ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আরবদেশে তৎকালে লুকমান হাকিমের হেকমত ও প্রজ্ঞার ব্যাপক চর্চা ছিলো। অধিকাংশ মজলিসে তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ কথামালা উদ্ধৃত করা হতো। তাবেঈন, সাহাবায়ে কেরাম রা., এমনকি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও লুকমান হাকিমের কতিপয় প্রজ্ঞাপূর্ণ উক্তি বর্ণনা করা হয়েছে। তার মধ্য থেকে নিম্নে কয়েকটি উদ্ধৃত করা হলো :
১. প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা দরিদ্র মানুষকেও রাজা বানিয়ে ছাড়ে।
২. কোনো মজলিস বা বৈঠকে প্রবেশ করলে প্রথমে সালাম দেবে। তারপর একপাশে বসে পড়বে। মজলিসে উপস্থিত লোকদের কথা-বার্তা শুনে নেয়ার আগ পর্যন্ত নিজে কথা-বার্তা শুরু করবে না। যদি তারা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকে তবে তুমিও তাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করো। আর যদি তারা কোনো অনর্থক কাজে লিপ্ত থাকে তবে তুমি তাদের মজলিস ছেড়ে কোনো ভালো মজলিসে চলে যাও।
৩. আল্লাহ তাআলা যদি কাউকে আমানতদার বানান, তবে তার জন্য আবশ্যক হলো সেই আমানতকে রা করা।
৪.হে বাছা, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। লৌকিকতার সঙ্গে আল্লাহর প্রতি ভয় প্রকাশ করো না। যাতে লোকেরা তোমার প্রতি সম্মান দেখায় অথচ তোমার অন্তর পাপগ্রস্ত।
৫.হে বাছা, মুর্খের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না। কারণ সে মনে করতে পারে যে তুমি তার মূর্খতাপ্রসূত আচরণ পছন্দ করো। জ্ঞানী ব্যক্তির রাগ ও অসন্তোষের প্রতি বেপরোয়া ভাব প্রকাশ করো না। এতে তিনি তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন।
৬. প্রকাশ থাকে যে, জ্ঞানী ব্যক্তিদের জবানে আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তি থাকে। তাঁদের মধ্যে কেউ কোনো কথা বলেন না, তবে তারা কেবল তা-ই বলে থাকেন আল্লাহপাক যেমন যা ঘটাতে চান।
৭.হে বাছা, নীরবতা অবলম্বন করলে কখনো অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হয় না। কথা-বার্তা যদি রুপা হয় তবে নীরবতা হলো স্বর্ণ।
৮. হে বাছা, সবসময় খারাপ কাজ থেকে দূরে থেকো, তাহলে খারাপ কাজও তোমার থেকে দূরে থাকবে। কেননা, খারাপ থেকে খারাপ উৎপাদিত হয়ে থাকে।
৯. হে বাছা, ক্রোধ ও ােভ থেকে নিজেকে রা করো। কেননা, অতিরিক্ত ক্রোধ জ্ঞানী ব্যক্তির অন্তরকে মৃত করে ফেলে।
১০ হে বাছা, নরম ও কোমলভাষী হও। সবসময় হাস্যময় উজ্জ্বল চেহারা ধারণ করো। তবে তুমি মানুষের দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তি থেকেও অধিক প্রিয় হয়ে যাবে যিনি সর্বদা দান-খয়রাত করে থাকেন।
১১.নম্র ও বিনীত স্বভাব বুদ্ধিমত্তার মূল।
১২যা বপন করবে তা-ই কাটবে।
১৩. নিজের পিতা ও পিতার বন্ধুকে ভালোবাসবে।
১৪.কেউ লুকমানকে জিজ্ঞেস করলো, সবচেয়ে ধৈর্যশীল ব্যক্তি কে? তিনি জবাব দিলেন, যাঁর ধৈর্য ধারণ করার পেছনে কষ্ট প্রদান করা উদ্দেশ্য না হয়। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলো, সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম কে? তিনি জবাব দিলেন, যিনি অন্য আলেমগণের ইলম দ্বারা নিজের ইলমকে বাড়িয়ে থাকেন। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, সর্বাপো উত্তম মানুষ কে? লুকমান হাকিম জবাব দিলেন, যিনি ‘অভাবমুক্ত’। লোকটি জিজ্ঞেস করলো, অভাবমুক্ত বলতে কি ধনবান ব্যক্তি উদ্দেশ্য? লুকমান হাকিম বললেন, না, অভাবমুক্ত সেই ব্যক্তি যিনি নিজের ভেতরে কল্যাণ অনুসন্ধান করলে তা বিদ্যমান দেখতে পান। অন্যথায় নিজেকে সে অন্যদের থেকে অমুখাপেী রাখে।
১৫.কেউ জিজ্ঞেস করলো, নিকৃষ্ট মানুষ কে? তিনি জবাব দিলেন, যে-ব্যক্তি এ-কথার পরোয়া করে না যে, লোকে তাকে মন্দ কাজ করতে দেখলে মন্দ বলবে।
১৬.হে বাছা, তোমার দস্তরখানে সবসময় সৎ লোকদের সমাবেশ থাকে তো উত্তম। আর উলামায়ে হক থেকেই কেবল পরামর্শ গ্রহণ করো।
[তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খ-, পৃষ্ঠা ১২৫; তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খ- : মুসনাদে ইমাম আহমদ রহ. থেকে গৃহীত।]
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন