বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০১৫

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এর একটি ঘটনা এবং আমাদের জন্যে শিক্ষা

আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস্সালাতু ওয়াস্সালামু আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মদ ﷺ।
উমর (রা) ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামের শক্তি বেড়ে গিয়েছিল। তিনি রাসূল ﷺ কে খুবই ভালবাসতেন, রাসূল ﷺ এর আদেশ মান্য করতেন। একদিন তিনি রাসূল ﷺ কে বলেছিলেন……..
আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একদা নবী ﷺ এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এর হাত ধরেছিলেন। উমর (রা) তখন তাকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রাণ ব্যতীত আপনি আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। তখন নবী ﷺ বললেনঃ না, ঐ মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! এমন কি তোমার কাছে তোমার প্রাণের চেয়েও আমাকে অধিক প্রিয় হতে হবে। তখন উমর (রা) তাকে বললেন, এখন আল্লাহর কসম! আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়। নবী ﷺ বললেনঃ হে উমর! এখন (তোমার ঈমাণ পূর্ণ হয়েছে)। (সহীহ বুখারী)
এই হাদীসটি আরো ভালোভাবে বুঝার জন্যে নিম্নোক্ত হাদীসটি সহায়ক হবে, ইনশাল্লাহ।
আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেনঃ তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে বেশী প্রিয় হই। (সহীহ বুখারী)
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাসূল ﷺ কে সবকিছু এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয় হওয়া বলতে কি বুঝায়? এর সহজ সরল উত্তর হচ্ছে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ এর নির্দেশ মেনে চলা, তার সুন্নাত অনুসরণ করা। রাসূল ﷺ এর সুন্নাত অনুসরণ করতে যেয়ে যদি কষ্টে পতিত হতে হয়, মানুষের কটু কথা শুনতে হয়, এমনকি নিজের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত প্রিয় কাজ সমূহও ত্যাগ করতে হয় তবুও করতে হবে। আর যদি তা আমরা করতে পারি তবেই আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর সন্তুষ্ট হবেন, আমাদের অপরাধ সমূহ মাফ করে দিবেন।
“(হে নবী) তুমি বলো, তোমরা যদি আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসো, তাহলে আমার কথা মেনে চলো, (আমাকে ভালোবাসলে) আল্লাহ তাআলাও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের গুণাহখাতা মাফ করে দিবেন; আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াবান”। (সূরা ইমরানঃ ৩১)
কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় যে, আমরা কি বলতে পেরেছি উমর (রা) এর মতো করে, যে আমরা রাসূল ﷺ কে আমাদের নিজেদের প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আজ আমরা এই ভালোবাসা অন্য কাউকে দিয়ে বসে আছি। কেউ এই ভালোবাসা দিয়েছে তার মনের মানুষকে, সে যেভাবে নাড়ায় সেভাবেই নড়ে! কেউ দিয়ে রেখেছে, প্রিয় কোন স্টার বা গায়ক বা লেখককে আর যার কারণে সেই স্টার যেভাবে চলে সেভাবে চলা চাই। কেউ এই ভালোবাসা দিয়ে রেখেছে কোন নেতার প্রতি, সেই নেতা যা বলে তাই করতে প্রস্তুত। কেউ এই ভালোবাসা দিয়ে রেখেছে কোন দলের প্রতি, সেই দল যেভাবে চলতে বলে সেইভাবে চলতে প্রস্তুত যদিও তা রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ, নির্দেশের অমান্য করা হয়। সবচেয়ে দুঃখবোধ হয় যখন কাউকে বলি, রাসূল ﷺ নির্দেশ হচ্ছে এইটা, আল্লাহর রাসূল ﷺ এইটা বলেছেন তখন বলা হয়, আমরা অমুক আলেম, পীর, দরবেশ, অমুক তরীকা মেনে চলি, অমুক এই বিষয়ে এই মতামত ব্যক্ত করেছেন আমরা তা মেনে চলি। হায়! এই বুঝি আমাদের ভালোবাসার নমুনা!
সবশেষে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এর একটি ঘটনা দিয়ে আমার লেখাটির ইতি টানছি।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বিখ্যাত সাহাবী ছিলেন, যিনি মক্কায় মসজিদুল হারামে শিক্ষা দান করতেন। যার সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলে গেছেন, ‘তিনি উম্মাহর পন্ডিত ও কুরআনের ভাষ্যকার’। তিনি তার জন্যে আরো দোয়াও করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে দ্বীন বুঝার তৌফিক দাও এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা দাও’।
একদিন যথারীতি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) শিক্ষা দান করছেন, তার নিকট থেকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান আরোহন করছেন, তাবেয়ীনগণ। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বললেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, তোমরা জিলহজ্জ্ব মাসে ‘ওমরা’ করতে পারবে। একছাত্র প্রতিবাদ করে উঠল! তার নাম ছিল উরওয়াহ, আসমা (রা) এর ছেলে। আসমা (রা) ছিলেন আয়শা (রা) এর বড় বোন আবু বকর (রা) এর বড় মেয়ে। সে বললো, আপনি কিভাবে বলতে পারলেন, তোমরা হজ্জ্বের মাসে ‘ওমরা’ করতে পারবে যখন আবু বকর (রা) এবং উমর (রা) তা করতে নিষেধ করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) খুবই দুঃখবোধ করলেন, তিনি বললেন, যাও তোমার মায়ের নিকট জিজ্ঞেস কর। কিভাবে তুমি এই কথা বলতে পারলে, আমি বলছি রাসূল ﷺ বলেছেন আর তুমি বলছ আবু বকর (রা) এবং উমর (রা) বলেছেন! তোমাদের ধ্বংস তো অতি নিকটবর্তী! (যার মানে হচ্ছে, যখন আল্লাহর রাসূল ﷺ এর কোন সহজে বোধগম্য কথা ব্যক্ত করা হয় তখন যদি কেউ বা কারা সেই কথার উপর অন্য কারো কথা বা মতামতের প্রাধান্য দেয় তখন তার বা তাদের ধ্বংস নিকটবর্তী)। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, আমাদের জামানা! আমরা রাসূল ﷺ এর কথার উপর অন্যের কথার প্রাধান্য দিই, অন্যের মতামত অনুসরণ করি। আল্লাহর রাসূলের শিক্ষা ছেড়ে ইসলামকে বুঝতে চেষ্টা করি অন্যের তথা বিভিন্ন ব্রান্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী। আর যার ফলেই আজ আমাদের মাঝে বিভিন্ন মডেলের ইসলাম আবির্ভূত হয়েছে। ইসলামের নামে অনেক দল হয়েছে কিন্তু ‘ইসলাম’ ছাড়া! আমরা উঠে পড়ে লেগে গেছি অইসলামকে ইসলামী করণ করতে। আমাদের কাছে মওজুদ রয়েছে কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবীদের জীবনী। সাহাবীদের মতো করেই ইসলামকে বুঝতে হবে নচেত আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল যে চরম দূর্ভাগ্যপূর্ণ স্থানে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
“যে ব্যক্তি তার কাছে প্রকৃত সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধচারণ করবে এবং বিশ্বাসীদের অনুসৃত পথ ছেড়ে অন্য পথ অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেই দিকেই পরিচালিত করব যেদিকে সে ধাবিত হয়েছে, তাকে আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো, (আর) তা কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল” (সূরা নিসাঃ ১১৫)
বিশ্বাসীদের অনুসৃত পথ – বলতে বুঝিয়েছে সাহাবীদের পথ আর এ বিষয়ে প্রায় সকল মুফাসসিরগণ একমত কারণ যখন এই আয়াত নাযিল হয়েছিল তখন বিশ্বাসীরা ছিলেন ‘সাহাবীগণ’।
এই সাহাবীদের বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“মোহাজের ও আনসারদের মাঝে যারা প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং পরবর্তীতে যারা তাদের একদম যথার্থভাবে অনুসরণ করেছে। আল্লাহ তাআলা তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহ তাআলার উপর সন্তুষ্ট হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে এমন এক (সুরম্য) জান্নাত তৈরী করে রেখেছেন যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে; আর তাই (হবে) সর্বোত্তম সাফল্য।” (সূরা তওবাঃ ১০০)
মোহাজেরঃ মোহাজের হচ্ছে তারাই যারা মক্কা থেকে মদীনাতে হিজরত করেছিলেন।
আনসারঃ যারা মদীনার অধিবাসী ছিলেন, যারা মোহাজেরদের সাহায্য করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের হক বুঝার তৌফিক দান করুন। সত্য আমাদের সামনে দিনের আলোর মতো পরিস্কার হয়ে যাওয়ার পরও যেন আমরা তা গ্রহণ করা থেকে বিরত না হই। আমরা যেন, উমর (রা) এর মতো করে বলতে পারি, আমরা আমাদের জীবনের চেয়েও রাসূল ﷺ কে ভালোবাসি! যে ভালোবাস সত্যিকারের ভালোবাসা, যে ভালোবাসা শুধু মুখের ফাকা কতগুলো বুলি নয়! আল্লাহ তাআলা আমাদের তৌফিক দান করুন। আমীন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন