মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

মুশরিকদের ইবাদাত এবং ইবাদাত কেন্দ্রিক উৎসবের বৈশিষ্ট্য হল


মুশরিকদের ইবাদাত এবং ইবাদাত কেন্দ্রিক উৎসবের বৈশিষ্ট্য হল আচার-সর্বস্বতা। হঠাৎ ঢুকে পরা কোন দর্শকের পক্ষে বিয়ের অনুষ্ঠান আর নবরাত্রির অনুষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন। রোমানদের স্যাটারনেলিয়া আর কোলোসিয়াম কেন্দ্রিক মদ-মাংসের উৎসবের মধ্যেও নিরপেক্ষ ও অনভিজ্ঞ দর্শকের পক্ষে পার্থক্য করা কঠিন। শিরককে কেন্দ্র করা গড়ে ওঠা সব রিচুয়ালের মধ্যেই এটা কমন। মূল উদ্দেশ্য কি, মূল অন্তর্নিহিত শিক্ষা কি, আত্মার খোরাক কি - তা খুঁজে পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, উল্লাস, উত্তেজনার একটা মিশেল। কারণ যেখানে একমাত্র স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের ইচ্ছে নেই, সেখানে সৃষ্টির আনন্দ, ক্ষণিকের উত্তেজনাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। কাল মজার, কিন্তু ব্যাপকভাবে অ্যাপ্রোপ্রিয়েট কিছু লাইন পড়লাম। ২৬শে, ২১শে, ১৪ই কিংবা ১৬- সবই বাংলাদেশে এখন ভ্যালেন্টাইন। যখন মূল আদর্শের জায়গাতেই সমস্যা, তখন ঐ আদর্শকে ঘিরে গড়ে ওঠা অনুষ্ঠানের সস্তা “কাছে আসার গল্পে” পরিণত হওয়াটাই স্বাভাবিক। গ্রীক-রোমান-আর্য, কোন মুশরিক সভ্যতাই এ অমোঘ নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে নি। 
.
.
প্রতিবছর ধুমধাম করে জাতীয় দিবসগুলো পালিত হচ্ছে। চলছে ব্যাপক কাভারেজ, ফ্রি-কনসার্ট, স্পেশাল অফার –ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এ দিবসগুলো যে আচার সর্বস্বতা এবং মেইক-শিফট ভ্যালেন্টাইনে পরিণত হয়েছে এর প্রমাণ হল, দিবসগুলোর পেছনে যে আদর্শগুলো ছিল সেগুলোর কোন প্রকাশ ঘটছে না। যদি ভাষা নিয়ে আসলেই মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বাড়তো তবে তো হিন্দির দৌরাত্ব্য কমার কথা। কিন্তু বিয়ে, জন্মদিন, বিজয় দিবস, পহেল বৈশাখ, পারলে মিলাদ-মাহফিল আর কুলখানিতেও এখন লোকজন হিন্দি গান বাজায়। উৎসব পালিত হচ্ছে, প্রতি বছর উৎসবের আকার বাড়ছে, কিন্তু আদর্শের কি খবর?
.
.
৭১ সালে যে মুক্তিযুদ্ধ হয় তা কি আদর্শিক যুদ্ধ ছিল নাকি আত্ম্রক্ষার (Self Preservation) এ নিয়ে আমি সবসময়ই সন্দিহান ছিলাম। তার বেশ কিছু কারণ আছে। প্রথমত, যুদ্ধটি যদি আদর্শিক হয় তাহলে কেন ২৫ মার্চের ম্যাসাকারের আগে ঘোষণা আসলো না? কেন তার আগে ইউনিল্যাটেরাল ডিক্লারেইশান হল না? ২৬ শে মার্চের ঘোষণা কি সরাসরি রক্তাক্ত ২৫ মার্চের রিয়্যাকশান ছিল না? আরও আগেই কি যুদ্ধ শুরু করা যেত না? ২৬ শে মার্চের আগে এবং পরে পার্থক্য তো শুধু ২৫ শে মার্চের রাতটাই। 
.
দ্বিতীয়ত, যদি এটা আদর্শিক যুদ্ধ হয়ে থাকে তবে আদর্শটা ঠিক কি ছিল এটা নিয়ে কেন ৪৫ বছর পরও জাতি একমত হতে পারছে না? এটা কিভাবে হতে পারে যে ঘটনাটাকে এ ভূখন্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে ধরে নেওয়া হয়, সেটার ইতিহাস এবং আদর্শ কি ছিল তা নিয়ে জাতি একমত হতে পারছে না? 
.
তৃতীয়ত, যদি আদর্শের কারণে আমাদের এই যুদ্ধ হয়ে থাকে, এবং এই আদর্শের আলোয় আমাদের উচিত নিজেদের জীবনকে সাজানো, তখন প্রশ্ন হল একজন মানুষ হিসেবে আমার দৈনন্দিন জীবনে, ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে এই আদর্শ আমাকে কিরকম নির্দেশনা দিচ্ছে? আদৌ কি কিছু দিচ্ছে? 
.
চতুর্থত, সকল আদর্শের বৈশিষ্ট্য হল তা কোন নির্দিষ্ট স্থান-কাল-পাত্র দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে না। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য থাকতে পারে কিন্তু আদর্শ – আইডিওলজির ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য না। প্রশ্ন হল, যদি মুক্তিকামীতা, শাসকের বিরুদ্ধে শোষিতের সংগ্রাম ইত্যাদি সত্যিই আমাদের আদর্শ হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের কাজে এর প্রতিফলন থাকার কথা। যারা আমদের মতো একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, আমাদের তো তাদের সাহায্য করার কথা – কোন রাজনৈতিক বা স্ট্র্যাটিজিক অবস্থান থেকে না, আদর্শের জায়গা থেকে। কিন্তু কাশ্মীর, আরাকান কিংবা সেভেন সিস্টার্সের মুক্তিকামী জনগণের জন্য রাষ্ট্র বা জাতি হিসেবে আমরা কি করেছি? বরং আমরা শোষিতের বিরুদ্ধে শাসকের পক্ষে নিয়েছি। তার উপর আছে বিশ্ব জমিদারদের পেটোয়া বাহিনী জাতিসংঘের অশান্তি বাহিনীর হয়ে আমাদের উজ্জ্বল ভূমিকা। এখানে আদর্শ কোথায়?
.
.
এসব কিছুর পাশপাশি আর একটি বিষয় আমার কাছে খুব প্রবলেম্যাটিক মনে হয়েছে। আচ্ছা আমি ধরে নিলাম এ পুরো ব্যাপারটাই আদর্শিক, কিন্তু এটা তো মেনে নিতে হবে, এই আদর্শ সম্পর্কে একেক পক্ষ একেক রকম ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ এবং বক্তব্য দেয়। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সঠিক পাঠের জন্য আমার রেফারেন্স কি হবে? আছে কি কোন কিতাব বা নির্ভরযোগ্য সূত্র? নেই। ফলাফল হল আমরা মুখস্থ কিছু বুলি শিখি, কোন কোন তারিখে পাঞ্জাবী পরে সেজে-গুজে বের হতে হবে তা শিখি, কিছু মূর্তির সামনে বেদিতে ফুল দিতে শিখি, টিভি ক্যামেরার সামনে আমতা আমতা করে কি বলতে হবে তা শিখি – কিন্তু কোন আদর্শ শিখি না। তাই ঘুরে ফিরে চলে যাই হিন্দি গানের সুরে সুরে কাছে আসার গল্পে, সব কিছু গিয়ে শেষমেশ পর্যবসিত হয় ভ্যালেন্টাইনে। ইজিপশিয়ান টেম্পল রিচুয়াল, গ্রেকো-রোমান স্যাটারনেলিয়া আর ডাইনাইসিসের অরজি, আর ড্রুইডদের “ওয়েইক” - সব তো ঘুরে ফিরে একই কাহিনী। এখানে বিশ্বাসের জায়গাটা কোথায়? আত্মার খোরাক কোথায়?
.
.
ইবন তাইমিয়্যাকে দেখা যেত প্রতিদিন সকালে ফযরের সালাতের পর লোকালয় থেকে দূরে গিয়ে, একাকী খোলা মাঠ বা প্রান্তরের ধারে বসে থাকতে। লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করতো আপনি কি করেন এভাবে? ইবন তাইমিয়্যাহ জাবাব দিতেন - আমি আমার রব্বকে স্মরণ করি, এটা আমার সারা দিনের খোরাক, যদি আমি এটা না করি আমি সারা দিন দুর্বল অনুভব করবো। তিনি লিখেছেন, যখন ক্বুর’আনের কোন আয়াতের ব্যাখ্যা, কিংবা ফিকহের কোন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর খুজে পেতেন না তিনি হাজার বারের বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তেন, আল্লাহ আর-রাহমানের-র কাছে ক্ষমা চাইতেন, তারপর নির্জনে গিয়ে আল্লাহ-র উদ্দেশ্য সিজদায় অবনত হতেন, বলতেন – হে ইব্রাহীমের শিক্ষক, আপনি আমাকে শিক্ষা দিন। এ বোধ কি শুধু ইবন তাইমিয়্যাহর মধ্যে ছিল ? বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের মুসলিমদের মধ্যে এ বোধ কাজ করেছে। অন্তরের প্রকৃত শান্তি তো একমাত্র আল্লাহ্‌ ‘আযযা ওয়া জালের আনুগত্য তাঁর নিকটবর্তী হবার চেষ্টার মাধ্যমেই আসে। 
.
.
একথা সত্য বর্তমানে ঈদের দুটি দিনও আমাদের সমাজের একটা ব্যাপক অংশের কাছেই আচার-সর্বস্বতার দিকে চলে গেছে, কিন্তু সেটা হয়েছে ইসলামের দিকে থেকে সরে জাহেলিয়্যাতের দিকে যাবার কারণেই। ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে আল হাজর আল-আসওয়াদ ছিল দুধের চেয়েও সাদা। কিন্তু বানী আদমের পাপের কারণে তার রঙ কালোতে পরিণত হয়। জান্নাত থেকে প্রেরিত পাথরের যদি এ অবস্থা হয়, তবে কুফর এবং জাহেলিয়্যাতের সিস্টেমের অধীনে বেশিদিন থাকার কারণে দুর্বল মানুষের মধ্যে এরকম বিচ্যুতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। তারপরও এখনো কি আমাদের মাঝে এমন বান্দারা নেই, যারা দুনিয়ার বিচারে একেবার শোচনীয় অবস্থায় থেকেও কোটিপতির চেয়ে বেশি সন্তুষ্ট ও প্রশান্ত অন্তরের অধিকারী? এরকম এক উৎসবের দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা, ফুল দিয়ে, ছবি তুলে, ঘুরে-ফিরে, “কাছে গিয়ে”, বাসায় ফিরবার পর সত্যিকার ভাবে আত্মিক অবস্থাটা কেমন থাকে? খুব সতেজ লাগে? গভীর কোন আবেগ কাজ করে? নিজের অস্তিত্ব নিয়ে, বিশ্ব জগত নিয়ে কোন উপলব্ধি কাজ করে? 
.
.
তাহলে কেন আমরা আদর্শ হিসেবে আমি এমন কিছু গ্রহণ করবো যার কোন নির্দিষ্ট উৎস নেই, নির্দিষ্ট পাঠ নেই, যার আদর্শিক ভিত্তি সংশয়পূর্ন আর যে আদর্শ আমাকে নির্দেশনা দিতে পারছে না, ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা সামাজিক পরিসরে? যে আদর্শের সর্বসাকুল্যে কৃতিত্ব হল কিছু দিবস পালন, কিছু আগাছা প্রকৃতির লোকের জীবিকা অর্জনের উপলক্ষ হওয়া, কিছু ফিল্টার আর কিছু ফ্যাসিযমের খোরাক হওয়া? যে আদর্শের একমাত্র প্রকাশভঙ্গি হল মূর্তির সামনে কিছুক্ষন দাড়ানো, ফুল দেওয়া আর তারপর কাছে আসার গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েযে পরিণত হওয়া? সত্যি? আমি কি এটা আমার জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবো? এর ভিত্তিতে আমি আমার জীবন চালিত করবো? অথচ আমার কাছে আছে আসমান ও যমীনের অধিপতির কাছ থেকে প্রেরিত জীবনবিধান? কিভাবে এই অমূল্য সম্পদকে বিক্রি করবো এই ঠুনকো সস্তা হাওয়াইমিঠাইয়ের জন্য? এ প্রস্তাবটাই তো লজ্জাজনক। কিভাবে আমরা আমাদের জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করবো এমন কিছু যা বলে – সমস্ত ক্ষমতার মালিক জনগণ? আর এজন্য আমি ত্যাগ করবো সেই জীবনবিধান যা আমার জন্য, আপনার জন্য, সমগ্র মানবজাতির জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন মালিকুল মূলক আল্লাহ্‌ আল-আযীয? আমি শাশ্বতকে ছেড়ে দেবো পার্থিবের জন্য? চিন্তাশীল ব্যক্তি কোনটা গ্রহণ করবে? 
.
.
.
আকাশ পৃথিবী এতদুভয়ের মধ্যে যা আছে, তা আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। 
.
আমি যদি ক্রীড়া উপকরণ সৃষ্টি করতে চাইতাম, তবে আমি আমার কাছে যা আছে তা দ্বারাই তা করতাম, যদি আমি চাইতাম। 
.
বরং আমি সত্যকে মিথ্যার উপর নিক্ষেপ করি, অতঃপর সত্য মিথ্যার মস্তক চুর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, অতঃপর মিথ্যা তৎক্ষণাৎ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তোমরা যা বলছ, তার জন্যে তোমাদের দুর্ভোগ। 
.
নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলে যারা আছে, তারা তাঁরই। আর যারা তাঁর সান্নিধ্যে আছে তারা তাঁর ইবাদতে অহংকার করে না এবং অলসতাও করে না। 
.
তারা রাত্রিদিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে এবং ক্লান্ত হয় না। 
.
তারা কি মৃত্তিকা দ্বারা তৈরী উপাস্য গ্রহণ করেছে, যে তারা তাদেরকে জীবিত করবে? 
.
যদি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলে আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য উপাস্য থাকত, তবে উভয়ের ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র। 
.
তিনি যা করেন, তৎসম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে। 
[সূরাতুল আম্বিয়া, ১৬-২৩]
(Asif Adnan)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন