বুধবার, ২৪ জুন, ২০১৫

সুলাইমান আ. এর এক উম্মতের কারামত ও কারামত অস্বীকারকারীদের মনস্তত্ব:

                                            ★★★★★★ ★★★★ ★★ ★★★★★★★★★
সহীহ আকিদার নামে সমাজে বিভিন্ন ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এসব ফেতনার মৌলিক একটি বৈশিষ্ট্য হল, এরা কারামত অস্বীকার করে থাকে। কারামত দেখলেই এর মাঝে শিরক খুজতে শুরু করে। বিভিন্ন কৌশলে কারামতকে শিরক হিসেবে চালিয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করাই এদের অন্যতম লক্ষ। বিশেষভাবে যার থেকে কারামত প্রকাশিত হয়েছে তাকে কুফুরী শিরকের অপবাদ দেয়া এদের কাছে খুবই সাধারণ বিষয়। সেই সাথে পরবর্তী কেউ যদি এধরনের কারামত তার কিতাবে লেখে কিংবা তা বর্ণনা করে, তাকেও তারা কুফুরী শিরকের অপবাদ দেয়। এভাবে কারামতকে কেন্দ্র করে ইসলামের বিখ্যাত ওলী-বুজুর্গকে কুফুরী শিরকের অপবাদ দিয়ে থাকে।
সহীহ আকিদার ধোয়া তুলে সর্বপ্রথম কারামত অস্বীকার করেছে মোতাজিলা সম্প্রদায়। তাদের অন্যতম একটি আকিদা হল, কোন উম্মত থেকে কখনও কারামত প্রকাশিত হতে পারে না। বাস্তবে মোতাজিলাদের মাঝে এমন কোন ওলী-বুজুর্গ ছিল না যার থেকে কারামত প্রকাশিত হতে পারে। তাদের কারামত অস্বীকারের মৌলিক কারণ ছিল এটি। বর্তমানে মোতাজিলাদের অনুসারী হিসেবে যারা কারামত অস্বীকার করে থাকেন, তাদের বাস্তবতাও এরুপ। হয়ত তাদের মাঝে কারাম প্রকাশিত হওয়ার মত কোন ওলী-বুজুর্গ হয় না, একারণে তারা কারামত দেখলেই সেটার মাঝে কুফুরী-শিরক গন্ধ পায়। মোতাজিলাদের কারামতঅস্বীকারের মনস্তত্ব এবং তথাকথিত সালাফী আহলে হাদীসদের কারামত অস্বীকারের মনস্তত্ব একই।
কারামত অস্বীকার এবং কারামত থেকে কিভাবে কুফুরী শিরকী নির্ণয় করা হয় এর একটি উদাহরণ আমরা আলোচনা করব।
হযরত সুলাইমান আ. এর দরবারে বিলকিস আ. এর আগমনের ঘটনা সবারই জানা রয়েছে। হযরত বিলকিস আ. যখন তার রাজত্ব থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন তিনি তার মণি-মুক্ত খচিত অতি মূল্যবান সিংহাসনটি নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করেন। হযরত সুলাইমান আ. এক মজলিসে তার সভাসদবর্গের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন,
قَالَ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَن يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ
হে সভাসদ, তাদের অনুগত হয়ে আগমনের পূর্বে তোমাদের মাঝে কে বিলকিসের সিংহাসন এখানে উপস্থিত করতে পারবে?
উত্তরে কু'জন নামের একটি দুষ্ট জিন বলল,
قَالَ عِفْرِيتٌ مِّنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَن تَقُومَ مِن مَّقَامِكَ ۖ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ
অর্থ: আপনি বসা থেকে দন্ডায়মান হওয়ার পূর্বে অথবা আপনার সভাসদ শেষ হওয়ার পূর্বে আমি সিংহাসন উপস্থিত করতে পারব। এ কাজে আমি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।
সুলাইমান আ. এর একজন বুজুর্গ উম্মত ছিল। অধিকাংশ মুফাসসির তার নাম লিখেছেন, আসিফ ইবনে বারখিয়া। তিনি ছিলেন সিদ্দিকীনদের অন্তর্ভূক্ত। তিনি বললেন,
قَالَ الَّذِي عِندَهُ عِلْمٌ مِّنَ الْكِتَابِ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَن يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ ۚ فَلَمَّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا عِندَهُ قَالَ هَٰذَا مِن فَضْلِ رَبِّي
অর্থ: তাদের মাঝে যার কাছে কিতাবের ইলম রয়েছে, সে বলল, আমি আপনার নিকট চোখের পলকে সিংহাসন উপস্থিত করতে পারব। অত:পর, সুলাইমান আ. যখন তার সম্মুখে সিংহাস উপস্থিত পেলেন, তিনি বললেন, এটি আমার প্রভূর বিশেষ অনুগ্রহ।
[সূরা নামল, ৩৮-৪০]
এই অস্বাভাবিক ঘটনা বা কারামতটি সুলাইমান আ. এর এক উম্মত আসিফ ইবনে বারখিয়ার হাতে প্রকাশিত হয়েছে। কারামতটিতে হাজার মাইল দূরে একটি রাজ সিংহাসন চোখের পলকে তিনি সুলাইমান আ. এর সামনে উপস্থিত করেছেন। একজন কারামতে বিস্বাসী মু'মিন যখন এধরনের অপ্রাকৃতিক অলৌকিক ঘটনা অবলোকন করেন, তিনি সুলাইমান আ. এর মত স্বত:স্ফূর্তভাবে স্বীকার করেন, 'এটি আমার প্রভূর অনুগ্রহে সংঘঠিত হয়েছে'। অথচ একজন কারামত অস্বীকারকারী এখানে শিরকের গন্ধ পেতে শুরু করে। আসুন দেখা যাক, কারামত অস্বীকাকারীরা কীভাবে এই কারামত থেকে শিরক নির্ণয় করে। পবিত্র কুরআনের এই ঘটনাটি আমরা যেভাবে বিশ্লেষণ করেছি, হুবহু একই ধরনের বিশ্লেষণ ও মনস্তত্ব খুজে পাবেন তথাকথিত সালাফী ও আহলে হাদীসদের বইয়ে। সুতরাং আমাদের এই বিশ্লেষণে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। উদাহরণ হিসেবে মুরাদ বিন আমজাদের লেখা সহীহ আকিদার মানদন্ডে তাবলিগী জামাত বইটি দেখতে পারেন। সেখানে এধরনের অসংখ্য বিশ্লেষণ দেখতে পাবেন।
উক্ত কারামত থেকে অস্বীকারকারীদের শিরক অনুসন্ধানের একটি নমুনা:
১. সুলাইমান আ. এর দরবারে বসা আসিফ ইবনে বারখিয়া হাজার মাইল দূরে অবস্থিত বিলকিস আ. এর সিংহাসন কোথায় সংরক্ষিত আছে কীভাবে জানলেন? তিনি কি গায়েব জানেন? পবিত্র কুরআনে রয়েছে, একমাত্র আল্লাহ তায়ালা গায়েব জানেন। সুতরাং এই ঘটনায় আসিফ ইবনে বারখিয়া চোখের পলকে সিংহাসন এনে দেয়ার যে কথাটি বলেছেন, এটি মূলত: গায়েব জানার দাবী করা। সুতরাং এখানে তিনি গায়েব জানার দাবী করে শিরক করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)।
২. হাজার মাইল দূরের এত বড় সিংহাসন চোখের পলকে কীভাবে আনা সম্ভব? একজন মানুষ এত বড় জিনিস এত দূর থেকে এক মুহূর্তে কীভাবে আনতে পারে? এধরণের অসম্ভব ঘটনা ঘটাতে পারেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। সুতরাং সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া এটা কেউ ঘটাতে পারে না। অথচ আসিফ ইবনে বারখিয়া এধরনের ঘটনা ঘটিয়ে নিজেকে সর্বশক্তিমান দাবী করে শিরক করেছে (নাউযুবিল্লা)।
ঠিক এধরনের একটি বিশ্লেষণ দেখতে পাবেন, মতিউর রমহমান মাদানীর দেওবন্দী আকিদা নামক লেকচারে। ইবনে বতুতা ও শাহজালাল রহ. এর একটি কারামত দেলোওয়ার হোসেন সাইদী সাহেব তার ওয়াজে বলেছিলেন। সেই কারামত থেকেও এভাবে শিরক বের করেছিলেন তথাকথিত শায়খ মতিউর রহমান মাদানী।
৩. আসিফ ইবনে বারখিয়া সিংহাসনটি চোখের পলকে এনেছিলেন। হাজার মাইল দূরের জিনিস কীভাবে চোখের পলকে আনা সম্ভব? হয়ত সময় দীর্ঘায়িত হয়েছিল নতুবা স্থান সংকুচিত হয়েছিল। আসিফ ইবনে বারখিয়ার পক্ষে এদু'টির কোনটিই করা সম্ভব নয়। সুতরাং তিনি কীভাবে এধরনের অসম্ভব কাজ করার দাবী করলেন?
কোন বুজুর্গ থেকে যদি এধরণের কোন ঘটনা বর্ণিত হয় যে, তিনি আসর থেকে মাগরিবের মাঝে এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করেছেন অথবা মুহূর্তে এক জায়গা থেকে হাজার মাইল দূরের কোথাও চলে গিয়েছেন, তাহলে সেটাকে নিয়ে আমাদের সহীহ আকিদার ভাইয়ের যারপর নাই তামাশা করে তাকে শিরক আখ্যা দিয়ে থাকেন। একই ঘটনা পবিত্র কুরআনে সুলাইমান আ. এর উম্মতের হাতে প্রকাশিত হয়েছে, এটা সম্পর্কেও হয়ত তারা একই ধরনের বিশ্লেষণ করে থাকেন। আল্লাহ ভাল জানেন।
৪. অনেক সময় অনেক বুজুর্গ থেকে এমন কিছু কারামত প্রকাশিত হয়েছে যেগুলো সাহাবীদের থেকেও প্রকাশিত হয়নি। তথাকথিত সালাফী-আহলে হাদীস ভাইয়েরা খুব জোর দিয়ে আপনার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিবে, যে কারামত সাহাবীদের থেকে প্রকাশিত হল না, সেটা ওলী-বুজুর্গ থেকে কীভাবে প্রকাশিত হতে পারে? তাদের এই মনস্তত্ব থেকে উক্ত ঘটনাকে আমরা এভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি,
"হযরত সুলাইমান আ. আল্লাহর নবী ছিলেন। আসিফ ইবনে বারখিয়া তার উম্মত ছিল। যেই কারামত নবী থেকে প্রকাশিত হল না, সেটা একজন উম্মত থেকে কীভাবে প্রকাশিত হতে পারে? তাহলে কি নবীর চেয়ে উম্মতের সম্মান বেশি?"
এধরনের আরও অনেক বিশ্লেষণ খুজে পাবেন অস্বীকারকারীদের বই ও লেকচারে। কারামত অস্বীকারের এই ফেতনা যদি শুধু অস্বীকারের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে এটাকে মোতাজিলাদের সমপর্যায়ে বলা যেত। কিন্তু বর্তমানের এই ফেতনা মোতাজিলাদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানের ফেতনাবাজরা শুধু কারামত অস্বীকার করেই ক্ষ্যান্ত হয় না, সেই সাথে যার থেকে কারামত প্রকাশিত হয়, তাকে কুফুরী শিরকের অপবাদ দিয়ে থাকে। তাদের এই মনস্তত্ব সাধার ওলী বুজুর্গদের কারামতের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পবিত্র কুরআনে বর্ণিত কারামত সম্পর্কেও তারা একই ধরনের ধ্যান-ধারণা রাখে। যেহেতু সকল কারামতের মাঝে কিছু সাধারণ বিষয় থাকে। সাধারণ কারামত এবং পবিত্র কুরআনে বর্ণিত কারামতের তেমন পার্থক্য নেই। ওলী-বুজুর্গদের কারামত যদি কুফুরী শিরকী হয়, তাহলে এদের মনস্তত্ব অনুযায়ী পবিত্র কুরআনে বর্ণিত কারামতও কুফুরী-শিরকী হবে। নাউযুবিল্লাহ। আমরা আল্লাহর কাছে এধরনের ইমান বিধ্বংসী মনস্তত্ব থেকে আশ্রয় চাই।
কারামত সম্পর্কে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকিদা বিশ্বাস ও অস্বীকারকারীদের সকল প্রশ্নের উত্তর জানতে পড়ুন,
https://www.facebook.com/2014idea/posts/623543834407158
কারামত সম্পর্কে অসাধারণ একটি কথোপকথন:
★★★★★★ ★★★★ ★★ ★★★★★★★★★
আমি তাঁকে বললাম, আপনি যে ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, এগুলো হলো কারামাত। একে খরকে আদত বা স্বাভাবিক নিয়ম বহির্ভূত বিষয়ও বলা হয়। সাধারণ নিয়ম হলো স্বামী-স্ত্রীর মিলনের মাধ্যমে সন্তান সৃষ্টি হয়। নিয়ম বহির্ভূত বিষয় হলো, কোন পুরুষের স্পর্শ ব্যতীত হজরত মারইয়াম আ: এর সন্তান হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়ম হলো, উটনীর পেট থেকে উট জন্ম নেয়। অস্বাভাবিক বিষয় হলো, পাহাড় থেকে উটনী জন্ম নিয়েছে। সাধারণ নিয়ম হলো, সাপের পেট থেকে সাপ জন্ম নেয়। কিন্তু নিয়ম বহির্ভূত হজরত মুসা আ. এর লাঠি সাপ হয়েছে। সাধারণ নিয়ম হলো ওষুধ ও অপারেশনের মাধ্যমে কুষ্ঠরোগী ও অন্ধ ভালো হয়ে থাকে।
কিন্তু অস্বাভাবিক ব্যাপার হলো, হজরত ইউসুফ আ. এর জামা ও হজরত ইসা আ. এর হাতের দ্বারা অন্ধ ভালো হয়েছে। সাধারণ নিয়ম হলো, গরু গরুর মতো শব্দ করবে। অস্বাভাবিক হলো, গাভি যদি মানুষের মতো কথা বলে। সাধারণ নিয়মের ক্ষেত্রে মানুষ বা মাখলুকের সাধারণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। কিন্ত কারামত বা নিয়ম বহির্ভূত বিষয় সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছায় হয়ে থাকে, তবে তা মানুষ বা অন্য কোন সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পবিত্র কুরআনে হজরত ইসা আ. এর মু’জেযা উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলমানরাও এই মু’জেযাগুলো সত্য মনে করে। তারা এও বিশ্বাস করে, এগুলো হজরত ইসা আ. এর হাতে প্রকাশিত হয়েছে; কিন্তু এগুলো ছিলো, আল্লাহ তায়ালার কুদরতের বহি:প্রকাশ। মুসলমানরা যখন এগুলোকে আল্লাহর বিশেষ ক্ষমতা বলে বিশ্বাস করে, তখন প্রত্যেকটা মু’জেযায় তারা আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণ দেখতে পায়। কিন্তু খ্রিস্টানরা এগুলোকে হজরত ইসা আ. এর ইচ্ছাধীন মনে করে। তারা বিশ্বাস করে এগুলো হজরত ইসা আ. এর নিজস্ব ক্ষমতা। ফলে তারা প্রত্যেকটা মু’জেযার ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করেছে। এই মু’জেযা থেকে শিরকের অর্থ উদ্দেশ্য নেয়া তাদের ভ্রান্তি। এখানে আল্লাহ তায়ালা ও ইসা আ. এর কোন ত্র“টি নেই। খ্রিস্টীয় ভ্রান্ত ধারণাই এখানে মূল বিষয়। তারা একটা তাউহিদের প্রমাণকে শিরক বানিয়েছে।
একইভাবে আমরা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত যখন কোন কারামত শুনি, তখন একে আল্লাহ তায়ালার কুদরতের বহি:প্রকাশ মনে করি। একারণে এসব কারামতের ক্ষেত্রে আমরা শুধু একত্ববাদের প্রকাশ দেখি, তাউহিদের প্রমাণ পাই। আপনারা যখন একই কারামতকে খ্রিস্টীয় চেতনা নিয়ে পড়েন, তখন একে শুধু শিরকই মনে করেন।
কিছু বান্দাকে আল্লাহর বিশেষ কুদরতের দ্বারা সম্মানিত করার কারণে নাউযুবিল্লাহ আল্লাহ তায়ালা দোষী নন। আবার এগুলো বিভিন্ন বুযুর্গের হাতে প্রকাশ পাওয়ার কারণে তারাও কোন ত্র“টি করেননি। মূল ত্র“টি হলো, আপনাদের এই খ্রিস্টীয় চেতনা। আপনি এখনও যদি খ্রিস্টীয় চেতনা মুক্ত হয়ে বিশুদ্ধ ইসলামি চেতনায় এগুলো পড়েন, তবে আপনিও একত্ববাদের প্রমাণ দেখতে পাবেন।
এগুলো হতেই পারে না:
ওহিদ সাহেব খুব চটে গিয়ে বললেন, এখানে অনেক ঘটনা এমন রয়েছে, যেগুলো হতেই পারে ন। একেবারেই অসম্ভব।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কার পক্ষ থেকে হতে পারে না? আল্লাহর পক্ষ থেকে না কি সৃষ্টির পক্ষ থেকে? যদি বলেন, সৃষ্টির পক্ষ থেকে হতে পারে না। তাহলে আপনার কথা শতভাগ সত্য। এগুলোকে সৃষ্টির নিজস্ব ক্ষমতা মনে করায় হলো খ্রিস্টীয় চেতনা। আর যদি বলেন, এগুলো আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হতে পারে না, তাহলে আপনি আল্লাহর ক্ষমতা ও ইলম অস্বীকার করলেন। আপনি যদি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এগুলোকে অসম্ভব মনে করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তায়ালার ততটুকু ক্ষমতা আছে, যতটুকু আপনার আছে, তাহলে আপনার এই তাউহিদ থেকে এখনই তওবা করুন। আপনার এধরনের কথা দ্বারা আল্লাহর ওলিদের কারামত অস্বীকার করা হয় না, বরং আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতা অস্বীকার করা হয়।
শুধু মিথ্যা
ওহিদ সাহেব বললেন, মানুষ বুযুর্গদের নামে বিভিন্ন মিথ্যা ও মনগড়া ঘটনা তৈরি করে থাকে। এগুলো কী গ্রহণযোগ্যতা আছে?
আমি বললাম, কোথায় মিথ্যা বানানো হয়নি? মানুষ মিথ্যা খোদা বানিয়েছে।মিথ্যা নবি বানিয়েছে। মিথ্যা হাদিস তৈরি করেছে। বাজারে জাল টাকা বানিয়েছে। আপনি কি শুধু মিথ্যা খোদাকেই অস্বীকার করবেন, না কি সাথে সত্য খোদাকেও? শুধু মিথ্যা নবীকে অস্বীকার করবেন, না কি সাথে সত্য নবীকেও? শুধু জাল হাদিস থেকে বেঁচে থাকবেন না কি সহিহ হাদিস থেকেও। জাল নোট থেকে বাঁচতে গিয়ে আসল নোট ব্যবহারও ছেড়ে দিবেন? কারামতের ক্ষেত্রেও আপনাকে মিথ্যা ঘটনা মানতে কে বলেছে? মিথ্যা ঘটনা থাকার কারণে সত্য ঘটনাও অস্বীকার করবেন কোন যুক্তিতে?
বিবেক মেনে নেয় না
এধরনের ঘটনা কীভাবে মেনে নিবো? অনেক বিষয় এমন রয়েছে, যা নবি ও সাহাবিদের ক্ষেত্রেও ঘটেনি। নবি ও সাহাবাদের মর্যাদা তো ওলিদের থেকে অনেক উর্ধ্বে। একটা অসম্ভব ব্যাপার হলো, একজন নবি ও সাহাবির হাতে যেই কারামত প্রকাশিত হয়নি, সেটা একজন ওলির হাতে প্রকাশিত হবে।
আমি বললাম, আজব ব্যাপার। আপনি এখানে যুক্তি দিতে শুরু করলেন। আপনাকে প্রশ্ন করি, আপনি স্বপ্ন দেখেন কি না? তিনি বললেন, হ্যাঁ, দেখি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হুবহু সেগুলোই দেখেন যা নবি ও সাহাবিগণ দেখেছেন না কি এর চে’ বেশি দেখেন? ওহিদ সাহেব বললেন, এখানে নবি ও সাহাবিদের সঙ্গে কিসের সম্পর্ক? আল্লাহ তায়ালা যা ইচ্ছা তাই স্বপ্নে দেখান। কখনও একটা ছোট্র শিশুও স্বপ্ন দেখে। সকালে বলে যে, আমি স্বপ্ন দেখেছি যে, আজ নানা এসেছে। বাস্তবেও ঐ দিন নানা এসে পড়লো। ফলে স্বপ্ন বাস্তব প্রমাণিত হলো। এই স্বপ্নকে কেউ এই বলে অস্বীকার করে না যে, পরিবারের বড়রা কেউ স্বপ্ন দেখলো না, একটা শিশু কীভাবে দেখলো??????????
দেখুন, হজরত মারইয়াম আ. আল্লাহর ওলি ছিলেন। তিনি মৌসুম ছাড়া ফল খাচ্ছিলেন। অথচ হজরত যাকারিয়া আ. আল্লাহর নবি হওয়া সত্ত্বেও তার নিকট ফল আসেনি। হজরত আয়েশা রা. নবিজি স. এর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তার কোন সন্তান হয়নি। এমনকি একটা কন্যা সন্তানও হয়নি। অথচ হজরত মারইয়াম আ. আল্লাহর ওলি হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে স্বামী ছাড়া পুত্র সন্তান দিয়েছেন। হজরত ইয়াকুব আ. প্রতিদিন নিজের মুখে হাত লাগিয়েছেন। চোখ ভালো হয়নি। অথচ হজরত ইউসুফ আ. এর শুধু জামার স্পর্শে চোখ সুস্থ হয়েছে। যেই বাতাস হজরত সুলাইমান আ.এর সিংহাসন উড়িয়ে নিয়ে যেত, তাকে হিজরতের সময় আদেশ দেয়া হয়নি যে, রসুল স. কে এক মুহূর্তে মদিনায় পৌঁছে দাও। হজরত সুলাইমান আ. নবি হওয়া সত্ত্বেও বিলকিসের সিংহাসন এনেছিলো তাঁর এক সাহাবি। এগুলো সব আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি চাইলে হাজার মাইল দূরের বাইতুল মুকাদ্দাস চোখের সামনে দেখাতে পারেন। জান্নাত ও জাহান্নাম চোখের সামনে উপস্থিত করতে পারেন। এর বিপরীতে হুদায়বিয়া সন্ধির সময় উসমান গণি রা. এর শাহাদাতের মিথ্যা সংবাদ আসে। সংবাদটি যাচাইয়ের কোন মাধ্যম ছিলো না। একারণে রসুল স. উসমান রা. এর হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বাইয়াত শুরু করে দিয়েছিলেন। হুদায়বিয়া মক্কা থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত। আল্লাহর ইচ্ছায় শত মাইল দূরের জিনিস দেখতে পেলেও আল্লাহর ইচ্ছা না হওয়ার কারণে কয়েক মাইল দূরের বিষয় জানতে পারেননি। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা না হওযার কারণে হজরত ইয়াকুব আ. সামান্য দূরে কূপের মধ্যে থাকা হজরত ইউসুফ আ. সম্পর্কে জানতে পারেননি। অথচ আল্লাহর ইচ্ছা হওয়ার কারণে মিশরে অবস্থিত হজরত ইউসুফ আ.এর জামার ঘ্রাণ কিনআনে পেয়েছেন। আমি তাঁকে বললাম, আপনি যে দুনিয়ার সবাইকে মুশরিক মনে করছেন, এ ব্যাপারে দ্বিতীয় বার চিন্তা করুন। আর অন্তর থেকে তওবা করুন।
                                        …………………মুফতী ইজহারুল ইসলাম আল কাউসারি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন