পৃথিবীর সকল মানুষ মিলে একটি পরিবার। আদমের পরিবার। কুদরতের অশেষ মহিমায় এ পরিবার সৃষ্টি করেছেন এক আল্লাহ। অনন্তর বেধেঁ দিয়েছেন দয়া ও মায়ার বাধঁনে। আবাদ করেছেন এই জগত দয়ামায়া, প্রেম ভালোবাসাস্নাত বন্ধনে। অতঃপর এর আবাদ প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অব্যাহত গতিতে বহমান রাখার ব্যবস্থাও করেছেন অতীব সুচারু রূপে ও সন্তর্পণে। সেই লক্ষে কুদরতের অপার মহিমায় সৃষ্টি করেছন প্রজনন ধারা। সৃষ্টি করেছেন প্রজনন মাধ্যম নর- নারী। সেই প্রজনন ধারা অব্যাহত গতিতে বহমান রাখার লক্ষেই মানবের রক্তে মাংসের রন্ধে রন্ধে ছড়িয়ে দিয়েছেন কাম-ক্ষুধা। অনন্তর সেই কাম তৃষ্ণা নিবারণের বৈধ পথ নির্দেশ করে আহ্বান করেছেন সে পথে পরিতৃপ্ত হতে। আর সে পথই হলো বিয়ে। যে পথে যৌনক্ষুদা সার্থক করার প্রতি আহ্বান করেছেন স্বয়ং আল্ল াহ ও তাঁর রাসূল সা.। ইরশাদ হয়েছে- তোমাদের মধ্যে যে সকল পুরুষের স্ত্রী নেই এবং যে সকল নারীর স্বামী নেই তাদের এবং তোমাদের দাস দাসীদের মধ্যে যারা সৎর্কমপরায়ণ তাদের বিয়ে দিয়ে দাও। [সূরা নূর-৩২] পরম দয়ালু চরম বাস্তববাদী মুহাম্মদ সা. বলেছেন, এভাবে- হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করতে সক্ষম তারা যেন বিয়ে করে নেয়। কারণ বিয়ে দৃষ্টি অবনত রাখতে ও লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষায় অধিক সহায়ক। আর যে বিয়ে করতে অক্ষম সে যেন রোযা রাখে। কারণ রোযা তার যৌনক্ষুধাকে দমিত করবে। [বুখারী: ২/৭৫৮; মুসলিম :১/৪৪৯; ইবনে মাজাহ :১৩২]
একথা অবিসংবাদিত সত্য ও সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত, বিয়ে একজন সুস্থ মানুষের স্বভাবজাত প্রয়োজন। মানবের স্বভাবগত পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও মানসিক ভারসাম্যতার অন্যতম উপায় বিয়ে। রক্ত-মাংসে সৃষ্ট মানবের দেহে যে কাম-ক্ষুধার সঞ্চার হয় বয়সের পরতে পরতে তা তো এক অকাট্য বাস্তবতা। এজন্যই পরম সুখের অনিন্দ্য বাসর বেহেশতে বসেও প্রথম মানব আদম আ. ভুগছিলেন অতৃপ্তি ও ঔদাসিন্যে। সকল কিছুর পূর্ণাঙ্গ আয়োজনের মাঝেও অনুভব করছিলেন একটা কিছু ‘নাই’ এর। তাই মহাপ্রজ্ঞাময় অন্তরযামী আল্লাহ তাআলা প্রথম নারী হাওয়া আ. কে সৃষ্টি করলেন তার জীবন সঙ্গিনীরূপে। শুরু হলো নর-নারীর যুগল বাঁধনে মানব জীবন। তৃপ্ত হলেন আদম আ.। দুর হলো ঔদাসিন্য ও নিঃসঙ্গতা। পূর্ণতায় ভরে উঠল তার জীবন। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- হে মানব, তোমরা ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে; যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং যিনি সৃষ্টি করেছেন তার থেকে তার স্ত্রীকে আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত নর- নারী। [সূরা- নিসা:১]
পবিত্র এই আয়াতটির ভাষ্যমতে, মহান আল্লাহ তাআলা একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছেন এই বিশাল মানব সংসার। এ তার অভাবিত কুদরতের বিন্দু বিকাশ। অতঃপর এক বাবা ও এক মায়ের বন্ধন সূত্রে গেঁথে দিয়ে সকল মানুষকে করেছেন পরষ্পরে করূণাশীল। পার্থিব জীবনযাত্রা, সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও স্থিতিশীলতার জন্যে যা ভিত্তিস্বরূপ। একথা অকাট্য সত্য, মানুষের মধ্যে রয়েছে বিয়ে করার স্বভাবজাত চাহিদা ও কাম-ক্ষুধা। যে কারণে সে পরনারীর দিকে তাকায় লোলুপ দৃষ্টিতে, কখনও কখনও উপনীত হয় নিষিদ্ধ সীমানায়। স্খলিত আচরণে অপবিত্র হয় সমাজ জীবন। ক্লেদাক্ত হয় পরিবেশ। মানবতা পরাজিত হয় পাশবিকতার নখর আচঁড়ে। যৌন তরঙ্গের নষ্ট আঘাতে পাপের সাগরে হারিয়ে যায় মানব চরিত্রের ভিটেমাটি। এই বাস্তবতাকেই অকপটে স্বীকার করেছেন আমাদের পরম প্রিয় হযরত মুহাম্মদ সা. এবং তার প্রতিকার ব্যবস্থারুপে উপদেশ দিয়েছেন বিয়ের। কারণ কাম-ক্ষুধার উত্তাল তরঙ্গ নিয়ন্ত্রিত করার একমাত্র বৈধ উপায় বিয়ে। বিয়ের মাধ্যমেই তা যথার্থ ধারায় প্রবাহিত হতে পারে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- তোমাদের স্ত্রীরা হলো (সন্তান প্রসবের) তোমাদের ক্ষেত্র। তোমরা যে ভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার কর। [সূরা বাকারা : ২২৩]
হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, (ভিন্ন পুরুষের জন্য) পর নারীর আগমন-প্রত্যাগমন শয়তানের আগমন প্রত্যাগমন সাদৃশ। যখন তোমাদের কারোর নিকট কোন নারীকে ভালো লাগে এবং তার প্রতি দৃষ্টি পড়ায় তোমাদের কারো মনে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, তাহলে সে যেন স্বীয় স্ত্রীর নিকট গমন করে সহবাস করে নেয়। এটা তার অন্তরে উদ্ভূত ঐ অবস্থা বিদূরিত করে দিবে। [মুসলিম : ১/৪৪৯-৪৫০]
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে – আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সা. এর দৃষ্টিতে জনৈক নারী নিপতিত হলো, এতে তার মনে প্রভাব পড়ায় তিনি তৎক্ষণাৎ স্বীয় স্ত্রী সাওদা রা. এর নিকট গমন করলেন। তখন সাওদা রা. খোশবু প্রস্তুত করছিলেন আর তার পাশে উপবিষ্টা ছিল কয়েকজন নারী। তারা রাসূলূল্লাহ সা. কে দেখে সাওদা রা. কে একাকী ছেড়ে চলে গেল । তখন তিনি নিজ প্রয়োজন মেটালেন। অতঃপর ঘোষণা করলেন, অপর নারী দর্শনে কোন পুরূষের ভালো লাগলে এবং অন্তরে আকর্ষণ সৃষ্টি হলে সে যেন স্বীয় স্ত্রীর নিকট গমন করে সহবাস করে নেয়, কারণ ঐ নারীর যা আছে তার স্ত্রীরও তা আছে। [দারেমী -মিশকাত২/২৬৯]
মূলত বিশ্বমানবতাকে পঙ্গিল পৃথিবীর অন্ধকার থেকে আলোর পথে তুলে আনার যে মহান ব্রত নিয়ে আমাদের প্রিয় নবীর সা. আবির্ভাব, সে দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন অক্ষরে অক্ষরে। আচার-আচরণ, চাল-চলন, কথা-বার্তা, লেনদেন, চিন্তা-চেতনা স্বভাব-চরিত্র, আমল-আখলাক সকল ক্ষেত্রেই তিনি আঁধার দূর করে ঐশী আলো জ্বেলেছেন অতীব সন্তর্পণে। যে যৌন ক্ষমতার মূল ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানব প্রজনন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণসে ক্ষমতা যেন যথার্থ স্থানে ব্যয়িত হয় এবং সে তাড়ানায় যেন মানুষ উন্মাদনার শিকার না হয়, মানবতা আর পাশবিকতা যেন একাকার না হয়ে পড়ে সে জন্যই বিবাহ প্রথার প্রতি যারপর নাই জোর দিয়েছে ইসলাম ও ইসলামের নবী। শুধু তাই নয়, যে সব কারণে যৌনস্খলনের সৃষ্টি হয় সে সবেরও প্রতিবিধান করেছে অত্যন্ত কঠোর ও সূচারুভাবে। সহজ কথায় কামক্ষুধা নিবারণের বৈধ আয়োজনকে একান্ত সহজ করেছে ইসলাম। সে বৈধ আয়োজন বিয়ের পবিত্র পরশে পরিচ্ছন্ন জীবন লাভে সার্থক হয় পৌরষদীপ্ত যুবক। প্রিয় নবীর আদর্শের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠে তার জীবন ও চারিত্রিক সকল অনুষঙ্গ। তখন সে সুস্থতা ও শুদ্ধতার সাথে মানতে পারে ধর্ম ও আদর্শের যে কোন বিধান প্রফুল্ল চিত্তে। এককথায়, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তা যেভাবে যুক্তিতর্কের উর্ধ্বে। আহার-পানীয় যেভাবে মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য- একজন যৌবনাদীপ্ত মানুষের সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপনের জন্য বিয়ের প্রয়োজনীয়তাও তেমনই। এজন্যই কুরআন-হাদীসে নির্দেশসূচক শব্দে উৎকীর্ণ হয়েছে বিয়ের বাণী। সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. এর বর্ণনায় মহানবী সা. বলেন- যে ব্যক্তি পূতঃপবিত্র অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে চায় সে যেন বিয়ে করে স্বাধীন নারাীকে। [ইবনে মাজাহ:১৩৫]
অপর বর্ণনায় এসেছে আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ সা. বলেন- কোন ব্যক্তি যখন বিয়ে করল তখন সে যেন দ্বীনের অর্ধেকটা পূর্ণ করে ফেলল। এখন সে যেন বাকি অর্ধাংশের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে। [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, মিশকাত:২/২৬৮] কি অপূর্ব ও মূল্যবান বাণী। মানবিক প্রাকৃতিক চাহিদার কারণেই মানুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। অথচ ইসলাম এটাকে পুরো দ্বীনের অর্ধেক এবং প্রভুর সােেথ পূতঃপবিত্র অবস্থায় সাক্ষাতের মাধ্যম বলে আখ্যায়িত করেছে। সম্ভবত এত বড় মর্যাদার কথা অন্য কোন ইবাদত সম্পর্কে বলা হয়নি। কারণ শরীর, মানস ও চরিত্রের শুদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা নির্ভর করে বিয়ের উপর। শোকর ইবাদত-বন্দেগির জন্য যে মানসিক ও চারিত্রিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন তার অধিকাংশই উৎসারিত হয় বৈধ পথে কাম-তৃষ্ণা তৃপ্ত করার মাধ্যমে যার একমাত্র ভিত্তি হলো বিয়ে। সুশৃঙ্খল সুনির্ধারিত পথে যৌন ক্ষুধা পূরণের কল্যাণময় কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে মহানবী সা. বলেছেন- তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই সাহায্য করবেন। ১.স্বাধীন হওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ গোলাম, যে নিজ মুক্তিপন আদায়ের ই”্ছা করে। ২. চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তি। ৩. আল্লাহর পথে জিহাদকারী। [তিরমিযী:২/২৯৫; নাসায়ী:২/৫৮; ইবনে মাজাহ :/১৮১]
মোট কথা : ইসলাম ফিতরাতের ধর্ম। তাই ইসলাম স্বীকার করেছে মানুষের যৌনকামনাকে। তবে একে শৃঙ্খলিত করেছে স্বচ্ছ পবিত্রতা ও বৈধতার বাঁধনে। ইসলাম মনে করে মানুষ সকল সৃষ্টির সেরা। তাই তার কাম- ক্ষুধা নিবারণ পদ্ধতি, যৌন সম্পর্ক ইত্যাদি সকল কিছুই হবে অন্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা যা সম্পাদিত হবে একটি মার্জিত সুনির্ধারিত নিয়মের বাঁধনে। যে পথে পূরণ হবে যৌন-কামনা। সাথে সাথে দলিত হবে না মানব সভ্যতা ও যৌনক্ষমতার মূল লক্ষ্য। এরই নাম বিয়ে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, বিয়ের হুকুম সর্বদা এক থাকেনা। বরং বিয়ের হুকুম আবর্তিত হয় ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক অবস্থার বিবেচনায়। তাই বিয়ে ব্যক্তি বিভেদে ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুওয়াক্কাদা, হারাম, মাকরূহ, মুবাহ ও সুন্নত বলে বিবেচিত হয়। ফরয: যদি কেউ বিয়ে না করলে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে বলে প্রত্যয়নিষ্ট হয় আর বৈধ পন্থায় মোহর ও ভরণ-পোষণ করতেও সক্ষম – এমন ব্যক্তির জন্য বিয়ে করা ফরয। ওয়াজিব : ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার ভয় হয় কিন্তু ব্যভিচারে পড়েই যাবে এমন প্রত্যয়নিষ্ট নয়। হালাল অর্থে স্ত্রীর মোহর ও ভরণ-পোষণ করতেও সক্ষম এমন ব্যক্তির জন্য বিয়ে ওয়াজিব। সুন্নতে মোয়াক্কাদা : ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশংকা নেই। তবে বিয়ে না করলে হালকা পাপের অধিকারী হবে। হালাল অর্থে মোহর ও ভরণ-পোষণ করতেও সক্ষম এমন ব্যক্তির জন্য বিয়ে সুন্নতে মোয়াক্কাদা। হারাম : যদি দৃঢ় বিশ্বাস থাকে বিয়ে করলে স্ত্রী জুলুম ও নিপীড়নের শিকার হবে। স্ত্রীর অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হবে, তাহলে এক্ষেত্রে বিয়ে করা হারাম। মাকরুহ : যদি বিয়ের কারণে স্ত্রী জুলুম- নিপীড়নের শিকার হবে বলে আশংকা হয়। বদ্ধমূল বিশ্বাস না থাকে, তাহলে বিয়ে করা মাকরূহ তাহরীমি। মুবাহ : বিয়ে না করলে ব্যভিচারী হয়ে পড়বে এমন আশংকা নেই; বরং যৌনকামনা পূরণার্থে বিয়ে করেছে- এটা মুবাহ। এক্ষেত্রে যদি নিজেকে পাপমুক্ত রাখা বা মানব বংশ বৃদ্ধির নিয়ত করে তাহলে বিয়ে করা সুন্নাত বলে বিবেচিত হবে। [কিতাবুল ফিকহী আলাল মাযাহিবিল আরবাআ : ৪/৬] বস্তুত যৌনজীবনের পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা আর চারিত্রিক শুদ্ধতা কল্যাণের ধর্ম ইসলামে অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই ইসলাম বিয়েকে করেছে যৌনতৃষ্ণা তৃপ্ত করার বৈধপথ। মানুষ যেন পবিত্র এ পথে সরলভাবে পূরণ করতে পারে যৌবনের চাহিদা। রিপুর টানে নেমে না আসে পশুর সারিতে।
একথা অবিসংবাদিত সত্য ও সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত, বিয়ে একজন সুস্থ মানুষের স্বভাবজাত প্রয়োজন। মানবের স্বভাবগত পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও মানসিক ভারসাম্যতার অন্যতম উপায় বিয়ে। রক্ত-মাংসে সৃষ্ট মানবের দেহে যে কাম-ক্ষুধার সঞ্চার হয় বয়সের পরতে পরতে তা তো এক অকাট্য বাস্তবতা। এজন্যই পরম সুখের অনিন্দ্য বাসর বেহেশতে বসেও প্রথম মানব আদম আ. ভুগছিলেন অতৃপ্তি ও ঔদাসিন্যে। সকল কিছুর পূর্ণাঙ্গ আয়োজনের মাঝেও অনুভব করছিলেন একটা কিছু ‘নাই’ এর। তাই মহাপ্রজ্ঞাময় অন্তরযামী আল্লাহ তাআলা প্রথম নারী হাওয়া আ. কে সৃষ্টি করলেন তার জীবন সঙ্গিনীরূপে। শুরু হলো নর-নারীর যুগল বাঁধনে মানব জীবন। তৃপ্ত হলেন আদম আ.। দুর হলো ঔদাসিন্য ও নিঃসঙ্গতা। পূর্ণতায় ভরে উঠল তার জীবন। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- হে মানব, তোমরা ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে; যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং যিনি সৃষ্টি করেছেন তার থেকে তার স্ত্রীকে আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত নর- নারী। [সূরা- নিসা:১]
পবিত্র এই আয়াতটির ভাষ্যমতে, মহান আল্লাহ তাআলা একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছেন এই বিশাল মানব সংসার। এ তার অভাবিত কুদরতের বিন্দু বিকাশ। অতঃপর এক বাবা ও এক মায়ের বন্ধন সূত্রে গেঁথে দিয়ে সকল মানুষকে করেছেন পরষ্পরে করূণাশীল। পার্থিব জীবনযাত্রা, সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও স্থিতিশীলতার জন্যে যা ভিত্তিস্বরূপ। একথা অকাট্য সত্য, মানুষের মধ্যে রয়েছে বিয়ে করার স্বভাবজাত চাহিদা ও কাম-ক্ষুধা। যে কারণে সে পরনারীর দিকে তাকায় লোলুপ দৃষ্টিতে, কখনও কখনও উপনীত হয় নিষিদ্ধ সীমানায়। স্খলিত আচরণে অপবিত্র হয় সমাজ জীবন। ক্লেদাক্ত হয় পরিবেশ। মানবতা পরাজিত হয় পাশবিকতার নখর আচঁড়ে। যৌন তরঙ্গের নষ্ট আঘাতে পাপের সাগরে হারিয়ে যায় মানব চরিত্রের ভিটেমাটি। এই বাস্তবতাকেই অকপটে স্বীকার করেছেন আমাদের পরম প্রিয় হযরত মুহাম্মদ সা. এবং তার প্রতিকার ব্যবস্থারুপে উপদেশ দিয়েছেন বিয়ের। কারণ কাম-ক্ষুধার উত্তাল তরঙ্গ নিয়ন্ত্রিত করার একমাত্র বৈধ উপায় বিয়ে। বিয়ের মাধ্যমেই তা যথার্থ ধারায় প্রবাহিত হতে পারে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- তোমাদের স্ত্রীরা হলো (সন্তান প্রসবের) তোমাদের ক্ষেত্র। তোমরা যে ভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার কর। [সূরা বাকারা : ২২৩]
হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, (ভিন্ন পুরুষের জন্য) পর নারীর আগমন-প্রত্যাগমন শয়তানের আগমন প্রত্যাগমন সাদৃশ। যখন তোমাদের কারোর নিকট কোন নারীকে ভালো লাগে এবং তার প্রতি দৃষ্টি পড়ায় তোমাদের কারো মনে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, তাহলে সে যেন স্বীয় স্ত্রীর নিকট গমন করে সহবাস করে নেয়। এটা তার অন্তরে উদ্ভূত ঐ অবস্থা বিদূরিত করে দিবে। [মুসলিম : ১/৪৪৯-৪৫০]
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে – আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সা. এর দৃষ্টিতে জনৈক নারী নিপতিত হলো, এতে তার মনে প্রভাব পড়ায় তিনি তৎক্ষণাৎ স্বীয় স্ত্রী সাওদা রা. এর নিকট গমন করলেন। তখন সাওদা রা. খোশবু প্রস্তুত করছিলেন আর তার পাশে উপবিষ্টা ছিল কয়েকজন নারী। তারা রাসূলূল্লাহ সা. কে দেখে সাওদা রা. কে একাকী ছেড়ে চলে গেল । তখন তিনি নিজ প্রয়োজন মেটালেন। অতঃপর ঘোষণা করলেন, অপর নারী দর্শনে কোন পুরূষের ভালো লাগলে এবং অন্তরে আকর্ষণ সৃষ্টি হলে সে যেন স্বীয় স্ত্রীর নিকট গমন করে সহবাস করে নেয়, কারণ ঐ নারীর যা আছে তার স্ত্রীরও তা আছে। [দারেমী -মিশকাত২/২৬৯]
মূলত বিশ্বমানবতাকে পঙ্গিল পৃথিবীর অন্ধকার থেকে আলোর পথে তুলে আনার যে মহান ব্রত নিয়ে আমাদের প্রিয় নবীর সা. আবির্ভাব, সে দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন অক্ষরে অক্ষরে। আচার-আচরণ, চাল-চলন, কথা-বার্তা, লেনদেন, চিন্তা-চেতনা স্বভাব-চরিত্র, আমল-আখলাক সকল ক্ষেত্রেই তিনি আঁধার দূর করে ঐশী আলো জ্বেলেছেন অতীব সন্তর্পণে। যে যৌন ক্ষমতার মূল ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানব প্রজনন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণসে ক্ষমতা যেন যথার্থ স্থানে ব্যয়িত হয় এবং সে তাড়ানায় যেন মানুষ উন্মাদনার শিকার না হয়, মানবতা আর পাশবিকতা যেন একাকার না হয়ে পড়ে সে জন্যই বিবাহ প্রথার প্রতি যারপর নাই জোর দিয়েছে ইসলাম ও ইসলামের নবী। শুধু তাই নয়, যে সব কারণে যৌনস্খলনের সৃষ্টি হয় সে সবেরও প্রতিবিধান করেছে অত্যন্ত কঠোর ও সূচারুভাবে। সহজ কথায় কামক্ষুধা নিবারণের বৈধ আয়োজনকে একান্ত সহজ করেছে ইসলাম। সে বৈধ আয়োজন বিয়ের পবিত্র পরশে পরিচ্ছন্ন জীবন লাভে সার্থক হয় পৌরষদীপ্ত যুবক। প্রিয় নবীর আদর্শের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠে তার জীবন ও চারিত্রিক সকল অনুষঙ্গ। তখন সে সুস্থতা ও শুদ্ধতার সাথে মানতে পারে ধর্ম ও আদর্শের যে কোন বিধান প্রফুল্ল চিত্তে। এককথায়, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তা যেভাবে যুক্তিতর্কের উর্ধ্বে। আহার-পানীয় যেভাবে মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য- একজন যৌবনাদীপ্ত মানুষের সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপনের জন্য বিয়ের প্রয়োজনীয়তাও তেমনই। এজন্যই কুরআন-হাদীসে নির্দেশসূচক শব্দে উৎকীর্ণ হয়েছে বিয়ের বাণী। সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. এর বর্ণনায় মহানবী সা. বলেন- যে ব্যক্তি পূতঃপবিত্র অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে চায় সে যেন বিয়ে করে স্বাধীন নারাীকে। [ইবনে মাজাহ:১৩৫]
অপর বর্ণনায় এসেছে আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ সা. বলেন- কোন ব্যক্তি যখন বিয়ে করল তখন সে যেন দ্বীনের অর্ধেকটা পূর্ণ করে ফেলল। এখন সে যেন বাকি অর্ধাংশের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে। [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, মিশকাত:২/২৬৮] কি অপূর্ব ও মূল্যবান বাণী। মানবিক প্রাকৃতিক চাহিদার কারণেই মানুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। অথচ ইসলাম এটাকে পুরো দ্বীনের অর্ধেক এবং প্রভুর সােেথ পূতঃপবিত্র অবস্থায় সাক্ষাতের মাধ্যম বলে আখ্যায়িত করেছে। সম্ভবত এত বড় মর্যাদার কথা অন্য কোন ইবাদত সম্পর্কে বলা হয়নি। কারণ শরীর, মানস ও চরিত্রের শুদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা নির্ভর করে বিয়ের উপর। শোকর ইবাদত-বন্দেগির জন্য যে মানসিক ও চারিত্রিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন তার অধিকাংশই উৎসারিত হয় বৈধ পথে কাম-তৃষ্ণা তৃপ্ত করার মাধ্যমে যার একমাত্র ভিত্তি হলো বিয়ে। সুশৃঙ্খল সুনির্ধারিত পথে যৌন ক্ষুধা পূরণের কল্যাণময় কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে মহানবী সা. বলেছেন- তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই সাহায্য করবেন। ১.স্বাধীন হওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ গোলাম, যে নিজ মুক্তিপন আদায়ের ই”্ছা করে। ২. চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তি। ৩. আল্লাহর পথে জিহাদকারী। [তিরমিযী:২/২৯৫; নাসায়ী:২/৫৮; ইবনে মাজাহ :/১৮১]
মোট কথা : ইসলাম ফিতরাতের ধর্ম। তাই ইসলাম স্বীকার করেছে মানুষের যৌনকামনাকে। তবে একে শৃঙ্খলিত করেছে স্বচ্ছ পবিত্রতা ও বৈধতার বাঁধনে। ইসলাম মনে করে মানুষ সকল সৃষ্টির সেরা। তাই তার কাম- ক্ষুধা নিবারণ পদ্ধতি, যৌন সম্পর্ক ইত্যাদি সকল কিছুই হবে অন্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা যা সম্পাদিত হবে একটি মার্জিত সুনির্ধারিত নিয়মের বাঁধনে। যে পথে পূরণ হবে যৌন-কামনা। সাথে সাথে দলিত হবে না মানব সভ্যতা ও যৌনক্ষমতার মূল লক্ষ্য। এরই নাম বিয়ে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, বিয়ের হুকুম সর্বদা এক থাকেনা। বরং বিয়ের হুকুম আবর্তিত হয় ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক অবস্থার বিবেচনায়। তাই বিয়ে ব্যক্তি বিভেদে ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুওয়াক্কাদা, হারাম, মাকরূহ, মুবাহ ও সুন্নত বলে বিবেচিত হয়। ফরয: যদি কেউ বিয়ে না করলে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে বলে প্রত্যয়নিষ্ট হয় আর বৈধ পন্থায় মোহর ও ভরণ-পোষণ করতেও সক্ষম – এমন ব্যক্তির জন্য বিয়ে করা ফরয। ওয়াজিব : ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার ভয় হয় কিন্তু ব্যভিচারে পড়েই যাবে এমন প্রত্যয়নিষ্ট নয়। হালাল অর্থে স্ত্রীর মোহর ও ভরণ-পোষণ করতেও সক্ষম এমন ব্যক্তির জন্য বিয়ে ওয়াজিব। সুন্নতে মোয়াক্কাদা : ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশংকা নেই। তবে বিয়ে না করলে হালকা পাপের অধিকারী হবে। হালাল অর্থে মোহর ও ভরণ-পোষণ করতেও সক্ষম এমন ব্যক্তির জন্য বিয়ে সুন্নতে মোয়াক্কাদা। হারাম : যদি দৃঢ় বিশ্বাস থাকে বিয়ে করলে স্ত্রী জুলুম ও নিপীড়নের শিকার হবে। স্ত্রীর অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হবে, তাহলে এক্ষেত্রে বিয়ে করা হারাম। মাকরুহ : যদি বিয়ের কারণে স্ত্রী জুলুম- নিপীড়নের শিকার হবে বলে আশংকা হয়। বদ্ধমূল বিশ্বাস না থাকে, তাহলে বিয়ে করা মাকরূহ তাহরীমি। মুবাহ : বিয়ে না করলে ব্যভিচারী হয়ে পড়বে এমন আশংকা নেই; বরং যৌনকামনা পূরণার্থে বিয়ে করেছে- এটা মুবাহ। এক্ষেত্রে যদি নিজেকে পাপমুক্ত রাখা বা মানব বংশ বৃদ্ধির নিয়ত করে তাহলে বিয়ে করা সুন্নাত বলে বিবেচিত হবে। [কিতাবুল ফিকহী আলাল মাযাহিবিল আরবাআ : ৪/৬] বস্তুত যৌনজীবনের পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা আর চারিত্রিক শুদ্ধতা কল্যাণের ধর্ম ইসলামে অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই ইসলাম বিয়েকে করেছে যৌনতৃষ্ণা তৃপ্ত করার বৈধপথ। মানুষ যেন পবিত্র এ পথে সরলভাবে পূরণ করতে পারে যৌবনের চাহিদা। রিপুর টানে নেমে না আসে পশুর সারিতে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, মুহাদ্দিস, জামিয়া মিফতাহুল উলুম মাদরাসা, নেত্রকোণা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন