প্রতিটি মানুষের মনের ভাব প্রকাশের শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে তার মাতৃভাষা। মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে চিন্তা-ভাবনা, নতুন জিনিস উদ্ভাবন ও আবিস্কার করার মতা দান করেছেন। সেই সাথে পরস্পরে মনের ভাব প্রকাশের জন্য শিা দিয়েছেন মুখের ভাষা। তাই মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্য মাতৃভাষাই হচ্ছে সর্বোত্তম মাধ্যম। মাতৃভাষায় যত সহজে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়, অন্য যে কোন ভাষায় তত সহজে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সে দিকে ল্য করেই আল্লাহ তাআলা মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সুরায়ে রুমে ইরশাদ করেন- আর তার নিদর্শনাবলীর অন্যতম নিদর্শন হলো আকাশম-লী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণবৈচিত্র। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।
এজন্যই তো আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাদের প্রত্যেককেই স্ব স্ব গোত্রীয় ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছেন। যাতে উম্মতেরা তাদের কথা বুঝতে পারে। আর সুরায়ে রহমানে ইরশাদ হয়েছে- দয়াময় আল্লাহ, শিা দিয়েছেন কুরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনিই তাকে শিা দিয়েছেন ভাষা ও ভাব প্রকাশের কলা-কৌশল।
এখানে ভাব প্রকাশের যে কলা-কৌশলের কথা বলা হয়েছে, তা হলো মানুষের মুখের ভাষা। যা মানব সম্প্রদায়ের জন্য স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ দান। উদাহরণ স্বরূপ বাংলাদেশের জন্য বাংলা ভাষা। যা বাংলার বীর দামাল ছেলেরা আন্দোলনের মাধ্যেমে রক্ত ঝরিয়ে অর্জন করেছেন।
মাতৃভাষা নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আন্দোলন হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে শুধুমাত্র বাংলাদেশই ঘটেছে ভাষার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেয়ার মত বিরল ঘটনা।
১৩৫৯ সালের ৮ ফাল্গুন মোতাবেক ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এদেশের গৌরব রফিক, বরকত, সালাম জাব্বারসহ আরও নাম না জানা বীর ছাত্র-যুবকসহ অনেকেই মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো- বাঙালীরা যে ভাষা রার্থে বিলিয়ে দিয়েছিল নিজেদের তাজা প্রাণ, আজ তাদেরই ছেলেরা সেই ভাষাকে বিকৃতি করে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে ইংরেজি দ্বারা। যেই ভাষার জন্য উৎসর্গিত হয়েছে আমাদের ত্রিশ ল প্রাণ, যেই ভাষার মর্যাদা রার জন্য আন্দোলন করেছিল বীর বাঙালীরা, সেই ভাষা দিবস আজ পালন করা হচ্ছে ইংরেজি তারিখে।
হায়রে আধুনিকতার অপব্যবহার! হায়রে সংস্কৃতির বিনাশ! কী ঘটছে বাংলা ভাষায়? কী হচ্ছে বাঙালীদের? কিই বা ছিল বাঙালীদের বিশ্ব জয়ের ল? কী উদ্দেশ্য ছিল ভাষা আন্দোলনের? যেই বাঙ্গালীদের আত্মত্যাগের একমাত্র ল ছিল বাংলা ভাষা, আজ সেই বাঙালীদের বংশধররা আপন মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে একুশে ফেব্র“য়ারিকে পালন করছে ভাষা দিবস হিসেবে। জানিনা কী তাদের উদ্দেশ্য? কী-ই বা তাদের আশা। তাদের ইচ্ছা কি ভাষাকে সমৃদ্ধশীল করা, নাকি ভাষার মান ক্ষুণ্ন করা? যদি তাই না হয়, তবে কেন দৈনন্দিন কথাবার্তার প্রতিটি বাক্যে স্থান দেয়া হয় ইংরেজি ভাষাকে? কেন বলা হয় ‘উদ্দেশ্য’-এর স্থলে ‘টার্গেট’? কেনই বা বলা হচ্ছে- ‘অতিথি বা মেহমান’-এর স্থানে ‘গেস্ট’? কেন ‘পরিবার’-কে বাদ দিয়ে ‘ফ্যামিলি’ বলা হয়? কেন ‘উপহার’ না দিয়ে দেয়া হচ্ছে- ‘সারপ্রাইজ’? কেন কেনাকাটা বা বাজার না করে করা হচ্ছে- ‘শপিং’? কেন ‘রকম’-এর জায়গায় ‘আইটেম’ না বললেই নয়? কেন আমরা কোন কাজে ‘সফল’ না হয়ে হই ‘সাকসেসফুল’? কেন ‘পরিকল্পনা’-এর জায়গায় করা হয় ‘প্ল্যান’?
যদি এসব প্রশ্ন আজ সমাজের মানুষকে করি তাহলে তারা নিশ্চয় বিদ্রূপের হাসি হেসে বলবে- এগুলো তো ব্যবহার করা হয় ভাষাকে সমৃদ্ধশীল করার জন্য। কিন্তু যদি বলি অপ্রয়োজনীয় তাগিদে কোন বিদেশি শব্দ দিয়ে লেখা দোষণীয় নয়, তবে তাতো কেবল প্রয়োজনে। কিন্তু অপ্রয়োজনে ও অযথা কেন এত বাড়াবাড়ি? কেন বিনা প্রয়োজনে ইংরেজি শব্দের এত ছড়াছড়ি?
আমরা বাঙালী আমাদের ভাষা বাংলা। আমাদের জন্য রয়েছে বাংলা সন। আর এই ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ১৩৫৯ সালের ৮ ফাল্গুন। সেই আলোকে আমাদের জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ৮ ফাল্গুন হওয়া কি যুক্তিসঙ্গত ছিল না? তা না হয়ে কেন আজ একুশে ফেব্রুয়ারি করা হলো? কী-ই বা উদ্দেশ্য তাতে? এটাই কি আমাদের জন্য অপমানের বিষয় নয়? এটা কি আমাদের বাংলা ভাষার জন্য মানহানীর ব্যাপার নয়?
হে বাঙালী! তোমার কি ইচ্ছে জাগে না বাংলা ভাষাকে পরিপূর্ণরূপে চর্চা করার এবং তা বিশ্বের মাঝে প্রচার-প্রসার করার? তাহলে তুমি কেন আজ ইংরেজি নিয়ে এতো ব্যস্ত? কেন তুমি ইংরেজিকে বাংলার ওপর প্রাধান্য দেবে? তুমি কেন ইংরেজিকে বাংলা ভাষায় সংমিশ্রণ ঘটাবে?
তুমাকে বলতে হবেÑ ইংরেজি লেখকরা তোমার ভাষাকে তাদের ভাষায় কতটুকু স্থান দিয়েছে? কয়টি বাংলা শব্দ লিখেছে তাদের রচনাবলীতে?
তুমি মায়ের ভাষাকে পরিত্যাগ করে বিদেশি সংস্কৃতির অপব্যবহার করছো। ধিক! শতধিক তোমাকে!! বস্তুত আমাদের ভাষাকে আমরা কিভাবে মর্যাদাশীল করব তা আমাদেরই ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল। হে বাংলিশ ব্যবহারকারীরা! কবে তোমাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে? কবে তোমরা বাংলা ভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিবে? আমার বিশ্বাস, তোমার সঠিক জ্ঞানে তুমি চাইবে বাংলা ভাষার বিজয়। আশা করি তুমি সম্বতি ফিরে পাবে।
লেখক : মুহাদ্দিস, আংগারিয়া ইকরা মাদরাসা শরীয়তপুর
uhkhan1990@gmail.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন