রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

আল-হাদিসের পরিভাষা পরিচিতি

শাব্দিক পরিচিতি : হাদিস আরবি শব্দ । এর আভিধানিক অর্থ নিম্মরুপ -নতুন (যা কাদিম বা অনাদি এর বিপরীত), কথা, বাণী, বার্তা, সংবাদ, বিষয়, খবর, ইত্যাদি। ইসলামী পরিভাষায় হাদিস বলা হয় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতিকে । এক কথায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম এর নবুয়াতি জীবনের সকল কথা কাজ ও অনুমোদন এবং চারিত্রিক গুনাবলী, সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট সবই হাদিসের অন্তর্ভূক্ত।
পারিভাষিক বা মুহাদ্দিসিনে কেরামের প্রামান্য সংজ্ঞা : হাফিজ সাখাভি (র.) বলেন, পরিভাষায় হাদিস বলা হয়, যা রাসূল সা. এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত; চাই তার উক্তি হোক বা কর্ম বা অনুমোদন অথবা গুণ, এমনকি ঘুমন্ত অবস্থায় ও জাগ্রত অবস্থায় তার গতি ও স্থিতি। আল্লামা যফর আহমাদ উসমানি (র.) বলেন, রাসুল সা. এর নামে কথিত কখা, কাজ অনুমোদন ও গুণ বৈশিষ্টকে হাদিস বলা হয়। এমনকি কোন কোন হাদিস বিশারদ সাহাবীদের কথা, কাজ ও অনুমোদনকেও ব্যাপক অর্থে হাদীসের অন্তর্ভুক্ত গন্য করেছেন।
উদাহরণ : মহানবী (সা.)ইরশাদ করেন, " যে অন্যের উপর দয়া করে না, আল্লাহ তায়ালাও তার উপর দয়া করেন না।" (বুখারি)
হাদিসে ক্ওলি : মহানবী সা. -এর সমগ্র বানী সমষ্টি অর্থাত কথা, নির্দেশনা, উপদেশ-পরামর্শ, আদেশ-নিষেধ সম্পর্কীয় হাদিসকেই হাদিসে ক্ওলি বলে।
উদাহরণ : রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‍"সকল আমলের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (বুখারি)


সুন্নাহ বা سنة শব্দটি আরবি। এটি একবচন, বহুবচনে سنن বা সুনান। যেমন বলা হয় سنن ابى داؤد (সুনানু আবী দাউদ), سنن ابن ماجه(সুনানু ইবনি মাযাহ) سنن النسائي(সুনানুন নাসাঈ) ইত্যাদি ।
সুন্নাহ শব্দের আভিধিনক অর্থ নিম্নরুপ :
১. الطريقة المسلوكة - নিয়মনীতি,
২. কর্মনীতি,
৩. পথ,
৪. পদ্ধতি,
৫. রাস্তা ইত্যাদি।

তাছাড়া হাদিসের অপন নামও সুন্নাহ।
পবিত্র কুরআনে সুন্নাহ শব্দের ব্যবহার :
সুন্নাহ শব্দ পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।যথা -
১. নিয়ম, যথা -
سُنَّةَ مَنْ قَدْ أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنْ رُسُلِنَا وَلَا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحْوِيلًا (الاسراء-77)
অর্থ : আপনার পূর্বে যত রাসূল প্রেরণ করেছি তাদের ক্ষেত্রেও এরূপ নিয়ম ছিল। আপনি আমার নিয়মের কোন ব্যতিক্রম পাবেন না। (সুরা ইসরা-৭৭ )
এ আয়াতে সুন্নাহ শব্দটি "নিয়ম" অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
২. রীতিনীতি, যথা ইরশাদ হয়েছে :
وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى وَيَسْتَغْفِرُوا رَبَّهُمْ إِلَّا أَنْ تَأْتِيَهُمْ سُنَّةُ الْأَوَّلِينَ أَوْ يَأْتِيَهُمُ الْعَذَابُ قُبُلًا ( الكهف-55)
অর্থ : হেদায়েত আসার পর এ প্রতীক্ষাই শুধু মানুষকে বিশ্বাস স্থাপন করতে এবং তাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করতে বিরত রাখে যে, কখন আসবে তাদের কাছে পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি অথবা কথন আসবে তাদের কাছে আযাব সামনাসামনি। (কাহফ - ৫৫)
এ আয়াতে সুন্নাহ শব্দটি "রীতিনীতি" অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
৩. বিধান, যথা ইরশাদ হয়েছে -
مَا كَانَ عَلَى النَّبِيِّ مِنْ حَرَجٍ فِيمَا فَرَضَ اللَّهُ لَهُ سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ قَدَرًا مَقْدُورًا - (الأحزاب-38)
অর্থ : আল্লাহ নবির জন্যে যা নির্ধারণ করেন, তাতে তার কোন বাধা নাই। পূর্ববর্তী নবিগণের ক্ষেত্রে এটাই ছিল আল্লাহর চিরাচরিত বিধান। আল্লাহর আদেশ নির্ধারিত, অবধারিত।
হাদিসে সুন্নাহ শব্দের ব্যবহার :
সহিহ মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে : -
عن عبد الله قال من سره أن يلقى الله غدا مسلما فليحافظ على هؤلاء الصلوات حيث ينادى بهن فإن الله شرع لنبيكم صلى الله عليه وسلم سنن الهدى وإنهن من سنن الهدى ولو أنكم صليتم في بيوتكم كما يصلي هذا المتخلف في بيته لتركتم سنة نبيكم ولو تركتم سنة نبيكم لضللتم وما من رجل يتطهر فيحسن الطهور ثم يعمد إلى مسجد من هذه المساجد إلا كتب الله له بكل خطوة يخطوها حسنة ويرفعه بها درجة ويحط عنه بها سيئة ولقد رأيتنا وما يتخلف عنها إلا منافق معلوم النفاق ولقد كان الرجل يؤتي به يهادى بين الرجلين حتى يقام في الصف (مسلم)
অর্থ : আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আগামীকাল (কিয়ামতের দিন) পূর্ণ মুসলিম হিসাবে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে ভালবাসে; সে যেন এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের (জামাতের ) প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখে যেখানে আজান দেয়া হয়। কেননা, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের নবির জন্য 'সুনানে হুদা' নির্ধারন করেছেন। আর এ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সুনানে হুদারই অন্তভুক্ত। যদি তোমরা তোমাদের ঘরে-বাড়িতে নামাজ আদায় কর, যেভাবে এ জামাত বরখেলাফকারী তার ঘরে আদায় করে, তা হলে তোমরা নবির সুন্নত ত্যাগ করলে। আর যদি তোমরা তোমাদের নবির সুন্নত ত্যাগ কর তা হলে নিশ্চয়ই গোমরাহ হয়ে যাবে। (অতপর তিনি বলেন ) আর যে ব্যক্তি পবিত্রতা লাভ করে এবং উত্তমরূপে পবিত্রতা লাভ করে এ মসজিদসমূহের মধ্যে কোন মসজিদের দিকে গমন করে, তাহলে সে যে সকল পদক্ষেপ দেয় তার প্রত্যেক কদমেই তার জন্য আল্লাহ তায়ালা একটি নেকি নির্ধারণ করেন এবং এর দ্বারা তার একটি মর্যাদা উন্নত করেন, এ ছাড়াও তা দ্বারা একটি গুণাহও মার্জনা করে দেন। আমি তাদেরকে দেখেছি (সাহাবাহগণ) কখনও জামাত ত্যাগ করেন নি। জামাত ছাড়ে কেবল প্রকাশ্য মুনাফিকরাই। নিশ্চয়ই এরুপ লোকও দেখা যেত যাকে দুই ব্যক্তির মধ্যখানে তাদের গায়ে ভর দিয়ে মসজিদে আনা হতো, যাতে তাকে নামাজের কাতারে দাঁড় করানো যায়।(মুসলিম)
এ হাদিসে সুন্নাহ শব্দটি রাসুল সা. এর অনুসৃত নীতি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
সুন্নাহ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা :
১. قاموس المصطلحات গ্রন্থকার বলেন -
السنة فى الشرع الطريقة المسلوكة فى الدين
(ইসলাম ধর্মের অনুসৃত পন্থাই সুন্নাহ )
২. ইমাম রাগেব ইস্পহানী রহ. বলেন, সুন্নত বলতে সে পথ ও পদ্ধতি বুঝায় যা নবি করিম সা. বেছে নিতেন ও অবলম্বন করে চলতেন। এটা কখনো হাদিস শব্দের সমার্থক রূপে ব্যবহৃত হয়।
এ অর্থেই বলা হয় - قد ورد بذلك السنة অর্থাৎ এ ব্যাপারে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
৩. শাইখ আবদুল আযীয রহ. বলেন, সুন্নাহ শব্দটি দ্বারা নবী সা. এর কথা ও কাজ বুঝায় এবং এটা নবী ও সাহাবীদের অনুসৃত বাস্তব কর্মনীতি অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
৪. কোন কোন হাদিস বিশারদ সুন্নাহ শব্দটি হাদিস এ খবর এর সমার্থক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (কাশফুল বারী)
মূলকথা হচ্ছে, সুন্নাহ হলো রাসুল সা. এর বাস্তব কর্মনীতি আর হাদিস হলো রাসূল সা. এর কাজ, কথা ও সমর্থন।


সনদ, মতন ইত্যাদি শব্দগুলো পৃথক পৃথক পরিভাষা হলেও একটি অপরটির সাথে সম্পৃক্ত । তাই একটি উদাহরণ দ্বারা প্রত্যেকটি শব্দের অর্থ ও ব্যবহার স্পষ্ট করছি, যেন পাঠকবর্গ সহজে বুঝতে পারেন।
সনদ ও মতন : হাদিসের দু’টি প্রধান অংশ: সনদ বলা হয় রাসুল সা. থেকে লেখক/ মুহাদ্দিস পর্যন্ত হাদিসটি যে সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, এই বর্ণনা সূত্রকে। আর বর্ণনাসূত্রের মাধ্যমে বর্ণিত মূল কথা টুকু হল মতন।
উদাহরণ : এখানে উদাহরণসরূপ বুখারি শরীফের একটি হাদিস সনদ ও মতন সহ পেশ করা হল :
حدثنا عبد الله بن يوسف قال أخبرنا مالك عن أبي الزناد عن الأعرج عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : لولا أن أشق على أمتي أو على الناس لأمرتهم بالسواك مع كل صلاة-
এ হাদিস ইমাম বুখারি বর্ণনা করেছেন। এখানে ইমাম বুখারির (১৯৪-২৫৬হি.) উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ইউসুফ (২১৮হি.), তার উস্তাদ মালিক (৮৯-১৭৯হি.), তার উস্তাদ আবুয যিনাদ (৬৫-১৩১হি.), তার উস্তাদ আ‘রাজ (১১৭হি.), তার উস্তাদ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু (৫৭হি.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যদি আমার উম্মতের উপর কষ্ট না হত, অথবা [বলেছেন] মানুষের উপর, তাহলে আমি অবশ্যই তাদেরকে প্রত্যেক সালাতের সাথে মিসওয়াকের নির্দেশ দিতাম”।
বিশ্লেষণ : এ হাদিসে ইমাম বুখারির উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ইউসুফ থেকে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু পর্যন্ত অংশকে سَنَد ‘সনদ’ বলা হয়। নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিসের অবশিষ্ট অংশকে مَتْن ‘মতন’ বলা হয়। হাদিসের মতন ও সনদ একটির সাথে অপরটি ওতপ্রোত জড়িত। সনদ ব্যতীত মতন হয় না, মতন থাকলে অবশ্যই তার সনদ আছে। তবে একটি ‘সহিহ’ হলে অপরটি ‘সহিহ’ হওয়া জরুরি নয়। কখনো সনদ সহিহ হয়, কারণ সহিহর সকল শর্ত তাতে বিদ্যমান, যেমন সনদ মুত্তাসিল, রাবিগণ আদিল ও দ্বাবিত, তবে মতন শায বা ‘ইল্লতের কারণে সহিহ নয়। কখনো মতন সহিহ হয়, তবে রাবির দুর্বলতা বা ইনকিতা‘ (বর্ণনাপরম্পরা কাটা পড়া) এর কারণে সনদ সহিহ হয় না। সনদ ও মতন উভয় সহিহ হলে হাদিস সহিহ।


রাবি : الراوى ‘রাবি’ আরবি শব্দ, বাংলা অর্থ বর্ণনাকারী ও উদ্ধৃতকারী।
হাদিসের পরিভাষায় সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক ব্যক্তিকে رَاوِيْ বলা হয়। সাহাবি নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তাবেয়ি সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন, এভাবে গ্রন্থকার পর্যন্ত সবাই বর্ণনা করেন, তাই সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক ব্যক্তি রাবি। উদাহরণে পেশ করা মিসওয়াকের হাদিসে পাঁচজন রাবি রয়েছে :
১-‘রাবি’ সাহাবি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু,
২-‘রাবি’ তাবেয়ি আ‘রাজ,
৩-‘রাবি’ তাবেয়ি আবুয যিনাদ,
৪-‘রাবি’ মালিক (ইমাম),
৫-‘রাবি’ আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ইউসুফ। তিনি ইমাম বুখারির উস্তাদ।

মুহাদ্দিস : ‘মুহাদ্দিস’ আরবি শব্দ, বাংলা অর্থ বর্ণনাকারী বা বক্তা।
হাদিসের পঠন-পাঠনকে যারা পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন, তাদেরকে পরিভাষায় مُحَدِّث ‘মুহাদ্দিস’ বলা হয়। ‘মুহাদ্দিস’ কর্তাবাচক বিশেষ্য, এ শব্দের আদেশসূচক ক্রিয়া দ্বারা আল্লাহ নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে:
وَأَمَّا بِنِعۡمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثۡ ١١ ﴾ [الضحى: ١١]
“আর আপনার রবের অনুগ্রহ আপনি বর্ণনা করুন”।
অর্থাৎ রিসালাত ও নবুওয়ত সবচেয়ে বড় নিয়ামত, অতএব যে রিসালাত দিয়ে আপনাকে প্রেরণ করা হয়েছে তা পৌঁছে দিন, আর যে নবুওয়ত আপনাকে দেওয়া হয়েছে তা বর্ণনা করুন।
নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘মুহাদ্দিস’, কারণ তিনি কুরআন ও হাদিস বর্ণনা করে রিসালাত ও নবুওয়তের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। পরবর্তীতে শুধু হাদিস বর্ণনাকারীদের মুহাদ্দিস বলা হয়। এ পরিভাষা সাহাবিদের যুগেও ছিল, আব্দুল্লাহ ইব্ন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বলেন:
وَقَدْ بَلَغَنِي أَنَّكَ مُحَدِّثٌ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ذَلِكَ.

“আমার নিকট পৌঁছেছে যে, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অমুক বিষয়ে বর্ণনা করেন”?
অতএব সনদে বিদ্যমান সকল রাবি মুহাদ্দিস। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সমর্থন ও গুণগানকে যথাযথ সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেন।
শায়খ : ‘শায়খ’ আরবি শব্দ, বাংলা অর্থ বৃদ্ধ ও বয়স্ক।
সাধারণত পঞ্চাশ ঊর্দ্ধ বয়স হলে شَيْخ বলা হয়। আরবরা বয়স্ক ও সম্মানিত ব্যক্তিকে শায়খ বলেন, অনুরূপ উস্তাদকেও তারা শায়খ বলেন।
হাদিসের ছাত্ররা তাদের হাদিসবিশারদ উস্তাদকে শায়খ বলেন। শায়খ দ্বারা হাদিসের উস্তাদ ও রাবি দ্বারা শায়খের ছাত্রকে বুঝানো হয়ে থাকে।
শায়খ ও রাবির সম্পর্ক : শায়খ ও রাবি আপেক্ষিক শব্দ। নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন হিসেবে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাবি, তাবেয়ি আ‘রাজ হিসেবে তিনি শায়খ।
শাইখুল হাদিস : হাদিস শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী, দীর্ঘ দিন হাদিসের পঠন ও পাঠনে নিরত শায়খকে কেউ ‘শায়খুল হাদিস’ বলেন।
তবে আমাদের ভারত উপমহাদেশে বুখারি শরীফের পাঠদানকারীকে ‘শায়খুল হাদিস’ বলা হয়।
صحيح শব্দটি আরবি। বহুবচনে صحاح। এর আভিধানিক অর্থ সুস্থ। সাধারণত মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য ‘সহিহ’ ব্যবহৃত হয়, যেমন হাদিসে এসেছে: " وَأَنْتَ صَحِيحٌ " ‘তুমি সুস্থাবস্থায়’ এ থেকেই সনদ ও মতন দোষমুক্ত হলে হাদিসকে সহিহ বলা হয়।
‘সহিহ’-র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেন :
هو ما نقله العدل تام الضبط متصل السند غيرمعلل ولا شاذ .
"যে হাদিস মুত্তাসিল সনদ তথা অবিচ্ছিন্ন সনদ পরম্পরায় বর্ণিত হয়, রাবী বা বর্ণনাকারী আদিল ও পূর্ণ আয়ত্বশক্তির অধিকারী হয়, এবং সনদটি শায কিংবা মুআল্লাল নয়; এমন হাদিস কে সহিহ বলে।
মোটকথা, হাদিস সহিহ হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছে :
১. সনদ মুত্তাসিল হওয়া।
২. রাবির আদিল হওয়া।
৩. রাবির দ্বাবিত হওয়া।
৪. শায না হওয়া।
৫. মু‘আল্লাল না হওয়া।

প্রথম শর্ত: اتصال السند বা সনদ মুত্তাসিল হওয়া:
সনদ মুত্তাসিল হওয়ার অর্থ, হাদিসের সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক রাবি (বর্ণনাকারী) তার শায়খ (শিক্ষক) থেকে সরাসরি হাদিস শ্রবণ করেছেন প্রমাণিত হওয়া। যেমন গ্রন্থকার মুহাদ্দিস বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (প্রথম উস্তাদ), তিনি বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (দ্বিতীয় উস্তাদ), তিনি বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (তৃতীয় উস্তাদ), তিনি বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (চতুর্থ উস্তাদ)। এভাবে প্রত্যেক রাবি স্বীয় শায়খ থেকে শ্রবণ করেছে নিশ্চিত করলে সনদ মুত্তাসিল।
শায়খের অনুমতি গ্রহণ করা, শায়খকে হাদিস শুনিয়ে সম্মতি নেওয়াকে সরাসরি শ্রবণ করা বলা হয়।

দ্বিতীয় শর্ত: عدالة الراوى বা রাবির ‘আদল:
সহিহ হাদিসের দ্বিতীয় শর্ত রাবির ‘আদল’ হওয়া। عدل ‘আদ্‌ল’ শব্দের অর্থ সোজা ও বক্রতাহীন রাস্তা, যেমন বলা হয় طريق عدل ‘সোজা রাস্তা’। পাপ পরিহারকারী ও সুস্থরুচি সম্পন্ন ব্যক্তি ন্যায় ও সোজা রাস্তার অনুসরণ করে, তাই তাকে ‘আদ্‌ল’ বা ‘আদিল’ বলা হয়। عادل কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। হাদিসের পরিভাষায় দীনদারী ও সুস্থরুচিকে عدالة বলা হয়।
‘আদিল’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুসলিম, বিবেকী, সাবালক, দীন বিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত ও সুস্থ রুচির অধিকারী ব্যক্তিকে উসুলে হাদিসের পরিভাষায় ‘আদিল’ বলা হয়। নিম্নে প্রত্যেকটি শর্ত প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হলো:
মুসলিম : রাবির ‘আদিল হওয়ার জন্য মুসলিম হওয়া জরুরি। অতএব কাফের ‘আদিল’ নয়, তার হাদিস সহিহ নয়। কাফের কুফরি অবস্থায় হাদিস শ্রবণ করে যদি মুসলিম হয়ে বর্ণনা করে, তাহলে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য। কারণ সে সংবাদ দেওয়ার সময় আদিল, যদিও গ্রহণ করার সময় আদিল ছিল না। যেমন জুবাইর ইব্‌ন মুতয়িম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ بِالطُّورِ»
“আমি নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাগরিবের সালাতে সূরা তূর পড়তে শুনেছি”। তিনি শুনেছেন কাফের অবস্থায়, আর বর্ণনা করেছেন মুসলিম অবস্থায়। (বুখারি ও মুসলিম)
সাবালিগ : রাবির আদিল হওয়ার জন্য সাবালিগ হওয়া জরুরি। কেউ শৈশবে হাদিস শ্রবণ করে যদি সাবালিগ হয়ে বর্ণনা করে, তাহলে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য, সাবালিগ হওয়ার পূর্বে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। কতক সাহাবির ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য নয়, যেমন ইব্‌ন আব্বাস, ইব্‌ন যুবায়ের ও নুমান ইব্‌ন বাশির প্রমুখ, তাদের হাদিস শৈশাবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছে।
বিবেকবান : রাবির আদিল হওয়ার জন্য বিবেক সম্পন্ন হওয়া জরুরি। বিবেকহীন ও পাগল ব্যক্তির বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। পাগল দু’প্রকার: স্থায়ী পাগল ও অস্থায়ী পাগল। স্থায়ী পাগলের হাদিস কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। অস্থায়ী পাগলের মধ্যে যদি সুস্থাবস্থায় সহিহর অন্যান্য শর্ত বিদ্যমান থাকে, তাহলে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য, তবে শ্রবণ করা ও বর্ণনা করা উভয় অবস্থায় সুস্থ থাকা জরুরি।
দীনদারী : রাবির ‘আদিল হওয়ার জন্য দীনদার হওয়া জরুরি, তাই পাপের উপর অটল ব্যক্তি আদিল নয়। পাপ হলেই ‘আদল বিনষ্ট হবে না, কারণ মুসলিম নিষ্পাপ নয়, তবে বারবার পাপ করা কিংবা কবিরা গুনায় লিপ্ত থাকা ‘আদল পরিপন্থী। দীনের অপব্যাখ্যাকারী, তাতে সন্দেহ পোষণকারী ও বিদ‘আতির হাদিস গ্রহণ করা সম্পর্কে আহলে ইলমগণ বিভিন্ন শর্তারোপ করেছেন।
সুস্থ রুচিবোধ : রাবির ‘আদল হওয়ার জন্য সুস্থ রুচিবোধ সম্পন্ন হওয়া জরুরি। সুস্থ রুচিবোধের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। প্রত্যেক সমাজের নির্দিষ্ট প্রথা, সে সমাজের জন্য মাপকাঠি, যা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নানা প্রকার হয়। সাধারণত সৌন্দর্য বিকাশ ও আভিজাত্য প্রকাশকারী কর্মসমূহ সম্পাদন করা এবং তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্নকারী কর্মসমূহ পরিত্যাগ করাকে সুস্থ রুচিবোধের পরিচায়ক বলা হয়।
হাফেয ইব্‌ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ ‘আদল’ এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আদল’ ব্যক্তির মধ্যে এমন যোগ্যতা, যা তাকে তাকওয়া ও রুচিবোধ আঁকড়ে থাকতে বাধ্য করে”। অতএব ফাসেক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ‘আদিল’ নয়, যদিও সে সত্যবাদী। জামাত ত্যাগকারী ‘আদিল’ নয়, যদিও সে সত্যবাদী, সুতরাং তাদের বর্ণনাকৃত হাদিস সহিহ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمۡ فَاسِقُۢ بِنَبَإ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوۡمَۢا بِجَهالَة فَتُصۡبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلۡتُمۡ نَٰدِمِينَ ٦ [الحجرات: ٦
“হে ঈমানদারগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে”। ফাসেক ব্যক্তির সংবাদ যাচাই ব্যতীত গ্রহণ করা যাবে না, পক্ষান্তরে আদিল ব্যক্তির সংবাদ গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ বলেন,
وَأَشۡهِدُواْ ذَوَيۡ عَدۡلٖ مِّنكُمۡ وَأَقِيمُواْ ٱلشَّهَٰدَةَ لِلَّهِۚ ٢ [الطلاق : ٢
“আর তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দু’জন সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে।”। এ আয়াতে আল্লাহ ‘আদিল’ ব্যক্তিদের সাক্ষীরূপে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সারাংশ : ‘আদিল’ ব্যক্তির মধ্যে দু’টি গুণ থাকা জরুরি: দীনদারী ও সঠিক রুচিবোধ। এ দু’টি গুণকে ‘আদালত’ বলা হয়। কখনো ‘আদিল’ ব্যক্তির জন্য ক্রিয়াবিশেষ্য ‘আদ্‌ল’ শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেমন লেখক বলেছেন: يرويه عدل এখানে ‘আদ্‌ল’ অর্থ ‘আদিল’। অত্র গ্রন্থে আমরা আদিল, আদালত ও আদ্‌ল শব্দগুলো অধিক ব্যবহার করব, তাই পাঠকবর্গ ভালো করে স্মরণ রাখুন।
তৃতীয় শর্ত: ضبط الراوىরাবির জাবত বা সংরক্ষণ:
সহিহ হাদিসের দ্বিতীয় শর্ত রাবির ‘দাবত’। ضبط ক্রিয়াবিশেষ্য, আভিধানিক অর্থ নিয়ন্ত্রণ। এ থেকে যিনি শায়খ থেকে হাদিস শ্রবণ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন, তাকে ضابط বলা হয়। ‘দ্বাবিত’ কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণকারী।
ضبط এর পারিভাষিক অর্থ: শায়খ থেকে শ্রবণ করা হাদিস হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত অপরের নিকট পৌঁছে দেওয়াই ضبط।
ضبط দু’প্রকার: স্মৃতি শক্তির জাবত ও খাতায় লিখে জাবত। সাহাবি ও প্রথম যুগের তাবেয়িগণ স্মৃতি শক্তির উপর নির্ভর করতেন, পরবর্তীতে লেখার ব্যাপক প্রচলন হয়। তখন থেকে স্মৃতি শক্তি অপেক্ষা লেখার উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়, তবে লিখিত পাণ্ডুলিপি নিজ দায়িত্বে সংরক্ষণ করা জরুরি।
চতুর্থ শর্ত : عدم الشذوذ বা 'শায’- না হওয়া :
‘মাকবুল বা গ্রহণযোগ্য রাবি যদি তাদের চেয়ে উত্তম বা অধিক নির্ভরযোগ্য রাবিদের বিপরীত বর্ণনা করে, তাহলে তাদের বর্ণনাকে শায বলা হয়’। সুতরাং কোন হাদিস সহী হতে হলে এমন না হওয়া। মকবুল অর্থ গ্রহণযোগ্য রাবি, যার একা বর্ণিত হাদিস ন্যূনতম পক্ষে ‘হাসানে’-র মর্যাদা রাখে। মকবুলের চেয়ে উত্তম রাবিকে সেকাহ বলা হয়, যার একা বর্ণিত হাদিস ‘সহিহ’-র মর্যাদা রাখে।
পঞ্চম শর্ত : عدم العلة কোন ধরনের ইল্লত না থাকা :
ইল্লত দ্বারা উদ্দেশ্য সুপ্ত ও গোপন ইল্লত বা ত্রুটি, বিজ্ঞ মুহাদ্দিস ব্যতীত যা কেউ বলতে পারে না। সনদ ও মতন উভয় স্থানে দোষণীয় ইল্লত হতে পারে।
সহিহ হাদিসের উদাহরণ :
حدثنا الحميدي (عبد الله بن الزبير) قال حدثنا سفيان قال حدثنا يحيى بن سعيد الأنصاري قال أخبرني محمد بن إبراهيم التيمي أنه سمع علقمة بن وقاص الليثي يقول سمعت عمر بن الخطاب رضي الله عنه على المنبر قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول * إنما الأعمال بالنيات وإنما لكل امرئ ما نوى فمن كانت هجرته إلى دنيا يصيبها أو إلى امرأة ينكحها فهجرته إلى ما هاجر إليه -
বর্ণিত হাদিসটির সনদে ইমাম বুখারি থেকে রাসুল সা. পর্যন্ত ৬ জন রাবী রয়েছে। যথা:
১. হুমাইদি (আবদুল্লাহ বিন জুবায়ের)
২. সুফিয়ান
৩. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল আনসারি
৪. মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম আত তাইমী
৫. আলকামাহ ইবনে ওয়াক্কাস আল লাইসি
৬. সাহাবি উমর ইবনে খাত্তাব রা.

উপরোক্ত প্রত্যেক রাবি নিজ শায়খ থেকে হাদিসটি শুনেছেন যা হাদিসটির সনদে স্পষ্ট উল্লেখ রছেছে। তাই সনদটি মুত্তাসিল। প্রত্যেক রাবী আদিল ও পূর্ণরুপে জাবিত ছিলেন। তাছাড়া বর্ণিত হাদিসটি শায বা মুয়াল্লাল নয়। এ হাদিসটি ইমাম বুখারি রহ. তার সহীহ বুখারিতে সর্বপ্রথম পেশ করেছেন। এতে সহিহ হাদিসের পাঁচটি শর্ত পূর্ণরুপে বিদ্যমান রয়েছে। তাই নি:সন্দেহে এটি একটি সহিহ হাদিস।


মুহাদ্দিসিনে কেরামের পরিভাষায় হাদিসে মাকবুল বা আমলযোগ্য হাদিসের কয়েকটি স্তর রয়েছে। তম্মোধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে হল সহিহ হাদিস। যার পরিচয় " পরিভাষা পরিচিতি - ০৬" এ আলোচনা করা হয়েছে। আমলযোগ্য হাদিসের দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে 'হাসান হাদিস'।
'হাসান' শব্দের আভিধানিক অর্থ :
حسَنُ‏ এর আভিধানিক অর্থ সুন্দর।

'হাসান' এর পারিভাষিক পরিচয় :
হাদিসে হাসান এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় মুহাদ্দিসিনে কেরামের মাঝে ব্যাপক মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে হাসান সম্পর্কে কতিপয় মুহাদ্দিসিনে কেরামের প্রদত্ত সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো :

১. হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এর মতে ,
هو خبر الآحاد بنقل عدل خاف الضبط متصل السند غير معلل و لا شاذ -
অর্থাৎ যে হাদিস অবিচ্ছিন্ন সনদ পরম্পরায় বর্ণিত হয়, বর্ণনাকারী আদিল বা ন্যায়পরায়ণ ও কম আয়ত্তশক্তির অধিকারী হয় এবং সনদটি শায কিংবা মুআল্লাল নয়- এরুপ হাদিসের নাম হাসান লিজাতিহি।
এ সংজ্ঞা মতে হাসান হাদিসে সহি হাদিসের শর্তগুলো থাকা জরুরি, তবে তৃতীয় শর্ত ব্যতিক্রম, যথা:
১. সনদ মুত্তাসিল হওয়া।
২. রাবির আদিল হওয়া।
৩. সহি হাদিস অপেক্ষা হাসান হাদিসের রাবির জাবত দুর্বল হওয়া।
৪. শায না হওয়া।
৫. মু‘আল্লাল না হওয়া বা দোষণীয় ইল্লত থেকে মুক্ত হওয়া।

তৃতীয় শর্তের ভিত্তিতে সহি ও হাসান একটি অপরটি থেকে পৃথক হয়, অন্যথায় হাসানের রাবিগণ তাকওয়া, ইবাদত ও অন্যান্য দীনি বিষয়ে সহি হাদিসের রাবি থেকে উঁচুমানের হতে পারে।
২. 'হাসান' এর সংজ্ঞায় المنظومة البيقونية গ্রন্থকার বলেন,
والحَسَنُ الْمَعْرُوفُ طُرْقاً - وَغَدَتْ رِجَالُهُ لا كَالصَّحِيحِ اشْتَهَرَتْ
“যে হাদিসের সনদগুলো প্রসিদ্ধ, তবে সহি হাদিসের রাবিদের ন্যায় প্রসিদ্ধ নয়, তাই হাসান”।
লেখক বাহ্যত হাসান হাদিসের দু’টি শর্ত উল্লেখ করেছেন: ১. রাবিদের প্রসিদ্ধ হওয়া। ২. সহি হাদিসের রাবিদের অপেক্ষা কম প্রসিদ্ধ হওয়া। সনদ মুত্তাসিল হওয়া, শায ও মু‘আল্‌ না হওয়া যদিও তিনি উল্লেখ করেননি, তবে সহির সাথে হাসানের তুলনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হাসান হাদিসেও সহির শর্তসমূহ প্রযোজ্য।

৩. শাহ আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলবি রহ. এর মতে, যে হাদিসের মধ্যে সহিহ হাদিসের বৈশিষ্ট কম থাকে এবং তা দূর করার কোন পদ্ধতি থাকে না, তাকে 'হাসান লিজাতিহি' বলে।
মুদ্দাকথা: যে হাদিস দুর্বল নয়, কিন্তু সহিহ'র মর্তবায় উন্নীত হতে পারেনি তাই হাসান লি-যাতিহি। অথবা বলা যায় জঈফ রাবি থেকে মুক্ত হাদিস হাসান লি-যাতিহি। এ হিসেবে হাসান হাদীস সহি হাদীসের একটি প্রকার। সহিহ বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়, হাসান হল তার সর্বনিম্ন প্রকার।
হাসান হাদিসের উদাহরণ :
عن سفيان عن عبد الله بن عقيل عن محمد بن الحنفية عن على رض عن النبى صلى الله عليه وسلم ، قال : مفتاح الصلاة الطهور -
এ হাদিসটিতে সহিহ হাদিসের যাবতীয় শর্তাবলী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও একন রাবির জাবত তথা স্মরণশক্তিতে কিছুটা দূর্বলতা আছে। তাই এটি হাসান হাদিস।

মুফতি মনিরুল ইসলাম
মুহাদ্দিস, জামিয়া ফারুকিয়া রওজাতুল উলুম, মুন্সীগঞ্জ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন