বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

আধ্যাত্মিক রাহবার আল্লামা আব্দুল হক শায়খে গাজিনগরী মদফুনে মক্কী রাহ.


ভূমিকা : দুনিয়ার এই জীবন ক্ষণিকের। পরকালের জীবন অনন্ত-অসীম। যার শুরু আছে শেষ নেই কিন্তু দুনিয়ার জীবনে রয়েছে সূচনা ও সমাপ্তি। অতএব, ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে আগমনকারী প্রতিটি আত্মাকেই মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। এটাই অনিবার্য এক বাস্তবতা।
ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ার বুকে কত হাজার কোটি মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, ক্ষণজন্মা কত মনীষীর পদদূলিতে ধন্য হয়েছে এই পৃথিবী কিন্তু কেউ চিরদিন বেঁচে থাকেন নি। স্রষ্টার চিরায়ত নিয়মের মধ্য দিয়েই একদিন তাকে চলে যেতে হয়েছে পরপারে। ভক্ত-মুরিদ, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, যশ-খ্যাতি, ধন-সম্পদ সব কিছুকে বিসর্জন দিয়ে। লাব্বায়েক বলতে হয় মহান মাওলার ডাকে সাড়া দিতে। পৃথিবীর বুকে বিচরণশীল প্রত্যেক প্রাণীকেই একদিন না একদিন তাকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে, সে যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন। এজন্য বুযুর্গরা কখনো মৃত্যুকে ভয় করতেন না। মহান মাওলার সান্নিধ্য লাভের আশায় তারা সদা-সর্বদা ব্যাকুল থাকতেন।
উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক রাহবার, ওলীকুল শিরোমনি শায়খুল ইসলাম আ্লেমা সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানী রাহ.’র বিশিষ্ট খলিফা ও অত্যন্ত প্রিয়ভাজন, ভাটি-বাংলার এক প্রবাদ পুরুষ, ওলীয়ে কামিল, কুতবে জামান, মুহিউস সুন্নাহ, কামিউল বিদআহ, জামিউশ শরীআহ, ছদরে জমিয়াহ আল্লমা শায়খ আব্দুল হক গাজীগনরী মদফুনে মক্কি রাহ.। মহান এ ব্যক্তির জীবন ও কর্ম নিয়ে কিছু লেখার সাহস আমি দেখাই কী করে! অজান্তে যদি কোন ভুল হয়ে যায়, অনাকাঙ্খিত কোন বেয়াদবী হয়ে যায় নিজের অজ্ঞতার দরুন, তখন অধমের উপায় কী হবে? প্রশ্ন হতে পারে তাহলে লিখার কসরত কেন? উত্তরে এ কথাই বলবো- আমি হতভাগা হুজুরের কাছ থেকে সরাসরি কোন ফায়দা লাভ করতে পারি নি বিধায় তাঁর ইন্তেকালের কয়েকবছর পর কিমাশিসার নিয়মিত আয়োজন; মনীষা চর্চায় কিছু আলোচনা করে নিজেকে জড়িয়ে দেয়া, জড়িয়ে নেয়ার অধম্য ইচ্ছা, স্পৃহা আর সুযোগ কাজে লাগানো।
জন্ম : শায়খ আব্দুল হক গাজিনগরী রাহ. ১৯২৮ সালে সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ১১নং পাথারিয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত গাজীনগর গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সম্মানিত পিতার নাম মরহুম কেরামত আলী মুন্সি ও সম্মানিতা মাতার নাম মুছাম্মাৎ হানিফা খাতুন। শায়খে গাজিনগরী রাহ.’র পিতা-মাতা উভয়ই দ্বীনদার, পরহেজগার ও খোদাভীরু ছিলেন। শিশু আব্দুল হক মায়ের দুগ্ধ পালনকালীন সময়েই মাথার উপর থেকে মমতাময়ী মায়ের ছায়া উঠে যায়।
প্রাথমিক শিক্ষা : আব্দুল হক শায়খে গাজিনগরী শৈশবে তাঁর মামার বাড়ী দিরাই উপজেলার শরীফপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার সূচনা করেন। এখানে তিনি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত লেখা-পড়া করেন।
জটিল রোগে আক্রান্ত : শরীফপুরে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় হযরত একবার এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশয়ী হয়ে পড়েন। তাকে সুস্থ করার জন্য অনেক ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করার পরও যখন সুস্থ হলেন না, তখন যুগ শ্রেষ্ঠ ওলী, যার কথা ভাটি-বাংলার মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে, তিনি হলেন শাহ সূফি হযরত মাওলানা সিকান্দার আলী রাহ.। যিনি সূফি সাহেব নামে খ্যাত, সেই মনীষির দোয়ার বরকতে হযরত পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে উঠেন এবং দ্বীনি শিক্ষার জন্য তাঁকে মাদরাসায় প্রেরনের জন্য পরামর্শ দেন।
মাদরাসা শিক্ষার সূচনা : কঠিন এই রোগ থেকে হযরত সুস্থ হওয়ার পর হযরত সূফি সাহেবের প্রতিষ্ঠিত দরগাহপুর মক্তব মাদরাসায় ভর্তি হন। দরগাহপুর মক্তব মাদরাসায় হযরত সুফি সাহেব, মাওলানা আব্দুল মুছাব্বির পারকুলী, মাওলানা ছানা উল্লাহ রাহ. প্রমূখ উস্তাদদের নিকট তিনি প্রাথমিক কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন। আর এখানেই লেখা-পড়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও তীক্ষ্ম মেধা শক্তির বিকাশ ঘটে।
মাধ্যমিক শিক্ষা : জ্ঞান তাপষ মহান এ সাধক ইলমে দ্বীন অর্জনের জন্যে দরগাহপুর থেকে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে নাহবেমীর জামাত পর্যন্ত প্রায় চার বছর অধ্যয়ন করেন। উলে্লখ্য যে, বানিয়াচং আলিয়া মাদরাসায় লেখাপড়ার সময় ১৯৪৫ সালে একবার শায়খুল ইসলাম হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী রাহ.’র বানিয়াচং আগমন ঘটে। তাঁর আগমন নিয়ে এলাকায় অনাকাংখিত একটি ঘটনার অবতারণা হলে হযরত মাদানী রাহ.’র প্রতি তাঁর অগাধ ভক্তি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে তখন। যার ফলে শায়খে গাজিনগরী রাহ. কে হবিগঞ্জ কারাগারে দীর্ঘ একমাস কারাবরণ করতে হয়।
সিলেট আলিয়া মাদরাসা : বানিয়াচংয়ে ৪ বছর অধ্যয়নের পর ১৯৪৮ সালে চলে আসেন সিলেট আলিয়া মাদরাসায়। এখানে কিছুদিন পড়ার পর মাদরাসার ছাত্রদের চাল-চলন, আচার-আচরণ তাঁর ভালো লাগেনি বলে সিলেট থেকে চলে যান জামিয়া ইউনুসিয়া বি-বাড়ীয়ায়। জামিয়া ইউনুসিয়ায় অত্যন্ত সুনামের সাথে ছানোবিয়্যাহ ৩য় বর্ষ অর্থাৎ মুখতাছারুল মা’আনী জামাত পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। সেখানে তাঁর উল্লেখযোগ্য উস্তাদদের মধ্য অন্যতম হলেন, মুনাযিরে জামান ফখরে বাঙাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রাহ., শায়খুল হাদীস আল্লামা সিরাজুল ইসলাম রাহ.।
সহপাঠীদের মধ্য অন্যতম হলেন, শায়খুল হাদীস মুফতি মাওলানা নূরুল্লাহ সাহেব দা.বা., শায়খুল হাদীস মাওলানা মুনিরুজ্জামান সাহেব, মাওলানা আব্দুল মালিক গাজিনগরী ছদর সাব হুজুর প্রমূখ।
শায়খে গাজিনগরী রাহ. শৈশবকাল থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। জামিয়া ইউনুসিয়াম থাকাকালীন সময়ে একবার তাঁর এক উস্তাদ তাকে বললেন, আব্দুল হক! হেদায়াতুন্নাহু মুখস্ত করে আমাকে শুনাতে হবে, শিক্ষকতা জীবনে এর প্রয়োজন অনেক। স্বীয় উস্তাদের প্রতি তাঁর এতো ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল যে, শিক্ষকদের আদেশ নতশীরে মেনে নিতেন। উস্তাদের আদেশ বিধায় অল্প ক’দিনের মধ্যই তিনি হেফায়াতুন্নাহ কিতাবখানা পূর্ণ মুখস্ত শুনিয়ে দিলেন তাঁর উস্তাদকে। এতে ঐ উস্তাদ যার পরনাই আনন্দিত হলেন।
দারুল উলূম দেওবন্দ গমন : শায়খে গাজিনগরী জামিয়া ইউনুসিয়ায় ৩ বছর পড়ালেখার পর উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্যে এবং আকাবিরদের ফয়েজ ও সুহবত লাভের আশায় ১৩৭০ হিজরি সনে মাদরে ইলমী, বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত সুনাম ও সুখ্যাতির সাথে দীর্ঘ ৪ বছর লেখা পড়া করে ১৩৭৫ হিজরী সনে দাওরায়ে হাদীসের জামাতে উত্তীর্ণ হন। দাওরায়ে হাদীসের জামাতে হাদীসে রাসূল সা.’র কালজয়ী গ্রন্থ বুখারী শরীফ এবং তিরমিযি শরীফ শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানীর রাহ.’র নিকট থেকে দারস লাভে ধন্য হন। এছাড়া আল্লামা ইব্রাহীম বলিয়াভী, শায়খুল আদব আল্লামা এজাজ আলী, মুফতিয়ে আজম মুফতি শফী রাহ. প্রমূখ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসীনে কেরামের নিকট সিহাহ সিত্তার অন্যান্ন কিতাবাদী অধ্যয়ন করেন।
আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং খেলাফত লাভ : শায়খ আব্দুল হক গাজিনগরী রাহ. দারুল উলূম দেওবন্দে দাওরায় হাদীস সমাপনান্তে কুতবে আলম, শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানী রাহ.’র খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন এবং আরো ২ বছর সেখানে অবস্থান করেন। এ সময়ে তিনি আপন মুর্শিদের খেদমতের পাশাপাশি ইলমে তরীকতের সনদে খেলাফত লাভে ধন্য হন এবং নিজ মুর্শিদের নির্দেশে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
কর্ম জীবন: ১৩৭৭ হিজরী সনে যখন তিনি দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে উচ্চ শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার সনদ অর্জন করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন ফখরে বাঙাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রাহ. তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে মাদানী রাহ.’র অনুমতিক্রমে ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইউনুসিয়া বি-বাড়ীয়ায় শিক্ষকতার মহান পেশায় তাঁকে নিযুক্ত করেন। সেখানে এক বছর দায়িত্ব পালনের পর আপন মুর্শিদ পত্রের মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দিলেন ‘‘মাকান যা কর মদরসা কায়িম কর’’ তখন তিনি আপন উস্তাদ ফখরে বাঙাল তাজুল ইসলাম রাহ.’র ইজাযত নিয়ে বাড়িতে চলে আসেন এবং নিজ গ্রাম দরগাহপুরে ১৩৬৪ বাংলায় প্রতিষ্ঠা করলেন ঐতিহ্যবাহী ইসলামী বিদ্যাপীঠ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের দূর্জয় এক কেল্লা- দারুল উলূম দরগাহপুর। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দারুল উলূম দরগাহপুরের প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম হিশেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
দীর্ঘ এই ৫১ বছরে তিনি দারুল উলূম দরগাহপুরকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ইহতেমামীর দায়িত্ব পালন করে জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে একবার মাদরাসার ইহতেমামীর দায়িত্ব ছেড়ে দিলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার তাঁকে পীড়াড়ীড়ি করে ইহতেমামীর দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি সম্মত হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ইতমেনানের সাথে মাদরাসার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে বলে আসার পর দরগাহপুর নামে যে মাদরাসাটি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, এ মাদরাসাটি তাঁর শৈশবে থাকলেও পাকিস্তান আমলে এর কোন অস্তিত্ব এমনকি এখানে মাদরাসা ছিল বলে কোন চিহ্নও ছিলনা। তিনি এখানে পূণরায় মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করেন।
বিবাহ : সুন্নাতে রাসূল সা. পালনার্থে খলিফায়ে মাদানী শায়খে গাজিনগরী রাহ. জীবনে দু’টি বিবাহ করেন। তন্মধ্যে প্রথম বিবাহ জামিয়া ইউনূসিয়া বি-বাড়ীয়ায় শিক্ষক থাকাকালীন সময়ে ১৩৭৭ হিজরীতে দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক শায়খ পরিবারের আদর্শ রমণী মোছাম্মাৎ মুমতাজ বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর গর্ভে মোট ১৩জন সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে ৬ ছেলে ও ৭ মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে ৪জন ছোটকালেই মারা যায়। অপর দু’জন হলেন, খলিফায়ে ফেদায়ে মিল্লাত ও শায়খে কৌড়িয়া রাহ. শায়খ মাওলানা আব্দুল করীম সাহেব। তিনি বর্তমানে আপন পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে বাইয়াতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অপরজন মরহুম শায়খ মাওলানা আব্দুল বাসিত রাহ.। তিনি ৩৮ বছর বয়সে পিতার আগেই হইধাম ত্যাগ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে কোন সন্তানাদি নেই।
রাজনৈতিক জীবন : ইসলামী রাজনীতির অঙ্গনে শায়খ আব্দুল হক গাজিনগরী রাহ.’র ছিল সক্রিয় ভূমিকা। আকাবির ও আসলাফের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠন জমিয়তে উলামায়ের ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সদস্য, সহ-সভাপতি অত:পর মৃত্যু অব্দি কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭০ এর জাতীয় নির্বাচনে জমিয়ত প্রার্থী হিশেবে খেজুরগাছ প্রতীক নিয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি ফেদায়ে মিল্লাত সায়্যিদ হযরত আস’আদ মাদানী রাহ. প্রতিষ্ঠিত ইসলাহুল মুসলিমীন বাংলাদেশ’র সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। হকের পক্ষে আর বাতিলের বিরুদ্ধে শায়খে গাজিনগরী ছিলেন সোচ্চার ভূমিকা পালনকারী। ছিলেন রাজপথে লড়াকু অগ্রসেনানী। সমাজ দরদী হিসেবে সমাজের দূর্গত, বঞ্চিত, অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতেন, সাধ্যমত সাহায্যের চেষ্টা করতেন।
সমাজ সংস্কারে শায়খে গাজিনগরী : বাতিলের আতংক শায়খে গাজিনগরী সমাজ রাষ্ট্রের সব অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে ছিলেন মূর্তিমান এক আতংক। ভাটি অঞ্চল হিশেবে খ্যাত সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলকে মহামারীর মত জড়িয়ে থাকা-যাত্রাগান, যাত্রাপালা, ঘৌড় দৌড়, নৌকা দৌড়, নাচ-গান সহ সমাজ বিধ্বংসী রোগগুলোকে তিনি প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে উৎখাত করতে সক্ষম হন। পুরো সুনামগঞ্জ এলাকায়ই তার প্রচেষ্টায় কুসংস্কার দূর হয়ে ইসলামী পরিবেশ কায়েম হয়।
এছাড়া কাদিয়ানী, মওদুদীবাদী ফিৎনা যখনই মাথা চড়া দিয়ে উঠত, তখনই তিনি তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত হয়ে যেতেন এবং মুনাজারার চ্যালেঞ্চ ছুড়ে দিতেন। এসব ফেৎনার মোকাবেলায় যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন, তাদের মধ্যে শায়খে গাজিনগরী অন্যতম।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের ভাষ্যকার শায়খে গাজিনগরী: আত্মার চিকিৎসক শায়খে গাজিনগরী রাহ. বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, অজপাড়াগাঁয়ে, গাড়িতে, নৌকা, কখনো মাইলের পর মাইল হেঁটে হেঁটে গিয়ে মানুষদেরকে ওয়াজ নসীহত করতেন। দ্বীনের তা’লীম দিতেন। পথভুলা, পথহারা মানুষ জনকে সঠিক পথের সন্ধান দিলেন। বায়আত করতেন, আত্মার চিকিৎসা করতেন। মানুষদের বুঝিয়ে শুনিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ইসলাম মুখী করতেন।
খেলাফত প্রদান : আশিকে মাদানী শায়খে গাজিনগরী রাহ. সাধারণত কোন বয়ানের পর সিলসিলায়ে মাদানীর আমানত বণ্টনের জন্যে মুরীদ বানাতেন। এর মধ্যে আবার যারা মুজাহাদা মুশাহাদায় অগ্রগামী তাদেরকে তিনি খেলাফতের ইজাযত দান করতেন।
উল্লেখ্য, শায়খে গাজিনগরী রাহ. এর সম্মানীত খলিফা মোট ৬জন: ১. মরহুম শায়খ মাওলানা আব্দুল হালীম সাহেব, কানাইঘাট, সিলেট। ২. শায়খ মাওলানা কামাল উদ্দীন সাহেব, মৌলভী বাজার। ৩. শায়খ মাওলানা হাদিয়াতুল্লাহ সাহেব, বি-বাড়ীয়া। ৪. শায়খ মাওলানা মুহিব্বুর রহমান সাহেব, ছাতক, সুনামগঞ্জ। ৫. শায়খ মাওলানা নজরুল ইসলাম, গোয়াইনঘাট, সিলেট।
হজ্বব্রত পালন : মদফুনে মক্কী শায়খে গাজিনগরী রাহ. জীবনে ৫ বার পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন। শেষবার হজ্ব করার জন্য পূণ্যনগরী মক্কা-মদীনায় গেলে মাওলার প্রেমে পড়ে গিয়ে সেখান থেকে আর দেশে ফেরা হয়নি।
ইন্তেকাল: ‘‘কুল্লু নাফসিন যা ইকাতুল মাউত’’ অর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ অস্বাদন করতে হবে। মৃত্যুকে কেউ রুখতে পারবেনা বা পারার সাধ্য কারো নেই। এই অনিবার্য বাস্তবতাকে সামনে রেখে আমাদের মাথার উপর এতোদিন ছায়া হয়ে থাকা মহান মনীষী, খলিফায়ে মাদানী আব্দুল হক শায়খে গাজিনগরী রাহ. আমাদেরকে, আত্মীয়-স্বজনসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত মুরীদানকে শোক সাগরে ভাসিয়ে ২০০৮ সালের ২রা ডিসেম্বর সোমবার স্থানীয় সময় রাত ৩ ঘটিকার (বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা) সময় কালেমায়ে শাহাদত পড়তে পড়তে মহান মাওলার ডাকে সাড়া দিয়ে তার সাক্ষাতের জন্য চলে যান ফিরে না আসার দেশে। চিরদিনের আমাদেরকে এতীম করে পাড়ি জমান পরপারে। ভাগ্যবান শায়খে গাজিনগরী রাহ.কে জান্নাতুল মুয়াল্লার ৮১/১৬ নং কবরে উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদিজার রাযি.’র কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।
লেখক : ইলিয়াস মশহুদ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন