রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৫

হাকিমুল উম্মত আল্লামা থানভী (রহঃ)-এর আকিদাও ‘নবী নূরের সৃষ্টি’-এ কথা কি সঠিক?

একটি মহল প্রায় দাবী করে থাকেন যে, থানভী রহঃ এর আকিদাও ‘নবী নূরের সৃষ্টি’ এমনটি ছিল! (মা’আজাল্লাহু আজ্জা-ওয়াজাল)। আল্লামা থানবী রহঃ এর ওপর তাদের উপরিউক্ত অভিযোগ খণ্ডন পূর্বক তথ্য ভিত্তিক জবাব নিচে দেয়া হল।
.
আমাদের জবাব:
.
আল্লামা থানভী রহঃ সম্পর্কে উপরোক্ত অভিযোগ অসত্য এবং বানোয়াট বৈ কিছু না। এবার হয়ত বলতে পারেন যে, তাহলে উক্ত অভিযোগের নেপথ্য রহস্য কী?
হ্যাঁ রহস্য আছে। আর তা হল, তিনি স্বীয় পুস্তক ‘নশরুত্তিব’ কিতাবে “জাবির রাঃ কর্তৃক বর্ণিত নূরের” হাদিসটিকে স্থান দেয়া। ব্যাস! মহাকাণ্ড ঘটে গেল। সে ভ্রষ্ট মহলটি হাউ মাউ করে প্রচার করতে লাগল ‘থানভী বলেছে নবী নূরের সৃষ্টি’!!
মজার কথা: আজ থানবীর উদ্ধৃতিখানা পেশ করব। ফলে তাঁর নাম ভেঙ্গে আজ অব্দি প্রচারিত সে সব নানা কথার ভিত্তি কতটা, তা অকপটে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।
নশরুত্তিবের ২৫ নং পৃষ্ঠার ১ম পরিচ্ছেদে তাঁর ভাষ্য- فائده: اس حديث سے نور محمدی کا حقیقۃ سب سے پہلے پیدا ہونا ثابت ہوا.
অর্থ “এ হাদিস দ্বারা এই কথা সুস্পষ্ট হল যে, হাক্বীকতে নূরে মুহাম্মদী আল্লাহপাকের সর্বপ্রথম সৃষ্ট।”
~
ব্যাস! থানভী রহঃ এর নিজস্ব বক্তব্য যদি কিছু থেকে থাকে তো এ পর্যন্তই। তাই আমরাও এ পর্যন্ত এসে থেমে যাই। এর বাহিরে বিবেকের পাগলা ঘোড়া দৌড়াই না।
~
পাঠক সমীপে প্রশ্ন, থানবীর রহঃ এ উক্তি দ্বারা তাঁর প্রতি উপরোক্ত অভিযোগ কীভাবে সত্য বলে প্রমাণিত হতে পারে?
হয়ত আরো একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে যে, থানভী রহঃ উনি আর যাইহোক স্বীকার তো করে নিলেন যে, “নবীজির সাঃ নূর মুবারক সর্বপ্রথম সৃষ্ট ছিল।
.
তার প্রতিউত্তরে আমাদের জবাব:
.
১-প্রথমত, হযরত জাবির রাঃ এর নামে প্রচলিত নূরের হাদিসটি মূলত হাদিসই নয়, বরং অসংখ্য হাদিস
বিশারদদের মত ইহা জাল বা মওজূ হাদিস।
দেখুন- www.markajomar.com/?p=166 এ হিসেবে এর আলোচনা করাও সময়ের অপচয় বৈ কিছু না!
২- দ্বিতীয়ত, কেউ কেউ এটিকে হাদিস ভেবে গোমরাহ হয়ে যেতে পারে, তাই প্রয়োজনের তাগিদে কোনো কোনো মুহাক্কিক কথিত হাদিসটির ব্যাখ্যাও দিয়ে গেছেন।
.
মোল্লা আলী কারী রহঃ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মোল্লা আলী কারী রহঃ (মৃত ১০১৪ হিঃ) ঐ জাল হাদিসটির “নূর” -কে ‘রূহ’ অর্থে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়:
.
ﻗﻮﻟﻪ ﺍﻭﻝ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻠﻪ ﻧﻮﺭﻱ ﻭ ﻓﻲ ﺭﻭﺍﻳﺔ
ﺭﻭﺣﻲ ﻫﻤﺎ ﻭﺍﺣﺪ ﻓﺎﻥ ﺍﻻﺭﻭﺍﺡ ﻧﻮﺭﺍﻧﻴﺔ ﺍﻱ
ﺍﻭﻝ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻦ ﺍﻻﺭﻭﺍﺡ ﺭﻭﺣﻲ. ﻣﺮﻗﺎﺓ ﺷﺮﺡ ﻣﺸﻜﻮﺓ: ١
.
অনুবাদ, “বর্ণনায় রয়েছে যে, আল্লাহপাক সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন। এভাবে অন্য আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আল্লাহপাক সর্বপ্রথম আমার রূহ সৃষ্টি করেছেন। অতএব উভয় বর্ণনার মর্মার্থ একই। যেহেতু রূহই নূর। অর্থাৎ আল্লাহপাক সর্বপ্রথম রূহ সমূহ মধ্য হতে আমার রূহ সৃষ্টি করেছেন।”
.
{দেখুন, মেরকাত ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং ১৬৭}।
.
কাজেই এবার বুঝে থাকলে বলুন, হযরত থানবী রহঃ এর উপরোক্ত উক্তি দ্বারা তিনি প্রকৃতপক্ষে কী বুঝাতে চান? অবশ্য আল্লাহপাক সর্বপ্রথম রূহ সমূহ মধ্য হতে রাসূলের রূহ সৃষ্টি করেছেন— প্রকৃতপক্ষে এমনই বুঝাতে চান ।
এখন হয়ত কেউ কেউ এ প্রশ্নটিও করতে পারেন যে, হাদিসে জাবের জাল বা অগ্রহণযোগ্য হওয়া সত্তেও “নশরুত্তিব” কিতাব সহ বিপুল সংখ্যক পুস্তকে একে উল্লেখ করা হয়েছে কেন?
.
আমাদের জবাব,
.
প্রথমেই বলে রাখতে চাই যে, কোনো একটি ভিত্তিহীন কথা অসংখ্য মানুষের মুখ দিয়ে উচ্চারণ হলে সেটি যেমন প্রকৃতার্থে সত্য হয় না, তেমনি কোনো একটি জাল হাদিস অসংখ্য কিতাবে উল্লেখ হওয়ার দ্বারা সেটিও কখনো সহীহ হাদিস হতে পারেনা।
.
সেই সাথে একথাও সবাই জানেন যে, কোনো বক্তব্য কোনো গ্রন্থে নিয়ে আসার মানেই উক্ত বক্তব্যটি সঠিক ও গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি প্রদান করা নয়। বরং অনেক সময় বিজ্ঞ লেখক উক্ত বর্ণনাটির ভুল ও ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করার জন্য আনতে পারেন । যেমন আল্লামা ইমাম সুয়ূতি রচিত ‘আল-হাভী লিল ফাতওয়াতে এনে লিখেছেন :
.
ﻭﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺍﻟﻤﺬﻛﻮﺭ ﻓﻲ ﺍﻟﺴﺆﺍﻝ ﻟﻴﺲ ﻟﻪ ﺇﺳﻨﺎﺩ ﻳﻌﺘﻤﺪ ﻋﻠﻴﻪ
.
অনুবাদ : প্রশ্নে উল্লিখিত (নূরের) হাদিসটির এমন কোনো সনদ (সূত্র) নেই, যার উপর নির্ভর করা যায়। (সূত্র : আল্লামা জালালুদ্দিন আস- সুয়ূতী (রাহ:) লেখিত, আল-হাউবী লিল ফাতওয়া- ১/৩৮৪, ফাতওয়া আল কুর’আনিয়্যাহ শীর্ষক সূরা আল মুদ্দাসসির (তাফসির) পর্ব দ্রষ্টব্য) কখনো বা সেটির ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য (যেমন মোল্লা আলী ক্বারি রচিত মেরকাত শরহে মেশকাত-১/১৬৭) কিংবা সংকলক মহোদয় ভুলক্রমেও সেটি নিজ গ্রন্থে আনতে পারেন (যেমন ইমাম আহমদ ইবনে মুহাম্মদ কাসতালানী রচিত মাওয়াহিব-১/৭১)। আমরা এতথ্যও পেয়ে যাই মাওয়াহিব কিতাবের মুহাক্কিক শায়খ ছালেহ আহমদ শামী (রহ) এর লিখনী হতে।
.
তাই প্রথমে দেখতে হবে লেখক উক্ত বর্ণনাটিকে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন কি না?
.
যদি স্বীকৃতি প্রদান করে থাকেন তাহলে কিতাবটির কোন পৃষ্ঠায়, কোন আলোচনায়, কী শব্দে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন তা উল্লেখ করতে হবে। নচেৎ তাদের সমুদয় দাবি এবং অভিযোগ ধোঁকাবাজী ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে নূরের সৃষ্টি দাবিদার ভাইয়েরা সংকলকগণের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্যই দেখাতে পারেননা।
.
এবার আমরা সরাসরি হাদিস দ্বারা প্রমাণ করব যে নবীজি (সাঃ)- এর শরীর মুবারকের সৃষ্টিমূল উৎস মাটি ছিল কিনা? নিচের হাদিসটি দ্বারা স্পষ্টতই তা প্রমাণ করা হল-
.
তাফসীরে মাযহারীর ৬ষ্ঠ খন্ড ৭৩ নং পৃষ্ঠায় স্পষ্টত বিশিষ্ট তাফসিরকারক আল্লামা ছানাউল্লাহ পানিপথি (রহ) বিশ্বনবী (সা) সহ সকল মানুষের সৃষ্টিমূল উপাদান মাটি হওয়ার প্রমাণ হিসেবে একটি মারফূহ হাদিস বর্ণনা করেছেন। হাদিস ও হাদিসের তরজুমা:
ﻣﺎ ﻣﻦ ﻣﻮﻟﻮﺩ ﺇﻻ ﻭﻓﻰ ﺳﺮﺗﻪ ﻣﻦ ﺗﺮﺑﺘﻪ ﺍﻟﺘﻰ ﻳﻮﻟﺪ ﻣﻨﻬﺎ ﻓﺈﺫﺍ ﺭﺩ ﺇﻟﻰ ﺃﺭﺫﻝ ﻋﻤﺮﻩ ﺭﺩ ﺇﻟﻰ ﺗﺮﺑﺘﻪ ﺍﻟﺘﻰ ﺧﻠﻖ ﻣﻨﻬﺎ ﺣﺘﻰ ﻳﺪﻓﻦ ﻓﻴﻬﺎ ﻭﺇﻧﻰ ﻭﺃﺑﻮ ﺑﻜﺮ ﻭﻋﻤﺮ ﺧﻠﻘﻨﺎ ﻣﻦ ﺗﺮﺑﺔ ﻭﺍﺣﺪﺓ ﻭﻓﻴﻬﺎ ﻧﺪﻓﻦ ‏( ﺍﻟﺨﻄﻴﺐ ﻋﻦ ﺍﺑﻦ ﻣﺴﻌﻮﺩ . ‏[ ﺍﻟﺪﻳﻠﻤﻰ ﻋﻦ ﺃﻧﺲ
.
অনুবাদ, প্রত্যেক নবজাতক শিশুর নাভিতে (নাভির সৃষ্টি-মূলে) মাটির কিছু অংশ নিহিত থাকে যেখান থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। যখন সে তার জীবনের অন্তিম সময়ে এসে পৌছে যাবে, তখন সে ওই মাটিতেই ফিরে যাবে যেখান থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এমনকি সেখানেই সে দাফন হবে।
নিশ্চয়ই আমি [রাসূল] এবং আবু বকর আর উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) একই মাটি হতে সৃষ্ট এমনকি একই মাটিতে (আমরা তিনজন) দাফন হবো।”
.
[দেখুন- আল-ইলালুল মুতানাহিয়্যাহ ফিল আ- হাদীসিল ওয়াহিয়্যাহ খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৯৩; ইমাম ইবনে যওজী (রহ) ]।
.
আরো দেখুন, (সামান্য শাব্দিক ব্যবধানে) উল্লিখিত হাদিসটি নিচের গ্রহণযোগ্য কিতাবগুলোতেও উল্লেখ রয়েছে।
.
যেমন : ১- তারিখে বাগদাদ- খন্ড১৫, পৃষ্ঠা ৩২; (হাদিস নাম্বার ৪৩৫৫) লেখক, ঊলূমে হাদিসের প্রখ্যাত কিতাব ‘মুত্তাফাক ওয়াল মুফতারাক’ রচয়িতা খতীব আল- বাগদাদী (রহঃ) [মৃত ৪৬৩ হিঃ]।
.
২- মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক -৩/৫১৬, হাদিস নং ৬৫৩৩; শায়খ মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক আস- সান’আনী (রহ) উনি হযরত ইবনে আব্বাস এবং আবু হোরায়রা (রা) দুজন হতে মাওকূফ সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন।
.
৩- বায়হাক্বী ফী শু’আবিল ঈমান – হাদিস নং ৯২৩৮, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) হতে।
.
৪- আল্লামা নূরুদ্দীন আল- হাইছামী (আলাইহির রাহমাহ) [মৃত ৮০৭ হিজরী] রচিত কাশফুল আসতার ৭৮৯।
.
৫- আল্লামা জালালুদ্দিন আস- সুয়ূতী (আলাইহির রাহমাহ) রচিত নূরুচ্ছদূর ফী শরহিল কবূর, পরিচ্ছেদ নং ১৪।
.
৬- আল্লামা সুয়ূতী (আলাইহির রাহমাহ) রচিত, জামেউল আহাদীস-১৯/২৮৭।
.
৭- তালখীছুল ইলালিল মুতানাহিয়্যাহ-৬৫, ইমাম যাহাবী (রহ)। আরো দেখা যেতে পারে –
.
www.markajomar.com/?p=955
.
এবার আশাকরি সবাই বুঝতে পেরেছেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের হক্ব বুঝার যোগ্যতা দিন এবং বাতিল আহলে বিদয়াত ওয়াল রেজভী জামাত হতে রেহাই দিন। আমীন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন