রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

’মুসলিম’ বনাম ‘আহলে হাদীস’


                                                                                بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
‪#‎মুযাফফর_বিন_মুহসিন‬ – ১ (‘ভ্রান্তির বেড়াজালে ইক্বামতে দ্বীন’ পৃ: ২৩০) : বর্তমানে হক্বপন্থী ও মুক্তিপ্রাপ্ত দলের পরিচিতি নিয়ে একশ্রেণীর অতি উৎসাহী ব্যক্তি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। রাসূল (ছাঃ)-এর যুগ থেকেই হক্বপন্থীদেরকে ‘আহলেহাদীছ’, ‘সালাফী’, ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত’ নামে উল্লেখ করা হলেও নতুন করে আবিষ্কার করে দাবী করে হচ্ছে যে, ‘মুসলিম’ বলে পরিচয় দিতে হবে। অনুরূপভাবে জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন সম্পর্কেও একশ্রেণীর লোকের এলার্জি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ জন্য পরিশিষ্ট অংশে ‘তাওহীদের ডাক’-এর দুইটি সম্পাদকীয় যোগ করা হল। আশা করি হঠাৎ গজিয়ে উঠা ঠুনকো যুক্তি কর্মীদেরকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।
‪#‎জবাব‬-১ : ক) লেখক সূত্রহীনভাবে হক্বপন্থীদের নাম হিসেবে – ‘আহলেহাদীছ’, ‘সালাফী’, ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত’ রসূলুল্লাহ (স)এর যুগ থেকে উল্লেখ করেছেন। আমরা পরবর্তিতে দেখব, তিনি এর সমর্থনে কুরআন ও সহীহ হাদীস থেকে ‘রসূলের যুগের’ কিছুই উল্লেখ করতে পারেন নি। ফলে তাঁর দাবীটিই অসত্য।
খ) লেখক ‘মুসলিম’ বলে পরিচয় দেয়াকে ‘নতুন করে আবিষ্কার’ বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
هُوَ سَمَّكُمُ الْمُسْلِمِيْنَ مِنْ قَبْلُ وَفِيْ هذَا
“তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম, এর আগে এবং এখানেও (কুরআনে)।” [সূরা হাজ্জ : ৭৮]
গ) লেখক ‘মুসলিম’ নামটিকে ঠুনকো যুক্তি বলে উল্লেখ করছেন। অথচ আল্লাহ তা‘আলার ঘোষণা অনুযায়ী এই নামটি আল্লাহ তা‘আলা দিয়েছেন, যা কুরআনের পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত। আমরা কিছু পরে দেখব লেখকের দাবীকৃত হক্বপন্থীদের পরিচয় – ‘আহলেহাদীছ’, ‘সালাফী’, ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত’ মুসলিম বিজ্ঞ আলেমদের পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য। যাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা সুন্নাত ও ইলমেকে হেফাযত করেছিলেন। সেটা ‘মুসলিম’ নামের মত উম্মাতে মুহাম্মাদী (স)-এর সর্বসাধারণের পরিচয় নয়।
ঘ) ‘তাওহীদের ডাক’-এ প্রকাশিত ‘ইসলাম বনাম ফের্কাবন্দী’ (জুলাই-আগষ্ট ২০১৩) নিয়ে আমরা আলোচনা করব, যা ঐ বইয়ের ২৩০-৩৪ পৃষ্ঠাতে আছে। অপর বিষয়টি (২৩৪-২৩৯) নিয়ে আলোচনা এখানে করা হবে না। তবে কিছু পরোক্ষ জবাব এই আলোচনাতেই দিয়ে দেয়া হবে, ইনঁশাআল্লাহ।
‪#‎কুরআনের‬ ন্যায় ‘মুসলিমদের জামা‘আত’-কে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে
#মুযাফফর_বিন_মুহসিন – ২ (পৃ: ২৩০) : ইসলাম মহান আল্লাহ প্রদত্ত এক সার্বজনীন জীবন বিধান। মানব জাতির সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের মধ্যে এর বাস্তব নমুনা বিদ্যমান। তবে এ সবের মৌলিক উদ্দেশ্য হল, মানুষকে পরীক্ষা করা। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরে ‘ছিরাতে মুস্তাক্বীমে’ চলার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সাথে ভ্রান্ত পথে চলতে নিষেধ করেছেন (আলে ইমরান ১০১, ১০৩; আন‘আম ১৫৩)।
জবাব-২ : সূরা আলে ইমরানে ১০১ নং আয়াতটিতে বলা হয়েছে : আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে সিরাতে মুস্তাক্বীমের হিদায়েত পাওয়া যাবে।
১০২ নং আয়াতটিতে বলা হয়েছে : আল্লাহকে সঠিকভাবে ভয় করতে হবে এবং মুসলিম হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে। (কিন্তু লেখক তা উল্লেখ করেন নি)
১০৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে : আল্লাহর রুজ্জুকে জামা‘আতবদ্ধভাবে আঁকড়ে থাকতে বলা হয়েছে। ফিরক্বা করতে নিষেধ করা হয়েছে। নবী (স) বলেছেন : كتاب الله عز وجل هو حبل الله ‘কিতাবুল্লাহ হল হাবলুল্লাহ (আল্লাহর রজ্জু)।’ [সহীহ মুসলিম, তাহ: মিশকাত হা/৬১৩১]
রসূলুল্লাহ (স) এই জামা‘আত ও ফিরক্বার ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিম্নরূপে :
تَلْزَمُ جَمَاعَةَ الْمُسْلِمِينَ وَإِمَامَهُمْ فَقُلْتُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُمْ جَمَاعَةٌ وَلاَ إِمَامٌ قَالَ فَاعْتَزِلْ تِلْكَ الْفِرَقَ كُلَّهَا
“তুমি ‘মুসলিমদের’ জামা‘আত ও তাদের ইমামকে আঁকড়ে থাক। আমি (হুযায়ফা রা.) জিজ্ঞাসা করলাম : যদি তাদের (মুসলিমদের) জামা‘আত ও ইমাম না থাকে? তিনি (স) বললেন : “তখন সমস্ত ফিরক্বাকে ত্যাগ কর।” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত- ফিতনা অধ্যায় ১০/৫১৪৯]
অন্যত্র নবী (স) বলেছেন : ثلاث لايغل عليهن قلب رجلٍ مسلم اخلاص العمل لله والنصيحة لولاة الامر ولزوم جماعة المسلمين
“তিনটি বিষয়ে মুসলিমের অন্তর খেয়ানত করতে পারে না : ১) আল্লাহর জন্য আমলকে খালেস করা। ২) নেতৃবৃন্দের হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া। ৩) ‘মুসলিমদের’ জামা‘আতকে আঁকড়ে থাকা।” [তাবারানীর ‘আওসাত’ ৬/৮৪, বর্ণনাকারীগণ সিক্বাহ ও এর সনদ সহীহ। এর সাক্ষ্যমূলক র্বণনা মুসনাদে হুমায়দীতে আছে। শায়েখ আলবানী (রহ) তাঁর ‘মিশকাতে’ (১/৭৮) সনদটিকে সহীহ বলেছেন।]
এখানে ঐক্যবদ্ধ মুসলিম দায়িত্বশীলদের আঁকড়ে থাকাকে ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’ বলা হয়েছে। সূরা আলে ইমরানের ১০১ ও ১০৩ আয়াতে যাকে ‘সিরাতে মুস্তাক্বীম’ ও ‘আল্লাহর রুজ্জু’ বলা হয়েছে, সূরা আনয়ামের ১৫৩ আয়াতে সেটারই অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। ভিন্নপথ তথা ফিরক্বাদের অন্তর্ভুক্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে। সূরা আলে-ইমরানের ১০২ ও ১০৩ নং আয়াত মিলিয়ে পড়লে বুঝা যায়, ফিরক্বাদের পথ মুসলিমদের পথ নয়। পূর্বোক্ত হাদীস দু’টির দাবীও সেটাই। এবার উক্ত আয়াতগুলো পরিপূর্ণভাবে পড়ুন। আপনার কাছে সুস্পষ্ট হবে, লেখক কেন সূরা আলে-ইমরানের ১০২ নং আয়াতটি উল্লেখ করলেন না। সূরা আলে-ইমরান ১০২ নং আয়াতটিসহ ১০৩ নং আয়াতটি নিম্নরূপ:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ -وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
“হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত, আর মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। আর তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে জামা‘আতবদ্ধভাবে আঁকড়ে থাক এবং ফিরক্বা সৃষ্টি করো না।”
বুঝা গেল, ‘মুসলিম’ এবং ‘ফিরক্বা’ ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। এ কারণে কোন মুসলিম ফিরক্বা সৃষ্টি করে না। সে `মুসলিম’ পরিচয়েই মৃত্যুবরণ করে, ফিরক্বার পরিচয়ে নয়। জামা‘আতবদ্ধ হতে হবে মুসলিম দাবীর ভিত্তিতে। আহলেহাদীস ভিত্তিক জামা‘আতবদ্ধতা ও তাঁদের ইমাম কেন্দ্রিক আনুগত্য ও বায়য়াতের কোন হাদীস নেই। তারা জামা‘আতবদ্ধ থাকার ব্যাপারে যেসব আয়াত ও হাদীস ‍উল্লেখ করে থাকে – তার সাথে ‘মুসলিম জামা‘আত’ ও তাদের ইমাম সম্পৃক্ত। অর্থাৎ সেগুলো ক্ষুদ্র কোন সংগঠনের জামা‘আতবদ্ধতা নয়। বরং সেটি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সংঘবদ্ধতা। সুতরাং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংগঠনের পক্ষে উক্ত আয়াত ও হাদীসগুলোর ব্যবহার প্রকারান্তরে মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি বা ফিরক্বা সৃষ্টির নামান্তর। তবে মুসলিমদের মধ্যে সবসময় সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধমূলক বিভিন্ন ছোট ছোট গোষ্ঠী সংস্কারের উদ্দেশ্য থাকতেই পারে। যাদের নিজেদের দাওয়াতের সমর্থনে পূর্বোক্ত আয়াত ও হাদীসগুলো ব্যবহার না করে নিম্নোক্ত আয়াত উপস্থাপন করবে। যেমন – আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা দাওয়াত দেবে কল্যাণের দিকে। আর নির্দেশ দেবে সৎকাজের এবং নিষেধ করবে অসৎকাজের। আর এরাই হল সফলকাম।” [সূরা আলে ইমরান : ১০৪]
এ সমস্ত দলগুলোর কাজ হল, হক্ব বিষয়গুলো উপস্থাপন করে যাওয়া। তারাই একমাত্র মুসলিমদের আনুগত্য পাওয়ার যোগ্য, যাকাত পাওয়ার হক্বদার – প্রভৃতি দাবী করার কোন এখতিয়ার তাদের নেই।
‘সিরাতে মুস্তাক্বীম’ হল ফিরক্বা ও ইখতিলাফ (মতপার্থক্য) মুক্ত মুসলিমদের পথ
#মুযাফফর_বিন_মুহসিন – ৩ (পৃ: ২৩০) :
সৎ আমলের নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত আমল সম্পর্কে জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন (কাহফ ১০৩-১০৬)। আল্লাহর উক্ত পথনির্দেশ নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করে আত্মসমর্পণ করবে বলে তিনি নাম রেখেছেন মুসলিম (হজ্জ ৭৮)। কিন্তু মুসলিম নামে ভূষিত হওয়া সত্ত্বেও ছিরাতে মুস্তাক্বীম থেকে বিচ্যুত হয়ে দলে দলে বিভক্ত হয়েছে। রাসূল (ছাঃ)-কে লক্ষ্য করে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলুন! নিশ্চয় এই সোজা পথটি আমার পথ। তোমরা এই পথেরই অনুসরণ করবে। অন্যান্য পথের অনুসরণ কর না। অন্যথা এই সোজা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। এ ব্যপারে আল্লাহ তোমাদেরকে অছিয়ত করছেন, যেন তোমরা সতর্কতা অবলম্বন কর (আন‘আম ১৫৩; আহমাদ হা/৪১৪২)। উক্ত আয়াতে অন্য যাবতীয় পথ বর্জন করে একটি পথে চলতে বলা হয়েছে।
কিন্তু মুসলিম নামে ভূষিত হওয়া সত্ত্বেও জিদ ও গোঁড়ামীর কারণে ‘ছিরাতে মুস্তাক্বীম’ থেকে বিচ্যুত হয়ে দিকভ্রান্তরা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে (শূরা ১৪; আন‘আম ১৫৯)।
[দাগানো অংশটুকু ‘তাওহীদের ডাক’ জুলাই-আগষ্ট’১৩-তে ছিল (দ্র: সম্পাদকীয়)। পরবর্তিতে প্রকাশিত আলোচ্য বইটিতে বাদ দেয়া হয়েছে। শেষ প্যারাটি ‘তাওহীদের ডাকে’ ছিল না]
#জবাব-৩ : সূরা কাহফের ১০৩ ও ১০৪ নং আয়াতে ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী ১০৫ ও ১০৬ নং আয়াতে যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা কাফের। কেননা তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা আল্লাহর আয়াত ও আখিরাতের প্রতি কুফরি করতো এবং রসূল (স) ও আয়াত নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রুপ করত। এদের সাথে সূরা হজ্জের ৭৮ নং আয়াতটির কোন সম্পর্কই নেই। কেননা শেষোক্ত আয়াতে যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারী নয়, আবার রসূল ও আয়াতকে অস্বীকারকারী নয়। বরং সম্পূর্ণ বিপরীত। লেখক কিভাবে সূরা দু’টির আয়াতের মধ্যে মূলভাব দেখিয়ে সম্পর্ক সৃষ্টি করলেন!?
– যা ইলমের সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না।
অতঃপর লেখক সূরা আন‘আমের ১৫৩ নং আয়াতটি উল্লেখ করেছেন। এর দাবী হল, সিরাতে মুস্তাক্বীমের উপর থাকা ও ভিন্নপথে না যাওয়া। তা ছাড়া নিচের আয়াতটি থেকে বুঝা যায়, সত্যিকার ঈমানদারদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ইখতিলাফ ও ফিরক্বাভিত্তিক মতপার্থক্য থেকে হেদায়েত দান করেন। স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ইখতিলাফ থেকে রক্ষা করে সিরাতে মুস্তাকীমের পথে পরিচালিত করেন। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ (118) إِلَّا مَنْ رَحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ
“তোমাদের রব ইচ্ছা করলে মানুষকে একটি উম্মাত করতে পারতেন। কিন্তু তারা ইখতিলাফ করতেই থাকবে, তবে যারা রহমতপ্রাপ্ত (তারা ছাড়া)। এজন্যেই তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”[সূরা হুদ : ১১৮-১৯]
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
“অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নিজ ইচ্ছায় ঈমানদারদেকে হিদায়েত দিলেন তাদের মধ্যকার হক্বের ব্যাপারে ইখতিলাফকৃত বিষয়গুলোতে, আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সিরাতে মুস্তাক্বীমের হিদায়েত দান করেন।” [সূরা বাক্বারাহ : ২১৩; পূর্ণাঙ্গ আয়াতটি পড়ুন, বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হবে]
এ থেকে বুঝা গেল, যারা ইখতিলাফ ও ফিরক্বাবাজি করে, তারা রহমত ও হিদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত নয়। এ কারণে সূরা আলে-ইমরানের ১০২ নং আয়াতটিতে মু’মিনদেরকে ‘মুসলিম’ হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে বলা হয়েছে। অন্যত্র সিরাতে মুস্তাক্বীম প্রাপ্ত লোকদেরকে ‘মুসলিম’ শব্দেও ভূষিত করা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (161) قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (162) لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
“বলুন! অবশ্যই আমার রব আমাকে সিরাতে মুস্তাক্বীমের প্রতিষ্ঠিত দ্বীন দিয়েছেন, যা একনিষ্ট মিল্লাতে ইবরাহীমের অন্তর্ভুক্ত, আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বলুন : আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরন আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই। আর আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে – আমিই যেন প্রথম মুসলিম হই।” [সূরা আন‘আয়ম : ১৬১-১৬২]
পুনরায় বুঝা গেল, যারা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে – তারা কুরআনের দাবীকৃত মু’মিন বা মুসলিম নয়। এ কারণে আমরা বাস্তব জীবনে দেখি, ফিরক্বাগুলো মু’মিন বা মুসলিম নামের চেয়ে নিজেদের বৈশিষ্ট্যগত নামকে বেশী ব্যবহার করে থাকে। এমনকি ঐ নামের পক্ষে বাতিল পন্থায় দলিল উপস্থাপন করে।
লেখক ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ বলতে হক্ব দল বুঝেছেন। আর ‘মুসলিমদের’ সম্পর্কে বলেছেন ‘জিদ ও গোঁড়ামীর কারণে সিরাতে মুস্তাক্বীম থেকে বিচূত হয়ে দিকভ্রান্তরা দলে দলে বিভ্রান্ত হয়েছে।’ অথচ শেষোক্ত আয়াতে মুসলিমরাই সিরাতে মুস্তাক্বীমের উপর রয়েছে বলে সুস্পষ্ট হয়। এখানে শাব্দিক মারপ্যাঁচে কিভাবে মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তাকে সিরাতে মুস্তাক্বীম বা হক্ব থেকে আলাদা করা যায়, সেটাই লেখক নিজ লেখনীর কৌশলে করার চেষ্টা করেছেন।
আয়াতের ও হাদীসের সঠিক প্রয়োগে জ্ঞানের অভাব
#মুযাফফর_বিন_মুহসিন – ৪ (পৃ: ২৩১) : প্রশ্ন হতে পারে মুসলিমদের মাঝে এত বিভক্তি ও দলাদলি কেন? এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ চাইলে তোমাদেরকে এক উম্মতভুক্ত করতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যে বিধান দিয়েছেন, সে ব্যাপারে পরীক্ষা করার জন্য তা করেননি। সুতরাং তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহর দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল। আর তোমরা কী বিষয়ে মতভেদ করছ সে বিষয়ে তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দিবেন’ (মায়েদাহ ৪৮)।* উক্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য রাসূল (ছাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। একটি ব্যতীত সবই জাহান্নামে যাবে। উক্ত জান্নাতী দলের পরিচয় সম্পর্কে বলেন, ‘আমি এবং আমার ছাহাবীরা যার উপর আছি তার উপর যারা থাকবে’ (তিরমিযী হা/২৬৪১)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সেটা হল, ‘জামা‘আত’ বা ঐক্যবদ্ধ একটি দল’ (আবুদাঊদ হা/৪৫৯৭)।
অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ইসলামের সূচনা হয়েছিল অল্প সংখ্যক মানুষের মাধমে। পুনরায় ইসলাম অল্প সংখ্যক মানুষের মাঝে ফিরে যাবে। তবে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের ‘তুবা’ নামকে গাছের সুসংবাদ। তারা হল, যারা আমার মৃত্যুর পর আমার সুন্নাতকে সংস্কার করবে, যখন মানুষেরা তাকে নষ্ট করবে’ )মুসলিম হা/৩৮৯; আহমাদ হা/১৬৭৩৬; ছহীহাহ হা/১৯৮৫ ও ২৫১৪)। **
উক্ত হাদীছগুলোতে ছিরাতে মুস্তাক্বীমের পথিকদের তিনটি পরিচয় ফুটে উঠেছে। আর উক্ত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জান্নাতী দল ক্বিয়ামত পর্যন্ত হক্বের উপর বিজয়ী থাকবে। তাদেরকে কেউ ক্ষতি করতে পারবে না (মুসলিম হা/৫০৫৯)।***
[‘তাওহীদের ডাকে’ তারকা (*) চিহ্নিত অংশগুলো ছিল নিম্নরূপ:
*সুতরাং তোমরা কল্যাণের দিকে প্রতিযোগিতা কর। তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল আল্লাহ। আর তোমরা কী বিষয়ে মতভেদ করছ সে বিষয়ে তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দিবেন’ (মায়েদাহ ৪৮)।
**এই অংশটি ‘তাওহীদের ডাকে’ ছিল না।
***রাসূল (ছাঃ) উক্ত হাদীছদ্বয়ে ছিরাতে মুস্তাক্বীমের পথিকদের দুইটি পরিচয় তুলে ধরেছেন। আর উক্ত জান্নাতী দল ক্বিয়ামত পর্যন্ত হক্বের উপর বিজয়ী থাকবে। তাদেরকে কেউ ক্ষতি করতে পারবে না (মুসলিম হা/৫০৫৯)। ]
#জবাব-৪ : লেখকের উদ্ধৃত সূরা মায়েদাহ-এর ৪৮ নং আয়াতাংশটি পড়লে বুঝা যায়, কল্যাণের জন্য বিভিন্ন উম্মাত করা হয়েছে। যেন তাদের মধ্যে কল্যাণের প্রতিযোগিতা থাকে। এরপরে মতভেদের বিষয়ে কোন নিন্দা বা আযাবের কথা বলা হয় নি। কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে আখিরাতে ঐ সমস্ত মতভেদের বিষয়কে চূড়ান্তভাবে জানানোর কথা বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যত্র ইখতিলাফ বা মতবিরোধকে নিম্নোক্ত আয়াতে আযাবের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ ۚ وَأُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
“তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা ফিরক্বা করেছে ও ইখতিলাফ করেছে – তাদের কাছে বাইয়েনাত (সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণ) আসার পর। তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক আযাব।” [সূরা আলে-ইমরান : ১০৫]
এই শেষোক্ত আয়াতটির সাথে লেখকের উল্লিখিত হাদীসগুলোর ব্যাখ্যার সম্পর্ক আছে। কিন্তু লেখকের উল্লিখিত আয়াতটির শাব্দিক তরজমার সাথে হাদীসগুলোর সরাসরি সম্পর্ক দেখছি না। কেননা সেখানে কল্যাণের কথাই ব্যক্ত হয়েছে। তবে মতবিরোধের বিষয়টি আমাদের শেষোক্ত্ (আলে ইমরান : ১০৫) আয়াতটি দ্বারা ব্যাখ্যা নিলে- লেখকের উপস্থাপনাটি সঙ্গত হয়, অন্যথায় নয়।
লেখকের হাদীস তিনটির প্রথম দু’টির দাবী হল, জান্নাতী দলটি রসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবীদের অনুসারী জামা‘আত। যা কুরআনের মাধ্যমে আরো সুস্পষ্ট হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ ۖ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
“যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে হিদায়েত প্রকাশিত হওয়ার পর এবং মু’মিনদের পথের বিরোধী পথে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কত নিকৃষ্ট স্থান।” [সূরা নিসা : ১০৫]
এখানে পূর্বের হাদীসটির ন্যায় মু’মিনদের পথের বিরোধিতাকারীকে জাহান্নামী বলা হয়েছে। যা মূলত নবী (স) ও সাহাবীদের জামা‘আত। কেননা এই জামা‘আতের বিরোধী পথে চলা মূলত ইসলাম বিরোধী পথে চলা। যার শাস্তি দুনিয়াতে মৃত্যুদণ্ড। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ (রা) বলেন :
قال رسول الله لا يحل دم امري مسلم يشهد ان لا اله الا الله واني رسول الله الا باحدي ثلاثٍ النفس بالنفس والشيب الزاني والمفارق لدينه ، التارك للجماعة
“রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: কোন মুসলিমের রক্ত হালাল নয় – যে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল। অবশ্য তিনটি বিষয়ের কোন একটি করলে (তাকে হত্যা করা হালাল হয়) – ১) হত্যার বদলে হত্যা, ২) বিবাহিত ব্যক্তি যিনা করলে, এবং ২) আল-জামা‘আত ত্যাগ করলে।” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৭/৩২৯৯]
লক্ষণীয়, লেখকের উল্লিখিত দ্বিতীয় হাদীসটিতে এই ‘আল-জামা‘আত’-কে জান্নাতী দল বলা হয়েছে। অন্যত্র এই ‘আল-জামা‘আতের’ পরিচয় নিম্নোক্তভাবে দেয়া হয়েছে। আয়েশা (রা) বলেন:
ماحل دم احد من اهل هذه القبلة الا من استحل ثلاثة اشياء قتل النفس والثيب الزاني المفارق جماعة المسلمين او الخارج من جماعة المسلمين [رواه ابن ابي شيبة ٤٢٨⁄٦ وسنده صحيح]
“আহলে ক্বিবলার রক্ত হালাল নয়। অবশ্য তিনটি ক্ষেত্রে (রক্ত) হালাল হয় – ১) জানের বদলে জান, ২) বিবাহিত ব্যক্তি যেনা করলে, এবং ৩) জামা‘আতুল মুসলিমীন থেকে খারিজ (ত্যাগকারী) ব্যক্তিকে।” [ইবনে আবী শায়বাহ ৬/৪৬৮ –এর সনদ সহীহ]
বুঝা গেল, যে হাদীসটিতে জান্নাতি বলতে ‘আল-জামা‘আত’-কে বুঝানো হয়েছে। সেটাই কুরআন ও অন্যান্য সহীহ হাদীসে জামা‘আতুল মুসলিম বা মু’মিনদের পথকে বুঝানো হয়েছে। এ কারণে নবী (স)ও আমাদেরকে নিম্নোক্ত নামে পরস্পরকে সম্বোধন করতে বলেছেন :
فَادْعُوْا بِدَعْوَى اللهِ الَّذِيْ سَـمَّاكُمُ الْـمُسْلِمِيْنَ الْـمُؤْمِنِيْنَ، عِبَادَ اللهِ
“সুতরাং তোমরা (নিজেদেরকে) ডাকো যেভাবে আল্লাহ তা‘আলা ডেকেছেন। তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন – মুসলিমীন, মু’মিনীন, ইবাদুল্লাহ।” [তিরমিযী – কিতাবুল আমসাল ; ইমাম তিরমিযী বলেন : হাদীসটি হাসান-সহীহ-গরীব। শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।(তাহ: তিরমিযী হা/২৮৬৩)]
এতো ব্যাপক সংখ্যক হাদীসের প্রতি লেখকের কেন এই বিদ্বেষমূলক লেখা – সেটা সত্যিই দুশ্চিন্তার কারণ।
লেখক তিনটি হাদীস থেকে যে বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করেছেন – তার মধ্যে ‘আহলেহাদীস’ কথাটি একটিবারের জন্যও আসে নি।
হাদীসের সূত্র ব্যবহার করে নিজের বুঝকে উপস্থাপনা
#মুযাফফর_বিন_মুহসিন – ৫ : অতএব আমাদেরকে রাসূল (ছাঃ) প্রদর্শিত সরল সোজা জান্নাতী পথে চলতে হবে এবং হক্বপন্থীদের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। কারণ হক্বপন্থী জামা‘আতের সাথে অবস্থানকে শরী‘আত অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে (বুখারী হা/৭০৮৪; আহমাদ হা/১৮৪৭২; ছহীহাহ হা/৬৬৭)।
[এই অংশটি ‘তাওহীদের ডাকে’ আছে। কিন্তু বইটির ২৩১ পৃষ্ঠাতে নেই।]
#জবাব-৫: লেখকের উল্লিখিত ক) বুখারীর হাদীসটিতে রয়েছে : ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন বা মুসলিমদের জামা‘আত।’[সহীহ বুখারী (তাওহীদ প্রকাশনী) হা/৭০৮৪]
খ) আহমাদ ও সহীহাহ-এর হাদীসটিতে রয়েছে : ‘আল-জামা‘আত।’ কিন্তু লেখক উক্ত শব্দগুলো কেন উল্লেখ করলেন!? লেখকের সূত্র উল্লেখ থেকে বুঝা যায়, তিনি খুব ভালভাবেই জানেন ‘আল-জামাআত’-ই ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’। যেভাবে কিছু পূর্বে হাদীস থেকে হাদীস দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উল্লেখ্য ‘আল-জামা‘আত’ শব্দটি যেভাবে ‘জামাআতুল মুসলিমীন’ বা মুসলিম সর্বসাধারণের জ্ন্য ব্যবহৃত হয়েছে। তেমনি ‘আল-জামা‘আত’ শব্দটি বিশেষ অর্থ যেমন – মুসলিম দায়িত্বশীল বা আলেম-উলামা প্রভৃতি অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন