মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০১৫

রায়হানা বিনতু শামঊন (রাঃ) যয়নাব বিনতু খুযাইমা (রাঃ) উম্মু হাবীবা বিনতু আবী সুফিয়ান (রাঃ)

রায়হানা বিনতু শামঊন (রাঃ)

রায়হানা বিনতু শামঊন (রাঃ)


ভূমিকা :
রায়হানা বিনতু শামঊন (রাঃ) বানু নাযীর বা বানু কুরাইযা গোত্রের মহিলা ছিলেন। যুদ্ধবন্দী হিসাবে তিনি রাসূলের নিকটে নীত হন। অতঃপর ইসলাম কবুল করার মাধ্যমে রাসূলের স্ত্রীদের মত মর্যাদা লাভের ঈর্ষণীয় সম্মানে ভূষিতা হন। এই মহিয়সী রমণীর সংক্ষিপ্ত জীবনী আমরা আলোচ্য নিবন্ধে উপস্থাপনের প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।-
নাম ও বংশপরিচয় :
তাঁর নাম রায়হানা। তাঁর পিতার নাম শামঊন মতান্তরে যায়েদ। তাঁর পিতার নাম ও বংশপরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) তাঁর বংশপরিচয় এভাবে উল্লেখ করেছেন- রায়হানা বিনতু শামঊন বিন যায়েদ। কেউ বলেছেন, রায়হানা বিনতু যায়েদ বিন আমর বিন ক্বানাফা মতান্তরে খানাফাহ। ইবনু সা‘দ তাঁর বংশধারা এভাবে বলেছেন, রায়হানা বিনতু যায়েদ বিন আমর বিন খানাফাহ বিন শামঊন বিন যায়েদ। ইবনু আব্দিল বার্র তাঁর বংশ পরম্পরা এভাবে উল্লেখ করেছেন, রায়হানা বিনতু শামঊন ইবনে যায়েদ ইবনে খানাফাহ। ইবনু ইসহাক বলেছেন এভাবে, রায়হানা বিনতু আমর ইবনে খানাফাহ। অন্যত্র আছে- রায়হানা ইবনাতু আমর ইবনে হুযাফাহ। তাঁর বংশ-গোত্র নিয়েও মতভেদ রয়েছে। ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) ও ইবনু সা‘দ তাকে বনু নাযীর গোত্রের বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনু ইসহাক, ইবনু আব্দিল বার্র ও হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) তাঁকে বনু কুরাইযা কবীলার বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনু আব্দিল বার্র বলেন যে, অধিকাংশের মত হচ্ছে- তিনি বনু কুরাইযা গোত্রের ছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক ইবনু সা‘দ বলেন, তিনি বনু কুরাইযার হাকাম নামক জনৈক ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এজন্য কোন কোন বর্ণনাকারী তাঁকে বনু কুরাইযার অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করেছেন।
জন্ম ও শৈশব :
উম্মুল মুমিনীন রায়হানা (রাঃ)-এর জন্ম সাল সম্পর্কে যেমন কিছু জানা যায় না, তেমনি তাঁর শৈশব-কৈশোরের অবস্থাও অজ্ঞাত। কেননা এ বিষয়ে চরিত্রকার ও ঐতিহাসিকগণ কিছুই বর্ণনা করেননি।
প্রথম বিবাহ :
বনু কুরাইযার আল-হাকাম নামক জনৈক ব্যক্তির সাথে তাঁর প্রথম বিবাহ হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, বনু কুরাইযার হাকীম নামক এক ব্যক্তির সাথে রায়হানা (রাঃ)-এর প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয়।
ইসলাম গ্রহণ ও রাসূলের সাথে বিবাহ :
৫ম হিজরীর যুলকা‘দাহ ও যুলহিজ্জাহ মাসে বনু কুরাইযার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে তার স্বামী নিহত হয় এবং তিনি যুদ্ধবন্দী হিসাবে রাসূলের নিকটে নীত হন। গনীমত বণ্টনে তিনি রাসূলের অংশে পড়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) গনীমত বণ্টন শেষ করে রায়হানা (রাঃ)-কে উম্মুল মুনযির সালমা বিনতু ক্বায়সের গৃহে পাঠান। সেখানে তিনি কয়েকদিন অবস্থান করেন। ইতিমধ্যে বনু কুরাইযার যুদ্ধ অপরাধীদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা এবং বন্দীদের বণ্টন সম্পন্ন হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উম্মুল মুনযিরের বাড়ীতে গিয়ে রায়হানাকে ডেকে বললেন, ان اخترت الله ورسوله واختارك رسول الله لنسفه ‘যদি তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে এখতিয়ার কর, তাহ’লে আল্লাহর রাসূল তোমাকে নিজের জন্য পসন্দ করবেন’। তখন তিনি বললেন, إنى اختار الله ورسوله ‘আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে পসন্দ করি’। অপর একটি বর্ণনায় আছে, রায়হানা যুদ্ধ বন্দীনী হিসাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে নীত হ’লে তিনি তাকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে ইসলাম কবুল করতে পার, ইচ্ছা করলে স্বধর্মের (ইহুদী) উপর কায়েম থাকতে পার। তিনি বললেন, أنا على دين قومى  ‘আমি আমার জাতির ধর্মের উপরে আছি’। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, إن اسلمت اختارك رسول الله لنفسه- ‘তুমি মুসলিম হ’লে আল্লাহর রাসূল নিজের জন্য তোমাকে এখতিয়ার করবেন’। তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন ও নিজ কথার উপর অটল থাকলেন। এতে রাসূল (ছাঃ) মনে খুব কষ্ট পেলেন এবং রায়হানাকে নিজের অবস্থার উপর ছেড়ে দিলেন। একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরামের সাথে বসেছিলেন এমন সময় জনৈক ব্যক্তির পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। তিনি বললেন, এই ব্যক্তি হচ্ছে ছা‘লাবা ইবনু সা‘ইয়াহ, সে রায়হানার ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ নিয়ে এসেছে। সে এসে রাসূলকে বললেন, রায়হানা ইসলাম কবুল করেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রায়হানাকে (দাসী হিসাবে) গ্রহণ করলেন। তার ইসলাম গ্রহণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুশী হন। তিনি আমৃত্যু রাসূলের নিকটে ছিলেন।১০ ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে আযাদ করে দেন এবং তাকে সাড়ে বার উকিয়া বা ৫০০ দেরহাম মহর প্রদান করে বিবাহ করেন।১১ এটা ছিল ৬ষ্ঠ হিজরীর মুহাররম মাসে।১২ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার উপর পর্দার বিধান আরোপ করেন এবং অন্যান্য স্ত্রীদের যেরূপ খাদ্যদ্রব্য দান করেছিলেন, তদ্রূপ রায়হানাকেও দিয়েছিলেন।১৩ অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রায়হানাকে দাসী হিসাবে স্বীয় মালিকানায় রেখেছিলেন, তাকে আযাদ করেননি এবং তাকে বিবাহও করেননি। কিন্তু ইবনু সা‘দ বলেন, ما روى لنا فى عتقها وتزويجها وهو أثبت الأقاويل عندنا وهو الأمر عند أهل العلم، ‘তাঁর আযাদ হওয়া ও বিবাহের ব্যাপারে যা আমাদের নিকটে বর্ণিত হয়েছে, তা আমাদের নিকটে অধিক প্রতিষ্ঠিত কথা এবং বিদ্বানগণের নিকটে এটি অধিক শক্তিশালী’।১৪ ইবনু ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রায়হানাকে নিজের জন্য মনোনীত করেন। মৃত্যু অবধি দাসী হিসাবে তিনি রাসূলের মালিকানায় ছিলেন। কালবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রায়হানাকে আযাদ করে বিবাহ করেন।১৫
অন্য বর্ণনায় আছে, রায়হানা (রাঃ) উম্মুল মুনযিরের গৃহে অবস্থান করছিলেন। সেখানে তাঁর একটি ঋতু অতিবাহিত হয়। তিনি পবিত্র হ’লে উম্মুল মুনযির (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে এসে রায়হানার পবিত্রতার খবর দিলেন। তখন তিনি উম্মুল মুনযিরের বাড়ীতে গেলেন।১৬ অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রায়হানকে ডেকে বললেন, যদি তুমি পসন্দ কর যে, আমি তোমাকে আযাদ করে দেই এবং বিবাহ করি তাহ’লে তাই করব। কিংবা যদি তুমি আমার মালিকানায় থাকা পসন্দ কর (তবে তাই হবে)। তিনি বললেন, يا رسول الله اكون فى ملكك أخف على وعليك، ‘হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি আপনার মালিকানায় থাকব, যা আমার জন্য ও আপনার জন্য হালকা হবে’। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে (দাসী হিসাবে) নিজ মালিকানায় রাখলেন। আমৃত্যু তিনি রাসূলের মালিকানায় ছিলেন। উম্মুল মুনযিরের বাড়ীতেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রায়হানার সাথে বাসর যাপন করেন।১৭ আয-যুহরী বলেন, كانت امة رسول الله فأعتقها وتزوجها، তিনি রাসূলের দাসী ছিলেন। অতঃপর রাসূল তাকে আযাদ করে বিবাহ করেন।১৮
চেহারা ও স্বভাব-চরিত্র :
রায়হানা অতি সুন্দরী মহিলা ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে মুহাম্মাদ ইবনু কা‘ব বলেন, فكانة امرأة جميلة وسيمة ‘আর তিনি ছিলেন রূপসী, কমনীয়া মহিলা’।১৯ ওয়াক্বেদী বলেন, وكانت ذات جمال ‘তিনি সুন্দরী ছিলেন’।২০ তিনি অতীব লাজুক ছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, উম্মুল মুনযিরের বাড়ীতে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমার নিকটে আসলেন। আমাকে ডেকে তাঁর সামনে বসালেন। আমি তখন লজ্জায় জড়সড় হয়ে যাচ্ছিলাম।২১
তালাক ও রাজা‘আত :
রায়হানা (রাঃ) অত্যন্ত আত্মসম্মানবোধ সম্পন্না মহিলা ছিলেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে এক তালাক প্রদান করেন। এটা তার জন্য এত কষ্টদায়ক ছিল যে, তিনি কষ্টে স্বীয় স্থান থেকে সরতে পারলেন না। সেখানে বসেই তিনি অত্যধিক কাঁদতে লাগলেন। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার নিকটে আসলেন এবং তাকে ফিরিয়ে নিলেন (রাজা‘আত করলেন)।২২ যুহরীর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে তালাক দেন, তখন তিনি তার পরিবারের সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, এরপর আমাকে কেউ দেখতে পায়নি। ওয়াক্বেদী বলেন, এটা ঠিক নয়। কেননা তিনি রাসূলের নিকটে থাকতেই ইন্তিকাল করেন।২৩
ইন্তিকাল ও দাফন :
রায়হানা (রাঃ) রাসূলের ওফাতের ১৬ মাস পূর্বে মতান্তরে ১০ম হিজরীতে বিদায় হজ্জ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর ইন্তিকাল করেন। তাঁকে ‘বাক্বীউল গারক্বাদ’ নামক কবরস্থানে দাফন করা হয়।২৪
সমাপনী :
রায়হানা (রাঃ) রাসূলের সান্নিধ্যে আসার পর থেকে আমৃত্যু তাঁর অধীনে ছিলেন। মহানবী (ছাঃ)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ও তাঁর একনিষ্ঠ আনুগত্য ছিল তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও তাকে মুহাববত করতেন। রিসালাতে মুহাম্মাদীর সংস্পর্শে এসে রায়হানা (রাঃ) নিজের জীবনকে রাঙিয়ে ছিলেন ইসলামের কালজয়ী আদর্শের সমুজ্জ্বল আলোকমালায়। এরপর ইসলামের উপর আজীবন তিনি অটল ও অবিচল ছিলেন। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর মত ইসলামের আদর্শে জীবন গড়ার তাওফীক্ব দিন- আমীন!




যয়নাব বিনতু খুযাইমা (রাঃ)


ভূমিকা :
নবীপত্নী উম্মুল মুমিনীন মায়মূনা বিনতুল হারেছ (রাঃ) ছিলেন বহু দুর্লভ গুণের অধিকারিণী এক বিদুষী মহিলা। ছাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন সমস্যায় তিনি অতি বিচক্ষণতার সাথে সমাধান দিতেন। উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আল্লাহভীতি, দানশীলতা, ইবাদত-বন্দেগী, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য প্রভৃতি গুণাবলীর জন্য তিনি ছিলেন সবার প্রিয় পাত্রী। অহি-র নির্মল আলোতে তাঁর জীবন ছিল উদ্ভাসিত। রিসালাতে মুহাম্মাদীর সংস্পর্শে এসে দ্বীন সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞান লাভ করেছিলেন। দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গকারিণী এই বিদুষী মহিলার সংক্ষিপ্ত জীবনাদর্শ আমরা এখানে আলোচনার প্রয়াস পাব।
নাম ও বংশপরিচয় :
তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বাররা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন মায়মূনা। তাঁর পিতার নাম হারেছ। মাতার নাম হিন্দ বিনতু আওফ। মায়মূনা (রাঃ)-এর পূর্ণ বংশধারা হচ্ছে- মায়মূনা বিনতুল হারেছ ইবনু হাযান ইবনে বুজায়র ইবনিল হাযম ইবনে রুওয়ায়বা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হেলাল ইবনে ‘আমির ইবনে ছা‘ছা‘আহ ইবনে মু‘আবিয়াহ ইবনে বকর ইবনে হাওয়াযিন ইবনে মানছূর ইবনে ইতরামা ইবনে খাফসা ইবনে কায়স ইবনে আয়লান ইবনে মুযার। হাকিম নাইসাপুরী বুজায়র ইবনিল হাযম-এর স্থলে বুজায়র ইবনিল হুরম (بجير ابن الهرم) উল্লেখ করেছেন। মায়মূনা (রাঃ)-এর মায়ের বংশধারা হচ্ছে- হিন্দ বিনতু আওফ ইবনে যুহায়র ইবনিল হারিছ ইবনে হাতামা ইবনে জারাশ মতান্তরে জারীশ। তিনি হুমায়র মতান্তরে কিনানা গোত্রের মহিলা ছিলেন।
মায়মূনা (রাঃ) ছিলেন আববাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিবের স্ত্রী উম্মুল ফযল লুবাবা আল-কুবরা বিনতুল হারিছ, ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরার স্ত্রী লুবাবা আছ-ছুগরা বিনতুল হারিছ ও আসমা বিনতুল হারিছের বোন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরকে الأخوات مؤمنات (মুমিনা বোনগণ) বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রখ্যাত ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস ও সাইফুল্লাহ খ্যাত খালিদ বিন ওয়ালীদের খালা ছিলেন।
জন্ম ও শৈশব : 
মায়মূনা (রাঃ)-এর জন্ম ও শৈশব সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ কিছু বলেননি। ফলে তাঁর জন্ম ও শৈশব সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তবে ৭ম হিজরী সনে ৩৭ বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।১০ সে হিসাবে তাঁর জন্ম ৫৯২ হিজরীতে হয়েছিল বলে ধরে নেয়া যায়।
প্রথম বিবাহ : 
জাহেলী যুগে তাঁর প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল মাসঊদ ইবনু আমর ইবনে ওমাইর আছ-ছাক্বাফীর সাথে। কোন কারণে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটলে আবু রুহম ইবনু আব্দুল ওয্যা ইবনে আবী কায়েস-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তিনি বানু মালেক ইবনে হাসাল ইবনে আমের ইবনে লুই-এর লোক ছিলেন। ৭ম হিজরীতে তিনি মারা যান।১১
রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে বিবাহ :
খায়বার যুদ্ধের পরে ৭ম হিজরীর শাওয়াল মতান্তরে যুলক্বাদাহ মাসে কাযা ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমনের পথে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-কে বিবাহ করেন।১২ এ সময় মায়মূনা (রাঃ)-এর বয়স হয়েছিল ২৬ বছর১৩ মতান্তরে ৩৭ বছর।১৪ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কর্তৃক মায়মূনা (রাঃ)-কে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার ব্যাপারে কয়েকটি মতামত পাওয়া যায়। ১. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কাযা ওমরা আদায়ের বছর মক্কার উদ্দেশ্য রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে আওস ইবনু খাওলী ও আবু রাফে‘কে আববাস (রাঃ)-এর নিকটে পাঠান। কিন্তু তারা পথ হারিয়ে ফেলে ‘রাবেগ’ উপত্যকায় কয়েকদিন অবস্থান করেন। অবশেষে ‘কুদাইদ’ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে পেয়ে তাঁর কাফেলার সাথে যুক্ত হয়ে মক্কায় গমন করেন। রাসূল মক্কায় পৌঁছে আববাস (রাঃ)-এর নিকট দূত পাঠান। দূত উক্ত বিষয়টি আববাসের নিকটে উল্লেখ করে। অন্য বর্ণনায় আছে, মায়মূনা তার বিষয়টি রাসূলের নিকটে পেশ করে। তখন রাসূল (ছাঃ) আববাসের বাড়ীতে গিয়ে মায়মূনাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে আববাস (রাঃ) তাকে রাসূলের সাথে বিবাহ দেন।১৫
(২) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জা‘ফর ইবনু আবু তালেবের মাধ্যমে মায়মূনার নিকটে প্রস্তাব পাঠালে তিনি বিষয়টি আববাস (রাঃ)-এর নিকটে উপস্থাপন করেন। তখন আববাস (রাঃ) তাকে রাসূলের সাথে বিবাহ দেন।১৬
(৩) মায়মূনা (রাঃ) রাসূলের প্রতি তার মনের আকর্ষণের কথা স্বীয় সহোদর বোন উম্মুল ফযল-এর নিকট ব্যক্ত করেন। তখন উম্মুল ফযল তার স্বামী আববাস (রাঃ)-এর সাথে এ বিষয়ে আলাপ করেন। আববাস (রাঃ) একথা রাসূলের নিকটে পেশ করেন। এমনকি তিনি রাসূলের নিকট মায়মূনাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে মায়মূনা (রাঃ)-কে বিবাহ করেন।১৭
(৪) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আবু রাফে‘ ও অন্য একজন আনছার লোককে মায়মূনার নিকটে পাঠান। তারা মায়মূনাকে রাসূলের সাথে বিবাহ দেন তিনি মদীনা থেকে (মক্কার উদ্দেশ্যে) বের হওয়ার পূর্বে।১৮
(৫) বাররা বিনতুল হারিছ ওরফে মায়মূনা (রাঃ) নিজেকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জন্য দান করেছিলেন। এ সম্পর্কে  আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন, وَامْرَأَةً مُّؤْمِنَةً إِنْ وَهَبَتْ نَفْسَهَا لِلنَّبِيِّ إِنْ أَرَادَ النَّبِيُّ أَنْ يَّسْتَنْكِحَهَا خَالِصَةً لَّكَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِيْنَ- ‘কোন মুমিনা নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পণ করে, নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য, অন্য কোন মুমিনের জন্য নয়’ (আহযাব ৫০)১৯
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-কে যখন বিবাহের প্রস্তাব পাঠান তখন মায়মূনা (রাঃ) একটি উটে চড়েছিলেন। রাসূলের প্রস্তাবে তিনি খুশি হয়ে বলেন, اَلْجَمَلُ وَمَا عَلَيْهِ لِرَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم- ‘এ উট এবং এর উপর যা আছে সব রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জন্য’।২০ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-কে ৪০০ দিরহাম মতান্তরে ৫০০ দিরহাম মহর দিয়েছিলেন।২১ তিনি ছিলেন নবী করীম (ছাঃ)-এর সর্বশেষ বিবাহিতা স্ত্রী।২২
বাসর যাপন : 
৭ম হিজরীর শাওয়াল মাসে কাযা ওমরা সম্পন্নের পর মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পথে ‘তানঈম’-এর নিকটবর্তী মক্কা থেকে ১০ বা ১২ মাইল দূরে ‘সারিফ’ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-এর সাথে বাসর যাপন করেন।২৩
নবী করীম (ছাঃ) মক্কায় তিন দিন অবস্থান করেন। তৃতীয় দিনে হুয়াইতাব ইবনু আব্দুল ওয্যা আরো কয়েক জন কুরাইশ লোক নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলে, তোমার (মক্কায় অবস্থানের) সময় শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং তুমি আমাদের এখান থেকে চলে যাও। তিনি বললেন, ‘তোমাদের কি হ’ল, তোমরা আমাকে পরিত্যাগ করেছ, আর আমি তোমাদের সামনে বাসরের আয়োজন করেছি এবং তোমাদের জন্য খাদ্য প্রস্ত্তত করেছি! ইতিমধ্যে তোমরা হাযিরও হয়েছ’। তারা বলল, তোমার খাদ্যের আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। তুমি আমাদের এখান থেকে চলে যাও। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-কে নিয়ে বের হ’লেন এবং ‘সারিফ’ নামক স্থানে এসে যাত্রা বিরতি করেন। এখানেই তিনি বাসর যাপন করেন।২৪
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কি মুহরিম অবস্থায় মায়মূনা (রাঃ)-কে বিবাহ করেছিলেন? 
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-কে হালাল অবস্থায় না মুহরিম অবস্থায় বিবাহ করেছিলেন এ সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থে দু’ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। মুহাম্মাদ ইবনু সা‘দ ‘আত-তাবাক্বাতুল কুবরা’ গ্রন্থে ১১টি বর্ণনা পেশ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-কে হালাল অবস্থায় বিবাহ করেছেন। পক্ষান্তরে তিনি বিভিন্ন সূত্রে ১৭টি বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন যে, তাঁদের বিবাহ মুহরিম অবস্থায় সম্পন্ন হয়েছিল।২৫ অনুরূপভাবে হাকিম নাইসাপুরী (রহঃ)ও পক্ষে-বিপক্ষে কয়েকটি বর্ণনা পেশ করেছেন।২৬ হাফেয শামসুদ্দীন যাহাবী পক্ষে-বিপক্ষে কতিপয় বর্ণনা উল্লেখ করে মুহরিম অবস্থায় বিবাহ সংক্রান্ত বর্ণনাকে মুতাওয়াতির বলেছেন।২৭ উক্ত বর্ণনাগুলোর মধ্যে দু’একটি নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল- 
عَنْ يَزِيْدَ بْنِ الْأَصَمِّ حَدَّثَتْنِيْ مَيْمُوْنَةُ بِنْتُ الْحَارِثِ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَزَوَّجَهَا وَهُوَ حَلاَلٌ قَالَ وَكَانَتْ خَالَتِيْ وَخَالَةَ ابْنِ عَبَّاسٍ-
ইয়াযীদ ইবনুল আছাম হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, মায়মূনা বিনতুল হারিছ (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে হালাল অবস্থায় বিবাহ করেছেন। রাবী বলেন, তিনি আমার ও ইবনু আববাসের খালা ছিলেন।২৮ অন্য বর্ণনায় আছে, 
عَنْ يَزِيْدَ بْنِ الْأَصَمِّ ابْنِ أَخِيْ مَيْمُوْنَةَ عَنْ مَيْمُوْنَةَ قَالَتْ تَزَوَّجَنِيْ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ حَلاَلاَنِ بِسَرِفَ-
ইয়াযীদ ইবনুল আছাম (মায়মূনার ভাগ্না) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, মায়মূনা (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ ‘সারিফ’ নামক স্থানে আমাকে বিবাহ করেন এবং আমরা হালাল অবস্থায় ছিলাম’।২৯
অন্য হাদীছে এসেছে, 
عَنْ عِكْرِمَةَ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَزَوَّجَ مَيْمُوْنَةَ وَهُوَ مُحْرِمٌ-
ইকরিমা ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-কে মুহরিম অবস্থায় বিবাহ করেছেন।৩০ আবুশ শা‘ছা থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।৩১
সমন্বয় : 
উপরোক্ত দুই ধরনের বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে মনীষীগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যথা- ১. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুহরিম অবস্থায় বিবাহ করেছেন এবং হালাল অবস্থায় বাসর যাপন করেছেন। ২. ঐ সময় পর্যন্ত মুহরিম অবস্থায় বিবাহ করা হারাম হয়নি।৩২ ৩. কারো মতে, তিনি তখন হারামের সীমানার মধ্যে ছিলেন। এজন্য তাকে মুহরিম বলা হয়েছে। কিন্তু মূলতঃ তিনি হালাল ছিলেন। ৪. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হালাল অবস্থায় বিবাহ করেছিলেন ও বাসর যাপন করেছিলেন এবং বিবাহের কথা প্রকাশ করেছিলেন মুহরিম অবস্থায়।৩৩ যেরূপ ইমাম মুহিউস সুন্নাহ বাগাভী (রহঃ) বলেন, وَالْاَكْثَرُوْنَ عَلٰى أَنَّهُ تَزَوَّجَهَا حَلاَلاً وَظَهَرَ أَمْرَ تَزْوِيْجِهَا وَهُوَ مُحْرِمٌ ثُمَّ بَنَى بِهَا وَهُوَ حَلاَلٌ بِسَرِفَ فِىْ طَرِيْقِ مَكَّةَ. ‘অধিকাংশ বিদ্বান এ মতে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হালাল অবস্থায় তাকে (মায়মূনাকে) বিবাহ করেছেন এবং বিবাহের বিষয়টি মুহরিম অবস্থায় প্রকাশ করেছেন। আর মক্কার পথে ‘সারিফ’ নামক স্থানে তার সাথে বাসর যাপন করেন হালাল অবস্থায়।৩৪ 
বিবাহের কারণ : 
তৎকালীন আরব সমাজে বিভিন্ন গোত্রের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। এ সম্পর্কের কারণেই ছোট ছোট গোত্রগুলো বিশালাকার ধারণ করে। এই বৈবাহিক সম্পর্ক ও পরিচিতির সূত্র ধরে মরুর পথে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে বহু দূর দূরান্ত থেকে নিজ নিজ গন্তব্যে যাতায়াত করত। এ সম্পর্কের ফলে নির্ভয়ে তারা এক শহর থেকে অন্য শহরে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সফর করত। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপ্লব সাধিত হয়। অনুরূপভাবে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে ইসলামী দাওয়াত সুদীর্ঘ কাল থেকে ব্যাপকতা লাভ করে আসছে। সেই দিক থেকে এ বিবাহ ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কর্তৃক মায়মূনা (রাঃ)-কে বিবাহ করার উল্লেখযোগ্য কতিপয় কারণ হচ্ছে- (১) আববাস (রাঃ)-এর পরিবার-পরিজনের সাথে সুসম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করা। কেননা তারা এ বিবাহ বন্ধনকে মনে-প্রাণে কামনা করছিলেন। (২) মায়মূনা (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। এতে তিনি বিভিন্ন সমস্যায় পতিত হন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার মানসিক অবস্থা ঠিক করার জন্য এবং বিভিন্ন সমস্যা থেকে হেফাযত করার জন্য তাকে বিবাহ করেন। (৩) মক্কার মুশরিকদের অন্তরকে প্রভাবিত করার জন্য, বিশেষতঃ মায়মূনা (রাঃ)-এর গোত্র বনু হেলালের উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য রাসূল (ছাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। কেননা আরবরা এ বৈবাহিক সম্পর্ককে মহৎ মানবিকতা, আশ্রয় দান ও সহায়তা হিসাবে গণ্য করত। এ বিবাহের ফলে দেখা যায়, ঐ গোত্রের লোক দলে দলে ইসলাম কবুল করছে।৩৫
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য : 
উম্মুল মুমিনীন মায়মূনা (রাঃ) বহু দুর্লভ গুণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারিণী ছিলেন। নিম্নে তাঁর কতিপয় উত্তম গুণাবলী উপস্থাপন করা হ’ল।-
ক. তাকওয়া বা আল্লাহভীতি : বিশ্ব জাহানের মালিক মহান আল্লাহকে তিনি সবচেয়ে বেশী ভয় করতেন। জীবনের প্রতিটি কাজে তা প্রতিফলিত হ’ত এবং তাঁর সাথে যারা ওঠা-বসা করতেন তারা তাঁর এ বৈশিষ্ট্যকে সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারতেন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা ছিদ্দীকা (রাঃ) মায়মূনা সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তাতে তাঁর এ অনুপম গুণ প্রতিভাত হয়েছে। তিনি বলেন, أَمَا اَنَّهَا كَانَتْ مِنْ أَتْقَانَا لِلَّهِ، وَأَوْصَلَنَا لِلرِّحْمِ، ‘জেনে রেখো, নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহভীরু এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারীণী।৩৬
খ. দানশীলতা : মায়মূনা (রাঃ) অতীব দানশীলা মহিলা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার এগুণটি পসন্দ করতেন। মায়মূনা (রাঃ)-এর একজন দাসী ছিল। তিনি তাকে আল্লাহ্র নামে আযাদ করে দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট একথা বর্ণনা করলে তিনি বললেন, তুমি যদি ঐ অর্থ তোমার ভাই ইবনুল হারিছকে দিতে তবে অধিক ছওয়াব পেতে।৩৭ 
(গ) ইবাদত-বন্দেগী : মায়মূনা (রাঃ) অতি ইবাদতগুযার মহিলা ছিলেন। তিনি ছালাত আদায়ের সময়ে তনুত্রাণ পরিধান করে তথা আপাদমস্তক বস্ত্রাবৃত করে ছালাত আদায় করতেন।৩৮ তিনি হজ্জ করতে গিয়ে ইহরাম অবস্থায় মাথা কামিয়ে ফেলেন। এ অবস্থায়ই তিনি ইন্তিকাল করেন। তাঁর মাথায় তখন নতুন চুলে ভরা ছিল।৩৯ মায়মূনা (রাঃ)-এর সম্ভবতঃ জানা ছিল না যে, হজ্জ বা ওমরায় মহিলাদের মাথা কামানো নিষেধ, বরং চুল ছোট করতে হয়। কেননা হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَلِيٍّ رضي الله عنه قَالَ نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ تَحْلِقَ الْمَرْأةُ رَأسَهَا- 
আলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মহিলাদের মাথা কামাতে নিষেধ করেছেন।৪০ অন্য বর্ণনায় এসেছে, لَيْسَ عَلَى النِّسَاءِ الْحَلْقُ إِنَّمَا عَلَى النِّسَاءِ التَّقْصِيْرُ 
‘মহিলাদের উপর মাথা কামানো নেই, তাদের জন্য আবশ্যক চুল খাটো করা’।৪১
(ঘ) দ্বীনের বিধানের প্রতি কঠোরতা : আল্লাহ ও রাসূলের আদেশ-নিষেধের প্রতি তিনি খুবই মনোযোগী ছিলেন। আল্লাহ্র হুকুমের বিপরীত কোন কাজ হ’তে দেখলে, তিনি তা বরদাশত করতেন না। একদা তাঁর এক নিকটাত্মীয় তাঁর গৃহে আসল। তখন লোকটির মুখ থেকে শরাবের গন্ধ আসছিল। তিনি বললেন, যদি তুমি মুসলমানদের নিকটে যাও, তাহ’লে তারা তোমাকে বেত্রাঘাত করবে কিংবা তোমাকে পবিত্র করে ছাড়বে। তুমি আমার নিকটে আর কখনো আসবে না।৪২
(ঙ) বুদ্ধিমত্তা : তাঁর বর্ণিত অনেক হাদীছ থেকে তাঁর ফিক্বহী সূক্ষ্মতার পরিচয় মেলে। উদাহরণ স্বরূপ একটি হাদীছ উল্লেখ করা হ’ল- একবার ইবনু আববাস (রাঃ) মলিন মুখে বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে বৎস! তোমার কি হয়েছে? তিনি বললেন, উম্মু আম্মার (তাঁর স্ত্রী) আমার চুলে চিরুণী করে দিত। কিন্তু সে মাসিক স্রাবে রয়েছে। তিনি বললেন, কী চমৎকার! আমার ঐ রকম দিনে নবী করীম (ছাঃ) আমার কোলে মাথা রেখে শয়ন করতেন ও কুরআন মাজীদ পড়তেন। আমি ঐ অবস্থায় মসজিদে বিছানা (চাটাই) রেখে আসতাম। বৎস! হাতেও কি এসব হয় কখনও?৪৩
ইলমী খিদমত : 
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ইন্তিকালের পরও দীর্ঘ দিন মায়মূনা (রাঃ) জীবিত ছিলেন। মহানবী (ছাঃ)-এর অনেক হাদীছই উম্মুল মুমিনীনদের মাধ্যমে পরবর্তীদের কাছে সম্প্রসারিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মায়মূনা (রাঃ)-এর অবদান অনস্বীকার্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে তিনি হাদীছ শিক্ষা লাভ করেছেন এবং তা বর্ণনাও করেছেন। ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, মায়মূনা (রাঃ) হ’তে ৭৬টি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।৪৪ হাফেয যাহাবী বলেন, তাঁর থেকে মোট ১৩টি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারী ও মুসলিম যৌথভাবে ৭টি, ইমাম বুখারী এককভাবে ১টি এবং ইমাম মুসলিম (রহঃ) এককভাবে ৫টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন।৪৫তবে আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাঁর থেকে বর্ণিত পুনরুক্তিসহ ছহীহ বুখারীতে ২১টি, ছহীহ মুসলিমে ১৮টি, জামি আত-তিরমিযীতে ৪টি, সুনান আবু দাঊদে ১৫টি, সুনান নাসাঈতে ২৬টি এবং সুনান ইবনু মাজাহতে ১১টি হাদীছ সংকলিত হয়েছে। 
তাঁর থেকে যারা হাদীছ বর্ণনা করেছেন : 
তাঁর থেকে যারা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তন্মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হ’লেন- ইবনু আববাস (মৃঃ ৮৬/৭০৫), আব্দুল্লাহ ইবনু শাদ্দাদ ইবনুল হাদ (মৃঃ ৮১/৭০০), আব্দুর রহমান ইবনুস সায়েব আল-হিলালী, ইয়াযীদ ইবনু আছাম, (এরা সকলেই তাঁর ভাগ্নে), তাঁর পূর্ব স্বামীর ছেলে ওবায়দুল্লাহ আল-খাওলানী, নদবা (দাসী), আতা ইবনু ইয়াসার, সুলায়মান ইবনু ইয়াসার (মৃঃ ১০০/৭১৮), ইবরাহীম ইবনু আব্দুললাহ (মৃঃ ৪১/৬৬১), কুরায়ব (ইবনু আববাসের দাস) (মৃঃ ৯৮/৭১৬), ওবায়দা ইবনু সাববাক, ওবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনে উতবা (মৃঃ ৯৪/৭১২), আলিয়া বিনতু সাবী (রাঃ) প্রমুখ।৪৬
খাদ্যশস্য দান : 
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খায়বারের উৎপাদিত ফসল থেকে মায়মূনা (রাঃ)-কে ৮০ ওয়াসাক্ব খেজুর এবং ২০ ওয়াসাক্ব যব বা গম প্রদান করেন।৪৭
ইন্তিকাল :
মায়মূনা (রাঃ) ৫১হিঃ/৬৭১খৃঃ ‘সারিফ’ নামক স্থানে ইন্তিকাল করেন। সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।৪৮ মুহাম্মাদ ইবনু ওমর আল-ওয়াকেদী বলেন, তিনি ইয়াযীদ ইবনু মু‘আবিয়ার খিলাফতকালে ৬১ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।৪৯ হাফেয ইবনু কাছীর বলেন, তিনি ৬৩ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।৫০ মায়মূনা (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে সর্বশেষে ইন্তিকাল করেন।৫১ অথচ ইয়াযীদ ইবনুল আছামের বর্ণনা হ’তে জানা যায় যে, আয়েশা (রাঃ) মায়মূনা (রাঃ)-এর পরেও জীবিত ছিলেন। আর আয়েশা (রাঃ) সর্বসম্মতিক্রমে ৬০ হিজরীর পূর্বে ইন্তিকাল করেন। মায়মূনা (রাঃ)-এর মৃত্যু সন নিয়ে আরো কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন ৪৯ হিঃ, ৬৩ হিঃ ও ৬৬ হিঃ। তবে এ বর্ণনাগুলো সঠিক নয়। বরং প্রথম বর্ণনাটিই অধিক বিশুদ্ধ।৫২ মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর মতান্তরে ৮১ বছর।৫৩
জানাযা ও দাফন : 
তিনি ‘সারিফে’ মৃত্যুবরণ করেন। কারো মতে, তিনি মক্কায় মৃত্যুবরণ করেন এবং সারিফে নীত হন।৫৪ যখন তাঁর লাশ কাঁধে উঠানো হয়, তখন ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর স্ত্রী। সুতরাং বেশী নাড়াচাড়া করো না। আদবের সাথে আস্তে নিয়ে চলো।৫৫ ইবনু আববাস (রাঃ) তাঁর জানাযা পড়ান। ‘সারিফ’ নামক স্থানে যেখানে তাঁর বাসর উদ্যাপিত হয়েছিল, সেখানে তাঁকে দাফন করা হয়। ইবনু আববাস (রাঃ), ইয়াযীদ ইবনুল আছাম, আব্দুল্লাহ ইবনু শাদ্দাদ ইবনুল হাদী এবং ওবায়দুল্লাহ আল-খাওলানী (রাঃ) তাঁকে কবরে নামান।৫৬ ইয়াযীদ ইবনু আছাম বলেন, যখন আমরা মায়মূনা (রাঃ)-এর মৃতদেহ কবরে রাখলাম, তখন তাঁর মাথাটা একদিকে ঝুকে গেল। তখন আমি চাদর খুলে তাঁর মাথার নীচে দিলে ইবনু আববাস তা উঠিয়ে ফেলেন এবং তাঁর মাথার নীচে কিছু নুড়ি পাথর দিয়ে দেন।৫৭
সমাপনী :
উম্মুল মুমিনীন মায়মূনা (রাঃ) ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশীয় ও অভিজাত পরিবারের এক বিদুষী মহিলা এবং বহু অনুপম গুণের অধিকারিণী। তিনি চরিত্র-মাধুর্যে যেমন অনুসরণীয় ছিলেন, তেমনি ইলমী খিদমতে তাঁর জীবনের অনেক সময় ব্যয় করেছেন। নবীপত্নী এই মহিয়সী ছাহাবীর জীবনী থেকে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে। তাঁর ঘটনাবহুল জীবনী থেকে ইবরাত হাছিল করতে পারলে আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন জীবন হবে সুন্দর ও সুখময়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণের তাওফীক্ব দান করুন-আমী 





মানব সৃষ্টির আদি থেকেই এমন কিছু লোক ছিলেন যারা জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করে, সকল প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে আল্লাহ প্রদত্ত অহি-র বিধানকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে মেনে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। প্রয়োজনে নিজের অমূল্য জীবন কুরবানী করেছেন। যেমন প্রতাপান্বিত কাফির সম্রাট ফেরাঊনের অধীনে থেকেও তার স্ত্রী আসিয়া ছিলেন ইসলামের শাশ্বত আদর্শে উজ্জীবিত। এ আদর্শের জন্য তিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুনিয়াবী জৌলুস ও শান-শওকত তাকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। অতীব নিষ্কলুষ ও নির্মল চরিত্রের অধিকারী অতি সুদর্শনা উম্মু হাবীবা (রাঃ)ও ছিলেন ইসলামী আদর্শের জন্য নিবেদিত প্রাণ এক মহিয়সী মহিলা। মক্কার কুরাইশ বংশের তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা আবু সুফিয়ানের বিত্ত-বৈভব ও সামাজিক উচ্চ মর্যাদা, প্রতিপত্তি উম্মু হাবীবাকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারেনি। বরং ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে দ্বীন-ঈমান রক্ষার খাতিরে দেশ ত্যাগের সীমাহীন কষ্ট অকাতরে সহ্য করেন তিনি। বিদেশ-বিভূঁইয়ে গিয়ে জীবনের সর্বাধিক প্রিয় মানুষ, জীবনের একমাত্র অবলম্বন প্রথম স্বামী দ্বীন ত্যাগ করে খৃষ্টান হয়ে গেলেও উম্মু হাবীবা (রাঃ) ছিলেন ইসলামের উপর অটল ও অবিচল। জীবনের এই কঠিনতম মুহূর্তেও তিনি আদর্শচ্যুত হননি, বিচ্যুত হননি ইসলামের আলোকময় পথ থেকে। তাঁকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি পার্থিব কোন আকর্ষণ, কোন মায়াজাল। এই মহিয়সী রমণী উম্মুল মুমিনীন উম্মু হাবীবা (রাঃ)-এর জীবনী আমরা এখানে আলোচনার প্রয়াস পাব।
নাম ও বংশ পরিচয় :
তাঁর প্রকৃত নাম রামলাহ মতান্তরে হিন্দ। তবে প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মতে তাঁর নাম রামলাহ। কুনিয়াত বা উপনাম উম্মু হাবীবা। পূর্ণ বংশ পরিচিতি হচ্ছে রামলাহ বিনতু আবী সুফিয়ান ছাখার ইবনে হারব ইবনে উমাইয়াহ ইবনে আব্দে শাম্স ইবনে আব্দে মানাফ ইবনে কুছাই। তাঁর মাতার নাম ছাফিয়াহ বিনতু আবীল ‘আছ ইবনে উমাইয়াহ ইবনে আব্দে শাম্স। যিনি ওছমান ইবনু আফফান (রাঃ)-এর ফুফু ছিলেন। কারো মতে উম্মু হাবীবা (রাঃ)-এর মাতার নাম আমিনা বিনতু আব্দিল উযযা ইবনে হিরবান ইবনে আওফ ইবনে ওবায়দ ইবনে ‘আবীজ ইবনে আদী ইবনে কা‘ব।
জন্ম ও শৈশব : 
উম্মু হাবীবা (রাঃ) নবুওয়াতের ১৭ বছর পূর্বে মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবকাল সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না।
বিবাহ ও ইসলাম গ্রহণ :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ফুফাত ভাই ওবায়দুল্লাহ ইবনু জাহাশ এর সাথে উম্মু হাবীবার প্রথম বিবাহ হয়। ওবায়দুল্লাহ ইবনু জাহাশ ছিলেন হারব ইবনু উমাইয়ার মিত্র। বিবাহের পরে ইসলামের প্রাথমিক দিকে উম্মু হাবীবা ও ওবায়দুল্লাহ দ্বীনের দাওয়াত পেয়ে একই সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশের ঔরসে ও রামলার গর্ভে মক্কায় হাবীবা নামক এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে । এ মেয়ের নামানুসারে রামলার উপনাম হয় উম্মু হাবীবাহ।
হিজরত ও প্রথম স্বামীর ইন্তিকাল :
মক্কার সার যমীনে মুসলমানদের বসবাস কঠিন হয়ে পড়লে উম্মু হাবীবা ও তাঁর স্বামী ওবায়দুল্লাহ অন্যান্য মুসলমানদের সাথে জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে সুদূর হাবাশায় (আবিসিনিয়ায়) বর্তমান ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন। কিন্তু এ হিজরত উম্মু হাবীবা (রাঃ)-এর জন্য মোটেই সুখকর ছিল না। দ্বীনের  খাতিরে স্বজন ও জন্মভূমি ছেড়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে তাঁর জীবনে দুর্দশা নেমে আসে। হিজরত তাঁর জন্য বয়ে নিয়ে আসল দুঃখ-বেদনার অথৈ পাথার। হিজরতের ফলে আবু জাহলের নির্মম অত্যাচার থেকে মুক্তি পেলেও দাম্পত্য জীবনে নেমে এল এক অসহনীয় বিপর্যয়। দুর্বল চিত্তের লোক স্বামী ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশ দ্বীনের জন্য এত তাকলীফ স্বীকার করতে অপ্রস্ত্তত হয়ে খৃষ্টান ধর্মে ফিরে যেতে উদ্ধত হন। যেজন জীবনের সবচেয়ে আপন, সার্বক্ষণিক সঙ্গী সে স্বামী দ্বীন-ধর্ম ত্যাগ করে পূর্বের ধর্মে ফিরে যায়। উম্মু হাবীবা (রাঃ) বলেন, একদা স্বপ্নে আমি আমার স্বামী ওবায়দুল্লাহকে বিকৃত চেহারায় বিভৎস অবস্থায় দেখে ভয় পেয়ে গেলাম এবং বললাম, আল্লাহ্র কসম তার অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেছে। সকালে সে আমাকে বলল, আমি বিভিন্ন ধর্মের প্রতি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু খৃষ্টান ধর্মের চেয়ে উত্তম কোন ধর্ম পাইনি। আমি ঐ ধর্মে ছিলাম। অতঃপর মুহাম্মাদের ধর্মে প্রবেশ করি। আমি পুনরায় পূর্বের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করছি। উম্মু হাবীবা (রাঃ) তখন তার স্বপ্নের কথা স্বামীকে বললেন। তিনি স্বামীকে বুঝানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন। কিন্তু সে শুনল না। মদ্যপানের দিকে ঝুঁকে পড়ল। আকণ্ঠ নিমজ্জিত করে মদ্যপান করতে লাগল।
ওবায়দুল্লাহ ধর্মান্তরিত হওয়ার পর স্ত্রী উম্মু হাবীবাকেও তার পদাঙ্ক অনুসরণের জন্য চাপ দিতে থাকে। কিন্তু উম্মু হাবীবার পর্বতসম ঈমানের কাছে তার সকল কোশেশ ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়। আল্লাহ্র পথে দ্বীনে হক্বের উপরে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকেন। স্ত্রীর কাছে নিজের আদর্শিক ব্যর্থতা ও পরাজয়ের আঘাত ওবায়দুল্লাহ্র মনে বিশেষভাবে নাড়া দিচ্ছিল। সে কল্পনাও করেনি যে বিদেশ বিভূঁইয়ে একজন সাধারণ মহিলা স্বামীর আদেশ উপেক্ষা করতে সাহস করবে। কিন্তু আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য পাগলপরা ও দ্বীনে হক্বের জন্য নিবেদিতা উম্মু হাবীবা (রাঃ) সে সাহস প্রদর্শন করলেন। স্বামীর জন্য ইসলামের শাশ্বত আদর্শ ত্যাগ করতে রাযী হ’লেন না। ওবায়দুল্লাহ এর প্রতিশোধ হিসাবে স্ত্রীর নিকট থেকে দূরে সরে গেলেন। প্রিয়জনের বিচ্ছেদ যন্ত্রণা উম্মু হাবীবা (রাঃ) অনুভব করলেও মুষড়ে পড়লেন না। আল্লাহ্র প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও দ্বীনে হক্বের প্রতি অবিচলতা, ইসলামের শাশ্বত আদর্শের জন্য নিবেদিতা উম্মু হাবীবা (রাঃ) তাই স্বামীর প্রেম-ভালবাসা উপেক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ ভালবাসা তাকে ইসলামের সার্বজনীন আদর্শ থেকে, সত্যপথ থেকে একটুও সরাতে পারেনি, টলাতে পারেনি। উম্মু হাবীবা (রাঃ) কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করলেন যে, প্রয়োজন বোধে দ্বীনে হক্বের জন্য স্বামীর ভালবাসা ও স্বজনের সুতীব্র আকর্ষণও কুরবানী দিতে হয়।
উল্লেখ্য, উম্মু হাবীবার ১ম স্বামী ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশ আবিসিনিয়ায় খৃষ্টান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।১০
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে বিবাহ :
উম্মু হাবীবা (রাঃ) ৬ষ্ঠ মতান্তরে ৭ম হিজরীতে আবিসিনিয়ায় অবস্থান কালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।১১ উম্মু হাবীবা (রাঃ) বলেন, ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশের মৃত্যুর পর একদা আমি স্বপ্নে দেখলাম, জনৈক আগন্তুক এসে আমাকে বলছে, হে উম্মুল মুমিনীন! এতে আমি শঙ্কিত হ’লাম। আর আমি মনে মনে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বিবাহ করবেন। অতঃপর আমার ইদ্দতকাল সমাপ্ত হওয়ার অব্যবহিত পরেই আমি দেখলাম, বাদশাহ নাজ্জাশীর দূত আমার দরজায় দন্ডায়মান। সে আমার গৃহে প্রবেশের জন্য আমার অনুমতি চাচ্ছে। দূত হিসাবে আবরাহা নাম্নী এক দাসী স্বীয় পরিচ্ছদে আমার নিকটে এসেছে। সে আমাকে বলল, বাদশাহ আমাকে একথা বলে পাঠিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আপনাকে বিবাহ করার জন্য পত্র পাঠিয়েছেন। অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমর ইবনু উমাইয়াকে নাজ্জাশীর নিকট পাঠান উম্মু হাবীবাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে।১২ তখন আমি বললাম, আল্লাহ তোমাকে উত্তম জিনিস দ্বারা সুসংবাদ দান করুন। আবরাহা বলল, বাদশাহ আপনাকে বিবাহের অলী (অভিভাবক) নিযুক্ত করে পাঠাতে বলেছেন। তখন আমি খালিদ ইবনু সাঈদ ইবনিল আছকে অলী নিযুক্ত করে পাঠালাম। এই সুসংবাদ প্রদানের জন্য তিনি বাদী আবরাহাকে রৌপ্যের দু’টি চুরি এবং একটি আংটি উপহার দেন।১৩ উল্লেখ্য, খালিদ ইবনু সাঈদ ছিলেন উম্মু হাবীবার পিতা আবু সুফিয়ানের চাচাত ভাই।১৪
সন্ধ্যায় বাদশাহ নাজ্জাশী জা‘ফর ইবনু আবী তালেব ও অন্যান্য মুসলমানদের ডেকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে উম্মু হাবীবা (রাঃ)-এর বিবাহ পড়িয়ে দেন। তিনি রাসূলে করীম (ছাঃ)-এর পক্ষ থেকে উম্মু হাবীবাকে ৪০০ দীনার মতান্তরে ৪ হাযার দেরহাম মহর প্রদান করেন। তিনি উপস্থিত সবাইকে খানার (ওলীমার) দাওয়াত দেন এবং খাদ্য খাওয়ান।১৫
উম্মু হাবীবার নিকট মহরের সম্পদ আসলে তা থেকে ৫০ মিছকাল তিনি আবরাহা নাম্নী বাদীকে প্রদান করেন, যে তাঁকে বিবাহের সুসংবাদ প্রদান করেছিল। বাদী তা নিতে অস্বীকার করলে উম্মু হাবীবা (রাঃ) বলেন, আমার কাছে  কোন সম্পদ নেই, আমাকে যা দেওয়া হয়েছে, তা থেকে তুমি এটা গ্রহণ করো। তখন আবরাহা বলল, বাদশাহ এ থেকে কোন কিছু গ্রহণ করতে কঠোরভাবে বারণ করেছেন। আর আমি তাঁর অন্ন-বস্ত্রে জীবন যাপন করছি। তাছাড়া আমি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দ্বীনের অনুসরণ করছি এবং আমি আল্লাহ্র প্রতি আত্মসমর্পণ করেছি। সুতরাং আপনার নিকট আমার অনুরোধ আপনি রাসূলের নিকট পৌঁছে আমার সালাম দিবেন এবং তাঁকে অবহিত করবেন যে, আমি তাঁর দ্বীনের অনুসরণ করছি। এ কথা বলে সে ঐ মাল ফেরৎ দিল।১৬ অতঃপর সে আমার প্রতি আরো বন্ধুভাবাপন্ন হ’ল। সে-ই আমাকে সফরের জন্য প্রস্ত্তত করে দিল। এরপর সে যখনই আমার নিকট আসতো, তখন বলতো, আপনার নিকট আমার প্রয়োজন ভুলে যাবেন না। উম্মু হাবীবা বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে এসে আবরাহার কথা বললে তিনি মুচকি হাসলেন এবং সালামের উত্তরে বললেন, ‘ওয়া আলাইহাস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’।১৭ বাদশাহ নাজ্জাশী বিবাহের পর উম্মু হাবীবাকে প্রস্ত্তত করার জন্য স্বীয় স্ত্রীদের নির্দেশ দেন। তারা কনের প্রয়োজনীয় সাজ-সজ্জা, সুগন্ধি ও অনেক মাখন নিয়ে আসে। উম্মু হাবীবা সেসব রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জন্য মদীনায় নিয়ে আসেন।১৮
বাদশাহ নাজ্জাশী নিজেই উম্মু হাবীবা (রাঃ)-কে মদীনায় প্রেরণের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দেন এবং তাঁকে শুরাহবিল ইবনু হাসনার সাথে প্রেরণ করেন।১৯ উম্মু হাবীবা (রাঃ) যখন মদীনায় আসেন তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩০ বছরের কিছু বেশী।২০
তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চাচাত বোন। রাসূলের স্ত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন রাসূলের বংশের অতি নিকটবর্তী। রাসূল (ছাঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্য উম্মু হাবীবা (রাঃ)-কে সর্বাধিক মহর প্রদান করা হয়েছে। আর তাঁকে রাসূল বিবাহ করেছেন যখন তিনি রাসূলের নিকট থেকে অনেক দূরে ছিলেন।২১
আবিসিনিয়ায় উম্মু হাবীবা (রাঃ)-এর স্বামী ধর্মান্তরিত হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করলে তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। তাঁর পিতা আবূ সুফিয়ান মক্কার প্রভাবশালী কুরাইশ নেতা এবং সে তখন কাফির। সে ছিল চরম ইসলাম বিদ্বেষী এবং ইসলাম ও মুসলমানদের কঠিনতম শত্রু। আর উম্মু হাবীবা (রাঃ) মুসলিম। এমতাবস্থায় মক্কায় তাঁর পরিবারের নিকটে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না। আবার ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশের চেয়ে ভাল ও উম্মু হাবীবার জন্য উপযুক্ত কাউকে না পাওয়ায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বিবাহের প্রস্তাব পাঠান ও বিবাহ করেন।২২
চেহারা ও চরিত্র মাধুর্য : 
উম্মু হাবীবা (রাঃ) অতি সুদর্শনা ছিলেন। ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আবু সুফিয়ান (রাঃ) স্বীয় কন্যার রূপের গৌরব করতেন। আবু সুফিয়ান বলতেন, عندى أحسن العرب وأجمله أم حبيبة بنت ابى سفيان، ‘আমার নিকটে আরবের উত্তম ও সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা হচ্ছে উম্মু হাবীবা বিনতু আবী সুফিয়ান’।২৩ উম্মু হাবীবা (রাঃ) যেমন সুশ্রী ছিলেন, তেমনি ছিলেন নির্মল ও নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী এবং খুব নম্র-ভদ্র স্বভাবের মহিলা। সরলতা ও কোমলতা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।২৪
ইবাদত-বন্দেগী ও সুন্নাতের অনুসরণ :
উম্মু হাবীবা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বাণী অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতেন এবং সাধ্যানুযায়ী নিজের জীবনে সেগুলো পালন করতেন। তাঁর পিতা আবু সুফিয়ান পরবর্তীতে  মুসলমান  হয়ে  মৃত্যুবরণ  করেন।  পিতার ইন্তিকালের তিন দিন পরে উম্মু হাবীবা (রাঃ) খশবু চেয়ে নিয়ে স্বীয় গন্ডদেশ ও বাহুতে লাগালেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ মুমিন মহিলার জন্য তিন দিনের বেশী কারো জন্য শোক পালন করা জায়েয নয়। শুধু স্বামীর জন্য ৪ মাস ১০ দিন শোক পালন করবে।২৫
উম্মু হাবীবা (রাঃ) অতি ইবাদতগুযার ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতি দিন ১২ রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করবে, জান্নাতে তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করা হবে’।২৬ উম্মু হাবীবা একথা শুনেছিলেন। এরপর সারাজীবন নিয়মিত প্রতিদিন তিনি ১২ রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করতেন।২৭
ইলমী খেদমত : 
ইলমে হাদীছে উম্মু হাবীবা (রাঃ) অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও উম্মুল মুমিনীন যয়নাব বিনতু জাহাশ (রাঃ)-এর নিকট থেকে হাদীছ শ্রবণ করেন। তাঁর নিকট থেকে স্বীয় কন্যা হাবীবা, ভ্রাতা মু‘আবিয়া, উৎবাহ, ভ্রাতুষ্পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনু উৎবাহ ইবনে আবী সুফিয়ান, ভাগ্নে আবু সুফিয়ান ইবনু সাঈদ ইবনিল মুগীরাহ ইবনিল আখনাস আছ-ছাক্বাফী, তাঁর গোলাম সালিম ইবনু শাওয়াল, ইবনুল জাররাহ, ছাফিয়া বিনতু শায়বাহ, যয়নাব বিনতু উম্মে সালমা, উরওয়াহ ইবনে যুবাইর, আবু ছালেহ আস-সিমান, শুতাইর ইবনু শাকাল, আবুল মালীহ ‘আমীর আল-হুযালী প্রমুখ হাদীছ বর্ণনা করেন।২৮ তাঁর নিকট থেকে বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা ৬৫টি।২৯
ইন্তিকাল : 
উম্মু হাবীবা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ইন্তিকালের পরে অনেক দিন বেঁচে ছিলেন। মৃত্যুর পূর্বে উম্মু হাবীবা (রাঃ) আয়েশা (রাঃ)-কে ডেকে বললেন, আমাদের মাঝে সতীনের সম্পর্ক ছিল। আমাদের কোন ভুল-ত্রুটি হ’লে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে দিন। অর্থাৎ আপনিও আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আয়েশা বললেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আপনাকে মুক্ত করে দিয়েছেন। উম্মু হাবীবা বললেন, আপনি আমাকে খুশি করেছেন। আল্লাহ আপনাকে খুশি করুন। তিনি উম্মু সালমার নিকটও অনুরূপ বলে পাঠান। উম্মু সালমাও ঐরূপ অভিন্ন কথা বলেন।৩০ তিনি স্বীয় ভ্রাতা মু‘আবিয়া ইবনু আবী সুফিয়ানের খিলাফতকালে ৪২ মতান্তরে ৪৪ হিজরীতে ৭৩ বছর বয়সে মদীনায় ইন্তিকাল করেন।৩১ মদীনার ‘মাকবারাহ বাবুছ ছাগীর’ নামক কবর স্থানে উম্মু সালমা আসমা বিনতু ইয়াযীদ আল-আনছারিয়ার কবরের পার্শ্বে তাঁকে সমাহিত করা হয়।৩২
উপসংহার : 
উম্মুল মুমিনীন উম্মু হাবীবা (রাঃ) ছিলেন মুসলিম কন্যা-জায়া-জননীদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। ইসলামের জন্য তিনি যে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অবিচলতার অনুপম আদর্শ রেখে গেছেন তা সকলের জন্য অনুসরণীয়। এই মহিয়সী মহিলার জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের মাতা-ভগ্নিগণ নিজেদেরকে আদর্শ রমনী হিসাবে তৈরী করলে সমাজে দেড় হাযার বছর পূর্বের সেই সোনালী যুগের শান্তি-সুখ ফিরে আসবে। কোন মেয়ে হবে না ধর্ষিতা, হবে না এসিড সন্ত্রাসের নির্মম শিকার। এ নিপীড়িত সমাজে যৌতুকের বলি হবে না কোন মেয়ে, পিতা-মাতাও হবেন না বিবাহযোগ্য কন্যা ঘরে থাকার কারণে চিন্তিত-বিমর্ষ। অতএব আসুন! আমরা উম্মু হাবীবার ঘটনাবহুল জীবনী থেকে ইবরাত হাছিল করি এবং আমাদের জীবনকে ইসলামের আলোকে ঢেলে সাজাই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!
- See more at: http://i-onlinemedia.net/archives/725#sthash.IXhffdah.dpuf

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন