মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

হযরত জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী দা.বা. বলেন

হযরত জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী দা.বা. বলেন, একবার ফয়সালাবাদ থেকে একজন মহিলা আমার বাড়িতে এলেন। আমার বিবি সাহেবা বললো, জনাব ! ঐ মহিলার কথা শুনেন কী যেনো বলতে চায়। বেচারিকে খুব পেরেশান মনে হচ্ছে। আসার পর থেকে শুধু কেঁদেই যাচ্ছে।
:
তাকে সালাম দিলাম। পর্দার ওপার থেকে মহিলা বললো, আমার স্বামী বড়ো ইণ্ডাস্ট্রিজের মালিক। খুব ধনী মানুষ। অঢেল সম্পদ তার। বিয়ের আট বছর পরও আমাদের কোনো সন্তান হয়নি। এতে আমি পেরেশান নই। স্বামী আমার সাথে আনন্দেই দিনাতিপাত করছেন। ভাগ্য থাকলে সন্তান হবে। না হয় আল্লাহ কপালে যা রেখেছেন তাতেই সন্তুষ্ট। একথা বলে মনকে প্রবোধ দেই। স্বামী আমাকে খুব সোহাগ করেন। ভালোবাসা দিয়ে আমাকে আগলে রেখেছেন। ঘরের যাবতীয় খরচ, গার্ড, বাবুর্চি, চাকর-বাকর ও মালির খরচ সবই তিনি বহন করেন। 
:
আমাদের গাড়ি আছে, ড্রাইভার আছে , আরাম-আয়েশের সকল উপকরণ আল্লাহ আমাদের দান করেছেন। তবে আমার পেরেশানির কারণ হলো, আমার স্বামী আমার ব্যক্তিগত খরচের জন্য মাত্র ৫০ হাজার রুপি দিয়ে থাকেন। যা দিয়ে আমার খরচ চলে না। এটুকু বলে সে ফোঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। যেনো তারচে‘ দুঃখী পৃথিবীতে আর কেউ নেই ! আপন কেউ মারা গেলে মানুষ যেমন কাঁদে মহিলা ঠিক সেভাবে কাঁদছিলো।
:
আমি তাকে বোঝালাম, আপনার পেরেশানি দূর করার কোনো উপায় নেই। ৫০ হাজার কেনো এর পরিবর্তে এক লক্ষ রুপি দিলেও আপনার পেরেশানি দূর হবে না। দুই লাখ, তিন লাখ কিংবা প্রতি মাসে পাঁচ লাখ রুপি দিলেও হবে না।
: মহিলা বললো, হুযুর সাহেব ! আমাকে বুঝিয়ে বলুন । আপনার কোনো কথাই তো আমি বুঝতে পারছি না !
:
অধম বললাম, যে পদ্ধতিতে আপনি সমস্যা দূর করতে চাইছেন, তাতে আপনার সমস্যা কখনো কাটবে না; বরং বাড়তেই থাকবে। 
: মহিলা কাতর কণ্ঠে বললেন, কিন্তু আমিতো সমস্যা দূর করতে চাই!
: যদি সমাধান চান তাহলে শরীয়ত মোতাবেক জীবন পরিচালনা করুন। গোনাহমুক্ত জীবন গ্রহণ করুন। পাপপূর্ণ জীবনাচারে অভ্যস্ত হয়ে আপনি আল্লাহকে নারাজ করে ফেলেছেন। ফলে আপনার মালের মধ্যে বরকত চলে গেছে। তাই সামনের দিনগুলোতে সুন্নতের পাবন্দী করুন। সুন্নত মোতাবেক জীবন-যাপন করে আল্লাহকে রাযি করিয়ে নিন। যাপিত জীবনের কৃতকর্মের জন্য তওবা করুন। তাহলে পুনরায় আপনার মালের মধ্যে বরকত আসবে। অন্তরের বেচাইনি দূর হবে। সব ধরনের পেরেশানি চলে যাবে।
:
আমার কথাগুলো তার অন্তরে রেখাপাত করলো। মহিলা বলতে লাগলো, হুযুর আমি সত্য দীলে তওবা করতে চাই। আমাকে তওবা পড়িয়ে দিন। অধম তাকে তওবার কালিমা পড়িয়ে বিদায় দিলাম।
:
তিন চার মাস পর টেলিফোনে সেই মহিলা আমাকে জানালো, হুযুর! আমি আলহামদুলিল্লাহ নামাযের পাবন্দ হয়েছি, বোরখা নিয়েছি। টিভি দেখা পরিহার করেছি। আমি তো এখন পুরোপুরি মৌলভি হয়ে গেছি ! কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো এখন ১৫ হাজার রুপি দিয়ে আমার খরচ চলে যায়। অবশিষ্ট টাকা আমি এতীম ও বিধবাদের মাঝে বণ্টন করে দেই।
:
বন্ধুরা ! আমাদের আশেপাশে নজর বুলালেই অনেককে দেখতে পাবো যারা প্রতিমাসে লাখ টাকা কামাই করেও সংসার চালাতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন। আবার কেউ কেউ মাসে মাত্র ৫/৭/১০ হাজার টাকা দিয়ে স্বাচ্ছন্দে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। যেমন মনে করুন, আমরা যারা কওমি মাদরাসার খিদমতের সাথে জড়িত কিংবা কোনো মসজিদের খিদমাত করছি তাদের বেতনের কথা শুনলে সবাই আকাশ থেকে পড়ে। এই বেতনে বর্তমান বাজারে চলা মুশকিল। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ বুকে হাত রেখে বলতে পারি আমাদেরচে‘ তৃপ্তির জীবন কারো নেই। সেটা হয়তো আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের সন্তুষ্টিরই প্রমাণবহ। কারণ সুন্নাতে নববীর আদর্শকে জীবনে বাস্তবায়নে আমরা প্রচেষ্ট থাকি।
:
আরেকটা বিষয় ভেবে দেখুন তো ! কী পরিমান সম্পদ হলে আপনি ধনী হতে পারবেন? আপনি যদি লাখ টাকার মালিক হোন তাহলে কোটি টাকার মালিকের তুলনায় আপনি গরিব। তিনি শত কোটির মালিকের তুলনায় গরিব। তিনি হাজার কোটির তুলনায়। তাহলে বুঝাগেলো পৃথিবীতো সম্পদের দ্বারা পূর্ণতা অর্জন সম্ভব নয়।
:
তাই আসুন ! সম্পদ কামানোর নেশায় না পড়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির পথে নিজেকে পরিচালনা করি। তাহলে অল্প সম্পদের মাঝেই আল্লাহ পাক বরকত দিবেন। অন্তরে তৃপ্তি দিবেন। সর্বোপরি পৃথিবীতেই ভোগ করতে পারবো জান্নাতের মজা।
“সম্পদ অর্জ করা যাবে না তা বলছি না। সম্পদ অর্জনকে জীবনের মাকসাদ বানানো যাবে না।“
:
আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার তৌফিক দান করুক। আমীন।।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন