প্রাসংঙ্গিক কিছু কথা
ইসলাম একটি জীবন দর্শন ও পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা । এর যাবতীয় বিষয় গড়ে উঠেছে কুরআন ও সুন্নাহ্ উপর । কুরআন আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর দূত জিবরাঈল আমীনের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর সরাসরি পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আর সুন্নাহ হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তরীকা বা পদ্ধতি । কুরআনের নির্দেশগুলো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ রাষ্ট্রীয় তথা সামগ্রীক পর্যায়ে কার্যকর করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা-ই হচ্ছে সুন্নাহ এবং এ সুন্নাহকে জানার বাস্তব মাধ্যমই হচ্ছে হাদীস । এ জন্য হাদীসকে এক পর্যায়ে কুরআনের বিস্তারিত রূপ এবং ব্যাখাও বলা হয় । কুরআন ও হাদীস এ দুটি সম্মিলিতভাবে দীন ইসলামকে পূর্ণতা দান করেছে। কুরআনে বলা হয়েছেঃ
“তিনি হিদায়াত ও সত্য জীবন ব্যবস্থা সহকারে তাঁর রাসুলকে পাঠিয়েছেন দুনিয়ার অন্য সমস্ত জীবন ব্যবস্থার উপর তাকে বিজয়ী করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” (তওবাঃ ৩৩)
আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে শুধুমাত্র হিদায়াত ও সত্য জীবন ব্যবস্থা পাঠিয়েই ক্ষান্ত থাকা হয়নি বরং এ হিদায়াত ও সত্য জীবন ব্যবস্থাকে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বও তাঁর উপর অর্পিত হয়েছে। আবার এ প্রসঙ্গে কুরআনে আরো বলা হয়েছে-
“রাসূল তোমাদের কাছে যা কিছু এনেছে তা গ্রহণ কর আর যা কিছু থেকে তিনি তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন তা পরিত্যাগ কর ।” (আল হাশরঃ ৭)
“তিনি হিদায়াত ও সত্য জীবন ব্যবস্থা সহকারে তাঁর রাসুলকে পাঠিয়েছেন দুনিয়ার অন্য সমস্ত জীবন ব্যবস্থার উপর তাকে বিজয়ী করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” (তওবাঃ ৩৩)
আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে শুধুমাত্র হিদায়াত ও সত্য জীবন ব্যবস্থা পাঠিয়েই ক্ষান্ত থাকা হয়নি বরং এ হিদায়াত ও সত্য জীবন ব্যবস্থাকে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বও তাঁর উপর অর্পিত হয়েছে। আবার এ প্রসঙ্গে কুরআনে আরো বলা হয়েছে-
“রাসূল তোমাদের কাছে যা কিছু এনেছে তা গ্রহণ কর আর যা কিছু থেকে তিনি তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন তা পরিত্যাগ কর ।” (আল হাশরঃ ৭)
এখানেও মূলতঃ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই আল্লাহর বিধানের একমাত্র মাধ্যম গণ্য করা হয়েছে । এ জন্য রাসুলের সবরকমের কথা ও কাজকে ইসলামী বিধানের বাস্তব রূপ বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে । যা আল্লাহ্ তায়ালা সরাসরি রাসূলের নিকট পাঠিয়েছেন এবং রাসুল তার যে ব্যাখ্যা করেছেন অথবা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাকে যে কার্যকর রূপ দিয়েছেন, তা সবই ইসলামী জীবন বিধানের অন্তর্ভুক্ত ।
কুরআনে অন্যত্র আরো সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, রাসূলকে শুধুমাত্র কুরআন দেয়া হয়নি বরং কুরআনের সাথে সাথে হিকমতও দান করা হয়েছে । এ হিকমতের মাধ্যমে তিনি লোকদেরকে কুরআনের বাস্তব প্রশিণ দেবেন ।
“নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাআলা মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে একজনকে তাদের কাছে নবী করে পাঠিয়েছেন, যে আল্লাহ্ তাআলার আয়াতগুলো তাদের সামনে পাঠ করে, তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিখায়, যদিও ইতিপূর্বে তারা সুস্পষ্ট গুমরাহীতে লিপ্ত ছিল ।” (আলে-ইমরানঃ ১৬৪)
এ আয়াতের প্রেক্ষিএত দেখা যায় কিতাব ছাড়া আর একটি বস্তুও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দান করা হয় সেটি হিকমত তথা কিতাবকে বাস্তবায়িত করার পদ্ধতি। সুরা আন নজমে বলা হয়েছে-
“তিনি (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের ইচ্ছামত কোন কথা বলেন না । যা কিছু তিনি বলেন তা সবই আল্লাহর অহী ।” (৩-৪)
এ আয়াতের প্রেক্ষিএত দেখা যায় কিতাব ছাড়া আর একটি বস্তুও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দান করা হয় সেটি হিকমত তথা কিতাবকে বাস্তবায়িত করার পদ্ধতি। সুরা আন নজমে বলা হয়েছে-
“তিনি (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের ইচ্ছামত কোন কথা বলেন না । যা কিছু তিনি বলেন তা সবই আল্লাহর অহী ।” (৩-৪)
এ সব আলোচনা থেকে যে কথাগুলো সুস্পষ্ট হয়েছে তা হচ্ছে
১. আল্লাহ্ তাঁর বিধান অর্থাৎ কুরআন মজীদ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পাঠিয়েছেন ।
১. আল্লাহ্ তাঁর বিধান অর্থাৎ কুরআন মজীদ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পাঠিয়েছেন ।
২. রাসূল সেই বিধানকে পৃথিবীতে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন ।
৩. এ প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে রাসূল যা কিছু করেছেন এবং বলেছেন সবই যেহেতু আল্লাহ্ তায়ালার সরাসরি তত্ত্ববধানে নিয়ন্ত্রিত, তাই তার সবই গ্রহণ করতে হবে ।
রসূলের নবুয়াতী জীবনের তেইশ বছরের এ কাজগুলোকে সুন্নাহ বলা হয় । সুন্নাহর বিস্তারিত চিত্র আমরা হাদীস গ্রন্থগুলোতে পাই ।
হাদীসে রাসূলের গুরুত্ব
আল্লাহ্ তা’আলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে মানুষের জীবন বিধান হিসেবে প্রেরণ করেছেন ‘ইসলাম’ । যে অহীর মাধ্যমে ইসলাম প্রেরিত হয়েছে, তা হলো আল কুরআন । আল্লাহ্ তা’আলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল কুরআনের প্রচারক এবং একমাত্র ব্যাখ্যাতা নিয়োগ করেন । সুতরাং আল কুরআন এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত আল কুরআনের ব্যাখ্যাই হচ্ছে দ্বীন ইসলামের মূল ভিত্তি । আর তাঁর প্রদত্ত এ ব্যাখ্যার নামই হলো হাদীস বা সুন্নাহ । সুতরাং হাদীস বা সুন্নাহকে বাদ দিয়ে ইসলামকে কল্পনাই করা যায় না ।
হাদীস রাসূলের মনগড়া বক্তব্য নয় । কুরআন ছাড়াও আরো বিভিন্ন প্রকার অহী তাঁর প্রতি নাযিল হতো । মূলত সেগুলোই হাদীস বা সুন্নায় প্রতিফলিত হয়েছে। কুরআনুল কারিমে পরিষ্কার বলা হয়েছে :
“তিনি (মুহাম্মদ রাসূল) নিজের ইচ্ছামত কোনো কথা বলেন না। তিনি যা কিছু বলেন সবই আল্লাহর অহী ।” সুরা আন নজম (৩-৪)
এ জন্যেই হাদীসকে বাদ দিয়ে ইসলামের অট্টালিকা নির্মিত হতে পারে না। হাদীস ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংগ । কুরআন এবং হাদীস উভয়টাই ইসলামী জীবন ব্যবস্থার ভিত ।
হাদীস ও সুন্নাতের গুরুত্ব সম্পর্কে স্বয়ং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
“তোমাদের কাছে আমি দুটো বিষয় রেখে গেলাম-আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ । এ দুটোকে আঁকড়ে ধরে থাকলে-তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না ।”
একথাও আমাদের সকলেরই জানা আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস ভান্ডারের মধ্যেই সন্নিবেশিত রয়েছে তাঁর সুন্নাহ । হাদীসে রাসূল থেকেই জানা যায় সুন্নাতে রাসূল । মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো স্পষ্টই বলেছেন যে, কুরআন এবং সুন্নাতে রাসূলকে আঁকড়ে ধরতে হবে । আল্লাহ্ তা’আলা রাসূলকে একথাও জানিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যে ,
“হে নবী, বলে দাও : তোমরা যদি সত্যি আল্লাহকে ভালবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো, তাহলেই আল্লাহ্ তোমাদের ভাল বাসবেন ।” (আল ইমরানঃ ৩১)
রাসূলের অনুসরণ করতে হলে রাসূলের দিয়ে যাওয়া কুরআনকে গ্রহণ করার সাথে সাথে তাঁর সুন্নাহকেও গ্রহণ করতে হবে । কারণ সুন্নাহ বা হাদীস তো কুরআনেরই ব্যাখ্যাঃ
“আমি তোমার কাছে যিকর (কুরআন) নাযিল করেছি, যেনো তুমি তাদের প্রতি যা নাযিল করা হলো, তা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দাও।” (আন নহলঃ ৪৪)
তাছাড়া কুরআনের বিভিন্ন স্থানে স্পষ্ট করেই বলে দেয়া হয়েছে যেঃ
“আল্লাহ্র আনুগত্য করো আর রাসূলের ।” (আলে ইমরানঃ ৩২)
“আল্লাহ্র আনুগত্য করো আর রাসূলের ।” (আলে ইমরানঃ ৩২)
একজন মুসলিমকে যেমন কুরআন মানতে হবে এবং অনুসরণ করতে হবে, তেমনি কুরআনের পরেই তাকে সত্যিকার মুসলিম হবার জন্যে হাদীস জানতে হবে এবং মানতে হবে ।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেছেন, সুন্নাতে রাসূল হলোঃ
১. কুরআনে যা আছে তাই, কিংবা
২. কুরআনেরই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অথবা
৩. কুরআনে নেই, অথচ মুমিনদের কর্তব্য এমন জিনিস ।
১. কুরআনে যা আছে তাই, কিংবা
২. কুরআনেরই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অথবা
৩. কুরআনে নেই, অথচ মুমিনদের কর্তব্য এমন জিনিস ।
এ কারণেই ইসলামী শরীয়ার উৎস হিসেবে হাদীস বা সুন্নাতে রাসূলকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ
“যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল ।” (আন নিসাঃ ৬৯)
হাদীস যেভাবে সংরতি হয়েছে ।
হাদীস যেভাবে সংরতি হয়েছে ।
রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোটা হাদীস ভান্ডার তিনটি নির্ভরযোগ্য পন্থায় হিফাযত ও সংরতি হয়ে আসছে
১. উম্মতের আমল ও বাস্তব অনুসরণের মাধ্যম ।
২. লেখা, মুখস্তকরণ ও গ্রন্থাবদ্ধ করণের মাধ্যম ।
৩. শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহনের মাধ্যম ।
১. উম্মতের আমল ও বাস্তব অনুসরণের মাধ্যম ।
২. লেখা, মুখস্তকরণ ও গ্রন্থাবদ্ধ করণের মাধ্যম ।
৩. শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহনের মাধ্যম ।
হাদীস কাকে বলে?
হাদীস শব্দের আভিধানিক অর্থ কথা, বাণী, সংবাদ, বিষয়, অভিনব ব্যাপার ইত্যাদি ।
পারিভাষিক ও প্রচলিত অর্থে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কাজ, সমর্থন, আচরণ এমনকি তাঁর দৈহিক ও মানসিক কাঠামো সংক্রান্ত বিবরণকেও হাদীস বলে ।
সাহাবায়ে কিরামের কথা, কাজ ও সমর্থনকেও হাদীস বলা হয় । অবশ্য পরে উসুলে হাদীসে তাঁদের কথা, কাজ ও সমর্থনের নাম দেয়া হয়েছে ‘আসার’ এবং হাদীসে মওকুফ’ এবং তাবেয়ীগণের কথা, কাজ ও সমর্থনের নাম দেয়া হয়েছে ‘ফতোয়া’ ।
হাদীসের প্রকারভেদ
হাদীসমূহকে সংজ্ঞাগত, বর্ণনাগত এবং বিষয় বস্তুগতভাবেও ভাগ করা হয়েছে ।
সংজ্ঞাগতভাবে মুখ্যত হাদীস তিন প্রকার–
১) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখনিঃসৃত কথা বা বাণীকে ‘কওলী’ হাদীস বলা হয় ।
২) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজ, কর্মপন্থা ও বাস্তব আচরণকে ‘ফিইলী’ হাদীস বলা হয় ।
৩) আর তা সমর্থন ও অনুমোদনপ্রাপ্ত বিষয়গুলোকে বলা হয় ‘তাকরীরী’ হাদীস ।
হাদীসের বর্ণনাগত প্রকারভেদ
হাদীস বিশারদগণ বর্ণনাগতভাবে হাদীসমূহকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। নিম্নে ধারাবাহিকভাবে সেগুলো উলেখ করা হলোঃ
খবরে মুতাওয়াতির : সেসব হাদীসকে খবরে মুতাওয়াতির বলা হয়, প্রতিটি যুগেই যে হাদীসগুলোর বর্ণনাকারীদের সংখ্যা ছিল এতো অধিক যাদের মিথ্যাচারের মতৈক্য হওয়া স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব।
খবরে ওয়াহিদ : সেসব হাদীসকে খবরে ওয়াহিদ বলে, যেগুলোর বর্ণনাকারীদের সংখ্যা মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। হাদীস বিশারদগণ এরুপ হাদীসকে তিনভাগে ভাগ করেছেন
মশহুর : বর্ণনাকারী সাহাবীর পরে কোনো যুগে যে হাদীসের বর্ণনাকারীর সংখ্যা তিনের কম ছিল না।
আযীব : যে হাদীসের বর্ণনাকারী সংখ্যা কোনো যুগেই দুই-এর কম ছিল না।
গরীব : যার বর্ণনাকরীর সংখ্যা কোনো কোনো যুগে একে এসে পৌঁছেছে।
মারফু : যে হাদীসের বর্ণনাসূত্র (সনদ) রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে হাদীসে মারফূ’ বলে।
মাওকুফ : যে হাদীসে বর্ণনা পরস্পরা (সনদ) সাহাবী পর্যন্ত এসে স্থগিত হয়ে গেছে তাকে হাদীসে মাওকুফ বলে।
মাকতু : যে হাদীসের সনদ তাবেয়ী পর্যন্ত এসে স্থগিত হয়েছে তাকে মাকতু বলে।
মুত্তাসিল : শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপর থেকে নিচ পর্যন্ত যে হাদীসের সনদ বা বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ অুন্ন থেকেছে এবং কোন পর্যায়ে কোন বর্ণনাকারী অনুলেখিত থাকেনি এরূপ হাদীসকে হাদীসে মুত্তাসিল বলে।
মুনকাতি : যে হাদীসের বর্ণনাকরীদের ধারাবাহিকতা অুন্ন না থেকে মাঝখান থেকে কোনো বর্ণনাকারীর নাম উহ্য বা লুপ্ত রয়ে গেছে তাকে হাদীসে মুনকাতি বলে।
মুয়ালাক : যে হাদীসের গোটা সনদ বা প্রথম দিকের সনদ উহ্য থকে তাকে হাদীসে মুয়ালাক বলে।
মু’দাল : যে হাদীসে ধারাবাহিকভাবে দুই বা তদুর্র্ধ বর্ণনাকারী উহ্য থাকে তাকে মু’দাল বলে।
শায : ঐ হাদীসকে শায বলে যার বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত বটে, কিন্তু হাদীসটি তার চাইতে অধিক বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বর্ণনার বিপরীত।
মুনকার ও মা’রূফ : কোন দুর্বল বর্ণনাকারী যদি কোন বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বর্ণনার বিপরীত হাদীস বর্ণনা করে, তবে দুর্বল বর্ণনাকারীর হাদীসকে ‘মুনকার’ এবং বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর হাদীসকে মা’রূফ বলে।
মুয়ালাল : যে হাদীসের সনদে এমন সুè ত্র“টি থাকে যা কেবল হাদীস বিশারদগণই পরখ করতে পারেন। এ ধরনের সু ত্র“টিপূর্ণ হাদীসকে মুয়ালাল বলে।
সহীহ : যে হাদীসের সনদে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ থাকে, তাকে সহীহ হাদীস বলে ঃ ১) মুত্তাসিল সনদ, ২) বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ৩) স্বচ্ছ স্মরণশক্তি ৪) শায নয় এবং ৫) মুয়ালাল নয়।
সনদ ও মতন : (…………)
হাদীস সংকলনের ইতিহাস
অহীয়ে মাতলু এর মাধ্যমে প্রাপ্ত কোরআন শরীফ জায়েদ ইবনে সাবেত (রা) প্রমুখ সুনির্দিষ্ট অহী লেখকদের সাহায্যে লিখিত করে রাখার ব্যবস্থা করা হলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় ’অহীয়ে গায়েরে মাতলু’ দ্বারা প্রকাশিত হাদীস শরীফ লিখিত আকারে সংরতি করার তেমন কোন ব্যবস্থা ছিল না । তাও কোরআন শরীফ লিখিত হত বিচ্ছিন্ন ভাবে খেজুরের পাতা, চামড়া, হাড় ও কাঠ প্রভৃতি জিনিসপত্রের ওপরে । স্বভাবতঃ কোরআনের ঐ সব বিচ্ছিন্ন লিখিত অংশগুলো একালের বাঁধানো বইপত্রের মত সুদৃঢ়ভাবে গুছিয়ে বাঁধাই করে রাখা সম্ভব হত না । ফলে ঐ একই সময়ে একই পদ্ধতিতে হাদীস লেখার কাজ শুরু করা হলে কোরআন ও হাদীসের লিখিত অংশগুলো পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করার বা মিশ্রিত হওয়ার আশঙ্কায় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় হাদীস লিখে রাখার কাজকে সাধারণভাবে নিষেধ করে দিয়েছিলেন এবং হযরত ওমর (রা)-ও হাদীস লিখে রাখার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন । কিন্তু কোন কোন বিশেষ সাবধানী সাহাবীর ক্ষেত্রে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিষেধ কিছু পরিমাণ শিথিল করে দিয়েছিলেন এমন প্রমাণ দুর্লভ নয় ।
আবু হোরায়রা (রা) বলেছেন, ’এই সব হাদীস আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে শুনেছিলাম ও লিখে রেখেছিলাম এবং তাঁকে শুনিয়েছিলাম । আবু হোরায়রা (রা) ছাড়াও আরো অনেক সাহাবী যেমন আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর (রা) ও হাদীস লিখে রাখতেন । আবু হোরায়রা (রা) বলেন, ‘আব্দুল্লাহ্ ইব্নে আমর (রা)-এর কাছে বেশী হাদীস থাকতে পারে, কারণ তিনি হাদীস লিখে রাখতেন, আমি হাদীস লেখায় বিশেষ তৎপর ছিলাম না ।’ আমর (রা) নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অনুযোগ করল যে সে হজরতের কাছে যা শুনছে তা স্মরণ রাখতে পারছে না । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার ডান হাতের সাহায্য নিতে বললেন (অর্থাৎ লিখে রাখতে বললেন) । হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা) ও কিছু কিছু হাদীস সংকলন করেছিলেন ।
মোট কথা সাধারণভাবে এবং ব্যাপকভাবে হাদীস লিখে রাখার কোন ব্যবস্থা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় প্রচলিত ছিল না । এ প্রসঙ্গে সহী বুখারীর বিখ্যাত টীকাকার আলকাস্তালানী বলেন, সাধারণতঃ সাহাবী বা তাবেয়ী কেউ হাদীস লিখে রাখতেন না । তাঁরা পরস্পরকে মৌখিক ভাবে হাদীস শিক্ষা দিতেন এবং অক্ষরে অক্ষরে তা কণ্ঠস্থ করে রাখতেন ।’ একদিকে সেকালের আরবদের স্মরণশক্তি যেমন প্রখরতর ছিল, অন্যদিকে তাদের মধ্যে অর জ্ঞানের অভাব তেমনি ভয়াবহভাবে ব্যাপকতর ছিল । কোরআনের সাথে হাদীসের সংমিশ্রন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার দ্বার রূদ্ভ করা এবং এই সব নিরক্ষর সাধারণ মানুষদের মধ্যে লেখার পরিবর্তে মৌখিক আকারেই হাদীসের প্রচার ও প্রসার সহজসাধ্য হবে ভেবে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের কালে হাদীস লিখে রাখার কাজকে বিলম্বিত ও নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল ।
কিন্তু চলমান কাল একদিন হাদীস লিখে রাখার পথের সবচেয়ে বড় বাধাটা দুর করে দিল । খলীফা আবুবকর (রা) এর নির্দেশে সাহাবী জায়েদ ইবনে সাবেত (রা) কোরআন শরীফের যে পুর্ণাঙ্গ গ্রন্থটি সঙ্কলিত ও লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রা) তার অসংখ্য কপি প্রস্তুত করিয়ে সারা সাম্রাজ্যের দিকে দিকে মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করলেন । ফলে কোআন শরীফের ব্যাপক প্রচার সাধিত হল । কোরআনের নির্ভুল পাঠ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অন্তরে অন্তরে নুরের আখরে মুদ্রিত হয়ে গেল । এখন আর কোরআনের মধ্যে হাদীসের অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা রইল না । অন্যদিকে ইসলামী সাম্রাজ্যের ব্যাপাক প্রসার এবং অন্যান্য কারণজনিত ক্রমবর্ধমান জীবন-সমস্যার অস্বাভাবিক জটিলতার সমাধান পাওয়ার জন্য সমগ্র মুসলিম জগৎ পবিত্র হাদীস শরীফকে সঙ্কলিত আকারে পেতে একান্তভাবে উৎসুক হয়ে উঠল । কুফা, কায়রো, দামেস্ক প্রভৃতি লোকাকীর্ণ নগর গুলোর বিচার-কার্য পরিচালনার জন্য আইনের বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন হল ।’ কিন্তু ‘প্রত্যাদেশের (অর্থাৎ কোরআনের) অপরিসর’ আয়তনের মধ্যে সেই ব্যাখ্যা সহজলভ্য হল না । তাই সমস্যা সমাধানের জন্য হাদীসের আশ্রয় গ্রহণের কামনা বিশ্ব মুসলিমের অন্তরের অন্তঃস্থলে প্রবলতর হয়ে উঠল ।
খোলাফায়ের রাশেদিনের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অন্যান্য নানা কারণে অজস্র জাল বা ‘মওজু’ হাদীস রচনায় লিপ্ত হওয়া, হাদীস শরীফকে লিখিত গ্রন্থের আকারে সংকলন ও সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে উঠল । জাল হাদীসের জঞ্জালের তলায় আসল হাদীস প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে বসল । গোঁড়া সুন্নী,শিয়া, খারেজী, মুতাজেলা, জিন্দিকও সুফী সম্প্রদায়ের বহু ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তখন হাদীস প্রচার করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে । শিয়া মতাবলম্বীর একটি অংশ হযরত আলী (রা) বংশধরকেই খেলাফতের একমাত্র উত্তরাধিকারী বলে তাদের দাবীকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিতান্ত উদ্দেশ্যমুলক ভাবে হাদীস উদ্ধৃত করতে শুরু করে । সুন্নী ও খারেজীরা ঠিক এর বিপরীত দাবীটাই বিভিন্ন হাদীস উদ্ধৃত করে প্রচার করতে শুরু করে । উদ্ধৃতিতে যেখানে আটছে না অত্যুৎসাহী অন্ধ সমর্থকেরা সেখানে মনের মত হাদীস নিয়ে নিজ নিজ বক্তব্যকে জোরদার করেছে । ওদিকে জিন্দিকরা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে দ্বিত্ববাদী ন্বাধীনচেতা হয়ে উঠেছে । তারা আল্লাহর রসুলের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছে । অন্য দিকে গ্রীক বিজ্ঞান-দর্শনের ভাবধারায় প্রতিষ্ঠিত মুতাজেলা সম্প্রদায় ঈমানের মুলশর্ত অস্বীকার করে ধর্ম- বিশ্বাসকে প্রমাণ ও বিচার সাপেক্ষ করে’ তুলল । তারা রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের মত মানবিক অবয়ব বিশিষ্ট রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে আকাশ ভেদ করে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাকে অসম্ভব বলে মনে করল এবং সেই যুক্তিতে ‘মে’রাজ’ বা ‘নভোভ্রমণ’কে অস্বীকার করল । তারা আল্লাহর সর্বময় একত্বের দোহাই দিয়ে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত পালন করাকে সম্পুর্ণরুপে বর্জন করল । সার্বিক পরিস্থিতির এই ঘোলাপানিতে মৎস্য-শিকারের উদ্দেশ্যে এক শ্রেণীর পোষকতাকারী খলীফাদের দরবারের জাকজমক ও বাহ্যাড়ম্বরকে সমর্থন করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর অনুচরদের অনাড়ম্বর জীবনের পুণ্যসমুহ মুছে দিতে লাগলো । উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য তাঁরা নানান মিথ্যা ও কল্পিত কাহিনী প্রচার করতে লাগলো । এসব তথ্যের প্রমাণ স্বরূপ তাঁরা নানান কল্পিত হাদীস তুলে ধরতে লাগলো । ফলে অসংখ্য ‘মওজু’ বা জাল হাদীসের আবির্ভাবে মুসলিম জগতের ভাগ্যাকাশ দুর্যোগের কালোমেঘে ঘনঘোর হয়ে উঠল ।
কিন্তু মেঘের আঁধারের পেছনেই সূর্যের আলোক প্রতীক্ষা করে । তাই এবার হাদীসের সংঙ্কটের ঘন অন্ধকার ভেদ করে’ নতুন দিনের নতুন সূর্যালোক দিগন্ত রক্তিম করে জ্বলে উঠল । রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া এই সব মিথ্যা কথা বা জাল হাদীসের জঞ্জাল থেকে হাদীস-শাস্ত্রকে নিরাপদ ও নিষ্কণ্টক করার উদ্দেশ্যে এবং সমসাময়িক সুবিশাল মুসলিম-বিশ্বের বিচিত্র সমস্যার সমাধানকে হাদীসের মাধ্যমে সর্বত্র সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর ৮৯ বছর পরে হিজরী ৯৯ সনে উমাইয়া বংশের শ্রেষ্ঠ খলীফা ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ বা দ্বিতীয় ওমর হাদীস-সংকলনের কাজে উদ্যোগী হলেন । তিনি ছিলেন দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রা)-এর দৌহিত্রৈর পুত্র । আচারে ও আচরণে তিনি খলীফা ওমর (রা)-কেই অরে অরে অনুকরণ করতেন, তাই ইসলামের ইতিহাসে তিনি ‘দ্বিতীয় ওমর’ নামে বিখ্যাত । তিনি তাঁর-নিযুক্ত মদীনার গর্ভনর আবু বকর ইবনে হযমকে হাদীস সংকলনের কাজে অগ্রসর হবার জন্য আদেশ দিলেন । লিখলেন, ‘আমার আদেশ আপনি রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক একটা হাদীস তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করুন এবং লিখে রাখুন । আমার ভয় হচ্ছে, এরকম না করলে একদিন এ জ্ঞানভান্ডার বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই জ্ঞানভান্ডারের রক সাহাবী ও তাবেয়ীগণ দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন । (বুখারী শরীফ)
ফলে এই হিজরী প্রথম শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকেই হাদীস সমূহ গ্রন্থাকারে সংকলন করার ব্যাপক প্রয়াসের একটা বান ডেকে গেল । ঐতিহাসিক উইলিয়াম ময়ুর বলেন, ‘হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের প্রায় একশ বছর পরে খলীফা দ্বিতীয় ওমর প্রচলিত হাদীসগুলোকে সংগ্রহ ও সঙ্কলিত করার জন্য একটা বৃত্তাকার আদেশ দিলেন । এইভাবে যে কাজের সুত্রপাত হল, প্রবল বেগে তা অগ্রসর হতে লাগল ।আল্লাহর অনেক নেক বান্দারা এই হাদীস সংগ্রহ করার জন্যে তাঁদের ‘জীবন যৌবন ধন-মান’ সব কিছু উৎসর্গ করে দিলেন । আল্লাহ তায়ালা তাদের সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন