রবিবার, ২৮ জুন, ২০১৫

রমযানুল মুবারক; অল্প বিনিয়োগে অধিক মুনাফার মাস

রমযানুল মুবারক; অল্প বিনিয়োগে অধিক মুনাফার মাস
******************************************************

বিশ্ব জাহানের স্রষ্টা, সমস্ত মাখলুকের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামীন দুনিয়ার নেযামকে একটি নিয়মের ভেতর সীমাবধ্য রেখেছেন। আসমান-যমীন, পাহাড়-পর্বত, চাঁদ-সূর্য ও দিনরাত সবকিছুই সেই নিয়ম মেনে চলে। সূর্য ওঠে, দিন আসে। সূর্য অস্ত যায়। চাঁদ ওঠে, রাত আসে। এটা ওদের রোজকার রুটিন। মানুষ অনিয়ম করলেও ওরা কখনো নিয়ম ভংগ করে না। দিন ঘুরে দিন আসে। সপ্তাহ ঘুরে আসে সপ্তাহ। মাস ঘুরে মাস, আর বছর ঘুরে আসে বছর। ঠিক তেমনি বছর ঘুরে আমাদের সামনে আবারও চলে এসেছে মাহে ‘রমযানুল মুবারক’।
শুক্রবার (জুমআর দিন) যেমন সপ্তাহের শ্রেষ্ঠতম দিন, তদ্রূপ রমযানও বছরের শ্রেষ্ঠতম মাস। সব চেয়ে বেশী ফযীলতের মাস। বেশী সওয়াব অর্জনের মাস। দুনিয়ার ফসলের যেমন মৌসুম আছে, তখন ফলন ভাল হয়। ব্যবসা-বানিজ্যের যেমন কিছু মৌসুম আছে, অন্য সময়ের তুলনায় তখন ব্যবসা-বানিজ্য ভাল হয়। তেমনি রমযান মাস হল মুমিনের ইবাদতের মৌসুম। অল্প ইবাদত করে বেশী সওয়াব অর্জনের মৌসুম, যখন একটি নফল ইবাদতের সওয়াব একটি ফরযের সমান এবং একটি ফরযের সওয়াব ৭০টি ফরযের সমান হয়ে যায়।
হযরত সালমান ফারসী রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি রমযানে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নফল ইবাদত করল, সে যেন রমযানের বাইরে একটি ফরয আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করল, সে যেন রমযানের বাইরে ৭০টি ফরয আদায় করল”।(সহীহ ইবনে খুযাইমাহ-১৮৮৭)
নফল ও ফরযের মাঝে কোন তুলনা চলে না। কেউ যদি একটি ফরয নাময কাযা করে অর্থাৎ সময়মত না পড়ে, তাহলে সারা জীবন নফল পড়লেও ঐ ওয়াক্তিয়া ফরযের সমতুল্য হবে না। ফরযের মর্যাদা এত বেশী। তা সত্ত্বেও বলা হয়েছে, রমযান মাসে একটি নফল ইবাদত করলে একটি ফরযের সমতুল্য হয়ে যাবে। চিন্তা করলে বুঝা যায়, রমযান মাসে একটি আমলের সওয়াব কতগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয় তা হিসাব করা সত্যই কঠিন।
রমযানের ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে আরো এসেছে, “যে ব্যক্তি রমযানে কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে, তাহলে এটা তার গুনাহ মাফের কারণ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায় হবে এবং তাকেও উক্ত রোযাদারের সমান সওয়াব দান করা হবে। কিন্তু রোযাদারের সওয়াব হতে এক বিন্দুও কমানো হবে না”।(সহীহ ইবনে খুযাইমাহ-১৮৮৭)
এছাড়াও হাদীসে রমযানের অসংখ্য ফযীলতের কথা বর্ণিত আছে। “এ মাসের প্রথম রাতে শয়তান ও অবাধ্য জ্বিনদেরকে শিকলে বেঁধে ফেলা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর আর কোন দরজা খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। এরপর আর কোন দরজা বন্ধ করা হয় না”।(তিরমিযী-১/১৪৭, ইবনে মাজাহ-১১৮)
এ মাসের প্রথমভাগে বান্দার উপর রহমতের বারিধারা বর্ষণ হয়। মধ্যভাগে বান্দার পাপ-কালিমা মোচন করা হয় এবং শেষভাগে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয়া হয়। সুতরাং গুনাহ মাফ এবং প্রতিপালকের নৈকট্য অর্জনের এটাই সর্বোত্তম সময়। পরকালের পাথেয় অর্জনের এটাই সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহর দিওয়ানা, খোদার আশেক মুমিনগণ সারাটি বছর চাতক পাখির ন্যায় এ মাসের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকেন। এমনকি স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অধির আগ্রহে এ মাসের অপেক্ষায় থাকতেন। হাদীসে এসেছে, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসের এত খেয়াল রাখতেন যে, অন্য কোন মাসের এত খেয়াল রাখতেন না”।(আবু দাউদ) এবং তিনি সাহাবায়ে কেরামকেও নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা রমযানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রেখো”।(তিরমিযী)
দুনিয়াতে ভাল মুনাফা অর্জনের জন্য কৃষক যেমন ফসলের মৌসুমে অন্য সকল কাজ-ব্যস্ততা ফেলে নতুন ফসল ঘরে তোলার জন্য পূর্ণ শ্রম ব্যয় করে থাকে, ব্যবসায়ী যেমন ঈদ বা অন্য কোন উপলক্ষ্যে বেশী লাভের জন্য রাতদিন পরিশ্রম করে থাকে, তেমনি পরকালীন মুনাফা অর্জনের জন্য, জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির জন্য আমাদেরও একটি মাস দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে বেশী বেশী ইবাদত-বন্দেগী করা ও জীবনের কৃত গুনাহসমূহের কথা স্মরণ করে বেশী বেশী ইস্তেগফারে মগ্ন থাকা উচিত।
সেই পবিত্র মাহে রমযান এখন আমাদের দ্বারপ্রান্তে। তাই এ মাসে অল্প বিনিয়োগ বা ইবাদতের মাধ্যমে অধিক মুনাফা তথা সওয়াব অর্জনের জন্য এখন থেকেই আমরা সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমযানের মাধ্যমে স্বীয় গুনাহসমূহ মাফ করিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অভিসম্পাত (ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে রমযান পেল, অথচ স্বীয় গুনাহসমূহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না) থেকে বাঁচার তাওফীক দান করুন। আমীন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন