হজরত মুসা আ. মিসরে অবস্থানকালে এক ইসরাইলি এবং এক মিসরির ঝগড়া থামাতে গিয়ে মিসরিকে থাপ্পড় মারলে সে তৎক্ষণাত মৃত্যুবরণ করে এবং ফেরাউনের লোকজন মুসা [আ.]-কে গ্রেফতার করার জন্য সৈন্য প্রেরণ করে। তাদের হাত থেকে বাঁচতে মুসা [আ.] পার্শ্ববর্তী মাদয়ান দেশের দিকে হিজরত করেন। মাদয়ানে এসে তিনি একটি কূপে দুটি বালিকার পশুগুলোকে পানি পান করানোর জন্য এগিয়ে যান। তাদের পশুগুলোকে পানি পান করালে তারা তাদের বাড়িতে চলে যায় এবং মুসা [আ.] সেখানে বসে থাকেন। প্রতিদিনের অভ্যাসের বিপরীত তাড়াতাড়ি ফিরে আসার কারণে বালিকা দুটির পিতা অত্যন্ত আশ্চর্য হলেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা পুরো ঘটনা খুলে বললো। কেমন করে জনৈক মিসরীয় লোক তাদেরকে সাহায্য করেছে। পিতা বালিকা দুজনের একজনকে বললেন, শিগগিরই যাও, তাকে এখনই আমার কাছে নিয়ে এসো।
এদিকে পিতা ও কন্যাদের মধ্যে এ-ধরনের কথাবার্তা হচ্ছিলো আর ওদিকে হজরত মুসা [আ.] পানি পান করানোর পর কাছেই একটি গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। একে তো সফরের ক্লান্তি, তার ওপর ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্বালা। হজরত মুসা [আ.] প্রার্থনা করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, এ-সময়ে উত্তম সরঞ্জাম তা-ই যা আপনি নিজ কুদরতে আমার জন্য নাযিল করবেন, আমি তার কাঙাল।’ বালিকা ওখানে পৌঁছে দেখলো কূপের কাছেই তিনি বসে আছেন। লজ্জায় দৃষ্টি অবনত করে বালিকা বললো, আপনি আমাদের বাড়িতে চলুন। আমাদের পিতা আপনাকে ডাকছেন। তিনি আমাদের প্রতি আপনার অনুগ্রহের বিনিময় প্রদান করবেন। হজরত মুসা [আ.] ভাবলেন, হয়তো এই সুযোগে কোনো উপায়ের দেখা পাওয়া যেতে পারে। এখন যাওয়াই উচিত, তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করা সঙ্গত নয়। আল্লাহপাক যে আমার দোয়া কবুল করেছে এটা তারই সূচনা। হজরত মুসা [আ.] উঠে দাঁড়ালেন এবং বালিকাকে বললেন, তুমি আমার চলো না; বরং আমার পেছনে চলো এবং ইশারা-ইঙ্গিতে আমাকে পথ দেখিয়ে দাও।
মুসা [আ.] সম্মানিত ব্যক্তির বাড়ির দিকে যাত্রা তো কললেন, কিন্তু তিনি স্বভাবগত মর্যাদাবোধ ও আত্মসম্মানের প্রতি লক্ষ করে বার বার বালিকাটির এ-কথা মনে করে দুঃখ পাচ্ছিলেন যে, আমার পিতা আপনার এই পরিশ্রমের বিনিময় দিতে চান। কিন্তু সফর ও তাঁর অবস্থার সঙ্কটময়তা শেষ পর্যন্ত তাঁকে এই পরামর্শই দিলো যে, এখন এই অপছন্দনীয় কাজটাকেই সহ্য করে নাও। তাতে এই নিঃসঙ্গতার সময়ে একজন সহানুভূতিশীল সান্ত্বনাদাতা বন্ধুর স্বতন্ত্র সমবেদনা লাভ করা যেতে পারে।
হজরত মুসা [আ.] চলতে চলতে গন্তব্যস্থানে এসে পৌঁছলেন। তিনি গঠন ও স্বভাব-চরিত্রে বুযুর্গ ব্যক্তি ও বালিকা দুজনের পিতার সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ করলেন। বুযুর্গ ব্যক্তি প্রথমে তাঁকে খাবার খাওয়ালেন। তারপর নিশ্চিন্ত মনে বসিয়ে তাঁর যাবতীয় অবস্থা শুনলেন। হজরত মুসা [আ.] নিজের জীবনবৃত্তান্ত এবং বনি ইসরাইলের ওপর ফেরআউনের নানাবিধ অত্যাচার ও নিপীড়নের বর্ণনা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঘটনা বিস্তারিত শুনালেন। সবকিছু শোনার পর বুযুর্গ ব্যক্তি মুসা [আ.]-কে সান্ত্বনা দিলেন এবং আল্লাহ তাআলার শোকর, এখন তুমি জালিমদের কবল থেকে মুক্তি লাভ করেছো, কোনো ভয়ের কারণ নেই।
এখানে অত্যাচারীদের অত্যাচার ও জালিমদের জুলুম বলতে বনি ইসরাইলের শিশুদেরকে হত্যা, বনি ইসরাইলকে দাস বানিয়ে রাখা, তাদের নানা ধরনের দুর্দশা ও যন্ত্রণার মধ্যে আবদ্ধ রাখার ঘটনাবলিই উদ্দেশ্য হতে পারে। তা ছাড়া তাদের কুফর এবং ভূপৃষ্ঠে ফেতনা-ফাসাদ ও অনর্থ বিস্তার করাও উদ্দেশ্য হতে পারে। অন্যথায় কিবতি লোকটিকে হত্যা করে ফেলার ব্যাপারে মুসা [আ.] নিজের কাজে জন্য অনুতপ্ত ছিলেন এবং নিজেকে দোষী মনে করতেন। এই ঘটনা কুরআনুল কারিমে বর্ণিত হয়েছে এভাবে—
وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَاءَ مَدْيَنَ قَالَ عَسَى رَبِّي أَنْ يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبِيلِ * وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِنْ دُونِهِمُ امْرَأتَيْنِ تَذُودَانِ قَالَ مَا خَطْبُكُمَا قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّى يُصْدِرَ الرِّعَاءُ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ * فَسَقَى لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ * فَجَاءَتْهُ إِحْدَاهُمَا تَمْشِي عَلَى اسْتِحْيَاءٍ قَالَتْ إِنَّ أَبِي يَدْعُوكَ لِيَجْزِيَكَ أَجْرَ مَا سَقَيْتَ لَنَا فَلَمَّا جَاءَهُ وَقَصَّ عَلَيْهِ الْقَصَصَ قَالَ لَا تَخَفْ نَجَوْتَ مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
‘যখন মুসা মাদয়ান অভিমুখে যাত্রা করলো তখন বললো, আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করবেন। যখন সে মাদয়ানের কূপের কাছে পৌঁছলো, দেখলো, একদল লোক তাদের পশুগুলোকে পানি পান করাচ্ছে এবং তাদের পেছনে দুইজন নারী তাদের পশুগুলোকে আগলাচ্ছে। মুসা বললো, তোমাদের কী ব্যাপার? তারা বললো, আমরা আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ রাখালেরা তাদের জানোয়ারগুলোকে নিয়ে সরে যায়। আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ। মুসা তখন তাদের পক্ষে পশুগুলোকে পানি পান করালো। তারপর সে ছায়ার নিচে আশ্রয় গ্রহণ করে বললো, হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমার প্রতি যে-অনুগ্রহ করবে আমি তার কাঙাল। তখন নারী দুজনের একজন লজ্জা-জড়িত চরণে তার কাছে এলো এবং বললো, আমার পিতা আপনাকে আমন্ত্রণ করছেন, আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করানোর পারিশ্রমিক দেয়ার জন্য। তখন মুসা তার কাছে এসে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলো। সে বললো, ভয় করো না, তুমি জালিম সম্প্রদায়ের কবল থেকে বেঁচে গেছো।’ [সুরা কাসাস আয়াত ২২-২৫]
সূত্র : কাসাসুল কুরআন, তাফসিরে ইবনে কাসির, নবীদের কাহিনিী
হাফেজ মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন