জসিমউদদীন আহমাদ :
দিল্লি অভিজাত শহর। অভিজাত মানুষের বসবাস এখানে। শিক্ষাদীক্ষা, অর্থবিত্তে পুরোদুস্তর আধুনিক এখানকার বাসিন্দারা। ভোগ্যসামগ্রী ও বিলাসব্যসনের কোনো অভাব নেই এখানে। মোঘলআমলের রাজনবর্গের বসতি ছিল দিল্লি। ঐতিহাসিক লালকেল্লার অবস্থানও এখানে। উচ্চপদস্থ কর্মকতা, আমির-ওমারা ও উচ্চপদস্থদের বাস যে শহরে তাতো আর দশটা অঞ্চল থেকে ভিন্ন হবেই। এখানে আছে বৃহদাকার শিক্ষায়তন। আছে অভিজাতশ্রেণির আবাসিক বসতি। স্টেডিয়াম, কম্যুনিটি সেন্টার, শপিংমল, বিজনেস সেন্টার। কী নেই এখানে?
দিল্লিরই অনতিদূরের এক বস্তির নাম মেওয়াত। ছোট ও নীচুশ্রেণির লোকেরা বাস করে এখানে। শিক্ষীদিক্ষা কিংবা সভ্যতার লেশমাত্র নেই এদের মাঝে। হাত-পায়ের স্বাভাবিক গড়ন ছাড়া বলার মতো কোনো মানুষ এরা নয়। পশ্চাদপদ ও অজ্ঞই শুধু নয়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইতরপ্রাণী বিশেষও এরা। বেঁচে থাকার তাগিদেই এরা বেঁচে আছে। সভ্য হওয়ার তাগাদা এদের মাঝে নেই। শিক্ষিত হওয়ার প্রেরণাও নেই। কি পেল আর কি দিলো লাভ-ক্ষতির হিসেব এরা কষতে জানে না। ধর্মীয় পরিচয়ে কোনো তফাৎ নেই এদের মাঝে। শেকেল ও সুরতে, আকার-আকৃতিতে সবার মাঝে যেন একই অবয়ব ফুটে রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ে ফারাক করতে গেলে বংশগত কিছু মুসলমান অবশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। হিন্দুদের মতোই ধূতি পরে এরা। অংশ নেয় পুজো পার্বনে। নারীরা সিঁথিতে সিঁদুর মাখে। হাতে পরে বালা। নামগুলোও আধা মুসলিম, আধা হিন্দু। সামসু সিং, হরি সিং, জল সিং, বল সিং… এভাবেই চলছে কয়েক পুরুষ ধরে। কালেমা জানে না, নামাজ বুঝে না, এদের দেখে মনে হয় না এরা মুসলমান। তবুও কেন জানি এরা মুসলিম!
দশ শতকের মাঝামাঝি থেকে এ অঞ্চলের অবস্থা এমনই ছিলো। দিল্লি শহরের মালী, কুলি, মেথর, সুইপার এসবের জোগান আসতো মেওয়াত থেকে। উঁচুশ্রেণির লোকদের জীবনযাত্রাকে সহজ করতে এরা নিজেদের সঁপে দিয়েছিল। মোঘলআমলে বড় বড় রাজনবর্গ সালতানাতের সীমানা বাড়াতে দেশে দেশে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলো। কেউ কেউ তো হেরেমে মদ আর নারী নিয়ে আসক্ত হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু এই লোকগুলোকে সভ্য করার চিন্তা কারও মাথায় আসেনি। এরা সভ্য হয়ে গেলে সভ্যদের জীবনযাত্রা যে অচল হয়ে পড়ত!
খোরাসান থেকে মায়ানমার সাম্রাজ্যের সীমানার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু প্রদীপের নিচের আঁধারিতে মেওয়াতিরা মেওয়াতিই থেকে গেছে। মোঘলসাম্রাজ্যের পতনের পরও অনেক উত্থান-পতন ঘটেছে। কিন্তু বদকিসমত এই লোকগুলোর জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কোনো রাজনীতিক এদের নিয়ে ভাবেনি। কোনো শিক্ষাবিদ এদের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। কোনো সমাজসংস্কারক, কোনো মুবাল্লিগ এদের নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি হয়নি।
আইয়ামে জাহেলিয়াতের আরব আর কয়েক শতক পরের মেওয়াতিদের মাঝে স্থানের ভিন্নতা ছাড়া অন্যকোনো ব্যবধান ছিলো না; বরং এরা তাদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে আরও জঘন্যই ছিলো। এরা যে মানুষ অনতিদূরের সভ্যলোকগুলোর মতো ওদেরও যে ভালোভাবে বেঁচে থাকার, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষতা ও শিক্ষিত হওয়া আর নীতি ও নৈতিকতার চর্চা করার অধিকার ওদেরও যে আছে, এ অনুভূতি কেউ কখনও ওদের দেয়নি। কেউ বলেনি হাত-পায়ের গড়নের বাইরেও তোমাদের আলাদা একটা সত্ত্বা আছে। রাষ্ট্র তাদের দিকে ফিরে তাকায়নি। কোনো চিন্তাবিদ তাঁর মূল্যবান সময় ওদের পেছনে অহেতুক ব্যয় করেনি। ওদেরকে মানুষ করার কারও বিবেকের দায় পড়েনি। কিন্তু পরম করুণাময়, যিনি তাঁর সৃষ্টিকে কখনও ভুলে যান না, উনিশ শতকের শুরুতে সেখানে পরম দরদী এক মানুষকে প্রেরণ করেন। সাহাবায়কেরামের প্রতিচ্ছবি এই মানুষটি বংশগতভাবে উম্মতে মোহাম্মাদির রক্তধারা বহনকারী এই লোকগুলোকে গোমরাহির অতল আঁধার থেকে হেদায়েতের রাজপথে উঠিয়ে আনেন।
গত শতাব্দির শুরুর দিকে মুসলিম জনতাকে ইসলামের প্রকৃত ও সঠিক পথে পরিচালিত করা ও বেদীনদের কাছে শাশ্বত তাওহিদের বাণী পৌঁছে দিতে মাওলানা ইলিয়াস কান্দালভি রহ. ‘এ্যায় মুসলমানো মুসলিম বনো’ [হে মুসলিম! মুসলমান হও] স্লোগান দিয়ে তাবলিগজামাত প্রতিষ্ঠা করেন। সালটি ছিলো ১৯২৬। তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় তাবলিগ আন্দোলন। জীবনের সবক্ষেত্রে রাসুল সা. -এর শিক্ষা ও আদর্শ বাস্তবায়ন করার মহতী উদ্যোগ নিয়ে ভারতের অখ্যাত মেওয়াতে মাওলানা ইলিয়াস রহ. তাঁর কর্মকাণ্ড শুরু করেন।
দিল্লির নিজামুদ্দিনের বাংগলেওয়ালি মসজিদ ছিলো তাঁর হেডকোয়াটার। একটি আদর্শিক আন্দোলন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বিশাল অংকের বাজেট। কিন্তু মাওলানা কোনো চাঁদা বা ডোনেশন ছাড়াই তাঁর কার্যক্রম শুরু করেন। এখানে সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই নিজেদের খরচের জোগান দেন। এটি একটি গতিশীল ধর্মীয় আন্দোলন, যা আগাগোড়া ইসলামি ঐতিহ্যে সুষমামণ্ডিত।
তাবলিগ দেওবন্দি আন্দোলনেরই একটি প্রশাখা। শিরক ও কুফরিতে নিমগ্ন মুসলিম সমাজকে অপসংস্কৃতির ঘোর থেকে মুক্ত করে সঠিক পথে চালিত করাই এ জামাত প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য। অবরুদ্ধ দেশে [ব্রিটিশবেনিয়া কর্তৃক] বিপন্ন স্বজাতির সংস্কৃতি ও স্বকীয়তা রক্ষায় মাওলানা ইলিয়াস রহ. তাবলিগের গোড়াপত্তন করেন। সেদিনের ক্ষুদ্র এই আন্দোলন, একব্যক্তির নিরলস প্রচেষ্টা ও আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণিতে তাবলিগ আজ বিশ্বব্যাপী একটি আন্দোলনের নাম। বিশ্বের ১৫০-রও অধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এ আন্দোলন। তাবলিগের মাধ্যমে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে ইসলামের আহ্বান।
তাবলিগ জামাত দলভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, যেখানে একজনকে আমির বা দায়িত্বশীল হিসেবে মনোনীত করা হয়। তারা গ্রাম থেকে গ্রামে, শহরে, পাড়ায়-মহল্লায় ঘুরে বেড়ান। অবস্থান করেন স্থানীয় মসজিদে। মানুষের কাছে পৌঁছে দেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বাণী। তালিমের জন্য ব্যবহার করা হয় ফাজায়েলে আমাল কিতাব। এটি মূলত হাদিসের সংকলন। রচয়িতা শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ জাকারিয়া রহ.। মানুষকে এরা সত্যের পথে অনুপ্রাণিত করেন। বিচ্যুতি ও গোমরাহি থেকে আলোর পথে ফিরে আসা এবং অন্যদের কাছে সত্য ও সুন্দর ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করেন।
তাবলিগ আরবি শব্দ। অর্থ হচ্ছে, বার্তা (সবংংধমব)। অন্য অর্থে ‘মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত ও বাণী পৌঁছানো।’ এ দৃষ্টিকোণ থেকে তাবলিগজামাত মানে, ইসলামের প্রতি আহ্বানকারী দল। দীনের পুনর্জীবন ও ইসলামের চিরন্তন পয়গাম দিকে দিকে পৌঁছে দিতে নিরন্তন ছুটে চলছে তাবলিগজামাত। দাওয়াতের সাথে সাথে ইসলামের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ও মুসলিম মনমানস গঠনে বিশ্বব্যাপীই কাজ করে যাচ্ছে এই জামাত।
তাবলিগের গোড়াপত্তন
দশম শতকের গোড়া থেকে মেওয়াত বহুসংখ্যক সুফি বুজুর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ সময় এখানে অনেকে তাদের আবাস গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ছিলেন- গাজি সাইয়েদ সালার মাসউদ, যিনি খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সহচর ছিলেন। কুতুবুদ্দিন আকবর আলি, খাজা আজমিরি, কাজি সাইয়েদ রাজি মোহাম্মাদ। কাজি সাইয়েদ এনায়েতুল্লাহ, কাজি সাইয়েদ হায়াতুল্লাহ, কাজি সাইয়েদ মোহাম্মাদ জামান, কাজি সাইয়েদ মোহাম্মাদ রাফি, সাইয়েদ মোহাম্মাদ আশরাফ প্রমুখ।
সুফি দরবেশদের হাত ধরে এ অঞ্চলের মানুষ তাওহিদ তথা একত্ববাদী আদর্শের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মুসলিমরা হিন্দুত্ববাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়। ইসলামের আদর্শ ও দীনের মৌলিক বিষয়াবলি পরিহার করে হিন্দুসংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে। হিন্দুদের বিভিন্ন পূজাপার্বণ তারা ঘটা করে পালন করতে লাগল। আকার-অবয়বেও ফুটে উঠল হিন্দুয়ানি চালচলন। স্বজাতির এই অবস্থা দেখে মাওলানা ইলিয়াস পেরেশান হয়ে যান।
মাওলানা ইলিয়াস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই কেবল এ বিভীষিকাময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। তিনি তাদের পরিশুদ্ধির উপায় খুঁজতে থাকেন। ১৯ শতকের প্রথমভাগে মাওলানা মেওয়াতের বাংগলেওয়ালি মসজিদে শিক্ষায়তন চালু করেন।
একদিনের ঘটনা। নামাজের সময় মাওলানা ইলিয়াস মসজিদের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। উদ্দেশ্য কোনো মুক্তাদি পাওয়া যায় কিনা! এ সময় তিনি দেখলেন কিছু মুসলিম শ্রমিক কাজের খোঁজে দিল্লি যাচ্ছে। তিনি তাদেরকে নামাজ পড়ার জন্য আহ্বান করলেন। কিন্তু তাদের অবস্থা দেখে মাওলানা ব্যথিত হলেন। এরা অজু করার নিয়ম-কানুনও জানে না। নামাজের পর মাওলানা ইলিয়াস তাদেরকে কুরআন মজিদের কিছু আয়াত শিক্ষা দিলেন। এরা সারাদিন কাজ করে যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেত, তিনি তাদেরকে এই পরিমাণ অর্থ দিতে চাইলেন, বিনিময়ে তারা তাঁর সদ্যপ্রতিষ্ঠিত মক্তবে পাঠ গ্রহণ করবে।
মেওয়াতি শ্রমিকরা তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হল। মাওলানা ইলিয়াস তাঁর পাঠ পরিক্রমা শুরু করলেন। কয়েকদিনের মধ্যে আরও মেওয়াতি এসে ভর্তি হল। কাশেফুল উলুম নামের এই মাদরাসার প্রাথমিক ছাত্র ছিল গরিব ও অশিক্ষিত বদ্দু মেওয়াতিরা। এদের সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৩০ জন। মাওলানা তাদের মাঝে দীনের আলো ছড়াতে লাগলেন।
বিস্ময়কর ফল ফলতে লাগল। আইয়ামে জাহেলিয়াতের আরবরা আল্লাহর রাসুলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করেছিল, তার প্রতিচ্ছবি যেন ফুঁটে উঠল আরেকবার দিল্লির মেওয়াতে। কিছুদিনের মধ্যে এই লোকগুলো ইসলামকে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে নিল। এরপর এদের তৎপরতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো আশেপাশের অঞ্চলেও। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে, এক শহর থেকে অন্য শহরে এবং একসময় দেশের সামীনা মাড়িয়ে বিশ্ব মানচিত্রে। ষাটের দশকের শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনতে জামাত বের হতে লাগল। একুশ শতকে এসে এ আন্দোলন আজ পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে। ভৌগোলিক মানচিত্রে অনুল্লেখ্য জনপদেও আছে এদের সরব উপস্থিতি। আরবে-আজমে, কালো আফ্রিকায় কিংবা উত্তাল অটলান্টিক পেরিয়ে এই কাফেলা ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের হিমশীতল ভূখণ্ডেও।
মেওয়াত আজ দুনিয়ার লাখো মানুষের হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। নিচু শ্রেণির ইতর এই প্রাণীগুলোকে মাওলানা ইলিয়াস মানুষ ও মানবতার এমন স্তরে উন্নীত করেছেন, তা শুধু দেড় হাজার বছর আগের আল্লাহর রাসুলের প্রিয় সাহাবাদের ঈমানদীপ্ত দাস্তানের সঙ্গেই তুল্য হতে পারে। দিল্লির অখ্যাত মেওয়াত থেকে ঈমানের যে স্ফূলিঙ্গ জ্বলে উঠেছে তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের দিকে দিকে। ক্ষুদ্র এই বস্তির বাসিন্দা আজ বিশ্বের সহস্র জনপদে হেদায়েতের দীপশিখা জ্বালিয়ে চলেছে। আল্লাহর প্রিয়বান্দাদের তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে, গোমরাহ ও পথহারা মানুষদের হেদায়েতের সন্ধান দিতে, গাফেলকে সচেতন করতে এরা চষে বেড়াচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম পৃথিবীর তাবৎ প্রান্তে। সাদা-কালো, ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়কন্দরে দীনে মোহাম্মাদির চেরাগ জ্বালাতে এরা অক্লান্ত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর দীনের জন্য কবুল করুন! আমিন।
দিল্লি অভিজাত শহর। অভিজাত মানুষের বসবাস এখানে। শিক্ষাদীক্ষা, অর্থবিত্তে পুরোদুস্তর আধুনিক এখানকার বাসিন্দারা। ভোগ্যসামগ্রী ও বিলাসব্যসনের কোনো অভাব নেই এখানে। মোঘলআমলের রাজনবর্গের বসতি ছিল দিল্লি। ঐতিহাসিক লালকেল্লার অবস্থানও এখানে। উচ্চপদস্থ কর্মকতা, আমির-ওমারা ও উচ্চপদস্থদের বাস যে শহরে তাতো আর দশটা অঞ্চল থেকে ভিন্ন হবেই। এখানে আছে বৃহদাকার শিক্ষায়তন। আছে অভিজাতশ্রেণির আবাসিক বসতি। স্টেডিয়াম, কম্যুনিটি সেন্টার, শপিংমল, বিজনেস সেন্টার। কী নেই এখানে?
দিল্লিরই অনতিদূরের এক বস্তির নাম মেওয়াত। ছোট ও নীচুশ্রেণির লোকেরা বাস করে এখানে। শিক্ষীদিক্ষা কিংবা সভ্যতার লেশমাত্র নেই এদের মাঝে। হাত-পায়ের স্বাভাবিক গড়ন ছাড়া বলার মতো কোনো মানুষ এরা নয়। পশ্চাদপদ ও অজ্ঞই শুধু নয়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইতরপ্রাণী বিশেষও এরা। বেঁচে থাকার তাগিদেই এরা বেঁচে আছে। সভ্য হওয়ার তাগাদা এদের মাঝে নেই। শিক্ষিত হওয়ার প্রেরণাও নেই। কি পেল আর কি দিলো লাভ-ক্ষতির হিসেব এরা কষতে জানে না। ধর্মীয় পরিচয়ে কোনো তফাৎ নেই এদের মাঝে। শেকেল ও সুরতে, আকার-আকৃতিতে সবার মাঝে যেন একই অবয়ব ফুটে রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ে ফারাক করতে গেলে বংশগত কিছু মুসলমান অবশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। হিন্দুদের মতোই ধূতি পরে এরা। অংশ নেয় পুজো পার্বনে। নারীরা সিঁথিতে সিঁদুর মাখে। হাতে পরে বালা। নামগুলোও আধা মুসলিম, আধা হিন্দু। সামসু সিং, হরি সিং, জল সিং, বল সিং… এভাবেই চলছে কয়েক পুরুষ ধরে। কালেমা জানে না, নামাজ বুঝে না, এদের দেখে মনে হয় না এরা মুসলমান। তবুও কেন জানি এরা মুসলিম!
দশ শতকের মাঝামাঝি থেকে এ অঞ্চলের অবস্থা এমনই ছিলো। দিল্লি শহরের মালী, কুলি, মেথর, সুইপার এসবের জোগান আসতো মেওয়াত থেকে। উঁচুশ্রেণির লোকদের জীবনযাত্রাকে সহজ করতে এরা নিজেদের সঁপে দিয়েছিল। মোঘলআমলে বড় বড় রাজনবর্গ সালতানাতের সীমানা বাড়াতে দেশে দেশে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলো। কেউ কেউ তো হেরেমে মদ আর নারী নিয়ে আসক্ত হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু এই লোকগুলোকে সভ্য করার চিন্তা কারও মাথায় আসেনি। এরা সভ্য হয়ে গেলে সভ্যদের জীবনযাত্রা যে অচল হয়ে পড়ত!
খোরাসান থেকে মায়ানমার সাম্রাজ্যের সীমানার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু প্রদীপের নিচের আঁধারিতে মেওয়াতিরা মেওয়াতিই থেকে গেছে। মোঘলসাম্রাজ্যের পতনের পরও অনেক উত্থান-পতন ঘটেছে। কিন্তু বদকিসমত এই লোকগুলোর জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কোনো রাজনীতিক এদের নিয়ে ভাবেনি। কোনো শিক্ষাবিদ এদের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। কোনো সমাজসংস্কারক, কোনো মুবাল্লিগ এদের নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি হয়নি।
আইয়ামে জাহেলিয়াতের আরব আর কয়েক শতক পরের মেওয়াতিদের মাঝে স্থানের ভিন্নতা ছাড়া অন্যকোনো ব্যবধান ছিলো না; বরং এরা তাদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে আরও জঘন্যই ছিলো। এরা যে মানুষ অনতিদূরের সভ্যলোকগুলোর মতো ওদেরও যে ভালোভাবে বেঁচে থাকার, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষতা ও শিক্ষিত হওয়া আর নীতি ও নৈতিকতার চর্চা করার অধিকার ওদেরও যে আছে, এ অনুভূতি কেউ কখনও ওদের দেয়নি। কেউ বলেনি হাত-পায়ের গড়নের বাইরেও তোমাদের আলাদা একটা সত্ত্বা আছে। রাষ্ট্র তাদের দিকে ফিরে তাকায়নি। কোনো চিন্তাবিদ তাঁর মূল্যবান সময় ওদের পেছনে অহেতুক ব্যয় করেনি। ওদেরকে মানুষ করার কারও বিবেকের দায় পড়েনি। কিন্তু পরম করুণাময়, যিনি তাঁর সৃষ্টিকে কখনও ভুলে যান না, উনিশ শতকের শুরুতে সেখানে পরম দরদী এক মানুষকে প্রেরণ করেন। সাহাবায়কেরামের প্রতিচ্ছবি এই মানুষটি বংশগতভাবে উম্মতে মোহাম্মাদির রক্তধারা বহনকারী এই লোকগুলোকে গোমরাহির অতল আঁধার থেকে হেদায়েতের রাজপথে উঠিয়ে আনেন।
গত শতাব্দির শুরুর দিকে মুসলিম জনতাকে ইসলামের প্রকৃত ও সঠিক পথে পরিচালিত করা ও বেদীনদের কাছে শাশ্বত তাওহিদের বাণী পৌঁছে দিতে মাওলানা ইলিয়াস কান্দালভি রহ. ‘এ্যায় মুসলমানো মুসলিম বনো’ [হে মুসলিম! মুসলমান হও] স্লোগান দিয়ে তাবলিগজামাত প্রতিষ্ঠা করেন। সালটি ছিলো ১৯২৬। তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় তাবলিগ আন্দোলন। জীবনের সবক্ষেত্রে রাসুল সা. -এর শিক্ষা ও আদর্শ বাস্তবায়ন করার মহতী উদ্যোগ নিয়ে ভারতের অখ্যাত মেওয়াতে মাওলানা ইলিয়াস রহ. তাঁর কর্মকাণ্ড শুরু করেন।
দিল্লির নিজামুদ্দিনের বাংগলেওয়ালি মসজিদ ছিলো তাঁর হেডকোয়াটার। একটি আদর্শিক আন্দোলন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বিশাল অংকের বাজেট। কিন্তু মাওলানা কোনো চাঁদা বা ডোনেশন ছাড়াই তাঁর কার্যক্রম শুরু করেন। এখানে সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই নিজেদের খরচের জোগান দেন। এটি একটি গতিশীল ধর্মীয় আন্দোলন, যা আগাগোড়া ইসলামি ঐতিহ্যে সুষমামণ্ডিত।
তাবলিগ দেওবন্দি আন্দোলনেরই একটি প্রশাখা। শিরক ও কুফরিতে নিমগ্ন মুসলিম সমাজকে অপসংস্কৃতির ঘোর থেকে মুক্ত করে সঠিক পথে চালিত করাই এ জামাত প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য। অবরুদ্ধ দেশে [ব্রিটিশবেনিয়া কর্তৃক] বিপন্ন স্বজাতির সংস্কৃতি ও স্বকীয়তা রক্ষায় মাওলানা ইলিয়াস রহ. তাবলিগের গোড়াপত্তন করেন। সেদিনের ক্ষুদ্র এই আন্দোলন, একব্যক্তির নিরলস প্রচেষ্টা ও আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণিতে তাবলিগ আজ বিশ্বব্যাপী একটি আন্দোলনের নাম। বিশ্বের ১৫০-রও অধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এ আন্দোলন। তাবলিগের মাধ্যমে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে ইসলামের আহ্বান।
তাবলিগ জামাত দলভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, যেখানে একজনকে আমির বা দায়িত্বশীল হিসেবে মনোনীত করা হয়। তারা গ্রাম থেকে গ্রামে, শহরে, পাড়ায়-মহল্লায় ঘুরে বেড়ান। অবস্থান করেন স্থানীয় মসজিদে। মানুষের কাছে পৌঁছে দেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বাণী। তালিমের জন্য ব্যবহার করা হয় ফাজায়েলে আমাল কিতাব। এটি মূলত হাদিসের সংকলন। রচয়িতা শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ জাকারিয়া রহ.। মানুষকে এরা সত্যের পথে অনুপ্রাণিত করেন। বিচ্যুতি ও গোমরাহি থেকে আলোর পথে ফিরে আসা এবং অন্যদের কাছে সত্য ও সুন্দর ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করেন।
তাবলিগ আরবি শব্দ। অর্থ হচ্ছে, বার্তা (সবংংধমব)। অন্য অর্থে ‘মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত ও বাণী পৌঁছানো।’ এ দৃষ্টিকোণ থেকে তাবলিগজামাত মানে, ইসলামের প্রতি আহ্বানকারী দল। দীনের পুনর্জীবন ও ইসলামের চিরন্তন পয়গাম দিকে দিকে পৌঁছে দিতে নিরন্তন ছুটে চলছে তাবলিগজামাত। দাওয়াতের সাথে সাথে ইসলামের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ও মুসলিম মনমানস গঠনে বিশ্বব্যাপীই কাজ করে যাচ্ছে এই জামাত।
তাবলিগের গোড়াপত্তন
দশম শতকের গোড়া থেকে মেওয়াত বহুসংখ্যক সুফি বুজুর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ সময় এখানে অনেকে তাদের আবাস গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ছিলেন- গাজি সাইয়েদ সালার মাসউদ, যিনি খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সহচর ছিলেন। কুতুবুদ্দিন আকবর আলি, খাজা আজমিরি, কাজি সাইয়েদ রাজি মোহাম্মাদ। কাজি সাইয়েদ এনায়েতুল্লাহ, কাজি সাইয়েদ হায়াতুল্লাহ, কাজি সাইয়েদ মোহাম্মাদ জামান, কাজি সাইয়েদ মোহাম্মাদ রাফি, সাইয়েদ মোহাম্মাদ আশরাফ প্রমুখ।
সুফি দরবেশদের হাত ধরে এ অঞ্চলের মানুষ তাওহিদ তথা একত্ববাদী আদর্শের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মুসলিমরা হিন্দুত্ববাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়। ইসলামের আদর্শ ও দীনের মৌলিক বিষয়াবলি পরিহার করে হিন্দুসংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে। হিন্দুদের বিভিন্ন পূজাপার্বণ তারা ঘটা করে পালন করতে লাগল। আকার-অবয়বেও ফুটে উঠল হিন্দুয়ানি চালচলন। স্বজাতির এই অবস্থা দেখে মাওলানা ইলিয়াস পেরেশান হয়ে যান।
মাওলানা ইলিয়াস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই কেবল এ বিভীষিকাময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। তিনি তাদের পরিশুদ্ধির উপায় খুঁজতে থাকেন। ১৯ শতকের প্রথমভাগে মাওলানা মেওয়াতের বাংগলেওয়ালি মসজিদে শিক্ষায়তন চালু করেন।
একদিনের ঘটনা। নামাজের সময় মাওলানা ইলিয়াস মসজিদের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। উদ্দেশ্য কোনো মুক্তাদি পাওয়া যায় কিনা! এ সময় তিনি দেখলেন কিছু মুসলিম শ্রমিক কাজের খোঁজে দিল্লি যাচ্ছে। তিনি তাদেরকে নামাজ পড়ার জন্য আহ্বান করলেন। কিন্তু তাদের অবস্থা দেখে মাওলানা ব্যথিত হলেন। এরা অজু করার নিয়ম-কানুনও জানে না। নামাজের পর মাওলানা ইলিয়াস তাদেরকে কুরআন মজিদের কিছু আয়াত শিক্ষা দিলেন। এরা সারাদিন কাজ করে যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেত, তিনি তাদেরকে এই পরিমাণ অর্থ দিতে চাইলেন, বিনিময়ে তারা তাঁর সদ্যপ্রতিষ্ঠিত মক্তবে পাঠ গ্রহণ করবে।
মেওয়াতি শ্রমিকরা তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হল। মাওলানা ইলিয়াস তাঁর পাঠ পরিক্রমা শুরু করলেন। কয়েকদিনের মধ্যে আরও মেওয়াতি এসে ভর্তি হল। কাশেফুল উলুম নামের এই মাদরাসার প্রাথমিক ছাত্র ছিল গরিব ও অশিক্ষিত বদ্দু মেওয়াতিরা। এদের সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৩০ জন। মাওলানা তাদের মাঝে দীনের আলো ছড়াতে লাগলেন।
বিস্ময়কর ফল ফলতে লাগল। আইয়ামে জাহেলিয়াতের আরবরা আল্লাহর রাসুলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করেছিল, তার প্রতিচ্ছবি যেন ফুঁটে উঠল আরেকবার দিল্লির মেওয়াতে। কিছুদিনের মধ্যে এই লোকগুলো ইসলামকে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে নিল। এরপর এদের তৎপরতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো আশেপাশের অঞ্চলেও। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে, এক শহর থেকে অন্য শহরে এবং একসময় দেশের সামীনা মাড়িয়ে বিশ্ব মানচিত্রে। ষাটের দশকের শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনতে জামাত বের হতে লাগল। একুশ শতকে এসে এ আন্দোলন আজ পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে। ভৌগোলিক মানচিত্রে অনুল্লেখ্য জনপদেও আছে এদের সরব উপস্থিতি। আরবে-আজমে, কালো আফ্রিকায় কিংবা উত্তাল অটলান্টিক পেরিয়ে এই কাফেলা ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের হিমশীতল ভূখণ্ডেও।
মেওয়াত আজ দুনিয়ার লাখো মানুষের হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। নিচু শ্রেণির ইতর এই প্রাণীগুলোকে মাওলানা ইলিয়াস মানুষ ও মানবতার এমন স্তরে উন্নীত করেছেন, তা শুধু দেড় হাজার বছর আগের আল্লাহর রাসুলের প্রিয় সাহাবাদের ঈমানদীপ্ত দাস্তানের সঙ্গেই তুল্য হতে পারে। দিল্লির অখ্যাত মেওয়াত থেকে ঈমানের যে স্ফূলিঙ্গ জ্বলে উঠেছে তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের দিকে দিকে। ক্ষুদ্র এই বস্তির বাসিন্দা আজ বিশ্বের সহস্র জনপদে হেদায়েতের দীপশিখা জ্বালিয়ে চলেছে। আল্লাহর প্রিয়বান্দাদের তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে, গোমরাহ ও পথহারা মানুষদের হেদায়েতের সন্ধান দিতে, গাফেলকে সচেতন করতে এরা চষে বেড়াচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম পৃথিবীর তাবৎ প্রান্তে। সাদা-কালো, ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়কন্দরে দীনে মোহাম্মাদির চেরাগ জ্বালাতে এরা অক্লান্ত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর দীনের জন্য কবুল করুন! আমিন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন