বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০১৫

পাথরে অঙ্কিত পথ এবং উড়ন্ত ধুলোর খেলা

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

হাদীসের নামে ‘মজনু’ এই নাতিন জামাইদের প্রকৃত প্রতিপক্ষ আমাদের সম্মানিত চার ইমাম। তারপরও হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর পায়ের কাছে এসে তাদের খেদ ক্ষোভ এবং জেদটা যেন লাভাময় হয়ে উঠে। কেন? অনেকেই এর সরল উত্তর দেন- গাছ যত বড় হয় ঝড় তাকে তত বেশিই পায়। কেউ বা-বলেন, সতীনের সন্তানের অবারিত জয় কে কবে কোথায় সয়েছে? অনেকে আবার ভাব জমিয়ে বলেন- একজন মানুষ গুণে মেধায় চিন্তায় অবদানে এবং গ্রহণযোগ্যতায় কালের পর কাল জয় করে যাবেন আর তার নামে কিছু পরাজিত প্রাণ অন্তত হিংসার অনলে পুড়ে ছাই হবে না- তাকি হয়! আমার কাছে কোনোটাই অযৌক্তিক মনে হয় না।
অবশ্য একজনমাত্র ব্যক্তির চিন্তা গবেষণা ও সাধনাকে পৃথিবীর এই বিপুল সংখ্যক মানুষ কেন মাথায় তুলে রাখবে বিনম্র শ্রদ্ধায়- তা অবশ্যই একটা কৌতূহলের বিষয়! আর সেটা যদি হয় শতকের পর শতক ধরে এবং বিস্তৃত যদি হয় উম্মতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে- তাহলে তো আর কৌতূহলের সীমা থাকে না। যারা জাদু মন্ত্রে অনুরক্ত তারা তো বলবেন- এ এক মহা জাদুমন্ত্রের ব্যাপার। প্রমাণ নেই বলে কিংবা জাদুমন্ত্র বুঝি না বলে আমরা তা অস্বীকার করি না! তবে একটা হাদীসের কথা বলতে পারি। সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রযি. থেকে বর্ণিত, হযরত রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘আল্লাহ্ তায়ালা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন হযরত জিবরাইলকে ডেকে বলেন- আল্লাহ্ তায়ালা অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন তুমিও তাকে ভালোবেসো! জিবরাইল আ. তখন তাকে প্রিয় করে নেন এবং আকাশবাসীর মাঝে ঘোষণা করে দেন- আল্লাহ্ তায়ালা অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন। সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবেসো। তারপর পৃথিবীতে তার গ্রহণযোগ্যতা ছড়িয়ে দেয়া হয়। [সহীহ বুখারী, হাদীস-৩২০৯, সহীহ মুসলিম, হাদীস-২৬৩৭, রিয়াযুস সালেহীন, হাদীস-৩৮৭] হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. জন্মগ্রহণ করেছেন হিজরি ৮০ সালে। মৃত্যু বরণ করেছেন ১৫০ সালে। এখন (১৪৩৬) থেকে ১২৮৬ বছর পূর্বে। এই দীর্ঘকাল যে গভীর শ্রদ্ধা উষ্ণ ভালোবাসা আর সযত্ন সতর্কতায় স্মরিত হয়েছেন পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম অবধি তাকে হাদীসের ভাষায়- ‘পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া গ্রহণযোগ্যতা’ ছাড়া আমরা আর কী বলতে পারি। কথা হলো- যে গ্রহণযোগ্যতা ছড়িয়ে দেন স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীর কোনো মানুষের পক্ষে কি তা রুখে দাঁড়ানো সম্ভব? জাদু বলি আর মন্ত্র বলি- আকাশে অঙ্কিত যে নাম অপার্থিব ভালোবাসায়- ক্ষোভে রোষে বিদ্বেষে উড়ন্ত ধুলোয় কি তা নিশ্চিহ্ন করে দেয়া সম্ভব?
یٰلَیْتَ قَوْمِیْ یَعْلَمُوْنَ
‘আহা! আমার স¤প্রদায় যদি জানত … ’ [ইয়াসীন : ২৬] কথা কি- এই উম্মতের একটা বড় সৌভাগ্য হলো তারা সামগ্রিক অর্থে তাদের নবীর উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি কখনই। তাদের চিন্তা বিশ্বাস ও আচরণে নবীজির শিক্ষা ও উপদেশ মানব শরীরের শিরায় শিরায় প্রবাহিত রক্তের মতোই উষ্ণ আবেগে বহমান। আবেগে লালিত উপদেশের এই উত্তরাধিকার অনেকে ক্ষেত্রেই তারা লাভ করেছে বংশানুক্রমিকভাবে। উম্মতজননী হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমাদেরকে হযরত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই মর্মে আদেশ করেছেন- ‘আমরা যেন প্রতিটি মানুষকে তার মর্যাদার আসনে সমাসীন করি’। [হাদীসটি ইমাম মুসলিম রহ. তদীয় সহীহ গ্রন্থের শুরুতে উল্লেখ করেছেন। ইমাম হাকিম আবু আবদুল্লাহ্ মারিফাতু উলুমিল হাদীস’ গ্রন্থে লিখেছেন- হাদীসটি হাসান সহীহ। আল্লামা নববী, রিয়াজুস সালেহীন, হাদীস : ৩৫৬] নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই পরামর্শের ভিত্তিতে এই উম্মত তাদের উন্মেষ কাল থেকেই যে কোনো ব্যক্তি ও প্রজন্মকে গ্রহণ ও বর্জনে তার জ্ঞান চিন্তা মেধা অভিজ্ঞতা সততা খোদাভীরুতা ও সত্য লালনে আপসহীনতার প্রতিষ্ঠিত মর্যাদার দিকটিও সামনে রেখেছে। তাই তারা নবীজির আসনে যেমন কাউকে ঠাঁই দেয়নি, তেমনি সাহাবায়ে কেরামের আসনে বসতে দেয়নি নবীজির দর্শনবঞ্চিত কাউকে। খোলাফায়ে রাশেদাকে তাদের মর্যাদার আসনে যেমন রেখেছে সমাসীন তেমনি আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ মুয়াজ ইবনে জাবাল আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ সাহাবীকে রেখেছে সম্মান ও কৃতজ্ঞতার যথার্থ আসনে। যারা সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষাতে ধন্য, তাদের শিষ্যত্ব লাভে তারাও বরিত হয়েছেন আপন মহিমায়। আপন মর্যাদার এই মানিত নীতি ইমাম আবু হানীফা ইমাম মালিক ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদকে যেমন প্রতিষ্ঠিত করেছে স্বমহিমায় তেমনি প্রতিষ্ঠিত করেছে ইমাম বুখারী ইমাম মুসলিম ইমাম আবু দাউদ ইমাম তিরমিজী ইমাম নাসাঈ ও ইমাম তহাবীকে স্ব স্ব আসনে। মর্যাদার সুঁতোয় গ্রথিত শৃংখলার এ এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস। যুগে যুগে কত মূর্খ, কত পামর চেষ্টা করেছে আমাদের ইতিহাসের এই স্বর্ণশেকল ছিড়ে ফেলতে! কিন্তু নবীজির উপদেশের মাধ্যমে কোনো পামর কিংবা গাড়লকেই দাঁড়াতে দেয়নি মুসলিম উম্মাহ। তাই তাদের দীনি ঐক্য থাকে অটুট! এতে শয়তান ও তার বন্ধুদের অবশ্যই দুঃখিত হওয়ার অধিকার আছে!
আমাদের প্রিয়তম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা বলেছেন- তোমরা ততদিন কল্যাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে যতদিন তোমাদের মাঝে তারা থাকবে যারা আমাকে দেখেছে আমার সঙ্গ লাভ করেছে। আল্লাহর শপথ! তোমরা ততদিন কল্যাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যতদিন তোমাদের মাঝে তারা থাকবে যারা আমার সাহাবীগণকে দেখেছে এবং তাদের সঙ্গ লাভ করেছে। [ইবনু আবি শায়বা, মুসান্নাফ, হাদীস : ৩১৭৪৩; হায়ছামী, মাজযাউয যাওয়াইদ-১০:২০; হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারীতে (৭:৭) বলেছেন- হাদীসটির সনদ হাসান] হযরত জাবের ইবনে সামুরা রাযি. বলেন- একবার হযরত ওমর রাযি. জাবিয়া নামক স্থানে দাঁড়িয়ে বললেন- আমি যেমন এখানে দাঁড়িয়েছি তেমনি দাঁড়িয়ে একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- তোমরা আমার সাহাবীগণের প্রতি উত্তম আচরণ করো, অতঃপর তাদের পরবর্তীদের প্রতি তারপর তাদের পরবর্তীদের প্রতি…….। [তিরমিযী, হাদীস : ২১৬৫, ইবনে মাজা, হাদীস : ২৩৬৩; মুসনাদে আহমাদ- ১:২৬; আলবানী সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, হাদীস: ৪৩০] একই মর্মে আরেকটি হাদীসের উদ্বৃতি দিই। সাহাবী ইমরান ইবনে হুসাইন রাযি. বলেন, হযরত রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- শ্রেষ্ঠ মানুষ হলো আমার কালের মানুষ; তারপর তাদের অব্যবহিত পর যারা তারা; তারপর তাদের অব্যবহিত পর যারা তারা। [সহীহ বুখারী, হাদীস : ২৬৫১, সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৫৩৫] উল্লিখিত হাদীস তিনটির স্পষ্ট বার্তা হলো- সাহাবী তাবিঈ এবং তাবে তাবিঈ- এই তিন প্রজন্মের কাল হলো কল্যাণ ও শ্রেষ্ঠত্বের কাল। নবীজি আদেশ করেছেন যথাক্রমে এই তিন শ্রেণির প্রতি উত্তম আচরণ করতে। আর আমরা জানি, আমাদের ইমাম আবু হানীফা রহ. একজন সম্মানিত তাবিঈ। নবীজির পবিত্র মুখে প্রশংসিত তার কাল এবং উম্মত আদিষ্ট তার প্রতি সদাচরণ করতে। প্রায় তেরশ’ বছরের পৃথিবী স্বাক্ষী- উম্মত তাদের নবীর আদেশ পালনে যে উপমা সৃষ্টি করেছে অন্য কোনো জাতি গোষ্ঠীর ইতিহাসে তার তুলনা খোঁজাও অর্থহীন। আমরা মনে করি- অবিশ্বাস্য শ্রদ্ধা ও আস্থায় শতক শতক ধরে মানিত হওয়ার এ একটি বিশিষ্ট কারণ! বলার অপেক্ষা রাখে না, সাহাবী কিংবা তাবিঈ হওয়ার এই মর্যাদা তর্ক এবং যুদ্ধ করে জয় করা যায় না।
یہ قیمت سے نہیں ملتی یہ ملتی ہے مقدر سے
কড়ি দিয়ে যায় না কেনা- এধন তকদিরের উপহার!
আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ইমাম আবু হানীফা রহ. জন্মগ্রহণ করেছেন হিজরি ৮০ সালে। যেটা ছিল খলীফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের কাল। তখনও সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এর এক বিরাট কাফেলা জীবিত। তিনি ছিলেন তাদের উত্তমররূপে অনুসারীগণের একজন। তিনি প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনে মালিক রাযি.কে দেখেছেন- যখন তিনি কূফায় এসেছিলেন। এটা হাদীস ও রিজাল শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম হাফেয যাহাবী রহ. এর মত। [মানাকিবুল ইমাম আবু হানীফা রহ. ১০ পৃ.] সম্মানিত চার ইমামের মধ্যে তাবিঈ হওয়ার গৌরব কেবল ইমাম আবু হানীফা রহ. এর ভাগ্যেই জুটেছে। তিনি একাধিক সাহাবীর সাক্ষাতে ধন্য হয়েছেন। তার শৈশবে কূফা ছিল জ্ঞানের শহর এবং সাহাবায়ে কেরামের শহর। তখনও সেখানে বেশ ক’জন সাহাবী জীবিত। হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. পারিবারিকভাবেই ছিলেন ব্যবসায়ী। তাদের দোকানের মালিক ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ওমর ইবনে হুরাইস রাযি.। তিনি ইন্তেকাল করেছেন হিজরী ৮৫ সালে। সুতরাং দোকানে আসা যাওয়ার সুবাদে বার বার সাক্ষাৎ হওয়া খুবই স্বাভাবিক কথা! আল্লামা ইবনে নাদীম রহ. লিখেছেন- ইমাম আবু হানীফা রহ. বেশ ক’জন সাহাবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। [তাযকিরাতুল হুফফাযসহ বিভিন্ন গ্রন্থের সূত্রে কাজী আতহার মোবারকপুরী রহ., আইম্মায়ে আরবাআ : ৩৭-৩৮পৃ.] হাদীস শাস্ত্রের দিকপাল এবং শাফিঈ মাযহাবের প্রখ্যাত উকিল হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. তদীয় ফতোয়াগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- ইমাম আবু হানীফা রহ. যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন সাহাবায়ে কেরামের এক কাফেলা জীবিত। তিনি কূফা শহরে ৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তখন সেখানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা বর্তমান। তার ওফাত হিজরী ৮৮ সাল কিংবা তারপরে। [ঐ-৩৯পৃ.; তাযকিরাতুন নুমান, মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সালেহী দিমাশকী শাফিঈ-৮১ পৃ:] তাছাড়া হযরত রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের সময় হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাযি. এর যে বয়স ছিল প্রায় সে বয়সে যখন ইমাম আবু হানীফা রহ. তখন বেশ ক’জন সাহাবী জীবিত। যথা হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আবু আওফা (মৃ. ৮৮) হযরত সাহল ইবনে সাদ সাঈদী (মৃ. ৯১) হযরত আনাস ইবনে মালিক (মৃ. ৯৩) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ইউস্র মাযানী (মৃ. ৯৬) হযরত আমের ইবনে ওয়াসেলা আল আসকা (মৃ. ১০২)! হযরত আমের রাযি. এর ওফাতের সময় হযরত ইমাম রহ. এর বয়স ২২ বছর। নবীজির ওফাতের সময় হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. এর বয়স ছিল এগার বছর। সে বয়সেই তিনি যদি হাদীস গ্রহণ ও ধারণ করতে পারেন তাহলে হযরত ইমাম রহ. কেন হযরত আনাস রাযি. থেকে হাদীস গ্রহণ করতে পারবেন না? তাছাড়া হযরত আনাস রাযি. এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে অনেক বার। অধিকন্তু হযরত আনাস রাযি. সম্পর্কেই কি এটা ভাবা যায়- তার মজলিসে হাদীস পাঠ ও পাঠদান হতো না! এটা ভিন্ন কথা- হযরত ইমাম রহ. সেই সব হাদীস বর্ণনা করেন নি হয়তো! [ড. আল্লামা খালেদ মাহমুদ, আসারুল হাদীস- ২ : ২৭৭] তবে স্মরণ রাখা ভালো- সাহাবী হওয়ার জন্যে যেমন নবীজির সূত্রে হাদীস বর্ণনা করা শর্ত নয়, তাবিঈ হওয়ার জন্যেও হাদীস বর্ণনা শর্ত নয়। তাই ইমাম আবু হানীফা রহ. এর তাবিঈ হওয়ার বিষয়টি তর্কাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত। [যায়লুল জাওয়াহি- ২ : ৪৫৩- এর সূত্রে মাওলানা সরফরায খান সফদর; মাকামে আবি হানীফা- ৮২ পৃ.] ইমাম আবু হানীফা রহ. এর এটাও একটা বৈশিষ্ট্য- তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন জ্ঞানের শহর, হাদীস ও ফেকাহর শহর কূফায়। মুসলমান কেন- মুসলমানদের পরিবেশে থাকে এমন অমুসলমানও জানে ইসলাম কোনো গোপন ও আধ্যাত্মিকতা সর্বস্ব বিষয় নয়। ইসলাম হলো সার্বক্ষণিকভাবে মানিত এক প্রাণপ্রীতিকর জীবনদর্শন। নামাজ রোজা থেকে শুরু করে বিয়ে-শাদি, দোয়া মুনাজাত থেকে শুরু করে পারস্পারিক লেনদেন ব্যবসা বাণিজ্য সর্বত্র মানিত এক বিজয়ী ধর্ম। তাই এই ধর্ম মুসলমানগণ যেমন যুগে যুগে পড়ে শিখেছেন তেমনি শিখেছেন দেখে। আর এভাবেই ধর্মীয় বিচারে ব্যক্তির নির্মাণ ও গঠনে তার সমসাময়িক পরিবেশ ও নিবাসিক জ্ঞানচর্চার বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে। আর একারণেই হযরত ইমাম মালিক রহ. এর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য যেমন মদীনা মুনাওয়ারার অধিবাসী হওয়া তেমনি কূফার অধিবাসী হওয়া হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কোনো সন্দেহ নেই- পাক মদীনার প্রধান ও কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য যেখানে সারা জাহানের বাদশাহ্ হযরত নবীয়ে আরাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আপন নিবাস হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি যে মহান দীন নিয়ে আগমন করেছিলেন তার নিরন্তর পাঠদান, সেই আলোকে ব্যক্তিগঠন, সমাজ সংশোধন অতঃপর ওহী থেকে আহরিত বিশ্বাসের দাওয়াত ও জিহাদের লালন ও প্রতিষ্ঠা হয়েছে এই পবিত্র ভূমিকে কেন্দ্র করেই। ফলে ইসলামের সামগ্রিক রূপ রস ও চেতনা সেঁচে গড়ে উঠেছিল মানব ও মানবতার যে শ্রেষ্ঠ কাফেলা সাহাবায়ে কেরাম নামে পরবর্তী পৃথিবীর জন্যে তারাই ছিলেন ইসলামের জীবন্ত পাঠশালা এবং ইসলামের শিক্ষা চিন্তা বিশ্বাস ও আদর্শের শুভ্র মিনার ও আলোকিত বাতিঘর। হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর জন্মভূমি কূফা শহরও এই সূত্রেই প্রাসঙ্গিক এবং অনুপেক্ষ শিরোনাম।
প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস হলো, হযরত ওমর ফারুক রাযি. যখন খলীফা হলেন তখন তার আমলেই প্রখ্যাত সাহাবী ও বীর হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাযি. এর হাতে বিজিত হয় ইরাক। ইরাক জয় করার পর হযরত ওমর রাযি. কূফা শহর নির্মাণের আদেশ দেন। হিজরি ১৭ সালে তার আদেশে কূফা শহর নির্মিত হলে তার নির্দেশেই এই শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আরবীভাষা প্রাঞ্জলতায় দগ্ধ বেশ কিছু আরব গোত্রের বসতি। সঙ্গে হযরত ওমর রাযি. কূফাবাসীকে কোরআন ও দীন শিক্ষদানের জন্য এই বলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি.কে পাঠিয়ে দেন-
وقدآثرتكم بعبد الله على نفسي
‘আবদুল্লাহকে পাঠিয়ে আমি তোমাদেরকে আমার উপর প্রাধান্য দিলাম’। হযরত ওমর রাযি. স্পষ্ট বলতে চাচ্ছেন- সাহাবায়ে কেরামের আলোকিত কাফেলায় ইবনে মাসউদ এক অনন্য নক্ষত্র। জ্ঞানের উচ্চতায় উপলব্ধির গভীরতায় ও মেধার তী²তায় আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ কাফেলার চূড়ায় অধিষ্ঠিত। তার ইলম ফেকাহ ও সচেতনতা দগ্ধ মত ছাড়া হযরত ওমর রাযি. এরও চলে না। ওমর রাযি. অকৃপণ কণ্ঠে বলেছেন- আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ হলেন- كُنَيْفٌ مُلِئَ فِقْهاً
‘ফেকাহপূর্ণ মহামূল্য পাত্র।’ [আল্লামা জাহেদ কাওসারী রহ. ফিকহু আহলিল ইরাক ওয়া হাদীসুহুম: ১০৭-১০৮] আরেকটি বর্ণনায় আছে, হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি.কে যখন কূফার আমীর বানিয়ে পাঠান তখন হযরত ওমর রাযি. কূফাবাসীর উদ্দেশে লিখেন- ‘আমি তোমাদের কাছে আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে আমীর আর আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদকে শিক্ষক ও উজির করে পাঠালাম। তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্ভ্রান্ত সঙ্গীবর্গ এবং আহলে বদরের অন্যতম। তোমরা তাদের অনুসরণ করবে এবং তাদের কথা মেনে চলবে। আর আমি আবদুল্লাহ্কে পাঠিয়ে তোমাদেরকে আমার উপর প্রাধান্য দিলাম।’ [তাযকিরাতুল হুফ্ফায- ১:১৪ এর সূত্রে আছারুল হাদীস : ২ : ২৩২] গর্বের কথা হলো, কূফা নগরের দীনিশিক্ষা ও বিশ্বাসিক নির্মাণের সূচনা হয়েছিল প্রিয় নবীজির এই দুই সাহাবীর মাধ্যমে। যেমন বীজ তেমন তার গাছ। আর যেমন গাছ তেমন তার ফল। যে ধনে নির্মিত গঠিত হয়েছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ ইমাম আবু হানীফা নুমান ইবনে সাবেত রহ. তার প্রথম বীজ ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং আম্মার ইবনে ইয়াসির। যে বাগানের ফুটন্ত অনুপম ফুল ছিলেন হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. তার প্রথম মালি হযরত ওমর ফারুক রাযি. অতঃপর হযরত আলী মুরতাজা রাযি.! প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদার এই পথ পাথরে অঙ্কিত। উন্মাদের উন্মত্ততায় উড়ন্ত ধুলো এই পথ মুছে দিতে পারে না কখনো। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রাযি. সম্পর্কে হযরত ওমরের মূল্যায়ন শুনেছি আমরা। এবার শরণ নেব সরাসরি নবীজির দুয়ারে। প্রখ্যাত তাবিঈ মাসরুক বলেন, আমরা একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. এর মজলিসে বসা ছিলাম। আমরা ইবনে মাসউদ রাযি. এর সূত্রে একটি হাদীসের কথা বলতেই তিনি বললেন- তাকে আমি তখন থেকেই বরাবর ভালোবাসি যখন আমি রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একথা বলতে শুনেছি- তোমরা চার ব্যক্তির কাছ থেকে কোরআন শেখো। ইবনে উম্মে আবদ (আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ) উবাই ইবনে কাব, আবু হুযায়ফার আজাদকৃত গোলাম সালেম এবং মুয়ায ইবনে জাবাল। [সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৪৬৪; সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৭৫৮] হযরত রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে মাসউদ রাযি. সম্পর্কে এও বলেছেন-
اني رضيت لأمتي ما رضي لأمتي
আমার উম্মতের জন্যে ইবনে মাসউদ যা পছন্দ করে আমিও তাই পছন্দ করি। [মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ৫৩৭৮ এর সূত্রে ফিকহু আহলিল ইরাক: ১০৯ পৃ:] আরেকটি হাদীসে হযরত রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- আমার পর তোমরা আমার সাহাবীগণের মধ্যে দুই ব্যক্তিকে অনুসরণ করবে- আবু বকর এবং ওমর; আম্মার-এর আদর্শে আদর্শবান হবে আর ধর্মীয় বিষয়ে ইবনে মাসউদকে মেনে চলবে। [তিরমিজি, হাদীস-৩৮০৫] হযরত আলী রাযি. বর্ণনা করেন- নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলেন- আমি যদি পরামর্শ ছাড়া কাউকে আমীর বানাতাম তাহলে ইবনে মাসউদকে আমীর বানাতাম। [ঐ-হাদীস : ৩৮০৯] প্রখ্যাত তাবিঈ আবদুর রহমান ইবনে ইয়াযিদ বলেন- আমি একবার হযরত হুযায়ফা রাযি.কে বললাম- আদর্শ ও আচরণে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচে কাছের কোনো ব্যক্তির সন্ধান দিন- আমরা যাকে গ্রহণ করব এবং যার কথা মেনে চলব। হযরত হুযায়ফা রাযি. বলেন- আদর্শে আচরণে চরিত্রে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচে কাছের মানুষ হলেন ইবনে মাসউদ। [ঐ, হাদীস : ৩৮০৭ ইমাম তিরমিজি এই হাদীসটি হাসান সহীহ বলেছেন]। এই সব হাদীস থেকে সহজেই অনুমান করতে পারি, হযরত ওমর রাযি. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. এর মূল্যায়নে কোনরূপ অত্যুক্তি করেন নি। হযরত ওমর রাযি. কূফা শহর নির্মাণ করে এই শহরের শিক্ষক বানিয়েছিলেন এই ইবনে মাসউদকে। আর হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. সর্বোচ্চ যতেœর সঙ্গে এখানে শিক্ষকতা করেছেন হযরত উসমান রাযি. এর শাসনামলের শেষ পর্যন্ত। পরিণতিতে কূফাকে পূর্ণ করে দিয়েছেন কোরআনের হাফেয ফকীহ এবং মুহাদ্দিস দ্বারা। ইমাম সারাখসী রহ. বলেছেন : তার সান্নিধ্যে থেকে যারা ফকীহ হিসাবে গড়ে উঠেছিলেন তাদের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। [ফিকহু আহলিল ইরাক-১১০ পৃ:] তাছাড়া এই কূফা শহরে আরও ছিলেন সাদ ইবনে মালিক, আবু ওয়াক্কাস, হুযায়ফা, আম্মার, সালমান ফারসী এবং আবু মূসা আশয়ারীর মতো শ্রেষ্ঠ সাহাবীদের এক কাফেলা। অনন্তর যখন হযরত আলী রাযি. এই কূফাকে রাজধানী করেন তখন এখানকার জ্ঞান চর্চার পরিবেশ ও জ্ঞানগভীরতায় সিদ্ধ বিপুলসংখ্যক ফকীহ ও আলেম দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হন এবং বলেন-
رحم الله ابن ام عبد قد ملأ هذه القرية علما
আল্লাহ তায়ালা ইবনে মাসউদের প্রতি করুণা করুন। তিনি এই জনপদকে ইলম দ্বারা পূর্ণ করে দিয়েছেন। আরেকবার বলেছেন-
اصحاب ابن مسعود سرج هذه الأمة
ইবনে মাসউদের শিষ্যগণ হলেন এই উম্মতের প্রদীপ।
হযরত আলী রাযি. এই শহরকে রাজধানী বানাবার পর কূফা হয়ে উঠে মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র। ইবরাহীম নাখাঈ রহ. বলেছেন : কূফায় বাইয়াতুর রিদওয়ান তথা হোদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারী সাহাবীর সংখ্যা ছিল তিনশ আর সত্তর জন ছিলেন বদরী সাহাবী। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাসসির আল্লামা সুয়ূতী রহ. মিশরে বসবাসকারী সাহাবীর সংখ্যা শুমার করতে গিয়ে তিনশ’র বেশি সাহাবী খুঁজে পাননি। অথচ আল্লামা ইজলী রহ. বলেছেন- কূফাকে যারা নিবাস হিসেবে বরণ করেছিলেন এমন সাহাবীর সংখ্যাই দেড় হাজার। যারা কূফায় অল্প সময় কাটিয়েছেন তারপর কিছু দিন ইলম বিতরণ করে অন্য শহরে চলে গেছেন তাদের হিসেব তো ভিন্ন। ভিন্ন ইরাকের অন্যান্য শহরের হিসাবও।
মাসরুক রহ. প্রখ্যাত তাবিঈ। নবীজির কালেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন কিন্তু সাক্ষাৎ পান নি। প্রথম শ্রেণির তাবিঈ আলেম আবেদ এবং যাহেদ। বিপুল সংখ্যক সাহাবীর কাছ থেকে হাদীস শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন। ওফাত লাভ করেছেন ৬২ কিংবা ৬৩ হিজরীতে। তিনি বলেন- আমি দেখেছি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইলম সঞ্চিত হয়েছে গিয়ে ছয় ব্যক্তির মধ্যে। তারা হলেন- হযরত আলী, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হযরত ওমর, যায়েদ ইবনে সাবেত, আবুদ দারদা এবং উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন। তারপর এই ছয়জনের ইলম গিয়ে সঞ্চিত হয়েছে হযরত আলী ও হযরত ইবনে মাসউদের মধ্যে। [ফিকহু আহলিল ইরাক: ১১৪-১১৭ পৃ:] আর এভাবেই এই কূফা শহরে ক্রমে প্রিয় নবীজির আসমানী জ্ঞানের ভাণ্ডার, কোরআন ও সুন্নার জ্ঞান ও নূর সঞ্চিত হয় কুদরতি আয়োজনে।
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ইলম ও মেধায় হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রাযি. এর ব্যক্তিত্বের কথা কারোই অজানা নয়। যার সম্পর্কে প্রখ্যাত সাহাবী নবীজির খাদেম আনাস ইবনে মালিক রাযি. বলেছেন-
أعلمهم بالحلال والحرام معاذ بن جبل
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হালাল হারাম সম্পর্কে সবচে বেশি জানেন মুয়ায ইবনে জাবাল রাযি.
নবীজি তাকে ইয়েমেনের বিচারপতি বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন এবং কোরআন ও সুন্নাহয় নেই এমন বিষয়ে কিভাবে ফয়সালা করবে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন- ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমি আমার গবেষণার আলোকে ফয়সালা করব। নবীজি এই উত্তরে খুশি হয়ে বলেছিলেন-
الحمد لله الذي وفق رسول رسول الله لما يرضى به رسول الله
আল্লাহর জন্যে সকল প্রশংসা যিনি তার নবীর প্রতিনিধিকে তার রাসূলের সন্তুষ্টি মাফিক কাজের তৌফিক ও সামর্থ্য দিয়েছেন।
হযরত ওমর রাযি. তার এক ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন- যে ব্যক্তি ফেকাহর কোন মাসআলা জানতে চায় সে যেন মুয়াযের কাছে যায়। আর কারও যদি অর্থের প্রয়োজন পড়ে সে যেন আমার কাছে আসে। কারণ আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে অর্থের সংরক্ষক ও বণ্টনকারীরূপে নিযুক্ত করেছেন। [তাযকিরাতুল হুফফায, আবু দাউদ ও তিরমিজীর সূত্রে- আছারুল হাদীস : ২ : ২২৯] জ্ঞানে ও গুণে বিখ্যাত এই সাহাবী মুয়ায রাযি.ই তার ছাত্র আমর ইবনে মায়মুন আলআওদীকে উপদেশ দিয়েছেন কূফায় গিয়ে হযরত ইবনে মাসউদের সান্নিধ্য গ্রহণ করার জন্যে। এই হলো জ্ঞানের শহর কূফা ও কূফার শিক্ষক হযরত ইবনে মাসউদ রাযি.।
দেড় হাজার সাহাবীর সংস্পর্শে মুগ্ধ কূফা কতটা মুগ্ধ করেছিল হযরত ওমর রাযি.কে তার এই কথা থেকেই উপলব্ধি করতে পারি। তিনি বলেছিলেন-
بالكوفة وجوه الناس
কূফা হলো শ্রেষ্ঠ মানুষের নগরী।
তিনি যখন কূফাবাসীর উদ্দেশে পত্র লিখতেন তাদের এই বলে সম্বোধন করতেন- ইলা রা’সিল ইসলাম- ইসলামের মস্তকের উদ্দেশ্যে…….। আর হযরত আলী রাযি. বলেছিলেন-
الكوفة جمجمة الإسلام وكنز الإيمان وسيف الله ورمحه يضعه حيث يشآء
কূফা হলো ইসলামের আস্তানা ঈমানের খনি, আল্লাহর তরবারী ও বর্শা- আল্লাহ্ তাকে যেখানে খুশি ব্যবহার করেন।’ আর সায়্যিদুনা হযরত সালমান ফারসী রাযি. বলেছেন-
الكوفة قبة الإسلام وأهل الإسلام
কূফা হলো ইসলাম ও মুসলমানদের গম্বুজ।
সুতরাং ঈমান ও ইসলামের খনি ও নিবাস যে নগর, সে নগর যে ইসলামের জ্ঞান ও প্রাণেরও শহর হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জ্ঞানের শহর এভাবে না বলে বরং পুরো কূফাটাকেই ইসলামের পাঠশালা বলা ভালো। প্রখ্যাত তাবিঈ মুহাম্মদ ইবনে সিরীন রহ.কে কে না চেনে? তিনি বলেছেন-
أدركت بالكوفة أربعة آلاف شاب يطلبون العلم
‘আমি কূফায় চার হাজার যুবককে ইলম অন্বেষণরত পেয়েছি।’ [টীকা : ফিকহু আহলিল ইরাক : ১১৩-১১৬] ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে চার হাজার শিক্ষার্থীর শহর- কী অবাক করা ইতিহাস। আমাদের গর্ব এই জ্ঞানের শহরেই জন্মেছিলেন আমাদের ইমাম আবু হানীফা রহ.। এই জ্ঞানের শহরের এক উজ্জ্বল অবদান হলো- পাক কোরআনের সর্বখ্যাত সাত কারীর অন্যতম তিন কারী এই শহরের-ই সন্তান। তারা হলেন- হযরত আসেম, হযরত হামযা এবং হযরত কাসায়ী রহ.। তাছাড়া পবিত্র কোরআনের তাফসীরের ক্ষেত্রেও উলামায়ে কেরাম হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. এর শিষ্যদের সর্বাধিক পণ্ডিত ও প্রাজ্ঞ মনে করেন। হযরত কাতাদা রহ. যে সাঈদ ইবনে জুবাইরকে তাফসীর শাস্ত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করতেন তিনিও বসবাস করতেন এই কূফাতেই! কোরআন ও তাফসীরই কেবল নয়। তার প্রধান ও বুনিয়াদি শাস্ত্র আরবী ভাষা ও তার ব্যাকরণ শাস্ত্রের জননী শহরও এই কূফা। [মাওলানা মুহাম্মদ আলী কাফালবী রহ. ইমাম আযম আওর ইলমে হাদীস : ১৫০ পৃ:] কূফা সম্পর্কিত উল্লেখিত তথ্যাবলির পর আর বলতে হয় না- কূফা ছিল হাদীসের মহান কেন্দ্র। দেড় হাজার সাহাবী যেখানে থেকেছেন, নবীজির প্রতি প্রেম ও ভালোবাসাই ছিল যাদের জীবনের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য বরং জীবনের জীবন- তারা কথায় কথায় বলবেন : নবীজি এই বলেছেন, নবীজি এই করেছেন, এইভাবে করেছেন, আমাকে এই বলতে শুনেছেন, এই করতে দেখেছেন, এইভাবে হেঁটেছেন, এইভাবে খেয়েছেন, এইভাবে ইবাদত করেছেন- এই তো স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতার সরল ফসলরূপে কূফার প্রতিটি ঘর মসজিদ ও প্রাঙ্গন সদা গুঞ্জরিত হতো কোরআন তেলাওয়াতে, হাদীসের পঠন পাঠন ও মনযোগী নিবিষ্ট চর্চায়। এ সুবাদে উদ্ধৃতির তো অভাব নেই। এক দুটি উদাহরণ দিই। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবু বকর ইবনে দাউদ বলেন- আমি কূফায় এলাম। আমার কাছে তখন একটি দেরহাম ছিল। আমি একটি দেরহাম দিয়ে ত্রিশ মুদ পরিমাণ লোবিয়া সবজি কিনলাম। প্রতিদিন এক মুদ পরিমাণ লোবিয়া খেতাম আর হযরত আশাজ রহ. এর মজলিসে বসে এক হাজার হাদীস লেখতাম। এভাবে এক মাসে আমি ত্রিশ হাজার হাদীস গ্রন্থবদ্ধ করি। ভাবা যায়- মাত্র একজন উস্তাদের সূত্রে এক মাসে ত্রিশ হাজার হাদীস সংগ্রহ করেছেন। এ কারণেই এই হাদীসের টানে এই শহরের বিপুল ভাণ্ডারের আকর্ষণে বুখারীর মতো বড় মুহাদ্দিসও এই শহরে বার বার এসেছেন। হাদীসের অমৃত ঘ্রাণে তৃপ্ত করেছেন আজন্ম তৃষিত জ্ঞানের আত্মা। [মাওলানা তকী উসমানী, মুকাদ্দিমা দরসে তিরমিজি- ৯০ পৃ:] এরও দু’য়েকটি উদাহরণ দিই। সহীহ বুখারীর ১১ নাম্বার হাদীস। বর্ণনাকারী প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু মুসা আশয়ারী রাযি.। বুখারী শরীফের পৃথিবীখ্যাত ভাষ্যকার শাফিঈ মাজহাবের কিংবদন্তী মুহাদ্দিস হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেছেন- এই হাদীসের বর্ণনাকারী সকলেই কূফার অধিবাসী। দুই. অধ্যায়-২০। হাদীস-৭৯। হাফেয সাহেব রহ. এই হাদীসের সনদ সম্পর্কেও বলেছেন- এর প্রত্যেক রাবীই কূফার অধিবাসী। তিন. অধ্যায়-৩৯। হাদীস-১১১। এই হাদীসের সনদ সম্পর্কেও হাফেয সাহেব বলেছেন- শুধু ইমাম বুখারীর উস্তাদ মুহাম্মদ ইবনে সালাম ছাড়া অবশিষ্ট সকল রাবীই কূফার অধিবাসী। [ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী, দারুল হাদীস মিশর ২০০৪ ইং ১ম খণ্ড।] এভাবে বুখারী শরীফে ইমাম বুখারী রহ. যাদের সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে তিনশজন মুহাদ্দিস কূফার অধিবাসী। [মাওলানা তকী উসমানী-ঐ] এই উম্মাহর জন্যে কি যে গর্বের কথা- হযরত ওমর রাযি. প্রতিষ্ঠা করেছেন যে শহর, যে শহরকে রাজধানী হিসেবে বরণ করেছেন হযরত আলী মুরতাজা রাযি., যাকে ছাড়া হযরত ওমরের চলে না সেই ইবনে মাসউদ ছিলেন সে শহরের শিক্ষক, ইমাম বুখারীর সহীহ বুখারী চলে না যে শহরের হাদীস ও মুহাদ্দিস ছাড়া, দেড় হাজারেরও বেশি সাহাবীর ইলম আমল ও তাকওয়ার রসে সিঞ্চিত যে পুণ্যভূমি ইমাম আবু হানীফা রহ. জন্মগ্রহণ করেছেন সেই শহরে অতঃপর পূর্বসূরী সকল মনীষীর সব ইলম প্রজ্ঞা তাকওয়া ও আখলাকের সমুদয় নূর শূষে নিয়ে হয়েছেন সেই শহরের প্রধান শিক্ষক এবং আবিশ্ব মুসলিম উম্মাহর অবিসংবাদিত ইমাম! একই ব্যক্তির জীবনে সঞ্চয়ের এত বিশাল ভাণ্ডার পৃথিবী কমই দেখেছে। [অসমাপ্ত]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন