রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

মুন্সী মেহেরউল্লাহ


আমরা খুব সহজে যেসব কীর্তিমান মানুষকে ভুলে যেতে বসেছি, মুন্সী মেহেরউল্লাহ তাঁদের অন্যতম। তাঁর জীবন থেকে কিছু মজার গল্প বলি।

পেশায় সামান্য একজন দর্জি ছিলেন তিনি। কিন্তু নিজের চেষ্টা ও আন্তরিকতায় কম্পরেটিভ রিলিজিওন-এ এতো বেশি ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন, ভাবতেই অবাক হই। ঔপনিবেশিক শাসনামলে খ্রিস্টান মিশনারিগুলোর ভয়ানক দৌরাত্ম্য এবং তার বিপরীতে মুসলিম সমাজের দৈন্য অবস্থায় তিনি ব্যথিত হন এবং নিজেই উদ্যোগী হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ঠিক আমাদের এখনকার ইন্টেলেকচুয়াল লড়াইয়ের গতি-প্রকৃতির সাথে তখনকার যুক্তি-তর্কগুলোর একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। সময়, চাহিদা এবং জনসাধারণের অবস্থান বিবেচনায় মিশনারি তৎপরতাও ছিলো ভিন্ন। ধর্মান্তরিতকরণের জন্যে তারা মূলত ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম রিলেটেড কিছু কমন পয়েন্টকে লজিক্যালি আক্রমণ করতো। এরা কিন্তু বেশ সফলও হয়েছিলেন। তার অন্যতম প্রমাণ মহাকবি শ্রী মধুসূদনের ‘মাইকেল মধুসূদন’ হওয়া। মুন্সী জমির উদ্দীন- ইনিও বেশ সমাদৃত ছিলেন থিংক ট্যাঙ্ক হিসেবে; কিন্তু তাঁকেও ধর্মান্তরিত করতে সক্ষম হয়। পরে অবশ্য মুন্সী মেহের উল্লাহর প্রচেষ্টায় তিনি পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

যাই হোক, মুন্সী মেহের উল্লাহকে নিয়ে সামান্য জানার চেষ্টা করলাম। উপস্থিত বুদ্ধিতে আসলেই এই মানুষটির কোন তুলনা হয় না। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বিচার-বুদ্ধিতে এতো বেশি বিচক্ষণ, সত্যিই বিরল! অবশ্য আমি বিশ্বাস করি, এখানে আল্লাহর সাহায্যও তাঁকে ছায়া দিয়েছে বারবার।

দুটো উদাহরণ দেই:
খ্রিস্টান পাদ্রীদের পক্ষ থেকে একটি বাহাসে প্রশ্ন করা হোল: ‘ইসলাম ধর্ম মতে জান্নাত হলো ৮টি এবং জাহান্নাম হলো ৭টি। এটা নিতান্তই হাস্যকর কথা। কারণ, আপনারাই বলেন মুসলমানরা ব্যতীত আর কেউ জান্নাতে যাবেনা। কিন্তু পৃথিবীতে মুসলমানদের বিপরীতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাই বেশি। আবার বলেছেন মুসলমানদের মধ্যেও সবাই জান্নাতে যাবেনা। খাঁটি ঈমানদারেরাই যাবে কেবল। দেখেন, তাহলে এই গুটিকয়েক মানুষের জন্য ৮টা জান্নাত আর বিপরীতে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য ৭টা জাহান্নাম! এর চে’ বড়ো কৌতুক আর কী হতে পারে?’ বলেই সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
মুন্সী মেহের উল্লাহ মুচকি হেসে ধীর-স্থির ভাবে এগিয়ে আসেন। প্রশ্ন করেন, ‘বাদুর দেখেছেন জনাব?’ পাদ্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, দেখেছি’। মুন্সী এবার হাসি দিয়ে বললেন,
‘দেখেন, রাতের বেলা যখন শিকারীরা ত্রিশ থেকে চল্লিশটা বাদুর শিকার করেন। দিনের বেলায় সেই বাদুরগুলোকে শুধু একটা মাত্র বস্তায় চেপে চেপে ভর্তি করে নিয়ে আসে। কিন্তু জনাব, ময়না দেখেছেন না? মানুষ কিন্তু শুধু একটা ময়নার জন্যই ইয়া বিশাল খাঁচা কিনে আদর করে রাখে। এবার আপনারাই বলেন, চল্লিশটা বাদুরের জন্যে একটা বস্তা, আর একটা ময়নার জন্যে সেই বস্তার সমান পুরোদস্তুর একটা খাঁচা; এটা কি হাস্যকর শোনাবে?’ সবাই নীরব। মুন্সী এবার বললেন, ‘ঠিক সেটাই। যার যেমন কদর, যার যেমন মূল্য। এখন আপনারা যারা বুক ফুলিয়ে বলেন জাহান্নামে যাবো, তারা ঠিক বাদুরের মতোই! আর আমরা যারা জান্নাতে যাবার স্বপ্ন দেখি, আমাদেরকে ময়না পাখির মতোই আদর-যতœ করে রাখা হবে তো, এ জন্যে অল্প মানুষের জন্যে বরাদ্দটা বেশি আর কি!’
আরেকবার একজন পাদ্রী বললেন, ‘ইসলাম ধর্মে দাবী করা হয় মুহাম্মদই শ্রেষ্ঠ নবী। এবং তাঁর আগমনে নাকি পূর্বের সব নবী-রসূলের শরীয়ত রহিত হয়ে গেছে। এটা পুরোটাই তাদের বানোয়াট কথা ছাড়া আর কিছু নয়। দেখেন, মুসলমান ভায়েরা, আমাদের নবী ঈসাকে আল্লাহ কিন্তু আসমানের ওপর তুলে নিয়েছেন। আর আপনাদের নবী মাটির নীচে শুয়ে আছে। এবার আপনারাই বিচার করুন, কে শ্রেষ্ঠ? আমাদেরকে মুসলমান হতে না বলে বরং আপনারাই খ্রিস্টান হওয়া যৌক্তিক।’
মুন্সী দেখছেন এদের ভাষা এবং প্রশ্ন করার ঢঙে যথেষ্ট বাড়াবাড়ি হচ্ছে এবং সীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা আছে। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি খুব শান্ত ভাবে বললেন, ‘জনাব! আমরা কিন্তু কুরআনের নির্দেশ মতো কোন নবী-রাসূলের মাঝে পার্থক্য করি না। তাঁরা সকলেই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি আপনি মান উঁচু-নীচুর প্রশ্নে আসেন, তাহলে একটা প্রশ্ন করতেই হয়, মুক্তা দেখেছেন? মুক্তা কিন্তু সমুদ্রের তলায় থাকে, আর উপরে যা থাকে, তা হলো জোয়ারের ফেনা!’ উপস্থিত সবাই নীরব এবং বিস্মিত!
আমাদের কাছে যুক্তিতর্কগুলো খুব সাধারণ মনে হলেও, তখনকার প্রেক্ষাপটে এগুলোর যথেষ্ট ভেল্যু ছিলো। তার কারণ, বাহাসে যারা আসতো, তারা নিছক মজা পাবার জন্যে আসলেও তর্কের জয়-পরাজয় তাদের অনেকেরই ধর্মচ্যুত হবার সম্ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করতো; ইতিহাস বলে।
ঠিক সেই সময়ে এগিয়ে এসেছিলেন মুন্সী মেহের উল্লাহ। শুধু তাই নয়, মুসলমানদের ভাগ্যাকাশে যখন কালো মেঘ ছেয়ে গিয়েছিলো; তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন সাহিত্য ও সমকালীন জ্ঞানচর্চায় মুসলমানদের এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা। আজকে আমরা যাঁদের নিয়ে গর্ব করি, সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, শেখ হবিবর রহমান সাহিত্যরতœ, শেখ ফজলল করিম- এঁদের পৃষ্ঠপোষক এবং প্রেরণাদাতা ছিলেন মুন্সী মেহের উল্লাহ।
আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের পাখি হিসেবে ক্ববূল করুন।
কালান্তরের কড়চায় তিনি বিস্মৃত ঠিকই, কিন্তু অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তিনি ভাস্বর থাকবেন ইতিহাস-সচেতন বাঙালী মুসলমানের মানস পটে। ঐশী আলোর দীপশিখা অনির্বাণ রাখার দুর্জয় প্রত্যয়ে মুন্সী মেহের উল্লাহ হোক সাহস ও প্রেরণার প্রোজ্জ্বল বাতিঘর।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন