শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

হাদীস ও ফেকাহ শাস্রবিদ ইমাম আবু হানীফা রহ. : মাওলানা জামাল উদ্দীন রাহমানী

১ম পর্ব
সমাজের অধঃপতনের সময় আলোক বার্তিকা নিয়ে যে সকল মনিষীরা পৃথিবীর বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন, পার্থিব লোভলালসা ও ক্ষমতার মোহ যাদেরকে ন্যায় ও সত্যের আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র পদস্খলন ঘটাতে পারেনি, যারা অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত করেননি, ইসলাম ও মানুষের কল্যাণে সারাটা জীবন যারা পরিশ্রম করে গিয়েছেন, সত্যকে আকড়ে থাকার কারণে যারা জালেম সরকার কর্তৃক অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত এমনকি কারাগারে নির্মমভাবে প্রহারিত হয়েছেন, ইমাম আবু হানীফা রহ. তাদের অন্যতম। ইমাম আবু হানিফা রহ. উমাইয়া খিলাফতের এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আবির্ভূূত হয়েছিলেন যখন উমাইয়া খলিফাদের দুঃশাসন ও  স্বৈরাচারী কার্যকলাপে সমগ্র মুসলিম জাহান আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল। তাদের দ্বারা এমন সব জঘন্য কাজ সম্পাদিত হয়েছিল, যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তাদের নিষ্ঠুর কার্যকলাপ সর্বত্র ছায়া মেলেছিল। তখন ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও মহানবীর খেলাফতকে শুধু ভূলুন্ঠিত করা হয়নি, চতুর্থ খলীফা হযরত আলী রা. কে মিম্বারে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করা হত। খিলাফতের স্থান দখল করেছিল তখন রাজতন্ত্রে। মোটকথা অত্যাচার ও ঝঞ্ঝাটে ঘনীভূত হয়ে গিয়েছিল পুরোরাজ্য। আর ঠিক এমনি এক মূহুর্তে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন হানাফী মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা রহ.। আর তিনি এমন সন্ধিক্ষণে এসে   বয়ে দিয়েছিলেন অতুলনীয় শান্তি ও কল্যাণের হিমেল হাওয়া। যিনি ছিলেন জ্ঞানে পূর্ণ ও গুণে অতুলণীয় সকলের প্রিয় ও আস্থার পাত্র। যা অনুমান করা যায় হানাফী মাজহাবের অনুসারীদের বৃহৎ সংখ্যার দিকে একটু পলক দিলেই।
ইমাম আবু হানিফা রহ. ইমামদের মধ্যে একমাত্র তাবেঈ ছিলেন। অনেক সাহাবীর আমল আখলাক তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন, অনেক সাহাবীর যুগ তিনি পেয়েছেন! এমনকি অনেক সাহাবীর সান্নিধ্যে থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেছেন। তার মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেছেন হাদীসে নববী থেকে, যেখানে সরাসরি হাদীস পাননি সেখানে দারস্ত হয়েছেন সাহাবীদের কওল বা আছারের উপর। দলীলহীন নিজ খেয়াল খুশি তিনি কখনই গ্রহণ করেননি। এমনকি তার মাযহাবী ফতোয়া বোর্ডের সদস্য ছিল ততকালীন সময়ের বড় বড় চল্লিশ জন কুরআন ও হাদীস বিশারদ ফকীহ। যারা সেই সময়ের তারকার মত উজ্জ্বল। আর এ ব্যাপারে দলীল ভিত্তিক সামনে আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।
ইমামে আযম আবু হানিফা রহ. এর সম্পর্কে রাসূল সা. এর ভাবিষ্যত বাণী
রাসূল সা. ইমাম আবূ হানিফা রহ. এর শেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম, ইলমী উৎকর্ষ ও তীক্ষèতা দ্বীন ইসলামের সাথে তার সম্পৃক্ততা ও মুহাব্বত ভালবাসা সম্পর্কে অনেক জায়গায় ভবিষ্যত বাণী করেছেন। তার কিছু উল্ল্যেখযোগ্য অংশ নিম্নরুপ।
১ হযরত আবু হুরাযরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. এক বিশেষ মুহুর্তে হযরত সালমান ফারসী  এর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন।
لوكان الإيمان عند الثريا لناله رجال أو رجل من هؤلاء
ঈমান যদি সুরাইয়া তারকায়ও পৌঁছে যায় তথাপিও পারস্য জাতির এক বা একাধিক ব্যাক্তি সেটাকে আয়ত্ত করবে। [বুখারী. ২/৫৬৫ মুসলিম ২/৩১২]
২ মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায়  আছে-
لوكان الدين عند الثريا لذهب به رجل في فارس أو قال من أبناء فارس حتي يتناوله
যদি দ্বীন সুরাইয়্যা তারকার নিকটে থাকে তথাপিও একজন পারস্যিক অথবা রাসূল সা. বলেছেন পারস্যিক বংশোদ্ভত একজন সেই দ্বীনকে গ্রহণ করবে। [মুসলিম ২/৩২১]
৩ আবু নুআঈম হিলয়া গ্রন্থে ইমাম আহমদ তার মুসনাদে হযরত আবু হুরায়রা রা. এর বারাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন-  ইলম যদি সুরাইয়্যা তারকার উপরেও থাকে, অবশ্যই পারস্যের কিছু লোক সে ইলম অর্জন করবে। [মুসনাদে আহমাদ। ২/৩২২]
আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়ূতী রহ. বলেন, এ ভবিষ্যত বাণীর সর্ব প্রথম ও সর্বপ্রধান ব্যক্তি হলেন, হযরত ইমাম আযম আবু হানিফা রহ.। [তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৪২]
আল্লামা দামেশকী সালেহী রহ. বলেন, এ সুসংবাদ ইমাম আবু হানিফা রহ. এর সম্পর্কে যে ভবিষ্যত বাণী তিনি করেছেন, তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। কেননা পারস্য বংশোদ্ভুত কোন ব্যাক্তি ইলমের  ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। [তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৪২]
শাহ ওয়ালিইল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. বলেন, একবার আমরা উল্লেখিত হাদীস গুলো নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমি বললাম, ইমাম আবু হানিফাই এ হাদীসের অর্ন্তভূক্ত। কেননা আল্লাহ তাআলা ইলমে ফিকহকে (কুরআন হাদীস থেকে) তার হাতে বের করেছেন এবং ব্যাপকতা দান করেছেন। মুসলমানদের একটি বৃহৎ দলকে তার ফিকহ দ্বারা পরিচালিত করেছেন। বিশেষত পরবর্তী যুগে সরকারি কার্যক্রম এ মাযহাব অনূসারেই পরিচালিত হয়। অধিকাংশ শহরের শাসক ও বিচারপতি এবং অধিকাংশ শিক্ষাদাতা ও জনসাধারণ হানাফী মাযহাবেরই অনুসারী। [ইমাম আযম আবূ হানিফা স্বারক গ্রন্থ। পৃ..৯১]
কে সেই ইমাম আবু হানিফা ?
নাম নু’মান বিন সাবিত বিন যূতা বিন ইয়াহইয়া বিন যায়েদ বিন আসাদ বিন রাশেদ। ইমাম সাহেবের পিতা সাবিত কূফায় জন্ম গ্রহণ করেন। সাবিতের পিতা তাকে হযরত আলী রা. এর খেদমতে নিয়ে যান। তিনি তার জন্য কল্যাণ ও বরকতের দোআ করেন।
ইমাম আবূ হানীফা রহ. কারো মতে ৬১ হিজরীতে প্রশিদ্ধ মত অনুযায়ী ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম, নুমান। ডাক নাম ও তার কারণ
ইমাম আযমের ডাক নাম আবু হানিফা। হানিফাতুন শব্দটি হানিফুন এর স্ত্রীলিঙ্গ। অর্থ ইবাদত গুজার
১ কারো মতে ইরাকী ভাষায় হানীফ অর্থ দোয়াত। ইমাম সাহেব যেহেতু সর্বদা দোয়াত কলম নিয়ে মাসআলা মাসায়েল লেখায় ব্যস্ত থাকেন তাই তাকে আবু হানিফা বলা হয়।
২ বিশুদ্ধ মত হলো, তিনি   উজ্জল ও সরল মিল্লাত বিশিষ্ট ছিলেন। তাই তার ডাক নাম হয় আবু হানিফা । মেয়ের নামের দিকে সম্পৃক্ত করে তাকে আবু হানিফা ডাকা হয় কথাটি সঠিক নয়। কেননা হাম্মাদ ব্যতীত তার কোন সন্তান ছিল না।
আকার ও আকৃতি
ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, তিনি ছিলেন মধ্যম গড়নের, তবে ঈষৎ লম্বা। তার মুখাবয়ব ও দেহ কাঠামো ছিল খুবই চমৎকার। ভাষা অত্যন্ত গাম্ভির্যপূর্ণ। অনর্থক কথা ও কাজ হতে তিনি সম্পূর্ণ বিরত থাকতেন। অধিকাংশ সময় নিশ্চুপ থাকতেন। আল্লাহ তাআলা তাকে বানিয়েছেন জ্ঞান ও বুদ্ধির আধার করে। [স্বারক গ্রন্থ পৃ… ১২০]
তিনি ছিলেন সৌভাগ্যবান তাবেয়ী
ইমাম আযম আবু হানিফা রহ. একজন সৌভাগ্যবান তাবেয়ী ছিলেন। ইমামগণের মধ্যে তিনিই কেবল তাবেয়ী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। ১. প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন, ইমাম আযম সাহাবায়ে কেরামের যুগ পেয়েছেন এবং খাদেমে রাসূল সা. হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. কে দেখেছেন। [আল বিদায়া ১০/১০৭]
২. প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে নাদীম লিখেন, ইমাম আযম একজন তাবেয়ী । [আল ফিহরেস্ত পৃ. ২৯৮]
৩. ইবনে আব্দুল বার মালেকী বলেন, ইমাম আযম রহ. হযরত আনাস রা. এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হারেস কে দেখেছেন এবং তাদের থেকে হাদীসও শ্রবণ করেছেন। [জামিউ বায়ানিল ইলম ১/৪৫]
৪. আল্লামা যাহাবী রহ. লিখেন, ইমাম আযম হযরত আনাস রা. কে দেখেছেন। [মানাকেব পৃ. ৭]
৫. আল্লামা ইবনে হজার মক্কী রহ. বলেন, ইমাম আযম সাহাবীদের যামানা পেয়েছেন এবং ৮ জন সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন।
গায়রে মুকাল্লিদ আলেম নবাব সিদ্দিক হাসান খান বলেন, ইমাম আযম হযরত  আনাস রা. কে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। [আত তাজুল মুকাম্মাল]
মোটকথা ইমাম যাহাবী রহ. ইমাম নববী রহ. ইবনে সাদ রহ. খতীবে বাগদাদ রহ. ইমাম দারে কুতনী রহ.  হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. আল্লামা সুয়ূতী রহ. ইবনে হাজার মাক্কী রহ. হাফেজ যয়নুদ্দীন ইরাকী রহ. ইমাম সাখাবী রহ. ইমাম জাযারী রহ. ইবনে আব্দুল বার রহ. ইবনুল জাওযী রহ. আল্লামা আইনী রহ. প্রমুখ শ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন ও ইসলামী মনীষীগণ সকলে এক বাক্যে একথার স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, ইমাম আযম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস রা.কে স্বচক্ষে দেখেছেন।
ইমাম আযম যে সকল সাহাবীর যুগ পেয়েছেন
১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. (মৃত্যু-৮৭)
২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হারেস রা. (মৃত্যু-৮৬)
৩. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে মালেক রা. (মৃত্যু-৮৯)
৪. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ছাআলাবা রা. (মৃত্যু-৮৯)
৫. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াযিদ রা. (মৃত্যু-৯১)
৬. হযরত মালেক ইবনে আউস রা. (মৃত্যু-৯২)
৭. হযরত মালেক ইবনে হুয়ায়রিস রা. (মৃত্যু-৯৪)
৮. হযরত সাদ ইবনে ইয়াস রা. (মৃত্যু-৯৫)
৯. হযরত আব্দুর রহমান ইবনে কাব আনসারী রা. (মৃত্যু-৯৪)
১০. হযরত আবু তোফায়েল ইবনে আমের বিন ওয়াসেলা রা. (মৃত্যু-১১০)
১১. হযরত মুআবিয়া ইবনে হাকাম রা. (মৃত্যু-১০০)
১২. হযরত ইমরান ইবনে মিলহান রা. (মৃত্যু-৯৫)
১৩. হযরত হারেস ইবনে  আউস রা. (মৃত্যু-৯৪)
১৪. হযরত আবু উসামা সাদ ইবনে সাহল রা. (মৃত্যু-১০০)
১৫. হযরত মাহমুদ ইবনে লাবীদ রা. (মৃত্যু-৯৪)
১৬. হযরত মাহমুদ ইবনে রাবী রা. (মৃত্যু-৯৯)
উল্লেখিত ১৬ জন সাহাবী এবং হযরত আনাস রা. সহ মোট সতের জন সাহাবীকে দেখার গৌরবময় সৌভাগ্য অর্জন করেন, [ইমাম আবু হানীফা রহ.স্বারক গ্রন্থ পৃ. ৩৪০]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন