সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

ইকামত হলেও শুধু ফজরের সুন্নত পড়া যাবে মসজিদের ভেতরে নয়, বাইরে

অন্যান্য সুন্নতের তুলনায় ফজরের দুই রাকাত সুন্নতের গুরুত্ব অনেক বেশি। সাধারণ সুন্নতের কোনো কাযা নেই, তবে ফরজের সঙ্গে কাযা হলে ভিন্ন কথা। কিন্তু ফজরের সুন্নত পড়ার সুযোগ না পেলে সূর্য উদয়ের পর পড়ার সুযোগ রয়েছে। এ কারণেই ইকামত হয়ে গেলেও জামাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে দ্রুততার সাথে ফজরের সুন্নত পড়ার অবকাশ রয়েছে। তবে এই অবকাশ মসজিদের ভেতরে নয়, মসজিদের বাইরে। জামাত চলাকালীন নতুনভাবে যে-কোনো সুন্নত-নফল পড়া মাকরুহ। ফজরের সুন্নতও এর অন্তর্ভুক্ত। মসজিদের বাইরে কোনো জায়গা থাকলে সেখানে পড়তে পারবে। সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট প্রমাণিত হয়।
দারুল উলুম দেওবন্দের বর্তমান শায়খুল হাদিস, বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরি দা.বা. ক্লাসে বলেছিলেন, “ইকামত হওয়ার পর কোনো সুন্নত-নফল পড়া যাবে না, এমনকি ফজরের সুন্নতও না। তবে ফজরের সুন্নতের গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণে হানাফিগণ জামাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সুন্নত পড়ার অবকাশ দিয়েছেন। কিন্তু হানাফিদের মতেও এই অবকাশ কেবল মসজিদের বাইরে, ভেতরে নয়। কেউ সুন্নত পড়তে চাইলে ‘ইহাতায়ে মুলসুরিতে’ পড়বে, মসজিদে কাদিমের বারান্দায় নয়, বারান্দাও মসজিদের অন্তর্ভুক্ত।” অথচ দুঃখের বিষয় মসজিদগুলোতে একদিকে জামাত চলছে অন্যদিকে অনেক মানুষ সুন্নত পড়ছে। ফজরের সময় এই দৃশ্য প্রায় মসজিদেই পরিলক্ষিত হয়। এমনকি অনেকে বারান্দায়ও পড়ে না, কাতারের ভেতরে অথবা কাতারের কাছাকাছি পড়া শুরু করে। এত্থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। হানাফিদের কিতাবে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এতই যদি সুন্নতের গুরুত্ব থাকে তাহলে পাঁচ/দশ মিনিট আগে মসজিদে আসা যায় না? নিদেনপক্ষে সূর্য উঠার পর সুন্নত পড়ে নিবে। মনে রাখতে হবে, কেবল ওইদিনের ফজরের সুন্নত সূর্যোদয়ের পর সূর্য হেলার আগ পর্যন্ত পড়ার অবকাশ আছে। সূর্য হেলার পর সুন্নত আর সুন্নত থাকবে না, সাধারণ নফলে পরিণত হবে। 
এবার হাদিস ও সাহাবিদের আমল লক্ষ্য করুন :

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ :« إِذَا أُقِيمَتِ الصَّلاَةُ فَلاَ صَلاَةَ إِلاَّ الْمَكْتُوبَةُ ، إِلاَّ رَكْعَتَىِ الصُّبْحِ ».
হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : নামাযের ইকামত হয়ে গেলে ফরজ ব্যতীত আর কোনো নামায পড়া যাবে না, তবে ফজরের দুই রাকাত সুন্নত এর ব্যতিক্রম। (সুনানে কুবরা লিলবায়হাকি, হাদিস নং- ৪৭২৯; জামেউল আহাদিস, হাদিস নং- ১৪৬১)। 
عن أبي إسحاق قال حدثني عبد الله بن أبى موسى عن أبيه : حين دعاهم سعيد بن العاص دعا أبا موسى وحذيفة وعبد الله بن مسعود رضي الله عنهم قبل أن يصلى الغداة ثم خرجوا من عنده وقد أقيمت الصلاة فجلس عبد الله الى أسطوانة من المسجد فصلى الركعتين ثم دخل في الصلاة
হযরত আবু ইসহাক রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আবু মুসা স্বীয় পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনুল আস রা. আবু মুসা, হুজাইফা ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. -কে ফজরের পূর্বে দাওয়াত করেন। সবাই তার ঘর থেকে বেরিয়ে ফজরের নামাযের উদ্দেশে মসজিদে গিয়ে দেখে ইকামত হয়ে গেছে, তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. মসজিদের খুঁটির কাছে (মসজিদের বাইরে) দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামায পড়লেন অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করেন। অর্থাৎ জামাতে শরিক হন। (শরহু মাআনিল আসার, হাদিস নং- ২০৩৭)
عن أبي مخلد : دخلت مع ابن عمر وابن عباس والإمام يصلي فأما ابن عمر فقد دخل في الصف وأما ابن عباس فصلى ركعتين ثم دخل مع الإمام فلما سلم الإمام قعد ابن عمر فلما طلعت الشمس ركع ركعتين
হযরত আবু মুখাল্লাদ রহ. বলেন, (ফজরের) জামাতচলকালীন আমি হযরত ইবনে ওমর রা. এবং ইবনে আব্বাস রা. এর সঙ্গে মসজিদে প্রবেশ করলাম, তখন ইবনে ওমর রা. জামাতে শামিল হয়ে গেলেন। আর ইবনে আব্বাস রা. দুই রাকাত সুন্নত পড়ার পর ইমামের সঙ্গে শরিক হন। নামায শেষ হওয়ার পর ইবনে ওমর রা. বসে থাকলেন; সূর্য উদয় হওয়ার পর দুই রাকাত সুন্নত আদায় করলেন। (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ : ১/১৬৮)। 
عن محمد بن كعب قال : خرج عبد الله بن عمر رضي الله عنهما من بيته فأقيمت صلاة الصبح فركع ركعتين قبل أن يدخل المسجد وهو في الطريق ثم دخل المسجد فصلى الصبح مع الناس
মুহাম্মদ ইবনে কা’ব রহ. বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. নিজের ঘর থেকে বের হলেন তখন মসজিদে ফজরের জামাত দাঁড়িয়ে গেছে, তাই তিনি মসজিদে প্রবেশের পূর্বে রাস্তায় দুই রাকাত সুন্নত পড়ার পর মসজিদে প্রবেশ করেন এবং মানুষের সঙ্গে জামাতে ফজরের নামায আদায় করেন। (শরহু মাআনিল আসার, হাদিস নং- ২০৪১; মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ : ১/১৬৮)। 
عن أبى الدرداء : أنه كان يدخل المسجد والناس صفوف في صلاة الفجر فيصلى ركعتين في ناحية المسجد ثم يدخل مع القوم في الصلاة 
হযরত আবু দারদা রা. হতে বর্ণিত, তিনি ফজরের সময় মসজিদে প্রবেশ করে মানুষজনকে জামাতে নামায পড়তে দেখলে মসজিদের পার্শ্বে দুই রাকাত সুন্নত পড়ে নিতেন; তারপর মানুষের সঙ্গে জামাতে শরিক হতেন। (শরহু মাআনিল আসার, হাদিস নং- ২০৪৪; মুয়াত্তা ইমাম মালেক : ১/১৬৮)।

আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন