মাযহাব ও ইমাম আবূ হানীফা (রহ)-এর ব্যাপারে লা- মাযহাবীদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও তার জবাব :
প্রাককথন:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, ”তোমার পালনকর্তার পথে আহবান করো, হৃদয়গ্রাহী হিকমাতের সহিত বুঝিয়ে এবং শুভেচ্ছামূলক আকর্ষণীয় উপদেশ শুনিয়ে এবং তোমরা (প্রয়োজনে) বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়।” ( সূত্র— আন-নাহল,১২৫)।
আয়াত : ﺍﺩﻉ ﺍﻟﯽ ﺳﺒﯿﻞ ﺭﺑﮏ ﺑﺎﻟﺤﮑﻤۃ ﻭﺍﻟﻤﻮﻋﻈۃ ﺍﻟﺤﺴﻨۃ ﻭﺟﺎﺩﻟﮭﻢ ﺑﺎﻟﺘﯽ ﮬﯽ ﺍﺣﺴﻦ ) )
আরো এক আয়াতে আছে, “তোমরা আহলে কিতাবদের সঙ্গে মতবিরোধে উত্তমপন্থা পরিহার করোনা।” ( সূত্র— আনকাবুত-৪৬)।
আয়াত : ﻻ ﺗﺠﺎﺩﻟﻮﺍ ﺍﮬﻞ ﺍﻟﮑﺘﺎﺏ ﺍﻻ ﺑﺎﻟﺘﯽ ﮬﯽ ﺍﺣﺴﻦ
এভাবে আল্লাহ তা’য়ালা মূসা (আ) এবং হারুন (আ) দু’জনকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন “ফিরাউনের মতো অবাধ্য কাফেরের সাথেও নম্র আচরণ করা উচিত।” ( সূত্র— ত্বোয়া- হা,৪৪)
আয়াতের ভাষ্য :
ﻓﻘﻮﻻ ﻟﮧ ﻗﻮﻻ ﻟﯿﻨﺎ
ﻓﻘﻮﻻ ﻟﮧ ﻗﻮﻻ ﻟﯿﻨﺎ
বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) অশ্লীলতাকে কোন ক্ষেত্রেই পছন্দ করতেন না। ( সূত্র— আহমাদ,২/১৯৩ হা.৬৮২৯)
ﻟﻢ ﯾﮑﻦ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﮧ ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﺎﺣﺸﺎ ﻭﻻ ﻣﺘﻔﺤﺸﺎ
আরেক হাদীসে তিনি বলেন, “ঈমানদারকে গালি দেয়া ফাসেক্বী এবং হত্যা করা কাফেরের কাজ।” ( সূত্র— আহমাদ – ১/৪৩৯ হা. ৪১৭৭)।
ﺳﺒﺎﺏ ﺍﻟﻤﺆﻣﻦ ﻓﺴﻖ ﻭﻗﺘﺎﻟﮧ كفر.
রাসূলুল্লাহ (সা) আরও ইরশাদ করেন, ”তোমরা পরস্পর ক্রোধ- ক্ষোভ, হিংসা-নিন্দা, গীবত ও সমালোচনা পরিহার করে ভাই ভাই হয়ে যাও। এভাবে তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। ( সূত্র— আবু দাউদ-৫/২১হা. ৪৯১০)
( ﻻﺗﺒﺎﻏﻀﻮﺍ ﻭﻻ ﺗﺤﺎﺳﺪﻭﺍ ﻭﻻ ﺗﺪﺍﺑﺮﻭﺍ ﻭﮐﻮﻧﻮﺍ ﻋﺒﺎﺩ ﺍﻟﻠﮧ ﺍﺧﻮﺍﻧﺎ )
Π মাযহাব ও মাযহাব-অবলম্বীদের প্রতি লা-মাযহাবীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া:
মাযহাব মানা বা তাক্বলীদ করা এবং মাযহাব-অবলম্বীদের প্রতি বিরাগ-বিদ্বেষ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়েই কথিত “আহলে হাদীস” মতবাদের আত্মপ্রকাশ। তাই, মাযহাব ও মাযহাবপন্থীদের প্রতি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অসঙ্গতিপূর্ণ, জঘন্যতম ও ন্যক্কারজনক কটুক্তিপূর্ণ বই-পুস্তক তারা বিনামূল্যে ও স্বল্পমূল্যে বিতরণ করে যাচ্ছে।
উদাহরণ স্বরূপ তাদের পুস্তকগুলো থেকে কয়েকটি উক্তি নিম্নে উল্লেখ করা হল।
(ক)
লা-মাযহাবীদের বহুল আলোচিত বই “কাটহুজ্জাতীর জাওয়াব” বইয়ের লিখক মৌ. আবু তাহের বর্দ্ধমানী লিখেছে “তাক্বলীদ হচ্ছে ঈমানদারদের জন্য শয়তানের সৃষ্ট বিভ্রান্তি।” ( সূত্র— কাটহুজ্জাতীর জওয়াব, পৃ.৮৩)।
লা-মাযহাবীদের বহুল আলোচিত বই “কাটহুজ্জাতীর জাওয়াব” বইয়ের লিখক মৌ. আবু তাহের বর্দ্ধমানী লিখেছে “তাক্বলীদ হচ্ছে ঈমানদারদের জন্য শয়তানের সৃষ্ট বিভ্রান্তি।” ( সূত্র— কাটহুজ্জাতীর জওয়াব, পৃ.৮৩)।
(খ)
অত্যন্ত বিতর্কিত বই “তাওহীদী এটম বোম” বইয়ের প্রণেতা মৌ. আব্দুল মান্নান সিরাজনগরী (বগুড়া) লিখেন ”মুক্বাল্লিদগণকে মুসলমান মনে করা উচিত নয়।” ( সূত্র— তাওহীদী এটম বোম, পৃ.১৫)।
অত্যন্ত বিতর্কিত বই “তাওহীদী এটম বোম” বইয়ের প্রণেতা মৌ. আব্দুল মান্নান সিরাজনগরী (বগুড়া) লিখেন ”মুক্বাল্লিদগণকে মুসলমান মনে করা উচিত নয়।” ( সূত্র— তাওহীদী এটম বোম, পৃ.১৫)।
(গ)
রংপুর শাইলবাড়ী নিবাসী মুহা. আব্দুল কাদের লিখেন, “মাযহাবীগণ ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত, তাদের মধ্যে ইসলামের কোন অংশ নেই।” ( সূত্র— তাম্বিহুল গাফেলীন, আব্দুল কাদির রচিত পৃ.৭)
রংপুর শাইলবাড়ী নিবাসী মুহা. আব্দুল কাদের লিখেন, “মাযহাবীগণ ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত, তাদের মধ্যে ইসলামের কোন অংশ নেই।” ( সূত্র— তাম্বিহুল গাফেলীন, আব্দুল কাদির রচিত পৃ.৭)
(ঘ)
মৌ. আব্দুল্লাহ মুহাম্মদী লিখেন ”চার ইমামের মুক্বাল্লেদ এবং চার তরিকার অনুসারীগণ মুশরিক ও কাফির।” ( সূত্র— ইতেছামুস সুন্নাহ পৃ.৭-৮)।
মৌ. আব্দুল্লাহ মুহাম্মদী লিখেন ”চার ইমামের মুক্বাল্লেদ এবং চার তরিকার অনুসারীগণ মুশরিক ও কাফির।” ( সূত্র— ইতেছামুস সুন্নাহ পৃ.৭-৮)।
এভাবে ‘জফরুল মুবিন’ প্রণেতা মৌ. মুহিউদ্দীন, ‘তরজুমানে ওহহাবিয়্যাহ’ প্রণেতা নবাব ছিদ্দীক হাসান খান এবং লা- মাযহাবীদের সর্বশ্রেষ্ঠ ফাতওয়ার (?) কিতাব ‘ফতোয়ায়ে নাজিরিয়া’র সংকলক মৌ. নাজিমুদ্দীন প্রমুখ মাযহাব অবলম্বীদেরকে কাফির, মুশরিক, বি’দআতী ও জাহান্নামী বলে ফতোয়া দিয়েছেন। ( সূত্র— জফরুল মুবিন, পৃ.১৮৯-২৩০-২২৩ তরজমানে ওহহাবিয়্যাহ পৃ. ৩৫-৩৬ ফতোয়ায়ে নাযীরিয়া।১/৬৯-৯৭)।
ΠΠ পর্যালোচনা :
হানাফী মাযহাবের সুখ্যাতি আজ জগৎজুড়ে, পরিধি বিশ্বজুড়ে। হানাফী মাযহাব ও ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব- বৈশিষ্ট্য এবং অন্যান্য তথ্যপূর্ণ ও তাত্ত্বিক গুণাবলীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চলমান বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশী মুসলমান এ মাযহাবের সুধাপানে তৃপ্তি লাভ করছেন।
এ মাযহাবের বিপুল গ্রহণযোগ্যতা লক্ষ্য করেই একটি কুচক্রী মহল গভীর ষড়যন্ত্র ও হিংসাত্মক আক্রমণে মেতে উঠেছে। তারা কি জানে না যে, এ মাযহাবে রয়েছে কুরআনে কারীমের অগ্রাধিকার, হাদীস শরীফের যথাযথ মূল্যায়ন, শ্রেষ্ঠ ও নির্ভুল দলীল প্রমাণের প্রাধান্য, কুরআন সুন্নাহ ও সমকালীন মাসাইলের লিপিবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত সম্ভার, সীমাহীন সতর্কতায় অটল, অপূর্ব তাত্ত্বিক গবেষণার শ্রেষ্ঠ সমাহার, যুগশ্রেষ্ঠ ও যুগোপযোগী সমাধানের অনন্য উপকরণ।
আর ইমাম আবু হানীফার শ্রেষ্ঠত্ব ও বুৎপত্তি তো আছেই। এ সমস্ত বিষয় আমি “মাযহাব মানি কেন” বইয়ে কুরআন সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত তত্ত্বপূর্ণ ও তথ্যবহুল আলোচনা করেছি। সবাইকে অধ্যয়নের আমন্ত্রন জানিয়ে চলমান পরিসরে অতি সংক্ষেপে কতিপয় তথ্য পেশ করার প্রয়াস পাবো।
ইমাম আবু হানীফা (রহ) একটি নাম, একটি ইতিহাস, হাজার-হাজার বই পুস্তকের শিরোনাম। কোটি-কোটি মানুষের স্মরণীয় বরণীয় ও অনুসরণীয়-অনুকরণীয় মহান ব্যক্তি।
শ্রদ্ধেয় ও প্রাণপ্রিয় মুখপাত্র, অসাধারণ পথিকৃত ও অপ্রতিদ্বন্ধী পথ প্রদর্শক এবং বিশ্ব মুসলিম জাতির এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা। কুরআন-সুন্নাহর দিক নির্দেশনায় তাঁর অসামান্য অবদানের কথা মুসলিম বিশ্ব স্মরণ করবে যুগ যুগ ধরে। তাঁর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা এবং কুরআন সুন্নাহর গবেষণায় সুনিপূণ কৃতিত্ব আদর্শ হয়ে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত আগত উত্তরসূরীদের পাথেয় হিসেবে। তাঁর মহৎ ব্যক্তিত্ব ও অসাধারণ কৃতিত্ব এবং অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্য শীর্ষক বই-প্স্তুক আজকের বিশ্বে অসংখ্য-অগণিত।
আমার জানামতে রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যতীত ইমাম আবু হানীফার সমতূল্য আর কারও জীবনী শীর্ষক এতো সংখ্যক বই-পুস্তক লিখা হয়নি। হানাফী মাযহাবের আলিমগণতো লিখেছেনই, অন্যান্য মাযহাবের যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের সংখ্যাও বেশুমার।
Π প্রিয়পাঠকগণকে নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলো অধ্যয়নের আমন্ত্রণ জানিয়ে তা হতে নির্বাচিত কয়েকটি উক্তি নিম্নে পেশ করছি-
খতীবে বাগদাদী (রহ) ইমাম হাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আসাদ বিন আমরকে বলতে শুনেছেন যে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) সাধারণতঃ প্রতি রাতেই পরিপূর্ণ কুরআন শরীফ খতম করতেন। তাঁর কান্নার করুণ শব্দ শুনে প্রতিবেশীদেরও দয়া জাগতো।
বিশুদ্ধ সূত্রে সংরক্ষিত আছে যে, ইমাম আবু হানীফা (রহ) যে স্থানে ইন্তিকাল করেছেন সেখানেই তিনি ৭ হাজার বার কুরআন খতম করেছেন। ( সূত্র— তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৫৪)।
অপর সূত্রে লিখেন যে, তিনি (নিষিদ্ধ দিনগুলো ব্যতীত) ধারাবাহিক ৩০ বছর রোযা রেখেছেন। ( সূত্র— তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৫৬)।
ইমাম আবু জাফর শীযমারী (রহ.) বর্ণনা করেন, ইমাম শাক্বীক বালখী থেকে, তিনি বলেন- ﮐﺎﻥ ﺍﻻﻣﺎﻡ ﺍﺑﻮ ﺣﻨﻔﯿۃ ﻣﻦ ﺍﻭﺭﻉ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﻭﺍﻋﻠﻢ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﺍﻋﺒﺪ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻭﺍﮐﺮﻡ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﻭﺍﮐﺜﺮ ﮬﻢ ﺍﺣﺘﯿﺎﻃﺎ ﻓﯽ ﺍﻟﺪﯾﻦ۔
অর্থাৎ ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ছিলেন সর্বাপেক্ষা খোদাভীরু, সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞ আলিম, সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী, সর্বাপেক্ষা সম্মানী এবং দ্বীন- ধর্মের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা সতর্কতা অবলম্বনকারী।”
( সূত্র— আল- মিযানুল কুবরা, ১/৮৬)।
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বলেন “আমি কুফায় প্রবেশ করতঃ সেখানকার তদানীন্তন বিজ্ঞ উলামাগণকে জিজ্ঞেস করি,
তোমাদের এ শহরে সর্বাপেক্ষা বড় আলিম কে?
সবাই ঐক্যমতে উত্তর দেয়, ইমাম আবু হানীফা (রহ)।
অতঃপর জিজ্ঞেস করি , সর্বাপেক্ষা খোদাভীরু কে?
সবাই বলে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
আমি বলি , আধ্যাত্মিকতায় কে সর্বশ্রেষ্ঠ?
সবাই বলে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
আমি জিজ্ঞেস করি, কে সর্বাপেক্ষা পরহেজগার?
সবাই বলে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
আমি জিজ্ঞেস করি, কে সর্বাপেক্ষা ইবাদতকারী ও ধর্মীয় ইলম নিয়ে ব্যস্ত?
সবাই বলে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
মোটকথা, এমন কোন ভাল গুণ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করি নি , যে ব্যাপারে সবাই বলেনি যে, আমরা ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর থেকে শ্রেষ্ঠ কাউকে জানি না।
( সূত্র— আল-মিযানুল কুবরা, ১/৮৭ তারীখে বাগদাদ , ১৩/৩৫৮)।
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন-
ﻟﻮﮐﺎﻥ ﺍﻟﺪﯾﻦ ﻋﻨﺪ ﺍﻟﺜﺮﯾﺎ ﻟﺬﮬﺐ ﺑﮧ ﺭﺟﻞ ﻣﻦ ﻓﺎﺭﺱ
অর্থাৎ দ্বীন ও ধর্মের জ্ঞান আহরণ করা মানুষের পক্ষে যদি এতো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে যে, আকাশের দুর্গম প্রান্ত বা সুরাইয়্যা তারকায় যেয়ে বিলুপ্ত হয়, তবুও পারস্যের এক ব্যক্তি সেখান থেকে দ্বীন আহরণ করতে সক্ষম হবে।”
( সূত্র— বুখারী, পৃ.৬/৩৭০ হাদীন নং ৪৮৯৭, মুসলিম ৪/১৯৭২, হা. নং-২৫৪৬ )
রাসুলুল্লাহ (সা.) উপরোক্ত হাদীসে যে পারস্য ব্যক্তির অসাধারণ কৃতিত্বের সুসংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, বিশেষজ্ঞ উলামাদের মতে, বিশেষ করে ইমাম সুয়ূতী , ইমাম ইবনে হাজার মক্কী ও শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (রহ.) প্রমুখের গবেষণার আলোকে সে সুসংবাদপ্রাপ্ত পারস্য ব্যক্তি হলেন ইমাম আবু হানীফা (রহ.)।
কেননা পারস্য বা অনারবে ইমাম আবু হানীফাই ইতিহাসের একমাত্র প্রথিতযশা ও ক্ষণজন্মা ব্যক্তি যিনি ইলম-প্রজ্ঞা ও ইজতিহাদ-গবেষণায় এ চরম উৎকর্ষতা অর্জন করেছিলেন।
( সূত্র— তাবয়ীযুছ ছাহীফা, ২০-২১, আল- খাইরাতুল হিসান-২৯; উকুদুয যামান-৪৫)।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন- ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻋﯿﺎﻝ ﻋﻠﯽ ﺍﺑﯽ ﺣﻨﻔﯿۃ ﻓﯽ ﺍﻟﻔﻘﮧ “ফিক্বহের জগতে পরবর্তীকালের সমস্ত মানুষ ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর সন্তান- সন্ততি ও পারিবারিক সদস্য হিসেবে গণ্য”।
( সূত্র— তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৪৬)।
ইমাম বুখারীর অন্যতম উস্তাদ মাক্কী বিন ইবরাহীম (রহ.) বলেন- ﮐﺎﻥ ﺍﺑﻮ ﺣﻨﻔﯿۃ ﺃﻋﻠﻢ ﺍﮬﻞ ﺯﻣﺎﻧﮧ
“ইমাম আবু হানীফা সকল বিষয়ে যুগশ্রেষ্ঠ আলিম ছিলেন।”
( সূত্র— মাকনাতু ইমাম আবী হানীফা, ডঃ হারেসী-১৯২)।
হাদীস বিশারদদের সর্বজ্ঞ পর্যবেক্ষক ও সর্বশ্রেষ্ঠ নিরীক্ষক ইমাম ইবনে মঈন (রহ. মৃত ২৩৩হি.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) কি নির্ভরযোগ্য হাদীস বিশারদ?
উত্তরে তিনি বলেন- ﻧﻌﻢ، ﺛﻘۃ ﺛﻘۃ ”হ্যাঁ অন্যতম নির্ভরযোগ্য , অন্যতম নির্ভরযোগ্য।”
( সূত্র— তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৪৫)।
বুখারী-মুসলিমের শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী ইমাম শু’বা (রহ.) বলেন- ﮐﺎﻥ ﻭﺍﻟﻠﮧ ﺣﺴﻦ ﺍﻟﻔﮭﻢ ﺟﯿﺪ ﺍﻟﺤﻔﻆ
“আল্লাহর শপথ! আবু হানীফার অনুধাবন শক্তি অতি আকর্ষণীয় এবং স্মৃতি শক্তি খুবই প্রখর ছিল।”
“আল্লাহর শপথ! আবু হানীফার অনুধাবন শক্তি অতি আকর্ষণীয় এবং স্মৃতি শক্তি খুবই প্রখর ছিল।”
( সূত্র— আল-খাইরাতুল হিসান-৩৪)।
ইমাম আব্দুল হাই লক্ষ্ণৌভী (রহ.) ইমাম আবু হানীফার উপর অর্পিত অভিযোগ খণ্ডন করতে গিয়ে লিখেন-
ﺍﯼ ﺷﻨﺎﻋۃ ﻓﻮﻕ ﮬﺬﺍ (؟ (! ﻓﺎﻧﮧ ﺍﻣﺎﻡ ﺗﻘﯽ ﻧﻘﯽ ﺧﺎﺋﻒ ﻣﻦ ﺍﻟﻠﮧ، ﻭﻟﮧ ﮐﺮﺍﻣﺎﺕ ﺷﮭﯿﺮۃ ﻓﺎﯼ ﺷﺊ ﺗﻄﺮﻕ ﺍﻟﯿﮧ ﺍﻟﻀﻌﻒ؟
অর্থাৎ এর চেয়ে জঘন্যতম ন্যক্কারজনক ও মারাত্মক বিদ্বেষী অপকর্ম আর কী হতে পারে(!) আবু হানীফা মুত্তাক্বী ও খোদাভীরু ইমাম। তাঁর অসংখ্য কারামত সর্বত্র প্রসিদ্ধ আছে, তাহলে কোন কারণে তাঁকে দুর্বলতার অপবাদ দিতে সাহস করেছে?”
( সূত্র— আর রাফউ ওয়াত্তাকমীল-পৃ.৭০)
বলাবাহুল্য যে, বিদ্বেষীদের চক্রান্ত আর অবান্তর অভিযোগ থেকে নবী-রাসূল এবং সাহাবাগণও রেহাই পাননি।
Π সতর্কীকরণ :
সর্বজনগৃহীত বড়দের জন্য বড়দের আক্রমণাত্মক যে কোনো বক্তব্যই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। এতদ্ব্যতীত উসূলে হাদীসের অবধারিত নিয়ম হলো- যার ইমামাত ও ন্যায়পরায়ণতা সর্বত্র প্রসিদ্ধ হয়েছে ও ব্যাপকতা লাভ করেছে, তার ব্যাপারে কোনো অশুভ উক্তি গ্রহণ করা যাবে না।
কে জানি বলেছিল, আল্লামা ইবনুল হাব্বান (রহ) তিনি নাকি ইমামে আ’জম হযরত আবু হানিফা (রহ)-কে ”মুরজিয়্যাহ’ ফেরকার ইমাম বলিয়া তাঁর সমালোচনা করেছেন।
আমরা বলি, উনার উক্ত কথাটি এতটুকুর মধ্যেই শেষ হয়ে যায়নি। যদি উনার পূর্ণ বক্তব্যটি ও তার কারণ ভালভাবে খুঁজতে যাই তাহলে প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসবে। ফলে কথিত আহলে হাদিসদের উপরিউক্ত মতলবসিদ্ধ অপপ্রচার পুরোই গুড়েবালি হবে।
আমরা “বৃটিশ সৃষ্ট ফেরকা” কথিত আহলে হাদিস (লা-মাযহাবী দল) মতাবলম্বীদের এ সমস্ত অর্থহীন বাগাড়ম্বর প্রসূত বক্তব্যের জবাব বহু আগেই দিয়েছি। আজ এখানে অভিনব কিছু জবাব দেব, যাতে তাদের বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতার পরিবর্তন হয়।
বিজ্ঞপাঠক লক্ষ্যকরুন!
১-
ইমাম বুখারীর উস্তাদ ইমাম জুহালী (রহ) ইমাম বুখারীকে মু’তাযিলা, বাতিল ইত্যাদি বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং মুসলমানদের কবরস্থানে ইমাম বুখারীকে কবর দিতে নিষেধ করেছেন, তাঁকে পরিত্যাগযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন।
ইমাম বুখারীর উস্তাদ ইমাম জুহালী (রহ) ইমাম বুখারীকে মু’তাযিলা, বাতিল ইত্যাদি বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং মুসলমানদের কবরস্থানে ইমাম বুখারীকে কবর দিতে নিষেধ করেছেন, তাঁকে পরিত্যাগযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন।
(সূত্র— সিয়ার আলামিন নুবালা, ১২/৪৫৬, তারীখে বাগদাদ , ২/১৩ তাবকাতুশ শাফেয়ীয়াতুল কুবরা, ২/২২৯)।
২-
ইমাম আবু হাতেম ও ইমাম আবু যুর’আ ইমাম বুখারী (রহ) থেকে হাদীস সংগ্রহ করা পরিত্যাগ করেছেন।
ইমাম আবু হাতেম ও ইমাম আবু যুর’আ ইমাম বুখারী (রহ) থেকে হাদীস সংগ্রহ করা পরিত্যাগ করেছেন।
( সূত্র— আল জারহ-ওয়াত্তা’দীল, ৭/১৯১)।
৩-
ইমাম ইবনে খাল্লিকান ইমাম মুসলিম (রহ)-কে ‘জাহমিয়া’ বলেছেন।
ইমাম ইবনে খাল্লিকান ইমাম মুসলিম (রহ)-কে ‘জাহমিয়া’ বলেছেন।
( সূত্র— ওফায়া’তুল আয়ান , ২/৯১)
৪-
অনেকে আবার ইমাম নাসাঈ (রহ)-কে শীয়া বলেছেন।
অনেকে আবার ইমাম নাসাঈ (রহ)-কে শীয়া বলেছেন।
(সূত্র— বোস্তানুল মুহাদ্দিসীন, পৃ.১১১)।
৫- ইমাম ইবনে হাজম ইমাম তিরমীযীকে বলেছেন (ﻣﺠﮭﻮﻝ) অজ্ঞাত পরিচিত।
( সূত্র— মিযানুল ই’তেদাল ৩/৬৭৮)।
৬-
ইমাম নাসাঈ তিনিও ইমাম আহমাদ ইবনে ছালেহ (রহ)-এর সমালোচনা করেছেন।
ইমাম নাসাঈ তিনিও ইমাম আহমাদ ইবনে ছালেহ (রহ)-এর সমালোচনা করেছেন।
(সূত্র— ক্বাইদাতুন ফিল জারহে ওয়াত্তা’দীল, ২৪-২৮)।
৭-
এভাবে ইমাম মালেক (রহ)-কে ইবনে আবী জীব (রহ) এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ)-কে ইবনে মঈন (রহ) অনেক অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।
এভাবে ইমাম মালেক (রহ)-কে ইবনে আবী জীব (রহ) এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ)-কে ইবনে মঈন (রহ) অনেক অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।
( সূত্র— ক্বাইদাতুন ফিল জারহে ওয়াত্তা’দীল, ২৪-২৮; যিকরু আসমায়ি মান তুকুল্লিমা-৪৯)।
কিন্তু মুসলিম উম্মাহ এ সমস্ত অতি উৎসাহীমূলক কথার প্রতি কখনো ভ্রুক্ষেপই করেনি। কারণ, এ সমস্ত অনর্থক কথা গ্রহণ করলে কি তাঁদের হাদীস গ্রহণ করা যেতো?
↓
তেমনি ইমাম আবু হানীফার ব্যাপারেও আজে-বাজে অতি উৎসাহীমূলক কথা-বার্তা অনেকে বলেছেন, যা অনর্থক ও অগ্রহণযোগ্য ।
↓
তেমনি ইমাম আবু হানীফার ব্যাপারেও আজে-বাজে অতি উৎসাহীমূলক কথা-বার্তা অনেকে বলেছেন, যা অনর্থক ও অগ্রহণযোগ্য ।
মুসলিম উম্মাহ এগুলোর প্রতি কোনো কর্ণপাত করেনি; বরং উসূলে হাদীসের অবধারিত নিয়ম হলো- যার ইমামাত ও ন্যায়পরায়ণতা সর্বত্র প্রসিদ্ধ হয়েছে ও ব্যাপকতা লাভ করেছে, তার ব্যাপারে কোনো অশুভ উক্তি গ্রহণ করা যাবে না।
(সূত্র—ক্বাইদাতুন ফিল জারহে ওয়াত্তা’দীল , পৃ. ২৩, দেরাসাতুন ফিল জারহে ওয়াত্তা’দীল, পৃ.৭৬)।
আশাকরি, এবার আপনারা বুঝতে পেরেছেন।
লেখক : http://ahlehaqmedia.com/3287
[মুফতি রফিকুল ইসলাম মাদানি (দা বা) রচিত ‘মাযহাব মানি কেন?’ পুস্তক অবলম্বনে।]
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন