হাজার আল-হাইছামী (রহ) এর কিতাব “আল-ফাতাওয়াল কুবরা” নামক কিতাবের ১নং খন্ডের ১৯৬ নং পৃষ্ঠায়ও। তিনি লিখেছেন : ﻗﺎﻝ ﺍﻹﻣﺎﻡ ﺍﺑﻦ ﺣﺠﺮ ﺍﻟﻌﺴﻘﻼﻧﻲ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ : ( ﺃﺻﻞ ﻋﻤﻞ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﺑﺪﻋﺔ ﻟﻢ ﺗﻨﻘﻞ ﻋﻦ ﺃﺣﺪ ﻣﻦ ﺍﻟﺴﻠﻒ ﺍﻟﺼّﺎﻟﺢ ﻣﻦ ﺍﻟﻘﺮﻭﻥ ﺍﻟﺜﻼﺛﺔ ﻭﻟﻜﻨﻬﺎ ﻣﻊ ﺫﻟﻚ ﻗﺪ ﺍﺷﺘﻤﻠﺖ ﻋﻠﻰ ﻣﺤﺎﺳﻦ ﻭﺿﺪﻫﺎ، ﻓﻤﻦ ﺗﺤﺮﻯ ﻓﻲ ﻋﻤﻠﻬﺎ ﺍﻟﻤﺤﺎﺳﻦ، ﻭﺟﻨّﺐ ﺿﺪّﻫﺎ ﻛﺎﻥ ﺑﺪﻋﺔ ﺣﺴﻨﺔ، ﻭﺇﻻ ﻓﻼ،
.
অর্থাৎ মিলাদুন্নবী পালনের এ আমল নতুন আবিষ্কৃত। সালফে-সালেহীনের সর্বোত্তম তিন যুগে এর কোনো প্রমাণ নেই। তথাপি এতে ভাল মন্দ দুটোই রয়েছে…।
.
৬-
মিলাদীদের অন্যতম শীর্ষ নেতা মৌঃ সালামত উল্লাহ সাহেব তার “আদ্দুররুল মুনাযযাম” পুস্তকেরহ ৭২ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন: ﺍﻭﻝ ﻛﺴﻲ ﻛﻪ ﺍﺑﺘﺪﺍﺋﺲ ﺳﺎﺧﺘﻪ ﺷﻴﺦ ﻋﻤﺮ ﺑﻦ ﻣﻼ ﻣﺤﻤﺪ ﻣﻮﺻﻠﻲ ﺍﺳﺖ ﻭ ﺍﻭﻝ ﻛﺴﻴﻜﻪ ﺍﺯ ﻣﻠﻮﻙ ﺑﺎﺷﺘﻬﺎﺭﺵ ﺑﺮ ﺩﺍﺧﺘﻪ ﻣﻠﻚ ﻣﻈﻔﺮ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺍﺑﻮ ﺳﻌﻴﺪ ﻛﻮﻛﻮﺭﻱ ﺑﻦ ﺯﻳﻦ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺑﺎﺩﺷﺎﻩ ﺍﺭﺑﻞ ﺍﺳﺖ .
অর্থাৎ সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী সাঃ পালনের সূচনা করেছেন তিনি ছিলেন শেখ উমর বিন মোল্লা মুসলী (মৃত ৬৩৫ হিজরী) । আর যে বাদশাহ সর্বপ্রথম এর প্রচলন করেন তিনি হলেন মুজাফফর উদ্দিন আবু সাঈদ কুকুরী বিন যাইনুদ্দীন শাহে ইরবল।”
.
উপসংহার :
আগাগোড়া বিশ্লেষণ করে আমরা বলতে পারি যে, আল্লামা ইমাম সুয়ূতী, ইবনে কাছীর, ইবনে খালদূন, ইমাম হাফেজ সাখাবী ও আল্লামা ইবনে হাজার আল-হাইছামী (আলাইহিমুর রহমাহ) উনাদের প্রত্যেকের বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, মিলাদুন্নবী নামক প্রচলিত আমলটি ৬০৪ হিজরী মুতাবেক ১২০৮ খ্রিষ্টাব্দের গোড়ার দিকেই ইরাকি বাদশাহ মুজাফফর উদ্দিনের আমলে মুসল শহরে সর্বপ্রথম উদ্ভাবিত হয়েছিল। ইতিপূর্বে এর কোনো অস্তিত্ব ছিলনা।
.
কাজেই চার খলিফা (আবুবকর, উমর, উসমান ও আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)’র জীবনকাল যেহেতু আরো অনেক আগেই অতিবাহিত হয়ে গেছে সেহেতু বর্তমানকালের নব উদ্ভাবিত “মিলাদুন্নবী” নামক ভুঁইফোড় আমলটির সাথে উনাদের কোনো প্রকারের সম্পর্ক না থাকাই প্রমাণিত হল। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই পরিষ্কার হয়ে গেল যে, চার খলিফার সাথে সম্পর্কযুক্ত উল্লিখিত রেওয়ায়েতগুলো জাল ও ভিত্তিহীন। ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের নিকট এ সমস্ত রেওয়ায়েতগুলোর কোনো মূল্যই নেই। জ্ঞানীদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। ওয়াসসালাম।
.
লেখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন