বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০১৫

জেরুসালেম, ফিলিস্তিন।

৫৮৭ খৃস্টপূর্বাব্দ।
জেরুসালেম, ফিলিস্তিন।
ডোম অব দ্য রকের পূর্বপাশের বারান্দায় সেজদায় মাথা লুটিয়ে অঝোরে কাঁদছেন নবি ইয়ারমিয়াহ আ.। চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে বায়তুল মুকাদ্দাসের পাত্থুরে দহলিজ। ফোঁপানোর শব্দ মসজিদের গম্বুজে প্রতিধ্বনিত হয়ে রাতের নিস্তব্ধতায় তৈরি করছে বেদনার অব্যক্ত আহাজারি।
—'ওহ খোদা! আমার মা যদি আমাকে জন্ম না দিতো তাহলে আজ আমাকে জেরুসালেমের শেষ ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে হতো না! হে আল্লাহ, কার হাত দিয়ে তুমি ধ্বংস করবে এই পবিত্র নগরী?’
প্রত্ত্যুত্তর এলো, 'মাথা তোলো ইয়ারমিয়াহ! যার হাত দিয়ে আমি এ নগরী ধ্বংস করবো, সে এক অগ্নি উপাসক! সে আমার উপাসনা করে না, সে আমার শাস্তির ভয় করে না, আর আমার প্রতিদানের ব্যাপারেও সে অজ্ঞ। যাও, বলে দাও তোমার সম্প্রদায়কে; তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ শাস্তি।’
পরদিন নবি ইয়ারমিয়াহ জেরুসালেমের পথে-ঘাটে, অলিতে-গলিতে নিজ সম্প্রদায় ইহুদিদের সম্বোধন করে বলতে লাগলেন— সতর্ক হও, নিজেদেরকে সংশোধন করো, অন্যথায় তোমাদের উপর খুব শিগগির পতিত হবে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ!
কিন্তু ইহুদিজাতির পক্ষ থেকে এই সাবধানবাণীর বিরূপ জবাব এলো৷ চারদিক থেকে তার ওপর প্রবল বৃষ্টিধারার মতো অভিশাপ ও গালি-গালাজ বর্ষিত হতে লাগলো। তাকে মারধর করা হলো৷ নিজ সম্প্রদায় তাকে কারারুদ্ধ করলো৷ ক্ষুধা ও পিপাসায় শুকিয়ে মেরে ফেলার জন্য তারা তাকে রশি দিয়ে বেঁধে কর্দমাক্ত কূয়ার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখলো৷
২.
সাতদিন পর।
ব্যাবিলনের [ইরাক] প্রতাপশালী সম্রাট নেবুচাদনেজার তুফানের মতো আক্রমণ করলো জেরুসালেম শহরে। অল্প সময়ের মধ্যে দুর্ভেদ্য শহররক্ষা প্রাচীর গুড়িয়ে দিয়ে তার সেনাবাহিনী প্রবেশ করলো শহরে। নগরের ইহুদি মিলিশিয়ারা প্রতিরোধচিন্তা বাদ দিয়ে পালাতে চেষ্টা করলো; কিন্তু সফল হলো না। নেবুর ক্ষুধিত পাষাণ যোদ্ধাদের ধারালো তরোয়ালের কোপে দ্বিখণ্ডিত হতে লাগলো নির্বিচারে।
বাদ পড়লো না শহরের ইহুদি অধিবাসীরাও, ব্যাবিলনীয় যোদ্ধারা শহরের তিনদিক থেকে একযোগে চালালো ইহুদিনিধন। সামনে জীবিত যা পেলো, সবই বিচার্য হলো তরোয়ালের কোপের নিশানায়। শহরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা পর্যন্ত তারা ক্ষান্ত হলো না।
সম্রাট নেবুচাদনেজার দুইদিনে জেরুসালেমে হত্যা করলেন প্রায় সত্তুর হাজার ইহুদিকে। শিশু ও বৃদ্ধদের বনানো হলো দাস। নারীদের বণ্টন করা হলো তার সৈন্যদের মাঝে এবং বাকিদের বিক্রি করে দেয়া হলো দাসবাজারে।
সম্রাট নেবু গুড়িয়ে দিলেন নবি সোলায়মান নির্মিত ইহুদিদের প্রধান উপাসনালয়সহ সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বাদ গেলো না পবিত্র মসজিদ বায়তুল মুকাদ্দাস। পুড়িয়ে ফেললেন ইহুদিদের ধর্মীয় গ্রন্থ তাওরাত।
সবকিছু শেষ হলে পুরো শহরে আগুন লাগিয়ে দিলেন সম্রাট। কিছুক্ষনের মধ্যেই আগুনের দাউদাউ শিখায় পুড়ে ভস্ম হয়ে গেলো অসংখ্য পয়গাম্বরের স্মৃতিধন্য নগরী- জেরুসালেম।
ধিকিধিকি আগুনের পোড়ার গর্জন একসময় থিতু হয়ে এলো। পুড়তে থাকা জেরুসালেম নগরীর বেদনার্ত কিছু আগুনের স্ফুলিঙ্গ কেবল মিলিত হলো সন্ধ্যার আকাশে জ্বলতে থাকা কয়েকটি একাকী তারার সঙ্গে।
৩.
অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্ত করা হয়েছে নবি ইয়ারমিয়াহকে। তিনি এখন সম্রাট নেবুচাদনেজারের তাঁবুতে, তার পাশে বসা। কয়েদের দুর্বিষহ যন্ত্রণায় বৃদ্ধনবির শরীর ক্লিষ্ট। চোখের সামনে ছাইভস্ম হতে দেখেছেন মাতৃভূমিকে। পুড়তে দেখেছেন নিজের চিরচেনা অবাধ্য অনুসারীদের। কষ্টের আতিশয্যে চোখ দৃষ্টিহীন। বলার মতো শব্দ নেই মুখে।
সম্রাট নেবু নিজেই মুখ খুললেন।
: সম্মানীয়! আপনি কি এই ধ্বংসলীলা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই শহরবাসীকে সতর্ক করেছিলেন?
: হ্যাঁ, এ ব্যাপারে আমি তাদের বেশ কিছুদিন পূর্বেই অবগত করেছিলাম। বৃদ্ধনবি একটু থেমে শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে আবার বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের সতর্ক করেছি আর তারা এর প্রতিদানে আমাকে বন্দি করে নির্যাতন করেছে। প্রকোষ্ঠের নির্যাতনের কথা মন উঠতেই নবির সারা শরীর কেঁপে উঠলো।
: তারা আপনাকে নির্যাতনও করেছে?
: হ্যাঁ, অনেক।
: উফফ! এরা কেমন জাতি, যারা তাদের ঈশ্বরপ্রেরিত পয়গাম্বরকে অস্বীকার করে, অথচ তারা সেই ঈশ্বরের উপাসনা করে বলে দাবি করে! তারা সেই ঈশ্বরের জন্য মসজিদ তৈরি করে, তার প্রেরিত গ্রন্থ পাঠ করে; আবার তার প্রেরিত পয়গাম্বরকে নির্যাতন করে!
সম্রাট থামলেন কিছুক্ষন। আবার বললেন—
: সম্মানীয়! আপনি মুক্ত! ইচ্ছে হলে আমার সঙ্গী হতে পারেন। আমি সসম্মানে আপনাকে আমার সঙ্গী করবো। আর যদি চান এখানেই কোথাও থাকবেন, তবে আমি আপনার পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।
: আপনার সৌজন্যতার জন্য ধন্যবাদ। আমাকে এখানেই থাকতে হবে, এই জেরুসালেমের মাটি, বাতাস, আকাশেন সঙ্গে। এখানেই আমি প্রেরিত হয়েছি। আর আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা আল্লাহর জিম্মায়। তিনিই আমার দেখভালকারী।
: আপনি যেটা ভালো মনে করেন। সম্রাট নবির মতামতকে সসম্মানে মেনে নিলেন।
৪.
পরদিন।
প্রিয়তমা স্ত্রীকে ভালোবেসে ব্যাবিলনের শূন্যউদ্যান নির্মাতা সম্রাট নেবুচাদনেজার জেরুসালেমকে বিদায় জানিয়ে রওনা হলেন ইউফ্রেতিস নদীর দিকে। এই নদীর তীরেই গড়ে তুলেছেন ইতিহাসবিখ্যাত ব্যবিলনের শূন্যউদ্যান।
নবি ইয়ারমিয়াহ আ. একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন অপসৃয়মান সম্রাটের সেনাদলের দিকে। তারা দৃষ্টিসীমার আড়াল হতেই 'এলাত’-এর পথে পা বাড়ালেন নবি। জীবনের শেষ ক'টা দিন লোকচক্ষুর অন্তরালে এই এলাতেই কাটান তিনি।
Salahuddin Jahangir
তথ্যসূত্র : তাফসিরে ইবনে কাসির
এবং বহুবিধ দস্তাবেজ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন