আমরা উলামায়ে দেওবন্দ সত্যি গর্বিত!
বেশকিছু দিন থেকে আমার মনে একটি ভাবনা ঘুরপাক করতে লাগল। বিশ্বের বুকে উলামায়ে দেওবন্দ সহ আহলে হক্ব আরো তো অনেক আলেমসমাজ রয়েছেন। যেমন, নদওয়াতুল উলামা, হিজাজ ও মিশরের জামেয়াতুল আজহার সহ আরো অনেক।
কিন্তু ফেরকায়ে বাতেলা তথা আহলে বিদয়াত বাতিল গোষ্ঠীরা তাদের কারো সম্পর্কে সামান্য টু-শব্দটিও করতে শুনিনা। যত রকম কুটুক্তি আর প্রতিহিংসা মূলক প্রোপাগান্ডা রয়েছে সব যেন উলামায়ে দেওবন্দের জন্যই।
শিয়া, কাদিয়ানী, গাইরে মুকাল্লিদ বা আহলে হাদিস ও বেরলবী তথা মাজারপূজারি বিদয়াতি জামাত সহ আরো যত রয়েছে সবাই একটি জায়গায় ঐক্যজোট। তা হল, উলামায়ে দেওবন্দ তথা আহলে হক্ব আলেম এবং তাদের মুহিব্বীন-মুতা’আল্লিক্বীন মুসলিম উম্মাহকে খাটো করা এবং তাদের বদনাম রটানো।
অবশেষে আমার মনে হল, দুনিয়ার বুকে যতগুলো ভ্রান্ত ও বিদয়াতি গোষ্ঠী রয়েছে তাদের ভ্রান্ত মতবাদ প্রচারে সব চেয়ে মারাত্মক বাধা হয়ে যারা সামনে আসেন, তাদের অন্যতম হলেন সেই উলামায়ে দেওবন্দ ও তাদের অনুগত বিশিষ্ট আলেমসমাজ। যাদের কাজেই হল, দ্বীনকে বিদয়াত থেকে মুক্ত রাখা এবং বাতিলের অপব্যাখ্যা থেকে পবিত্র করা। বাতিল যত বড় শক্তিশালী হোক, তা এলমী ময়দানে দলিল প্রমাণের অপ্রতিরোধ্য মারণাস্ত্র দ্বারা তছনছ করে দেয়া। আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে হচ্ছেও তাই। ইনশাআল্লাহ, সে দিন বেশি দূর নয়; যখন সাম্প্রতিক সময়ের সব বড় মিথ্যাবাদী, ধোঁকাবাজ ও মুর্খ জামাত কথিত আহলে হাদিস গোষ্ঠীটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকট শুধুই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ইতিহাস হয়ে থাকবে। আমরাও সে দিনের অপেক্ষায়।
যাইহোক, সাম্প্রতিক বাতিল গোষ্ঠীগুলোর উলামায়ে দেওবন্দ বিদ্বেষী অপপ্রচার দেখে পাকিস্তান বংশোদ্ভূত সিপায়ে সাহাবা’র আমীর শহীদ আল্লামা ফারকী (রহ) এর একটি ভাষণ আমার মনে পড়ে যায়। তিনি বলেন :
কেউ কেউ বলতে পারেন, দেওবন্দ মাদ্রাসা তো প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে মাত্র কিছু দিন পূর্বে। আর জাতি হিসেবে মুসলমানরা তো বহু আগে থেকেই আছে। কিন্তু আমি ইতিপূর্বেই আপনাদের সামনে আলোচনা করেছি, দারুল উলুম দেওবন্দ কী উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়েছে আর মুসলিম জাতি তার কী কী ফলাফল ভোগ করেছে?
মনে রাখতে হবে, মুসলিম জাতির কুষ্ঠিনামা বা বংশ পরম্পরার সূচনা মাদরাসা থেকে হয় না; বরং বংশ পরম্পরা শুরু হয় রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে।
বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমাদের সম্পর্ক কতখানি দৃঢ় এবং মজবুত। আমরা গর্বের সাথে একথা বলতে পারি যে, আমাদের আধ্যাত্নিক সম্পর্ক যেভাবে রসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে, তেমনিভাবে ইলমের দিক থেকেও আমাদের সম্পর্ক রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত।
প্রথমে ইলমী সম্পর্কে কথা বলছি শুনুন, কিভাবে তা রসূলের সাথে সংযুক্ত।
√ ইলমে নববীর সনদ :
আমাদের পীর ও মুরশিদ হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহঃ) ইলমে দ্বীন হাসিল করেছেনঃ
১। শাহ আব্দুল গনী মুজাদ্দেদী (রহঃ) থেকে
২। শাহ আব্দুল গনী (রহঃ) শাহ ইসহাক (রহঃ) থেকে
৩। তিনি শাহ আব্দুল আযীয থেকে
৪। তিনি শাহ ওয়ালী উল্লাহ থেকে
৫। তিনি শায়খ আবু তাহের মাদানী থেকে
৬। তিনি (তদীয় পিতা) শায়খ ইব্রাহীম কারদারী থেকে
৭। তিনি শায়খ আহমদ কোশাশী থেকে
৮। তিনি শায়খ আবুল মাওয়াহিব আহমদ ইবনে আব্দুল কুদ্দুস শানাভী থেকে
৯। তিনি শাহ শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে রমলী থেকে
১০। তিনি শায়খুল ইসলাম আবু ইয়াহইয়া আহমেদ যাকারিয়া ইবনে মুহাম্মদ আনসারী থেকে
১১। তিনি শায়খ শিহাবুদ্দীন ইব্রাহীম ইবনে আহমদ তানুখী থেকে
১২। তিনি শায়খ সিরাজ উদ্দীন ইবনে মোবারক হাম্বলী যুবাইদী থেকে
১৩। তিনি আবুল ওয়াক্ত আব্দুল আউয়াল ঈসা ইবনে শোয়াইব সানজারী হারাবী থেকে
১৪। তিনি আবুল হাসান আব্দুর রহমান ইবনে মুজাফফর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে দাউদ দাউদী থেকে
১৫। তিনি আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ সারাখসী থেকে
১৬। তিনি আবু মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ মাতার ইবনে সালেহ ইবনে বিশর আল ফেরারবী থেকে
১৭। তিনি মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল থেকে
১৮। তিনি হযরত হাম্মাদ বিন যায়েদ থেকে
১৯। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক থেকে
২০। তিনি ইমাম আবু হানিফা থেকে
২১। তিনি আনাস ইবনে মালেক থেকে
২২। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে
২৩। তিনি রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে। এই হলো আমাদের ইলমের সনদ।
এবার শুনুন কিভাবে রসূলের সাথে আমাদের আধ্যাত্নিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
√ তাসাওউফ বা তরীকতের সনদ :
কুতুবুল আলম হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহঃ) বেলায়েত শিখেছেনঃ
১। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী থেকে
২। তিনি মিয়াজী নুর মুহাম্মদ থেকে
৩। তিনি শাহ আব্দুর রহীম থেকে
৪। তিনি শাহ আব্দুল বারী থেকে
৫। তিনি শাহ আব্দুল হাদী থেকে
৬। তিনি শাহ আযদুদ্দীন থেকে
৭। তিনি শাহ মুহাম্মদ মক্কী আবু সাঈদ থেকে
৮। তিনি শায়খ নিজামুদ্দীন বলখী থেকে
৯। তিনি শায়খ জালালুদ্দীন থানেশ্বরী থেকে
১০। তিনি শাহ আব্দুল কুদ্দুস থেকে
১১। তিনি শায়খ মুহাম্মদ আরিফ থেকে
১২। তিনি শায়খ আরিফ ইবনে আহমদ থেকে
১৩। তিনি শায়খ আব্দুল হক রাদুলোভী থেকে
১৪। তিনি শায়খ জালালুদ্দীন থেকে
১৫। তিনি শায়খ শামসুদ্দীন থেকে
১৬। তিনি শায়খ আলাউদ্দিন সাবের কালারী থেকে
১৭। তিনি শায়খ ফরিদুদ্দীন গনজেশকর থেকে
১৮। তিনি খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী থেকে
১৯। তিনি খাজা উসমান থেকে
২০। তিনি খাজা হাজী শরীফ যিন্দানী থেকে
২১। তিনি খাজা হোযাইফা থেকে
২২। তিনি খাজা ইবরাহীম ইবনে আদহাম থেকে
২৩। তিনি ফুযাইল ইবনে আয়ায থেকে
২৪। তিনি খাজা আব্দুল ওয়াহিদ থেকে
২৫। তিনি হাসান বসরী থেকে
২৬। তিনি আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (রঃ) থেকে
২৭। তিনি সাইয়েদুল মুরসালীন মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে।
মাহবুবে খোদা রহমাতুললীল আলামীনের সাথে ইলমী ও রুহানী উভয় দিক থেকে আমাদের যোগসূত্র রয়েছে। এটাই আমাদের গর্ব। এটাই বাতিল গোষ্ঠীগুলোর ঈর্ষাবিদ্বেষ এবং চরম মাথাব্যথা।
[মাওলানা জিয়াউর রহমান ফারুকী (রহঃ) এর কালজয়ী ভাষণ “ওলামায়ে দেওবন্দের সংগ্রামী ইতিহাস” অবলম্বনে]
লেখক, প্রিন্সিপাল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন