রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৫

আল্লামা থানভী (রহঃ) এর বিরুদ্ধে মাজারপূজারি রেজভিদের প্রোপাগান্ডা, ‘রাসূল (সা)-এর গায়েবের যেমন জ্ঞান আছে, তেমন জ্ঞান প্রত্যেক শিশু, উম্মাদ এবং জানোয়ারেরও রয়েছে’—আমাদের খণ্ডন।

প্রশ্ন – আহমদ রেজাখান তার পুস্তক হুসামুল হারামাইন কিতাবে লিখেছেন: মাওলানা আশরাফ আলী থানভী ‘হিফজুল ঈমান’ কিতাবে লিখেছেন- “রাসূল (সা)-এর গায়েবের যেমন জ্ঞান আছে, তেমন জ্ঞান প্রত্যেক শিশু, উম্মাদ এমনকি জানোয়ারদেরও রয়েছে”।
.
আহমদ রেজাখান ব্রেলভীর উপরিউক্ত অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?
.
জবাব-
.
আগেই সাধারণ মুসলমানদের সতর্কতার জন্য জানাচ্ছি যে, আমাদের আকাবীরে দেওবন্দ যারা তাদের আজীবন মেহনত দ্বারা এ উপমহাদেশ থেকে বাতিল আক্বিদা, শিরক- বিদআতকে বিতাড়িত করার জন্য সংগ্রাম করেছেন তাদের বিরুদ্ধে শিরক-বিদআতীরা যেসব অভিযোগ করেছে তার সবক’টিই মিথ্যাচার। এ সকল আক্বিদার সাথে আমাদের সামান্যতম কোন সম্পর্ক নেই।
.
অধিকাংশই এতই মিথ্যাচার যে, লিখতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে যাই। ওরা মুসলমান দাবি করে এমন জঘন্য মিথ্যাচার করে কি করে? কোথাও শব্দের আগে পরের বক্তব্য বাদ দিয়ে খন্ড বক্তব্য উদ্ধৃত করে, কখনো শব্দ পাল্টে নিজ থেকে শব্দ বাড়িয়ে, কখনো এক পৃষ্ঠার পর কয়েক পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে আরেক পৃষ্ঠার শব্দ মিলিয়ে তৈরী করে এক মনগড়া প্লাটফর্ম। যা দেখে সাধারণ মুসলমান না বুঝেই স্বীকার হয় বিভ্রান্তিতে।
.
তাই সকল পাঠকদের প্রতি আমাদের অনুরোধ রেজাখানীগ্রুপ এবং কথিত আহলে হাদীস গ্রুপের পক্ষ থেকে যখনই আমাদের স্বর্ণালী আকাবীরদের বিরুদ্ধে কোন আপত্তিকর মিথ্যা শুনতে পান, তাহলে হক্কানী ওলামাদের কাছে এর সঠিক ব্যাখ্যা বা মূল কিতাব থেকে না পড়ে আন্দাজেই তা প্রচার করে গোনাহগার হবেন না। না জেনে এবং যাচাই বাছাই না করে তা প্রচার করে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।
.
ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻰ ﻫُﺮَﻳْﺮَﺓَ ﺃَﻥَّ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰَّ – ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ- ﻗَﺎﻝَ « ﻛَﻔَﻰ ﺑِﺎﻟْﻤَﺮْﺀِ ﺇِﺛْﻤًﺎ ﺃَﻥْ ﻳُﺤَﺪِّﺙَ ﺑِﻜُﻞِّ ﻣَﺎ ﺳَﻤِﻊَ ( ﺳﻨﻦ ﺍﺑﻰ ﺩﺍﻭﺩ- ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻷﺩﺏ، ﺑﺎﺏ ﻓِﻰ ﺍﻟﺘَّﺸْﺪِﻳﺪِ ﻓِﻰ ﺍﻟْﻜَﺬِﺏِ. –
.
অনুবাদ : হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যা শুনে তা’ই বলতে থাকা [যাচাই বাছাই ছাড়া] ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ঠ।
.
[সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৯৯৪, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৩০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৭] .
♣’হিফজুল ঈমান’ কিতাবে আসলে কী ছিল?
.
আহমদ রেজাখান ব্রেলভীর উক্ত অভিযোগটির জবাব খুঁজতে গিয়ে মূল কিতাব দেখে এতই আশ্চর্য হয়েছি যে, এমন বিকৃতি কোন মুসলমান করতে পারে বলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। জঘন্য কোন কাফেরও এমন মিথ্যাচারের আশ্রয় নিতে পারে না।
.
মূল বিষয়টির দিকে খেয়াল করুন! হাকিমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহঃ এর বিরুদ্ধে এ মিথ্যুকদের অভিযোগ হচ্ছে ” ‘হিফজুল ঈমান’ কিতাবে নাকি লেখা আছে- “রাসূল (সা)-এর গায়েবের যেমন জ্ঞান আছে, তেমন জ্ঞান প্রত্যেক শিশু, উম্মাদ এমনকি জানোয়ারদেরও রয়েছে”। ” [নাউজুবিল্লাহ]।
.
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ‘হিফজুল ঈমান’ কিতাবে উক্তিটি কিভাবে আছে তা এখানে হুবহু তুলে দেয়ার পরই পাঠক বুঝতে সক্ষম হবেন যে, রেজাখানী মিথ্যুকদের অভিযোগ এমন জঘন্যতম বানোয়াট ও বিকৃতি, যা কোন মুসলমান করতে পারেনা। অভিশপ্ত কোন কাফেরও এমন মিথ্যাচারের আশ্রয় নিতে পারে না।
.
‘হিফজুল ঈমান’ কিতাবের ভাষ্য :
.
آپ کی ذات مقدسہ پر علم غیب کا حکم کیا جانا اگر بقول زید صحیح ہو تو دریافت طلب یہ امر ہے کہ اس غیب سے مراد بعض غیب ہے یا کل غیب? اگر بعض علوم غیبیہ مراد ہین تو اس مین حضور صلی اللہ علیہ و سلم کی کیا تخصیص ہین? ایسا علم غیب تو زید عمر بلکہ ہر صبی و مجنون بلکہ جمیع حیوانات و بہائم کیلے بہی حاصل ہے. کیونکہ ہر شخص کو کسی نہ کسی ایسی بات کا علم ہوتا ہے جو دوسرے شخص سے مخفی رہے. تو چاہے کہ سبکو عالم الغیب کہا جاوے. بحوالہ بسط البنان 15
.
অনুবাদ, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সত্তার উপর ইলমে গায়েবের হুকুম লাগানো যদি সঠিক হত, তবে জিজ্ঞাসা করা চাই যে, এ গায়েব দ্বারা কিছু গায়েব উদ্দেশ্য নাকি সকল গায়েব উদ্দেশ্য? যদি কিছু গায়েব উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে তখন শুধুমাত্র হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই নির্দিষ্ট করা হবে কেন? যেহেতু এ ধরণের কতেক গায়েব (অজ্ঞাত বিষয়) তো যায়েদ, উমর এমনকি প্রত্যেক শিশু উম্মাদ; বরং প্রাণী আর চতুষ্পদ জন্তুদেরও অর্জন রয়েছে। কেননা প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো এমন বিষয় জানা রয়েছে যা অন্যদের জানা নেই। তাই বলে কি প্রত্যেককে “আলেমুল গায়েব” (অজ্ঞাত বা অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞানী) বলা যাবে কি?”
.
আসলে হাকিমুল উম্মাত রহঃ তিনি তাঁর উপরিউক্ত নাতিদীর্ঘ ও জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন যে, একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ছাড়া পরাশক্তির অধিকারী যেমন আর কেউ নন, ঠিক তেমনি ইলমে গায়েব তথা অদৃশ্য জ্ঞানেরও অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কেউ নন।
.
পবিত্র কুর’আনের সূরা আন-নমল আয়াত নং ৬৫ -তে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ রয়েছে, “হে নবী! আপনি বলে দিন, একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আকাশ ও জমিনের কেউ গায়েব জানেনা।”
.
খুব খেয়াল করুন-
.
মিথ্যাবাদী রেজভিদের প্রচারণা হল- “রাসূল (সা)-এর গায়েবের যেমন জ্ঞান আছে, তেমন জ্ঞান প্রত্যেক শিশু, উম্মাদ এমনকি জানোয়ারদেরও রয়েছে”।
.
পক্ষান্তরে হাকিমুল উম্মাতের লেখাটির সাথে মিথ্যুকদের প্রচারিত বক্তব্যের কোনো মিল নেই। যা তাঁরই কিতাবের হুবহু ইবারত (ভাষ্য) হতে পুরোপুরি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।
.
এবার আমরা মিথ্যুকদের মিথ্যাচারের কিছু নমুনা দেখে নেব। তারা হাকিমুল উম্মাতের কিতাবের মূল বক্তব্যের ভেতর শব্দের আগে পরের বক্তব্য বাদ দিয়ে খন্ড বক্তব্য উদ্ধৃত করে, এবং শব্দ পাল্টে নিজ থেকে শব্দ বাড়িয়ে কী রকম জঘন্যতম মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়েছে এবং স্বাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভুল বুঝাবুঝির জন্ম দিয়ে যাচ্ছে!
.
রেজাখানী তথা রেজভী ভান্ডারী সুন্নীরা হাকিমুল উম্মাতের বক্তব্যের শুরু থেকে যে অংশটি বাদ দেয় তা হল:

.
“হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সত্তার উপর ইলমে গায়েবের হুকুম লাগানো যদি সঠিক হত, তবে জিজ্ঞাসা করা চাই যে, এ গায়েব দ্বারা কিছু গায়েব উদ্দেশ্য নাকি সকল গায়েব উদ্দেশ্য? যদি কিছু গায়েব উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে তখন শুধুমাত্র হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই নির্দিষ্ট করা হবে কেন?”

তারপর শেষের যে অংশটি কেটে ফেলে দিল তা হল-
.
“কেননা প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো এমন বিষয় জানা রয়েছে যা অন্যদের জানা নেই। তাই বলে কি প্রত্যেককে “আলেমুল গায়েব” (অজ্ঞাত বা অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞানী) বলা যাবে কি?”

অতপর হাকিমুল উম্মাতের বক্তব্যটির আগপাছ কর্তন করার পর এবং শব্দ পাল্টে নিজ থেকে শব্দ [রাসূল (সা)-এর গায়েবের যেমন জ্ঞান আছে] বাড়িয়ে দেয়ার পর যা দাঁড়াল, তা হল-
.
“রাসূল (সা)-এর গায়েবের যেমন জ্ঞান আছে, তেমন জ্ঞান প্রত্যেক শিশু, উম্মাদ এমনকি জানোয়ারদেরও রয়েছে।” (নাউযুবিল্লাহ)।

♦এবার হয়ত কেউ আপত্তি জানাতে পারেন যে, হাকিমুল উম্মাত (রহঃ) তিনি ইলমে গায়েবের উদাহরণ দিতে গিয়ে শিশু উম্মাদ; বরং প্রাণী আর চতুষ্পদ জন্তুদের নাম টেনে আনলেন কেন?
.
আমাদের জবাব-
.
হাকিমুল উম্মাত আল্লামা থানভী রহঃ তিনি (প্রচলিত অর্থে) কিছু ইলমে গায়েবকেও যা মোটামোটি সবারই জানা, তা নবীজি (সা:)-এর জন্য বিশেষত্ব মানা সঠিক নয়- মূলত তাহাই বুঝাতে চেয়েছেন। যে জন্য উদাহরণ দিতে গিয়ে শিশু উম্মাদ; বরং প্রাণী আর চতুষ্পদ জন্তুদের নাম টেনে আনলেও তাতে কোনো সমস্যা নেই। হ্যাঁ, যদি হাকিমুল উম্মাত আল্লামা থানভী রহঃ তিনি (প্রচলিত অর্থে) কিছু ইলমে গায়েবকেও যা মোটামোটি সবারই জানা, তা নবীজি (সা:)-এর জন্য বিশেষত্বস্বরূপ মেনে নেয়া সঠিক মনে করতেন, কেবল তখনি মিথ্যাচারদের এ সমস্ত বালগিল্যতাপূর্ণ আপত্তি গ্রহণযোগ্য হত!
.
(প্রচলিত অর্থে) কিছু ইলমে গায়েবকেও যা মোটামোটি সবারই জানা, তা নবীজি (সা:)-এর জন্য বিশেষত্ব মানা সঠিক না হওয়ার কারণ তিনি এও দর্শালেন যে,
.
“যেহেতু এ ধরণের কতেক গায়েব (অজ্ঞাত বিষয়) তো যায়েদ, উমর এমনকি প্রত্যেক শিশু উম্মাদ; বরং প্রাণী আর চতুষ্পদ জন্তুদেরও অর্জন রয়েছে।
কেননা প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো এমন বিষয় জানা রয়েছে যা অন্যদের জানা নেই। তাই বলে কি প্রত্যেককে “আলেমুল গায়েব” (অজ্ঞাত বা অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞানী) বলা যাবে কি?” (সুবহানআল্লাহ)।
.
♪এতে সূক্ষ্ম ভাবে আরো একটি বিষয় ফুটে উঠে, তা হল-
.
যারা নবীজির পবিত্র সত্তার প্রতি ইলমে গায়েবের নিসবত করে তার দ্বারা যদি কিছু গায়েব উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে তখন পরোক্ষ ভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে (নাউযুবিল্লাহ) শিশু, উম্মাদ এমনকি জানোয়ারদের এলমের সমান্তরাল সাব্যস্ত করা হচ্ছে , যা আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে কুফুরী। বলা বাহুল্য যে, রেজভীরা এ দৃষ্টিকোণ থেকে পরোক্ষ কুফুরীতে লিপ্ত। (মা’আজাল্লাহ)।
.
উপসংহার, পরিশেষে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, হাকিমুল উম্মাতের নামে রেজভী ভান্ডারী সুন্নীদের প্রচারিত উপরিউক্ত অভিযোগ পুরোপুরি অসার এবং ভিত্তিহীন বললেও কম হবে, বরং শতাব্দীর জঘন্যতম মিথ্যাচার আর রেজভিদের সীমাহীন হীনমন্যতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু না।
.
আর যেহেতু উপরিউক্ত অভিযোগ পুরোপুরি অসার এবং ভিত্তিহীন হিসেবে প্রমাণিত হল, সেহেতু আমরা মনে করি যে, উপরিউক্ত বক্তব্যটি আর কারো নয়, বরং বৃটিশের অাশীর্বাদপুষ্ট বিদয়াতি ও মাজারপুজারী পীর আহমদ রেজাখান উল্টোবাস ব্রেলভী’রই (মৃত ১৯২১খ্রিষ্টাব্দ) ।
কাজেই তার তাকফিরী ফতুয়া এবার তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করল। হে আল্লাহ! মিথ্যুকদের মিথ্যাচার থেকে তুমি গোটা উম্মাতে মুহাম্মদী (আলাইহিসসালাম)-কে হেফাজত কর। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।
.
www.markajomar.com/?p=797
.
লিখেছেন- প্রিন্সিপাল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন