বর্তমান মুসলামানদের ধর্মীয় সংস্থাসমূহ সব সময় এ চিন্তায় থাকে যে, তাদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জিত হোক। এ লক্ষ্যে বিশাল বিশাল সমাবেশ ও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। নিজেদের দীর্ঘ কর্মসূচি ও প্ল্যান-প্রোগ্রাম প্রচার করা হয়। অতীতের কীর্তিসমূহকে কবিতা ও সংগীতের মাধ্যমে আবৃত্তি করা হয়। এমনকি সাংবাদিক সম্মেলন করে এগুলোকে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়, আর একইে পূর্ণ সফলতা জ্ঞান করা হয়। কোনো প্রোগ্রামে যদি বিপুল লোকের সমাবেশ ঘটে, পত্রপত্রিকা ও রেডিও টিভির সংবাদে উত্তম রিপোর্ট প্রকাশ ও প্রচার করা হয় তবে তো আনন্দের সীমা-পরিসীমা থাকে না। মনে হয় এটাই যেন আমাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন। চাই জনসাধারণের এবং ইসলাম ও মুসলমানের তাতে কোনো উপকার না-ই হোক। শুধু মিডিয়ার প্রশংসাই আমাদের আনন্দদানের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যায়। অথচ এ প্রচার ও প্রকাশনার জন্য না-জানি কত চেষ্টা, শ্রম ও তদবির করতে হয় এবং কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ উদ্দেশ্যে শরিয়তের খেলাফ নাজায়েয কাজ ও উপায় অবলম্বন করতে হয়; কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও আসল ফলাফল শূন্য হয়। বস্তুত এসব লৌকিকতা জনসাধারণের মনে কোনো রেখাপাত করে না।
আম্বিয়ায়ে কেরামের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা :
সাময়িকভাবে বিভিন্ন কাজের দরুন মানুষের প্রশংসা ও সুনাম অর্জিত হয়। কিন্তু এটা আল্লাহ তাআলার নিকট মাকবুল হওয়ার আলামত নয়। বস্তুত অন্তরে স্থান করে নেয়া এবং স্থায়ী সুখ্যাতি ও মাকবুলিয়্যত অর্জন করা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ছাড়া সম্ভব নয়। লৌকিকতা ও কৃত্রিমতার মাধ্যমে সাময়িক বাহবাহ কুড়ানো মাকড়সার জালের মতো দুর্বল ও অস্থায়ী বিষয়। বরং এর দরুন আরো কুধারণা সৃষ্টি হয়। এটা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
من أسخط الله في رضى الناس سخط الله عليه وأسخط عليه من أرضاه في سخطه ومن أرضى الله في سخط الناس رضي الله عنه وأرضى عنه من أسخط في رضاه حتى يزينه ويزين قوله وعمله في عينه
“যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টির লক্ষ্যে আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে তার ওপর আল্লাহ তাআলা নিজেও অসন্তুষ্ট হন এবং যাদেরকে সে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিল তাদেরকেও অসন্তুষ্ট করে দেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মানুষকে অসন্তুষ্ট করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে, শুধু আল্লাহই তার ওপর সন্তুষ্ট হন না বরং যারা তার ওপর অসন্তুষ্ট ছিল তাদেরকেও তিনি সন্তুষ্ট করে দেন। আর তাদের দৃষ্টিতে ওই ব্যক্তির কাজকর্ম, কথাবার্তা সবকিছুকে সুশোভিত ও সন্তোষজনক করে দেন।” [আত্ তারগিব ওয়াত্ তারহিব : ১৩৯/৩]
হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করে রাসুলে কারিম সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
مَنْ طَلَبَ مَحَاْمِدَ النَّاسِ بِمَعْصِيَةِ اللهِ عَزَّ، وَجَلَّ عَادَ حَامِدُهُ لَهُ ذَامًّا
“যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি লাভ করার চেষ্টা করে পরিণতিতে তার প্রশংসাকারীরাও তার দুর্নামকারী হয়ে যায়।” [আত্ তারগিব ওয়াত্ তারহিব : ১৩৯/৩]
সুতরাং ধর্মীয় সংস্থাসমূহ যদি কেয়ামত পর্যন্ত কেবল প্রচারমাধ্যমের প্রচারণাকে নিজেদের মাকবুলিয়্যত ও জনপ্রিয়তার ভিত্তি মনে করে তাহলে তাতে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে না। শরিয়তের গ-ির মধ্যে থেকে জাতির জরুরি খেদমত আঞ্জাম দিলে কোনো প্রচারণা ছাড়াই এমনিতেই মানুষের মুখে তাদের সেবা ও কর্মের প্রশংসা উচ্চারিত হবে। কোনো দল বা সংস্থার আসল পরিচয় লাভ হবে তাদের কর্মের দ্বারা। কর্ম যাই হোক নামের জন্য হাজারো চেষ্টা তদবির করলেও তা অহেতুক ও অন্তঃসারশূন্য হয়ে যায়।
কাজেই ইসলামি সংস্থাসমূহের কর্মকর্তাদের জন্য নিজেদের প্রতিটি কাজেকর্মে শরিয়তের পূর্ণ পাবন্দি ও আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিকে সামনে রাখা বাঞ্ছনীয়। পার্থিব রীতিনীতি ও প্রথাগত বিষয়াদিতে প্রভান্বিত হওয়ার পরিবর্তে পূর্ণ শক্তি ও দৃঢ়তার সাথে শরিয়তের আঁচল ধারণ করার মধ্যেই সফলতা ও নাজাত নিহিত।
-মাও. সালমান মনসুরপুরি হাফিজাহুল্লাহ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন