আমাদের দেশের সিংহভাগ মসজিদে অনেকেই চেয়ারে বসে নামায পড়তে দেখা যায়। বিশেষ করে অভিজাত এলাকার মসজিদগুলোতে এর প্রবণতা বেশি। অনেক মুসল্লি বাসা-বাড়ি , দোকান ও অফিস আদালতে চেয়ারে বসে অভ্যস্ত। এ অভ্যাসপ্রসূত কারণে তাদেরকেও চেয়ারে বসে নামায আদায় করতে দেখা যায়। অনেক সময় এ বিষয় টা নিয়ে তর্ক বিতর্ক ও করতে দেখা যায়। তর্ক বিতর্ক তো ইসলামের কোন সমাধান নয়। সমাধান হলো, এসব বিতর্কিত বিষয়ের নিরসনকল্পে সুষ্ঠ চিন্তা ও ফিকহি মাসায়েলের সমন্বয় করা। আমার এ মাসআলা সমৃদ্ধ লেখাটি এমনই এক প্রয়াস, যা অনেকের তর্ক বিতর্কে অবসান ঘটাবে বলে আশা করি। চেয়ারে বসে নামাজের মাসআলা-মাসায়েল প্রদত্ত হলো:
১। যে নামাযি স্বাভাবিকভাবে কিয়াম (দাঁড়াতে) ও রুকু , সিজদা, করতে অম। তার জন্য উত্তম এবং সুন্নত তরিকা হলো: নিচে বসে ইশারা –ইঙ্গিতের মাধ্যমে নামায আদায় করা। তবে নিচে বসে কষ্টকর হলে এবং চেয়ারে বসে নামায আদায় সহজ ও আরামদায়ক হলে তার জন্য চেয়ারে বসে ইশারায় নামায আদায় করা জায়েজ এবং শরিয়তসম্মত।
২। যে স্বাভাবিকভাবে কিয়াম ও রুকু উভয়টিই আদায় করতে অম। তবে নিচে (ফোরে, জমিনে) সিজদা করতে সম, তাহলে তার জন্য নিচে বসে স্বাভাবিকভাবে সিজদা করে নামায আদায় করা জরুরি। ফোরে কিংবা জমিনে স্বাভাবিকভাবে সিজদা না করে চেয়ারে অথবা নিচে বসে ইশারা- ইঙ্গিতে নাময আদায় করা জায়েয নয়।
৩। যে কিয়াম ও রুকু স্বাভাবিকভাবেই আদায় করতে পারে কিন্তু জমিনে সিজদা করতে পারে না, তাহলে তার জন্য উত্তম হলো: নিচে বসে ইশারা –ইঙ্গিতে রুকু ও সিজদা আদায় করা । যদি সে কিয়াম অর্থাৎ দাড়িঁয়ে নামায আদায় করে আর রুকু ও সিজদা নিচে বসে অথবা চেয়ারে বসে ইশারার মাধ্যমে আদায় করে নেয়, তাহলেও নামায আদায় হয়ে যাবে।
৪। যে শুধুমাত্র কিয়াম করতে পারে কিন্তু স্বাভাবিকভাবে রুকু ও সিজদা করতে পারে না। সেও নিচে বসে ইশারা –ইঙ্গিতে রুকু ও সিজদা আদায়ের মাধ্যমে নামায পড়তে পারবে। এেেত্রও কিয়াম করে নামায আদায়কালে রুকু ও সিজদা নিচে বসে অথবা চেয়ারে বসে ইশারার মাধ্যমে আদায় করতে পারবে।
৫। পান্তরে যে শুধু কিয়াম করতে পারেনা তবে স্বাভাবিকভাবে রুকু ও সিজদা করে নামায আদায় করা। চেয়ারে বসে ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমে রুকু ও সিজদা করা যথেষ্ট নয় এবং এতে তার নামাযও হবেনা।
৬। যে কিয়াম, রুকু ও সিজদা এসব স্বাভাবিকভাবে আদায় করতে পারে। তার জন্য চেয়ারে বসে নামায আদায় করা কোনোভাবেই জায়েয নয়।
৭। যে স্বাভাবিকভাবে রুকু, সিজদা করতে পারে কিন্তু ফরজ আদায় করার সময় পুরোপুরিভাবে কিয়াম করতে পারে, তাহলে তার জন্য অল্প সময় ভর দিয়ে হলেও কিয়াম করা ফরজ। পরে অপারগ অবস্থায় জমিনে অথবা চেয়ারে বসতে পারবে। এরপর স্বাভাবিকভাবে রুকু, সিজদা করে নামায আদায় করে নিবে।
৮। যে স্বাভাবিকভাবে রুকু করতে পারে কিন্তু জমিনে সিজদা করতে পারেনা। সে চেয়ারে বসে ইশারা ইঙ্গিতে রুকু সিজদা করতে পারবে। তবে রুকুর তুলনায় সিজদায় অধিক ঝুকতে হবে। এেেত্র সম্মুখে তেপায়া অথবা অন্য কিছুতে সিজদা করার কোন প্রয়োজন নেই।
আরও কিছু কথা: অনেক মসজিদে নামাযের আগে পরে চেয়ারে বসে বা জমিনে গোল হয়ে গল্প গোজব, আলাপ আলোচনার বৈঠক করতে দেখা যায়। এসব বৈঠক দ¦ীনি বিষয়ে হয়ে থাকলে অসুবিধা নেই। তবুও অন্যের নামায, জিকির তেলাওয়াতের যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, এ ব্যাপারে সজাগ থাকা চাই। কারণ মসজিদ হলো নামায, জিকির, ও তেলাওয়াত করার সর্বোত্তম জায়গা। এসব জায়গায় দ্বীনি মাসআলা মাসায়েলর বিষয়ে কথাবার্তা নিষেধ নয়। তবে নামাযিদের প্রতি সচেতন দৃষ্টি রাখা একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে আল্লাহর মসজিদগুলোতে তার নাম উচ্চারণ করতে ব্যাঘাত ঘটায় এবং তা ধ্বংস করতে প্রয়াস পায়, তার চেয়ে অধিক অত্যাচারী আর কে হতে পারে? এদের উচিত ছিল ভিত অবস্থাতেই মসজিদে প্রবেশ করা; এদের জন্য রয়েছে ইহলোকের দুর্গতি এবং পরলোকের কঠোর শাস্তি। (সূরা বাকারা: ১১৪)
বিশেষত, আযানের পর নামায শুরু হওয়ার পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত নিবিষ্ট মনে একাকী আমলে নিমগ্ন থাকা অধিক শ্রেয়। যে সব কথাবার্তা, আলোচনা মসজিদের বাহিরে করা যায়, তা মসজিদে করার কোন প্রয়োজন নেই। মসজিদকে নিছক অফিস স্টাইলের স্থান মনে না করা। মসজিদের সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। মসজিদে উচ্চস্বওে কথা না বলা, বাকবিত-ায় জড়িয়ে না পড়া মসজিদের প্রতি সম্মানের অন্যতম অংশ।
লেখক : আমীর, মজলিসে দাওয়াতুল হক;
মুহতামিম, যাত্রাবাড়ি বড় মাদরাসা;
খতিব, গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন