শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

প্রযুক্তির ইতিকথা : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

‘বিশ্ব নারী মুক্তির উপায়’ বই হতে :
স্যাটেলাইট আমাদের মানব জাতির জন্য একটি নিয়ামত স্বরূপ। সাধনা করতে আল্লাহ নিষেধ করেন নাই, মনযোগ সহকারে সাধনা করলে আল্লাহ তা‘আলা সফলতা দিবেন। যাদের কষ্টের ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত মূল্যবান যন্ত্রগুলো পেয়েছি তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আমি ভেবে বিস্মিত! প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর রকমারি আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলি দেখে আমার মনটা জুড়িয়ে যায় খুশিতে, আনন্দের ঝরনা ধারা বয়ে যায় হৃদয়ে। যেমন- ফোন আবিষ্কারের আগের ইতিহাস, যখন ফোন ছিল না দূর-দুরান্তের খবর সহজে পাওয়া যেত না, চিঠির মাধ্যমে অথবা টেলিগ্রামের মাধ্যমে পাওয়া যেত। কিন্তু অতি জরুরী খবর টেলিগ্রামের মাধ্যমে পাওয়া যেত, সুস্পষ্ট কিছু বুঝা যেত না। আর চিঠি পেতে কম পক্ষে ১৪/১৫ দিন সময় লাগত। আর যখন টেলিফোন আসল তখন আরো অনেক সহজ হয়ে গেল। আর এখন মুঠোফোনে এক মিনিটের মধ্যে খবর পাওয়া যায় পুরো বিশ্বের। এটা আমাদের জন্য নেয়ামত নয় কি! রেডিও টেলিভিশনে দেশ বিদেশের খবর সিএনএন, বিবিসি, আল জাজিরা, সৌদিয়ার অন্যান্য আধুনিক আবিষ্কার দ্বারা সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সকল খবর মুহূর্তের মধ্যে পাচ্ছি। টেলিভিশন ও আবিষ্কৃত যন্ত্রাদি না থাকলে এতদ্রুতগতিতে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তরে খবরা-খবর কোথায় পেতাম! ইন্টারনেট আমাদের বন্ধু। বন্ধুকে যেভাবে শিখিয়ে দিব সেভাবেই কাজ করবে। তার দোষ কি? দোষ আমাদের। আমরা যদি ওকে খারাপভাবে ব্যবহার করি, খারাপই হবে। ভালভাবে ব্যবহার করলে ভাল হবে। এটা কি স্যাটেলাইটের দোষ, না ব্যবহারকারীর দোষ? স্যাটেলাইট আমাদেরকে যখন যা চাই তা দেয়। আামাদের যে বিজ্ঞানী ভাইয়েরা জীবন যৌবন শেষ করে আবিষ্কারে মত্ত থেকে আমাদেরকে এ মূল্যবান যন্ত্রগুলি উপহার দিয়েছে তাদের প্রতি আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞ। আল্লাহ তা‘আলা কোরআনে বলেছেন আমি লৌহ অবতীর্ণ করেছি, যাতে রয়েছে প্রচণ্ড রণশক্তি ও মানুষের কল্যাণ (আয়াত ২৫ সূরা হাদীদ)। আমাদের গবেষক ভাইয়েরা গবেষণা করেছেন এবং তার ফল পেয়েছেন। বড় বড় বিজ্ঞানীরা কোরআন এবং হাদিস দ্বারাই বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছেন। কোরআন ও হাদিস ছাড়া কেউ আবিষ্কার করতে পারবেনা। এই কোরআন ও হাদিস থেকেই মুসলমানরা এক সময় প্রযুক্তির নানা ধরনের চমৎকার বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কার করেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য এবং সভ্যতার ক্ষেত্রে তারাই বিশ্বের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল। আর ইউরোপিয়ানরা তখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রায় সকল শাখায় অবদান রেখে গেছেন। আরাস্তাতালিস (এরিষ্টোটল) আলবিরুনী, ইবনে সিনা, লোকমান হেকীম, আল ফারাবী আরো অনেকেই মানব কল্যাণে সারা জীবন জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সাধনা করে গেছেন। বিশেষ কিছু বিষয়ে তাদের অবদানের কথা উল্লেখ করা সমীচীন মনে করে তাদের নাম ও অবদানের কথা উল্লেখ করলাম। যেমন- আনুশাহ আনসারী, আল মারওয়াজী, আমীর আনসারী, ইয়াকুব ইবনে তারিক, ইব্রাহীম আল ফাজারী, আল ফারঘানি, আবূ নাসার মানসূর, কুতুবুদ্দীন আস সিরাজী, ইবনে শাতির, আবূল ফজল হারায়ী, ফারুক আল বায যিনি প্রথম চাঁদে অবতরণের সময় অঢ়ড়ষষড় চৎড়মৎধস -৩ এর সাথে জড়িত ছিলেন। (এরা সকলেই জ্যোতির্বিজ্ঞানে) অবদান রেখেছেন। খালিদ ইয়াজিদ, ইবনে সীনা, জাফর আস সাদিক, জাবির ইবনে হাঈয়ান, আহমেদ এইচ যিওয়ালী (নোবেল প্রাইজ প্রাপ্ত ১৯৯৯), আব্বাস ইবনে ফিরনাস, মোস্তফা আল সাঈদ, আল কিন্দি, ইবনে, মিসকাওয়াহ, নাসির উদ্দীন আত তুসী, আল মাওয়ারদী, তাঁরা প্রত্যেকেই রসায়ন বিজ্ঞানে অবদান রেখেছেন। আল মাসূদী, আল কিন্দি, আল মসিহি, আলী ইবনে রেদওয়ান, আবু রায়হান আল বিরুনী, ইবনে আল নাফিস, ইবনে বতুতা, ইবনে খালদুনসহ আরো অনেক মুসলিম বিজ্ঞানী ভূগোলে অবদান রেখেছেন। খালিদ ইবনে ইয়াজিদ, জাফর আস সাদিক, শাপুর ইবনে সাহল, আল কিন্দি, আল জাহিয, আলী ইবনে সাহল রাব্বান আল তাবারি, আহমেদ ইবনে সাহল আল বলখী, আল ফারাবী, আবু রায়হান আল বিরুনী, ইবনে আল হাইসাম, মেহমাত ও.জি. তাঁরা চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রেখেছেন। জাফর আস সাদিক, বনু মূসা, জাফর, ইবনে মূসা ইবনে শাকির, আহমেদ মূসা ইবনে শাকির, আব্বাস ইবনে ফাইমাস, আল সাঘানি, ইবনে ইউনূস, আল কারাজি, আবু রায়হান আল বিরুনী, ইবনে আল হাইসাম, ইবনে সীনা, আল খাযিনী, ইবনে বাজ্জাহসহ আরো কিছু বিজ্ঞানী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিদ্যায় বিশেষ অবদান রেখেছেন। মুহাম্মদ ইবনে মূসা আল খাওয়ারিজমি, আল হাজ্জাজী ইবনে ইউসুফ ইবনে মাতার, খালিদ ইবনে ইয়াজিদ, আব্দুল্লাহ হামিদ ইবনে তুরক, আবু কামিল সূজা ইবনে আসলাম, আল আব্বাস ইবনে সাঈদ আল জাহিরী, আল কিন্দি, বনু মূসা, আল মাহানী, আহমেদ ইবনে ইউসূফ, আল মাজরিতি, আল খলিনি, ইবনে সাহল, আল সিজ্জি, আবু নাসার মানসুর, আল নাঈরিযী, তাঁরা গণিতে বিশেষ অবদান রেখেছেন। ইবনে শিরিন, আল কিন্দি, নাজাবুদ্দিন মুহাম্মদ, আল ফারাবি, আল ইবনে আব্বাস আল মাজুসি, আবূ আল কাসিম আল যাহরাযী, ইবনে আল হাইসাম তাঁরা জীববিজ্ঞান, স্নায়ুবিদ মনোবিজ্ঞানে বিশেষ অবদেন রাখেন। তাই মুসলমানদের আবারও সেই জনকল্যাণকর বিজ্ঞান চর্চায় অত্মনিয়োগ করতে হবে। এছাড়াও অমুসলিমদের মধ্যেও কিছু বিজ্ঞানী যারা মুসলমানদের গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক নিত্য নতুন বহু আবিষ্কার করেছেন। যেমন – চার্লস ব্যবেজ, আগস্ট আডা বায়রণ, হেনরী এডওয়ার্ড রবার্টসন, (কম্পিউটার) ডগলাস ইনজেল বাগ (মাউস), আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল (টেলিফোন), মার্টিন কুপার (মোবাইল), স্যার জগদিস চন্দ্র বসু বাঙ্গালী (মাইক্রোওভেন), লিওনার্ড ক্লেইনরক (ইন্টারনেট), ওয়েনার ভন ব্রাউন (ক্ষেপণাস্ত্র), এবং আইনস্টাইনসহ আরো অনেকেই বিভিন্ন বিষয়ে অবদান রেখে আধুনিক বিশ্বগড়ে সকলের উপকার করে গেছেন। আমরা তাদের এই অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাই আসুন ভাই ও বোনেরা, কোরআন হাদিসের জ্ঞানে সুন্দর করি আমাদের জীবন ও এই পৃথিবীকে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, তিনি সেই মহান সত্তা যিনি তোমাদের উপকারার্থে পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত ২৯) এ আয়াতের নির্দেশ মতে মানুষের জন্য উচিৎ সব জিনিসের মাঝে গবেষণা করা ও তার থেকে উপকারিতাগুলি মানব কল্যাণের জন্য খুজে বের করা। অনেক জিনিসের উপকারিতা মানুষ এখনো আবিষ্কারই করতে পারেনি। তাই আসুন আরো আবিষ্কার করি, সাধনা ও মনযোগ সহকারে যা কিছু করবো তাতেই সাফল্য আসবে। গবেষণা করতে অনেক কষ্ট, ধৈর্য ও সময় লাগে এবং যারা চিন্তাশীল তাঁরা জ্ঞান অর্জন করতে পারে। আল্লাহ বলেছেন চক্ষুষ্মান আর অন্ধ কি সমান? অর্থাৎ যে জানে আর যে জানে না তারা কি সমান? আল্লাহ জ্ঞানীদের পছন্দ করেন। ধর্ম শিক্ষা ছাড়া জ্ঞান অর্জন হয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা আমার রাস্তায় চলতে চেষ্টা করে অবশ্যই আমি তাদেরকে আমার পথ দেখিয়ে দেব। (সূরা রূম আয়াত ৬৯)। আল্লাহ বলেন, তোমরা সাধনার মধ্যে যা চাইবে তাই পাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা যার কল্যাণ চান তাকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করেন। সারকথা হলোÑ বিজ্ঞান মহ্না কল্যাণে আবিষ্কৃত হয়েছে বটে, তবে এর সঠিক ব্যবহার না করে; বরং এর অসৎ ব্যবহারের দরুন আজ তা মানুষের অকল্যাণেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। চলবে।….

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন