শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

ইলম অন্বেষণের গুরুত্ব ও মর্যাদা : মাওলানা আব্দুস সাত্তার

প্রথমেই ঐ দয়াময় সত্ত্বার প্রসংশা জ্ঞাপন করছি যিনি মানুষকে অক্ষর জ্ঞান দান করেছেন। অসংখ্য দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী মুহাম্মদ সা. এর উপর যিনি দীনি জ্ঞান অর্জন করাকে সকলের উপর ফরজ করেছেন এবং তাঁর জান উৎসর্গকারী সাহাবীদের উপর।
আমাদের এই মহান ধর্মে ইলমকে অনেক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ইলমের ধারক-বাহক নবী-রাসুলদের উত্তরাধিকারী। আর আবেদ ও আলেমের মর্যাদার ফারাক আসমান ও জমিনের মতো। কায়স ইবন কাছীর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদীনা থেকে এক ব্যক্তি দামেশকে আবু দারদা রা.-এর কাছে এলো। তিনি জিজ্ঞেস করেলেন, হে ভাই, কোন জিনিস এখানে তোমার আগমন ঘটিয়েছে?
তিনি বললেন : একটি হাদিস এখানে আমাকে এনেছে, যা আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন বলে আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে।
তিনি জানতে চাইলেন : তুমি কি অন্য কোনো প্রয়োজনে আসো নি?! তিনি বললেন, না।
জানতে চাইলেন : তুমি কি বাণিজ্যের জন্যে আসো নি? উত্তর দিলেন, জী না।
তিনি জানালেন, আমি কেবল এ হাদিস শিখতেই আপনার কাছে এসেছি।
তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইলম হাসিলের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করে আল্লাহ তাঁর জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আর তালিবুল ইলমকে খুশি করতে ফেরেশতারা তাঁদের ডানা বিছিয়ে দেন। আলেমের জন্য আসমান ও জমিনের সবাই মাগফিরাত কামনা করতে থাকে। এমনকি পানির মাছগুলো পর্যন্ত। আর আবেদের ওপর আলেমের শ্রেষ্ঠত্ব সকল তারকার ওপর চাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের মতো। নিশ্চয় আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। তবে নবীগণ দিনার বা দিরহামের উত্তরাধিকারী বানান না। তাঁরা কেবল ইলমের ওয়ারিশ বানান। অতএব যে তা গ্রহণ করে সে পূর্ণ অংশই পায়।’ [তিরমিযী : ২৬৮২]
আর আলেমগণ হলেন বান্দাদের জন্য আল্লাহর বিশেষ রক্ষী। কারণ তাঁরা শরিয়তকে ভ্রান্তপন্থীদের বিকৃতি ও অজ্ঞদের আপব্যাখ্যা থেকে রক্ষা করেন। আলেমদের জন্য এ এক বিশাল মর্যাদার ব্যাপার। দীনের ব্যাপারে তাঁদের কাছেই ছুটে যেতে হয়। হতে হয় তাঁদেরই শরণাপন্ন। কেননা আল্লাহ তাআলা অজ্ঞদের জন্য আবশ্যক করে দিয়েছেন তাঁদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করা। তিনি ইরশাদ করেন, ‘সুতরাং জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর যদি তোমরা না জান’। [সূরা আন-নাহল, আয়াত : ৪৩] আর প্রকৃতপক্ষে তাঁরা মানুষের চিকিৎসক। কেননা দেহের রোগের চেয়ে আত্মার ব্যাধিই বেশি। কারণ, মূর্খতা একটি রোগ আর এই রোগগুলোর ওষুধ হলো এই ইলম। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “নিশ্চয় অজ্ঞতার চিকিৎসা হলো জিজ্ঞাসা”। [আবু দাউদ : ৩৩৬] ইলমের মর্যাদা
১.ইলম অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ.-কে ইলমের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেন, তোমরা কি আল্লাহর এ বাণীর প্রতি লক্ষ্য করো নি? এতে তিনি ইলম হাসিলের পর আমলের কথা বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে : ‘অতএব জেনে রাখ নিঃসন্দেহে আল্লাহ ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। তুমি ক্ষমা চাও তোমার ও মুমিন নারী-পুরুষদের ক্রটি-বিচ্যুতির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং নিবাস সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। [সূরা মহাম্মদ, আয়াত : ১৯]
এ আয়াতে  আগে ইলম তথা জানার কথা বলা হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে আমলের (ক্ষমা চাওয়ার) কথা। এই আয়াতকে সামনে রেখে ইমাম বুখারি রহ. তদীয় সহিহ গ্রন্থের একটি অধ্যায় রচনা করেছেন এমন শিরেনামে এ অধ্যায় ‘বলা ও করার আগে শেখা সম্পর্কে’। অতএব কথা ও কর্মের আগে ইলম অর্জনের অগ্রাধিকার। কারণ ইলম ছাড়া কোনো আমল শুদ্ধ হয় না। আর প্রথমেই শিখতে হবে তাওহিদ তথা আল্লাহর নিরঙ্কুশ একত্ববাদের ইলম। একে বলা হয় সুলুকের ইলম। যাতে করে আল্লাহর পরিচয় লাভ হয়। আকিদা শুদ্ধ করা যায়। নিজেকে চেনা যায় এবং কিভাবে নিজেকে বিশুদ্ধ করা যায় তাও জানা যায়।
২. ইলম দৃষ্টির আলো
ইলম দৃষ্টির আলো। যা দিয়ে মানুষ বস্তুর হাকিকত ও বাস্তবতা অনুধাবন করেত পারে। তবে এ কিন্তু চোখের দৃষ্টি নয়; এ হলো অন্তরের দৃষ্টি। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তারা কি জমিনে ভ্রমণ করে নি? তাহলে তাদের হত এমন হৃদয় যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করতে পারত এবং এমন কর্ণ যা দ্বারা তারা শুনতে পারত। বস্তুত চোখ অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় বক্ষস্থিত হৃদয়। [সূরা আল-হজ্ব, আয়াত : ৪৬]
এ জন্যই আল্লাহ তা’আলা মানুষকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন : আলেম ও অন্ধ। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি জানে তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা নাযিল হয়েছে, তা সত্য, সে কি তার মত, যে অন্ধ? বুদ্ধিমানরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে। [সূরা আর-রাদ, আয়াত : ১৯]
৩.ইলম মানুষের অন্তরে আল্লাহ ভয় সৃষ্টি করে :
যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল। [সূরা ফাতির, আয়াত : ২৮]
আরেক আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
“নিশ্চয় এর পূর্বে যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তাদের কাছে যখন এটা পাঠ করা হয় তখন তারা সিজদাবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ে। আর তারা বলে, ‘নিশ্চয় এর পূর্বে যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হেয়েছে, তাদের কাছে যখন এটা পাঠ করা হয় তখন তারা সিজদাবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ে। আর তারা বলে, ‘পবিত্র মহান আমাদের রব! আমাদের রবের ওয়াদা অবশ্যই কার্যকর হয়ে থাকে। আর তারা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে। [সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত : ১০৭-২১০৯]
৪.ইলম বৃদ্ধির জন্য দু’আ করা
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে ইলম বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করতে বলেছেন। ইলমের মর্যাদা হিসেবে এতটুকুই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন, “এবং তুমি বল, ‘হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।’ [সূরা ত্ব-হা, আয়াত : ১১৪]
ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, যদি ইলম থেকে উত্তম কিছু থাকত তবে আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা-ই বৃদ্ধির প্রার্থনা করতে বলতেন। যেমন এ আয়াতে ইলম বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করতে বলেছেন।
৫.ইলম উত্তম জিহাদ
জিহাদের একটি প্রকার হলো প্রমাণ ও দলীলের মাধ্যমে জিহাদ করা। এটিই নবীর উত্তরাধিকারী নেতৃবৃন্দের জিহাদ। মুখ ও হাতের জিহাদ থেকে এটি উত্তম। কারণ ইলম অর্জনে বেশি কষ্ট করতে হয় এবং এর শক্রও বেশি। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আমি ইচ্ছা করলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী পাঠাতাম। সুতরাং তুমি কাফিরদের আনুগত্য করো না এবং তুমি কুরআনের সাহয্যে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম (জিহাদ) কর।’ [সূরা আল্লফুরকান, আয়াত : ৫১-৫২]
ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, এটি ছিল তাদের বিরুদ্ধে কুরআনের সাহয্যে জিহাদ। জিহাদের প্রকারদ্বয়ের মধ্যে এটিই বড়। একে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদও বলা হয়। কারণ মুনাফিকরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করত না। তারা বরং দৃশ্যত মুসলিমদের সঙ্গেই থাকত। কখনো তারা মুসলিমের সঙ্গে শত্র“দের বিরুদ্ধে লড়াইয়েই শরিক হত। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘হে নবী, কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের ব্যাপারে কঠোর হও; আর তাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং তা কত নিকৃষ্ট গন্তব্যস্থল! [সূরা আত-তাহরীম, আয়াত : ০৯] আর বলাবাহুল্য, মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হয় কুরআন ও প্রমাণের মাধ্যমে। উদ্দেশ্য হলো, জিহাদ, ইলম অর্জন এবং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান- সবগুলোই সাবিলুল্লাহ বা আল্লাহর রাস্তা। [দেখুন, ইবনুল কায়্যিম, মিফতাহু দারিস সাআদ : ১/৭০]
আবূ হুরায়রা  রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার এই মসজিদে কেবল কোনো কল্যাণ (ইলম) শেখার বা শেখাবার অভিপ্রায়ে আসবে, সে আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের মর্যাদার অধিকারী। আর যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আসবে, সে ওই ব্যক্তির অনুরূপ যে অন্যের সম্পদ পরিদর্শনে আসে। [ইবন মাজা : ২২৭, সহিহ সনদে বর্ণিত]
৬. ইলম প্রচারে প্রতিযোগিতা
আল্লাহ তাআলা কেবল দু’টি বিষয়ে পরস্পর হিংসা (ই’র্ষা) পোষণ বৈধ রেখেছেন : সম্পদ ব্যয় এবং ইলম ব্যয়। এটি করা হয়েছে এ দুই জিনিসের মর্যাদা হেতু। আর মানুষকে নানা ধরনের কল্যাণ আহরণে পরস্পর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। যেমন আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কেবল দুই ব্যক্তিকে হিংসা করার অনুমতি রয়েছে : ওই ব্যক্তিকে আল্লাহ যাকে সম্পদ দিয়েছেন। অতপর তাকে সে সম্পদ হকের পথে ব্যয় করতে ন্যস্ত করেছেন। আর ওই ব্যক্তি যাকে তিনি হিকমাহ বা ইলম দান করেছেন। ফলে সে তা দিয়ে বিচার করে এবং তার শিক্ষা দেয়।’ [বুখারি : ৭৩]
৭. ইলম ও দীন সম্পর্কে পাণ্ডিত্য আল্লাহর মহাদান
আল্লাহ যাকে দীন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দান করেন তিনিই প্রকৃত তাওফিক প্রাপ্ত। কেননা দীনী বিষয়ে প্রাজ্ঞতা ও পাণ্ডিত্য সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ আল্লাহ যার কল্যাণ চান তিনি তাকে দীন বিষয়ে গভীর ইলম দান করেন।’ [বুখারি : ৭৩১২; মুসলি : ২৪৩৯]
৮. ইবাদতের চেয়ে ইলমের মর্যাদা বেশি
ইবাদতের চেয়ে ইলমের গুরুত্ব বেশি। কারণ, ইলমের মর্যাদার হেতুগুলো একটি হলো তা ইবাদতের প্রতি ধাবিত করে। আর যে ইলম হাসিলে পথ অতিক্রম করে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ হয়ে যায়। মা আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ আমার প্রতি ওহী করেছেন, যে ব্যক্তি ইলম অর্জনে কোনো রাস্তা অবলম্বন করে, আমি তার জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দিই। আর আমি যার দুই প্রিয়তমকে (চক্ষুদ্বয়) কেড়ে নিই, এর বিনিময়ে আমি তাকে জান্নাত দান করি। কল্যাণের ইলম আহরণে আধিক্য ইবাদতেও আধিক্যের হেতু। দীনের সেরা বিষয় হলো আল্লাহর ভয়।’ [বাইহাকি, শুআবুল ঈমান : ৫৩৬৭, সহিহ সনদে বর্ণিত]
ইলম হাসিল সম্পর্কে পূর্বসূরিদের কিছু বাণী
পূর্বসূরি বুযুর্গদের প্রতি আল্লাহ রহম করুন। তাঁরা নিজের অন্তরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন। নিজের নিয়ত পর্যালোচনা করতেন। যেমন হাসান বসরী রহ. প্রায়ই নিজেকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করে বলতেন, ‘তুমি নেককার, অনুগত ও ইবাদতগুযারদের মতো কথা বলো আর কাজ করো ফাসেক, মুনাফিক ও লোক দেখানো ব্যক্তিদের? আল্লাহর শপথ, এসব মোটেই মুখলিছ বা খাঁটি ঈমানদের বৈশিষ্ট্য নয়।
সুফিয়ান ছাওরী রহিমাহুল্লাহ বলতেন, ‘আমার যেসব আমল আমি প্রকাশ্যে করেছি; সেগুলোকে আমি কিছুই মনে করি না। কারণ, আমাদের মতো লোকদের পক্ষে কেউ দেখে ফেললে সে আমলকে ইখলাসপূর্ণ রাখা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।”
ইউসুফ ইবন হুসাইন রহ. বলেন, ‘দুনিয়ার মধ্যে সবচে মূল্যবান বিষয় হলো ইখলাস। আমার অন্তর থেকে রিয়া বা লোক দেখানোর মানসিকতা তাড়াতে কত চেষ্টাই না করেছি; কিন্তু সে তাতে নতুন রঙ্গে আবির্ভূত হয়।
মুতাররিফ ইবন আবদুল্লাহ রহ. তাঁর দু’আয় বলতেন, হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে ওই কাজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যা থেকে আমি তাওবা করেছি অতপর আবার তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছি। আমি সেই বিষয়ের জন্য আপনার কাছে মার্জনা প্রার্থনা করছি যা আমার অন্তরে কেবল আপনার জন্যই স্থাপন করেছি অতপর তার ব্যাপারে আপনার সঙ্গে বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতে পারি নি। আমি সেই বিষয়ের জন্যও আপনার কাছে মার্জনা করছি, যা কেবল আপনাকেই সন্তুষ্ট করতে চেয়েছি বলে ধারণা করেছি, অতপর তার সঙ্গে আমার অন্তরে তা মিশে গেছে যা সম্পর্কে আপনি অবগত।’
ফুযাইল ইবন আয়ায রহ. বলতেন, আল্লাহ যখন ইসমাইল ও ঈসা আলাইহিস্ সালামদের মতো মহাসত্যবাদীদেরই তাঁদের (ঈমানের) সত্যবাদিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন, তখন আমাদের মতো মিথ্যাবাদীদের সাথে তিনি কী আচরণ করবেন?
আবু উবাইদা মামার আলমুছান্না রহিমাহুল্লাহ হলেন, ‘যে ব্যক্তি রুটি খাওয়ার (তথা উদরপূর্তির) উদ্দেশে ইলম শেখে তবে তার জন্য যেন ক্রন্দনকারীরা ক্রন্দন করে।’
হাফেয যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আলেমের কর্তব্য হলো সৎ উদ্দেশ্যে এবং সঠিক নিয়তে কথা বলা। তার কথা যদি তাকে মুগ্ধ করে তবে তিনি চুপ হয়ে যাবেন। নিজের নফসের হিসাব নেয়া থেকে বিরাম নাই। কারণ, প্রদর্শন ও প্রশংসাই তার পছন্দ।’
হিশাম দাসতওয়ায়ীর জীবনী লিখতে গিয়ে ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ গ্রন্থে ‘আওন ইবন আমারা বলেন, আমি হিশাম দাসতওয়ায়ীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘শপথ আল্লাহর, আমি এ কথা বলতে পারব না যে অমুক দিন আমি হাদিস শিখতে গিয়েছি আর তা করেছি একমাত্র আল্লাহ তা’আলাকে সন্তুষ্ট করার ইচ্ছায়।’
দাসতওয়ায়ী রহিমাহুল্লাহ- এর এ বাণী সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইমাম যাহাবী বলেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমিও পারব না হলফ করে বলতে। কেননা পুর্বসুরী বুযুর্গগণ ইলম হাসিল করতেন একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিমিত্তে। ফলে তাঁরা মহৎ হয়েছেন। হয়েছেন ইমাম ও আদর্শ, মানুষ যাদের অনুসরণ করে। আর তাঁদের কাছ থেকে কিছু লোক ইলম শিখেছেন প্রথমে একমাত্র আল্লাহর জন্য। ইলম শেখার ফলে তারা অনেক এগিয়ে গেছেন। তারপর তাঁরা নিজেরা নিজেদের অন্তরের হিসাব এগিয়ে গেছেন। তারপর তাঁরা নিজেরা নিজেদের অন্তরের হিসাব নিয়েছেন। তাই এ পথিমধ্যে এ ইলমই তাঁদেরকে ইখলাস ও আল্লাহনিষ্ঠার দিকে নিয়ে গেছে।’
যেমন ইমাম মুজাহিদ ও অন্য অনেকে বলেন, ‘আমরা এ ইলম শিখেছি, অথচ এতে আমার নিয়ত বড় কিছু ছিল না। অতপর আল্লাহ পরবর্তীতে আমাদেরকে ‘সহিহ নিয়তে’র তাওফিক দান করেছেন।’
আবার কেউ বলেছেন, ‘আমরা এ ইলম শিখেছি গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়াও অন্য কারও উদ্দেশ্যে। কিন্তু এ ইলমই কেবল আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোও জন্যে হাসিল হতে অস্বীকার করেছে।
এও ভালো। প্রথমে নিয়ম সঠিক না থাকলেও শুদ্ধ করে পরে এই ইলমের প্রসারে আত্মনিয়োগ করা যায়। আবার কেউ কেউ এই ইলম শিখেছে অসৎ উদ্দেশ্যে, নিছক দুনিয়া কামানো এবং প্রশংসা পাবার অভিপ্রায়ে। অতএব তাদের জন্য তা-ই বরাদ্ধ করা হয়েছে যার নিয়ত তারা করেছে। যেমন উবাদা ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াাসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি যুদ্ধ করে আর তার যুদ্ধের মাধ্যমে কিছু উটের রশি কিংবা সামান্য সম্পদ লাভের নিয়ত করে, তবে সে শুধু তা-ই পাবে, যার নিয়ত সে করেছে।
আপনি এই শ্রেণীকে দেখবেন তারা ইলমের আলোয় আলোকিত হয় না। তাদের আত্মায় এ ইলম স্থিতি লাভ করে না। তাদের আমলেও এ ইলমের কোনো বড় প্রতিফল লক্ষিত হয় না। নিশ্চয় তারাই কেবল আলেম যারা আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করে।
আরেক শ্রেণী আছে, যারা ইলম পেয়েছে। এবং ইলমের বদৌলতে পদ-পদবিও লাভ করেছে। অতপর তারা যুলম করেছে। ইলমের শর্তাদি পরিহার করেছে। অতপর তারা যুলম করেছে। ইলমের শর্তাদি পরিহার করেছে। আর কবীরা গুনাহ ও অশ্লীল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। ধ্বংস তারা। তারা প্রকৃত আলেম নয়!!
উপর্যূক্ত সব শ্রেণীই ইলমের একটি বড় অংশ প্রচার করেছেন। সামগ্রিকভাবে তারা এতে প্রাজ্ঞতা ও পাণ্ডিত্যও অর্জন করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের মধ্যে একদল এর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর তা করেছে ইলম ও আমলে ত্র“টির মধ্য দিয়ে । আরেক শ্রেণী তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে, যারা দৃশ্যত নিজেরদের ইলমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জাহির করেছে কিন্তু তারা সামান্য বিদ্যা ছাড়া কোনোরূপ গভীরতা অর্জন করে নি। এতেই তারা নিজেদের বিদগ্ধ আলেম ভাবতে শুরু করেছে। তাদের মাথায় কখনো কল্পনায়ও উদয় হয় না যে তারা এর দ্বারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে। কারণ, তারা কোনো আদর্শ শিক্ষক পায়নি,  ইলম অর্জনে যাকে অনুসরণ করবে। এ কারণে তারা এলোমেলোভাবে গড়ে উঠেছে। যেখানে শিক্ষকের উদ্দেশ্য থাকে ভালো কোনো কিতাবের ক্লাস পাওয়া। কদাচিৎ তিনি সেই কিতাব দেখবেন না। আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও নাজাত চাই। যেমন কেউ বলেছেন, আমি নিজে আলেম নই; আবার কোনো আলেমকেও দেখি নি।
অনেক পূর্বসূরি বুযুর্গই বলেছেন, ‘আমরা ইলম শিখেছি গাইরুল্লাহর জন্য কিন্তু সে অস্বীকার করে বলেছে সে কেবল আল্লাহর জন্যই হতে চায়।
অন্য একজন বলেন, ‘আমরা এ ইলম শিখেছি, অথচ এতে আমাদের নিয়ত বড় কিছু ছিল না। অতপর আল্লাহ পরবর্তীতে আমাদেরকে ‘সহিহ নিয়তে’র তাওফিক দান করেছেন।’ অর্থাৎ ইলমের সুফল এই ছিল যে তা একমাত্র আল্লার জন্য হয়ে যায়।
‘এক দল লোক আছে যারা হাদিস সংকলন করে অথচ তাদের ওপর এর কোনো প্রভাব দৃষ্টিগোচর হয় না। তাদের কোনো সম্মান বা মর্যাদাও নেই সমাজে। তিনি বললেন, এরা হাদিসের দ্বারা কল্যাণের দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।
হাবীব ইবন আবী ছাবেত বলেন, ‘আমরা এ ইলম শিখেছি তখন আমাদের বড় কিছু নিয়ত ছিল না। অতপর আল্লাহ পরবর্তীতে সহিহ নিয়ত এবং আমল যোগ হয়েছে। অতএব বান্দার হার মানা উচিত নয়। বরং নিয়ত শুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। যদিও এ প্রথম দিকে এই শুদ্ধ করার কাজটিকে কঠিন মনে হবে। সুফিয়ান ছাওরী রহমিাহুল্লাহ বলেন, ‘আমি নিয়তের চেয়ে অন্য কিছু দেখি না যা শুদ্ধ করা এত কঠিন।’
সিয়ারু আলামিন নুবালা’ গ্রস্থে ইবন জুরাইজের জীবনীতে অলীদ ইবনে মুসলিম বলেন, ‘আমি আওযাঈ, ‘সাঈদ ইবন আবদুল আযীয ও ইবন জুরাইজকে জিজ্ঞেস করলাম কেন আপনারা ইলম শিখেছেন? তাঁরা প্রত্যেকেই জবাব দিলেন, আমার নিজের জন্য শিখেছি। তবে ইবন জুরাইজ বললেন, আমি তা শিখেছি মানুষের জন্য।
এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইমাম যাহাবী রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আমি বলি, তাঁরা কতই না সত্যবাদী ছিলেন! আর আজ আপনি একজন নির্বোধ মুফতিকেও জিজ্ঞেস করবেন কেন আপনি ইলম শিখেছেন? তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দেবেন, আমি আল্লাহর জন্য শিখেছি। তিনি মিথ্যা বলছেন। ইলম শিখেছেন তিনি দুনিয়া কামাইয়ের জন্য। তিনি যে মুফতি নামে খ্যাতিমান সে ব্যাপারে পুঁজি তার কতই না স্বল্প! আপনার ওপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক হে যাহাবী। এখন আমরা যে অধঃপতিত অবস্থায় আছি তা দেখলে না জানি আপনি কী বলতেন! আমি যেন তাঁকে এ যুগের ত্র“টিগুলো দেখিয়ে দিচ্ছি। প্রকৃতি শোনাচ্ছি। যার কারণে আমাদের মধ্যে এমন দঙ্গল, বর্বর বিদ্যাধারীর আবির্ভাব ঘটছে। মিথ্যার বেসাতিই যাদের ধর্ম। আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। আপনার শান্তিকে আরও দীর্ঘ ও সুপরিসর করুন। ইমাম বুখারি রহিমাহুল্লাহ তদীয় সহিহ গ্রন্থে একটি হাদিস সংকলন করেছেন শত নাম্বারে।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে ইসমাঈল ইবন আবী উ‘আইস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার কাছে মালেক হিশাম ইবনে উরওয়া থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর বাবা আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, ‘ আল্লাহ (দুনিয়া থেকে) ইলম উঠিয়ে নেবেন না তাঁর বান্দাদের অন্তর থেকে তা উঠিয়ে নেবার মাধ্যমে। বরং ইলম উঠিয়ে নেবেন তিনি আলেমদের তুলে নেবার মধ্য দিয়ে। এক পর্যায়ে যখন কোনো (প্রকৃত) আলেম জীবিত থাকবেনা তখন লোকেরা অজ্ঞ ও মূর্খদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করেব। অতপর তাদেরকে (শরঈ বিষয় সম্পর্কে) জিজ্ঞেস করা হবে আর না জেনেই তারা ফতোয়া দিতে শুরু করবে। ফলে তারা নিজেরা যেমন গোমরাহ হয়ে যাবে। অন্যদেরও তেমন গোমরাহীর পথে নিয়ে যাবে।’
একই বিষয়ের হাদিস একটি বর্ণিত হয়েছে সহিহ মুসলিম শরিফেও। ২৬৭৩ নং এ হাদিসে ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমাদের কাছে হারামালা ইবন ইয়াহইয়া আত-তুজিবী বর্ণনা করেন, আমাদেরকে আবদুল্লাহ ইবনে অহাব সংবাদ দেন, আমার কাছে আবু শুরাইহ বর্ণনা করেন যে আবুল আসওয়াদ তাঁর কাছে উরওয়া ইবন যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা’র ঘটনা বয়ান করেন। উরওয়া বলেন, আমাকে উদ্দেশ করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বললেন, হে আমার ভাগিনা, আমাকে একটু জানাবে যে আবদুল্লাহ ইবন আমর রা. আমাদের নিয়ে হজ্জে যাবেন কি-না। তুমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এবং বিষয়টা তাঁকে জিজ্ঞেস করবে। তিনি তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করে আসছিলেন। তিনি যা উল্লেখ করছিলেন তার মধ্যে এই হাদিসটিও ছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ মানুষের কাছ থেকে একবারে ইলমকে ছিনিয়ে নেবেন না। বরং আলেমদের উঠিয়ে নেবেন। আর তাঁদের সঙ্গে তাঁদের ইলমও উঠিয়ে নেবেন। অতপর মানুষের মধ্যে শুধু মূর্খ নেতারা অবশিষ্ট থাকবে। এরা ইলম ছাড়াই তাদের ফতোয়া দেবে। ফলে তারা পথভ্রষ্ট হবে এবং লোকদেরও পথভ্রষ্ট বানাবে।
উরওয়া বলেন, আমি যখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে এই হাদিসটি শোনালাম, তাঁর কাছে কথাগুলো অনেক ভারি মনে হলো এবং তিনি অস্বীকার করতে চাইলেন। তিনি বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তোমাকে বলেছেন যে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন বলতে শুনেছেন? এমনকি আমি তার সাথে পরবর্তীতে সাক্ষাৎ করে তার কাছে জিজ্ঞেস করলাম ঐ হাদিসটি সম্পর্কে ইলম সম্পর্কে তিনি তোমাকে যা শুনিয়েছিলেন। উরওয়া বলেন, আমি তখন ইবন উমর এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে এ বিষয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করি, তিনি আমাকে প্রথমবারের মতই হাদিস বর্ণনা করলেন। উরওয়া বলেন, তারপর যখন আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে এ সংবাদ দিলাম তখন তিনি বললেন, আমার বিশ্বাস তিনি ঠিকই বলেছেন। আমি তাঁকে দেখছি এতে তিনি কিছু কম করেন নি আবার বেশিও করেন নি।
এ হাদিস থেকে প্রতীয়মাণ হয় কিয়ামত যত কাছে আসবে নিষ্ঠাবান মুখলিস আলেমের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাবে। অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন বিদ্বান হয়তো অনেক মিলবে কিন্তু প্রকৃত আলেমের সংখ্যা নগন্য হয়ে যাবে যাদের প্রশংসা করে পবিত্র কুরআনে পুর্বে উল্লিখিত ওই বাক্য উচ্চারিত হয়েছে। অর্থাৎ ‘নিশ্চয় আলেমরাই আল্লাহকে প্রকৃত অর্থে ভয় করেন’।
অতএব প্রত্যেক আলেম ও তালেবে ইলম ভাইয়ের প্রতি অনুরোধ, আসুন আমরা নিজেদের নিয়তের খবর নেই। নিজেদের আত্মার প্রতি নিজেরা একটু দৃষ্টি দেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ইখলাস ও নিষ্ঠাবান মুমিন হবার তাওফিক দান করুন। আমিন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন